হৃদয়ের নৈঃশব্দ্য – ১

১. অভিজ্ঞান

জীবন ক্ষুদ্র বটে; আরও ক্ষুদ্র জীবনের মানে।
কিছুটা মণীষী জানে। বাকিটুকু উন্মাদের জ্ঞানে।
এসবের বাইরেও থেকে যায় মানুষের রাশ।
সেইখানে আমাদের নিখিলেশ–বিমলার বাস।
নিখিল চাকরি করে। বিমলাও ব্যস্ত থাকে ঘরে
হাজার ঝামেলা নিয়ে। খিটিমিটি অবরেসবরে।
নিখিল বাজারে যায়, হাতে ঝোলে বাজারের থলে।
বিমলার রান্না হলে চেটে খায় ঝোলে অম্বলে।
নিখিল আপিস যায়। দশটা–পাঁচটা শরীর পাতন।
বিমলাও সাতপাঁচ ভেবে নিয়ে তুলে নেয় ফোন।
ছেলেকে আনার আগে সন্দীপের ফ্ল্যাট ঘুরে যাওয়া…
জীবনে জীবন যোগ করে নিলে বেড়ে যায় পাওয়া।
জীবন ক্ষুদ্রই বটে। আরও ক্ষুদ্র জীবনের মানে।
কিছুটা বিমলা জানে। বাকিটুকু নিখিলের জ্ঞানে।

.

‘আবার অন্তহীনে তোর লেখা বেরিয়েছে?’ ম্যাগাজিনের শীত সংখ্যা উল্টে বলল বৃন্দা, ‘তুই তো এখন অফিশিয়াল কবি রে! এইবার একটা কবিতার বই বার করলেই হয়।’

‘ভ্যাট। কুল্যে এখনও পর্যন্ত পনেরোটা লিখেছি। ছাপা হয়েছে গোটা দশেক। আমাকে কবি বলে না।’ বলল অভি। দু’জনে বসে রয়েছে ফার্মাকোলজির থিয়োরি ক্লাসে। পড়া না শুনে নিজেদের মধ্যে বকবক করছে। বৃন্দা বলল, ‘সুদিন চক্রবর্তী নিজের বাড়িতে ডেকে তোকে বই উপহার দিলেন, মন দিয়ে কবিতা লিখতে বললেন। এরপরও বলবি তুই কবি নোস? ইয়ার্কি হচ্ছে?’

‘সুদিন চক্রবর্তীর বাড়িটা খুব ইন্টারেস্টিং। দু’কামরার ফ্ল্যাট। দুটো ঘরই বই, পত্রিকা, ফাইল আর কাগজে ঠাসা। আমি রোববার সকালে গিয়ে দেখি জনাপাঁচেক কবি আর কবিনি বসে রয়েছেন। আরামকেদারায় সুদিন বসে ঝিমোচ্ছেন আর এক কবিনি মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন।’

‘এ মা! কেন?’

‘আগের রাতে বেশি মদ খাওয়ার ফলে হ্যাংওভার হয়েছে।’

সুদিন শনিবার রাতে কোথায় মদ খেয়েছেন, সেটা আর জিজ্ঞাসা করল না বৃন্দা। মুখ বেঁকিয়ে বলল, ‘জঘন্য!’

‘তুই এমন করে বললি, যেন দিনের পর দিন মাতালদের ঝেলছিস!’

সেটা যে কত বড় সত্যি, তা অভি জানে না। বৃন্দা জানাতেও চায় না। সে বলল, ‘ঝেলছিস? কবির মুখে এ আবার কী ভাষা?’

অভি লজ্জা পেয়ে বলে, ‘ওয়ার্ডটা সুরজের থেকে পিক আপ করেছি। যে কোনও নতুন ওয়ার্ড আমার মাথায় ঢুকলে আর বেরোতে চায় না।’

‘তা হলে অ্যানাটমিতে মাস্‌লের নাম মনে রাখতে কষ্ট হত কেন?’

‘এবার থাম! বস বকবে।’ অভি বলে। অ্যানাটমির স্মৃতি সে আর ফিরে পেতে চায় না।

বস মানে ফার্মাকোলজির এইচওডি ডক্টর মুখার্জি। অনেক্ষণ ধরে অ্যান্টাসিড পড়াচ্ছেন। ব্ল্যাকবোর্ড জোড়া নানান মলিকিউলের ছবি। এলএলটির প্রথম দিকের বেঞ্চের ছেলেমেয়েরা হাই তুলেছে। পিছনের বেঞ্চে শুয়ে প্রবাল আর দীপ ঘুমোচ্ছে। দু’একবার নাকও ডাকল।

একটা ইন্টারেস্টিং সাবজেক্টকে কীভাবে বোরিং করে ফেলা যায়, ডক্টর মুখার্জির ক্লাস না করলে বিশ্বাস হয় না। ছোট একটা কাগজে পাঠ্য বিষয়টি লিখে আনেন। ক্লাসে ঢুকে পরবর্তী পঁয়তাল্লিশ মিনিট ধরে সেটা ব্ল্যাকবোর্ডে লেখেন এবং আওড়ান। লোকটা এত বোরিং যে কেউ ওঁর নামও জানে না। একমাত্র পরিচয়, ডক্টর মুখার্জি।

ক্লাস শেষ হতে তার মিনিট পাঁচেক বাকি। বৃন্দা বলল, ‘দিনরাত কবিতাই লিখছিস? নাকি লেখাপড়াও করছিস?’

লাজুক হেসে অভি বলে, ‘সত্যি কথা বলতে কী, পড়াশুনা ডকে উঠেছে। আমি এখন মন দিয়ে ছন্দ শিখছি। ক্ষিতিমোহন সেন, শঙ্খ ঘোষ আর নীরেন্দ্রনাথের চক্রবর্তীর ছন্দের বইতে ডুবে আছি।’

‘ছন্দের পাশাপাশি প্যাথলজি, মাইক্রোবায়োলজির চর্চাটাও চালিয়ে যা। না হলে সেমিস্টারের সময় হাবুডুবু খাবি।’ মিনতি করে বৃন্দা।

ক্লাস শেষ। ডাস্টার দিয়ে ব্ল্যাকবোর্ড মুছে ডক্টর মুখার্জি এলএলটি থেকে বেরিয়ে গেলেন। বৃন্দা আর অভি টুকটুক করে বাইরে বেরোল। আজ দোসরা জানুয়ারি, সোমবার। কলকাতার তাপমাত্রা বারো ডিগ্রির আশেপাশে! দুপুরবেলাতেও ফুলহাতা সোয়েটার পরতে হচ্ছে। এই বছরের ফ্যাশানে হুডি খুব ‘ইন’। ধর্মতলার ফুটপাথে দুশো টাকায় দেদার বিকোচ্ছে।

চন্দনও একটা হুডি পরে আছে। তাকে দেখে অভি বলল, ‘আজ বাড়ি যাব।’

হুডি নামিয়ে চন্দন বলল, ‘আজই তো এলি!’

‘দরকার আছে।’ প্রসঙ্গ এড়ায় অভি।

‘বিলুদাকে দেখছি না। সেও কি বাড়িতে?’

‘দাদা কোথাও একটা গেছে। আজ ফিরবে।’ অভির উত্তর দিল। তাদের কথার মাঝে দময়ন্তী ঢুকে পড়ে বলল, ‘সিনিয়ারদের নিয়ে আলোচনা বাদ দে। ডক্টর মুখার্জির ঘুমপাড়ানি ক্লাস নিয়ে তোদের কোনও মতামত নেই?’

‘না।’ মুচকি হাসে চন্দন।

‘কেন?’

‘কেন না আমি ক্লাসে ঘুমোচ্ছিলাম।’ ফচকে হাসি দিয়ে হোস্টেলের দিকে হাঁটা লাগিয়েছে চন্দন। বৃন্দা আর দময়ন্তী গেল কলেজ স্ট্রিট, ফার্মাকোলজির টেক্সট বইয়ের নতুন এডিশনের খোঁজ করতে। অভি কলেজ থেকে বেরোল। দুপুরবেলায় ডানকুনি লোকাল কম থাকে। তাকে বাসে বাড়ি ফিরতে হবে।

ডানলপগামী বাসের সিটে বসে অন্তহীন পত্রিকাটা আবার খুলল অভি। পত্রিকার শ’খানেক কবিতার একটাও না পড়ে নিজের কবিতার দিকে তাকিয়ে রয়েছে সে। ‘ঘরে বাইরে’ নামের কবিতাটিতে কোথাও কি বাস্তবতার ছোঁয়া আছে? আপাতদৃষ্টিতে রবি ঠাকুরের ‘ঘরে বাইরে’ উপন্যাসটি আবার বলা হয়েছে এই কবিতায়। অভি জানে, এটা আহামরি কোনও কবিতা নয়।

কবিতার শেষ লাইন, ‘কিছুটা বিমলা জানে। বাকিটুকু নিখিলের জ্ঞানে।’ অর্থাৎ নিখিলেশ জানে যে বিমলার সঙ্গে সন্দীপের শারীরিক সম্পর্ক আছে। তবু এই সংসার চলছে। চলছে যাবতীয় সম্পর্কের শীতলতা নিয়ে।

‘ঘরে বাইরে’ উপন্যাসের নিখিলেশ আর এই কবিতার নিখিল অবস্থানগত ভাবে এক জায়গায়। স্ত্রীর কার্যকলাপ দেখে, মেনে নিতে নিতে সে উন্মাদ হয়ে যাচ্ছে।

যতই ‘ঘরে বাইরে’-র মুখোশ থাক না কেন, এ কবিতায় রবি ঠাকুর নেই। আছেন মনোজ এবং অরুণা। কবিতায় বিমলা দ্বিচারিণী হয়েছে। বাস্তবে মনোজের দ্বিচারিতায় অরুণা ধীরে ধীরে উন্মাদ হয়ে যাচ্ছেন।

.

অভি যখন বাসে করে ডানলপে আসছে, তখন মনোজ আর ঋষিতা এন্টালিতে, ঋষিতার অফিসে। আজ ঋষিতার দাবি ছিল, অল্প ভদকা খেতে হবে। মনোজ প্রথমে আপত্তি করেছিলেন। তাঁকে আবার অফিস ফিরতে হবে। ঋষিতা আদুরে গলায় হুকুম করেছিল, ‘না। আজ দুপুরে থেকে সন্ধে, পুরোটা সময় তুমি এখানে থাকবে। দেখি, ফিফটি প্লাসের কত দম!’

শুনলেই শরীর শিরিশির করে ওঠে। মনে হয়, এই মেয়েকে আর্তনাদ করে ক্ষমা না চাওয়ালে শান্তি নেই। মনোজ ঠিক করেছিলেন, সারাদিন ঋষিতার সঙ্গে কাটাবেন। তবে, এটাই শেষবার। আর না। বড্ড বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে।

অফিসে না গিয়ে সোজা এন্টালি চলে এসেছেন মনোজ। বাড়ি থেকে বেরিয়ে দু’বার বাস বদলে ঋষিতার অফিসে পৌঁছেছেন এগারোটার সময়।

পাপ্পু আজ নেই। রোলিং শাটার নামিয়ে, অফিসের দরজার ভিতর থেকে তালা লাগিয়ে দিল ঋষিতা। মনোজ খেয়াল করলেন, আজ মেয়েটা অন্য রকম সেজেছে। জিন্‌স–টপ বা সালওয়ার কামিজের বদলে শাড়ি। ঋষিতা কখনও কখনও শাড়ি পরেও অফিস করে। তবে আজকের শাড়িটা পার্টিওয়্যার। অল্প ঝলমলে। ব্লাউজের কাট দুঃসাহসী। সামনে অনেকটা ক্লিভেজ দেখা যাচ্ছে। পিছন দিকে অনেকগুলো ফিতে দিয়ে মাছ ধরার জালের মতো কারুকাজ। অনেকটা হাইহিল। অল্প একটু মেকআপ। সামান্য আই লাইনার। ঠোঁট এক পোঁচ বেশি লাল। ঋষিতার ব্যক্তিত্বে আজ এক ছিপি বেশি রহস্য।

টেবিলে সাজানো আপেলের ফ্লেভারওয়ালা ভদকার বোতল। পাশে লেবুর গন্ধওয়ালা নরম পানীয়। কাজুবাদাম আর ড্রাইফুটের প্যাকেট, বরফ, ঠান্ডা জল। চেয়ারে বসে চোখের তারায় রহস্য ফুটিয়ে ঋষিতা বলল, ‘উদ্‌ভ্রান্তের মতো লাগছে কেন?’

‘একটা নতুন প্রোডাকশানের কথা চলছে।’ সামনে ছড়ানো আয়োজনের দিকে তাকিয়ে বলেন মনোজ। ঋষিতাকে দেখে তিনি অলরেডি উত্তেজিত বোধ করছেন।

‘কার নাটক?’ গ্লাসে ভদকা ঢালতে ঢালতে বলে ঋষিতা। নিষিদ্ধ আপেলের গন্ধে ঘর ভরে যায়।

‘সার্ত্রের লেখা। নাটকের নাম নিন্দাপঙ্কে। এটা বহুরূপীর প্রোডাকশান।’

‘জানি। এই নাটক তোমার ইউনিয়ন গ্রহণ করতে পারবে? কমিউনিস্টদের খুব গালমন্দ করা আছে।’ ঠান্ডা পানীয় মেশানো ভদকায় বরফ আর জল ঢেলে মনোজের দিকে এগিয়ে দেয় ঋষিতা। নিজেও নেয়। প্লেটে ঢালে কাজুবাদাম।

‘সেই নিয়েই ঝগড়া আর কথা কাটাকাটি।’ বড় একটা চুমুক দেন মনোজ। নেশা যখন করতেই হবে তখন তাড়াতাড়ি করে ফেলাই ভালো।

হালকা চুমুক দিয়ে ঋষিতা বলল, ‘তাই নিয়ে ডিরেক্টার সাহেবের মন খারাপ?’

‘তুমি তো আছ। আমার মন খারাপের ওষুধ।’ হাত বাড়িয়ে ঋষিতার গাল স্পর্শ করেন মনোজ। এক চুমুকে নিজের গ্লাস শেষ করে ঋষিতা ফিশফিশ করে বলে, ‘তুমি ছুঁলেই আমার সারা শরীর ঝনঝন করে ওঠে। কেন বলো তো?’

‘আমারও সারা শরীর ঝনঝন করছে।’ টেবিলের ওপ্রান্তে গিয়ে ঋষিতার কানে চুমু খেয়ে বলেন মনোজ। ঋষিতা ছটফট করতে করতে মনোজকে জড়িয়ে ধরে।

ঋষিতার হাত থেকে মনোজ ছাড়া পেলেন বিকেল পাঁচটায়। মাথা ভার, সারা শরীরে ব্যথা, অল্প অল্প পা টলছে। মনে হচ্ছে এখানেই আরও দু’ঘণ্টা শুয়ে থাকি। কিন্তু ঋষিতা এইসব ব্যাপারে অত্যন্ত হিসেবি। বলল, ‘সন্ধে নাগাদ কয়েকজন কাস্টমার আসবে। আর আগে আমাকে পোশাক বদলাতে হবে। তুমি যাও। আমি পরে ফোন করে নেব।’

ফুটপাথে এসে ভুরু কুঁচকে গেল মনোজের। রোদ্দুরের তেজ চড়া। গা গুলোচ্ছে। এখন বাসে বা ট্রেনে বাড়ি যাওয়া যাবে না। ট্যাক্সির জন্য টুকটুক করে মৌলালির মোড়ের দিকে এগোলেন তিনি।

.

অভি যখন বাসে করে ডানলপে আসছে তখন অরুণা, রাধা আর মানদা গল্প করছে। কোনও অজানা কারণে আজ মানদার মুড ভালো। সে নানা রকম রসের গল্প করছে। বর্ণনা প্রায়ই শালীনতার সীমা ছাড়াচ্ছে, আর রাধা উত্তেজিত হয়ে বলছে, ‘আঃ! এত গ্রাফিক বর্ণনার কী প্রয়োজন! সাটল হও। মিনিমালিস্ট হও।’

‘শাটেল ট্যাক্সি হয়েই তো জীবনটা কাটছে। লোকের ভাড়া খেটে খেটে জান গেল। তুই আর জ্ঞান দিস না।’ হাত নেড়ে বলে মানদা।

‘কী আর বলব!’ অরুণার দিকে তাকিয়ে হতাশ হয়ে রাধা বলে, ‘অশিক্ষিত, বর্বর, ইতর, মনুষ্যেতর প্রাণীর সঙ্গে কথা বলা যায় নাকি? এদের একটাই দাওয়াই। কম্বল ধোলাই।’

‘তুই তোর জ্ঞানের কথা রাখ। এই শীতে কী লাগে জানিস? রুই আর দুই। রুই মানে কী বল তো?’

‘রুই মাছ?’ জানতে চায় অরুণা।

‘না গো বউদিমণি। হিন্দিতে রুই মানে তুলো। অর্থাৎ লেপের নিজে দু’জন। পুরুষ মানুষের গা দিয়ে গরম ভাপ বেরোয়। সেই ভাপে শরীরটা সেঁকে নিলে শীতকালে আর শীত করে না।’

‘ওপরে একজন আছেন।’ গর্জন করে ওঠে রাধা, ‘তিনি সব দেখছেন, সব শুনছেন। তাঁর হাতে তুলাদণ্ড। তিনি ক্রমাগত ওজন করছেন। যে দিন পাপের ওজন পুণ্যের ওজনকে ছাড়িয়ে যাবে, সে দিন তোর আত্মাকে তিনি কিনে নেবেন। তখন কেঁদে কূল পাবি না।’

‘ওফ! কথায় কথায় ভগবান টানো কেন বলো তো!’ বিরক্ত হয়ে বলেন অরুণা।

‘বুঝেছি! তোমারও মানদার ছোঁয়া লেগেছে। তাই গা দিয়ে আঁশটে গন্ধ বেরোচ্ছে। আজ একবার বরকে দিয়ে গতর সাফ করিয়ে নিও। না হলে আঁশটানি যাবে না।’ ঘৃণাভরে বলে রাধা। তার কথা শুনে অরুণা চিৎকার করে বলেন, ‘নোংরা কথা কে বলছে? তুমি না মানদা? যাও এখান থেকে। পাগলি কোথাকার।’

মেঝে থেকে ওঠে রাধা। আপন মনে গান গায়, ‘পাগল হয়ে বন্ধু, পাগল বানাইলি পাগল।’ অরুণাকে বলে, ‘এই নিয়ে দু’বার চলে যেতে বললে। লোকে বলে, বার বার তিনবার। তুমি আর একবার আমাকে যেতে বললে এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাব।’

‘কোথায় যাবি? রাঁচির কাঁকে, না কলকাতার গোবরা? মাথায় ইলেকট্রিক শক দেয় এমন হাসপাতাল আর কোথায় আছে?’ খ্যাঁক খ্যাঁক করে শুনিয়ে দেয় মানদা।

‘বউমা! তুমি এই বেবুশ্যেটাকে কিছু বলো। আমার কিন্তু মাথা গরম হয়ে যাচ্ছে।’ গনগনে চোখে অরুণাকে বলে রাধা।

অরুণা একটা পালক কানে ঢুকিয়ে মৃদু মৃদু ঘোরাচ্ছিলেন। আরামে চোখ বোজা। গলায় কুরকুর করে আওয়াজ করছেন। আরামে বিঘ্ন ঘটায় বললেন, ‘তোমাদের ঝামেলায় আমাকে জড়িও না। আর রাধাদি, তোমার আবার জায়গার অভাব? মেয়ের বাড়ি আছে। গারো পাহাড় আছে। এখানে যে কেন রয়েছ, এটাই তো আমি বুঝতে পারি না।’

‘বারবার তিনবার!’ বিড়বিড় করল রাধা। তারপর দুপদাপ করে একতলায় চলে গেল। মানদার ঝগড়া করার ইচ্ছে এখনও শেষ হয়নি। সেও রাধার পিছু পিছু চলল একতলায়।

ফাঁকা দোতলায়, টিভির সামনে এখন অরুণা একা।

আজ শরীরে আনচান ভাব। সকাল থেকে মেজাজ ফুরফুরে। পায়ের তলায় যেন স্প্রিং লাগানো। এ হল মাসের সেই সময়, যখন শরীর উষ্ণতা খোঁজে। পঁয়তাল্লিশের কাছাকাছি বয়স হল। ঋতুচক্র এখনও স্বাভাবিক। অরুণা জানেন, প্রকৃতির নিয়মে এবার তা বন্ধ হয়ে যাবে। শরীরে বাসা বাঁধবে শীতকাল। তার আগে, এই ক’টা মাস, শরীর একটু আদর চায়। বিয়ে করা বউ তো আর মানদার মতো রাস্তার লোকের কাছে আদর চাইবে না। সে চাইবে বরের কাছে। অরুণা যেমন চান মনোজের কাছে।

কিন্তু সেই মানুষটা অনেক দূরে সরে গেছে। অরুণা আর যুবতী নেই। চুল পেকেছে, পেটে চর্বি জমেছে, গালে মেচেতার দাগ। কিন্তু মনোজই বা কোন যুবকটা আছেন? চোখের নীচে ব্যাগ, চোখে বাইফোকাল, একদিন দাড়ি না কামালে গালময় সাদা সাদা বিজগুড়ি বিজগুড়ি দাড়ি, জালার মতো পেট…

ওঁকে দিয়েই কাজ চালিয়ে নেবেন অরুণা। একবার কাছে আসুক তো! মানদার কথা মনে পড়ে। পুরুষ মানুষের শরীর থেকে বেরোনো ভাপে শরীর সেঁকে নেওয়ার কথা। সোফা থেকে উঠে আড়মোড়া ভাঙেন অরুণা। অকারণে হাই তোলেন। শরীর আজ বড্ড শরীর চাইছে।

ল্যান্ডফোন থেকে মনোজকে ফোন করেন অরুণা। রিং হচ্ছে। অরুণা জানেন যে মনোজ বাড়ির ফোন ধরবেন না। তাও বৃথা চেষ্টা। যদি ধরে, তাহলে কণ্ঠে আদুরে ভাব এনে প্রশ্ন করবে, ‘আজ রাতে একটু ঝাল ঝাল করে মাংস করব? পরোটা আর কাঁচা পেঁয়াজ দিয়ে চমৎকার লাগবে।’

যথারীতি মনোজ ফোন ধরলেন না। বসার ঘরের সোফা থেকে উঠে অলস পায়ে বাথরুমে ঢোকেন অরুণা। বেসিনের ওপরের আয়নাটা ময়লা হয়ে রয়েছে। অনেক দিন পরিষ্কার করা হয়নি। খবরের কাগজ জলে ভিজিয়ে ঘষে ঘষে আয়না পরিষ্কার করলেন তিনি। মুহূর্তের পরিশ্রমে ঝকমকিয়ে ওঠে মুকুর। সেখানে বিষণ্ণ এক নারীর প্রতিবিম্ব।

অপর অরুণার দিকে তাকিয়ে জিভ ভ্যাংচান এ দিকের অরুণা। গাল ফোলান, জিভ কাটেন, অনভ্যস্ত চোখ মারেন। নাহ! আজ একটা হেস্তনেস্ত করতে হবে। বাথরুম থেকে বেরিয়ে বেডরুমে ঢুকে আলমারি খোলেন অরুণা। গেল পুজোয় আকাশি রঙের শিফনের শাড়ি কিনেছিলেন। সঙ্গে ম্যাচিং কোবাল্ট ব্লু ব্লাউজ। এখনও শাড়ির পাড় ভাঙা হয়নি। দ্রুত বাথরুমে ফেরেন অরুণা। অব্যবহৃত ফেসওয়াশ দিয়ে মুখ পরিষ্কার করেন। অব্যবহৃত মলম দিয়ে শরীরের লোম তোলেন। চর্চা নেই, বড় যন্ত্রণা হল। অযত্নে পড়ে থাকা ময়েশ্চারাইজার সারা শরীরে বোলালেন। আজ তাঁকে নরম হতে হবে। কোমল, মোলায়েম, তরতাজা হতে হবে।

রূপ-রুটিন সারার ফলে মুখ এখন ঝকঝকে। ঠান্ডা জলের ঝাপটা দিয়ে চুল ভিজিয়ে নেন অরুণা। চিরুনি দিয়ে টানটান করে চুল আঁচড়ে আলগা খোঁপা করেন। শাড়ি ব্লাউজ পরে ঘড়ির দিকে তাকান। ছ’টা বাজে। মনোজ বলেছেন আজ সাড়ে ছ’টার মধ্যে আসবেন। বিলু আজ ফিরবে না! অভির ফিরতে দেরি আছে!

মাংস গরম করা চলছে, এমন সময় মনোজ দোতলায় উঠলেন। এ বাড়ির সদর দরজা রাত ছাড়া বন্ধ হয় না। মানদা বা রাধা— কেউ না কেউ থাকেই। মনোজকে দেখে অরুণা বললেন, ‘বাব্‌বাহ! আজ একেবারে ঘড়ি ধরে সাড়ে ছ’টায়! বোধ হয় জানতে যে আমি কষা মাংস রাঁধছি।’

মনোজ ফ্যাকাশে হেসে বললেন, ‘ডাক্তার আমাকে রেড মিট খেতে বারণ করেছেন।’

‘এটা চিকেন। রেড মিট নয়।’ ভ্রু-ভঙ্গি করেন অরুণা। মনোজ শোওয়ার ঘরে ঢোকেন। কাঁধের ব্যাগ বিছানায় ফেলে বাথরুমে ঢুকে যান। এক বালতি জলে ইমারসন হিটার ডুবিয়ে জল গরম করেন। ভালো করে দাঁত ব্রাশ করেন। আয়নাটা সম্প্রতি পরিষ্কার হয়েছে। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেন, কোনও দাগছোপ আছে কি না। গরম জলে স্নান সেরে, পাজামা পাঞ্জাবি পরে, গায়ে গন্ধ ছড়িয়ে বাথরুম থেকে বেরোন। এতক্ষণে ফ্রেশ লাগছে। এক কাপ চা খেলে শরীরটা ঝরঝরে লাগবে।

বাথরুম থেকে বেরিয়ে মনোজ অবাক। শোওয়ার ঘরের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ। নতুন কাপে চা নিয়ে অরুণা যেভাবে দাঁড়িয়ে, তাতে মনোজের কাছে সবটা পরিষ্কার হয়ে যায়।

‘মাথা ধরেছে। আলো নিবিয়ে দাও।’ বিছানায় শুয়ে বলেন তিনি।

এত বছরের বিবাহিত জীবনের পরে দু’জনেরই একে অপরের সম্পর্কে আর কিছু অজানা নেই। প্রতিটি কথা, প্রতিটি শরীরের ভাষা জলের মতো পরিষ্কার। কিন্তু সব জেনেও না বোঝার ভান করেন অরুণা। মনোজের পাশে আধশোওয়া হয়ে বলেন, ‘দাঁড়াও। টিপে দিচ্ছি।’

‘লাগবে না। থাক।’ ওপাশ ফিরে শুলেন মনোজ। গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে অরুণা মনোজের ওপরে কম্বল চাপিয়ে দিলেন। আলো নিবিয়ে নিজেও ঢুকে পড়লেন কম্বলের মধ্যে। তিনি আর কোনও ভনিতা করছেন না। মনোজের মাথা টিপে দিচ্ছেন, বুকে হাত বোলাচ্ছেন, ভুঁড়িতে হাত বোলাচ্ছেন…

‘অভির আসার সময় হয়ে গেল।’ কুঁকড়ে যেতে যেতে বলেন মনোজ।

‘এখনও দেরি আছে।’ মনোজের পাজামার দড়ি খুলে দিয়েছেন অরুণা। জোর করে তাঁকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিয়েছেন। চুম্বনে চুম্বনে ভরিয়ে দিচ্ছেন মুখ আর বুক।

‘ভালো লাগছে না।’ ধাক্কা দিয়ে অরুণাকে সরিয়ে দিলেন মনোজ।

‘কেন ভালো লাগছে না?’ হিসহিস করে বলেন অরুণা। ‘এক সময় তো খুব ভালো লাগত। আমার ভালো না লাগলেও তোমার কথা ভেবে রাজি হয়ে যেতাম। আজ আমার ভালো লাগছে। তোমাকেও ভালো লাগাতে হবে।’

‘আজকে হবে না! প্লিজ!’ মিনতি করছেন মনোজ।

‘কেন হবে না?’ পাজামার ফাঁকে হাত গলিয়েছেন অরুণা, মনোজের শরীরে নাক ঘষছেন। ‘ভর দুপুরবেলা তুমি মদ খেয়েছ? কোথায়? কার সঙ্গে?’

‘কারও সঙ্গে না।’ ছটফটিয়ে ওঠেন মনোজ। ‘অফিসে একটা প্রোগ্রাম ছিল। ওই জন্যই মাথাটা ধরেছে।’

‘তোমার সঙ্গে কে কে ছিল অফিসের? তাদের ফোন নম্বর দাও। আমি জিজ্ঞাসা করব।’ এক টানে কম্বল সরিয়ে মনোজের মোবাইল ছিনিয়ে নিয়েছেন অরুণা। পটাপট বোতাম টিপে ফোন লাগান সহকর্মী ঘোষদাকে।

মনোজ ওঠার চেষ্টা করছেন না। শুয়ে শুয়ে পাজামার দড়ি বাঁধতে বাঁধতে শুনছেন, ভারি মিষ্টি গলায় কথা বলছেন অরুণা। ‘ঘোষদা, অরুণা বলছি। আর বলবেন না। আপনার বন্ধুর ফোন থেকে কথা বলতে বাধ্য হলাম। ওর শরীরটা খারাপ লাগছে। বলছে অফিসের প্রোগ্রামে উল্টোপাল্টা খাওয়া হয়ে গেছে…কী বলছেন? আজ ও অফিসে যায়নি? তা হবে। এই নিন বন্ধুর সঙ্গে কথা বলুন।’ স্পিকার অন করে মনোজের হাতে ফোন গুঁজে দেয় অরুণা।

ফোন নিয়ে অসহায় ভাবে মনোজ বলে, ‘ঘোষদা, আমি পরে কথা বলব।’ তিনি লাইন কাটার আগেই ঘোষদার গলা শোওয়ার ঘরে গমগমিয়ে ওঠে, ‘আপিসে না এসে কোথায় ডুবে ডুবে জল খাচ্ছ লাহিড়ী? আমাদেরও একটু প্রসাদ দাও!’

মনোজ ফোন রাখেন। অরুণা আকাশি শাড়ি খুলছেন। কোবাল্ট ব্লু ব্লাউজ খুলছেন। খুলছেন অন্তর্বাস ও পেটিকোট। সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে চেয়ারে বসেন তিনি। মনোজকে দেখিয়ে দেখিয়ে বাঁ-হাতে নিজের স্তনবৃন্ত চিপে ধরেন। তাঁর ডানহাত এখন দুই ঊরুর মাঝখানে। মনোজের দিকে তাকিয়ে স্বমেহন করতে করতে চাপা গলায় শীৎকার করছেন আর বলছেন, ‘আর তোকে লাগবে না। কোনও দিনও লাগবে না। যাঃ! তুই ঋষিতার কাছে যা। এই বাড়িতে আর আসিস না। যাঃ! হুশ!’

মনোজ অবাক হয়ে অরুণার দিকে তাকিয়ে আছেন।

.

লক্ষ্মী নিবাসে ঢুকতে ঢুকতে অভি খেয়াল করল, আজ বাড়ির চেহারা অন্যরকম। একতলা আর দোতলার সমস্ত ঘরের দরজা জানলা খোলা। সব ঘরে আলো জ্বলছে। মায় চিলেকোঠার জানলাও খোলা। সেই ঘরে বিলুকে দেখা যাচ্ছে। দৌড়ে বাড়ি ঢোকে অভি। একতলায় মানদা বা রাধা কেউ নেই।

দোতলায় উঠে সে দেখে অরুণা আর মানদা থম মেরে বসে। রিফ্লেক্সের বশে অভি বলে, ‘বাবা ফেরেনি?’

অরুণা চুপ করে থাকে। মানদা বলে, ‘তোমরা বাবা অনেকক্ষণ এসেচে। শরিল খারাপ। শুয়ে রয়েছে।’

‘তাহলে কী হল?’ অবাক হয়ে বলে অভি। অরুণাকে দেখে তার ভালো লাগছে না। দৃষ্টিতে ফোকাস নেই। ভুরু কুঁচকোনো, কপালে একগাদা চিন্তার রেখা, এই শীতেও ঘামছেন। মুখ আর হাত অস্বাভাবিক তেলতেলে। অরুণার হাতে একটুকরো কাগজ।

কাগজটা হাতে নেয় অভি। লেখা রয়েছে,

‘বারবার তিনবার। তিনি সব দেখেছেন। তিনি সব জানেন। লাইফ ইজ টু শর্ট টু পন্ডার ওভার সিলি থিংস। আমি গারো পাহাড় চললাম। তোমরা ভালো থাকার চেষ্টা করো। ভালো থাকতে না পারলে ভালো থাকার অভিনয় করো। যতক্ষণ না মৃত্যু এসে সবাইকে একদম ভালো রাখে।

একটা কথা মনে রেখো। দাবার বোর্ডে কেউ রাজা, কেউ রানি, কেউ বোড়ে। খেলা শেষ হয়ে গেলে কিন্তু সবাইকে এক সঙ্গে বাক্সের মধ্যে জড়াজড়ি করে শুয়ে থাকতে হবে।

গুড বাই। বিদায়। আলবিদা।

রাধা।’

বিলু ছাদের ঘর খুঁজে নীচে চলে এসেছে। সে বলল, ‘মোবাইলে রাধাদির মেয়ে ছায়ার সঙ্গে কথা বললাম। সোনারপুরে এখনও যায়নি।’

অরুণা বললেন, ‘খোঁজ করে লাভ নেই। ওকে আর পাওয়া যাবে না।’

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *