৪. দময়ন্তী
‘কলকাত্তাওয়ালি!’ লাল রঙের হরফে বড়বড় করে লেখা। পাড়ার সেলুনে অথবা লরির পিছনে যে রকম হরফ দেখা যায়, সেই রকম হরফ। এই শব্দাবলী শোভা পাচ্ছে বিশাল বিলবোর্ডের ডিজিটাল প্রিন্টে। সেখানে রয়েছে নানান ছবি ও লেখার কোলাজ। হাওড়া ব্রিজের ফোটোর পাশে লেখা, ‘দেখবি আর জ্বলবি, লুচির মতো ফুলবি।’ হলুদ রঙের ট্যাক্সির ফোটোগ্রাফের পাশে লেখা ‘৮০ বন্ধু, আবার দেখা হবে।’ যামিনী রায়ের আঁকা ছবির পাশে লেখা, ‘Horn OK Please’। সত্যজিৎ রায়ের পোর্ট্রেটের পাশে লেখা, ‘সদর দপ্তরে কামান দাগো’। রবীন্দ্রনাথের হস্তাক্ষরের পাশে রয়েছে প্যাম ক্রেনের ছবি। ‘চিনের চেয়ারম্যান আমাদের চেয়ারম্যান’ দেওয়াল লিখনের পাশে রয়েছে মিক্সড চাউমিনের ছবি। ‘পকেটমার হইতে সাবধান’ চেতাবনির পাশেই শোভা পাচ্ছে রাজনৈতিক নেতার ছবি। ‘যুদ্ধ নয়, শান্তি চাই’ স্লোগানের পাশে গব্বর সিং-এর মুখ।
মায়াকমের বিজ্ঞাপন দপ্তরের তৈরি করা এই বিলবোর্ড গত সাতদিন ধরে কলকাতা শহরের বিভিন্ন প্রান্তে দেখা যাচ্ছে। বিলবোর্ডের একদম নীচে ড্যানিয়েল আর্চারের ক্লোজ আপ। তলায় লেখা, ‘এক্সিবিশন বাই ড্যানিয়েল আর্চার। বাই দ্য ওয়ে গ্যালারি, পার্ক স্ট্রিট। ফ্রম ২ এপ্রিল টু ৮ এপ্রিল।’
ড্যানিয়েলের ক্যালকাটা সিরিজের ছবিগুলোর এতদিনে গতি হল। ক্যাটালগিং, প্রাইসিং, মার্কেটিং—সব দায়িত্ব পালন করছে বাই দ্য ওয়ে গ্যালারি। উদ্বোধন হচ্ছে ধুমধাম করে। মায়াকমের কল্যাণে এই মিডিয়া-হাঙ্গামা জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক স্তরে পৌঁছবে। বাই দ্য ওয়ের ওয়েব পোর্টালে ছবিগুলোর ফোটোগ্রাফ, স্পেসিফিকেশান এবং মূল্য লিখে দেওয়া আছে। পঁয়ত্রিশটি ছবির মধ্যে একুশটি ছবি বিদেশি ক্রেতারা অনলাইনে কিনে নিয়েছেন। সেই সব ছবির ফ্রেমের গায়ে লাল টিপ পড়ে গেছে। যার মানে, ‘সোল্ড আউট’।
বাই দ্য ওয়ে গ্যালারির বিস্তীর্ণ হলে আজ সাধারণ দর্শকের প্রবেশাধিকার নেই। প্রিন্ট এবং অডিও ভিশুয়াল মিডিয়ার লোকজনে হল গমগম করছে। কলকাতার প্রথিতযশা আঁকিয়েদের মধ্যে অনেকেই আসবেন। তাঁদের বসার জন্য আলাদা ঘর আছে। আসছেন কলকাতার অন্যান্য গুণীজনও। অভিনেতা, চিত্রপরিচালক, নাট্যকার, নৃত্যশিল্পী, শিল্পপতি এবং পেজ থ্রি পিপ্লের দঙ্গল।
দময়ন্তী আজ বাবার সঙ্গে এসেছে। শান্তিনিকেতন, দিল্লি বা ইংল্যান্ডের এক্সিবিশানে ড্যানিয়েল মেয়েকে ট্যাঁকে গুজে নিয়ে যেত। সেই অভ্যাস এখনও যায়নি। আজ শক্তিরূপাও এসেছে। বিবস্বানের বেতনভুক কর্মচারী হিসেবে নয়। শিল্পীর স্ত্রী হিসেবে।
দময়ন্তী এক কোনায় বসে ক্যাটালগ ওল্টাচ্ছিল। এক মহিলা তার পাশে বসে বলল, ‘তুমি দময়ন্তী?’ মহিলার মুখে দুষ্টু হাসি। ভাবটা এইরকম, ‘বল তো, আমি কে?’
অভিনেত্রী মন্দিরা ব্যানার্জিকে না চেনার কোনও কারণ নেই। দময়ন্তী মুচকি হেসে বলল, ‘বৃন্দা তো বলেনি যে আপনি আসবেন।’
‘আসার কথা ছিল না। কিন্তু ছবির প্রোডিউসার ইনসিস্ট করছেন বেশি করে পাবলিক অ্যাপিয়ারেন্স দিতে। তাই আসা।’ হৈমবতীর দিকে হাত নাড়েন মন্দিরা। দময়ন্তী দেখল ছবির পরিচালক মনোতোষ এবং নায়ক বিশাল কপুরও হাজির।
ড্যানিয়েল পরে এসেছেন সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি। ভীষণ গ্রেসফুল লাগছে। ধুতি-পাঞ্জাবি পরা সাহেবকে দেখে ফোটোগ্রাফারদের মধ্যে ছবি তোলার জন্য ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়ে গেল।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠান খুব সাদামাটা। একজিবিশন যে হলে হচ্ছে, তার দরজায় রেশমের ফিতে লাগানো ছিল। কাঁচি দিয়ে ফিতে কেটে প্রদর্শনীর উদ্বোধন করলেন ড্যানিয়েল। তারপর প্রেস কনফারেন্স। টেবিলের ওপরে অন্তত পঞ্চাশটা বুম রাখা। ভিডিয়ো ক্যামেরা গোটা তিরিশেক। অনেকে মোবাইল ফোনে অডিয়ো বা ভিডিয়ো রেকর্ডিং করছে। হাজারটা প্রশ্ন ধেয়ে এল ড্যানিয়েলের দিকে। তার মধ্যে হোম ওয়ার্ক না করে আসা সাংবাদিকদের ছেলে ভোলানো প্রশ্নই বেশি। যেমন, ‘আপনার ছেলেবেলার কথা বলুন।’ অথবা, ‘আপনার যৌবনের দিনগুলো আপনার ছবিকে কী ভাবে প্রভাবিত করেছে?’ অথবা, ‘এতদিন ভারতে থেকে একজন ব্রিটিশ হিসেবে আপনার অভিজ্ঞতা কী রকম?’
প্রশ্নগুলো শুনে স্মিত হেসে ড্যানিয়েল বললেন, ‘বহুবার এইসব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছি। আপনারা অন্য প্রশ্ন করুন।’
স্কুপ চ্যানেলের পরিমল প্রশ্ন করল, ‘আপনার কলকাতা সিরিজের ছবিগুলোতে ধূসর রঙের প্রাধান্য কেন?’
প্রশ্নটি ড্যানিয়েলের মনে ধরল। জীবনানন্দ দাশের কবিতা, গণেশ পাইনের ছবি, প্রত্ন-যৌনতা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে দশ মিনিটের বক্তব্য রাখলেন তিনি।
আজ সকালের সাংবাদিক প্রশ্ন করল, ‘পেইন্টিং কেন বারবার নিজেকে কালোত্তীর্ণ প্রমাণ করবার চেষ্টা করবে। সমসাময়িকতাকে সে জাপটে ধরবে না কেন?’
‘আপনি মুদ্রণ মাধ্যমের সাংবাদিক। আপনার কাগজের নাম আজ সকাল। সকাল এগারোটার পর কাগজটির আর কোনো গুরুত্ব নেই। কিলো দরে বিক্রি হয়ে যাওয়া ছাড়া অন্য কোনও ভবিতব্য নেই। এটাই ছাপাই খবরের বৈশিষ্ট্য। এটা খবরের কাগজের বংশাণুতে রয়েছে।’
‘মুদ্রণ মাধ্যম’ এবং ‘বংশাণু’ মানে যে ‘প্রিন্ট মিডিয়া’ এবং ‘জিন’— সেটা ক’জন বুঝল কে জানে! ড্যানিয়েল বলে যাচ্ছেন। ‘শিল্প কিন্তু অমরত্বের সাধনা করে। জনপ্রিয় শিল্প এবং দেওয়াল লিখনও সেই সাধনাই করে। তারা একই সঙ্গে সমসাময়িক এবং চিরকালীন। তবে আপনি বোধ হয় বলতে চাইছেন, সমসাময়িক বিষয় নিয়ে আমি ছবি আঁকি না কেন? এর উত্তরে বলি, আমি আঁকতে চাই। আমি চাই খবরের কাগজের কোনও খবর বা দূরদর্শনের কোনও সংবাদের দৃশ্য আমাকে অনুপ্রাণিত করুক। তবে এখনও সে রকম কিছু ঘটেনি। ঘটলে জানাবো।’
‘সমসাময়িকতা আর আধুনিকতা কি আপনার কাছে এক?’‘আজ যদি মাতিস ছবি আঁকতেন, তাহলে কি তিনি জনপ্রিয় শিল্পী হতে পারতেন?’‘বেঙ্গল স্কুল অব পেন্টিং কি জাতীয় স্তরে উপেক্ষিত?’ আবার একগাদা প্রশ্ন ধেয়ে এল ড্যানিয়েলের দিকে।
এইসব ভ্যাজরং ভ্যাজরং যখন চলছে, তখন দময়ন্তী বাবার ছবিগুলো আর এক বার দেখল। স্টুডিওর ন্যাচারাল লাইটে ছবিগুলো একরকম লাগত। এখানে অন্য রকম লাগছে। দময়ন্তীর মনে পড়ে গেল ড্যানিয়েল আর শক্তিরূপা একবার এই বিষয় নিয়ে খুব ইন্টারেস্টিং আলোচনা করছিলেন। শক্তিরূপা বলেছিলেন, ‘তোমার ছবি কেনে আর্ট কালেকটার আর কর্পোরেট বায়ার। তারা বাড়ির দেওয়ালে বা স্টুডিওয় বা অফিসের দেওয়ালে ঝুলিয়ে রাখে। এসি রুমে, আর্টিফিশিয়াল লাইটের সামনে জীবন অতিবাহিত করা তোমার ছবির ভবিষ্যৎ। এটা যখন তুমি জানো, তাহলে ছবিকে সেই পরিবেশেই কনসিভ করা উচিত। ন্যাচরাল লাইটে ভরপুর এই স্টুডিওতে নয়।’
‘কী বলছ তুমি? স্বাভাবিক আলো ছাড়া রঙের গুরুত্ব বোঝা যায়?’ আপত্তি করেছিলেন ড্যানিয়েল। পরবর্তীকালে অবশ্য শক্তিরূপার যুক্তি নীতিগতভাবে মেনে নিয়ে তিনি স্টুডিওর দরজা জানলা বন্ধ করে, আলো জ্বেলে ছবি আঁকতেন।
অনুষ্ঠানের শেষে চা পর্ব। চায়ে চুমুক দিয়ে বিবস্বান মন্দিরাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘শুটিং-পর্ব কেমন হল?’
‘খুবই ভালো,’ আগ বাড়িয়ে উত্তর দিল বিশাল, ‘আমি স্ক্রিপ্ট পড়েই মনোতোষকে বললাম যে, টাইম-ফ্রেম পারফেক্টলি পকড় লিয়া। লেকিন এই পিকচারের জন্যে লোকেশান খুব ইম্পর্ট্যান্ট আছে।’
আগ বাড়িয়ে বলা কথার উত্তরে মৃদু হাসলেন বিবস্বান। মন্দিরাকে প্রশ্ন করলেন, ‘শুটিং-এর সময় কোনও প্রবলেম হয়নি তো?’
মন্দিরা এখনও চুপ। এবার আগ বাড়িয়ে উত্তর দিলেন মনোতোষ। ‘আমাদের প্রোডিউসার এত মেথডিক্যাল যে প্রতিদিনের লজিসটিক্স টু দ্য লাস্ট ডিটেল ছকা ছিল। অ্যাবসলিউটলি হ্যাস্ল ফ্রি শুট।’
মিডিয়া ব্যারন নিজের এবং স্ত্রীর স্তাবকতা শুনে অভ্যস্ত। মনোতোষের কথায় পাত্তা না দিয়ে বিবস্বান আবার মন্দিরাকে বললেন, ‘শুটিং-এর সময়কার কোনও ইন্টারেস্টিং অ্যানেকডোট?’
মন্দিরা বলল, ‘নতুনগ্রামের পাশে বাঁজাপলাশ নামে একটা গ্রাম আছে। ওখানকার সবাই বামন। ওরা শুটিং দেখতে আসত। মনোতোষ মেলার সিকোয়েন্সে আর আমার স্বপ্নদৃশ্যে ওদের ঢুকিয়ে নিয়েছেন। দে আর অ্যাবসলিউটলি ন্যাচরাল পারফর্মারস। এদের সম্পর্কে আপনাদের মিডিয়া হাউস স্টোরি করছে না কেন?’
‘বামন জনগোষ্ঠী? চিত্তাকর্ষক!’ মন্তব্য করলেন ড্যানিয়েল।
বিশাল বললেন, ‘সার্কাসের সব ক্লাউন ওখান থেকে আসে।’ এই পচা রসিকতা শুনে কেউ হাসল না।
বিবস্বান বললেন, ‘ওই জনগোষ্ঠী নিয়ে স্টোরি না হলেও ওই জনপদ খুব তাড়াতাড়ি ফ্রন্ট পেজ নিউজ হবে।’
দময়ন্তী চুপচাপ আলোচনা শুনছে। কোনও কথা বলছে না। শক্তিরূপা বললেন, ‘হেল্থ হাবের জন্য জমি অধিগ্রহণ নিয়ে যে পলিটিকাল সার্কাস শুরু হয়েছে…’
‘বামনগুলো ওই সার্কাসের ক্লাউন আছে।’ বিশাল আবার রসিকতা করলেন।
হৈমবতী এতক্ষণ মুখ খুলেছেন। ‘হেল্থ হাবের মাথা জর্জ কুক ক্যালটেকে পড়াশুনো করেছেন।’
‘ক্যালটেক মানে? ও কলকাতায় পড়াশুনো করেছে নাকি?’ জানতে চাইলেন বিশাল।
হৈমবতী বলে, ‘ক্যালটেক মানে ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি। এর সঙ্গে কলকাতা বা বাংলা বা ভারতের কোনও সম্বন্ধ নেই। আমি ওঁকে নিয়ে আর্টিক্ল পড়ছিলাম। ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট, কিন্তু অ্যাবসলিউট লুজার ইন রিয়্যাল লাইফ। কলেজে কোনও গার্লফ্রেন্ড জোটেনি। সোশাল ফোবিয়ায় ভুগতেন। একা একা পড়াশুনা নিয়ে থাকতেন। পাশাপাশি উনি মানবদরদী। ফিল্যানথ্রপি করে থাকেন। এবং উন্নয়নশীল দেশের জন্য ওঁর নানা চিন্তা আছে। মুশকিল হল, ফিল্যানথ্রপির মার্কিনি মডেল এ দেশে কতটা কাজ করবে— এটা উনি বুঝতে পারছেন না। আর একটা কথা হল, আমাদের গর্ভনমেন্টের কোনও ল্যান্ড ব্যাংক নেই। সমুদ্রের ধারের জনবহুল একটা গ্রাম কুকের কোম্পানিকে গিফ্ট করেছে। অ্যান্ড কুক ইজ নট ইভ্ন অ্যাওয়ার অব দ্যাট।’
ড্যানিয়েল ঘড়ি দেখছেন। সেটা খেয়াল করে বিবস্বান বললেন, ‘লেট্স কল ইট আ ডে। অন্যদিন আবার আড্ডা হবে।’
হৈমবতী বললেন, ‘হ্যাঁ। ড্যানিয়েল রোজই একবার এখানে ঘুরে যাবে। তখন আড্ডা হবে।’
বাই দ্য ওয়ে গ্যালারির ভিড় পাতলা হয়ে এসেছে। বিশিষ্ট অতিথিরা আর কেউ নেই। দময়ন্তী ড্যানিয়েলের হাত ধরে লিফ্টের দিকে এগোচ্ছে। শক্তিরূপা বললেন, ‘তোরা বাড়ি যা। আমি একবার অফিস যাব।’
‘এখন অফিস?’ ড্যানিয়েল অবাক। ‘কেউ মারাটারা গেল নাকি?’
ড্যানিয়েলের এই প্রশ্নের পিছনে যথেষ্ট যুক্তি আছে। উইকেন্ড সাপ্তাহিক নিউজ ম্যাগাজিন। দৈনন্দিন ডেডলাইনের চাপ নেই। শনিবারে যে ম্যাগাজিন বেরোয়, তার ম্যাটার বুধবার সন্ধ্যায় প্রেসে পাঠিয়ে দিলে সেই ইস্যুর দায়িত্ব শেষ। কখনও কখনও এই নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটে। কভারস্টোরির জন্য যে ম্যাটার রেডি আছে, তার থেকেও ইম্পর্ট্যান্ট ঘটনা ঘটে গেলে ইমার্জেন্সি এডিটোরিয়াল মিটিং, ফ্রেশ কপি লেখা, পাতা সাজানো—সব এক রাতের মধ্যে করে ফেলতে হয়। সাম্প্রতিক অতীতে কয়েকজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং অভিনেতার মৃত্যু হয়েছে। এইসব দিনে, বা বলা ভালো এই সব রাতে, শক্তিরূপাকে অফিসে কাটাতে হয়েছে। আজও কি সেই রকম কিছু হয়েছে?
‘কেউ মারা যায়নি,’ বললেন শক্তিরূপা, ‘আমার বসের হাতে হেল্থ-হাবের ‘মেমোরান্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ বা ‘মউ’টা এসেছে। আমাকে আড্ডা মারতে মারতে মেসেজ করলেন। অন্য মিডিয়া পাওয়ার আগে বস এটা নিয়ে স্টোরি করতে চান। আমার যদিও এ রকম কোনও ইচ্ছে নেই।’
‘ইচ্ছে না থাকলে সেটা এখানেই বলে দাও। অফিসে গিয়ে বলার কী আছে?’ বলে দময়ন্তী।
‘সব জিনিসের একটা প্রোটোকল আছে দিঠি। উনি আমার বস বলে ডিকটেটরশিপ চালাতে পারেন না। আমিও ওঁর কথা ফুৎকারে উড়িয়ে দিতে পারি না। দু’জনেই নিজের যুক্তি পেশ করব। দেখব, ম্যাগাজিনের বিক্রির পার্সপেকটিভে কার যুক্তি স্ট্রং। তারপর ডিসিশান নেওয়া হবে। এসব কথা অফিসেই হয়। বাড়িতে নয়। তোরা যা।’ ড্যানিয়েল আর দময়ন্তীকে হাত নেড়ে শক্তিরূপা বিবস্বানের গাড়িতে উঠে যান।
.
‘আমাদের নেক্সট ইস্যু প্রেসে যেতে এখনও আটচল্লিশ ঘণ্টা দেরি আছে। ম্যাটার রেডি?’ বিশাল টেবিলের একপ্রান্ত থেকে প্রশ্ন করলেন বিবস্বান। বোর্ড রুমে তিনি আর শক্তিরূপা ছাড়া কেউ নেই।
‘বিধবাপুকুর সিনেমাকে কভার স্টোরি করে ম্যাগাজিন রেডি হয়ে গেছে।’ টেবিলের অন্য প্রান্ত থেকে বললেন শক্তিরূপা। ‘আপনি কি সেটা চেঞ্জ করতে চান? তার জন্যে কিন্তু স্ট্রং সাবজেক্টের প্রয়োজন।’
‘সাবজেক্ট আছে। জনমোর্চা সরকারের ভূমি ও ভূমি রাজস্ব দফতর এবং স্বাস্থ্য দফতর মিলে জর্জ কুকের হেল্থ হাব কোম্পানির সঙ্গে একটা ‘মেমোরান্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ বা ‘মউ’ সাক্ষর করেছে। ড্রাফ্টটা কে বানিয়েছেন আমার জানা নেই। আমার কাগজে সেই ব্যক্তি এক ঘণ্টাও টিকতে পারতেন না। তার আগেই তাঁকে পিঙ্ক স্লিপ ধরানো হত। দুঃখের বিষয়, পশ্চিম বাংলা এখন এইরকম অশিক্ষিত, ভিশনলেস, দুর্নীতিগ্রস্ত, ঘুষখোর, আদর্শহীন মানুষে ভর্তি। আরও দুঃখের বিষয়, মউটি যে বা যাঁরা পড়ে দেখেছেন, তাঁরা এর বিরোধিতা করেননি বা অদলবদলের কথা বলেননি। আমার ধারণা কেউ পড়েও দেখেননি। না সরকারের তরফে, না জনমোর্চার তরফে। অথচ এক সময় এই দলে শিক্ষিত যুবকরা নিজে থেকে যোগ দিত। ত্রিশ বছরের সরকার চালানোর ক্লান্তি যে কী জিনিস!’
‘এরা না হয় পড়েনি। কিন্তু হেল্থ হাব একটা মার্কিন কর্পোরেট এজেন্সি। তদের মাইনে করা ল-ইয়ার আছে। তারা কী করছে?’
‘সেটাই অবাক হওয়ার মতো বিষয়। জর্জ কুকের সঙ্গে মউ সাক্ষরপর্ব চুকে গেছে অনেক দিন। আশা করা যায় হেল্থ হাবের লিগাল ডিভিশন এই ড্রাফ্টটি পড়েছে। আমেরিকান ল-ইয়ারদের এই ড্রাফট পড়ে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ার কথা। তারাও কোনও উচ্চবাচ্য করছে না। আই থিংক দে আর টেস্টিং ওয়াটার। কয়েক ডলারের বিনিময়ে অনেকখানি জমি পাওয়া যাচ্ছে। দে উইল সিট অন ইট ফর আ লং টাইম। হেল্থ ট্যুরিজ্ম কেন, ডাংগুলি খেলার মাঠও ওরা করবে না। এই বিষয়টা নিয়ে উইকেন্ডের নেক্সট টু নেফ্রট ইস্যু হতে পারে কি?’
‘হতেই পারে।’ নড়েচড়ে বসেন শক্তিরূপা। ‘কিন্তু এত বড় একটা স্কুপ নিয়ে তাড়াহুড়ো কেন? আমরা তো নেক্সট ইস্যুও করতে পারি।’
‘আমি যে সোর্স থেকে ডকুমেন্ট পেয়েছি, সে টাকার গন্ধ পেয়েছে। হি উইল গো ফর আ কিল। অন্য মিডিয়ার হাতে যাওয়ার আগে আমরা এটা খবর করব।’
‘ফেয়ার এনাফ! আপনার হাতে স্কুপ চ্যানেল আছে, আজ সকাল আছে, বেঙ্গল নিউজ আছে। বাংলা-ইংরিজি খবরের কাগজ আর টিভিকে ছেড়ে হঠাৎ উইকেন্ডকে বেছে নেওয়ার কারণ?’
‘কারণটা তোমার টিম। কারণটা তুমি, যে টিম লিড ম্যাগাজিনের সার্কুলেশানকে এক লাখ ক্রস করাতে পারছে না। উইকেন্ড ঘিরে কোনও হইচই নেই। উইকেন্ড যথেষ্ট হ্যাপেনিং নয়। এ, এ প্লাস সেগমেন্টের রিডারদের টার্গেট করে এই ম্যাগাজিন কনসিভ করা হয়েছে। তারা এই ম্যাগাজিন পড়ছে না। বিদেশি গাড়ি, বিদেশি জুয়েলারি, বিদেশি ফ্যাশান হাউস তাহলে কেন অ্যাড দেবে? কুড়ি টাকার ম্যাগাজিনের সার্কুলেশান এখনও নব্বই হাজার। তোমরা তো এখনও তোমাদের মাইনে আর্ন করছ না। মায়াকমের সাবসিডিতে তোমাদের লপচপানি। এবার একটু নিজের পায়ে দাঁড়াও! আমারও তো সহ্যের একটা লিমিট আছে।’
শক্তিরূপার কান লাল। বুকের মধ্যে ধড়াস ধড়াস করে আওয়াজ হচ্ছে। হঠাৎ খুব জোরে পটি পেল। কান্নাও পাচ্ছে।
ওয়র্ক রিলেটেড স্ট্রেস। কর্পোরেট কালচারের টার্গেট ছোঁওয়ার সংস্কৃতি! এইসব তাঁকে প্রতিদিন ফেস করতে হবে জেনেই তিনি উইকেন্ডে এসেছিলেন। আজ অনুশোচনা করে লাভ নেই।
নিজেকে শান্ত করতে সামনে রাখা জলের গ্লাস থেকে এক চুমুক জল খেলেন শক্তিরূপা। বললেন, ‘সব কিছুর একটা ব্রেক ইভ্ন পিরিয়ড আছে। উইকেন্ডের আয়ু মাত্র দু’বছর। নব্বই হাজার সার্কুলেশন মুখের কথা নয়। এই ম্যাগাজিন প্রথম চার বছর কোনও লাভ দেবে না জেনেই ভেঞ্চারে নামা হয়েছিল। এনিওয়ে, আই আন্ডারস্ট্যান্ড ইয়োর পয়েন্ট অব ভিউ। উইকেন্ডের পরের ইস্যুর কভার স্টোরি বিধবাপুকুর নয়। বাঁজাপলাশ গ্রাম।’
‘তোমার মেশিনে মউটা মেল করে দিয়েছি। চেয়ার থেকে উঠতে উঠতে বিবস্বান বললেন, ‘আগামিকাল সন্ধে সাতটার মধ্যে আমি নতুন ইস্যু দেখতে চাই।’
বিবস্বানের সঙ্গেই বোর্ড রুম থেকে বেরোলেন শক্তিরূপা। বিভিন্ন বিভাগের কর্মচারীদের ফোন করে ডেকে নিলেন নিজের কিউবিক্লে। এমার্জেন্সি মিটিং-এর জন্যে। তিনি জানেন এত রাতে এত্তেলা পেয়ে সবাই তাঁকে গালিগালাজ করবে।
.
সার্কুলেশান থেকে মথুরেশ, ব্র্যান্ডের অনিল, অ্যাড ডিভিশান থেকে তানিয়া, আর অ্যান্ড ডি থেকে শুক্লা। উইকেন্ডের ইস্যু তৈরিতে এদের প্রত্যেকের ইনপুট থাকে। সম্পাদক হিসেবে শক্তিরূপা সেনগুপ্তর নাম গেলেও মিটিং-এ সবার মতামত গুরুত্বপূর্ণ। উইকেন্ডের বিক্রি বাড়লে তার কৃতিত্ব সবার আগে দাবি করেন মথুরেশ আর তানিয়া। তানিয়ার বক্তব্য সোজাসাপটা। ‘কুড়ি টাকার ম্যাগাজিন নব্বই হাজার কপি বিক্রি হলে সবাইকে দিয়েথুয়ে কোম্পানির ঘরে যা ঢোকে তা নস্যি। আমার টিম যদি অ্যাড জোগাড় না করত, তা হলে উইকেন্ড কবেই উঠে যেত। অ্যাডই আসল।’
মথুরেশ বলেন, ‘আমার টিম ম্যাগাজিন সব জায়গায় পৌঁছে না দিলে বিক্কিরি হত না।’
শুক্লা আর আর অনিলও বডি ল্যাঙ্গোয়েজে বুঝিয়ে দেন, ‘হম কিসিসে কম নহি।’ এই তো শক্তিরূপার সহকর্মীদের ছিরি!
তাঁরা এসে যাওয়ার পরে দীর্ঘশ্বাস ফেলে শক্তিরূপা মিটিং শুরু করলেন। ‘কারেন্ট ইভেন্টের দু’পাতা আর গেস্ট কলামের তিনপাতা ছাড়া বাকি ইস্যু কমপ্লিট। অ্যাডের ব্যাপারটা কতদূর তানিয়া?
তানিয়া বললেন, ‘এবারের কভার স্টোরি স্ট্রং নয়। বিধবাপুকুর রিজিয়নাল ল্যাঙ্গোয়েজে তৈরি একটা ছবি। রিলিজ হতে দেরি আছে। শুধুমাত্র শুটিং-এর গপ্পো, বুড়ো হিরো-হিরোইনের ইন্টারভিউ, বুড়ো রাইটার আর ডিরেক্টরের ইন্টারভিউ দিয়ে ইস্যু উতরোবে না। পপ সোশিওলজিস্ট মিস্টার বড়ুয়া ‘বহুবিবাহ এবং সতীদাহ’ নিয়ে একটা ইন্টারেস্টিং আর্টিক্ল দিয়েছেন। সেটা ফোকাস অব অ্যাট্রাকশান হতে পারে।’
‘সিরিয়াস ফিচার দিয়ে কভার স্টোরি হলে ম্যাগাজিন বিক্রির দায়িত্ব আমি নেব না।’ সাফ জবাব মথুরেশের।
অনিল বললেন, ‘এই স্টোরিটার মধ্যে একটা ফিল গুড ব্যাপার আছে। মাঝে মাঝে এইরকম সফ্ট ইস্যু আমাদের করা উচিত। শুধু পলিটিক্যাল স্টোরিতে ফোকাস করলে ম্যাগাজিনের হাই ব্রাও ইমেজ তৈরি হবে। সেটা আমাদের কাম্য নয়।’
মথুরেশ এইবার মুখ খুলেছেন। তিনি বললেন, ‘হঠাৎ কী হল? তৈরি থাকা ইস্যুর কভার স্টোরি চেঞ্জ করতে হবে কেন? আমাদের এডিটরের মাথায় কি, হঠাৎ কোনও ‘সো কল্ড’ ব্রিলিয়ান্ট আইডিয়া এসেছে?’
শক্তিরূপা ঠান্ডা গলায় বললেন, ‘বস মিটিং-এ ডেকে আমাকে যা বলেছেন, সেটা তোমাদের কনভে করতে চাই। আমাদের পরের ইস্যু বিধবাপুকুর নয়। বাঁজাপলাশ গ্রাম। অ্যাড, আর অ্যান্ড ডি, ব্র্যান্ড এবং সার্কুলেশান টিম সেই ভাবে রেডি হয়ে যান। কাল সন্ধে সাতটার মধ্যে ম্যাটার রেডি হয়ে যাবে।’
সবাই বোর্ডরুম থেকে দৌড়ে বেরোলেন। এইবারে শক্তিরূপা মোবাইল থেকে এডিটোরিয়াল টিমের সবাইকে একসঙ্গে মেল করলেন, ‘কাম ট্যু দ্য অফিস অ্যাট সেভেন এএম শার্প। আওয়ার কভার স্টোরি হ্যাজ বিন চেঞ্জড।’ তারপর বাড়ির দিকে এগোলেন। এখন রাত এগারোটা। ভোর ছ’টার মধ্যে উঠতে হবে। কাল সারাদিন ব্যস্ততার মধ্যে কাটবে।
.
ড্যানিয়েল আর দময়ন্তী খাবার টেবিলে বসেছিল। শক্তিরূপা দ্রুত স্নান সেরে খেতে বসলেন। খেতে খেতেই সমস্যাটা বুঝিয়ে বললেন ড্যানিয়েল আর দময়ন্তীকে। তারপর ঘুমোতে চলে গেলেন।
দময়ন্তীর ঘুম পায়নি। সে গোলঘরের খাটে শুয়ে মোবাইলের দিকে তাকাল। কাকে ফোন করা যায়?
টেলিপ্যাথি মেনে ফোন বেজে উঠল। ‘বিলু কলিং…’
‘বলো।’ ফোন ধরে বলে দময়ন্তী।
‘এখনও ঘুমোসনি?’
‘না। সবে খেলাম। এত রাতে হঠাৎ তলব?’ বিলুর সঙ্গে কথা বলার সময় দময়ন্তীর মাথায় টিকটিক করছে চন্দনের বলা কথাগুলো। বিলু কি সোশাল ক্লাইম্বার? তাকে পটাচ্ছে? নাকি সত্যিই এক রিভলুশনারি? চে গেভারার মতো?
‘তলব মানে, আমাদের কিছু টাকাপয়সা লাগবে। সেই নিয়ে আমার একটা প্ল্যান আছে।’
‘টাকাপয়সা? কাদের লাগবে? তোমার?’
‘আমার বলতে পারিস। আমি তো পিএমএফ-এর অংশ। টাকা লাগবে বাঁজাপলাশ গ্রামের জন্য। গোপালদা একটা স্ট্রাগল ফান্ড তৈরি করছে। সেখানে কনট্রিবিউট করতে হবে।’
দময়ন্তীর এখনও দোনামনা। সে বলল, ‘আমাকে কত দিতে হবে?’
‘দূর গাধা!’ খুকখুক করে হাসছে বিলু, ‘নিজের পকেট থেকে টাকা দিতে বলছি না। আমাদের সবার কোটা ফিক্সড। এক হাজার টাকা। সেটা দিলেই হবে। প্ল্যান বলতে আমি বলছিলাম নতুন ছাত্রছাত্রীকে দলে আনার কথা। ফার্স্ট ইয়ারের সঙ্গে র্যাপো তৈরি করার কথা।’
‘ওহঃ! তাই বলো।’ মনে মনে হাফ ছেঁড়ে বাঁচে দময়ন্তী। চন্দন যা বলেছে, তা ভুল। অন্তত বিলুদার অংশটা ভুল। অভির ব্যাপারটা নিয়ে পরে ভাবা যাবে।’
‘তুই এবার বৃন্দাকে অ্যাপ্রোচ কর। ও অ্যাপলিটিকাল মেয়ে। কিন্তু ইস্যুটা ওর জানা উচিত।’ পরামর্শ দেয় বিলু।
‘ও রাজি হবে না। ও রাজনীতির থেকে একশো হাত দূরে থাকে।’
‘কেউ বৃন্দাকে রাজনীতি করতে বলছে না। কিন্তু মেয়েটার সাম্প্রতিক ঘটনাবলী সম্পর্কে ইন ডেপ্থ নলেজ আছে। রোজ তিনচারটে খবরের কাগজ পড়ে। তা ছাড়া ওর মা বাঁজাপলাশ গ্রামে শুটিং করে এলেন। গ্রামটা নিয়ে ওর কৌতূহল থাকা স্বাভাবিক। এই ইস্যুতে ওর সঙ্গে কথা বলে দেখ। যদি পিএমএফ-এর দিকে টানা যায়।’
‘কালকে এই নিয়ে কথা বলব। এখন ঘুম পাচ্ছে।’ ফোন কেটে দেয় দময়ন্তী। বিছানায় শোওয়ার আগে একটা অ্যালোপাম জিভের তলায় রাখে। বিলুকে নিয়ে তার আর কোনও চিন্তা নেই। আজ এমনিই ঘুম আসা উচিত। তবুও, সাবধানের মার নেই।
.
পরদিন দুটো ক্লাসের ফাঁকে জীবনদার ক্যান্টিনে বসে দু’কাপ চা আর দুটো কাপকেক অর্ডার করে দময়ন্তী বৃন্দাকে বলল, ‘বাঁজাপলাশ গ্রামে গিয়েছিলাম। যেখানে কাকিমা শুটিং করতে গিয়েছিলেন।’
‘তুই কেন গিয়েছিলি? ওখানে তো চন্দনের বাড়ি।’
‘ওটা এখন ট্যুরিস্ট স্পট হয়ে গেছে। ওখানে গিয়ে গ্রামের নাম নিয়ে একটা ফোক লোর শুনলাম।’
‘কী ফোক লোর? গ্রামের নামটা খুব ভালগার। মুখে আনা যায় না।’
‘সেইটাই তো বলছি। অনেককাল আগে ওখানে নাকি পলাশ গাছের জঙ্গল ছিল। তখন নাম ছিল পলাশগাঁ। গ্রীষ্মকালে লাল পলাশ ফুলে এলাকার মাটি লাল হয়ে থাকত। ওখানকার ভূমিপুত্রদের নাম জোয়াকিম। ওরা অতীতে জেলে ছিল। এবং ওরা অতীতে বামন ছিল না। নর্মাল হাইটের ছিল। একদিন ওলন্দাজ দস্যুরা এসে পলাশগাঁয়ের সমুদ্রকূলে জাহাজ ভেড়ায় এবং লুটপাট শুরু করে। জোয়াকিমদের গাঁওবুড়ো গ্রামের সবাইকে ডেকে বলে, ‘এসো, আমরা সবাই মিলে ওদের সঙ্গে লড়াই করি। আমরা হাজার হাজার লোক। জলদস্যু আছে তিরিশ-চল্লিশ জন। আমরাই জিতব।’ গাঁওবুড়োর কথায় কেউ রাজি হয়নি। সবাই নিজের ঘর গুছোতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ওলন্দাজ জলদস্যু ডাঙায় নেমে সবার আগে গাঁওবুড়োকে পাকড়ে তার একটা হাত কেটে পলাশগাছ থেকে ঝুলিয়ে দেয়। বলে, ‘প্রতিবাদ যে করবে, এটা তার শাস্তি।’ রক্ত ঝরে ঝরে গাঁওবুড়ো মরে যায়। মরার আগে অভিশাপ দিয়ে যায়, ‘নিজের রক্ত দিয়ে আমি এই গ্রামকে লাল করে গেলাম। ভবিষ্যতে পলাশগাঁয়ে একটাও ফুল ফুটবে না। এই গাঁয়ে বাঁজাপলাশ গাছ থাকবে শুধু। আর প্রতিবাদ যারা করে না, তারা ছোট মনের মানুষ হয়। তোরাও আজ থেকে আমার চোখে ছোট হয়ে গেলি। আজ থেকে বাঁজাপলাশে যত বাচ্চা জন্মাবে, সবাই বামন হবে।’’
কাপ কেকে কামড় দিয়ে বৃন্দা বলল, ‘ইন্টারেস্টিং স্টোরি!’
‘হ্যাঁ। খুব ইন্টারেস্টিং! তোর সঙ্গে আরও কথা আছে। সেটা নিরোধ স্যারের প্র্যাকটিকাল ক্লাসের পরে বলব। তাড়াতাড়ি চা শেষ কর।’
বৃন্দা কিছু বলার আগেই জেম্সি লাফাতে লাফাতে এসে বলল, ‘আজ সুরজের বার্থডে। ওর ঘাড় ভেঙে ট্রিট নেব। আইনক্সে হৃতিক রোশনের অগ্নিপথ দেখব। তারপরে ফুডকোর্টে খাব। নিরোধ স্যারের ক্লাসে মারো গুলি!’
.
