৩. চন্দন
‘টেল মি চন্দন, হোয়াট ইজ দিস?’ চন্দনের দিকে বিষ ভরতি একটা বোতল এগিয়ে দিয়ে প্রশ্ন করলেন ডক্টর রেপ। সেমিস্টারের ফরেনসিক মেডিসিন প্র্যাকটিকাল পরীক্ষার প্রথম প্রশ্ন।
বোতলের দিকে তাকিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল চন্দন। ভিতরে তামাক পাতা রয়েছে। টোব্যাকো।
টক্সিকোলজি মানে হল বিষচর্চা। এই বিষয় আয়ত্ত করা খুব শক্ত। বিষের এনসাইক্লোপিডিয়া থেকে চন্দনের প্রিয় বিষ বেছে দিয়েছেন ডক্টর রেপ। অ্যাকোনাইট, স্ট্রিকনিন, সায়ানাইডের মতো কঠিন কঠিন বিষ ছেড়ে সামান্য তামাক! যেটা চন্দনের রোজের খোরাক। হাসি চেপে চন্দন বলল, ‘টোব্যাকো।’
‘লেথাল ডোজ?’ অর্থাৎ ন্যূনতম কী পরিমাণ তামাক শরীরে ঢুকলে একজন মানুষের মৃত্যু ঘটবে।
আবার হাসি পেল চন্দনের। জীবনের প্রথম ধূমপানের অভিজ্ঞতা মনে পড়ে গেল। পরপর দশটা সিগারেট খেতে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার স্মৃতি এ জীবনে মুছবে না। সেইদিন থেকে সে নিকোটিন অ্যাডিক্ট হয়ে গেছে। কালো ঠোঁট আরও কালো হয়েছে। আঙুলে খয়েরি ছোপ। শরীর থেকে সব সময় নিকোটিনের গন্ধ বেরোয়। নিকোটিনের লেথাল ডোজ বলল চন্দন।
নিকোটিনের কেমিক্যাল স্ট্রাকচার নিয়ে একগাদা প্রশ্ন ধেয়ে এল চন্দনের দিকে। পনেরো মিনিট ধরে সব প্রশ্নের উত্তর দিল সে। ডক্টর রেপ খুশি হয়ে বললেন, ‘পলিটিক্স করেও এত ভালো পারফরম্যান্স? গুড। প্রেম করো না। তাই তো?’
‘না।’ চোয়াল শক্ত করে বলল চন্দন।
‘স্মোক করো?’ মুচকি হাসেন ডক্টর রেপ।
‘করি।’
‘তোমাকে একটা গপ্পো বলি।’ মৌখিক পরীক্ষা ভুলে গল্পে মজেছেন ডক্টর রেপ। ‘তোমার মতো এক ছোকরা প্রেমে ঝাড় খেয়ে ভগবানকে বলল, ‘‘প্রভু, আমি দেহত্যাগ করতে চাই। আমায় খানিকটা বিষ দিন।’’ ভগবান ঝোলা খুলে বিষের শিশি বাছছেন, এমন সময় ছোকরা বলল, ‘‘আমি কষ্ট পেয়ে মরতে চাই না। এমন বিষ দিন যা খেলে আনন্দ হবে।’’ ভগবান নতুন শিশি বাছলেন। ছোকরা বলল, ‘‘আমি তাড়াতাড়ি মরতে চাই না। এমন বিষ দিন, যা খেলে অনেক দিন ধরে আস্তে আস্তে মরব।’’ ভগবান ঝুলি থেকে কী বিষ বার করলেন বলতে পারবে?’
চন্দন ঘাড় নাড়ল। এই প্রশ্নের উত্তর তার জানা নেই।
টোব্যাকোর বোতল নেড়ে ডক্টর রেপ বললেন, ‘এইটা।’
চন্দন এতক্ষণে বুঝতে পারল। হালকা হেসে বলল, ‘আমার ভাইভা শেষ?’
‘হ্যাঁ। পরের জনকে পাঠিয়ে দাও।’
‘আর কেউ নেই স্যার।’ ব্যাকপ্যাক কাঁধে ঝুলিয়ে চন্দন বলে, ‘আমিই লাস্ট ক্যান্ডিডেট ছিলাম।’
‘তাহলে এখন কী কর্তব্য? সিনেমা দেখা, রেস্তরাঁয় খেতে যাওয়া, না হোস্টেলে হুল্লোড়?’
‘কোনওটাই না। বাড়ি যাব।’ ডক্টর রেপকে টাটা করে ফরেনসিক মেডিসিন ডিপার্টমেন্ট থেকে বেরোয় চন্দন। বিকেল সাড়ে চারটে বাজে। বাড়ি পৌঁছতে পৌঁছতে সাড়ে সাতটা-আটটা বাজবে। আজ সতেরোই মার্চ। থার্ড সেমিস্টার শুরু হয়েছিল দোসরা মার্চ। গত পনেরো দিন তাদের ব্যাচের ওপর দিয়ে ঝড় বয়ে গেল। চারটে সাবেজেক্টের থিয়োরি এবং প্র্যাকটিকাল। চন্দনের পরীক্ষা মোটামুটি উতরে গেছে। অভি কেমন দিয়েছে জিজ্ঞাসা করা হয়নি। চন্দন বরং বেশি আগ্রহী দময়ন্তী কেমন দিয়েছে সেটা জানতে।
অধীরদার কাছ থেকে দময়ন্তী সম্পর্কে কিছু তথ্য জানতে পেরেছে চন্দন। পরীক্ষার মধ্যে একদিন ফোন করে অধীরদা জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কী করছ ডাক্তার?’
‘পড়ছি।’ চন্দন ক্যাজুয়ালি বলেছিল।
‘তোমার গলার আওয়াজ শুনে বোঝা যাচ্ছে যে টেনশানে আছ। তাই কাজের কথাটা ছোট করে বলি। তোমার ব্যাচমেট দময়ন্তী সেনগুপ্ত এবং তোমার সিনিয়র ব্যাচের সব্যসাচী এবং অনাবিল নিয়মিত তোমার নতুনগ্রামে যায়। এ খবর রাখো?’
‘নতুনগ্রামে?’ চন্দন অবাক।
‘আজ্ঞে হ্যাঁ। নতুনগ্রামের গোপাল নস্করকে চেনো?’
‘গোপাল নস্কর?’ ঢোক গিলে বলে চন্দন।
‘হ্যাঁ। চেনো নাকি?’
‘চিনি মানে, আমাদের স্কুলের মাস্টারমশাই। স্কুল ছাড়ার পরে যোগাযোগ নেই।’ হড়বড় করে বলে চন্দন। তার বাবা আর গোপালকাকা মিলে ‘বেলাকূল’ নামে একটা খবরের কাগজ বার করেন, আবাসবাড়িতে গোপালকাকার রোজের যাতায়াত— এইসব কথা চেপে যাওয়াই ভালো।
‘গোপাল নস্করের বাড়িতে ইন্ডিয়ান্স পিপ্লস পার্টির ক্যাম্প আছে। আইপিপি যে নিষিদ্ধ পার্টি এই আইডিয়া নিশ্চয় আছে?’
‘আছে।’
‘আইপিপির ক্যাম্পে গিয়ে ওরা বন্দুক চালানো শিখছে। শুয়োরের বাচ্চারা সশস্ত্র বিপ্লব করবে। সরকার থেকে পাবলিক প্রাইভেটে পার্টনারশিপে এত বড় একটা প্রজেক্ট হচ্ছে, হেল্থ টুরিজম থেকে গাদা গাদা ডলার আসবে, কত ছেলেপুলের চাকরি হবে… সে সব খেয়াল নেই। অন্ধ্রপ্রদেশ, ওড়িশা, ঝাড়খণ্ডের নকশালগুলোর সঙ্গে হাত মিলিয়ে বাংলায় অশান্তি ঢোকাচ্ছে।’
‘আমি দেখছি অধীরদা। আপনি চিন্তা করবেন না।’
‘আমি চিন্তা করব না তো কি মৃন্ময় চ্যাটার্জি করবে? কলেজে অতিবাম রাজনীতি ঢুকে গেছে, আর তোমরা জানোও না। ফাজলামো হচ্ছে?’ অধীর রেগে আগুন।
কথায় কথায় মৃন্ময়ের রেফারেন্স এখন দলের সব স্তরে। সন্দীপ সামন্ত উন্নাসিক মানুষ। মৃন্ময়ের নাম মুখে আনেন না। বলেন, ‘ওই ফক্কড়টা’। অথবা ‘ওই ছ্যাবলাটা’। অথবা ‘সাগরসঙ্গমে নবকুমার’। শেষের নামটা ‘নবযুগ পার্টি’ নিয়ে মশকরা। ‘আগামী ভোটের পরে নবযুগ পার্টির স্থান হবে বঙ্গোপসাগরে’— এই কথাটা মিছিলে মিটিং-এ সন্দীপ সামন্ত প্রায়ই বলেন।
জনগণের সামনে মৃন্ময়কে পাত্তা না দিলেও পার্টির অভ্যন্তরে মৃন্ময়ের ছায়া দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। পুরোনো দিনের পার্টি কর্মীরা নিষ্ক্রিয়, হতাশ অথবা ঝগড়ায় মত্ত। নতুনদের মধ্যে অধিকাংশটাই বেনোজল। ধান্দাবাজির জন্যে পার্টিতে ঢুকেছিল। এখন তারা ফেন্স-সিটার। সুযোগের অপেক্ষায় আছে। জনমোর্চার নৌকায় ফুটো দেখলেই নবযুগের নৌকোয় লাফ মারবে। অধীরও সেটা জানেন। তাই এত খিটখিটে হয়ে গেছেন।
ফোন রেখে দিয়ে চন্দন অন্য কথা ভাবছিল। দময়ন্তীর মতো মেয়ে সক্রিয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েছে? চন্দন জানতেও পারল না? রিপুদাও না? জানতে হল কলেজের বাইরের লোকের কাছ থেকে? কলেজে জনমোর্চার জনভিত্তি তা হলে কমছে? চন্দনের জনপ্রিয়তায় তা হলে ভাটার টান?
দময়ন্তীর অতিবাম রাজনৈতিক অবস্থানকে কী ভাবে নিজের স্বার্থসিদ্ধিতে ব্যবহার করা যেতে পারে, ভাবছিল চন্দন। সে নিজের কাছে খুব পরিষ্কার। কলেজে পড়াশুনো করতে এসেছে। সব বিষয়ে প্রথম হয়ে সে ইন্ডিয়ান মেডিকাল কলেজ থেকে বেরোবে। ইউনিভার্সিটিতে ফার্স্ট হওয়াটা নিজের হাতে নয়, তবে চন্দন লড়ে যাবে। পড়াশুনো করতে গিয়ে, হোস্টেলে থাকতে গিয়ে গ্রামের ছেলে হিসেবে অসুবিধে হচ্ছিল বলে ছাত্র রাজনীতিতে ঢুকেছে। সময় বুঝে বেরিয়েও যাবে। তবে সেই সময় এখনও আসেনি।
দময়ন্তী, দময়ন্তীর রুমমেট বৃন্দা, বৃন্দার ভালোবাসার মানুষ অভি, অভির দাদা বিলু, বিলুর গুরু সব্যসাচী, সব্যসাচীর দল আইপিপি… অবয়বহীন একটা ছক চন্দনের মাথার মধ্যে তৈরি হচ্ছিল। বাড়ি ফেরার দীর্ঘ যাত্রাপথে ছকটা ফাইন টিউন করল সে। আবাসবাড়িতে যখন ঢুকল, আটটা বাজে। গরমকাল বলে সার্কাস কোম্পানি নন্দনকে ছুটি দিয়েছে। সে বাড়িতে। পারুল রান্নাঘরে চা করছেন। পবন আর গোপাল বৈঠকখানায় তুমুল ঝগড়া লাগিয়েছেন। পোশাক বদল করে, বারমুডা স্যান্ডো গেঞ্জি গলিয়ে রান্নাঘরে গিয়ে চন্দন পারুলকে বলল, ‘খিদে পেয়েছে।’
‘তোর বাবার জন্য মুড়ি মাখব। চলবে?’
‘আমি মাখছি।’ চন্দন বলল। কলকাতার চাউমিন খেয়ে পেটে চড়া পড়ে গেছে। মুড়ির টিন থেকে বড় কাঁসার পাত্রে মুড়ি ঢালে চন্দন। বাড়িতে ভাজা সাদা মুড়ি। রান্নাঘরের নানান শিশি, বোতল, কৌটো ঘেঁটে বার করে বাদাম, কাঠিভাজা, কচুভাজা, চানাচুর। মুড়িতে সব ঢালে। দুটো পেঁয়াজ কুচিকুচি করে কেটে মুড়িতে মেশায়। কাঁচালঙ্কা টুকরো টুকরো করে কাটে। সবশেষে ঢালে আমতেল। টক–ঝাল ঝাঁঝে জিভে জল আসে চন্দনের। কাঁসার পাত্র নিয়ে বৈঠকখানায় ঢুকে বলে, ‘এই নাও। এনার্জি।’
গোপাল এক মুঠো মুড়ি মুখে ফেলে বলেন, ‘বাঁজাপলাশ গ্রামে হেল্থ হাব হওয়া নিয়ে তোর কী মত?’
চন্দন বলল, ‘আমার মত পরে শুনবেন। আগে আপনার মত বলুন। খবরের কাগজ বা টিভি সত্যিটা বলছে না।’
গোপাল বললেন, ‘সত্যি বলে কিছু হয় না। আজ যেটা সত্যি, কাল সেটা মিথ্যে হয়ে যায়। আজ যেটা সত্যি বলে মনে হচ্ছে, কাল দেখা যায় সেটা সত্যি হলেও হতে পারে, তবে মিথ্যের পাহাড়ের ওপরে দাঁড়িয়ে রয়েছে।’
পবন বললেন, ‘ওফ! দর্শনের কথা বোলো না। ফ্যাক্টস বলো।’
‘ফ্যাক্ট নম্বর ওয়ান। স্বাস্থ্য দফতর বাঁজাপলাশ গ্রামে একটা হেল্থ হাব গড়তে চাইছে। ‘পিপিপি’ বা ‘প্রাইভেট-পাবলিক পার্টনারশিপ’ মডেলে। প্রাইভেট সেক্টর কোম্পানিটির নাম ‘হেলথ হাব’। এটি একটি আমেরিকান কোম্পানি। মালিকের নাম জর্জ কুক। ফোর্বস পত্রিকা প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী বিশ্বের প্রথম দশজন ধনী মানুষদের তালিকায় জর্জের অবস্থান সাতে। আমেরিকার হেল্থ পলিসি নিয়ে তোর কোনও ধারণা আছে?’
চন্দন বলল, ‘আপনি বলুন।’
গোপাল বললেন, ‘মেডিকাল ইনসিয়োরেন্স না থাকলে ডাক্তার রুগি দেখেন না। স্বাস্থ্য ওই দেশে পরিষেবা নয়, পণ্য। আর পাঁচটা প্রোডাক্টের মতো চিকিৎসা নিয়েও নিয়মিত মামলা হয়। ডাক্তার নিজের প্রাণ বাঁচাতে ইনসিয়োরেন্স করিয়ে রাখেন। অর্থাৎ রুগি মামলা করলে কোনও একটি ল-ফার্ম ডাক্তারের হয়ে মামলা লড়বে। এবং ডাক্তার হারলে কমপেনসেশনের টাকা দেবে। এই ইনসিয়োয়োরেন্সের প্রিমিয়াম চড়া বলে প্রতিটি ডাক্তারের প্রফেশনাল ফি বেশি। তা ছাড়া, ভবিষ্যতে মামলা হতে পারে এই আশংকায় ডাক্তাররা নিজের ক্লিনিকাল নলেজ বা বেডসাইড মেডিসিনের ওপরে ভরসা করেন না। কারণ আদালতে ডাক্তারি বিদ্যা বা এথিক্স মান্যতা পায় না। সেখানে মান্যতা পায় ডকুমেন্ট। আলট্রাসোনোগ্রাফি, সিটি স্ক্যান, এমআরআই, ব্লাড রিপোর্ট। ল-ফার্ম এবং ইনসিয়োরেন্স কোম্পানি নিয়ন্ত্রিত এই চিকিৎসা ব্যবস্থায় ওদেশের সাধারণ মানুষ যখন হাঁসফাঁস করছে, তখন জর্জ কুক আমদানি করল হেল্থ টুরিজম। এটা বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং-এর মতো একটা বিজনেস মডেল।’
‘বিপিও ব্যাপারটা জানি।’ আর একগাল মুড়ি মুখে দিয়ে পবন বলেন, ‘হেল্থ ট্যুরিজমটা কী বস্তু?’
‘জর্জ দেখলেন, ভারতবর্ষ বা উন্নয়নশীল দেশগুলোর অনেক সুবিধে আছে। এখানে উন্নতমানের চিকিৎসক আছেন। ইনফ্যাক্ট আমেরিকা বা ইংল্যান্ডে ভারতীয়, পাকিস্তানি বা চিনা চিকিৎসকদের যথেষ্ট সুনাম। কেরালিয়ান নার্সরা পৃথিবীর কোন প্রান্তে নেই?’
‘তো?’
‘জর্জ দেখলেন যে ভারতে হিউম্যান রিসোর্স রয়েছে। নেই শুধু ইনফ্রাস্ট্রাকচার। সেইটা প্রোভাইড করছে ওঁর হেল্থ হাব। তুমি সত্য খুঁজছিলে না? এই হল সেই সত্য। কোনও গ্লোবাল টেন্ডার ডাকা হয়েছিল কি না, ডাকা হয়ে থাকলে কোন যোগ্যতায় হাল্থ হাব বরাত পেল, টেন্ডার ডাকা না হয়ে থাকলে জর্জ কুক কী ভাবে এই বরাত পেল— এই সব প্রশ্নের উত্তর কোনও দিনও জানা যাবে না।’
‘তোমার খালি খুঁত খোঁজা কাজ। হেল্থ হাব হলে কত স্থানীয় লোকের চাকরি হবে তা ভেবেছ?’
‘হেল্থ হাবের কোর এরিয়ায় স্টাফের সংখ্যা হবে এক হাজার। ডাক্তার, নার্স, প্যারামেডিকাল স্টাফ, অ্যাকাউন্টস ডিভিশান, আর অ্যান্ড ডি, কর্পোরেট, পিআর, মেনটেন্যান্স—এইসব ডিভিশানে কোনও স্থানীয় লোক নেওয়া হবে না। যোগ্যতাই সেখানে একমাত্র মাপকাঠি। ঝাড়পোঁছ করার জন্য আর বাগানের মাটি কোপানোর জন্য কয়েকজন লোকাল ছেলেমেয়ে নেওয়া হবে। তাদের ইন্টারভিউ বড়বড় করে খবরের কাগজে ছাপা হবে।’
‘সরকারের কোষাগারে কত টাকা আসবে ভেবেছ?’ পবন দমতে নারাজ।
‘এক পয়সাও আসবে না। তোমার সরকার এই জমি জর্জের কোম্পানির হাতে অনুদান হিসেবে তুলে দিয়েছে।’
‘সাধারণ মানুষ, নতুনগ্রাম আর বাঁজাপলাশের মানুষ, এই জেলার মানুষ— এখানে চিকিৎসা পাবে না বলছ? এ তোমার অপপ্রচার।’ ঘাড় নাড়েন পবন।
‘যদ্দুর শুনছি, বাঁজাপলাশ গ্রামে লোক-দেখানো একটা হেল্থ ইউনিট খোলা হবে। যে হেল্থ সেন্টারটা আছে, ওটাকেই রং করে সং সাজানো হবে। সেখানে স্থানীয় লোকেদের চিকিৎসাও হবে। কিন্তু হেল্থ হাব আসলে মধ্যবিত্ত আমেরিকানদের জন্য। তারা কম পয়সায় ছানি কাটাতে, দাঁত তোলাতে, অ্যাপেনডিক্স বা গল-ব্লাডার অপারেশন করাতে এ দেশে আসবে। ও দেশে খরচ একশো ডলার হলে, এ দেশে একশো টাকা। কম খরচে আর্ন্তজাতিক মানের চিকিৎসা হল, ভারত ভ্রমণের অভিজ্ঞতা হল, ওরিয়েন্টাল মিস্টিসিজমের স্বাদ পাওয়া গেল। শুধু এখানকার গরিবরা বাস্তুহারা হয়ে গেল।’
‘জোয়াকিমদের তো পুনর্বাসন করবে সরকার!’
‘কে চায় পুনর্বাসন? তাদের কোনও মতামত নেওয়া হয়েছে!’ গর্জে ওঠেন গোপাল। ‘শান্ত, নির্বিরোধী একটা জনগোষ্ঠী। প্রকৃতির অদ্ভুত খেয়ালে অধিকাংশ মানুষই বামন। অথচ এখান থেকেই উঠে আসছে ভারতের সেরা জরি-পালিশওয়ালা, ডায়মন্ড ডিজাইনার, শাড়ির কারিগর। সারা ভারতের বিভিন্ন ফ্যাশন উইকে যেসব স্টার ডিজাইনারদের নাম তোমরা শোনো, তাদের স্টুডিওতে শাড়ি বানায় জোয়াকিমরা। শিল্পচেতনায় ভরপুর, লুপ্তপ্রায় এই জনগোষ্ঠীকে পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন করে কোন শিল্প গড়ছে তোমার সরকার? তোমার এক ছেলে তো বামন। এই ছোট ছোট মানুষগুলোর জন্য তোমার কোনও রকমের অনুভূতি হয় না?’
‘আহ! ঠাকুরপো!’ রান্নাঘর থেকে মৃদুস্বরে বলেন পারুল, ‘চা যে জুড়িয়ে গেল…’
পবন তাড়াতাড়ি বলেন, ‘তাহলে বেলাকূলের সম্পাদকীয়তে কী যাবে? তোমার দৃষ্টিভঙ্গি না আমার?’
‘আমার মনে হয়, এইবার দুটো সম্পাদকীয় যাক। একাধিক পয়েন্ট অফ ভিউ থাকলে পাঠকের পক্ষে পুরো ছবিটা দেখতে সুবিধে হয়।’
পবন আর গোপাল আলোচনা চালাচ্ছেন। চন্দন টুক করে বেরিয়ে এল। সিগারেট খেতে ইচ্ছে করছে। বাঁজাপলাশ গ্রামের দিকে ঘুরতে ঘুরতে সিগারেট টানা যাক। বহুকাল ওদিকে যাওয়া হয়নি।
মেচেদা-নতুনগ্রাম সড়কে চন্দনের সঙ্গী হল নন্দন। ভাইকে বলল, ‘আমার কিনে দেওয়া মোবাইলটা কোথায়?’
ইন্ডিয়ান মেডিকাল কলেজে ভরতি হওয়ার দিন নন্দন তাকে একটা মোবাইল উপহার দেয়। পকেট থেকে মোবাইল বার করে চন্দন দেখাল, ‘এই যে!’
বিজয় মেমোরিয়াল গ্রাউন্ড পেরিয়ে বেশ খানিকটা হাঁটার পর নতুনগ্রাম শেষ হয়ে এল। শুরু হল বাঁজাপলাশ। রাস্তার দু’দিকে বালি শুরু হয়ে গেছে। বাঁ দিকে সমুদ্র আর ঝাউবন। ডান দিকে ক্যাশুরিনার সারি আর ঝাউবন। অযত্নে বেড়ে ওঠা গাছগাছালি জঙ্গল-জঙ্গল পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। এদিকের বাড়িতে এখনও কারেন্ট আসেনি। গোপাল নস্করের দোতলা বাড়ির কয়েকটা ঘরে আলো জ্বলছে। জোয়াকিমপাড়ার সব ঘরেই কুপি বা লন্ঠন। ছোট ছোট মানুষের দল দাওয়ায় বসে রাতের খাবার সেরে নিচ্ছে। নন্দন হিসি করতে দাঁড়িয়েছে। চন্দন কয়েক পা এগিয়ে, লাইটার জ্বেলে সিগারেট ধরাল। এতক্ষণ দাদা ছিল বলে সিগারেট ধরাতে পারেনি।
‘কী হে বোমাবস! এখানে কী করছ?’ অন্ধকার থেকে হঠাৎ শোনা গেল।
চমকে উঠে হাত থেকে লাইটার ফেলে দিল চন্দন। কলেজের প্রথম দিনের প্রসঙ্গ দেড় বছর বাদে কে তুলল?
যে তুলল সে জিন্স আর পাঞ্জাবি পরে কুলকুলিয়ে হাসছে। দময়ন্তী। চন্দন সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে নিজের ফুসফুস কালো ধোঁয়ায় ভরিয়ে নিল। আজকেই সে এক ঢিলে দুই পাখি মারার প্ল্যান করেছিল। আর আজই প্ল্যান ইমপ্লিমেন্টেশানের সুযোগ এসে গেল? বাহ! জবাব নেই!
বালি থেকে লাইটার তুলে চন্দন বলল, ‘তোকে এত রাতে এক্সপেক্ট করিনি।’
চন্দন সচেতন ভাবে ‘এখানে এক্সপেক্ট করিনি’ বলল। প্র্যাকটিকাল পরীক্ষা শেষ হওয়া মাত্র দময়ন্তী নিজের বাড়ি না গিয়ে বাঁজাপলাশ গ্রামে কেন এসেছে, এর উত্তর সে দময়ন্তীর মুখ থেকে শুনতে চায়। আলোচনা যদি প্ল্যানমাফিক এগোয়, তাহলে সে এক ঢিলে দুই পাখি মারবে। দময়ন্তীকে আইপিপি এবং পিএমএফ-এর কবল থেকে সরাবে। প্লাস ওকে ব্যবহার করে বৃন্দাকে অভির কবল থেকে সরাবে।
দময়ন্তী বলল, ‘এত রাতে এক্সপেক্ট করিসনি— এই কথার মানে কী? যেন তুই আমাকে তোর গ্রামে এক্সপেক্ট করেছিলি? আমাকে এখানে দেখে তোর অবাক লাগছে না?’
‘ক’দিন আগেই বৃন্দার মা এখানে দিনদশেক কাটিয়ে গেলেন। সেটাও তো এক্সপেক্ট করিনি।’ প্যাঁচানো উত্তর দেয় চন্দন।
‘সেটা তো শুটিং-এর ব্যাপার।’
‘তোরও তো শুটিং-এর ব্যাপার। বিলুদার নেতৃত্বে সশস্ত্র বিপ্লবের শুটিং।’
দময়ন্তী অবাক হয়ে চন্দনের দিকে তাকিয়ে। কিছুক্ষণ পরে বলল, ‘কী করে জানলি?’
‘উত্তর পছন্দ হবে না। এইসব বাদ দে। চল মোহনার দিক থেকে ঘুরে আসি।’ টুকটুক করে হাঁটা লাগিয়েছে চন্দন।
‘না। তোকে বলতেই হবে।’ দৌড়ে এসে চন্দনের হাত খিমচে ধরেছে দময়ন্তী।
দময়ন্তীর মতো মেয়েরা খুব হাইপার হয়। এই প্রেমে পড়ে, এই প্রেম থেকে ওঠে, এই ঝাড় নামায়, এই ঝাড় খেয়ে ডিপ্রেস্ড হয়ে মুঠো মুঠো ঘুমের ওষুধ খেয়ে সুইসাইড করতে যায়, এই সুইসাইডে ব্যর্থ হয়ে আর এক জনের প্রেমে পড়ে! এদের টুপি পরানো খুব সোজা। শুধু ঠিকঠাক সুতো ছাড়তে আর গোটাতে হবে।
চন্দন বলল, ‘সব শুনেটুনে বলবি না যেন কিন্তু যে কেন সব কথা বললাম। মাইন্ড ইট, এই ডিসকাশান আমি শুরু করতে চাইনি। এখানে মিটিং-এর মিনিট বই থাকলে আমাদের কথাবার্তা সেখানে লিখে রাখতাম।’
‘নেতাগিরি ফলাস না। আমি শুটিং প্র্যাকটিস করি, এ কথা তোকে কে বলেছে?’
‘দ্যাখ দময়ন্তী, তুই ফায়ার আর্মস চালানো শিখছিস এটা কোনও ইসু নয়। তোর জীবনে আমি নাক গলাবো কেন? আমি চিন্তিত দুই ভাইয়ের গেম প্ল্যান নিয়ে।’
‘দুই ভাই?’
‘অভি আর বিলুদা। দুই সোশাল ক্লাইম্বার। একজন তোকে পাকড়েছে। অন্যজন বৃন্দাকে পাকড়েছে। দুটোই ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির জন্য।’
‘হোয়াট দ্য ফাক!’ হিস হিস করে বলে দময়ন্তী, ‘তুই বিলুদা সম্পর্কে এমন কথা বলতে পারলি? পেটি মিড্ল ক্লাস বং। ক্র্যাব মেন্টালিটি ছাড়া এইসব নোংরা কথা বলা যায় না।’
আলোচনা ঠিক রাস্তাতেই এগোচ্ছে। নিজের পারফরম্যান্সে তুষ্ট হয়ে চন্দন বলল, ‘আমি মিড্ল ক্লাস নই, চাষার ছেলে। দারিদ্ররেখার আশেপাশে ঘাস খাই। আমি জানি যে বামন হয়ে চাঁদ হাত দিতে নেই। কিন্তু মধ্যবিত্ত এক আজব সম্প্রদায়। তারা সব সময় ভাবে সোশালি ক্লাইম্ব করবে। মফস্সল থেকে একলাফে মেট্রোপলিটন শহরের পশ এলাকায় তার ফোর বিএইচকে চাই, টু হুইলার থেকে এসইউভি চাই, বাৎসরিক পুরী–দিঘা–দার্জিলিং ভ্রমণের বদলে ইয়োরোপিয়ান ট্যুর চাই, মা এইট পাশ গৃহবধূ হলেও নিজের জন্য ইংরিজি জানা ডাক্তার বউ চাই। আর এই সবের জন্য চাই শাঁসালো শ্বশুরবাড়ি। অভি আসলে প্রেম করছে স্যামি ব্যানার্জির মেয়ের সাথে। সেই মেয়েটা বৃন্দার বদলে শিলা, মেরি, টিনা—যে কেউ হতে পারে। একই ভাবে, তোর বিলুদা প্রেমের খেলা খেলছে ড্যানিয়েল আর্চার আর শক্তিরূপা সেনগুপ্তর মেয়ের সঙ্গে। তার নাম দময়ন্তীর বদলে সায়ন্তনী, দিতিপ্রিয়া, আর্যপ্রিয়া, আরাত্রিকা— হতে পারে। তোরা দু’জনে দুই ভাইয়ের পাসপোর্ট টু হাই লাইফ।’
‘আমরা বড়লোক নই।’ বিরক্ত হয়ে বলে দময়ন্তী।
‘ড্যানিয়েল আর্চারের পেন্টিং দশ লাখ টাকায় প্রি-বুকিং হয়। উইকেন্ডের এডিটর হিসেবে শক্তিরূপা সেনগুপ্ত স্যালারি এবং পার্কস মিলিয়ে মিনিমাম পঁচিশ লাখ টাকা পার অ্যানাম উপার্জন করেন। তোর মনে হতেই পারে তুই বড়লোক নোস। কিন্তু রাইর্টাস বিল্ডিং-এর ক্লার্কের ছেলের এই রকম মনে হয় না।’
‘বিলুদাকে নিয়ে এইসব আলোচনা আমার পছন্দ নয়। শাট আপ চন্দন।’
চন্দন মনে মনে নিজের পিঠ চাপড়াল। আজ সত্যিই ভাগ্যদেবী তার সহায়। না হলে আলোচনা ঠিক পথে কী ভাবে এগোচ্ছে? দময়ন্তী-বিলুদার প্রসঙ্গ থেকে লাইন চেঞ্জ করে এবার বৃন্দা-অভির লাইনে আলোচনাকে আনতে হবে। তবে বিলুদা প্রসঙ্গ একদম বাদ দেওয়া যাবে না। খামোখা একটা মেয়ে পিএমএফ করবে এটা জাস্ট মানা যাচ্ছে না।
শান্তভাবে চন্দন বলল, ‘প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা খুব সোজা কাজ। কোনও কিছুকে ভাংতে জাস্ট একটা ইট লাগে। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক হওয়া অনেক শক্ত। প্রতি মিনিট, প্রতি ঘণ্টা, প্রতিটি দিন একই কাজ করে যেতে হয়। প্রতিটি ভুল মিডিয়া দশগুণ বড় করে দেখায়। অজস্র ঠিকের খবর রিপোর্টেড হয় না। সরকার বিরোধিতার রাজনীতি করছিস, কর। এসব ক্ষণেকের আবেগ। এমবিবিএস পাশ করে বেরোনোর পর নিজের কাণ্ড কারখানার কথা ভেবে হাসবি। তখন তুই ইউকে-র ন্যাশনাল হেল্থ সার্ভিসের মেডিকাল অফিসার হিসেবে কার্ডিফ কিংবা পেলহ্যাম কিংবা ল্যাঙ্কাশায়ারে আছিস। তোর বিলুদাও তাই।’
দময়ন্তী কোনও কথা বলছে না। তাকে নীরব দেখে চন্দন লাইন চেঞ্জ করল। বলল, ‘তোকে নিয়ে আমার চিন্তা নেই। তোর বাবা-মা তোকে দুনিয়াদারি শিখিয়ে বাজারে ছেড়েছে। আমার চিন্তা হয় বৃন্দাটার জন্য। বাপমায়ের আদুরে মেয়ে। এই বয়সে কোনও ভুল ডিসিশন নিলে সারাজীবন ফল ভোগ করতে হবে।’
দময়ন্তী হাঁটা থামিয়ে দিয়েছে। আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বলেছিস ভালো। তবে আমার একটা প্রশ্ন আছে। বৃন্দার ওপরে তোর কোনও ব্যথা নেই তো?’
এই প্রশ্নটা যে আসবে, চন্দন জানত। প্রতিপক্ষ শক্তিশালী না হলে লড়াই করে লাভ কী? চন্দন মনে করে, ‘নাথিং ইজ রং ইন লাভ অ্যান্ড ওয়র!’ প্রশ্নের উত্তর তার কাছে তৈরি ছিল।
চন্দন বলল, ‘বৃন্দাকে যার ভালো লাগে না, সে ছেলেই নয়। কিন্তু আমি আগেই বলেছি, আমি চাষার ছেলে। বামনের চন্দ্রাভিলাষ আমার নেই। আমি আমার পছন্দসই কোনও গেরস্থপোষা মেয়েকে বিয়ে করব। বৃন্দার প্রতি কনসার্নটা বন্ধু হিসেবে। তুই যদি ওর বন্ধু হোস, তাহলে মেসেজটা কনভে করিস।’
দময়ন্তী চন্দনের দিকে তাকাল। অন্ধকারে, চশমার আড়ালে ঝকঝক করছে ধারালো চোখ। দময়ন্তী তাকিয়ে থাকল। তাকিয়েই থাকল। চন্দনও দৃষ্টি ঘোরালো না। মিথ্যেবাদী মন চাইছিল মাটির দিকে তাকাতে। কিন্তু হেলায় সেই মানসিকতা উড়িয়ে দিয়ে বন্ধুর দৃষ্টি, স্বজনের দৃষ্টি বিছিয়ে রাখল চন্দন। এ লড়াই বাঁচার লড়াই। এ লড়াই জিততে হবে।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে দময়ন্তী বলল, ‘চল, ফিরি। অনেক রাত হল।’
.
