হৃদয়ের নৈঃশব্দ্য – ২৩

২৩. চন্দন

ভোরবেলা ঘুম ভাঙল খেজুর গুড় জ্বাল দেওয়ার গন্ধে। আবাসবাড়ির ঠিক পাশে, নতুনগ্রাম-মেচেদা সড়কের ধারে খেজুরপাতা দিয়ে অস্থায়ী ছাউনি বানানো হয়েছে। ছাউনির ভিতরে ভোরবেলা গুড় জ্বাল দেওয়ার কাজ করে শিউলিরা। মরদগুলো গাছে উঠে হাঁড়ি পেড়ে আনে। বউগুলো উনুনে ঢিমে আঁচে জ্বাল দেয়। অসম্ভব মন কেমন করা সৌরভে ভরে যায় নতুনগ্রাম। লোকে বুঝতে পারে, শীত এসেছে।

আবাসবাড়ির বিছানায় শুয়ে চন্দনের ঘুম ভাঙল পুরোনো সুগন্ধে। গন্ধের সঙ্গে নানা স্মৃতি জড়িয়ে থাকে। জবাকুসুম তেলের গন্ধে মায়ের কথা মনে পড়ে। পারুল বরাবর মাথায় জবাকুসুম তেল মাখেন। সর্ষের তেলের গন্ধে মনে পড়ে বাবার কথা। পবন স্নান করার আগে সর্ষের তেলে শরীর দলাইমলাই করেন। তেলেভাজার গন্ধ পেলে মনে পড়ে বর্ষাকালের কথা। আর খেজুর রস জ্বাল দেওয়ার গন্ধ অনিবার্যভাবে নিয়ে আসে শীতকালের অনুষঙ্গ।

লেপের ওম ছেড়ে উঠে জানলা খুলল চন্দন। বৃন্দার ওড়নার মতো বিছিয়ে রয়েছে পাতলা কুয়াশা। এখনও ভোরের আলো ফোটেনি। অন্ধকারের মধ্যে উৎকট এয়ারহর্ন বাজাতে বাজাতে চলে গেল হুমগড়ের বাস। এই বাসে চড়ে কয়েক বছর আগে চন্দন ইন্ডিয়ান মেডিকাল কলেজ গিয়েছিল। আজ মনে হয়, সে অনেক পুরোনো দিনের কথা।

জানলা বন্ধ করে পাশ ফিরে শোয় চন্দন। আজ একত্রিশে ডিসেম্বর। বছরের শেষ দিন। হোস্টেলে গ্র্যান্ড ফিস্ট আছে। তাকে ফিরে যেতে হবে।

গতকাল সন্ধেবেলা সে এসেছে। আসার একদম ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু ফোনে পারুলের কান্না শুনে থাকতে পারেনি। পবন গত পরশু থেকে বাড়ি ছাড়া। নবযুগ পার্টির লোকেরা কাতান, হাতবোমা, ওয়ান শটার নিয়ে বাড়ি এসে বলে গেছে, পবন যেন ভোটের আগে এলাকায় না ঢোকেন। পরশুই পবন ব্যাগ গুছিয়ে হাওড়া চলে গেছেন। হাওড়া ময়দানের এক সহকর্মীর সাহায্যে ছোট্ট একটা ফ্ল্যাট মাসিক চার হাজার টাকা ভাড়ায় পেয়েছেন। সেখানে থাকছেন। ওখান থেকেই অফিস করছেন। নতুনগ্রামে ফেরার সম্ভাবনা নেই। বড় ছেলে থাকলে পারুল নিজেকে সামলাতে পারতেন। কিন্তু শীতের সিজনে নন্দন মালদায় সার্কাসের শো নিয়ে ব্যস্ত। পারুল বাধ্য হয়ে ছোট ছেলেকে ফোন করেছিলেন। গতকাল বিজয় মেমোরিয়াল ময়দানে মৃন্ময় চ্যাটার্জির জনসভা ছিল। এখান থেকেই বিধানসভা ভোটের ক্যাম্পেন শুরু করলেন তিনি।

গতকাল বিকেল চারটের সময় মেচেদা স্টেশনে নেমে চন্দন অবাক। পুরো এলাকা নবযুগ পার্টির হলুদ পতাকায় ঝলমল করছে। জনমোর্চা পার্টির লাল পতাকার একটা টুকরোও দেখা যাচ্ছে না। এত দ্রুত বদলে গেল এই এলাকা? কয়েক মাস আগেও এই পরিস্থিতি ছিল না! নবযুগ পার্টি একদিকে অস্ত্র দেখিয়ে পার্টি কর্মীদের বাড়িছাড়া করছে, অন্যদিকে মিটিং মিছিল অর্গানাইজ করে গণভিত্তি তৈরি করছে। নাক সিঁটকোয় চন্দন। আইডিয়োলজিবিহীন, ওয়ান-ম্যান পার্টি। তার আবার এত রোয়াব কীসের? ক’দিন বাদেই ধুয়েমুছে সাফ হয়ে যাবে!

স্ট্যান্ডে বাস নেই। সিগারেট কিনতে গিয়ে চন্দন জানতে পারল, সব বাস বিজয় মেমোরিয়াল গ্রাউন্ডে। কোনও বাস মালিককে জোরাজুরি করতে হয়নি। তারা নিজেরাই বাস দিয়েছে দলীয় কর্মীদের মিটিং-এ যাবার জন্য।

অগত্যা ভ্যানো চড়ে যাত্রা। নতুনগ্রামে যখন চন্দন পৌঁছল তখন সভা শেষের দিকে। মৃন্ময় ভাষণ দিচ্ছেন। শব্দচয়ন বা বাক্যগঠনের মাথা মুণ্ডু নেই। অবলীলায় আওড়াচ্ছেন মিথ্যে স্ট্যাটিস্টিক্স। সেই ভাষণ শুনে বিজয় মেমোরিয়াল গ্রাউন্ডের চাষাভুষো মানুষ, শ্রমজীবী, চাকুরিজীবী, শিক্ষক-অশিক্ষক কর্মচারী, সবহারাদের দল হাততালি দিয়ে আকাশবাতাস ফাটিয়ে দিল।

বাড়ি ঢোকামাত্র পারুলের কান্না শুরু হল। তিনি শক্ত ধাতের মহিলা। পার্টি করা স্বামী আর বামন ছেলেকে নিয়ে সংসার চালানো সোজা কথা নয়। কিন্তু অস্ত্র হাতে একগাদা লোক বাড়িতে এসে ভয় দেখিয়ে যাবে—এ কখনও ভাবতে পারেননি। মোবাইল ফোনের দৌলতে রোজ দু’বেলা পবনের সঙ্গে কথা হচ্ছে। কিন্তু লোকটা নিজের বাড়ি ফিরতে পারছেন না, এটা বেজায় ভয় পাইয়ে দিয়েছে। চন্দনকে জড়িয়ে ধরে পারুল বললেন, ‘তুই কথা দে যে কোনওদিন রাজনীতি করবি না? ওই পাপের পথ থেকে দূরে থাকবি?’

এক কথায় সায় দিল চন্দন। নতমুখে বলল, ‘না মা। আমি কোনদিনও রাজনীতি করব না।’

এইসব ছোটখাটো স্ট্র্যাটেজিক মিথ্যে না বলে উপায় নেই। সে যে কলেজে ঘোরতর জনমোর্চাপন্থী, ইউনিয়নের জেনারেল সেক্রেটারি, পার্টি কার্ড হোল্ডার—এসব কথা এখানে কেউ জানে না। জানাবার প্রয়োজনও নেই। বরং আজ সকালে বেরিয়ে এখানকার নবযুগ পার্টির নেতার সঙ্গে আলাপটা ঝালিয়ে আসতে হবে। কখন কী দরকার লাগে কে জানে!

ভোরবেলা লেপ মুড়ি দিয়ে এইসব ভাবছিল চন্দন। পারুল চা নিয়ে ঢুকলেন। বিছানায় বসে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে চন্দন বলল, ‘ফ্ল্যাটের ভাড়া মাসে চার হাজার টাকা। প্লাস জমির কাজ দেখার লোক নেই। তোমার অসুবিধা হবে না?’

‘খেতের কাজ মুনিষ দিয়ে সামলাচ্ছি। তোর বাপ এখানে থাকলে বেলাকূলের পিছনে একগাদা টাকা ঢালত। সেই খরচ বন্ধ হয়েছে।’

চায়ে চুমুক দিয়ে চন্দন বলল, ‘সে গুড়ে বালি। ফোনে বাবার সঙ্গে কথা হল। ওখানে একটা সেকেন্ড হ্যান্ড কম্পিউটার জোগাড় করেছে। বেলাকূল চার পাতার ট্যাবলয়েড। নিজেই চার পাতা লিখছে। তারপর সেটা এখানকার প্রেসকে মেল করছে। এরা ছেপে বাজারে ছাড়ছে।’

‘মেল করা মানে কী?’ প্রশ্ন করেন পারুল।

‘হাওয়ায় চিঠি পাঠানো। আগেকার দিনে চিঠি লিখে পায়রার পায়ে বেঁধে দিলে পায়রা চিঠি নিয়ে উড়ে উড়ে প্রাপকের কাছে পৌঁছে দিত। আজও একই টেকনিক। এখন শুধু জিমেলের পায়ে চিঠি বাঁধতে হয়।’

পারুল কী বুঝলেন কে জানে! ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আগে বললেন, ‘একা কী করে কাগজ চালাবে? গোপাল নস্করের তো কোনও খবর নেই!’

চা খেতে খেতে গোপাল কাকার কথা ভাবল চন্দন। যৌথবাহিনীর আক্রমণের রাত থেকে গোপাল কাকার পাত্তা নেই। দোতলা বাড়িটা প্রথমে যৌথবাহিনী সিল করে দিয়ে গিয়েছিল। প্রাথমিক খানাতল্লাশির পরে বাড়িটা তাদের হাত থেকে রেহাই পায়। তাপসীদি ফাঁকা বাড়িতে এসে উঠবে এটা কেউ ভাবেনি। তার ধর্ষণ এবং খুনের ঘটনার পর থেকে ওটা হানাবাড়ি হয়ে আছে। ওই ঘটনার পরে একদিন চন্দন গিয়ে দেখেছিল, বাড়িটার দরজা জানলা চুরি হওয়া শুরু হয়ে গেছে। সামনের বাগান ঝোপঝাড়ে ভরতি। কার্নিশে বট-অশ্বত্থের চারা গজিয়েছে। ওই বাড়ি আর ক’দিনের মধ্যে ধুলোবালিতে মিলিয়ে যাবে। গোপাল কাকা হয়তো রেড করিডর ধরে উড়িষ্যা, ঝাড়খন্ড বা অন্ধ্রপ্রদেশে পালিয়েছেন। বা পুলিশি এনকাউন্টারে লাশ হয়ে গেছেন। শেয়াল কুকুরে মাংস খেয়ে নিয়েছে। কঙ্কালটাও ঝুরঝুরে হয়ে আসছে।

না। এই জীবন চন্দনের পছন্দ নয়। সে ভেবে নিয়েছে, মেডিসিনে এমডি করবে। তারপর কার্ডিওলজিতে ডিএম। পরের গন্তব্য বিদেশ। ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্ট হয়ে দেশে ফিরবে। চিকিৎসকদের কাছে সবাইকে নতজানু হতে হয়। একটা বয়সের পরে প্রতিটি মানুষ নিজেকে সঁপে দেয় হৃদরোগ বিশেষজ্ঞদের হাতে। অর্থ বলো, ক্ষমতা বলো, প্রতিপত্তি বলো—সবের চূড়ায় অবস্থান কার্ডিওলজিস্টের। তাঁরা হলেন রাজার রাজা। হিমালয় রেঞ্জের মধ্যে মাউন্ট এভারেস্ট। চন্দন ওই চূড়ায় পৌঁছতে চায়। নতুনগ্রামের চাষার ছেলে শুধু মার্কশিট দিয়ে অতদূর উঠতে পারবে না।

আচ্ছা, সামনের ভোটে কি পশ্চিমবাংলা রং বদলাবে? এই প্রশ্নের উত্তর জানা অত্যন্ত জরুরি। তড়াক করে বিছানা ছাড়ে চন্দন। হাতমুখ ধুয়ে বেরতে হবে। নবযুগ পার্টির নেতার সঙ্গে দেখা করে দুপুরের খাওয়া খেয়ে কলকাতা রওনা দিতে হবে। থার্টি ফার্স্ট নাইটের গ্র্যান্ড ফিস্ট শেষ হতে হতে নতুন বছর চলে আসবে।

নতুন বছরে নিজেকেও বদলাবে চন্দন। অধীরের সঙ্গে যোগাযোগ কমাবে। ইউনিয়নের কাজ জুনিয়র ছেলেদের হাতে ভাগ করে দিতে হবে। ফার্স্ট আর সেকেন্ড ইয়ারে নতুন কয়েকটা মুরগি আছে। পলিটিক্স নিয়ে খুব লাফালাফি করছে। লাফাচ্ছিস যখন লিডারশিপও নে। চন্দন আপাতত রিটায়ার্ড হার্ট। তার লক্ষ্য দুটো। পুরো রাজত্ব এবং রাজকন্যা।

স্নান করে, জলখাবার খেয়ে শক্তিধর মাইতির বাড়ি গেল চন্দন। মৃন্ময় চ্যাটার্জি জেলায় এলে নবযুগ পার্টির জন্মলগ্ন থেকে সক্রিয় কর্মী শক্তিধরের বাড়িতেই ওঠেন। চন্দন আন্দাজ করতে পারছে শক্তিধরের মদতেই নবযুগ পার্টির লোকেরা পবনকে বাড়িছাড়া করেছে।

শক্তিধর এখন চূড়ান্ত ব্যস্ত। তবে চন্দন শক্তিকাকুর কোলেপিঠে মানুষ হয়েছে। শক্তিকাকুই তাকে রূপনারায়ণে সাঁতার কাটা শিখিয়েছেন। ছোট্টবেলার আলাপ এত সহজে কাটাতে পারবেন না। তাছাড়া, সে উচ্চ মাধ্যমিকের ফার্স্ট বয়। জেলার গৌরব। ইজ্জতই আলাদা।

শক্তিধরের চারতলা বাড়িটি দুর্গের মতো সুরক্ষিত। মৃন্ময় চ্যাটার্জির কাট আউট ও হলুদ রঙের দলীয় পতাকায় পুরো বাড়ি মোড়া। গেটের বাইরে গোটা তিরিশেক বাইক, গোটা পঞ্চাশেক সাইকেল, শ’খানেক দর্শনপ্রার্থী। মেজো-সেজো নেতা আর দালাল-ফড়ের ভনভনানিতে মাইতি ভবন সরগরম।

গেটে দারোয়ানকাকু বসেছিল। ছোটবেলা থেকে চন্দনকে চেনে। একগাল হেসে গেট খুলে দিয়ে বলল, ‘ডাক্তারবাবু যে! কবে এলে?’

‘ডাক্তার হতে এক বছর দেরি আছে। আর সেটা হয়ে গেলেও তুমি আমায় ডাক্তারবাবু বলবে না। চন্দন বলে ডাকবে।’ গেট টপকে ভেতরে ঢুকে বলে চন্দন। তার পিছন পিছন দু’একজন উমেদার ঢোকার চেষ্টা করছিল। দারোয়ানকাকু তাদের মুখের ওপরে দরজা বন্ধ করে দিল।

বসার ঘরে মস্ত টেবিলের কোণে শক্তিধর বসে। সামনে জনাপঞ্চাশ লোক। শক্তিকাকু তাদের নির্বাচনবিধি বোঝাচ্ছেন। দলীয় কর্মীদের জন্য শিক্ষাশিবির চলছে। কাল মৃন্ময় চ্যাটার্জি তাঁর ভাষণে, নির্বাচনবিধি নিখুঁতভাবে জানার ব্যাপারে জোর দিয়েছিলেন।

শক্তিকাকুকে হাত নেড়ে ভেতর বাড়িতে গেল চন্দন। কাকিমার সঙ্গে গপ্‌পো গুজব করে, শক্তিকাকুর মায়ের দাঁতের ব্যথার ওষুধ বাতলে, চা আর মাখা সন্দেশ খেয়ে বেরোল ঘণ্টাখানেক পরে। বসার ঘরে তখন শক্তিকাকু আর তার দুই স্যাঙাত। শিক্ষার্থীরা আপাতত উধাও। চন্দনকে বেরিয়ে যেতে দেখে শক্তিধর বললেন, ‘কী হিরো? কী খবর?’

‘খবর তো তোমার!’ একগাল হেসে বলল চন্দন, ‘বিধানসভায় ভোটে দাঁড়াচ্ছ। জিতলে এমএলএ হবে। মৃন্ময় স্যার চাইলে মন্ত্রীও হতে পারো।’

‘পবনের সঙ্গে কাল রাতে কথা হল।’ চন্দনের কথায় পাত্তা না দিয়ে বললেন শক্তিধর, ‘বাড়িভাড়া বাবদ চার হাজার টাকা হঠাৎ করে বার করা ইয়ার্কির কথা নয়। হাওড়া ময়দানের গ্যাঞ্জেস ভিউ কমপ্লেক্সে আমার একটা ওয়ান রুম ফ্ল্যাট আছে। আমি ওকে বলেছি ফ্ল্যাটটায় শিফ্‌ট করতে। তুই চাবি নিয়ে যা।’

শক্তিধরের ইশারায় এক স্যাঙাত ভিতরে গেল চাবি আনতে। চন্দন চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। শক্তিধর থেমে থেমে বললেন, ‘পবনকে আমি আগেই বলেছিলাম, এখান থেকে চলে যেতে। আমি নেতা হতে পারি। কিন্তু ভিটেমাটি হারানোর দুঃখ আমি বুঝব না। যারা তোর বাবাকে সেদিন বাড়ি থেকে চলে যেতে বলেছিল, তাদের মাথার ওপরে কোনও ছাদ নেই। সন্দীপ সামন্তর সরকার নিয়ে নিয়েছে। আমি ওদের না সামলালে তোর বাবার সেদিন কিছু হয়ে যেতে পারত।’

আবাসবাড়িতে বাঁজাপলাশের জোয়াকিমরা আসেনি। এসেছিল একদল পূর্ণ দৈর্ঘ্যের গুন্ডা। তবে সে কথা শক্তিধরকে বলার সময় এটা নয়। চন্দন চুপ করে রইল। শক্তিধরের স্যাঙাত চাবি এনে মালিকের হাতে তুলে দিল। শক্তিধর বললেন, ‘আমরা এক স্কুলে পড়েছি, এক কলেজে পড়েছি, একসঙ্গে বিড়িটানা শিখেছি, একসঙ্গে আরও নানা দুষ্টুমি করেছি। তুই কলেজে পড়ছিস, কলকাতায় থাকিস। তোকে সেসব বুঝিয়ে বলতে হবে না। মাঝেমাঝে এমন সময় আসে, যখন এইসব পুরোনো, টাইমটেস্টেড সম্পর্ককেও প্রশ্নচিহ্নের মুখে পড়তে হয়। তোর বাবার রাজনীতি আর আমার রাজনীতি আলাদা। গণতন্ত্রে সেটা স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু এখন এই দুই দল পরষ্পরের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নিয়েছে। সন্দীপ সামন্ত এবং তার স্টেট মেশিনারি ভার্সাস মৃন্ময় চ্যাটার্জি ও জনগণ। দু’পক্ষের শক্তি যখন সমানে সমানে হয় তখন রাজনৈতিক অস্থিরতা বেশি থাকে। দেশে সিভিল ওয়ারের পরিস্থিতি হয়। আমি পবনের জন্য যতটা পারি করছি। তুই তোর বাবাকে বুঝিয়ে বলিস।’

‘আচ্ছা, ’ সংক্ষিপ্ত উত্তর দেয় চন্দন। তার মন বলছে, শক্তিধর আরও কিছু কথা বলবেন। উচ্চ মাধ্যমিকের ফার্স্ট বয়, ডাক্তারি ছাত্র, জনমোর্চা বাড়ির ছেলেকে নবযুগে টানার চেষ্টা শক্তিধর করবেন না? এতদিনে এই রাজনীতি বুঝেছে চন্দন?

চন্দনের অনুমান সত্যি করে শক্তিধর বললেন, ‘কলেজে পড়াশুনা কেমন চলছে?’

‘ভালো।’

‘পলিটিক্‌স?’ প্রত্যাশিত প্রশ্নটি করেই ফেললেন শক্তিধর। এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্যই চন্দন আজ এখানে এসেছে। উত্তর তার তৈরি আছে। ‘আমি রাজনীতি বুঝি না শক্তিকাকু। কলেজে যাদের ইউনিয়ন, তাদের সঙ্গে মাখামাখি আছে। এই যা। ওইটুকু না করলে একঘরে হয়ে যাব।’

‘হ্যাঁ। গত ত্রিশ বছর ধরে এই সরকার তো ওটাই শিখিয়েছে। একঘরে করা, ধোপা নাপিত বন্ধ করা, ‘আমাদের লোক না হলে তুই ওদের লোক’ বলে দেগে দেওয়া!’ দীর্ঘশ্বাস ফেলে শক্তিধর ফ্ল্যাটের চাবি চন্দনের হাতে দিলেন, ‘তুই কবে কলকাতা যাচ্ছিস?’

‘একটু পরেই। খেয়েদেয়ে বেরোবো।’

‘তাহলে পবনকে চাবিটা দিয়ে দিস। আজই শিফ্‌ট করে যাক। কাল পয়লা তারিখ। একদিনের জন্য কেন চার হাজার টাকা এক্সট্রা গুনবে?’

‘আচ্ছা।’

‘আর একটা কথা। তুই কেমন ছেলে আমি জানি। তোর মতো ছেলেকে রাজনীতি করতে বলব না। কিন্তু আশেপাশে যা ঘটছে তাই নিয়ে নিজস্ব মতামত আছে তো?’

‘হ্যাঁ। মোটামুটি। আসলে টিভি দেখা হয় না। খবরের কাগজটাও সেভাবে পড়া হয় না…’

‘এই হল তোদের জেনারেশানের সমস্যা। রিয়্যালিটি থেকে মুখ ঘুরিয়ে থাকা। চিকিৎসকদের কারবার মানুষ নিয়ে। একজন মানুষ নয়, সমস্ত মানুষ। গোটা সোসাইটি। সোসাইটি ভালো না থাকলে তার দায় শুধু পলিটিশিয়ানদের ঘাড়ে চাপালে হবে না। পৃথিবীর ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখতে পাবি অনেক পলিটিশিয়ানই আদতে চিকিৎসক ছিলেন। বিধানচন্দ্র রায়ের নাম জানিস। আর্নেস্টো চে গেভারার নাম শুনেছিস?’

চন্দন অবাক হয়ে শক্তিধরের কথা শুনছিল। যে আদর্শের বুলি তার বলার কথা, তা শুনতে হচ্ছে নবযুগ পার্টির নেতার কাছ থেকে। দক্ষিণপন্থী সংগঠনের নেতা চে-র নাম করছেন, চিকিৎসকের সামাজিক দায়বদ্ধতার কথা বলছেন। আর সে, কলেজে বামপন্থী ছাত্র সংগঠনের নেতা, পার্টি কর্মী, ইউনিয়নের জেনারেল সেক্রেটারি—রাজনৈতিক পরিচয় গোপন করে জ্ঞান হজম করছে।

একাধিক পরিচয় রাখা কি অন্যায়? ন্যায়-অন্যায়ে মারো গুলি। তার মতো দুই-তিন-চার নৌকায় পা দিয়ে আরও মানুষ চলছে! কলেজে লাল, পাড়ায় নীল, ক্লাবে সবুজ, বাজারে গেরুয়া—এই রকম গিরগিটিই এখন বাংলায় মেজরিটি।

চন্দন নিজের চিন্তায় ডুবে ছিল। শক্তিধরের প্রশ্নে চটকা ভাঙল। ‘কী রে? ধ্যানস্থ হয়ে গেলি যে!’

‘না!’ হালকা হাসে চন্দন, ‘আমি অন্য কথা ভাবছিলাম।’

‘যা। পালা। হাওড়ায় পৌঁছে পবনকে চাবিটা দিয়ে দিস। আমি রাত্তিরে ফোন করে খবর নেব কিন্তু।’

‘আচ্ছা।’ মাইতি ভবন থেকে বিদায় নেয় চন্দন। দারোয়ানকাকু গেট খুলে বলল, ‘আবার কবে আসবে চন্দন?’

‘আগামী বছরে।’ ফচকে হেসে আবাসবাড়ির দিকে এগোয় চন্দন।

.

হোস্টেলে পৌঁছতে রাত আটটা বাজল। চন্দন আরও আগে আসতে পারত। পবনকে চাবি দিতে গিয়ে দেরি হল। পবন ফোনে বলেছিলেন হাওড়া স্টেশনে এসে চাবি নিয়ে নেবেন। চন্দন রাজি হয়নি। হাওড়া স্টেশন থেকে বেরিয়ে হাওড়া ময়দানে গিয়ে পবনের হাতে চাবি ধরিয়ে নতুন ফ্ল্যাটে শিফ্‌ট করাল। ডেস্কটপটা পুরোনো এবং ওজনদার। কোর্টের দলিল-দস্তাবেজ, উকিলবাবুদের ব্রিফ, বেলাকূলের ফাইল, কাপড়জামা, বিছানাপত্র—জিনিস কম নয়। একটা পিক আপ ভ্যান ভাড়া করতে হল।

শক্তিধরের ফ্ল্যাট গ্যাঞ্জেস ভিউ হাউসিং কমপ্লেক্সে। শক্তিধর সিকিওরিটিকে বলে রেখেছিলেন। সে-ই নিয়ে গেল দোতলার পুঁচকে ফ্ল্যাটে। একপলক দেখে পছন্দ হয়ে গেল চন্দনের। একটা শোওয়ার ঘর, একটা লিভিং কাম ডাইনিং স্পেস, একফালি বারান্দা, কিচেন আর একটা বাথরুম। ব্যস। ফ্ল্যাটে এসি, ফ্রিজ, টিভি, খাট, বিছানা— সব রয়েছে। পবনের দু’চারটে কাপড়চোপড় আলমারিতে ঢুকিয়ে, কম্পিউটারের পার্টস জুড়ে সেটাকে চালু করে, ফাইলপত্র টেবিলে সাজিয়ে ফ্ল্যাট থেকে বেরোতে বেরোতে সাড়ে ছ’টা। একত্রিশে ডিসেম্বরের সন্ধ্যায় মহাত্মা গাঁধী রোড জ্যামজমাট। সাতটায় শেয়ালদা পৌঁছল চন্দন। দাঁড়ে বসে চা খেয়ে, সুরজের সঙ্গে গপ্‌পো করে হোস্টেলে ঢুকল আটটায়।

তাকে দেখে দৌড়ে এল দীপ আর সবুজ। ‘এতক্ষণ কোথায় পায়ুমৈথুন করাচ্ছিলি?’ রাগ রাগ গলায় বলে দীপ। ‘ছেলেরা ড্রিংকের জন্য হেদিয়ে মরে যাচ্ছে। তুই না এলে আমরা কাউকে সার্ভ করতে পারছি না।’

‘অ্যানেক্স ব্লকের ছেলেগুলো অলরেডি গাঁজা খেয়ে আউট। শুনলাম এক্সট্যাসি আর চরসও টানছে। এইসব কিন্তু বরদাস্ত করা উচিত নয়।’ বলল সবুজ।

দীপ বলল, ‘পরের ছেলে পরমানন্দ। যত ভোগে যায় তত আনন্দ। ওরা ওইসব খেয়ে মরুক। ছেলেরা ড্রিংকের সঙ্গে চিকেন পকোড়া চাইছে। অত ফিঙ্গার ফুড কোত্থেকে দেব।’

চন্দন একশো পঁচিশের তালা খুলে দিল। এই ঘরেই বোতল রাখা রয়েছে। হোস্টেলে আজ আড়াইশো ছেলে আছে। এরা একমাস আগে থেকে দাবি তুলেছিল, একত্রিশে ডিসেম্বর রাত্রে পার্টি চাই। কলকাতার প্রতিটি ক্লাবে, রেস্তরাঁয় এদিন নাচাগানা এবং খানাপিনার আয়োজন করা হয়। ক্লাবে যাওয়ার জন্য পারমিশান বা ইনভিটেশান লাগে। রেস্তরাঁয় যাবার জন্য লাগে রেস্ত। কোনওটাই ছাত্রদের নেই। সুতরাং হোস্টেলেই পার্টি করতে হবে।

‘পার্টি’ শব্দটা অবশ্য সচেতনভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে না। বলা হচ্ছে গ্র্যান্ড ফিস্ট। কেন না পার্টি শব্দটির সঙ্গে সুরা, রমণী, নাচগান, বেলেল্লাপনার অনুষঙ্গ থাকে। ‘ফিস্ট’ বলতে বোঝায় ‘চড়ুইভাতি’। যদিও হোস্টেলের মাঝখানের বাগানে একটি স্টেজ তৈরি হয়েছে। ডিস্ক জকি বা ডিজে আসছে। বার কাউন্টার থাকছে। সাইকেডেলিক আলোর ব্যবস্থা হয়েছে। এবং ব্যতিক্রম হিসেবে, লেডি আর্চার্স হোস্টেলের মেয়েরাও আমন্ত্রিত।

কলেজ ইউনিয়নের অনুষ্ঠান হিসেবে সেন্ট্রাল হলে বর্ষবরণের পার্টি করা যেত। স্পনসরের আপত্তির কারণে করা যায়নি।

স্পনসর বলতে ওষুধ কোম্পানি। অ্যারন ফার্মা নামের একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি আয়রন ট্যাবলেট, ভিটামিন সিরাপ, অ্যান্টাসিড—এইসব ওষুধ তৈরি করে। এইসব ‘ওভার দ্য কাউন্টার’ ড্রাগ বা ওটিসির জন্য ডাক্তারি প্রেসক্রিপশান লাগে না। যে কেউ ওষুধের দোকানে গিয়ে চাইলেই দোকানি ফেরাসল, ভিটাসল, বা অ্যান্টিসল দিয়ে দেবে। কিন্তু অ্যারন ফার্মা চায় ডাক্তাররা এইসব ওষুধ প্রেসক্রাইব করুক। এই জন্য তারা বেছেছে ইন্টার্ন এবং হাউসস্টাফেদের। ‘ক্যাচ দেম ইয়াং।’ হোস্টেলে ইয়ার এন্ডিং পার্টির জন্য আবেদন যখন তুঙ্গে তখন রিপুর সূত্রে চন্দন যোগাযোগ করে অ্যারন ফার্মার মেডিকাল রিপ্রেজেন্টেটিভ বিকাশের সঙ্গে।

বিকাশ এক কথায় রাজি হয়ে যায়। তার শর্ত ছিল দু’টি। ইউনিয়নের সেক্রেটারি হিসেবে মঞ্চ থেকে এই আবেদন সকল ছাত্রকে পৌছে দিতে হবে, যে পাশ করার পর তারা যেন রোজ অ্যারন ফার্মার যে কোনো একটা প্রোডাক্ট লেখে। দিনে জাস্ট একটা। চন্দন মনে মনে হিসেব করেছে, আড়াইশো ছাত্রর দশ শতাংশ বিকাশের কথা শুনলেও ছ’মাসে অ্যারনের টাকা উঠে যাবে। দ্বিতীয় শর্ত ছিল, অনুষ্ঠানটা হোস্টেলে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। বিকাশ বলেছিল, ‘আজকাল ইলেকট্রনিক মিডিয়া খুব স্ট্রং। ওষুধ কোম্পানির পয়সায় ডাক্তারি ছাত্ররা হাসপাতাল চত্বরে পার্টি করছে—এই খবর বাইরে বেরোলে আমার কোম্পানির গুড উইল তো নষ্ট হবেই, আপনার ইউনিয়নের গুড উইলও যাবে।’

যুক্তিটা মনে ধরেছিল চন্দনের। তাই হোস্টেলে গ্র্যান্ড ফিস্ট।

একশো পঁচিশ থেকে মদের পেটি নিয়ে দীপ আর সবুজ লাফাতে লাফাতে নীচে গেল। হোস্টেলের ঠিক মাঝখানে চারকোনা মঞ্চ। লাল নীল হলুদ সবুজ আলো ঝিকমিক করছে। ডিজে ‘পিয়া তু আব তো আজা’ চালিয়ে বাজার গরম করার চেষ্টা করছে। ছেলেরা টুকটুক করে জড়ো হচ্ছে।

একশো পঁচিশ নম্বর রুমে তালা মেরে একশো চব্বিশে ঢুকতে গিয়ে চন্দন দেখল, ভিতর থেকে ছিটকিনি দেওয়া। যাব্বাবা! এখানে এখন কী হচ্ছে? দরজা ধাক্কায় সে।

অভি দরজা খুলে দিল। পরনে সাদ টিশার্ট আর কালো কারগো। একমাথা চুল। একগাল দাড়ি। পায়ে হলুদ রঙের ফ্লোটার্স। হাতে পিডিয়াট্রিক্সের টেক্সট বই।

‘কী বস? চুপকে চুপকে লেখাপড়া হচ্ছে?’ অভির কাঁধে থাপ্পড় কষিয়ে চন্দন ঘরে ঢোকে। দেখে অভির ল্যাপটপে পিডিয়াট্রিক কার্ডিওলজির পাতা খোলা আছে।

চন্দনের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে অভি ল্যাপটপের সামনে বসে। চন্দন বিরক্ত হয়ে বলে, ‘চল বে! বহুত পড়েছিস।’

‘কোথায় যাব?’ প্রশ্ন করে অভি।

‘ইয়ার এন্ড পার্টিতে যাবি! আবার কোথায়?’ ধাঁতানি দেয় চন্দন। ‘আঁতেলদের মতো দাড়ি রেখেছিস কেন? মহাকাব্য লিখবি নাকি?’

‘আমি যাব না। আমার ওসব ভালো লাগে না।’ মিনতি করে অভি।

‘তোর কী ভাল্লাগে বল তো?’ বিরক্ত হয়ে বলে চন্দন। ‘লেখাপড়া যে করছিস, সেটাও তো ভাল্লাগে না। তাহলে এত সাপ্লি খেতিস না।’

‘চন্দন প্লিজ। আমায় ছেড়ে দে।’

‘আমি তোকে ধরে রাখিনি যে ছেড়ে দেব। এই রকম মিনমিন করে যারা বেঁচে থাকে তাদের আমার অসহ্য লাগে। তোর দাদাটা ছিল বাঘের বাচ্চা। যে ক’দিন বাঁচল চুটিয়ে বাঁচল। যখন মরল, কাগজে ছবি হয়ে মরল। আর তুই নিজেকে দেখ…’

‘চন্দন প্লিজ! সবাই হেডলাইন হয় না। কেউ কেউ লাস্ট না হলে তোর মতো ফার্স্টের মাহাত্ম্য থাকে না। কেউ কেউ কলেজ ইলেকশানে হারে বলেই অন্যরা জেতে। কেউ কেউ প্রেমে ঝাড় খায় বলেই অন্যরা সেই মেয়েটাকে পায়। হেরোরা না থাকলে ফার্স্ট হওয়ার চার্ম চলে যায়। আমি তোর পাশে আছি বলেই তোকে এত শার্প লাগছে, এত উজ্জ্বল লাগছে, হ্যালো এত স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।’

‘ঠিক হ্যায়! তুই পড়াশুনা কর। আমি চললাম। টাটা বস। হ্যাপি নিউ ইয়ার।’ একশো চব্বিশ থেকে বেরিয়ে যায় চন্দন।

অভি দরজা বন্ধ করে। এতক্ষণ সে চোখের জল চেপে রেখেছিল। আর পারল না। কাঁদতে কাঁদতে নিজেকে বলল, ‘দাদার দিব্যি! ফাইনাল এমবিবিএস-এ আমাকে ভালো রেজাল্ট করতে হবে। করতে হবে। হবেই!’

একতলায় ডিজে গান চালিয়েছে, ‘হাম হ্যায় নয়ে, আন্দাজ কিঁউ হো পুরানা?’

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *