৩৬. দময়ন্তী
আকাশের মুখ ভার। ঘুম থেকে উঠে জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দময়ন্তী দেখল, পূর্ব দিকে চাপচাপ মেঘ জমেছে। মোষের মতো ধূসর ও বলশালী মেঘের দল গুঁতোগুঁতি করতে করতে কলকাতার দিকে ধেয়ে আসছে। আজ প্রবল বৃষ্টি হবে।
গতকাল রাতে টেলিভিশনে আবহাওয়াবিদ বলেছিলেন, বঙ্গোপসাগরে বিশাল বড় নিম্নচাপের সৃষ্টি হয়েছে। সেই নিম্নচাপ ধীর ও নিশ্চিতভাবে ধেয়ে আসছে কলকাতার দিকে। যদি বাতাস তাকে বাংলাদেশের দিকে উড়িয়ে না নিয়ে যায়, তাহলে এই বজ্র ও বৃষ্টিগর্ভ মেঘ প্রবল বেগে আছড়ে পড়বে গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গে।
গতরাতের টিভিতে যা ছিল স্যাটেলাইট পিকচার ও ইনফোগ্রাফিক্স, তা এখন জলজ্যান্ত মেঘের স্তুপ। ওরা বাংলাদেশে না গিয়ে ঢুকে পড়েছে পশ্চিমবঙ্গে।
আজকেই ওয়েদার খারাপ হতে হল? আবহাওয়ার ডিপ্রেসন দেখে ডিপ্রেসন হয়ে যায় দময়ন্তীর। আজ রাত আটটার সময় ফ্লাইট। খারাপ আবহাওয়ার কারণে যদি বাতিল হয়ে যায়? সিসে রং-এর আকাশের দিকে তাকিয়ে দময়ন্তী আনমনে বলল,
‘বৃষ্টি পড়ে এখানে বারোমাস
এখানে মেঘ গাভীর মতো চরে
পরাঙ্মুখ সবুজ নালিঘাস
দুয়ার চেপে ধরে…’
.
কতদিন বাদে শক্তি চট্টোপাধ্যায় ফিরে এলেন? ফিরে এল বাংলা কবিতা? দময়ন্তীর মনে পড়ে না। কলেজে ঢোকার পরে নবীন বরণ উৎসবে বৃন্দা শঙ্খ ঘোষের কবিতা আউড়েছিল। আজ, এত বছর বাদে যখন কলকাতা ছাড়ছে দময়ন্তী, তখন তার মনের মধ্যে উচ্চারিত হচ্ছে অন্য এক কবির লেখা পংক্তি,
‘শুনিনি কখনো কলকাতা ছেড়ে গেছে কেউ, আর ভালো আছে।
শুনিনি কখনো কেউ সুখে গেছে কলকাতা ছাড়িয়ে…
…অনিবার্য শহর কাঁদায়
নিজেও ক্রন্দন করে একা একা আমার কলকাতা।’
.
গতকাল চন্দন চলে গেছে চণ্ডীগড়। যাওয়ার আগে এসএমএস করেছে, ‘হারামি মাগি!’ মেসেজ পেয়ে প্রথমে অবাক হয়েছিল দময়ন্তী। বিলুদা মারা যাওয়ার আগে তাকে ঠিক এই ভাষায় গালাগালি দিয়েছিল। নির্লিপ্তির চাদর জড়িয়ে থাকা দময়ন্তীর তাতে কিছু আসে যায়নি। চন্দনের কাছ থেকে মেসেজে একই গালাগালি পেয়ে খুশিই হয়েছে। গতকাল এমন একটা কিছু কাণ্ড ঘটেছে, যার জন্য চন্দন দময়ন্তীর ওপরে সাংঘাতিক খচে আছে। সেটা কী দময়ন্তী আন্দাজ করতে পারছে। সিওর হওয়ার জন্য বৃন্দাকে ফোন করা যায়। কিন্তু দময়ন্তী করবে না। আজ একবার কলেজে যাবে। তখন দেখা করে কথা বলে নেবে।
চন্দনের চিন্তা মাথা থেকে তাড়ায় দময়ন্তী। আরও অনেক বড় সমস্যা বাড়ির মধ্যে রয়েছে। শক্তিরূপা। হঠাৎ করে চাকরি চলে যাওয়ায় শক্তিরূপা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। অর্থনৈতিক সমস্যাটা বড় ইস্যু না হলেও ইস্যু। সংসার খরচের জন্য যা টাকাপয়সা লাগে তা আসে শক্তিরূপা-ড্যানিয়েলের জয়েন্ট অ্যাকাউন্ট থেকে। ড্যানিয়েলের বাঁধাধরা আয় নেই। বছরের মধ্যে এগারো মাস ব্যাংক অ্যাকাউন্টে এক নয়া পয়সা জমা পড়ে না। বারোতম মাসে এক লপ্তে তিরিশ-চল্লিশ লাখ টাকা জমা পড়ে। শক্তিরূপা তাঁর স্যালারি অ্যাকাউন্টের পুরোটা টাকাই জয়েন্ট অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করেন।
ভ্যাগ্যিস করেন। না করলে কী হত মথুরেশকে দেখলে বোঝা যায়।
মথুরেশ স্যালারি অ্যাকাউন্ট থেকে খুব কম টাকা তুলতেন। একা মানুষ। মাসে তিরিশ হাজার টাকার বেশি লাগত না। বাকি টাকা স্যালারি অ্যাকাউন্টে পড়ে থাকত। কোম্পানি উঠে যাওয়ার পরে ব্যাংকে গিয়ে দেখেন, তাঁর অ্যাকাউন্টের সব টাকা হাওয়া হয়ে গেছে।
শক্তিরূপার এখন সবসময় মুখ ভার। খাওয়ায় রুচি, জলতেষ্টা বা ঘুম নেই। মোবাইলের দিকে তাকিয়ে বসে থাকেন আর কুটকুট করে এসএমএস করেন। বোর্ড মিটিং-এ যারা তাঁর প্রধান শত্রু ছিলেন, তাঁরাই এখন কথা বলার সঙ্গী। উইকেন্ডের এডিটোরিয়াল টিমে দশজন স্টাফ। অন্যান্য বিভাগে আরও পাঁচজন। এই পনেরো জনের টিম মাঝে মধ্যে মিটিং করছে। অন্য শিল্পপতির সঙ্গে কথা বলছে। যদি আবার উইকেন্ড বার করা যায়। অন্য নামে। সবাই সাধ্যমতো কনট্যাক্ট ব্যবহার করছেন। কিন্তু রেজাল্ট এখনও পর্যন্ত জিরো।
শক্তিরূপা সারাদিন স্টাডিরুমে বসে থাকেন। ড্যানিয়েল জোরজার করলে পাঁচ মিনিটের জন্য বেরোন। আবার ফুড়ুত করে ঢুকে যান। দময়ন্তীর ভিসা হয়ে গেল, ফ্লাইটের টিকিট কাটা হয়ে গেল, অনলাইনে ফর্ম ফিল আপ করা হয়ে গেল, ইউনিভার্সিটিতে এনরোলমেন্ট হয়ে গেল, ডর্মে রুমের সংস্থান হয়ে গেল— শক্তিরূপার হেলদোল নেই।
ইস্ট লন্ডনে ড্যানিয়েলের আত্মীয়রা থাকেন। ফোনে তাঁদের সঙ্গে কথা হয়ে গেছে। ওখানে পৌঁছে দময়ন্তী তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করবে। আপ্পু আর রিপু বলেছে হিথরো এয়ারপোর্টে রিসিভ করতে আসবে। ওদের অন্য ইউনিভার্সিটি হলেও একদিনের জন্য ছুটি ম্যানেজ করেছে।
আবার নিজের চিন্তা মাথা থেকে তাড়ায় দময়ন্তী। সে চলে গেলে বুড়ো বাবা আর বেকার মায়ের কী হবে কে জানে! এত বড় গোলমহলে দুটো প্রাণী মিলে কী করবে?
ড্যানিয়েল অবশ্য দিব্যি আছেন। অপারেশান হওয়ার পরে চেহারায় বার্ধক্যের ছাপ পড়েছে। কেমোথেরাপির ফলে মাথার সব চুল উঠে গিয়েছিল। টাক মাথায় কোঁকড়া চুল গজিয়েছে। বয়স্ক মুখ আর একমাথা কোঁকড়া চুলের কম্বিনেশানে খুব কিউট দেখাচ্ছে। আঁকাআঁকিতে নতুন করে ঝাঁপিয়েছেন। সংস্কৃত মহাভারত ছড়াও কালীপ্রসন্ন সিংহ, উপেন্দ্রকিশোর, রাজশেখর বসুর মহাভারত পড়ছেন। অন্যান্য ভারতীয় ভাষায় লেখা মহাভারত, তিজন বাইয়ের ‘পাণ্ডবানি’-র ভিডিও, ‘নাথবতী অনাথবৎ’ নাটকের ভিডিও, মহাভারত বিষয়ক অজস্র অ্যাকাডেমিক টেক্সট, রেফারেন্স বই, পেপার কাটিং, জার্নাল, ম্যাগাজিনে স্টুডিও উপচে উঠেছে। দু’বেলা খাওয়ার সময় ছাড়া স্টুডিও থেকে বেরোচ্ছেন না। শক্তিরূপার সঙ্গে মহাভারত নিয়েই কথা হয়। উইকেন্ড নিয়ে কখনওই নয়।
ড্যানিয়েলের এই স্ট্যান্ডপয়েন্ট সমর্থন করে দময়ন্তী। শক্তিরূপাকে সহানুভূতি জানিয়ে লাভ নেই। উনি ওতে বিরক্ত হবেন। সম্পাদকের পদ হল ক্ষমতার পদ। প্রতিদিন অজস্র ফোন আসে। নামি লেখকরা এসএমএস করেন, ‘ইলেকশান রিফর্ম নিয়ে ভাবছি। হাজার দুয়েক শব্দের একটা রাইট আপ জমা দেব?’ কলাম লিখিয়েরা ফোন করেন, ‘এবারে একদিন দেরি হবে। একটু ম্যানেজ কোরো।’ ফ্রিলান্সাররা মেল করেন, ‘একবার লেখার সুযোগ দিন। স্যাম্পল লেখা নিয়ে আপনার সাথে দেখা করতে যাই।’
এতটা গুরুত্ব পেলে যে কোনও মানুষ বিগড়ে যাবেন। ভুলে যাবেন, গুরুত্ব পদের। তাঁর নিজের নয়। শক্তিরূপা খুবই ঠান্ডা মাথার মহিলা। তিনি কখনও ব্যক্তি শক্তিরূপা আর সম্পাদক শক্তিরূপাকে গুলিয়ে ফেলেননি। তাই পদমর্যাদা হারিয়ে কষ্ট কম হয়েছে। বুকে বেশি লেগেছে চাকরি যাওয়ার বিষয়টা। চিট ফান্ড কোম্পানির আর্থিক বদান্যতায় যে ম্যাগাজিন বেরোত, তিনি তার সম্পাদক ছিলেন। যে কোনও সাংবাদিকের কেরিয়ারে এ এক ব্ল্যাক স্পট। উইকেন্ড-এর কর্মচারী— এই পরিচয় যে কোনও সাংবাদিকের সিভিতে ব্ল্যাক স্পট।
আমজনতা দু’দিন পরে খবর জানলেও মিডিয়া জগতের লোকেরা সেদিনই জেনে গিয়েছিল। প্রথমা দু’একটা মামুলি মেসেজ। ‘সরি টু হিয়ার দ্য নিউজ।’ ‘মাই সলিডারিটি ইজ উইথ টিম উইকেন্ড!’ ‘আনবিলিভেবল!’
পরের দিন থেকে শুরু হল অন্য রকম মেসেজ। ‘আয়ার্ল্যান্ডের মেডিকাল টারমিনেশান অব প্রেগন্যান্সি আইন পাশ হওয়া নিয়ে লেখাটা অন্য ম্যাগাজিনে দিতে পারি?’ অথবা, ‘মিড ডে মিলের রাজনীতি নিয়ে লেখাটা অন্য কাগজে দিচ্ছি।’ অথবা, ‘পরিণীতি চোপড়ার ইন্টারভিউটা ওয়েবে পোস্ট করে দিলাম।’
সব ক্ষেত্রেই শক্তিরূপার উত্তর, ‘ওকে।’ সঙ্গে একটা স্মাইলি। সারা দিনে দেড়শোটা মেসেজ পেয়ে ও সমসংখ্যক মেসেজ পাঠিয়ে শক্তিরূপা মানসিকভাবে ভেঙে পড়লেন। এইসব লেখকরা আগে ফোন করত। এখন মেসেজে কাজ সারছে। যাতে কথা বলতে না হয়। চাকরি যাওয়ার তৃতীয় দিন থেকে কোনও ফোন আসেনি। কোনও মেসেজও না। শক্তিরূপা নিজেই ফোন করেছেন। অন্য কাগজের অফিসে, সংবাদপত্র ও ম্যাগাজিন জগতের বন্ধুদের। উত্তরে শুনেছেন সেই কথাটা, যেটা তিনি এতদিন বলে আসতেন। ‘আপনার ফোন করার প্রয়োজন নেই। আমাদের দরকারে আমরাই আপনাকে ফোন করে নেব।’
উইকেন্ডের টিমের ফোনগুলো প্রথমদিকে লম্বা হচ্ছিল। তারপর কমতে কমতে হাফ মিনিট। শুক্লা, তানিয়া, অনিল আর মথুরেশ সবার আগে অন্য কোম্পানিতে চাকরি নিয়ে চলে গেলেন। যাবার আগে অনিল বললেন, ‘নো হার্ড ফিলিংস শক্তিরূপা। আমার বউবাচ্চা আছে। বৃদ্ধ বাবা-মা আছেন। স্টেডি ইনকাম না থাকলে কোথায় যাই বলো? তুমি কোনও কাগজ শুরু করলে আমরা নিশ্চয়ই ফিরে আসব।’
ফিরবেন না। জানেন শক্তিরূপা।
এডিটোরিয়াল টিমের দুটো ছেলেমেয়ে অত্যন্ত কম টাকায় অন্য কাগজে জয়েন করেছে। শক্তিরূপা আটকাননি। চাকরি যাওয়ার পরে একদিনই বাড়ির বাইরে বেরিয়েছিলেন তিনি। টিমের একটা ছেলে ইংরিজি থিয়েটার করে। ওদের একটা প্রোডাকশান ছিল জ্ঞান মঞ্চে। ‘দ্য টেমিং অব দ্য শ্রু।’ সেটা দেখতে গিয়েছিলেন।
বিরতির সময় বাইরে বেরিয়ে কফি খাচ্ছিলেন শক্তিরূপা। হঠাৎ পাশ থেকে একজন বললেন, ‘দ্য টেমিং অব দ্য শ্রু আজও কত প্রাসঙ্গিক, তাই না শক্তিরূপা?’
পাশ ফিরে শক্তিরূপা দেখলেন, কথাটা বলছেন উইকেন্ডের এক অতিথি লেখক। সরকারপন্থী লেখালিখি করেন বলে এঁর কয়েকটি লেখা ফেরত পাঠিয়েছেন শক্তিরূপা। বারবার বলেছেন, ‘প্রো-এসট্যাবলিশমেন্ট লেখালিখির জায়গা উইকেন্ড নয়। তার জন্য অন্য ম্যাগাজিন আছে।’ কিন্তু এই বান্দা সে সব শুনবেন না। দুটো লেখা সরকারকে আক্রমণ করে লিখলেন। তিন নম্বর লেখায় আবার পুরোনো অবস্থান। উইকেন্ডের পলিসির সঙ্গে যায় না বলে সেই লেখা রিজেক্ট করেছেন শক্তিরূপা। আজ ইনি প্রতিশোধ নিচ্ছেন।
কী আর করা যাবে? বিরতির সময়টুকু এখানেই কাটাতে হবে। আড়চোখে ঘড়ি দেখে, কফিতে চুমুক দিয়ে শক্তিরূপা বললেন, ‘ক্লাসিক মাত্রেই কনটেমপোরারি।’
‘রাইটলি সেইড। বজ্জাত মেয়েছেলেরা অতীতেও জব্দ হত। আজও জব্দ হয়। সাধে কি সেক্সপিয়ারকে গ্রেট বলা হয়?’
শক্তিরূপা আর পারলেন না। কফির কাপ ডাস্টবিনে ফেলে, থিয়েটারের বাকি অংশ না দেখে জ্ঞান মঞ্চ থেকে বেরিয়ে আসছেন, সেই অতিথি লেখক চেঁচিয়ে বললেন, ‘শক্তিরূপা, শুনলাম গত তিনমাস আপনি মাইনে পাননি। কোনও অসুবিধে হলে বলবেন। হেল্প করব।’
সেই রাতে দময়ন্তীর কাছ থেকে অ্যালোপাম চেয়ে খেয়েছিলেন শক্তিরূপা। তিনি জানতেন, মেয়ে ওই ওষুধ খায়। তিনি কখনও বারণ করেননি বা দুশ্চিন্তা প্রকাশ করেননি। জানতেন মেয়ে একদিন নিজেই ওর থেকে দূরে সরে যাবে।
মেয়ে দূরে গেছে কি না জানেন না শক্তিরূপা। রোজ রাতে দুটো অ্যালোপাম না খেলে আজকাল তাঁর ঘুম আসে না।
শক্তিরূপা গতকাল রাতে সুরেশ আগরওয়ালের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। উনি ড্যানিয়েলের ছবির ক্রেতা ও সমঝদার। প্রোমোটিং এবং রিয়াল এস্টেটের বিরাট ব্যবসা। শক্তিরূপা চেষ্টা করছিল সুরেশকে প্রিন্ট মিডিয়া সম্পর্কে আগ্রহী তৈরি করতে। এমন সময় একটা ফোন ঢুকল। টুঁটুঁ আওয়াজ শুনে মোবাইলের স্ক্রিন দেখলেন শক্তিরূপা।
‘পবন সরকার কলিং…’
চন্দনের বাবা তাঁকে কেন ফোন করছেন? রিং হয়ে যেতে দিলেন শক্তিরূপা। সুরেশের সঙ্গে কথা বলা বেশি জরুরি।
সুরেশ বলছেন, ‘আমি কনভিন্সড নই মিসেস সেনগুপ্ত। আপনার এফিসিয়েন্ট টিম থাকতে পারে। কিন্তু পাবলিশিং আমাদের কোর কমপিটেন্সের জায়গা নয়। আমাকে এক সপ্তাহ ভাবার সময় দিন। আমি বেঙ্গলের প্রিন্ট মিডিয়ার মার্কেট স্টাডি করি। তারপর আমিই আপনাকে ফোন করে নেব। ঠিক আছে?’
মোবাইলের লাল বোতাম টেপে শক্তিরূপা। আবার একটা রিজেকশান। ঠিক আছে। ভেঙে পড়লে চলবে না। চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। অন্য কাউকে ফোন করার আগে একবার চন্দনের বাবাকে ফোন করে নেওয়া যাক। শক্তিরূপা রিং ব্যাক করে বললেন, ‘বলুন পবনবাবু।’
‘হ্যাঁ… আমি আপনাকে ফোন করেছিলাম। মানে… আগেই করা উচিত ছিল, কিন্তু করিনি। আসলে সহানুভূতি বা বা অনুকম্পা জানানোটা কোনও কাজের কথা নয়…’
শক্তিরূপা চুপচাপ শুনছেন।
‘ম্যাডাম, আপনার অর্থনৈতিক সমস্যা নেই সেটা আমি ভালো করেই জানি। কিন্তু আপনার মতো একজন সাংবাদিক চুপচাপ বসে থাকবেন এটা কখনই কাম্য নয়।’
‘আমি চুপ করে বসে আছি এটা আপনাকে কে বলল? কোনও জার্নালিস্ট?’
‘না ম্যাডাম। আমি জেলার সাংবাদিক। কলকাতায় আমার কোনও কানেকশান নেই। এটা আমি জেনেছি দময়ন্তীর কাছ থেকে। ওর সঙ্গে একটু আগে কথা হল।’
‘ওহ!’ শুকনো হাসেন শক্তিরূপা। ‘তা হলে তো ঘোড়ার মুখের খবর জানেন।’
‘না… মানে… একটা কথা বলতে চাই। আপনি যদি কিছু মনে না করেন।’
‘বলুন না! এত সংকোচ করছেন কেন?’
‘মানে… আমি যে কথাটা বলতে চাইছি সেটা শুনে আপনার কাছে অপমানজনক মনে হলে আমি দুঃখ পাব। তাও…’
‘পবনবাবু, আমি অনর্থক বেশি কথা বলা পছন্দ করি না,’ কড়া গলায় বললেন শক্তিরূপা।
শক্তিরূপার ধমক খেয়ে পবন গড়গড় করে বললেন, ‘আপনি বেলাকূলের অতিথি সম্পাদক হবেন?’
‘মানে?’ শক্তিরূপা অবাক! উইকেন্ডে কাজ নেই বলে জেলার কাগজের সম্পাদক হতে হবে? এই লোকটা তাকে এই ভাবে অপমান করছেন?
পবন বলে যাচ্ছেন, ‘আমি কাগজটা নতুন করে সাজাচ্ছি। আমাদের অফিস এখন পুরোপুরি কম্পিউটারাইজ্ড। নিজস্ব প্রেস নেই। কিন্তু সেটা কোনও প্রবলেম না। ডিস্ট্রিবিউশান সিস্টেমটা ডেভেলপ করছি।’
শক্তিরূপা বুঝতে পারলেন, পবন তাঁকে অপমান করছেন না। গ্রামের মানুষ তাঁর নিজস্ব উদারতায় বিপদের দিনে সাহায্য করতে চাইছেন। শক্তিরূপার মেট্রোপোলিটান কুটিল মন সেটাকে অপমান ভেবে নিয়েছে।
‘কাজ যা করার আমিই করব,’ বলছেন পবন, ‘আপনার নামটা সম্পাদক হিসেবে ব্যবহার করতে চাই। তার জন্য আমার সামর্থ অনুযায়ী সামান্য কিছু সম্মান দক্ষিণাও দেব। আপনাকে এখানে আসতে হবে না। মানে, চাইলে আপনি আসতে পারেন। সপ্তাহে একবার, বা মাসে একবার। অনলাইনে কাজ হবে। আপনি এডিটোরিয়ালগুলো লিখবেন। আর…’ বলতে বলতে থেমে যান পবন।
শক্তিরূপা মৃদু হেসে বললেন, ‘অতিথি সম্পাদকের পদটি আমার মনে ধরল না। এর মাধ্যমে লোক ঠকানো হচ্ছে। সাংবাদিকতা ফুলটাইম জব। সপ্তাহে বা মাসে একদিন অফিস গিয়ে আর যাই হোক না কেন, জার্নালিজম হয় না।’
‘ওহ! দুঃখিত। ঠিক আছে। মানে আমি জানতাম যে আপনি ‘না’ বলবেন। মানে আপনাকে পাব না। কিন্তু ওই যে, লোভ! ভাবলাম, ফাঁকা আছেন যখন, তখন একবার কথা বলে দেখি। আপনি ‘হ্যাঁ’ বললে কলকাতা যেতাম। তা ঠিক আছে। আমি বুঝতে পেরেছি।’
‘আপনাকে কলকাতায় আসতে হবে না। আমি নতুনগ্রামে গিয়ে আপনার সঙ্গে দেখা করব।’ দৃঢ় গলায় বলেন শক্তিরূপা, ‘আমি যদি আপনার বেতনভূক কর্মচারী হই, তাহলে আমার কর্তব্য আপনার কাছে যাওয়া। আর অফিসটাও তো দেখতে হবে। তাই না?’
‘আপনি আসবেন? সত্যি? নিজেকে “বেতনভূক কর্মচারী” বলে আমাকে ছোট করবেন না। আমি বিশ্বাস করতে পারছি না…’ অসংলগ্ন কিছু প্রশ্ন, অপ্রাসঙ্গিক কিছু মন্তব্য বেরোয় পবনের মুখ দিয়ে। শক্তিরূপা বুঝতে পারেন, পবন কাঁদছেন।
শক্তিরূপা পবনকে বুঝতে দেন না যে তিনিও ভেতরে ভেতরে কাঁদছেন। গলার কাছে কী যেন একটা গুটলি পাকিয়ে উঠছে। চোখ জ্বালা করছে। নাকের পাটা ফুলে যাচ্ছে। কান গরম হয়ে গেছে।
তাঁর মতো হার্ডকোর জার্নালিস্টের মধ্যে এতটা মনুষ্যত্ব লুকিয়ে ছিল? লজ্জা পেলেন শক্তিরূপা। এবং সত্যি সত্যি কেঁদে ফেললেন। পটাং করে মোবাইলের লাল বোতাম টিপে চেয়ার থেকে উঠলেন। স্টাডিরুম থেকে বেরিয়ে ড্যানিয়েলের স্টুডিওয় ঢুকলেন। আরাম কেদারায় বসে ড্যানিয়েল রাজশেখর বসুর মহাভারত পড়ছেন। সাউন্ড সিস্টেমে গান বাজছে।
‘এলেম নতুন দেশে।
তলায় গেল ভগ্নতরী
কূলে এলেম শেষে।
এলেম নতুন দেশে।’
.
শক্তিরূপার দিকে এক পলক তাকিয়ে রিমোট টিপে গানের ভলিউম কমিয়ে ড্যানিয়েল বললেন, ‘তা হলে? কলকাতাবাসের পর্ব চুকল? আর কত দূরে নিয়ে যাবে মোরে হে সুন্দরী।’
শক্তিরূপা চোখ মুছতে মুছতে বললেন, ‘মিস্টার হোমস। কী করে বুঝলে?’
‘প্রাথমিক ব্যাপার, বন্ধু ওয়াটসন! স্বেচ্ছাবন্দি অবস্থা থেকে এতদিন বাদে বেরোলে। তার সঙ্গে চোখে জল আর মুখে হাসি। এবং পদক্ষেপে আত্মবিশ্বাস। অর্থাৎ নতুন কোনও সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে। সেটা কলকাতার মুদ্রণ জগতে হওয়া সম্ভব নয়। এখানকার ইংরিজি খবরের কাগজের দুনিয়া হয় তোমাকে নেবে না, না হয় মাইনে দিতে পারবে না। সুতরাং অন্য শহর। বেঙ্গালুরু না মুম্বই?’
ড্যানিয়েলের আরাম কেদারার পাশে, মেঝেয় বসে শক্তিরূপা বললেন, ‘জীবনটা ফিকশান নয়। সব হিসেব মেলে না। শুনে অবাক হোয়ো না। আমি বাংলা প্রিন্ট মিডিয়ায় শিফ্ট করছি। বিগ হাউজ থেকে জেলার সাপ্তাহিকীতে শিফ্ট করছি। কলকাতা থেকে নতুনগ্রামে শিফ্ট করছি।’
‘সাংবাদিকতা থেকে সরে যাচ্ছ না তো?’ শক্তিরূপার মাথায় হাত বুলোন ড্যানিয়েল। ‘তোমার ভালোবাসার জায়গা থেকে সরে যাচ্ছ না তো? তোমার স্বপ্নের পিছনে দৌড়নো থামিয়ে দিচ্ছ না তো?’
‘না।’ ড্যানিয়েলের কোলে মাথা রাখেন শক্তিরূপা।
‘তা হলে আর কী? দিল্লি থেকে কলকাতা এলাম মেয়ের জন্য। সেই মেয়ে আগামিকাল লন্ডন চলে যাচ্ছে। লন্ডন যখন যাব না, তখন নতুনগ্রাম আর কলকাতা আমার কাছে সমান। ওখানে বরং আবহাওয়া দূষণ অনেক কম। ভেজাল অনেক কম। আলোতে অনেক বেশি তেজ। গাছগাছালিতে অনেক বেশি সবুজ কণা। প্রকৃতিতে অনেক বেশি রং। ওখানে আমাকে একটা আঁকার ঘর বানিয়ে দিও। আমি আপনমনে ছবি আঁকব। আর তুমি তোমার কাজ নিয়ে থাকবে। দিঠি আমাকে বলেছে, আমি একটা বানানো বাংলায় থাকি। সেটা নাকি আঁতেল ছবির বাংলা। সেখানে সব্বাই রবীন্দ্রসঙ্গীত গায়, সব্বাই জমিদারবাড়ি অথবা আকাশ আঁচড়ানো বহুতলের মহার্ঘ বসতিতে থাকে। সবাই ফরাসি সুরা আর ইতালিয়ান ভাত খায়। আসল বাংলা আছে নতুনগ্রামে। আমি যখন সুযোগ পেয়েছি, তখন আসল বাংলায় থাকতে চাই।’
‘দিঠির কথা ছাড়ো। তুমি সত্যিই আমার সঙ্গে যাবে? কলকাতা ছেড়ে থাকতে তোমার অসুবিধে হবে না? তোমার আর্ট গ্যালারি, তোমার এক্সিবিশন, তোমার বন্ধুবান্ধব…’
‘তুমি, বাংলা ভাষা, রবি ঠাকুর আর রং-তুলি ছাড়া আমার কিছু লাগে না। কিছু বই আর ছায়াছবি জমেছে। সেগুলো নিলেও হয়, না নিলেও হয়। তোমার জন্য আমি, ওই যাকে চালু বাংলায় বলে, ‘ “রইল ঝোলা চলল ভোলা” হয়ে যেতে রাজি আছি।’
‘ন্যাকা!’ ড্যানিয়েলের বারমুডায় চোখের জল মুছে শক্তিরূপা বলেন, ‘গোলমহল আমি ছাড়ব না। প্রাথমিকভাবে তালাচাবি মারা থাকবে। পরে সপ্তাহান্তে একবার আসব। কিন্তু নতুনগ্রামে থাকার মতো একটা বাড়ি চাই। গোপাল আর তাপসীর বাড়িটা এখন খণ্ডহর। ওটাকে রিনোভেট করবে?’
‘ভালো বলেছ।’ সোজা হয়ে বসেন ড্যানিয়েল। ‘উইকেন্ডের পাতায় আর দূরদর্শনের অনুষ্ঠানে বাড়িটার অনেক ছবি দেখেছি। সামনে অনেকটা বাগান। দোতলা বাড়ি। প্রশস্ত দরজা জানলা। কিন্তু ওটার মালিকানা কার নামে?’
‘আমি যতদূর জানি পুলিশ বাড়িটাকে কনফিসকেট করেনি। ওটা এখনও গোপাল নস্করের সম্পত্তি। আমি পবনের সঙ্গে কথা বলব। গোপাল তো নিরুদ্দেশ।’ ঘড়ির দিকে তাকালেন শক্তিরূপা। ‘রাত এগারোটা বাজে। চলো, খেয়ে নিই। কাল মেয়েকে এয়ারপোর্টে পৌঁছে দিতে হবে। ওখান থেকেই আমরা নতুনগ্রামে চলে যাব। একটা রাত কাটিয়ে পরশু কলকাতা ফিরব। তারপর বাকি ভাবনা ভাবা যাবে।’
‘তোমার পত্রিকা দফতরের ছেলেমেয়েরা তোমার সঙ্গে যাবে?’
‘তিনজন মাত্র পড়ে আছে। ওরা যাবে না। ওদের কম বয়স। অর্থনৈতিক স্থিতির প্রয়োজন। বেলাকূল তা দিতে পারবে না। তাছাড়া বেলাকূল নামে একটা জেলার কাগজে কাজ করা ওদের কাছে খুব “আনকুল” ব্যাপার হবে।’ হাসতে হাসতে বলেন শক্তিরূপা।
‘তা ঠিক।’ আরাম কেদারা থেকে ওঠেন ড্যানিয়েল। ‘তা, তুমি কিছু পয়সা কড়ি পাবে? না গাঁট থেকে দেবে?’
‘পবনবাবু অফার করেছেন। অ্যামাউন্ট বলেননি। আমি ভাবছি কিছু টাকা ইনভেস্ট করে পার্টনারশিপে যাব। বেলাকূলের ব্র্যান্ডিং ভালো। হাজার হোক রুরাল রিপোর্টিং-এর জন্য অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে। আমারও এডিটর হিসেবে একটা ব্র্যান্ড ভ্যালু আছে। উইকলি ম্যাগাজিন হিসেবে শুরু করি। দেখা যাক রেসপন্স কেমন। তারপর অন্য কথা ভাবব।’
‘উনি যদি যৌথ উদ্যোগে রাজি না হন?’
‘অত এখনও ভাবিনি গো। জার্নালিজম নিয়ে থাকব, লেখালেখি নিয়ে থাকব, ডেডলাইন নিয়ে থাকব—এই ভেবেই আনন্দ হচ্ছে। আমি জানি আজ রাতে অ্যালোপাম ছাড়াই আমার ঘুম হবে। চলো আমরা খেতে বসি। অনেক দিন বাদে জমাটি খিদে পেয়েছে।’
দু’জনে স্টুডিও থেকে বেরিয়ে খাবার টেবিলে বসলেন। ড্যানিয়েল জিজ্ঞাসা করলেন, ‘দিঠিকে বলবে না?’
‘কাল বলব।’
‘মেয়েটা কোথায়?’
‘ও খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়েছে। আগামিকাল ফ্লাইট।’
.
সকাল সাতটা থেকে তুমুল বৃষ্টি শুরু হল। টানা তিনঘণ্টার বৃষ্টিপাতে পুরো কলকাতা জলের তলায়। মহাকরণ থেকে মৃন্ময় চ্যাটার্জি সাংবাদিক সম্মেলন করে জানালেন, ‘বৃষ্টি বন্ধ না হলে পুরো দক্ষিণবঙ্গ জুড়ে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে।’ আবহাওয়া দফতর থেকে বারবার জানাচ্ছে যে মাঝিদের সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়া বারণ।
ব্রেকফাস্ট খেতে বসে শক্তিরূপাকে দেখে অবাক হল দময়ন্তী। ফ্রেশ, ঝকঝকে চেহারা। হাবভাবে পুরোনো ব্যক্তিত্ব। সসেজ চিবোতে চিবোতে দময়ন্তী বলল, ‘তোমাকে খুব হ্যাপি লাগছে। কী ব্যাপার বলো তো?’
‘সুখী এবং খুশি।’ মুচকি হাসে ড্যানিয়েল, ‘তুই ঠাঁই বদলাচ্ছিস। তাই আমরাও ঠাঁই বদলাচ্ছি। আমি বেকার মানুষ। কাজকম্মো নেই। তোর মা নতুন কাজ জুটিয়েছে। বাড়ির কত্তা হিসেবে আমিও যাচ্ছি।’
‘ “বাড়ির কত্তা” কি “হাউস হাজব্যান্ড”-এর বাংলা?’
‘হয়নি, না?’ লাজুক মুখে জানতে চাইলেন ড্যানিয়েল।
‘একদমই হয়নি।’ কড়া গলায় বলে দময়ন্তী। ‘এনিওয়ে, তোমরা কোথায় যাচ্ছ? দিল্লি না মুম্বই?’
শক্তিরূপা পুরো প্রসঙ্গ মেয়েকে আবার বোঝালেন। সব শুনে দময়ন্তী ঘাড় নেড়ে বলল, ‘চন্দনের বাবাকে আমি চিনি। ভালো লোক। নতুনগ্রামও আমার ঘোরা। গোপাল নস্করের বাড়িতেও আমি গিয়েছি।’
‘জানি।’ টোস্টে মার্জারিন লাগাতে লাগাতে বলেন শক্তিরূপা, ‘তুই, সব্যসাচী, অনাবিল—সবাই ফায়ারিং প্র্যাকটিস করতিস ওখানে।’
দময়ন্তীর হাত থেকে আধখাওয়া সসেজ পড়ে যায়। ‘তুত্… তুমি জানতে?’
‘আমি সাংবাদিক দিঠি। আমি তখন নতুনগ্রাম কভার করছি। ওখানে কী কী ঘটছে তার প্রতিটি খবর আমার কাছে আছে। আমি ইন্টারভেন না করলে বাদশা ঘোষ তোকে আগেই ইন্টারোগেট করার জন্য কাস্টডিতে নিত।’
‘তার মানে তুমি আমার ব্যাপারে নাক গলিয়েছিলে?’ ফোঁস ফোঁস করে বলে দময়ন্তী।
‘আমি কোনও দিনও তোর কোনও ব্যাপারে নাক গলাইনি। যদি গলাতাম, তা হলে বলতাম অ্যালোপাম খাওয়া বন্ধ কর। ওতে অ্যাডিকশান হয়। যদি নাক গলাতাম, তা হলে নবীনবরণের রাতে তোকে মলেস্ট করার জন্য সুরজের জেল হত। কোনওটাই করিনি। তবে এই ক্ষেত্রে নাক গলিয়েছিলাম। কারণ এইটা তোর কেরিয়ারের প্রশ্ন। পুলিশ রেকর্ড থাকলে তুই ভিসা পেতিস না।’ ক্যাজুয়ালি বলেন শক্তিরূপা।
দময়ন্তী কিছুক্ষণ গুম মেরে বসে থাকে। অবশেষে বলে, ‘তা হলে? আমার কি তোমাকে একটা ধন্যবাদ জানানো উচিৎ?’
শক্তিরূপা ম্লান হেসে বললেন, ‘সারকাজম! শ্লেষ! শব্দের চোরাগোপ্তা আক্রমণ! আজকাল আর এ সবে কিছু আসে যায় না রে! বাইরের আঘাত আমাকে যখন বিচলিত করতে পারেনি তখন ঘরের আঘাতও পারবে না।’
ড্যানিয়েল হাত নেড়ে শক্তিরূপাকে থামালেন। দময়ন্তীকে বললেন, ‘কম বয়সের ধর্ম হল পুরোনোকে অস্বীকার করা। পুরোনো নিয়ম, পুরোনো রীতি-রেওয়াজ, পুরোনো নিয়ম-শৃঙ্খলাকে হাওয়ায় উড়িয়ে না দিলে যৌবন নিজেকে প্রকাশ করতে পারে না। আমি কম বয়সে নিজের মতো করে বিপ্লব করেছি। তোমার মা-ও করেছেন। বিপ্লব মানে শুধু রাজনৈতিক বা সামাজিক বিপ্লব নয়। নিয়ম ভাঙাও একটা যুদ্ধ। আমি মদ্যপান করেছি। দেশত্যাগ করেছি। তোমার মা এক মদ্যপ ব্রিটিশকে ভালোবেসেছে। তাকে বিবাহ করেছে। সময়ের নিয়মেই আমাদের যৌবন এখন অতীত। আমরা এখন গৃহপালিত। আমরা এখন মনে করি নিয়মের প্রয়োজন আছে। সমাজ বা পরিবারতন্ত্র যা বলে, তা উড়িয়ে দেওয়া ঠিক নয়। কিন্তু আমরা এখন অতীত। তুমি হলে বর্তমান। তোমার মন, তোমার মস্তিষ্ক, তোমার সময় দাবি করেছে নতুন বিপ্লবের। সেই দাবি মেনে তুমি অতিবাম রাজনীতিতে জড়িয়েছ, একাধিক সম্পর্কে লিপ্ত হয়েছ, সম্পর্ক ছেড়ে বেরিয়ে এসেছ। এখন অন্য দেশে যাচ্ছ। বাবামা হিসেবে আমরা সবটাই জানি। কিন্তু কখনও তোমার ব্যক্তিগত জায়গায় হাত দিইনি।’
‘বাবা, “পারসোনাল স্পেস”-এর বাংলা “ব্যক্তিগত জায়গা” নয়।’
‘হয়নি, না?’ শিশুর হাসি ড্যানিয়েলের মুখে। তিনি দেখছেন যে দময়ন্তী চেয়ার থেকে উঠে শক্তিরূপাকে জড়িয়ে ধরছে। বলছে, ‘আমি সরি মা। আমি বুঝতে পারিনি। আমাকে প্লিজ ক্ষমা করে দাও।’
‘ধুর পাগলি!’ মেয়েকে ঠেলে সরিয়ে চোখ মোছেন শক্তিরূপা। ‘চলে যাওয়ার সময় এইসব ধাষ্টামোর কোনও মানে হয়? আমার কান্না পাচ্ছে!’
‘আমারও!’ ফোঁতফোঁত করে বলে দময়ন্তী। ‘আজকের ওয়েদারটা জঘন্য। এইরকম দিনই কলকাতা ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য আইডিয়াল। নোংরা, পলিউটেড একটা নেক্রোপলিস। রোজ ট্রাফিক জ্যাম, রোজ গোলাগুলি চলছে, রোজ মিছিল আর মিটিং, রোজ মলেস্টেশান আর ধর্ষণ। বাঙালিগুলো ক্রমশ গাম্বাট হয়ে যাচ্ছে। যারা উড়ে এসে জুড়ে বসছে তারা রুটলেস। শহরটার প্রতি কোনও মায়াদয়া নেই। রাজীব গাঁধী অতীতে কলকাতাকে “ডাইং সিটি” বলেছিলেন। উনি কমিয়ে বলেছিলেন। এটা একটা ডেড সিটি, যার গা থেকে সব সময় পচা গন্ধ বেরোয়।’
ড্যানিয়েল মুচকি হাসলেন। ‘মান অভিমানের পালা শেষ হলে আমাকে জানিও। আমাদের সবার জন্য লম্বা সফর অপেক্ষা করে আছে। বাড়িতে তালা মারতে হবে। আমি একটা বড় গাড়ি বলে রেখেছি। যথেষ্ট আগে না বেরোলে তোমার বিপত্তি। আমাদেরও।’
বাইরে অঝোরে বৃষ্টি পড়ছে। জানলার গ্রিলে গাল রেখে দময়ন্তী ফিসফিস করে বলে,
‘কলকাতা ছাড়িয়ে গেলে কলকাতাকে বেশি মনে পড়ে—
জঙ্গলে হারিয়ে গিয়ে, তুমি দেখবে, কলকাতা তোমার
চতুর্দিকে রয়ে গেছে শাল শিশু খয়ের গাছের—
মতন নিবিড় হয়ে, তার কাছে পরিত্রাণ নেই
নিতান্ত খরগোশ হয়ে সে তোমাকে সহজে ঠোকরাবে।’
.
প্রবল বৃষ্টিতে জল থইথই কলকাতা শহর। টেলিভিশনের ব্রেকিং নিউজের ভাষায়, ‘জনজীবন বিপর্যস্ত।’ তার মধ্যে ভিআইপি রোডের জ্যাম আর জল ঠেলে এগোচ্ছে এক এসইউভি। গাড়ির ভিতরে, এসির ঠান্ডার মধ্যে ড্যানিয়েল চোখ বুজে বসে রয়েছেন। শক্তিরূপা দময়ন্তীর হাত নিজের কোলে নিয়ে রেখেছেন।
দময়ন্তী নিজের মোবাইল থেকে মেসেজ পাঠাচ্ছে। ‘চললাম। তোদের শহর ছেড়ে। এ-বি-সি-ডি-র মধ্যে সি আর ডি গায়েব। সি ফর চণ্ডীগড়। ডি ফর লন্ডন। এ আর বি-র কী হবে?’ মেসেজ যাচ্ছে অভি আর বৃন্দার মোবাইলে।
এয়ারপোর্ট এসে যাচ্ছে। বিমানবন্দরের আন্তর্জাতিক লাউঞ্জে ঢুকে যাচ্ছে দময়ন্তী। শেষবারের মতো পিছন দিকে হাত নেড়ে টাটা করছে বাবা-মাকে। চেক ইন হয়ে যাচ্ছে। মস্ত বড় বোয়িং-এর পেটে ঢুকে যাচ্ছে সে। প্লেন ছেড়ে দিচ্ছে। কলকাতার ময়লা সিটিস্কেপে ময়লা ছায়া বুলিয়ে উড়ে যাচ্ছে বিমান।
আজ বৃষ্টি বন্ধ হবে না। বাদলের ধারাপাত আজ কলকাতাকে ডুবিয়ে তবে ছাড়বে। তারই মধ্যে এসইউভি জল ঠেলে দৌড়চ্ছে বেলঘরিয়া এক্সপ্রেসওয়ে ধরে। দক্ষিণেশ্বর আর বালি ব্রিজ টপকে ন্যাশনাল হাইওয়ে সিক্স ধরছে। জানলার কাচ খুলে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে ড্যানিয়েল আকাশের দিকে তাকাচ্ছেন। বোয়িংটা দেখা যাচ্ছে কী? যাতে করে উড়ে গেল তাঁদের একমাত্র কন্যা? তাঁদের সাত রাজার ধন এক মানিক?
ড্যানিয়েল দেখতে পাচ্ছেন না যে অনেক ওপরে একটা বিমান উড়ে যাচ্ছে পশ্চিম দিকে। সেই বিমানের উইনডো সিটে বসে জানলা দিয়ে নীচের দিকে তাকিয়ে রয়েছে দময়ন্তী। মেঘের স্তূপের মাঝখানে সে খুঁজছে ছুটন্ত একটা গাড়ি। দময়ন্তী দেখতে না পেলেও জানে যে গাড়িটা কলকাতা ছেড়ে নতুনগ্রামের দিকে দৌড়চ্ছে। গাড়িতে রয়ে গেল দময়ন্তীর অতীত। আর সে উড়ে যাচ্ছে ভবিষ্যতের দিকে।
ইন্ডিয়ান মেডিকাল কলেজে ঠিক সময়ে ঢুকবে বলে উঁচু পাঁচিল থেকে নীচে ঝাঁপ মেরেছিল দময়ন্তী। পাশ করে কলেজ থেকে বেরিয়ে নীচু থেকে উঁচুতে উড়াল দিয়েছে। আর পিছনে ফেরা যাবে না। আসা যাওয়ার মাঝখানে ইন্ডিয়ান মেডিকাল কলেজ সুখস্মৃতি হয়ে থেকে যাবে। তার বেশি কিছু নয়। কমও নয়।
জানলা থেকে চোখ সরায় দময়ন্তী। সামনের টিভিতে বিবিসি চ্যানেল ফোরে খবর শোনাচ্ছে। লন্ডনের আবহাওয়ায় চোখ রাখে দময়ন্তী। ওখানেও খুব বৃষ্টি হচ্ছে…
.
