২৭. চন্দন
টিভিতে মুখ্যমন্ত্রী মৃন্ময় চ্যাটার্জির সাক্ষাৎকার দেখাচ্ছে। স্কুপ চ্যানেলের প্রতিনিধি পরিমল বলল, ‘নতুন সরকারের কাছে সাধারণ মানুষের অনেক প্রত্যাশা। ত্রিশ বছরের অচলায়তন ভেঙে বাংলাকে আপনি নতুন পথের দিশা দেখাচ্ছেন। বাংলার উন্নয়ন নিয়ে আপনার কোনও নির্দিষ্ট পরিকল্পনা আছে? নাকি মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসার পরে এই নিয়ে এখনও ভাবার সময় পাননি? ধীরেসুস্থে, আমলাদের সঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত নেবেন?’
‘আমার পরিকল্পনা ত্রিশ বছরের পুরোনো। আমলা কিংবা গামলাদের সঙ্গে বসে আমাকে প্ল্যান করতে হয় না। আমি ওয়ান-ম্যান ইন্ডাস্ট্রি। তিরিশ বছর ধরে দিনের বেলা ওদের হাতে মার খেয়েছি। আর রাতের বেলা বাংলাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেছি। অ্যাই হ্যাভ আ ড্রিম। মিড সামার নাইটস ড্রিম।’
মৃন্ময়ের বক্তৃতা শুনে রাগের চোটে টিভি বন্ধ করে দিলেন পবন। এ কী ভাষা বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর মুখে? মানুষ কেন মৃন্ময়কে ভোট দিল? তারা কী পেয়েছে ওঁর মধ্যে?
উত্তর পেতে অসুবিধে হয় না। রাজ্যের মানুষ জনমোর্চাকে কুলোর বাতাস দিয়ে তাড়িয়েছে।
মানুষের মনে এত ক্ষোভ জমেছিল? এত রাগ? এত ঘৃণা? হতাশ হয়ে পড়েন পবন। বিপ্লবের স্বপ্ন কবেই চুকেবুকে গেছে। শোষণমুক্ত সমাজ, জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের কথা আজকাল পার্টি ক্লাসেও বলা হয় না। রাশিয়া ভেঙে গেছে, পূর্ব ইয়োরোপ চুরমার, ভারতবর্ষের কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে টিমটিম করে জ্বলছিল জনমোর্চা পার্টিচালিত সরকার। তার একটা চলে গেল।
টিভি ছেড়ে কম্পিউটার নিয়ে বসলেন পবন। আজকের মধ্যে বেলাকূলের কাজ শেষ করতে হবে। চারপাতা কাগজ একা লেখা মুশকিলের কাজ। নতুনগ্রামের যে ছেলেটা ডিটিপি করে, তাকে আজকের মধ্যে পুরোটা মেল করতে হবে। ছেলেটা পাতা সাজিয়ে পত্রিকা ছাপবে।
একদিনের নোটিশে আবাসবাড়ি ছেড়ে শক্তিধরের ফ্ল্যাটে এসে পবনের টাকার সাশ্রয় হয়েছে বটে, কিন্তু বেলাকূলের একটা ইস্যু ছাপা যায়নি। হাওড়া টেলিফোন এক্সচেঞ্জে দৌড়াদৌড়ি করে ইন্টারনেট কানেকশান নিতে এক সপ্তাহ সময় লেগেছে। ভাগ্যিস শক্তিধরের ল্যান্ডলাইন ছিল, তাই শুধু প্ল্যান চেঞ্জ করতে হয়েছে।
শক্তিধরের কথা মনে পড়ায় মাথা গরম হয়ে যায় পবনের। এদিকে বন্ধুকৃত্য করছে, অন্যদিকে বাঁশ দিচ্ছে। ইস্কুলের ন্যাংটা বয়সের বন্ধু সাহায্য করার বদলে নবযুগ পার্টির গুন্ডাদের লেলিয়ে দিয়েছিল। টাইপ করতে করতে ঘাড় নাড়লেন পবন। তিরিশ বছর আগে, সন্দীপ সামন্তর সরকার ক্ষমতায় আসার পরে, শক্তিধরের অনেক জমি বর্গা হয়েছিল। সেই সব পরিকল্পনায় পবনের অল্পবিস্তর হাত ছিল বই কী!
কিন্তু সে ছিল জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের দিকে একধাপ এগিয়ে যাওয়া। আর এ হল দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক দলের দাদাগিরি। দুটো এক নয়। কিছুতেই এক নয়।
একটানা ঘণ্টাখানেক টাইপ করে টেবিল ছেড়ে ওঠেন পবন। তিনি ছোটবেলায় টাইপ করতে শিখেছিলেন। কম্পিউটার আসার পরে টাইপিং-এর স্পিড কাজে লেগেছে।
মনিটরের দিকে তাকিয়ে কিবোর্ডে ঝড়ের গতিতে আঙুল চালানোর ব্যাপারে পবন পারদর্শী। হাওড়া কোর্টে তাঁকে এই কাজই করতে হয়। স্পিড ভালো হওয়ার কারণে এক ঘণ্টায় বেলাকূলের অনেকটা টাইপ করা হয়ে গেল। আবার একটু টিভি দেখা যাক।
স্কুপ চ্যানেল ব্রেকিং নিউজ। ছত্তিশগড়ের মাওবাদি নেতার এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকার। বিক্রম নামের সেই দলনেতা গামছা দিয়ে মুখ ঢেকে সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন। চাঁচাছোলা বক্তব্য। রাষ্ট্র যদি গরিব মানুষকে খেতে দিতে না পারে, পরিশ্রুত পানীয় জল দিতে না পারে, বাচ্চা ছেলেমেয়েদের ইস্কুলে যাবার ব্যবস্থা না করতে পারে, তাহলে তার থুতু ফেলে ডুবে মরা উচিত। একের পর এক মানুষ না খেতে পেয়ে মরে যাবে, আর সরকার প্রাইমারি হেল্থ সেন্টার না বানিয়ে বড়লোকদের জন্য হেল্থ রিসর্ট আর স্পা বানাবে—এটা মেনে নেওয়া যায় না। এখানেই শেষ নয়, বড়লোকদের বেলেল্লাপনার ঠেক বানানোর জন্যে গরিব মানুষগুলোর জমি-বাড়ি-ঘরদোর কেড়ে নিচ্ছে। তাদের উৎখাত করছে। এরপর যদি তারা পাল্টা মার দেয়, তা হলে অন্যায় কোথায়? বিক্রম সোজাসাপটা বললেন, ‘আপ মেরে ঘর মে আকে মেরা বহেন কি রেপ করেগা, মেরা জমিন জায়দাত লুট লেগা, মেরা ঘর কো বুলডোজার সে মিট্টি যে মিলা দেগা—অওর হমলোগ আপকো রস্গুল্লা খিলায়েঙ্গে? হমারা এক মরেগা তো আপকো দশ মরেগা। হমলোগোকে তরফ সে ইয়ে পাক্কা ওয়াদা। মরতে দম তক।’
পবন এক দৃষ্টে টিভির দিকে তাকিয়ে রয়েছেন। ছত্তিশগড়ের নেতার মুখে ‘রসগুল্লা’ শব্দটি তাঁর কানে লাগছে। কানে লাগছে বাঙালির টিপিকাল হিন্দি উচ্চারণ! ‘মেরা বহেন কি রেপ করেগা,’ বা ‘মেরা জমিন জায়দাত লুট লেগা’—এই অভিমানও বড় চেনা লাগল। গোপাল নস্করের কথা মনে পড়ে গেল।
গোপাল হঠাৎ বাতাসে মিলিয়ে গেলেন। লোকটার সঙ্গে পবনের দিনরাত ঝগড়া হত। বেলাকূলের এডিটোরিয়াল পলিসি নিয়ে, লেখার দৃষ্টিকোণ নিয়ে, সমসাময়িক রাজনীতি নিয়ে। মতান্তর হলেও মনান্তর হয়নি। বাঁজাপলাশ গ্রামে হেল্থ হাব হওয়া প্রসঙ্গে দু’জনে যখন একদম আলাদা বিন্দুতে অবস্থান করতেন— তখনও হয়নি।
একদিকে পবন জোয়াকিমদের বোঝাচ্ছেন, কেন তাঁদের সরকারি পুর্নবাসনের প্যাকেজ গ্রহণ করা উচিত। অন্যদিকে গোপাল তাঁদের বোঝাচ্ছেন কেন এই রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্রের মোকাবিলা করার জন্যে অস্ত্র হাতে নেওয়া উচিত।
পবন আগাগোড়াই জানতেন, গোপালের বাড়িটা আইপিপির হাইড আউট। অন্য ভাষাভাষী ছেলেমেয়েরা ওখানে থাকত। তারা বাড়ি থেকে বেরোত না। জোয়াকিমরা পবনকে বলেছিলেন, ওই ছেলেমেয়েরা নাকি ওখানে বন্দুক চালানো প্র্যাকটিস করে। পবন গুরুত্ব দেননি। জনমোর্চার প্রধান শত্রু নবযুগ। আইপিপি কী করছে, এই নিয়ে মাথা না ঘামালেও চলবে।
টিভির পর্দার দিকে তাকিয়ে পবনের মনে হল, গামছা দিয়ে মুখ ঢাকা বিক্রম আসলে কে? গলার আওয়াজ চেনা লাগছে কি? নিশ্চিত হতে পারলেন না পবন। শক্তিধর নবযুগ পার্টির হয়ে গোপালের নামে এফআইআর করেছেন। পবন করেছেন মিসিং পারসন্স ডায়রি। ভারতবর্ষের সব থানায় চলে গেছে গোপালের ছবি। কিন্তু থানা, পুলিশ, টেলিভিশন, পোস্টার— এ সব থাকে ‘ইনক্রেডিব্ল ইন্ডিয়া’র বিজ্ঞাপনে। ভারতবর্ষের বিস্তীর্ণ অঞ্চল তার বাইরে। যেখানে বিপিএল কার্ড নেই, মিড ডে মিল নেই, জননী সুরক্ষা যোজনা নেই, একশো দিনের কাজ নেই, খাপ বা খাপছাড়া— কোনও পঞ্চায়েতই নেই। শুধু অভাব আছে। দারিদ্র্য আছে। অনাহার আছে। মৃত্যু আছে। আছে পাহাড়, পর্বত, গুহা, কন্দর, অরণ্য, ঝরনা, উপত্যকা। আছে হাইড আউট। আছে রেড করিডর। আছে ভূমিপুত্র। আছে রাষ্ট্রবিরোধী তকমা পাওয়া গরিবগুর্বো মানুষ। গোপাল যদি সেখানে মিশে গিয়ে থাকেন, তা হলে কোনও দিনও খোঁজ পাওয়া যাবে না।
গোপাল রাষ্ট্রবিরোধিতার তক্মা গলায় ঝুলিয়ে হারিয়ে গেলেন। তাপসীকে ধর্ষণ করে খুন করা হল। বাড়িটায় ধুলোবালি জমছে। কার্নিশে গাছপালা গজাচ্ছে। শুকনো পাতা, পোকামাকড়, সাপ-বিছে দখল নিচ্ছে। সামুদ্রিক লোনা বাতাসে, রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ধ্বংসস্তুপে পরিণত হচ্ছে। কেউ মনে রাখছে না যে ওখানে গোপাল আর তাপসী নস্কর নামে দুই ভাইবোন থাকতেন।
সম্প্রতি পরিস্থিতি বদলেছে। যে সব জোয়াকিম পুলিশের গুলিতে মারা গিয়েছিলেন তাঁদের পরিবারের লোকজন এখন ওই বাড়িতে থাকছে। থাকছে পবনের বড় ছেলে নন্দন আর তার বউ মানদা। বাড়ি এখন সাফসুতরো। নিয়মিত দেখভালের ফলে ঝকঝকে।
টিভির চ্যানেল বদলান পবন। হাঁটুতে ঘুষি মারেন। কী ভুল যে করেছেন তিনি! তিরিশ বছরের ক্ষমতার দম্ভে বড় ছেলেকে বাঁটকুল ভেবে! নন্দনের বিচারবুদ্ধি তাঁর থেকে অনেক বেশি পোক্ত। বছরের শুরুতেই নন্দন বলেছিল, ‘বাবা, গোপালকাকার বাড়িতে নিয়মিত ফায়ার আর্মস প্র্যাকটিস হয়। ওরা কিছু একটা করার প্ল্যান কষছে। তোমার দলকে দেখতে বলো।’
নন্দনের কথায় পবন পাত্তা দেননি। ছেলে সার্কাসে ক্লাউনগিরি করে, নিজের খরচ নিজে সামলায়, বাড়িতে অর্থ সাহায্য করে—সব ঠিক আছে। কিন্তু ওর সামাজিক চিন্তা নিয়ে পবন মাথা ঘামাননি।
সেই নন্দন বিয়ে করে ঘরে বউ এনেছে। বাবা-মাকে জিজ্ঞাসা করার প্রয়োজন বোধ করেনি। মানদাকে এক ঝলক দেখে পবনের পছন্দ হয়নি। পরে জেনেছেন, মেয়েটি চন্দনের ক্লাসমেট অভির বাড়ির ঝি ছিল। সেটা শুনে রাগে থরথর করে কেঁপেছেন পবন। কিন্তু কিছু বলতে পারেননি। শ্রেণিহীন সমাজের স্বপ্ন দেখা পবনের এতে রাগ কেন হচ্ছে? ওরা দু’জনে মিলে যদি সুখে থাকে, তাহলে আপত্তি কিসের? কিন্তু না। মেনে নেওয়া যাচ্ছে না। নিজের দুঃখ নিজের কাছে জমিয়ে রেখেছেন পবন।
পারুলের সঙ্গে মানদার বনিবনা খুব ভালো। বিয়ে করে আসার দু’দিনের মাথায় সামাজিক অনুষ্ঠান করে গ্রামের লোকেদের খাইয়েছেন পারুল। অনুষ্ঠানের পরদিন নববিবাহিতাকে নিয়ে নন্দন আবাসবাড়ি ছেড়ে চলে গেছে গোপাল নস্করের বাড়ি। মালিকবিহীন বাড়ি দখল করে কমিউন বানিয়েছে বামনের দল।
টিভিতে বিজ্ঞাপনের বিরতি। টিভি বন্ধ করেন পবন। কম্পিউটারের সামনে বসে বেলাকূলের জন্য লেখালেখি শুরু করেন। গোপালের অনুপস্থিতিতে কতদিন তিনি একলা এই কাগজ বার করতে পারবেন? কে জানে! আগে সার্কুলেশান বেশি ছিল। অল্পবিস্তর বিজ্ঞাপনও আসত। সম্প্রতি সার্কুলেশান কমছে। নতুন সরকার আসার পরে পঞ্চায়েত বা অন্যান্য সরকারি দপ্তরের বিজ্ঞাপন একদম বন্ধ হয়ে গেছে। বিজ্ঞাপনের অভাবে লেখার জন্য বেশি স্পেস থাকছে। এত লেখা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়।
পত্রিকা বন্ধ করে দেওয়ার আগে শেষ চেষ্টা করছেন পবন। গোপালের সময়কার এডিটোরিয়াল পলিসি বদলে ফেলেছেন। রাজনীতি বিষয়ক লেখা কমিয়ে স্থানীয় ঘটনাবলীর ওপরে জোর দিচ্ছেন। যদিও এতদিনকার সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা থেকে পবন জানেন, জেলার মানুষ কলকাতার খবর পড়তেই বেশি আগ্রহী। স্থানীয় সংবাদে তাদের উৎসাহ কম।
আর একটা চেষ্টা পবন করছেন। কমবয়সি ছেলেমেয়েদের মধ্যে বেলাকূলের বিক্রি বাড়াতে চাইছেন। টিনএজার ছেলেমেয়েদের হাতে এখন যথেষ্ট পকেটমানি। তাদের পছন্দসই করে বেলাকূলকে সাজাতে হবে। এ কাজ তাঁর একার দ্বারা হবে না। চন্দনের আজই থিয়োরি পরীক্ষা শেষ হয়েছে। পবন ছেলেকে বলেছেন আজ রাতটা এখানে কাটাতে। চন্দন রাজি হয়েছে। সে বলেছে, ওর ক্লাসমেট দময়ন্তীকে নিয়ে আসবে। দময়ন্তীকে না চিনলেও দময়ন্তীর মাকে চেনেন পবন। উইকেন্ডের এডিটর। নতুনগ্রাম আর বাঁজাপলাশ গ্রাম যখন রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন নতুনগ্রামে এসেছিলেন। আবাসবাড়িতেও গিয়েছিলেন। তারও আগে, যখন বিধবাপুকুর সিনেমার শুটিং হয়েছিল, তখনও উইকেন্ড বিধবাপুকুর এবং নতুনগ্রাম নিয়ে স্টোরি করেছিলেন।
মা নামকরা সাংবাদিক বলেই মেয়ের নিউজ সেন্স ভালো হবে, এই আশা পবন করছেন না। তবে কলকাতা শহরে এখনকার ছেলেমেয়েরা কী ভাবছে, কেন ভাবছে—এইসব ওর কাছ থেকে জানা যাবে।
ওরা আসবে বলে আইসক্রিম আর চানাচুর আনিয়ে রেখেছেন পবন। অন্য লোকের বাড়িতে ব্যাচেলারের জীবনযাপন করতে হচ্ছে। কোথায় কী বাসনপত্র আছে জানেন না। থার্মোকলের বাটি, গ্লাস আর প্লেট এনে রেখেছেন চারটে করে। ছেলের বন্ধু বলে কথা। আপ্যায়ন ঠিকঠাক হওয়া জরুরি।
আবার কম্পিউটার নিয়ে বসেন পবন। কলেজ পড়ুয়াদের ভাষা নিয়ে একটা লেখা লিখছেন তিনি। ইন্টারনেট ঘেঁটে ROFL, LMAO, LOL, XOXO—এই রকম নানা অ্যাব্রিভিয়েশান জোগাড় করেছেন। তারপর সেগুলো ব্যাখ্যা করছেন। WTF–এর ব্যাখ্যা লিখতে গিয়ে ডিলিট করে দিলেন। সব কিছু ঢোকানো যাবে না। বেলাকূল পারিবারিক কাগজ। আধুনিক ও কলকাত্তাইয়া হতে গিয়ে মফস্সলের রিডার বেস নষ্ট করা যাবে না।
কলিং বেল বাজল। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে অবাক হল পবন। সন্ধে ছ’টা বাজে। চন্দন বলেছিল সাতটার সময় আসবে। এত তাড়াতাড়ি চলে এল? অবশ্য দময়ন্তীকে মৌলালি ফিরতে হবে। তা ছাড়া, একটানা থিয়োরি পরীক্ষা দিয়ে ওরা ক্লান্ত। বাড়ি গিয়ে ঘুমোবে। আজ ওদের ডাকাটাই অন্যায় হয়েছে।
নিজের পোশাকের দিকে তাকালেন পবন। তিনি পরে আছেন ফতুয়া আর লুঙ্গি। এই পোশাক পরে ছেলের বান্ধবীকে ঘরে ডাকা যায় না। তাড়াতাড়ি ইস্তিরি করা পাজামা পাঞ্জাবির দিকে হাত বাড়ালেন তিনি।
আবার ট্যাঁট্যাঁ করে কলিং বেল বাজছে। অধৈর্য ঘণ্টি। যেন বেল বাদক বলতে চাইছে, ‘আমাকে এতক্ষণ বাইরে দাঁড় করানো হচ্ছে কেন?’
যৎপরোনাস্তি বিরক্ত হলেন পবন। আজকালকার ছেলেমেয়েগুলোর কি এক বিন্দু ধৈর্য নেই? ঘরের লোকটাকে নড়াচড়ার সময় দিবি তো রে বাবা! তিনি হাঁক পাড়লেন, ‘ওরে দাঁড়া। আমি আসছি।’
‘দাঁড়া’র সঙ্গে মিলিয়ে একটা গালাগাল শোনা গেল বাইরে থেকে। শক্তিধর চ্যাঁচাচ্ছেন, ‘এতক্ষণ লাগে দরজা খুলতে? ঘরে মেয়েছেলে ঢুকিয়েছিস নাকি?’
পবন হেসে ফেলেন। বাড়ির মালিক এসেছেন। দরজা খুলতে দেরি হলে বিরক্ত হবেনই। লুঙ্গি আর ফতুয়া পরে দরজা খুলে তিনি বললেন, ‘সরেজমিনে তদন্ত করতে এলি, তোর ফ্ল্যাটে কোনও অসামাজিক কাজকর্ম করছি কি না?’
ভিতরে ঢুকলেন শক্তিধর এবং একজন অচেনা লোক। দুজনের মুখ দিয়ে মদের গন্ধ আসছে। পবন অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তিনি এই বাড়ির অতিথি না গৃহকর্তা—বুঝতে পারছেন না। যদি অতিথি হন, তা হলে এক্ষুনি বেরিয়ে যাওয়া উচিত। মাতালদের সংস্পর্শ একদম পছন্দ করেন না পবন। আর যদি তিনি গৃহকর্তা হন, তা হলে এদের এখনই ফ্ল্যাট থেকে বার করে দেওয়া উচিত। ওই একই কারণে।
কোনওটাই না করে পবন বললেন, ‘একটু বাদে আমার ছেলে আর তার ব্যাচমেট এখানে আসবে। তুই এই সময় মদ খেয়ে এলি?’
‘তো?’ সোফায় বসে বলেন শক্তিধর।
‘না। কিছু না। তুই আমাকে থাকতে দিয়েছিস। তার জন্য আমি কৃতজ্ঞ। কিন্তু এভাবে হামলা করবি ভাবিনি।’
‘আগে কখনও করেছি?’ সঙ্গে যে ছেলেটি এসেছে তাকে বসতে বললেন শক্তিধর।
‘তা করিসনি।’
‘এই প্রথম আর এই শেষ। চন্দনের সঙ্গে দেখা করে আমি উঠব। সঙ্গে গাড়ি আছে। সোজা নতুনগ্রামে ব্যাক করব। এই ছেলেটা এখানে রাত কাটাবে। কাল ভোরবেলা হাওড়া থেকে ট্রেন ধরবে। ভালো ছেলে। তোর কোনও অসুবিধে হবে না। ও কমন প্যাসেজে শুয়ে পড়বে। কী রে বাবলু, পারবি না?’
বাবলু বিনয়ের সঙ্গে বলল, ‘জরুর পারেগা।’
বিরক্ত হলেন পবন। একটা মাতালকে রাতের বেলা পুষতে হবে। ঝক্কির কাজ। কিন্তু কী আর করা! বন্ধুর অনুরোধ বলে কথা! পোশাক বদলাতে বদলাতে পবন বললেন, ‘উনি কি রাতের খাওয়া সেরে এসেছেন?’
‘হাঁহাঁ। হম খানা খাকে আয়া। আপ বেফিক্র রহিয়ে।’ হাত নাড়ে বাবলু। শক্তিধর বলেন, ‘রান্নাঘরে অনেকগুলো গ্লাস ছিল…’
‘আছে।’ শক্তিধরকে থামান পবন। ‘কিন্তু আমি তোকে মদ খেতে দেব না। বললাম না, ছেলে আসবে!’
‘মদ খেতে দিবি না?’ শক্তিধর অবাক। ‘খেতে না দেওয়ার তুই কে?’
‘ঠিক আছে। আমি তাহলে এখনই এখান থেকে বেরিয়ে যাচ্ছি।’ বিরক্তির সঙ্গে বললেন পবন।
‘বেরিয়ে কোথায় যাবি?’ সোফায় শরীর এলিয়ে প্রশ্ন করেন শক্তিধর। ‘হাওড়ার পুরোনো ফ্ল্যাটে ব্যাক করতে পারবি না। নতুনগ্রামেও ফিরতে পারবি না। হাওড়া স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে শুয়ে থাকবি?’
পবনের অসহ্য রাগ হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘নতুন গর্ভনমেন্ট আসার পরে তোর রোয়াব বড্ড বেড়েছে। আমাকে বাড়ি থেকে উৎখাত করলি। ভাড়াবাড়ি থেকে উৎখাত করলি। এখন এই আশ্রয় থেকেও তাড়াতে চাইছিস।’
বাবলু ত্যারছা চোখে পবনকে মাপছে। শক্তিধর হাসতে হাসতে বললেন, ‘বাব্বাঃ! তুই আমার ওপরে ব্যাপক রেগে আছিস। মারবি নাকি?’
পবন জবাব দেওয়ার আগে কলিং বেল বাজল। বাবলু লাফিয়ে উঠে বলল, ‘কওন!’
শক্তিধর তার কাঁধ চাপড়ে বললেন, ‘তুমি শান্ত হয়ে বোসো তো বাছা! জেল থেকে পালিয়ে কলকাতা জেলার পার্টি অফিসে লুকিয়েছিলে। পার্টি অফিস তোমাকে সামলাতে না পেরে আমার ঘাড়ে চালান করল। মিনিস্টার না বললে তোমাকে আমি নিজের ঘাড়ে নিতাম না।’
পবন বলল, ‘জেল থেকে পালিয়েছে? ক্রিমিনালকে সঙ্গে নিয়ে ঘুরছিস কেন?’
‘ক্রিমিনাল নয়, বাবলু নবযুগের পার্টি কর্মী। তোরা যাদের ক্যাডার বলতিস। ত্রিশ বছর ধরে তোরা পুলিশকে এমন দলদাস বানিয়ে রেখেছিলি যে সরকার বদলালেও ওরা তোদের হয়েই কাজ করছে। আমাদের তরুণ তুর্কিদের বেছে বেছে জেলে ভরছে। ওকে শেলটার দেওয়ার দায়িত্ব আমার। কাল সকালেই হাওড়া থেকে ট্রেন ধরবে।’
শক্তিধরের কথার মধ্যে আবার বেল বাজল। বাবলু নামের ছেলেটা আবার সোজা হয়ে দাঁড়াল। তার ডান হাত পকেটে। পবন বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘তুই তোর পার্টি কর্মীকে সামলা। চন্দন আর ওর ক্লাসমেট এসেছে। ওদের সামনে কোনও গন্ডগোল পাকাস না।’
পবনের কথা শুনে বাবলু বসার ঘরের কোণে চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ল। পবন দরজা খুলে দেখলেন চন্দন আর চশমা পরা একটা মেয়ে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। মেয়েটা পবনকে দেখে বলল, ‘নমস্কার কাকু!’
‘নমস্কার। ভেতরে এসো। তোমাদের জেনারেশান এখনও কাকু বলে? আমি তো জানতাম আঙ্কল আর আন্টি ছাড়া কিছু বলে না।’
‘আমাদের বাড়িতে ওই সব সম্বোধনের কোনও জায়গা নেই। বাবা-মা ধরে মারবে।’ হাসতে হাসতে ফ্ল্যাট ঢোকে দময়ন্তী। নাক কুঁচকে বলে, ‘আপনি ড্রিংক করছিলেন? ডিসটার্ব করলাম?’
চন্দন হড়বড়িয়ে বলে, ‘বাবা সাধুপুরুষ। পান, তামাক, গুটকা, মদ—কিছু ছোঁয় না। এই গন্ধটা…’
‘চন্দন, এদিকে আয়। সোফা থেকে আহ্বান করেন শক্তিধর। ‘তোর বাবা সাধুপুরুষ হলেও বাবার বন্ধুরা সাধুপুরুষ নয়। একটু চলবে নাকি?’
শক্তিধরকে প্রণাম করে চন্দন বলে, ‘না কাকু। আমার চলে না।’
‘বাবার সামনে ভালো মানুষ সাজছিস?’ হ্যাহ্যা করে হাসছেন শক্তিধর। দময়ন্তী পবনকে বলল, ‘কাকু আমাকে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে হবে। আপনার কী জানার আছে বলুন।’
দময়ন্তীর গলার আওয়াজ কয়েক পর্দা উঁচুতে। তার বডি ল্যাঙ্গোয়েজ বলে দিচ্ছে শক্তিধরের মাতলামো সে পছন্দ করছে না।
‘হ্যাঁ হ্যাঁ… তুমি এ ঘরে এসে বোসো।’ দময়ন্তীর হাত ধরে শোওয়ার ঘরে টেনে আনেন পবন। দরজা ভেজিয়ে বলেন, ‘ওরা ও ঘরে বসুক। আমরা এই ঘরে আলোচনা করি। তোমাদের জন্য আইসক্রিম এনেছি। খাবে তো?’
‘হ্যাঁ। খাব।’ আহ্লাদি গলায় বলে দময়ন্তী। পবন ঘর থেকে বেরিয়ে রান্নাঘরের ফ্রিজ খুলে একবাটি আইসক্রিম নিয়ে শোবার ঘরে ফেরত আসেন। পবনের হাত থেকে বাটি নিয়ে আইসক্রিম খেতে খেতে দময়ন্তী বলল, ‘এখানে আসার সময় ট্যাক্সিতে চন্দন আমাকে সব বলেছে।’
‘সব মানে?’
‘সব মানে, আপনি নিজের বাড়ি ছেড়ে কেন এইখানে আছেন।’ এক চামচ আইসক্রিম মুখে দিয়ে বলে দময়ন্তী, ‘ওই ভদ্রলোকই শক্তিধর মাইতি? মানে, নবযুগ পার্টির নেতা এবং এই ফ্ল্যাটের মালিক?’
‘হ্যাঁ। ও আমার বন্ধু।’ শক্তিধরকে নিয়ে আলোচনা থামিয়ে পবন বললেন, ‘তোমাকে বেলাকূলের কয়েকটা কপি দিই। দেখলে আন্দাজ করতে পারবে, গ্রামগঞ্জের খবরের কাগজ কী রকম হয়ে থাকে।’
‘বেলাকূল আমার দেখা।’ আর এক চামচ আইসক্রিম মুখে নিয়ে বলে দময়ন্তী।
‘কোত্থেকে দেখলে?’ প্রশ্ন করেন পবন।
গোপনে জিভ কাটে দময়ন্তী। ‘গোপাল নস্করের বাড়িতে দেখেছি’—এই উত্তর দেওয়া যাবে না। সে যে নতুনগ্রামে থেকেছে, আর্মস প্র্যাকটিস করেছে—এ সব এখন পাস্ট টেন্স। কায়দা করে দময়ন্তী বলে, ‘একজ্যাক্টলি মনে নেই। আমার মা নতুনগ্রামে গিয়েছিলেন। সেই সূত্রে বাড়িতে দেখতে পারি। অথবা চন্দন কলেজে নিয়ে এসেছিল। আপনাদের কাগজের আইডিয়াটা ভালো।’
‘ভালো বলতে?’
‘এই জাতীয় লোকাল নিউজ পেপারের কোনও ক্যারেক্টার থাকে না। চার পাতা জুড়ে লেখা, ছবি আর বিজ্ঞাপনের জবরজং কোলাজ। খারাপ পাতা, খারাপ ছাপা, খারাপ গদ্য— সব মিলিয়ে আনরিডেব্ল। বেলাকূল সেরকম নয়। কাগজটায় অনেকগুলো সেকশান আছে। জেলা, রাজ্য, দেশ, আন্তর্জাতিক খবরের জন্য আলাদা বিভাগ। পার্শ্বরচনা, জেলার তারা, নিজে করো, অ্যাস্ট্রোলজি… যদিও অ্যাস্ট্রোলজি বিষয়টা আমার পছন্দ নয়।’
‘আমারও নয়। কিন্তু বেলাকূল কিনে লোকে সবার আগে ওটাই পড়ে।’
পবন আর দময়ন্তীর আলোচনা জমে উঠেছে। চন্দন এসে বলল, ‘বাবা, তোমার রাতের খাবার…’
চন্দনকে থামিয়ে পবন বললেন, ‘আমার খাবার নিয়ে তোকে ভাবতে হবে না। আমি ম্যানেজ করে নেব। তোর সুবিধে হল। শক্তিধরের সঙ্গে গাড়িতে বাড়ি চলে যেতে পারবি।’
‘হ্যাঁ। কাকু তাই বলছিলেন। যাই হোক। আমি তোমার একার জন্য খিচুড়ি বানিয়ে ফেলেছি। খেয়ে নিও।’
‘আমার একার জন্য? বাবলুর জন্য বানালি না?’
‘বাবলু?’ সরু চোখে পবনের দিকে তাকায় চন্দন। ‘একটা লোক ড্রয়িং রুমে চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে। ও কে?’
‘শক্তির পার্টির লোক। শক্তি বলছিল যে ও নাকি জেল থেকে পালিয়েছে। কাল সকালে হাওড়া থেকে ট্রেন ধরবে।’
‘বাবলু? জেল থেকে পালিয়েছে?’ স্বগতোক্তি করতে করতে শোওয়ার ঘর থেকে বেরোয় চন্দন। শোওয়ার ঘরের দরজা টেনে দেয়। ফ্রিজ থেকে আইসক্রিমের টাব বার করে, দুটো কাচের বাটিতে আইসক্রিম নিয়ে বসার ঘরে আসে। শক্তিধর টিভি দেখছেন। তাঁর সামনে একটা বাটি রাখে। অন্য বাটিটা নিয়ে চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকা ছেলেটার পাশে বসে বলে, ‘আপনি ঘুমিয়ে পড়েছেন? আইসক্রিম খান।’
‘থ্যাংক ইউ বস।’ চাদরমুড়ি দেওয়া ছেলেটা উঠে বসে চন্দনের হাত থেকে বাটি নেয়। চন্দন ছেলেটার দিকে তাকায়…
বাবলু চৌধুরী! চন্দনের মাথার মধ্যে ঝিকিয়ে ওঠে এক রাশ স্মৃতি। সেকেন্ড ইয়ার। কলেজ ইলেকশান। নমিনেশান পেপার জমা দেওয়ার দিন। ফরেনসিক ডিপার্টমেন্ট। ডক্টর রেবতীভূষণ পট্টনায়েক। সুরজ আর সে! চিকনা আর অধীরদা! হ্যাপি তিওয়ারি আর মুঙ্গেরি ওয়ান শটারের ঝলক! তপন চৌধুরীর মৃতদেহ!
চন্দনের মাথার ভেতরে টুকরো ছবি দিয়ে কোলাজ তৈরি হচ্ছে। চন্দনের পায়ের নীচের পৃথিবী দু’ভাগ হয়ে যাচ্ছে। চন্দনের সামনে দুটো রাস্তা তৈরি হচ্ছে। একটা রাস্তা বলছে, এক্ষুনি পুলিশে খবর দাও। এন্টালি থানার এসআই তপন চৌধুরীর হত্যাকারীর ঠিকানা বলে দাও। বলে দাও, কে তাকে শেল্টার দিচ্ছেন। কার নির্দেশে এই ঘটনা ঘটেছে।
দ্বিতীয় রাস্তা বলছে, এই রাস্তায় অনেক বিপদ। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারাই এখন ক্ষমতায়। পুলিশ চাইলেও বাবলুর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারবে না। উল্টে শক্তিধর, নবযুগ পার্টি, মৃন্ময় চ্যাটার্জির সরকার তোমার ওপরে খচে যাবে। আর ক’দিন বাদেই তুমি ডাক্তারি পাশ করবে। ভবিষ্যতে তুমি যখন শান্তিধাম সামলাবে তখন নানান দরকারে শক্তিধরকে লাগবে। একে চটিয়ে কী লাভ? সন্দীপ সামন্ত ইজ পাস্ট। জনমোর্চা ইজ পাস্ট। বরং নেগোশিয়েশানে যাও। ফিউচারে অনেক লাভ আছে। মৃন্ময় চ্যাটার্জি আর নবযুগ হল ফিউচার। আর ফিউচার মানে কেরিয়ার। ফিউচার মানে ফার্স্ট হওয়ার ট্র্যাক রেকর্ড অব্যাহত রাখা।
বাবলুকে দেখতে দেখতে চন্দন উঠে দাঁড়ায়। বেঁটেখাটো, কেলেকুলো চন্দনের শরীর থেকে কনফিডেন্স ঝরে পড়ছে। শোওয়ার ঘরের ভেজানো দরজার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে সে শক্তিধরকে বলে, ‘আমাদের কলেজের মধ্যে এন্টালি থানার এস আই তপন চৌধুরী মার্ডার হয়েছিলেন। খুনের দায়ে যে গ্রেফতার হয়, সে কিছুদিন আগে জেল থেকে পালিয়েছে। পুলিশ ছেলেটাকে খুঁজছে। ছেলেটাকে আমি এক ফুট দূর থেকে দেখেছিলাম। মুখটাও মনে আছে। কী যেন নাম ছেলেটার… বিলু না বাবলু… শর্মা না চৌধুরী…’
শক্তিধরের মাতলামো উধাও। স্থির চোখে তিনি চন্দনের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন। বাবলু তড়াক করে উঠে দাঁড়িয়েছে। ছোট ছোট পদক্ষেপে সদর দরজার দিকে এগোচ্ছে। বুক পকেট থেকে মোবাইল বার করে বাবলুর ভিডিয়ো তুলছে। একই ফ্রেমে শক্তিধরকেও রাখছে। বাবলু পকেটে হাত ঢুকিয়ে বার করে আনছে মুঙ্গেরি ওয়ান শটার। চন্দন ভিডিয়ো তুলতে তুলতে হিসহিস করে বলছে, ‘ওই ভুল আর কোরো না। তা হলে তোমার ফাঁসি আর শক্তিকাকার জেলের ঘানি ঘোরানো কারও বাবা আটকাতে পারবে না।’ বাবলু ওয়ান শটার আবার পকেটে ঢোকাচ্ছে। শক্তিধর ভুরু কুঁচকে ফিসফিস করে বলছেন, ‘তুই কিছু জানিস না। তুই কিছু দেখিসনি…’
চন্দন মোবাইলে ভিডিয়ো তোলা বন্ধ করে বলছে, ‘আমি কিছু জানি না। আমি কিছু দেখিনি।’ শক্তিধর বলছেন, ‘তা হলে?’ চন্দন বলছে, ‘বাবা আর এখানে থাকবে না। আমি আর বাবা তোমার গাড়িতে নতুনগ্রাম ফিরব।’ শক্তিধর বলছেন, ‘কিন্তু…’ চন্দন নিজের মোবাইল নেড়ে বলছে, ‘আমার বাবার অন্য রাজনৈতিক বিশ্বাস থাকতে পারে। আমি কিন্তু নবযুগ পার্টির গোঁড়া সমর্থক। তোমাদের ডাক্তার সংগঠন এখন কে দেখছে?’
শক্তিধর ঠান্ডা চোখে চন্দনের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন। কপালে একগাদা ভাঁজ। তাঁর ভুরু কুঁচকে রয়েছে। চোখ লাল। হাত কাঁপছে। ধীরে ধীরে সোফা থেকে উঠে দাঁড়ালেন। চন্দন এক পা-ও পিছোয়নি। সে-ও শক্তিধরের দিকে অপলক তাকিয়ে।
শক্তিধরের মুখে হঠাৎ একগাল হাসি। খুকখুক করে হেসে বললেন, ‘সত্যি! তোরা, আজকালকার ছেলেপুলেরা এত সেয়ানা! ভাবাই যায় না! যা! পবনকে বল রেডি হতে। আমরা ফিরব। ‘বিলু শর্মা’ আজ রাতটা এখানে থেকে আগামিকাল বাংলা ছাড়ুক। কেয়ার টেকারের কাছে ও ফ্ল্যাটের চাবি রেখে দেবে।’
‘ঠিক হ্যায়।’ আবার শুয়ে পড়েছে বাবলু। চন্দন বলল, ‘থ্যাঙ্ক ইয়ু শক্তিকাকা।’
তিনজনের কথোপকথনের মধ্যে শোওয়ার ঘরের দরজা নিঃশব্দে খুলে কখন দময়ন্তী বসার ঘরে চলে এসেছে, কেউ খেয়াল করেনি। চন্দনের কাঁধ খিমচে ধরে, দাঁতে দাঁত চিপে সে বলল, ‘চন্দন, তোকে আমি এতদিন কেন চিনতে পারিনি কে জানে! এনিওয়ে, বেটার লেট দ্যান নেভার!’
‘আরে! চাপ নিচ্ছিস কেন?’ হাসতে হাসতে দময়ন্তীর হাত ছাড়িয়ে নেয় চন্দন। ‘তুই কী জোরে খিমচে দিলি মাইরি! দাঁড়া তোকে একতলা পর্যন্ত ছেড়ে দিয়ে আসি।’
দময়ন্তী ফ্ল্যাটের সদর দরজা খুলে বলে, ‘কোনও দরকার নেই। আমি একাই চলে যেতে পারব।’
চন্দন ঠান্ডা গলায় বলে, ‘তাহলে সোজা বাড়ি যা। অন্য কোথাও যাওয়ার চেষ্টা করিস না।’
দময়ন্তী বলল, ‘তপন চৌধুরী তোকে নিজের ছেলের মতো দেখতেন। তুই তার খুনিদের সঙ্গে মিউচুয়াল করলি। এ পাপ একদিন তোর গলায় ফাঁসি হয়ে ঝুলবে। ওপরওয়ালা তোকে শাস্তি দেবেন। বাই।’
দড়াম শব্দে সদর দরজা বন্ধ করে তরতর করে সিড়ি দিয়ে নেমে গেল দময়ন্তী। বাবলু পকেট থেকে আবার ওয়ান শটার বার করে বলল, ‘টপকা দুঁ ক্যা? যাদা দূর নেহি গিয়া ইয়ে ছোকরি।’
চন্দন বাবলুর কাঁধে হাত রেখে বলল, ‘পাগলামি কোরো না। পুলিশকে মেরেই সামলাতে পারছ না। এখন ডাক্তারি স্টুডেন্টকে টপকাতে চাইছ?’
শক্তিধর ভুরু কুঁচকে বললেন, ‘মেয়েটা এখন থ্রেট। ও যদি এখন থানায় যায়?’
‘কিস্সু হবে না।’ শক্তিধরকে বোঝায় চন্দন, ‘পুলিশকে বললেই হবে যে মেয়েটা ড্রাগ অ্যাডিক্ট। ওর নানান ভিজুয়াল আর অডিটরি হ্যালুসিনেশান হয়। সাইকায়াট্রি ডিপার্টমেন্টের ডাক্তার সেটা কনফার্ম করবেন। পুলিশ ওকে বিশ্বাস করবে না। ওকে জাস্ট ইগনোর করুন।’
শোওয়ার ঘরের ভ্যাজানো দরজার দিকে তাকিয়ে শক্তিধর বললেন, ‘হুম্ম্…’
চন্দন বলল, ‘চলো শক্তিকাকা, বাবাকে বাড়ি ফেরার সুখবরটা দিই।’
‘পবন কিছু শুনতে পায়নি তো?’
‘বাবা দরজা বন্ধ করে টাইপ করছে। বাবাকে নিয়ে চিন্তা নেই।’ শক্তিধরের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করে চন্দন।
.
