পূর্বকথা
গল্পের শুরু
প্রথম অংশ: কল্পযাত্রা
দ্বিতীয় অংশ : সত্যাভিযান

সময়: ১৫৯৬ খ্রিস্টাব্দ – কিশোরগঞ্জ, জঙ্গলমহাল দুর্গ

সময়: ১৫৯৬ খ্রিস্টাব্দ – কিশোরগঞ্জ, জঙ্গলমহাল দুর্গ

জীবনের বিভিন্ন প্রান্তে কখনও কখনও এমন সময় আসে যখন ভবিতব্যকে মেনে নিতে হয়। কিন্তু সমস্যা হলো আপনি যদি এমন মানুষ হোন যে ছোটোবেলা থেকে কঠিন পরিশ্রম আর অধ্যবসায়ে নিজের ভাগ্য এবং ভবিষ্যৎ নিজের হাতে গড়ে তুলেছেন তবে এমন মানুষের জন্যে ভবিতব্যকে মেনে নিয়ে ভাগ্যের হাতে নিজেকে সঁপে দেওয়াটা অসম্ভবই বটে।

সুবাদার আসলাম শেঠের জন্যে আজকের রাতটা এমনই এক রাত। না চাইলেও মনে হচ্ছে নিজেকে তার ভাগ্যের হাতেই সঁপে দিতে হবে। তবে যত বিপদই আসুক না কেন, স্রষ্টার প্রার্থনা থেকে নিজেকে কখনও বিরত রাখতে পারে না সে। দুপাশে সালাম ফিরিয়ে মোনাজাতের জন্যে চোখের সামনে হাতটা তুলে ধরে বিড়বিড় করে স্রেফ একটা জিনিসই চাইল সে স্রষ্টার কাছে। নিজের নিরাপত্তা নয়, পরিবারের নিরাপত্তা নয়, নিজের মানুষদের রক্ষা করার সুযোগ কিংবা প্রতিজ্ঞা নয়। এমনকি নিজের প্রাণপ্রিয় স্ত্রীর সুরক্ষাও নয়, বরং সে বিড়বিড় করে বলে উঠল, ‘যেন আমি প্রতিজ্ঞাটা রক্ষা করতে পারি।’ কারণ সুবাদার আসলাম শেঠ জানে, তার এই প্রতিজ্ঞা রক্ষার ওপরে অনেককিছু নির্ভর করছে, নির্ভর করছে অনেক মানুষের প্রাণ, এমনকি এই বাঙাল মুলুকের ভবিষ্যতও, হয়তো সমগ্র মানবতারও।

মোনাজাত সম্পন্ন করেই জলচৌকিতে সোজা হয়ে বসল সে। জলচৌকি থেকে উঠে প্রথমেই যে-কাজটা করল, নিজের পরিধেয়ের ওপরে চড়িয়ে নিলো যুদ্ধের পোশাক। পরিধান শেষ করে তরবারি আর নিজের লম্বা ছুরি হাতে সে যখন শোবার ঘরে প্রবেশ করল দেখতে পেল তার স্ত্রী, এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে।

তাকে দেখে কোনোরকম আবেগের বহিঃপ্রকাশ না ঘটিয়ে বরং খুব শান্ত গলায় সে বলে উঠল, ‘সময় উপস্থিত, তাই না?’

স্ত্রী যতই আবেগহীনভাবে কথাটা বলে উঠুক না কেন, সুবাদার আসলাম শেঠ নিজেকে সামলাতে পারল না। তরবারি আর ছুরিটা একটা চৌপায়ার ওপরে রেখে দ্রুত গতিতে এগিয়ে গিয়ে শক্ত করে দুহাতে জড়িয়ে ধরল নিজের স্ত্রীকে, কতটা সময় অতিবাহিত হলো সেট ধরতে না পারলেও একটা সময় অনুভব করতে পারল, তার স্ত্রীও তার মতো ফুঁপিয়ে কাঁদছে।

নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে মুহূর্তের জন্যে তার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল সুবাদারের স্ত্রী। একটা হাত তুলে মুছে দিলো, আসলাম শেঠের চোখের পানি ‘সারাজীবন শক্তির সাধনা করে এসেছ তুমি, তোমার মতো মানুষের চোখে পানি মানায় না,’ এরকম করুণ এক সময়েও স্ত্রীর অদ্ভুত টানের বাংলা শুনে মৃদু হেসে উঠল আসলাম শেঠ। ‘তোমার বাংলাটা আজো ঠিক হলো না,’ কথাটা বলামাত্রই আসলাম শেঠের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। আর কোনোদিনই হয়তো এই চোখজোড়ার দিকে তাকিয়ে আবেগে ভেসে যাওয়া হবে না, আর কোনোদিনই হয়তো ভালোবাসায় জড়িয়ে ধরা হবে না প্রিয় মানুষটাকে, কথাটা মনে আসতেই নিজের স্ত্রীকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল সে আরেকবার। কতক্ষণ এভাবেই আবেগের স্রোতে ভেসে যাওয়া বহমান থাকত সেটা হয়তো দুজনার কেউই অনুধাবন করতে পারত না। কিন্তু পেছনে পায়ের শব্দ শুনে দুজনে পরস্পরকে ছেড়ে দিলো।

সুবাদার আসলাম শেঠের স্ত্রীর একান্ত ব্যক্তিগত পরিচারিকা এবং তার দেহরক্ষী এবং আসলাম শেঠের স্ত্রীর অধীনে পরিচালিত নারী বাহিনীর প্রধান, রায়েলি দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটার দিকে ফিরে তাকাতেই সে চোখ নামিয়ে নিলো ‘দুঃখিত, তার বাংলা উচ্চারণও আসলাম শেখের স্ত্রীর মতোই, যেন মুখে পানি নিয়ে কথা বলছে অনেকটা সেরকম। কারণ তারা দুজনে একই এলাকার লোক। ‘সুবাদার, সেনাপতি মোহরাম আপনার জন্যে বাইরে অপেক্ষা করছে।’

সুবাদার আসলাম শেঠ চৌপায়ার ওপরে রাখা তরবারি আর ছুরিটা উঠিয়ে নিয়ে আড়চোখে মেয়েটাকে একবার দেখে নিলো। একজন পরহেজগার মুসলিম হিসেবে চাইলেও সে মেয়েটার দিকে সরাসরি তাকাতে পারে না। যদিও এটার প্রয়োজন আছে, বিশেষ অবস্থায় বিশেষ বিচার। কিন্তু অভ্যাস তো আর বিশেষ অবস্থা মানে না। আড়চোখে তাকালেও মেয়েটাকে দেখে সে খুশি হয়ে উঠল, একেবারে প্রয়োজনমতো প্রস্তুতিমূলক পোশাক পরিধান করেই এসেছে মেয়েটা।

‘শুকরিয়া, রায়েলি,’ বলেই সে তার স্ত্রীর দিকে একবার দেখে নিয়ে আবার রায়েলির দিকে ইশারা করে বলে উঠল, ‘তোমরা দুজনেই মন দিয়ে শোনো আমি কী বলি।’

বর্তমান সময়ের তিন বছর আগে – রেলওয়ে কলোনি বস্তি, কমলাপুর, ঢাকা

চিন্তা-ভাবনা করাটাও এক ধরনের চর্চা করার মতো বিষয়, যারা এটা জানে না তাদেরকে বোকা মনে হয় তার কাছে। অবশ্য সেভাবে ভাবলে দুনিয়ার বেশিরভাগ মানুষই বোকা। কিন্তু সমস্যা হলো দুনিয়ার বেশিরভাগ মানুষ তার ব্যাপারে বরং উলটো মনে করে, অন্তত বোকা না হলেও উদ্ভট তো বটেই। শেষ বাক্যটা মাথায় আসতেই মেডিটেশনের গভীর স্তরে থাকার পরেও সে ফিক করে হেসে উঠল।

পৃথিবীর বেশিরভাগ মানুষ, আসলে বেশিরভাগ মানুষ নয় বরং প্রায় সব মানুষই সবকিছু বিচার বিবেচনা করে তাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে। যার জগৎ যত ছোটো হয়, তার দৃষ্টিভঙ্গিও ততটাই ছোটো হবে-এটাই খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। আর সে সূত্র ধরেই প্রচলিত সমাজের সংজ্ঞার সাথে যা মেলে না সেটাকেই তারা উদ্ভট, পাগল, ব্যতিক্রম এবং ক্ষেত্রবিশেষে বোকা হিসেবেও আখ্যায়িত করতে পিছপা হয় না। যেকোনো ব্যাপারের গহীনে সবাই যেতে পারবে না, এটাই স্বাভাবিক। বিশেষ করে তার মতো জিনিয়াসের জন্যে পুরো পৃথিবীটা ব্যতিক্রম হবে এটাও খুব স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। যা ভাবছিল সেটা থেকে সরে এসে এই ফালতু তত্ত্বকথা মাথার ভেতরে ঘুরপাক খেতে শুরু করাতে ইফতেখার মাহমুদ খানিকটা বিরক্ত হলো নিজের ওপরে। বড়ো করে একবার দম নিয়ে সে আবারও চিন্তা-ভাবনায় একটা ফোকাস নিয়ে আসার চেষ্টা করল।

একজন গবেষক হিসেবে ইফতেখার মাহমুদের নানাবিধ কাজের পাশাপাশি নিজের জগৎ এবং কাজ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করাটা খুব জরুরিভাবেই তার পেশার একটা অংশ। কিন্তু চাইলেও সময়ের অভাবে হোক, আর নানাবিধ কাজের ব্যস্ততায় হোক সবসময় মাথাটাকে খাটানো সম্ভব হতো না তার পক্ষে। আর তাই নিজের জগৎ নিয়ে ভাবনা চিন্তা করত সে মূলত তিনটা সময়; সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে দৌড়ানোর সময়ে, একজন ডিভোর্সি ব্যাচেলর হিসেবে রান্না করার সময়ে এবং রাতে ঘুমাতে যাবার সময়ে। এটা ছিল তার স্বাভাবিক জীবনে, নিজের কাজ আর গবেষণার বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করার প্যাটার্ন। শুধুমাত্র ইফতেখার মাহমুদ নয় বরং অনেক শিল্পী, সাহিত্যিক, লেখক ও গবেষকরাই এটা করে থাকেন। ইফতেখার মাহমুদও তাই করত তার স্বাভাবিক জীবনে। কিন্তু কয়েক মাসের বন্দি এবং পলাতক জীবনে সব পালটে গেছে।

নিজের পলাতক জীবনে দিনের বেশিরভাগ সময় তাকে রেলওয়ে কলোনি বস্তির একটা ট্রেনের পুরনো ভাঙা বগির ভেতরেই কাটাতে হচ্ছে। কাজেই চাইলেই সে সারাদিন চিন্তা-ভাবনা করতে পারে। কিন্তু সেটা আসলে হয়ে ওঠে না। আর তাই সে চিন্তা-ভাবনার জন্যে সকালে দুঘণ্টা মেডিটেশনে বসে, আবার রাতে দুঘণ্টা মেডিটেশনে বসে। এই চার ঘণ্টা সময় সে ভাবনা চিন্তা করে, নিজের কাজ ভবিষ্যৎ এবং নিজের কাজের জন্যে সম্ভাব্য স্ট্র্যাটেজি বের করে বসে বসে। যদিও গত কিছুদিন যাবৎ সব কিছুই ভুল প্রমাণিত হতে হতে সে একেবারে কোণঠাসা হয়ে গেছে। আর আজ রাতেই সেই কোণঠাসা পরিস্থিতির সর্বশেষ পরিণতি ঘটতে যাচ্ছে সম্ভবত। হয় আজ রাতে তার এবং তাদের মুক্তি ঘটবে, আর নাহয় আজ রাতে তারা ধরা পড়ে যাবে। বাকিরা ধরা পড়ে গেলেও সে ধরা পড়বে না, ধরা পড়ার চেয়ে সে মৃত্যুবরণ করবে। আনমনেই নিজের মাড়ির গোড়ায় থাকা শেষ দাঁতটায় একবার জিভ বুলিয়ে নিলো সে। কে জানে হয়তো এটারই প্রয়োজন পড়বে আজ রাতে সবচেয়ে বেশি।

তাও, মনে মনে আরেকবার বিরক্ত হলো ইফতেখার মাহমুদ। কোথায় আজ রাতে তাকে ঠান্ডা মাথায় সব ভাবা উচিত সেখানে আজ রাতে কি না চিন্তা-ভাবনা সব ওলট-পালট হয়ে গুলিয়ে যাচ্ছে। বড়ো করে আরেকবার দম নিয়ে চোখ খুলে উঠে দাঁড়াল সে। ঘুরে দাঁড়াতে গিয়ে আরেকটু হলে চমকে উঠত সে। ঠিক তার পেছনেই একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে অন্ধকারের ভেতরে।

‘আবদেল!’ চমকে উঠতে গিয়েও নিজেকে সামলে নিলো ইফতেখার। তুমি আরেকটু হলে চমকে দিয়েছিলে আমাকে,’ নিজের বন্ধু বিশিষ্ট আর্কিয়োলজিস্ট এবং গবেষক হাসান আবদেলের দিকে দুইপা এগিয়ে গেল ইফতেখার মাহমুদ। ‘কোনো খবর?’

সরি, আমি তোমাকে চমকে দিতে চাইনি,’ বলে সে ট্রেনের পুরনো দুটো সিট জোড়া দিয়ে বানানো ইফতেখার মাহমুদের বিচিত্র খাটটার এক কিনারায় বসে পড়ল। পুরনো ট্রেনের কামরাটার আরেকপাশে কাছাকাছি টাইপের আরেকটা বিছানায় প্রফেসর আবদেল থাকে। সিট কাম বিছানাটায় বসে সে চোখ তুলে তাকাল ইফতেখার মাহমুদের দিকে। ‘বন্ধু, তোমার কী মনে হয় আমরা পারব?’

‘হয় স্বাধীনতা, না হয় মৃত্যু,’ বলে মৃদু হেসে উঠল ইফতেখার মাহমুদ। মনে আছে চে গুয়েভারার এই ডায়লগটা?’ প্রিয় বন্ধুর কাঁধে একটা হাত রাখল সে। ‘অনেকটা পথ পাড়ি দিয়ে এসেছি আমরা, আবদেল। আমাদের পিছু ফেরার আর কোনো উপায় নেই। আমরা যা করতে চেয়েছি, যা করতে যাচ্ছি সেটা করার জন্যে ঝুঁকি তো কম নিইনি। মৃত্যুর কাছাকাছিও তো কমবার পৌঁছাইনি। এসব কিছু তো আমাদের জন্যে একেবারে নতুন নয়। তুমি-আমি দুজনেই এই খেলায় বহু পুরনো খেলোয়াড়।’

কথা বলতে বলতে বগির ভাঙা কাচের খোলা জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়েছিল সে। আবদেলের কাঁধে রাখা হাতটা হঠাৎ কাঁপতে শুরু করাতে বেশ খানকিটা চমকে গেল ইফতেখার মাহমুদ। আবদেলের মাথাটা তার বুকের ওপরে ঝুঁকে পড়েছে, আর থেকে থেকে সেটা কেঁপে উঠছে কান্নার দমকে। শক্তিশালী পুরুষ মানুষ যখন ভেঙে পড়ে, সেই দৃশ্য খুব সুখকর হয় না। প্রায় কোনো ভাবনা ছাড়াই নিজের প্রিয় বন্ধুকে বুকে জড়িয়ে ধরল ইফতেখার মাহমুদ। ‘শান্ত হও, বন্ধু, সব ঠিক হয়ে যাবে। যদিও সে জানে যে পথে তারা পা বাড়িয়েছে তাতে আসলে ঠিক হবার মতো আর কিছু বাকি নেই। যদি কিছু বাকি থেকে থাকে তবে সেটা হলো হ্যাঁ অথবা না।

‘শান্ত হও, বন্ধু—’  

ইফতেখারকে ছাড়িয়ে নিয়ে মাথা তুলে টকটকে লাল দুচোখ মেলে তাকাল প্রফেসর হাসান আবদেল। ‘আমরা যা করতে চাচ্ছি, আদৌ কি সেটার কোনো মূল্যায়ন হবে? আদৌ কি আমরা আর কোনোদিন নিজেদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারব? আমার একটামাত্র মেয়ে, তোমার—’  

আবদেলের দুকাঁধ শক্ত করে চেপে ধরল ইফতেখার মাহমুদ। ‘তুমিই তো বলতে সবকিছু আসলে মূল্য দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। সবকিছু সফলতা বা ব্যর্থতা দিয়েও মাপা যায় না। কিছু কাজ করতে হয় স্রেফ নিজের কর্তব্য আর দায়িত্ববোধ থেকে। আর তুমি জানো আমরা যা পেয়েছি, যা করতে চাচ্ছি সেটার চেয়ে বড়ো দায়িত্ববোধ এই পৃথিবীতে আর কিছু হতে পারে না। আমাদের কর্তব্য এবং করণীয় তুমি, আমি, আমার মেয়ে, তোমার মেয়ে বা আমাদের পরিবারের চেয়ে অনেক বড়ো কিছু। আর সেটা তোমার চেয়ে ভালো কেউ জানে না,’ বলে ইফতেখার মাহমুদ বাইরে তাকাল।

সময় যত গড়িয়ে যাচ্ছে, ঝুঁকি তত বাড়ছে। যত দ্রুত সম্ভব কাজ সারতে হবে। আর আজ রাতে কাজের জন্যে তার আবদেলের সহায়তা লাগবে, তাকে শক্ত হতে হবে সেই সাথে শক্ত করতে হবে আবদেলকে। ‘শোনো, আবদেল, আজ রাত আমাদের জন্যে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আমার বিশ্বাস চৌধুরীকে যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সেটা সে করতে পারবে। কিন্তু চৌধুরী তার কাজ সেরে ফিরে আসার আগে তোমাকে আমার কিছু কথা বলার আছে। মন দিয়ে শোনো আমার কথা।’

আবদেল খানিকটা স্থির হতেই বিড়বিড় করে প্রফেসর ইফতেখার মাহমুদ বলতে শুরু করল তার কথা। মাঝে মধ্যে প্রশ্নোত্তর চলল, সেই সাথে চলল মতামত আদানপ্রদান। তাদের আলোচনা যখন শেষ পর্যায়ে এমন সময় বাইরে একাধিক পায়ের শব্দ শোনা গেল।

আলোচনা থামিয়ে ইফতেখার মাহমুদ একবার মাথা উঁচু করে শোনার চেষ্টা করল বাইরের পদধ্বনি। মৃদু হাসি ফুটে উঠল তার মুখে। আবদেলের দিকে ফিরে বলে উঠল, ‘চৌধুরী চলে এসেছে। মনে থাকবে তো যা যা বলেছি?’

আপনাতেই মাথা নেড়ে সায় জানাল প্রফেসর হাসান আবদেল।

অতীত

সুবাদার আসলাম শেঠ বাইরে বেরিয়ে দেখল তার সেনাপতি মোহরাম প্রধান দুই সঙ্গীকে নিয়ে কামরার ঠিক বাইরেই দাঁড়িয়ে আছে। মোহরাম শুধু তার সেনাপতিই নয় বরং বন্ধুও বটে। কিন্তু সুবাদার আসলাম শেঠ নিশ্চিত যে এই জঙ্গলমহাল দুর্গের বসতভিটার এই অংশে এর আগে এত ভেতরে আসতে পারেনি মোহরাম। কিন্তু আজ রাতের হিসাব ভিন্ন।

‘কী খবর, মোহরাম?’ একেবারে রণসাজে সজ্জিত রণক্লান্ত মোহরামকে দেখে খানিকটা মায়াই লাগল সুবাদারের। গত কয়েকদিনের টানা যুদ্ধ এবং আজ রাতে এর শেষ পরিণতি তাকে ক্লান্তির শেষ পর্যায়ে নিয়ে গেছে। তবে আসলাম শেঠ জানে এই ক্লান্তি আসলে রণক্লান্তি নয়। এই ক্লান্তি সম্ভাব্য পরাজয়ের ক্লান্তি। যেকোনো সৈনিক যুদ্ধের ময়দানে পরাজিত হয় পরে, আগে সে পরাজিত হয় নিজের মাথার ভেতরে, নিজের মনের ভেতরে। আসলাম শেঠ জানে কয়েকদিনের তীব্র আক্রমণের তোড়ে তার বাহিনী নিজেরদের ভেতরে আগে আগেই পরাজিত হয়ে গেছে। এখন শুধু বাহ্যিক পতনটা বাকি। এরকম বাহিনী নিয়ে মৃত্যুমুখে ঝাঁপ দেওয়া যায়, যুদ্ধ জয় করা সম্ভব হয় না। আর মোহরাম যখন মুখ খুলল ঠিক এটাই যেন ঘোষণা করল সে।

‘খবর ভালো না, সুবাদার। মোঘলদের বাহিনী সর্বাগ্রে আগায়া আসছে। জঙ্গলমহালের পতন এখন স্রেফ সময়ের ব্যাপার,’ শেষ কথাগুলো উচ্চারণ করতে গিয়ে মোহরামের গলাটা যেন ভেঙে এলো। আসলাম শেঠ জানে জঙ্গলমহাল তার সম্পত্তি হলেও এই দুর্গের প্রতি মোহরামের ভালোবাসা তারচেয়ে অনেক বেশি। কারণ এই দুর্গের ভেতরেই জন্ম মোহরামের, এখানেই বেড়ে উঠেছে সে। আর তাই জঙ্গলমহালের সাথে তার আত্মার টান।

স্বাভাবিক অবস্থায় যে-কাজটা সে কখনোই করত না, আবেগের আতিশয্যে ঠিক সেটাই করে বসল। আনমনেই একটা হাত রাখল সে মোহরামের কাঁধে। ‘নিজেকে সামলে নাও, সেনাপতি। মনে রেখ সুসময়ে নয় দুঃসময়ে যেমন প্রকৃত বন্ধুর পরিচয়, ঠিক তেমনি খারাপ সময়েই প্রকৃত সেনাপতির পরিচয় পাওয়া যায়। জঙ্গলমহালের যদি পতন হয়, তবে সেই পতন যেন শুধু দুর্গেরই হয়, শেখ সুবাদার আসলাম শেঠের পরিবারের কিংবা তার সেনাবাহিনীর সুনামের পতন যেন না হয়—সেটা দেখতে হবে আগে। বুঝতে পেরেছ?’ শেষ কথাগুলো বলার সময়ে মোহরামের কাঁধে শক্ত করে একটা ঝাঁকি দিলো আসলাম শেঠ।

আসলাম শেঠের ঝাঁকি খেয়ে সোজা হয়ে মুখ তুলে তাকাল সে। নিজেকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করছে মোহরাম, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত একজন প্রকৃত সৈনিকের পেশাদরিত্বের ভাব ফুটে উঠতে শুরু করেছে তার চোখে-মুখে। ‘জি সুবাদার, বলুন আমার করণীয় কী? শুধু আমি না, আমার অধীনে থাকা প্রতিটা লোক তার শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত বিলিয়ে দিবে আপনার জন্যে, জঙ্গলমহাল এবং আপনার পরিবারের সুনামের জন্যে,’ বাক্যগুলো শেষ হয়ে আসতে আসতে অপরিসীম দৃঢ়তা ফুটে উঠল তার চোখে মুখে। ‘আমার চিন্তা শুধু বেগম সাহেবা আর তার সাথের-’

সুবাদার আসলাম শেঠ ঘুরে দাঁড়িয়ে বসতভিটার বাইরের দিকে এগোতে শুরু করেছে। মোহরাম শেষ কথাগুলো কেন বলেছে সেটা সে বেশ ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছে। কারণ জঙ্গলমহালে আক্রমণ হবার সাথে সাথে জঙ্গলমহালকে শত্রুরা পুরোপুরি ঘিরে ফেলার আগেই নারী, বৃদ্ধা ও সমস্ত শিশুদেরকে আগে সরিয়ে ফেলা হয়েছে আসলাম শেখের বন্ধুসম রসুল খাঁর এলাকায়। জঙ্গলমহালে রয়ে গেছে শুধুমাত্র আসলাম শেঠের স্ত্রী এবং তার সঙ্গীরা। সেটারও বিশেষ কারণ আছে।

ণরাজয় নিশ্চিত জেনেও বারবার বলার পরও বেগম সাহেবাকে সরায়নি সে এবং এখন একদিকে দুর্গের চূড়ান্ত পতনের সময়ে চলে এসেছে, সেই সাথে শত্রুরাও ঘিরে ধরেছে জঙ্গলমহালকে। যদি জঙ্গলমহালের পতন হয় এবং তারা পরাজিত হয় তবে বেগম সাহেবার কী হবে—সেটাই মোহরামের চিন্তার বিষয়। মোহরাম কেন এই কথা বলেছে সেটা বুঝতে পারলেও সেই বিষয়ে কিছুই বলল না আসলাম শেঠ। বরং সামনে এগোতে এগোতে সে একেবারে ভিন্ন প্রসঙ্গে কথা বলে উঠল।

‘মোহরাম, আমাকে সার্বিক পরিস্থিতির বিষয়ে জানান দাও। পরবর্তী করণীয় ঠিক করতে হলে আমাকে আগে পরিস্থিতি বুঝতে হবে।’

সুবাদার আসলাম শেঠের ঠিক পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে পরিস্থিতির বয়ান দিয়ে চলল মোহরাম। ‘হুজুর, জঙ্গলমহালের সামনের প্রধান তিন বুরুজের দুইটারই অবস্থা কাহিল। একটার একদিক ধইসা পড়ছে। ওটা আমরা ছাইড়া দিছি, ওই অংশের দখল নিয়া নিছে শত্রুপক্ষ।

‘আর বাকি দুটো?’ আসলাম শেখের ভ্রু কুঁচকে উঠেছে শুনতে শুনতে।

‘বাকি দুটোর মধ্যে একটার অবস্থা খুবই খারাপ। যেকোনো সময়ে সেটা শত্রুপক্ষের হাতে চলে যেতে পারে। আমি ভেতরে আসার আগেও প্রাণপণে লড়াই চলছিল। তবে আমাদের সৈন্যরা এতক্ষণে হয়তো–’ ইচ্ছে করেই সে বাক্যটা সমাপ্ত করল না।

মোহরাম আর তার সঙ্গীকে নিয়ে দুর্গের তৃতীয় বুরুজের ওপরে এসে সামনের দিকে তাকিয়ে আসলাম শেঠ অন্ধকারের ভেতরে বোঝার চেষ্টা করল দ্বিতীয় বুরুজে আসলে হচ্ছেটা কি। প্রথম বুরুজে উড়তে থাকা শত্রুপক্ষের পতাকা দেখে এটা পরিষ্কার যে সেটা ইতিমধ্যেই বেদখল হয়ে গেছে। কিন্তু আধো অন্ধকারের ভেতরে দ্বিতীয় বুরুজের দিকে তাকিয়ে ঠিক পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে না ওখানে প্রকৃতপক্ষে হচ্ছেটা কী? এই রাতের বেলা দূরবীক্ষণও যে খুব বেশি কাজ করবে না, সেটাও তো জানা কথা।

‘মোহরাম, আমাদের কি ওইখানে লোকবল পাঠানো উচিত?’ প্রায় আর্তনাদের গলায় বলে উঠল সুবাদার। যদিও সে আগে থেকেই জানত কী ঘটছে ওখানে এবং সম্ভবত একই ব্যাপার ঘটতে চলেছে ওদের সাথেও, তবুও নিজের লোকদেরকে সে কখনও পর কিংবা শুধুমাত্র কাজের লোক কিংবা সৈন্য হিসেবে দেখেনি। বরং সবসময়ই নিজের একান্ত আপন এবং কাছের মানুষ হিসেবে বিবেচনা করেছে।

‘হুজুর,’ মোহরামের মাথা আপনাতেই নিচু হয়ে গেল। ‘আপনেও জানেন ওইখানে আরও লোক পাঠানো মানে তাগোরেও সরাসরি মৃত্যুর মুখে ঠেইলা দেওয়া,’ মোহরামের গলাতেও কষ্টের ছাপ।

হঠাৎ বাজ পড়ার মতো তীব্র শব্দে কেঁপে উঠল পুরো জঙ্গলমহাল। আগুন ঝলসে উঠল দ্বিতীয় বুরুজের একপাশে, সেই সাথে অসংখ্য মানুষের হই হই রব ভেসে এলো। না চাইতেও আপনাতেই সামনের দিকে দুই পা এগিয়ে গেল সুবাদার আসলাম শেঠ। তীব্র শব্দ, আগুনের উত্তাপ আর অসংখ্য মানুষের আর্তনাদের সাথে সড়সড় করে দ্বিতীয় বুরুজের ওপরে উঠে গেল শত্রুদের পতাকা। যদিও সবই জানা, তবুও দুঃখে পানি চলে এলো আসলাম শেঠের চোখে। আনমনেই সেদিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে একবার মোহরামকে দেখে নিয়ে সে ফিরে দেখল বুরুজের ওপরে দাঁড়িয়ে থাকা নিজের লোকদেরকে। কারও ভাই, কারও বন্ধু কারও বাবা কিংবা আপনজন মারা পড়ছে ওইখানে, পবিত্র জন্মভূমি পদদলিত হচ্ছে শত্রুর করতলে, তবুও কিছুই করার নেই। আসলেই কি কিছু করার নেই!

একটাই করণীয়, মনে মনে দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠল আসলাম শেঠ যদিও নিজের বিচিত্র আর বাহুল্যময় জীবনে সে বহু দেশ, বহু জায়গাতে ঘুরে বেড়িয়েছে। কিন্তু মোহরামের মতোই এই জঙ্গলমহাল তারও জন্মভূমি, তারও মাতৃভূমি। তবে আসলাম শেঠ এটাও জানে যেদিন সে নিজের স্ত্রীকে এখানে নিয়ে এসেছিল সেদিন জঙ্গলমহাল, কিংবা নিজের মাতৃভূমির চেয়েও অনেক অনেক বড়ো এক পবিত্র দায়িত্ব সে নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিল। এমনকি নিজের মাতৃভূমির বিনিময়ে হলেও এই পবিত্র দায়িত্ব তাকে পালন করতেই হবে। আর নিজের কিংবা নিজের মানুষদের জীবনাবসান করে হলেও সেটা সে পালন করবে। বৃহত্তর স্বার্থে ক্ষুদ্রতর বিসর্জন।

মনে মনে সে একবার পুরো জঙ্গলমহালের আকৃতিটা ঝালাই করে নিলো । তিনদিকে ভূমি আর একদিকে জলপথের সাথে সংযুক্ত কেল্লাটা আক্ষরিক অর্থেই চারপাশে জঙ্গল আর জলভূমির মাঝখানে অবস্থিত; পুরো জঙ্গলমহালের দুর্গটাকে ঘিরে আছে পরিখা। পুরো দুর্গের রক্ষণভাগ নিয়ন্ত্রণ করা হয় মূলত তিনটে বুরুজ থেকে। প্রথম বুরুজটা প্রবেশ পথের একেবারে সম্মুখভাগেই এবং সেটাই সবচেয়ে শক্তিশালী। আর বিগত দশদিনের যুদ্ধে প্রথম বুরুজটারই পতন হয়েছে সবার আগে। আর সেটা ঘটার সাথে সাথেই অরক্ষিত হয়ে পড়েছে পুরো দুর্গ। কিন্তু এটাও ঠিক, হয়তো প্রথম বুরুজের সাথে প্রায় সমান্তরালে দ্বিতীয় বুরুজ। যেটার পতন হলো এইমাত্র। দ্বিতীয় বুরুজ অতটা শক্তিশালী না হলেও দুর্গের ভেতরে বসতবাড়িগুলোকে আগলে থাকা তৃতীয় বুরুজ অত্যন্ত শক্তিশালীভাবে গড়ে তোলা। আর প্রথম দুটো বুরুজের সাথে তৃতীয় বুরুজের দূরত্বও বেশ অনেকটা। একটাই উপায় আছে তাদের সামনে। মনে মনে নিজের করণীয় ঠিক করে নিয়েই মোহরামের দিকে ফিরে তাকাল আসলাম শেঠ।

‘মোহরাম, শত্রুপক্ষের অবস্থান বর্ণনা করো আমার কাছে।’

‘হুজুর, অনুমতি দিলে আমি জানাইতে পারি,’ মোহরামের পাশ থেকে সৈনিকদের প্রধান বয়স্ক লোকটা বলে উঠল। ‘হুজুর, পরিখার বাইরে আমাদের দুর্গের সম্মুখভাগ পুরাটাই আগলে আছে শত্রুপক্ষ। তিনকোনা দুর্গের সম্মুখভাগ এবং দুইপাশে অর্ধবৃত্তাকারে ছড়ায়ে আছে সৈনিকেরা। জঙ্গলের ভেতরের সমস্ত পথ আগলে আছে ওরা, যাতে বাইরের কোনো সাহায্য আমাদের নিকটে পৌঁছাতে না পারে। আর দুর্গ থেকে একটা পক্ষীও ওই পথে পলাইতে না পারে।’

এই তথ্য আসলাম শেঠ জানে। আর এ-কারণেই রসুল খাঁর কোনো সাহায্য তাদের কাছ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেনি। ‘আর পেছনের জলপথ?’

হুজুর, পেছনের জলপথে সরাসরি কোনো প্রহরার খবর পাওয়া যায়নি। তবে আমি নিশ্চিত, জলপথের ওপাশেও তাদের বাহিনী প্রস্তুত আছে। জলপথে কেউ বেরোলে মূল নদীতে পড়ামাত্রই ধরা পইড়া যাবে। এছাড়াও ওরা স্থানীয় মোঘল জলচৌকির সহায়তা পাইব।’

বয়স্ক সৈনিক প্রধানের শেষ কথাটা শুনে সুবাদারের মুখে মৃদু হাসি ফুটে উঠল। ‘মোহরাম, তোমার অধীনে সৈন্য যারা আছে তাদেরকে তৃতীয় বুরুজের নিচে নামিয়ে বসতবাড়ি আগলে একটা সাময়িক প্রতিরক্ষা দেওয়াল তৈরি করে ফেলতে বলো।’

আসলাম শেঠের কথা শুনে মোহরাম তো বটেই এমনকি বয়স্ক সৈনিকও অবাক হয়ে চোখ তুলে তাকাল তার দিকে। ‘হুজুর, কী বলছেন আপনি। এই দুর্গে আর শত্রুপক্ষের বিজয়ের ভেতরে এখন একটাই বাধা আর সেটা হলো এই তৃতীয় বুরুজ। এটা ছাইড়া দিলে তো—’  

‘মোহরাম, যা বলছি করো,’ আসলাম শেঠের গলায় পাহাড়সম দৃঢ়তা।

‘গোস্তাকি নিবেন না, হুজুর, আমাদের হাতে কিন্তু খানিকটা সময় আছে, আমার মনে হয় না শত্রুপক্ষ দ্বিতীয় বুরুজ দখলের পর সকালের আগে আর আক্রমণ চালাবে কারণ ওরা জানে আমরা ফাঁদে আটকে পড়ে গেছি। আমরা যদি সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারি—’

‘আমি চাই ওরা সকাল নয়, রাতেই আক্রমণ করুক,’ আসলাম শেঠ মৃদু হেসে বলে উঠল। ‘ঠিকভাবে বলতে গেলে রাতেই আক্রমণ করতে প্রলুব্ধ হোক।’

মোহরামসহ সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। ‘তাহলে কি তৃতীয় বুরুজ থেকে—’

সব সৈনিক নিচে নামিয়ে বসতবাড়ি আগলে সাময়িক দেওয়াল তৈরি করতে বলো, বসতবাড়িতে তোমার বেগম সাহেবার কাছে একটা বিশেষ বার্তা পাঠাও—’

‘হুজুর, এই বুরুজের প্রহরা-’

মোহরামকে কথা শেষ করতে দিলো না আসলাম শেঠ। ‘দরকার নাই, বলে সে ফিরে তাকাল নিজের বন্ধুসম সেনাপতি ও সৈনিক প্রধানের দিকে। ‘কারণ এই বুরুজে আমরাই আগুন ধরায়ে দিব। মৃত্যু আলিঙ্গনের সময় এসে গেছে, বন্ধু।’

বর্তমান সময়ের তিন বছর আগে – কমলাপুর রেলওয়ে কলোনি বস্তি

পুরনো লাইনচ্যুত যে বগিটায় বিগত বেশ কিছুদিন ধরে তারা থাকছে সেটার ঠিক বাইরে পায়ের শব্দ শুনে ইফতেখার মাহমুদ আর হাসান আবদেল দুজনেই ফিরে তাকাল সেদিকে।

‘আবদেল, চৌধুরী চলে এসেছে, যা যা বলেছি মনে রেখ,’ বলে সে উঠে দাঁড়াতেই ভেতরে প্রবেশ করল পঁয়ত্রিশ-ছত্রিশ বছর বয়সের একজন মানুষ। সদ্য যৌবনের কোঠা পার হয়ে মধ্যবয়সের দিকে রওনা দেওয়া মানুষটার বয়স প্রফেসর আবদেল আর প্রফেসর ইফতেখারের অর্ধেকের চেয়ে কিছু বেশি হলেও তাকে দেখতে লাগে অনেক বেশি বয়স্ক; আর বিগত কয়েক মাসের মানসিক চাপ এবং বাজে পরিস্থিতি তাকে আরও বেশি এলোমেলো আর বয়স্ক করে তুলেছে। বয়সে কম হলেও সে একজন গবেষক, চোর-বাটপাড় কিংবা আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার লোক নয় যে দিনের-পর-দিন চোরের মতো পালিয়ে বেড়াবে লোকজনের চোখে ধুলো দিয়ে। অথচ সেটাই তাকে করতে হচ্ছে বিগত বেশ কিছুদিন ধরে।

‘চৌধুরী, কী অবস্থা বাইরে? যা করতে বলেছিলাম সেটা করতে পেরেছো?’ যদিও সে অত্যন্ত ঠান্ডা মাথার মানুষ কিন্তু এই মুহূর্তে তার গলায় চাপা উদ্বেগ কোনোভাবেই আর চাপা থাকল না।

কিন্তু সে যত উৎকণ্ঠার সুরেই প্রশ্ন করুক না কেন, চৌধুরী হাসান শেখ কোনো জবাব দিলো না। তাকে দেখে মনে হচ্ছে যেকোনো মুহূর্তে সে ক্লান্তি আর চিন্তার চোটে ধসে পড়বে। প্রফেসর ইফতেখারের প্রশ্নের জবাব না দিয়ে সে অদ্ভুত সেই সিট বিছানার এক কোনায় গিয়ে ধপ করে বসে পড়ল।

‘চৌধুরী, তুমি ঠিক আছ?’ প্রফেসর আবদেল চিন্তিত দৃষ্টিতে একবার ইফতেখার মাহমুদের দিকে দেখে নিয়ে সে ফিরে তাকাল চৌধুরীর দিকে। কিন্তু কিছু বলার আগে চৌধুরীই কথা বলে উঠল। ‘স্যার, আপনি যা বলেছিলেন সেটাই সত্যি প্রমাণিত হয়েছে।’

ইফতেখার মাহমুদ তার বন্ধু আবদেলের দিকে তাকিয়ে একবার কাঁধ ঝাঁকাল তার মুখ এবং শরীরের ভাষা পরিষ্কার বলছে, আমি আগেই জানতাম। ‘শান্ত হও, চৌধুরী, এরকমটা হবারই কথা ছিল।’

‘স্যার, আমরা ধরা পড়ে গেছি। এতদিন ধরে লুকিয়ে থেকে তবে কি—’  

প্রফেসর আবদেল ট্রেনের বগির জানালার দিকে এগিয়ে গেল। ‘ধরা পড়ে গেছি মানে? ওরা কি এখানে চলে এসেছে নাকি?’ সে অস্থির হয়ে উঁকি দিয়ে জানালার বাইরে দেখার চেষ্টা করছে।

‘শান্ত হও, আবদেল,’ ইফতেখার মাহমুদ শান্ত গলাতেই কথা বলে উঠল ‘আমরা এই এলাকাতে আছি-এটা ওরা বুঝতে পেরেছে। কিন্তু একেবারে নির্দিষ্টভাবে কোথায় আছি সেটা ওরা এখনও বের করতে পারেনি।’

তুমি এতটা নিশ্চিন্ত হচ্ছো কীভাবে?’ প্রফেসর আবদেলের গলার দুঃশ্চিন্তা কিছুতেই কমছে না। সে আবারও জালালা দিয়ে বাইরে উঁকি দিয়ে অন্ধকারের ভেতরে বোঝার চেষ্টা করছে-আসলে বাইরে কেউ তাদেরকে ধরার জন্যে ওঁত পেতে আছে কি না।

‘আবদেল!’ এবার খানিকটা রাগের সাথেই সে বলতে গেলে ধমক দিয়ে উঠল প্রফেসর আবদেলকে। ‘বললাম না শান্ত হতে। আমি নিশ্চিত ওরা বের করতে পারেনি আমরা নির্দিষ্টভাবে কোথায় আছি। যদি সেটা পারত তবে চৌধুরীও আমাদের কাছ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারত না, আর আমরাও এখনও মুক্ত থাকতাম কি না সন্দেহ আছে,’ প্রফেসর আবদেলকে এটুকু বলে ইফতেখার মাহমুদ এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াল তার ছাত্র এবং পারসোনাল সেক্রেটারি চৌধুরীর সামনে।

‘চৌধুরী, তুমি ঠিক করে বলো তো কী দেখে এসেছ বা শুনেছ?’ ইফতেখার মাহমুদ বাঁহাতের তর্জনী আর বৃদ্ধাঙ্গুলি এক করে ভ্রুর ওপরে ঘষতে শুরু করেছে। এটা অনেকটা তার মুদ্রাদোষের মতো। বিশেষ করে ভাবনা চিন্তা করার সময়ে সে এমনটা করে।

স্যার, আপনি ঠিক যেভাবে বলেছিলেন সেভাবেই আমি টোকাই আর কমলাপুরের ফকির বাহিনীর প্রধানকে টাকা খাইয়েছিলাম। সে আজ রাতে জানান দিয়েছে: তার বাহিনী নাকি এই এলাকাতে পুলিশের ইনফরমারদেরকে ঘুরঘুর করেত দেখেছে।’

‘এটা খুব স্বাভাবিক একটা ব্যাপার, ইফতেখার মাহমুদ ভ্রু থেকে হাত নামিয়ে নিলো। ‘কমলাপুর এলাকা খুব বিজি এবং কম্পলিকেটেড একটা এরিয়া। তার ওপরে ক্রাইম এবং ড্রাগ এগুলোরও আখড়া। কাজেই এখানে পুলিশের চর আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার লোকেরা বেশি বেশি চারপাশে ঘুরঘুর করবে এটাই স্বাভাবিক।’

‘আপনি ভুল বুঝছেন স্যার, চৌধুরী মাটি থেকে একটা পানির বোতল তুলে নিতে নিতে বলে উঠল। ‘এই এলাকাতে পুলিশের চরেরা ঘোরাঘুরি করছে এটা স্বাভাবিক ঘটনা হলেও একেবারে নির্দিষ্টভাবে আমাদের এই বগির আশপাশেও গতকাল থেকে এই এলাকায় পুলিশের সবচেয়ে কুখ্যাত ইনফরমার মন্টুকে ঘোরাফেরা করতে দেখা গেছে। শুধু মন্টু না, মন্টুর ডান হাত হিসেবে খ্যাত দুবলা নামের একজনকে দুবার এই বগির সামনে দেখেছে আপনার নিয়োগ দেওয়া টোকাইদের একজন। টোকাইদের নেতা দুলাল আজকে আমাকে লোকটাকে দেখিয়েছেও।’

ইফতেখার মাহমুদ বাইরের দিকে তাকিয়ে আনমনেই বলে উঠল, ‘লোকটা কি হ্যাংলা-পাতলা ছোটো করে, একটা কান নেই?’ এই প্রথমবারের মতো চৌধুরীর কথা শুনে ইফতেখার মাহমুদের গলায় মেঘ জমতে শুরু করেছে।

‘স্যার, আপনি কীভাবে জানলেন?’ চৌধুরী পানি খেতে খেতে খুব অবাক হয়ে জানতে চাইল। প্রফেসর আবদেলও বেশ অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে ইফতেখার মাহমুদের দিকে।

‘তোমার কি ধারণা, এতদিন ধরে আমরা এখানে লুকিয়ে আছি, সবকিছু আমি সামলাচ্ছি; শুধু ছোটোখাটো কাজগুলো তোমাকে করতে দিয়েছি, চৌধুরী। তাহলে আজ কেন হঠাৎ করে তোমাকে পাঠালাম টোকাই আর ভিক্ষুকদের দলটার সাথে যোগাযোগ করার জন্যে?’ এই পর্যন্ত বলে সে ফিরে তাকাল আবদেল আর চৌধুরীর দিকে। ‘কারণ আমি গতকালই টের পেয়েছি কিছু একটা ঠিক নেই। গড়বড় হয়ে গেছে কোথাও,’ বলে সে বিছানার পাশ থেকে একটা সিগারের প্যাকেট তুলে নিয়ে তা থেকে সিগার বের করে ধরাল। নিজেদের পরিচয় গোপন করে লুকিয়ে থাকার জন্যে সবকিছু করলেও শুধু ভালো সিগার খাবার ব্যাপারটা ছাড়তে পারেনি ইফতেখার মাহমুদ। প্রথম কয়েকদিন চেষ্টা করেছিল সিগারেট খাবার জন্যে, কিন্তু কাজ হয়নি। পারেনি, এরপর সেই চেষ্টা বাদ দিয়ে সে আবারও পুরনো সিগার টানার অভ্যাসে ফিরে গেছে।

‘কারণ যে-লোকটার কথা তুমি বললে, সিগারেটে একটা টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে ইফতেখার মাহমুদ বলে উঠল। ‘তাকে আমি গত দুই দিনে একাধিকবার এদিকে দেখেছি। তবে সে সম্ভবত এখনও পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারেনি, কারণ আমি কিংবা আবদেল কেউই আমরা এই বগি থেকে বের হইনি বলে,’ ইফতেখার মাহমুদ নিশ্চিত ভঙ্গিতে সিগারেট টানছে। প্রফেসর আবদেল অস্থির হয়ে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল তার আগেই সে একটা হাত তুলে থামিয়ে দিলো তাকে।

‘অস্থির হয়ো না,’ বলে সে নিজেই মৃদু হেসে উঠল। যদিও অস্থির হবার মতো কারণ যথেষ্টই আছে আসলে। ওরা এই পর্যন্ত যেহেতু চলে এসেছে এবং চৌধুরীর নিয়ে আসা তথ্য অনুযায়ী আমি ধারণা করতে পারি বড়োজোর আজকের রাতটা আমরা এখানে টিকতে পারবো। কাল ধরা পড়ে যাবো।’

‘তাহলে এখন করণীয় কি, স্যার?’

‘এতদিনে পালিয়ে বেড়ানো কি তবে কোনো কাজেই আসবে না?’ প্রফেসর আবদেলের গলায় অস্থিরতা। ‘আমরা

‘আবদেল, আমি মানা করছি অস্থির হয়ো না। আমাদের হাতে সময় খুব কম, আর বড়োজোর চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা আছে, সম্ভববত তাও নেই। কাজেই এরকম সময়ে অস্থির হলে চলবে না। মনে রেখ, আমরা একটা বিরাট উদ্দেশ্য নিয়ে লড়ছি,’ বলে সে নিজে বিড়বিড় করে বলে উঠল। বিরাট নয়, সবম্ভবত ইতিহাসের সবচেয়ে বড়ো উদ্দেশ্য নিয়ে। বিড়বিড় করে কথাটা বলেই সে হঠাৎ ঝট করে দুজনার দিকে ফিরে তাকাল। ‘এক মিনিট, আমি বিরাট একটা ভুল করে ফেলেছি, শিট,’ বলে সে অস্থির হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে হাতের সিগারেটটা মেঝেতে ছুড়ে ফেলল। ‘আমি এতবড়ো ভুল কীভাবে করলাম? শিট!’

‘কী ব্যাপার হঠাৎ–’  

‘আবদেল, দুঃখিত বন্ধু, আমাদের হাতে আসলে কোনো সময়ই নেই, যেকোনো সময়ে ধরা পড়ে যাব আমরা। ইতিমধ্যেই যে পড়িনি সেটাই অনেক বড়ো বিষয়!’

‘কারণ কী? হঠাৎ হলোটা কী সেটা তো বলো!’ ইফতেখারের উত্তেজনা প্রফেসর আবদেল আর চৌধুরীর ভেতরেও সঞ্চারিত হতে শুরু করেছে।

‘পুলিশের লোকেরা যদি আমাদেরকে ট্রেস করে থাকে, তবে নিশ্চয়ই ওরা আমাদের ওপরে নজর রাখছে। সেক্ষেত্রে ওরা আজ রাতে চৌধুরীকে বের হতে দেখেছে এবং ফিরে আসতেও দেখেছে। তারমানে ওরা কয়েক ঘণ্টা আগেই নিশ্চিত হয়েছে আমরা এখানে আছি।’

‘সেটা নাও হতে পারে, কারণ আমি বা তুমি তো বাইরে বের হইনি, ওরা আমাদেরকে দেখতে পায়নি,’ আবদেল বলে উঠল

‘সেটা ঠিক, কিন্তু চৌধুরী বের হবার পরও এখানে আলো জ্বলেছে তারমানে এখানে কেউ-না-কেউ আছে এই ব্যাপারে ওরা নিশ্চিত। অন্তত চৌধুরী এই মুহূর্তে এখানে আছে এটা তো পুরোপুরি নিশ্চিত। তাহলে ওরা এখনও কিছু করেনি কেন?’

প্রফেসর আবদেল এবং চৌধুরী দুজনেই চুপ। দুজনেই বুঝতে পারছে না কারণটা কী?

‘এর পেছনে একটাই কারণ হতে পারে। ওরা আমাদেরকে ধরবেই না।’

‘কেন, আর যদি না ধরে তবে তো ভালোই—’

‘ভুল, ওরা ধরবে না মানে ওরা সম্ভবত টাকা খেয়ে সুযোগ করে দিবে অন্য কাউকে ধরার জন্যে। আমি নিশ্চিত আমাদের ওপরে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার যারা নজর রাখছে, ওরা জানেই না কেন আমরা গুরুত্বপূর্ণ। কাজেই এদেরকে টাকা দিয়ে কেনা-’

‘রেলিক-,’ প্রফেসর আবদেলের গলায় ঠান্ডা আতঙ্ক।

‘অথবা নেক্রপলিস,’ ইফতেখার মাহমুদ ছোটো জায়গাটায় পায়চারি করতে করতে বলে উঠল।

‘এখন করণীয় কী, স্যার?’ অনেকক্ষণ পর চৌধুরী কথা বলে উঠল। তার গলা শুনে মনে হচ্ছে যেকোনো সময় কেঁদে ফেলবে সে।

ইফতেখার মাহমুদ কিছু না বলে আরেকটা সিগার ধরালো। তাকে আবারও বেশ শান্ত দেখাচ্ছে। ‘ওয়েল, জাদু দেখেছ তোমরা কখনও?’ বলে সে ফিরে তাকাল প্রফেসর আবদেল আর চৌধুরীর দিকে। দুজনেই হাঁ করে তাকিয়ে আছে তার দিকে। মনে মনে ভাবছে লোকটা অধিক মানসিক চাপে পাগল হয়ে গেল নাকি?

‘যাক গে, জাদুর কথা না বলি,’ বলে সে সিগারেটে কষে আরেকটা টান দিলো। আমরা সেটাই করব ওরা, মানে আমাদের অদৃশ্য শত্রুপক্ষ যেটা আশাই করছে না,’ বলে সে আবারও থামল। আবদেল আর চৌধুরীর অবাক মুখের দিকে তাকিয়ে যোগ করল। ‘ওরা আমাদের দিকে ধেয়ে আসার আগে আমরাই ওদের দিকে ধেয়ে যাব,’ বলে সে মৃদু হেসে উঠল।

অতীত

কাউকে হত্যা করার সময়ে মোঘল সেনাপতি বাহরাম খাঁর ভেতরে অদ্ভুত এক দোদুল্যমানতা কাজ করে। বিষয়টা এমন না যে সে কাউকে আঘাত করতে ভয় পায়, কিংবা কারও গলা কাটতে তার হাত কেঁপে ওঠে, বরং কাউকে মারতে গেলে উলটোটা ঘটে। যখন কারও শরীরে নিজের বিরাট তরবারিটা প্রবেশ করায়, কিংবা সেটার তীব্র আঘাতে মাংস কেটে হাড় ভেঙে মানুষটার শরীর ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় সেটা বরং তাকে বিচিত্র এক আনন্দ দেয়। আর বাহরাম খাঁর দ্বিধাটাও ঠিক এখানেই। সমাজের খুবই দরিদ্র অংশ থেকে উঠে আসা বাহরাম খাঁ নিজেকে খুব ধার্মিক মানুষ মনে করে। সে মনে করে সমাজের যে চাপা পড়া অংশ থেকে উঠে এসে আজকে একজন মোঘল সেনাপতি হতে পেরেছে এটার পেছনে একমাত্র কারণ হলো তার স্রষ্টার অনুগ্রহ। তার ওপরে স্রষ্টার অপরিসীম কৃপা ছিল বলেই সে আজ মোঘল বাহিনীর মতো ভারতের সর্ববৃহৎ সেনাবাহিনীর একটা বড়ো দলের সেনাপতি হতে পেরেছে। সমস্যা হলো একদিকে সে স্রষ্টার প্রতি অপরিসীম নিগ্রহ অনুভব করে। আবার সেই স্রষ্টার সৃষ্টির প্রাণ হরণ করতে গিয়ে সে এক বিচিত্র আনন্দ অনুভব করে। এই পরস্পরবিরোধী অনুভূতির তল সে আজো খুঁজে পায়নি। তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে থাকা বন্দির মাথার পেছনের চুল ধরে তার সৈনিক যখন লোকটার গলা উন্মুক্ত করে ধরল মানুষটা চোখে অসহায় মৃত্যুভয় দেখে নিজের ভেতরে সেই বিচিত্র-বিকৃত আনন্দ অনুভব করতে লাগল বাহরাম খাঁ। মুহূর্তের জন্যে তার মনে হলো সে নিজেই আসলে ঈশ্বর সমতূল্য। এমনকি, সেই ক্ষণিক মুহূর্তের ভেতরে সে নিজের ভেতরে খানিকটা যৌন উত্তেজনাও অনুভব করল। তবে তার ভেতরের লড়াইটা খুব বেশি স্থায়ী হলো না, স্রষ্টার অনুকম্পার জায়গাটা খুব দ্রুতই দখল করে নিলো আসন্ন হত্যার আনন্দ। নিজের বিরাট তরবারিটা চালিয়ে দিলো সে বন্দির গলা বরাবর। লোকটার কণ্ঠনালী ভেদ করে লোহার পাতটা ঢুকে গিয়ে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরোতে শুরু করতেই আসন্ন মৃতের বুক বরাবর লাথি মেরে দেহটা বুরুজ থেকে নিচে ফেলে দিলো সে। মুহূর্তের জন্যে তার মনে হলো: জয় এবং হত্যার তীব্র আনন্দে চিৎকার করে ওঠে। কিন্তু সেটা না করে চোখ বন্ধ করে ফেলল সে। মনে মনে একবার তওবা করে বিড়বিড় করে কিছু একটা বলতে লাগল।

তারপর চোখ খুলে জঙ্গলমহাল নামের এই দুর্গের দখল করা দ্বিতীয় বুরুজের ওপরে পত পত করে তার বিশেষ বাহিনীর পতাকা উড়ছে। খুশিতে মনটা আনচান করে উঠল তার। সমস্ত অপেক্ষার অবসান হতে যাচ্ছে, আর কিছুটা সময়; এরপরেই সে দখল করে নেবে পুরো জঙ্গলমহাল, যা আজ অব্দি কোনো বহিরাগত দখল করতে পারেনি। তবে সেই সাথে নিজেকে সে স্মরণ করিয়ে দিলো তার মূল উদ্দেশ্য জঙ্গলমহাল দখল করা নয়, বরং ভিন্ন কিছু। আর সেটা ঠিকঠাক করতে পারলে সে শুধু বাঙাল মুলুক নয়, পুরো মোঘল বাহিনীতে সবচেয়ে ক্ষমতাবান এবং প্রভাবশালীদের একজন হয়ে উঠবে।

পতাকা থেকে চোখ নামিয়ে উল্লাসের সাথে চিৎকার করতে থাকা নিজের লোকদেরকে হাত নেড়ে শান্ত হতে বলল সে, হাতের ইশারায় কাছে ডেকে পাঠাল তার বাহিনীর দ্বিতীয় প্রধান, সরাফতকে।

সরাফতের হাতে-মুখে-শরীরে রক্ত লেগে আছে, সমস্ত শরীরেও কালিঝুলি মাখা। হাতে এখনও খোলা তলোয়ার। বাহরাম খাঁর কাছে এসে সে তরবারিটা কোষে ঢুকিয়ে আপনাতেই সামান্য মাথা নিচু করে বলে উঠল, ‘হুজুর, হুকুম

‘সব বন্দিদেরকে নিকেশ করা হয়েছে?’ যদিও সে জানে জবাবটা কী হবে তবুও একবার বলে উঠল।

‘জি হুজুর, আপনার নির্দেশ অনুযায়ীই সব বন্দিদেরকে নিকেশ করে লাশগুলো পরিখায় ফেলে দেওয়া হয়েছে,’ সরাফত মাথা নিচু করেই কথা বলছে। বাহরাম খাঁ চোখে চোখ রেখে কথা বলতে ভয় পায় সে। বিশেষ করে যুদ্ধাবস্থায় তো আরও না, এই লোকের মেজাজ মর্জির কোনো আগা-মাথা নেই। আর তলোয়ার চলে হাওয়ায় উড়তে থাকা বাঁশপাতার মতো। ‘আর কোনো হুকুম, হুজুর?’

শত্রু পক্ষের কী অবস্থা?’ সে নিজে চোখ কুঁচকে তাকিয়ে আছে তৃতীয় বুরুজের দিকে। ওটাতে একটু আগেও আলো জ্বলছিল। এখন একেবারে অন্ধকারে ঢেকে আছে পুরো বুরুজ। ব্যাপার কি, শালারা ভয়ে পালাল নাকি? কথাটা মনে মনে বললেও সে জানে ওদের পালাবার কোনো পথ নেই। যদি থাকতও, তবুও আসলাম শেঠের মতো লোক নিজের জন্মভূমি ফেলে কাপুরুষের মতো পালাবে না, এটা সে ভালোই জানে, শালা ভেতো বাঙালি হলেও মনের জোর আছে ব্যাটার। আর একারণেই ধ্বংস হবে সে বাহরাম খাঁর হাতে। তোকে আমি গলা টিপে মারব, আসলাম শেঠ।

হুজুর, দ্বিতীয় বুরুজ দখলের পরই ওরা পিছু হটে গেছে। আমার হিসেব বলে, ওরা দ্বিতীয় আর তৃতীয় বুরুজের মধ্যিখানে একটা শক্ত অবস্থান গড়ে তুলবে, সেই সাথে নিজেদের সমস্ত শক্তি নিয়োগ করবে তৃতীয় বুরুজে। কারণ ওটার পতন হলেই জঙ্গলমহালের পতন হবে।’

সরাফতের কথা শুনে জোরে হেসে উঠল বাহরাম খাঁ। ‘মাথায় যদি সামান্যতম বুদ্ধি থেকে থাকে তবে তাই করবে। আর ওটাই ওদের ধ্বংস ডেকে আনবে। আমার বাহিনীর অবস্থা বর্ণনা করো। বিশেষ করে প্রহরার কী অবস্থা?’

দুর্গ চারিপাশ থেকে ঘিরে রাখা হয়েছে, বিশেষ করে দুর্গের পিছনের ভাগ, সম্মুখভাগ এবং জঙ্গলের পথ এই তিনদিক দিয়ে একটা পক্ষীও পালাইতে পারবে না। আর জলপথ—’ সরাফতকে কথা শেষ করতে দিলো না বাহরাম। তার আগেই বলে উঠল, ‘জলপথের খবর আমি জানি। এক কাজ করো, সরাফত। দ্বিতীয় বুরুজে প্রহরার ব্যবস্থা করো, আর তোমার লোকদের কয়েক ঘণ্টা বিশ্রাম নিতে নির্দেশ দাও আর সকালের প্রথম প্রহরেই আমরা আক্রমণ চালাব। আমার হিসেব বলে ওদের খুব বেশি মানুষ অবশিষ্ট নেই। আর যারা আছে তারাও এক এবং দুই বুরুজের মাঝের সুরক্ষা শক্ত করতে ব্যস্ত, কাজেই সকাল হতে হতে ওরা সুরক্ষা দাঁড় করিয়ে ফেলতে পারলেও ওরা থাকবে ক্লান্ত। আর ওদের ওই সুরক্ষা ব্যবস্থা কীভাবে ভাঙতে হবে সেটা আমার জানা আছে,’ এটুকু বলতেই বাহরাম খাঁর মুখে হাসি ফুটে উঠল। দিব্যদৃষ্টিতে সে পরিষ্কার নিজের বিজয় দেখতে পাচ্ছে। আর একবার ওদের সুরক্ষা ভেঙে গেলে ওদের তৃতীয় বুরুজ নিয়ে আমার বিশেষ পরিকল্পনা আছে—’ বাহরাম খাঁর মুখের কথা মুখেই রয়ে গেল সামনের দৃশ্য দেখে সে চমকে উঠল।

শুধু সে না, উপস্থিত প্রতিটা সৈনিক হাঁ হয়ে তাকিয়ে দেখল, বলতে গেলে আচমকাই দাউ দাউ করে জ্বলতে শুরু করেছে জঙ্গলমহালের তৃতীয় বুরুজ।

‘শালারা পাগল হয়ে গেল নাকি, নিজেদের বুরুজে নিজেরাই আগুন লাগিয়ে দিয়েছে—’ কিন্তু এর পরের দৃশ্য দেখে সে আরও চমকে উঠল। দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকা বুরুজের অগুনের আলোয় পরিষ্কার দেখল, মশাল আর তলোয়ার হাতে আসলাম শেঠের অবশিষ্ট সৈনিকেরা দৌড়ে আক্রমণ করতে আসছে ওদেরকে।

‘এরা আসলেই পাগল হয়ে গেছে, না হলে মরার জন্যে এত উতলা হয় কেউ—’  

বর্তমান সময়ের তিন বছর আগে

প্রফেসর ইফতেখার মাহমুদ খুব মনোযোগের সাথে তারা যেখানে আছে, মানে সেই কমলাপুর রেলওয়ে বস্তির পুরো এলাকাটার অবস্থান এবং চারপাশটা জরিপ করার চেষ্টা করছে। কমলাপুর স্টেশন থেকে খিলগাঁওয়ের দিকে যেতে মূল যে রেললাইনগুলো আছে, সেগুলোর দুপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা পুরনো রেলের বগি আর রেললাইনের বেশ অনেকটা জায়গা নিয়ে এই রেলওয়ে বস্তি। মূলত লাইনগুলোকে কেন্দ্র করে দুপাশে ছড়িয়ে আছে। দুপাশে দুটো পুরনো, বাতিল রেললাইনকে সমান্তরালে ধরে লাইনের দুপাশে অসংখ্য ছোটো ছোটো ঝুপড়ি। এর একপাশে মাইলখানেক গেলে স্টেশন, উলটোদিকে মাইলখানেক গেলে খিলগাঁও রেল ক্রসিং। ক্রসিংয়ের তূলনামূলক কাছে রেলের একটা পুরনো বগিতে বিগত বেশ কিছুদিন যাবৎ লুকিয়ে আছে প্রফেসর ইফতেখার, প্রফেসর আবদেল এবং তাদের সহকারী চৌধুরী।

রেলের বগির ধুলোময় মেঝের ওপরে একটা কাঠি দিয়ে দুটো দাগ টানল প্রফেসর ইফতেখার। ‘এই দুটো হলো মূল রেললাইন,’ লাইনের একপাশে দেখাল সে। ‘এদিকটা ধরে কিছুদূর এগোলে স্টেশন। একদিকে রেলগেইট আর ওদিকে মূল সড়ক,’ এইটুকু বলে ইফতেখার একবার চৌধুরীকে দেখল।

‘স্যার, ওই আপনি যেদিকটাতে স্টেশনের ইশারা করলেন, আপনার লোকের দেওয়া খবর অনুযায়ী ওইদিকেই দুজনকে দেখা গেছে, মানে পুলিশের লোক আর কি,’ চৌধুরী চিন্তিত ভঙ্গিতে বলে উঠল।

ইফতেখার মাহমুদ ম্যাপটা দেখছে। দেখতে দেখতে নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে সে মৃদু হেসে উঠল। ‘ঠিক আছে, দুজনেই মনোযোগ দিয়ে দেখ। আমি গুজা কামালকে খবর দিয়েছি,’ কামাল লোকটা এই বস্তির ক্যাডারের মতো, তাকে সবাই ‘গুজা কামাল’ নামে ডাকে। মূলত এই লোকটাকেই হাত করে এই রেলের বগিটাতে লুকিয়ে আছে তারা।

‘তোমার এই লোকটাকে কি বিশ্বাস করা যায়?’ প্রফেসর আবদেল জানতে চাইল।

বিশ্বাস তো করতে চাই না,’ ইফতেখার মাহমুদ এখনও ম্যাপ দেখছে। ‘কামালকে অনেক টাকা খাওয়ানো হয়েছে। আর সে আমার কাছে অতীতের একটা ঘটনায় কৃতজ্ঞ। কাজেই তার ওপরেই ভরসা করতে হবে। শোনো, সে দুজন লোক পাঠাবে আর কিছুক্ষণের ভেতরেই। ওরা এলে কী করতে হবে বুঝে নাও।’ বলে সে চৌধুরী আর আবদেলকে করণীয় বুঝিয়ে দিলো।

তারা কথা বলতে বলতে কিছুক্ষণ পরেই বাইরে থেকে কেউ একজন শিস বাজিয়ে উঠল। ‘লোক চলে এসেছে,’ বলে ইফতেখার মাহমুদ প্রফেসর আবদেলকে একবার শক্ত করে আলিঙ্গন করল। ‘প্রিয় বন্ধু, সাবধানে থেকো, আর—’ বলে সে কথাটা শেষ করল না। এবার জড়িয়ে ধরল চৌধুরীকে। ‘চৌধুরী, মনে আছে তো কী করতে হবে?’

‘জি, স্যার,’ চৌধুরী মাথা নেড়ে সায় জানাতেই তিনজনেই যার যার ছোটো ব্যাগগুলো উঠিয়ে নিলো। ‘চলো, লোকগুলোকে বুঝিয়ে দিতে হবে কী করবে।’

অতীত

বিষয়টা বাহরাম খাঁ আর তার সৈনিকেরা যেমনটা ভেবেছিল, অতটা সহজ হলো না। বাহরাম খাঁর লোকেরা জঙ্গলমহালের দ্বিতীয় বুরুজ দখল করার পর যখন ভেবেছিল আজকে রাতের মতো আর কিছু করবে না, বরং সকাল পর্যন্ত বিশ্রাম নিয়ে কাল সকালে তৃতীয় বুরুজে আক্রমণ চালাবে সমস্ত শক্তি নিয়ে। এমন সময় উলটো সুবাদার আসলাম শেঠের লোকেই উলটো তাদের ওপরে আক্রমণ চালায়। বলতে গেলে সাথে সাথে পালটে যায় যুদ্ধের গতিপথ।

বাহরাম খাঁ ভেবেছিল পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে থাকা আসলাম শেঠের সৈনিকদেরকে সে কোণঠাসা করে তারপর একের-পর-এক উপর্যুপরি আক্রমণ চালিয়ে ঘায়েল করে ফেলবে, তারপর প্রবেশ করবে বসতবাড়িতে, যেটা তার এই জঙ্গলমহাল আক্রমণ করার মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু ঘটনা ঘটলো উলটো। আসলাম শেঠের সৈনিকেরাই তাদেরকে আক্রমণ করে বসল। আসলাম শেঠের সৈনিকদেরকে আক্রমণ করতে দেখে বাহরাম প্রথমে হেসে উঠেছিল। কিন্তু সৈন্য- সংখ্যায় কম হলেও প্রথম দফায় খুব হিংস্র এবং ভয়ঙ্কর আক্রমণ চালাল তারা। বাহরামদের সৈনিকের সংখ্যায় অনেক বেশি হলেও তারা এই হঠাৎ এবং অনাকাঙ্ক্ষিত আক্রমণে রীতিমতো ঘাবড়ে গেল। কারণ বাহরাম খাঁসহ সেনাপতিদের প্রায় সবাই ছিল সদ্য দখল করা দ্বিতীয় বুরুজের ওপরে। কাজেই চট করে অপ্রস্তুত আক্রমণের কারণে সৈন্যদের অনেকেই প্রথম ধাপে কচুকাটা হয়ে গেল। বাহরাম খাঁ এবং তার সঙ্গীরা নেমে এসে যখন প্রতিরোধ গড়ে তুলল ততক্ষণে প্রাথমিক আক্রমণ করে আসলাম শেঠের সৈনিকেরা পিছু হটে গেছে।

বাহরাম খাঁ যখন নিচে নেমে এসে সৈনিকদের দায়িত্ব নিলো ততক্ষণে জঙ্গলমহালের সৈনিকেরা পিছু হটে গেছে বসতবাড়ির দিকে। ‘পরিস্থিতি কী?’ বাহরাম খাঁ রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে তলোয়ার হাতে সবার সামনে এসে দাঁড়াল। ‘কাপুরুষগুলো পালিয়েছে? আমরা বসে আছি কেন?’ নিজের দ্বিতীয় সেনাপতির দিকে তাকিয়ে রীতিমতো গর্জন করে উঠল বাহরাম খাঁ

‘হুজুর, এদেরকে যত সহজে বশ করা যাবে ভেবেছিলাম, তত সহজে কাবু করা যাবে না, ওরা বসতবাড়ির সামনে অস্থায়ী প্রতিরোধ তুলে ওটার অড়ালে অপেক্ষা করছে।’

‘ঠিক আছে, যদি তাই চায় এরা তবে তাই হোক,’ বাহরাম খাঁ আঘাত পেয়ে খেপে গেছে পুরোপুরি। সরাফত ভয়ে অস্থির হয়ে আছে। কারণ সে এর আগেও দেখেছে বাহরাম খাঁ খেপে গেলে পুরোপুরি অমানুষে পরিণত হয়। হুজুর, এখন করণীয়? এরা সংখ্যায় কম হলেও যেভাবে অবস্থান নিয়েছে তাতে হুট করে আমরা যদি আক্রমণ করি, তবে আমাদেরই ক্ষতি হবার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে। আবার কিছু না করলেও এরাও হুটহাট এভাবে ঝাঁপায় পইড়া ক্ষতি করতে পারে।’

‘বুঝছি,’ বলে সে মাথা নাড়ল। ‘সরাফত, আমাদের সমস্ত সৈনিকদের খবর দাও। এরা এমনেও পলাইতে পারবে না। কাজেই, দুর্গের বাইরে খালি জঙ্গল পথের দিকে পাহারা রাখো। আর বাকি সব সৈনিক এইখানে নিয়া আসো। এমন আক্রমণ চালাবো, একটা পিঁপড়াও ছাড়বো না।’

সরাফত একবার আসলাম শেঠের দিকে দেখে নিয়ে দৌড়ে চলে গেল সৈনিকদের খবর দিতে।

বর্তমান সময়ের তিন বছর আগে

স্পেশাল সেলের ডিউটি অফিসার আকবর জাকারিয়ার জন্যে আজকের রাতটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিগত কয়েক মাস ধরে সে যে-মানুষগুলোকে ধরার জন্যে হন্যে হয়ে আছে আজ রাতে সুযোগ চলে এসেছে তাদেরকে ধরার। কিন্তু কোনো এক অদ্ভুত কারণে এরকম একটা সময় যখন তার সবচেয়ে বেশি মাথা ঠান্ডা রাখা উচিত এমন সময় তার মাথাটা হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বেশি গরম, আর এর পেছনে দায়ী তার পার্টনার আর তার ডিপার্টমেন্ট।

নিজের রাগ প্রশমিত করার জন্যে হাতের ওয়াকিটকিটা বেশ জোরের সাথে সামনের গাড়ির ড্যাশবোর্ডের ওপরে ছুড়ে মারল সে। পকেট থেকে সিগারেট বের করে ধরাতে ধরাতে হঠাৎ একটা অদ্ভুত চিন্তা খেলে গেল তার মাথার ভেতরে। কেউ একজন ভেতরে ভেতরে তার অপারেশন স্যাবোটাজ করার চেষ্টা করছে না তো!

কথাটা মনে হতেই বেশ একটা উত্তেজনার শিহরণও খেলে গেল তার ভেতরে। অবশ্যই এমন কিছু একটা ঘটছে। বিষয়টা আরও আগে কেন তার মাথায় আসেনি, সেটা ভেবে বেশ বিরক্ত বোধ করল সে নিজের ওপরেই। বিগত বেশ কিছু দিনের অদ্ভুত কিছু বিষয় হঠাৎই যেন খানিকটা পরিষ্কার হয়ে আসতে শুরু করল তার মনের ভেতরে। মনে মনে একটা বিষয়ে সে নিশ্চিত-যাই ঘটতে থাকুক না কেন, এর সাথে তার পার্টনারের অবশ্যই সংযোগ আছে। সিগারেটটা বাঁহাতে নিয়ে গাড়ির দরজা খুলে সাবধানে বাইরে বেরিয়ে এলো সে। গাড়ির দরজাটা শব্দ না করে সাবধানে বন্ধ করে দিয়ে আড়চোখে একবার দেখে নিয়ে নিজের পার্টনারকে লোকটা ফোনে কথা বলছে। গত আধাঘণ্টা ধরে বলেই চলেছে, বলেই চলেছে। যে-লোকটা নিজের ক্যারিয়ার আর টাকা ছাড়া কিছুই বোঝে না। যে লোকটা এমনকি নিজের বউয়ের সাথেও ঠিকঠাক কথা বলে না, সে আজ সন্ধ্যা থেকে কার সাথে এত কথা বলছে?

নিজের পার্টনারকে একঝলক দেখে নিয়ে গাড়িতে হেলান দিলো স্পেশাল অফিসার আকবর জাকারিয়া। এই কেসটা গোড়া থেকেই তাকে ঝামেলা দিচ্ছে। অনেক কিছুই পরিষ্কার না, আবার একাধিক মহলের সংযোগ, কাজের চেয়ে বেশি জবাবদিহিতা, সব মিলিয়ে অদ্ভুত এক কেস। প্রথমে যখন তাকে কেসের দায়িত্ব দেওয়া হলো এবং বলা হলো তিনজন ফেরারি আসামিকে খুঁজে বের করতে হবে, বেশ খানিকটা অবাক হয়েছিল সে। কিন্তু এটা বুঝতে পারেনি, তার মতো একজন অভিজ্ঞ অফিসারকে কেন এরকম দায়িত্ব দেওয়া হলো। কিন্তু কেসে নেমে সে বুঝতে পারে যা ভাবছিল কেসটা মোটেই সেরকম কিছু না। ট্র্যাক ডাউন শুরু হতেই মানুষগুলোর পরিচয় আবিষ্কার করে, সাথে সাথে বেশ অবাক হয়ে যায়। ফেরারি আসামি বলে যাদেরকে খুঁজে বের করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এরা যে আসলে অ্যাকাডেমিক জগতের লোক, এটা জেনে হেডঅফিসকে রীতিমত চার্জ করতে শুরু করে সে। হেডঅফিস তাকে এটা সেটা বুঝিয়ে আবারও কাজে নেমে যেতে বলার পর সে পূর্ণ উদ্যমে কাজে নেমে পড়ে কিন্তু এটা বুঝতে পারে, তার ওপরে নজরদারি করা হচ্ছে এবং এরপরেই পার্টনার হিসেবে তাকে এমন এক লোককে ঝুলিয়ে দেওয়া হয় যার সাথে তার কোনো সংযোগই নেই বলতে গেলে। এরপর ট্র্যাক করতে গিয়ে তারা আরেক বিপদ অনুভব করে। যখন আকবর শুনেছিল যাদেরকে সে ট্র্যাক করার চেষ্টা করছে এরা অ্যাকাডেমিশিয়ান, সে ভেবেছিল এরা আর কতটা পালাতে পারবে? কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে দুই- দুইবার অন্তত তারা তার হাত থেকে পিছলে বেরিয়ে যায়। এরপর আরেকটু গভীরে গিয়ে আকবর জানতে পারে: এদের ভেতরে প্রফেসর ইফতেখার নামে একজন আছে যে কি না প্রফেসর হলেও তার বিচিত্র আর ভিন্ন সব ব্যাক গ্রাউন্ড আছে, যে- কারণে এদেরকে ধরা সহজ হবে না। এরপর বিগত টানা কিছুদিন, চেষ্টা করার পর অবশেষে সে তাদেরকে ট্র্যাক করতে সক্ষম হয় এবং এখন যখন এদেরকে প্রায় ধরে ফেলার প্রান্তে এমন সময় কি না তার কাজে বাগড়া দেওয়া হচ্ছে! কথাটা মনে আসতেই আবারও মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। নাহ, এভাবে হবে না, এবার শক্ত হতে হবে।

সিগারেটটাকে পিষে ফেলে দিয়ে দ্রুত পায়ে এগোল সে প্লাটফর্মের কাছে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলতে থাকা তার পার্টনার মোশতাকের দিকে। ওকে এগোতে দেখে মোবাইলে কথা বলতে বলতে মোশতাক মোবাইলের ওপাশে থাকা মানুষটাকে কিছু একটা বলে ফোনটা নামিয়ে ফেলল।

‘কী ব্যাপার, বস?’ তাকে দেখে মনে হচ্ছে সে কিছুই জানে না।

‘মোশতাক, ফোন কাটো,’ বেশ গম্ভীর ভঙ্গিতে প্রায় ধমকের সুরে কথা বলে উঠল আকবর। মোশতাক তড়িঘড়ি করে মোবাইলের কলটা কেটে দিয়ে ফোনটা পকেটে রেখে দিলো। ‘কী ব্যাপার, বস?’ মোশতাকের কথা এক সুরে আটকে গেছে। একই বাক্য রিপিট করছে সে পুরনো দিনের ক্যাসেটে ফিতা আটকে যাবার মতো।

‘শোনো, মোশতাক, আমি জানি ওপরের লেভেলে তোমার অনেক কানেকশন, কিন্তু তোমাকে একটা ব্যাপার বুঝতে হবে, এটা আমার কেস এবং এখানে আমার কথামতোই সব হবে।

‘অবশ্যই, বস,’ মোশতাকের টকি খরখর করতে শুরু করেছে। কিন্তু সেটার পরোয়া না করে সে ফিরে তাকাল আকবরের দিকে। চালু মাল মোশতাক, সে ঠিকই অনুধাবন করেছে কিছু একটা ঠিক নেই, আকবর সম্ভবত পিসড অফ তার ওপরে। ‘বস, কোনো সমস্যা?’

‘মোশতাক, যা বলব সিরিয়াসলি শুনবা,’ মোশতাকের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে তাকিয়ে মুখের সামনে একটা আঙুল তুলে বলে উঠল। ‘আর শোনো, নাটক করবা না। আমি নাটক সহ্য করতে পারি না, আকবরের গলায় চূড়ান্ত বিরক্তি। দিনের-পর-দিন সৎ থেকে পরিশ্রম করে এক একটা কেস সলভ করে আর সেটার থেকে ফায়দা লোটে এসব চোরগুলো। মোশতাক হাত মুখ নেড়ে নাটুকে ভঙ্গিতে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল কিন্তু আকবরের গলার টোন শুনে আর তার সিরিয়াস ভাব দেখে চুপ করে রইল। ‘শোনো, মোশতাক, এই কেসের অথরিটি আমার। তোমরা যে নাটক শুরু করেছ, এগুলো আমার ভালো লাগছে না। বারবার তোমাদের এসব আল-বাল নাটকের কারণে আসল অপরাধী পার পেয়ে যায়।’

‘বস, নাটক মানে?’ মোশতাক খুব সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলে উঠল। সে সাধারণত এরকম টোনে কথা বলে না।

‘নাটক মানে? তুমি আর তোমার ওপরওয়ালারা যা শুরু করেছ!’ মোশতাক কিছু বলার আগেই আকবর ধমকে উঠল, ‘আমার কথা শেষ হয়নি, মোশতাক। তোমরা যা মন চায় করো, আমার অপারেশন যদি বিগড়ায় এবার তোমাদের খবর আছে।’

‘বস, আমি তো নিজে থেকে–’

কথা শেষ করে আকবর ঘুরে দাঁড়াতে যাচ্ছিল মোশতাকের কথা শুনে ফিরে দাঁড়াল। আকবরের ঘুরে দাঁড়ানোর ভঙ্গিটা এতটাই বিপজ্জনক দেখে ভয় পেয়ে গেল মোশতাক। ‘নিজে থেকে তো করছ না, তোমাকে ধরে কলের পুতুলের মতো নাচাচ্ছে যারা তাদের কথা বলছি। খুব সাবধান, মোশতাক, এবার এরা হাত ফসকালে তোমার বাপেরাও কিন্তু তোমাকে–’

আকবর আর মোশতাক দুজনেরই ওয়াকিটকি খরখর করে উঠল। ওদের পাশ থেকে তারস্বরে কেউ একজন চেঁচাচ্ছে। ‘স্যার, টার্গেট স্পট থেকে মুভমেন্ট শুরু হয়েছে। তিনজন লোক বগিটা থেকে বেরিয়ে বাইরের তিনদিকে দৌড়াতে শুরু করেছে।’

‘সর্বনাশ,’ কথাটা আকবরের মুখ থেকে আপনাতেই বের হয়ে গেল। আগেই বলেছিলাম। জলদি মোশতাককে নির্দেশ দেওয়ার আগেই দেখল ঝড়ের বেগে মোশতাক দৌড়াতে শুরু করেছে। ‘ফাক!’ বলে নিজেও দৌড়াতে শুরু করল আকবর।

অতীত

দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকা তৃতীয় বুরুজের ঠিক নিচেই মুখোমুখি হলো সুবাদার আসলাম এবং মোঘল সেনাপতি বাহরামের বাহিনী। যুদ্ধটা যতটা স্থায়ী হবার কথা ছিল তারচেয়ে অনেক বেশি সময় স্থায়ী হলো এবং যা ভাবা হয়েছিল তারচেয়ে অনেক বেশি রক্তক্ষয়ী হলো।

আসলাম শেঠের বাহিনীর প্রতিটা লোক রক্তচক্ষু করে খোলা অস্ত্র হাতে তাদের তৈরি করা প্রতিরোধের ওপাশে দাঁড়িয়ে ছিল। মানুষগুলোকে দেখলেই বোঝা যায় এদের আর হারাবার মতো কিছুই নেই। প্রতিটা লোকের চেহারায় অপরিসীম ক্লান্তি আর তাদের দেহাবয়বে সব ধ্বংস করে দেবার প্রবণতা। আর অন্যদিকে রাগে ফুঁসতে থাকা মোঘল সেনাপতি বাহরাম খাঁর বাহিনী

বাহরাম খাঁ যেই মুহূর্তে বুঝতে পারল, তাকে খুঁচিয়ে শেষ মুহূর্তে বীরত্ব দেখাতে চাইছে সুবাদারের লোকেরা, আরও বেশি রাগে অস্থির হয়ে ওঠে সে। সাথে সাথে দুর্গের চারপাশ থেকে লোকবল সরিয়ে নিয়ে আসে এই তৃতীয় বুরুজের নিচে। সুবাদারের পঞ্চাশ-ষাটজনের বাহিনীর ওপরে আক্ষরিক অর্থেই স্রোতের মতো গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল বাহরাম খাঁর বাহিনী। শক্তি যতই থাক, দৃঢ় প্রতিজ্ঞা যতই থাক, লোকবলের সামনে একটা সময় সবই ফিকে হয়ে আসতে শুরু করল। প্রথম ধাক্কার শক্ত প্রতিরোধ সময়ের সাথে সাথে পরিণত হলো দুর্বল বাধায়। ধীরে ধীরে রূপ বদলে সেটা পালটে গেল টিকে থাকার সংগ্রামে। কিন্তু ভোরের আলো ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে সেটাও আর রইল না। ভোরের আলো যতক্ষণে জঙ্গলমহালের আঙিনায় ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে ততক্ষণে আলোর বন্যার চেয়ে বেশি লাশের বন্যা বয়ে গেছে।

পরিস্থিতি শেষ পর্যায়ে দেখে হাতেগোনা গুটিকয়েক সৈনিক নিয়ে আসলাম শেঠ বসতবাড়ির আঙিনায় উঠে গেল। সেখানে আঙিনার নামেমাত্র আড়ালে অবস্থান নিয়ে বলতে গেলে শেষ পরিণতির অপেক্ষা করতে লাগল তারা। ইতিমধ্যেই আসলাম শেঠের প্রধান সেনাপতিসহ প্রায় সবাই নিহত হয়েছে। বাকি যারা অবশিষ্ট আছে এরা সবাই সাধারণ সৈনিক। সবাই আহত-বিধ্বস্ত-ক্লান্ত এবং ইতিমধ্যেই মানসিকভাবে পরাজিত। এদেরকে নিয়ে যুদ্ধে জেতা কিংবা প্রতিরোধ তো দূরে থাক, এমনকি পলায়নও সম্ভব নয়। আর আসলাম শেঠ এটা বেশ ভালোই জানে। কিন্তু সে নিজে পলায়ন প্রত্যাশাও করছে না। বরং সে দুটো জিনিস চাইছে মনে মনে। প্রথমত, আর অল্প খানিকটা সময়। আর দ্বিতীয়ত সম্মানজনক মৃত্যু

আসলাম শেঠ রক্তে রঞ্জিত তরবারি হাতে তার বসতবাড়ির আঙিনার সম্মুখভাগে এসে দাঁড়াল। তার তরবারির রক্ত শুধু শত্রুদের রক্ত নয়, বরং এতে তার নিজের পাঁজর আর কাঁধ থেকে গড়িয়ে নেমে আসা রক্তের পরিমাণও হয়তো বা বেশি। তরবারিটা ডান হাত থেকে বাঁহাতে নিয়ে নিলো সে। পাঁজরের পাশের গভীর এক ক্ষতের কারণে ডান হাতটা বলতে গেলে অকেজো প্রায়। আসলাম শেঠ চারপাশে একবার নজর বুলাল। এই জঙ্গলমহাল তার জন্মভূমি, এখানেই সে বড়ো হয়েছে। এখানেই সে তার শৈশব আর যৌবন কাটিয়েছে। দুনিয়ার নানা প্রান্ত ঘুরেও এই জঙ্গলমহালের প্রতি তার ভালোবাসা এতটুকু কমেনি। সে তার জন্মভূমিকে যতটা ভালোবেসেছে, তার জন্মভূমিও তাকে ফিরিয়ে দিয়েছে দ্বিগুণ ভালোবাসা। কিন্তু সবকিছুরই শেষ আছে। সে তার জন্মভূমিকে শত্রুর কবল থেকে রক্ষা করতে পারেনি। কিন্তু তার বিনিময়ে সে আরও বড়ো কিছু করার সুযোগ পাচ্ছে।

নিজের বাঁহাতে কোনোমতে ধরে তরবারিটাকে সামনের দিকে তুলে ধরল আসলাম শেঠ। সেখানেই জড়ো হয়েছে মোঘল সেনাপতি বাহরামের বাহিনী তরবারিটাকে সোজা দলের পেছনে থাকা বাহরামের দিকে নির্দেশ করে সে চিৎকার করে উঠল, ‘এই তোমাদের দম! আমাদের গুটিকয়েকজনকে কায়দা করতে পারছ না,’ বলে সে উন্মাদের মতো চিৎকার করে উঠল, সেই সাথে হেসে উঠল সে। তার সাথে সাথে চিৎকার করে উঠল তার বাকি সৈন্যরা।

রাগের সাথে চিৎকার করে আসলাম শেঠের প্রতিটা লোকে কচুকাটা করে ফেলার নির্দেশ দিলো সেনাপতি বাহরাম। ‘শোন,’ সরাফত এগিয়ে যাচ্ছিল, তার পোশাকের কাঁধের কাছটা খামচে ধরে থামাল সে। ‘ওই আসলাম শেঠরে তুই ধরবি, তবে ওরে জানে মারবি না। মাইরা মাইরা জিন্দা রাখবি। ওর পরিবাররে যখন আমি ধরব তখনও ও যেন জিন্দা থাকে।’

মোঘল সৈন্যরা ইতিমধ্যেই আসলাম শেঠের অবশিষ্ট বাহিনীর ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। সরাফত সোজা এগিয়ে গেল আসলাম শেঠের দিকে। নিজের প্রায় অকেজো হাত শরীরের সাথে আটকে ধরে একজন মোঘল সৈনিকের মোকাবিলা করার চেষ্টা করছিল সে, সরাফত এগিয়ে গিয়ে সৈনিকটাকে ঠেলে সরিয়ে দিলো তার সামনে থেকে। তরবারির প্রথম ধাক্কাটাকে স্রেফ এড়িয়ে গিয়ে কাঁধ দিয়ে ধাক্কা মারল আসলাম শেঠকে। সরাফত ভেবেছিল আসলাম শেঠ আহত শরীর নিয়ে তার শক্তিশালী ধাক্কা সামলাতে পারবে না। কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে লোকটা শক্তিশালী ধাক্কা খেয়ে অনেকটা পিছিয়ে গেলেও পড়ে গেল না। বরং নিজেকে সামলে নিয়ে বাঁহাতে তলোয়ারটা শরাফতের দিকে তলোয়ারটা উঠিয়ে বলে উঠল, ‘রাজা তাহলে,’ বলে সে আঙিনার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা বাহরামকে দেখাল, ‘তার পেয়াদাকে পাঠিয়েছে আসল রাজাকে কাহিল করার জন্যে,’ বলে লোকটা আবারও হেসে উঠল। সরাফত বুঝতে পারছে না এরকম আহত বিধ্বস্ত আর মৃতপ্রায় লোকটা কীভাবে এরকম অবস্থায় হাসতে পারে। কিন্তু নিজের ভাবনাটা সে সম্পূর্ণ করার আগেই আহত আসলাম শেঠ তরবারি নাড়িয়ে এত দ্রুত আক্রমণ করে বসল শরাফতের জন্যে প্রথম ধাক্কাটা সামলাতে খানিকটা কষ্ট হলো। হয়তো কিছুই না তবুও তার মনে হলো লোকটা আহত না হলে চিত্রটা ভিন্ন হতে পারত। যদিও শত্রু কিন্তু মনে মনে লোকটার যোদ্ধা সত্তার প্রশংসা না করে পারল না সরাফত।

আসলাম শেঠ একের-পর-এক আক্রমণ চালিয়ে গেল আর সরাফত ঠেকিয়ে গেল। কিন্তু সে বুঝে উঠতে পারছে না-লোকটাকে আর আহত না করে কীভাবে কাবু করবে। কারণ মানুষটা আহত হলেও তার ক্ষিপ্রতার কোনো শেষ নেই। আবার মানুষটাকে থামাতে গিয়ে যদি তাকে মেরে ফেলে, তবে বাহরাম তাকেও মেরে ফেলতে পারে। ‘আত্মসমর্পণ করুন, জানে বাঁচবেন,’ সরাফত কথাটা শেষ করার আগেই আসলাম শেঠ খপ করে শরাফতের কবজি ধরে ফেলল। ‘তোমার কি মনে হয়, তোমার সেনাপতি আমাকে বাঁচতে দিবে?’ সরাফত অবাক হয়ে দেখল এই আহত মানুষটা এমনভাবে আহত হাতে তার কবজি চেপে ধরেছে যে সে তরবারি নাড়াতে পারছে না। বহু যুদ্ধের দক্ষ যোদ্ধা সরাফত, আতঙ্কের সাথে অনুভব করল সে তার শত্রুকে ঠিকভাবে নেয়নি, যে-কারণে আহত হয়েও লোকটা তার কবজি ধরে ফেলেছে এবং সে চাইলেই তার তরবারিটা শরাফতের গলায় কিংবা বুকে সেঁধিয়ে দিতে পারে। কিন্তু আসলাম শেঠ ওরকম কিছু না করে বরং তার চোখের দিকে তাকিয়ে আবারও বলে উঠল, ‘বলো সৈনিক, কী মনে হয়?’

সরাফত আবারও নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করার আগেই তীক্ষ্ণ একটা শব্দের সাথে পাশ থেকে একটা তরবারি ঢুকে গেল আসলাম শেঠের পেটে। সেই সাথে তীব্র লাথির সাথে লোকটা শরাফতের কাছ থেকে ছিটকে গিয়ে পড়ল দরজার ওপরে। বসতবাড়ির দরজাটা ভেঙে ভেতরে পড়ে গেল সে। সরাফত তাকিয়ে দেখল তার ঠিক পাশেই তলোয়ার হাতে দাঁড়িয়ে আছে সেনাপতি বাহরাম।

‘বেকুব কোথাকার! যা, ভিতরে গিয়ে ধর বাকিদেরকে,’ সরাফত ধমক খেয়েও চট করে নড়তে পারল না। ঘটনার ঘনঘটায় সে চমকে গেছে, আসলাম শেঠ তাকে মারল না কেন? এবং বাহরাম এভাবে লোকটাকে পেছন থেকে আঘাত করায় তার মস্তিষ্ক এখনও প্রক্রিয়া করে উঠতে পারছে না পুরো বিষয়টা। নিজের তরবারিটাকে সামলে নিয়ে আশপাশে দেখল সে একবার। আঙিনার এখানে ওখানে ছড়িয়ে আছে জঙ্গলমহালের সৈনিকদের ছিন্নভিন্ন মৃতদেহ। ‘কী হলো? সবাইকে নির্দেশ দাও বসতভিটার ভেতরে ঢুকতে, মহিলাদের কাউকে যেন মারা না হয়। সবাইরে আমি জীবিত চাই,’ বাহরামের গর্জনরত নির্দেশ শুনে দ্রুত নড়ে উঠল সরাফত।

ইতিমধ্যেই মোঘল সৈনিকেরা পিল পিল করে ঢুকে পড়তে শুরু করেছে বসতবাড়ির ভেতরে। সরাফত এগিয়ে গিয়ে দেখল দুজনে ধরে শক্ত হাতে মাটি থেকে উঠিয়ে আনছে মৃতপ্রায় অসলাম শেঠকে। লোকটার প্রাণশক্তি সরাফতকে শুধু অবাকই করে চলেছে। ‘সবাই ছড়িয়ে পড়, একজনও যেন পালাতে না পারে।’

কিন্তু অল্প সময়ের ভেতরেই বাহরাম খাঁর মুখের হাসি হারিয়ে গেল, যে-মুহূর্তে পুরো বসতবাড়ি তন্ন তন্ন করে খুঁজে একটা লোককেও পেল না ওরা। না মহিলা, না আসলাম শেঠের স্ত্রী কিংবা অন্য কাউকে। বাহরাম খাঁর সামনে দাঁড়িয়ে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে সৈনিকেরা জানাল, বাড়ির ভেতরে কাউকেই পাওয়া যায়নি।

বাহরাম খাঁ উন্মাদের মতো চিৎকার করে উঠল, ‘কীভাবে সম্ভব? একটা পক্ষীও পালানোর কথা না,’ বাহরামের মনে হচ্ছে সে পাগল হয়ে যাবে! এতদিনের প্রচেষ্টা, এত এত লোকের মৃত্যু-এত কষ্ট সব কি তবে জলে যাবে? এই জঙ্গলমহাল দিয়ে সে কী করবে, যদি আসল কাজই না হয়? ‘এরা পালালো কীভাবে? কে অবহেলা করছে পাহারা দিতে?’

সৈনিকেরা কেউই কোনো জবাব না দিয়ে তাকিয়ে রইল সরাফতের দিকে সরাফত তরবারিটা খাপে ঢুকিয়ে সামনে এগিয়ে গেল। মৃত্যুর ঝুঁকি থাকলেও তাকেই সত্যটা বলতে হবে। ‘হুজুর, এইখানে সৈনিকদের কোনো অবহেলা নেই। সবাই নিজের কাজ ঠিকমতোই করছে। কিন্তু আপনি যখন বসতভিটা আক্রমণের জন্যে পিছন থেইকা সব সৈনিক সরায়া অনার সিদ্ধান্ত নিলেন সম্ভবত ওইখানেই ভুল হইছে। হইতে পারে ওরা ওই সময়েই পিছন দিয়া পলাইছে। হইতে পারে এইটার জন্যেই তারা আগ বাড়ায়া আক্রমণ করছিল, যাতে বাকিরা পিছন দিয়া সইরা পড়তে পারে।’

মুহূর্তের জন্যে সবার মনে হলো সরাফতকে মেরেই ফেলবে বাহরাম, কারণ এরকম অবস্থায় সেনাপতির ভুলের কথা সরাসরি ধরিয়ে দিয়েছে সে। বাহরামকে দেখে মনে হলো সে ভষ্ম করে ফেলবে সরাফতকে, কিন্তু সবাই অবাক হয়ে গেল অদ্ভুত এক শব্দ শুনে। দুই সৈনিকের ধরে থাকা বাহুর মাঝখানে প্রায় ঝুলে আছে মৃতপ্রায় আসলাম শেঠ। লোকটা কাশির সাথে রক্ত উগরে দিতে দিতে হেসে উঠেছে এই অবস্থায়। উপস্থিত প্রতিটা লোক অনুভব করতে পারল আসলাম শেঠের জঙ্গলমহাল দখল করে নিতে পারলেও বসতবাড়িতে থাকা মানুষগুলোকে বাহরামের লোকেরা ধরতে পারেনি কারণ শেষ মুহূর্তে আসলাম শেঠের বুদ্ধির কাছে হেরে গেছে বাহরাম খাঁ। লোকটাই কৌশলে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে বাহরাম খাঁ খেপে গিয়ে সব সৈনিক নিয়ে আক্রমণ চালিয়েছে। আর এই কাজটা সে করেছে যাতে সে বসতবাড়ির লোকজনকে পালানোর ব্যবস্থা করে দিতে পারে। আসলাম শেঠ খিক খক করে হেসেই চলেছে।

বাহরাম খাঁ এগিয়ে গিয়ে খোলা তলেয়ার দিয়ে এক কোপে আসলাম শেঠের মাথাটা নামিয়ে দিলো। তারপর চিৎকার করে উঠল রাগে-ক্ষোভে।

বর্তমান সময়ের তিন বছর আগে

‘বন্ধু, তোমার কী মনে হয় কাজ হবে?’ প্রফেসর আবদেলকে দেখে মনে হচ্ছে অন্ধকারের ভেতরে সে আরও সেঁধিয়ে নিজের অস্তিত্বকে রক্ষা করার চেষ্টা করছে। কিন্তু এরকম পরিস্থিতিতেও সে প্রফেসর ইফতেখারের হাসি শুনে অবাক হয়ে গেল। একটু অবাক হয়েই অন্ধকারের ভেতরে সে ফিরে তাকাল প্রফেসর ইফতেখারের দিকে।

‘আবদেল, তুমি তো আমাকে চিন কম দিন হলো না। তোমার কাছে কী মনে হয়?’ কথাটা বলে সে অন্ধকারের ভেতরেই প্রফেসর আবদেলের দিকে তাকিয়ে রইল সে। প্রফেসর আবদেল আর চৌধুরী দুজনেই অন্ধকারের ভেতরে বসে এতটাই ভয়ে আছে যে কোনো জবাব না দিয়ে বরং তাকিয়ে রইল প্রফেসর ইফতেখারের দিকে। ইফতেখারই কথা বলে উঠল, ‘তোমাদের কাছে কি মনে হয় এই হোমিওপ্যাথির শিশিতে ধরে যাবে এরকম মস্তিষ্ক নিয়ে এরা আমার সাথে পারবে?’ বলে সে একবার থেমে উঁকি দিয়ে বাইরে দেখে নিলো। তা সেটা যত বড়ো বিপদেই থাকি না কেন আমি। আমাকে হারানো এদের কম্ম নয়। খালি একটাই অনুরোধ, তোমরা আমার সাথে তাল রেখো। গুলিয়ে ফেলো না আমার নির্দেশগুলো। এক সেকেন্ড,’ বলে সে হুট করে আড়াল ছেড়ে পুরোপুরি কালি গোলানো অন্ধকারের ভেতর থেকে উঠে আধো অলোতে চলে এলো।

প্রফেসর ইফতেখার যে-মুহূর্তে বুঝতে পারল তাদের হাতে আসলে খুব একটা সময় নেই-যেকোনো মুহূর্তে হয় পুলিশ না হয় অন্য কোনো গ্রুপ তাদের ওপরে হামলা চালাবে—সেই মুহূর্তেই সে একটা পরিকল্পনা ঠিক করে ফেলে। প্রথমেই সে ফোনে খবর দেয় গুজা কামালকে, যার শেলটারে সে এখানে অবস্থান করছিল। তাকে খবর দিয়ে দ্রুত তিনজন লোক পাঠাতে বলে বগিতে, যতটা সম্ভব আড়াল নিয়ে আসার জন্যে বললেও এটাও জানায় আড়াল না নিলেও আসলে খুব একটা সমস্যা নেই। তাদের সাথে জিনিসপত্র খুব বেশি না থাকলেও লোকগুলো আসতে আসতে যা আছে সেগুলো গুছিয়ে নিয়ে অনেকটা পোঁটলার মতো বানিয়ে ফেলে। লোকগুলো আসতেই তাদেরকে বিশেষ কিছু নির্দেশনা দিয়ে বগি থেকে নেমে ওরা লুকিয়ে পড়ে বগির পেছনেই ঝোপেঝাড়ে।

প্রফেসর ইফতেখারের পরিকল্পনা খুব সহজ কিন্তু কার্যকরী হবার সম্ভাবনা অনেক। তার পরিকল্পনাটা অনেকটা এমন: যে লোকগুলোকে খবর দিয়ে আনা হয়েছে তারা প্রফেসরদের পোশাক পরে নিয়ে কিছু পোঁটলা-পাটলি নিয়ে তিনজন বগি থেকে বেরিয়ে তিন দিকে রওনা দিবে। রওনা দিবে বলতে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করবে। যদিও এতে ঝুঁকি আছে, কারণ ওরা জানে না পুলিশে আদৌ তাদের পিছু নিবে কি না। কিন্তু সম্ভাবনা আছে পুলিশ বা শত্রুপক্ষ যারাই হোক না কেন, এতে অন্তত ডিট্র্যাকটেড হবে, আর এই সুযোগটাই নিতে হবে তাদের তিনজনকে। যেই মুহূর্তে পুলিশ কিংবা শত্রুপক্ষ ডিস্ট্রাকটেড হবে সেই মুহূর্তে তারা সটকে পড়ার চেষ্টা করবে। ইফতেখারের মতো ঝানু মাল জানে, তার পরিকল্পনা নিখুঁত নয়, এবং এতে অনেক ফাঁক আছে। কিন্তু এই মুহূর্তে জানে বাঁচতে হলে এটাই সেরা মনে হয়েছে। এছাড়া একটা ব্যাকআপ প্ল্যানও আছে তার।

অন্ধকারের আড়াল ছেড়ে বেরিয়ে আসতেই দেখতে পেল তাদের ঠিক করে রাখা লোকগুলা বগি থেকে বেরিয়ে তিনদিকে দৌড়াতে শরু করেছে। লোকগুলো দৌড়াতে শুরু করার সাথে সাথে প্রফেসর ইফতেখার হাতের কড়ে আঙুল গুনতে শুরু করল।

এক—দুই—তিন–অপেক্ষা করছে সে। ষাট—বাষট্টি–মাঠের একপাশ থেকে একজনকে দৌড়ে বেরোতে দেখে হাসি ফুটে উঠল তার মুখে। পরিকল্পনা কাজে দিচ্ছে। কারা পালাচ্ছে বুঝতে না পেরে পুলিশ বা অন্যরা ডিট্র্যাকটেড হবে। ‘জলদি জলদি—’ চৌধুরী আর প্রফেসর আবদেলের দিকে ফিরে ইশারা করল সে। সাথে সাথে আড়াল থেকে বেরিয়েই তিনজনে নিজেদের মাথা মুড়িয়ে নিয়ে যতটা সম্ভব অন্ধকারের ভেতরে কলোনি মাঠের একপাশ দিয়ে হাঁটতে শুরু করল। তিনজনেরই পরনে সেই লোকগুলোর পোশাক। মাঠের অন্যদিকে হাঁকডাক শোনা যাচ্ছে। ‘জলদি জলদি হাঁটো। একবার স্টেশনের ভিড়ে মিশে যেতে পারলে কিংবা মূল রাস্তায় উঠে যেতে পারলে আর ধরতে পারবে না।

তিনজনেই জানপ্রাণ দিয়ে হাঁটছে, কিন্তু চাইলেও দৌড়ানো কিংবা অন্যকিছু করা সম্ভব হবে না। তাতে বরং উলটোটা হতে পারে, বাকিদের নজরে পড়ে যাবার সম্ভাবনা আছে। যদিও রাত প্রায় ভোরের দিকে কিন্তু বস্তি আর মাঠের কোনা যেখানে মিশেছে সেখানে বেশ কিছু টং দোকার আছে। দোকানগুলোতে ভিড় না হলেও টুকটাক লোকজন আছে। আর তারাও কৌতূহলী দৃষ্টিতে দেখার চেষ্টা করছে এদিকে কী হচ্ছে। প্রফেসর ইফতেখার, প্রফেসর আবদেল আর চৌধুরী এগিয়ে চলেছে। আর দুইশো গজ যেতে পারলেই মিশে যেতে পারবে ভিড়ের ভেতরে। ‘জলদি জলদি,’ আবারও তাড়া দিলো প্রফেসর। হঠাৎই পিছনে একজনের দৌড়ে আসার শব্দ শুনতে পেল সে। চৌধুরী ঘুরে তাকাতে যাচ্ছিল তার আগেই ইফতেখার ধমকে উঠল। ‘সোজা হাঁটতে থাকো, আর একটু পথ বাকি।’

কিন্তু তার কথায় কাজ হলো না। পেছনে বাড়তে থাকা ধুপধুপ শব্দ শুনে চৌধুরী আর নার্ভ ধরে রাখতে পারল না। চট করে পেছনে ফিরে তাকাল সে। মাথা ঢেকে রাখা কাপড়টা পড়ে গেল। সাথে সাথে পেছনে আসতে থাকা একাধিক পায়ের শব্দ আরও বেড়ে গেল। কেউ একজন চিৎকার করে উঠল। হল্ট, পুলিশ। মাথার ওপরে হাত তুলে দাঁড়াও।’

***

ইন্সপেক্টর আকবর তার পার্টনারদের পিছু নিয়ে যখন কলোনি মাঠের কিনারায় পৌঁছায় তখন তিনজনে তিনদিকে ছুটতে শুরু করেছে। প্রহরায় যারাই ছিল সবাই ছুটন্ত মানুষগুলোর পিছু নিয়ে দৌড়াতে শুরু করেছে ততক্ষণে। প্রথমে কী হচ্ছে বুঝতে না পেরে ইন্সপেক্টর আকবরও দৌড়াতে শুরু করে কিন্তু হঠাৎই তার মাথায় ভিন্ন কিছু একটা খেলে যায়। মাঠের একেবারে কিনারায় না গিয়ে সে বরং অপেক্ষা করতে থাকে এবং একটু পরেই দেখে তিনটে ছায়ামূর্তি বগির পেছনের অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এসে দ্রুত এগোতে শুরু করেছে অন্যদিকে। সাথে সাথে পিছু নিতে শুরু করে সে। কিন্তু প্রথমে সে বুঝতে পারছিল না, এরা কি ভিন্ন কেউ? নাকি বস্তিরই সাধারণ মানুষ? ওদের চলাচলের ভাব দেখে খানিকটা সন্দেহ হতেই সে দৌড়াতে শুরু করে। আর একবার একজন পিছু ফিরে তাকাতেই সাথে সাথে চিনতে পেরে দৌড়াতে দৌড়াতে বের করে নিয়ে আসে নিজের পিস্তল।

***

প্রফেসর ইফতেখার দৌড়াতে দৌড়াতে প্রফেসর আবদেলের একটা হাত খামচে ধরে তাকে নিয়ে দৌড়াতে শুরু করল। ওদিকে অতিরিক্ত নার্ভাস হয়ে চৌধুরী থমকে দাঁড়িয়ে গেছে।

‘চৌধুরী,’ প্রফেসর আবদেল চিৎকার করে উঠল।

ভুলে যাও ওর কথা, দৌড় দাও,’ প্রফেসর আবদেলের হাত জোরে চেপে ধরে সে দৌড়াতে শুরু করেছে। হল্ট হল্ট, এই থামো,’ পেছন থেকে চিৎকার ভেসে আসছে। কিন্তু থামার বদলে উলটো গতি বাড়িয়ে দিলো প্রফেসর ইফতেখার। এতক্ষণে খেয়াল করল চৌধুরী আবারও হুঁশ ফিরে পেয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে চলে আসে তাদের কাছাকাছি।

প্রফেসর ইফতেখার আর আবদেল প্রাণপণে দৌড়ে চলেছে, চৌধুরী তাদের ঠিক পেছনে। সে চিৎকার করে বলে উঠল, ‘স্যার, ওরা প্রায় চলে এসেছে। আমরা পালাবো ক্যামনে?’ অতি উত্তেজনায় তার আঞ্চলিক ভাষা বেরিয়ে এসেছে মুখ দিয়ে।

প্রফেসর ইফতেখার দৌড়াতে দৌড়াতে নিজের গতি কমিয়ে আনল। ‘একটাই উপায় আছে,’ বলে সে চট করে দৌড়াতে দৌড়াতেই ল্যাঙ মারল চৌধুরীকে। উলটে-পালটে পড়ে যেতে যেতে চিৎকার করে উঠল চৌধুরী।

জলদি দৌড়াও,’ প্রফেসর ইফতেখার আবারও আবদেলের হাত চেপে ধরল। ‘ছেলেটাকে—’ ওরা ভিড়ের ভেতরে ঢুকে পড়েছে। স্টেশনের লোকজন কৌতূহলী জনতা আর মানুষের হুড়োহুড়ির ভেতরে ঢুকে পড়তেই আড়ালে চলে এলো ওরা। ইফতেখার আড়চোখে পেছনে তাকিয়ে দেখল চৌধুরীকে ঠেসে মাটিতে শুইয়ে ফেলেছে পুলিশ।

‘ছেলেটাকে এভাবে ধরিয়ে দিলে!’ হাত নামিয়ে আনতে আনতে প্রফসর আবদেল হাঁপাতে হাঁপাতে বলে উঠল।

‘আবদেল, আমরা যা করতে চাইছি তা এই ছেলে বা আমি-তুমি–এমনকি আমাদের চেয়েও অনেক বড়ো। আমাকে যদি আমার প্রাণ বাজি রাখতে হতো আমি তবে তাই করতাম। এখন জলদি পালাতে হবে,’ দুজনে ভিড় পার হয়ে মূল স্টেশন এলাকায় ঢুকে পড়ল। ওদিকে মাটিতে পড়ে চোখের জল নাকের জল এক করে তখনও তারস্বরে চিৎকার করেই চলেছে চৌধুরী, ‘এইভাবে ধোঁকা দিলো এইভাবে!’

প্রফেসর আবদেল আর প্রফেসর ইফতেখার তখন নিজেদের গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়ে পার হয়ে গেছে অনেকটা পথ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *