১৩. অভিজ্ঞান
পাগল পাগল লাগছে অভির। একসঙ্গে একগাদা ঘটনা হুড়মুড় করে তার জীবনে ঘটে যাচ্ছে। যেভাবে পাহাড়ি ধসের সময় নেমে আসে বোল্ডারের পর বোল্ডারের পর বোল্ডার, পথচারীর পালানোর পথ থাকে না, সেই ভাবে ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে দৌড়ে পেরে উঠছে না অভি। দৌড়চ্ছে, ড্রিবল করছে, ডজ করছে, লাফাচ্ছে। লাভ হচ্ছে না। একটা না একটা পাথর তাকে পেড়ে ফেলছে। তার সামনে এখন একটাই রাস্তা। অন্তহীন খাদের দিকে অপ্রতিরোধ্য পতন। ওয়ান ওয়ে টিকেট। নিজেকে নিয়ে কী করবে ভেবে পায় না সে। পাগল পাগল লাগে।
ইলেকশানের নমিনেশন পেপার জমা দেওয়ার দিন কলেজে যে গন্ডগোল হল তার ঢেউ আছড়ে পড়েছে বাড়িতে। মনোজ রেগে কাঁই। বড় ছেলে নকশালপন্থী রাজনীতি করে, এ পর্যন্ত ঠিক ছিল। ছোট ছেলে কালচারাল সেক্রেটারির পোস্টে ভোটে দাঁড়িয়েছে—এটা শুনে বাড়িতে তুলকালাম বাঁধিয়ে দিল। হতে পারে সেই দল মনোজের পছন্দের দল, কিন্তু মনোজ চায় না যে অভি রাজনীতি করুক। সৌভাগ্যবশত নমিনেশান পেপার জমা দেওয়ার দিন অভি কলেজে যায়নি।
রেপ স্যারের মোবাইলে তোলা ভিডিয়োর কল্যাণে চন্দন এখন সকলের চেনা মুখ। সুরজ, চিকনা, বাবলু, হ্যাপি তিওয়ারি— এইসব নাম লোকের মুখে মুখে ফিরছে। ট্রেনের ডেলি প্যাসেঞ্জার, শাট্ল ট্যাক্সির ড্রাইভার, অফিস বাবু, পাড়ার আড্ডায় পঞ্চপাণ্ডব—সবার মুখে একটাই কথা, ‘ডাক্তারি পড়তে গিয়ে এরা এইসব করে? এরা ভবিষ্যতে আমাদের চিকিৎসা করবে?’
পঞ্চপাণ্ডব পাড়ার রকে আড্ডা মারছিল। অভি কলেজ থেকে ফিরছে, তাকে পাকড়ে প্রথম পাণ্ডব বলল, ‘তুই কবিতা ফবিতা লিখিস। তুই বুঝবি। আমি আজ সকালে একটা বই পড়ছিলাম। নাম, “বাংলা সাহিত্যে ডাকাতের ভূমিকা।” পড়া শেষ করে দেখলাম আগাগোড়া ছাপার ভুলে ভর্তি। বইটার নাম আসলে, “বাংলা সাহিত্যে ডাক্তারের ভূমিকা।” ’
অভি শুকনো হেসে বলল, ‘দারুণ জোক।’
দ্বিতীয় পাণ্ডব বলল, ‘তোদের বোমা বাঁধা শেখায়?’
অভি বলল, ‘না।’
তৃতীয় পাণ্ডব বলল, ‘পিস্তল চালানো?’
‘না।’
চতুর্থ পাণ্ডব বলল, ‘তাহলে তোরা কী শিখিস?’
অভি শুকনো মুখে বলল, ‘এসব ছাড়াই মানুষ মারতে শিখি।’
পঞ্চম পাণ্ডব হাসতে হাসতে বলল, ‘ডাক্তারি পড়তে ঢুকে তোর সেন্স অব হিউমারটা যায়নি দেখছি।’
‘আমরা জেম্স বন্ডের মতো। লাইসেন্সড টু কিল, উইথ আ স্মাইল অন আওয়ার ফেস।’ পঞ্চপাণ্ডবকে টাটা করে লক্ষ্মী নিবাসে ঢোকে অভি।
মনোজ আর অরুণার মধ্যে আবার ঝগড়া বেঁধেছে। অরুণা নীচু গলায় বলছেন, ‘জানো ঋষিতা, আজ তোমার মনোজ নীল রঙের ফতুয়া আর সাদা রঙের পাজামা পরেছে। অফিস থেকে ফিরে চান সেরে এখন টিভি দেখছে। তোমার মনোজের টিভি মানে তো নিউজ চ্যানেল দেখা। সরকারের নামে নিন্দে করে যেসব চ্যানেল, সেগুলো তোমার মনোজ দেখে না।’
‘আহঃ, থামবে?’ চায়ে চুমুক দিয়ে বলেন মনোজ। তিনি দেখছেন স্কুপ চ্যানেল। অরুণা মনোজের কথা শুনতে পাননি, অথবা শুনেও না শোনার অভিনয় করছেন। তিনি বললেন, ‘এখন তোমার মনোজ স্কুপ চ্যানেল দেখছে। এইটা ওর পছন্দের চ্যানেল।’
‘বাজে না বকে দেখো কী দেখাচ্ছে,’ খেঁকিয়ে ওঠেন মনোজ, ‘মায়াকম আবার একগুচ্ছ স্কিম বাজারে এনেছে। ওদের এজেন্টরা পাড়ায় পাড়ায়, গ্রামে গ্রামে, মহল্লায় মহল্লায় পৌঁছে যাচ্ছে। রোজ একশো টাকা জমা রাখলে তিন বছরে টাকা ডবল হবে। মেয়েদের জন্য স্কিমের নাম নারীশক্তি। বাচ্চাদের জন্য স্কিমের নাম শিশুশক্তি, খেতমজুরদের জন্য স্কিমের নাম শ্রমশক্তি। এই এমপাওয়ারমেন্ট আর কোন রাজ্যে আছে? শুধু নিন্দে করলে আর বিরোধিতা করলে হয় না। কাজ করতে হয়। কাজ করলে ভুল হবেই। ভুলের ফর্দ দেখিয়ে মৃন্ময় চ্যাটার্জি ভোটে জিততে পারবে না।’
রাধা চুপচাপ বসে আটা মাখছিল। সে হঠাৎ কুলকুলিয়ে হাসতে লাগল। মানদা বলল, ‘পাগলির মরণ! হাসছিস কেন?’
রাধা বলল, ‘পায়ে ধরে সাধা, রা নাহি দেয় রাধা।’
অভি এতক্ষণ চুপ করে সব শুনছিল। এবার বলল, ‘গুপ্তধন।’
‘সেটাই তো বলছি গো!’ রাধা এখনও হাসছে। ‘তিন বছরে টাকা ডবল করছে কোন গৌরী সেন? আমার কাছে ‘পাঁচ রুপাইয়া বারা আনা’ আছে। আমি তার কাছে গচ্ছিত রাখতে চাই।’
‘ওফ! গৌরী সেন নয়। এটা একটা নন ব্যাঙ্কিং অরগানাইজেশান। ওরা বাজারে টাকা খাটায়।’ বিরক্ত হয়ে বলেন মনোজ।
মানদা বলে, ‘আমার কাছে কিছু ট্যাকা জমেছে। ভাবছিলুম ব্যাঙ্কে রাখব। কিন্তু ব্যাঙ্কে এত ভিড় হয়! আর ব্যাঙ্কের লোকগুলো সব সময় খারাপ ব্যাভার করে!’
‘মর মাগি! ছ’পয়সা রোজগার করিস না, যাবি ব্যাঙ্কে। কলমি শাকের আবার ক্যাশমেমো!’ আওয়াজ দেয় রাধা। অরুণা সবাইকে থামিয়ে বলেন, ‘চুপ! আমি ঋষিতার সঙ্গে কথা বলছি। জানো ঋষিতা, আজ তোমার মনোজের জন্য মুরগির ঠ্যাং রেঁধেছি। ঝাল দিয়েছি খুব। ওর ভালো লাগবে, বলো?’
‘ধুর সালা!’ হাতের রিমোট ছুড়ে ফেলে গর্জন করে ওঠেন মনোজ। ‘এটা বাড়ি না পাগলা গারদ? আর একটা কথা বললে ঘাড় ধরে বাড়ি থেকে বার করে দেব।’
মনোজের চিৎকারে সব্বাই চুপ। অরুণা নিজের ঘরে গিয়ে খিল দিলেন। মানদা আর রাধা নীচে চলে গেল। বিলু ঘর থেকে বেরোল না। আর অভি বুঝল আজও রাতে বাড়ির কেউ খাবে না।
চিলেকোঠার ঘরে পেটে কিল মেরে শুয়ে অভির মনে পড়ে কলেজ ইলেকশানের কথা। একমাসের ঝোড়ো ক্যাম্পেনের দিনগুলোয় পড়াশুনো লাটে উঠেছিল। রোজ ক্লাস লেকচারিং, ছাত্রছাত্রীদের কাছে ভোট ভিক্ষা। রোজ পোস্টার লেখা আর সাঁটা, লিফলেট বিলি, ব্যানার ঝোলানো, প্ল্যাকার্ড টাঙানো। একমাসের পরিশ্রমের শেষে কী লাভ হল? অভি ভোটে হেরে গেল। হেরো অভির ব্যর্থতার মুকুটে আর একটা পালক যুক্ত হল।
ফার্স্ট এমবিবিএসে ফেল, বৃন্দার ঝাড় নামানো, ইলেকশানে হারা, এরপরে জীবনে আর কোনও ব্যর্থতা থাকার কথা নয়। কিন্তু অভি জানে, আছে। সামনেই সেকেন্ড এমবিবিএস। আর একটা ফেল অপেক্ষা করছে তার জন্য।
পরীক্ষার কুড়ি দিনও বাকি নেই। প্রিপারেশান খুব খারাপ। কাল প্যারাসাইটোলজির প্র্যাকটিকাল ক্লাস। পরজীবী সংক্রান্ত টেক্সট বুক খোলে অভি।
.
মাইক্রোবায়োলজি পড়ানোর কথা যে ম্যাডামের, বাচ্চা হবে বলে তিনি ছুটিতে আছেন। প্যাথলজির রিনা ম্যাডাম তাই প্যারাসাইটোলজির ক্লাস নিচ্ছেন। তিনি বাঁশির মতো সরু গলায় বললেন, ‘প্র্যাকটিকাল পরীক্ষার সময় স্টুলে প্যারাসাইট খুঁজে বার করতে হবে। যেটা খুঁজে পাবি, তার ওপরে ভাইভা হবে।’
অভির এক পাশে বসে সুরজ। অন্য পাশে জেম্সি। জেম্সির পাশে চন্দন। চন্দনের পাশে বৃন্দা। দময়ন্তী সামনের সিটে বসেছে। বৃন্দা ফিসফিস করে চন্দনকে জিজ্ঞাসা করল, ‘নতুনগ্রাম থেকে কখন ফিরলি?’
‘একটু আগে। কাল রাতে বাড়ি ঢুকলাম রাত আটটায়। সকালে তাই তাড়াহুড়ো করিনি। অফিস টাইমের ট্রেনে খুব ভিড় হয়। সেটা পার করে বাড়ি থেকে বেরোলাম।’
সামনে থেকে দময়ন্তী বলল, ‘অ্যাই চন্দন, আমার মা তোদের গ্রামে যাবে। কী সব কাজ আছে। তোর ফোন নাম্বার চেয়েছে।’
বৃন্দাকে চন্দনের সঙ্গে কথা বলতে দেখে একদলা ফিতাকৃমি অভির মাথার ওপরে থ্যাপ করে বসল। আঠালো আর পিচ্ছিল শুঁড় নাড়িয়ে তারা ছড়িয়ে পড়ছে মুখে, ঘাড়ে, গলায়। অভির সারা শরীর ঘেন্নায় কুঁচকে যায়। নিজের অনুভূতি চাপা দেওয়ার জন্য সুরজকে সে জিজ্ঞাসা করে, ‘প্রিপারেশান কেমন চলছে?’
‘নট ব্যাড!’ শ্রাগ করে সুরজ। ‘তোর কী অবস্থা?’
‘খুব খারাপ!’ সত্যি কথা বলে অভি।
‘তোর শালা বাঁজা কপাল, কুত্তা রাশি, খচ্চর গণ। যাতে হাত দিস সেটাই জ্বলে ছারখার হয়ে যায়। না হলে প্রবালের মতো ছেলে কালচারাল সেক্রেটারির পোস্টে জেতে? তুই অপোনেন্ট বলে জিতল।’
‘তোর দলের ছেলে জিতল। তুই খুশি নোস?’
‘একশোবার খুশি। কিন্তু ও কোনও কাজ করবে না। এখন আমার হয়েছে হাম্পু। ওপিয়ামের সব কাজ দেখতে হবে।’
সুরজের কথা শুনে ফিক করে হেসে ফেলে অভি। ঠিকই তো। তার মতো অপয়া আর ক’টা আছে? সে ভালো ছাত্র হতে পারছে না, ভালো সন্তান হতে পারছে না, ভালো ছাত্রনেতা হতে পারছে না। প্রেমিক হতেও পারেনি। নিজের ওপর ঘৃণায় মুখে একদলা থুতু চলে আসে।
মাইক্রোস্কোপের পিছন থেকে রিনা ম্যাডাম হাঁক পাড়ছেন, ‘চলে এসো। চারটে মাইক্রোস্কোপে চারটে স্লাইড রাখা আছে। সবাই এক মিনিট করে দেখবে। ফিল্ড চেঞ্জ করবে না। কী পেলে সেটা খাতায় লিখবে। তারপর আমি এক এক করে পড়া ধরব।’
অভি সচেতন ভাবে ডানদিকের মাইক্রোস্কোপের সামনে দাঁড়াল। যাতে বৃন্দাকে তার লাইনে দাঁড়াতে না হয়। সুরজ দেখার পরে মাইক্রোস্কোপের ভিউ ফাউন্ডারে চোখ রাখে অভি। সব কিছু আউট অব ফোকাস। সে কিছুই দেখতে পেল না। সবার দেখা শেষ হতে যে যার আসনে বসল। রিনা ম্যাডাম প্রথম প্রশ্ন করলেন অভিকে, ‘কী পেয়েছিস! বল।’
‘ফিকাল ম্যাটার শো-জ…শোজ…’ এইটুকু বলে থেমে যায় অভি।
রিনা ম্যাডাম অবাক হয়ে কিছুক্ষণ অভির দিকে তাকিয়ে থাকেন। অবশেষে দীর্ঘশ্বাস ফেলে অভির মাথায় গাঁট্টা মেরে বললেন, ‘এখানে কী আছে? ফিকাল ম্যাটার? মানুষের না গোরুর?’
সারা ক্লাস খুকখুক করে হাসছে। রাগে, অপমানে অভির চোখ দিয়ে জল বেরোনোর উপক্রম। রিনা ম্যাডাম বললেন, ‘যে পারবে এবার তাকে জিজ্ঞাসা করি। বৃন্দা, বল।’
বৃন্দা বলল, ‘অ্যাসকারিসের ওভা পেয়েছি।’
পাশ থেকে চন্দন বলল, ‘স্লাইডে প্রচুর শ্বেতকণিকা আর লোহিতকণিকা আছে। বোধ হয় অ্যাকিউট গ্যাস্ট্রো-এন্টেরাইটিসের পেশেন্ট।’
অভির মাথায় ঝমঝম করে শব্দ হচ্ছে। চন্দন আর বৃন্দাকে সপ্রতিভ ভাবে প্রশ্নের উত্তর দিতে দেখে তার মাথায় বৃষ্টি হচ্ছে। শব্দের বৃষ্টি। পংক্তির বৃষ্টি। অনুচ্ছেদের বৃষ্টি। রাফ খাতা টেনে নিয়ে অভি গড়গড় করে লিখতে থাকে…
‘কতটা দূরে গেলে হবে?
কতটা কাছে এলে হবে?
কতটা কাছে এবং দূরে
এলে এবং গেলে হবে?
.
কতটা ভালোবেসে হবে?
কতটা কেঁদেহেসে হবে?
কতটা দূর কেঁদেহেসে
এবং ভালোবেসে হবে?
.
কতটা তুমি বিরহিনী
কতটা তুমি আরোহিনী
আরোহন ও বিরহেতে
কতটা পারদর্শিনী?
.
তোমার সাথে ও ছেলেটা কে?
ছেলেটা, ভেলভেলেটা কে?
ভেলভেলেটা ছেলেটাকে
আমার সঙ্গে বদলাবে?
.
কবিতাটা লিখে মুখ তুলে চারপাশ দেখল অভি। রিনা ম্যাডাম প্রোজেক্টরে বিভিন্ন কৃমির ছবি দেখাচ্ছেন। ছেলেমেয়েরা নিজের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে নিচ্ছে। অভি চুপ করে বসে রইল। তার এখন পড়াশুনো করতে ইচ্ছে করছে না। মনে একটাই বাসনা। ক্লাস শেষ হলে লাইব্রেরিতে গিয়ে কবিতাটা ফেয়ার করতে হবে। অনেকগুলো পংক্তিতে ছন্দে গণ্ডগোল আছে।
প্র্যাকটিকাল ক্লাসের পরে আর কিছু নেই। সবাই দুদ্দাড়িয়ে হোস্টেল বা বাড়ি পালাল। অভি লাইব্রেরির দিকে এগোল। পদ্যটা ঠিকঠাক করে প্যারাসাইটোলজিতে চোখ বুলোবে। লাইব্রেরির কোণের দিকের চেয়ারে বসে পদ্য কারেকশান শুরু করেছে, দময়ন্তী সামনে এসে বসল। চমকে উঠে, খাতা বন্ধ করে অভি বলল, ‘হোস্টেলে গেলি না?’
‘আজ বৃহস্পতিবার। আগামী সোমবার থেকে আমি হোস্টেলে থাকব।’ ব্যাকপ্যাক থেকে মিন্ট ফ্লেভার্ড চিউইং গাম বার করে একটা মুখে পুরে অন্যটা অভির দিকে এগিয়ে দেয় দময়ন্তী।
‘তোর অবশ্য হোস্টেলে থাকা না থাকা দিয়ে কিছু আসে যায় না। বাড়ি ফিরতে পাঁচ মিনিট সময় লাগে।’ চিউইং গাম চিবোতে চিবোতে বলল অভি। মিন্টের কারণে গলা ঠান্ডা হয়ে গেল। খুব আরাম লাগছে।
‘শুধু ঐ জন্যে কেউ হোস্টেলে থাকে? গাধা!’ অভিকে ধমকায় দময়ন্তী। ‘হোস্টেলে থাকে গ্রুপ স্টাডির জন্য। বৃন্দা সোমবার থেকে থাকবে, তাই আমিও।’
আলোচনার মধ্যে অনভিপ্রেতভাবে বৃন্দা ঢুকে পড়ায় অভি থতমত খেয়ে বই খোলে। প্রসঙ্গ বদলাতে দময়ন্তী বলে, ‘আমাদের কলেজটা কী বিচ্ছিরি ভাবে নিউজ আইটেম হয়ে গেল। তাই না?’
‘এটা ভবিতব্য ছিল। জনমোর্চা বরাবর চেয়েছে প্রতিটি মানুষকে দেগে দিতে। প্রতিটি মানুষের পিঠে ছাপ্পা দিতে। যে, হয় তুমি আমাদের দলে। না হলে ওদের দলে। হয় তুমি আমার বন্ধু, না হলে আমার শত্রু। হয় আমরা, নয় ওরা। বহুস্বরের অস্তিত্ব এরা অস্বীকার করেছে। তার পরিণতি যা হওয়ার তাই হয়েছে। পোলারাইজেশান সম্পূর্ণ। পুরোটাই জনমোর্চার বিরুদ্ধে।’
‘পুরোটা কোথায়?’ আপত্তি করে দময়ন্তী।
‘ওয়েট অ্যান্ড ওয়াচ। বিধানসভা ইলেকশান আসতে দে। কী রেজাল্ট হয় দেখতে পাবি। এনিওয়ে, কলেজ ইলেকশানের ভোটে হেরে গিয়ে আমি হ্যাপি। বাড়িতে এই নিয়ে প্রবল ঝামেলা। দাদার কারবার নিয়ে বাবা মা অলরেডি খেপচুরিয়াস। আমি ভোটে দাঁড়ানোয় সিচুয়েশান হাতের বাইরে চলে গিয়েছিল। এখন কিছুটা হলেও শান্তি ফিরেছে।’
বিলুর প্রসঙ্গ ওঠায় এবার দময়ন্তী অস্বস্তিতে। প্রসঙ্গ পাল্টানোর জন্য সে বলল, ‘আমার মা যে নিউজ ম্যাগাজিনটায় চাকরি করে, তারা আমাদের নিয়ে একটা গোল টেবিল আড্ডা রেকর্ড করল গতকাল। খুব ইন্টারেস্টিং হল।’
মুখ বেঁকিয়ে অভি বলল, ‘ডিজাইনার শাড়ি, ডিজাইনার গাড়ি, ডিজাইনার ঘড়ির পরে এবার ডিজাইনার আড্ডা। ওসবের কোনও মানে নেই।’
‘তুই বাবা বড্ড সিরিয়াস। লাইট কিছু বল না!’
‘যে মেয়েটা ফ্রেসার্স ওয়েলকামে শঙ্খ ঘোষের কবিতা আবৃত্তি করেছিল, তার সঙ্গে সিরিয়াস কথাই বলতে ইচ্ছে করে। তুই চাইলে আমি সলমান খানের নতুন হেয়ার স্টাইল বা শাহরুখ আর গৌরি খানের ঝগড়া নিয়েও কথা বলতে পারি।’
‘ঠিক হ্যায় বস। তাহলে অন্য কথাই হোক। বৃন্দাহীন জীবন কেমন কাটছে?’
দময়ন্তীর ঘুষিটা আসছে, অভি বুঝতে পারেনি। অভিঘাত হল তীব্র। ভুরু কুঁচকে, মুখ টিপে, ঘুষিটা নিল অভি। তারপর পাল্টা ঝাড় দিল। ‘বিলুহীন জীবন তোর কেমন কাটছে, দময়ন্তী? দাদা যে ভালো নেই সেটা আমি জানি। তোর কথা বল।’
বিলুর প্রসঙ্গ এসে পড়ায় দময়ন্তী কিছুক্ষণ চিইউং গাম চিবোল। বলল, ‘মেয়েরা ইমোশনালি ছেলেদের থেকে অনেক স্ট্রং হয়। ঝড়ঝাপটা সামলানো আমাদের পক্ষে ইজিয়ার। আমি নিজেকে নিয়ে অতটা বদার্ড নই, যতটা তোর দাদাকে নিয়ে। অনেকদিন কলেজে দেখছি না। আছে কেমন?’
‘ভালো নয়। ঝকঝকে দাদাটা কেমন হয়ে গেছে। সবসময় খোলসের মধ্যে ঢুকে থাকে। ঘর থেকে বেরোয় না। কলিং বেল বাজলে বা বাড়ির সামনে কেউ চ্যাঁচামেচি করলে চমকে ওঠে। বকাবকি করে স্নান করা বা দাড়ি কামানোর মতো কাজগুলো করাতে হয়। দিনরাত বই খুলে বসে থাকে। পড়ে কি না কে জানে!’
‘ওর মোবাইল?’
‘সিম নষ্ট করে দিয়েছে। মোবাইল ফেলে দিয়েছে। ওর সঙ্গে যোগাযোগ করার কোনও উপায় নেই। দাদার কড়া হুকুম, কেউ ল্যান্ড লাইনে ফোন করে ওর খবর নিলে যেন বলা হয়, বাড়িতে নেই। এমনকী আমি বা বাবা ফোন করলেও।’
‘মানে অভি বা অভির বাবা সেজে কেউ ফোন করলে?’
‘এক্স্যাক্টলি। কেন না, আমরা তো জানি যে ল্যান্ডলাইনে দাদাকে পাওয়া যাবে না।’ ডটপেন দিয়ে মাথা চুলকোয় অভি। ‘দাদা এত বাড়াবাড়ি কেন করছে, বুঝতে পারছি না। ফিয়ার সাইকোসিস না পুলিশের ভয়, নাকি দুটোই— কে জানে!’
‘আমার মনে হয় দুটোই।’
‘তৃতীয় একটা কারণও আছে। তুই। দাদাকে ঝাড় না দিলে এইরকম দেবদাস হয়ে যেত না।’
অভিযোগ শুনে চশমার ফাঁক দিয়ে কিছুক্ষণ অভিকে দেখল দময়ন্তী। বলল, ‘আমি ঝাড় দিইনি। তোর দাদা আর তার রাজনৈতিক সংসর্গ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছি। ঝাড় খেয়েছিস তুই। কই, তুই তো দেবদাস হয়ে যাসনি! ডিপ্রেশানেও ভুগছিস না।’
খুব কষ্ট করে অভি হাসল। বলল, ‘লোকে বলে মানব জীবনের সমস্ত শেড্স, সমস্ত মুহূর্ত নিয়ে রবি ঠাকুর গান বেঁধেছেন। এক্ষুনি একটা গান মনে পড়ল। শুনবি?’
মোবাইলের একটা ইয়ারপ্লাগ দময়ন্তীর দিকে এগিয়ে দেয় অভি। অন্যটা গোঁজে নিজের কানে। ‘প্লে’ বাটন টিপতেই দু’জনের কানে ছড়িয়ে পড়ে জর্জ বিশ্বাসের মন্দ্র কণ্ঠস্বর…
‘তুমি রবে নীরবে,
হৃদয়ে মম,
তুমি রবে নীরবে,
নিবিড়, নিভৃত
পূর্ণিমা নিশীথিনী সম…’
.
গানটা শুনতে শুনতে অভি আর দময়ন্তী দু’জনেই নিঃশব্দে কাঁদতে থাকে। দু’জনের অশ্রুতে ভিজতে থাকে লাইব্রেরির টেবিলের কাঠ। জাঁদরেল লাইব্রেরিয়ান মহিলা জার্নাল গোছানো ছেড়ে হাতে তুলে নেন রবি ঠাকুরের ছিন্নপত্র। যারা পড়াশুনো করছিল, তারা মোটামোটা বই টেবিলে রেখে জানলার ধারে গিয়ে দাঁড়ায়। জানলার কাচের ওপারে হাঁসের ডিমের কুসুমের মতো লালচে-হলুদ সূর্যদেব কাজ মুলতুবি রাখেন। আগুন ছড়ানো ছেড়ে, নির্দিষ্ট সময়ের আগেই ডুব দেন। কলকাতার আকাশে ঘনাতে থাকে কালো মেঘ। এফএম রেডিওয় আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা জানান, কেরালাতে মৌসুমী বায়ু এসে গেছে। পশ্চিমবঙ্গে তার আসার তারিখে আটই জুন। এই বছর জোরদার বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা আছে।
জর্জ বিশ্বাস গাইতে থাকেন…
.
ডানকুনি লোকালে চেপে বালিঘাট স্টেশনে অভি নামল রাত পৌনে আটটার সময়। দময়ন্তীর সঙ্গে গান শোনা, বকবক করা, অল্প পড়াশুনো করা—এইসব করতে করতে সাড়ে পাঁচটা বাজল। দাঁড়ে বসে এক কাপ চা খেয়ে দময়ন্তী গেল মৌলালির দিকে। অভি শেয়ালদা থেকে সাতটার ডানকুনি লোকাল ধরেছে।
বালিঘাট স্টেশনের পাশে শ্রীকৃষ্ণ বাস স্ট্যান্ড। কিছুদিন আগেও জিটি রোডের ওপরে শ্রীকৃষ্ণ নামের একটা সিনেমা হল ছিল। সিনেমা হল থেকে বাসস্ট্যান্ডের নাম হয়ে গিয়েছিল শ্রীকৃষ্ণ। কিছুদিন আগে নিবেদিতা সেতু নির্মাণের জন্য শ্রীকৃষ্ণ সিনেমা হল ভেঙে মাটিতে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে বাস স্টপেজের নাম শ্রীকৃষ্ণই রয়ে গেছে।
শ্রীকৃষ্ণ স্টপেজ থেকে অটোয় উঠে অভি ঠিক করল, বিলুর সঙ্গে কথা বলবে। এতটা গুটিয়ে যাওয়ার পিছনে ডিপ্রেশান কাজ করছে। সাইকায়াট্রিস্ট দেখতে হবে। তিনি যদি বলেন তাহলে কাউন্সেলিং করাতে হবে অথবা ওষুধ খাওয়াতে হবে। কিন্তু এই সবের আগে বিলুকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে। কে-ই বা নিজেকে মানসিক ভাবে অসুস্থ বলে মনে করে?
নিজের ঘরের দরজা-জানলা বন্ধ করে, ফ্যান চালিয়ে খাটে শুয়েছিল বিলু। আলো জ্বালিয়ে অভি দেখল বিলু চোখ কুঁচকে তার দিকে তাকিয়ে। সড়াত করে দৃষ্টি সরিয়ে ফাঁকা দেওয়ালে দৃষ্টি রাখল সে। বিড়বিড় করে বলল, ‘আলো নেভা।’
‘তোর লাইফে প্রবলেমটা কী আমায় বলবি? কিছুদিন আগেও মার্কস, লেনিন, স্ট্যালিন, মাও, চে ছাড়া কথা বলতিস না। এখন একেবারে বোবা।’
বিলু চুপ। দৃষ্টি পায়ের দিকে। অভি বলল, ‘কী রে! কিছু বল!’
‘বোবার শত্রু নেই।’ বিড়বিড় করে বিলু।
অভি বিলুর পাশে বসে বলে, ‘তুই কলেজে যাওয়া ছেড়ে দিলি কেন? রিপুদা, আপ্পুদিরা কিন্তু রেগুলার ক্লিনিক অ্যাটেন্ড করছে। বাড়িতে বসে গাঁতিয়ে পড়ে ফাইনাল এমবি পাশ করা যায় না। পেশেন্ট না দেখলে কপালে ঝাড় নাচছে।’
‘বোবার শত্রু নেই…’
‘এরকম করিস না দাদা। বাড়িতে শুয়ে পাগলের অভিনয় করলে কেউ দেখতে আসবে না। কোনও সিমপ্যাথি ওয়েভ বইবে না, তোর জন্য কারও দরদ উঠলে উঠবে না। ডিপ্রেশান কাটানোর বেস্ট উপায় আমি বলে দিচ্ছি। দাড়ি কামা, চুলে শ্যাম্পু দে, গুছিয়ে স্নান কর, নতুন জামা-প্যান্ট পরে বাইরে গিয়ে মেয়ে দেখে আয়।’
‘ডিপ্রেশান হলে কিছু করতে ইচ্ছে করে না!’ নখের কোণ থেকে কাল্পনিক ময়লা বার করতে করতে বিলু বলল, ‘এমনকী আত্মহত্যা করতেও ইচ্ছে করে না। সেই ইচ্ছেটা আসে যখন মানুষ ডিপ্রেশান খানিকটা কাটিয়ে ওঠে। তোর চিন্তা নেই। আমি এখন সুইসাইডের স্টেজে নেই।’
বিলুর শূন্য দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে অভির গতকালের অনুভূতিটা ফিরে এল। তার নিজের এবার পাগল পাগল লাগছে।
.
