১৭. অভিজ্ঞান
‘আমি যে তোমার সঙ্গে দেখা করতে আসি এতে কেউ কিছু মনে করে না তো?’
‘কেউ জানতে পারলে তো? তুমি যখন আসো তখন বাড়ির মালিক আপিসে। বড় ছেলে দরজা বন্ধ করে পড়ছে। ছোটটা কলেজে। মালকিন রান্নাবান্না নিয়ে ব্যস্ত। আমাদের নিয়ে মাথা ঘামানোর মতো কেউ নেই।’
‘কেন? রাধাদি?’
‘ওরেব্বাবা। সে তোমাকে কী মনে করে সে-ই জানে! তুমি এলে আমাদের ঘরের দরজা বাইরে থেকে আটকে পাহারা দেয়। ওকে নিয়ে চিন্তার কিছু নেই।’
‘না…তাও। আমি অপরিচিত কেউ হলে অসুবিধে ছিল না। কিন্তু আমার ভাই আর তোমার মালিকের ছেলে এক কলেজে ডাক্তারি পড়ে। এই বাড়িতে আমার আসার কথা লোকে জেনে গেলে আমার মুখ পুড়বে।’
‘পুড়ুক। শুধু রাধা কেন কলঙ্কিনী হবে? কেষ্টর গায়েও কালি লাগুক।’
‘এর মধ্যে রাধাদির নাম এল কেন?’
‘ওফ! এ রাধা সে রাধা নয়। এ হল কেষ্টর রাধা। অপোগণ্ড কোথাকার!’
‘অপোগণ্ড মানে কী?’
‘এই! তুমি গায়ে হাত দেবে না বলে দিচ্ছি! তিন ফুট মানুষের এত তেজ আসে কোথা থেকে?’
‘আহা! তুমি এইসব সাধারণ বিষয়ে মাথা ঘামিও না। অপোগণ্ড মানে বলো।’
‘অ্যাই মেরেচে!। আমি কি আর পড়াশুনা জানি গো! অপোগণ্ড মানে বোধ হয় বাচ্ছা ছেলেপুলে।’
‘গলগণ্ড বলে একটা কথা আছে না? আমি জানতাম গণ্ডারদের গলাকে গলগণ্ড বলে! মানে…’ মানদার গ্রীবায় হাত বুলিয়ে নন্দন বলে, ‘এই জায়গাটা।’
‘ভ্যাট! খালি ভুলভাল বকছে। আচ্ছা, আমার গায়ে হাত দিয়ে তোমার ভালো লাগছে?’
‘উম্ম!’
‘আচ্ছা তোমাদের সার্কাসে তো হাপ-ন্যাংটা বিলিতি মাগি থাকে। ওরা তোমায় দেয় না?’
‘না। আমি বামন কিনা। আমাকে ওরা দলে নেয় না।’
‘আমাকেও কেউ দলে নেয় না। লোকের বাড়ি ঝি-গিরি করি। তার ওপরে লাইনে নেমেছিলাম। কী কষ্ট বলো তো!’
‘কষ্টের কী আছে! এসো না, আমি আর তুমি মিলে দল পাকাই। উম্ম…’
‘ইল্লি রে! বারো হাত কাঁকুড়ের তেরো হাত বিচি! দল পাকাবে! এবার তুমি বিদেয় হও। রাধা পাগলি খেপে গেলে দাদা-বউদিকে বলে দেবে কিন্তু! তখন তোমার ভাইয়ের মুখ পুড়বে।’
‘ঠিক বলেছ। কটা বাজে বলো তো? আমি বাড়ি থেকে বেরিয়েছি ভোর পাঁচটায়।’
‘মাত্র এগারোটা বাজে। আর একটু বোসো। আবার তো সেই এক হপ্তা পরে আসবে।’
‘আর না। এবার বাড়ি ফিরতে হবে। আজ চন্দনের রেজাল্ট বেরোবে। ও বাড়ি ঢোকার আগে আমায় ঢুকতে হবে।’
.
অনেকক্ষণ ধরে নন্দন আর মানদার ফিসফিস শুনছিল অভি আর বিলু। মানদার ঘর থেকে নন্দন বেরোনোর উদ্যোগ করায় দু’জনে সিঁড়ি বেয়ে চুপিচুপি ওপরে উঠে এল।
আজ তিরিশে জুলাই। আজ সেকেন্ড এমবিবিএস-এর রেজাল্ট বেরোবে। গতকাল রাত্তিরে ভালো ঘুম হয়নি অভির। এপাশ ওপাশ করতে করতে মোবাইলে শেষবারের মতো সময় দেখেছে, সাড়ে চারটে বাজে। তারপরে ঘুমিয়ে পড়েছিল। টেনশানহীন ভোরের ঘুম গড়িয়েছে বেলা পর্যন্ত। অরুণা বুদ্ধি করে চা-জলখাবার খেতে তাকে ডাকেননি। কিন্তু তার ঘুম ভাঙিয়ে দিল বিলু। চিলেকোঠার ঘরে ঢুকে অভির পাশে বসে বলল, ‘একটা কথা বলব। মাকে বলবি না কিন্তু।’
অভি ধড়মড় করে উঠে বসে মোবাইলে সময় দেখল। এগারোটা বাজে। ভালোই ঘুমিয়েছে সে। রাতের ক্লান্তি আর নেই। কিন্তু টেনশানটা ফেরত এসেছে। আজ রেজাল্ট।
অভির মনে পড়ে গেল ডাক্তারিতে ভরতি হওয়ার আগের দিনের কথা। ‘দাবাং’ দেখতে গিয়ে বিলু সিগারেট খেয়েছিল। অভি শাসিয়েছিল, মাকে বলে দেবে। দেখতে দেখতে দু’বছর কেটে গেল। আজও বিলু একইরকম রয়ে গেছে। কোনও একটা কথা মাকে না বলার জন্য অভিকে অনুরোধ করছে। বিলুর অভিব্যক্তিহীন মুখের দিকে তাকিয়ে সে বলল, ‘কী হয়েছে? আবার কী বাওয়াল করেছিস?’
‘আমি আর কোনও বাওয়াল করব না। এটা অন্য ব্যাপার। বল, মাকে বলবি না?’
বিলুর মুখের দিকে তাকিয়ে মায়া হল অভির। বিলু বরাবরই রোগা। এখন কেমন চোয়াড়ে দেখতে হয়ে গেছে। অনেক দিন দাড়ি কামায়নি। ঢুকে যাওয়া গালে, এবড়োখেবড়ো দাড়িতে জ্বলজ্বলে চোখে বিপ্লবী মার্কা লুক বরাবরই ছিল। সেলুনে না গিয়ে ঘাড় পর্যন্ত চুল হয়েছে। অভি খেয়াল করল বিলুর গা দিয়ে বোঁটকা গন্ধ আসছে। অনেকদিন চান করেনি। অনেকদিন জামাকাপড় বদলায়নি। টিশার্ট আর বারমুডায় ছোপ ছোপ দাগ। মুখ থেকেও দুর্গন্ধ আসছে। একে আবার সাইকায়াট্রিস্টের কাছে নিয়ে যেতেই হবে। রেজাল্ট দেখার পরে আজই রিপুদার সঙ্গে কথা বলবে অভি।
আপাতত বিলুকে ম্যানেজ করা যাক। অভি বলল, ‘মাকে বলব না। বল, কী কথা?’
‘চন্দনের একটা দাদা আছে। নাম নন্দন…’ বিড়বিড় করে বলে বিলু।
‘হ্যাঁ। বামন। আমাদের বাড়ি একবার এসেছিল।’
‘আর কথা নয়। আমার সঙ্গে চুপিচুপি আয়। সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় আওয়াজ করবি না!’
.
দোতলার ল্যান্ডিং-এ দাঁড়িয়ে অভি বলল, ‘কেস জমে দই! মানদা আর নন্দনের “পেয়ার ইশ্ক অওর মহব্বত” কদ্দিন ধরে চলিতং?’
‘আমাদের বাড়িতে আসার দিনই ফিটিং হয়ে গিয়েছিল। তারপর থেকে প্রতি সপ্তাহে একবার আসে। তোর প্র্যাকটিকাল পরীক্ষার মধ্যেও এসেছে। বাবা নেই, মা রান্না নিয়ে ব্যস্ত। ওই ফাঁকে ঘণ্টা তিন-চার কাটিয়ে যায়। রাধাদি ওদের গার্ড দেয়।’
‘ভালো তো!’ খুক খুক করে হাসে অভি। ‘দু’জনেরই হিল্লে হল।’
‘তা হল। তবে ওরা কিছু করার আগে বাবামাকে জানানো উচিত। তা না হলে মা খচে ফায়ার হয়ে যাবে। রাধাদি আর মানদাপিসিকে বাড়ি থেকে বারও করে দিতে পারে।’
‘মনে হয় না।’ বিলুর হাত ধরে খাবার টেবিলে বসিয়ে অভি বলে, ‘তুই বোস। আমি ওপর থেকে প্যান্টশার্ট পরে আসি।’
অরুণা রান্না করতে করতে বললেন, ‘তোরা দু’জনে মিলে সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে কী গুজুরগুজুর করছিলি রে? অনেকক্ষণ কোনও সাড়াশব্দ পাইনি!’
‘কিছু না। এমনিই।’ আজ সকাল পড়তে পড়তে বলে বিলু।
‘তোর কী হয়েছে বলতো? অন্যদিন তো ঘর থেকে বেরোস না। ঘরে খাবার দিয়ে আসতে হয়। আজ নিজের থেকেই খেতে এলি! তার ওপরে খবরের কাগজ পড়ছিস! এতদিন তো কাগজ আর টিভির থেকে একশো হাত দূরে থাকতিস।’
‘আজকে স্পেশাল দিন।’ হালকা হাসে বিলু। অভি এর মধ্যে তিনতলা থেকে পোশাক পরে নেমে এসেছে। চেয়ারে বসে বলল, ‘মা, খেতে দাও। হ্যাঁরে দাদা, আজ স্পেশাল দিন কেন? আমার রেজাল্ট বেরোচ্ছে বলে? তোর চিন্তা নেই। আমি এবারও সাপ্লি খাচ্ছি। ফার্মাকোলজির থিয়োরি পরীক্ষা খুব বাজে দিয়েছি। কেউ আমাকে পাশ করাতে পারবে না।’
অরুণা অভির সামনে ভাতের থালা আর বিলুর সামনে জলখাবারের থালা রেখে বললেন, ‘দু’জনে খেয়ে আমায় উদ্ধার করো। আজ তোমাদের বাবা অফিস যাবে না। ব্যাংক আর পোস্টাপিসে কী সব কাজ আছে, সেইসব সারবে। আমি কিন্তু এরপর পুজো নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ব। দুপুর দুটোর আগে সময় পাব না।’
‘দাও। খেয়েই নি।’ আড়মোড়া ভাঙে বিলু। অভি আড়চোখে বিলুর দিকে তাকায়। আজ বিলুকে অন্যরকম লাগছে। হাসিখুশি। চঞ্চল। বিষাদহীন। কী ব্যাপার কে জানে!
মুচকি হেসে বিলু অরুণাকে বলল, ‘মা, তোমাকে একটা রিকোয়েস্ট করব। রাখবে?’ অভির পাত থেকে একচামচ ডালভাত মুখে দিয়ে বলল, ‘আজ ডালে হিং দিয়েছ?’
‘হ্যাঁ। দুপুরে খেও। কী রিকোয়েস্ট শুনি। আগে থেকে সবটা না শুনে আমি “হ্যাঁ” বলব না।’
‘আগে থেকে সবটা না শুনেই তোমাকে “হ্যাঁ” বলতে হবে। আমি আর কখনও তোমাকে রিকোয়েস্ট করব না। প্লিজ মা!’
‘বলো!’ অরুণা সন্দেহজনক চোখে বিলুর দিকে তাকালেন।
‘মানদাদির জন্য আমি আর অভি একটা পাত্র দেখেছি। তুমি আর…’
‘থাক!’ ঝঙ্কার দিয়ে ওঠেন অরুণা। ‘সব ব্যাপারে তোমাদের মাথা না ঘামালেও চলবে। ডাক্তারি ছেড়ে দিয়ে ঘটকালি করতে যেও না। কাজের লোকেদের বেশি লাই দিতে নেই।’
অভির খাওয়া শেষ। সে বেসিনে মুখ ধুয়ে ন্যাপস্যাক কাঁধে ঝুলিয়ে দুদ্দাড়িয়ে দৌড় দিল। ট্রেন আর পনেরো মিনিট বাদে। সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে শুনল, রাধাপাগলি মানদাকে বলছে, ‘আগুনের গন্ধ পাচ্ছিস? ঝলসানো মাংসর গন্ধ? আমি পাচ্ছি। আজকের দিনটা ভালো না।’
.
দিনটা যে ভালো না, সেটা অভি কলেজে গিয়ে বুঝল। ফরেনসিক মেডিসিন এবং ফার্মাকোলজি—দুটো সাবজেক্টে ফেল করেছে সে। নোটিশ বোর্ডে রেজাল্ট ঝুলিয়ে চলে গেছেন প্যাথলজির রিনা ম্যাডাম, ফার্মাকোলজির ডক্টর মুখার্জি, কমিউনিটি মেডিসিনের নিরোধ স্যার আর ফরেনসিক মেডিসিনের রেপ স্যার।
এবারে ফেলের হার পনেরো শতাংশ। সুরজ, সঞ্জয়, সবুজ, প্রবাল, জেম্সি, সাবিনা—সবাই ফরেনসিক মেডিসিনে সাপ্লি খেয়েছে। ফার্মায় ঝাড় খেয়েছে পুরো ক্লাসের মধ্যে অভি একা।
ফরেনসিক মেডিসিনের ফেলটা যেহেতু ছাত্রছাত্রীদের হাতে ছিল না, তাই এ নিয়ে তাদের কোনও গিলটি ফিলিং নেই। জীবনদার ক্যান্টিনে মোচা আর ন্যাবা পার্টির সবাই বসে আছে। টেবিল থাবড়ে গান গাইছে সুরজ, ‘পাপা কহতে হ্যায় বড়া নাম করেগা। বেটা হমারা অ্যায়সা কাম করেগা। মগর ইয়ে তো কোই না জানে কে মেরে মঞ্জিল হ্যায় কাঁহা।’
মঞ্জিল শব্দটা নিয়ে নিশ্চিত হয়ে পড়ল অভি। বাংলায় ছেলেদের নাম হয় মঞ্জিল। ‘মঞ্জিল’ নামে হিন্দি সিনেমা আছে। হিন্দি গানে মঞ্জিলের ছড়াছড়ি। শব্দটা উর্দু না হিন্দি কে জানে!
‘ফার্মায় ঝাড় খেলে বস! ক্যালি আছে!’ সুরজ দু’হাত তুলে অভিকে নমস্কার করে।
‘একটু খুরের ধুলো দিও বস। বাটিতে রেখে দেব।’ আওয়াজ দেয় সঞ্জয়।
‘দেড়শো জনের মধ্যে একমাত্র তোরই দুটো সাবজেক্টে সাপ্লি। ইসকা রাজ কেয়া হ্যায়?’ অভির মুখের সামনে কাল্পনিক বুম এগিয়ে দিয়ে ইন্টারভিউ নিচ্ছে সবুজ। মাথায় থাবড়া মেরে তাকে থামিয়ে দিয়ে জেম্সি বলল, ‘বোস অভি। চা খা।’
জীবনদা সবার জন্য চা আর পুঁচকে সিঙাড়া দিয়ে গেল। একটা তুলে নিয়ে ফুঁ দিতে দিতে প্রবাল বলল, ‘আসলে অভির অনেক প্রবলেম আছে।’
‘জ্যায়সে কি…’ চায়ে চুমুক দিয়ে জানতে চাইল সাবিনা।
‘এক নম্বর প্রেমে লেঙ্গি।’
‘দ্যাটস হিসট্রি বস! দ্যাট্স… বাংলায় কী যেন বলে…প্রাগৈতিহাসিক। বৃন্দা এখন চন্দনকে বগলে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মিঞা-বিবি ধামাকাদার রেজাল্ট করেছে। চন্দন ফার্মাকোলজি ছাড়া বাকি সাবজেক্টে হায়েস্ট নম্বর পেয়েছে।’ সবুজ সবাইকে জানায়, ‘আর বৃন্দা হায়েস্ট পেয়েছে ফার্মায়। একদম ‘মেড ফর ইচ আদার’।’
‘আমাকে সবটা বলতে দে।’ প্রবাল সবুজের মুখ চেপে ধরে। ‘আমরা অভিকে নিয়ে ডিসকাস করছি। বিসিকে নিয়ে নয়।’
‘বি–সি মানে তো…’ সাবিনা অবাক হয়ে বলে।
‘বি-সি মানে বৃন্দা-চন্দন। কলেজের হট অ্যান্ড হ্যাপেনিং জোড়ির নাম আমি দিয়েছি বিসি।’ সগর্বে সবুজ সবাইকে জানায়।
‘এনাফ ইজ এনাফ। আমি কিছু বলছিলাম।’ প্লেট থেকে সবক’টা সিঙাড়া তুলে নিয়ে জানায় প্রবাল। বিসি ছেড়ে দিয়ে এ-তে আয়। এ ফর অভি। অভির প্রবলেমগুলো বোঝ। এক নম্বর প্রেমে লেঙ্গি। দু’নম্বর বিরহের কারণে পড়াশুনো ডকে উঠেছে। তিন নম্বর, বাড়িতে বাওয়াল। ফলে পরপর দুটো এমবিবিএস-এ সাপ্লি।’
অভি মাথা নীচু করে বসেছিল। বিরক্ত হয়ে বলল, ‘বাড়িতে বাওয়াল মানে? আমার বাড়ির খবর তুই কী করে জানলি?’
‘কাগজ বলছে বস!’ আজ সকাল কাগজটা নাড়ে প্রবাল। ‘এই দ্যাখো। চতুর্থ পৃষ্ঠায় লিখেছে, “জমি অধিগ্রহণ বিরোধী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে যৌথ বাহিনীর হাতে ডাক্তারি ছাত্র সব্যসাচী সেনের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গ যখন উত্তাল, তখন মুখ্যমন্ত্রী সন্দীপ সামন্ত জানিয়েছেন, রাষ্ট্রদ্রোহী কার্যকলাপের জন্য আর এক ডাক্তারি ছাত্রকে খুঁজছে পুলিশ। ইন্ডিয়ান মেডিকাল কলেজের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র অনাবিল লাহিড়ীকে খুব শীঘ্রই জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হবে।”’
‘দাদা?’ আঁতকে ওঠে অভি। একলাফে ক্যান্টিন থেকে ছিটকে বেরোয়। সকালে বাড়ি থেকে বেরোনোর আগে সে কাগজ দেখে বেরোয়নি। আজ সকালে কাগজটা বিলু পড়ছিল না? অন্যদিন তো কাগজ ছুঁয়েও দেখে না। নিজের মোবাইল থেকে বিলুর মোবাইলে ফোন করতে গিয়ে অভির মনে পড়ে বিলু মোবাইল ব্যবহার করা বন্ধ করে দিয়েছে। ছকটা আর একটু ক্লিয়ার হয় অভির কাছে। হায় রে! কেন সে এতদিন বুঝতে পারেনি!
.
সকালে উঠে আজ সকাল-এর চারের পাতা দেখে নিয়ে কাগজটা নিজের ঘরে লুকিয়ে রেখেছিল বিলু। মনোজ অফিস যাওয়ার আগে চেয়েছিল। দেয়নি। পুলিশি জেরার কথা সে আগেই জানত। আইপিপির এক কমরেড গতকাল দুপুরবেলা বাড়িতে এসে জানিয়ে গিয়েছিল। আজকের কাগজে যে এটা নিউজ হবে এটা বিলু আন্দাজ করেছিল। গতকাল রাতে দময়ন্তীর সঙ্গে কথা বলার পরেই ডিসিশান নিয়েছে বিলু। সব যখন শেষ হয়ে গেছে, তখন ব্যাপারটাকে নিজের মতো সাজানো থাক। জীবনের শেষ ক’ঘণ্টা শান্তিতে থাকতে চায় বিলু।
অভি বেরিয়ে যাওয়ার পরে বাথরুমে ঢুকে দাড়ি কামালো। চুলে শ্যাম্পু দিল। অল্প কন্ডিশনার দিল। সাত দিনের বাসি টিশার্ট আর বারমুডা কেচে ছাদে মেলে দিল। নিজের যাবতীয় জামাপ্যান্ট চিলেকোঠায় অভির ঘরের খাটে সাজিয়ে রাখল। একবার ভেবেছিল ডাক্তারি বই আর অন্যান্য বইও ওখানেই রেখে আসবে। পরে মনে হল, কী দরকার। ক’দিন পর থেকে অভি তো এই ঘরেই থাকবে। বেচারি ছাদের ঘরে এতদিন কাটাল। এবার একটা ভালো ঘর পাবে। ঘরটা ভালো করে ঝাড়পোঁছ করল। দীর্ঘদিন ঝাঁট পড়েনি। কিলোখানেক নোংরা বেরোল।
মনোজ দেরি করে ঘুম থেকে উঠেছেন। বেলা বারোটা নাগাদ জলখাবার খেতে বসে সদ্যস্নাত এবং ক্লিন শেভ্ড বিলুকে দেখে বললেন, ‘অনেকদিন বাদে মানুষের ছানার মতো দেখাচ্ছে।’
একগাল হেসে বিলু বলল, ‘অ্যাদ্দিন কীসের মতো লাগছিল?’
বিলুর মুখে হাসি দেখে মনোজও খুশ। তিনি বললেন, ‘পান্তভূতের জ্যান্তছানার মতো। পরীক্ষার প্রিপারেশান কেমন চলছে? পড়াশুনো করছিস না নকশালদের ম্যানিফেস্টো মুখস্থ করিস? চব্বিশ ঘণ্টা দরজা জানলা বন্ধ করে ঘরে বসে কী যে করিস, কে জানে!’
‘আজ সব দরজা জানলা খুলে দিলাম।’ স্মিত হেসে বলে বিলু। মনোজের সঙ্গে লক্ষ্মী নিবাসের গেট পর্যন্ত আসে। মনোজ বাঁকের মুখে মিলিয়ে যাওয়ার পরে দোতলায় না গিয়ে মানদার ঘরে খুটখুট করে কড়া নাড়ে। যে ঘরে একটু আগে পর্যন্ত ফিসফিস করে কথা শোনা যাচ্ছিল, সেই ঘরে এখন ঝিম ধরা নৈঃশব্দ্য। উল্টো দিকের ঘর থেকে রাধা বেরিয়ে এসে বলল, ‘কেন বিরক্ত করছ? তুমি তো নিজেকে গুছিয়ে নিয়েছ। বাকিদেরও সুযোগ দাও।’
বিলু মৃদু হেসে মানদাকে বলল, ‘মাকে বলেছি মানদা পিসি আর চন্দনের বিয়ের কথা। খুব রাগারাগি করছে। তবে মেনে নেবে বলে মনে হয়।’
রাধা কপালে হাত ঠেকিয়ে বলল, ‘তুমি ঈশ্বরের মঙ্গল করলে। ঈশ্বরও তোমার মঙ্গল করুন। দুগ্গা, দুগ্গা।’
দু’জনের কথোপকথনের মধ্যে রাধার ঘরের দরজা খুলে গেছে। দরজার আড়াল থেকে মুখ বার করে নন্দন বলল, ‘হাই বস!’
‘চালিয়ে যাও বস।’ নন্দনকে বলে বিলু, ‘আমি আর অভি তোমার পাশে আছি। বাড়িতে বিয়ের কথা পাড়ব নাকি?’
মানদা বলল, ‘ওদের একটা কথাও বিশ্বাস কোরো না। ওরা হল ঘরজ্বালানি পরভোলানি।’
নন্দন জিভ কাটল। তাকে ঘরে ঢুকিয়ে দিয়ে বাইরে থেকে ছিটকিনি লাগিয়ে রাধাকে বিলু বলে, ‘তুমি বাজার থেকে তোমার দোক্তা নিয়ে এসো। আমি পাহারায় রইলাম।’
রাধা ভুরু কুঁচকে বিলুকে মাপল। বলল, ‘তোমার মা কি আজ মাংস রান্না করতে গিয়ে পুড়িয়ে ফেলল?’
‘আজ মাংস হয়নি তো!’ বিলু অবাক।
রাধাও অবাক চোখে বিলুর দিকে তাকিয়ে রইল। দৃষ্টি অবশেষে বদলে গেল বিষণ্ণতায়। ম্লান হেসে সে বলল, ‘দেখা হবে!’ তারপর ধীর পদক্ষেপে লক্ষ্মী নিবাস থেকে বেরোল।
রাধা বেরিয়ে যাওয়ার পরে বিলু গেট বন্ধ করে ওপরে এল। দোতলার ল্যান্ডলাইন বাজছে। অরুণা ফোন ধরতে যাচ্ছিল। বিলু বলল, ‘এটা আমার ফোন।’
‘কী করে জানলি?’ অরুণা অবাক, ‘মোবাইলটা হারিয়ে ফেলার পরে কখনও তো শুনলাম না যে ল্যান্ডলাইনে তোর ফোন এসেছে।’
‘এটা আমারই ফোন।’ আবার বলল বিলু। রিসিভার কানে দিয়ে বলল, ‘হ্যালো।’
‘অনাবিল লাহিড়ীর সঙ্গে কথা বলতে চাই।’
‘কে বলছেন?’
‘আমি কি অনাবিল লাহিড়ীর সঙ্গে কথা বলছি?’
‘আপনি কে বলছেন?’
ও প্রান্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে কেটে কেটে বলে, ‘আমি স্পেশাল ব্রাঞ্চের অফিসার বাদশা ঘোষ বলছি।’
যাক! সব কিছু ভালোয় ভালোয় মিটছে। মন প্রশান্ত হয়ে আসে বিলুর। এতদিনের অশান্তি, এত দিনের দোলাচল, এত দিনের টানাপোড়েন, এতদিনের চোরপুলিশ খেলা আজ শেষ হচ্ছে। এটাই ভবিতব্য ছিল। বিলু বলে, ‘আমি অনাবিল লাহিড়ী বলছি। আপনি কেন ফোন করেছেন জানতে পারি?’
‘বাঁজাপলাশ গ্রামের গন্ডগোল নিয়ে আমরা আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাই। ফোন কাটবেন না। প্লিজ ফোন কাটবেন না। একটা কথা শুনে রাখুন। সাদা পোশাকের পুলিশ এই মুহূর্তে আপনার বাড়ি ঘিরে আছে। আপনি পালাবার চেষ্টা করবেন না। কোনও হঠকারী সিদ্ধান্ত নেবেন না।’
‘আমি পালাব না।’
‘আপনি ভদ্রঘরের ছেলে। আমরাও যথেষ্ট সংবেদনশীল। একটা সাদা অ্যাম্বাসাডার নিয়ে আমিই আসছি। আপনাকে ভবানী ভবনে নিয়ে গিয়ে সামান্য দু’একটা ক্ল্যারিফিকেশান নিয়ে ছেড়ে দেব। কোনও প্রবলেম নেই তো?’
‘না।’
ফোন কেটে গেল। ক্রেড্লে রিসিভার রেখে বিলু দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বাদশা ঘোষ! গতকাল যে কমরেড বাড়িতে এসেছিলেন, তিনি বলে গেছেন যে বাদশা ঘোষ স্পেশাল ব্রাঞ্চের অফিসার। রাষ্ট্রবিরোধী রাজনৈতিক দলের কার্যকলাপ নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করছেন। গ্রেফতার হওয়া আইপিপি সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করার ব্যাপারে বিশেষ পারদর্শী। সেইসব সদস্যরা কেউই আর বেঁচে নেই। এসব ঘটনা এত তুচ্ছ যে খবরের কাগজে স্থান পায় না। পরশু যদি কাগজে বেরোয় যে সোনাগাছির রাস্তায় বিলুর মৃতদেহ পাওয়া গেছে, তবে তার সঙ্গে আজকের খবরের কাগজে প্রকাশিত ‘ডাক্তারি ছাত্রকে জিজ্ঞাসাবাদ’ হেডলাইনকে কেউ মিলিয়ে দেখবে না।
বিলু জানলা দিয়ে রাস্তার দিকে তাকাল। অন্যদিন পঞ্চপাণ্ডব সামনের রোয়াক ছেড়ে নড়ে না। আজ তারা নেই। একটা ঝালমুড়িওয়ালা আর একটা ট্যাক্সি ছাড়া গোটা রাস্তায় কেউ নেই। এই ঝালমুড়িওয়ালা আর ট্যাক্সি ড্রাইভারকে কোনও দিনও ভরদুপুরে পাড়ায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেনি বিলু। আজ সকাল থেকেই রয়েছে।
নিজের ঘরে গেল বিলু।
.
এজেসি রোডে পৌঁছে প্রথম যে ট্যাক্সিটা দেখতে পেল অভি, তাকেই বলল, ‘ডানলপ যাবেন?’ এর আগে অভি কোনও দিনও ট্যাক্সিতে বাড়ি ফেরেনি। আজই প্রথম।
‘যাব।’ মিটার ডাউন করে ট্যাক্সিওয়ালা। বাড়ির ল্যান্ডলাইনে ফোন করে অভি। রিং হচ্ছে…
‘হ্যালো?’ অনেক দূর থেকে বিলুর কণ্ঠস্বর ভেসে আসে।
‘দাদা! তুই কী করছিস?’ অভি চিৎকার করে ওঠে। বিলু উত্তর দিচ্ছে না। অভি আবার চিৎকার করে, ‘দাদা, মাকে ফোনটা দে। দাদা, মাকে ফোনটা দে…’ বার পাঁচেক বলার পরে সে বুঝতে পারে রিসিভার ক্রেডল থেকে নামিয়ে বিলু চলে গেছে। ফোনে পারিপার্শ্বিকের আওয়াজ আসছে। পাখির ডাক, কুকারের সিটি, আসবাব ঠেলার ঘড়ঘড়, অরুণার বকবকানি…
অরুণার বকবকানি? মা তার মানে ফোনের আশেপাশেই রয়েছে? ফুসফুসের সমস্ত বাতাস একত্রিত করে অভি চ্যাঁচাল, ‘মা! ও মা! শুনতে পাচ্ছ?’
ড্রাইভার বিরক্ত হয়ে বলল, ‘উরেব্বাস! আর এট্টু জোরে চ্যাঁচান ভাইডি! তাহলেই শুনতে পাবে!’
.
দোতলায় নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে বিলু টেবিল ঘাঁটাঘাঁটি করছে। হাতে উঠে এল শঙ্খ ঘোষের শ্রেষ্ঠ কবিতা। কয়েক বছর আগে সে অভিকে কবিতা পড়া শিখিয়েছিল। যে কবির লেখা পড়ে অভি কবিতার উপমহাদেশে প্রবেশ করেছিল, তাঁর নাম শঙ্খ ঘোষ। এই বইয়ের সমস্ত কবিতা একসময় বিলুর মুখস্থ ছিল। আজও কি আছে? গ্রন্থটি গীতাজ্ঞানে স্পর্শ করে, চোখ বন্ধ করে মন্ত্রোচ্চারণ করে বিলু,
‘ময়দান ভারী হয়ে নামে কুয়াশায়
দিগন্তের দিকে মিলিয়ে যায় রুটমার্চ
তার মাঝখানে পথে প’ড়ে আছে ও কি কৃষ্ণচূড়া?
নিচু হয়ে ব’সে হাতে তুলে নিই
তোমার ছিন্নশির, তিমির।’
.
বিলুর চোখ দিয়ে জল পড়ছে। মনে আছে। সব মনে আছে। বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের শ্রেষ্ঠ কবিতা স্পর্শ করে সে আবৃত্তি করে,
‘কোথাও মানুষ ভালো রয়ে গেছে ব’লে
আজও তার নিঃশ্বাসের বাতাস নির্মল;
যদিও উজীর কাজি, শহর কোটাল
ছড়ায় বিষাক্ত ধুলো, ঘোলা করে জল
তথাপি মানুষ আজও শিশুকে দেখলে
নম্র হয়, জননীর কোলে মাথা রাখে,
উপোসেও রমণীকে বুকে টানে; কারও
সাধ্য নেই একেবারে নষ্ট করে তাকে।’
.
সব থেকে যাবে। বাবা, মা, তাদের ঝগড়া। একদিন নিশ্চয়ই ওদের মধ্যে মিলমিশ হবে। থেকে যাবে অভি, অভির কবিতা, অভির বিরহ। ছোট ভাইটা একদিন মস্ত কবি হবে। বিরহ কেটে গিয়ে আসবে নতুন প্রেম। পুরোনো প্রেমও নতুন চেহারায় ফিরে আসতে পারে। মানদার সঙ্গে নন্দনের বিয়ে হবে কি? কে জানে! রাধাদি নিশ্চয়ই ওদের হয়ে গলা ফাটাবে। রিপু, আপ্পু, সুব্রত, বান্টি, টিনটিন—এরা ফাইনাল এমবিবিএস দেবে। পাশ করে বেরোবে। ডাক্তার হবে।
আর দময়ন্তী?
চশমাপরা, আধপাগলি, সিরিয়াস টাইপের মেয়েটা? ওরও ভালো হোক। গোপালদা, আপনারও ভালো হোক। বাঁজাপলাশ গ্রামের বন্ধুরা, তোমাদেরও ভালো হোক। আমাকে তোমরা ছেড়ে দাও। আমি পারলাম না। আমি হেরে গেলাম।
কলিং বেল বাজল। বাদশা ঘোষ চলে এসেছেন। টিশার্টের হাতায় চোখ মোছে বিলু। পড়ার টেবিলের ড্রয়ার থেকে বার করে আনে মুঙ্গেরি ওয়ান শটার। গতকাল কমরেড দিয়ে গেছেন। বিছানায় শুয়ে চোখ বন্ধ করে ডান হাতে অস্ত্র নিয়ে তর্জনী দিয়ে ঘোড়া স্পর্শ করে! ঘোড়ায় আঙুল রেখে ডান রগে নল ঠেকায়।
নলটা কী ঠান্ডা! মারা যাওয়ার আগে এটাই ছিল বিলুর শেষ অনুভূতি। গুলি চলার আওয়াজ সে শুনতে পায়নি। কোনও যন্ত্রণাও হয়নি। তার আগেই ঘিলু ছ্যাতরা ভ্যাতরা হয়ে গিয়েছিল। বিকট শব্দে চমকে উঠেছিলেন অরুণা। অবাক হয়ে দেখেছিলেন, সিঁড়ি দিয়ে লাফাতে লাফাতে উঠে আসছে ছ’ফুটের বেশি লম্বা, কালো একটা লোক। অরুণাকে সরিয়ে বিলুর ঘরের বন্ধ দরজা এক লাথিতে ভেঙে দিয়েছিলেন। অরুণার দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, ‘বাদশা ঘোষ, স্পেশাল ব্রাঞ্চ।’
অরুণা কিছু শোনেননি। পা টিপে টিপে বিলুর ঘরে উঁকি মেরেছিলেন। দেখেছিলেন, খাটে শুয়ে থাকা বিলুর মাথা থ্যাঁতলানো তরমুজের মতো হয়ে গেছে। অরুণা অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন।
ঠিক তখনই পঞ্চপাণ্ডব ফিরে এসেছে উল্টোদিকের রোয়াকে। ঝালমুড়িওয়ালা আর ট্যাক্সিওয়ালা গায়েব হয়ে গেছে। লক্ষ্মী নিবাসের গেট খুলে দৌড়ে ঢুকছে অভি। দোক্তা কিনে ফিরে আসছে রাধা। রাধা অভিকে বলল, ‘দিনটা ভালো নয়। মাংস পোড়ার গন্ধ বেরোচ্ছে।’
.
পোস্টমর্টেম হয়ে যাওয়ার পরে বিলুর বডি আর লক্ষ্মী নিবাসে ফেরত আনা হয়নি। বালি বাজারের বার্নিং ঘাটে নিয়ে যাওয়া হল। বাদশা যথেষ্ট সাহায্য করেছেন। বালি থানায় নিজেই ফোন করলেন যাতে ইনকোয়েস্ট রিপোর্ট তাড়াতাড়ি হয়ে যায়। ডক্টর পট্টনায়েক উত্তরপাড়া হাসপাতালের সুপারকে ফোন করে বলে দিলেন যাতে ওই হাসপাতালের ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ তাড়াতাড়ি পোস্টমর্টেম করে দেন। অভির ফোন পেয়ে মনোজ ব্যাঙ্কের কাজ ফেলে দৌড়ে বাড়ি এসেছেন। প্রাথমিক ভাবে ভেঙে পড়লেও নিজেকে সামলে নিয়েছেন মনোজ। এখন গঙ্গার ধারে বসে বাদশার সঙ্গে নীচু গলায় কথা বলছেন। বাদশা মনোজকে পরামর্শ দিচ্ছেন, প্রেসের সামনে মুখ না খোলার জন্য।
গঙ্গার দিকে তাকিয়ে অভি বসেছিল। মাথা কাজ করছে না। আজ সকালে সে দুটো সাবজেক্টে সাপ্লি পেয়েছে, এ নিয়ে কোনও অনুভূতি নেই। দাদাটা মরে গেল, এ নিয়েও কোন ফিলিংস হচ্ছে না। বাড়িতে পুলিশ ঢুকল, পাড়ার লোকের সামনে গুলি খাওয়া লাশ বেরোল—অভির হেলদোল নেই। অরুণাকে রাধাদির জিম্মায় রেখে আসা হয়েছে। অরুণা ক্রমাগত হেঁচকি তুলছেন, কাঁদছেন, বুক চাপড়াচ্ছেন আর অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছেন। চন্দনরা কলেজ থেকে আসছে ট্যাক্সি নিয়ে। ওরা এলে মাকে ঘুমের ইঞ্জেকশান দিতে হবে। মানদা একটা কাজের কাজ করেছে। এই গন্ডগোলের মধ্যে নন্দনকে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে। চন্দনের সঙ্গে নন্দনের এখানে দেখা হয়ে গেলে খুব বাজে ব্যাপার হত।
চন্দনের কথা ভাবতে না ভাবতেই বৃন্দা ছাড়া অভির ব্যাচের বন্ধুরা সব্বাই হাজির। সবাই মিলে অভিকে ঘিরে ধরে জানতে চাইল, কী ঘটেছে। অভি কোনও কথা বলার আগে বাদশা আর মনোজ ওদের দিকে এগিয়ে এলেন। চন্দনকে দেখে বাদশা বলল, ‘ভালো?’
‘হ্যাঁ।’ সম্মতির ঘাড় নাড়ল চন্দন।
দময়ন্তী চন্দনের হাত ধরে দাঁড়িয়েছিল। মনোজকে দেখে বলল, ‘আপনিই অভির বাবা? আপনাকে তো অনেকবার আমাদের বাড়ির একতলায় দেখেছি।’
‘কোথায়?’ মনোজ অবাক।
দময়ন্তী বলল, ‘ঋষিতার অফিসে। আপনি ওখানে নিয়মিত ডিটিপি করাতে যান।’
.
