পূর্বকথা
গল্পের শুরু
প্রথম অংশ: কল্পযাত্রা
দ্বিতীয় অংশ : সত্যাভিযান

রাজদ্রোহী – ৪

অধ্যায় চার – বর্তমান সময় – ফার্মগেট, ঢাকা

রাজুর নিয়ে আসা খবরটা স্তব্ধ করে দেবার মতোই বটে।

‘বাশার, এই বাশার,’ ঘুমের ভেতরে তীব্র ধাক্কা খেয়ে প্রায় চমকে উঠে বসল পুলিশের সিনিয়র এএসপি আহমেদ বাশার। আচমকা ঘুম ভেঙে যাওয়াতে বুকটা ধড়ফড় করছে ওর। ‘কী ও, কী হয়েছে,’ হঠাৎ ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায় বুকটা ধড়ফড় তো করছেই সেই সাথে রীতিমতো ঘামতে শুরু করেছে বাশার।

‘রাজু, তোর মাথা ঠিক আছে তো, এভাবে কেউ ঘুম থেকে ওঠায় নাকি?’ বাশার ডান হাতের উলটোপিঠ দিয়ে কপালের ঘাম মুছে খাটের পাশের ছোটো টেবিল থেকে পানির গ্লাস উঠিয়ে নিয়ে পানি পান করতে লাগল। একে তো গতকাল ভীষণ পরিশ্রান্ত একটা দিন গেছে, তার ওপরে আবার বিগত কয়েকদিন ব্যস্ততার কারণে ঠিকমতো বিশ্রাম নিতে পারেনি বাশার। সেই সাথে ঠান্ডার রাতে আবার নেমেছে বৃষ্টি কাজেই আজ রাতে বলতে গেলে মরার মতো ঘুমাচ্ছিল ও। হঠাৎ ঘুম ভেঙে যাওয়াতে রীতিমতো অসুস্থ লাগছে ওর।

ওর উলটোদিকের আরেক খাটে ছোটো একটা হাফপ্যান্ট পরে বসে আছে আরেক সিনিয়র এএসপি রেজাউদ্দিন পাটোয়ারি ওরফে রাজু। রাজু শুধু ওর সহকর্মীই নয়। ওরা দুজনে খুব ভালো বন্ধুও। পুলিশ হিসেবে নিজেকে খুবই মধ্যম মানের মনে করলেও, বাশার সবসময়ই মনে করে রাজু খুবই বুদ্ধিমান এবং দক্ষ একজন পুলিশ। নিজের কাজকর্ম থেকে শুরু করে এমনকি ব্যক্তিগত জীবন পর্যন্ত সব ক্ষেত্রেই রাজুকে তার কাছে রীতিমতো একজন আইডল মনে হয়। কিন্তু সব মানুষের মতো রাজুরও কিছু সমস্যা আছে। আর তার মধ্যে অন্যতম হলো হুটহাট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে অকারণে উত্তেজিত হয়ে যাওয়া। রাজুর এই দিকটা একেবারেই পছন্দ নয় বাশারের। কিন্তু কী আর করা, বন্ধু বলে কথা। রাজুকে খাটের বিপরীতে বসে উত্তেজতি ভঙ্গিতে পা নাড়তে দেখেই বাশার বুঝতে পেরেছে হয় কিছু একটা ঘটেছে, আর না হয় রাজু কিছু একটা ঘটিয়েছে। তা না হলে এই মাঝরাতে সে এতটা উত্তেজিত হয়ে ওকে ঘুম থেকে ডেকে তুলতে আসত না। মনে মনে বাশার শঙ্কিত হয়ে উঠল কীভাবে রাজুকে সামলাবে সেটা ভেবে ঠিক করতে গিয়ে। আগে থেকেই তাকে সাবধান হতে হবে। ‘দেখ, রাজু–’ কিন্তু সে কথা শুরু করেও আগাতে পারল না। তাকে থামিয়ে দিয়ে রাজু বলে উঠল। ‘দোস্ত, আগে বিড়ি দে,’ বাশার ভেবেছিল রাজু তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে তোড়বোড় করে কথা বলতে শুরু করবে। কিন্তু তা না করে হঠাৎ সিগারেট চাওয়াতে একটু অবাকই হলো বাশার। খাটের ওপরে উঠে বসে। পাশে টেবিলের ড্রয়ার থেকে বেনসনের প্যাকেট আর লাইটার বের করে নিজে একটা ধরিয়ে প্যাকেট আর লাইটার দুটোই রাজুর দিকে ছুড়ে দিলো বাশার। ‘কী ব্যাপার বলত?’ বলেই সে নিজেকে সামলে নিলো। ব্যাপার যদি সিরিয়াস হয়ও তাও রাজুকে বেশি লাই দেওয়া যাবে না। ব্যাটাকে লাই দিলেই খবর আছে। ‘দোস্ত, দেখ আমি খুব ক্লান্ত–’

আরে গুল্লি মার তোর ক্লান্তি,’ সিগারেট ধরিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে উত্তেজিত ভঙ্গিতে বলে উঠল রাজু। ‘বাইশআঙ্গুইল্লা বজলু শহরে আসছে,’ শেষ বাক্যটা প্রায় গালি দেওয়ার মতো দ্রুত এবং উত্তেজনার সাথে বলে উঠল রাজু।

মুহূর্তের জন্যে বাশারের মনে হলো সে কানে ভুল শুনেছে। পরমুহূর্তে বাক্যটার অন্তর্নিহিত অর্থ অনুধাবন করে চট করে ফিরে তাকাল রাজুর দিকে। ‘কী বললি?’ সে আসলেই নিশ্চিত হতে চাইলে ঠিক শুনেছে কি না। প্রশ্ন করতে করতেই বাশার দেখল রাজুর সিগারেট ধরা হাতটা কাঁপছে। আর সেটা যে উত্তেজনায় কাঁপছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কম্পিত হস্তে সিগারেট টানতে টানতে সে বলে উঠল। ‘যা শুনেছিস তাই বলেছি। বজলু শহরে আসছে আজ রাতে।’

বাশার চট করে বিছানার ওপরে উঠে বসল, ঘুম পালিয়েছে চোখ থেকে। ‘কী বলিস! তুই জানলি কীভাবে?’ বজলু হলো এই শহরের সবচেয়ে বড়ো গ্যাংস্টারদের একজন, সোজা কথা বলতে গেলে ক্যাডার। দুই মাস আগে সলিমপুরে বড়ো ধরনের গ্যাংওয়ার হয় ড্রাগ বিজনেস আর টেরিটরির দখল নিয়ে। প্রতিপক্ষ দলের সাথে সেই গ্যাঙওয়ারে প্রায় আধডজন খুনখারাবি হবার পর থেকে পুলিশ রেডঅ্যালার্ট জারি করে। বিগত দুই মাস থেকে রাজু আর বাশারের ওপরে দায়িত্ব পড়েছে এই পুরো গ্যাংওয়ারের হোতা বজলুকে খুঁজে বের করার জন্যে। স্থানীয় এলাকার কুখ্যাত ব্যবসায়ী এবং মাদকের প্রধান কারবারি বজলুর ডাক নাম বাইশআঙ্গুইল্লা বজলু। জন্মগতভাবে তার দুইহাতে একাধিক আঙুল থাকার কারণেই তাকে এই নামে ডাকা হয়। বিগত দুই মাস ধরে গোরুখোঁজা খুঁজে বজলুর টিকিরও সন্ধান বের করতে পারেনি বাশার আর রাজু। তবে একাধিক ইনফরমার আর রুট লেভেলের খবরদাতাদের থেকে এটুকু নিশ্চিত করতে পেরেছিল যে শহর ছেড়ে পালিয়েছে বজলু। এমনও খবর ছিল ওদের কাছে যে, গন্ডগোলের সুযোগে বজলু একেবারে সোজা ভারতে পালিয়ে গেছে বর্ডার পার হয়ে। কারণ সলিমপুর থেকে ইন্ডিয়ার বর্ডার আসলে খুব বেশি দূরে নয়। ওরা যখন অনুসন্ধান প্রায় গুছিয়ে এনে রিপোর্ট করার দারপ্রান্তে ছিল যে বজলু আসলে ভারতে পালিয়েছে, এমন সময় কি না মাঝরাতে ওকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে বলছে বজলু শহরে ফিরে এসেছে!

‘রাজু, তুই কি নিশ্চিত?’ রাজুর উত্তেজনা বাশারের ভেতরেও স্থানান্তরিত হতে শুরু করেছে। সে নিজেও একটা সিগারেট ধরাতে ধরাতে জানতে চাইল।

‘আমি শতভাগ নিশ্চিত, বন্ধু,’ কথাটা বলেই উত্তেজনার চোটে সে আর বসে থাকতে পারল না, দাঁড়িয়ে গেল। ‘দোস্ত, আমাদের কিছু একটা করতে হবে,’ বলে সে টেবিলের ওপরে ছোটো একটা চাঁটি মারল। ‘করতেই হবে।’

‘শান্ত হ, রাজু, পাগলামি করিস না,’ রাজুর পাগলামির ইতিহাস বাশারের বেশ ভালোই জানা আছে। আর ওর পাগলামিকে বেশি লাই দিলে কী ঘটবে সেটাও বেশ ভালোই জানা আছে ওর। ‘আগে বল, তুই জানলি কীভাবে?’

‘বাশার, বোকার মতো প্রশ্ন করিস না তো!’ রাজুকে দেখে মনে হলো তাকে উৎসাহ না দিয়ে বরং প্রশ্ন করাতে সে বাশারের ওপরে বেশ বিরক্তই হয়েছে। ‘কোত্থেকে আর জানব, কানা রউফুলে খবর দিছে।’

কানা রউফুল ওদের ইনফরমারদের একজন। আন্ডারওয়ার্ল্ডের প্রায় সব মহলেই তার বিশেষ যাতায়াত আছে বিধায় ইনফরমার হিসেবে তার বেশ মূল্যায়ন আছে। কিন্তু লোকটা ধুরন্ধরের ধুরন্ধর। তার ব্যাপারে প্রচলিত আছে মানুষে দুই নৌকায় পা দিয়ে ব্যালেন্স রাখতে পারে না, আর কানা রউফুল নাকি দুই-তিন-চার

আসলে কয় নৌকায় পা দিয়ে আছে সে নিজেও সঠিক জানে না। তারচেয়ে বড়ো কথা লোকটা শুধু সব নৌকায় পা দিয়েই বসে নেই, সব নৌকা থেকে সে নাকি নিজের সুবিধামতো জিনিসও তুলে নিতে পারে! মানে নিজের সুবিধা আদায় করে নিতে পারে। আর এক চোখ ছোটো হওয়াতে তাকে কানা রউফুল বলে ডাকা হয়।

‘রউফুলের কথা বিশ্বাস করার উপায় কী?’ বাশার খানিকটা চিন্তিত ভঙ্গিতে সিগারেট টানতে টানতে বলে উঠল। ‘এতদিন কোনো খোঁজ নেই, হঠাৎ সে কইথেকে আইসা বলে উঠল বজলু সলিমপুরে!’ বাশার তাকিয়ে আছে রাজুর দিকে।

‘বাশার, এত কথা বুঝি না। রউফুল আমারে পাকা খবর দিয়েছে বিশেষ একটা কাজে বজলু আজ রাতে সলিমপুরে আসবে এবং সে সকালের ভেতরেই আবার সরে পড়বে এখান থেকে। কাজেই তাকে পাকড়াও করতে চাইলে আজ রাতেই সুযোগ। আমি আজ রাতেই ওর খোঁজে যেতে চাই।’

রাজুর কথাগুলো এতক্ষণ ধরে মনের ভেতরে যাচাই করার চেষ্টা করছিল বাশার কিন্তু শেষ কথাটা শুনে সে চমকে তো উঠলই, সেই সাথে মনে মনে সে খানিকটা শঙ্কিতও হয়ে উঠল। ‘রাজু, তুই আগে শান্ত হ। একদম পাগলামি করিস না,’ বলেই বাশার হাত বাড়িয়ে বিছানার পাশের জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখল বাইরে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে। ‘দেখ, আমার তোর ওপরে পূর্ণ বিশ্বাস আছে কিন্তু রউফুলের কথার কোনো ঠিক নেই। তার ওপরে রাত এখন প্রায় মাঝরাতের দিকে যেতে শুরু করেছে এমন সময় এরকম স্রেফ একটা ইনফরমারের কথার ওপরে ভিত্তি করে এরকম একটা অভিযান চালাতে গেলে—’

‘তোকে কে বলেছে আমি অথরিটির সাথে কথা বলে সব প্রসিজার মেনে অপারেশন চালাতে যাবো বাশারের কথা শুনে রাজু হেসে উঠল। ‘শোন, বাশার, গত দুইটা মাস ধরে এই হারামজাদা যথেষ্ঠ জ্বালাইছে, এবার কেসে আমি আর সময় নষ্ট করতে চাই না। আজ রাতেই এর একটা এসপার আর না হয় ওসপার করেই ছাড়ব। সেটা যেভাবেই হোক।

বাশার একটু ভ্রু কুঁচকে তাকাল তার দিকে। ‘রাজু, তুই নিজেও জানিস না তুই কী বলছিস। স্রেফ একটা ইনফরমারের কথার ওপরে ভিত্তি করে তুই ভয়ঙ্কর এক গ্যাংস্টারের বিরুদ্ধে আনঅথরাইজড অপারেশন চালানোর কথা বলছিস, তোর মাথা ঠিক আছে তো? যদি কোনো গড়বড় হয়–’

‘কিচ্ছু হবে না। শোন, আমি পাকা পরিকল্পনা করে ফেলেছি। দেখ,’ বলে সে মোবাইল বের করে সেটাতে একটা ম্যাপ বের করে দেখাল। রাজু দেখল: ওটা সলিমপুরের ডকইয়ার্ড এলাকার একটা ম্যাপ। ‘শোন, রউফুলের তথ্য মতে আজ রাতে বজলু আর তার সঙ্গীরা ট্রলারে করে এইখানে আসার কথা। ওদের ভেতরে নিশ্চিত কোনো একটা জরুরি মিটিং হবে বাজার এলাকায়। ওটা সেরেই ওরা আবার সকালের ভেতরে ফিরে যাবে। আমার পরিকল্পনা হলো-’

‘রাজু, তুই জানিস আমি কোনো অবস্থাতেই আনঅথরাইজড অপারেশনে যাবো তো না-ই, তোকেও যেতে দিব না। তুই কি পাগল নাকি, এভাবে—শোন, বজলুর সাথে শত্রুতাটাকে তুই অনেক বেশি পারসোনাল করে ফেলছিস। এভাবে ব্যক্তিগত পর্যায়ে নিয়ে গেলে প্রফেশনাল কাজকে

‘বাশার, তুই যাই বলিস আজ রাতে আমি যাবোই,’ রাজু কোমরে দুই হাত রেখে গোঁয়ারের মতো বলে উঠল। ‘তুই আমার সাথে যাবি কি না বল,’ বলেই সে বেশি জোরে বলে ফেলেছে কথাগুলো বুঝতে পেরে নিজের গলা নামিয়ে নিলো। ‘আচ্ছা শোন, আমরা একটু ট্রাই তো করতে পারি।’

বাশার আনমনেই মাথা নাড়ল। রাজুকে কোনোভাবেই থামাতে পারবে না এটা সে বেশ ভালোই বুঝতে পারছে। ‘ঠিক আছি, আমি যাবো তোর সাথে; কিন্তু একটা শর্ত আছে।’

‘তোর যেকোনো শর্ত-’।

‘আগে শোন,’ বলে বাশার আরেকটা সিগারেট ধরাতে ধরাতে বলে উঠল ‘শোন, রউফুলের কথার ওপরে আমার কোনো ভরসা নেই আমরা ওখানে যাবো। গিয়ে যদি এটা নিশ্চিত করতে পারি বজলু আছে, সাথে সাথে আমরা ফোর্সে খবর দিব,’ রাজু হাত নেড়ে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল তার আগে বাশার বলে উঠল, ‘রাজু, এটা সিরিয়াস বিষয়, তুই পাগলামি না করে আমার কথা শোন। আমি তোকে অভিযান চালাতে মানাও করছি না, আবার যাতে পুরো ব্যাপারটাতে অতিরিক্ত ঘাপলা না হয় সেটাও বুঝতে বলছি। ঠিক আছে?’

‘ঠিক আছে, ঠিক আছে; চল, চল। তৈরি হয়ে নেই।’

পরবর্তী বিশ মিনিটের ভেতরে দুজনেই তৈরি হয়ে কালো রেইনকোট পরে পুলিশ ফাঁড়ির বাইরে বেরিয়ে এলো। দুজনেই সিভিল ড্রেসে এসেছে, সাথে ব্যাজ থাকলেও দুজনের কেউই এমনকি রেজিস্টার্ড ফায়ারআর্মসও নেয়নি। এটাও রাজুরই বুদ্ধি।

বাইরে বেরিয়ে এসে জিপ চালু করে টানা দশ মিনিটের মতো গাড়ি চালিয়ে চলে এলো ডক-ইয়ার্ড এলাকায়। বাজারের কাছাকাছি আসতেই বাশারের হাত চেপে ধরল রাজু। ‘এইখানেই রাখ। বাকিটা পথ আমরা হেঁটে যাবো।’

‘তোর ইনফরমার কই?’ জিপটাকে সাইড করতে করতে বাশার প্রশ্ন করল।

‘ওই যে,’ টিপ টিপ বৃষ্টির ভেতরে বাজারের একপাশের কোনায় একটা ঘোলা লাইটের আলোতে এতটা ছাপড়ির নিচে দাঁড়িয়ে আছে কম্বলের মতো কিছু একটা মুড়ি দিয়ে এক লোক। দূর থেকে ঠিক কে, সেটা পরিষ্কার বোঝা না গেলেও মোটামুটি এটা বোঝা যাচ্ছে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। ‘জলদি চল।’

ওরা জিপ থেকে নেমে অনুভব করল বৃষ্টির বেগ বেশ বেড়েছে, এখন আর এটাকে টিপ টিপ বৃষ্টির পর্যায়ে ফেলা যাবে না কোনোভাবেই। তবে মুষলধারে বৃষ্টি বলারও উপায় নেই। রেইনকোটের হুডটা ভালোভাবে বসিয়ে খানিকটা এগোতেই দেখতে পেল ছোটোখাটো রউফুল চাদর মুড়ি দিয়ে ঝুপড়ির নিচে দাঁড়িয়ে বিড়ি ফুঁকছে। ‘রফু,’ অনুচ্চ স্বরে ডেকে উঠল। রাজুর ডাক শুনে রউফুল ওরফে রফু এমনভাবে ফিরে তাকাল যেন মনে হলো কোনো কুকুরকে শিস দিয়ে ডাকলে যেভাবে চট করে মাথা ফেরায় অনেকটা যেন সেভাবে।

‘খবর কী বল, রাজু রউফুলের কাছাকাছি গিয়ে একবার চট করে চারপাশে দেখে নিলো

‘আরে ওস্তাদেরা, আপনেরা দেরি করলাইন কেরে?’ রউফুলও আশপাশে সতর্ক নজর বোলাচ্ছে।

‘রফু, কথা কম বকুল, বজলু আসছে?’ রাজুর গলায় অস্থিরতা। বাশার দেখল আনমনেই সে একবার কোমরে রাখা পিস্তলে হাত বুলিয়ে নিলো।

‘শশশ,’ রউফুল, আপনাদের ওদেরকে চুপ থাকতে বলেই চট করে ঝুপড়ি থেকে নেমে গেল। ‘আমার লগে আইয়ুন।’

রাজু একবার বাশারের দিকে ফিরে দেখল। বাশার কিছু বলতে গিয়েও স্রেফ একবার কাঁধ ঝাঁকাল। দুজনেই রউফুলের পিছু নিয়ে সরু একটা গলির মতো জায়গায় চলে এলো। চারপাশে বাজারের ছোটো ছোটো দোকানঘর।

‘ওস্তাদ, মাফ কইরা দেন,’ রউফুলের গলায় অস্থিরতা।

‘মানে কী?’ রাজু প্রায় ধমকে উঠতে গিয়েও গলা নামিয়ে নিলো। একহাতে রউফুলের চাদর চেপে ধরে হালকা-পাতলা রউফুলকে একটানে নিজের কাছে নিয়ে এলো। ‘রাজু, শান্ত হ,’ বাশার সতর্ক করে দিলো রাজুকে।

রাজু বাশারের দিকে ফিরেও দেখল না। সে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে কানা রউফুলের চোখের দিকে। ‘মানে কী বলত, রফু। তুই কি এই মাঝরাতে আমাদেরকে ডেকে নিয়ে এসে এখন উলটাপালটা কথা বলছিস। এর মানে কী? বজলু আসছে কি আসে নাই? ঠিক কইরা কথা বলবি,’ বলেই সে কোমর থেকে পিস্তল বের করে রউফুলের কপালের ওপরে চেপে ধরল। ‘হয় আজ রাতে বজলুরে ধরব, আর না হয় তোরে মারব। মারতে আমার আইজরাতে হবেই।’

‘ওস্তাদ, এট্টু আগে ওইহানে একটা টলার ভইরা কয়েকজন আইছে, হের ভিতরে বজলু আছে কি না কইবার পারি না।’

‘ওরা গেছে কোনোদিকে?’ রাজু প্রশ্ন করার আগেই বাশার জানতে চাইল।

‘হেরা ওই দোতলায় গুদামের ভিতরে গেছে।’

‘রউফুল, তুই কি নিশ্চিত ওরা ওইদিকেই গেছে?’ আবারও বাশার জানতে চাইল। আনমনেই ডক-ইয়ার্ডটা একবার দেখে নিয়ে রাস্তার অন্যপাশে গুদামটা দেখে নিলো বাশার। রউফুলের কথায় যুক্তি আছে। যদি বজলু বা তার সঙ্গীরা এসেই থাকে তবে ওদিকেই যাবার কথা হিসেবে।

‘ওস্তাদ, আমি নিশ্চিত কইতে পারি না হেগো ভিতরে বজলু আছে কি না, তয় হেরা ওইদিকেই গেছে আর যারা ওইদিকে গেছে কেউই বাইর হয় নাই।’

‘রাজু, ওরে ছাড়, জলদি চল, যদি বজলু এসেই থাকে চেক করতে হবে,’ বাশার নাড়া দিলো রাজুকে। রাজু এখনও রউফুলের দিকেই তাকিয়ে আছে। চট করে সে পিস্তলটা নামিয়ে নিলো। ‘রফু, তুই এইখানেই থাক। আমরা আসতেছি। চল।’

‘কি মনে হয়, রউফুলের কথা ঠিক আছে?’ সন্তর্পণে গুদামের দিকে এগোতে এগোতে পিস্তলটাকে একবার চেক করে নিচ্ছে রাজু। সেই ফাঁকেই সে জানতে চাইল।

যুক্তি তো বলে ঠিকই আছে। কারণ,’ এইটুকু বলে বাশার একবার ডকের দিকে দেখাল। ‘এখানে বেশিরভাগই মাছ ধরার ট্রলার অথবা নৌকা অথবা শ্যালো নৌকা। এই ট্রলারটা এখানকার না, এইটা নিশ্চিত, আর যদি ট্রলারে করে কেউ এসেই থাকে তবে এটাও ধরে নেওয়া যায় যে, গোপন মিটিংয়ের ইচ্ছে থাকলে গুদামগুলোর দিকে যেতেই পারে। আরেকটা কথা,’ বলে বাশার থেমে গিয়ে এবার নিজের পিস্তল বের করে আনল। বৃষ্টির গতি আরও বাড়তে শুরু করেছে। ‘রউফুল যে গুদামগুলোর দিকে দেখিয়েছে ওগুলোর মালিকানা কিংবা দখল কিন্তু বজলুরই।’

‘ঠিক আছে, জলদি চল। বজলু যদি আইসা থাকে,’ নিজের পিস্তলটা বাগিয়ে ধরে, মাথা থেকে রেইনকোটের হুডটা সরিয়ে দিলো রাজু।

‘এক মিনিট। তোর কথা মনে আছে তো? যদি আমরা একবার নিশ্চিত হতে পারি যে বজলু এখানে এসেছে তবে সাথে সাথে আমরা অথরিটিকে খবর দিব, মনে আছে?’

‘মনে আছে, এখন চল,’ রাজু এগিয়ে যেতেই তাকে অনুসরণ করে বাশার।

দুজনে মিলে সরু গলিটা থেকে মূল রাস্তায় বেরিয়ে এসে সেটা সাবধানে পার হয়ে ঢুকে পড়ল গুদাম এলাকায়। সামনে বেশ অনেকটা ফাঁকা জায়গা আর সেটা পার হলেই বেশ কয়েকটা গুদামঘর। ‘কোনো মানুষের তো ছায়াও দেখি না, বিড়বিড় করে বলে উঠল রাজু।

‘মানুষ বাদ দে, কোথাও তো একটু আলোও দেখি না,’ বাশার মনোযোগের সাথে সামনে জরিপ করার চেষ্টা করছে। ‘ওই যে,’ রাজু চট করে বলে উঠল ‘ওইদিকে আলো দেখা যায়। সম্ভবত গুদামের ভেতরে আরও জ্বলছে।’

‘খুব সাবধানে, পাহারাদার থাকতে পারে,’ দুজনেই যতটা সম্ভব সাবধানে দৌড়াতে দৌড়াতে ফাঁকা জায়গাটা পার হয়ে এলো। একটা বাঁকের অন্যপাশে আলো দেখা যাচ্ছে। ‘তুই আগা, আমি তোকে কভার করছি,’ রাজুকে উদ্দেশ্য করে কথাটা বলে উঠল বাশার। সামান্য মাথা নেড়ে সামনের দিকে এগিয়ে গেল রাজু, তাকে কভার করে সাবধানে অনুসরণ করে দুজনেই চলে এলো আলো জ্বলতে থাকা গুদামের একটা জানালার দুইপাশে। দুজনেই খুব সাবধানে পজিশন নিলো জানালার দুপাশে। ভেতর থেকে হালকা কথার শব্দ ভেসে আসছে। বাশারকে উদ্দেশ্য করে একবার মাথা নেড়ে খুব সাবধানে ভেতরের দিকে উঁকি দিলো রাজু। মাথাটাকে সামান্য ঘুরিয়ে ভেতরে দেখে নিতেই তার মুখে সামান্য হাসি ফুটে উঠল। আনমনেই সে বিড়বিড় করে বলে উঠল, ‘বজলু।’

‘তুই নিশ্চিত?’ প্রায় ফিস ফিস করে জানতে চাইল বাশার। রাজু কিছু বলার আগেই ওদের সামনে থেকে কেউ একজন আচমকাই ধমকে উঠল। ‘এই তোরা কেডা রে?’

রাজু আর বাশার দুজনেই চট করে সামনে ফিরে তাকাল। ছাতা হাতে দুজন দাঁড়িয়ে আছে অন্ধকারের ভেতরে। একজনের হাতে একটা সিগারেট। রাজু আর বাশার সাথে সাথে যেন জমে গেল, লোকটা আরেক পা এগিয়ে এলো ওদের দিকে ‘কেডা রে তোরা?’ লোকদুজনও যে ওদেরকে দেকে চমকে উঠেছে কোনো সন্দেহ নেই। সবার আগে বাশারই নড়ে উঠল, নিজের পিস্তলটাকে উঠিয়ে আনছে। সামনের দুজনের একজন পিস্তল তুলল। বাশার আর লোকটা দুজনেই গুলি করল ঠিক একই সাথে, একই সময়ে। দুটো গুলির শব্দ ঠিক একইসাথে ফুটে ওঠাতে মনে হলো যেন একটাই গুলি হলো, কিন্তু শব্দটা হলো ডিনামাইট বিস্ফোরণের মতো। নিস্তব্ধ রাতের নীরবতা খান খান হয়ে গেল গুলির শব্দে। বাশার দেখল ওর গুলি মিলি মাইক্রো সেকেন্ড আগে লাগাতে লোকটা পড়ে গেল। লোকটার গুলি ওদের মাথার ওপর দিয়ে চলে গেল। লোকটার সাথী অস্ত্র বের করে আনছে, ‘বাশার, সাবধান,’ বলেই রাজু ওর দিকে লাফ দিয়ে দুজনেই গড়িয়ে পড়ে গেল। শোওয়া অবস্থাতেই রাজু গুলি করল অপর লোকটাকে।

‘সর্বনাশ, ওরা টের পেয়ে গেছে। বজলু পালাবে, জলদি খবর দিতে হবে ফোর্সে,’ বাশার আপনাতেই বলে উঠল।

‘সময় নেই,’ রাজুর কথা শেষ হবার আগেই ধুপধাপ গুলির শব্দ হলো, ওদের আশপাশে বৃষ্টির ভেতরে কাদা ছিটালো গুলি। বাশার উঁকি দিয়ে দেখল গুদামের ভেতরে হই-হট্টগোল শুরু হয়ে গেছে। ‘দোস্ত, ওরা পালাবে,’ বাশার কোনোমতে বলে উঠল।

‘আমি সেটা হতে দিচ্ছি না,’ বলেই রাজু গুদামের দরজার দিকে গুলি করল ওটা দিয়ে বেরিয়ে আসতে থাকা একজন গুলির শব্দের চেয়ে জোরে চিৎকার করে পড়ে গেল। ‘শোন, একটা বুদ্ধি এসেছে,’ রাজু উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলে উঠল কিন্তু দাঁড়ানোর সাথে সাথে গুলি হতেই আবারও বসে পড়ল। বাশার গুলি করে কভার দিলো ওকে।

‘শোন, ওরা টের পেয়ে গেছে ঠিক আছে কিন্তু ওরাও ফাঁদে পড়ে গেছে। এই গুদাম থেকে বের হবার দুটো রাস্তা। এক কাজ করবো। আমি এগোবো, তুই আমাকে কভার দিবি। আমি গুদামের দরজাটা বাইরে থেকে আটকে দিয়ে অপরপাশের রাস্তায় চলে যাবো। তুই এদিক থেকে দরজাটা কভার করবি, আর আমি ওদিক থেকে। কেউ বেরোলেই আমরা গুলি করবো। আর আমি এর ভেতরে ফোর্সে খবর দিয়ে দিবো। আজ কোনোমতেই পালাতে দিবো না শালাদের।

‘রাজু, শোন, অনেক বেশি ঝুঁকি

‘কভার কর,’ বাশারের কথা শোনার আগেই রাজু ওকে গুলি চালানোর নির্দেশ দিলো। বাশার গুদামের দরজা লক্ষ্য করে গুলি করল কয়েক রাউন্ড। এই ফাঁকে রাজু দৌড়াতে শুরু করল। ‘এক-দুই-তিন,’ মনে মনে গুনতে গুনতে আধো অন্ধকারের ভেতরে আরও দুই রাউন্ড গুলি করইে বসে পড়ল বাশার। বসেই আবারও গুনতে শুরু করল। ‘এক, দুই, তিন দশ পর্যন্ত গোনা হতেই আবারও উঠে দাঁড়াল সে, আশা করছে রাজু এতক্ষণে পৌঁছে গেছে। কিন্তু ও উঠে দাঁড়ানোর সাথে সাথেই গুলি এসে লাগল। ওর গায়ে না লাগলেও ঠিক পাশেই দেওয়ালে লাগল। বাশার দেখল গুদামের জানালা দিয়ে কেউ একজন গুলি করছে। নিশ্চিত রাজুর গায়ে গুলি লাগবে। আড়ালের তোয়াক্কা না করে বাশার গুলি চালিয়ে গেল। রাউন্ড শেষ হতেই বসে পড়তে যাবে আবারও গুলি হলো, দেওয়ালের একটা ইটের চলটা এসে ডান চোখের ওপরে আঘাত করতেই তীব্র চিৎকার করে বসে পড়ল ও মাটিতে। চোখে হাত দিয়ে চেপে ধরলেও পরিষ্কার বুঝতে পারছে আহত জায়গাটা থেকে রক্ত বেরিয়ে বন্ধ করে দিচ্ছে চোখ। ব্যথার চোটে মনে হলো পাগল হয়ে যাবে।

কিন্তু ব্যথার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ গুলি ভরা। ওপাশ থেকে গুলির শব্দ থেমে গেল কিন্তু ধপাধপ কারও এগিয়ে আসার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। বাশার চোখ ছেড়ে দিয়ে আক্ষরিক অর্থেই অন্ধের মতো পকেট থেকে ক্লিপ বের করে পিস্তলে ভরার চেষ্টা করতে লাগল। বৃষ্টি আর রক্তে পিচ্ছিল হাত থেকে বারবার পিছলে যাচ্ছে ক্লিপটা। ওদিকে এগিয়ে আসছে পায়ের শব্দ, বাশার নিজের অজান্তেই গুলি ভরতে ভরতে পেছাতে শুরু করছে, পেছনের দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে ওর। গুলি ভরা হতেই বৃষ্টি আর রক্তে ভেজা চোখ খুলে সোজা পিস্তল তুলল সামনের দিকে। আড়ালের অন্যপাশ থেকে এগিয়ে আসতে থাকা ছায়ামূর্তিটা দেখা মাত্রই গুলি করল ও। একবার দুবার তিনবার।

মূর্তিটা থেমে গেছে, বাশার পিস্তল তাক করেই সোজা হলো একহাতে চোখের ওপর থেকে পানি আর রক্ত ঝাপটা দিয়ে সরাতেই মুখ হাঁ হয়ে গেল ওর। ঠিক ওর মতোই ততধিক অবাক দৃষ্টিতে হাঁ করা মুখে অবিশ্বাসের সাথে ওর দিকে তাকিয়ে আছে রাজু। তার নীল রেইনকোটের বুকটা ভেসে যাচ্ছে রক্তে। বাশারের তিনটে গুলিই তার বুক বিদীর্ণ করে গেছে। কাঁপতে কাঁপতে নিজের পিস্তল ফেলে রাজুকে ধরে ফেলল বাশার। বুক চিরে বেরিয়ে এলো বীভৎস চিৎকার—

.

মোবাইলের ভাইব্রেশনের শব্দে ডায়েরির পাতা থেকে চোখ তুলে মোবাইলের দিকে তাকাল বাশার। সেই সাথে ডায়েরির পাতার বীভৎস অতীত থেকে ফিরে এলো বর্তমানে। মোবাইল স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে দেখতে পেলা রিফাতের কল। চোখের পাপড়ি ফেলতেই একফোঁটা পানি টুপ করে গড়িয়ে পড়ল মোবাইলের স্ক্রিনের ওপরে। ডায়েরির পাতা বন্ধ করে কলটা রিসিভ করল ও। ‘হ্যালো।’

‘কী ব্যাপার, এখনও ঘুমাওনি?’ ওপাশ থেকে আর্কিয়োলজিস্ট রিফাত মজুমদারের গলা ভেসে এলো। রিফাতের প্রশ্নের জবাবে বাশারের নিস্তব্ধতার জবাবে রিফাত উদ্বিগ্ন সুরে জানতে চাইল। ‘কী ব্যাপার, কোনো সমস্যা?’

বাশার তখনও চুপ। ওপাশ থেকে রিফাতই আবার কথা বলে উঠল। তুমি আবার পুরনো ডায়েরি পড়ছিলে?’ এবার সে খানিকটা ঝাঁঝাল গলায় বলে উঠল বাশার, তোমাকে না বলেছি পুরনো অতীত রোমন্থন করার কোনো প্রয়োজন নেই,’ বলে সে একটু থামল। এবার আবারও শান্ত গলায় বলে উঠল। ‘বাশার, অতীতে যা হয়েছে তো হয়েছেই। রাজুর মৃত্যুতে তোমার কি আদৌ প্রকৃত কোনো দোষ ছিল—এটা নিয়ে আমরা বহুবার আলোচনা করেছি। এমনকি ডিপার্টমেন্টও তোমাকে ক্লিন স্লেট দিয়েছে অবশেষে। তুমি সম্প্রতি দুর্দান্ত একটা কেস সলভ করেছ। তোমার প্রমোশন হয়েছে, নতুন ফোর্সে জয়েন করছ। সবকিছুই কি আগের চেয়ে বেটার হয়নি, বলো?’

ফোনের এপাশে বাশার বড়ো করে একবার নিশ্বাস নিলো। ‘সবকিছুর পরও বন্ধু তো আমার আর ফিরে আসেনি, আর তাকে আমি নিজ হাতে খুন করেছিলাম।’

‘বাশার,’ ওপাশে আবারও রিফাতের গলা চড়ে গেল। ‘শোনো, এবার কিন্তু সত্যি সত্যি আমি তোমাকে কাউন্সিলিংয়ের জন্যে পাঠাবো। যদি আমার কথা না শোনো, তবে আমি তোমার ডিপার্টমেন্টের বস আমজাদ আনোয়ারকে জানাবো।’

বাশার হেসে উঠল। ‘হা-হা, এত কষ্ট করতে হবে না। আমার কথা বাদ দাও, তোমার কী অবস্থা? টুইন কালী মন্দিরের রেনোভেশন কেমন চলছে?’

‘দারুণ,’ ওপাশে রিফাতের গলায় খুশির আমেজ। ‘আমি দারুণ একটা টিম পেয়েছি। পুরো টিম খুব ভালো কাজ দেখাচ্ছে। তবে এখানে অনেক ব্যাপার আছে। বিশেষ করে ঠগীদের অরিজিনের কিছু ক্লু নিয়ে খুব অদ্ভুত আর মিস্টিরিয়াস ব্যাপার আছে…আচ্ছা আমি এগুলো পরে বিস্তারিত বলব তোমাকে। আগে বলো তোমার প্রস্তুতি কেমন, কাল নতুন ফোর্সে জয়েন করছ। তাও আবার স্পেশাল উইংয়ে। কেমন লাগছে?’

‘হা-হা। এ এমন কিছু না। আমি ঠিক আছি,’ বাশার ডায়েরিটা টেবিলের ড্রয়ারে রেখে দিলো। ‘কাল সকাল সকাল চলে যাবো। দেখি কী কেস অপেক্ষা করছে।’

‘বেস্ট অব লাক ডিয়ার, তুমি অনেক ভালো করবে, আমার বিলিভ। এখন ঘুমিয়ে যাও, গেস্ট হাউজের খাওয়া থাকার ব্যবস্থা সব ঠিক আছে তো?’

‘হ্যাঁ, সব ঠিক আছে। তুমিও ঘুমিয়ে যাও,’ রিফাতের কল কেটে দিয়ে মনে মনে বাশার বলে উঠল। হ্যাঁ, কালকের দিনটা বড়োই বটে

কিন্তু কোনো ধারণাই নেই কালকের দিনটা ঠিক কতটা বড়ো হতে যাচ্ছে তার জন্যে।

দীর্ঘ এবং কঠিন একটা দিন অপেক্ষা করছে তার জন্যে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *