হৃদয়ের নৈঃশব্দ্য – ৩৫

৩৫. চন্দন

আনন্দবাজার পত্রিকার হেডলাইন, ‘চিটফান্ডের মালিক পত্নী-সহ গ্রেফতার।’ সঙ্গের ছবিতে দেখা যাচ্ছে মুখে পাশবালিশের ওয়াড় চাপা দিয়ে প্রিজন ভ্যানে বসে রয়েছেন হৈমবতী। বিবস্বান মুখ ঢাকেননি। সটান ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে রয়েছেন। না-কামানো দাড়ির রং সাদা। রঙ না করা চুলে খয়েরি আর সাদা রং-এর ছোপ। চোখের কোণে গাঢ় কালি। ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি। ভাবটা এই রকম, ‘তোরা আমার কিস্‌সু করতে পারবি না।’

খবরে চোখ রাখল চন্দন। প্রধান খবর, মোবাইলের টাওয়ার ট্র্যাক করে বিবস্বান-হৈমবতীকে কীভাবে চণ্ডীগড়ের একটি সাধারণ হোটেল থেকে ধরা হল। অন্য বড় খবর হল, কলকাতায় মায়াকমের হেড অফিসে ভাঙ-চুর হয়েছে। বিভিন্ন জেলায় মায়াকমের একাধিক এজেন্ট গ্রাহককে প্রাপ্য টাকা মেটাতে না পেরে আত্মঘাতী হয়েছেন। তৃতীয় খবরে বলা হয়েছে, আজ সকাল, বেঙ্গল নিউজ, ফিল্মডম এবং স্কুপ চ্যানেল—অর্থাৎ দুটি সংবাদপত্র ও দুটি টিভি চ্যানেল বন্ধ হয়ে গেল। মনোতোষ ঘোষের পরের ছবির প্রোডিউসার ছিল মায়াকম। সে ছবির কাজও বন্ধ। সান্যাল দম্পতির সমস্ত প্রপার্টি পুলিশ সিল করেছে।

খবরের কাগজ খাটে রেখে হাই তোলে চন্দন। সকাল সাতটা বাজে। কাল সারাদিন বিয়ার খাওয়ার ফলে এখনও মাথাব্যথা করছে আর গা ম্যাজম্যাজ করছে। সুরজকে হাতে রাখার জন্য এইসব করতে হয়। কলেজে ভর্তি হওয়ার দিন তাকে আস্ত একটা প্যাকেট সিগারেট খেতে হয়েছিল। অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল নন-স্মোকার চন্দন। কিন্তু চ্যালেঞ্জ হারেনি। এখন দিনে এক প্যাকেট সিগারেট না হলে চলে না।

মদ্যপান করার বাতিক নেই চন্দনের। কিন্তু সুরজ নাছোড়বান্দা। সকাল থেকেই বিয়ার টানা শুরু হয়েছিল। চন্দন বুদ্ধিমানের মতো একটা ক্যান্‌ড বিয়ার শেষ করার পরে এক বোতল জল খাচ্ছিল। ঘন ঘন বাথরুম হলেও নেশা তেমন হয়নি। হঠাৎই ফোনে মেয়েটাকে ডাকল সুরজ। ঘরে ঢোকা মাত্র দু’জনে যা শুরু করল, তা একমাত্র ব্লু-ফিল্মেই দেখেছে চন্দন।

নিজেকে সামলাতে পারেনি চন্দন। যৌনতার অভিজ্ঞতা তার ছিল না। গতকাল ঋষিতার কাছে হাতেখড়ি হল। মেয়েটা ভালো শিক্ষিকা। সুরজের মতো পোড় খাওয়া ছাত্র এবং চন্দনের মতো সদ্য সাক্ষরের যাবতীয় দাবি একটানা মিটিয়ে গেল।

গতকালের কথা ভেবে অশালীন লিঙ্গোত্থান হয়েছে চন্দনের। খুব ঋষিতার কথা মনে পড়ছে। মনে হচ্ছে এক ছুটে মেয়েটার কাছে চলে যায়, চুমোয় চুমোয় ভরিয়ে দেয়। এটা কি প্রেম? না বোধ হয়! প্রেম তো বৃন্দার সঙ্গে। তা হলে একসঙ্গে দু’জনকে কি ভালোবাসা যায়?

দার্শনিক প্রশ্ন বরাবর অপছন্দ করে চন্দন। ওইসব ন্যাকামো লুজারদের জন্য। অপার্থিব, আন-প্রেডিকটেবিল কোনও কিছুর মুখোমুখি হলে, তার সমাধান খুব সরল ভাবে করে চন্দন। এখনও তাই করল। নিজেকে বোঝাল যে শরীর এখন ঋষিতাকে চাইছে। মন সেটাকে প্রেম ভেবে ভুল করছে।

একই ভাবে মস্তিষ্ক চাইছে স্যামি এবং শান্তিধামকে। মস্তিষ্ক মনকে বোঝাচ্ছে, বৃন্দার সঙ্গে ভালোবাসার অভিনয় করতে। এই ভাবে একদিন না একদিন প্রেম হয়ে যাবে। আর না হলেই বা কী আসে যায়? প্রেমের অভিনয়কে এতদিন প্রেম ভেবে ভুল করে চলেছে বৃন্দা। বাকি দিনগুলোও একই ভুল করবে।

আসলে চন্দন কাউকেই ভালোবাসে না। সে ভালোবাসে এক নম্বর অবস্থান। সে ভালোবাসে পাহাড়চূড়া। সে ভালোবাসে ত্রিভুজের শীর্ষদেশ। এক নম্বর অবস্থান ধরে রাখার জন্যই গ্রাম থেকে শহরে আসা, স্যামিলটন স্কুল থেকে ইন্ডিয়ান মেডিকাল কলেজে ঠাঁই বদল, পরপর দশটা সিগারেট খেয়ে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, সিনিয়রদের তাঁবেদারি করা, জনমোর্চার সদস্য পদ নেওয়া, ভোটে জিতে ইউনিয়নের জেনারেল সেক্রেটারি হওয়া। এক নম্বর অবস্থান ধরে রাখার জন্যেই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে পালটি খাওয়া, শত্রুর তাঁবেদারি করা, বিয়ার খাওয়া, গ্রুপ সেক্সে অংশগ্রহণ করা। এ সবই সিঁড়ির ধাপ। এসব করতেই হয়।

অভির কাছে ক্র্যাকপিজির কোর্স মেটিরিয়াল দেখার পরে লাইব্রেরি গিয়ে ক্র্যাকপিজির বুকলেট উল্টেপাল্টে দেখে চন্দনের মনে হয়েছে, এমবিবিএস-এর সময়ে যারা টেক্সট বুক মন দিয়ে পড়েছে, তাদের কাছে এ সব প্রশ্ন জলের মতো সোজা। ক্র্যাকপিজিতে জয়েন করার জন্য বাবার কাছে পঁচিশ হাজার টাকা চেয়েছিল চন্দন। পবন দেননি। অগত্যা টিনটিন, রিপু, আপ্পুর কাছ থেকে ক্র্যাকপিজির পুরোনো স্টাডি মেটিরিয়াল জোগাড় করেছে চন্দন। ওরা এমডি এনট্রান্স পরীক্ষায় বসবে বলে ক্র্যাকপিজিতে জয়েন করেছিল। ইংল্যান্ড চলে যাওয়ার কারণে মেটিরিয়ালগুলো নষ্ট হচ্ছিল। মাস দুয়েক প্র্যাকটিস করার পরেই চন্দন বুঝে গেছে—যারা এমবিবিএস-এর মূল টেক্সট বই খুঁটিয়ে পড়েছে, সব সাবজেক্টের সব চ্যাপ্টার কভার করেছে, প্রতিটি বিষয় সম্পর্কে যাদের আইডিয়া জলের মতো—তাদের কাছে পোস্ট গ্র্যাজুয়েশানে চান্স পাওয়া সোজা। অভিকে গাঁতিয়ে পড়তে হচ্ছে, কেন না ওর বেস স্ট্রং নয়। প্রথম এমবিবিএস-এর পড়া ওকে এখন পড়তে হচ্ছে। ওই পরিশ্রম চন্দনকে করতে হবে না। চন্দন অনলাইনে ফর্ম ফিলাপ করে ট্রেনে দিল্লি গিয়ে পরীক্ষা দিয়েছে। হাউসস্টাফশিপে যা মাইনে দেয়, তাতে স্লিপার ক্লাসে দিল্লি যেতে অসুবিধে হয়নি। থাকার ব্যবস্থা এমপি কোয়ার্টারে। অধীর হালদারের কাছে।

বাংলার রাজনীতি ছেড়ে অধীর এখন সর্বভারতীয় রাজনীতির আঙিনায়। পশ্চিমবাংলা থেকে ধুয়েমুছে গেলেও অন্যান্য কয়েকটি রাজ্যে জনমোর্চার অল্পবিস্তর উপস্থিতি আছে। অধীর উড়িষ্যা থেকে নির্বাচিত মেম্বার অব পার্লামেন্ট। চেহারায় চমৎকার পালিশ এসেছে। অল্প কয়েকটি আসনের সমর্থন দিয়ে জাতীয়তাবাদী পার্টিকে সরকারে টিকিয়ে রেখেছে জনমোর্চা। জাতীয়তাবাদী পার্টির সরকার ভরসা দিয়েছে, আগামী বিধানসভা নির্বাচনে জনমোর্চার সঙ্গে একসাথে লড়ে মৃন্ময় চ্যাটার্জিকে বাংলাছাড়া করবে। একে বলে জোটধর্ম।

জোটধর্ম চন্দনও পালন করেছে। বাংলায় মৃন্ময়কে সমর্থন করলেও দিল্লি গিয়ে আবার পুরোনো বামপন্থী ফর্মে। অধীরের সঙ্গে লম্বা লম্বা আড্ডা, নিও-কমিউনিজম নিয়ে আলোচনা, একদিন পার্লামেন্ট ঘুরে আসা—সবই করেছে। তার ফাঁকে টুক করে এইমস আর পিজিআই-এর এমডি এনট্রান্স পরীক্ষা দিয়ে ফেলেছে। সারা ভারতের হাতে গোনা, বাছাই করা ভালো ছেলেমেয়ে ছাড়া এই পরীক্ষায় কেউ চান্স পায় না। আজ সেই পরীক্ষার রেজাল্ট বেরোবে।

বিছানায় শুয়ে সুরজকে দেখল চন্দন। নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছে। সুরজের জীবনের মোটো খুব সিম্পল। হাউসজব শেষ করে সে মুম্বই ফিরে যাবে। প্রাইভেট মেডিকাল কলেজে পোস্ট গ্র্যাজুয়েশনের সিট কিনতে পাওয়া যায়। সুরজের বাবা-মা দুজনেই ডাক্তার। বিশাল নার্সিংহোম আছে। সুরজের ভবিষ্যত সুরক্ষিত। যে ক’দিন বাংলায় রইল, আরামসে রইল। মদ-মেয়েছেলে-পলিটিক্স নিয়ে বিন্দাস লাইফস্টাইল লিড করল। এবার মুম্বই ফিরে ‘ঘরেলু লড়কি’ বিয়ে করে থিতু হবে।

দরজায় টকটক আওয়াজ। তার মানে সঞ্জয় ফিরল। ওর অ্যাডমিশন ডে ছিল। ছেলেটা মন দিয়ে গাইনিতে হাউসজব করছে। ও জিয়াগঞ্জের বাসিন্দা। কথায় কথায় চন্দনকে বলেছে, গাইনিতে হাউসজব করে জিয়াগঞ্জে এমটিপি ক্লিনিক খুলে বসবে। একটা বাড়ি, একটা গাড়ি, একটা বউ, দুটো বাচ্চা—জীবনে আর কিছু চায় না।

সবাই নিজেকে গুছিয়ে নিচ্ছে। শুধু চন্দনই রাডারহীন জাহাজ। আজ সকাল তার জন্য কোনও নতুন দিশা নিয়ে আসবে কি? দেখা যাক! বিছানা থেকে উঠে দরজা খুলল চন্দন।

সঞ্জয় নয়। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে প্রবাল, দীপ, আর সবুজ। প্রবাল চন্দনকে হিড়হিড় করে টেনে বাইরে বার করল। বলল, ‘সুরজ ঘুমোচ্ছে বলে রুমে ঢুকে হুজ্জুত করলাম না। চল শালা! খাওয়াবি চল।’

‘খাওয়াব? কেন?’ চন্দন অবাক।

‘তুই শালা প্রথমবারেই পিজিআই ক্র্যাক করেছিস! র‌্যাঙ্ক হয়েছে চোদ্দ। আমরা সকাল থেকে নেট খুলে বসেছিলাম।’ হুঙ্কার ছাড়ে দীপ।

‘চোদ্দ?’ জানতে চায় চন্দন। নিজেকে প্রশ্ন করে, ‘এক হল না কেন?’

‘হ্যাঁ। তোর চোদ্দ। সবুজের একশো পাঁচ, প্রবালের একশো আটচল্লিশ আর আমার দুশো কুড়ি। আমি বোধ হয় চান্স পাব না। তবে নো বিগ ডিল। প্রথমবার ক্র্যাক করেছি মানে ছ’মাস গাঁতিয়ে পড়লে আরও ভালো র‌্যাঙ্ক করব।’

আড়চোখে তিনশো চোদ্দ নম্বর ঘরের দিকে তাকায় চন্দন। আধখোলা দরজা দিয়ে দেখা যাচ্ছে অভি মাথা নীচু করে ক্র্যাকপিজি-র বই খুলে বসে রয়েছে। মনে মনে হাসে চন্দন। ইশপের গল্পে খরগোশ আর কচ্ছপের দৌড়ে কচ্ছপ জিতেছিল। তবে ওটা গল্প। বাস্তবে কচ্ছপ জেতে না।

বারমুডা আর টি-শার্ট পরে চারজনে দাঁড়ে গিয়ে বসল। চা খেতে খেতে উত্তেজিত আলোচনা শুরু হল কাউন্সেলিং নিয়ে। পিজিআই-এর ওয়েবসাইটে বলেছে, কাউন্সেলিং আগামী শুক্রবার। আজ মঙ্গলবার। বৃহস্পতিবার রাতে চণ্ডীগড় পৌঁছতে হলে বুধবার সকালে ট্রেনে উঠতে হবে। এত লেট নোটিসে টিকিট পাওয়া যাবে তো? সবুজ সামান্য ভেবে বলল, ‘আমি বলতেই পারতাম, প্লেনে বেরিয়ে যাই। কিন্তু সবার কথা ভেবে সেটা বলতে পারছি না।’

‘তুই কি আমার কথা বলছিস?’ ভাঁড়ে চুমুক দিয়ে চন্দন বলে, ‘হতে পারে আমি চাষার ছেলে আর তুই ত্রিপুরার রাজপরিবারের সন্তান, কিন্তু এখন দুজনেই সমান স্টাইপেন্ড পাই। ওই টাকায় প্লেনের যাতায়াত ভাড়া হয়ে যাবে। তুই প্লেনের টিকিট বুক কর। আমি এর মধ্যে এদিককার কাজকম্মো গুটিয়ে আনি।’

‘কাজকম্মো বলতে?’ জানতে চায় দীপ।

‘এনএইচকিউ ছাড়তে হবে। হোস্টেলের কশান মানি ফেরত নিতে হবে। লাইব্রেরির মেম্বারশিপ ছেড়ে কশান মানি ফেরত নিতে হবে। কলেজ অফিস থেকে মেডিকাল রেজিস্ট্রেশান নম্বর তুলতে হবে। বাড়ি ফিরে সবার সঙ্গে একবার দেখা করতে হবে। এখানকার বন্ধুবান্ধব আর টিচারদের সঙ্গেও একবার হাই-হ্যালো করতে হবে।’

‘কলকাতার নোঙর তুলছিস। তাই তো?’

‘হ্যাঁ।’

‘চণ্ডীগড়ে নোঙর ফেলবি?’

‘হ্যাঁ। আগামী তিন বছরের জন্য।’

‘তারপর?’

‘কলকাতায় ফিরে বৃন্দার সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে আবার পড়তে বসব। তবে সেই পড়াটা বিলেত যাবার জন্য।’

‘সমর সেন বলেছেন, একে বলে, “পুরুষাঙ্গ বাঁধা দিয়ে বিলেত যাত্রা।” ’

‘সমর সেনটা আবার কে?’ দীপকে ধাওয়া করে চন্দন। দীপ দৌড়তে দৌড়তে ফরেনসিক ডিপার্টমেন্টের দিকে পালায়। মাঝরাস্তায় তাকে ধরে ফেলে চন্দন। কলার ধরে হিড়হিড় করে দাঁড়ে টেনে আনতে আনতে হঠাৎ মনে পড়ে যায়, এই সেই স্পট, যেখানে তপন চৌধুরী খুন হয়েছিলেন।

তপন চৌধুরী!

চন্দনের মুঠো আলগা হয়ে যায়। দীপ সুযোগ পেয়ে কলার ছাড়িয়ে আবার দাঁড়ে গিয়ে বসেছে। সবুজ চায়ের দাম মেটাচ্ছে। চণ্ডীগড়ের কাউন্সেলিং-এ কে কোন সাবজেক্ট বাছবে তাই নিয়ে তিনজনে আলোচনা করছে।

চন্দনের কানে কিছু ঢুকছে না। তার মাথায় স্লো মোশানে তৈরি হচ্ছে খণ্ডচিত্র। তপন চৌধুরীর সঙ্গে আলাপ ও বন্ধুতা। তপন তাকে ছেলের মতো ভালোবাসতেন। নিজের ছেলে আর চন্দন সমবয়সি—এই কথা বারবার বলেছেন। তারপর এল নমিনেশান পেপার জমা দেওয়ার সেই ভয়ংকর দিন। চন্দনকে বাঁচাতে গিয়ে মারা গেলেন তপন! এইখানে, ঠিক এই স্পটে রক্তের পুকুরের মধ্যে শুয়ে একটু একটু করে মরে গিয়েছিলেন। বউ আর ছেলেকে অকূল পাথারে ফেলে।

এখনও কি এখানে রক্ত লেগে আছে? চন্দন জানতে চায় না। অতীত মানে ভূত। চন্দনের ভূতের ভয় নেই। সে বর্তমানে বেঁচে থাকে। দ্রুত রাস্তাটুকু পেরিয়ে দাঁড়ে বসে প্রবাল আর সবুজের সঙ্গে পিজিআই দিয়ে আলোচনায় মেতে ওঠে।

.

সুরজ ঘুম থেকে উঠে ব্রাশ করে, ব্রেকফাস্ট সেরে রেডি। ওয়ার্ডে যাওয়ার আগে চন্দনের রেজাল্ট শুনে বলল, ‘কনগ্র্যাচুলেশান্‌স। কলকাতায় ডাক্তারি পড়াশুনো বহুকাল উঠে গেছে। ট্রেনিং-এর নামগন্ধ নেই। যা শেখার নিজেকে শিখতে হয়। পিজিআই অন্য জিনিস। তিন বছর এমন খাটাবে যে ‘বাপ’ বলার সময় পাবি না। ইট্‌স ট্রায়াল বাই ফায়ার। ফর নেক্সট থ্রি ইয়ারস দিনে দু’ঘণ্টা ঘুম আর বাইশ ঘণ্টা কাজ করতে হবে।’

চন্দন বলল, ‘ঢুকতে কষ্ট, ঢুকে কষ্ট, বেরোতে কষ্ট, বেরিয়ে কষ্ট। কী বল তো?’

সুরজ ফিচেল হেসে বলল, ‘এই প্রশ্নটা কলেজে ঢোকার প্রথম দিন অভিকে করা হয়েছিল। এত বছর ধরে কষ্ট পেয়ে প্রথম তিনটে ধাপ পেরোলাম। এবার চার নম্বর ধাপ শুরু।’ তারপর রুম থেকে বেরিয়ে গেল।

চন্দন চান করতে গেল। সারা দিন ধরে একগাদা অফিসিয়াল কাজ চুকিয়ে বিকেল পাঁচটা নাগাদ নতুনগ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা দিল। আজ রাতটা ওখানে কাটিয়ে কাল ভোরবেলা ফিরবে। সবুজ ফোন করে বলে দিয়েছে, ট্রেনের টিকিট পাওয়া যায়নি। প্লেনের টিকিট কাটতে হয়েছে। আগামিকাল বিকেলে উড়ান।

আবাসবাড়ি পৌঁছে চন্দন দেখল নতুনগ্রামে অদ্ভুত এক সংকট দেখা দিয়েছে। এখানকার জনগোষ্ঠীর একটা বড় অংশ মায়াকমে ইনভেস্ট করেছিল। দিনমজুর, ভাগচাষি, গৃহবধূ—সবাই ডেলি স্কিমে টাকা জমা করত। এজেন্টের সংখ্যা কম নয়। তারা স্টেশনের বেঞ্চিতে, পাড়ার মোড়ের চায়ের দোকানে, সেলুনে, বা ইটভাটার বাইরে বসে থাকে। টাকা জমা দাও, বইয়ে সই বা টিপছাপ দাও— ব্যস! তোমার দায়িত্ব শেষ। নতুনগ্রাম এবং বাঁজাপলাশ গ্রামের লোকজন দু’বছরে টাকা ডবল হওয়ার আশায় খুশি ছিল। তা ছাড়া রাজ্যে নতুন সরকার এসেছে। এখানকার নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি শক্তিধর মাইতি বলেছে যে নবযুগ সরকার মায়াকমের সঙ্গে আছে। মায়াকম বনেদি বাঙালি প্রতিষ্ঠান। নিশ্চিন্তে বিনিয়োগ করা যায়।

হৈমবতী আর বিবস্বান জেলে। শক্তিধর ‘মায়াকম নিপাত যাক’ জিগির তুলে নতুনগ্রাম কাঁপাচ্ছেন। সঙ্গে অনুগত কয়েকজন চামচা। নতুনগ্রামের অসহায় গরিবগুর্বো মানুষগুলো কোথায় যাবে বুঝতে না পেরে চড়াও হচ্ছে এজেন্টদের বাড়ি। তিনজন এজেন্ট বেপাত্তা। দু’জন আত্মহত্যা করেছে। এই পরিস্থিতিতে চন্দনের বাড়ি ফেরা কেউ খেয়ালও করল না।

পবন বরাবরই চিটফান্ডের বিপক্ষে। যখন জনমোর্চা সরকার ছিল, তখনও তিনি এর বিরোধিতা করেছেন। পন্‌জি স্কিমের উৎপত্তি; পৃথিবীব্যাপী তার উত্থান-পতন ও নতুন নতুন রূপে ফিরে আসা নিয়ে বেলাকূল-এ আর্টিক্‌ল লিখেছেন। তিনি নতুনগ্রামের এই ক্রাইসিসের মধ্যে নেই। তিনি ব্যস্ত বেলাকূলের এক্সপ্যানসন নিয়ে। আবাসবাড়ির গায়ে নতুন দুটো ঘর করেছেন। বাইরেটা আর পাঁচটা গ্রামের বাড়ির মতো। ভিতরটা আধুনিক। শহুরে অফিস ঘরের মতো। কম্পিউটার, এসি, কিউবিক্‌ল, আধুনিক ডিজাইনের চেয়ার। একটা ঘর এডিটোরিয়াল টিমের জন্য। অন্য ঘরের কাজ এখনও শেষ হয়নি। সেখানে মার্কেটিং ও অ্যাড টিম বসবে। অতিথি আপ্যায়নের জন্য একটা কোণ নির্দিষ্ট হয়েছে।

বাড়ি ঢোকা ইস্তক চন্দন দেখে গেল পবন ভয়ংকর উত্তেজিত হয়ে মোবাইলে বকবক করছেন। আজ সকাল, বেঙ্গল নিউজ, স্কুপ চ্যানেল, উইকেন্ড, চিটফান্ড, তিনমাস বেতন বন্ধ—এই হল আলোচনার বিষয়। সারা পশ্চিমবঙ্গ এই বিষয় নিয়েই চিন্তিত। চন্দন মাথা না ঘামিয়ে পারুলের কাছে গেল।

পারুল লুচি ভাজার তোড়জোড় করছেন। চন্দনকে দেখে বললেন, ‘বাঁধন কাটার আগে আমাদের কথা মনে পড়ে, তাই না?’

চন্দন উত্তর দিল না।

পারুল বললেন, ‘তুই আরও রোগা হয়েছিস? না আরও লম্বা হয়েছিস?’

চন্দন মুচকি হেসে বলল, ‘আরও কালো হয়েছি।’

‘যাঃ!’ মুখে আঁচল দিলেন পারুল। হাসছেন না কাঁদছেন বোঝা দায়। নাক টেনে বললেন, ‘বাঁজাপলাশে গিয়ে দাদা-বউদির সঙ্গে দেখা করে আয়। ওদের মনমেজাজ ভালো নেই। মায়াকমে টাকা রেখেছিল। ওদের সব টাকা মায়া হয়ে গেছে।’

‘দাদা-বউদির টাকাও গেছে?’ দ্রুত আবাসবাড়ি থেকে বেরোয় চন্দন। সন্ধে একটু একটু করে রাতের দিকে চলছে। চারপাশে অন্ধকার নেমে আসছে দ্রুত। মেচেদা-নতুনগ্রাম হাইওয়ে দিয়ে সাঁইসাঁই করে চলে যাচ্ছে দূরপাল্লার বাস। বাতাসে বালি উড়ছে।

বাঁজাপলাশ গ্রামের মুখে এসে থমকাল চন্দন। পলাশ গাছের নীচে কিছু একটা হচ্ছে। হ্যাজাকের আলোয় জায়গাটা উজ্জ্বল। আর এগোল না চন্দন। ক্যাশুরিনা গাছের পিছনে দাঁড়িয়ে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করল।

কিছুক্ষণ দাঁড়াতেই বিষয়টা পরিষ্কার হল। চন্দন অবাক হয়ে দেখল, জোয়াকিমরা গোল হয়ে বসে মিটিং করছে। গোলের মাঝে একটা নড়বড়ে বেঞ্চি আর তিনটে চেয়ার পাতা। বসে রয়েছে পঞ্চায়েত প্রধান মাইকেল ধীবর, স্ত্রী জুলি ধীবর এবং নন্দন। মানদা মাইকে বক্তৃতা করছে।

‘আমাদের সবার টাকা হাপিশ হয়ে গেছে। টাকা মানে সঞ্চয়। টাকা আমাদের স্ত্রী-ধন।’ চিৎকার করছে মানদা, ‘টাকা কীভাবে হাপিশ করা হয়েছে? আমাদের বিশ্বাস অর্জন করে। আমাদের ভুল বুঝিয়ে। তোমরা বলবে, “ভুল বুঝেছ কেন?” আমি বলব, “এখানকার এমএলএ বলেছে মায়াকমে টাকা রাখা যায়।” আমরা এমএলএ-কে বিশ্বাস করেছিলাম। ভাবতে পারিনি যে উনি মিথ্যে কথা বলছেন। রাজ্য সরকার একটা কোম্পানি। আমাদের ভোটে সেই কোম্পানি চলে। মায়াকমও একটা কোম্পানি। সেটা চলে মালিকের ইচ্ছায়। এই দুই কোম্পানি এক হয়ে গেলে আমরা কোথায় যাব?’

চন্দন খেয়াল করে তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন শক্তিধর মাইতি। চন্দন জিজ্ঞাসা করে, ‘এই সময়ে এখানে?’

শক্তিধর উত্তর দিলেন না। চন্দন লক্ষ্য করল শক্তিধরের পিছনে, ক্যাশুরিনা গাছের আড়ালে জড়ো হয়েছে জনাবিশেক মানুষ। কড়া দিশি মদের গন্ধে নাক ঝাঁঝাঁ করছে।

মানদা বলছে, ‘জনমোর্চা সরকার তোমাদের জমি কেড়ে নিয়েছিল। তখন শক্তিধর মাইতি পাশে দাঁড়িয়েছিল। তোমাদের কাঁধে কাঁধ দিয়ে লড়াই করেছিল। আমি যে বাড়ির মেয়ে, সে বাড়ির সবাই জনমোর্চাকে ভোট দেয়। আমি একা গিয়ে নবযুগ পার্টির প্রার্থীকে ভোট দিয়ে এসেছিলাম। আমি চেয়েছিলাম তিরিশ বছরের গুন্ডারাজ শেষ হোক। তোমার-আমার ভোটে জনমোর্চা সরকার বিদেয় হয়েছে। এসেছে নবযুগ সরকার। এরা এসেই আমাদের টাকা লুট করে নিল। জনমোর্চা কোম্পানি জমি নিতে চেয়েছিল। আমরা দিইনি। নবযুগ কোম্পানি আমাদের টাকা নিয়েছে। এদেরও ছাড়ব না। গলায় গামছা দিয়ে ওই টাকা আদায় করব।’

চন্দন দেখল, শক্তিধরের পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা নবযুগের ক্যাডারদের হাতে লাঠি, দা, সাইকেলের চেন, ওয়ান-শাটার, বোম আর কাতান। এত অস্ত্র দিয়ে শ’খানেক লোক মেরে ফেলা যাবে।

‘বাড়ি যাও হিরো।’ চন্দনের ঘাড়ে হাত রেখে শান্ত কণ্ঠে বলেন শক্তিধর, ‘বাবলু চৌধুরীকে যে ভাবে ভুলে গেছ, সে ভাবে আজকের দিনটাও ভুলে যাও। পোস্ট গ্র্যাজুয়েশান করে বাংলায় ফিরলে তোমার ধার আমি শোধ করে দেব।’

‘হ্যাঁ শক্তিকাকু।’ দ্রুত পিছিয়ে আসে চন্দন। এখানে আর এক মুহূর্ত থাকার মানে হয় না। ইনফ্যাক্ট, আজ রাতেই নতুনগ্রাম ছাড়লে ভালো হত। কিন্তু তা হওয়ার নয়। কাল ভোর-ভোর পালাতে হবে। আপাতত আবাসবাড়ি ফিরে মায়ের হাতের গরম গরম লুচি খাওয়া যাক।

অন্ধকার রাস্তা দিয়ে একা হাঁটতে হাঁটতে চন্দন ভাবল, নন্দনকে সাবধান করে দেওয়া উচিত। নন্দন তাকে বড্ড ভালোবাসে। ওকে বলা উচিত যে শক্তিধর আর তার সাঙ্গোপাঙ্গরা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ওদের ঘাড়ের পিছনে শ্বাস ফেলছে।

বললেও দাদা বা বউদি শুনবে কি? মানদা যা জোরে চেঁচাচ্ছে, থামবে বলে মনে হয় না। দাদার উপহার দেওয়া মোবাইল হাতে নেয় চন্দন। কনট্যাক্ট লিস্ট থেকে দাদার নাম বার করতে গিয়ে দোনামনা করে।

এই সময় খুব জোরে একটা বোমা ফাটল। কান ফাটানো আওয়াজে চমকে উঠে পিছনে তাকিয়ে চন্দন দেখল, অন্ধকারে কিছু দেখা যাচ্ছে না। শুধু লোকজনের কোলাহল শোনা যাচ্ছে। হঠাৎ মাইকে মানদার গলা শোনা গেল, ‘বন্ধুরা, ওরা ভয় দেখাতে চাইছে। আপনারা পালাবেন না।’ এবার ফট করে ওয়ান শটারের আওয়াজ এল। আবার চিৎকার চেঁচামাচি। আবার বোমা ফাটার শব্দ। লোকজনের চিৎকার ক্রমে বাড়ছে।

নন্দনের দেওয়া মোবাইল পকেটে ভরে চন্দন। দ্রুত আবাসবাড়ির দিকে এগোয়। নিজের লক্ষ্যে অবিচল থাকতে হবে। এইসব ছোটখাটো চিত্তবিক্ষেপে বিচলিত হলে চলবে না। বাড়ি ফিরে খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়তে হবে। বাঁজাপলাশে মিটিং হচ্ছে, সেই মিটিং-এ নন্দন-মানদা আছে, মিটিং–এ শক্তিধরের দলবল বোমাবাজি করেছে, এই খবর পবন-পারুলকে জানানো যাবে না। তা হলে আজ রাতেই কান্নাকাটি, থানা-পুলিশ, হাসপাতাল-মর্গ, অভিযোগ-দোষারোপ, খবরের কাগজ-টেলিভিশনের রুটিন শুরু হবে।

ওসব আর চন্দনের জন্য নয়। দাদার দেওয়া মোবাইলের কনট্যাক্ট লিস্ট থেকে দাদার ফোন নম্বর ডিলিট করে দেয় সে।

.

সকালবেলা এনএইচকিউ ফিরে প্রথম কাজ ব্যাগ গোছানো। একটা ট্রাঙ্ক আর একটা মুড়ির টিন নিয়ে নতুনগ্রাম থেকে কলকাতায় এসেছিল চন্দন। ট্রাঙ্কটা এখনও রয়েছে। কালো ট্রাঙ্কের গায়ে পবন সাদা তেলরং দিয়ে লিখে দিয়েছিলেন, ‘চন্দন সরকার। ইন্ডিয়ান মেডিকাল কলেজ।’ দু’পাশে দুটো গোলাপ ফুল আঁকা ছিল। অনেক বছর ব্যবহার না করার ফলে ট্রাঙ্কে মরচে ধরে গেছে। সেটা ফেলে দিতে গিয়ে কী ভেবে, মিনি মেসের ঠাকুরের হাতে তুলে দিল চন্দন। থাক! কেউ একটা ব্যবহার করুক।

বিদেশি কোম্পানির ট্রলি ব্যাগ কিনেছে সে। তাতে ঢোকাল গোটা চারেক জিন্‌স। লেভাইস, পেপে এবং অন্যান্য ব্র্যান্ড। গোটা চারেক শার্টও ঢোকাল। প্যাস্টেল শেডের ভার্টিকাল স্ট্রাইপস। অপটিকাল ইলিউশানের কারণে অল্প হলেও লম্বা লাগবে। থ্রি-কোয়ার্টার কারগো, গোলগলা টি-শার্ট, শেভিং কিট, আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র ট্রলিতে ঢুকিয়ে মাথা ঠান্ডা হল। অ্যাকাডেমিক ফাইলটা বাইরে থাক। ওটা হ্যান্ড-লাগেজ হিসেবে ক্যারি করবে। এখন কাজ হল এটিএম থেকে টাকা তোলা আর বৃন্দার সঙ্গে যোগাযোগ করা। মেয়েটাকে ভরসা দিতে হবে যে সে মাত্র তিন বছরের জন্য যাচ্ছে। চেষ্টা করবে প্রতি বছরে একবার কলকাতা ফিরতে। তা ছাড়া এখন লং ডিসট্যান্স রিলেশানশিপ মেনটেইন করার হাজারটা উপায় আছে। বৃন্দাকে এটাও বোঝাতে হবে যে হাউসস্টাফশিপ করার পাশাপাশি ও যেন পোস্ট গ্র্যাজুয়েশানের প্রিপারেশানও চালিয়ে যায়। গাইনিতে হাউসজব করছে করুক, চন্দন ওকে মেডিসিনের লাইনে পাঠাবেই।

নতুনগ্রামের কথা মনে পড়ে চন্দনের। গতকাল রাতে পবন বা পারুল কোনও খবর পাননি। সকাল হতেই হইচই শুরু হয়ে গিয়েছিল। বাঁজাপলাশ গাছের নীচে পাঁচটা ডেডবডি পড়ে আছে। চারজন ছেলে আর একটা মেয়ে। ছেলেগুলো বামন হলেও মেয়েটা নয়। মেয়েটার কাপড়ের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে মরে যাওয়ার আগে শারীরিক নির্যাতন সহ্য করেছে।

মৃত্যু ও গণধর্ষণের খবর এখন জলভাত। লোকে অবাক হয় না। পবন সাংবাদিক সুলভ নো-ননসেন্স মুখ করে বললেন, ‘শুনলাম ডেডবডিগুলোর পাশে অনেক পলাশ ফুল পড়ে রয়েছে। এটা আবার কী কায়দা? লালরঙা ফুল ফেলে রেখে জেনোসাইডকে পলিটিকাল কালার দিচ্ছে না কি?’

‘এটা পলাশ ফুলের সময় নয়!’ বিরক্ত হয়ে বলেন পারুল। ‘দ্যাখো! ওগুলো হয় তো প্লাস্টিকের ফুল।’

‘তাও যদি হয়, তাহলে তার ব্যাখ্যা কী?’ মোটরবাইক নিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিলেন পবন। বাইকটি পুরস্কারের টাকায় কেনা। বেলাকূলের কাজে ব্যবহৃত হয়।

পারুল একটু আগে ফোন করে চন্দনকে জানিয়েছেন মৃতদেহও চিহ্নিত করা যায়নি। শরীরগুলো বোমার আঘাতে এতটাই বিকৃত যে মুখ দেখে চেনার উপায় নেই। দেহগুলো রক্তে ভাসাভাসি।

‘মরার আগে সবাই খুব কষ্ট পেয়েছে।’ পারুল কাঁদোকাঁদো গলায় চন্দনকে বললেন, ‘তোর দাদা-বউদি কোথায় রে?’

‘দাদা ও সব ঝামেলায় থাকে না। গোলমালের আগেই বউদিকে নিয়ে পালিয়েছে,’ অক্লেশে মিথ্যে বলে চন্দন।

‘আমারও তাই মনে হয়।’ থেমে থেমে বলেন পারুল। ‘তোর বাবা অনেক খোঁজাখুঁজি করেছে। পুলিশও খুঁজেছে। কিন্তু বাঁজাপলাশ গ্রাম এখন সত্যি বাঁজা। একজন বামনও আর ওখানে নেই। ঘরবাড়ি ছেড়ে উড়িষ্যা বর্ডারের দিকে পালিয়ে গেছে। বালিতে অনেক পুতুল পুতুল পায়ের ছাপ পাওয়া গেছে। নন্দনও ওখানেই আছে, না রে?’

পারুল কাঁদছেন। চন্দন বলে, ‘হ্যাঁ মা। দাদা খুব ধুরন্ধর। ও ঠিক সময় কেটে পড়ে,’ মাকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে একটুও গলা কাঁপছে না চন্দনের। দাদা-বউদি বেঁচে আছে না মারা গেছে— জানে না সে।

দুপুর তিনটে বাজে। ফ্লাইট রাত সাড়ে নটায়। সবুজ বলেছে দু’ঘণ্টা আগে পৌঁছতে হবে। তার মানে সাড়ে সাতটায় দমদম। ব্যাক ক্যালকুলেশান করে চন্দন। সাড়ে ছ’টায় হোস্টেল থেকে বেরোতে হবে। অর্থাৎ হাতে আর সাড়ে তিন ঘণ্টা সময় আছে।

স্নান খাওয়া সেরে এটিএম থেকে দশ হাজার টাকা তুলল সে। এতেই হয়ে যাবে। আরও লাগলে চণ্ডীগড়ের এটিএম থেকে তোলা যেবে। এনএইচকিউ ফিরে এক চোট ঘুম দিল। সন্ধে সাড়ে পাঁচটায় ঘুম থেকে উঠে স্নান সেরে নতুন জিন্‌স আর টি-শার্ট গলিয়ে লেডি আর্চার্স হোস্টেলের দিকে যেতে যেতে বৃন্দাকে ফোন করল। এতক্ষণে ওর ওয়ার্ড থেকে চলে আসার কথা।

‘বল।’ রিং হতে না হতেই বৃন্দা বলল।

‘তোর সঙ্গে একটা দরকার ছিল।’

‘না।’ শান্ত গলায় বলে বৃন্দা।

চন্দনের মনে পড়ে যায় অনেক বছর আগের এক কথোপকথন। চন্দন তার মনের কথা বলতে চেয়েছিল। বৃন্দা বলেছিল, ‘না।’ আজ এত বছর বাদে আবার কোন খেলা খেলছে মেয়েটা?

‘না মানে? আমি তোকে কী বলব তুই জানিস?’

‘পিজিআইতে চান্স পাওয়ার জন্য ট্রিট দিবি। তাই তো? আমি এখন ওয়েট রিডিউস করছি। একদম মেপেজুপে খাওয়া। নো ট্রিট।’ ফোনে দুষ্টুমির হাসি হাসে বৃন্দা।

‘তুই কোথায়?’ জানতে চায় চন্দন। ‘আমি এখন তোদের হোস্টেলের সামনে।’

‘গেস্ট রুমে বোস। আমি আসছি।’ ফোন কাটে বৃন্দা। চন্দন লেডি আর্চার্স হোস্টেলে ঢোকে। সেই লাল বাড়ি, সেই হলুদ বর্ডার, সেই সবুজ দরজা। বাঁদিকের সুপারিনটেনডেন্টের দরজা খুলে বেরোলেন রিনা দত্ত। তিনকোনা ফ্রেমের লাল চশমা ঠিক করে চন্দনকে দেখে বললেন, ‘তুই পিজিআইতে চান্স পেয়েছিস?’

বাতাসে রামের গন্ধ। নাক টেনে চন্দন বলল, ‘হ্যাঁ। আজই যাচ্ছি। আপনাকে কে বলল ম্যাডাম?’

‘থার্ড ইয়ারের ছেলেরা। তোদের ব্যাচের ছেলেমেয়েদের মধ্যে তুই, প্রবাল, দীপ আর সবুজ সবার আগে পোস্ট গ্র্যাজুয়েশানে চান্স পেলি। তাই তো?’

‘দীপ বোধ হয় চান্স পাবে না। ওর র‌্যাঙ্ক অনেক পরে। কিন্তু আপনি এত ডিটেলে সব খবর রাখেন?’

‘তোদের সাফল্যের খবর বাতাসে উড়ছে। বেস্ট অব লাক। এনিওয়ে, আমি বেরোচ্ছি। একটা ওয়াটার বাথ কিনতে হবে।’

‘ওয়াটার বাথ? কেন ম্যাডাম?’

‘তোদের পুশকিনদার বেডসোর ডেভেলপ করেছে।’ নিজের কোয়ার্টারের দিকে তর্জনী দেখান রিনা। ‘কোমরের নীচের দিকটায়। আস্তে আস্তে বড় হচ্ছে। লোকটা আর বেশিদিন নেই, জানিস চন্দন। ও চলে গেলেই আমার মুক্তি। নেতাদের তৈলমর্দন করে ইন্ডিয়ান মেডিকাল কলেজে আর থাকতে হবে না। সরকার যে চুলোয় পোস্টিং দেবে, সেই চুলোয় চলে যাব।’

রিনার দিকে তাকিয়ে চন্দন কোনও মতে বলে, ‘ঠিক আছে ম্যাডাম।’

‘বৃন্দাকে টাটা বল। আমি চললাম।’ টলতে টলতে লেডি আর্চার্স হোস্টেলের গেট পেরিয়ে যান রিনা। বাতাসে হাল্কা রাম আর হালকা ফরম্যালিনের গন্ধ। দায়বদ্ধতা, প্রেম, ভালোবাসা, দায়িত্বের গন্ধ মিশে আছে। মিশে আছে ব্যর্থতার গন্ধও। নাকি এটা আস্ত জীবনের গন্ধ? জানে না চন্দন।

আপনমনে ঘাড় নাড়ে সে। যাবতীয় দড়িদড়া কাটার কাজ শেষ। মোটা একটা কাছি নিজের শরীরে বেঁধেছে। কাছির অন্যদিক বৃন্দার হাতে তুলে দিতে পারলেই অজানা সাগরে ঝাঁপ দেবে। রাজকন্যাকে প্রেমের অভিনয়ে বেঁধে ফেলে আগামী তিন বছরের জন্য পড়াশুনো করা ছাড়া এই মুহূর্তে তার অন্য কোনও অ্যাম্বিশান নেই।

বিকল পে ফোনের বাক্সের পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে বৃন্দা। পরনে নীল জিন্‌স আর সাদা টপ। পায়ে গোলাপি ফ্লিপফ্লপ। চুলে টপনট করা। চন্দনকে দেখে বলল, ‘কনগ্র্যাচুলেশান্‌স।’

‘শুধু কনগ্র্যাচুলেশন্‌স। শুকনো মুখে? আর কিছু পাব না?’ ফিচেল হাসি চন্দনের ঠোঁটের কোণে।

‘আর কী চাস?’

‘বলতে হবে?’ বৃন্দার দিকে এক পা এগোয় চন্দন, ‘নাকি জোর করে নিতে হবে?’

‘না।’ এক ধাপ গলা তুলেছে বৃন্দা।

‘কী না? তুই কি জানিস আমি কী চাই?’

‘না।’

‘আবার না? এর মানে কী?’ চন্দন অবাক।

‘তোর সব প্রশ্নের জন্যে আমার তরফে একটাই উত্তর। না। পড়াশুনো মন দিয়ে কর, সফল হ, জীবনে উন্নতি কর। কিন্তু আমার কাছে আর আসিস না।’

চন্দন অবাক চোখে বৃন্দাকে দেখে। বৃন্দার সঙ্গে নিজের সম্পর্ককে শক্ত ভিতের ওপরে দাঁড় করাতে সে এখন লেডি আর্চার্স হোস্টেলে এসেছে। আর বৃন্দা তাকে রিফিউজ করছে? কেন? কিছু বুঝতে না পেরে চন্দন বলে, ‘তুই কী বলতে চাইছিস?’

‘তোর আজ আনন্দের দিন চন্দন। এই দিনটায় অন্য চিন্তা মনে স্থান দিস না। যা বললাম, তুই শুনেছিস। এবার পালা। ফ্লাইট ক’টার সময়?’ মাছি তাড়াবার মতো হাত নাড়ছে বৃন্দা।

বৃন্দার হাতের তালু শক্ত করে চেপে ধরে রূঢ়ভাবে চন্দন বলে, ‘এইভাবে আমার সঙ্গে কেউ কথা বলার সাহস দেখায় না। তুই কোন সাহসে এইভাবে কথা বলছিস?’

‘হাত ছাড়।’ শান্ত গলায় বলে বৃন্দা।

‘কোন সাহসে এইভাবে কথা বলছিস?’ হাতে চাপ দিয়ে চিৎকার করে চন্দন।

‘চ্যাঁচাস না।’ সপাটে চন্দনের ডান গালে থাপ্পড় কষায় বৃন্দা। থাপ্পড়ের শব্দ ফাঁকা গেস্টরুমে প্রতিদ্বনি হয়। বৃন্দা হিসহিস করে বলে, ‘আমি যদি এখন চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলি যে তুই, সুরজ আর ঋষিতা মিলে এনএইচকিউ-এর রুমে গ্রুপ সেক্স করেছিস, শুনতে ভালো লাগবে?’

চন্দন চুপ। এখনও সে বৃন্দার হাত ধরে আছে। নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে চন্দনের বাঁ গালে আর একটা থাপ্পড় কষায় বৃন্দা। ‘আমি যদি চেঁচিয়ে বলি, তোর নজর ছিল আমার বাবার চেম্বার আর শান্তিধামের দিকে, আমি ছিলাম উপলক্ষ্য, শুনতে ভালো লাগবে?’

গেস্টরুমে এসে দাঁড়িয়েছে ফুলমতিয়া। দরজা দিয়ে উঁকি মারছে জুনিয়র মেয়েরা। এসে গেছেন রিনা দত্তও। চন্দনের ডান গালে আবার একটা থাপ্পড় কষিয়ে বৃন্দা বলে, ‘আমি যদি চেঁচিয়ে বলি, অভিজ্ঞানের নামে মিথ্যে কথা রটিয়ে তুই আমাকে ওর থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে গেছিস, তাহলে শুনতে ভালো লাগবে? বল?’

চন্দনের গাল জ্বালা করছে। অপমানে মাথা ঝাঁঝাঁ করছে। মাথা নীচু করে সে বলে, ‘আমি যাচ্ছি।’

‘কোথায় যাচ্ছিস?’ চন্দনের নতুন টিশার্টের কলার চেপে ধরেছে বৃন্দা। ‘আমি যদি চেঁচিয়ে বলি তুই আমাকে গেস্টরুমে মলেস্ট করার চেষ্টা করছিলি, আমি যদি পুলিশে খবর দিই, তাহলে নন বেলেব্‌ল অফেন্সে তোর জেল হবে। ভালো লাগবে? চণ্ডীগড় যাওয়া ক্যানসেল, কাউন্সেলিং ক্যানসেল, পোস্ট গ্র্যাজুয়েশান করা ক্যানসেল। মেডিকাল রেজিস্ট্রেশানও ক্যানসেল। চাষার ছেলেকে গ্রামে ফিরে গিয়ে চাষবাস করতে হবে। অবশ্য যদি জেল থেকে ছাড়া পাস।’

চন্দন কেঁচোর মতো গুটিয়ে গেছে। তার চোখে মুখে ভয়। লজ্জা। অপমান। কুতকুতে চোখে এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখছে। ফুলমতিয়া হাসছে। জুনিয়র মেয়েগুলো হাসছে। রিনার ঠোঁটের কোণেও তিনকোনা হাসি ঝিকমিক করছে। সে হাসিতে ঘেন্না মিশে রয়েছে।

লজ্জা। ঘেন্না। ভয়। তিন থাকতে নয়। বৃন্দাকে এক ধাক্কা মারে চন্দন। বৃন্দা ব্যালান্স হারিয়ে পে ফোনের অচল বাক্সের ওপরে গিয়ে পড়ে। সেই সুযোগে ইঁদুরের মতো দৌড় মারে চন্দন। ফুলমতিয়া আঁচলের তলা দিয়ে, রিনা ম্যাডামের ওয়াটার বাথে ধাক্কা মেরে, জুনিয়র মেয়েগুলোর ‘হায় হায়’ ধ্বনি উপেক্ষা করে গেস্টরুম থেকে ছিটকে বেরোয়। লেডি আর্চার্স হোস্টেলের সবুজ গেট টপকে শেয়ালের মতো লেজ তুলে দৌড়োয় এনএইচকিউ-এর দিকে। হাঁফাতে হাঁফাতে তিনশো সাত নম্বর রুমে ঢুকে, ট্রলি আর অ্যাকাডেমিক ফাইল নিয়ে, রুমের চাবি সুরজের খাটে রেখে তিনশো সাত নম্বর রুম থেকে বেরোতে যায়।

উল্টো দিকে তিনশো চোদ্দো নম্বর রুমের দরজা খুলে অভি দাঁড়িয়ে। সে চন্দনকে বলল, ‘ছুপা রুস্তম!’

চমকে উঠে চন্দন বলল, ‘কেন বললি?’

মুচকি হেসে অভি বলে, ‘পিজিআই-এর জন্য। ঋষিতার জন্য নয়।’

চন্দন আবার দৌড় লাগায়। হোস্টেলে ঢোকার সময়ে সে দেখেছে যে এনএইচকিউ-এর সামনে ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে আছে। প্রবাল, দীপ, সবুজ—সবাই ট্যাক্সিতে। চন্দন ট্যাক্সির ডিকিতে ট্রলি তুলে বলল, ‘চল।’ তারপর সন্তর্পণে লেডি আর্চার্স হোস্টেলের দিকে তাকাল। তাকে ধরতে কেউ দৌড়ে আসছে না তো?

না। কেউ নেই।

দু’হাত কপালে ঠেকিয়ে নমস্কার করে চন্দন। বিদায় ইন্ডিয়ান মেডিকাল কলেজ, বিদায় কলকাতা শহর, বিদায় নতুনগ্রাম, বিদায় বাবা-মা।

অনেক বছর আগে গ্রাম থেকে শহরে এসেছিল কালোকুলো, বেঁটেখাটো যে ছেলেটা, তার বুকে ছিল ফার্স্ট হওয়ার খিদে। পড়াশুনোয় প্রথম, পরীক্ষায় প্রথম, ডাক্তারিতে প্রথম, পুত্র হিসেবে প্রথম, রাজনীতিতে প্রথম, বন্ধুতায় প্রথম। আজ সে বুঝতে পারছে—জীবনের সব খেলায় এক নম্বর হওয়া যায় না।

কী আর করা যাবে। ‘ইউ উইন সাম। ইউ লুজ সাম!’ ব্যর্থতা ভুলে সাফল্যে আরও শান দিতে হবে। সফল চিকিৎসক হতে হবে। তার ফলে যদি প্রেমহীন, বন্ধুত্বহীন, পরিবারহীন একলা জীবন কাটাতে হয়—তা হলেও ক্ষতি নেই।

এক আর একা—শব্দ দুটো খুব কাছাকাছি।

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *