২৬. বৃন্দা
‘কুনাল, ভাইটাল্স ঠিক আছে?’ অজ্ঞান রোগীর পেটে সেলাই দিতে দিতে প্রশ্ন করলেন স্যামি।
কুনাল বলল, ‘পালস্, প্রেশার, অক্সিজেন স্যাচুরেশান নরমাল। তবে অ্যানাস্থেসিয়ার এফেক্ট চলে যাচ্ছে। পেশেন্ট এবার চেল্লাবে।’
‘আমি স্কিন দিচ্ছি। পেশেন্ট চেল্লালে কোনও প্রবলেম নেই।’ সেলাই শেষ করে স্যামি বলেন, ‘স্কিন টু স্কিন কতক্ষণ লাগল সিস্টার?’
সুজাতা আয়ার নামে এক নতুন সিস্টার জয়েন করেছে শান্তিধামে। মাঝারি বয়স। অসম্ভব এফিসিয়েন্ট। খুব চুপচাপ। কলকাতার এক কেরালিয়ানকে বিয়ে করে কাজের সূত্রে দীর্ঘদিন মাসকাটে ছিল। লেক গার্ডেন্সে বরের বাড়ি। তার বাপ-মা গত হয়েছে কিছুদিন আগে। মাসকাট থেকে কলকাতায় ফিরে সুজাতা দেখে স্বামী কমবয়সি একটা মেয়েকে বিয়ে করে দিব্যি ফুর্তিতে আছে। সুজাতা ঝাঁটা মেরে প্রথমে মেয়েটাকে তাড়িয়েছে। তারপর বরকে। অ্যাডালটরিতে ইস্যুতে ডির্ভোসের মামলা। হাসতে হাসতে জিতে গেছে। এখন কলকাতায় নিজের বাড়ি, গাড়ি এবং মোটা ব্যাংক ব্যালান্স। এই রকম মহিলার শান্তিধামে মেট্রন হয়ে আসার কোনও কারণ নেই। এর উচিত কেরালায় ফেরত যাওয়া অথবা কোনও কর্পোরেট হসপিটালে জয়েন করা। যেখানে মাইনে এবং অন্যান্য সুযোগ সুবিধে অনেক বেশি। কিন্তু সুজাতা শান্তিধামে জয়েন করেছে। কারণ হিসেবে স্যামিকে বলেছে, ‘আমি এখন মেন্টালি ডিস্টার্বড। বেশি ওয়র্কলোড নিতে পারবো না। আপনার এই কম কাজের এবং কম মাইনের জায়গা আমার পক্ষে ঠিক আছে। আপনি যদি না তাড়ান, আমি নেক্সট এক বছর আছি। তারপর কেরালা শিফ্ট করব।’
স্যামি সুজাতাকে নিয়েছেন। মেয়েটা একদিন অন্তর লেক গার্ডেন্সের বাড়িতে গিয়ে ঝাড়পোঁছ করে আসে। সেটাও ম্যাক্সিমাম একঘণ্টার জন্য। বাকি সময়টা শান্তিধামে। ছুটিছাটা নেয় না।
স্যামির প্রশ্নের উত্তরে সুজাতা বলল, ‘তিরিশ মিনিট লাগল স্যার। অ্যাপেনডিক্স অপারেশনের ক্ষেত্রে অনেক বেশি সময়। হাউসস্টাফরা এই অপারেশান পনেরো মিনিটে নামায়।’
‘এটা অলিম্পিকের একশো মিটার দৌড়ে নয় সিস্টার, যে কে কত কম সময় ফিনিশ করল, সেটাই সাফল্যের একমাত্র খতিয়ান। সার্জারি কতটা নিঁখুত হল— সেটাই একমাত্র ইস্যু। তবে আমি মানছি যে আমি অনেক স্লো হয়ে গেছি। এই অপারেশান কুড়ি মিনিটের মধ্যে নামানো উচিত ছিল। কিন্তু, বেটার বি সেফ, দ্যান সরি।’
সুজাতা বা কুনাল কোনও মন্তব্য করল না। চন্দ্রিমা এপিসোড়ের কথা জানার পরেই সুজাতা এখানে জয়েন করেছে। কুনাল চুপচাপ প্রকৃতির। তাও টুকরোটাকরা কথায় স্যামির অ্যালকোহলিজম, লিভারের সমস্যা, ওটি করার সময় পেশেন্টের মৃত্যু, সেই নিয়ে মিডিয়া হাইপ, মামলা মোকদ্দমা— সবই সুজাতার জানা। তবে এখন স্যামি অনেক ভালো আছেন। আবার ইন্ডিয়ান মেডিকাল কলেজে জয়েন করেছেন। নিজের কনফিডেন্স বাড়ানোর জন্য ওখানে নিয়মিত ছোটোখাটো ওটিও করছেন। হাত আবার সেট হচ্ছে। যদিও, স্যামি জানেন, তিনি আর কলকাতা সেরা সার্জনদের মধ্যে পড়েন না। বিভিন্ন কর্পোরেট হাসপাতাল এখন চিকিৎসকদের তারকা হিসেবে প্রোমোট করছে। খবরের কাগজে ছবি, ম্যাগাজিনে প্রশ্নোত্তর সেশন, জেলায় জেলায় সেমিনারের নামে পেশেন্ট সংগ্রহের চেষ্টা।
নতুন প্রজন্মের এই চিকিৎসকদের সঙ্গে, কর্পোরেট হাসপাতালের টার্গেট ওরিয়েন্টেড পলিসির সঙ্গে পুরোনোপন্থী শান্তিধাম পেরে উঠবে না। মাঝে মাঝে স্যামির মনে হয়, সব কিছু বেচেবুচে দিয়ে শুধু সরকারি চাকরি করেন। তা হলে অন্তত মানসিক শান্তি থাকবে। পর মুহূর্তে মন বিদ্রোহ করে। ‘না! আমি স্যামি ব্যানার্জি। এমবিবিএস-এ গোল্ড মেডেলিস্ট। এমএস-এ গোল্ড মেডেলিস্ট। এফআরসিএস-এ গোল্ড মেডেলিস্ট। অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসার এবং তার চিকিৎসা হুইপল্স অপারেশান নিয়ে আমার থিসিস পেপার আজও লন্ডনের সার্জারির ছাত্রদের পড়ানো হয় এটা দেখানোর জন্য, যে দেখো, আইডিয়াল থিসিস কেমন হওয়া উচিত।’
শান্তিধাম স্যামি বেচতে পারবেন না। মরে গেলেও না। তা ছাড়া মেয়েটা আর কয়েক দিনের মধ্যে ডাক্তারি পাশ করবে। ওর জন্যই শান্তিধাম। যদিও স্যামি জানেন ইন্টার্নশিপ, হাউসস্টাফশিপ, পোস্ট গ্র্যাজুয়েশান, বিদেশি ডিগ্রি—সব মিলিয়ে পুরোদস্তুর ডাক্তার হতে বৃন্দার আরও আট ন’বছর লাগবে।
কিন্তু বৃন্দার কেরিয়ারের থেকেও এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ তাঁর নিজের কেরিয়ার। হার্নিয়া, হাইড্রোসিল, অ্যাপেনডিক্স, গল ব্লাডার কাটার লোক কলকাতায় হাজার খানেক। ওইসব সার্জেনের তালিকায় ঢুকে পড়তে হয়েছে বলে স্যামি লজ্জিত। হি শুড বি ব্যাক হোয়্যার হি বিলংড। ইন দ্য বিগ লিগ।
ওটির পরে সার্জনদের রেস্টরুমে বসে কফি খাওয়া শান্তিধামের চালু প্রথা। সুজাতা কফি বানিয়েছে। কুনাল টেবিলের একপ্রান্তে বসে চুপচাপ কফি খাচ্ছে। স্যামি নিজের কাপ নিয়ে বসলেন। ভাবলেন নিজের অধঃপতনের কথা।
.
অ্যালকোহলিজম একটা রোগ। জেনেটিক গঠন, পরিবার, সমাজ—সবাই এই রোগের জন্য দায়ী। বৃন্দা আর মন্দিরা অভিযোগ করে, থ্রি মাস্কেটিয়ার্স এর জন্য দায়ী। স্যামি কিছু বলেন না। কিন্তু তিনি মনে মনে জানেন, বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে তিনি বখে যাননি। কারণ বন্ধুরা তো বখে যায়নি। মনোতোষ দিব্যি ছবি বানাচ্ছেন, ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড পেলেন, বুদ্ধিজীবীদের মিছিলে হাঁটলেন। বিপিন একের পর এক গপ্পো উপন্যাস লিখে যাচ্ছেন, আজ বাংলাদেশ কাল আমেরিকা যাচ্ছেন, বিশ্ববঙ্গ সম্মেলন অ্যাটেন্ড করছেন। সুদিন সংবাদপত্রের চাকরি সামলে অন্তহীন সম্পাদনা করছেন, নবীন কবিদের মধ্যে নেটওয়ার্ক তৈরি করছেন, কবিতা অ্যাকাদেমি খোলার চেষ্টা চালাচ্ছেন। তিনজনই সন্ধেবেলা আকণ্ঠ মদ্যপান করেন। অথচ সকালবেলা শালগমের মতো সতেজ। স্যামিই খালি পা পিছলে পড়ে গেলেন।
পতনের পরে উত্থান আসে। আসেই। স্যামিও উঠছেন। ধীরে হলেও উঠছেন। শান্তিধামে রোগীর সংখ্যা বেড়েছে, ডাক্তাররা আবার চেম্বার করছেন, টার্নওভার মোটামুটি। সমস্ত কর্মচারীর বেতন মিটিয়ে, ওভারহেড চুকিয়ে যে টাকাটা হাতে থাকছে, সেটা ইএমআই চোকানোর পক্ষে যথেষ্ট নয়। তবে ব্যাংকও সেয়ানা। পারসোনাল ম্যানেজার একদিন বাড়িতে এসেছিল। বলে গেল, ‘আপনার মতো কাস্টমার আমরা লুজ করতে চাই না। আপনার ডিফল্টার হওয়া নিয়ে আগামী ছ’মাস আমরা মাথা ঘামাব না। ইউ জাস্ট রিবিল্ড ইয়োর প্র্যাকটিস। ব্যাংকের নিয়ম মেনে একটা রিওয়ার্ড হয়তো আপনাকে দিতে হবে…’
‘তোমাদের ভাষায় রিওয়ার্ড মানে পেনাল্টি। তাই তো?’ প্রশ্ন করেছিলেন স্যামি।
‘হ্যাঁ স্যার।’ লজ্জায় অধোবদন হয়ে বলেছিল টাই পরা স্মার্ট ছোকরা। ‘শুধু একটাই রিকোয়েস্ট স্যার, আপনার অ্যাকিলিস হিল আপনি জানেন। ওই পদার্থটি বাকি জীবনে আর স্পর্শ করবেন না। আর আপনার সন্ধের সেশনের বন্ধুদেরও বাকি জীবনের জন্য ত্যাগ করুন।’
এক দিকের ভুরু তুলে স্যামি বলেছিলেন, ‘আমার লাইফস্টাইল নিয়ে কথা বলার অধিকার তোমাকে কে দিল হে?’
‘কেউ দেয়নি স্যার। এই সব নিয়ে কথা বলার কোনও অধিকার আমার নেই। আপনি আমার এগেইনস্টে কমপ্লেন করতে পারেন। তবে আপনি জানেন যে আমি যা বলছি, তা আপনার ভালোর জন্যই বলছি। আর আপনার ভালো মানে তো ব্যাংকেরও ভালো। তাই না?’
লাজুক পারসোনাল ম্যানেজারের ইস্পাত-কঠিন কণ্ঠস্বর শুনে স্যামি বুঝেছিলেন, এরা সব খবর রাখে। স্যামি ব্যবসা দিচ্ছেন বলে খাতির করছে। যে দিন জানবে স্যামি আর ব্যবসা দিতে পারবেন না, সে দিন শান্তিধাম ক্রোক করতে এক সেকেন্ডও সময় নেবে না।
সুতরাং ভয় একটা মোটিভেশন। দ্বিতীয় মোটিভেশান লজ্জা। মন্দিরা তাঁর কথা না শুনে রোজ চিৎপুরে রিহার্সাল দিতে যাচ্ছে। ভাবলেই লজ্জা করে স্যামির। ওই নোংরা রাস্তা, ওই ঘুপচি অফিস, ওই তেল চুকচুকে মালিক আর তার সাঙ্গোপাঙ্গ, ওই সখীমার্কা ক্ল্যারিওনেট বাজিয়ে—এদের মাঝখানে মন্দিরা? ব্রেড আর্নার অব দ্য ফ্যামিলি হিসেবে এ তাঁর লজ্জা! স্যামি চূড়ান্ত প্যাট্রিয়ার্কাল! নারী-পুরুষ সমানাধিকারের তত্ত্ব তিনি প্রকাশ্যে অস্বীকার করেন। আজ তাঁরই এই দুরবস্থা?
তৃতীয় মোটিভেশন ঈর্ষা। মন্দিরা ভালো রোজগার করছে। মহড়া শুরু হওয়ার আগে তিন লাখ টাকা অ্যাডভান্স পেয়েছে, ইন ক্যাশ। এরপরে আসবে শোয়ের টাকা। প্রথম উপার্জনেই শান্তিধামের ইএমআই চুকোনো যেত। স্যামি রাজি হননি। চিৎপুরের তেলচিটে গদির কালো টাকা তিনি শান্তিধামে খাটাবেন না। স্টাফের মাইনে এবং ওভারহেড মেটাতে রাজি হয়েছেন তিনি। ইএমআইয়ের ছাড়টা হাতে আছে। ওই টাকা দিয়ে আরও একমাস চলে যাবে।
কিন্তু মন্দিরা তাঁর থেকে বেশি রোজগার করছে? অসম্ভব! স্যামি তাই তেড়েফুঁড়ে উঠেছেন। থ্রি মাস্কেটিয়ার্সের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন না। দিনের বেলা ওদের শান্তিধামে আসা নিয়ে কোনও সমস্যা নেই। মন্দিরার সঙ্গে দেখা করতে মনোতোষ অনেকবারই এসেছেন। নবযুগের মহামিছিলে মন্দিরা পা মিলিয়েছিল মনোতোষের প্ররোচনাতে। মন্দিরার সঙ্গে এই নিয়েও ঝামেলা হয়েছে স্যামির। স্যামি বলেছিলেন, ‘মিছিলে হাঁটে ভাড়া করা গুন্ডা, কলেজের কনফিউজড ছেলেমেয়ে, ক্যাডার আর বেকার। তুমি কেন?’
‘তোমার পারসেপশানকে ভুল প্রমাণ করতে।’ চাবুকের মতো জবাব মন্দিরার। ‘আমার স্বার্থ দুটো। নাম্বার ওয়ান, ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড পাওয়া অভিনেত্রী হিসেবে আমার ভিজিবিলিটি একটু বাড়ানো উচিত। ফিল্মি পার্টিতে বেছে বেছে যাই, টিভির টক শোয়ে বেছে বেছে যাই, রিয়্যালিটি শোয়ের জাজ হিসেবে যাই না। এত বাছাবাছি করলে কেউ ডাকবে না। প্লাস, ন্যাশনাল মিডিয়ায় এইসব হাবিজাবি শোয়ের কোনও অস্তিত্ব নেই। আজকের মিছিলটা শুধু ন্যাশনাল নয়, ইন্টারন্যাশনাল নিউজ হবে। আমার এতে যাওয়া উচিত।’
‘দ্বিতীয় কারণ?’
‘আমি সত্যিই বিশ্বাস করি, সন্দীপ সামন্তর সরকারের যাওয়া উচিত। এদেরকে আর জাস্ট নেওয়া যাচ্ছে না।’ তাঁতের শাড়ি পরে চোখে সানগ্লাস লাগিয়ে শান্তিধাম থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন মন্দিরা।
তারপর তো ভোট হল। স্যামি ভোট দিতে না গেলেও মন্দিরা সকাল সকাল ভোট দিয়ে এলেন। কাগজে তার ছবিও বেরিয়েছে। বৃন্দাও ভোট দিতে যায়নি। পড়াশুনো নিয়ে ব্যস্ত ছিল।
মৃন্ময় চ্যাটার্জি মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে কাজ শুরু করেছেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে হাসপাতালে হাসপাতালে হানা দিচ্ছেন। বেশ কয়েকজন সিনিয়র চিকিৎসককে শো কজ এবং সাসপেন্ড করেছেন। স্যামি বরাবরই সকাল ন’টায় হাসপাতালে ঢোকেন। কিন্তু অন্যান্য ভিজিটিংরা সাড়ে ন’টা, দশটা, এমনকী সাড়ে এগারোটায় দুলকি চালে হাসপাতালে ঢোকেন। তাদের সেই বাবুয়ানি এখন বন্ধ। হাঁফাতে হাঁফাতে ন’টার মধ্যে ঢুকে হাজিরা খাতায় সই করছেন। ফাঁকিবাজদের ভয় পেতে দেখে স্যামি খুশি।
.
কফি শেষ। ঘড়ি দেখলেন স্যামি। সন্ধে সাতটা বাজে। আজ বৃন্দার সার্জারি থিয়োরি পরীক্ষা ছিল। গার্ড দেওয়ার জন্য স্যামি অ্যাকাডেমিক বিল্ডিং-এ একঘণ্টা ছিলেন। স্যামিকে দেখে পরীক্ষা হলে শ্মশানের স্তব্ধতা। প্রশ্নপত্র যারা বানিয়েছেন, তাঁরা তৈরির আগে স্যামির মতামত চেয়েছিলেন। স্যামি পরিষ্কার বলে দিয়েছিলেন, ‘এবার আমার মেয়ে ফাইনাল এমবিবিএস দিচ্ছে। এক্সামিনেসান প্রসেসের মধ্যে আমাকে রেখো না।’
স্যামিকে রাখা হয়নি। স্যামি প্রশ্ন জানতেন না। পরীক্ষা হলে প্রশ্নপত্র দেখে অবশ্য খুশিই হলেন। প্র্যাকটিক্যাল ওরিয়েন্টেড প্রশ্ন। ছোট এবং টু দ্য পয়েন্ট উত্তর চাই। বেশি লিখতে হবে না। বেসিক জিনিস জানলে পাশ। আর একটু বেশি জানলে বেশি নম্বর। সবটা জানলে অনার্স।
পরীক্ষা হলে একবার টহল দিলেন স্যামি। বৃন্দার সিট পড়েছে সেকেন্ড রো-তে। মেয়ের পাশে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘প্রশ্ন কেমন হয়েছে?’
‘ঠিকঠাক।’ স্যামিকে পাত্তা দিল না বৃন্দা। স্যামি একপলক দেখলেন, মেয়ে শর্ট নোটের উত্তর লিখছে। পরীক্ষা হলে আর থাকেননি স্যামি। ওখান থেকে বেরিয়ে ডিপার্টমেন্টে এসেছিলেন। রাউন্ড ও অন্যান্য কাজকর্মের শেষে শান্তিধাম। আজ বিকেলে দুটো ওটি ছিল। দুটোই কমপ্লিট। পেশেন্টরা রিকভার করছে। বাকিটা কুনাল সামলাবে। স্যামি কুনালকে বলল, ‘কী হে! অত মন দিয়ে কী পড়ছ?’
কুনাল কফি খেতে খেতে একটা বই পড়ছে। ফ্যাকাশে হেসে বইটা দেখাল। ইন্ডিয়ান রেলওয়ের টাইম টেবিল।
কুনাল আগের থেকে অনেক বদলে গেছে। বাঁজাপলাশ গ্রামের সেই পর্বের পরে স্পেশাল ব্রাঞ্চের বাদশা ঘোষের জেরার মুখোমুখি হতে হয়েছে দফায় দফায়। কুনালের শরীরে অত্যাচারের স্পষ্ট দাগ ছিল। এটাও প্রমাণিত হয়েছিল যে ওকে জোর করে মদ খাওয়ানো হয়েছিল। বাদশা তাই কাস্টডিতে নেননি। কিন্তু কুনালকে নিয়মিত লালবাজারে হাজিরা দিতে যেতে হত।
কাগজে ছবি বেরিয়েছে, দুই ষণ্ডামার্কা পুলিশ তার কাঁধ ধরে আছে। তলায় ক্যাপশান, ‘রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ চিকিৎসকের বিরুদ্ধে।’ এর থেকে বড় সর্বনাশ মানুষের জীবনে আর কীই বা আসতে পারে? এটা যে শুধুমাত্র অভিযোগ, এটা আদালতে ভুল প্রমাণ হতে পারে, সে কথা মানুষের মনে থাকে না।
জগদ্দলের অবস্থা খুব খারাপ। গিন্নি বাড়ি থেকে বেরোতে পারছে না। ছেলেমেয়েদুটো ইস্কুল যেতে পারছে না। সবচেয়ে বড় কথা গিন্নি ফোন করে বলেছে, ‘তুমি এখন বাড়ি এসো না। তোমায় না দেখতে পেলে পাবলিক দশ দিনে সব ভুলে যাবে। কিন্তু চোখের সামনে দেখলে উল্টোপাল্টা বকবে। ও আমি সহ্য করতে পারব না।’
ছেলেমেয়েও ফোনে বলেছে, ‘বাবা। তুমি এসো না।’
কুনাল তা হলে যায় কোথায়? যতক্ষণ কাজের মধ্যে থাকে, কিছু মনে থাকে না। কাজ শেষ হলেই একাকীত্বের ব্যাধি গিলে খেতে আসে। হঠাৎ মনে পড়ে যায় তাপসীর মুখ। খরখরে গলার আওয়াজ, শ্যামলা গায়ের রং, খসখসে চামড়া। একজন যৌবনোত্তীর্ণা মহিলাকে গণধর্ষণ করা হল। কুনাল কিছু করতে পারল না। রাগে, অসহায়তায়, নিজের প্রতি ঘৃণায় মাথা ঠুকতে ইচ্ছে করে। কুনাল বুঝতে পারে, বউয়ের ফোনের বক্তব্যের পিছনে অন্য মানসিকতাও আছে। কাগজে বা টিভিতে তাপসীকে নিয়ে যত রকম খবর বেরিয়েছে, তার অন্যতম অ্যাঙ্গেল ছিল কুনালের সঙ্গে তার সম্পর্ক। ফাঁকা জায়গা, ফাঁকা বাড়ি, বিধবা নারী ও বিবাহিত পুরুষ, বিয়ারের বোতল… এসব তথ্য খবরে পেঁয়াজ-মশলা যোগ করেছে। পাবলিক গপগপিয়ে গিলেছে।
ইন্ডিয়ান রেলওয়ের টাইম টেবিলের মধ্যে একটা ভাঁজ করা ম্যাপ রয়েছে। স্যামি কফি খেয়ে উঠে যাওয়ার পরে ম্যাপটা খুলল কুনাল। একাধিক ভাঁজ খোলার পরে বড়সড়ো এক ভারতবর্ষের মানচিত্র তৈরি হল। মানচিত্রের দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে রইল কুনাল।
পঞ্চাশ বছরের কাছাকাছি পৌঁছে নিজেকে নিয়ে সমীক্ষায় বসল কুনাল। জীবনের ব্যালান্স শিট করার সময় হয়ে গেল। কী হতে চেয়েছিলাম, কী হয়েছি। কী করতে চেয়েছিলাম, কী করে উঠতে পারলাম। কী করা হয়ে উঠল না।
খবরের কাগজে পাত্রপাত্রীর বিজ্ঞাপনের ভাষায়, ‘জগদ্দলে নিজস্ব দ্বিতল বাসগৃহ।’ সামনে অনেকটা বাগান। ওপর নীচ মিলিয়ে গোটা পাঁচেক ঘর। গৃহকর্তা ও কর্ত্রীর একটি বেডরুম, দুই ছেলে মেয়ের একটি করে বেডরুম, একটি গেস্টরুম। সেটি সারা বছর তালা বন্ধ থাকে। বাড়িটা বহুকাল আগে গিন্নি ও ছেলেমেয়ের নামে গিফ্ট ডিড করে রেখেছিল কুনাল। কেন করেছিল, জানে না। আজ মনে হচ্ছে, হয়তো জানত, একদিন এই অস্তিত্বের সংকট দেখা দেবে।
তিনটে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট। সবকটাই গিন্নির সাথে জয়েন্ট। ‘ইদার অর সারভাইভার।’ এলআইসি করানো আছে গোটা চারেক। নমিনি গিন্নি ও পুত্রকন্যা। মিউচুয়াল ফান্ড এবং রেকারিং ডিপোজিটে টাকা কম নেই। পোস্ট অফিসে এমআইএস করানো আছে। সবই জয়েন্ট অ্যাকাউন্ট। তার অবর্তমানে স্ত্রী ও পুত্রকন্যারা জলে পড়বে না। বরং ভালোই থাকবে।
ব্যাঙ্কের লকারে তিরিশ ভরি সোনা আছে। বিয়ের সময়ে পাওয়া। বউ সে সবের মালিক। ছেলেমেয়ে পড়াশুনোয় ভালো। ওদের হায়ার এডুকেশনের জন্য এফডি করানো আছে। উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করার পরে হায়ার স্টাডিজে টাকা লাগলে পেয়ে যাবে। বিদেশে গেলেও অর্থাভাব হবে না।
কুনালের কাছে একটা সেল্ফ-হেল্প বই আছে। নাম, ‘হু উইল ক্রাই, হোয়েন ইউ ডাই?’ মেডিকাল রিপ্রেজেনটেটিভরা হাবিজাবি গিফ্ট দেয়। তার মধ্যে এই বইটাও ছিল। পড়ে দেখার প্রয়োজন বোধ করেনি কুনাল। বই পড়ার অভ্যাস তার নেই। কিন্তু বইয়ের নামটা তাকে হন্ট করেছিল।
তুমি মারা গেলে কে তোমার জন্য কাঁদবে? অজানা লেখকের না–পড়া বইটির নাম এখনও হন্ট করছে কুনালকে। সে, ডক্টর কুনাল বোস, এমবিবিএস ক্যাল, ট্রেইনড ইন সার্জারি, আরএমও অব শান্তিধাম, দুই সন্তানের পিতা, স্বামী… এতগুলো পরিচয়। সে যদি মারা যায়, তার জন্য কে কে কাঁদবে?
বাচ্চা দুটো কাঁদবে। কুনাল নিশ্চিত। গিন্নিও কাঁদবে, তবে দিন দশেকের জন্য। তাদের বিবাহ সম্পর্কের মধ্যে আর যাই থাক না কেন, ভালোবাসা ছিল না। গিন্নিকে কুনাল কখনও চিনতে পারেনি। গিন্নিও কুনালকে চেনার চেষ্টা করেনি। অর্থনৈতিক সমস্যা থাকলে গালাগালি করত। সেদিকটা কুনাল মেরে রেখেছে।
বাচ্চা দুটোকে দেখতে ইচ্ছে করছে। তবে ও সব নিয়ে মায়া না বাড়ানোই ভালো। ও সব ফালতু বন্ধন। ভারতবর্ষের মানচিত্রের দিকে তাকিয়ে থাকে কুনাল।
না। মরার ইচ্ছে তার নেই। জীবন একটা কাজের জিনিস। এত সহজে তাকে ছাড়বে না কুনাল। দু’বেলা দু’মুঠো খাওয়া, আকণ্ঠ ঘুম, মাঝে মধ্যে কামেচ্ছা জাগলে শরীরে শরীর ঘষা—এই তো চাহিদা। এতে বাধা দিচ্ছে কে?
জীবনের ব্যালান্স শিট মেলায় কুনাল। বাধা দিচ্ছে তার পরিচয়। এই শান্তিধাম, এই কলকাতা শহর, এই পশ্চিমবাংলা, এই চেনা পরিমণ্ডল। এই মায়া।
একে ছাড়তে হবে।
ব্যালান্স শিটে লাভের ঘরে জ্বলজ্বল করছে ডাক্তারি ডিগ্রি। এ এমন এক যোগ্যতা, যার কোনও মার নেই। গাছতলায় বসে রোগী দেখা শুরু করলেও পশার হবে। সে লোভী নয়, তার প্রয়োজন অল্প। দু’বেলা দু’মুঠো খাবার হলেই চলে যাবে। তবে আর মায়া বাড়িয়ে লাভ কি?
চেয়ার থেকে ওঠে কুনাল। স্টেথোস্কোপ, ব্লাড প্রেশার মাপার যন্ত্র এবং আনুষঙ্গিক ডাক্তারি যন্ত্রপাতি ভরতি ব্যাগটা কাঁধে ঝোলায়। নিজের ঘরে ঢুকে অ্যাকাডেমিক ফাইল থেকে শুধুমাত্র ডিগ্রির কাগজ এবং রেজিস্ট্রেশান নম্বরটা ব্যাগে ভরে। প্যান্টের হিপ পকেট থেকে বার করে ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড। কাঁচি দিয়ে কুচিকুচি করে কার্ড দুটো কেটে নর্দমায় ফেলে দেয়। ছোট্ট পাউচে ভরে পাসপোর্ট, ভোটার আইকার্ড, প্যানকার্ড, ড্রাইভিং লাইসেন্স, অন্যান্য নানা পরিচয়পত্র, যা বলে দেয় তার নাম কুনাল। ব্যাংক, এলআইসি এবং অন্যান্য ফিনান্সিয়াল ডকুমেন্ট একটা ফোল্ডারে ভরে ঘর থেকে বেরোয়। মানিব্যাগে কত টাকা আছে দেখার প্রয়োজন বোধ করে না।
সুজাতা টিভি দেখছিল। তার হাতে ফোল্ডার আর পাউচটা তুলে দিয়ে কুনাল বলে, ‘এ দুটো বসকে দিয়ে এসো।’
‘আপনি কোথাও বেরোচ্ছেন?’ ফোল্ডার আর পাউচ নিয়ে প্রশ্ন করে সুজাতা। ‘বস ন’টা নাগাদ রাউন্ডে আসবেন। তখন আপনি থাকবেন তো?’
কুনাল উত্তর দেয় না। দেওয়ালে তাপসীর একটা বড় ছবি টাঙানো রয়েছে। তাপসী মারা যাওয়ার পরে পুরোনো অ্যালবামের একটা গ্রুপ ফোটো থেকে ক্রপ করে এই ছবিটা তৈরি করেছিল কুনাল। দশ বাই বারো ইঞ্চি মাপে এনলার্জ করে, ফ্রেমিং করে দেওয়ালে টাঙিয়েছিল। এখনও ছবির ফ্রেমে শুকনো মালা ঝুলছে।
শুকনো ফুল ট্র্যাশবিনে ফেলে দিয়ে কুনাল ছবিতে মাথা ঠেকিয়ে নমস্কার করে।
‘আপনি কোথাও যাচ্ছেন?’ আবার প্রশ্ন করে সুজাতা। হাতের টাইম টেবিল নেড়ে কুনাল বলে ‘হ্যাঁ।’ তারপর ঘর ছেড়ে বেরোয়।
লিফ্টে একতলা। ফাঁকা ফয়্যার। গেটের পাশে সুলতান বসে রয়েছে। কুনালকে দেখে দরজা খুলে বলল, ‘কাঁহা যা রহা হ্যায় স্যর?’
উত্তর না দিয়ে এস আর দাস রোডে পা রাখে কুনাল। শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি রোডে একগাদা ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে। তাদের একজনকে বলে, ‘হাওড়া স্টেশন।’ তারপর ট্যাক্সির দরজা খুলে পিছনের সিটে শরীর এলিয়ে দেয়।
ভারতবর্ষে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ হারিয়ে যায়। আজ তাদের দলে আর একজন নাম লেখাল। থানাপুলিশ, ভবানী ভবন, মিসিং পারসন্স স্কোয়াড, সন্ধান চাই— এই সব পর্ব চুকে গেলে, ছ’মাসের মধ্যে আশা করা যায় সবাই তাকে ভুলে যাবে।
কুনাল মরতে পারবে না। সন্ন্যাসীও হতে পারবে না। তার অন্য ভাবে বাঁচার ইচ্ছে হয়েছে। একই জীবন দু’বার বাঁচা যাবে না কেন? সে কোনও অন্যায় করছে না। নাম ভাঁড়াচ্ছে না। পেশা বদলাচ্ছে না। শুধু অন্য কোথাও বাকি জীবনটা কাটাতে চাইছে।
বাকি জীবন মানে কত দিন? বছর কুড়ি? বড় জোর তিরিশ? এই তিরিশ বছরের মধ্যে সে পনেরো বছর ঘুমোবে। বাকি সময়টা অল্পবিস্তর রোগী দেখবে, অল্পবিস্তর খাওয়াদাওয়া করবে, অল্পবিস্তর রমণীসঙ্গ করবে। আর, মাঝে মাঝে তাপসীর কথা ভাববে।
অন্য কোথাও মানে কী? কুনাল জানে না। এত বড় একটা দেশ। এত বড় মানচিত্র! তার মধ্যে সে হারিয়ে যেতে পারবে না?
নিশ্চয়ই পারবে। ট্যাক্সির পিছনের সিটে বসে, চোখ বুঁজে হাওড়া স্টেশনের জন্য অপেক্ষা করছে কুনাল।
.
