হৃদয়ের নৈঃশব্দ্য – ৩৪

৩৪. বৃন্দা

‘এই নে!’ মনোতোষ বিপিনের দিকে একটা চেক এগিয়ে দিলেন। হাসি মুখে চেকের কোনা ধরে বিপিন বলল, ‘চি-ই-ই-জ!’ মন্দিরা পটাপট গোটাদশেক ছবি তুললেন। ছবি তোলা পর্ব শেষ হতে চেকটা দেখলেন বিপিন। নাক সিঁটকে বললেন, ‘মাত্র এক লাখ টাকা? ফিলিম লাইনের লোকেরা এত ছ্যাঁচড়া হয় কেন রে?’

মন্দিরার হাত থেকে ক্যামেরা নিয়ে ন্যাপস্যাকে ভরে মনোতোষ বললেন, ‘লেখককে তাঁর উপন্যাসের চলচ্চিত্রায়ণের জন্য পরিচালক সাইনিং অ্যামাউন্ট হিসেবে এক লাখ দিচ্ছেন, যেটা মূল সম্মান দক্ষিণার টেন পারসেন্ট। টালিগঞ্জে গোয়েন্দা লাগালেও এই উদারতা খুঁজে পাবি না।’

‘তার মানে তুই বলতে চাইছিস যে উপন্যাসের ফিল্ম রাইট বিক্রির জন্য লেখকরা দশ লাখ টাকা পায় না?’ বিপিন জানতে চান।

‘কেঁদে ককিয়ে একলাখ টাকা দেয়। সাইনিং অ্যামাউন্ট তার টেন পারসেন্ট। অর্থাৎ দশ হাজার টাকা। তোর কপাল ভালো যে মায়াকম আবার আমার ছবি প্রোডিউস করছে।’

‘না করে শালারা যাবে কোথায়? একটা ছবিতেই বাজার কেঁপে গেছে। ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ডের ছড়াছড়ি। কী বলো মন্দিরা?’

মন্দিরা বললেন, ‘আচ্ছা, ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড পেয়ে আপনাদের কোনও লাভ হয়েছে? কোনও নতুন অফার এসেছে?’

‘আমার এসেছে।’ হাত তোলেন বিপিন। ‘মুম্বইয়ের একতা কাপুরের প্রোডাকশান হাউস থেকে আমাকে একটা মেগা লেখার অফার দিয়েছে। বাঙালি পরিবারের তিন প্রজন্মের গপ্‌পো। প্রি পার্টিশান এরা শুরু হয়ে গেছে এখন শেষ হচ্ছে।’

‘অফারটা নিয়েছিস নাকি?’

‘হ্যাঁ মুম্বইতে মান নেই। তবে মানি আছে। তুই আমাকে এখন যে টাকাটা দিলি ওটা আমার দু’সপ্তাহের রোজগার।’

‘মাসে দু’লাখ? ঘরে বসে?’ মন্দিরা অবাক।

‘হ্যাঁ ম্যাডাম। ঘরে বসে। আমি গপ্পো এমএস ওয়ার্ডে লিখে মেল করে দিই। ওরা কাটাকুটি করে, নতুন ফিডব্যাক দিয়ে সেই লেখা ফেরত পাঠায়। আমি ফিডব্যাকের ওপরে ভিত্তি করে আবার লিখি। আবার মেল করি। ওদের সঙ্গে মিটিং করার জন্য মাসে একবার মুম্বই যেতে হয়। এয়ার ফেয়ার ওরাই দেয়।’

‘কী নাম সিরিয়ালটার?’

‘হর পল। তিনমাসের মতো এপিসোড-ব্যাংক রেডি হয়ে আছে। আগামী মাস থেকে শুরু হবে।’

‘আর কোনও অফার?’

‘ওফ! এতেই পাগল পাগল অবস্থা। রোজ সকাল পৌনে সাতটার সময় অ্যালার্ম শুনে ঘুম থেকে উঠি। সাতটা থেকে ন’টা পর্যন্ত লিখি। তারপর অফিস। অফিসে মাথা তোলার সময় পাইনা। বাড়ি ফিরে সাতটা থেকে দশটা পর্যন্ত এডিট করি। দশটার সময় মেল করে দিই। তারপর আমি মুক্ত বিহঙ্গ।’

‘স্যামির চেম্বারে আমাদের নো এন্ট্রি। অত রাতে বার খোলা পাওয়া মুশকিল।’ দুঃখের সঙ্গে বলেন মনোতোষ।

‘তোর নতুন ছবির স্ক্রিপ্ট আমাকে দিয়ে করাচ্ছিস। সামনের বছরের পুজোর লেখার চাপ আছে। মদ কখন খাব বল তো?’ আফশোস করেন বিপিন।

মন্দিরা মদ্যপান সংক্রান্ত আলোচনায় অংশগ্রহণ করেননি। এবার বললেন, ‘আপনার গত উপন্যাসটাও খুব ভালো। মহিলা ক্রিমিনাল সাইকোলজিস্ট নিয়ে বাংলায় কোনও ফিকশান আমি পড়িনি। ইংরিজিতে আছে। সায়লেন্স অব দ্য ল্যাম্ব।’

‘আহা! ওটা ক্রাইম থ্রিলার! এটা অন্য জঁর। যেখানে ক্রিমিনাল একজন ব্ল্যাক ম্যাজিশিয়ান। তাকে স্টাডি করতে গিয়ে এই সাইকোলজিস্ট নিজেই খেলার পুতুল হয়ে যাচ্ছে।’ আপত্তি করেন বিপিন।

‘মন্দিরা, তোমাকে ক্রিমিনাল সাইকোলজিস্টের রোলে মানাবে। আবার ব্ল্যাক ম্যাজিশিয়ানের রোলটাও একদম ফিট। কোনটা করবে?’ বলেন মনোতোষ।

‘আপনি কি আর আমার অনুরোধ রাখবেন? অলরেডি কাস্টিং সেরে ফেলেছেন হয়তো।’

‘আহা! তুমি বলো না!’

‘ক্রিমিনাল সাইকলজিস্টের রোলে আমাকে মানাবে না। ব্ল্যাক ম্যাজিশিয়ানের রোলটা আমার চাই।’

‘আমি এই রোলটার জন্যই তোমাকে ভেবেছি। গত শতকের বিধবা থেকে আধুনিক কলকাতার কালাযাদু চর্চাকারী। চমৎকার ভ্যারিয়েশান। ক্রিমিনাল সাইকোলজিস্টের রোলে তোমার থেকে বছর দশেকের ছোট একটা মেয়ের দরকার ছিল। থিয়েটার বা টেলিভিশনের কাউকে দেখতে হবে। ফ্রেশ ফেস চাই।’

‘বৃন্দাকে নিতে পারিস তো!’ ক্যাজুয়ালি বলেন বিপিন। মনোতোষ চমকে উঠে বলেন, ‘খারাপ বলিসনি। ওর মধ্যে একটা ভারজিনাল লুক আছে। আর একটু ওয়েট গেইন করালে বয়সটা সামান্য বেশি লাগবে। তোর গল্পে আছে মেয়েটা পাঁচ বছর ধরে ক্রিমিনাল সাইকোলজি প্র্যাকটিস করছে। আমি করে দেব ফ্রেশ আউট অব দ্য কলেজ। তাহলে ক্যারাকটারটার র-নেস ভালো ফুটবে। ডাক তো মেয়েটাকে। বৃন্দা, এই বৃন্দা।’

মন্দিরা অবাক হয়ে বললেন, ‘আচ্ছা, আমার মেয়েকে নিয়ে কথা হচ্ছে। আমাকে একবার জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন বোধ করছেন না যে আমার মত আছে না নেই! আশ্চর্য ব্যাপার!’

‘বাবামায়েদের কখনও মত থাকে না। এটা বাংলা সিনেমা-থিয়েটারের ঐতিহ্য।’ মনোতোষ বললেন, ‘আমার কাছে ইম্পর্ট্যান্ট বৃন্দার মত। ও কোথায়?’

‘ও গাইনিতে হাউসজব করছে। গতকাল অ্যাডমিশন ডে ছিল। আজ সন্ধেবেলা বাড়ি ফিরবে।’

‘বৃন্দার মোবাইল নম্বর দেখি।’ মন্দিরার মোবাইল নিয়ে কনট্যাক্ট লিস্ট থেকে বৃন্দার নম্বর খুঁজে বার করেন মনোতোষ। মন্দিরার ফোন থেকেই ডায়াল করেন। রিং হয়ে হয়ে কেটে যায়। মনোতোষ অবাক হয়ে বললেন, ‘তোমার ফোন ধরল না তো!’

‘ওটি থাকলে ফোন লকারে রেখে দেয়। পরে রিং ব্যাক করে। তবে তোমার প্রস্তাবে ও রাজি হবে না। হলেও স্যামি ওকে অ্যাক্টিং করতে দেবে না।’

ঝুনুর মা সবার জন্য চা আর ফিশ ফ্রাই নিয়ে এসেছে। টক করে একটি ফিশ ফ্রাই তুলে বিপিন মনোতোষকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘মায়াকমকে আবার পটালি কী করে? এখনও তো স্ক্রিপ্ট রেডি হয়নি।’

মনোতোষ বললেন, ‘একটা ছবি করেই মায়াকম প্রোডাকশান ন্যাশনাল লেভেলে পরিচিতি পেয়েছে। বিবস্বান এবং হৈমবতী দুজনেই পরের ছবি প্রোডিউস করার জন্য খুব ইগার। তোদের সাইনিং অ্যামাউন্ট মেটানোর জন্য অলরেডি আমার অ্যাকাউন্টে পাঁচ লাখ টাকা ট্রান্সফার করে দিয়েছে। দাঁড়া আবার বৃন্দাকে ফোন করি।’

মন্দিরার মোবাইলের সবুজ বোতাম টিপে মনোতোষ রিডায়াল করেন। রিং হয়ে হয়ে ফোন কেটে যায়।

.

মোবাইল সাইলেন্ট মোডে পাঠিয়ে বৃন্দা লেডি আর্চার্স হোস্টেলে ঘুমোচ্ছিল। এমবিবিএস পাশ করে গেল, ইন্টার্নশিপ শেষ হয়ে গেল, পুরোদমে গাইনিতে হাউসজব চলছে—বৃন্দার রুম নম্বর বদলাল না। সেই অশুভ তেরো নম্বর। রুমমেট সেই দময়ন্তী। সকালবেলা সেই বাথরুমের সামনে ক্যাঁচরম্যাচর। সেই ফুলমতিয়ার হিহি হাসি আর নোংরা রসিকতা।

সব এক থাকলেও একটা বিষয় বদলে গেছে। গোটা কলেজ জীবনে বৃন্দা যা করেনি, হাউসস্টাফশিপে এসে সেটা করতে বাধ্য হচ্ছে। তা হল, সপ্তাহে সাড়ে ছ’দিন হোস্টেলে থাকতে বাধ্য হচ্ছে।

গাইনিতে হাউসজব করা নিয়ে স্যামির সাথে এক প্রস্থ ঝামেলা হয়েছে বৃন্দার। আধোঘুমে পাশ ফিরতে ফিরতে সে বিড়বিড় করে, ‘কনট্রোল ফ্রিক!’

বৃন্দার নামকরণের খেলাটা এখন আর সেভাবে কাজ করে না। মন্দিরা আর দ্য লোনলি ওয়াইফ নেই। সিনেমার শুটিং, প্রি আর পোস্ট প্রোডাকশান, ফিল্মের প্রোমোশান, ইভেন্টে যাওয়া— এইসব নিয়ে ব্যস্ত। শান্তিধামের তিনতলায় একটা অফিস খুলেছে। কর্মচারী হিসেবে অফিসে রেখেছে ঝুনুকে। অর্থাৎ বৃন্দার সুপ্রভাত। পাঁচ বছর আগের এক মায়াবী ভোরবেলায় যাকে দেখে বৃন্দার মনে পুলক জেগেছিল, সে এখন মাইনে করা স্টাফ। ধুস! সব রহস্য গায়েব হয়ে গেছে। ঢ্যাঙা ছেলেটাকে দেখলে বিরক্তি ছাড়া অন্য কোনও অনুভূতি হয় না বৃন্দার।

ঝুনুর মা উওম্যান ফ্রাইডেই আছে। কিন্তু থ্রি উইচেস-এর গ্রুপ ভেঙে গেছে। মনোতোষ আর বিপিনের বন্ধুত্ব অটুট থাকলেও ছিটকে গেছেন সুদিন। আজ সকাল-এর সাংবাদিকতা আর অন্তহীন পত্রিকার সম্পাদনা নিয়ে নিজস্ব বৃত্ত খুঁজে নিয়েছেন। বিপিন আর সুদিনের মধ্যেকার সেই বন্ডিং আর নেই। বিপিনের সাফল্যে ঈর্ষান্বিত হয়ে সুদিন দূরে সরে গেছেন, নাকি ক্রমাগত উপন্যাস আর স্ক্রিপ্ট লেখার জাঁতাকলে পড়ে বিপিনই সময় দিতে পারেন না— এ কথা ভবিষ্যত বলবে। মনোতোষ আর বিপিন নিয়মিত শান্তিধামে এলেও তাঁদের স্থান হয় মন্দিরার অফিসে। স্যামির সঙ্গে যোগাযোগ নেই।

বদলায়নি কনট্রোল ফ্রিক স্যামি। হাউসস্টাফশিপের জন্য কাউন্সেলিং দিন সকালে স্যামি হুকুম জারি করলেন, ‘হাউসজবে সার্জারি নিস।’

ব্রেকফাস্ট টেবিলে বসে বেঙ্গল নিউজ-এ চোখ বোলাতে বোলাতে বৃন্দা বলল, ‘না।’

‘না মানে?’ পুরোনো স্যামির গলায় পুরোনো দার্ঢ্য।

‘আমি গাইনিতে হাউস জব করব।’

‘ওটা একটা সাবজেক্ট হল? গাইনিকলজি অ্যান্ড অবস্টেট্রিক্স-এর বাংলা হল ‘স্ত্রীরোগ ও ধাত্রীবিদ্যা’। “ধাত্রী” থেকে “ধাইমা” কথাটা এসেছে। গ্রামের হোম ডেলিভারিতে যারা অ্যাসিস্ট করে। এটা একটা কোয়াক সাবজেক্ট।’

‘কোয়াকরা ফোঁড়া কাটে বাবা। নাপিতরা চুল-দাড়ি-নখ কাটে। তারা যেমন সার্জন নয় তেমনই ধাইমারা অবস্টেট্রিশিয়ান নয়। এই সাবজেক্টটা এখন আর আগের মতো নেই। রিপ্রোডাকটিভ মেডিসিন এবং ইনফার্টিলিটি নিয়ে গবেষণা এখন এই সাবজেক্টের প্রধান ফোকাস।’

বৃন্দার ভাষণে পাত্তা না দিয়ে স্যামি বললেন, ‘শান্তিধাম তাহলে কে চালাবে?’

‘কেন? তুমি!’ বৃন্দা অবাক।

‘আমি না থাকলে?’

‘তুমি ব্লাড লাইনের কথা ভাবছ?’ অবাক হয়ে বলে বৃন্দা, ‘আমি ভাবছি আমার পছন্দ অপছন্দের কথা। এইজন্যই কনফ্লিক্ট হচ্ছে।’

‘তাহলে? কী ঠিক করলি?’ কনফিডেন্টলি বলেন স্যামি।

‘গাইনিতেই হাউসজব করব। আমি শুধু তোমার পয়েন্ট অব ভিউ জানতে চেয়েছিলাম।’ বেঙ্গল নিউজ রেখে খাবার টেবিল থেকে ওঠে বৃন্দা।

সেই হাউসজব এইরকম বাঁশ দেবে, বৃন্দা ভাবতেও পারেনি। সে হাউসজব করছে হেড অব দ্য ডিপার্টমেন্ট ডক্টর মল্লিকের আন্ডারে। অ্যাডমিশান ডে শনিবার। শনিবার আর রবিবার খাটুনির চোটে জান কয়লা হয়ে যায়। নিঃশ্বাস ফেলার সময় পাওয়া যায় না।

আজ রোব্বার। রাউন্ড থেকে ফিরে আধঘণ্টার ভাত-ঘুম দিচ্ছিল বৃন্দা। মোবাইলে অ্যালার্ম দেওয়া আছে। ঘুম থেকে উঠে রাউন্ডে যাবে। বৃন্দার পাশের বিছানায় বসে ল্যাপটপে অনলাইনে ফর্ম ফিলাপ করছে দময়ন্তী। সে হাউসজব করছে রেডিওলজিতে। কাজের চাপ নেই। অ্যাডমিশান ডে, নাইট ডিউটি, ইমার্জেন্সি ডিউটি, ওটি, পোস্ট অ্যাডমিশান ডে, রাউন্ডের ঝামেলা নেই। সকাল ন’টা থেকে দুপুর দুটো পর্যন্ত আরামের ডিউটি। এসি ঘরে বসে আলট্রাসোনোগ্রাফি, সিটি স্ক্যান, ডপলার স্টাডি— এইসব শেখা।

দময়ন্তী বৃন্দার মোবাইলের দপদপানি দেখতে পেয়েছে, কিন্তু বৃন্দাকে কিছু বলেনি। নিজের কাজ চুকিয়ে সে ল্যাপটপ শাট ডাউন করল। তারপর জানলার দিকে তাকাল। জানলার পাশে রাখা টুলে বিলুদা বসে রয়েছে। পরনে জলপাই সবুজ রঙের কম্ব্যাট গিয়ার, মাথায় লাল ফেট্টি, হাতে এ কে সাতচল্লিশ। দময়ন্তীর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘কী ভাবছিস?’

বিলুর দিকে ভুরু কুঁচকে তাকাল দময়ন্তী। আবার তার অডিটরি এবং ভিশুয়াল হ্যালুসিনেশান হচ্ছে। সাইকায়াট্রি ওপিডিতে দেখিয়ে এবং কাউন্সেলিং করে সে ভালো ছিল। আবার কী হল?

বিলু এ কে সাতচল্লিশ মেঝেয় রেখে বলল, ‘কার সঙ্গে ফোনে বকরবকর করছিলি?’

‘অভির সঙ্গে।’

‘কী কথা হল?’

‘সেটাই বোঝার চেষ্টা করছি।’

‘কী বুঝলি?’

‘অভি এখনও বৃন্দাকে খুব ভালোবাসে।’

‘সেটাই তো স্বাভাবিক। ভালোবাসা পূর্ণতা পেলে ভালো। না পেলে আরও ভালো। সারা জীবন জোনাকির মতো মিষ্টি, ছোট্ট আর নরম একটা নীল আলো বুকের বাঁদিকে জ্বলবে। ভাবতেই ভালো লাগে।’

‘তোমার ভালো লাগতে পারে। আমার অবাক লাগে।’

‘অবাক লাগে? কেন?’

‘আমার মধ্যে সূক্ষ্ম অনুভূতির অভাব আছে। তাই।’

‘অভাব আছে, না আমাকে তোর জীবন থেকে সরিয়ে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ওইসব দরকারি ইমোশনগুলোকে ছেঁটে ফেলেছিস?’

‘যে ভাবে দেখবে।’ বিরস মুখ করে বলে দময়ন্তী। ‘আর, ওগুলো দরকারি না ফালতু ইমোশান—সেটা আমার হৃদয় ঠিক করবে। তুমি ডিকটেট করার কে?’

‘কে হায় হৃদয় খুঁড়ে জাগাতে ভালোবাসে!’ নরম গলায় বলে বিলু।

‘জীবনানন্দের কবিতা আওড়ে কোনও লাভ নেই। আমি একটা অনুভূতিহীন জোম্বি। অনুভূতিপ্রবণ মানুষদের বুঝতে আমার অসুবিধে হয়।’ বিড়বিড় করে দময়ন্তী।

‘তোর মনে নানা রকম কনফিউশান বাসা বেঁধেছে। আমাকে যদি বলিস তা হলে সর্ট আউট করার চেষ্টা করব।’

‘নট আ ব্যাড আইডিয়া।’ বিলুর প্রস্তাবে খুশি হয় দময়ন্তী। ‘তুমি কি জানো যে চন্দন ঋষিতার সঙ্গে এনএইচকিউতে বেলেল্লাপনা করছে?’

‘আগে জানতাম না। এখন জানলাম।’

‘কয়েকবছর আগের একটা ঘটনা মনে পড়ে গেল। সেটা ছিল সুরজের জন্মদিন। ও সেদিন আইনক্সে আমাদের ব্যাচের ছেলেমেয়েদের ‘অগ্নিপথ’ দেখিয়েছিল। সিনেমা দেখে ফেরার সময়ে আমি আর বৃন্দা ফ্যাব ইন্ডিয়াতে গিয়েছিলাম। বৃন্দা সেখান থেকে অভির জন্য হলুদ রঙের একটা পাঞ্জাবি কিনেছিল।’

‘তারপর?’

‘আমার সঙ্গে বৃন্দার কোনও একটা কারণে ঝগড়া হয়েছিল। কী কারণ, মনে নেই। এজেসি বোস রোডের ফুটপাথে দাঁড়িয়ে বৃন্দা আমার গালে থাপ্পড় কষিয়েছিল। বলেছিল, “ডার্টি বিচ!” প্রতিশোধ নিতে আমিও পাল্টা মার দিয়েছিলাম। হাতের মার নয়, ওস্তাদের মার! চন্দনের কাছ থেকে শোনা একটা কথা বৃন্দার কাছে এমনভাবে প্লেস করেছিলাম, যে বৃন্দা অভির ওপরে বেদম খচে গিয়ে পরের দিনই কলেজে এসে অভিকে ঝাড় নামিয়েছিল। ওদের মধ্যে চিরকালের জন্য ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। মুখচোরা, মফস্‌সলি, অভি প্রেমে ঝাড় খেয়ে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিল।’

‘সেই কথাটা কী?’

‘অভি ভালোবাসে স্যামি ব্যানার্জি এবং তার শান্তিধামকে। বৃন্দাকে নয়।’

‘এই সাংঘাতিক তথ্যটা তুই কার কাছ থেকে পেয়েছিলি? আমার ভাই তো এইরকম ছেলে নয়!’

‘জেনেছিলাম তোমাদের সঙ্গে বাঁজাপলাশ গ্রামে গিয়ে। ফরেনসিক মেডিসিনের প্র্যাকটিকাল পরীক্ষা যে দিন হয়েছিল সেই রাতে। চন্দন আমাকে বলেছিল।’

‘কী বলেছিল?’

‘বলেছিল যে অভি বৃন্দাকে নয়, বৃন্দার বাবার সম্পত্তিকে ভালোবাসে।’

‘চন্দন বলল, আর তুই মেনে নিলি? একবার তথ্য ক্রসচেক করলি না?’

‘না।’

‘কেন?’

‘কেন না এই জাতীয় ভেগ অভিযোগ প্রমাণ করা যায় না। কিন্তু প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য এই সব অভিযোগ খুব কাজে দেয়। আমিও কাজে লাগিয়েছিলাম। বৃন্দার থাপ্পড়ের প্রতিশোধ নিয়েছিলাম, ওদের পিরিত চটকে দিয়ে।’

‘এর পরেও তোদের মধ্যে বন্ধুত্ব ছিল?’

‘হ্যাঁ! এতে অবাক হওয়ার কী আছে?’

‘সত্যি! তোরা, মেয়েরা, অদ্ভুত চিড়িয়া!’

‘যাক! অ্যাদ্দিনে বোধোদয় হল!’

‘কিন্তু তুই পরে কেন বৃন্দার কাছে ক্ষমা চাসনি? কেন বৃন্দার ভুল ভেঙে দিসনি?’

‘কেন না ততদিনে চন্দন বৃন্দার জীবনে স্মুদলি এন্ট্রি নিয়েছে। ওরা তখন কলেজের হট অ্যান্ড হ্যাপেনিং কাপ্‌ল। ব্র্যাঞ্জেলিনার কায়দায় ওদের জোড়িকে বলা হচ্ছে ‘বিসি’। আমি কী করে কাবাবের হাড় হই?’

‘জাস্ট এটাই কারণ? না অন্য কোনও কারণও ছিল?’ মেঝে থেকে এ কে সাতচল্লিশ তুলে নিয়ে প্রশ্ন করে বিলু।

‘অন্য কারণও ছিল।’ জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আনমনে বলে দময়ন্তী, ‘ততদিনে বাঁজপলাশ গ্রামে যৌথবাহিনীর হত্যালীলা ঘটে গেছে। পুলিশ তোমাকে খুঁজছে। বাদশা ঘোষ আমাকে জেরা করেছেন। আমি তখন তোমার থেকে, আইপিপির থেকে, বাঁজাপলাশ গ্রামের অস্ত্রশিক্ষার গোপন অভিযান থেকে দূরত্ব বাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছি। ওই টেনশানে চন্দনের বলা কথাগুলো আমি কনভিনিয়েন্টলি ভুলে গিয়েছিলাম। আর, তুমি তো জানোই, আমি অ্যালোপাম অ্যাডিক্ট।’

‘দুশ্চিন্তাহীন সুখী জীবন কীভাবে পেতে হয়—এই বইটা ডেল কার্নেগির বদলে তোর লেখা উচিত ছিল।’ দময়ন্তীর দিকে এ কে সাতচল্লিশের নল তাক করেছে বিলু।

দময়ন্তী বলল, ‘আজ বুঝতে পারছি, চন্দন কখনওই বৃন্দাকে ভালোবাসেনি। বাসলে ঋষিতা আর সুরজের সঙ্গে গ্রুপ সেক্স করতে পারত না। আর আমি চন্দনকে আরও ভালোভাবে চিনেছি চন্দনের বাবার সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে। নবযুগ পার্টির কনট্রাক্ট কিলার বাবলু চৌধুরীকে আশ্রয় দিয়ে জনমোর্চা থেকে নবযুগে পাল্টি খেতে চন্দনের এক মিনিটও সময় লাগেনি। বাঙালিরা বোধহয় এইরমই হয়। ক্রমাগত রং বদলাতে থাকা অমেরুদণ্ডী প্রাণী!’

‘তুইও অমেরুদণ্ডী দিঠি। তুইও অন্যায়ের প্রতিবাদ করিস না। পুলিশকে যে খুন করেছে তাকে চোখে সামনে দেখেও চুপ করে থাকিস। যে তোকে একদিন মলেস্ট করেছিল, সে ভয় দেখালে চুপ করে যাস। আর যে বন্ধু তোকে মলেস্ট হওয়া থেকে বাঁচিয়েছিল, তাকে অবলীলায় পুলিশের হাতে তুলে দিস। তোর সাজা হওয়া উচিত না?’ দময়ন্তীর দুই ভুরুর মাঝে আগ্নেয়াস্ত্রর নল ঠেকায় বিলু।

বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ায় দময়ন্তী। বিলু এবং তার আগ্নেয়াস্ত্র উধাও হয়ে গেছে। সে যাক! দময়ন্তী জানে, এগুলো তার হ্যালুসিনেশান। কিন্তু এই হ্যালুসিনেশান তার কনফিউশান অনেকটা ক্লিয়ার করে দিয়েছে। অতীতে চন্দন তাকে একটা ভুল তথ্য দিয়েছিল। সেই ভুল তথ্যের ভিত্তিতে অভি আর বৃন্দার প্রেম ভেঙে যায়।

আজ অভি তাকে একটা তথ্য দিয়েছে। চন্দন-সুরজ-ঋষিতার গ্রুপ সেক্সের তথ্য। বৃন্দাকে এই তথ্য জানালে বৃন্দা সিয়োর চন্দনকে ঝাড় নামাবে। এবং তাতে দময়ন্তী খুশিই হবে। কিন্তু বৃন্দাকে জানানোর আগে তথ্যটা ক্রসচেক করতে হবে। আগের ভুল দময়ন্তী আজ আর করতে চায় না।

বৃন্দা ঘুমোক। নিঃশব্দে জিন্‌স টি-শার্ট আর স্নিকার গলায় দময়ন্তী। সে একবার গোলমহল থেকে ঘুরে আসবে। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বিয়ার খেয়ে মাতাল অবস্থায় শ্বশুরবাড়ি পৌঁছালে সন্তোষ সেদিনই ডিভোর্সের জন্য আবেদন করবে। সুতরাং ঋষিতার এখন ডিটিপির দোকানে থাকার কথা।

.

বৃন্দা ঘুম থেকে উঠে দেখল, মোবাইলে একগাদা মিস্‌ড কল জমে আছে। তার মধ্যে মায়ের ফোন বেশ কয়েকটা। চন্দনের একটা। বাকি ফোনগুলো গুরুত্বপূর্ণ নয়। চন্দন আজকাল কম ফোন করে। তাতে অবশ্য বৃন্দা খানিকটা নিশ্চিন্ত। এইভাবে যদি সম্পর্কটা নিজের থেকে মরে যায় তাহলে বেটার। না হলে ফালতু একটা নাটক হবে। যেমন হয়েছিল অভির সঙ্গে।

সেবার ছিল অভি। এবার চন্দন। ছেলেরা কি মানি আর সেক্স ছাড়া কিস্‌সু বোঝে না? দীর্ঘশ্বাস ফেলে বৃন্দা। এখন এইসব ফালতু বিষয় নিয়ে মাথা না ঘামালেও চলবে। এখন রাউন্ডে যাওয়ার সময়। পোস্ট অ্যাডমিশন ডে-র রাউন্ড দিতে দীর্ঘ সময় লাগে। সব শেষে আছে মা ও সন্তানের বাড়ির লোকের সঙ্গে কথা বলা।

রাউন্ড শেষ হতে তিন থেকে চারঘণ্টা লাগবে। স্টেথোস্কোপ হাতে আর এপ্রন কাঁধে নিয়ে বৃন্দা লেডি আর্চার্স হোস্টেল থেকে বেরোয়। ঘড়িতে চারটে বাজে।

.

আটটার সময় আনলাকি তেরো নম্বর রুমে ফিরে বৃন্দা দেখল, দময়ন্তী জানলা খুলে, ল্যাপটপে বাংলা লোকসঙ্গীত চালিয়ে একা একা নাচছে। ‘পিন্দারে পলাশের বন, পালাবো পালাবো মন, ন্যাংটা ইন্দুরে ঢোল কাটে, হে কাটে রে, বতরে পিরিতির ফুল ফোটে…’ পিরিতির ফুলের ফুটে ওঠা বোঝাতে সে যে ভাবে শরীরের এখানে ওখানে হাত দিচ্ছে, তা দেখতে গ্রুপ ডি স্টাফের কোয়ার্টারের বারান্দায় ছেলে-ছোকরা, বুড়ো-ধাড়িদের লম্বা লাইন পড়েছে। ধড়াম করে জানলা বন্ধ করে বৃন্দা বলল, ‘একটা ডিলডো দেব?’

‘আমার আছে।’ নাচ থামিয়ে হাঁফাতে হাঁফাতে বলল দময়ন্তী। ‘ইমার্জেন্সি পারপাসে ব্যাগেই রাখা থাকে। নাম রেখেছি ভোঁদাই।’

‘গাড়ুর ডাকনাম অনাগত বিধাতা, চটির ডাকনাম নিত্যকর্ম পদ্ধতি— এই অবধি জানতাম। তা বলে ডিলডোর ডাকনাম ভোঁদাই? দারুণ ব্যাপার!’

বৃন্দার কথায় পাত্তা না দিয়ে দময়ন্তী বলল, ‘দিব্যি একটা ট্রান্সের মধ্যে ছিলাম। দিলি সব চটকে।’

‘আমি চটকালে হবে না। তোর জন্য অন্য কাউকে চাই।’ পোশাক ছাড়তে ছাড়তে বলে বৃন্দা।

‘খেতে ভালো ইলিশ। আর শুতে ভালো পুলিশ।’ দীর্ঘশ্বাস ফেলে দময়ন্তী, ‘হ্যাঁরে বৃন্দা, তোর হাতে কোনও চিকনা পুলিশ আছে? কলকাতার নতুন ট্রাফিক সার্জেন্টগুলো কী ডাঁশা হয়েছে মাইরি। দেখলেই মনে হয় খপাত করে খেয়ে ফেলি।’

‘এত গরম কেন?’ দময়ন্তীর ল্যাপটপ বন্ধ করে বৃন্দা। মোবাইল হাতে নেয়। মাকে এবার ফোন করা যাক।

দময়ন্তী বৃন্দার হাত থেকে ফোন কেড়ে নিয়ে বলল, ‘এই মাসটাই কলকাতায় আমার শেষ মাস। তারপর…’ আকাশে হাতের তালু ঘুরিয়ে প্লেন উড়ে যাওয়ার ভঙ্গি করল সে।

‘ভিসা পেয়ে গেলি?’ দময়ন্তীর কাছ থেকে মোবাইল কেড়ে নেয় বৃন্দা। দময়ন্তী নিজের মোবাইল সাইলেন্ট মোডে পাঠিয়ে বলে, ‘তোর সঙ্গে আমার দু’একটা কথা আছে। মাত্র দশ মিনিট নেব। ওই সময়টুকুর জন্য আনডিভাইডেড অ্যাটেনশান চাই। আমার ফোন সাইলেন্ট মোডে পাঠিয়ে দিয়েছি। তুই তোর ফোন সাইলেন্ট মোডে পাঠিয়ে দে।’

‘কী কথা? কাকে নিয়ে কথা? তুই হয়তো শারুখ খান-করণ জোহরের লাভ স্টোরি শোনাবি। তাতে আমার ইন্টারেস্ট নেই।’

‘চন্দন আর ঋষিতার লাভ স্টোরি নিয়েও ইন্টারেস্ট নেই?’

‘কী?’ চিল চিৎকার করে বৃন্দা। মোবাইল ফোন সাইলেন্ট মোডে পাঠিয়ে বলে ‘কী বলবি বল।’

‘আজ সকাল থেকে ঋষিতা, চন্দন আর সুরজ এনএইচকিউ-এর তিনশো সাত নম্বর ঘরে বিয়ার খেয়েছে। আর কী কী করেছে জানা যায়নি। তবে লুডো খেলেনি— এটা সিওর।’

বৃন্দা অল্প অল্প হাঁফাচ্ছে। সে বলল, ‘চন্দন সম্পর্কে আমার ইন্টারেস্ট শেষ হয়ে গেছে। এই ইনফো পেয়ে আমার নতুন কোনও অনুভূতি হল না। তবে থ্যাংকস। চন্দন ঝামেলা পাকাতে এলে ওকে ফোটাতে সুবিধে হবে।’

‘তুই জিজ্ঞাসা করছিস না যে এটা আমি জানলাম কোথা থেকে?’

‘এ সব কথা লুকোনো যায় না। এনএইচকিউ-এর কোনও বোর্ডার বলেছে।’

‘অভি বলেছে।’

‘ও।’ বৃন্দা অভিব্যক্তিহীন।

‘অনেক বছর আগে আমি অভির নামে কয়েকটা কথা বলেছিলাম। মনে পড়ে?’

‘হ্যাঁ।’

‘এত দিন সোর্স বলিনি। আজ বলি, কথাগুলো চন্দন আমাকে বলেছিল।’

‘তো?’

‘মোনোসিলেব্‌লে উত্তর দিচ্ছিস কেন? ফিলিং টেনস্‌ড? তাহলে তোর টেনসান আর একটু বাড়িয়ে দিই। চন্দন সে দিন আমাকে মিথ্যে কথা বলেছিল। চন্দন তোকে উইন ওভার করতে চেয়েছিল। তাই অভির নামে ফালতু কথা আমার মাধ্যমে রটিয়েছিল। অভি কোনও দিনও স্যামি ব্যানার্জির চেম্বার নিয়ে লালায়িত ছিল না। অভি বরাবর তোকে, শুধু তোকে ভালোবেসে এসেছে। আমি চন্দনের হাতের পুতুল হয়ে তোদের প্রেম ভেঙে দিয়েছিলাম। ক্রস চেক করিনি, চন্দন সত্যি বলছে না মিথ্যে।’

‘আজ এ সব ভেবে কোনও লাভ আছে?’

‘আছে। কেন না আজ আমি ক্রস চেক করেছি যে অভি সত্যি কথা বলেছে। তুই যখন ঘুমোচ্ছিলি তখন আমি বাড়ি গিয়েছিলাম। বাড়ি বলা ভুল, গোলমহলের একতলায় ঋষিতার অফিসে গিয়েছিলাম। মেয়েটা নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছিল। আমি চেপে ধরায় সব স্বীকার করেছে। ঋষিতার জন্য আমার খারাপ লাগছে। সেক্স-অ্যাডিকশান যে একটা রোগ, এটা ইন্ডিয়া কবে বুঝবে কে জানে! শি নিড্‌স রিহ্যাব লাইক বিল ক্লিন্টন।’

‘যাচ্ছিস ইংল্যান্ড। আমেরিকার প্রাক্তন প্রেসিডেন্টকে নিয়ে চিন্তা কেন?’

‘আমার চিন্তা তোকে নিয়ে। আমার কথা শুনে তুই অভিকে ঝাড় নামিয়েছিলি। ছেলেটা এখনও তোর জন্য একবুক ভালোবাসা নিয়ে অভিমান করে বসে আছে। ইউ শুড ডু সামথিং।’

‘ইয়েস আই শুড।’ খাট থেকে ওঠে বৃন্দা। রাগ আর উত্তেজনায় তার গোলাপি গাল এখন টকটকে লাল। বড় বড় পা ফেলে দময়ন্তীর কাছে গিয়ে গালে সপাটে এক থাপ্পড় কষিয়ে বলল, ‘ডার্টি বিচ!’

দময়ন্তী হাসছে। যন্ত্রণায় চোখে জল। বৃন্দার মোবাইল এগিয়ে দিয়ে সে বলল, ‘আই ডিজার্ভ ইট। এই নে তোর মোবাইল।’

বৃন্দা দময়ন্তীকে তার ফোন ফেরত দিয়ে বলে, ‘এই নে তোর ফোন। তুই যখন আমার সঙ্গে কথা বলছিলি তখন কাকিমার অনেক ফোন এসেছিল।’

‘মায়ের ফোন?’ দময়ন্তী অবাক। ‘আমি বাড়ি গিয়ে দেখলাম বাইরে থেকে তালা মারা। তাই আর ঢুকিনি। হয়তো ঋষিতা খবর দিয়েছে যে আমি এসেছিলাম।’ শক্তিরূপাকে রিংব্যাক করে দময়ন্তী। রিং হতেই ফোন ধরে শক্তিরূপা বলেন, ‘টিভি দেখছিস?’

‘টিভি? না। কেন?’

‘বিবস্বান এবং হৈমবতী সান্যালকে কলকাতা পুলিশের একটা টিম চণ্ডীগড় থেকে অ্যারেস্ট করেছে। মাইক্রোফিনান্সের ব্যাবসার নামে অজস্র গরিব মানুষের টাকা মেরে দুজনে পালিয়েছেন। পুলিশ ওঁদের সব অফিস সিল করে দিয়েছে।’

‘আর উইকেন্ড?’

ঠান্ডা গলায় শক্তিরূপা বলেন, ‘তোকে এতদিন জানাইনি। গত তিন মাস আমরা মাইনে পাচ্ছিলাম না। গতকাল রাতে উইকেন্ডের সব স্টাফের কাছে একটা মেল এসেছে। তাতে বিবস্বান জানিয়েছেন যে আজ সকাল, বেঙ্গল নিউজ, ফিল্মডম এবং স্কুপ চ্যানেল বন্ধ করে দেওয়া হল। বন্ধ করে দেওয়া হল উইকেন্ড ম্যাগাজিন। মাই সার্ভিস উইল নো লংগার বি রিকোয়্যার্ড। আমি এখন বেকার, দিঠি।’

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *