সময় : ৪৮১ খ্রিস্ট পূর্বাব্দ – পার্সিয়ান সাম্রাজ্যের কোনো এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে
যার শুরু আছে, তার একটা শেষ তো থাকেই।
কিন্তু পুরো ঘটনার শেষটা এমন হবে কোনো দিন স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি সম্রাট পায়াম। প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত দুর্গের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে উঠতে আনমনেই সে নিজের বাঁহাত দিয়ে কোমরে ঝোলানো তরবারিটার হাতলটা শক্ত করে চেপে ধরল। কিন্তু কাজটা করতে গিয়ে ব্যথার চোটে কবজিটা খচ করে উঠতে আপনাতেই তার একটা চোখ খানিকটা কুঁচকে উঠল। বাঁকানো ভ্রুর একপাশ দিয়ে মাথার ক্ষত থেকে এক ফোঁটা তাজা রক্ত চিবুক বেয়ে গড়িয়ে পড়ল বর্মের ওপরে।
হাতের প্রায় সাদা হয়ে আসা ক্ষত কিংবা মাথার ডান পাশের আধ বিঘত বড়ো রক্তাক্ত ক্ষত-কোনোটাই সম্রাট পায়ামের মনোযোগ কেড়ে নিতে পারল না। আহত বাঁহাতে শক্ত করে তরবারির হাতলটা চেপে ধরে ভাঙাচোরা সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠেই চলল, অনেকটা যেন স্থাণুর মতো, অনেকটা যেন খ্যাপা মানুষের মতো।
অনেকটা শেষ আশ্রয়ের সারথির মতো।
ছিন্নভিন্ন ভিখারির কাঁথার মতো ছিঁড়ে-খুঁড়ে আছে পাথুরে সিঁড়ির ধাপগুলো, সেই সাথে দুপাশের পাথুরে দেওয়াল। তার ভেতরেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে ছিন্নবিছিন্ন মানব দেহ। চারপাশে ছড়ানো-ছিটানো মানব দেহের অংশ বিশেষ আর ধ্বংসপ্রাপ্ত জিনিসের পরিমাণ এত বেশি যে চোখে পীড়া দেয়। পায়াম আহত ক্লান্ত গ্রীবাটাকে যতটা সম্ভব উঁচু রেখে উঠে চলেছে ওপরের দিকে। কারণ চারপাশের ছিন্নভিন্ন দুর্গের অবয়ব যদি তাকে কষ্ট দেয়, তবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা দেহাবশেষগুলো বিদীর্ণ করে ফেলছে তার হৃদয়। প্রতিটা মানুষ, কিংবা প্রতিটা টুকরো হয়ে যাওয়া অংশ তারই নিজের কোনো মানুষের অংশবিশেষ। তার ভাই, তার চাচা-মামা কিংবা খুব কাছের কোনো বন্ধুর। তীব্র বীভৎসতায় শেষ হয়ে গেছে বেশিরভাগ মানুষ। অনাকাঙ্ক্ষিত দানবের থাবায় সম্রাট পায়ামের পবিত্র মাতৃভূমি পরিণত হয়েছে মৃত্যুভূমিতে। কিন্তু এর শেষ এখনও বাকি, আর সেটার প্রস্তুতি নিতেই পায়ামকে শেষবারের মতো মুখোমুখি হতে হবে তার জীবনের সবচেয়ে নিষ্ঠুর সত্যের। নিতে হবে তার জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ সিদ্ধান্ত।
সিঁড়ির শেষ ধাপ পার হয়ে লালচে ধুলোমাখা ছাদের কিনারায় পা রাখতেই পায়ামের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। এই লাল রঙ তার মানুষদের রক্তে রঞ্জিত লাল। দুঃখ আর যাতনার চোটে পায়ামের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলেও সে জানে: খুব বেশি কিছু করার নেই আসলে তার। তবে শেষ ছোবল এখনও বাকি। দানব যত শক্তিশালী, বড়ো আর জনপ্রিয় আর উন্মত্তই হোক না কেন তারও বিনাশ আছে। আর সেই বিনাশ সাধন যদি করা সম্ভব নাও হয় তবে অন্তত সম্মানের সাথে সেই বিনাশ সাধনের চেষ্টার মাধ্যমে মৃত্যুকে বরণ করে নেওয়াও পবিত্র একটা ব্যাপার। আর সেই উদাহরণ কিছুদিন আগে রেখেও গেছে স্পার্টার রাজা লিওনাইডাস।
রাক্তাক্ত ধুলোমাখা ছাদের কিনারায় উঠে এসে দিগন্তের দিকে ফিরে তাকাল পায়াম। ভোর হতে আর খুব বেশি বাকি নেই। দিগন্ত রেখার দিকচক্রবালের কাছে সোনালি একটা আভা ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। এই সোনালি আভা সুন্দর ঝলমলে একদিনের ঘোষণা নিয়ে আসছে। কিন্তু পায়াম জানে সে আর তার মানুষের জন্যে এটা দিনের ঘোষণা নয়, সত্যিকার অর্থেই মৃত্যু পরোয়ানা। শুধু মানুষদের জন্যে না, তার জন্মভূমির জন্যেও।
দুর্গের সবচেয়ে ওপরের অংশে উঠে আসতেই দৌড়ে এলো তার প্রধান সেনাপতিদের একজন, নিমানাল। পায়াম তার দিয়ে ফিরেও তাকাল না। বরং সে একটা হাত তুলে তাকে ব্যস্ত হবার জন্যে মানা করল। আগে নিজেকে স্থির করতে হবে, এরপর বাকি পৃথিবী। আরও দুপা সামনে এগিয়ে একেবারে দুর্গের কার্ণিশের কিনারায় গিয়ে দাঁড়াল সে। পায়াম জানে বিষয়টাতে খানিকটা ঝুঁকি আছে। কারণ দুর্গের এই দিকটাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে, অন্যদিকে এইদিকটার ঠিক সামনেই অবস্থান করছে শত্রুপক্ষ। কাজেই দুর্গের ভঙ্গুর কাঠামো কিংবা শত্রুপক্ষ দুদিক থেকেই আসতে পারে বিপদ। কিন্তু, পায়াম ভেতরে ভেতরে এও জানে, এই মুহূর্তে তার ওপরে আক্রমণ হবে না। শুধু তার ওপরে কেন কারও ওপরেই আক্রমণ চালাবে না শত্রুপক্ষ, কারণ তারা শেষ ধ্বংসযজ্ঞের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
শত্রুশিবির থেকে দৃষ্টি সরিয়ে আবারও দিগন্তের দিকে ফিরে তাকাল পায়াম। উদীয়মান সূর্যের সোনালি আভা এবার দিকচক্রবাল ছাড়িয়ে পাহাড়ের ওপরে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। এই পাহাড়েই পায়ামের জন্ম, এই পাহাড়ই পায়ামের দেশ এবং এই পাহাড়েই হয়তো তার বিনাশ সাধন হতে যাচ্ছে। যদিও নিজের বিনাশ সাধন নিয়ে সে মোটেই চিন্তিত নয়, মোটেই ব্যথিত নয় এই পাহাড়ের কোলে মৃত্যুবরণ করা নিয়ে। আফসোস একটাই, তার সাথে সাথে ধ্বংস হয়ে যাবে নিজের মাতৃভূমি, এমনকি নিজের মানুষেরাও, বলতে গেলে পুরো জাতি।
পাহাড়ে ছড়িয়ে পড়া সূর্যকিরণের দিকে তাকিয়ে শৈশবের কথা মনে পড়ে গেল পায়ামের। একেবারে ছোটোবেলা থেকেই বাবার খুব নেওটা ছিল সে। আর তার বাপ সম্রাট হলেও ছেলেকে ভালোবাসত পাগলের মতো। ব্যাপারটা এমন নয় যে সম্রাট হলে নিজের সন্তানকে ভালোবাসা যাবে না। কিন্তু পায়ামের বাপ তাকে শুধু ভালোইবাসত না, বরং সম্রাট হবার পরও নিজের ছেলেকে সে অনেক সময় দিত। পায়ামের সবচেয়ে কাছের বন্ধু, সবচেয়ে কাছের খেলার সাথী এমনকি তার শিক্ষকও ছিল তার বাপ। একজন সম্রাট হিসেবে ব্যাপারটা যেমন ব্যতিক্রম ঠিক তেমনি একজন সম্রাটের ছেলে হিসেবেও বিষয়টা বেশ ভিন্ন। আর এই পুরো ব্যতিক্রম ব্যাপারটা গড়ে উঠেছিল পায়ামের একেবারে শৈশব থেকে। পায়ামের বাপই পায়ামকে ছোটোবেলা থেকে খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস করে তুলেছিল। আর প্রতিদিন ভোরে প্রহরীরা বাদে বাকি সবার আগে ঘুম থেকে উঠত সম্রাট নিজে এবং ডেকে তুলত তার ছেলেকে। গ্রীষ্ম আর শীত নেই, নেই বৃষ্টি কিংবা তুষারপাত। বছরের প্রতিটা দিন সবার আগে ঘুম থেকে উঠে পায়ামের বাপ, ঘুম থেকে ওঠার পর ছেলেকে নিয়ে চলে আসত দুর্গের ছাদে। ঠিক যেখানে এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আছে পায়াম। পায়ামের বাপ পায়ামকে সবসময় বলত, প্রতিদিন এখানে উঠেই সে নিজের মাতৃভূমিকে পলক বুলিয়ে দেখতে চায় এবং এর প্রকৃতিকে উপলব্ধি করতে চায়, এতে নাকি নিজের মাতৃভূমি আর নিজের মানুষকে প্রতিদিন আরও একটু বেশি করে উপলব্ধি করতে পারে সে, আরও একটু বেশি করে ভালোবাসতে পারে, আরও একটু বেশি করে তাদের জন্যে নিজেকে উৎসর্গ করতে পারে। একই অভ্যাসের ভিত্তি সে গড়ে দিতে পেরেছিল নিজের ছেলের ভেতরে এবং একই ভালোবাসা আর নিজেকে উৎসর্গ করার বীজ সে রোপণ করে দিতে পেরেছিল নিজের সন্তান পায়ামের মনের গহীনে। আর নিজে সম্রাট হবার পর সেই বীজকে দিন দিন বৃদ্ধি করে নিজের মানুষদের প্রতি ভালোবাসা আর দায়িত্বের মহীরুহে পরিণত হবার সুযোগ করে দিয়েছে পায়াম নিজেই। তবে মোটেই সহজ ছিল না তার এই যাত্ৰা।
পায়ামদের রাজ্যটা ছোটো কিন্তু ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে পার্সিয়া, গ্রিস, ইলাম আর মেসিডোনিয়ার বাণিজ্যপথ আর রাজনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পায়ামের দাদার দাদা এক জিপসী গোত্রের বার্তাবাহক ছিল। পরিচিত পৃথিবীর ব্যাবসার একটা বড়ো অংশ পরিচালিত হয় সমুদ্রপথে আর সেই সমুদ্রপথে ব্যাবসার একটা বড়ো অংশ নিয়ন্ত্রণ করে আরব আর পার্সিয়ান ব্যবসায়ীরা। সারাজীবন নানা জায়গায় ঘুরে বিপুল পরিমাণ অর্থ সম্পদ অর্জন করার পর পায়ামের দাদা কোথাও থিতু হতে চাইছিল। আর সেটা করার জন্যে সে পার্সিয়ান সাম্রাজ্যের এই ছোটো অঞ্চল বেছে নেয় সে। যেই সময়ের কথা বলা হচ্ছে সেই সময়ে কেউ কোনো অঞ্চলে স্থায়ী হতে চাইলে একটাই উপায় ছিল। সেই অঞ্চলে বসতি গড়ে তোলা। সেটা গায়ের জোরে হোক, সম্পর্কের জোরে হোক, আর রাজনীতির জোরে হোক। পায়ামের দাদার বলতে গেলে প্রায় সবই ছিল।
প্রশ্ন হলো, যে-মানুষটা সারাজীবন সমুদ্রে আর জাহাজে জাহাজে ঘুরে বেড়িয়েছে সেই লোকটা কেন একটা স্থলের জায়গা বেছে নিলো স্থায়ী হবার জন্যে, কেন কোনো দ্বীপ বা জলপথের কাছের জায়গা নয়। পায়ামের বর্তমান অবস্থা বুঝতে হলে এটা জানাটা জরুরি। পায়ামের দাদা যেমন অর্থবান ছিল ঠিক তেমনি সে ছিল বুদ্ধিমানও। আর তাই ঘুরতে ঘুরতে অনেকটা ইচ্ছে করেই সে এই জায়গাটা বেছে নেয়। পায়ামদের রাজ্যটা এমন এক জায়গায় যে অবস্থানগত কারণে একদিকে এর শক্তি অপরিসীম, অন্যদিকে স্রেফ অবস্থানের কারণেই এই জায়গার মূল্যও অপরিসীম। কারণ কী?
আগেই বলা হয়েছে পরিচিতি পৃথিবীর বাণিজ্যের একটা অংশ নিয়ন্ত্রিত হয় সমুদ্রপথে। সেই এশিয়া মাইন থেকে শুরু করে সুদূর ইউরোপের ভেনিস পর্যন্ত চলে গেছে এই সমুদ্রপথ। দূর প্রাচ্যের বিভিন্ন এলাকা থেকে উৎপাদিত এবং বহন করে নিয়ে আসা পণ্যের একটা অংশ বিভিন্নভাবে সমুদ্রপথে চলে যায় ইউরোপের শহর ভেনিসে, সেখান থেকে ছড়িয়ে পড়ে ইউরোপের বাজারে। এশিয়া থেকে আসা জিনিসপত্রের এই পণ্য চলাচলের জলপথের একটা বড়ো অংশ নিয়ন্ত্রণ করে আরবের ব্যবসায়ীরা। কিন্তু পার্সিয়ান সাম্রাজ্যের একটা বড়ো অংশের জিনিসপত্রের নিয়ন্ত্রণ থাকে স্থলপথের যাতায়াতকারীদের হাতে। এই স্থলপথের যাতায়াতকারীদের একটা অংশ আবার স্থলপথ দিয়ে ভ্রমণ করে জিনিসপত্র পৌঁছে দেয় জলবন্দরগুলোতে। পায়ামদের সাম্রাজ্য ঠিক জলপথের কোথাও না হলেও অবস্থানগত কারণে এরকম পণ্য চলাচলের এক স্থলপথের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় অবস্থিত। পায়ামদের সাম্রাজ্যের একদিকে পাহাড়ে ঘেরা, যেখানে অসংখ্য পাহাড়ি গোত্র বসবাস করে। এরা একদিকে পুরো পাহাড়ি এলাকা জুড়ে চাষাবাদ করে। আবার এখান থেকে অনতিদূরেই অবস্থিত জলবন্দর। দীর্ঘদিন যাবৎ স্থলপথের যাতায়াতকারী আর পাহাড়িদের ভেতরে যুদ্ধ লেগেই ছিল। লুট, ছিনতাই, ডাকাতি থেকে শুরু করে ছোটো এই জায়গাটা যেন বছরের পর বছর ধরে নরক হয়ে থাকত।
পায়ামের দাদা। ঘুরতে ঘুরতে এই জায়গায় এসে জায়গাটার অবস্থান এবং স্থানীয় রাজনীতি অনুধাবন করতে পেরে সে এখানেই গোড়াপত্তন করে। কিন্তু তার গোড়াপত্তনের ব্যাপারটা খুবই কঠিন ছিল। কারণ একদিকে এমন এক পাহাড়ি গোত্র, যাদের সাথে বছরের পর বছর কেউই আঁতাত করতে পারেনি। অন্যদিকে এদের ভিন্ন আরেক গোত্র পুরোটাই ডাকাত, যারা বছরের পর বছর ধরে ডাকাতি করেই চলেছে, আবার অন্যদিকে স্থলপথে যাতায়াতকারী ব্যবসায়ীদের রাজনীতি। কোনো এক অদ্ভুত উপায়ে পায়ামের দাদা এই তিন দলকে এক করতে সমর্থ হয়।
পায়ামের বাবা যখনই সময় পেত ছেলের কাছে নিজের পরিবারের ইতিহাস, পরিবারের লোকজনের গল্প বলে যেত। মুগ্ধ হয়ে শুনত পায়াম। এখনও যখন নিজের কোনো প্রয়োজনে সে দিশেহারা বোধ করে বাবার সেই পারিবারিক ইতিহাসের দিকেই ফিরে তাকায় সে সমাধানের জন্যে এবং মনে মনে নিজের দাদার কূটনৈতিক জ্ঞানের প্রশংসা না করে পারে না। পায়ামের দাদা প্ৰথমেই সেই পাহাড়ি গোত্রকে হাত করে। কারণ সে জানত এদেরকে হাত না করতে পারলে কিছুই এগোবে না। হাত করার প্রয়াসটাও খুব সুন্দর ছিল, নিজের ছেলে মানে পায়ামের বাবাকে গোত্র প্রধানের মেয়ের সাথে বিয়ে দিয়ে নিজের পারিবারকে তাদের পরিবারের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে ফেলে। এই প্রথা আজো চালু আছে। এমনকি সব ঠিক থাকলে পায়ামেরও একইভাবে বিয়ে হবার কথা ছিল। যাই হোক, দুই পরিবারকে বন্ধনে আবদ্ধ করে পায়ামের পরদাদা প্রথমেই দুই পরিবারকে এক করে। এরপরে দ্বিতীয় ধাপ ছিল, ব্যবসায়ীদের হাত করা, এটা কঠিন হলেও অসম্ভব ছিল না, ব্যবসায়ীদের হাত করার একটাই উপায় ছিল, আর সেটাই প্রয়োগ করে পায়ামের দাদা। তাদেরকে সে সোজা একটা কথা বলে, শত শত বছর ধরে এই পাহাড়ি পথ তাদেরকে পাড়ি দিতে হয় জলবন্দরে যাবার জন্যে আর এই শত শত বছর ধরে পঞ্চাশ মাইলের মতো পাহাড়ি রাস্তায় তারা খুন যখম ছিনতাইয়ের শিকার হয়ে আসছে। শত বছরেও তারা এর কোনো সমাধান করতে পারেনি, না পেরেছে নিজেদের লোকদের সুরক্ষা দিতে। ব্যবসায়ীরা যদি এই এলাকাতে তাদেরকে একটা দুর্গ গড়ে সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে সহায়তা করে তবে এই ঝুঁকিপূর্ণ দীর্ঘপথের নিরাপত্তার দায়িত্ব থাকবে তাদের ওপরে, বিনিময়ে তাদেরকে নামে মাত্র একটা শুল্ক দিতে হবে। ব্যবসায়ীরা প্রথমে অবিশ্বাস করলেও পায়ামের দাদার কথা ফেলে দিতে পারেনি। কারণ সত্যি যদি তারা এই দীর্ঘপথে নিরাপত্তা পেতে পারে তবে আখেরে তাদেরই লাভ। আর যে-শুল্কের কথা পায়ামের দাদা বলেছিল সেটা কিছুই নয়। তবে তারা তার কথা পুরোপুরি বিশ্বাসও করেনি। বরং ব্যবসায়ীরা পায়ামের দাদাকে সময় ধরে দেয়, এর ভেতরে যদি তারা পাহাড়ি ডাকাত গোত্রদের সাথে কোনো সমঝোতায় এনে সত্যি সত্যি ওই পথের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে, তবে তারা তাকে দুর্গ নির্মাণে সহায়তা তো করবেই এমনকি শুল্ক দিতে তাদের কোনো আপত্তি থাকবে না।
পায়ামের দাদার জন্যে এরপর সবচেয়ে বড়ো বাধাটা এসে দাঁড়ায় পাহাড়ি ডাকাত গোত্রের ওপরে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। বুদ্ধিমান মানুষটা জানত ব্যাপারটা এত সহজ হবে না। তবুও সে প্রথমে প্রচলিত পথেই চেষ্টা করে। একাধিকবার তাদের কাছে বার্তা প্রেরণ করে কথা বলতে চায়। কিন্তু প্রতিউত্তর না পেয়ে সে মনে মনে সিদ্ধান্ত নেয় কঠিন পথেই যেতে হবে তাকে। কিন্তু কী সেই কঠিন পথ। নিজের পরিবারের লোকবল এই ডাকাতদের মোকাবেলার জন্যে যথেষ্ট নয়। অন্যদিকে যথেষ্ট নয় পাহাড়ি গোত্রের লোকজন। কাজেই সে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র অর্থের সাহায্য নেয়। দূর প্রাচ্য থেকে সমুদ্রপথে ভাড়াটে সৈনিক আমদানি করে। ব্যাপারটা খানিকটা অদ্ভুত শোনালেও সেই সময়ে এটার প্রচলন ছিল খুব বেশি । ভাড়াটে সৈনিক সৃষ্টির আদি থেকেই ছিল, এখনও আছে। যুগে যুগে স্রেফ নাম বদলেছে। এসব ভাড়াটে সৈনিকেরা প্রয়োজনে যে-কারও হয়ে লড়াই করবে। পায়ামের দাদা জানত সাধারণ ভাড়াটে সৈনিক দিয়ে এসব পাহাড়ি ডাকাতদের মোকাবিলা করা যাবে না। হিমালয়ের বিশেষ অঞ্চল থেকে সে পাহাড়ি যুদ্ধে পারদর্শী গোর্খাদের সেনাবাহিনী ভাড়া করে নিয়ে আসে এবং কাজটা করে সে খুব গোপনে। ভাড়াটে সৈন্যদের একটা অংশ পৌঁছানোর পর তাদেরকে ব্যবসায়ী সাজিয়ে সেই পাহাড়ি পথে পাঠিয়ে ডাকাত ধরার জন্যে টোপ দিয়ে ফাঁদ পাতে সে। বিস্ময়কর হলেও তাতে ধরা পড়ে বেশ কয়েকজন। আর ধরা পড়া ডাকাতদের থেকে তথ্য বের করে ধীরে ধীরে পাহাড়ে চোরা গোপ্তা অভিযান চালাতে শুরু করে তার ভাড়াটে বাহিনী। সেই অভিযানগুলো ছিল ভয়াবহ হিংস্র আর রক্তাক্ত। কারণ পায়ামের দাদা জানত বীভৎস হিংস্রতা দেখাতে না পারলে কোনোদিনই এদের সাথে পেরে ওঠা সম্ভব নয় এবং তার কথা যে ভুল ছিল না সেটার প্রমাণ পাওয়া যায় কিছুদিন পরেই। প্রথমে যেখানে তারা বার্তা পাঠিয়ে কোনো সুবিধা করে উঠতে পারেনি, সেখানে পরিস্থিতির চাপে পড়ে পাহাড়ি ডাকাত দলের সর্দার উলটো তাদের কাছে সন্ধি করার জন্যে বার্তা প্রেরণ করে। সর্দারের সাথে দেখা করতে যাবার পর ডাকাত সর্দারের সাথে খুব খোলামেলা আলাপ করে পায়ামের দাদা। তাকে সে সরাসরি জানিয়ে দেয়, যদি তাদের সাথে সে টক্কর দিতে যায় তবে যেকোনো মূল্যে সে এবং তার অধীনে থাকা ছোটো ছোটো ডাকাত বাহিনীর শেষ না দেখে ছাড়বে না সে। অন্যদিকে ডাকাত সর্দার যদি চায় তবে ওদের সাথে যোগ দিতে পারে। তারা যদি নিজেদের অতীত ভুলে গিয়ে তাদের সাথে যোগ দেয়, তবে এই পাহাড়ি পথের নিরাপত্তা রক্ষায় দায়িত্ব তাদের ওপরেই বর্তানো হবে। বিনিময়ে তাদেরকে পায়ামের দাদার অধীনে পরিচালিত রাজ্যের অধীনে বশ্যতা স্বীকার করে তাদের নিয়ম মেনে কাজ করতে হবে। আর তারা যদি সেটা করে তবে, এই স্থলপথের আদায়কৃত শুল্কের ভাগ তাদের সাথে যথাযথ উপায়ে ভাগ করে নেওয়া হবে।
কঠিন পথটা পাড়ি দেওয়ার পর বাকিটা তূলনামূলক সহজ হয়ে যায়। তিনদিক সামলে নেওয়ার পর অত্র এলাকাতে রাজ্য প্রতিষ্ঠা করা পায়ামের দাদার জন্যে তেমন কঠিন কিছু ছিল না। রাজ্যের প্রাথমিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করার পর এটাকে শক্তিশালী করার দিকে নজর দেয় সে। একদিকে নিজের গোত্রের লোকজন, পাহাড়ি লোকজনের লোকবল আর বিপুল পরিমাণ অর্থ নিয়ে এই দুর্গ নির্মাণের কাজে নামে সে। দূরপ্রাচ্য থেকে আসে এর মূল নকশাকারী, পারস্য থেকে আসে এর মালমশলা আর মেসিডোনিয়ার বিশেষ অঞ্চল থেকে বিশেষ পাথর। সে এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। দুর্গটাকে এমনভাবে নির্মাণ করা হয় যেন এর পেছন দিকটা থাকে ক্রমাগত ওপরের দিকে উঠে যাওয়া পাহাড়ের সারির দিকে। আবার মুখটা থাকে অন্যপাশের পাহাড় আর জঙ্গলের থেকে বিরাট আকারের এক ময়দানের দিকে মুখ করে। সেই সময়ে পারস্যের লোকেরা এভাবেই দুর্গ নির্মাণ করত। তবে পারস্যের ভিত্তির ওপরে মূল নকশাটা দূরপ্রাচ্যের নকশাকারী সৃষ্টি করাতে দুর্গটার অবস্থান, আকৃতি এবং ভিত্তিতে এমন এমনভাবে গড়ে ওঠে যে একে দমন করা বলতে গেলে প্রায় অসম্ভব। গত একশ বছর ধরে সেটাই প্রমাণিত হয়ে এসেছে আজকের আগ পর্যন্ত। দুর্গ নির্মাণের বিরাট কর্মযজ্ঞ শুরু করলেও দুর্গের কাজ সম্পন্নকরণ দেখে যেতে পারেনি পায়ামের দাদা। এর আগেই মৃত্যু হয় তার। দুর্গ নির্মাণের ভার এসে পড়ে পায়ামের বাবার ওপরে। নিজের বাপের চেয়ে ভালো কাজ দেখায় সে। একটা পর্যায়ে শেষ হয় দুর্গ নির্মাণ। দুর্গ নির্মাণ শেষ করেই পায়ামের বাবা মনোযোগ দেয় নিজের সাম্রাজ্যের ভিত্তি শক্ত করার দিকে। একদিকে পাহাড়ি গোত্রের লোকজনকে তাদের কাজের জন্যে আরও বেশি উপাদান সরবরাহ করে। আরও ভালো সম্পর্ক গড়ে তোলে সেই পাহাড়ি ডাকাত দলের সাথে, তারা ততদিনে এই সাম্রজ্যের সামরিক শক্তির প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের সাথেও সে গড়ে তোলে দারুণ সম্পর্ক। ফলে সবদিক থেকেই রাজ্যে বলতে গেলে সুসম্পর্ক উন্নয়ন আর সাফল্যের জোয়ার বইতে থাকে। একই ধারা বজায় থাকে পায়ামের শাসনকালেও।
পায়াম তার শাসনামলে আরও বেশি সাফল্য দেখায়। এক কথা বলতে গেলে যে সাম্রাজ্যের ভিত্তি সে রচনা করেছিল তার দাদা সেই সাম্রাজ্যের সাফল্যের মুকুটে এক এক করে রাজনৈতিক শক্তির পালক যোগ করে সে। সুদূর মেসিডোনিয়া থেকে গ্রিস, সাইপ্রাস থেকে পারস্য, সবদিকের শাসকদের সাথে সুম্পর্ক গড়ে তোলে সে। আর সেই সম্পর্ক এতটাই জোরালোভাবে প্রতিষ্টিত হয় যে এই ছোট্ট রাজ্যের সুরক্ষা ব্যবস্থা থেকে শুরু করে ব্যাবসায়িক বিষয়াদিরও সুনাম ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে, সেই সাথে তাদের সামরিক সামর্থ্যের কথাও। কিন্তু পায়াম নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে শুরু করে অন্যদিক থেকে। পায়ামের বাবার শাসনামলের শেষ দিকে এক বিশেষ শাসকের উত্থান ঘটতে শুরু করে পারস্যে। তার নাম রাজা জেরেক্সিস।
রাজা জেরেক্সিস যখন পারস্যের শাসন ব্যবস্থার ওপরে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে সেই সময়ে পায়ামের বাবা বেশ বৃদ্ধ, একরকম বলা যায় মৃত্যুশয্যায়। পায়ামের পরিষ্কার মনে পড়ে এমনকি মৃত্যুশয্যাতেও সে পায়ামকে রাজা জেরক্সিসের ব্যাপারে সাবধান করে দিয়েছিল। বাবার মৃত্যুর পর তার একমাত্র ছেলে এবং রাজ্যের যোগ্য উত্তরসূরি সম্রাট হিসেবে শপথ নেয় পায়াম। সে যেদিন রাজা হিসেবে শপথ নেয় পুরো রাজ্য খুশির হাসিতে ঝলমল করে উঠেছিল। কারণ পায়ামকে ছোটোবেলা থেকে রাজ্যের সবাই পছন্দ করত। সবাই জানত নিজের বাপ দাদারা যে ইতিহাস সৃষ্টি করেছে সেই ধারা বজায় রেখে পায়াম রাজা হিসেবে নিজেকে এবং পুরো রাজ্যকে সাফল্য এবং উন্নতির ভিন্ন এক শিখরে নিয়ে যাবে। সত্যিকার অর্থে হতেও শুরু করে সেটাই। নিজের বাপ-দাদার যে-শিক্ষা পায়াম নিজের ভেতরে বেশ ভালোভাবেই লালন এবং ধারণ করেছে সেটা সে প্রমাণ করতে শুরু করে নিজের শাসনামলের একেবারে গোড়া থেকেই।
রাজনৈতিক সুসম্পর্ক এবং শক্তির কথা তো বলা হয়েছেই, এর পাশাপাশি একদিকে সে রাজ্যের অর্থনীতির দিকে মনোযোগ দেয় এবং সেই সাথে রাজ্যে প্রতিষ্ঠা করে হাতে কলমে কাজ শেখার কিছু প্রতিষ্ঠান। অন্যদিকে তার বাপের ইচ্ছে ছিল দূরদেশ থেকে কিছু বৈদ্যকে স্থায়ীভাবে নিজের দেশে নিয়ে আসার, কিন্তু জীবিত অবস্থায় সেটা সে করে যেতে পারেনি। বাপের এই স্বপ্নকে সে পূরণ করে। তবে এসব প্রাথমিক কাজগুলোর পরেই সে সবচেয়ে বেশি জোর দেয় যেই কাজটাতে সেটা হলো সামরিক শক্তি বৃদ্ধি। মৃত্যুশয্যায় বাপের বলে যাওয়া কথাগুলো সে ভোলেনি এবং নিজেও খুব মনোযোগ দিয়ে প্রত্যক্ষ করছিল পুরো পারস্যের রাজনীতির প্রেক্ষাপট। পুরো পারস্যে তখন সম্রাট জেরেক্সিসের জয় জয়কার। প্রথম খুব ভালোভাবে নিজের শাসন প্রতিষ্ঠা করার পর ধীরে ধীরে সম্রাট জেরেক্সিস নিজের ক্ষমতা বৃদ্ধি করে নজর দিতে শুরু করে আশপাশের রাজ্যগুলোর ওপরে। যদিও পায়ামের উপদেষ্টারা তাকে আশ্বাসবাণী শুনিয়েছিল যে সম্রাট জেরেক্সিস যাই করুক কোনোদিনই এই রাজ্য আক্রমণ করবে না। কারণ সে যত শক্তিশালী সম্রটাই হোক না কেন, এই রাজ্য আক্রমণ করে এর আকৃতি এবং অবস্থানগত কারণে সে খুব একটা সুবিধা করে উঠতে পারবে না, আর রাজনৈতিক বিষয়াদি তো আছেই। কিন্তু পায়াম মনে মনে স্বস্তি বোধ করেনি, বরং সে ভেতরে ভেতরে প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে ভুল প্রমাণিত হয় সে।
দিন দিন তার সাম্রাজ্য আর ক্ষমতা বৃদ্ধি করলেও সম্রাট জেরেক্সিস কখনোই তাদের রাজ্যের ব্যাপারে কোনো আগ্রহ দেখায়নি। সেটা সামরিক কারণেই হোক, যুদ্ধগত কারণেই হোক কিংবা এর অবস্থানগত শক্তির কারণেই হোক। জেরেক্সিস নিজের মতো একের-পর-এক রাজ্য দখল চালিয়ে যেতে থাকে, অন্যদিকে পায়ামের রাজ্যের লোকেরা তাদের নিজেদের মতো জীবন চালিয়ে যেতে থাকে। কিন্তু এরপরেই ঘটে এমন এক ঘটনা যা বদলে দেয় পারস্যসহ বিশ্ব ইতিহাসের একাংশ।
স্পার্টার রাজা লিওনাইডাসের সাথে টক্কর লাগে সম্রাট জেরক্সিসের। দিন দিন নিজের সাম্রাজ্য আর শক্তি বৃদ্ধি করতে করতে এক পর্যায়ে জেরক্সিস নিজেকে রাজাদের রাজা থেকে শুরু করে খোদা উপাধিতে ভূষিত করে। আর নিজের সাম্রাজ্য বৃদ্ধির সাথে সাথে বিশ্বজয়ের স্বপ্নে বিভোর তখন সে। নিজের রাজ্য ছাড়িয়ে বিভিন্ন দিকে সে তখন দূত প্রেরণ করতে শুরু করেছে তার বশ্যতা স্বীকার করে নেওয়ার জন্যে। এরই অংশ হিসেবে যোদ্ধা জাতি হিসিবে খ্যাত স্পার্টায়ও সে বার্তা প্রেরণ করে। খুব স্বাভাবিকভাবেই স্পার্টার মতো যোদ্ধা জাতি, যারা কখনোই কারও বশ্যতা স্বীকার করেনি, তারা জেরেক্সিসের বশ্যতাও স্বীকার করার কথা নয়; করেওনি তারা। আর এখানেই জেরেক্সিসের সাথে স্পার্টার রাজা লিওনাইডাসের বাহিনীর সংঘাত হয়। মজার বিষয় হলো, স্পার্টার সাথে জেরেক্সিসেস বাহিনীর একটা সংঘাত লাগতে যাচ্ছে এটা পুরো পারস্য আর পশ্চিমের লোকেরা জানত। কিন্তু সেটা এমন হুট করে হয় যাবে কেউ ভাবতে পারেনি এবং যেভাবে হলো সেভাবে হবে এটা কেউই ভাবতে পারেনি।
স্পার্টানদের যুদ্ধবাজির কথা সবাই জানে। ইতিহাসের সেরা যোদ্ধাদের একটা বড়ো অংশ তাদের জাতি থেকেই জন্ম হয়েছে, এটাও অনেকের জানা। এমনকি স্পার্টানরা নিজেদের অর্থনীতির চেয়েও সমরনীতির দিকে মনোযোগ দেয় অনেক বেশি। আর তাই ওরা জন্ম থেকেই সেরা যোদ্ধা হিসেবে গড়ে ওঠে। আর একারণেই জেরেক্সিসিসের নজরও সবসময় ছিল স্পার্টার দিকে। জেরেক্সিস জানত সে যদি নিজেকে সত্যিকার অর্থেই পুরো পৃথিবীর অধিপতি হিসেবে দেখতে চায় তবে, গুটিকয় যে কয়টা জাতিকে তার অবশ্যই বশ করতে হবে তাদের ভেতরে স্পার্টানরা অন্যতম। সে অনুযায়ী তাদেরকে প্রস্তাবও পাঠানো হয় কিন্তু স্পার্টার রাজা লিওনাইডস বেঁকে বসে। সে মাত্র তিনশো সৈন্যের এক বাহিনী নিয়ে দিনের-পর- দিন ঠেকিয়ে রাখে জেরেক্সিসের বিরাট বাহিনীকে। রাগে-ক্রোধে উন্মত্ত জেরেক্সিস যখন ভাবতে বসেছে সে আর লিওনাইডাসকে পরাজিত করতে পারবে না এমন সময় বেঈমানির শিকার লিওনাইডাসকে অবশেষে সে ধ্বংস করতে সমর্থ হয়। সত্যি কথা হলো লিওনাইডাস আর তার লোকেরা বশতা স্বীকার করেনি, বরং তারা যুদ্ধ করতে করতেই মৃত্যুবরণ করে।
কিন্তু জেরেক্সিসের জন্যে সেটাই অনেক বড়ো পাওয়া। কারণ একটা পর্যায়ে সে ভাবতে শুরু করেছিল লিওনাইডাসকে আর পরাজিত করতে পারবে না। কিন্তু লিওনাইডাসকে পরাজিত করার পর জেরেক্সিস আক্ষরিক অর্থেই নিজেকে ঈশ্বর ভাবতে শুরু করে। এবার সে ধীরে ধীরে নজর দিতে শুরু করে বাকি রাজ্যগুলোর দিকে। তার বক্তব্য একটাই, পৃথিবীর যে কাউকেই সে বশ করতে পারবে। জেরেক্সিস যখন তার থাবা চারপাশে বৃদ্ধি করতে শুরু করে, পায়াম জানত একসময় জেরেক্সিসের নজর এই রাজ্যের দিকে পড়বেই। কিন্তু সেনাপতি থেকে শুরু করে তার পরিষদবর্গের কেউই এতে সম্মতি প্রদান করেনি। বরং সবাই বলেছে, এই রাজ্যের সাথে জেরেক্সিসের দরবারের সবসময়ই সুসম্পর্ক ছিল। আর তাছাড়া অবস্থানগত কারণে জেরেক্সিস ঠিক যেভাবে স্পার্টানদের বাধার সম্মুখীন হয়েছে ঠিক একইভাবে এখানে তারচেয়ে দ্বিগুণ বাধার সম্মুখীন হবে সে। কাজেই এই রাজ্য আক্রমণ করার কোনো কারণই নেই তার।
কিন্তু পরিষদ বর্গের কথা ভুল প্রমাণিত করে ঠিকই একদিন জেরেক্সিসের দূত এসে হাজির হয় পায়ামের রাজ দরবারে। ফরমান খুব সহজ, পৃথিবীর অধিপতি জেরেক্সিসের অধীনে মাথা নত করতে হবে তাদেরকে। একদিকে তাকে বছরে বিরাট একটা কর তো দিতেই হবে, সেই সাথে যে-জঙ্গল পথ তারা নিয়ন্ত্রণ করে আসছে অর্ধ-শত বছর যাবৎ সেটার নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিতে হবে জেরেক্সিসের অধীনে। খুব স্বাভাবিকভাবেই এই উৎকট প্রস্তাব মেনে নেবার কোনো কারণই ছিল না। ওরা মেনে নেয়ওনি। এরপর থেকেই শুরু হয় তাদের ওপরে অত্যাচার। প্রথমে পাহাড়ি জঙ্গুলে পথে ওদের সৈন্যবাহিনীর ওপরে চোরাগুপ্তা হামলা হতে শুরু করে। দূর প্রাচ্য থেকে নিয়ে আসা জেরেক্সিসের বাহিনীর একাশংকে বলা হয়ে থাকে কালো মশাল। কালো মশাল বাহিনী চোরাগুপ্তা হামলা চালানোয় ওস্তাদ। তারা হামলা চালিয়ে পায়ামের বাহিনীর ক্ষতি করতে শুরু করে। একটা পর্যায়ে অবস্থা এমন হয় জঙ্গুলে পথের বেশ অনেকটা অংশ পায়ামের বাহিনী ছেড়ে দিয়ে পিছু হঠতে বাধ্য হয়। পায়ামের পরিকল্পনা ছিল জঙ্গুলে পথের খানিকটা পিছু হটে তারা শক্ত অবস্থানে আসামাত্রই আবারও পূর্ণ শক্তিতে আক্রমণ এবং প্রতিরোধে যাবে। কিন্তু সেটা করে ওঠা সম্ভব হয়নি তাদের পক্ষে। তার আগেই জেরেক্সিসের সেনাবাহিনীর একটা বিরাট অংশ পৌঁছে যায় পায়ামের রাজ্যের একেবারে দোরগোড়ায়।
জেরেক্সিসের বাহিনীর বড়ো অংশটা তাদের জঙ্গুলে পথের সৈনিকদের ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে রাতের গভীরে। পায়ামরা প্রস্তুত থাকলেও এরকম কিছুর জন্যে তারা তখনও প্রস্তুত হতে পারেনি। পায়াম জানত জেরেক্সিসের বাহিনী যেকোনো সময় পৌঁছে যাবে, কিন্তু তারা এত দ্রুত এভাবে আক্রমণ চালাবে এটা কেউই বুঝে উঠতে পারেনি। সৈন্যবাহিনী আক্ষরিক অর্থেই পাহাড়ি ঢলের মতো পায়ামের জঙ্গল পথের প্রহরীদেরকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। তারা কিছু বুঝে ওঠার আগেই স্রেফ কচুকাটা হয়ে যায়। গুটিকয়েক যারা পালাতে সক্ষম হয় তারা কোনোমতে দুর্গে পৌঁছায় ভোর রাতের দিকে। কী ঘটেছে সেটা বুঝে উঠে প্রস্তুতি নেওয়ার আগেই ভোরের আলো ফোঁটার সাথে সাথে পায়াম এবং তার রাজ্যের লোকেরা দেখতে পায়: দুর্গের উলটোদিকের জঙ্গুলে পথ তো বটেই, দুর্গের সামনের দিগন্ত বিস্তৃত ভূমি কালো হয়ে ছেয়ে গেছে জেরেক্সিসের সৈন্যবাহিনীর লোকে।
খবর পৌঁছে যায় রাজ্যের কোনায় কোনায়, জারি করা হয় যুদ্ধের সতর্ক বার্তা । খবর এসে পৌঁছায় হাতি-ঘোড়া, বন্য বাঘ থেকে শুরু করে দূরপাল্লার পাথর ছোড়ার ভারী ক্ষেপণাস্ত্র, এমনকিছু নেই যা জেরেক্সিসের বাহিনী নিয়ে আসেনি। আর পুরো দলের নেতৃত্বে আছে জেরেক্সিসের সেনাবাহিনীর সবচেয়ে কুখ্যাত কসাই হিসেবে পরিচিত সেনাপতি দাভুদ। দাভুদ এই বিশেষ বাহিনীর নেতৃত্বে আছে শোনার সাথে সাথে পায়াম বুঝতে পারে সামনে খুব ভয়াবহ দিন অপেক্ষা করছে তাদের জন্যে। নিজের বাহিনীর সবচেয়ে দক্ষ সেনাপতিকে যেহেতু এখানে পাঠিয়েছে, কাজেই জেরেক্সিস খুব ভালোভাবেই তাদেরকে ধ্বংস করার জন্যে ময়দানে নেমেছে। আর তারা যে-সমস্ত অস্ত্রসস্ত্র নিয়ে এসেছে বলে খবর পৌঁছেছে তাতে এটাও পরিষ্কার বোঝা যায় যেকোনো মূল্যে দুর্গের পতন ঘটিয়ে ছাড়বে তারা। তবে এটাও ঠিক যে এই দুর্গই তাদের প্রথম এবং প্রধান হাতিয়ার হতে যাচ্ছে। পায়াম এবং তার লোকেরা সব ভেবে ঠিক করার আগেই দূত এসে পৌঁছায় ওদের সমর্পণের বার্তা নিয়ে। খুব স্বাভাবিকভাবেই তাকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। দূত চলে যাবার কিছু সময় পরেই উপহার পাঠানো হয় সেনাপতি দাভুদের তরফ থেকে রাজা পায়ামের জন্যে। উপহার দেখে শিউরে ওঠে প্রতিটা মানুষ। গাধায় ঠেলা গাড়ি ভরতি করে পাঠানো হয়েছে জঙ্গল পথে রাজা পায়ামের বন্দি লোকদের কর্তিত মস্তক।
শিউরে ওঠে সমস্ত রাজ্য। কিন্তু এই বিষয়ে পায়ামের প্রতিক্রিয়া হয় সম্পূর্ণ ভিন্ন। নিজের ভেতরে যতটুকু দ্বিধা ছিল সেটাকে পুরোপুরি পরিহার করে শক্তভাবে নিজের সভাসদদেরকে সে জানিয়ে দেয়-কোনো অবস্থাতেই সে বশতা স্বীকার করবে না, প্রয়োজনে জীবন দিবে। তার পরিষদের লোকেরাও একবাক্যে মেনে নেয় তার কথা। এই বার্তা পাঠিয়ে দেওয়া হয় দাভুদের কাছেও। বিনিময়ে উলটো বার্তা পাঠায় সেনপতি দাভুদ। যাতে উল্লেখ করা ছিল পায়াম চাইলেও আর তার বশ্যতা মেনে নেওয়া হবে না। তার দুর্গ পুরোপুরি ধ্বংস করে রাজ্যের তিন গোত্রের প্রতিটা পুরুষকে হত্যা করা হবে, হত্যা করা হবে বৃদ্ধ এবং শিশুদেরকে, সেই সাথে ধর্ষণ করা হবে প্রতিটা নারীকে, সমস্ত যুবক-যুবতীকে বন্দি করে দাস হিসেবে বিক্রি করে দেওয়া হবে। দাঁতে দাঁত চেপে প্রস্তুতি নিতে শুরু করে পায়ামের বাহিনী। কিন্তু খুব বেশি সময় আসলে ছিল না।
একভাবে বলতে গেলে নিজেদেরকে সোজা করে দাঁড় করানোর আগেই শুরু হয়ে যায় আক্রমণ। এমন এক আক্রমণ যেটার বিরুদ্ধে আসলে কোনো প্রতিরোধ নেই। দাভুদের বাহিনীর লোকেরা বিরাট শুঁয়োপোকার আঁকশির মতো দেখতে তাল গাছের মতো লম্বা যন্ত্র নিয়ে আসে নিজেদের বাহিনীর সামনে। জিনিসগুলো কী বুঝে ওঠার আগেই দুর্গের দিকে সেগুলো দিয়ে পাথর ছুড়ে মারতে শুরু করে দাভুদের বাহিনীর লোকেরা। ছোটোখাটো এক-একটা ঘোড়ার মতো সাইজের বিরাটাকায় এক একটা পাথর একের-পর-এক আছড়ে পড়তে শুরু করে দুর্গের ওপরে। আক্রমণ চলতেই থাকে। সকাল গড়িয়ে দুপুর, দুপুর গড়িয়ে বিকেল। একের-পর-এক বিরাটাকার পাথর আছড়ে পড়তে থাকে দুর্গের সামনের দেওয়ালে, দেওয়ালের ওপরে, কখনও দেওয়াল ছাড়িয়ে দুর্গের মূল অংশের ভেতরে। কিছু কিছু পাথর এতটাই গতি নিয়ে ছুটে আসে যে দুর্গের প্রাঙ্গণ ছাড়িয়ে সেগুলো পেছনের পাহাড়ের ফসলের ক্ষেতগুলোরও বারোটা বাজিয়ে দেয়।
যে-মুহূর্তে পাথর ছোড়ার শুঁয়োপোকার আকশির মতো যন্ত্রগুলোকে সাজানো শুরু করেছে দাভুদের, বাহিনী সেই মুহূর্ত থেকেই চিৎকার করে নিজের লোকদেরকে আশ্রয় নেওয়ার নির্দেশ দিতে শুরু করে পায়াম আর তার প্রধান সেনাপতি নিমানাল। পাথরের বর্ষণ শুরু হতেই যে যার মতো আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করলেও খুব একটা লাভ হয় না। পাথরগুলো এতটাই বিশাল আর এতটাই গতি নিয়ে ছুটে আসে যে যেখানে আঘাত করে তার বারোটা বাজিয়ে দেয়; একমাত্র দুর্গের মোটা দেওয়াল বাদে আর যেকোনো আকৃতিকেই প্রায় গুঁড়িয়ে দেওয়ার সামর্থ্য রাখা পাথরগুলো ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করে দুর্গের দেওয়াল থেকে শুরু করে মূল কাঠামো, এমনকি দুর্গের ভেতরের অনেক স্থাপনায় একের-পর-এক আঘাত করে গেলেও মূল যে-উদ্দেশ্য নিয়ে দাভুদের বাহিনী এত কষ্ট করে এই যন্ত্র এবং এতগুলো পাথর এতদূর থেকে বহন করে নিয়ে এসেছে সেটা অধরাই রয়ে যায়। অটুট রয়ে যায় দুর্গের দেওয়াল। এই ব্যাপারটা পায়াম জানত। যতই আঘাত করা হোক না কেন, পাথরের আক্রমণ দুর্গের দেওয়ালের বা কাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি করলেও সেটাকে গুঁড়িয়ে দিতে পারবে না এর আকৃতিগত কারণে। এটা এমন এক প্রযুক্তি যা দূরপ্রাচ্যের লোকেরা তাদের কাঠামো নির্মাণে ব্যবহার করে। দুর্গর মূল কাঠামোর ভেতরে এক শক্ত পাথরের পাশাপাশি একধরনের গুঁড়ো পাথর ব্যবহার করা হয় যেকারণে আঘাতে এক অংশ বসে গেলেও ভেতরের পাথরের গুঁড়ো সেই অংশকে পূরণ করে ফেলে। যে-কারণে আকৃতির যতই ক্ষতি হোক না কেন, সেটা ভেঙে পুরোপুরি ধসে যায় না।
আর একারণেই পাথরের আক্রমণ শুরু হতেই পায়াম জানত দাভুদ যে উদ্দেশ্য নিয়ে আক্রমণ চালাচ্ছে সেটা সফল হবে না, বরং সে চাইছিল দাভুদের লোকেরা আরও বেশি করে পাথর ছুড়ে মারুক, কারণ এতে তাদের পাথরের মজুদ দ্রুত শেষ হবে। আর হয়ও তাই। দিন শেষ হবার আগেই পরিসমাপ্তি ঘটে দাভুদের বাহিনীর পাথর আক্রমণ। প্রথম দিনের আক্রমণের শুরুতে ঠিক যে হাসি নিয়ে দাভুদের লোকেরা আক্রমণ শুরু করেছিল, সেই হাসি মিটে যায় তাদের দিন শেষেও দুর্গের সামনের দেওয়াল ধ্বসিয়ে দিতে না পেরে। প্রথমদিনের যুদ্ধ শেষ হয় এভাবেই।
পায়াম জানত মূল আক্রমণ শুরু হবে পরের দিন থেকে এবং হয়ও তাই। দিনের আলো ফুটে ওঠার আগেই হাজার হাজার সৈনিক পায়ে হেঁটে এগিয়ে আসতে থাকে দুর্গের দিকে। সেই সাথে তারা বহন করে নিয়ে আসতে থাকে দুর্গের দেওয়াল বেয়ে ওঠার জন্যে কাঠের বানানো বিশেষ কাঠামো। আক্রমণের দ্বিতীয় ভাগেও পায়ামের বাহিনী দূরদর্শীতার পরিচয় দেয়। পায়াম জানত তার লোকবল দাভুদের সেনাবাহিনীর চার ভাগের এক ভাগ, কাজেই শুধু শক্তি না বুদ্ধি খাটাতে হবে তাকে যুদ্ধ জিততে হলে। প্রথম ধাপের আক্রমণে পানি না পেয়ে দাভুদ যে এবার দ্বিতীয় ধাপে তার সৈন্যবাহিনীকে কাজে লাগাবে সেটাও অনুমান করতে পেরেছিল সে, আর প্রস্তুতিও নেওয়া ছিল সেভাবেই। পিল পিল করে সৈন্যরা এগিয়ে আসতে শুরু করা মাত্রই পায়ামের তিরন্দাজ বাহিনী আর দেওয়ালের ওপর থেকে পাথর ছোড়া বাহিনী সক্রিয় হয়ে ওঠে। কিন্তু স্রোতের মতো এগিয়ে এসে সৈনিকেরা ঠিকই দুর্গের দেওয়ালে দেওয়ালে বাক্স আর সিঁড়ির মতো কাঠের কাঠামো বসিয়ে উঠে আসতে শুরু করে। পায়ামের বাহিনীকে শুধুমাত্র তির আর পাথর ছুঁড়তে দেখে দাভুদ ভেবেছিল এই তাদের প্রস্তুতি। কিন্তু কাঠের কাঠামোগুলো দুর্গের দেওয়ালে বসিয়ে তার সৈনিকেরা যেই উঠে যেতে শুরু করে, দুর্গের অর্ধবৃত্তাকার আকৃতির দুপাশ থেকে একে একে ছুটে আসতে শুরু করে ভারী বর্শার মতো বিরাট আকৃতির মতো তির। কাঠের কাঠামোগুলো ভেদ করে নোঙরের মতো জিনিসগুলো আটকে যায় দুপাশে, সেই সাথে দুর্গের ভেতরের দিকে ছুড়ে দেওয়া হয় নোঙরের মতো অকৃতিগুলোর সাথে আটকানো ভারী বস্তাগুলো। তীব্র হ্যাচকা টানে একে একে হেলে পড়তে শুরু করে কাঠের কাঠামোগুলো। আধডজন কাঠামোর বেশিরভাগগুলোই ভেঙে পড়ে বেলা শেষ হবার আগেই, আর যেগুলো আস্ত থাকে সেগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেয় পায়ামের বাহিনী। দ্বিতীয় দিনও হৃত উদ্যমে ফিরে যায় দাভুদের বাহিনী।
তৃতীয় দিনে আরও তীব্র আক্রমণের সাথে ধেয়ে আসে তার বাহিনী। এবার বড়ো আকৃতি নয়। দুর্গের সামনের অংশে সারি গাছের কাণ্ড জোড়া লাগিয়ে সেগুলো বেয়ে পিল পিল করে উঠে আসতে শুরু করে সৈন্যরা। পায়াম বুঝতে পারে প্রথম দুই দিনের ধাক্কায় দাভুদের মতো হিংস্র লোকের সম্মানে আঘাত লেগেছে আর একারণেই সে তার লোকবল ব্যবহার করার জন্যে উঠে পড়ে লেগেছে। ধারে নয় ভারে কাটার চেষ্টা করছে দাভুদ। কিন্তু যেটা সে বুঝতে পারেনি সেটা হলো, দুর্গের সামনের ভাগে এই তীব্র আক্রমণের মূল লক্ষ্য আসলে দেওয়াল বা দেওয়ালের ওপরের অংশ দখল নয়, বরং দুর্গের প্রধান ফটক দখল করা। তীব্র আক্রমণ সামলাতে গিয়ে পায়াম সেটা খেয়াল করতে পারেনি, কিন্তু ব্যাপারটা ধরতে পারে পায়ামের পাহাড়ি গোত্রের প্রধান এবং তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু, হুমান সাদি চারপাশে আক্রমণে সবাই বিধ্বস্ত হলেও হুমান সাদি মূল জায়গা থেকে সরে পড়ে। সে ঠিকই অনুধাবন করতে পেরেছিল বিরাট একটা লোহার দণ্ড নিয়ে মূল ফটকের ওপরে আক্রমণ চালাতে থাকা বাহিনী এই আক্রমণের মূল হোতা। হুমান সাদি তার বিশেষ বাহিনী নিয়ে দুর্গের দেওয়ালের ওপর থেকে সরে ফটকের ভেতরের দিকে অবস্থান নেয়।
ঠিক যখন ফটকের সামনের অংশ লোহার দণ্ডের ক্রমাগত আক্রমণে অনেকটাই ধসে পড়ে পিল পিল করে ভেতরে ঢুকতে শুরু করে দাভুদের বাহিনী, খুশির বন্যা বয়ে যায় দাভুদের শিবিরে, কিন্তু তারা জানত না এটা ছিল স্রেফ একটা ফাঁদ মাত্র। মূল ফটকের একাংশ ভেঙে ফেলার আনন্দের আতিশয্যে ভেতর প্রবেশ করা বাহিনী ফটক ভেদ করে ভেতরে ঢুকে ফাঁদটা ধরতে পারে। আসলে দুর্গের যে ফটকটা বাইরে থেকে দেখা যায়, সেটা মূল ফটক নয়, ওটা আসলে একটা কৃত্রিম ফটক, সেটা দিয়ে প্রবেশ করলে দুর্গের ভেতরের দিকে আরেকটা ফটক আছে, ওটা মূল ফটক। ফটক ভেঙে ভেতরে ঢোকা বাহিনী ছোটো আঙিনাটা প্রবেশ করা মাত্রই হুমান সাদির বাহিনী ভেতরের ফটক বন্ধ করে দিয়ে বাইরের দিকে ঘিরে ফেলে, ফলে আনন্দের তোড়ে ভেতরে ঢুকে পড়া শ’খানেক সৈন্য আটকা পড়ে ভেতরে। স্রেফ কচুকাটা করা হয় তাদেরকে।
তৃতীয় দিনের আক্রমণও শেষ হয় দাভুদের বাহিনীর পরাজয় দিয়ে। তৃতীয় দিনের শেষে সারা বিকেল জয়ের আনন্দে দুর্গের দেওয়ালের ওপরে দাঁড়িয়ে আনন্দে চিৎকার করতে থাকে ওরা। পায়ামের বাহিনীর প্রতিটি আনন্দ চিৎকার দাভুদের কানে অপমানের চাবুক হয়ে ঝরে পড়তে থাকে। তিনদিনের টানা যুদ্ধের পর খানিকটা স্বস্তি নিয়ে বিশ্রামে যায় পায়ামের বাহিনী। কিন্তু পায়ামের মনে শান্তি ছিল না। সে জানত দাভুদ এভাবে থেমে যাবার মতো লোক নয়। কিন্তু পায়াম এটাও বুঝতে পারছিল না, এবার দাভুদের বাহিনীর চালটা আসলে কী হবে, এবার সে কোনো প্রক্রিয়া ধরে আগাবে। ভাবতে ভাবতেই ঘুমিয়ে যায় সে। কিন্তু মাঝরাতে ঘুম ভাঙে বাতাসে ভেসে বেড়ানো ধোঁয়া আর মৃত্যুর গন্ধে। প্রায় লাফিয়ে বাইরে এসে দেখতে পায় সে দাউ দাউ করে জ্বলছে তার রাজ্যের বিভিন্ন অংশ।
দাভুদের বাহিনী যথেষ্ট হিংস্র এবং জয়ের জন্যে করতে পারে না এমন কোনো কাজ নেই। কিন্তু তারা এতটা নিচে নেমে যাবে এটা পায়াম ভাবতে পারেনি। তৃতীয় দিনের পরাজয়ে হিংস্র হয়ে তারা যুদ্ধের সমস্ত নিয়ম ভেঙে রাতের আঁধারে আক্রমণ চালিয়েছে। তাও বিচিত্র ও বীভৎস এক উপায়ে। যুদ্ধে সে যতই হিংস্র আর খারাপ হোক তারও কিছু নিয়ম থাকে, তাতেও পরস্পরকে সম্মান করার, শত্রুকে সমানভাবে খেলতে দেওয়ার ব্যাপার থাকে। কিন্তু নীচ দাভুদ সেসবের ধার না ধরে স্রেফ কসাইয়ের পথ বেছে নিয়েছে। দাভুদ জানে পায়ামের লোকবল কম, কাজেই দিনের বেলা টানা যুদ্ধ শেষে তার বেশিরভাগ লোকে ঘুমোবে এটাই স্বাভাবিক, কিন্তু দাভুদের বিরাট বাহিনীর জন্যে এটা কোনো সমস্যা না। এমনকি সে তার সৈন্যবাহিনীর একটা অংশ এখনও কাজেই লাগাতে পারেনি। কাজেই তৃতীয় দিনের পরাজয়ের পরেই সে রাতে সিদ্ধান্ত নিয়ে বসে-রাতের আঁধারেই নিজের বাহিনীর এক অংশ দিয়ে সে আক্রমণ চালাবে। পায়ামের লোকেরা সন্ধে নামার পর যখন বিশ্রামের প্রস্তুতি নিচ্ছে দাভুদের লোকেরা তখন প্রস্তুতি নিয়েছে রাতের গভীরে আক্রমণ চালানোর। আগের দিনে আঁকশির মতো বড়ো বড়ো যন্ত্র যেগুলোতে করে পাথর ছোড়া হয়েছে সেগুলোতে শুকনো শস্যের বল বানিয়ে তাতে জ্বালানি দিয়ে আগুন ধরিয়ে মাঝরাতে ছুড়ে মারতে শুরু করে তার লোকেরা।
বিচিত্র আগুনের বল রাতের নিস্তব্ধতাকে খান খান করে দিয়ে আগুনে বাতির মতো বিচিত্র সৌন্দর্য নিয়ে মৃত্যুর প্রতিনিধি হয়ে একে একে আছড়ে পড়তে শুরু করে পায়ামের রাজ্যের ওপরে। দুর্গের ওপরে ঘুমন্ত পায়ামের বাহিনীর একাংশ পুড়ে ছারখার হয়ে যায় কিছু টের পাবার আগেই। পায়াম বাইরে এসে দেখে চারপাশে আগুন লেগে গেছে, লোকজন দিশেহারা হয়ে এদিক-সেদিক ছুটোছুটি করতে শুরু করেছে। কে কী করবে কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। অর্ধক্লান্ত শরীরে বাইরে এসে এই দৃশ্য দেখে পায়াম নিজেও মুহূর্তের জন্যে বুঝে উঠতে পারে না আসলে কী করবে। কিছুক্ষণ বোকার মতো দাঁড়িয়ে থেকে হঠাৎ একটা ব্যাপার তার মাথায় ঝিলিক দিয়ে ওঠে, কেন জানি তার কাছে মনে হয় এই আক্রমণের উদ্দেশ্য যদি দিনের বেলার মতো ভিন্ন কিছু হয়, তবে সর্বনাশ হবে। এক করতে হবে তার বাহিনীকে। কিন্তু কীভাবে? পাগলের মতো ছুটতে ছুটতে সে হুমান আর নিমানালকে খুঁজে বের করে। কিন্তু সেনাবাহিনীকে একসাথে করবে কীভাবে? কারণ সবাই আগুন সামলাতে ব্যস্ত। এমন সময় এগিয়ে আসে রাজ্যের মহিলারা। পুরুষদের প্রায় সবাই রণক্লান্ত হলেও মহিলারা সমর্থই আছে। তারা নিজ থেকে এগিয়ে এসে আগুন নেভাতে শুরু করে, আর অন্যদিকে নিজের বাহিনীকে নিয়ে দুর্গের সম্মুখ দেওয়ালের ওপরে উঠে আসে পায়াম, হুমান আর নিমানাল। এবং পায়ামের অনুমানকে সত্য প্রমাণ করে দেখতে পায়-দুর্গের দেওয়ালের বাইরে শত শত সৈনিক দড়ি আর সরু গাছের কাণ্ড নিয়ে প্রস্তুত হয়ে আছে উঠে আসার জন্যে। এই প্রথমবারের মতো নিজের ওপরে নিয়ন্ত্রণ হারায় পায়াম।
নিজের লোকদেরকে নির্দেশ দেয় একজন শত্রুরও যেন কল্লা না থাকে। যদিও ওরা ক্লান্ত বিধ্বস্ত অন্যদিকে আগুনের গোলার আক্রমণে বিপর্যস্ত, কিন্তু দাভুদের সৈনিকেরা উঠে আসা মাত্রই দুই বাহিনীর মধ্যে শুরু হয় তীব্র যুদ্ধ। ভোর পর্যন্ত চলতে থাকে সেই লড়াই। কেউই কাউকে এক ইঞ্চি ছাড় দিতে রাজি না। তীব্র লড়াইয়ের তোড়ে পরাজিত হতে হতে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে সমর্থ হয় পায়ামের বাহিনী। চতুর্থবারের মতো পিছু হটতে বাধ্য হয় দাভুদের সৈনিকেরা। আবারও উল্লাস ধ্বনি ভেসে বেড়াতে থাকে দুর্গের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে। কিন্তু এবার তার জোর অনেক কম, কারণ ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রচুর। হাজারো সৈনিক নিহত এবং আহত, স্বজন আর সম্পদ সব হারানোর শোকে হাহাকার সবার মাঝে। আপাতত জয়ী হলেও ওরা সেই সাথে এটা বুঝতে পেরেছে দাভুদের বাহিনী পিছু হটবে না। কিন্তু এটাও স্থির হয়ে গেছে লড়াই চলবেই কোনো এক বাহিনী শেষ না হওয়া পর্যন্ত।
এমন অবস্থায় পরদিন সকালে দাভুদের দূত এসে জানায়-পায়ামের সাথে কথা বলতে আগ্রহী সেনাপতি দাভুদ। নিজের লোকদের সাথে পরামর্শ করার পর কথা বলার সিদ্ধান্ত নেয় পায়াম এবং সম্ভবত জীবনের সবচেয়ে বড়ো ভুলটা করে সে এখানেই। কথা ছিল: দুর্গ সংলগ্ন বনভূমি আর খোলা প্রান্তরের একেবারে সন্ধিক্ষণে একেবারে নিরস্ত্র অবস্থায় পায়াম এবং হুমান দেখা করবে দাভুদ এবং তার সেনাবাহিনীর সাথে। তার লোকেরা জায়গা পরীক্ষা করে আসার পর দাভুদের লোকেরা জায়গা পরীক্ষা করে দুপক্ষ নিশ্চিত হবার পর দেখা করতে যায় তারা। দাভুদের মুখোমুখি হয়ে যেই আলোচনা শুরু করবে ঠিক তখুনি মাটি ফুঁড়ে তাদের ওপরে আক্রমণ হয়। এটাও দাভুদের কূটচালের অংশ। সে কিছুতেই ওদেরকে বাগে আনতে না পেরে আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে মাটির নিচে বিশেষ পদ্ধতিতে নিজের লোক লুকিয়ে রেখে পায়াম এবং সেনাপ্রধানকে মেরে ফেলার জন্যে ফাঁদ পেতেছিল মাত্র। আর তাতে বোকার মতো ধরা দিয়েছে পায়াম। হঠাৎ আক্রমণের চমকে প্রতিরোধ করলেও খুব বেশি কিছু করার ছিল না ওদের। খালি হাতে নিজের প্রাণ উৎসর্গ করে পায়ামকে পালানোর উপায় করে দেয় হুমান। আক্রমণে আহত পায়াম হুমানের প্রাণের বিনিময়ে কোনোমতো পালিয়ে আসে নিমানালকে নিয়ে । দুর্গে ফিরে সব জানানোর পরও তাদের কিছুই করার ছিল না। এবার আর দাভুদও কোনোকিছুর তোয়াক্কা না করে, ত্রিমুখী আক্রমণ চালায়।
তিনদিন ধরে টানা আক্রমণের পর আজ ভোররাতের দিকে খানিকটা বিরতি দিয়েছে দাভুদের লোকেরা। তাদের কোনো ক্লান্তি নেই, নেই কোনো বিরাম অন্যদিকে এই তিনদিন একের-পর-এক আক্রমণ প্রতিরোধ আর ধ্বংসযজ্ঞের ভেতর দিয়ে যেতে যেতে পায়ামের বাহিনী এবং তার দুর্গের পতন এখন স্রেফ সময়ের ব্যাপার।
উদীয়মান সূর্যের আলোক রশ্মির দিকে তাকিয়ে পায়ামের কালিঝুলিতে মাখা গালের ওপরে অশ্রু গড়িয়ে নেমে এলো। কিছুই কি করার নেই তার? কোনোভাবেই কী রক্ষা করা সম্ভব নয় নিজের লোকদেরকে? ঠিক আছে, যদি তাই হয় তবে মৃত্যুকেই আলিঙ্গন করে নেবে সে সম্মানের সাথে। দাঁতে দাঁত চেপে সে ফিরে তাকাল পাশে দাঁড়ানো নিমানালের দিকে। আমরা আক্রমণ চালাব এগিয়ে গিয়ে,’ ক্লান্তির শেষ পর্যায়ে হলেও পায়ামের গলায় দৃঢ়তার কোনো অভাব নেই।
মুহূর্তের জন্যে নিমানালের মনে হলো সে ভুল শুনেছে। ‘সেটা কি ঠিক হবে?’ সে এখনও অবিশ্বাসের সাথে পায়ামের দিকে তাকিয়ে আছে।
‘এটাই একমাত্র উপায়,’ নিমানালের ওপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে সে ফিরে তাকিয়েছে আবারও দিগন্তের দিকে। পায়াম জানে, সেখানেই সৈন্যবাহিনীর ভিড়ের ভেতরে কোথাও-না-কোথাও দাভুদও হয়তো তার দিকেই তাকিয়ে আছে। একটাই পার্থক্য দুজনার তাকিয়ে থাকার ভেতরে। পায়ামের দৃষ্টিতে অসহায়ত্ব, নিজের মানুষদের রক্ষা করার আকুতি আর দাভুদের চোখে যুদ্ধজয়ের হিংস্র আনন্দ, নিজের সাফল্যের কাছাকাছি পৌঁছে যাবার আনন্দ। আবারও দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠল পায়াম, ‘যা সিদ্ধান্ত নিয়েছি তাই হবে। সৈনিকদের প্রস্তুত হতে বলো। ঘোড়ওসওয়ার বাহিনী থেকে শুরু করে সব প্রস্তুত করো। অসহায় বৃদ্ধ আর শিশুদেরকে পেছনের পাহাড়ে চলে যেতে বলো। যদিও সম্ভাবনা কম, তাও যদি ওরা কিছুদিন টিকতে পারে বা কোনোভাবে পাহাড় আর খাড়ি টপকে পাশের রাজ্যে চলে যেতে পারে, তবে ওরা সহায়তা পাবে। সমস্ত সৈন্যদেরকে এক হতে বলো। আমরা দুর্গের বাইরে গিয়ে আক্রমণ চালাবো। এতে করে ওরা পেছনে সরে পড়ার জন্যে অন্তত অর্ধদিন সময় পাবে। আর নারীদেরকে কী করতে হবে তা তো তুমি জানো,’ বলে ঘুরে দাঁড়াতে গিয়েও ফিরে তাকাল সে। ‘নিমা, তুমি শুধু আমার সেনাপতি নও, বন্ধু এবং পরিবারও, তোমার সাথে যুদ্ধ করতে পারাটা আমার জন্যে অনেক বড়ো সম্মানের,’ কথাটা বলে বুকে হাত রেখে সামান্য ঝুঁকে রাজা হয়েও সে রীতি ভেঙে নিজের বন্ধু ও সেনাপতিকে সম্মান জানাল।
প্রতিউত্তরে নিমাও হাঁটু গেড়ে পায়ামের সামনে বসে, বুকের ওপরে একটা হাত ভাঁজ করে মাথা নিচু করে সম্মান জানিয়ে বলে উঠল, ‘রাজা পায়াম, আপনার জন্যে যুদ্ধ করাটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড়ো প্রাপ্তি, পরজন্মে যেন আপনার বন্ধু বা সেনাপতি নয়, বরং আপনার দাস হয়ে জন্ম নিতে পারি।’
নিমার কাঁধ চেপে ধরে তাকে টেনে তুলে বুকে জড়িয়ে ধরল পায়াম। দুই বন্ধুরই মুখে কোনো ভাষা নেই। পায়াম নিচের দিকে নামতে নামতে শুনতে পেল দুর্গের চূড়ায় ঘণ্টা ধ্বনি বেজে চলেছে। পায়ামের রাজ্যের সবাই তো বটেই, এমনকি দাভুদের শিবিরেও সবাই অবাক হয়ে ফিরে তাকাল ঘণ্টাধ্বনি শুনে। পরবর্তী আধাঘণ্টায় নিজের পরিবার থেকে শুরু করে কাছের সব মানুষদের কাছে থেকে বিদায় নিয়ে দুর্গের ফটকের বাইরে এলো পায়াম। পুরোপুরি যুদ্ধের সাজে সজ্জিত হয়ে আছে পুরো বাহিনী। আরও অবাক হয়ে সে দেখল কাল পর্যন্ত প্রতিটা মানুষকে আহত বিধ্বস্ত লাগছিল। আজ তাদের সবাইকে কেমন জানি অদ্ভুত উজ্জীবিত লাগছে এই মুহূর্তে। পুরো বাহিনীর সামনে দাঁড়িয়ে আছে সমরসাজে সজ্জিত নিমানাল।
‘পায়াম,’ বলে সে দুর্গের একপাশের ছোটো একটা ফটকের দিকে দেখাল। সেটা দিয়ে দলে দলে বেরিয়ে আসছে সাদা পোশাক পরিহিত এক বাহিনী। ‘ওরা?’ পায়াম খুব অবাক হয়ে দেখল রাজ্যের নারীরা তাদের বিশেষ যুদ্ধের পোশাকে সজ্জিত। সবার হাতে হয়তো অস্ত্র নেই কিন্তু যে যা পেয়েছে তাই নিয়ে এসেছে। ‘ওরা?’ আবারও একই শব্দ উচ্চরণ করে পায়াম ফিরে তাকাল নিমার দিকে।
‘ওরা ভিতুর মতো আত্মাহুতি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে,’ নিমার চোখে অদ্ভুত এক গর্বে জ্বল জ্বল করছে। ‘বরং ওরাও লড়াই করে মরবে।’
গর্বে বুকটা ফুলে উঠল পায়ামের। তার জন্যে নিয়ে আসা ঘোড়ায় চড়ে সে চলে এলো নিজের অবশিষ্ট বাহিনীর সামনে। হাতের বিরাট ফলাটা উঁচিয়ে ধরে চিৎকার করে বলে উঠল, ‘মাতৃভূমির জন্যে,’ তার সাথে সাথে সৈনিকেরাও চিৎকার করে বলে উঠল, ‘মাতৃভূমির জন্যে।
পায়াম ঘোড়া দাবিয়ে এগিয়ে চলল সামনের দিকে। তার সাথে ঘোড়সওয়ার বাহিনী, পেছনে দৌড়ে আসছে পদাতিকেরা। এগোনোর সাথে সাথে গতি বাড়তে লাগল। পায়ামের মনে একটাই নিয়ত, মৃত্যুর আগে যতটা সম্ভব ক্ষতি করবে সে দাভুদের বাহিনীর। আর স্রষ্টা যেন তাকে একটা সুযোগ দেয় একটা ফলা দাভুদের কণ্ঠনালী ভেদ করানোর।
ওদেরকে আক্রমণ চালাতে দেখে পুরোপুরি প্রস্তুত হয়ে গেছে দাভুদের বাহিনী। অস্ত্রসস্ত্রে সজ্জিত হয়ে দেওয়ালের মতো হয়ে প্রতিরোধ তৈরি করে ফেলেছে নিজেদের শিবিরের সামনে। পায়ামের বাহিনী এগিয়ে যেতে শুরু করেছে। আর আধমাইলেরও কম দূরত্বে দুই বাহিনী মুখোমুখি হবে। পাঁচশো গজও বাকি নেই। হই হই রব তুলে আসন্ন সৈনিকদের দেওয়ালের ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ার ইচ্ছে তাদের। আক্রমণের আর কয়েকশো গজ বাকি আসন্ন মৃত্যুরও। পায়াম সর্বশক্তি দিয়ে চিৎকার করে উঠল।
হঠাৎ পুরো আকাশ কালো হয়ে গেল। প্রকম্পিত হয়ে উঠল পুরো সমভূমি। পায়ের নিচে কেঁপে উঠল মাটি। ঘোড়ার ওপরে থাকা প্রতিটা লোক তো বটেই এমনকি পদাতিকেরাও মাটিতে গড়িয়ে পড়ে গেল। ধুলো আর এক ধরনের কালো ছাইয়ের মতো বস্তুতে ছেয়ে গেল চারপাশ।
তীব্র আঘাতের চোটে মাটিতে পড়ে গেছিল পায়াম। জ্ঞানও হারিয়ে ফেলেছিল সে ক্ষণিকের জন্যে। কিন্তু অল্প সময় পরেই সোজা হয়ে বসতে পারল সে। কাশতে কাশতে উঠে দাঁড়াল বহু কষ্টে। কিছুই বুঝতে পারছে না, হলোটা কী? চারপাশে তার সৈনিকেরা এদিক-সেদিক ছিটকে পড়ে আছে। অন্ধকারের ভেতরেই নিমার নাম ধরে ডাকল সে। সৈনিকদের আহাজারিতে ভরে উঠেছে চারপাশ।
‘পায়াম, পায়াম,’ অন্ধকারের ভেতর থেকে একটা গলা বলে উঠল, সেদিকে ফিরে তাকাতেই, একটা হাত এগিয়ে এসে খপ করে ধরে ফেলল তাকে। ঝটকা দিয়ে ছাড়িয়ে নেওয়ার আগেই অনুধাবন করতে পারল হাতটা আর কারও নয়, নিমার। ‘পায়াম পায়াম
‘নিমা, হলোটা কি আসলে এমন করে—’
সে কথা শেষ করতে পারল না, তার আগেই বিচিত্র আধো অন্ধকারের ভেতরেই তাকে চুপ থাকতে বলে সামনের দিকে টেনে নিয়ে চলল নিমানাল।
‘ওদিকে তো শত্রু—’
‘শশশ,’ আবারও চুপ থাকতে বলে তাকে অন্ধের মতো টেনে নিয়ে চলল সে। কয়েক গজ সামনে এগিয়ে কেন যেন উন্মাদের মতো দৃষ্টিতে পায়ামের দিকে তাকিয়ে নিমা বলে উঠল, ‘ওদিকে দেখ।’
পায়াম কী দেখবে বুঝতে না পেরে এক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল। কিন্তু তারপরই ব্যাপারটা ধরতে পারল সে। অনেকটা উন্মাদের মতো সামনের দিকে এগিয়ে যা
দেখতে পেল সে, পৃথিবীর ইতিহাসে জীবিত খুব কম মানুষেরই সেটা দেখার সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্য হয়েছে। দাভুদের পুরো সেনাবাহিনীর শত শত সৈনিক
‘এরা তো সবাই—’ হতভম্বের চূড়ান্ত হয়ে পায়াম ফিরে তাকাল নিমার দিকে।
‘এরা সবাই বদলে গেছে, পুরো বাহিনীর সবাই।’
অবিশ্বাস আর আতঙ্কের সাথে নিমার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল পায়াম।
.
