৩১. চন্দন
চন্দন সকাল সাড়ে সাতটার মধ্যে মেডিসিন ওয়ার্ডে ঢুকে যায়। অ্যাডমিশন ডে-র পরের দিন প্রচুর কাজ থাকে। নতুন ভর্তি হওয়া রোগীদের কেস হিসট্রি ঝালিয়ে নেওয়া, রক্ত টানা, নানান পরীক্ষার ফর্ম ফিল আপ করা—এইসব করতে করতে সকাল ন’টা বেজে যায়।
বিডিআর-এর হাউসস্টাফ রিপু আর আপ্পু সাড়ে আটটার মধ্যে ওয়ার্ডে ঢোকে। এই ইউনিটে চন্দনের কো-ইন্টার্ন দময়ন্তী আর বৃন্দা। কিন্তু ওরা আজ আসেনি। দময়ন্তীর বাবার অপারেশান বলে ওরা আজ শান্তিধামে।
সকাল নটার সময় ওয়ার্ডে রাউন্ড শুরু করে এক রোগীর বেডের পাশে দাঁড়িয়ে বিডিআর বললেন, ‘বিলিরুবিন কত?’
চন্দন আগেই ব্লাড রিপোর্ট দেখেছে। সে বলল, ‘দশ মিলিগ্রাম পার ডেসিলিটার।’
‘ডায়াগনসিস কী হতে পারে?’
এই প্রশ্ন থেকে আলোচনা জনডিস হয়ে ঘুরে গেল ড্যানিয়েল আর্চাররের অপারেশান ও স্যামির দিকে।
ঠোঁট উল্টে বিডিআর বললেন, ‘আমার আর স্যামির ওপরে ভরসা নেই। ইট উইল বি আ ডিজাস্টার। ডেথ ইন ওটি না হয়। যেমন ওই অ্যাকট্রেসের বেলায় হয়েছিল। বাই দ্য ওয়ে, স্যামি হসপিটাল আওয়ারে প্র্যাকটিস করছে কেন? দিস ইজ আনএথিকাল।’
চন্দন বলল, ‘উনি এক সপ্তাহের জন্য ছুটি নিয়েছেন।’
‘তুমি কী করে জানলে?’ ভুরু তুলে বলেন বিডিআর। রিপু আর আপ্পু বিডিআর-এর দিকে তাকিয়ে অর্থপূর্ণ হাসল। বিডিআর শ্রাগ করে নিজের কেবিনে চলে গেলেন। চন্দন ভাবল, তার আর বৃন্দার ব্যাপারটা বিডিআর কি জানেন?
রাউন্ডের পরেও অনেক কাজ থাকে। সেইসব কাজ চুকিয়ে চন্দন রিপুকে বলল, ‘আমি কাটছি।’
রিপু গাঁইগুঁই করে বলল, ‘দময়ন্তী আর বৃন্দা নেই। তুইও থাকবি না…’
আপ্পু কটমট করে রিপুর দিকে তাকিয়ে তাকে চুপ করিয়ে দিল। চন্দনকে বলল, ‘যা। সন্ধেবেলা ফোন করিস।’
‘আচ্ছা।’ মেডিসিন ওয়ার্ড থেকে বেরোল চন্দন।
এমবিবিএস পাশ করার পরে বয়েজ হোস্টেল ছেড়ে দিয়েছে চন্দন এবং ফাইনাল এমবিবিএস-এর অন্যান্য ছাত্ররা। এখন তারা থাকে নিউ হাউসস্টাফ কোয়ার্টারে। যার আদরের ডাক নাম এনএইচকিউ। গাইনি বিল্ডিং-এর উল্টোদিকে, ছ’তলা বিশাল হোস্টেল। এনএইচকিউতে রুম নম্বরের একটা প্যার্টান আছে। একতলায় রুম নম্বর একশো এক থেকে একশো কুড়ি। দোতলায় দুশো এক থেকে দুশো কুড়ি। একই ভাবে ছ’তলায় ছশো এক থেকে ছশো কুড়ি। প্রতি ফ্লোরে কুড়িটা বড় রুম। প্রতি রুমে তিনটে বেড। একশো কুড়িটা ঘরে তিনশো ষাটটা বেড। এত জুনিয়র ডাক্তার ইন্ডিয়ান মেডিকাল কলেজে নেই। সেই কারণে প্রতি ঘরে বেড ফাঁকা থাকে। ছ’তলার অনেক রুম তালা বন্ধ হয়ে পড়ে আছে। ঘরগুলো বিশাল বড়। তিনটে বেড রাখার পরেও অফুরন্ত জায়গা। সারাদিন ঘরে রোদ আর হাওয়া লুটোপুটি খায়।
এনএইচকিউয়ের তিনতলায়, তিনশো সাত নম্বর রুমে থাকে চন্দন। এখানে তার রুমমেট সুরজ আর সঞ্জয়।
এনএইচকিউতে ঢুকে তিনতলায় উঠে, নিজের রুমের সামনে এসে চন্দন দেখল, রুম ভিতর থেকে বন্ধ। দরজা খট খট করায় ভেতর থেকে সুরজ বলল, ‘কওন হ্যায় বে?’
চন্দন বলল, ‘আমি।’
সুরজ বলল, ‘আধা ঘণ্টা বাদ আনা। বিজি হুঁ।’
সুরজের এই এক নতুন ব্যামো হয়েছে। মেয়ে নিয়ে ছোঁকছোঁকানি বরাবরই ছিল। জায়গার অভাবে কিছু করে উঠতে পারত না। এনএইচকিউতে মহিলাদের প্রবেশের ব্যাপারে বিধিনিষেধ নেই। চব্বিশ ঘণ্টা প্রধান ফটক খোলা। কে ঢুকছে, কে বেরোচ্ছে— দেখা হয় না। এই সুযোগে সুরজ ঘরে মেয়ে নিয়ে আসছে। যে দিন চন্দন এনএইচকিউতে এল সেই সন্ধেতেই সুরজ একটা বছর তিরিশের মেয়ে নিয়ে এসেছিল। চন্দন ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। মেয়েটাকে দেখে কখনওই চন্দনের মনে হয়নি, ও যৌনকর্মী।
পরের দিন সন্ধেবেলা নতুন এক মহিলার প্রবেশ। এর বয়স পঞ্চাশ-বাহান্ন। চন্দন সেই মুহূর্তে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেও পরে রুমে ফিরে সুরজকে চেপে ধরে জিজ্ঞাসা করেছে, ‘এদের তুই পাচ্ছিস কোথা থেকে?’
‘এরা আউটডোরের পেশেন্ট।’ স্মার্ট উত্তর সুরজের।
‘কিন্তু, এ তো হাইলি আনএথিকাল!’ চন্দন অবাক।
‘এথিক্স কেয়া হোতা হ্যায়?’ সুরজ ততধিক অবাক।
‘বাদ দে।’ হতাশ হয়ে চন্দন বলে, ‘এরা তোর সঙ্গে শুতে রাজি হচ্ছে কেন? মেয়েরা এত তাড়াতাড়ি সব কিছু দেয় না। মেন্টাল অ্যাটাচমেন্ট ডেভেলপ না করলে মেয়েরা শোবেই না।’
‘বঙ্গালিবাবু, মেয়েদের সম্পর্কে তুমি কিছুই জানো না। এখনও শারাতচান্দ্রার জমানায় পড়ে আছ। দে আর মোর অ্যাগ্রেসিভ দ্যান মেল স্পিসিজ ইন বেড। প্রেম-ফ্রেম নিয়ে আর বদার করে না। স্পেশাল বঙ্গালি বউদিরা তো অসাম।’
চন্দন বলল, ‘তোর ম্যানলি চেহারা দেখে যে কোনও মেয়ে ফিদা হয়ে যাবে।’
‘উও তো সহি হ্যায়।’ টি-শার্ট খুলে সিক্স প্যাক অ্যাব আর পাথর কঠিন বাইসেপ্স দেখায় সুরজ। ‘তবে আনম্যারেড মেয়েদের আমি এন্টারটেইন করি না। দে আর ভেরি ডেঞ্জারাস। ওদের ধান্দা থাকে ফাঁসিয়ে নিয়ে বিয়ে করার। তা ছাড়া প্রোটেকশান ইউজ করার ঝামেলা থাকে।’
‘তুই ক্যাপ ইউজ করিস না?’ চন্দন অবাক হয়ে বলে।
‘আমি কেন প্রোটেকশান নেব? আমার থোড়ি বাচ্চা হবে? বউদিরা পিল খেয়ে আসে। একটু বুড়িগুলোর অপারেশান করা থাকে।’
আজও ওইরকম কোনও মহিলাকে নিয়ে ব্যস্ত সুরজ। চন্দন যায় কোথায়? এই সময় অধিকাংশ ছেলে ওয়ার্ডে। উল্টো দিকের উইং-এ তিনশো চোদ্দ নম্বর ঘর খোলা। ওই ঘরে অভি, সবুজ আর প্রবাল থাকে। তিনশো চোদ্দর দিকে এগোয় চন্দন।
রুমে ঢুকে চন্দন দেখল অভি মেডিসিনের বই খুলে মন দিয়ে পড়ছে। হাতে হাইলাইটার। পাশে মাল্টিপল চয়েস কোয়েশ্চেনের বইয়ের ওপরে লেখা, ‘ক্র্যাকপিজি’।
‘ক্র্যাকপিজি? তুই রাজস্থানের কোটার ডিস্ট্যান্ট লার্নিং কোর্সে ভরতি হয়েছিস? আমাকে বলিসনি তো!’ অবাক হয়ে বলে চন্দন।
‘ইন্টার্নশিপ শুরু হওয়ার পরে তোর সঙ্গে এই প্রথম দেখা হল।’ জবাব দেয় অভি।
‘দাড়ি কামিয়ে ভদ্রলোকের মতো দেখতে হয়েছে। কোনও মানত-টানত ছিল নাকি?’
‘হ্যাঁ। এক বারে ফাইনাল এমবিবিএস পাশ না করলে দাড়ি কামাবো না— এই রকম প্রতিজ্ঞা করেছিলাম। পাশ করলাম। তাই দাড়িও কাটলাম।’
‘ওয়ার্ডে না গিয়ে পড়াশুনো করছিস?’
‘আমার সার্জারি চলছে। স্যামি ব্যানার্জি ছুটিতে। কোনও পেশেন্ট ভরতি হয়নি।’
‘ওহঃ হো! স্যামি ব্যানার্জি বলতে মনে পড়ল, আমাকে এক্ষুনি শান্তিধাম যেতে হবে। দময়ন্তীর বাবার অপারেশান আছে। তুই যাবি নাকি?’ অভির কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে দিতে প্রশ্ন করে চন্দন।
অভি বলে, ‘আজ ওটি হচ্ছে। আজ ডিসটার্ব করা ঠিক হবে না। কাল বা পরশু যাব।’
অভির নির্লিপ্ততায় অবাক হয় চন্দন। বলে, ‘ক্র্যাকপিজি কার সঙ্গে পড়ছিস? সবুজ না প্রবাল?’
‘আমি একাই।’
‘আমি তোর সঙ্গে গ্রুপ স্টাডিতে বসবো নাকি?’
‘বসতে পারিস। তবে কোর্স মেটিরিয়ালের দাম পঞ্চাশ হাজার টাকা। তার অর্ধেক তোকে দিতে হবে।’
‘ফাইনাল এমবিবিএস-এ ভালো রেজাল্ট করে বেশি রেলা হয়েছে, তাই না? আগের দুটো এমবিতে ঝাড় খেয়ে যখন কেলিয়ে পড়েছিলি, তখন এই শর্মাই হেল্প করেছিল। ছোটলোক কোথাকার! বন্ধুত্বের মধ্যে টাকার কথা আনতে লজ্জা করে না?’
অভি বলল, ‘বন্ধুত্ব আছে বলেই স্টাডি মেটিরিয়াল শেয়ার করতে হবে?’
কথাটা শুনে অভির দিকে রাগত দৃষ্টিতে তাকিয়ে চন্দন তিনশো চোদ্দ নম্বর রুম থেকে বেরোল। এবং দেখল, তিনশো সাত থেকে দু’জন মহিলা বেরোলেন। প্রথম জনের বয়স পঁয়তাল্লিশ থেকে পঞ্চাশের মধ্যে। অন্যজনের পঁচিশের আশেপাশে। প্রথম মহিলা শাড়ি পরে আছে। দ্বিতীয়জন জিন্স ও টি-শার্ট। হঠাৎ দেখলে মা-মেয়ে বলে মনে হয়।
রুমে ঢুকতেই চন্দনের হাঁ করা মুখ দেখে সুরজ মুচকি হেসে বলল, ‘আ যা বাচ্চা!’
চন্দন বিছানার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘প্রচুর ধামসাধামসি হয়েছে। দু’জনকে ট্যাকল করলি কী করে?’
সুরজের পরনে বারমুডা আর টি-শার্ট। কাঁধে তোয়ালে চাপিয়ে সে বলল, ‘হম নহাকে আতা হ্যায়।’
চন্দন প্রশ্ন করল, ‘এরা কারা?’
সুরজ বলল, ‘মেয়েটা এই বছর নর্থ বেঙ্গল মেডিকাল কলেজে ডেন্টাল এনট্রান্সে চান্স পেয়েছে। কিন্তু মা চায় না যে মেয়ে কলকাতা ছেড়ে অতদূর যাক। তাই আমার কাছে দরবার করতে এসেছিল।’
‘তুই দু’জনের সঙ্গে দরবার করলি?’ চন্দনের চোখ কপালে উঠে গেল।
সুরজ তার পিঠ থাবড়ে বলল, ‘বঙ্গালিদের এসব হজম হবে না। তুই বৃন্দার পল্লুর তলায় ঢোক।’
সুরজ স্নান করতে চলে গেল। চন্দন চটপট হাসপাতালের জামাপ্যান্ট ছেড়ে দাড়ি কামালো, স্নান করল, নতুন জামাপ্যান্ট গলাল। মানিব্যাগ, রুমের চাবি, মোবাইল ফোন পকেটে ভরে, গায়ে ডিও আর গালে আফটার শেভ মেখে রুম থেকে বেরোল। এখন আড়াইটে বাজে। মেসে দুপুরের খাওয়া সেরে ট্যাক্সি নিয়ে শান্তিধামে পৌঁছতে সওয়া তিনটে বাজবে। ততক্ষণে অপারেশান শেষ হয়ে যাওয়ার কথা।
সাড়ে তিনটের সময় শান্তিধামে পৌঁছে চন্দন দেখল, ওয়েটিং রুমের সোফায় বসে রয়েছেন বৃন্দা, দময়ন্তী এবং শক্তিরূপা। এসি চলছে পুরোদমে। তা সত্ত্বেও সবাই ঘামছেন। শক্তিরূপা ল্যাপটপে একটা ইংরিজি লেখা এডিট করছেন। পাশে পড়ে রয়েছে স্মার্টফোন। তাতে একের পর এক মেল জমা হচ্ছে। মেল আসার নোটিফিকেশান এলে ল্যাপটপ থেকে চোখ তুলে শক্তিরূপা মেল চেক করছেন। প্রয়োজনীয় মেলের উত্তর দিচ্ছেন। আবার কাজে ডুবে যাচ্ছেন।
বৃন্দার পাশে বসে চন্দন বলল, ‘অপারেশান কমপ্লিট? পেশেন্টকে বেডে দিয়েছে?’
‘না।’ টেনশান ভরা মুখে দময়ন্তী বললেন, ‘সকাল ন’টায় ওটিতে নিয়ে গেছে। সাড়ে ছ’ঘণ্টা হয়ে গেল। এখনও কোনও খবর নেই।’
‘আহ! চুপ করো।’ দময়ন্তীকে ধমক দেয় শক্তিরূপা। বৃন্দা বলে, ‘আমার এবার টেনশান হচ্ছে।’
শক্তিরূপা বৃন্দাকে বললেন, ‘নেগেটিভ এনার্জি ছড়িও না।’
দময়ন্তী শক্তিরূপাকে বলে, ‘মা, তুমিও টেনশান করছ। না হলে বৃন্দাকে বকতে না।’
শক্তিরূপা ফ্যাকাশে হেসে বৃন্দাকে বলেন, ‘সরি। কিছু মনে কোরো না।’
চন্দন চাপান উতোর শুনছিল। এবার বৃন্দাকে বলল, ‘হ্যাঁ রে, কাকিমা কোথায়?’
বৃন্দা টেনশানের পরিবেশে হাঁফিয়ে উঠেছিল। চন্দনের ইঙ্গিত বুঝে বলল, ‘চল, তোকে আমাদের বাড়িটা ঘুরিয়ে দেখাই।’
দু’জনে ওয়েটিং রুম থেকে বেরোল। বৃন্দা বেরোনোর আগে আড়চোখে দময়ন্তীর দিকে তাকাল। মেয়েটা আর পারছে না। শক্তিরূপার কোলে মাথা রেখে গুটিশুটি মেরে শুয়ে পড়েছে।
একতলায় পৌঁছে বৃন্দা বলল, ‘গ্রাউন্ড ফ্লোরে বাবার চেম্বার।’
চন্দন খুব মন দিয়ে শান্তিধামের প্রতিটি ইঞ্চি দেখছে। গেটের পাশে বসে থাকা সুলতানকে বলল, ‘ভালো আছেন?’
সুলতান ভুরু কুঁচকে চন্দনকে দেখল। কোনও কথা বলল না। ঘড়ি দেখল চন্দন। চারটে বাজতে যায়। দুপুরের কড়া রোদ নরম হয়ে আসছে। কমলা রং-এর আলোয় বৃন্দাকে বিদেশি রূপকথার রাজকন্যার মতো লাগছে। কোন একটা গল্পে এক ঘুমন্ত রাজকন্যার কথা বলা আছে। রাজপুত্র চুমু খেলে যার ঘুম ভাঙত। বৃন্দার নরম গাল দেখে চন্দনের সেই রকম ইচ্ছে করছে।
রাজকন্যা বলতেই অর্ধেক রাজত্বের অনুষঙ্গ মনে আসে। অর্থাৎ শান্তিধামের অনুষঙ্গ। যতদিন স্যামি ব্যানার্জি বেঁচে থাকবেন অর্ধেক রাজত্বই পাবে চন্দন। তারপর পুরো সাম্রাজ্যের অধিকারী হবে। বৃন্দাকে দিয়ে মেডিসিনে এমডি করাতে হবে। তারপরে কার্ডিয়োলজিতে ডিএম। সে সার্জারিতে এমএস করবে। তারপর কার্ডিয়োথোরাসিক সার্জারিতে এমসিএইচ। আজকের ঝিমিয়ে পড়া শান্তিধাম আবার গমগম করবে পেশেন্টে। এটা হবে কলকাতার এক নম্বর হার্ট ক্লিনিক। তবে তার জন্য এখনও অনেক পথ বাকি। চু কিতকিত খেলার একটা দানও মিস করা যাবে না।
‘কী ভাবছিস?’ বৃন্দা প্রশ্ন করেছে। হেসে ফেলে চন্দন বলে, ‘ছোটবেলায় গ্রামে চু কিতকিত খেলতাম। হঠাৎ সেই খেলাটার কথা মনে পড়ে গেল। কখনও খেলেছিস?’
‘না।’ হাসতে হাসতে বলে বৃন্দা, ‘চল, ওপরে চল।’
‘দাঁড়া। তোর বাবার চেম্বারটা দেখি।’ দরজা খুলে স্যামির চেম্বারে প্রবেশ করে চন্দন। পিছন পিছন বৃন্দা। অত্যাধুনিক চেম্বার দেখে চন্দনের চোখ ধাঁধিয়ে যায়। মন্ত্রমুগ্ধের মতো সে এগিয়ে যায় সুইভেল চেয়ারের দিকে।
‘বসিস না।’ পিছন থেকে ঠান্ডা গলায় বলে বৃন্দা। মুহূর্তের মধ্যে চন্দন হুঁশে ফেরে। মুচকি হেসে বলে, ‘তুই ভাবলি কী করে যে তোর বাবার চেয়ারে বসব?’ তারপর সামান্য থেমে গলা নামিয়ে বলে, ‘বৃন্দা, একটা কথা অনেকদিন ধরে বলব বলব করছি…’
‘কী?’ ফোলাফোলা গাল আর আদুরে চাউনি বিছিয়ে বৃন্দা জানতে চায়।
‘তুই আমাকে বিয়ে করবি?’ কাজের কথাটা বলেই ফেলে চন্দন। চোখেমুখে দু’ছিপি প্রেম, দু’ছিপি আন্তরিকতা, অল্প একটু ভীতি মিশিয়ে।
‘উইল ইয়ু ম্যারি মি?’ মুখে হাত দিয়ে হোহো করে হাসে বৃন্দা, ‘এ কথা বলার সময় হাঁটু গেড়ে বসতে হয়, হিরের আংটি গিফ্ট করতে হয়, গোলাপ ফুলের তোড়া বাড়িয়ে ধরতে হয়… সে সব কোথায়?’
‘ওসব তোদের ইংরিজি নভেলে হয়।’ দু’পা এগিয়ে বৃন্দার গাল স্পর্শ করে চন্দন, ‘আমাদের বাংলায় এইভাবে হয়।’ বৃন্দার নীচের ঠোঁট মুখের মধ্যে নেয় সে। বৃন্দা পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থাকে। সে আপত্তি করছে না বা বাধা দিচ্ছে না। চুম্বনে অংশগ্রহণও করছে না। বডি ল্যাঙ্গোয়েজে নীরবতা।
চন্দন গাল থেকে হাত সরায়। বাঁ হাত বৃন্দার পিঠে রাখে। ডান হাত দিয়ে স্পর্শ করতে চায় বুক। কিন্তু এই রোম্যান্টিক এবং ক্যালকুলেটিভ মুহূর্তকে ভেঙে দিয়ে ঝনঝন করে বেজে ওঠে চন্দনের মোবাইল। চমকে উঠে বৃন্দা পিছনে সরে যায়।
‘ধুস্ শালা!’ বিরক্ত হয়ে গালাগালি দেয় চন্দন। পকেট থেকে মোবাইল বার করে জিভ কেটে বলে, ‘বাবা!’
চন্দনের অভিব্যক্তি দেখে বৃন্দা খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে। ফোন ধরে চন্দন বলে, ‘বলো বাবা।’
‘টিভি দেখছিস?’ ওদিক থেকে চিৎকার করেন পবন।
‘না। কেন?’
‘ওরে, তোর বাবা এবার রুরাল রিপোর্টিং এর জন্য বেস্ট জার্নালিস্টস অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে। বাঁজাপলাশ গ্রামে হত্যা ও ধর্ষণের রাজনীতি নিয়ে আমি বেলাকূলে যে লেখাগুলো লিখেছিলাম সেটা রুরাল রিপোর্টিং-এর মধ্যে সেরা নির্বাচিত হয়েছে। টিভি চ্যানেল এসে আমার ইন্টারভিউ নিয়ে গেল।’ উত্তেজনায় পবনের কণ্ঠস্বর থরথর করে কাঁপছে।
বৃন্দার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে স্পিকার ফোন অন করে চন্দন। বাবার সাফল্যের সংবাদ বৃন্দাকে শোনানো যাক। গ্রামের লোক হলেও বৃন্দার ভাবী শ্বশুর যে কেউকেটা—এটা প্রমাণ হয়ে যাক। চন্দন বলে, ‘এই প্রাইজটা কারা দেয়?’
‘এটা দেয় “ইন্ডিয়ান নিউজ।” দিল্লি থেকে প্রকাশিত ভারতবর্ষের সবচেয়ে বেশি বিক্রির ইংরিজি খবরের কাগজ। এর ইজ্জতই আলাদা।’
বৃন্দা চন্দনকে ফিসফিস করে বলে, ‘ওপরে চল। অপারেশান শেষ হল কি না দেখি।’
‘কত টাকা দিচ্ছে জানিস?’ পবনের গলা শোনা যাচ্ছে, ‘দশ লাখ টাকা। কলকাতার গ্র্যান্ড হোটেলে অনুষ্ঠান করে পুরস্কার দেবে। আমার… আমার খুব আনন্দ হচ্ছে। গোপালের কথা ভীষণ মনে পড়ছে।’ ফোনে কাঁদছেন পবন, ‘হাজার হোক কাগজটার সম্পাদক তো ও-ই ছিল। দিনের পর দিন কী পরিশ্রম করেই না কাগজটা দাঁড় করিয়েছে। নিজের মাইনের টাকা বেলাকূলের পিছনে ঢালত।’
বৃন্দা ইশারায় চন্দনের কাছ থেকে মোবাইল চায়। চন্দন অবাক হয়ে ঠোঁট নেড়ে বলে, ‘কথা বলবি?’ বৃন্দা ইতিবাচক ঘাড় নাড়ে। চন্দন বলে, ‘বাবা, আমার এক ক্লাসমেট তোমার সঙ্গে কথা বলতে চায়। ও তোমার সব কথা শুনেছে…’
‘কে দময়ন্তী? দে। ওকে ফোন দে।’ আবেগতাড়িত পবন বলে।
‘না কাকু। আমি দময়ন্তী নই। আমার নাম বৃন্দা। আমি এতক্ষণ আপনার কথা শুনছিলাম। আপনাকে অনেক অভিনন্দন। আমরা, কলকাতার লোকেরা শুধু নামকরা কাগজ পড়ি। জেলার কাগজেও যে ভালো রিপোর্টিং হয় তা আপনি প্রমাণ করে দিলেন।’
‘ধন্যবাদ মা। ধন্যবাদ।’ স্পিকার ফোনে ভেসে আসছে পবনের গলা, ‘তোমার উৎসাহ শুনে ভরসা পেলাম। ওই টাকা আমি বেলাকূলের উন্নতির কাজে ব্যবহার করব। এতদিন আমার বাড়িটাই অফিস ছিল। এবার নতুন একটা অফিস করব। আমার জেলায় প্রচুর ট্যালেন্টেড ছেলেমেয়ে আছে। কম্পিউটারের কাজ জানে, ফোটোগ্রাফিতে আগ্রহ আছে, ঝরঝরে বাংলা লিখতে পারে, খাটতে পারে—এমন দু’জন ছেলেমেয়ে রাখব। কাগজটাকে ঝাঁ চকচকে করব। ডিসট্রিবিউশান সিস্টেমটাও ইমপ্রুভ করতে হবে। না হলে সার্কুলেশান বাড়বে না। এই জেলার বাইরে কাগজ বিক্রি করতে হবে। আপাতত টার্গেট দক্ষিণবঙ্গের চারটে জেলা। পরে পুরো দক্ষিণবঙ্গ। পারবো না মা? বলো!’
‘বাবা, একটা কথা বলব?’ বৃন্দার হাত থেকে মোবাইল কেড়ে নিয়ে বলে চন্দন, ‘তুমি ওই টাকা থেকে আমাকে পঞ্চাশ হাজার টাকা দেবে? এমডি এনট্রান্স পরীক্ষার জন্য টিউটোরিয়াল ক্লাসে ভরতি হবো।’
‘এর থেকে?’ আমতা আমতা করে পবন, ‘দাঁড়া, আগে টাকাটা হাতে পাই। এ তো “গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল” হয়ে গেল।’
‘আহ! চন্দন!’ চন্দনের হাত থেকে মোবাইল কেড়ে নিয়ে বৃন্দা বলে, ‘কাকু, ওর কথা ছাড়ুন। আপনি আগে বেলাকূলের কথা ভাবুন।’
‘আচ্ছা মা। ধন্যবাদ।’ ফোন কেটে দেন পবন। চন্দন উত্তেজিত হয়ে বলে, ‘তুই আমাকে বাধা দিলি কেন? তুই জানিস, অভি ক্র্যাকপিজির কোর্স করছে? আমি ওকে বললাম, গ্রুপ স্টাডি করব। ও বলল, হাফ টাকা দিতে হবে। পঁচিশ হাজার টাকা কোথায় পাব বল?’
‘বাইশ হাজার টাকা মাস গেলে পাচ্ছিস তো!’
‘ওই টাকা ব্যাঙ্কে জমাচ্ছি। ওতে হাত দেব না।’
‘নিজে রোজগার করছিস। বাবার কাছে হাত পাততে লজ্জা করে না?’
‘দ্যাখ বৃন্দা, আমি মন দিয়ে ইন্টার্নশিপ করছি। ডাক্তারি শুধু বই পড়ে শেখা যায় না। এ হল হাতে কলমের কাজ। হাউসস্টাফশিপ করার ইচ্ছে আমার নেই। আমি এখন থেকেই পোস্ট গ্র্যাজুয়েশানের জন্যে তৈরি হতে চাই। প্রথমবারেই পিজিতে চান্স পেতে চাই। তা না হলে খুব বিপদ!’
‘কীসের বিপদ?’
‘হাউসজব না করলে এনএইচকিউতে থাকা যাবে না। যতই আমি সুরজের সঙ্গে ঘুরঘুর করি না কেন, ও আর সঞ্জয় মিলে আগে আমাকে এখান থেকে বার করে দেবে। তখন আমাকে কলকাতায় মেস ভাড়া নিয়ে থেকে পড়াশুনো করতে হবে। ওই জন্যে টাকা জমাচ্ছি। তা ছাড়া আমি অন্য রাজ্যের এমডি এনট্রান্স পরীক্ষাতেও বসব। সব মিলিয়ে মেলা খরচ।’
‘তুই তো এখন মৃন্ময় চ্যাটার্জির দলের লোক। তোকে কেন হোস্টেল থেকে বার করে দেবে?’
‘সুরজকে আমি মেরেছিলাম। ও নির্ঘাত প্রতিশোধ নেবে।’
‘তুই আগে ছিলি জনমোর্চার নেতা। সরকার বদলাতেই পালটি খেয়ে নবযুগে নাম লিখিয়েছিস। তোর দলীয় আনুগত্য বলে কিছু নেই?’
‘আমি শুধু অ্যাম্বিশনের প্রতি অনুগত। আর তোর প্রতি।’ বৃন্দার গালে হাত রাখে চন্দন, ‘বাবার ফোন এসে আলোচনাটা ঘেঁটে গেল। আমায় বিয়ে করবি, বৃন্দা?’
‘বিয়ে একটা মেজর লাইফ ইভেন্ট, চন্দন। “ওঠ ছুঁড়ি তোর বিয়ে”-র জমানা শেষ হয়ে গেছে। এইভাবে “হ্যাঁ” বলা যায় না।’
‘কেন যায় না? দুজনে যখন দু’জনকে ভালোবাসি তখন বিয়ে করতে সমস্যা কোথায়? তুই তোর বাড়িতে কথা বল। আমি আমার বাড়িতে কথা বলি। বিয়ের পরে তুই নতুনগ্রামে গিয়ে থাকতে পারবি না। আমিই এখানে চলে আসবো। তা হলে আমাকে আর পয়সা খরচ করে মেসে থাকতে হবে না। দু’জনে একসঙ্গে পড়াশুনো করব। শান্তিধামে তোর বাবার একটা হেল্পিং হ্যান্ডও হবে।’
চন্দন বকবক করে যাচ্ছে। বৃন্দা অবাক হয়ে চন্দনের দিকে তাকিয়ে থাকে। চন্দনকে সে আজ অন্যভাবে দেখছে। এতকাল ছেলেটাকে সরল, সাধাসিধে, গোঁয়ার, স্টুডিয়াস বলে মনে হত। এখন দেখা যাচ্ছে এ-ও সেই ধান্দাবাজ ছেলেগুলোর মতো। যারা বৃন্দাকে চায় না, স্যামি ব্যানার্জি আর শান্তিধাম চায়। অন্যরা শহুরে পালিশ দিয়ে চাওয়াটাকে ঢেকে রাখে। চন্দন গ্রাম্যতাবশত নিজের উদ্দেশ্য বলে ফেলেছে।
নিজের জন্য খুব কষ্ট হয় বৃন্দার। তার কপালে কি এই–ই লেখা আছে? বিখ্যাত বাবা-মায়ের সন্তান হওয়ার বিড়ম্বনা তার ব্যক্তিগত জীবনেও এই ভাবে ছায়া ফেলবে? এমন কোনও ছেলে কি নেই, যে শুধু তাকে ভালোবাসবে? তার চালচিত্রকে নয়?
বৃন্দা বুঝতে পারে, চন্দনের সঙ্গে তার সম্পর্কটা শেষ হয়ে গেল। এখন, এই মুহূর্তে। বৃন্দা আর কোনও দিনও চন্দনকে ভালোবাসতে পারবে না। এটা তার মানসিক সমস্যা। কিন্তু এটাই সে। যেদিন বৃন্দা জানল যে অভির লক্ষ্য সে নয়, স্যামি ব্যানার্জি, সেই দিনই অভিকে মানসিকভাবে ত্যাগ করেছিল বৃন্দা। আজ চন্দনকেও করল।
চন্দন বকবক করেই যাচ্ছে। বৃন্দা বলল, ‘ওপরে চল। দময়ন্তীর বাবার খবর নেওয়া যাক।’
‘রথযাত্রা লোকারণ্য মহা ধূমধাম
ভক্তেরা লুটায়ে পথে করিছে প্রণাম।
রথ ভাবে আমি দেব, পথ ভাবে আমি
মূর্তি ভাবে আমি দেব, হাসে অর্ন্তযামী।’
.
কেবিনে শুয়ে রয়েছে ড্যানিয়েল। চোখ বন্ধ। হাতে ফ্লুইড চলছে। নাকে রাইল্স টিউব গোঁজা। বেডের গায়ে ঝুলছে ইউরিন ব্যাগ। ড্যানিয়েলকে ক্যাথিটার পরানো হয়েছে। স্যামি ড্যানিয়েলের পাল্স দেখছেন।
সোফায় বসে শক্তিরূপা ল্যাপটপে কাজ করে যাচ্ছেন। দময়ন্তী বেডের পাশে একটা টুল নিয়ে বসে ‘ক্ষণিকা’ থেকে কবিতা পড়ছে। বইটা সে মন্দিরার কাছ থেকে জোগাড় করেছে। সুজাতা স্যালাইনের পাউচে ওষুধ ইনজেক্ট করছিল। মৃদুস্বরে বলল, ‘ওঁকে ঘুমের ইনজেকশান দেওয়া হল। আপনারা এখন যান। আবার কাল আসবেন।’
শক্তিরূপা বললেন, ‘অপারেশান করতে এত সময় লাগল কেন?’
স্যামি বললেন, ‘যতটা ভাবা হয়েছিল, ক্যানসারের স্প্রেড তার থেকে বেশি ছিল। তাই একটু বেশি কাটাকাটি করতে হয়েছে।’
‘বাবা ঠিক আছে তো কাকু?’ কাঁদো কাঁদো গলায় বলে দময়ন্তী। শক্তিরূপারও মুখ শুকনো। স্যামি বললেন, ‘এখন কিছু বলা যাবে না। বাহাত্তর ঘণ্টা ওয়েট করতে হবে।’
সবাই কেবিন থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ বেড থেকে ড্যানিয়েল বললেন, ‘রবি ঠাকুরের এ ভারি অন্যায়। সবাই নিজেকে দেব ভাবছে। তাহলে টালিগঞ্জের বাকি নায়কদের কী হবে?’
.
