অধ্যায় তেত্রিশ
অতীত
টাঙ্গা গ্রাম, ব্রহ্মপুত্র ও শীতলক্ষ্যা নদীর সঙ্গমস্থল
চারপাশে যুদ্ধ বাহিনীর মাঝখানে পত পত করে উড়তে থাকা যুদ্ধ পতাকাটা যেন পুরো মানবতাকে উপহাস করছে। কারণ আক্ষরিক অর্থেই বলতে গেলে মোঘল এবং বারো ভূঁইয়ারা মুখোমুখি। জায়গাটা ব্রহ্মপুত্র ও শীতলক্ষ্যা নদীর সঙ্গমস্থলের একেবারে কেন্দ্রে টাঙ্গা নামক এক গ্রামে। অবস্থানগত কারণে এই জায়গাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর একারণেই দুই বাহিনী মুখোমুখি হয়েছে এখানে।
জায়গাটা একদিকে শীতলক্ষ্যা আর ব্রহ্মপুত্রের সঙ্গমস্থল, তার ওপরে শীতলক্ষ্যার অন্যদিকেই মানসিংহের টোক নগরী, ওটা আবার ফজল গাজীদের এলাকার সাথে সংশ্লিষ্ট। আবার ব্রহ্মপুত্রের অপর পাড়ে এগারো সিন্ধু যেটা এখান থেকে খুব বেশি দূরে নয়। মানসিংহের মূল আক্রমণটা ওখানে হলেও প্রথম কয়েকদিনে এগারো সিন্ধুর যুদ্ধে ঈশা খাঁর অনুপস্থিতিতে অনেক প্রশ্নের উৎপত্তি হয়েছে, আবার ইচ্ছাকৃত উপায়ে ছড়ানো হয়েছে অনেক গুজব। সব সামলানোর জন্যেই ঈশা খাঁ এক পত্র প্রেরণ করে মানসিংহের দরবারে এরপরেই ঝড়ের বেগে সব বাহিনী মিলে এসে উপস্থিত হয়েছে টাঙ্গাতে। দুই বাহিনী একেবারে মুখোমুখি, আর সেই বিষয়েই জরুরি আলোচনা চলছে ঈশা খাঁর শিবিরে। আলোচনার বিষয়, ঈশা খাঁর পাঠানো পত্র এবং মানসিংহের শিবির থেকে সম্ভাব্য উত্তর।
ঈশা খাঁ তার সভাসদদের দিকে ফিরে তাকাল। একে একে সবাইকে দেখে নিয়ে তার দৃষ্টি স্থির হলো লতিফ খাঁর ওপরে। সেই তার দরবারে। সবচেয়ে বুদ্ধিমান এবং স্থির বুদ্ধির মানুষ। ‘কী মনে হয়, করণীয় কী?’ ঈশা খাঁর বক্তব্যের পেছনে অনেকগুলো বিষয় আছে যা একমাত্র তার কাছের মানুষেরাই জানে। বিশেষ করে সরফরাজ, লতিফ খাঁ। কারণ তারা জানে আসলাম শেঠের বিবিকে উদ্ধার করার জন্যে মাসুম কাবুলির অবস্থানের কোনো খোঁজ এখনও পাওয়া যায়নি। ঈশা খাঁর এই প্রশ্নের পেছনে সেই বিষয়ে অবগতিরর খোঁজও ছিল খানিকটা।
যুদ্ধের সাজে সজ্জিত সভাসদদের দিকে দেখে নিয়ে লতিফ খাঁ ফিরে তাকাল ঈশা খাঁর দিকে। ‘আমার মনে হয় বাইরের কোনো সাহায্যের ওপরে আর নির্ভর করার কোনো উপায় নাই। এখানে আমরা সব মিত্ররা এক হইছি, কাজেই যা হইবে তাই করতে হইবে। যা আছে কপালে সেইটা দেখা যাইবে। চেষ্টায় কোনো কমতি থাকা চলবে না,’ বলে সে থেমে গেল। বাকিদের দিকে হালকাভাবে দেখে নিয়ে ঈশা খাঁর দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, ‘গোস্তাকি নিয়েন না, হুজুর। কিন্তু আপনি যেইভাবে পুরা বিষয়টা চাইতেছেন সেইটাও আমার ঠিক মনমতো হইতেছে না, বলে সে আবারও বাকিদের দিকে দেখল। ‘আমার বিশ্বাস অনেকেই আমার লগে সহমত হইবে।’
লতিফ খাঁ কথা শেষ করার প্রায় সাথে সাথে সম্মতির গুঞ্জন শোনা গেল সভাসদদের ভেতর থেকে। ‘আমরা কোনো মূল্যেই আপনার জীবনের ওপরে ঝুঁকি আইতে দিতে পারি না,’ কেউ একজন বলে উঠল। ঈশা খাঁ যে পত্র পাঠিয়েছিল মানসিংহের দরবারে সেই পত্রে সে একটা বিশেষ প্রস্তাবনা দিয়েছে মানসিংহকে মূল টক্কর যেহেতু তাদের দুজনার ভিতরে কাজেই অকারণে প্রাণক্ষয় না করে বরং সে নিজে মানসিংহের সাথে দ্বৈতযুদ্ধে মুখোমুখি হতে চায়। যদি তাতে মানসিংহ জিতে যায় তবে বাংলা তার, আর ঈশা খাঁ জিতে গেলে মানসিংহকে বাঙাল প্রদেশ ছেড়ে যেতে হবে। যদিও এতে অনেকেরই আপত্তি ছিল কিন্তু ঈশা খাঁ এটাই করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং এই প্রস্তাবনাই পাঠায় সে শত্রু শিবিরে।
‘এখনও তো ওদের তরফ থেকে কোনো জবাব এলো না,’ ঈশা খাঁ গম্ভীর মুখে বলে উঠল। বলেই সে নিজের সভাসদদের দিকে ফিরে তাকাল। প্রত্যেকের চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছে তার এই প্রস্তাবনাকে কেউ মেনে নিতে পারছে না। ‘আমি বুঝতে পারছি তোমরা অনেকেই আমার সাথে এই প্রস্তাবনার বিষয়ে একমত নও, কিন্তু একটা কথা মনে রাখতে হবে। আমি শুরু থেকেই বলছি মানসিংহ তথা মোঘলদের সাথে লড়াইয়ের জন্যে আমরা প্রস্তুত নই, আমাদের সম্মান ইচ্ছা কিংবা দৃঢ় প্রতিজ্ঞা নিয়ে কোনো দ্বিধা নেই। কিন্তু বাস্তবতাও বুঝতে হবে। ওদের সাথে লড়াইয়ের জন্যে আমাদের সামর্থ্য যথেষ্ট নয়। কাজেই আমি শুরু থেকেই ভিন্ন কিছুর জন্যে অপেক্ষা করছিলাম কিন্তু তা তো, বলে সে থেমে গেল তারপর সবার দিকে মুখ তুলে বলে উঠল, ‘খোদা চাহেন তো-’
বাইরে পদশব্দের সাথে ভেতরে প্রবেশ করল পাহারাদারদের একজন। ‘হুজুর, অপরপক্ষ থেকে ফরমান এসেছে,’ বলে সে দূতকে দেখাল। ঈশা খাঁ ফরমান পড়তে বলল। সেটা পড়া শেষ হতে হতে তার মুখে ফুটে উঠল মৃদু হাসি। তার সভাসদেরা অনেকেই আপত্তির সাথে মাথা নাড়ল। কিন্তু সে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়াল, যুদ্ধের ফরমান এসে গেছে, ‘সবাই চল।’
.
বর্তমান
হাবিব আনোয়ার পাশার টেবিলের চারপাশে বসে আছে পিবিআইয়ের স্পেশাল ব্রাঞ্চের অফিসার থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ পলিসি গ্রহণের সাথে সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টারা। হাবিব আনোয়ার পাশা সবাইকে দেখে নিয়ে বলে উঠল, ‘এই হলো পরিস্থিতি,’ বলে সে মাথা নাড়ল তরফদারের দিকে তাকিয়ে। তরফদারের মতামতের ওপরে তার ভরসা অপরিসীম। ‘আমার একটা কথা আপনাদের সবাইকে জানাতে কোনো দ্বিধা নেই যে আমি যখন এই স্পেশাল ব্রাঞ্চের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আমার একটা ভয় ছিল, সত্যিকার অর্থেই স্পেশাল,’ বলে সে নিজের দুই তর্জনী নেড়ে বলে উঠল। ‘কাজ করার মতো কেস পাব কি না। সেসব ক্ষেত্রেও আমার চুজ করা অফিসারেরা আসলে কতটা দক্ষতা দেখাতে পারবে কিংবা আদৌ পারবে কি না। কিন্তু আদতে ব্যাপারটা ঘটে গেছে উলটো। আমার অফিসারেরা তাদের কাজে সর্বোচ্চ দক্ষতা তো দেখিয়েছেই কিন্তু এতটা দ্রুততম সময় এমন কিছু ষড়যন্ত্র আবিষ্কার করা গেছে যে এখন আমাদের হাতে থাকা রিসোর্স আসলে এইসব পরিস্থিতি সামলানোর মতো নয়। এই মুহূর্তে আমি আপনাদের মতামত আশা করছি এবং সেই সাথে আপনাদের সিদ্ধান্ত সহায়তাও,’ বলে সে মৌসুমির দিকে তাকাল। মৌসুমি একে একে বয়ান করে গেল ময়মনসিংহের বিষয়টা, সেই সাথে সিলেট এবং চট্টগ্রামে কী ঘটেছে এবং সবশেষে ইন্সেপেক্টর বাশারের কেস এবং তার সাথে চট্টগ্রামের কেসের সংশ্লিষ্টতা।
তার বয়ান শেষ হতেই বেশ কিছু প্রশ্ন উঠে এলো আলোচকদের ভেতর থেকে। একে একে দুজনেই সব প্রশ্নের জবাব দিয়ে গেল। তাদের প্রশ্ন শেষ হতে পাটোয়ারি জানতে চাইল, ‘সিলেট আর চিটাগাংয়ে তানভীর আর শারিয়ারের এখন কিরহম সাহাইয্য দরকার?’
হাবিব আনোয়ার পাশা বয়ান করে গেল ওরা কী করতে যাচ্ছে এবং ওদের কী ধরনের রিসোর্স প্রয়োজন হতে পারে। তার জবাব শুনে উপদেষ্টা কমিটির লোকজন নিজেদের ভেতরে আলোচনা করল কিছুক্ষণ।
‘মিস্টার পাশা, আপনাদের কেসগুলো যথেষ্ট সিরিয়াস বলেই মনে হচ্ছে। আমরা যথাযথ কৃর্তপক্ষের সাথে কথা বলে সিলেট এবং চট্টগ্রামে আপনার এজেন্টদের রিসোর্সের ব্যবস্থা করে দিতে পারবো।’
‘আর ময়মনসিংহের বিষয়ে আপনারা যা ধারণা করেছেন সেটার ব্যাপারেও ব্যাকআপ দেওয়া সম্ভব কিন্তু আপনাদের কংক্রিট কিছু রেজাল্ট দেখাতে হবে—’
আগের আলোচক কথা শেষ করার আগেই পরের আলোচক বলে উঠল, ‘বিশেষ করে চট্টগ্রামের কেসটা কিন্তু অসম্পূর্ণ এবং ওটার কোনো সঠিক সমাধান আপনারা এখনও করতে পারেননি,’ উপদেষ্টা তাকিয়ে আছে আনোয়ার পাশার দিকে।
আমি তো আপনাদেরকে বলেছিই ওটার সমাধান করতে হলে একজন মানুষকে খুঁজে বার করতে হবে আর সেটার জন্যে কাজ করছে আমার আরেক এজেন্ট, আশা করছি ওরা জলদিই বিষয়টার কোনো একটা সমাধান বের করতে পারবে। কাজেই—’
‘ইউ বেটার হারি, মিস্টার পাশা,’ আরেক উপদেষ্টা বলে উঠল। ‘আমার দীর্ঘদিনের কাজের অভিজ্ঞতায় একটা ব্যাপার আমি জানি আপনাদের যাদের সাথে টক্কর লাগছে তারা অত্যন্ত শক্তিশালী প্রতিপক্ষ, তাদের সাথে লড়তে হলে আপনার অনেক কংক্রিট কিছুর প্রয়োজন হবে। আপনার এজেন্টরা এখন পর্যন্ত অনেক সফল হলেও সেই কংক্রিট কিছু আপনারা এখনও বের করতে পারেননি। কাজেই আপনার এজেন্টকে বলুন যা করার জলদি করতে।’
‘আই কমপ্লিটলি অ্যাগ্রি উইথ ইউ,’ আনোয়ার পাশা মনে মনে বলে উঠল, বাশার তুমি আছ কোথায়, করছটা কী?
সে ফিরে তাকাল মৌসুমির দিকে, তারও মনে একই প্রশ্ন।
.
অতীত
‘এইটাই কি সেই জলপথ?’ মাসুম খানিকটা সন্দিহান দৃষ্টিতে সরু জলপথটার দিকে তাকিয়ে আছে।
‘জি, হুজুর,’ নুক্কুন ভালোভাবে সামনে দেখে মাথা নাড়ল। ‘আমি নিশ্চিত এইটাই সেই জলপথ, এইটা ধইরা গেলেই সেই দুর্গে পৌঁছাইতে পারবো আমরা। নুক্কুন নিশ্চিত করতেই মাসুম একজনের দিকে ফিরে ইশারা করল। লোকটা সারেংকে জানিয়ে দিবে ওদের নির্দেশনা। মাসুম ফিরে তাকাল নিজের লোকদের দিকে।
‘সবাই মন দিয়া শোনো; আমরা কেউই কাল রাইতে, খাই নাই, বিশ্রাম করি নাই, তুমগো সবার অবস্থা খারাপ। আমি বুঝতে পারছি, এই অবস্থায় আমরা আগাইতে থাকলে সবাই অসুস্থ হয়া পড়বা। আমরা এই জঙ্গলবাড়ি দুর্গে গিয়া, প্রথমে নুক্কুনের পরিবাররে উদ্ধার করব তারপর, তারপর কোনোভাবে রসুল খাঁর কাছে খবর পাঠানোর ব্যবস্থা করবো। তারপর আমরা খায়া বিশ্রাম নিবো। যদি বিকাল নাগাদ রসুল খাঁর তরফ থেইকা কোনো খবর না আসে, তবে আমরাই কাইল ভোরে সওদাগরিতে কইরা রওনা দিবো রসুল খাঁর এলাকার উদ্দেশ্যে। বোঝা গেছে?’ সবাই মাথা নেড়ে সায় জানাল।
‘ও, আরেকটা কথা,’ মাসুম দেখল ওদের নৌকাটা খাল ধরে খাড়িতে ঢুকতে শুরু করেছে। ওটার ওপাশে দুর্গের আকৃতি চোখে পড়ছে। ‘আমরা দুৰ্গে নামতাছি আর কিছুক্ষণের ভিতরেই। সবাই যার যার জিনিসপত্র সামলায়া প্রস্তুত হয়া যাও,’ শেষ কথাটা সে বলল রায়েলিকে উদ্দেশ্য করে। রায়েলি সামান্য মাথা নেড়ে সায় জানাল।
আর কিছুক্ষণের ভেতরেই খালের মতো জলধারাটা দিয়ে ওদের নৌকাটা ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল দুর্গটার দিকে। বিরাট আকারের দুর্গটার একপাশে পরিখার মতো অংশের সাথে গিয়ে মিশেছে খালটা। মাসুম খেয়াল করে দেখল দুর্গের চারপাশে বেশ গভীর করে খোঁড়া হয়েছে পরিখা আর সেটা দুর্গের দুদিক থেকে দুপাশে গিয়ে মিশেছে একপাশের খালের সাথে। অন্যপাশে একটা বিরাট আকারের দিঘির মতো জলধারার সাথে দুর্গের ঠিক সম্মুখভাগেই বিরাট দিঘিটার পাশেই বিরাট আকারের একটা ময়দান।
পরিখার কাছে নৌকাটা গিয়ে ভিড়তেই ওরা একে একে নেমে এলো সবাই। দলে এখন আর খুব বেশি মানুষ অবশিষ্ট নেই। একজনকে সারেংয়ের সাথে নৌকার পাহারায় রেখে ওরা পরিখার ওপরে নামানো কাঠের পাটাতনের ওপর দিয়ে দুর্গের মূল সিঁড়ির মতো অংশের দিকে এগোলে। সবার অগে নুকুন।
‘কী ব্যাপার কাউকেই তো দেখতে পাচ্ছি না,’ মাসুম কিছু বলার আগেই ওর পাশ থেকে ধোবল বলে উঠল। মাসুমও চারপাশে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করছে দুর্গটাকে এতটা নির্জন লাগছে কেন। ‘নুক্কুন?’
মাসুম নুক্কুনের নাম ধরে ডাক দিলেও সে দেখতে পেল নুক্কুনের কোনো হুঁশ নেই, সে প্রায় দৌড়ে দৌড়ে লাফাতে লাফাতে দুর্গের সিঁড়ি বেয়ে ওপরের দিকে উঠে চলেছে। মনে মনে আফসোসের সাথে একবার মাথা নাড়ল, নুক্কুন বেচারা নিশ্চয়ই পরিবারে সাথে দেখা করার জন্য একেবারে অস্থির হয়ে উঠেছে।
‘নুক্কুন?’ আবারও তাকে ডাক দিলো কিন্তু তার কোনোদিকে হুঁশ নেই। মাসুম বাকিদেরকে ইশারা করল ওপরে ওঠার জন্যে। ওরা ধাপগুলো পার হয়ে চারপাশে দেখতে দেখতে চলে এলো দুর্গের মূল প্রাঙ্গণে। সেখানে প্রবেশ করে আশপাশে তাকাতেই দেখল নুক্কুন প্রাঙ্গণের একপাশে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
মাসুম অবাক হয়ে একবার তাকে দেখল একবার নিজের লোকদের দিকে দেখল। ‘কী ব্যাপার, নুরুন, তোমার পরিবার–’
মাসুম প্রশ্নটা শেষ করতে পারল না। তার আগেই দেখতে পেল ওরা যেখানে দাঁড়িয়ে আছে তার চারপাশে উদয় হয়েছে ধুতি আর লালচে ফতুয়ার মতো পোশাক পরা একদল মানুষ। ওরা অস্ত্র বের করে প্রস্তুত হবার আগেই মানুষগুলো ঘিরে ফেলল ওদেরকে। লোকগুলো মোটেই অচেনা নয় ওদের কাছে।
মাসুম কিছু বলার আগেই, প্রাঙ্গণের আরেকপাশ থেকে ভরাট গলায় কথা বলে উঠল, লম্বা শক্তিশালী চেহারার একজন মানুষ। তার পরনে বাকিদের মতোই ধুতি, আর ফতুয়া, মাথায় লাল কাপড় বাঁধা, কপালে বিরাট তিলক। মানুষটা হাসিমুখে মাসুমের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, ‘হুজুর, কিসমতের খেল, আবারও দেখা হয়েই গেল আপনের লগে।’
গেড়ুয়ার দিকে তাকিয়ে রাগে দাঁত কিড়মিড় করে উঠল মাসুম। আবারও বোকার মতো পাঙ্গু গেড়ুয়ার দলের হাতে ধরা পড়েছে ওরা।
আলতো করে নিজের ঘাড় ফেরালো নুক্কুনের দিকে। অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে সে। তবে কি নুক্কুনই ওদেরকে ফাঁসিয়েছে? কথাটা ভাবতেই রাগের হলকা বয়ে গেল মাসুমের শরীরে। ওই নৌকায় করে ওদেরকে পাঙ্গুদের হাত থেকে উদ্ধার করার ঘটনা তবে স্রেফ নাটক ছিল। ওদের সাথে ভিড়ে গিয়ে ওদেরকে দিয়ে কাজ উদ্ধার করিয়ে তারপর পাঙ্গুদের হাতে ধরিয়ে দেওয়ার জন্যে। স্রেফ ধোঁকা দেওয়া হয়েছে ওদেরকে।
***
‘হ্যাঁ, মোহাম্মদপুরের ঘটনাটা স্রেফ ধোঁকা ছিল, আইওয়াশ,’ খুবই শান্ত ক্যালকেশিয়ান টানে বলে উঠল কালো কোট।
ভেজা চুপচুপে শরীরে ট্রলারটার একপাশে একটা বেঞ্চের মতো দেখতে বসার জায়গার ওপরে বসে আছে সবাই। রাগে ক্ষোভে বাশারের নিজের হাত-পা কামড়াতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু আসলে কিছু করার নেই। ওদের বিশেষ করে ওর নিজের প্রচুর বোকামি ছিল এইসব ঘটার পেছনে।
‘নিন, এভাবে ঠান্ডার ভেতরে ভেজা বসে থাকার কোনো মানে হয় না,’ ওদের ট্রলার এখন মাঝ-নদীতে। আর ওদের ঠিক সামনে বসে আছে সেই কালো কোট। ওদের সামনে একটা চেয়ার নিয়ে বসে আছে সে। তার থেকে খানিক দূরে ওদের দুপাশে দুজন করে চারজন। ‘আপাতত মাথা মুছে কফি খান, আমাদের বেশ কিছু কথা আছে এরপর আপনাদের পোশাক পালটানোর ব্যবস্থা করা হবে। আপাতত আপনাদের সুস্থ থাকাটা জরুরি।’
লোকটার কথা শুনে পৃথা রাগের সাথে ঝটকা মারলেও বাশার শান্ত থাকল, সে হাত বাড়িয়ে টাওয়ালটা নিয়ে মাথা আর শরীরের ভেজা অংশ যতটা পারল মুছে নিলো। যে লোকটা টাওয়ালটা দিয়েছিল তাকে ধন্যবাদ জানাতেও ভুলল না। তারপর কালো কোটের দিকে ফিরে বলে উঠল, ‘আপনি কিন্তু আপনার পরিচয় দেননি। হতে পারি আমরা আপনার বন্দি, কিন্তু বন্দিদের সাথেও তো ম্যানারস বজায় রাখা যায়, নাকি?’ ওদেরকে পানি থেকে ওঠানোর পরই অস্ত্রধারীরা ওদের থেকে সব কিছু নিয়ে নিয়েছে। পিস্তল থেকে শুরু করে মোবাইল, এমনকি পৃথা সেই গুহার ভেতরে বেদি থেকে যে জিনিসটা উদ্ধার করে এসেছে সেটাও। ওরা এই মুহূর্তে পুরোপুরি অসহায়ভাবে বন্দি, কাজেই অকারণ জোর জবরদস্তি করে কোনো লাভ নেই। তাই শান্তস্বরে শান্তভাবেই সে জানতে চাইল সামনের মানুষটার পরিচয়।
কিন্তু ওর প্রশ্নের জবাবে সামান্য হেসে উঠল লোকটা। ‘মিস্টার বাশার, আপনি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লোক ঠিক আছে, কিন্তু মনে রাখবেন কিছু বিষয় আছে যা আপনার কিংবা আপনাদেরও আয়ত্তের বাইরে,’ বলে সে নিজের মুখটাকে সামান্য এগিয়ে নিয়ে এলো। ‘কাজেই কিছু জিনিস না জানাই ভালো,’ বলে সে চেয়ারে হেলান দিলো। বাশার এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মানুষটার দিকে। খুব শান্তশিষ্ট মানুষটার অবয়ব থেকে যেন শক্তি সামর্থ্য সাহস আর স্থিরতা ঠিকরে বেরোচ্ছে। বাশার এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার দিকে। লোকটা কে হয়তো ও সেটা জানে না। কিন্তু অনুধাবন করতে পারে খুব সহজেই। আর এই লোকটা যে ওদেরকে ঘোল খাইয়েছে খুব সহজেই, সেটা অনুধাবন করাও খুব মুশকিল কোনো বিষয় না।
বাশার আনমনেই মাথা নাড়ল। ‘ঠিক আছে, বুঝতে পেরেছি আপনি আপনার পরিচয় বলতে চাইছেন না, কিন্তু এটা বলতে তো দ্বিধা নেই যে মোহাম্মদপুরের ঘটনাটা আপনি ইচ্ছে করেই ঘটিয়েছেন, আমাদের-’
‘জি, তা বলতে পারেন,’ বলে লোকটা তার এক অনুচরের উদ্দেশ্যে হাত নাড়ল। সাথে সাথে লোকটা ওদের সবাইকে কাপে করে একেবারে গরম কফি সার্ভ করল। ‘বলছি, আগে কফি নিন, আপনারা এমনিতেই এই ঠান্ডার ভেতরে ভিজেছেন, তার ওপরে আবার ভেজা কাপড়ে আছেন, ঠান্ডা লেগে যেতে পারে। এখুনি আপনাদের পোশাক বদলাবার ব্যবস্থা করতে পারছি না কারণ আপনাদের সাথে আমার কথা আছে, কাজ আছে, সেগুলো সারতে হবে আগে। কিন্তু তাই বলে অসুস্থ হতেও দিতে পারি না। কাজেই কফি নিন,’ কফি সার্ভ করা হতেই সে বাশারের দিকে ফিরে বলে উঠল, ‘হ্যাঁ, মোহাম্মদপুরের ঘটনাটা ইচ্ছে করেই ঘটানো হয়েছে। প্রথমে চট্টগ্রামে প্রফেসর আবদেলের মৃত্যুর পর আমি বাংলাদেশে আসি আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হয় সেখান থেকে,’ বলে সে নিজের গ্রীবা উঁচু করল। একেবারেই দ্বিধা ছাড়াই সে বলে চলেছে, বাশার আরও একবার অনুধাবন করার চেষ্টা করল লোকটার শক্তি আর ক্ষমতার উৎস। ‘আমি প্রফেসর ইফতেখারের পেছনে লাগার পর বুঝতে পারি ব্যাপারটা কঠিন হবে। আমার পরিকল্পনা ছিল এদের দুজনকেই অপহরণ করা যেকোনো মূল্যে,’ বলে সে পৃথা আর চৌধুরীকে দেখাল। ‘কিন্তু মিস্টার চৌধুরী হাত ফসকে গেল, এরপর মিস পৃথার ওপরে নজর রাখতে গিয়ে প্রথমে আবিষ্কার করলাম-চৌধুরীও তার ওপরে নজর রাখছে, আবার সেই সাথে উপলব্ধি করলাম জোর করে মিস পৃথাকে দিয়ে কিছু বের করানোটা কঠিন হবে। এমন সময় আপনি, মিস্টার বাশার, দারুণ একটা কাজ করলেন, আপনি কেন করেছিলেন কাজটা আমি জানি না। কিন্তু আমি একটা দারুণ সুযোগ পেয়ে যাই ওতে। যে-দুজনকে আমি এক করে জোর করে কেসটা সলভ করানোর পরিকল্পনা করছিলাম সেই দুজনকে টেকনিক্যালি এক করে স্রেফ ছোটো একটা জিনিস প্ল্যান্ট করে দেই, বাকিটা আপনারাই চালিয়ে যান।’
‘তাহলে বারবার আমাদের ওপরে আক্রমণ করছিলেন কেন?’ পৃথা রাগের সাথে বলে উঠল।
‘প্রথমে আমার নিজের পরিকল্পনাই আসলে স্থির করতে পারছিলাম না, আর পরে-’ লোকটা থেমে গেল। বাশার তার দিকে তাকিয়ে আছে সরাসরি। লোকটার কথার এই পর্যায়ে কিছু একটা অনুধাবন করার চেষ্টা করছে ও। কালো কোটও তাকিয়ে আছে, বাশার আপনাতেই বলে উঠল, ‘আপনাদের একটা অ্যান্টি পার্টি আছে, তাই না?’ বলে বাশার মৃদু হাসল।
কালো কোট হেসে উঠে প্রফেসর হামিদের দিকে তাকালো। ‘কংগ্রাচুলেশন্স, আপনারা পানামের লেজেন্ডারি পাতাল পথ খুঁজে পেয়েছেন।’
প্রফেসরকে বিদ্ধস্ত লাগছে। ‘আরও আগেই পাওয়া উচিত ছিলো, আমি বুঝলাম না, যেদিক দিয়ে আমরা বেরুলাম সেদিকে কারও সুড়ঙ্গমুখটা এতোদিন কারও চোখে পড়েনি কেন?’
‘আপনারা তো দৌড়ের ওপরে ছিলেন, তাই খেয়াল করেননি, আমি এখান থেকে দেখেছি, ওটা একেবারেই বিচ্ছিন্ন একটা চর এলাকা, আমার ধারণা ওদিকে তেমন কেউ যায় না দেখেই হয়তো—’
কালো কোট আবারও মাথা নেড়ে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, তার আগেই তার একজন লোক এসে কানের কাছে মুখ নিয়ে কিছু একটা বলল। লোকটার কথা শেষ হতেই কালো কোট ওদের দিকে তাকিয়ে হেসে উঠল, ‘আপনাদের জন্যে সুখবর আছে, যেজন্য এত কষ্ট করেছেন মরতে ধরেছিলেন, সেটার সমাধান পাওয়া গেছে,’ বলেই সে হাতের ইশারায় নিজের একজনকে ডাকল। একটু পরেই লম্বা চুলের একটা ছেলে ল্যাপটপ নিয়ে এসে সেটাকে ওদের সামনে একটা রাখল, তার পেছনে এলো খানিক বয়স্ক করে চাইনিজ চেহারার একজন, তার হাতে পানাম নগরের পাতালঘর থেকে উদ্ধার করে আনা সেই পিতলের চাকতির মতো জিনিসটা। ‘মিস্টার লি,’ লোকটাকে দেখেই প্রফেসর হামিদ অস্ফুটে বলে উঠল।
‘ওহ, প্রফেসর আপনি জন লি’কে চেনেন; অবশ্য আপনারা দুজনেই বলতে গেলে একই ফিল্ডে আছেন, কাজেই,’ বলে কালো কোট কাঁধ ঝাঁকাল। ‘বাকিরা যারা তাকে চেনেন না: ও জন লি, একসময় ইউনির্ভাসিটির প্রফেসর ছিল আর্কিয়োলজির। এরপর গোপনে আর্কিয়োলজিক্যাল সাইটের জিনিসপত্র চোরা বাজারে বিক্রি করতে শুরু করলে থাই সরকার তার বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি করে। লি এখন আমাদের জন্যে কাজ করে।’
‘তারপর লির দিকে ফিরে ইংরেজিতে বলে উঠল, ‘লি, বলো উনাদেরকে, কী পেয়েছ?’ এর পরিবর্তে ‘কালো কোট লির দিকে ফিরে ইংরেজিতে বলে উঠল, ‘লি, বলো উনাদেরকে, কী পেয়েছ?’
বলার সাথে সাথে লি সেই পেতলের চাকতির মতো জিনিসটা তুলে ধরল ওদের সামনে, তারপর ইংরেজিতে বলতে শুরু করল। ‘আপনারা কি কেউ এই জিনিসটা চেনেন?’ ওরা সবাই চুপ দেখে আবারও সে নিজেই বলতে শুরু করল। ‘আপনারা নিশ্চয়ই জানেন, ইউরোপ কিংবা বিশ্বের অন্যান্য অংশের আগেই বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য নৌবিদ্যায় অনেক বেশি পারদর্শী ছিল। বর্তমান বিশ্বে নেভিগেশনের অনেককিছুই একেবারে ডিজিটালি করা হয় কিন্তু আগে এমনটা ছিল না। যেমন, সেক্সট্যান্টের মাধ্যমে নেভিগেশনের জন্যে কোনো জায়গার অবস্থান নির্ণয় করাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আপনারা চোখের সামনে যে-জিনিসটা দেখতে পাচ্ছেন, এটাকে সেক্সট্যান্টের পূর্বপুরুষ বলতে পারেন। পার্সিয়ান এক ধরনের নেভিগেশনের কাজে লাগানোর যন্ত্র। এটা দ্বারা কোনো নির্দিষ্ট-’
‘অবস্থান বোঝানো হয় এবং আমরা যে যন্ত্রটা বের করে এনেছি ওটাতে একটা অবস্থানে লক করা ছিল, তাই না?’ পৃথা বলে উঠল
‘এক্সাক্টলি ইয়াং লেডি,’ খুশি হয়ে উঠল লি।
‘আর ওটাতে যে অবস্থান লক ছিল সেটাকে আমরা ডিজিটালি জিপিএসে বসাতেই এই লোকেশনটা পেয়েছি,’ সেই লম্বা চুলের ছেলেটা বলে উঠে ল্যাপটপটা প্রথমে কালো কোটের দিকে ঘুরিয়ে দেখাল তারপর কালো কোট ইশারা করতেই
সে ওটাকে ঘুরিয়ে দিলো ওদের দিকে। পৃথা ভ্রু কুঁচকে দেখার এবং বোঝার চেষ্টা করছে, সে অস্ফুটে বলে উঠল, ‘এটা তো কিশোরগঞ্জের একটা লোকেশন দেখাচ্ছে। ওখানে—’
‘ঈশা খাঁর জঙ্গলবাড়ি দুর্গ,’ ওর পাশ থেকে প্রফেসর হামিদ বলে উঠল।
‘ভেরি গুড,’ কালো কোট খুশিতে তালি দিয়ে উঠল, ‘সারেংকে লঞ্চ ঘোরাতে বলো, আমরা কিশোরগঞ্জে যাচ্ছি। এই সমস্ত কাহিনির সমাপ্তি হবে ওখানেই,’ বলে সে ওদের দিকে তাকিয়ে একটা হাসি দিয়ে উঠল
