৩৩. অভিজ্ঞান
মেডিসিনে হাউসস্টাফশিপ শুরু হওয়ার পরে অভির প্রতিদিনের রুটিন গুলিয়ে গেছে। চব্বিশ ঘণ্টাকে কিপটের মতো টিপে টিপে ব্যবহার করলেও দিনের শেষে নিজের জন্য কোনও সময় পড়ে থাকে না। আগামী এক বছরের জন্য অভির জীবন থেকে নিজস্ব সময় হারিয়ে গেল। হাউসস্টাফশিপ মানে হল দিনে চব্বিশ ঘণ্টার কাজ। সপ্তাহে সাত দিন।
অভি হাউস জব করছে বিডিআর-এর আন্ডারে। দক্ষ এবং কড়া প্রশাসক। পাশাপাশি রোগী-দরদী চিকিৎসক। পান থেকে চুন খসলে রোগীর সামনে হাউসস্টাফদের এমন বকাবকি করেন যে তারা পালাতে পথ পায় না। রিপু আর আপ্পু এই ইউনিটে হাউসজব শেষ করে পালিয়ে বেঁচেছে। রিপুর মামাবাড়ি ইংল্যান্ডে। মামারা ইংল্যান্ডের নাগরিক। এমবিবিএস পাশ করার পরে ডাক্তারি ডিগ্রির কাগজ নিয়ে রিপু পাড়ি দিয়েছে রানির দেশে। ট্যাঁকে করে নিয়ে গেছে আপ্পুকে। কলকাতায় রেজিস্ট্রি ম্যারেজ সেরে ড্যাংডেঙিয়ে প্লেনে উঠেছে।
টিনটিন আর বান্টিও বিলেতে। লাটু আর সুব্রত পোস্ট গ্র্যাজুয়েট চান্স পেয়ে গেছে। লাটু দিল্লির এইমসে অর্থোপেডিক্সে এমএস করতে গেছে। সুব্রত গেছে সার্জারিতে এমএস করতে, পুনের এএফএমসি বা আর্মড ফোর্স মেডিকাল কলেজে। সিনিয়র দাদাদিদিরা আর কেউ এই কলেজে নেই।
তাদের ব্যাচের তিনজন মেয়ে গায়েব। সাবিনা রানা নেপালে চলে গেছে। হাউসজব এবং পোস্ট গ্র্যাজুয়েশানে ওখান থেকেই করবে। শ্রীপর্ণা সুব্রতর সঙ্গে চলে গেছে পুনে। শ্রীপর্ণার বাবা আর্মিতে আছেন। এএফএমসিতে হাউসজব পেতে শ্রীপর্ণার অসুবিধে হয়নি। জেম্সি ফেরত গেছে গোয়া। তার আর পড়াশুনো করার ইচ্ছে নেই। চেম্বার খুলে প্র্যাকটিস করতে বসে যাবে।
হাউসজব করছে অভি, চন্দন, বৃন্দা, দময়ন্তী, সুরজ, প্রবাল, সঞ্জয় আর দীপ। অভির সঙ্গে মেডিসিনে হাউসজব করছে প্রবাল আর দীপ। অভির কো-হাউসস্টাফ প্রবাল। ছেলেটা কাজকর্ম ঠিকঠাক করে। তা না হলে অভি পাগল হয়ে যেত।
অভি ঘুম থেকে ওঠে সকাল ছ’টায়। প্রাতঃকৃত্য সেরে ক্র্যাকপিজির মেটিরিয়াল নিয়ে বসে। এরা যে স্টাডি মেটিরিয়াল পাঠায়, তাতে রোজ কী পড়তে হবে তার হিসেব দেওয়া থাকে। অর্থাৎ একদিন রুটিন ফলো না করলে সেই পড়া পরের দিনের কোর্স মেটিরিয়ালের সঙ্গে জুড়ে যায়। পঞ্চাশ হাজার টাকা খরচ করে করেসপন্ডেন্স কোর্সে ভরতি হয়ে টাকা নষ্ট করার বান্দা অভি নয়। সাড়ে ছ’টা থেকে আটটা পর্যন্ত একটানা পড়াশুনো। এই সময় মোবাইল সাইলেন্ট মোডে রাখে। মেডিসিন ওয়ার্ডের সিস্টারদের অভি বলে রেখেছে যে ওয়ার্ডে হঠাৎ দরকার হলে তারা যেন সকালবেলা সুরজের ফোনে যোগাযোগ করে। যখন তখন মেয়েদের ফোন আসে বলে সুরজ কখনও মোবাইল ফোন অফ করে না।
আটটা দশে মিনি মেসের ব্রেকফাস্ট। বয়েজ হোস্টেলে যে মিনি মেস তুলে দেওয়া নিয়ে আন্দোলন হয়েছিল, সেই মিনি মেস এনএইচকিউ-এর প্রতি ফ্লোরে। এইসব মেসের খাবার সুস্বাদু এবং পুষ্টিকর। ব্রেকফাস্টে লুচি আলুরদম, চাউমিন, এগ-টোস্ট— সব কিছুই থাকে। সাড়ে আটটায় ওয়ার্ডে ঢোকে অভি। সাড়ে নটায় রাউন্ড শুরুর আগে একঘণ্টার প্রস্তুতি। বিডিআর এসে গেলে পরবর্তী তিন ঘণ্টা কোথা দিয়ে কেটে যায়, বোঝা যায় না।
বারোটা থেকে আবার কাজ। শেষ হতে হতে চারটে। হোস্টেলে ফিরে খেয়েদেয়ে আধঘণ্টার ঘুম। পাঁচটায় ঘুম থেকে উঠে মিনি মেসের চা। তারপর রাউন্ড। সন্ধেবেলার রাউন্ড দুটো কারণে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, সব রোগীর চিকিৎসা ঠিকমতো না হলে রাত্তিরে সিস্টার ডেকে পাঠাবে। দু’নম্বর কারণ হল, ওয়ার্ডের বাইরে রোগীর বাড়ির লোক অপেক্ষা করছে। রাউন্ড শেষ হয়ে গেলে রোগীর বাড়ির লোকের মুখ থেকে শুধুমাত্র বেড নম্বর শুনে রোগীর আদ্যোপান্ত মনে রেখে বাড়ির লোককে সাম্প্রতিক হাল-হকিকত বলা কঠিন কাজ। প্রতিদিন এই কাজ করে এখন অভির অভ্যাসের মধ্যে চলে এসেছে। তাও মাঝে মধ্যে ভুল হয়।
হোস্টেলে ফিরতে ফিরতে আটটা। স্নান করে পড়তে বসে অভি। সাড়ে আটটা থেকে সাড়ে দশটা পর্যন্ত পড়ে খাওয়া সেরে নেয়। এগারোটা থেকে দুটো পর্যন্ত আবার পড়ে। তারপর ঘুম। পরদিন সকাল ছ’টায় অ্যালার্ম।
সারা দিনে তিন খেপে সাত ঘণ্টা পড়ে অভি। দৈনিক কোর্স মেটিরিয়াল কোনও দিন বাকি থাকলে পরের দিন সেটা ছুঁয়েও দেখে না। পরের পড়ায় ঢুকে পড়ে। সপ্তাহে এক বা দু’দিন পড়া বাকি থাকে। রবিবারে সেটা ম্যানেজ করতে হয়।
অভি বাড়ি যায় মাসে একবার। মাসের চতুর্থ রবিবার সকালে লক্ষ্মী নিবাস গিয়ে সন্ধেবেলা ফেরত আসে। মনোজ এবং অরুণার এই নিয়ে অনুযোগের শেষ নেই। বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে মাসের দ্বিতীয় রবিবার অরুণা-মনোজ মিলে ছেলেকে দেখতে আসেন। অভি বারণ করা সত্ত্বেও ওঁরা শোনেন না। অভি তাই সময় বেঁধে দিয়েছে। বিকেলবেলা চারটে থেকে ছ’টা।
আজ সকালে অভির ঘুম ভাঙল মাথার মধ্যে একগোছা অস্বস্তি নিয়ে। অন্যদিন রোবটের মতো প্রাতঃকৃত্য সেরে পড়তে বসে যায়। আজ বিছানা ছেড়ে উঠল না। শুয়ে শুয়ে মোবাইলের অ্যালার্ম অফ করে জানলা দিয়ে বাইরে তাকাল।
এনএইচকিউ-এর পিছন দিকে কোনও একটা সরকারি দফতর। শেয়ালদার মতো কংক্রিটের জঙ্গলেও কদম, বকুল, রঙ্গন, নারকেল গাছ রয়েছে। বর্ষাকালে কদম ফুলের গন্ধে নাক ভারী হয়ে আসে। অ্যালার্জি শুরু হয়ে যায়। লক্ষ্মী নিবাসের ছাদের বাগান থেকে পালিয়েও গাছ থেকে মুক্তি পায়নি অভি। রোজ সন্ধে নাগাদ এই সব গাছে টিয়া আর চড়াইপাখি বাসা বাঁধে। তাদের কিচিরমিচির শুনে কান ভোঁ ভোঁ করে। মোবাইল টাওয়ারের বিকিরণ সহ্য করে যে ক’টা টিয়া আর চড়াই কলকাতা শহরে আজও বেঁচে আছে, এই বাগানটা তাদের গোপন ডেরা।
ওই একফালি সবুজের দিকে তাকিয়ে অন্যমনস্ক হয়ে শুয়ে রইল অভি। তার মন বলছে, আজ কিছু একটা হবে। অন্যরকম কিছু। তার জীবনে আজ কোনও একটা চমক আসছে।
‘জীবন ক্ষুদ্র বটে, আরও ক্ষুদ্র জীবনের মানে…’
আরেঃ! কবিতার লাইন! চমকে ওঠে অভি। নিজের লেখা কবিতার লাইন হঠাৎ হাঙরের মতো অবচেতনের কালচে নীল সাগর থেকে দাঁত বার করে মাথা তুলল কেন? কী মতলব এর? অভির কেরিয়ারের কচি পাগুলো কামড়ে খাবে নাকি? বিরক্ত অভি আলস্য কাটিয়ে বিছানা ছাড়ে। প্রবাল চোখ মুছতে মুছতে বলে, ‘কী হল? দুঃস্বপ্ন দেখলি নাকি?’
‘হ্যাঁ।’ অভি বাথরুমের দিকে দৌড়চ্ছে।
আজ দ্বিতীয় রোববার। মনোজ-অরুণার আসার দিন। বিকেলে বেফালতু সময় নষ্ট হবে। সকাল থেকেই পড়তে বসা যাক। ব্রেকফাস্ট নাকে মুখে গুঁজে ক্র্যাকপিজি নিয়ে বসে অভি। ছ’টা পঁয়তাল্লিশ বাজে। আজ সে পনেরো মিনিট লেট।
রোববারে বিডিআর হাসপাতালে আসেন না। আজ ওয়ার্ডে দেরি করে গেলেও চলবে। অ্যানাটমির মালটিপল চয়েস কোশ্চেন নিয়ে বসল অভি। ঠিক উত্তরে টিক মারতে গিয়ে মনে পড়ে গেল ফার্স্ট এমবিবিএস-এর দিনগুলোর কথা। হেড অব দ্য ডিপার্টমেন্ট নীলাক্ষ গাঙ্গুলি ওরফে এনজির কথা। কালুয়া ডোমের কথা। ফিজিওলজির এইচওডি পার্বতী মুখার্জি ওরফে পিএম এবং বায়োকেমিস্ট্রির এইচওডি আরতী মুখার্জি ওরফে এএম-এর কথা। মনে পড়ে গেল সাপ্লির কথা। মনে পড়ে গেল বৃন্দার কথা।
‘জীবন ক্ষুদ্র বটে। আরও ক্ষুদ্র জীবনের মানে…’
ঝাঁকুনি খায় অভি। আজ কী হয়েছে তার? এত অতীতচারণ কেন? এত কবিতা কেন? বৃন্দাই বা কেন? আজ কিছু একটা হবে। হবেই। ঘড়ির দিকে তাকায় অভি। সাতটা বাজে। পনেরো মিনিট কেটে গেছে। মাত্র একটা এমসিকিউয়ের উত্তর দেওয়া হয়েছে। ধুস! দাঁতে দাঁতে চিপে প্রশ্নপত্র আক্রমণ করে সে।
দশটার সময় প্রবাল বলল, ‘ওয়ার্ডে যাবি না?’ এমসিকিউতে ডুবে থাকা অভি বলল, ‘না। তুই সকালটা ম্যানেজ করে দে। আমি ওবেলা যাব।’
‘ওবেলা তোর বাবামা আসবেন। আমি ভাবছিলাম তুই এবেলা রাউন্ডটা সেরে দিলে ইভনিং রাউন্ডে আমি যাব। কাকু কাকিমার সামনে বোকার মতো রুমে বসে থাকার কোনও মানে হয় না।’
‘ইভনিং রাউন্ড আমি দেব। তুই সকালটা দিয়ে দে প্লিজ। তারপর বাড়ি চলে যা। তেমন হলে কাল সকালে ডুব মার। আমি বিডিআরকে ম্যানেজ করে নেব।’
‘বলছিস?’ অভির প্রস্তাবে খুশি হয় প্রবাল। পটাপট জামাপ্যান্ট গলিয়ে, কাঁধে ন্যাপস্যাক ঝুলিয়ে বলে, ‘আমি তাহলে মঙ্গলবার সকালে আসব। তুই একটু ম্যানেজ করে নিস।’
‘আচ্ছা, ’ অভি এমসিকিউয়ের মধ্যে ডুবে গেছে। প্রবাল রুমের দরজা খোলে। করিডোরের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলে, ‘অভি!’
‘কী?’ অভি বিরক্ত।
‘সুরজ আগে একা নোংরামি করত। এখন চন্দন ওর সাকরেদ হয়েছে।’ দরজা একটুখানি ফাঁক করে বলে প্রবাল। খাটে বসে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে অভি। তাদের তিনশো চোদ্দ নম্বর রুম থেকে সুরজ আর চন্দনের তিনশো সাত নম্বর রুম পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। তিনশো সাতের দরজার সামনে চন্দন আর এক বিবাহিত মহিলা দাঁড়িয়ে। চন্দন দরজায় নক করল। দরজা ভিতর থেকে খুলে গেল। এদিক ওদিক দেখে চন্দন সুট করে রুমে ঢুকে গেল। মহিলা আড়চোখে অভির ঘরের দিকে তাকায়। প্রবাল চট করে দরজার একপাশে সরে যায়। দরজার এক চিলতে ফাঁক দিয়ে অভি মহিলাকে দেখতে পায়। ঋষিতা!
এই সেই মেয়েটা, যার কোনও অস্তিত্ব নেই বলে লক্ষ্মী নিবাসে শান্তি ফিরিয়েছে অভি। এর সঙ্গে সন্তোষের কিছুদিন আগে বিয়ে হল না? বিয়ের দিন কান্নাকাটি করে দময়ন্তীকে বলেছিল, ‘আশীর্বাদ করো। যেন সুখী হতে পারি!’ ঋষিতার ছবি মোবাইলে তুলে অভিকে দেখিয়েছিল দময়ন্তী!
কয়েক মাসের মধ্যে এ কী অবস্থা? এবার মেয়েটা সুরজ আর চন্দনের খপ্পরে পড়ল? নাকি সুরজ আর চন্দন ঋষিতার খপ্পরে পড়েছে? দ্রুত মুখ ঘুরিয়ে নেয় অভি। প্রবালকে বলে, ‘তুই বাড়ি যা।’ ভোর থেকে মনে হচ্ছিল আজকের দিনটা ঘটনাবহুল। আজকের দিনটা অন্যরকম। তাই-ই হল। মর্নিং শো-জ দ্য ডে। বাকি দিনে কী অপেক্ষা করে আছে কে জানে!
‘জীবন ক্ষুদ্র বটে…’ আবার মাথার মধ্যে বুড়বুড়ি কাটছে কবিতার লাইন। দাবড়ানি দিয়ে নিজেকে থামায় অভি। চমকে উঠে ভাবে, আজ বিকেলে বাবা-মা আসবে। ঋষিতা আর মনোজের এখানে দেখা হয়ে যাবে না তো? অনেক কষ্টে ঋষিতার ভূত মনোজ-অরুণার ঘাড় থেকে নামানো গেছে। আজ আবার ‘ওল্ড ফ্লেম’-এর সঙ্গে দেখা হয়ে গেলে কী হবে?
ঋষিতা একাধিক পুরুষের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক না করে থাকতে পারে না। অনেক কষ্টে ওর থেকে মনোজকে দূরে সরাতে পেরেছে অভি। আর রিস্ক নেওয়া যাবে না।
লেখাপড়া মাথায় উঠল। মোবাইলে মনোজকে ফোন করল অভি। বাবা-মাকে হোস্টেলে আসতে বারণ করতে হবে। দরকার হলে মিথ্যে কথা বলে।
মনোজের মোবাইলের সুইচ অফ। যাব্বাবা! এরকমটা তো কখনও হয় না! বিরক্ত হয়ে বাড়ির ল্যান্ডলাইনে ফোন করে অভি। অরুণা নিশ্চয়ই ফোন ধরবে। তখন জানা যাবে, মনোজ কোথায়। বেশ কয়েকবার রিং হওয়ার পরে অরুণা ফোন ধরে বললেন, ‘হ্যালো?’
‘মা, বাবার মোবাইল বন্ধ কেন?’ সোজা কাজের কথায় ঢুকল অভি।
‘ব্যাটারি নেই,’ ব্যস্ততার মধ্যে বলেন অরুণা, ‘কী ব্যাপার? হঠাৎ ফোন?’
অভি বলল, ‘তোমাদের আজকে হোস্টেলে আসার দরকার নেই।’
‘এ নিয়ে পরে কথা বলব। রাধাদির খুব শরীর খারাপ। তোর বাবা ডাক্তার ডাকতে গেছে। পরে ফোন করিস।’ লাইন কেটে দেন অরুণা।
ভ্যাবলার মতো মোবাইলের দিকে তাকিয়ে থাকে অভি। রাধা পাগলির শরীর খারাপ? কী হয়েছে কে জানে! বাবা যখন ডাক্তার ডাকতে গেছে, তখন নির্ঘাত সিরিয়াস কিছু। তা হলে ওঁরা এমনিতেই আজ আসবেন না। নিশ্চিন্ত হয়ে বিছানা ছেড়ে ওঠে অভি। দরজায় ছিটকিনি দিয়ে আবার ক্র্যাকপিজির মকটেস্টের এমসিকিউ নিয়ে বসে। এখন কোনও ডিসট্র্যাকশান নয়। টানা তিনঘণ্টা লেখাপড়া।
এগারোটা নাগাদ মকটেস্ট শেষ হল। ক্র্যাকপিজির দেওয়া উত্তরের সঙ্গে নিজের উত্তর মিলিয়ে খুশি অভি। তিনশোর মধ্যে দুশো সত্তরটা প্রশ্নের উত্তর ঠিক হয়েছে। ভালো রেজাল্ট। আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে মোবাইল তুলে নেয় সে। ঋষিতার খবরটা একজনকে দেওয়া জরুরি।
‘বল।’ রিং হওয়া মাত্র ফোন ধরেছে দময়ন্তী।
‘তোর ঋষিতা এখন এনএইচকিউতে। চন্দন আর সুরজের সঙ্গে ঘরে ঢুকে দরজা দিয়েছে।’ এক নিঃশ্বাসে বলে অভি। ভনিতাহীন কমেন্টের শক ভ্যালু কেমন দেখা যাক!
দময়ন্তী যথেষ্টই চমকাল। বলল, ‘ভ্যাট!’
‘এসে দেখে যা। সকাল সাতটায় ঢুকেছে। এখনও আছে কিনা জানি না। যদি থাকে তাহলে বেরোনোর সময়ে মোবাইলে ছবি তুলে রাখব? অ্যাজ আ প্রুফ! তুই যেমন ওর ছবি আমাকে মোবাইলে দেখিয়েছিলি?’
‘দরকার নেই। তোর মুখের কথাই যথেষ্ট। মেয়েটার সাহস বলিহারি। খুব ভালো করে জানে যে আমি এই কলেজে পড়ি। তাও সাহস করে ঢুকল?’
‘কলকাতায় রোজ কোটি কোটি লোক একই জায়গায় ঘুরঘুর করে। একজনের সঙ্গে অন্যজনের দ্বিতীয়বার দেখা হওয়ার প্রোবাবিলিটি কম।’
‘তা ঠিক।’ সামান্য ভেবে বলে দময়ন্তী, ‘বাই দ্য ওয়ে, এতদিন জানতাম শুধু সুরজের আলুর দোষ আছে। চন্দন এর মধ্যে ঢুকল কেন?’
‘সুরজের নেচার তুই ফার্স্ট ইয়ার থেকে জানিস। আমিও তাই। কিন্তু চন্দন হঠাৎ এমন রং বদলায় যে ওকে বুঝতে অসুবিধে হয়। ও কি বৃন্দার প্রতি সিরিয়াসলি ইন্টারেস্টেড? তা হলে এইসব কেন করছে?’
‘চন্দনের ব্যাপারটা বৃন্দাকে বলা জরুরি। কি বলিস?’ দময়ন্তী জানতে চায়। অভি বলে, ‘এ বিষয়ে আমি কোনও মন্তব্য করব না।’ যদিও অভি মনে মনে জানে, দময়ন্তী যাতে বৃন্দাকে কথাগুলো বলে, সেই জন্যই ওকে এইসব বলা।
‘মন্তব্য করবি না কেন? পলিটিকালি কারেক্ট থাকতে চাইছিস? একটা মেয়ে তোর বাবার সঙ্গে শুতো। এখন তোর বন্ধুর সঙ্গে শোয়। বাবার সঙ্গে শোওয়ার কারণে তোর ফ্যামিলি ভোগে যাচ্ছিল। অনেক কষ্টে সামলেছিস। বন্ধুকে নিয়ে কোনও চিন্তা নেই?’
‘চন্দন আমার বন্ধু নয় দময়ন্তী। ক্লাসমেট।’
‘বাব্বা! একসময় তো গলায় গলায় বন্ধু ছিলি। এখন এত রাগ? বৃন্দাকে তুলে নিল বলে?’
‘ধুস!’ দুর্বল গলায় আপত্তি করে অভি। দময়ন্তী অভির আপত্তিকে পাত্তা না দিয়ে বলে, ‘সত্যি মাইরি, পুরো ট্র্যাঙ্গুলার লাভ স্টোরি। জ্যামিতির উপপাদ্যে যেমন পড়তে হত। ধরো এবিসি একটি ত্রিভুজ। এ থেকে বি-এর দূরত্ব যতটা, এ থেকে সি-এর দূরত্ব তার তিনগুণ বেশি। তা হলে বি আর সি-র মধ্যে দূরত্ব কত?’
‘তা হলে ‘ডি’ কী করছে? জ্যামিতি খাতার এক কোণে দাঁড়িয়ে মজা দেখছে?’ বিরক্ত হয়ে বলে অভি। আজকের দিনটা সত্যিই অন্য রকম। নানা ভাবে পড়া ঘাঁটছে। মাথার মধ্যে কিলবিল করছে পুরোনো কবিতার লাইন। কী হল রে বাবা!
নরম গলায় অভি বলে, ‘আমি ফোন রাখছি। পরে কথা হবে।’
দময়ন্তী বলে, ‘ডু ইউ স্টিল ফিল ফর বৃন্দা?’
বৃন্দা! ফোলা ফোলা গাল! ঝামরে ওঠা চুল! কমলালেবুর কোয়ার মতো ঠোঁট। ও কি কোনও মানবী? না কক্ষচ্যুত কোনও তারা? না মায়াকাননের ফুল? নাকি লজ্জাবতী লতা? বৃন্দাকে কখনও অভি চিনত? কোনও দিনও সে বৃন্দার কাছাকাছি এসেছিল? কোনও দিনও ভালোবেসেছিল?
ভালোবাসা! দীর্ঘশ্বাস ফেলে অভি। শুধু পরাজয়ের গ্লানি মনে পড়ে। শুধু ‘হেরো অভি’-কে মনে পড়ে। জীবন মানে আদিগন্ত বিস্তৃত এক বন্ধ্যা জমি। আকাশে এক ফোঁটা মেঘ নেই। সূর্য মধ্যগগনে। জলবিহীন মাটি ফুটিফাটা হয়ে আছে। তার ওপর দিয়ে অভি একা হাঁটছে। বোতলে জল নেই। ব্যাগে কম্পাস নেই। কোনও দিকনির্দেশ নেই। শুধু যাত্রা আছে। শুধু আশা আছে, যে একদিন এই নাবাল জমি ফুরোবে। একদিন আকাশে মেঘ করবে। একদিন বৃষ্টি আসবে। একদিন শিরিষ কাগজের মতো শুকনো গলায় এক ফোঁটা জীবনদায়ী জল আসবে। শুধু আশা আছে যে একদিন দুঃস্বপ্নের শেষ হবে! হবেই।
আশা! সমস্ত কালোর মধ্যে একফোঁটা আলোর আর এক নাম আশা! চিরপ্রণম্য সেই অস্তির দিকে যাত্রার আর এক নাম জীবন। অভি যাচ্ছে। একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে, এই আশায়।
‘কী রে? দীর্ঘশ্বাসের মহাভারত লিখছিস কেন? ডু ইউ স্টিল ফিল ফর বৃন্দা?’
অভি নিরুত্তর।
অবাক হয়ে দময়ন্তী বলে, ‘আমার কোনও আইডিয়াই ছিল না যে তুই বৃন্দাকে এখনও ভালোবাসিস।’
‘আমি একবারও বলেছি?’ আপত্তি করে অভি। কুঁক কুঁক আওয়াজ করে তার ফোনে অন্য একটা ফোন ঢুকছে। কার কে জানে! দময়ন্তীর সঙ্গে ফোনালাপ শেষ করতে হবে।
‘জানিস অভি, পারসোনাল স্পেসকে ছোটবেলা থেকে গুরুত্ব দিতে শিখেছি। কারও ব্যক্তিগত জীবনে নাক গলানো পছন্দ করি না। তাই এতদিন তোকে বলিনি।’
‘কী বলিসনি?’ অধৈর্য হয়ে বলে অভি। ফোনটা আবার আসছে। এ দিকে দময়ন্তীর হেঁয়ালি মেশানো কথার কারণে লাইন কাটতেও ইচ্ছে করছে না।
হালকা হাসে দময়ন্তী। ‘তুই বোধ হয় জানিস না যে আমি ইংল্যান্ডে চলে যাচ্ছি। জ্যামিতি খাতার এককোণে দাঁড়িয়ে থাকা ‘ডি’ সত্যিই খাতার বাইরে চলে যাচ্ছে। পাঁচ বছরের কলকাতা বাস খুব আনন্দের হল—এই রকম মোটেই মনে হচ্ছে না। অ্যান্ড আই উইল নেভার ফরগিভ সুরজ ফর গিভিং মি স্লিপলেস নাইটস। ফর মেকিং মি আ জাঙ্কি। চন্দন যদি ওর সঙ্গে তাল মিলিয়ে নোংরামি শুরু করে থাকে, তাহলে আই উইল নট ফরগিভ চন্দন টু।’
‘আমি রাখছি।’ ফোন কাটে অভি। এই নিয়ে তিনবার ফোন এল। নিশ্চয়ই জরুরি দরকার। অচেনা নম্বরে ফোন করে সে বলে, ‘হ্যালো?’
‘অভিজ্ঞান লাহিড়ী বলছ? আমি সুদিন চক্রবর্তী বলছি। অন্তহীনের সম্পাদক।’
অভি চুপ করে থাকে। আজ সকাল থেকেই দিনটা অন্যরকম। তার মন বলছিল, কিছু একটা হবে। এই সেই আচম্বিত। এই সেই আনপ্রেডিক্টেবল যা এখন তার চারিদিকে জাল বিছোবে।
‘শুনতে পাচ্ছ?’ প্রশ্ন করছেন সুদিন।
‘হ্যাঁ বলুন।’ শান্ত গলায় বলার চেষ্টা করে অভি। গলা কেঁপে যায়।
‘অন্তহীনের আগামী ইস্যুতে আমরা দশজন নবীন এবং সম্ভাবনাময় কবির দীর্ঘ কবিতা রাখতে চাইছি। অন্তহীনের তরফ থেকে তোমায় একটা দীর্ঘ কবিতা দিতে অনুরোধ করছি। দীর্ঘ মানে দীর্ঘ। কোনও ওয়ার্ড লিমিট নেই।’
কবিতা? পদ্য? দীর্ঘ কবিতা? ভিনদেশি শব্দ বলে মনে হয় অভির। কে জানে, এসব কথার মানে কী!
‘একমাস সময় দিলাম। ঠিক আছে?’ বলেন সুদিন।
অভি কী বলবে বুঝতে না পেরে বলে, ‘রোববারে অন্তহীনের দফতর খোলা থাকে নাকি?’
‘লিটল ম্যাগাজিনের আবার রবি সোম!’ হাসেন সুদিন, ‘তা হলে একমাস বাদে ফোন করছি। ঠিক আছে?’ লাইন কেটে দিয়েছেন সুদিন।
মোবাইল হাতে ভ্যাবলার মতো বসে থাকে অভি। আজ সারা সকাল নষ্ট হল। একটা মকটেস্ট শেষ হয়েছে। ভেবেছিল আর একটা নিয়ে বসবে। সব ঘেঁটে লাট হয়ে গেল।
নাঃ! মাথা ঝাঁকায় অভি। মনকে উচাটন হতে দিলে চলবে না। ডিসিপ্লিন ভীষণ জরুরি। প্রতিদিনের রুটিনে ব্যাঘাত ঘটতে দেওয়া যাবে না। মোবাইল সাইলেন্ট মোডে দিয়ে পরের মকটেস্ট নিয়ে বসে অভি। আগামী তিনঘণ্টা নো ডিসট্র্যাকশান।
পেপার সল্ভ করতে করতে মাথা থেকে উড়ে গেল চন্দন আর ঋষিতার কথা, মনোজ আর অরুণার কথা, দময়ন্তী আর সুদিনের কথা। হঠাৎ অভি দেখতে পেল লেডি আর্চার্স হোস্টেলের সুপার রিনা দত্তর কোয়ার্টার। প্যারাপ্লেজিক পুশকিনদা ওয়াটার বেড থেকে উঠে বসেছেন কারও সাহায্য ছাড়াই। হাঁটতে হাঁটতে বলছেন, ‘রিনা, তোমার নীরদ আত্মহত্যা করেছেন।’
ভদকায় চুমুক দিয়ে রিনা ম্যাডাম বললেন, ‘তোমাকে কে বলল?’
বায়োকেমিস্ট্রির আরতী মুখার্জি ওরফে এএম বললেন, ‘নীরদ আবার কবে থেকে রিনার হল? ও তো আমার!’
‘আমার।’ লাল রঙের তিনকোনা চশমা ঝিকিয়ে বললেন রিনা ম্যাডাম।
‘আমার।’ কাচের চুড়ি ঝমঝমিয়ে বললেন এএম। দু’জনকে থামিয়ে ডক্টর রেবতীভূষণ পট্টনায়েক ওরফে রেপ স্যার চ্যাঁচালেন, ‘ডেথ বাই হ্যাঙ্গিং। অ্যান্টি-মর্টেম ইন নেচার।’ রিনা ম্যাডাম আর এএম গলা জড়াজড়ি করে কেঁদে উঠলেন। হঠাৎ কেউ খুব জোরে রিনা ম্যাডামের কোয়ার্টারের দরজার কড়া নাড়ছে। রিনা ম্যাডাম বললেন, ‘ক্যা?’
‘দরজা খুলুন।’ বাদশা ঘোষের গলার আওয়াজ শোনা গেল, ‘থানা থেকে আসছি।’
দরজায় খটখটানি শুনে ঘুম ভাঙল অভির। মকটেস্ট সল্ভ করতে করতে সে ঘুমিয়ে পড়েছিল। এত গভীর ঘুম বহুকাল ঘুমোয়নি। বিকেল সাড়ে চারটে বাজে। এখনও দুপুরের খাওয়া হয়নি। মোবাইল হাতে নিয়ে অভি দেখল, মনোজের মোবাইল থেকে এবং লক্ষ্মী নিবাসের ল্যান্ডলাইন থেকে একগাদা মিস্ড কল রয়েছে।
কে দরজা ধাকাচ্ছে? বাবা-মা এসে গেল নাকি? আঁতকে ওঠে অভি। সকালে অরুণার সঙ্গে ফোনে কথা বলার পরে আর যোগাযোগ হয়নি। তিনশো সাত নম্বর রুমে সুরজ আর চন্দনের সঙ্গে ঋষিতা এখনও থাকলে সাংঘাতিক ব্যাপার। এক্ষুনি একটা কেলেংকারি হবে। একলাফে বিছানা থেকে উঠে দরজা খোলে অভি। দেখে দরজার বাইরে অরুণা দাঁড়িয়ে রয়েছেন। করিডোরের ওদিকে, তিনশো সাত নম্বর ঘর থেকে ঋষিতা বেরোচ্ছে। পিছন পিছন চন্দন আর সুরজ। তিনজনেই মদ খেয়ে আউট। হাবভাব আর চাহনিতে চোর-চোর ভাব।
অরুণাকে তিনশো চোদ্দ নম্বর রুমের মধ্যে টেনে আনে অভি। করিডোরে উঁকি মেরে বলে, ‘বাবা কোথায়?’ অরুণা থমথমে মুখে বলেন, ‘তুই বাড়ি চল।’
মনোজ কি ট্যাক্সির ভাড়া মেটাচ্ছেন? আবার করিডোরে উঁকি মারে অভি। মনোজ নেই। অভি বলে ‘বাবা কোথায়?’
‘তুই বাড়ি চল।’ হাঁফাতে হাঁফাতে বলেন অরুণা, ‘আমি একলা ট্যাক্সি নিয়ে এসেছি। রাধার শরীর খুব খারাপ। তোর বাবা ডাক্তার নিয়ে এসেছে। রাধা তোকে দেখতে চাইছে।’
‘বাবা আসেনি?’ আনন্দের চোটে মনে মনে তিনবার ডিগবাজি খায় অভি! অরুণার হাত ধরে টানতে টানতে রুমের বাইরে পাঠায়। তার মুখের ওপরে দরজা বন্ধ করে বলে, ‘তুমি দাঁড়াও। আমি চেঞ্জ করে আসছি।’ দ্রুত প্যান্টশার্ট পরে স্নিকার গলিয়ে, মোবাইল আর মানিব্যাগ পকেটে ভরে। দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে রুমে তালা মারে। রাউন্ডে যাওয়া হল না। পড়াশুনো হল না। আজকের দিনটা অন্যরকম হবে, এটা সকালেই ঠিক হয়ে আছে। যা গেছে তা যাক! কাল থেকে নতুন উদ্যমে ক্র্যাকপিজি নিয়ে বসা যাবে।
একতলায় নামে অভি। পিছন পিছন অরুণা। এনএইচকিউয়ের সামনে বিকেল সাড়ে চারটের সময় মাল খেয়ে বাওয়াল করছে চন্দন আর সুরজ। যে ট্যাক্সিতে অরুণা এসেছেন, তার ড্রাইভারের সঙ্গে ঝগড়া করছে। দাপুটে ড্রাইভার বলছে, ‘কেন ফালতু বাওয়াল করছেন দাদা? আমি ওয়েটিং-এ রয়েছি। আপনারা এই গাড়িতে উঠতে পারেন না।
‘জানিস আমি কে?’ তড়পাচ্ছে সুরজ।
‘না। জানতেও চাই না। একশোয় ডায়াল করে বলব নাকি মাল খেয়ে ট্যাক্সি ড্রাইভারের সঙ্গে ঝামেলা করছেন? না অন্য ট্যাক্সি ড্রাইভারদের ডাকব?’
‘ডাক না! কোন মাই কা লাল আছে, তাকে ডাক।’ নেশাগ্রস্ত গলায় তড়পায় চন্দন, ‘আমরা মৃন্ময় চ্যাটার্জির লোক। মারব কম, দৌড় করাব বেশি।’
তিনজনের কথা কাটাকাটির মধ্যে অরুণা ট্যাক্সিতে উঠে বসলেন। পাশে বসল অভি। অরুণা বললেন, ‘চলুন দাদা।’
চন্দন অভিকে ট্যাক্সিতে উঠতে দেখে মুখে রুমাল চাপা দিল বলল, ‘ও, তুই! কাকিমার সঙ্গে বাড়ি যাচ্ছিস?’
‘হ্যাঁ।’ ঘাড় নাড়ে অভি।
‘মাসিমা… আপনার মানদা খুব ভালো আশ্শে… দাদার শঙ্গে মন দিয়ে শংশার করশে…’ মুখ থেকে রুমাল না সরিয়ে বলে চন্দন। ‘আপনি আর কাকু একবার নতুনগ্রামে আশ্শুন। খুব মজা হবে। শমুদ্রের ধারে আমরা ফিকনিক করব।’
চন্দনের জিভ জড়িয়ে গেছে। বোধবুদ্ধিও লোপ পেয়েছে। একবার অরুণাকে ‘কাকিমা’ বলছে, একবার ‘মাসিমা’। পরিস্থিতি আন্দাজ করে অরুণা চন্দনকে বললেন, ‘যাব বাবা। নিশ্চয়ই যাব।’ তারপর ট্যাক্সি ড্রাইভারকে বললেন, ‘আপনি চলুন।’
সুরজ হাঁকডাক চালিয়েই যাচ্ছে। ‘ঋষিতাকে ড্রপ করার কী হবে? শি ইজ ফুল টাল্লি। অকেলা ঘর নহি পঁওছ পায়েঙ্গে উওহ! হেঁটে বাড়ি ফিরতে পারবে না।’
‘ঋষিতা!’ একটা শব্দ। একটা নাম। এক অশনি সংকেত! ভিতরে ভিতরে কুঁকড়ে গেল অভি। অরুণা কি শুনতে পেয়েছেন? মায়ের কী রিঅ্যাকশান? আবার কি পুরোনো পাগলামি শুরু হবে? আবার সেই হাত ধোওয়া, আবার বাবাকে সন্দেহ, আবার অবিশ্বাস? আবার টিভির সামনে বসে থেকে দেখা, কোথায় কোথায় অ্যাক্সিডেন্ট হল? লক্ষ্মী নিবাস কি আবার সেই অন্ধকার, ঝুল পড়া, গোমড়ামুখো দিনগুলোয় ফেরত যাবে? আবার মনোজ আর অরুণার মধ্যে সংঘাত? আবার সংশয় আর সন্দেহের যাপনচিত্র?
আড়চোখে মায়ের দিকে তাকায় অভি। অরুণা ব্যাগ হাঁটকাচ্ছেন। ছোট্ট একটা স্টিলের কৌটো বার করে, তার থেকে দুটো লবঙ্গ নিয়ে, একটা অভির হাতে দিয়ে অন্যটা নিজের মুখে ফেলে বলল, ‘তোর চিন্তার কোনও কারণ নেই। ঋষিতা নামটা খুব কমন।’
শান্তির নিঃশ্বাস ফেলল অভি। লবঙ্গ মুখে ফেলে বাইরে তাকাল। সুরজের মুখে ঋষিতার নাম শুনে চন্দন সিঁটিয়ে গেছে। ঋষিতার হাত ধরে টেনে টেলিফোন বুথের আড়ালে লুকোনোর চেষ্টা করছে। ঋষিতা হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলছে, ‘পাগলের মতো আচরণ করছ কেন? মাতাল কোথাকার!’
.
রাধা পাগলি একতলার ঘরের বিছানায় শুয়ে রয়েছে। মুখে মৃদু হাসি। সারা শরীর নীল। এত নীল কোনও মানুষ দেখেনি অভি।
পাড়ার ডাক্তার ডেথ সার্টিফিকেট দিয়ে গেছেন। হার্ট অ্যাটাকের কারণে মৃত্যু।
পঞ্চপাণ্ডব খাটিয়া সাজিয়ে ফেলেছে। এবার শ্মশানে যেতে হবে। রাধার মেয়ে ছায়া লক্ষ্মী নিবাসের রকে বসে হাউহাউ করে কাঁদছে। অভি তার পাশে বসে বলল, ‘বাবা তোমাকে খবর দিল? না তুমি নিজে এলে?’ অভির প্রশ্নের পিছনে যুক্তি আছে। ছায়ার বাড়ি অনেক দূরে। শরীর খারাপের খবর পেয়ে তার পক্ষে বিকেলের মধ্যে আসা সম্ভব নয়।
‘ভোর রাতে একটা বাজে স্বপ্ন দেখলুম।’ কাঁদতে কাঁদতে বলল ছায়া, ‘একগাদা বামন, মানদা আর মা মিলে খাটিয়ায় করে একটা ডেডবডি নিয়ে যাচ্ছে। ডেডবডিটা পলাশফুল ফেলতে ফেলতে যাচ্ছে। যে ভাবে সীতা নিজের গয়না ফেলতে ফেলতে গিয়েছিল। আমি মাকে বললাম, “কোথায় যাচ্ছো?” মা বলল, “বলব কেন? তাহলেই তো তুই সেখানে গিয়ে ঝামেলা পাকাবি।” আমি বললাম, “গারো পাহাড়?” মা বলল, “বলব না।” তারপর সবাই নাচতে নাচতে চলে গেল। স্বপ্নটা দেখে বুকটা ধড়াস করে উঠেছিল। লাফাতে লাফাতে তোমাদের বাড়ি আসছি, এমন সময় তোমার বাবার ফোন। উনি বললেন, মা আর নেই।’
ছায়ার দিকে তাকিয়ে রয়েছে অভি। ছায়ার আঁচল ভরতি পলাশ ফুল। অভি বলল, ‘পলাশ ফুল কোথা থেকে পেলে? আমাদের বাড়িতে অনেক গাছ থাকলেও পলাশ গাছ নেই। ইনফ্যাক্ট বেলুড়ে কোনও পলাশগাছ আমি আজ পর্যন্ত দেখিনি।’
‘এগুলো মায়ের বিছানায় রাখা ছিল। কোথা থেকে এসেছে বলতে পারব না।’ জবাব দেয় ছায়া। অভি অবাক হয়ে ছায়ার দিকে তাকিয়ে থাকে।
.
শ্মশান পর্ব চুকতে রাত ন’টা বাজল। ছায়া আজ লক্ষ্মী নিবাসেই থাকবে। অভিও হোস্টেলে ফিরবে না। সারাদিন ধরে যা যা ঘটল, তাতে অভির মাথা ভোঁভোঁ করছে। এমসিকিউ, ঋষিতা, দময়ন্তী, অরুণা, সুদিন, রাধা পাগলি, পলাশফুল— মানুষ আর সম্পর্ক, বাস্তব আর স্বপ্ন, পরাবাস্তব আর ব্যাখ্যাতীত ঘটনায় জর্জরিত অভি। তবে পাঁচমিশেলি এই ঘটনা পরম্পরার মধ্যে একটা নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে সে। এবার সেটা ইমপ্লিমেন্ট করতে হবে। ছাদের বাগানে দাঁড়িয়ে সুদিনকে ফোন করে অভি।
সুদিন ফোন ধরে বলেন, ‘বলো অভিজ্ঞান।’
বিনয়ের সঙ্গে অভি বলে, ‘আপনার অনুরোধ রাখতে পারছি না। মাফ করবেন।’
‘দীর্ঘ কবিতা আসছে না? ওটা কোনও ব্যাপার নয়। ঠিক আসবে।’ সম্পাদক অভয় দেন কবিকে।
অভি বলে, ‘কবিতা আসছে না, এই রকমটা নয়। আমি আসলে আর কোনও দিনও কবিতা লিখব না। আপনি অন্য কোনও কবিকে দীর্ঘ কবিতার জন্য অনুরোধ করুন।’
‘আর কোনও দিনও কবিতা লিখবে না? কেন?’ জানতে চাইছেন সম্পাদক।
‘আসলে ডাক্তারি খুব ডিম্যান্ডিং একটা প্রফেশান। জেলাস বউয়ের মতো। অন্য কাউকে সময় দিই, এটা তার পছন্দ নয়। তো, ভাবলাম যে, একটাই মাত্র জীবন। যেটা করতে ভালো লাগে, সেটা করে কাটিয়ে দিতে চাই। আশা করি ভুল বুঝবেন না।’ ফোন কেটে দেয় অভি।
কাল থেকে আবার ক্র্যাকপিজি নিয়ে বসতে হবে।
.
