৬.অভিজ্ঞান
‘আজ সকাল’ সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী সন্দীপ সামন্ত ও হেল্থ হাবের মালিক জর্জ কুকের করমর্দনের ছবি। মহাকরণের অলিন্দে সাংবাদিক সম্মেলন করে ‘লুক ইস্ট’ নীতি ব্যাখ্যা করছেন সন্দীপ। জর্জ ছোট ছোট বাক্যে হেল্থ ট্যুরিজমের ব্যাপারটি আমজনতার অনুধাবনযোগ্য করছেন। এটিই আজকের প্রধান খবর। অন্যান্য খবরের মধ্যে রয়েছে মহারাষ্ট্রে ঋণ শোধ করতে না পেরে কৃষক আত্মঘাতী। গাজিয়াবাদে গৃহবধূকে গণধর্ষণ। ধৃতরা সবাই স্কুল পড়ুয়া।
খবরগুলো দেখতে দেখতে অভির মাথা হালকা হয়ে গেল। চিলেকোঠার বিছানায় শুয়ে কাগজ পড়তে পড়তে ঠ্যাং নাচানো বন্ধ হয়ে গেল। খবরের কাগজের পাতা থেকে অক্ষরগুলো লাফিয়ে উঠছে, শূন্যে নেচে বেড়াচ্ছে। ‘ধর্ষণ’-এর পাশে নাচছে ‘ঋণ’, ‘গৃহবধূ’র পাশে নাচছে ‘কৃষক’, ‘সন্দীপ সামন্ত’র পাশে নাচছে ‘জর্জ কুক’, ‘মহারাষ্ট্র’-র পাশে নাচছে ‘মহাকরণ’। শব্দগুলো নাচতে নাচতে মাথায় ধাক্কা মারছে। মাথার মধ্যে ধকধক করে শব্দ হচ্ছে। শব্দ!
কাগজ রেখে ধড়মড়িয়ে উঠে বসল অভি। মোবাইলে সময় দেখল। সকাল সাড়ে সাতটা বাজে। এপ্রিল মাসের তিন তারিখের চড়া রোদে ঘর ভেসে যাচ্ছে।
আজ মঙ্গলবার। সকালে কতগুলো পচা থিয়োরি ক্লাস আছে, যেগুলো করার কোনও ইচ্ছে নেই। বারোটায় রিনা ম্যাডামের প্যাথলজি প্র্যাকটিকাল আছে। ওই ক্লাসটার জন্য কলেজ যাওয়া। বৃন্দার সঙ্গে মোলাকাতও ওই সুযোগে হয়ে যাবে।
বৃন্দার কথা মনে পড়ায় আবার মোবাইলের দিকে তাকায় অভি। গতকাল রাত্তিরে বা আজ সকালে ওর সঙ্গে কোনও কথা হয়নি। কোনও মেসেজও করা হয়নি। কাল সুরজ যখন দল বেঁধে সিনেমা দেখতে গেল তখন সে লাইব্রেরিতে বৃন্দার প্র্যাকটিকাল খাতায় ছবি আঁকছিল। নিজের খাতায় আঁকাজোকা কমপ্লিট। বৃন্দারটা চেয়ে নিয়েছে, যাতে রিভিশন হয়ে যায়।
লেখাপড়ার চিন্তা থেকে বৃন্দার প্রসঙ্গে ঢুকে পড়েছে অভি। একবার ফোন করবে নাকি? এই সময় বৃন্দা বাথরুমে থাকে। স্যামি ব্যানার্জির হাতে মোবাইল পড়লে সর্বনাশ হয়ে যাবে। এক ঘণ্টা বাদে ফোন করা যেতে পারে। আবার খবরের কাগজ হাতে নেয় অভি। ভিতরের পাতায় একটা ছোট্ট খবর চোখে পড়ে। বাঁজাপলাশ গ্রামের সব বাড়িতে সরকারের তরফে বিডিও গিয়ে নোটিশ ধরিয়ে এসেছে। আগামী এক মাসের মধ্যে পুরো গ্রামটি সরকার অধিগ্রহণ করবে। পাশে ছোট্ট একটা ছবি। গাছের গায়ে মারা সরকারি নোটিশ পড়ছে একদল বামন। তাদের মুখে চিন্তা, ভয়, অসহায়তা। খবরের পাশে ঠান্ডা পানীয়র বিরাট বিজ্ঞাপন। ঠান্ডা পানীয়ের বোতল হাতে হাসছেন বিপাশা বসু এবং জন আব্রাহাম। ওঁদের মধ্যে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেলেও বিজ্ঞাপনে এখনও একসঙ্গে দেখা যায়।
আবার অভির মাথা হালকা হয়ে যাচ্ছে। আবার শব্দগুলো কাগজ থেকে উড়ে আসছে তার দিকে। আবার তারা একে অপরের সঙ্গে নাচছে, শব্দ ভেঙে অক্ষর তৈরি হচ্ছে, অক্ষরগুলো নিজেদের মতো করে সাজিয়ে গুছিয়ে জন্ম দিচ্ছে নতুন শব্দের, শব্দেরা পাশাপাশি বসে নতুনতর শব্দ, বাক্য, পংক্তি তৈরি করছে…
কলমদানি থেকে পেন তুলে নিয়ে খবরের কাগজের কোণে অভি লেখে,
.
‘এ দ্যুলোক মধুময়। মধুময় পৃথিবীর ধূলি।
ঘরে ঘরে ফিরি হয় মাল্টি ন্যাশনালের ভ্যা-ক্লিনারগুলি।
সে ধুলোয় হলুদ-সবুজ ফুল ধীরে ধীরে বাড়ে।
রং কোম্পানি তাকে গুলে নেয় ডিসটেম্পারে।
ফুলের তোড়াটি হাতে তোমার বাড়ির দিকে স্খলিত চরণ।
ক্যাটওয়াকে ভুল কত? বলে দেবে বিপাশা ও জন।
ফেরত আসার পথে চোখে যদি জলের প্রলাপ।
স্বচ্ছ বোতলে ভরে, তাতে দাও ‘মিনারেল’ ছাপ।
মার্কসবাদ মধুময়। মধুময় কফিনের এ পেরেকগুলি।
আমার এ বাজার থেকে তোমাদের হাতে আমি দিয়ে যাব তুলি।’
.
একটানা দশ লাইন লিখে কিছুক্ষণ হাঁফায় অভি। তরতর করে লাইনগুলো মাথায় এসে গেছে। স্বরবৃত্তে লেখা পদ্য, কোথাও মাত্রায় গন্ডগোল হয়নি। অন্ত্যমিল নিয়ে খুঁতখুঁতুনি লাগছে। দ্বিতীয় ও নবম লাইনে ‘গুলি’ লিখেছে। ২০১২ সালে কবিতা লিখতে গিয়ে কেউ ‘পেরেকগুলি’ লেখে নাকি? ‘ধুলি’-র সঙ্গে মিল দেওয়ার জন্য ‘তুলি’ ছাড়া আর কোন শব্দ নেই? ধুস্!
পদ্যটা এডিট করবে বলে খাতা নিয়ে বসে অভি। খবরের কাগজ দেখার প্রয়োজন নেই। লাইনগুলো মাথার মধ্যে টগবগ করে ফুটছে। আধঘণ্টা ধস্তাধস্তির শেষে পদ্যটা আর একটু ইমপ্রুভ করল। পদ্যর নাম ঠিক করতে অসুবিধে হল না। ‘শিল্পায়নের প্রাথমিক খসড়া।’ নামকরণে খুশি হয়ে খাতাকলম আর খবরের কাগজ বিছানায় রেখে চেয়ার ছেড়ে উঠল অভি। সকালবেলাটা সুন্দর শুরু হল। ‘মর্নিং শো-জ দ্য ডে’-র তত্ত্ব মানলে আজ সারাদিন ভালোই যাবে।
দোতলায় নেমে অভি দেখল পরিস্থিতি গন্ডগোলের। মনোজ আর অরুণা ঝগড়া করছেন। বিষয়, রাধার নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়া। মনোজ বলছেন, ‘আমি একশোবার বলেছি, কাজের লোকের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করা বন্ধ করো। কিন্তু সে কথা শুনলে তো? কাজের লোককে থাকার জায়গা দিয়ে মাথা কিনে নাওনি!’
অরুণা বঁটিতে পটল কাটছিলেন। মুখ গোঁজ। কপালে ঘাম। ঠোঁট টিপে কথাগুলো শুনলেন। ঘ্যাঁস ঘ্যাঁস করে পটল কাটতে কাটতে বললেন, ‘থানার বড়বাবু কী বলল?’
‘নতুন আর কী বলবে? তোমার জন্য আমার কম হয়রানি হল? মর্গ, হাসপাতাল, থানার লক আপ, ভ্যাগর্যান্সি হোম, ভিখিরিদের ডেন—সব ঘোরা হয়ে গেছে। কোত্থাও নেই। এদিকে ওর মেয়ে ছায়া দু’বেলা ফোন করছে। আগের ফোনগুলো ছিল কাকুতি মিনতির। এখন সেটা শাসানির জায়গায় পৌঁছেছে।’
‘ছায়া ওরকম নয়,’ ঘর মুছতে মুছতে মানদা বলল। ‘ওর কানে গুরুমন্তর দেওয়ার মতো কেউ জুটেছে।’
‘এই সবের জন্য দালাল থাকে,’ গাল চুলকোতে চুলকোতে মনোজ বললেন। ‘আউট অব দ্য কোর্ট সেট্লমেন্ট চেয়ে লাখ পাঁচেক টাকা নেবে। সেটা ওই দালাল আর ছায়া ভাগ করে নেবে।’
‘লাখ পাঁচেক?’ আঁতকে উঠেছেন অরুণা।
‘এখনও কিছু চায়নি। কিন্তু ফোনে যে ভাবে ইনিয়ে বিনিয়ে বলছে! ‘আপনার তিনতলা বাড়ি, সরকারি চাকরি, দুই ছেলে ডাক্তার!’
‘মানুষ কত নীচে নামতে পারে…’ বিড়বিড় করেন অরুণা।
এইসব কথাবার্তা অভির অসহ্য লাগছে। সে ঘোষণা করল, ‘আজ সকালে বাড়িতে চা হবে? না আমি দোকান থেকে খেয়ে আসব?’
মুহূর্তের মধ্যে মনোজ আর অরুণা জোটবদ্ধ। মনোজ ঠান্ডা গলায় বললেন, ‘এটা বাড়ি। কলেজ ক্যান্টিন নয়। এখানে ওভাবে কথা বলা যাবে না।’ অরুণা বললেন, ‘কলেজে ঢুকেছ বলে তোমার দুটো প্যাখনা গজায়নি। চুপচাপ বোসো। চা হলেই পাবে।’
‘লে হালুয়া! আমি ভুলটা কী বললাম!’ কথাগুলো ছুড়ে দিয়ে বাথরুমে ঢুকে যায় অভি। বাথরুম এত অন্ধকার যে ঢুকলেই ডিপ্রেশন হয়। নিত্যকর্ম পদ্ধতি নমো নমো করে সেরে বাথরুম থেকে বেরোতে যাবে অভি এমন সময় শুনতে পেল মনোজের চিৎকার, ‘বাড়াবাড়ির একটা সীমা থাকা উচিত! ছেলেটা বাথরুমে।’
বাথরুমের ছিটকিনি খুলতে গিয়ে থেমে যায় অভি। এবার কোন এপিসোড?
‘তোমার লীলাখেলার কথা ছেলের জানা উচিত। দিন নেই রাত নেই ছোঁকছোঁকানি চলছে। বয়স তো কম হল না।’
‘আহ্! বউমা! কেন বাজে বকছ।’ মানদা চাপা গলায় ধমকাল অরুণাকে।
‘বাজে বকছি না মানদা। আজকাল ওর কোনও রিহার্সাল থাকে না। ওর কোলিগ ঘোষদা আমাকে বলেছেন। তা হলে অফিসের পরে ও কোথায় যায়? রাইটার্স বিল্ডিং-এ রাত দশটা পর্যন্ত কাজ হচ্ছে শুনলে পাগলেও হাসবে। রঙিন জামা, ইস্তিরি করা প্যান্ট, চকচকে জুতো, নিত্যনতুন আফটার শেভ—এইসব বাতিক তো আগে ছিল না! হঠাৎ কাত্তিক ঠাকুর সাজার ইচ্ছে হল কেন?’
‘কথা হচ্ছিল রাধা পাগলিকে নিয়ে। তার মধ্যে তুমি এসব কী টেনে আনছ?’ গলা চড়ালেন মনোজ।
‘ধমকাবে না। তোমার ধমকে আর কাজ হবে না। দুই ছেলে বড় হয়ে গেছে। আমি আর তোমাকে ভয় পাই না। বেঁচে থাকতে গেলে লাগে দুটো ভাত আর মাথার ওপরে একটা ছাদ। ওই জন্য তোমার নোংরামি এতদিন সহ্য করেছি। আর না। ছেলেদুটোকে বলে দেব, তাদের বাবা আসলে কী জিনিস।’
‘ছেলেদের কথা আর বোলো না। বড়টি পলিটিক্স করে নিজের বারোটা বাজাচ্ছেন। আমাকে লালবাজার থেকে ফোন করে বলেছে, ওরা বিলুর ওপর নজর রাখছে। আর ছোটোটি কী করছেন খোদায় মালুম! অলরেডি একটা সাবজেক্টে ফেল করেছে।’
অভি আর পারল না। খটাং করে ছিটকিনি খুলে বাথরুম থেকে বেরিয়ে বলল, ‘সকাল সকাল তোমরা কী শুরু করেছ? বস্তিবাড়ির মতো খেউড় করছ।’
‘তোমার গুণধর বাবা বাড়িকে বস্তি বানালে আমি কী করতে পারি বলো?’ ঝাঁঝিয়ে ওঠে অরুণা, ‘মেয়েছেলে নিয়ে লটঘট করলে সোনার সংসার সোনাগাছিই হয়।’
অভি অবাক হয়ে দেখল, মনোজ সোফা থেকে উঠে একলাফে অরুণার কাছে গিয়ে গালে সপাটে এক চড় কষালেন। মানদা আঁতকে উঠে বলল, ‘বউয়ের গায়ে হাত তুললে? অ্যাদ্দিনে বাড়িটা বস্তি হল।’
অরুণা দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিস করে বললেন, ‘আর তো কোনও কিছুর মুরোদ নেই। হাতের জোরই ফলাও।’
‘বউমা! কী আজেবাজে কথা বলছ!’ ধমক দেয় মানদা। মনোজের হাত চেপে ধরেছে সে।
অরুণার চোখে জল। ঠোঁটে বিদ্রুপ আর ঘৃণার হাসি মিশিয়ে সে বলল, ‘ঋষিতার বয়স কত গো? একুশ বাইশ? নাকি সাতাশ আঠাশ? ও কি আমার থেকে ফরসা? ওর বুকদুটো কি খুব টাইট? বিয়ের সময় আমার যেমন ছিল?’
অভি আর শুনল না। এক দৌড়ে বসার ঘর পেরিয়ে সিঁড়ি বেয়ে তিনতলায় উঠল। হাতের কাছে জামা-প্যান্ট-মোজা যা পেল, গলিয়ে নিয়ে চুল আঁচড়াল। ব্যাকপ্যাক কাঁধে ঝুলিয়ে, টেবিল থেকে তুলে নিল সকালে লেখা কবিতার ফেয়ার কপি। এক দৌড়ে একতলায় নেমে স্নিকার গলিয়ে দৌড় লাগাল জিটি রোডের দিকে। মনোজ-অরুণার ঝগড়া-মারামারি তাকে যতটা অস্বস্তিতে ফেলেছে, তার থেকেও বেশি অস্বস্তিতে ফেলেছে মনোজের বলা একটা কথা। ‘আমাকে লালবাজার থেকে ফোন করে বলেছে, ওরা বিলুর ওপর নজর রাখছে।’
.
কলেজে ঢুকে মোবাইলে সময় দেখল অভি। সে বেখাপ্পা সময়ে কলেজে ঢুকেছে। রেপ স্যারের থিয়োরি ক্লাস করতে সবাই এখন এলএলটিতে। বৃন্দাকে মেসেজ করতে গিয়ে থমকায়। থাক। একটু পরেই দেখা হবে। ততক্ষণ জীবনদার ক্যান্টিনে একটু ঠেক মারা যাক। পেটে কিছু দিতে হবে। বাবামায়ের বাওয়ালের জন্য কিছু না খেয়ে বাড়ি থেকে বেরতে হয়েছে।
ক্যান্টিনে বসে এক প্লেট চাউমিন সাঁটাতে সাঁটাতে বৃন্দাকে মেসেজটা করেই ফেলল অভি। ‘লং টাইম নো এসএমএস। অ্যাংরি কেয়া?’ পাশে একটা স্মাইলি। গপাগপ চাউমিন শেষ করে অ্যাকাডেমিক বিল্ডিং-এর দিকে রওনা দিল। প্যাথলজি প্র্যাকটিকালে জান লড়িয়ে দিতে হবে। বৃন্দার প্র্যাকটিকাল খাতাটাও ফেরত দিতে হবে। গাধার খাটনি খেটে খাতাটা তৈরি করেছে। পুরস্কার হিসেবে তিনটে চুমু তার প্রাপ্য।
বৃন্দা পাল্টা কোনও এসএমএস করল না তো! মোবাইল হয় তো সাইলেন্ট মোডে ঝোলায় ঢোকানো আছে।
পিছন থেকে জীবনদা হাঁক পাড়ল, ‘ওহে রোমিও! এটা বাবার হোটেল নয়। এখানে খ্যাঁটন সারলে পয়সা দিতে হয়।’
সকালে বাড়িতে বাবা বলল, ‘এটা কলেজ ক্যান্টিন নয়।’ এখন কলেজ ক্যান্টিনে জীবনদা বলল, ‘এটা বাবার হোটেল নয়।’ লাইফ খুবই কমপ্লিকেটেড হয়ে যাচ্ছে অভির কাছে। সে চাউমিনের দাম মিটিয়ে অ্যাকাডেমিক বিল্ডিং-এর দিকে দৌড়োল।
প্র্যাকটিকাল ক্লাসে অভি যখন ঢুকল, তখন ঘর ভরতি। বৃন্দা একদম সামনের সিটে বসে। দময়ন্তী মাঝামাঝি জায়গায়। পিছনের সারি থেকে চন্দন হাত নাড়ল, ‘এদিকে আয়।’
চন্দনের পাশের চেয়ারে বসে অভি বলল, ‘কাল সুরজের জন্মদিনের পার্টিতে কী হল?’
‘কে জানে!’ মুখ ভ্যাটকায় চন্দন। ‘আমার ওসব ন্যাকামোয় ইন্টারেস্ট নেই। আমি যাইনি।’
রিনা ম্যাডাম ব্ল্যাকবোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘প্যাথলজি ইজ অ্যাবাউট টু থিংস। নাম্বার ওয়ান, ঘৃণা নামক অনুভূতিটি শরীর থেকে বাদ দিতে হবে। নাম্বার টু, কিন অবজার্ভেশন পাওয়ার। এই দুটি পরীক্ষায় তোমরা কী ভাবে পাশ করো, তা জানার জন্য আমি একটা টেস্ট করতে চাই। আমার সামনের র্যাকে একটা টেস্ট টিউব রাখা রয়েছে। এতে কী আছে, কে বলতে পারবে?’
হালকা হলদে রঙের তরল দেখে সামনের চেয়ার থেকে বৃন্দা বলল, ‘পু!’
জেম্সি বলল, ‘ইক্স! শিট!’
শ্রীপর্ণা বলল, ‘এটা কি পুঁজ?’
সাবিনা বলল, ‘এক্সপেক্টোরেশান? কাশির সঙ্গে উঠেছে?’
পুরো ক্লাস জুড়ে ওয়াক তোলার আওয়াজ উঠল। সমবেত ‘ওয়াক’ ধ্বনির মধ্যে রিনা ম্যাডাম একটা আঙুল টেস্ট টিউবে ঢুকিয়ে বাইরে বার করলেন। হলদে লুদলুদে তরল আঙুল বেয়ে নিচের দিকে গড়াচ্ছে। সবাইকে দেখিয়ে আঙুলের হলদে তরল জিভ দিয়ে চেটে রিনা ম্যাডাম তৃপ্তির ঢেকুর তুললেন, ‘আহ!’
ক্লাস জুড়ে মেয়েরা, ম্যাগো, ব্যাব্যাগো, ওয়াক থু, উল্টি হো যায়েগা—এইসব বলে চ্যাঁচাতে লাগল। ছেলেরা নাক সিঁটকে বসে রইল।
রিনা ম্যাডাম ঘোষণা করলেন, ‘আই নিড আ ভলান্টিয়ার।’
সারা ক্লাস চুপ। রিনা ম্যাডামের চোখে চোখ রাখবে না বলে সবাই মেঝের দিকে তাকিয়ে।
‘কে আসবে?’ মিষ্টি হেসে জানতে চাইছেন রিনা ম্যাডাম। কেউ কোনও উত্তর করছে না।
‘আচ্ছা। তোমরা যখন নিজের থেকে এগিয়ে আসবে না, তাহলে আমিই ডাকছি। কে আসবে? সুরজ?’
ছয়ফুটিয়া ছোকরা কাঁধ ঝুঁকিয়ে মৃদু ঘাড় নাড়ে।
‘সুরজ নয়। শ্রীপর্ণা, বৃন্দা, চন্দন, প্রবাল, জেম্সি, সঞ্জয়…’ নামের লিস্টি আওড়াচ্ছেন রিনা ম্যাডাম। এক একটা নাম উচ্চারিত হচ্ছে আর ছেলেমেয়েরা কেঁপে কেঁপে উঠছে। অবশেষে সিদ্ধান্ত নির্ণায়ক কণ্ঠস্বরে রিনা ম্যাডাম বললেন, ‘অভিজ্ঞান! তুমি এসো।’
‘আমি আবার কেন ম্যাডাম?’ শিউরে উঠে, ম্যাডামের টার্গেট অন্য লোকের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টায় অভি বলে, ‘অ্যাই সুরজ। তুই যা! ম্যাডাম প্রথমে তোর নাম বলেছিলেন।’
‘চলে এসো অভিজ্ঞান।’ তর্জনী দিয়ে ডাকছেন রিনা ম্যাডাম। ‘প্যাথলজিতে পাশ করতে গেলে এই পরীক্ষার পাশ করা ভীষণ জরুরি। এসো।’
রিনা ম্যাডাম নেতাদের ঘাঁটাবেন না। অভি জানে। ওঁর টার্গেট তার মতো নির্বিষ, অরাজনৈতিক ছাত্র।
কাঁধ ঝুকিয়ে রিনা ম্যাডামের পাশে যায় অভি। নাক বন্ধ করে। তর্জনি টেস্ট টিউবে ঢুকিয়েই তুলে নেয়। তর্জনীতে কি একটা হড়হড়ে পদার্থের ছোঁয়া লাগল। না দেখে তর্জনী মুখে ঢুকিয়ে জিভ দিয়ে চেটে নিয়েই বেসিনের দিকে দৌড় লাগায় সে। এক্ষুনি বমি করতে হবে।
কল খুলে ওয়াক তুলতে তুলতে অভি শুনল, রিনা ম্যাডাম বলছেন, ‘অভিজ্ঞানের জন্য দুটো পরীক্ষা ছিল। একটা ঘৃণা জয় করার পরীক্ষা। অন্যটা পর্যবেক্ষণ শক্তির পরীক্ষা। একশো নম্বরের পরীক্ষায় পঞ্চাশ নম্বর পেয়ে টায়ে টায়ে পাশ করেছে অভিজ্ঞান।’
‘ফিফটি পার্সেন্ট কেন?’ প্রশ্ন করেছে চন্দন।
‘ঘৃণা জয় করার পরীক্ষায় ও পঞ্চাশে পঞ্চাশ পেয়েছে। আর পর্যবেক্ষণ শক্তির পরীক্ষায় পঞ্চাশে শূন্য পেয়ে ফেল করেছে। কেন না…’ মুচকি হেসে রিনা ম্যাডাম বললেন, ‘আমি যখন এই পরীক্ষাটা তোমাদের সামনে করে দেখালাম, তখন আমি টেস্ট টিউবে তর্জনি ডুবিয়ে ছিলাম। কিন্তু মুখে দিয়েছিলাম মধ্যমা।’
সারা ক্লাস হাসিতে ফেটে পড়েছে। ওয়াক তুলতে তুলতে অভি শুনতে পেল রিনা ম্যাডাম বলছেন, ‘অত ওয়াক তোলার কিছু নেই অভি। ওটা লেডিজ হোস্টেলের মেসের ডাল। খুব ভালো খেতে না হলেও, খারাপ কিছু নয়। তুমি সিটে এসে বোসো।’
মুখ মুছতে মুছতে বোকা বোকা গলায় অভি বলল, ‘তাই কেমন চেনা চেনা স্বাদ মনে হল।’
তার কথা শুনে সারা ক্লাস হোহো করে হেসে উঠল। চন্দন বলল, ‘লেডি আর্চার্স হোস্টেলের ডালের টেস্ট চেনা হয় কী করে?’
সুরজ বলল, ‘ডাল মে কুছ কালা হ্যায়!’ অভির ভ্যাবাচ্যাকা মুখ দেখে পুরো ক্লাস আবার হাসিতে ফেটে পড়ল। রিনা ম্যাডাম বললেন, ‘অনেক বাজে কথা হয়েছে। এবার আমরা দেখব টিবির জীবাণু কী ভাবে দেখতে হয়। আমার কাছে এক বিকার কফ রয়েছে। তোমরা এগুলো স্লাইডে নিয়ে স্মেয়ার তৈরি করো।’
ঝাড়া একঘণ্টা প্র্যাকটিকাল ক্লাসের শেষে মুক্তি। আজ সারা দিন কি জঘন্য গেল! নিজের ওপরে প্রচণ্ড বিরক্ত অভি। সকালে একটা কবিতা লিখে মনটা ফুরফুরে হয়েছিল। তারপর বাবামায়ের ঝগড়া আর কাদা-ছোড়াছুড়ি, কলেজে এসে প্র্যাকটিকাল ক্লাসে সবার সামনে মুরগি হওয়া, বৃন্দার সঙ্গে কথা বলতে না পারা, এসএমএসের উত্তরে বৃন্দার চুপ থাকা… বিরক্তির লিস্টি লম্বা। এখন বৃন্দার সঙ্গে কথা না বলতে পারলে সে দম আটকে মরেই যাবে। তা ছাড়া, নতুন কবিতাটা ওকে শোনাতে হবে তো!
বৃন্দা আর শ্রীপর্ণা হাঁটতে হাঁটতে দাঁড়ের দিকে যাচ্ছে। দময়ন্তীকে দেখতে না পেয়ে অবাক হল অভি। রোজ দুজনে যমজ বাচ্চার মতো একে অপরের গায়ে চিপকে থাকে। আজ ‘বিছড়ে হুয়ে’ কেন? অভি হাঁক পাড়ল, ‘অ্যাই বৃন্দা!’
শ্রীপর্ণা দাঁড়িয়ে পড়ে হাসতে হাসতে অভিকে বলল, ‘তোর ছেলে হলে আমি তার নাম রাখব, “গু খেগোর ব্যাটা”।’
‘ধ্যাত! খালি বাজে কথা।’ শ্রীপর্ণাকে উত্তর দিলেও অভির চোখ বৃন্দার দিকে। ‘শ্রোণীভারে অলসগমনা হয়ে হেঁটে যাচ্ছিস। ডাকছি, শুনতে পাচ্ছিস না?’
বৃন্দা ঘুরে দাঁড়াল। ন্যাপস্যাক থেকে ফ্যাব ইন্ডিয়ার প্যাকেট বার করে বলল, ‘গতকাল তোর জন্য একটা পাঞ্জাবি কিনেছিলাম।’
‘নাইস কালার!’ আবার হাসছে শ্রীপর্ণা, ‘দিস ইজ কল্ড শিট ইয়েলো।’
শ্রীপর্ণার টিপ্পনিকে পাত্তা না দিয়ে অভি বলে, ‘তোর মুখটা গম্ভীর কেন? এনিথিং রং?’
‘রং? অ্যাজ ইন কালার? এটা হলদে রং! বললাম তো!’ পান করতে পেরে আবার হাসছে শ্রীপর্ণা। বিরক্ত হয়ে অভি বলে, ‘ইয়ার্কির একটা সীমা আছে। তুই একটু থাম।’
‘না রে শ্রীপর্ণা! তুই বল। ‘হলুদ’ রং বললেই কী মনে হয় তোর?’ অভির অস্তিত্বকে অস্বীকার করে বৃন্দা বলে।
‘ইয়েলো সাবমেরিন। বিটল্সের বিখ্যাত গান।’ রাস্তার ওপরেই গিটার বাজানোর অভিনয় করে গান ধরেছে শ্রীপর্ণা, ‘উই আর গোইং অন আ ইয়েলো সাবমেরিন…’
‘হলদে পাখির পালক।’ এবার বৃন্দার বলার পালা। ‘লীলা মজুমদারের উপন্যাস! তা ছাড়া ক্যাকটাসের বিখ্যাত গান, “সেই যে হলুদ পাখি।” এন্ড অব ইনোসেন্স নিয়ে এত ভালো গান বাংলায় হয়নি।’
‘হলদে সবুজ ওরাং ওটাং ইটপাটকেল চিৎপটাং। সুকুমার রায়।’ শ্রীপর্ণা ফটাফট উত্তর দেয়।
‘হলুদ বনে বনে, নাকছাবিটি হারিয়ে গেছে সুখ নেই কো মনে।’ উৎসাহের সঙ্গে বলে অভি। ‘পথের পাঁচালিতে পড়েছি। কার লেখা জানি না।’
‘তোকে বলতে বলা হয়নি।’ নিষ্প্রাণ গলায় বলে বৃন্দা। শ্রীপর্ণাকে বলে, ‘‘হলুদ বসন্ত” নামে একটা বাংলা উপন্যাস আছে।’
‘দুরন্ত দুপুর নামে নরেশ গুহর লেখা একটা কবিতার বই আছে। সত্যজিৎ রায় প্রচ্ছদ করার সময় হলুদ রং ব্যবহার করেছিলেন। কেন না, ওঁর মনে হয়েছিল, দুপুরের রং হলুদ। এই পাঞ্জাবিটার মতো হলুদ।’ বলল অভি। সে কথা বলছে আর পলকহীন দৃষ্টিতে বৃন্দাকে দেখছে। বৃন্দা তার সঙ্গে কথা বলছে না। তার দিকে তাকাচ্ছে না। বৃন্দার চোখ দুটো ফোলা আর লাল। নাকের ডগা লাল। দুই গাল লাল। বৃন্দা কান্নাকাটি করেছে। কেন?
অবশেষে অভির দিকে তাকিয়েছে বৃন্দা। বলছে, ‘তুই আর আমার সঙ্গে কথা বলিস না অভি। কোনওদিনও বলিস না। ফোন করিস না। মেসেজ করিস না। গতকাল যখন এই পাঞ্জাবিটা যখন তোর জন্য কিনেছিলাম তখনও জানতাম না তুই এত মিন। পাঞ্জাবিটা তাই তোকে দেব না। বাই!’ শ্রীপর্ণার হাত ধরে গটগট করে গাইনি বিল্ডিং এর দিকে হেঁটে যায় বৃন্দা। কালো সুইফ্ট ডিজায়ার গাড়ি নিয়ে সুলতান পাখির মতো ভেসে আসে। শ্রীপর্ণাকে টাটা করে বৃন্দা গাড়িতে উঠে পড়ে।
অভি দৌড় লাগায়। এইভাবে বৃন্দা তাকে ডাম্প করছে কেন? কেন এই ভাবে ঝাড় নামাচ্ছে? কী তার অপরাধ? এত দিনের একটা সম্পর্ক এইভাবে এক সেকেন্ডে ভেঙে দেওয়ার অধিকার বৃন্দাকে কে দিল? গাড়ির কাচ ধরে হাঁফাতে হাঁফাতে অভি বলে, ‘কী হল? পাগলামি করছিস কেন?’
‘পাগলামি আমি করছি না। তুই করছিস।’ মাথা নীচু করে বলে বৃন্দা। সুলতান এক পলক অভির দিকে তাকিয়ে গাড়ির কোনও একটা সুইচ টেপে। পাওয়ার উইনডো আপনা আপনি উঠে যায়। অভি আর বৃন্দার মাঝখানে এখন কাচের দেওয়াল।
গাড়ি হুস করে ইন্ডিয়ান মেডিকাল কলেজের বাইরে বেরিয়ে যায়।
অভির মাথা ঘুরছে। অভির চোখে জল। অভির হাত-পা ঠান্ডা। অভির বুকের ভিতরে দমচাপা আর্তনাদ গুমরোচ্ছে। অভির ইচ্ছে করছে থান ইট নিয়ে ট্রামলাইন বরাবর দৌড়তে। মৌলালির ক্রসিং-এ কালো গাড়িটা নিশ্চয়ই দাঁড়িয়ে। ইটের বাড়িতে কাচের জানলা ভাঙবে না?
অভির কাঁধে শ্রীপর্ণার হাত। মিষ্টি হেসে সে বলে, ‘জীবনে প্রথমবার ঝাড় খেলি?’
ঝরঝর করে কাঁদতে কাঁদতে অভি বলে, ‘হ্যাঁ।’
‘লেট্স সেলিব্রেট।’ দাঁড়ে বসে শ্রীপর্ণা বলে, ‘এক ভাঁড় চা খাওয়া।’
.
