২. বৃন্দা
অভির সঙ্গে আড্ডা মারলে কী ভাবে সময় কেটে যায় বোঝাই যায় না। বৃন্দা তাই প্রেমের সেশনগুলোকে অ্যাকাডেমিক সেশনে বদলে দিয়েছে। অ্যাকাডেমিক বিল্ডিং-এর তিনতলায় সেন্ট্রাল লাইব্রেরির এক কোনে দু’জনে ঢাউস বই নিয়ে বসে লিভারলাঙের প্যাথলজি নিয়ে আলোচনা করে। রোজ দু’ঘণ্টার গ্রুপ ডিসকাশনে প্রেম হয়, পড়াশুনোও।
সেমিস্টার পরীক্ষা নিয়ে কেউ চাপ নেয় না। ইন্টার্নাল অ্যাসেসমেন্টের রেজাল্ট খারাপ হতে পারে, তবে সাপ্লির চোখরাঙানি নেই। তাই বলে সেই পরীক্ষায় এত শক্ত প্রশ্ন আশা করেনি বৃন্দা। পঁচিশ নম্বরের চারটে লং কোয়েশ্চেন দেখে সবার মাথায় হাত। সুরজ চেঁচিয়ে বলল, ‘সিফিলিস, এইডস, ওভারি আর পেনিস থেকে লং কোয়েশ্চেন। রিনা ম্যাডাম কি সেক্স এডুকেশনের সেমিস্টার নিচ্ছেন?’
‘কথা বোলো না।’ মুচকি হেসে বললেন রিনা দত্ত। ‘যে যা পারো লেখো। নম্বর আমার হাতে। কোয়েশ্চেন পিছু দু’পাতার কম লিখলে শূন্য দেব। ফাঁকা খাতা জমা দিলেও শূন্য দেব। আদার ওয়াইজ সবাই পাশ করবে। সুতরাং ক্যারি অন।’
বৃন্দা জানে রিনা এক কথার মানুষ। অতএব পাতা ভরালেই পাশ। চারটে প্রশ্নের মধ্যে সিফিলিসের ল্যাবরেটরি ডায়াগনসিস বৃন্দার ঝাড়া মুখস্থ। পলিসিস্টিক ওভারিয়ান ডিজিজ সম্পর্কে মেয়েদের ম্যাগাজিনেই অনেক কথা লেখা থাকে। ওটা নামানো যাবে। পেনিসের ক্যানসারটা অল্প জানা। কিন্তু এইডস ভাইরাস সম্পর্কে তার জ্ঞান শূন্য। এই প্রশ্নের উত্তরের জন্য অন্যের সাহায্য লাগবে।
তিন ঘণ্টার পরীক্ষার মধ্যে দু’ঘণ্টা ধরে তিনটে প্রশ্নের উত্তর লিখল বৃন্দা। একগাদা ছবি আঁকল। চার্ট, ডায়াগ্রাম আর গ্রাফ দিল। চার্ট আর ডায়াগ্রামের মধ্যে বেশ কয়েকটা তার মস্তিষ্কপ্রসূত। কোনও টেক্সট বুকে এই সব চার্ট বা ডায়াগ্রাম নেই। তবে তাতে কিছু যায় আসে না।
তিনটে প্রশ্নের উত্তর লেখা শেষ করে সন্তর্পণে ঘাড় ঘোরালো বৃন্দা। তার পাশে জেম্সির সিট পড়েছে। জেম্সি আড়চোখে তাকিয়ে ঠোঁট নেড়ে নিঃশব্দে বলল, ‘কী?’
‘এইচআইভি।’ ঠোঁট নাড়ল বৃন্দা।
‘গট ইট ফ্রম চন্দন।’ তিনটে লুজ শিট আলাদা করে সরাল জেম্সি। জিজ্ঞাসা করল, ‘তোর কাছে পেনিস আছে?’
প্রশ্নটা শুনে বৃন্দা আঁতকে উঠে মাথা নীচু করে অনেকক্ষণ ধরে হাসল। জেম্সিও নিজের ভুল বুঝতে পেরে কুলকুল করে হাসছে। অবশেষে নিজেকে সামলে বৃন্দা বলল, ‘হ্যাঁ। কার্সিনোমা পেনিসের বায়প্সি ফাইন্ডিংস লেখা হয়ে গেছে।’
‘এক্সচেঞ্জ।’
বৃন্দা সামনের দিকে তাকাল। রিনা মোবাইলে নীচু গলায় কথা বলছেন আর কাগজে হিজিবিজি কাটছেন। নির্ঘাৎ নিরোধ স্যারের সঙ্গে টেলি-প্রেম চলছে। লুজ শিট এক্সচেঞ্জ করার আইডিয়াল টাইম। কারসিনোমা পেনিসের বায়প্সি ফাইন্ডিং লেখা চারটে পাতা টেবিল থেকে সরিয়ে বসার বেঞ্চির মাঝামাঝি রাখল বৃন্দা।
‘অ্যাত্তো লেখা?’ চোখ কপালে তুলে জেম্সি বলে, ‘ইয়োর পেনিস ইজ টু বিগ!’
‘শাট আপ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ।’ চোখ পাকিয়ে ফিসফিসোয় বৃন্দা।
অতি দ্রুত লুজ শিটের হাতবদল হল। বিদ্যুৎ গতিতে জেম্সির লুজ শিটগুলো নিজের আনসার শিটের ফাঁকে ঢুকিয়ে নিয়ে পড়তে শুরু করল বৃন্দা। মাছিমারা কেরানির মতো দেখে দেখে কপি করার মেয়ে সে নয়। জেম্সি কোন কোন পয়েন্টে উত্তর ফেনিয়েছে সেটা দেখে লুজ শিট ফেরত দিয়ে দেবে।
এডস ভাইরাসের চেহারা এত জটিল?জেম্সির ডায়াগ্রাম দেখে চোখ কপালে উঠল। এ জিনিস মুখস্ত করে নামানো যাবে না। দেখে দেখেই আঁকতে হবে। টুক করে রিনাকে দেখে নেয় বৃন্দা। মোবাইলে প্রেমালাপ এখনো চলছে।
লাল-নীল স্কেচপেন দিয়ে ডায়াগ্রাম কপি করা শুরু করে বৃন্দা। রিনা উঠে এলে এক আনসার স্ক্রিপ্টে দুটো ভাইরাসের ডায়াগ্রাম দেখে এক সেকেন্ডে সব বুঝে যাবেন। স্যামির কানে কথা পৌঁছতে একটা ফোন কলই যথেষ্ট।
ডায়াগ্রাম আঁকতে চার মিনিট নিল বৃন্দা। জেম্সির জঘন্য হাতের লেখায় ভাইরাসের বর্ণনা পড়তে আরও ছ’মিনিট। দশ মিনিটের মধ্যে ব্যাপারটা বুঝে নিয়ে জেম্সির দিকে তাকাল।
‘ডোন্ট ডিসটার্ব মি নাও। অ্যায়াম কপিইং।’ ফিসফিসিয়ে বলে জেম্সি। আওয়াজ শুনে ফোন কেটে রিনা ম্যাডাম বলেন, ‘বৃন্দা, এনি প্রবলেম?’
বৃন্দা এখন ঘাড় গুঁজে মন দিয়ে উত্তর লিখছে। শুনতে না পাওয়ার অভিনয় করে সে। দ্বিতীয়বার রিনা একই প্রশ্ন করায় বলল, ‘হ্যাঁ ম্যাডাম। খুব প্রবলেম।’
‘বলো। কী হয়েছে?’ চেয়ার ছেড়ে বৃন্দার কাছে এগিয়ে আসছেন রিনা।
‘টু টাফ কোয়েশ্চেন্স। টু লেংদি আন্সারস।’ কাঁদো কাঁদো মুখে জবাব দেয় বৃন্দা। সঙ্গে সঙ্গে হল জুড়ে গুঞ্জন শুরু হয়ে যায়।
‘হ্যাঁ ম্যাডাম, খুব শক্ত প্রশ্ন হয়েছে।’ বলে চন্দন।
‘ও ম্যাডাম, এদিকে একটু আসুন।’ হাঁক পাড়ে প্রবাল।
‘ম্যাডাম এইচআইভিটা জানি না।’ সবুজের কাতর আবেদন।
‘ম্যাডাম, প্রবাল একটুও হেল্প করছে না।’ ফচকেমি করে শ্রীপর্ণা।
এই সব হল্লা আর বাজে কথায় হল ভনভন করতে থাকে। বৃন্দা জানে, এ হল ‘ডিকয়’। রিনার দৃষ্টি অন্যদিকে ঘোরানোর চেষ্টা। পরীক্ষা হলে গণ্ডগোল তৈরি করে, ম্যাডামকে নিজের কাছে ডেকে নিয়ে, অন্যদের সুযোগ করে দেওয়া। এই ব্যাপারে ছাত্রছাত্রীদের ঐক্য নিখুঁত।
রিনাও এক সময় ছাত্রী ছিলেন। এ সব জিনিস তাঁর জানা। শিক্ষিকা হয়ে পরীক্ষা দেওয়ার দিনগুলো ভোলেননি। তিনি বললেন, ‘আমার একটা জরুরি ফোন আসছে। আমি ঠিক দশ মিনিটের জন্য হলের দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ফোন অ্যাটেন্ড করছি। তোমরা মন দিয়ে লেখো। কোনও শব্দ যেন না শুনি।’
দেড়শোজন পরীক্ষার্থী মুহূর্তে নিশ্চুপ। রিনা হলের বাইরে গিয়ে দরজা টেনে দিলেন।
পরবর্তী দশ মিনিট হলঘরে একটাও শব্দ শোনা গেল না। ইশারা, ইঙ্গিত, লুজ শিটের হাতবদল, খসখস করে লেখা, এতেই সময় চলে গেল। রিনা হলঘরে ফিরলেন পনেরো মিনিট পার করে। চেয়ারে বসে বললেন, ‘হারি আপ। পরীক্ষা শেষ।’
বৃন্দা নিজের আসন থেকে উঠে খাতা জমা দিল। এইচআইভির উত্তরটা লেখা হয়ে গেছে। সব মিলিয়ে প্যাথলজির থিয়োরি পরীক্ষা খারাপ হল না। অভিও আসছে। বৃন্দা বলল, ‘মুখ গোমড়া কেন?’
‘এইচআইভিটা ভালো লিখতে পারলাম না।’
‘ফালতু কথা বাদ দে! দু’পাতার বেশি লিখেছিস তো?’
‘তা লিখেছি। তবে টোকাটুকি ব্যাপারটা আমার ভালো লাগে না।’
‘সাধুদের মতো কথা বলিস না তো! এত শক্ত প্রশ্ন কী করে সেমিস্টারে দেয়? রিনা ম্যাডাম নিজে পরীক্ষা দিতে বসলে শিয়োর ঝাড় খেতেন। ছাড় ওসব কথা। এখন তোর কী প্ল্যান?’
‘ফার্মাকোলজি নিয়ে বসা ছাড়া আর কোনও কাজ নেই। কবে যে এই ঝামেলা শেষ হবে, ঈশ্বর জানেন।’
‘থিয়োরি পরীক্ষা শেষ হলে একটা সিনেমা যাবি নাকি?’
‘দাঁড়া, আগে এই পাপের বোঝা ঘাড় থেকে নামাই। তারপর সিনেমা থিয়েটার নিয়ে ভাবব।’
‘আর তোর পদ্য?’
‘নিকুচি করেছে পদ্যর! আমি হোস্টেলে চললাম। বাই।’
‘আমাকে বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত পৌঁছে দিবি না?’
‘পারলাম না বস। হোস্টেলে গিয়ে ঘুমোতে হবে।’ বৃন্দার হাত নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে মৃদু চাপ দেয় অভি। বৃন্দাও পালটা চাপ দেয়। অভি বৃন্দার চোখে চোখ রেখে বলে, ‘আর একদিন প্রিন্সেপ ঘাট যাব।’
‘আচ্ছা!’ বলে বৃন্দা। হাত ছাড়িয়ে নিয়ে এজেসি বোস রোডের দিকে এগোয়।
চন্দন যে পিছন পিছন আসছে, খেয়াল করেনি বৃন্দা। দাঁড়ের কাছাকাছি এসে সে শুনতে পেল, ‘অ্যাই বৃন্দা! তখন থেকে ডাকছি। শুনতে পাচ্ছিস না?’
‘কখন থেকে ডাকছিস?’ বৃন্দা অবাক।
‘এই প্রথমবার ডাকলাম। তবে ওইভাবে বললে ব্যাপারটা নাটকীয় হয়।’ সিগারেট ধরিয়ে বলে চন্দন।
‘নাটক করতে হবে না। এক কাপ চা খাওয়া।’ দাঁড়ে বসে বলে বৃন্দা।
দুটো চায়ের অর্ডার দিয়ে চন্দন বলে, ‘পরীক্ষা কেমন হল?’
‘ঢপের! ছাড় ওসব। তোর কেমন হল?’
‘ভালো। আমি তোকে ডাকলাম অন্য একটা কারণে।’ বৃন্দার হাতে চায়ের ভাঁড় ধরিয়ে বলে চন্দন, ‘মন্দিরা ব্যানার্জি তোর মা। তাই না?’
‘হ্যাঁ। কেন?’ চায়ে চুমুক দিয়ে অবাক হয়ে বলে বৃন্দা।
‘উনি এখন আমাদের গ্রামে। নতুনগ্রামে শুটিং পার্টি এসেছে। আগামী পনেরো কুড়িদিন ওখানেই থাকবে। পুলিশে পুলিশে ছয়লাপ।’ চন্দন এক চুমুকে চা শেষ করল।
‘তোকে কে বলল যে মন্দিরা ব্যানার্জি আমার মা?’
‘বাবা ফোন করেছিল। আমাকে বলল, হিরোইনের হাজব্যান্ড নাকি ইন্ডিয়ান মেডিকাল কলেজের সার্জারির এইচওডি। আমি শুনে দুই আর দুইয়ে চার করলাম।’
‘ঠিকই গেস করেছিস। মা এখন নতুনগ্রামে।’ চায়ের ভাঁড় ফেলে ট্রাম ধরতে দৌড়ল বৃন্দা। ট্রামে উঠে মন্দিরাকে ফোন করতে হবে। যদি না ধরে অথবা বলে যে ফোন সুইচ অফ আছে, তাহলে বুঝতে হবে শুটিং চলছে।
মন্দিরা এক রিং-এ ফোন ধরলেন। ‘কী রে? পরীক্ষা শেষ?’
‘হ্যাঁ। তোমাকে তোমার প্রোডিউসার কোথায় রেখেছে? ওটা তো গ্রাম।’
‘একটাই ভদ্রস্থ হোটেল আছে। নাম হোটেল মেঘদূত। ওটাই পুরো বুক করা হয়েছে। আমার ঘরটা মন্দ নয়। এসি আছে আর অ্যাটাচ্ড বাথ আছে। বাথরুমে গিজার, কমোড, বাথটাব, বেডরুমে ফ্ল্যাট টিভি আর ফ্রিজ আছে। আলাদা কুকিং জোন আছে। আমি ইউনিটের সঙ্গেই লাঞ্চ বা ডিনার করি। তবে বিশাল কপুর খুব ট্যানট্রাম থ্রো করছে।’
‘মুম্বইয়ের হিরো তো! ট্যানট্রাম থ্রো করে দেখে নেয় বাজার কতটা আছে।’
‘হিরো নয়, বল এক্স-হিরো। বলিউড থেকে কুড়ি বছর আগে আউট। আমার ধারণা ও বিনি পয়সায় কাজ করছে।’
‘আমার ধারণা রোল পাওয়ার জন্য বিশালই পয়সা দিয়েছে।’
বৃন্দার কথা শুনে কুলকুলিয়ে হাসেন মন্দিরা। বলেন, ‘নেক্সট পরীক্ষা কবে?’
‘পরশু।’
‘মন দিয়ে পরীক্ষা দিস। পরীক্ষা শেষ হলে ফোন করিস।’ ফোন কাটেন মন্দিরা। সামনে তাকিয়ে হেয়ার ড্রেসার সালমাকে বলে, ‘ফ্লোর রেডি? আমি বেরোব?’
‘হ্যাঁ। চলো।’ সালোয়ার কামিজ পরা, মাথায় বড়িখোঁপায় একগাদা চিরুনি আর কাঁচি গোঁজা সালমা বলে, ‘এখন তোমার কয়েকটা ক্লোজ আপ নেওয়া হবে। কন্টিনুইটি শট।’ মন্দিরা চেয়ার থেকে ওঠেন।
বিধবাপুকুরের ইউনিট নতুনগ্রামে পৌঁছেছে গতকাল। মানে পয়লা মার্চ। মনোতোষ আগে প্রোডাকশান ম্যানেজারকে সঙ্গে নিয়ে রেকি করে গিয়েছিলেন। তখনই হোটেল মেঘদূত বুক করে যান। হোটেলটার অ্যাডভান্টেজ প্রচুর। বর্গভীমা মন্দির সংলগ্ন পুকুর থেকে পাঁচ মিনিটের হাঁটাপথ। রাস্তাটা সরু। গাড়ি ঢোকার উপায় নেই। রাস্তার দু’দিকে গেরস্থ বাড়ি। এমন কোনও অলিগলি নেই, যেখান দিয়ে শুটিং দেখার জন্য পিলপিল করে লোক আসবে। শুটিং-এর জন্য আদর্শ লোকেশান। লাইট, ট্রলি, রিফ্লেক্টের বা ক্যামেরা নিয়ে যাওয়ার সময় ভিড় সরাতে হবে না। হিরো হিরোইন দেখার জন্য থিকথিকে লোকও হবে না। আরামে কাজ করা যাবে।
গতকাল দিনের বেলার অভিজ্ঞতা খারাপ নয়। মনোতোষ একটা বুদ্ধিমানের কাজ করেছেন। নতুনগ্রামে রটিয়ে দিয়েছেন যে দূরদর্শনের জন্য বর্গভীমার মন্দিরের ওপরে একটা তথ্যচিত্র শুট করা হচ্ছে। নাম, ‘হিস্ট্রি অব বর্গভীমা’। স্ল্যাপস্টিকে এই নামই ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রোডাকশানের তরফে কড়া নির্দেশ আছে, অন্য কিছু যেন বলা না হয়।
একে দূরদর্শন, তায় তথ্যচিত্র। তাও আবার ইংরিজিতে। লোকজনের আগ্রহ কম। তবে গ্রামাঞ্চলে মন্দিরার স্টার ভ্যালু এখনও আছে। তাঁকে দেখতে ভালোই ভিড় হচ্ছে। বিশালের বাজারদরও খারাপ না। স্থানীয় থানা থেকে পুলিশ মোতায়েন করেছে।
গতকাল পুকুরপাড়ে বিশাল আর মন্দিরার কথপোকথনের একটা লম্বা শুট ছিল। তেরো মিনিটের সিকোয়েন্স শুট করতে সারাদিন লেগেছে। আজ তার কন্টিনিউটি শুট হচ্ছে। বিশাল যখন ডায়ালগ বলছিলেন, তখন মন্দিরার অভিব্যক্তি কেমন ছিল— সেটাই ক্যামেরাবন্দি হবে। প্রথম দু’দিন মনোতোষ হালকা কাজ রেখেছেন। কাল থেকে পুরোদমে শ্যুটিং শুরু হবে।
মন্দিরার পরনে সাদা থান। নতুন থান কিনে চায়ের লিকারে ডুবিয়ে পুরোনো করা হয়েছে। বেশ কয়েক জায়গায় ছিঁড়ে রিফু করা হয়েছে আর গিঁট বাঁধা হয়েছে। পুরো সিনেমায় মন্দিরার এই একটিই কস্টিউম। পাঁচটা থান কিনে একই সঙ্গে চায়ে ডোবানো, ছেঁড়া, রিফু করা এবং গিঁট বাধার কাজ করা হয়েছে, যাতে অন্য শাড়ি পরলেও দর্শক বুঝতে না পারে।
ঘি আর মাখন খেয়ে খেয়ে মন্দিরার ওজন এখন সত্তর কিলো। কোমরে চওড়া মেদ। হাতেও মেদ জমেছে। মনোতোষ মন্দিরাকে ব্লাউজ বা অন্তর্বাস পরতে দেননি। পেটিকোট পরতেও বারণ করেছিলেন। মন্দিরা আপত্তি করে বলেছেন, ‘সিনেমা মানে রিয়্যালিটি নয়, মেক-বিলিফ রিয়্যালিটি। আমি ছোটঝুলের পেটিকোট পরব। কেউ বুঝতে পারবে না।’ মনোতোষ মেনে নিয়েছেন।
সত্যিই তো। চলচ্চিত্র মানেই রিয়্যালিটি নয়। এখানে মন্দিরার মাথায় কদমছাঁট। সেটা আসলে কাঁচাপাকা চুলের উইগ। মেকআপহীন চেহারা আসলে নো মেকআপ লুক। বুকে ও হাতে ফাউন্ডেশান লাগাতে হচ্ছে। মনোতোষের নির্দেশে তিনি গত একমাস নখ কাটেননি। কেন না নাপতেনিকে দিয়ে হাত ও পায়ের নখ কাটার দৃশ্য আছে। মনোতোষ নির্দেশে আই-ব্রাও থ্রেডিং করাও বন্ধ। তবে আন্ডারআর্ম ওয়্যাক্সিং না করার আদেশ প্রত্যাখ্যান করেছেন মন্দিরা। বলেছেন, ‘সারাক্ষণ গায়ে আঁচল দিয়ে থাকব। আন্ডারআর্ম ফ্রেমে আসবে না।’
বিশালকে নিয়ে ইউনিটে সমস্যা হচ্ছে। পুরোনো জমানার স্টার। পর্বতপ্রমাণ ইগো। যখন হিরো ছিলেন, তখন বুদ্ধিমানের মতো মাড আইল্যান্ডে একটা বাংলো কিনে রেখেছিলেন। এখন সেই বাংলোর জন্য আকাশছোঁয়া দর পাচ্ছেন। কিন্তু বেচবেন না। ক্ষীণ আশা আছে, ‘আই উইল বি ব্যাক উইদ আ ব্যাং।’ বিধবাপুকুর সিনেমাটিকে বিশাল বলিউডে ফিরে আসার লঞ্চিং প্যাড হিসেবে দেখছেন। মনোতোষ ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড পাওয়া ডিরেক্টার, বিধবাপুকুরের স্ক্রিপ্ট খুব স্ট্রং, মন্দিরার মতো বিশালের রোলটাও অথর ব্যাকড। অজস্র শেড্স আছে। অভিনয়ের স্কোপ প্রচুর। বিশাল রোলটাকে সিরিয়াসলি নিয়েছেন। মনোতোষের আদেশ মেনে মদ খাওয়া কমিয়েছেন। নিয়মিত জিম করছেন, পনেরো কেজি ফ্যাট ঝরিয়েছেন, চুল বড় রেখেছেন। মেকআপের পরে বিশালকে জমিদার ভাবতে অসুবিধে হয় না। বাংলার শিক্ষক রেখে বাংলাটা ইমপ্রুভ করেছেন। স্ক্রিপ্টে রোমান হরফে লিখে দিলে গড়গড় করে বলে দেন, ঠিকঠাক ইমোশান সহ। মনোতোষের সঙ্গে চুক্তি আছে, ডাবিং তিনি নিজে করবেন। অন্য লোকে ডাবিং করে দিলে ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড পাওয়া যায় না— এই তথ্য বিশাল জানেন।
এসবই ভালো কথা। সমস্যা হল, বিধবাপুকুরে তিনটে বিছানা দৃশ্য আছে। তিনটেই মন্দিরার। তার মধ্যে একটা স্বপ্নে। সেটা মৃত স্বামীর সঙ্গে। কোনও জুনিয়র আর্টিস্ট করবে। বাকি দুটো বিশালের সঙ্গে। একটা দৃশ্যে বিশাল গায়ের জোর ফলাবে। দ্বিতীয় দৃশ্যে মন্দিরা গায়ের জোর ফলাবে। ওয়ার্কশপ করে মন্দিরার সঙ্গে বিশালের ভালোই সম্পর্ক। শট দেওয়ার ফাঁকে ফাঁকে নানান গপ্পোগাছাও হয়। কিন্তু বিশালের সঙ্গে মন্দিরা স্বচ্ছন্দ নন। এর জন্য বিশালের অ্যালকোহলিক, উওম্যানাইজার ইমেজ দায়ী; না মন্দিরার স্পটলাইট ছেড়ে দীর্ঘকাল নির্বাসনে থাকা দায়ী, না বিশালের লেচারাস চাহনি দায়ী, না সিনেমায় ‘নামার’ কথা শুনে স্যামির তীব্র আপত্তি দায়ী— বুঝতে পারেন না মন্দিরা।
অথবা বুঝেও না বোঝার ভান করেন।
শেষ দুপুরে কল টাইম। ডিওপি বা ডিরেক্টর অব ফোটোগ্রাফি হিসেবনিকেশ করে দেখেছে, এই সময়ই পুকুরপাড়ে ন্যাচারাল লাইট সব থেকে বেশি থাকে। গতকালও এই সময়ে শুট ছিল। তাতে মন্দিরার ভূমিকা ছিল ব্যাক টু দ্য ক্যামেরা। আজ অনেকগুলো ক্লোজ আপ আর মিড শট আছে।
মন্দিরা যখন শুটিং স্পটে পৌঁছলেন, তখন শট রেডি হচ্ছে। মনোতোষ হাসতে হাসতে বললেন, ‘আজ তোমার কোনও ডায়ালগ নেই।’
মন্দিরা কিছু বললেন না। বিধবাপুকুর উপন্যাসে সেক্সুয়াল আন্ডারকারেন্ট ছিল। সিনেমায় সেই আন্ডারকারেন্টকে জোরালো করা হয়েছে। মনোতোষের চিত্রনাট্যে বেদানাদাসী একজন মাঝবয়সি, সেক্স স্টার্ভড মহিলা। পুকুরপাড়ের এই দৃশ্যটিতে বিশাল তাকে কুপ্রস্তাব দিচ্ছেন। আর তিনি ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ কায়দায় না-না বলতে বলতে রাজি হচ্ছেন। এই দৃশ্যে চোখে জল আনতে হবে। ঘাড় নেড়ে ‘না’ বলা, চোখে জল আনা, ভিতরে ভিতরে উল্লসিত হওয়া— তিনটি কাজ একসঙ্গে করতে হবে।
শুটিং দেখতে ভিড় হয়নি। যারা আছে, তারা পুকুরের ওপারে। আজ বিশালের ভূমিকা ব্যাক টু দ্য ক্যামেরা। আজকের প্রথম শটের জন্য মন্দিরা রেডি হলেন। ঘাটের রানায় বসে আছেন তিনি। সামনে বসেছেন বিশাল। বিশালের পিছনে ক্যামেরা। ক্যামেরার পিছনে ডিওপি। তাঁর পাশে মনোতোষ। লাইটস-ক্যামেরা-অ্যাকশানের রুটিন পেরিয়ে ইউনিটের স্পটবয় স্ল্যাপস্টিক মেরে বলল, ‘হিস্ট্রি অব বর্গভীমা। সিন টু। শট ওয়ান।’
মনোতোষ বললেন, ‘তোমার মুখে হাসি নেই কেন বেদানা?’
এটা বলার কথা বিশালের। কিউ হিসেবে মনোতোষ বলে দিলেন। বিশাল মন্দিরার দিকে তাকিয়ে রয়েছেন। ক্যামেরা তাঁর মুখ দেখতে পাচ্ছে না। বিশাল মন্দিরার দিকে তাকিয়ে ভেংচি কাটলেন।
এটা খুব পুরনো ট্রিক। সহ অভিনেতাকে খাটো করার জন্য অতীতে এইসব চলত। সহ অভিনেতা ঘাবড়ে গিয়ে শট এনজি করতেন। ফলে ‘র’ স্টক নষ্ট হত। আজকের ডিজিটাল রেকর্ডিং এর জমানায় ‘র’ স্টক নষ্ট হওয়ার কনসেপ্ট উঠে গেছে। তবে কোনও শট ‘এনজি’ বা ‘নট গুড’ হলে পুরো ইউনিটের খাটনি বাড়ে। অভিনেতার পারফরম্যান্সও খারাপ হতে থাকে।
নিজেকে সামলে নিলেন মন্দিরা। চোখের তারায় ঈষৎ রহস্য ফুটিয়ে চাপা হাসলেন।
‘কাট ইট।’ মনোতোষ হাঁক পাড়লেন, ‘কী ব্যাপার মন্দিরা। ডিলেড রিঅ্যাকশান হল কেন? এনি প্রবলেম?’
বিশালের মুখ এখন একদম স্বাভাবিক। সে ঘাড় ঘুরিয়ে বল, ‘অনেক দিন পর তো। একটু টাইট আচে। বার কয়েক করলেই স্মুদ হয়ে যাবে।’
এই সব ডাব্ল মিনিংওয়ালা কথা শুনে মন্দিরা যদি রেগে যান তা হলে পরের শটগুলোও ঝুলবে। বিশালের কথায় পাত্তা না দিয়ে তিনি বললেন, ‘এনজি হল?’
‘ইট ওয়জ এক্সেলেন্ট। তবে আমি আর একটা নেব।’
‘আর একটা নেব’-র মানে ‘এনজি’ হতে পারে। আবার নাও পারে। একাধিক ইমোশনের শট নিয়ে এডিটিং টেবিলে বেস্ট পারফরম্যান্সটা রাখা হবে। মন্দিরা চোখ বন্ধ করে ডিপ ব্রিদ করলেন। মনোতোষ বললেন, ‘লাইটস… ক্যামেরা রোলিং… অ্যাকশান।’
স্পটবয় বলল, ‘হিস্ট্রি অব বর্গভীমা। সিন টু। টেক টু।’
মনোতোষ বললেন, ‘তোমার মুখে হাসি নেই কেন বেদানা?’
বিশাল মন্দিরাকে চোখে মারলেন।
মন্দিরার সামনে এখন বিশাল নেই। তাঁর সামনে এখন জমিদার। তাঁর কথার প্রতিবাদ করা যায় না। আঁখি পল্লবে বিষন্নতা আর ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে মৃদু ঘাড় নাড়লেন মন্দিরা। ক্লোজ আপে এইটুকুই যথেষ্ট।
‘কাট ইট। ফ্যাবুলাস মন্দিরা।’ হাততালি দিচ্ছেন মনোতোষ। ‘ফ্যাবুলাস’ শব্দটা শুনে হাসি ফোটে মন্দিরার মুখে। সুপারলেটিভ পারফরম্যান্স ছাড়া এই বিশেষণ ব্যবহার করেন না মনোতোষ। পরবর্তী শটগুলো টপাটপ হয়ে গেল। বিশালও আর বেগড়বাঁই করল না।
বেশ কয়েকটা নাইট শট নিয়ে প্যাকআপ হল রাত সাড়ে নটার সময়। অন্ধকার গলি দিয়ে হোটেলে ফিরতে ফিরতে আকাশের দিকে তাকালেন মন্দিরা। অজস্র তারা চিকমিক করছে। দেখলে মন ভালো হয়ে যায়। হোটেলের রুমে ফিরে মেকআপ তুলে, স্নান করে বাড়িতে ফোন করতে হবে। বৃন্দার সঙ্গে কথা হলেও স্যামির সঙ্গে সারাদিন কথা হয়নি।
দশটা নাগাদ স্যামির মোবাইলে ফোন করলেন মন্দিরা। এতক্ষণে নিশ্চয় চেম্বারে আসর বসেছে। মনোতোষ না থাকলেও বিপিন আর সুদিন আছেন।
‘বলো।’ নেশাহীন কণ্ঠে বলেন স্যামি। ঈষৎ অবাক হয়ে মন্দিরা বলেন, ‘তুমি কোথায়?’
‘চেম্বারে নয়। মদও খাইনি।’
‘আমি তো জিজ্ঞাসা করিনি।’
‘তুমি তাইই জিজ্ঞাসা করেছ। এনিওয়ে, আমি এখন আমাদের বেডরুমে। ল্যাপটপ খুলে শান্তিধামের আয়ব্যয়ের হিসেব নিকেশ করছি।’
‘কেন? কী হল?’
‘হাউজ বিল্ডিং লোনের ইএমআই বড্ড হাই। সেকেন্ড গাড়ির লোনটাও আছে। খরচাপাতি নিয়ে একটু টেনশানে আছি।’
‘তুমি তো বরাবর ব্যয় সংকোচন না করে আয় বাড়াবার পক্ষপাতি।’
‘তা ঠিক। তবে শান্তিধামের পেশেন্ট কমছে। ওটি করতে গেলে আমার ট্রেমর হচ্ছে। গত মাসে গল ব্লাডার অপারেশন করতে গিয়ে মাঝবয়সি একজন মহিলা মারা গেলেন, তার স্বামী আমার এগেইন্স্টে ক্রিমিনাল নেগলিজেন্সের কেস ঠুকেছেন…’
‘তোমার তো ইনডেমনটি ইনসিইয়োরেন্স করা আছে। অত টাকা প্রিমিয়াম দাও…’
‘তা আছে। ভালো উকিলবাবুও আছেন। কোর্টে আমাকে যেতেও হয় না। কেসে হেরে গিয়ে যদি লাখ বিশেক টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হয়, সেটা ইনসিয়োরেন্স কোম্পানিই দেবে। কিন্তু টেনশান তো যাওয়ার নয়।’
‘কী বলি বলো। তোমার কাছে থাকলে হয়তো কথা বলে খানিকটা শান্ত করতে পারতাম। সব প্রফেশানেই হ্যাজার্ড আছে। এটা সেই হিসেবে নাও।’
‘অভিনেত্রীদের কোনও হ্যাজার্ড নেই। ফিলিম লাইনে কোনও হ্যাজার্ড নেই। শট এনজি হলে রিটেক আছে। আমার স্ক্যালপেল ভুল চললে কোনও সেকেন্ড চান্স নেই। বুঝলে হিরোইন?’
মন্দিরা কথা না বলে চুপ করে রইল। তার একটা অ্যানক্যানি ফিলিং হচ্ছে। বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে হুল্লোড়ে মত্ত, মদ্যপ স্যামিকে সে চেনে। শ্লেষাত্মক কথা দিয়ে আক্রমণ করা এই স্যামি অচেনা। মাত্র দু’দিনেই এই পরিবর্তন?
.
মন্দিরা যা দেখতে পাচ্ছেন না, সেটা বৃন্দা দেখতে পাচ্ছে। নিজের ঘর থেকে বৃন্দা দেখছে, শান্তিধামের ব্যালকনিতে বসে স্যামি একা এক বোতল হুইস্কি শেষ করেছেন। জল বা সোডা না মিশিয়ে, গ্লাসে না ঢেলে, বোতল গলায় উপুড় করছেন। কথা বলতে বলতে স্যামির হাত থরথর করে কাঁপছে।
বৃন্দা অবাক হয়ে ভাবল, একা একা মদ খাওয়া স্যামি কবে থেকে ধরলেন? মদ খাওয়া নিয়ে মিথ্যে কথা বলাই বা কবে থেকে শুরু করলেন?
.
