৩৭. অভিজ্ঞান ও বৃন্দা
‘চললাম। তোদের শহর ছেড়ে। এ-বি-সি-ডি-র মধ্যে সি আর ডি গায়েব। সি ফর চণ্ডীগড়। ডি ফর লন্ডন। এ আর বি-র কী হবে?’
টুং করে মেসেজটা ঢুকল অভির মোবাইলে। মেসেজটা পড়ে মোবাইলে সময় দেখল অভি। সন্ধে ছ’টা বাজে। রাউন্ড দিতে যেতে হবে। কিন্তু বাইরে ঝড় আর বৃষ্টি তাণ্ডব চালাচ্ছে। ঘণ্টায় আশি থেকে নব্বই কিলোমিটার বেগে হাওয়া এসে আছড়ে পড়ছে জানলার কাচে। থেকে থেকেই জানলা-দরজা কেঁপে উঠছে। অনেকক্ষণ ধরে বিদ্যুৎ নেই। লোডশেডিং হওয়ার আগে মেসের টিভিতে খবর শুনেছিল অভি। আবহাওয়ার পরিস্থিতি ভয়ংকর। মৃন্ময় চ্যাটার্জি বললেন, ‘দক্ষিণবঙ্গের চারটি জেলা ইতিমধ্যে বন্যাকবলিত। ডিভিসি বলেছে আগামী চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে এক লক্ষ কিউসেক জল ছাড়বে। তাহলে পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটবে। দক্ষিণবঙ্গের আরও চারটি জেলায় বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। রাইটার্স বিল্ডিং-এ বিশেষ কনট্রোল রুম চালু হয়েছে। চালু হয়েছে হেল্পলাইন। দুটোই চব্বিশ ঘণ্টা খোলা। ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট টিম কাজ শুরু করে দিয়েছে। আর্মি এবং প্যারামিলিটারি ফোর্সও কাজ করছে। আগামিকাল সকাল থেকে হেলিকপ্টারে করে ত্রিপল এবং চিঁড়ের প্যাকেট ফেলা শুরু হবে। উত্তরবঙ্গে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি না হলেও দক্ষিণে দশলক্ষ লোক এর মধ্যেই গৃহহীন। তারা উঁচু রাস্তা, নদীবাঁধ, পাকা বাড়ি বা গাছের উপরে ভিজছে।’
টিভি দেখতে বিচ্ছিরি লাগছিল অভির। প্রকৃতির কাছে মানুষ কী ভীষণ অসহায়! মানুষ গত কয়েক শতাব্দী ধরে পৃথিবী নামের এই গ্রহর উপরে এত অত্যাচার করেছে যে পৃথিবী এখন প্রতিশোধ নিচ্ছে।
মোবাইল রেখে বিছানা থেকে ওঠে অভি। ঘর এখন খালি। রুমমেট দীপ চলে গেছে চণ্ডীগড়। এমডিতে চান্স না পেলে ফেরত আসবে। যদি চান্স পেয়ে যায়, তাহলে ওর বেডে নতুন কেউ আসবে। বাইরের দিকের একটা জানলা একটু খোলে অভি। মোটা, রাগী, বেগবান বৃষ্টিকণা বুলেটের মতো আছড়ে পড়ে মুখে। কী তেজ রে বাবা! তাড়াতাড়ি জানলা বন্ধ করে অভি মেডিসিন ওয়ার্ডে ফোন করে। পরিচিত সিস্টার ফোন ধরে অভির গলার আওয়াজ চিনে বলে, ‘ডক্টর লাহিড়ী? আপনাদের ইউনিটে দশজন পেশেন্ট ভর্তি আছে। তার মধ্যে আটজন সুস্থ। কাল এসে ছুটি করে দেবেন। আমাদের সিস্টাররা বাড়ি যেতে পারছে না। ওয়ার্ডে এখন অনেক স্টাফ। আপনার না এলেও চলবে।’
‘ঠিক আছে।’ ফোন কাটে অভি। ক্র্যাকপিজির স্টাডি মেটিরিয়াল নিয়ে বসে। ওয়ার্ডে যখন যেতে হবে না তখন ছ’টা থেকে আটটা সলিড পড়াশুনো হবে। অ্যানাটমির এমসিকিউ দিয়ে শুরু করল অভি। গোটা পাঁচেক এমসিকিউ করার পরে মোবাইল হাতে নিল। দময়ন্তীর পাঠানো মেসেজ আবার পড়ল। ‘চললাম। তোদের শহর ছেড়ে। এ-বি-সি-ডি-র মধ্যে সি আর ডি গায়েব। সি ফর চণ্ডীগড়। ডি ফর লন্ডন। এ আর বি-র কী হবে?’
এ ফর অভি। বি ফর বৃন্দা। ব্রাউনিয়ান মোশনের তত্ত্ব মেনে দুটো কণা একই স্পেসে ঘোরাঘুরি করার সুবাদে পরস্পরের কাছে এসেছিল। মুহূর্ত পরে ছিটকে দূরে সরে গেছে। ভবিষ্যতে আর কখনও আসবে কি না কেউ জানে না।
অঙ্ক নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় নেই অভির। সে অন্য কথা ভাবছে। চন্দন তার পাঁচ বছরের কলেজে জীবনে যত রকম বদমায়েসি করে থাকুক না কেন, পড়াশুনোটা মন দিয়ে করেছে। তার ফলও পেল। চণ্ডীগড়ের পিজিআই থেকে এমএস করার পরেও ও থামবে না, অভি নিশ্চিত। এফআরসিএস করতে লন্ডন যাবে। তারপরে কলকাতায় ফিরবে। বিদেশে থিতু হওয়ার মানসিকতা চন্দনের নেই। যতই বিদেশের আকাশে ডানা মেলুক না কেন, ওর শিকড় বাংলার মাটিতে গাঁথা।
দময়ন্তী ফিরবে না। ওর মতো মেয়েরা ফেরে না। ওর শিকড় বলে কিছু নেই। শুধু ডানা আছে। হয়তো ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশানের চাকরি নিয়ে ইথিয়োপিয়া চলে গেল। হয়তো কোনও চাইনিজ ছোকরার সঙ্গে লিভ টুগেদার করবে বলে চায়নার গুয়াংডং প্রদেশে ছ’বছর রয়ে গেল। হয়তো কোনও আফ্রিকান পরিবেশ-বিজ্ঞানীকে বিয়ে করে আমাজন অববাহিকার রেন ফরেস্টে তাঁবু গাড়ল। সাদা, কালো, হলদে বা বাদামি এক-দুটো বাচ্চা নিয়ে, স্বামী বা পার্টনারের সঙ্গে ভালোবেসে বা ঝগড়া করে, ডিভোর্স করে বা না করে, ঘুমের ওষুধ খেয়ে বা না খেয়ে, ডাক্তারি ভুলে গিয়ে অথবা ভীষণ মনোযোগ দিয়ে ডাক্তারি করে একদিন চুল পাকিয়ে ফেলবে। এরা সারা জীবন গুমরে মরে। কিন্তু হাসিঠাট্টায়, জীবনীশক্তিতে, প্রাণোচ্ছ্বলতায় আশপাশ মাতিয়ে রাখে। মনের মধ্যে ভীষণ একা। সামাজিক হওয়ার অভিনয় করে।
তবে দময়ন্তী একজনকে কখনওই ভুলবে না। পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকুক না কেন, অনাবিল লাহিড়ীর স্মৃতি ওর ঘাড়ে সিন্ধবাদের গল্পের দানোর মতো চেপে বসে থাকবে!
দাদার কথা মনে পড়তে নিজের ওপরে বিরক্ত হয় অভি। আজ কী হয়েছে তার। টিপিকাল বাঙালিদের মতো পুরোনো দিনের কথা মনে করে হা-হুতাশ! ন্যাকামির একটা লিমিট থাকা উচিত। নিজেকে দাবড়ানি দিয়ে আবার অ্যানাটমি নিয়ে বসে অভি। এক ধাক্কায় একশোটা এমসিকিউ নামিয়ে ফেলে!
টুং! মোবাইলে মেসেজ আসার আওয়াজ হল। ফোন হাতে নিয়ে মেসেজ পড়ে অভি। ‘চললাম। তোদের শহর ছেড়ে। এ-বি-সি-ডি-র মধ্যে সি আর ডি গায়েব। সি ফর চণ্ডীগড়। ডি ফর লন্ডন। এ আর বি-র কী হবে?’
দময়ন্তীর মেসেজটা আবার ঢুকল? মাঝে মধ্যে এমন হয়। নেটওয়ার্কের সমস্যার জন্য একই মেসেজ সাত-আটবার চলে আসে। আজ আবহাওয়ার যা অবস্থা, নেটওয়ার্ক যে বেঁচে আছে এই যথেষ্ট। স্যাটেলাইটের এতক্ষণে সর্দিকাশি হয়ে যাওয়ার কথা। মেসেজটা মুছতে গিয়ে প্রেরকের নাম দেখে চমকে ওঠে অভি। দময়ন্তী নয়, মেসেজটা তাকে পাঠিয়েছে বৃন্দা!
হতচকিত হয়ে যায় অভি। এটা বোঝা যাচ্ছে যে এই মেসেজ দময়ন্তী তাদের দু’জনকেই পাঠিয়েছিল। কিন্তু বৃন্দা হঠাৎ তাকে মেসেজটা ফরোয়ার্ড করতে গেল কেন? কী বলতে চায় মেয়েটা? নাকি কিছু বলতে চায় না? অভির প্রসঙ্গ আছে বলে ক্যাজুয়ালি ফরোয়ার্ড করেছে?
.
তেরো নম্বর ঘরে বসে বৃন্দা আর ফুলমতিয়া গল্প করছে। ফুলমতিয়া বলছে, ‘নতুন যে মেয়েগুলো হোস্টেলে এসেছে, তারা কী বেশরম দিদি! ঘরে জাঙিয়া পেহনে থাকে।’
‘আহ! জাঙিয়া নয়। ওগুলো প্যান্টি। আই মিন আন্ডারগারমেন্ট।’
‘একই হল। যার নাম চালভাজা, তারই নাম মুড়ি। তা-ও শুধু নিচেরটা পেহনে। ওপরেরটা পেহনে না। একুশ নম্বর ঘরের মেয়ে দুটো আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মাপে, কারটা বেশি বড় আছে আর কারটা বেশি উঁচু আছে। ছি-ছি!’
‘ওদের ঘরে তোমার ঢোকার কী দরকার?’
‘আহা! আমাকে কাজ করার জন্যে বুলালো তো। ওদের ঘরে সপ্তাহে একদিন পার্টি হয়। আরও তিন চারটে মেয়ে আসে। গান চালিয়ে ডান্স-মস্তি করে। অন্য মেয়েগুলো চলে গেলে ওরা নিজেদের মধ্যে লদকালদকি করে। ওরা লেসু আছে।’
‘লেসু? মানে লেসবিয়ান? তুমি জানো ব্যাপারটা কী?’ বৃন্দা অবাক।
‘না জানার কি আছে? আমাদের গাঁওতে দুটো মেয়ে ছিল। একটা চামারের মেয়ে, আর একটা নাপিতের মেয়ে। চামারের মেয়েটা প্যান্ট পেহেনতো, বিড়ি পিতো, ছেলেদের মতো বাল কাটত। আর নাপিতের মেয়েটা সিনিমার হিরোইনদের মতো শাড়ি পেহনে ওর সঙ্গে ঢলাঢলি করত। পঞ্চায়েত থেকে নিদান দিল, ওদের ওপরে ভূতে ভর করেছে। কারা যেন চামারের মেয়েটাকে রেপ করে খুন করল। নাপিতের মেয়েটার শাদি হয়েছিল। লেকিন ও সুইসাইড করে।’
‘একটা মেয়েকে রেপ করে খুন করা হল, কেউ আপত্তি করল না?’
‘কে আপত্তি করবে দিদি? ওটা কলকাতা শহর নয়। গাঁও। ওখানে ছেলে-মেয়েতেই পেয়ার চলে না। মেয়ে-মেয়ে কী করে চলবে? আমি তোমাদের জীবনদাকে বলেছিলাম ওদের অন্য গাঁও পাঠিয়ে দিতে। ও উল্টে আমাকে মারধর করল। সাধে আমি গাঁও যেতে চাই না? ওখানে আমার কয়েক বিঘে জমি আছে। চাষবাস হয়। শ্বশুর-শাশুড়ি আছে। লেকিন ওখানে গেলে আমি হাঁফিয়ে যাই। দিনরাত ঘুঙ্ঘট দিয়ে থাকতে হয়। নীচু গলায় কথা বলতে হয়। বাড়ির সারা কাজ সামহালতে হয়। ঝামেলার ব্যাপার। আমি এখানেই ভালো আছি। কত কিছু দেখতে পাই। কত নতুন জিনিস শিখি।’
‘যেমন লেসু শিখেছ?’ খিলখিলিয়ে হাসে বৃন্দা।
‘পেয়ার মহব্বত তো ভালো জিনিস। ছেলে হোক বা মেয়ে। দিঠিদিদি বিলুদার সঙ্গে কী মজা করে থাকত। বিলুদা মরে যাওয়ার পরে খ্যাপাটে হয়ে গেল। পেয়ার জীবনকে একটা মতলব দেয়। বকরাকে খুলে রাখো, সে ‘ম্যাম্যা’ করে দৌড় লাগাবে। ঘাস খেতে অন্য গাঁও চলে যাবে। সেই গাঁওয়ের লোক বকরাকে কেটে খেয়ে লিবে। কিন্তু যদি খোঁটায় বেঁধে রাখো, তাহলে বকরা ঘাস ভি খাবে, ‘ম্যাম্যা’ ভি করবে, ঘুরপাক ভি খাবে। দূরে কোথাও যাবে না। পেয়ার ওই খোঁটা। ওটা না থাকলে তুমি বেহকি হুয়ি অওরতের মতো ঘুরে বেড়াবে। দিঠিদিদির মতো।’
‘উরেব্বাস! কী ফিলজফি দিলে গুরু। একটু লেগ ডাস্ট দাও।’ ফুলমতিয়াকে আওয়াজ দেয় বৃন্দা। পাশাপাশি দময়ন্তীর পাঠানো মেসেজটা অভিকে ফরোয়ার্ড করে।
কেন করলাম? পরমুহূর্তে নিজেকে প্রশ্ন করে বৃন্দা। এই মেসেজ যে অভি পেয়েছে সেটা মেসেজের বিষয়ই বলে দিচ্ছে। তা হলে পাঠানোর কী দরকার ছিল? অভির সঙ্গে তার ফোনালাপ বহুকাল বন্ধ। মেসেজ চালাচালিও বন্ধ। হঠাৎ সেই রীতি কেন ভাঙল? ইমপাল্স? না কোনও উদ্দেশ্য? ইমপালসের পিছনেও কি উদ্দেশ্য থাকে? যার কথা শুধুমাত্র সাবকনশাস জানে?
মেসেজ পাঠিয়ে বেকুবের মতো লাগছে। প্রসঙ্গ পালটাতে বৃন্দা ফুলমতিয়াকে বলল, ‘নিজের পেয়ার মহব্বত নিয়ে চিন্তা করো না? তোমাদের কোনও বাচ্চাকাচ্চা হল না কেন?’
‘জানো তো দিদি, এক লাইফে সব কিছু হয় না। অমিতা বচ্চনেরও হয় না। আমারও হয় না। দেখতে সুন্দর, লেখাপড়ায় ফার্স্ট, চাকরিতে ম্যানাজার, বউ হিরোইন, উঁচু বাড়ি, লম্বা গাড়ি—ও সব সিনিমায় হয়। লাইফে সব জিনিস অল্প পাওয়া যায়। সেটাই মেখেজুখে তরিবত করে খেলে সুখ। এন্টালিতে একটা অনাথ আশ্রম আছে। ওখানে সপ্তাহে তিনদিন সন্ধেবেলা যাই। আমার দিলে যে পেয়ার তৈরি হয়, সেটা বাচ্চাদের মধ্যে বিলিয়ে দিই। ওখানে গায়েগতরে খাটি। টাকাপয়সাও দিই। বাচ্চাগুলোর হাসিমুখ দেখলে নিজের বাচ্চার কথা আর মনে থাকে না।’
ফুলমতিয়াকে নতুন করে চিনছে বৃন্দা। দিনরাত্তির খারাপ কথা বলা, বাগানে গাঁজা চাষ করা, জীবনদার মাধ্যমে সেই গাঁজা ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে বিক্রি করার পাশাপাশি ফুলমতিয়া এইসবও করে? ইন্টারেস্টিং!
টুং করে একটা মেসেজ ঢুকল। মেসেজ পড়ার আগে বৃন্দা প্রশ্ন করল, ‘গাঁজা বিক্রির পয়সা দিয়ে কী করো? দেশে বাড়ি বানাচ্ছ?’
‘ধুস!’ হাত দিয়ে মাছি তাড়ায় ফুলমতিয়া। ‘ওখানে গিয়ে আমি থাকতে পারবো না। ওই টাকা অনাথ আশ্রমে দিয়ে দিই। বাচ্চাগুলোর খাওয়ার ব্যবস্থা হয়। আশ্রমটার টাকাপয়সা খুব কম। গরমেন্টের টাকা এই মাসে আসে তো পরের মাসে আসে না।’
বৃন্দা ফুলমতিয়ার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। বলল, ‘তোমাকে আমার পেন্নাম করা উচিত। কিন্তু করছি না। কারণ আমাকে এক্ষুনি বেরোতে হবে।’
‘হেই মা! এই অলুক্ষুণে বৃষ্টিতে কোথায় যাবে?’ কপাল চাপড়ে বলে ফুলমতিয়া।
‘এক্ষুনি যে মেসেজটা ঢুকল সেটা অভি পাঠিয়েছে। ও লিখেছে যে দিঠির বাবা-মায়ের গাড়ি ন্যাশনাল হাইওয়েতে অ্যাক্সিডেন্ট করেছে। ওঁরা দিঠি বা চন্দনকে ফোন করেননি। কারণ, দু’জনেই এখন ফ্লাইটে। দিঠির মা অভিকে ফোন করেছিলেন। অভি আমাকে মেসেজ করেছে। আমি আর অভি এখনই নতুনগ্রামের দিকে রওনা দেব।’ ফোন করতে করতে বলে বলে বৃন্দা।
‘কাকে ফোন করছ?’
‘বাবাকে। একটা উঁচু গাড়ি পাঠানোর জন্য।’ পোশাক বদলাচ্ছে বৃন্দা।
.
পোশাক বদলাচ্ছে অভিও। শর্ট্স আর টি-শার্ট পরল। ন্যাপসাকে ভরল রেনকোট, ছাতা, নাইলনের দড়ি, টর্চ, মোবাইল চার্জার, দু’সেট জামাপ্যান্ট, একগাদা পলিপ্যাক। কী ভেবে শুকনো চিঁড়ের প্যাকেটও ঢোকাল। চন্দনের বাড়ি যেতে ঘণ্টাচারেক লাগবে। এত কিছু না নিলেও চলত। তবে রিস্ক নিয়ে কাজ নেই। ওয়েদার আরও খারাপ হচ্ছে। জানলা খুলে আবার বাইরের দিকে তাকায় অভি। সিসে রঙের আকাশ। নোংরা মশারির মতো বৃষ্টিপাত। ভিজিবিলিটি নেই। এই আবহাওয়ার রাস্তায় আটকে পড়লে বিপদ আছে। কিন্তু কী আর করা যাবে? বৃন্দার ফরোয়ার্ড করা মেসেজটা তার ফোনে ঢোকার পরে যে কাণ্ডটা হল!
মেসেজ আসার একটু পরেই অচেনা নম্বর থেকে ফোন এসেছিল। ফোন ধরে অভি বলেছিল, ‘হ্যালো?’
‘অভি? আমি শক্তিরূপা সেনগুপ্ত বলছি। দময়ন্তীর মা।’
‘ও হ্যাঁ… বলুন… বলুন কাকিমা!’ বেশ অবাক হয়ে বলেছিল অভি। কলেজ জীবনে কখনও দময়ন্তীর বাড়ি যায়নি সে। দময়ন্তীর বাবামায়ের সঙ্গে সামনাসামনি দেখা হয়নি। ফোনালাপ তো কখনওই নয়। আজ হঠাৎ? শক্তিরূপা তার মোবাইল নম্বর জানেন, এটাই অভি জানত না।
শক্তিরূপা বললেন, ‘একটা বিপদে পড়ে ফোন করেছি। আমাদের অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে।’
‘অ্যাক্সিডেন্ট? কোথায়?’
‘আমরা নতুনগ্রামে যাচ্ছিলাম। বৃষ্টির মধ্যে ভিজিবিলিটি ছিল না। আমরা নতুনগ্রাম চিনতে না পেরে আরও কয়েক কিলোমিটার এগিয়ে বাঁজাপলাশ গ্রামের কাছাকাছি চলে এসেছিলাম। সেখানে উল্টোদিক থেকে একটা লরি এসে হেড অন মেরেছে। দিঠি আর চন্দন ফ্লাইটে। স্যামি ব্যানার্জিকে ফোন করেছিলাম। রিং হয়ে গেল। বোধহয় ওটি করছেন। তোমাদের ব্যাচের অনেকের মোবাইল নম্বরই আমার ফোনে স্টোর করা আছে। বৃন্দার নম্বরটা খুঁজে না পেয়ে তোমাকে ফোন করলাম। আমি খুব হেল্পলেস ফিল করছি। তুমি এখানে আসতে পারবে?’
‘আপনাদের চোট লাগেনি তো?’
‘তোমার কাকুর হেড ইনজুরি হয়েছে। এখন আনকনশাস। আমার কাঁধের হাড় ভেঙে গেছে বোধহয়। ড্রাইভার স্পট ডেড।’
এক ঝটকায় বিছানা থেকে উঠে দাঁড়িয়েছিল অভি। বলেছিল, ‘আমি আসছি। আপনি চন্দনের বাবার সঙ্গে যোগাযোগ করুন। নম্বর আছে? না আমি দেব?’
‘আছে, থ্যাঙ্ক ইয়ু।’ ফোন কেটে দিয়েছিলেন শক্তিরূপা। অভি এই ফোনালাপের সারমর্ম মেসেজ করে দিয়েছিল বৃন্দাকে। শেষে লিখেছিল, ‘বাবাকে বলে একটা উঁচু গাড়ি যোগাড় কর। ড্রাইভার হিসেবে তোর সুলতান চাচুকে চাই।’ তারপর মেসেজ পাঠিয়েছিল বৃন্দাকে।
.
মোবাইলে টুং করে শব্দ হল। মোবাইল হাতে নিয়ে মেসেজ দেখল অভি। বৃন্দা পাঠিয়েছে। ‘আমরা এসে গেছি।’
ন্যাপস্যাক কাঁধে রুম থেকে বেরোয় অভি। রুমে তালা মেরে চাবি ন্যাপস্যাকের সাইড পকেটে ঢোকায়। তরতরিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নামে।
এনএইচকিউয়ের সামনে দাঁড়িয়ে স্যামির এসইউভি। চালকের আসনে সুলতান। পিছনের সিটে বসে রয়েছে বৃন্দা। মাথায় ছাতা ধরে গাড়ি পর্যন্ত পৌঁছয় অভি। এখানে অলরেডি হাঁটু পর্যন্ত জল। ভাগ্যিস সে শর্টস পরে বেরিয়েছে।
ছাতা বন্ধ করে গাড়িতে ওঠে অভি। সুলতান রিভার্স গিয়ারে গাড়ি ঘোরায়। অভি শোনে, বৃন্দা ফোনে বলছে, ‘মা, শোনো। ইটস নো বিগ ডিল। নতুনগ্রাম কলকাতা থেকে পঁচাশি কিলোমিটার। নরমাল দিনে গাড়িতে পৌঁছতে পৌনে দু’ঘণ্টা লাগত। আজকের ওয়েদারে চার ঘণ্টা লাগবে। যদি আজ ফিরতে না পারি তা হলে চন্দনের বাড়ি থেকে যাব। তুমি এত চাপ নিচ্ছ কেন? না, আমি তোমার কথা শুনব না। আমি যাব। আমি অভি আর সুলতান চাচুকে একা ছাড়ব না। নাও, অভির সঙ্গে কথা বলো।’
রাগে গজগজ করতে করতে অভির হাতে মোবাইল গুঁজে দেয় বৃন্দা। ‘নে, মায়ের সঙ্গে কথা বল।’
কতকাল বাদে বৃন্দা অভির সঙ্গে কথা বলল? কত বছর বাদে অভির হাত স্পর্শ করল বৃন্দার হাত? কত যুগ পরে বৃন্দা আর অভি এত কাছাকাছি? কত শতাব্দী পরে বৃন্দার গনগনে শ্বাস পুড়িয়ে দিচ্ছে অভির ত্বক?
অভি জানে না। অভি জানতে চায় না। ‘পুরানো সেই দিনের কথা’ মার্কা ছেঁদো সেন্টিমেন্ট সরিয়ে মোবাইল গালে ঠেকায় অভি। ‘বলুন।’
‘অভি, আমি কাকিমা বলছি। বৃন্দার মা। টিভিতে যা ক্লিপিংস দেখাচ্ছে, তাতে আমার বুক কেঁপে উঠছে। রূপনারায়ণের জল ক্রমশঃ বাড়ছে। ন্যাশনাল হাইওয়েতে এখনই গোড়ালিডোবা জল। টিভিতে বলছে ওয়াটার লেভেল আরও বাড়বে। তখন কিন্তু গাড়ি চলবে না। তুমি ওকে বোঝাও। ও যেন নতুনগ্রামে না যায়। ইনফ্যাক্ট তোমারও যাওয়া উচিত না।’
‘তাহলে দময়ন্তীর বাবা-মায়ের কী হবে কাকিমা?’
‘আহ! তার জন্য সরকার আছে। পঞ্চায়েত আছে। থানা-পুলিশ আছে। চন্দনের বাবা-মা আছেন। ওখানকার লোকাল লোকজন আছে।’
‘দময়ন্তীর মা তাদের ফোন করেননি। আমাকে ফোন করেছিলেন।’
‘ওফ! তোমরা তাহলে যাবেই? বৃন্দার বাবা ওটি করছেন। এখনও কিছু জানতে পারেননি। উনি জানলে তুলকালাম হয়ে যাবে। তুমি বৃন্দাকে ফোন দাও।’
অভির হাত থেকে ফোন নিয়ে বৃন্দা বলল, ‘রাখছি।’ তারপর ফোন কেটে দিয়ে বলল, ‘চলো সুলতান চাচু।’
সুলতান নির্বিকার মুখে স্টিয়ারিং ঘোরালো। অল ইন্ডিয়া মেডিকাল কলেজ অ্যান্ড হসপিটালের নিরাপদ ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে বাঁ-দিকে ঘুরে আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু রোড বরাবর এগোল মৌলালির দিকে।
আজ রাস্তা জনবিরল। বাচ্চারা স্কুলে আসেনি। প্র্যাট মেমোরিয়াল এবং সেন্ট জেমস স্কুলের সামনে রাস্তা ফাঁকা। মিন্টো পার্কের সামনে কোনও জ্যাম নেই। লা মার্টিনিয়ার ফর বয়েজ এবং গার্লস স্কুলের গেটে তালা। এক্সাইড মোড় ফাঁকা। অফিস যাত্রীদের দেখা যাচ্ছে না। পিজি হাসপাতালের সামনেটা শুনশান। অসুস্থ মানুষেরা হাসপাতালে আসতে পারছে না। সেকেন্ড হুগলি ব্রিজে গাড়ি নেই। কোনা এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে লরি বা ট্রাক চলছে না। ছ’নম্বর ন্যাশনাল হাইওয়েতে গোড়ালি ডোবা জল। দু’পাশের নীচু জনপদ আর ধানজমি, বাড়িঘর আর খেতখামার, দোকানপাট আর পার্টি অফিস একহাঁটু জলের তলায়। সুলতান গম্ভীর মুখে বলল, ‘আর একটু এগিয়ে ট্যাঙ্কি ফুল করতে হবে। এত পানিতে গাড়ি চালাতে অসুবিধে হবে।’
অবিশ্রান্ত বৃষ্টি পড়ছে। কাচ নামানোর উপায় নেই। এসি চলছে। বাইরের আওয়াজ, ঝড়ের দাপট, বৃষ্টিপাতের শব্দ কাচ ভেদ করে আসছে না। গাড়ির মধ্যে থমথম করছে নৈঃশব্দ্য। উলুবেড়িয়া পেরিয়ে গেল, বাগনান পেরিয়ে গেল, কোলাঘাটের ব্রিজ আসব আসব করছে। সুলতান বলল, ‘কোলাঘাটে তেল ভরব। তোমরা কিছু খেয়ে নাও। মেরে লিয়ে কিমা পরোটা অওর লস্যি প্যাক কর লেনা।’
অভি নড়েচড়ে বসল। ‘আপনি এখানে আগেও এসেছেন।’
‘শের-এ-পঞ্জাব ধাবা মে স্যার অওর ম্যাডাম রেগুলার খেতে আসত। গত পাঁচ সাল আসে না। বহোত উমদা খানা।’ পেট্রল পাম্পের সামনে গাড়ি রেখে বলে সুলতান। ‘তোমরা ছাতা নিয়ে রাস্তা পেরোও। ধাবা ওই ফুটে।’
অভি আর বৃন্দা ছাতা মাথায় রাস্তা পেরোয়। শের-এ-পাঞ্জাব নামেই ধাবা। আসলে বিশাল বড় রেস্তরাঁ। সঙ্গে আছে বার আর হোটেল। খাটিয়া যেমন আছে, তেমন এসি ডাইনিং রুমও আছে।
এত বৃষ্টির মধ্যেও ধাবার বাইরে গোটা দশেক গাড়ি দাঁড়িয়ে। সেগুলো টপকে এসি রেস্তরাঁয় ঢুকে চেয়ারে বসল বৃন্দা। বলল ‘কী খাবি?’
দেড়ঘণ্টা আগে বৃন্দা বলেছিল, ‘নে, মায়ের সঙ্গে কথা বল!’ এখন বলল, ‘কী খাবি?’ অভি মাথা নীচু করে ভাবছে। কত দিন, কত সপ্তাহ, কত মাস, কত বছর, কত যুগ, কত শতক পরে সে আর বৃন্দা আবার এক জায়গায়?
‘কী খাবি?’ আবার বলল বৃন্দা। মেনু কার্ড এগিয়ে দিল।
কার্ড না ছুঁয়ে অভি বলল, ‘তুই অর্ডার দে।’
বৃন্দা কিছুক্ষণ অভির দিকে তাকিয়ে রইল। নীচের ঠোঁট কামড়ে কী যেন ভাবছে! হঠাৎ বলল, ‘সরি!’ তারপর পাশে দাঁড়ানো ওয়েটারকে বলল, ‘একটা চিকেন বাটার মশালা, দুটো বাটার নান আর দুটো কফি। কফিটা শেষে দেবেন। একটা কিমা পরোটা, একটা চিকেন টিক্কা আর একটা লস্যি পারসেল হবে।’
‘ওকে ম্যাম!’ সদাব্যস্ত ওয়েটার চলে যায়। কবজিতে থুতনি রেখে অভি রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকে। বৃন্দা ‘সরি’ কেন বলল? কীসের জন্য দুঃখ প্রকাশ করল? আজ এমন কোনও কাজ করেনি যার জন্য দুঃখ প্রকাশ করতে হবে। অনেকদিন আগে বৃন্দা তার সঙ্গে যোগাযোগ রাখা বন্ধ করে দিয়েছিল। কেন, জানতে চেয়েছিল অভি। কোনও উত্তর মেলেনি।
আজ উত্তর এল কি?
ওয়েটার খাবার দিয়ে গেল। ধোঁয়া-ওঠা চিকেন বাটার মসালা, মাখন গড়ানো বাটার নান। টিপিকাল পঞ্জাবি খাবার। আধখানা নান অভির প্লেটে দিল বৃন্দা। নিজে আধখানা নিল। চিকেনের প্রিপারেশান দু’ভাগ করল। বলল, ‘তাড়াতাড়ি খা। অনেক দূর যেতে হবে।’
চুপচাপ খাচ্ছে অভি। অর্ধেক নান শেষ হতে, বৃন্দা আর একটা নান ছিঁড়ে দু’আধখানা করল। অভির প্লেটে হাফ নান দিয়ে বলল, ‘আর একটা নান বলি?’
‘হ্যাঁ।’ আঙুল চাটতে চাটতে অভি বলল, ‘চিকেনের প্রিপারেশানটা ফাটাফাটি।’
আর এক প্লেট চিকেন বাটার মশালা, আরও দুটো নান সাঁটিয়ে, কফি খেয়ে উঠল অভি। সুলতানের খাবার এবং লস্যি প্যাক করা আছে। বৃন্দা ব্যাগ খুলছে বিল মেটানোর জন্য।
অভি পার্স থেকে এক হাজার টাকা বার করে ওয়েটারের হাতে ধরাল। বৃন্দা এক পলক দেখে ব্যাগ বন্ধ করল।
সুলতান গাড়িতে তেল ভরে নিয়ে বসেছিল। বৃন্দা আর অভি গাড়িতে উঠল। বৃন্দা সুলতানের হাতে খাবারের প্যাকেট চালান করে দিল। খেতে খেতে গাড়ি ছোটাল সুলতান।
মেচেদা পেরিয়ে মেচেদা-নতুনগ্রাম সড়ক বরাবর ছুটছে গাড়ি। এ রাস্তা ন্যাশনাল হাইওয়ে নয়। খানাখন্দে ভরতি। রাস্তা কখনও উঁচু, কখনও নীচু। উঁচু রাস্তায় জল নেই। নীচু রাস্তা জলের তলায়। সড়কের দু’পাশে পরপর বাহারি দু’তিনতলা বাড়ি। কোনও কোনও বাড়ি গঠনশৈলী ও স্থাপত্যে কলকাতাকে টেক্কা দিতে পারে। সেইসব বাড়ির পাশাপাশি সহাবস্থান করছে মাটির বাড়ি, দরমার চালা। বাড়িগুলোর পিছনেই নীচু চাষের জমি। সেই জমি আপাতত জলের তলায়। ধানগাছ, পাট গাছ, পানের বরজ, ফুলের নার্সারি আলাদা করা যাচ্ছে না। মাটির বাড়ি ঝড়বৃষ্টিতে মাটিতে মিশে গেছে। একতলা বাড়িগুলোয় জল ঢুকেছে। যারা বন্যায় বাড়ি হারিয়েছে তারা পোঁটলাপুঁটলি নিয়ে উঠে আসছে সড়কে। পাকা বাড়িগুলোর সদর দরজা খোলা। সেখানে যাচ্ছে তারা। বাচ্চারা কলার ভেলায় চড়ে লগি বাইছে। আকাশ আরও ময়লা হচ্ছে। বৃষ্টির তেজ ক্রমশ বাড়ছে। ভিজিবিলিটি শূন্য। সুলতান হেডলাইট, টেললাইট, ফগলাইট— সব জ্বেলে গাড়ি চালাচ্ছে।
বৃন্দার ভয় করছে। ওস্তাদি করে চলে তো এল। মায়ের কথা না শোনার ফল কী হবে কে জানে! এই গাড়ির শ্যাসি উঁচু বলে এখনও গাড়িতে জল ঢোকেনি। মেচেদা-নতুনগ্রাম সড়কের বেশ কয়েকটা গাড়ি খারাপ হয়ে পড়ে রয়েছে। ইঞ্জিনে জল ঢুকে স্টার্ট বন্ধ হয়ে গেছে।
মোবাইলের কনট্যাক্ট লিস্ট থেকে শক্তিরূপার নম্বর বার করে বৃন্দা। ড্যানিয়েলের অপারেশানের সময় থেকে এই নম্বর তার কাছে ছিল। সবুজ বোতাম টিপে ফোন কানে দেয়। রিং হচ্ছে। শক্তিরূপা ফোন ধরলেন। বৃন্দা বলল, ‘আপনারা কোথায়?’
প্রবল বর্ষণে মোবাইলের টাওয়ার দুর্বল। কোনও কথা শোনা যাচ্ছে না। প্রবল ঝোড়ো হাওয়ায় ইথার তরঙ্গ তছনছ হয়ে যাচ্ছে। মোবাইলে জলোচ্ছ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে।
দময়ন্তী বললেন, ‘কে? বৃন্দা? তোমার নম্বরটা আমার ফোন থেকে ডিলিট হয়ে গিয়েছিল, ’ কড় কড় কড়… ‘আমরা বাঁজাপলাশ গ্রামের হেল্থ সেন্টারে…’ কড় কড় কড়… ‘আমাদের ড্রাইভার মারা গেছে…’ কড় কড় কড়… ‘ড্যানিয়েলের নাক দিয়ে ব্লিডিং হচ্ছে…’ কড় কড় কড়…
‘চন্দনের বাবা কোথায়?’ আর্তনাদ করে ওঠে বৃন্দা।
‘উনি আসছেন। তবে ওঁর অফিসেও জল ঢুকেছে…’ আবার বাতাসের হাহাকার, আবার বজ্রপাতের কড়কড়… ‘ওঁর অফিসে অনেক দামি মেশিন কেনা হয়েছে। সেগুলো দোতলায় তুলে আসছেন…’ লাইন কেটে যায়।
সুলতান জিজ্ঞাসা করল, ‘কাহাঁ যানা হ্যায়?’
বৃন্দা বলল, ‘হেল্থ সেন্টার।’
সুলতান বলল, ‘কী হয়েছে যে কলকাত্তা থেকে এতদূর চলে এলে?’
‘গাড়ি অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে। কাকুর মাথায় চোট। কাকিমার কাঁধের হাড় ভেঙেছে। গাড়ির ড্রাইভার মারা গেছে।’
সুলতান গাড়ির স্পিড সামান্য কমিয়ে দিল। বরফ-ঠান্ডা হাতে অভির হাত স্পর্শ করে বৃন্দা বলল, ‘এবার কী হবে?’
‘তুম লোগ হ্যায় না? কুছ নহি হোগা!’ গাড়ি চালাতে চালাতে বলে সুলতান। সেকেন্ড গিয়ার থেকে থার্ড গিয়ারে গাড়ি তুলে, জলমগ্ন মেচেদা-নতুনগ্রাম সড়ক দিয়ে গাড়ি ছোটায়।
অভির হাতের মধ্যে বৃন্দার হাত। ভিজে, ঠান্ডা, নিষ্প্রাণ। অভি হাত না সরিয়ে জানলা দিয়ে বাইরে তাকায়। হুশহুশ করে পেরিয়ে যাচ্ছে অজানা সব জনপদ। বুড়ারি, কাঁকটিয়া, নোনাকুড়ি, ডিমারি…
ঘণ্টাখানেক গাড়ি চালানোর পরে সুলতান বলল, ‘নতুনগ্রাম এসে গেছি। এখানে কাউকে পুছবে নাকি, হেল্থ সেন্টার কোথায়?’
বাঁ দিকে তাকিয়ে বৃন্দা বলল, ‘মায়ের মুখে শুনেছি বিজয় মেমোরিয়াল গ্রাউন্ড বলে একটা বড় মাঠ আছে রাস্তার বাঁদিকে। সেটা পেরিয়ে দু’তিন কিলোমিটার গেলে সমুদ্র কাছে চলে আসে। রাস্তায় ধুলোর বদলে বালি দেখা যায়। অনেক ক্যাশুরিনা গাছ আছে। আর…’
‘বাঁয়ে দেখো। তোমার ওই গ্রাউন্ড পেরোচ্ছি।’ স্টিয়ারিং-এ ডান হাত রেখে বাঁদিকে তর্জনী দেখায় সুলতান, ‘কিন্তু রাস্তায় বালি বুঝা যাবে না। এখানে সির্ফ পানি।’
‘সরকারি হাসপাতালের একটা নিজস্ব চেহারা হয়। হলদে, পুরোনো, ভাঙা বিল্ডিং। দূর থেকে দেখলেই চেনা যায়।’
‘সব সরকারি বিল্ডিংই ওইরকম দেখতে।’ আপত্তি করে অভি। তার হাতের মধ্যে এখনও বৃন্দা হাত। ‘বিডিও, স্কুল, বিএলআরও, পঞ্চায়েত— সব। তুই বলতে পারিস, যে আপিসের সামনে একটা অ্যাক্সিডেন্ট হওয়া গাড়ি আছে আমরা সেখানে যাব।’
‘মনে পড়েছে।’ অভির হাতের থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বৃন্দা বলে, ‘হাসপাতালের আশেপাশে একটা পলাশ গাছ আছে। ওই গাছটায় কোনও ফুল হয় না বলে গাছটার নাম… আমার বলতে লজ্জা করছে, আই মিন ‘ইনফার্টাইল’-এর বাংলা…’
‘বাঁজাপলাশ’, আবার বৃন্দার হাত নিজের হাতে নেয় অভি। ‘তুই “শালা” বলতে পারিস কিন্তু “বাঁজা” বলতে লজ্জা পাচ্ছিস?’
হাত ছাড়িয়ে নিয়ে অভির থাইতে চিমটি কাটে বৃন্দা। চোখ গোল গোল করে ইশারায় সুলতানকে দেখায়। সুলতান কোনো কথা শুনছে বলে মনে হল না। জিরো ভিজিবিলিটির মধ্যে সে সাবধানে গাড়ি চালাচ্ছে। হঠাৎ গাড়ি স্লো করে বলল, ‘পিলা রং কা পুরানা মকান। ভাঙা গাড়ি। পলাশ গাছ। সব কুছ হ্যায়। এইটাই হেল্থ সেন্টার।’ তারপর স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে কম্পাউন্ডে গাড়ি ঢোকাল।
ভাঙা পাঁচিলের গায়ে বড় বড় গাছ হয়েছে। বালির মধ্যে মোরাম দেওয়া রাস্তার দু’দিকে ইট বসানো। সেই রাস্তা যেখানে শেষ হয়েছে সেখানে একটা একতলা বাড়ি। অতীতে হলদে রঙের ছিল। এখন শ্যাওলা জমে সবজেটে। পলেস্তারা খসা দেওয়াল। জানলার শিক ভাঙা, পাল্লাও ভাঙা। মেঝেয় সিমেন্টের আস্তরণ উঠে ইট বেরিয়ে গেছে। দালানে একটা নড়বড়ে বেঞ্চি পাতা। সেখানে বসে ঠান্ডায় অথবা ভয়ে অথবা দুটোতেই হিহি করে কাঁপছেন শক্তিরূপা। সুলতান গাড়ি ঘুরিয়ে এমনভাবে দাঁড় করাল, যাতে গাড়ির বাঁ-দরজা দালানের দিকে ফিরে থাকে। বৃন্দা বাঁ-দিকে বসেছিল। মাথায় ছাতা ধরে, ন্যাপস্যাক নিয়ে সে আগে নামল। এক দৌড়ে উঠে গেল সিঁড়ি বেয়ে। পিছন পিছন নামল অভি। তারও মাথায় ছাতা এবং কাঁধে ন্যাপস্যাক। দু’জনে নামার পরে গাড়ি ঘুরিয়ে সুলতান চলে গেল হেল্থ সেন্টারের পিছন দিকে।
দালানে উঠে ছাতা বন্ধ করতে গিয়ে অভি অবাক! সামনে দাঁড়িয়ে এক বামন মহিলা। মহিলা বলল, ‘আপনারা এসেছেন, ভালোই হল। গত দশ বছর ধরে এই হেল্থ সেন্টারে কোনও ডাক্তারের পোস্টিং নেই।’
‘ডাক্তার নেই?’ বৃন্দা অবাক! ‘তাহলে হেল্থ সেন্টার চলছে কী করে?’
‘এটা কলকাতা শহর নয় দিদিমণি।’ কঠিন গলায় বলে বেঁটে মহিলা। ‘এটা বাঁজাপলাশ গ্রাম।’
.
