হৃদয়ের নৈঃশব্দ্য – ২১

২১. অভিজ্ঞান

এ এক অবিশ্বাস্য দৃশ্য। জওহরলাল নেহরু রোডের বহুতলের ছাদ থেকে পাখির চোখে দেখা। তিনশো ষাট ডিগ্রি জুড়ে শুধু মানুষ। কালো কালো মাথা যেন এক একটা পিক্সেল। পিক্সেল-সমগ্র এক জন-বিস্ফোরণের ছবি তৈরি করেছে। যে দিকে তাকানো যায়—মানুষ, মানুষ আর মানুষ। জওহরলাল নেহরু রোড, লেনিন সরণি, এসপ্ল্যানেড ইস্ট, সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি রোড, এসপ্ল্যানেড ওয়েস্ট, বেন্টিঙ্ক স্ট্রিট এবং চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউ জুড়ে কলকাতার শহরের বিস্তীর্ণ এলাকায় বাসট্রাম চলছে না। শহরের সব মানুষ আজ একটাই মহামিছিলে সামিল। গোটা কলকাতা আজ লড়াইয়ের ময়দান। এই মিছিলে কোনও স্লোগান নেই। নেই রণহুঙ্কার। নেই দলদাসদের গলাবাজি। শান্ত ও নম্রভাবে এই মিছিল জানাচ্ছে, সন্দীপ সামন্ত ও তার সরকারের শেষের শুরু হল। তাসের ঘরের একটা তাস পড়েছে। ডোমিনো এফেক্টে বাকিটা হুড়মুড়িয়ে ভাঙবে। শুধু সময়ের অপেক্ষা। অচলায়তনের জানলার একটি পাল্লা খুলেছে। এক ফালি আলোক রশ্মি ঢুকেছে। এসেছে এক ঝলক বাতাস। আলোর মধ্যে লুকিয়ে আছে বজ্রগর্ভ মেঘ। বাতাসে লুকিয়ে রয়েছে ঝড়ের পূর্বাভাস।

টিভিতে মিছিলের ছবি দেখতে দেখতে অভি ভাবছিল, এও কি সম্ভব? সাধারণ মানুষ এত শক্তি পেল কোথা থেকে? ত্রিশ বছর ধরে যে দলতন্ত্র বাঙালি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্র নিয়ন্ত্রণ করে এসেছে; অফিস-কারখানা, খেত-খামার, বাস-ট্রাম, পাড়া-ক্লাব, রান্নাঘর-শোওয়ার ঘরের প্রতিটি বাসিন্দাকে ‘আমরা’ আর ‘ওরা’-র তকমায় দেগে দিয়েছে, সেই হিমালয় সদৃশ পার্টির বিরুদ্ধে এই স্বতঃস্ফূর্ত সমাবেশ কি বাস্তব? তাহলে বোধ হয় সেই কথাটা ঠিক, যে, ‘কিছু মানুষকে চিরদিনের জন্য বোকা বানানো যায়। সমস্ত মানুষকে কিছু দিনের জন্য বোকা বানানো যায়। কিন্তু সমস্ত মানুষকে চিরদিনের জন্য বোকা বানানো যায় না!’

টিভিতে মিছিলের ছবি দেখছেন মনোজও। দেখছেন আর রাগে ফুঁসছেন। আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদী হাত পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছেন তিনি। সাবেক সোভিয়েত রাশিয়ার পতন থেকে শুরু করে ইস্ট ইউরোপের একের পর এক দেশে ভাড়াটে গুন্ডা পাঠিয়েছে সিআইএ। অতীত থেকে আজ পর্যন্ত ওই দেশটার ওয়ান পয়েন্ট অ্যাজেন্ডা হল বামপন্থী ভাবধারাকে পৃথিবী থেকে ধুয়েমুছে সাফ করে দেওয়া। সন্দেহ নেই, আমেরিকা অনেকাংশে সফল। কিন্তু প্রবাদপ্রতিম ফিনিক্স পাখির মতো বিভিন্ন দেশের কমিউনিস্ট পার্টিও আগুনে জ্বলে ছারখার হয়ে যাওয়ার পরে নতুন চেহারায় ডানা ঝাপটাচ্ছে। বাংলায় কী হবে, সময় বলবে।

মনোজ জানেন, এই মিছিলে যারা হাঁটছেন, তাঁদের অধিকাংশই বর্তমান সরকারের কাছ থেকে নানা সুবিধে নিয়েছেন। আজ হাতি যখন কাদায় পড়েছে, তখন চামচিকের দল ডানা মেলেছে। কাঁধে ডানা লাগানো বামনদের ছবি আঁকা প্ল্যাকার্ডের তলায় লেখা ‘আমাদের চন্দ্রাভিলাষ’। অর্থাৎ ‘বামনের চন্দ্রাভিলাষ’। বাঁজাপলাশ গ্রামের বামন জনগোষ্ঠীর রেফারেন্স টানা এই ‘সিল্‌পো’-কর্ম সাধারণ মানুষ বুঝবে? যত্তোসব ন্যাকামো। হারামি বুদ্ধিজীবীর দল!

মনোজের মাথায় অলরেডি নতুন নাটক তৈরি হচ্ছে। জীবন সংগ্রাম গ্রুপের জন্য নাটকের নামও ভেবে ফেলেছেন তিনি। ‘পাখি সব’। রবীন্দ্রনাথের খাঁচার পাখি আর বনের পাখির তত্ত্বকথাকে নতুন মোড়কে পরিবেশন করা যাবে। কিছুটা রূপকধর্মী। আগামী বিধানসভা ভোটে সরকার বদল হলে মৃন্ময় চ্যাটার্জির নেতৃত্বে আদৌ যদি কোনও সরকার গঠিত হয়, তাহলে সেই সময়ে জনগণ কেমন থাকবে, আর এখন জনগণ কেমন আছে—এই নিয়ে ডিসকোর্স। পুতুল নাচ, মূকাভিনয়, জনপ্রিয় বাংলা আর হিন্দি গানের প্যারডি—সব কিছু আছে। প্রধান বিরোধী নেতা মৃন্ময় চ্যাটার্জিকে নাটকে নেত্রী করে দিতে হবে। নাম হবে চিন্ময়ী সেন। ওই রোলটায় ঋষিতাকে ভালো মানাত! কিন্তু জীবন সংগ্রামে ভালো অভিনেত্রীর অভাব নেই। ঋষিতাকে আনা যাবে না। ঋষিতার প্রসঙ্গ মনে পড়ায় অন্যমনস্ক হয়ে যান মনোজ।

মহামিছিলের ছবি দেখছেন অরুণাও। আর ভাবছেন, এই দলটাই তাঁর সর্বনাশের কারণ। এই সরকারকে চোখের মণির মতো রক্ষা করতে হবে—এমন দাসখত কে লিখে দিতে বলেছিল? নিত্য নতুন নাটক, প্রতিদিন দেরি করে রিহার্সাল, প্রতি সপ্তাহে কলকাতার বাইরে কল শো, স্টেজে আর মহড়ায় নাটকের মেয়েদের সঙ্গে মাখামাখি—পুরুষ মানুষ মাত্রেই বিগড়োবে। তাঁর বরের আর দোষ কোথায়? আজকালকার মেয়েগুলোর চরিত্র বলে কিছু নেই। শাড়ি বা সালোয়ার পরা ছেড়ে দিয়েছে। পা দেখানো শর্টস, কোমর দেখানো প্যান্ট আর বুক দেখানো টপ ছাড়া কিছু পরে না। ছেলেদের মাথা তো ঘুরবেই। বরের দোষ ভুলে গিয়ে জনমোর্চা সরকারের ওপরে রেগে যান অরুণা। আপদ সন্দীপ সামন্তটা গেলেই সব সমস্যার সমাধান। অরুণা মনেপ্রাণে চান, মৃন্ময় চ্যাটার্জি মুখ্যমন্ত্রী হোন। যদি হন, তা হলে অরুণা তাঁর সঙ্গে দেখা করে ঋষিতার নামে কমপ্লেন করে আসবে। লক্ষ্মী নিবাসে শান্তি ফিরুক। বিলু ফিরে আসুক। এই তো সামান্য চাহিদা। পূরণ হবে না?

বিলু! সারা শরীর কেঁদে ওঠে অরুণার। অন্যরা কাঁদলে চোখ দিয়ে জল বেরোয়, মুখ দিয়ে কান্নার শব্দ আসে। কিন্তু অরুণার শরীর কেঁদে ওঠে। অব্যক্ত যন্ত্রণায় গোঙাতে থাকে পুরো দেহ। অরুণা কী এমন অপরাধ করেছিলেন যে ভগবান অমন সোনার টুকরো ছেলেটাকে ছিনিয়ে নিল? লোকে বলে, ভগবান যাদের ভালোবাসেন, তাদের আগে ডেকে নেন। ভগবান কি বিলুকে বেশি ভালোবেসেছিলেন? অরুণার ভালোবাসার থেকেও ভগবানের ভালোবাসার জোর বেশি? মহামিছিলে মানুষের ছবি দেখতে দেখতে সারা শরীর দিয়ে কাঁদেন অরুণা। পাশে বসে থাকা মনোজ টের পান না। পায় না অভিও।

মাথা! মানুষের মাথা ওইভাবে ছিন্নভিন্ন হয়ে যেতে পারে? অরুণা তখন রান্নাঘরে ব্যস্ত ছিলেন। অনেক দিন বাদে বিলু দাড়ি কামিয়েছে, চুলে শ্যাম্পু দিয়েছে, সাবান মেখে স্নান করেছে, বাবার সঙ্গে হেসে কথা বলেছে। অরুণা খুশি।

ল্যান্ড লাইনে রিং হওয়ায় বিলু ফোন ধরেছিল। ফোন নিয়ে মাথা ঘামাননি অরুণা। পাঁঠার মাংসে পেঁপের টুকরো দিচ্ছিলেন। এমন সময় বিলুর ঘর থেকে দড়াম করে একটা শব্দ। অরুণা ছুটে যাচ্ছেন, হঠাৎ ষণ্ডামার্কা একটা পুলিশ লাফাতে লাফাতে ওপরে এসে এক লাথিতে বিলুর ঘরের দরজা ভেঙে দিলেন। ভাঙা দরজা দিয়ে ঘরে ঢুকে অরুণা দেখলেন সেই ভয়ানক দৃশ্য।

বিলু খাটে শুয়ে রয়েছে। যেন ঘুমিয়ে রয়েছে। শুধু মাথাটা অন্যরকম হয়ে গেছে। তরমুজে হাতুড়ি চালালে যেমন সব ছ্যাতরা ভ্যাতরা হয়ে যায়, তেমনই বিলুর মাথার অবস্থা। হাড়-চামড়া-ঘিলুছিটকে গেছে। ডান হাতের পিস্তল দেখে অরুণা আন্দাজ করেছিলেন কী হয়েছে। তাও মনে হয়েছিল, ছেলেটা বেঁচে আছে। ঘিলু আর হাড়ের টুকরো আর চামড়া ঠিক জায়গায় বসানোর চেষ্টা করেছিলেন। মুশকো পুলিশটা অরুণার হাত ধরে ঘর থেকে বাইরে বার করে বলেছিলেন, ‘হাত দেবেন না। বাইরে যান।’

আজও অরুণার হাতে বিলুর মাংসের গন্ধ লেগে আছে। লেগে আছে ঘিলুর আঁশটে গন্ধ। ওয়াক তুলে বেসিনের দিকে দৌড় লাগান তিনি। বমি হবে। হবেই।

অরুণাকে বেসিনের দিকে ছুটে যেতে দেখে মনোজ ছুটে যান। অরুণার কাঁধ খিমচে বলেন, ‘কী হল? শরীর খারাপ লাগছে? বমি করবে?’

‘তুমি আমায় ছোঁবে না।’ বিবমিষা ভুলে গিয়ে তীক্ষ্ণ চিৎকার করেন অরুণা। ‘আমার গা নোংরা হয়ে যাবে। তোমায় গা থেকে ঋষিতার গন্ধ আসছে। সরে যাও তুমি।’

অভি মায়ের পাশে এসে বলে, ‘কী হল মা? বাবার ওপরে রাগ করছ কেন?’

‘রাগ করছি না। ঘেন্না করছি। আমি তোর বাবাকে ঘেন্না করি। আমার সারা জীবনটা নোংরা করে দিল। পাঁকে ভরিয়ে দিল আমার জীবন।’

মনোজ অরুণাকে ছেড়ে দেন। মাথা নীচু করে সোফায় গিয়ে বসেন। রাজনৈতিক লড়াইয়ের সময় একজন যোদ্ধা কাছের মানুষের মধ্যে আশ্রয় খোঁজে। মনোজের সে আশ্রয় নেই। তিনি এখন যান কোথায়? জীবনযাপনের জন্য অল্প একটু ভালোবাসা লাগে। খুঁদকুড়োর মতো ভালোবাসা পেলেও মানুষ লড়াই জারি রাখে। নিজেকে ভরসা দেয় যে সব ঠিক হয়ে যেবে। ‘ও’ তো আছে!

যারা ভাগ্যবান, তাদের ভালোবাসার পাত্র হয় বউ। পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষই অভাগা। তারা অপর নারী বা অপর পুরুষকে ভালোবেসে, বিনিময়ে কোনও ভালোবাসা না পেয়ে অর্থহীন জীবন কাটায়। অনেকে ভালোবাসা বিলোনোর জন্য মানুষও পায় না। তারা সাহিত্য, সিনেমা, থিয়েটার, মদ—এসব জিনিসকে ভালোবাসার অভিনয় করে।

জীবনে ভালোবাসা না থাকলে মানুষ মরে যেতে পছন্দ করে। কিন্তু আত্মহত্যা করার সাহস ক’জনের হয়? মনোজের সাহস নেই। সোফায় বসে, কপালে হাত দিয়ে মনোজ ভাবেন, বাকি জীবনটা তাহলে এই ভাবেই কাটবে। মানসিক ভাবে অসুস্থ স্ত্রী আর মৃত বড় ছেলের স্মৃতি নিয়ে ভারবাহী গাধার মতো মৃত্যুর দিকে ক্রমাগত এগিয়ে যেতে হবে। ওয়ান ওয়ে টিকেট!

‘মা, তোমার সবকিছু মেনে নেওয়া যায়। শুধু ঋষিতার প্রসঙ্গ ছাড়া।’ শান্ত কণ্ঠে অরুণাকে বলছে অভি। মনোজ আমর্ম চমকে উঠলেও বাইরে প্রকাশ করলেন না। কপাল হাত রাখা অবস্থায় আঙুলের ফাঁক দিয়ে ছোট ছেলেকে দেখলেন। এই ছেলেটা সব জানে। বিলুকে দাহ করার সময় ওর ক্লাসমেট দময়ন্তী মনোজকে চিনতে পেরেছিল। ঋষিতার অফিস দময়ন্তীর বাড়ির একতলায়। কলেজে এই নিয়ে নিশ্চয়ই আলোচনা হয়েছে। বিলুর মৃত্যুর রাত থেকে মনোজ অভির চোখে চোখ রাখতে পারেন না।

‘ঋষিতা নামে কোনও মেয়ে নেই। ওটা তোমার কল্পনা। তোমার প্যারানইয়া হচ্ছে।’ অরুণার মাথায় হাত বুলোচ্ছে অভি।

‘ঋষিতা আছে। একবার ফোন ধরেছিল।’ চিৎকার করে ওঠে অরুণা। ‘ওর কাছে যাওয়ার জন্য তোর নোংরা বাপটা রোজ আমায় মিথ্যে কথা বলত।

‘ঋষিতা নামের তিন হাজার মেয়ে থাকতে পারে। সেটা বড় কথা নয়। কিন্তু বাবার সঙ্গে এই রকম কোনও মেয়ের যোগাযোগ নেই। তুমি অন্যায় অভিযোগ করছ। বাবার হাজার একটা দোষ থাকতে পারে। সে সব নিয়ে গালাগালি দাও। ঝগড়া করো। কিন্তু কাল্পনিক একটা চরিত্র নিয়ে অশান্তি কোরো না।’

অরুণা মাথা নীচু করে কাঁদছেন। বলছেন, ‘আমার কী রোগ আছে? কী বললি তুই?’

‘প্যারানইয়া। সন্দেহবাতিক। এক ধরনের মানসিক সমস্যা। তোমার ডাক্তার দেখানো উচিত মা। মনের ডাক্তার।’

‘তার থেকে বল না কেন পাগলের ডাক্তার। তার থেকে বল না কেন যে আমি পাগল। এক তলায় রাধা পাগলি আর দু’তলায় অরুণা পাগলি। তোরা আমাকে পাগলা গারদে রেখে আয়। ওরা আমাকে লোহার চেন দিয়ে বেঁধে রাখবে আর ইলেকট্রিক শক দেবে। আমার ওই ভালো।’

‘মা, মা, মা…’ অরুণাকে জড়িয়ে ধরে অভি। ‘এত দুঃখবিলাস ভালো না। তোমার কিস্‌সু হয়নি। শুধু মন খারাপ। আমাকে ডাক্তার হতে দাও। আমি তোমাকে হানড্রেড পারসেন্ট ভালো করে দেব।’

‘সত্যি বলছিস?’ ঝলমলিয়ে হাসছেন অরুণা। ‘তুই ডাক্তার হয়ে আমাকে ভালো করে দিবি? আমার গা ছুঁয়ে প্রতিজ্ঞা কর যে বিলুর মতো হঠাৎ সব ছেড়ে উধাও হয়ে যাবি না? আমার গা ছুঁয়ে বল, তুই বড় ডাক্তার হবি? বল!’

অরুণার মাথায় হাত বুলিয়ে অভি বলে, ‘এত মেলোড্রামা করার দরকার নেই। এই কথাগুলোই তুমি অন্যভাবে বলতে পারো।’

‘আমি কম লেখাপড়া জানতে পারি। কিন্তু আমি তোর মা। ড্রামা করি আর যাই করি, তোর ভালো বই মন্দ চাই না। তুই আমায় ছুঁয়ে বল, মন দিয়ে পড়াশুনো করব?’

অরুণার কথাগুলো অভির বুকে গিয়ে ধাক্কা মারল। এন্তার কবিতা পড়ে, বিদেশি গপ্‌পো-উপন্যাস পড়ে অনুভূতিগুলো প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সূক্ষ্ম হয়ে গেছে। সে বড্ড বেশি সিভিলাইজ্‌ড হয়েছে। রুচিসম্পন্ন হয়েছে। মা ও সন্তানের সম্পর্কের যে চিরায়ত চেহারা—তা বহু ব্যবহারে জীর্ণ। ক্লিশে। ‘জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপী গরিয়সী’ থেকে শুরু করে ‘ও আমার দেশের মাটি’—সবটাই মেলোড্রামা বলে মনে হয়।

আজ হঠাৎ সেই পুরোনো, মোটা দাগের অপত্যস্নেহ দড়াম করে বুকে লাগল। অভি বুঝতে পারল, যতই আধুনিক হও না কেন, মা আর সন্তানের বন্ধন একটা জৈবিক, তপতপে ঘটনা। ভীষণ রিয়্যাল, ভীষণ অর্গ্যানিক। যার আবেদন হৃদয়ের জলসাঘরে। মস্তিষ্কের ব্যায়ামাগারে নয়। চোখের জল মুছতে মুছতে অভি বোকার মতো বলল, ‘হ্যাঁ। আমি মন দিয়ে পড়াশুনা করব।’

মনোজ এখনও মাথায় হাত দিয়ে সোফায় বসে। অভির দিকে তিনি অন্য হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। মনোজের হাত ক্ষণেকের জন্য ধরে অভি ছেড়ে দিল। স্পর্শের মাধ্যমে বলতে চাইল, ‘এই একবারই তোমাকে বাঁচালাম। আর কোনওদিনও বাঁচাবো না। এবার তুমি নিজে বোঝো।’

নীরবে ঘাড় নাড়লেন মনোজ। অভির না বলা কথা তিনি শুনতে পেয়েছেন।

তিনতলার ঘরে না গিয়ে একতলায় নামল অভি। টিভিতে এখনও মিছিলের ছবি। এখনও অজস্র কালো কালো মাথা। এখনও অজস্র প্ল্যাকার্ডে ডানাওয়ালা জোয়াকিমরা উড়ছে। এখনও দেখা যাচ্ছে নাগরিক সমাজের সম্মিলিত ধিক্কার!

.

মানদা পায়ের লোম কামাচ্ছিল। অভিকে ঢুকতে দেখে হুড়মড়িয়ে আয়না, শেভিং ব্লেড, রেজার, সব তক্তপোষের তলায় ঢুকিয়ে বলল, ‘মেয়েমানুষের ঘরে ঢোকার আগে দরজা খটখট করতে হয়, এটাও জানো না? এখন তো আর কচি খোকা নও।’

অভি বুঝতে পারল এখন মানদাকে ঘাঁটানো ঠিক হবে না। সে বিষয় বদলে বলল, ‘আজ এত সাজগোজ কীসের? নন্দনদা আসবে নাকি? বিকেল করে তো কখনও আসে না! এলে তো রাতে থেকে যেতে হবে!’

‘ঝিয়ের ব্যাপারে তোমার নাক গলানোর কী দরকার?’ তেড়ে ওঠে রাধা। ‘তোমার না সামনে পরীক্ষা? তোমার মা দুঃখ করছিল যে বড় ছেলেটা পলিটিক্‌স করে মরে গেল। আর ছোট ছেলেটা পদ্য লিখে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।’

‘ওর বাবা কী বলছিল সেটা বলো।’ পাশ থেকে ধরতাই দেয় মানদা, ‘পলিটিক্‌স করলেও বড়োটা বছর বছর পাশ করত। পদ্য লিখে এ শুধু ফেলই করছে।’

অভি ভয়ংকর লজ্জা পেল। পরপর দুটো এমবিবিএসে ফেল করার কথা সে বাড়িতে বলেনি। মনোজ-অরুণা তার পড়াশুনো নিয়ে মাথা ঘামান না। কবে পরীক্ষা এল, কবে রেজাল্ট বেরোল, কবে সাপ্লি পরীক্ষা এল, কবে তার রেজাল্ট বেরোল— এই নিয়ে কারও কাছ থেকে কখনও, কোনও প্রশ্ন শোনেনি অভি। আজ বুঝতে পারছে, ওঁরা সব জানতেন। হয় বিলু বলেছিল। অথবা ওঁরা চিলেকোঠার ঘরে ঢুকে ফাইল খুলে ডাব্‌ল মার্কশিট দেখেছেন।

দ্বিতীয় অনুমানটা মাথা থেকে উড়িয়ে দিল অভি। ওই ফাইল খুঁজে বের করা ওঁদের পক্ষে অসম্ভব। প্রথম অনুমানটাই ঠিক।

ভেজা চোখে ঘাড় নাড়ে অভি। মৃত দাদার উদ্দেশে বলে, ‘আমি তোকে ভয় দেখিয়ে বলতাম, “সিগারেট খাচ্ছিস? বাড়িতে বলে দেব।” “পলিটিক্স করিস? বাড়িতে বলে দেব।” কোনও দিন বলিনি। আর তুই কি না আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করলি? ছ্যাঃ!’

অভির কাঁধে রাধার হাত। রাধা বলল, ‘জানো বোধ হয়, জিনিয়াস আর পাগলের মধ্যে বিশেষ কোনও তফাত নেই। আমি জিনিয়াস না পাগল বলো তো?’

‘দুটোই,’ চোখ মুছে উত্তর দেয় অভি। এবার রাধার খ্যাপামো শুরু হবে।

‘বোকা ছেলে। আমি কোনওটাই নই। আমি শুধু তাঁর উপাসক। এখন তো তাঁর নাম নেওয়াও অপরাধ। পুলিশ পিটবে, সরকার পিটবে, লোকাল কমিটি পিটবে, তোমার বাপ-মাও পিটবে। আমি তাই পাগলের ভেক ধরে থাকি। যেদিন সময় হবে তুমি রাধা পাগলির আসল রূপ দেখতে পাবে।’

‘এহঃ! ভুলভাল বকছে!’ ভেংচি কাটে মানদা।

‘সেই কথাই তো বলছি মুখপুড়ি!’ মানদার গালে ঠোনা মেরে অভির দিকে তাকিয়ে রাধা বলে, ‘মানুষের স্নায়ু সব সময় স্বতোৎসারিত গ্রহণযোগ্যতা খোঁজে। তোমার হৃদয়ই তোমার অস্তিত্বকে গড়ে দেয়। কিন্তু তোমার মধ্যে সেই প্রায়োগিক হাহাকার কই? তাই বলি, মন দিয়ে পড়ো। মায়ের মাথাটা ভালো করে দাও আর আমার মাথাটা পুরোপুরি খারাপ করে দাও। এত আধপাগলের মধ্যে বেঁচে থাকা অর্থহীন। তিনি সব জানেন! তবু কেন যে পরীক্ষা নিচ্ছেন!’

রাধার বলা কথাগুলোর মানে বোঝার চেষ্টা করছে অভি, এমন সময়ে মানদার দিকে তেড়ে গিয়ে রাধা বলে, ‘তোর লিপিস্টিক মাখা শেষ হল? তিনি কখন থেকে রাস্তার ধারে অপেক্ষা করে আছেন। এবারে দেখা দে। বেচারা বিরহানলে কাতর হয়ে পড়েছেন। পাঁচ মিনিটের সাক্ষাতের জন্য আটঘণ্টার সফর। পিরিতিকে এমনি কাঁঠালের আঠা বলা হয় না।’

দু’জনের ঝগড়ার ফাঁকে অভি ঘর থেকে বেড়িয়ে আসে। তার মাথায় সম্পূর্ণ অন্য চিন্তা ঘুরছে। তার মাথায় ঘুরছে রাধা পাগলির বলা একটা কথা। ‘তাই বলি, মন দিয়ে পড়ো। মায়ের মাথাটা ভালো করে দাও।’

তিনতলায় উঠে চিলেকোঠার ঘরে ঢোকে অভি। একরত্তি ঘরে একটা সিঙ্গল বেড। বিছানায় সবুজ আর নীল রঙ মেশানো চাদর পাতা। মাথার বালিশ নোংরা, পাতলা, তেলচিটে। পাশ বালিশটা ধামসানো। মশারি না গুটিয়ে ছত্রির ওপরে তোলা। বিছানায় কাগজ, খাতা, কলম, ডাক্তারির বই। ঝুলভরা দেওয়ালে ময়লা বাল্ব জ্বলছে।

ঘরের অন্য দিকে বইয়ে ঠাসা বুক র‌্যাক। বাংলা ভাষার কবিদের হেন বই নেই, যা অভির কাছে নেই। এছাড়া আছে অজস্র লিটল ম্যাগাজিন। বেশির ভাগটাই কেনা। কিছু কিছু এর ওর থেকে পাওয়া। এই সবের মধ্যে মেডিসিন, সার্জারি, পিডিয়াট্রিক্স আর অবজিন-এর টেক্সট বুক কোথায় হারিয়ে গেছে কে জানে।

অভি তিনবার জোরে শ্বাস নিল। তারপর নিজেকে দু’ঘণ্টা সময় দিল ঘরটাকে বাসযোগ্য করে তোলার জন্য।

.

রাত দশটার সময় ঘরের চেহারা বদলে গেছে। দেওয়ালে ঝুল নেই। বাল্বের বদলে জ্বলছে সিএফএল। খাটের পাশে একটা ছোট টুল এসেছে। তাতে রাখা টেবিল ল্যাম্প আর এক জগ ঠান্ডা জল। খাটের বিছানায় ধবধবে সাদা বেডশিট ও বেড কভার। মেঝেয় গোল পাপোশ। বুকর‌্যাকে মোটা মোটা গোটা ত্রিশেক টেক্সট বই রাখা। অনেকগুলো বিলুর। বাকিগুলো অভির কেনা। সব কটা বইতে ব্রাউন পেপার দিয়ে মলাট দিয়ে, হাত ধুতে দোতলায় নামে অভি। কবিতার বইগুলো বসার ঘরের সোফায় ডাঁই করে রাখা রয়েছে।

মনোজ প্রশ্ন করলেন, ‘এগুলো নিয়ে কী করবি?’

‘আপাতত দাদার ঘরে রাখলাম। পরে বেচে দেব।’ ঠান্ডা গলায় বলে অভি।

অরুণা বলে, ‘বেচে দিবি কেন? আছে, থাক না!’

‘না। ওগুলোয় উইপোকা ধরেছে। থাকলে অন্য বই নষ্ট হয়ে যাবে।’ হাত ধোওয়া শেষ করে আবার তিনতলায় আসে অভি। ঢাউস একটা ব্যাগ কাঁধে নিয়ে নীচে নামে। মনোজ-অরুণাকে বলেন, ‘আমি একটু বেরোচ্ছি। এসে খাব।’

‘কোথায় যাচ্ছিস?’ একসঙ্গে প্রশ্ন করেন দু’জনে।

‘গঙ্গার ধার থেকে হাওয়া খেয়ে আসছি।’ সত্যি কথা বলে অভি।

আজ বৃহস্পতিবার। পূর্ণিমা। নতুন মাজা স্টিলের থালার মতো চাঁদ উঠেছে। জোৎস্না আলো ছড়াচ্ছে ইলেকট্রিক সাপ্লাইয়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। রাস্তায় কয়েকটা কুকুর নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করছে। লক্ষ্মী নিবাসের রোয়াকে বসে পঞ্চপাণ্ডব আড্ডা মারছে। আড্ডা ওদের অক্সিজেন।

অভির অক্সিজেন কবিতা। কবিতা অভির লাইফলাইন। আজ সে নিজের হাতে লাইফলাইন কাটবে। আজ সে সাঁতার না জেনে ঝাঁপ দেবে অথৈ জলে। আজ থেকে হয় এসপার, নয় ওসপার!

মায়ের কথায় নয়, বাবার কথায় নয়, রাধা পাগলির কথায় নয়, মানদাদির কথায় নয়। তার ভিতর থেকে ডাক এসেছে। পুরোনো জীবনের খোলস ত্যাগ করে, নতুন জীবনে প্রবেশ করার ডাক। স্কুল জীবনে সে পড়াশুনোয় আগাগোড়া ভালো ছিল। কলেজে ঢুকে তার কী হল, যে সে এখন খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে?

একটা প্রেম হল। সেটা কেন কেটে গেল, আজও জানে না অভি। অল্প রাজনীতি হল। ভোটে হেরে গিয়ে সেখান থেকেও বিদায়। পড়াশুনা একদমই হল না। পরপর দুটো এমবিবিএসে সাপ্লি। ওদিকে বাড়িতে মানসিক ভাবে অসুস্থ মা আর পরকীয়ায় ব্যস্ত বাবা। রাজনীতির প্যাঁচে দাদাটা সুইসাইড করল।

প্রেমে ঝাড়, পলিটিক্সে ঝাড়, পড়াশুনোয় ঝাড়, ফ্যামিলি লাইফে ঝাড়। মার খেতে খেতে অভি এখন পাথর। এবার সে ঘুরে দাঁড়াবে। জাস্ট একবার ঘুরে দাঁড়াবে। এই নিষ্ঠুর জীবনের চোখে চোখ রেখে একটা পাল্টা মার দেবে। তারপর যা হবার হবে।

অতীতে শুভ কাজের আগে বলি দেওয়া হত। অভিও শুভ কাজ করার আগে বলি দেবে তার কবি সত্ত্বাকে। অজস্র ব্যর্থতার মধ্যে একটাই আলোর রেখা ছিল। তার নাম কবিতা। আজ তাকে গঙ্গায় ভাসান দিতে যাচ্ছে অভি।

গঙ্গার ধারে এখন কেউ নেই। ওপারে দেখা যাচ্ছে দক্ষিণেশ্বরের মন্দির, বালি ব্রিজ, নিবেদিতা সেতু, কাচের মন্দির, কাশীপুরের কারখানার তিন চিমনি। সামনে গঙ্গার জল ছলাত ছল করছে।

ব্যাগ থেকে একের পর এক লিটল ম্যাগাজিন বার করে অভি। এইসব ম্যাগাজিনে তার কবিতা আছে। এরা তার সন্তানবৎ।

তাহলে শিশুবলি হোক। এক এক করে ত্রিশটা পত্রিকা জলে ভাসিয়ে দেয় অভি। জল খেয়ে ফুলে গিয়ে পত্রিকাগুলো কিছুক্ষণ ভাসে, তারপর ডুবে যেতে থাকে। ভেসে যায় অন্যদিন, দীর্ঘশ্বাস, জিরাফের গান, বোবাকান্না, জলপিপি। ভেসে যায় অন্তহীন, মোমের আলো, মৃতস্বর, বৃষ্টিরাত, সবুজ মেঘ। সব ভেসে যায়।

সবশেষে ব্যাগ থেকে অভি বার করে তার কবিতার খাতা। এই খাতা তার প্রাণ। প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত মিলে এতে প্রায় শ’খানেক পদ্য আছে। খাতাটা হাতে নিয়ে ব্যাংবাজি করার কায়দায় গঙ্গায় ছোড়ে সে। ভারি শব্দ করে খাতা জলে আছড়ে পড়ে। তারপর তলিয়ে যায়। কোনও আলোড়ন, কোনও জলোচ্ছ্বাস, কোনও দ্বিতীয় লাফ দেখা যায় না।

দ্বিতীয় লাফ দেখার জন্য অভি দাঁড়িয়ে নেই। সে গঙ্গার ঘাটের সিঁড়ি দিয়ে লাফাতে লাফাতে উঠছে। লক্ষ্মী নিবাসের দিকে দৌড়চ্ছে। টাঁকশাল থেকে সদ্য বেরোনো চকচকে আধুলির মতো নতুন জীবন সামনে গড়াচ্ছে। তাকে ধরতে অভি দৌড়য়।

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *