৮. দময়ন্তী
আবার সেই কুচ্ছিত স্বপ্নটা! সেই বর্ষার রাত, সেই সরু রাস্তা, সেইসব দমচাপা ছোট দোকান, সেই রং মাখা মেয়েরা, সেই তেড়ে আসা সুরজ। সেই বুক ধড়ফড়, সেই জিভ শুকিয়ে আসা, সেই পেটে মোচড়, সেই ধড়মড়িয়ে বিছানায় উঠে বসে মনে হওয়া, ‘ওহ! স্বপ্ন!’
দময়ন্তী বিছানায় বসে মোবাইলে সময় দেখল। এপ্রিল মাসের কুড়ি তারিখে ছ’টাকে ভোর বলা যায় না। জানলার ফাঁকফোকর দিয়ে সূর্যের বল্লম ঢুকে পড়েছে। ঘর গরম হতে শুরু করেছে। দময়ন্তীর সারা গা ভিজে।
তিনতলার গোলঘরে গরমকালে খুব অসুবিধে। সূর্যের আলো সরাসরি গোলঘরের ছাদে আর দেওয়ালে পড়ে। সকাল সাতটার মধ্যে ঘর এত গরম হয়ে যায় যে আর থাকা যায় না। ড্যানিয়েল দু’একবার এসি বসানোর কথা বলেছেন। দময়ন্তী সেই প্রস্তাব উড়িয়ে দিয়েছে। দোতলার পুরোটাই এসি। গরমের মাসগুলোয় ইলেকট্রিক বিল আসে পনেরো থেকে কুড়ি হাজার টাকা।
দময়ন্তী গরম কমানোর জন্য নিজের মতো ব্যবস্থা করেছে। গোলঘরের ছাদে পাট আর খড়ের মাদুর বুনে বিছিয়ে দিয়েছে। চারকোনে চারটে ইটের ওপরে রাখা সেই চাদর এয়ার পকেট তৈরি করে ঘরের তাপমাত্রা কমিয়ে রাখে। তবে বর্ষা আসার আগে খুলে ফেলতে হয়। না হলে পাট পচে ছাদে ড্যাম্প ধরে যাবে।
জানলায় খসখস দেওয়া। বারবার জল ঢালতে হয়। তবে এত কিছু করেও ঘরের তাপমাত্রা বাইরের থেকে পাঁচ ডিগ্রির বেশি কমানো যায় না। বাইরে যখন চল্লিশ ডিগ্রি, তখন পঁয়ত্রিশ ডিগ্রিতে বেগুন পোড়া হওয়া ছাড়া উপায় নেই।
বিছানা থেকে উঠে বালিশের ওয়াড় দিয়ে গা মোছে দময়ন্তী। ঘর থেকে বেরিয়ে ছাদের কল খুলে বালতিতে জল ভরে খসখসে কয়েক বালতি জল ঢালে। ছাদ ভিজে শপশপ করছে। আপাতত কিছুক্ষণ ঘর ঠান্ডা থাকবে।
তবে এখন ছাদে থাকার ইচ্ছে নেই। সে নেমে এল দোতলায়। ড্যানিয়েল স্টুডিওর একপ্রান্তে ইজিচেয়ারে শুয়ে ঘুমোচ্ছেন। খালি গা। পরনে সিক্স পকেট কারগো। হালকা বাদামি রঙের কারগোর পকেটে একাধিক তুলি গোঁজা। নানান রং লেগে কারগোটা কালারফুল হয়ে গেছে। ড্যানিয়েল বুকের ওপরে রাখা দান্তের ‘মেফিস্টো’।
বাবাকে ঘুম থেকে না তুলে মায়ের স্টাডিতে ঢোকে দময়ন্তী। স্টাডির ভেতরটা কনকনে ঠান্ডা। এসির তাপমান ষোল ডিগ্রিতে নামিয়ে, ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে বসে আছেন শক্তিরূপা। টেবিলে থার্মোফ্লাস্কে কফি রাখা রয়েছে। প্লেটে কয়েকটা মাল্টিগ্রেন বিস্কুট। বিস্কুট খেতে খেতে কাজ করছিলেন শক্তিরূপা। মেয়েকে দেখে বললেন, ‘সুপ্রভাত।’ আবার কাজে ডুবে গেলেন।
মাকে দেখলে আজকাল খারাপ লাগে দময়ন্তীর। মায়াকম কোম্পানি হিসেবে খুব ভালো। প্রচুর মাইনে, অজস্র সুযোগ সুবিধে কিন্তু কাজের চাপে কর্মীরা হাঁসফাঁস করে। প্রতি সপ্তাহে নতুন ইস্যু তৈরির পাশাপাশি ক্রমাগত ম্যাগাজিনের সেল বাড়িয়ে যাওয়া, লেখা ও ছবির মান ক্রমাগত উন্নত করা, ক্রমাগত প্রতিযোগীদের থেকে দশ কদম আগে থাকার প্রবণতা ‘উইকেন্ড’-এর কর্মীদের দম দেওয়া পুতুল বানিয়ে ছেড়েছে। শক্তিরূপাও একটি পুতুল। আগে অফিসের কাজ বাড়িতে নিয়ে আসতেন না। এখন এমন অবস্থা হয়েছে, ঘুমনোর সময় ছাড়া সারাক্ষণই অফিসের কাজ করেন। স্বামী ও কন্যার প্রতি মনোযোগ দেওয়ার সময় নেই।
দময়ন্তী মায়ের পাশে বসে বলল, ‘এবারের কভার স্টোরি কী?’ সে জানে একমাত্র এই বিষয় নিয়ে কথা বললেই শক্তিরূপা দু’চার কথা বলবে। অন্য কিছু বললে ‘হুঁ-হাঁ’ বলে সেরে দেবে।
‘সেই বিধবাপুকুর।’ কফিতে চুমুক দিয়ে, থার্মোফ্লাস্ক থেকে কাপে কফি ঢেলে দময়ন্তীর দিকে এগিয়ে বলেন শক্তিরূপা, ‘এত দিন বাদে সেই কভার স্টোরিটা যাচ্ছে।’
‘লেখাগুলো একই থাকবে?’
‘হ্যাঁ। এখন বরং অনেক প্রাসঙ্গিক। ছবির পোস্ট-প্রোডাকশান শেষ। রিলিজ করবে খুব শিগগির। মন্দিরা মুখার্জি একটা লেখা দিয়েছেন বাঁজাপলাশ গ্রামে শুটিং-এর অভিজ্ঞতা নিয়ে। খুব মজার। লেখাটা ভালো কাটবে।’
বাঁজাপলাশ নামটা শুনে দময়ন্তী কফিতে চুমুক দিল। ‘এই গ্রামটা এখন নানান কারণে নিউজ।’
‘হ্যাঁ। আমরাই তো তিনটে কভার স্টোরি করলাম। ভালো সার্কুলেশন ছিল।’
‘তোমাকে নিয়ে এই এক সমস্যা।’ হাসছে দময়ন্তী, ‘সার্কুলেশান, ডেডলাইন আর টার্গেট ছাড়া কিছু বোঝো না। আমার মনে হয় এমন একদিন আসছে, যখন বাবার প্রসঙ্গ উঠলে তুমি বলবে, ‘হ্যাঁ। ওকে নিয়ে স্টোরি করলে সার্কুলেশান বাড়ে।’’
শক্তিরূপা দময়ন্তীর দিকে তাকান। বলেন, ‘আমি সুপারমম নই দিঠি। মেয়েদের ‘দশভুজা’ উপাধি দিয়ে সব কাজ করিয়ে নেওয়ার মধ্যে যে প্যাট্রিয়ার্কাল বদমায়েশি আছে, সেই ফাঁদে পা দেওয়ার মতো বোকাও নই। যেটা পারি সেটা করি। আর পাঁচজন বউয়ের মতো বরকে কফি করে দিতে পারি না। কিন্তু তারা কি আমার মতো প্রতি সপ্তাহে একটা ম্যাগাজিন বার করতে পারে? আর পাঁচজন মায়ের মতো মেয়ে কলেজ যাওয়ার আগে তাকে ব্রেকফাস্ট সার্ভ করতে পারি না। কিন্তু ওই মায়েরা কি আমার মতো এক্সেল স্প্রেড শিট নিয়ে তুখোড় কাজ করতে পারে?’
‘আয়্যাম সরি মা! এত কিছু মিন করে কথাটা বলিনি।’ শক্তিরূপাকে জড়িয়ে ধরে দময়ন্তী। শক্তিরূপা বলেন, ‘আমার কথার মানে আজ বুঝবি না। বিয়ের পরে বুঝবি ঘর আর বার একসঙ্গে ট্যাক্ল করা যে কী টাফ জব! আমরা তো ওয়েল অফ। কাজের লোক এফর্ড করতে পারি। মধ্যবিত্ত বাড়ির বউদের অবস্থার কথা কখনও ভেবেছিস? কর্তা-গিন্নি দু’জনেই অফিস করে। কর্তা অফিস থেকে ফিরে জামাকাপড় খুলে সোফায় বসে পা নাচাতে নাচাতে রিয়াল মাদ্রিদের ম্যাচ দেখে আর গিন্নি রান্নাঘরে ঢুকে চা বানায়, রাতের খাবার বানায়, সকালের ব্রেকফাস্ট আর লাঞ্চের কাজ এগিয়ে রাখে।’
দময়ন্তী বলল, ‘মা, তোমার পরের ইস্যুর স্টোরি রেডি। ‘সুপারমম ইজ আ মিথ!’ বা ‘মডার্ন মম, গিল্ট-ফ্রি মম!’’
‘নট আ ব্যাড আইডিয়া।’ ভুরু নাচিয়ে বলেন শক্তিরূপা। মায়ের সঙ্গে আড্ডা শেষ করে স্টাডি থেকে বেরোয় দময়ন্তী। বাবার স্টুডিওয় ঢোকে।
ড্যানিয়েল এর মধ্যে ঘুম থেকে উঠে সাউন্ড সিস্টেম চালিয়েছেন। দেবব্রত বিশ্বাসের ব্যারিটোনে শোনা যাচ্ছে, ‘বৈশাখ হে, মৌনী তাপস!’ দময়ন্তী বাবার পাশে বসে বলল, ‘এই গরমে বর্ষাকালের গান চালাও না। একটু গরম কমে তাহলে।’
রিমোট টিপে এসির তাপমান কমিয়ে ড্যানিয়েল বললেন, ‘ওপরে খুব গরম। তাই না? তুই তো শীতাতপ নিয়ন্ত্রক যন্ত্র লাগাতে দিবি না। গরমের সময়টা তা হলে নীচে থাক।’
‘না! আই অ্যাম হ্যাপি উইদ গোলঘর। বাবা, এটা কী আঁকছ?’ ক্যানভাসের দিকে ইঙ্গিত করে দময়ন্তী। থুতনি চুলকোতে চুলকোতে ড্যানিয়েল বলেন, ‘জানি না। আমার আর “প্রিটি-প্রিটি” ছবি আসছে না। একটা মেন্টাল ব্লক হয়েছে।’
‘প্রিটি-প্রিটি’ ছবি মানে কি খারাপ ছবি? তুমি এমন ভাবে বললে, যেন ওই রকম ছবি এঁকে অপরাধ করে ফেলেছ। তোমার বেনারস, রাজস্থান বা কলকাতা সিরিজ তো ইন্টারন্যাশনালি অ্যাক্লেমড।’
‘আমি তা বলতে চাইনি।’ হতাশ হয়ে বলেন ড্যানিয়েল, ‘আমি আর ওই মেন্টাল স্পেসে নেই। রোজ খবরের কাগজ আর টিভিতে বাজে খবর দেখে মনে নানা ভাঙচুর চলেছে। নানা আবছায়া ইমেজ তৈরি হচ্ছে। সাদা, কালো আর ধূসর ছাড়া কোনও রং দেখতে পাচ্ছি না।’
‘দান্তে পড়া বন্ধ করো।’ বুক র্যাকে ‘মেফিস্টো’ গুঁজে দেয় দময়ন্তী।
‘তোর কলেজ নেই?’
‘আছে। আমি চললাম।’ ড্যানিয়েলের স্টুডিও থেকে বেরিয়ে বাথরুমে ঢোকে দময়ন্তী। স্নান সেরে বেরিয়ে দেখে কাজের দিদি ব্রেকফাস্ট সাজিয়ে রেখেছে। চিজ স্যান্ডুইচ আর ফলের রস। আজ সকাল আর ক্যালকাটা পোস্ট-এর হেডলাইনে চোখ বোলায়। ড্যানিয়েল ঠিকই বলেছেন। কাগজদুটো খুন-জখম, ধর্ষণ-মলেস্টেশান, দাঙ্গা-হাঙ্গামা, চুরি-ডাকাতির খবরে ভর্তি। কাগজ রেখে ব্যাকপ্যাকে ঠান্ডা জলের বোতল নিয়ে তরতর করে একতলায় নামে দময়ন্তী। ঋষিতা সকাল বেলাতেই অফিসের শাটার তুলছে। অন্যান্য দিন এই সকালবেলায় ঘুম চোখে থাকে। আজ স্নান করে, শিফনের শাড়ি পরে, হালকা মেকআপ করে রেডি। দময়ন্তী জিজ্ঞাসা করল, ‘কী ব্যাপার? আজ কোনও অকেশান আছে নাকি?’
‘কেন?’ অস্বাভাবিক চড়া গলায় প্রশ্ন করল ঋষিতা। ঘাবড়ে গিয়ে দময়ন্তী বলল, ‘না, মানে, অন্য দিন এত সেজেগুজে থাকো না তো। তাই বললাম। তুমি কিছু মনে করলে না তো?’
ঋষিতা ফ্যাকাশে হেসে বলল, ‘এত গরম! সেজেগুজে থাকলে একটা সেন্স অব ওয়েল বিয়িং হয়। তুমিও তো চমৎকার সেজেছ। খুব মিষ্টি দেখাচ্ছে।’
‘থ্যাংকু!’ চেষ্টা করে নেকুনেকু গলার আওয়াজ বার করল দময়ন্তী। ‘পাপ্পু কোথায়? ছেলেটা এই সময়ে চলে আসে।’
‘ওকে বৈঠকখানা বাজারে পাঠিয়েছি কাগজ কিনতে। নতুন একটা স্যুভেনিরের বরাত পেলাম।’ শাটার তুলে অফিসে ঢুকে যায় ঋষিতা।
দময়ন্তী গোলমহল থেকে বেরিয়ে ভাবে, ঋষিতার সাজগোজের প্রসঙ্গ তুলে সে ঠিক করেনি। ওর কোনও একটা চক্কর আছে। পরে এ নিয়ে খোঁজখবর নিতে হবে। আপাতত প্রসঙ্গটা ধামাচাপা দেওয়া থাক। না হলে মেয়েটা সতর্ক হয়ে যাবে। তারও কলেজের দেরি হয়ে যাচ্ছে। আজ প্রথমেই থিয়োরি ক্লাস।
তবে, দময়ন্তী বুঝতে পারে, আজ আবার তার মাথার মধ্যে উনুনে কেউ কয়লা ঢেলেছে। ছড়িয়েছে কেরোসিন। এবার ফিস্ করে দেশলাই মারল! রাগের নীল শিখা দপ করে বার করল জিভ। ওই জিভ আজ কাউকে খাবে। খাবেই।
কলেজে ঢুকে থিয়োরি ক্লাস করা হল না দময়ন্তীর। দাঁড়ে বসে ব্যাচমেটরা আড্ডা মারছে। জেম্সি, সাবিনা, শ্রীপর্ণা মিলে অভিকে কলকল করে কী সব বলছে। পাশে দাঁড়িয়ে আপ্পু।
‘কী ব্যাপার?’ আপ্পুকে জিজ্ঞাসা করল দময়ন্তী।
‘তোর ব্যাচমেটকে জিজ্ঞাসা করে দ্যাখ।’ রাগরাগ গলায় বলে আপ্পু। ‘অভি বলছে ডাক্তারি পড়া ছেড়ে দেবে। আর কলেজে আসবে না।’ আপ্পুর কথা কেড়ে নিয়ে শ্রীপর্ণা বলল, ‘মামদোবাজি নাকি? কেলিয়ে তোর ইয়ে ফাটিয়ে দেব! চল! ক্লাসে চল!’
দময়ন্তী অনেকদিন বাদে অভিকে দেখল। রোগাটে ছেলেটা আরও রোগা হয়ে গেছে। চুল কাটেনি, গোঁফদাড়ি কামায়নি। নবীন সন্ন্যাসীদের মতো লাগছে। চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে। গাল ভাঙা। পোশাক-আশাক মলিন।
‘দেবদাসের মতো মদও ধরেছিস নাকি?’ নিজের বুকে কিল মেরে দময়ন্তী গান ধরে, ‘মার ডালা! হায়, মার ডালা!’
‘তোর কেসটা কী বল তো?’ সবার হাতে চায়ের ভাঁড় ধরাতে ধরাতে সাবিনা জিজ্ঞাসা করে, ‘বৃন্দার সঙ্গে খিচাইন হয়েছে বলে পড়াশুনা বন্ধ করবি কেন?’
চায়ের ভাঁড় হাতে নিয়ে, রাস্তার দিকে তাকিয়ে অভি বলল, ‘তোরা ক্লাসে যাবি না?’
শ্রীপর্ণা বলল, ‘বেচারি অনেক চেষ্টা করে কান্না আটকে রেখেছে। ফারদার কিছু বললে ভ্যাঁ করে দেবে। তোরা ওকে ছাড়।’
অভির জন্য দময়ন্তীর খারাপ লাগছে এমনটা নয়। ক্যালকুলেটিভ এবং ছকবাজ ছেলেদের এমন পরিণতিই হওয়া উচিত। এত নিখুঁত নাটক করছে যে অভিনয় না সত্যিকারের দুঃখ বোঝা যাচ্ছে না। আপ্পু শ্রীপর্ণাকে বলল, ‘তোরা ক্লাসে যা। আমি পরের ক্লাসে ওকে নিয়ে আসছি।’
‘থ্যাংকস বস!’ শ্রীপর্ণা, জেম্সি আর সাবিনা এলএলটির দিকে দৌড়ল। দময়ন্তী এতক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়েছিল। সে বলল, ‘সামনে ভোট। তারপর আমাদের সেকেন্ড এমবি। এর মধ্যে ফালতু বাওয়াল কেন করছিস?’
আপ্পু বলল, ‘আমাদের কলেজে মেয়েদের অভাব আছে? অন্য কাউকে লাইন মার। কে বারণ করেছে?’
অভি ক্লান্ত চোখে আপ্পুর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘প্লিজ, তোমরা অন্য বিষয় নিয়ে কথা বলো। আমাকে নিয়ে মাথা না ঘামালেও চলবে।’
ঘাড় ঝাঁকিয়ে আপ্পু বলল, ‘সরি বস! টু ইচ হিজ ওন। চল, ক্যান্টিনে চল। দময়ন্তী, চায়ের পয়সা মিটিয়ে দে।’
দময়ন্তীর মাথার উনুনে হঠাৎ কে যেন কুলোর বাতাস দিল। চাপা আগুন ধক করে উঠল। দাঁত চিপে সে আপ্পুকে বলল, ‘অন্যের পয়সায় তো সব সময় খাচ্ছ। একবার নিজে দামটা মেটাও না!’
আপ্পু অবাক হয়ে বলে, ‘তুইও পেগলে গেলি নাকি? না পিএমএস চলছে? এনিওয়ে…’ চায়ের দাম মিটিয়ে সে বলল, ‘চল অভি। ক্যান্টিনে চল। একা থাকলে চাপ বাড়বে।’
আপ্পু আর অভি ক্যান্টিনের দিকে এগোল। দময়ন্তীর রাগ এখনও কমেনি। সাপের মতো ফোঁসফোঁস করছে সে। বিষের থলিতে অনেক বিষ জমে আছে। বিষ নামাতে না পারলে এই কষ্ট বয়ে বেড়াতে হবে। গরগর করতে করতে সে এসএলটি-র দিকে এগোয়। এখন সেখানে রেপ স্যারের থিয়োরি ক্লাস আছে।
এসএলটিতে ঢুকে দময়ন্তী শুনল রেপ স্যার বলছেন, ‘স্নেক বাইট নিয়ে প্র্যাকটিকাল ক্লাস আগেই হয়ে গেছে। আজ থিয়োরি পড়াবো। সাপ সম্পর্কে তোমরা কে কী জানো?’
পিছনের সিট থেকে প্রবাল বলল, ‘এক ধরনের সাপ আছে। তাকে বলে ঢ্যামনা। একে নিয়েই সুকুমার রায় লিখেছেন, ‘বাবুরাম সাপুড়ে কোথা যাস বাপুরে!’’
রেপ স্যার গলা মেলালেন, ‘ “সেই সাপ জ্যান্ত গোটা দুই আন তো। তেড়েমেড়ে ডান্ডা করে দিই ঠান্ডা।” বেশ। আর কোনও তথ্য?’
দীপ বলল, ‘‘বিষ নেই তবু কুলোপানা চক্কর!’ এটাও কি ঢ্যামনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য?’
‘হ্যাঁ।’ ঘাড় নাড়েন রেপ স্যার। ‘এবার বলো এটা কোথায় আছে। ‘সাপের ভাষা সাপের শিস, ফিসফিস ফিসফিস। বালকিষনের বিষম বিষ। ফিসফিস ফিসফিস।”’
‘খগম।’ একদম পিছনের সারি থেকে বলল অভি। দময়ন্তী দেখল অভির গলা শুনে বৃন্দা শক্ত হয়ে গেল। পাশে বসে থাকা চন্দন বৃন্দার হাতে হাত রেখে সান্ত্বনা দিল।
‘নাগিন কে কে দেখেছ? “মন ডোলে মেরা তন ডোলে মেরা, দিল কা গয়া করার রে। কওন বাজায়ে বাঁসুরিয়া।” ’ রেপ স্যার গান গেয়ে শুনিয়ে দিলেন। দেড়শো জনের মধ্যে দু’তিনটি হাত উঠল।
রেপ স্যার বললেন, ‘পুরোনো জমানার ফিলিম। না দেখাই স্বাভাবিক। আচ্ছা নাগিনা কে কে দেখেছ? শ্রীদেবী হিরোইন ছিলেন।’
জেম্সি গান ধরল, ‘ম্যায় তেরি দুশমন, দুশমন তু মেরা, ম্যায় নাগিন তু সপেরা।’
রেপ স্যার বললেন, ‘একেই বলে, সাপের হাঁচি বেদেয় চেনে। তোমরা সাপ সম্পর্কে কিছু কিছু জানো। এবার বাকিটা জানার পালা। আমরা তাহলে সাপের প্রকারভেদ দিয়ে শুরু করি…’
রেপ স্যার সাপের ঠিকুজি-কুষ্ঠি পড়াচ্ছেন, দময়ন্তীর মাথা দপদপ করছে। আজ তার কী হল? এত মানসিক অস্থিরতা কেন? অভিকে দেখে তার রাগ হচ্ছে। রাগ হচ্ছে বৃন্দা-চন্দনের জুটি দেখে। রাগ হচ্ছে এই ক্লাসের ওপরে, ইন্ডিয়ান মেডিকাল কলেজের ওপরে, কলকাতা শহরের ওপরে, বিশ্ব সংসারের ওপরে। সারা শরীর থেকে ঝাঁঝাঁ করে রাগের বাষ্প বেরোচ্ছে।
ক্লাস শেষ। একবর্ণও শোনেনি দময়ন্তী। এখন ফার্মাকোলজি প্র্যাকটিকাল। যাওয়ার কোনও ইচ্ছে নেই। এসএলটি থেকে বেরিয়ে ক্যান্টিনের দিকে যাচ্ছে, পিছন থেকে নরম গলায় বৃন্দা ডাকল, ‘অ্যাই! শোন!’
দময়ন্তী ঘুরে দাঁড়াল। মুখে একগাল হাসি ফুটিয়ে বলল, ‘নিজাম প্যালেসের ফুটপাথে দাঁড়িয়ে থাপ্পড় খাওয়ার কথা আমি এখনও ভুলিনি।’
ছলোছলো চোখে বৃন্দা বলল, ‘সরি বললেও মাফ করবি না?’
‘আচ্ছা, আমার না হয় তোর এগেনস্টে একটা গ্রাজ জমা রইল। তাতে ফ্রেন্ডশিপে আটকাচ্ছে কোথায়?’
‘ও রকম বলিস না! প্লিজ! আমার এগেনস্টে গ্রাজ রাখিস না। প্লিজ!’
‘অত প্লিজ প্লিজ করিস না। বোর লাগে। চল ক্যান্টিনে যাই।’ বৃন্দার হাত ধরে ক্যান্টিনের দিকে এগোয় দময়ন্তী। পিছন থেকে চন্দন বলে, ‘আমি আসতে পারি?’
‘তুই? এখন? আমাদের সঙ্গে?’ ইতস্তত করে বৃন্দা। দময়ন্তী ফোঁসফোঁস করতে করতে ভাবে, এদের মধ্যে কী ধরনের ধাষ্টামো শুরু হয়েছে কে জানে? বন্ধুত্বের অনেক রকম চেহারা হয়! অনেক রকমের নাম হয়। বৃন্দা আর চন্দনের মধ্যে যা চলছে তা কী রকমের বন্ধুত্ব?
‘থাকব না? চলে যাব?’ এক পা এগিয়ে আসে চন্দন। বৃন্দা বলে, ‘তুই যা। দময়ন্তীর সঙ্গে আমার একটু দরকার ছিল।’ চন্দন বাধ্য ছেলের মতো হোস্টেলের দিকে এগোয়। দময়ন্তী আর বৃন্দা ক্যান্টিনে ঢুকে কোনের টেবিল দখল করে। জীবনদা এসে বলে, ‘দু’জনকে একসঙ্গে অনেক দিন বাদে দেখলাম। কী দেব?’
‘এক প্লেট চাউমিন আর দুটো কোক।’ অর্ডার করে বৃন্দা।
দময়ন্তী বৃন্দার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। কী অদ্ভুত একটা হ্যাপি, কিউট, বোকাটে পারসোনালিটি ডেভেলপ করেছে মেয়েটা। ভীষণ স্যাটিসফায়েড, শান্ত আর তৃপ্ত লাগছে। মনে হচ্ছে ওর অস্তিত্বের ভিতরে আনন্দের দীপ জ্বলছে। শান্ত, স্নিগ্ধ আলোয় পরিপূর্ণ হয়ে আছে।
এত আনন্দ কীসের? কীসের এত পরিপূর্ণতা? দময়ন্তীর ভিতরের সাপের ঘুম ভাঙে। বিষের থলিতে চোয়াল ব্যথা করছে। এখন একটা ছোবল লাগবে। অব্যর্থ, অমোঘ এক ছোবল। শুধু একটু আঘাত চাই।
জীবনদা চাউমিন আর কোক দিয়ে গেছে। সঙ্গে দুটো ফর্ক। বৃন্দা আর দময়ন্তী ফর্ক দিয়ে চাউমিন খাচ্ছে, টুকটাক কথা চালাচ্ছে। চাউমিনে অল্প নুন, একটু কেচাপ মিশছে। স্বাদ বাড়ছে চাউমিনের। গপ্পো জমছে আস্তে আস্তে।
খটাং করে চেয়ার টেনে বৃন্দার পাশে বসে ঠান্ডার বোতল গলায় ঢেলে বিলু বলল, ‘অ্যাই বৃন্দা! তোকে শ্রীপর্ণা ডাকছে।’
‘উঠে যেতে বলছ?’ মুচকি হেসে বলে বৃন্দা।
‘শ্রীপর্ণা বলল তোদের হোস্টেলে ফুলমতিয়া কী একটা বাওয়াল করেছে। সেই জন্য ডাকছে।’
টুকটুক করে চাউমিন শেষ করে দু’জনে। বৃন্দা জীবনদাকে ডেকে আর একটা ঠান্ডা পানীয় চায়। বিলুকে প্রশ্ন করে, ‘ফুলমতিয়া কী করেছে?’
‘নাথিং সিরিয়াস। সিঁড়ি ধুতে গিয়ে পা-ফা ভেঙেছে বোধ হয়। ওরা ফুলমতিয়াকে ইমার্জেন্সিতে নিয়ে যাচ্ছে।’
‘এমা! তাই?’ বেঞ্চি থেকে উঠে বৃন্দা বলে, ‘জীবনদা জানে? দময়ন্তী, যাবি?’
‘তুই যা। আমার দময়ন্তীর সঙ্গে কথা আছে।’ হাত নেড়ে বলে বিলু। বৃন্দা তড়বড় করে উঠে জীবনদাকে বউয়ের পা ভাঙার খবর দেয়। জীবনদা বিরক্ত হয়ে বলে, ‘এইসব পুরোনো মডেলের মাল আর চলবে না। আজ টায়ার পামচার, কাল বডি তুবড়ে গেছে, পরশু হেড লাইট ভেঙেছে, তার পরের দিন হরেন ফুটো। এই মাল বেচে নতুন মডেল নিয়ে আসব।’
‘ফুলমতিয়াকে বেচলে তাও দু’টাকা হবে। তোমাকে তো কাগজওয়ালারাও কুড়িয়ে নেবে না।’ বৃন্দা ধমক দেয়। জীবনদার সঙ্গে বৃন্দা ক্যান্টিন থেকে বেরিয়ে যায়।
ক্যান্টিনের অন্য স্টাফ আর একটা কোকের বোতল এনেছে। সে চেঁচিয়ে বলল, ‘এটা কার?’ দময়ন্তী কিছু বলার আগে বিলু বলল, ‘এটাও আমার।’ তারপর ঢকঢক করে অর্ধেক বোতল শেষ করে দময়ন্তীকে বলল, ‘নে!’
অলসভাবে বোতলের দিকে তাকিয়ে দেখল দময়ন্তী। মুখ চাপা দিয়ে হাই তুলল। নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলল, ‘না।’
‘খাবি না? গুড! আমার বড্ড তেষ্টা পেয়েছে।’ দ্বিতীয় চুমুকে বোতল শেষ করে বিলু বলে, ‘বৃন্দাকে ভাগিয়ে দিলাম, তার পিছনে কারণ আছে। সামনে ইলেকশান। সব্যসাচী মিটিং ডেকেছে। বাঁজাপলাশ গ্রাম এবারের কলেজে ইউনিয়ন ইলেকশানে বড় ইস্যু হবে।’
‘ও।’ ক্যান্টিনের ছোকরাকে ইশারায় ডাকে দময়ন্তী। ছোকরা বলে, ‘একটা চাউমিন আর দুটো কোক। পঞ্চাশ টাকা।’
‘শুধু একটা চাউমিন।’ তিনটে দশ টাকার নোট বাড়িয়ে দিয়েছে দময়ন্তী।
‘দুটো কোকের দাম কে দেবে?’ নোটগুলো নিয়ে প্রশ্ন করে ছোকরা।
‘যে খেয়েছে।’ দময়ন্তীর চোখ ঝিকিয়ে ওঠে। তার চোয়াল ব্যথা করছে। এখন সে স্থির, শান্ত, নির্বিকল্প। সামান্য নড়াচড়ার অপেক্ষা। আলোছায়ায় সামান্য এদিক ওদিক…
‘তোর কী হল? হ্যালো?’ দময়ন্তীর থুতনি নেড়ে হাসতে হাসতে বলে বিলু। লোকে যেভাবে বাড়ির দরজা খটখটায়, সেই কায়দায় ঠকঠক করে মাথায় গাঁট্টা মেরে বলে, ‘এনিবডি হোম? কেউ আছে? বাপ ছবি এঁকে লাখ লাখ টাকা কামায়। মা বুর্জোয়া কাগজের এডিটর। তাদের মেয়ে হয়ে তুই দুটো কোকের দাম নিয়ে কঞ্জুসি করছিস?’
চোখ থেকে চশমা খুলল দময়ন্তী। দুই কনুই টেবিলে রেখে হাতের মধ্যে হাত দিল। ঘাড় সামান্য বেঁকিয়ে বিলুর চোখে চোখ রাখল। বলল, ‘কয়েকটা কথা বলার আছে।। এক এক করে বলছি। নাম্বার ওয়ান…’
‘এনিথিং রং?’ শঙ্কিত হয়ে জানতে চায় বিলু।
‘শ্শ্শ্শ্!’ তর্জনী ঠোঁটের ওপর রেখে বিলুকে থামায় দময়ন্তী। ‘এক নম্বর, আমার বাবা-মা কত রোজগার করে, এই নিয়ে কথা বলার রাইট তোমার নেই। যেমন আমার রাইট নেই তোমার বাবা-মা সম্পর্কে কোনও কমেন্ট করার।’
‘সরি!’
‘সরি ওন্ট মেন্ড ইট। নাম্বার টু, এই মুহূর্ত থেকে আমি তোমার সঙ্গে যাবতীয় ব্যক্তিগত যোগাযোগ ছিন্ন করছি। ইন ফিউচার, তুমি আর আমার সঙ্গে যোগাযোগ করবে না। আই ডোন্ট ওয়ান্ট আ সোশাল ক্লাইম্বার অ্যাজ মাই ফ্রেন্ড। অর লাইফ পার্টনার, ফর দ্যাট ম্যাটার।’
‘সোশাল ক্লাইম্বার? আমি? তুই পাগল নাকি? এতদিনে আমার সঙ্গে থেকে তোর এই ধারণা হল?’
‘নাম্বার থ্রি। পলিটিক্স ইজ নট মাই কাপ অফ টি। লেফ্ট, রাইট, র্যাডিক্যাল লেফ্ট, আলট্রা-লেফ্ট, রাইটিস্ট, ফান্ডামেন্টালিস্ট—কোথাও আমি বিলং করি না। তোমাদের প্রোগ্রেসিভ মেডিকাল ফোরাম, তোমাদের ইন্ডিয়ান পিপ্লস ফ্রন্ট, তোমাদের দুনিয়া বদলানোর স্বপ্ন, তোমাদের সরকার ফেলার আন্দোলন—এই সবের সঙ্গে আমার সম্পর্ক শেষ। তোমাকে যতদিন ভালো লাগত, ততদিন প্রেমের প্রফেশনাল হ্যাজার্ড হিসেবে এগুলো ভালো লাগত। কিন্তু আর নয়। এনাফ ইজ এনাফ!’
‘আমাকে আর তোর ভালো লাগে না?’ অবিশ্বাস, ক্রোধ, অসহায়তা, ডিনায়ালের সংমিশ্রণে বিলু থরথর করে কাঁপছে। দময়ন্তীর হাত ধরে হ্যাঁচকা টান মারে সে।
‘ড্রামা কোরো না।’ হাত ছাড়িয়ে নিয়ে হিসহিস করে বলে দময়ন্তী। ‘আমি ভুলে গিয়েছিলাম যে কলকাতায় এসেছি ডাক্তারি পড়তে। জমির দালালি করতে নয়, বন্দুকবাজ হতে নয়, চে গেভেরার আর্ম ক্যান্ডি হতে নয়। ওই তপন চৌধুরী অ্যান্ড কোং যখন তোমাকে গারদে ভরে ন্যাংটো করে ক্যালাবে তখন আমার কথাগুলোর মানে বুঝতে পারবে। বাই।’
বিলু নিজের পরিণতি জেনে গেছে। তাও সে শেষ চেষ্টা করে। বলে, ‘তুই এটা ঠিক করছিস না। আমি এর শেষ দেখে ছাড়ব।’
‘শেষ আমি দেখব।’ তর্জনী তুলে বলে দময়ন্তী, ‘আমাকে আর একবারও ডিসটার্ব করলে, আই উইল গো টু দ্য পোলিস অ্যান্ড স্পিল দ্য বিন্স। বাই।’
গটগট করে ক্যান্টিন থেকে বেরিয়ে যায় দময়ন্তী। বিলু মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকে। ক্যান্টিনের ছোকরা এসে বলে, ‘কুড়ি টাকা ছাড়ো। দুটো কোকের দাম বাকি আছে।’
.
