শেষ কথা
অতীত
কত্রাবো, ঈশা খাঁর রাজধানী
‘ছেলেটার সাথে আমার পরিচয় হয়েছিল যুদ্ধের ময়দানে, নিজের হাতে ধরা ছেঁড়া এক টুকরো কাপড়ে লেখা ছোট্ট পত্রটা থেকে চোখ তুলে তাকাল সুবাদারের স্ত্রীর দিকে। পাথরের কঠিন আর পর্বতের মটো অটল মানুষ, যে সদ্যই শুধু যুদ্ধ নয় বরং কঠিন মোঘল সেনাপতির হৃদয় জয় করে শান্তি ফিরিয়ে এনেছে বাঙাল মুলুকে, সেই মানুষটার চোখের অশ্রু যেন বাঁধ মানতে চাইছে না মাসুমের শেষ পরিণতির কথা শুনে। সুবাদারের স্ত্রী, নুক্কুন এবং তার সাথে সুলতানসহ গুটিকয়েকজন মানুষ এবং পাঙ্গুদের যে-দলটা এসেছে ওরা সবাই আছে। তবে এখানে সবাই উপস্থিত নেই। কথা হচ্ছে ঈশা খাঁ আর সুবাদারের স্ত্রীর ভেতরে। এরকম গোপন বৈঠকে, সবাইকে রাখা যায় না। আর সেটা সম্ভবও নয়, বিশেষ করে এরকম গোপন বৈঠকের জন্যে তো একেবারেই নয়।
ওইদিন দুর্গ থেকে বেরিয়ে আসার পর পেছনে জ্বলন্ত দুর্গটাকে রেখে ওরা নদী পথে এগোতে থাকে। একটা সময় পরে রসুল খাঁর এলাকাতে পৌঁছানোর চেষ্টা করলেও সেখানে সরাসরি যেতে পারেনি। বরং একটা সময় ওরা জেলেদের একটা গ্রামে গিয়ে পৌঁছায়। সেখান থেকে খবর পাঠানো হয় রসুল খাঁর এলাকাতে। তারও আরও দুদিন পর রসুল খাঁর বাহিনী এসে উদ্ধার করে ওদেরকে এবং নিজেদের এলাকাতে নিয়ে যায়। সেখানে গিয়ে ওরা জানায় কী ঘটেছে এবং ওরাও জানতে পারে মানসিংহের সাথে যুদ্ধে ঈশা খাঁ বিজয়ী হয়েছে। বলতে গেলে সমতা হয়েছে। মোঘল সেনাপতি বাঙালি মসনদে আলা ঈশা খাঁর বীরত্বে মুগ্ধ হয়ে তার সাথে সমঝতায় এসেছে। ঈশা খাঁ নিজের বাহিনী নিয়ে ফিরে গেছে নিজের পুনরূদ্ধার হওয়া রাজধানী কত্রাবোতে। রসুল খাঁর লোকের মাধ্যমে খবর পাঠানো হয় কত্রাবোতে। এরই মাঝে ওরা বিশ্রাম নিয়ে কিছুটা ঠিকঠাক হয়ে সেই পিপে থেকে জিনিসগুলো একটা সিন্দুকে তুলে নেয়। এরও প্রায় সপ্তাহখানেক পর কত্রাবো থেকে খবর আসে, সেই সাথে ঈশা খাঁর নিজের বিশ্বস্ত লোক পাঠায় ওদেরকে নিয়ে যাবার জন্যে। কত্রাবো আসার পর ওদেরকে দারুণ যত্ন-আত্তি করা হলেও ঈশা খাঁ সরাসরি দেখা করেনি ওদের সাথে। আরও দুদিন পর রাতের বেলা ঈশা খাঁর সাথে দেখা করার জন্যে গোপন বৈঠকখানায় ডেকে পাঠানো হয় তাদেরকে। নুক্কুন আর পাঙ্গুদেরকে ডাকা হয়নি। সুবাদারের স্ত্রী মেহের আর ওদের বাকি সঙ্গীদেরকে ডেকে পাঠানো হয়। ঈশা খাঁর সাথে দেখা হবার পর সুবাদারের স্ত্রী সব খুলে বলে একে একে কী হয়েছিল জঙ্গলমহালে, তারপর সেখান থেকে কীভাবে তারা পালায় এবং এরপরে মাসুমরা কীভাবে সেখানে পৌঁছে ওদেরকে উদ্ধার করে এবং অবশেষে দুর্গে কী ঘটে। সব বলার পরে মাসুমের দেওয়া ছোটো বার্তাটা সে তুলে দেয় ঈশা খাঁর হাতে। সেটা দেখে আবেগপ্রবণ হয়ে ওঠে মসনদে আলা ঈশা খাঁ
‘ঠিক কী কারণে ছেলেটা আমাকে এতটা ভালোবাসত আমি নিজেও ঠিক জানি না,’ বলে সে সে দীর্ঘ একটা নিশ্বাস ছাড়ল। তারপর মৃদু হেসে বলে উঠল, ‘সবসময় বলত, একদিন প্রয়োজনে আমার জন্যে প্রাণ দিবে, পাগলটা করলও তাই,’ বলে সে চোখ তুলে তাকাল সুবাদারের স্ত্রীর দিকে। ‘সুবাদার আসলামও আমার ভালোবাসার মানুষ ছিল। আমি যেমন হারিয়েছি, আপনি হারিয়েছেন তারচেয়ে বেশি। স্বামী, প্রিয়জন-’ ‘সবচেয়ে কাছের মানুষ-বোন-বান্ধবী,’ বলে সুবাদারের স্ত্রীও দীর্ঘ নিশ্বাস ছাড়ল। ‘তবে আমি ছোটোবেলা থেকে এমন এক দায়িত্ব নিয়ে বড়ো হয়েছি যেখানে এভাবেই আমাকে পথ চলতে হবে। আমি জানি না আমার স্বামী সুবাদার আসলাম আপনাকে কী বলেছিল, কিন্তু এমন এক শক্তির আধার আমি ধারণ করে চলেছি যার বোঝা বইবার জন্যে আমাকে কঠিন হওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।’
ঈশা খাঁ তাকিয়ে আছে তার দিকে। ‘আপনার কাছে যা আছে এবং এর ব্যাপারে আমি যা শুনেছি তাতে আমার বেশ কয়েকটা কথা মনে হয়েছে। প্ৰথমত, আমার ধারণা সুবাদার আসলামও আপনার কাছে থাকা এই শক্তির আধারটাকে ঠিক বুঝতে পারেনি। যে কারণে সে আমাকে এমন একটা ধারণা দিয়েছিল যে এটা সরাসরি যুদ্ধে ব্যবহার করার মতো কোনো অস্ত্র কিন্তু আসলে তো বিষয়টা তা নয়,’ বলে সে থেমে গেল। ‘বরং তারচেয়েও অনেক বড়ো কিছু।’
হ্যাঁ। এ-এমন এক শক্তি যা মানুষের জন্যে উপকার যেমন বয়ে আনতে পারে, ঠিক তেমনি বহন করে আনতে পারে ভয়াবহ বিপর্যয়। আজ থেকে হাজারো বছর আগে আমার পূর্বপুরুষেরা এক যুদ্ধের সময়ে যখন এই শক্তির সন্ধান পায় তখন থেকেই আমাদের সমাজে এটাকে একইসাথে পবিত্র এবং নিষিদ্ধ বস্তু হিসেবে বিবেচনা করে আসা হয়েছে। আমাদের রাজ্যও এর ভালোমন্দ দুটো দিকই দেখেছে।’
ঈশা খাঁ আনমনেই মাথা নাড়ল। ‘আমি সুবাদারের কথা শুনে যা ভেবেছিলাম, সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হয়নি দেখে আমি খুশি। আমাকে যুদ্ধ জয়ের জন্যে সেই শক্তির আশ্রয় নিতে হয়নি, কিন্তু এখন কিছু প্রশ্ন রয়ে যায়,’ বলে সে চোখ তুলে তাকাল সুবাদারের স্ত্রী মেহেরের দিকে। ‘আমি নিজে এই শক্তি ব্যবহার করিনি এবং করবোও না। কিন্তু তাই বলে আমি শক্তি যে-কারও হাতেও পড়তে দিতে পারি না। তাছাড়া আপনি এবং আপনার সঙ্গীরা, নুক্কুন এবং পাঙ্গুরাও এখন আমার দায়িত্বের ভেতরে পড়েন। কাজেই আপনি কী ভাবছেন বলুন।’
‘আমার সাথে বিপুল পরিমাণ সম্পদ আছে, যেহেতু আমার স্বামী আপনার কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিল কাজেই সেটা আপনার কাছে থাকলেই সবচেয়ে ভালো হবে, আপনি এই সম্পদ এবং শক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার করতে পারবেন। আপনার মাধ্যমেই এই সম্পদ বাঙলার মানুষের কাজে লাগুক।’
ঈশা খাঁ গম্ভীর মুখে তাকিয়ে রইল তার দিকে। ‘বরং আমার ভিন্ন এক প্রস্তাব আছে। যে-শক্তির আধার আপনার কাছে আছে সেটার সংরক্ষণ করাটা বেশি জরুরি। আমি আপনাকে সব ধরনের সহায়তা করব। আপনি একটা পরিবার প্রতিষ্ঠা করুন। আমার সহায়তা তো থাকবেই প্রয়োজনে এই সম্পদ সংরক্ষণ করুন। এই পরিবারের কাজ হবে গোপনে এই শক্তির ভারসাম্য রক্ষা করা। নুক্কুনকে সম্ভব হলে আপনার এই বৃহত্তর পরিবারের অংশ করে নিন। যে পাঙ্গুরা আপনার সাথে আছে ওদেরও গতি হওয়াটা জরুরি। এরা সবাই পথ হারা, আপনার মাধ্যমে ওরা একটা পথের দিশা খুঁজে পেতে পারে। এই সম্পদ শুধু আমি কিংবা বাঙালার মানুষ নয়, এভাবে ব্যবহার করতে পারলে এটা সমগ্র মানবতার কাজে দিবে। আমি, আপনাকে সুরক্ষিত থাকায় জায়গা দেব। মোঘলরা যাতে এই বিষয় নিয়ে আর কোন ঝামেলা না করে সেটা আমি মানসিংহের সাথে বুঝে নিবো। ধীরে ধীরে সময় নিয়ে একটা পরিবার প্রতিষ্ঠা করে ফেলুন, যারা শুধু আপনার নয়-এই সমগ্র শক্তির ধারক হবে। আর যদি কখনও মনে হয় কোনো ভালো শাসক যার এই শক্তির বা সম্পদের প্রয়োজন পড়বে, তার হাতেও তুলে দিতে পারেন। অথবা-’ ঈশা খাঁ ধীরে ধীরে বলে গেল কীভাবে কী ভাবছে সে আর সুবাদারের স্ত্রী শুনে গেল। দীর্ঘ সময় আলোচনার পর সে যখন বাইরে বেরিয়ে এলো। তখন তার মুখ উদ্ভাসিত। নতুন এক দিশা খুঁজে পেয়েছে সে জীবনের, যাতে করে তার মানুষদেরও সংস্থান করা হবে, যে দায়িত্ব নিয়ে সে জন্মেছে সেটাও পালন করা হবে, যে মানুষগুলো নিজেদের জীবন বিলিয়ে দিয়েছে তাদেরকে সম্মান জানানো হবে। সবচেয়ে বড়ো কথা যে শক্তির আধার সে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, সেটাকেও সংরক্ষণ করা যাবে।
ঈশা খাঁর আলোচনা সভা থেকে বেরিয়ে সে অপেক্ষমাণ নিজের মানুষদের দিকে তাকিয়ে একটা চওড়া হাসি দিলো। অনেক কাজ করতে হবে তাদেরকে, অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে।
.
বর্তমান সময়
ম্যাজিক দেখেছিস কখনও, সোহেল?’ বাশারের প্রচণ্ড সিগারেটের তেষ্টা পেয়েছে, কিন্তু এমন অবস্থায় আছে চাইলেও এখন সিগারেট খাওয়া সম্ভব নয়। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে মুখ দিয়ে ধোঁয়া ছাড়ার ভঙ্গি করতে লাগল বাশার। ওদের গাড়ি তেজগাঁও থেকে মোহাম্মদপুরের দিকে যাচ্ছে। রাস্তার জ্যামের ভেতরে বসে ওরা কথা বলছে। কিশোরগঞ্জ থেকে হেলিকপ্টারে করে ঢাকায় এসে ওরা নেমেছে তেজগাঁওয়ের পুরনো এয়ারপোর্টে। সেখান থেকে গাড়িতে করে ওরা যাচ্ছে মোহাম্মদপুরের দিকে। কিশোরগঞ্জে যাদেরকে আটক করা হয়েছে তাদেরকে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ঢাকায় আনা হয়েছে এবং রাখা হয়েছে স্পেশাল সেলে। আর ওরা চলেছে কেসের শেষ টুকরোটার সমাধান করার জন্যে। কিশোরগঞ্জে জঙ্গলবাড়ি দুর্গের সামনে বাশার যখন বলল রাজদ্রোহীর রহস্যের শেষ টুকরোটার সমাধান রয়েছে প্রফেসর ইফতেখারের কাছে এবং সেটার শেষ অংশটুকু একমাত্র প্রফেসর ইফতেখারই বয়ান করতে পারবেন, তখন সবাই চমকে ওঠে এবং ততধিক চমকে ওঠে বাশার পৃথার দিকে ইঙ্গিত করাতে। তবে অবাক করা বিষয় হলো, বাশার এ-কথা বলার পরও পৃথা কিছুই বলেনি। সে কিছু অস্বীকারও করেনি, আর কিছু স্বীকারও করেনি। সে স্রেফ চুপ করে ছিল। কিন্তু প্রফেসর হামিদ এবং সোহেলের অনেক প্রশ্ন থাকলেও ওদের আলোচনা সেখান থেকে খুব বেশি আগায়নি। কারণ স্পেশাল ফোর্সের ওরা এলাকা সিল করে ওখান থেকে বন্দিদের এবং পুকরের নিচ থেকে পাওয়া সম্পদ নিয়ে দ্রুত সরে পড়তে চাচ্ছিল নিরাপত্তাজনিত কারণে, তাই ওদেরকে দ্রুত মুভ করতে হয়। আর হেলিকপ্টারেও আলোচনা করার উপায় ছিল না। আর তাই তেজগাঁওতে নামার পর গাড়িতে ওঠার পর দিয়ে সোহেল এবং প্রফেসর হামিদ বাশারকে ধরে বসে আসলে বিষয়টা কী এবং ওরা কোথায় যাচ্ছে সেটা জানতে চায়। প্রথমেই বাশার মৃদু হেসে জানায় ওরা প্রফেসর ইফতেখারের সাথে দেখা করতে যাচ্ছে তারপর সোহেলকে উদ্দেশ্য করে প্রশ্ন করে ম্যাজিক নিয়ে। ‘কী রে উত্তর দিলি না?’
‘ম্যাজিকে আবার কী হয়, জাদুকর জাদু দেখায়,’ সোহেল সামান্য কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলে উঠল।
‘হ্যাঁ, কিন্তু জাদুর ব্যাপারটা অনেকটা এমন যে জাদুকর ইচ্ছে করেই টেকনিক্যালি এমন একটা অবস্থা সৃষ্টি করে যে সবার নজর থাকে ঠিক যেখানে সে নিয়ে যেতে চায় সেখানে। এর বাইরে সে তার কারুকাজ করে কিন্তু কেউ সেটা দেখতে পায় না, কারণ নজর আগেই সরিয়ে ফেলা হয়েছে। ঠিক এই একই টেকনিক সিনেমাতেও ব্যবহার করা হয় ফ্রেমের আকারে। নির্দিষ্ট একটা পয়েন্টে কী ঘটছে অর্থাৎ ফ্রেমের ভেতরে কী ঘটছে সেটাই আমরা দেখতে পাই এর বাইরে কী হচ্ছে সেটা দেখা যায় না।’
‘বস, মাফ করে দেওয়া যায় না?’ সোহেল দুই হাত তুলে ধরল মুখের সামনে। ‘দুই দিন নাওয়া খাওয়া নাই, বিশ্রাম নাই-লেকচার মাফ করে বলো কী বলতে চাচ্ছ।’
বাশার হেসে উঠল, ‘এখানেই তো মজা, এই ফ্রেম থিয়োরি বা ম্যাজিশিয়ানদের টেকনিকের সাথে আমাদের কেসের ব্যাপক মিল আছে। এই কেসটা নেওয়ার পরেই পাটোয়ারি স্যার বলেছিলেন, যা দেখছ তা কিন্তু না, এর বাইরেও অনেক কিছু আছে। প্রথমত, কালো কোট মানে মাস্টার জেড ভাবছিল সে এই কেসটা নিয়ন্ত্রণ করছে, মুখোশধারী কাল্টের ওরা ভাবছিল ওরা নিয়ন্ত্রণ করছে, আমি ভাবছিলাম সব আমার হাতে আছে,’ বলে বাশার কাঁধ ঝাঁকাল। ‘পুরোটা না হলেও কিছুটা। কিন্তু পুরো খেলাটা নিয়ন্ত্রণ করছে আসলে একেবারেই ভিন্ন একজন মানুষ,’ বলে সে মৃদু ক্লান্ত হাসি দিলো। ‘প্রফেসর ইফতেখার,’ বাশার হাসছে পৃথার দিকে তাকিয়ে।
পৃথা তার দিকে তাকিয়ে আছে, তার চোখে কোনোর ভাষা নেই।
‘কিন্তু কীভাবে?’ সোহেল প্রায় আর্তনাদ করে উঠল, ‘আর তিনি আছেনই বা কোথায়?’
বাশার ঘড়ি দেখল, ‘আমরা প্রায় চলে এসেছি। একেবারে হাতে-কলমে দেখাবো, সে কথা শেষ করার কিছুক্ষণের ভেতরেই ওদের গাড়িটা এক জায়গায় এসে থামল। ‘চলো সবাই।’
‘এটা তো পৃথার মোহাম্মদপুরের সেই বাসা,’ সোহেল গাড়ি থেকে নামতে নামতে বলে উঠল। ‘এখানে কেন আমরা?’ সোহেল বলে উঠল। সে একবার
পৃথাকে দেখছে আরেকবার বাশারকে দেখছে।
‘ম্যাজিক দেখাবো,’ বলে সে সামনেই দেখল পুরো অ্যাপার্টমেন্ট ভবনটাকেই ঘিরে রেখেছে পুলিশ। ওদের সবার সামনে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে পেটমোটা ছোটোখাটো ভুঁড়িওয়ালা একজন মানুষ। বাশারকে দেখে সে হেসে উঠল। ‘আরে, বস!’
‘আরে টমি,’ বাশার জড়িয়ে ধরল তাকে। ‘তোর চট্টগ্রামের ট্রিপ কেমন হলো? ওই, যা বলেছি, এনেছিস?’
টমি এনেছে জানাতেই বাকিদেরকে নিয়ে সামনে এগোল বাশার। ‘চল, যেতে যেতে বলছি। তার আগে আরেকটা প্রশ্ন, মানুষ চাইলেও কোনো জায়গাটা দেখতে পারে না, কিংবা সবচেয়ে বেশি অন্ধকার থাকে কোনো জায়গাতে?’ বলেই সে হাত তুলল, ‘আমিই বলছি। মানুষ ঠিক তার নাকের নিচেই দেখতে পারে না। আর অন্ধকার সবচেয়ে বেশি গাঢ় থাকে প্রদীপের ঠিক তলাতেই। এখন ধর তুই, তোকে যদি কোনো কারণে পালাতে হয় তুই কই পালাবি?’
‘যেখানে কেউ আমাকে খুঁজে পাবে না?’
‘সেক্ষেত্রে এমন কোনো জায়গায় কি তুই পালাবি, যেমন ধর তোর দাদাবাড়িতে?’
‘না, কখনও না,’ সোহেলের সরল স্বীকারোক্তি।
‘একদম ঠিক। কিন্তু এটাও তো ঠিক ধ, তুই যদি এমন কোনো জায়গায় পালিয়ে বসে থাকিস, যেখানে তোকে কেউ খোঁজার কথা ভাববেও না। কারণ তুই বছরের-পর-বছর সময় নিয়ে আগে থেকেই এমন একটা অবস্থা সৃষ্টি করে রেখেছিস যাতে তোকে কেউই ওখানে খোঁজার কথা কারও মাথাতে না আসে। তাহলে ব্যাপারটা কেমন হয়?’ বলে বাশার সবার দিকে তাকিয়ে রইল লিফট এসে থেমে গেল।
‘প্রফেসর ইফতেখার ঠিক এই কাজটাই করেছেন। উনারা যখন পালালেন, প্রফেসর আবদেল পালিয়ে গেলেন চট্টগ্রামে, একেবারেই অচেনা অজানা এক জায়গায়। চৌধুরী গেল জেলে আর প্রফেসর ইফতেখার বেছে নিলেন এমন এক জায়গা,’ কথা বলতে বলতেই ওরা পৃথার অ্যাপার্টমেন্টটা পার হয়ে ছাদে যাবার সিঁড়িতে উঠে পড়েছে বাশার। তার পেছনে পেছনে বাকিরাও তাকে অনুসরণ করতে করতে সিঁড়িতে উঠে পড়ল। ‘উনি বেছে নিলেন এমন এক জায়গা যেটাকে আক্ষরিক অর্থেই বলা যায় সবার নাকের নিচে, ওরা ছাদের দরজা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল। আর তাই কেউই তাকে ঠিকমতো দেখতে পাচ্ছিল না। কিন্তু উনি রয়ে গেলেন একেবারে সব কিছুর কেন্দ্রে সেই শুরু থেকেই।’
‘এখানে?’ সোহেল খুব অবাক হয়ে পৃথার বাসার ছাদের চারপাশে দেখাল। ওরা ছাদে প্রবেশ করে দেখতে পেল ছাদে বেশ কয়েকজন পুলিশ। একপাশে সেই কেয়ারটেকার লোকটা, পৃথা সেদিন যার সাথে ঝগড়া করছিল সে কাঁচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সোহেল লোকটার দিকে তাকিয়ে আছে দেখে বাশার হেসে ফেলল। ‘লেডিস অ্যান্ড জেন্টেলম্যাল, আই গিভ ইউ প্রফেসর ইফতেখার,’ বলে সে কেয়ারটেকারের থাকার কামরাটার দিকে দেখাল। ‘চলুন, দেখি ভেতরে কী হচ্ছে।’
ওরা সবাই মিলে ভেতরে ঢুকে দেখতে পেল ভেতরে একজন পুলিশ সদস্য দাঁড়িয়ে আছে। আর ভেতরে সাধারণ দেখতে কয়েকটা আসবাবের ওপাশে একটা খাটে বসে আছেন বয়স্কমতন একজন মানুষ। ওদেরকে দেখে চোখ তুলে তাকাল মানুষটা। ‘হ্যালো, প্রফেসর ইফতেখার,’ বাশার বেশ আমুদে স্বরে বলে উঠল, ‘আপনার সাথে পরিচিত হয়ে খুশি হলাম।’ বয়স্ক মানুষটা উঠে দাঁড়িয়ে ওদের দিকে এগিয়ে এলেন। বাশার দেখল ছবির সেই মানুষটার স্রেফ চুলের পরিমাণ আরও কমেছে, গায়ের চামড়া আরও ফ্যাকাসে হয়েছে, শুকিয়ে গেছেন অনেকটাই, কিন্তু মানুষটা নিঃসন্দেহে প্রফেসর ইফতেখারই। ‘হ্যালো, ইন্সপেক্টর বাশার,’ মানুষটার হাতে ধরা ছিল একটা চিকন সিগার, সেটাকে ঠোঁটের কোণে চেপে ধরে বাশারের দিকে তাকিয়ে সে একটা হাসি দিলেন, বাকিদের দিকে দেখে নিয়ে সামান্য মাথা ঝাঁকালেন। ‘আপনার সাথে পরিচিত হয়েও খুশি হলাম। আমার বিশ্বাস পরস্পরের প্রতি আমাদের অনেক প্রশ্ন এবং উত্তর রয়েছে।’
প্রফেসর ইফতেখারের কথার জবাবে মৃদু হেসে উঠল বাশার। ‘অবশ্যই।’
***
‘প্রথম প্রশ্ন আমি করবো,’ প্রফেসর ইফতেখার সিগার টানতে টানতে বলে উঠলেন। বাশার মাথা ঝাঁকিয়ে সম্মতি জানাল। ‘আপনি ধরতে পারলেন কীভাবে আমি এখানে আছি?’ বলে প্রফেসর ইফতেখার নিজের কাঁধ ঝাঁকালেন। ‘প্রথম কু পেলেন কীভাবে?’
বাশার মৃদু হাসল। ‘ওটার মাধ্যমে,’ বলে সে প্রফেসরের হাতে ধরে থাকা সিগারটা দেখাল। ‘এটা?’ প্রফেসরও অবাক হয়ে বলে উঠলেন।
‘প্রথম যেদিন আমি আর সোহেল আপনাদের এই ছাদে আসি, আমরা আসার ঠিক আগে সম্ভবত পৃথা এসেছিল আপনার সাথে কথা বলতে। আমাদের উপস্থিতি টের পেয়ে আপনারা সেই ঝগড়ার নাটক সাজান। সত্যি কথা বলতে ওইদিনই আমার ভেতরে একটা অস্বস্তি কাজ করছিল। কি যেন একটা ঠিক মিলছিল না। কিন্তু তখন এত বেশি উত্তেজনার ভেতরে ছিলাম ঠিক ধরতে পারিনি। পরে যখন ভাবার সময় পাই তখন বিষয়গুলো ধীরে ধীরে ধরা পড়তে শুরু করে। ওইদিন আপনার কামরার বাইরে বিরাট একটা অ্যাশট্রে রাখা ছিল, ওটাতে এই সিগারের গোড়া পড়ে ছিল বেশ কয়েকটা। একজন কেয়ারটেকার এই সিগার খাবে, এটা হতেই পারে না। আপনার ফাইলে আমি পড়েছি আপনি দামি তামাক ছাড়া খেতে পারেন না, এটা একটা ক্লু ছিল। এরপর আরও কিছু বিষয় যেমন, আমরা যখন নারায়ণগঞ্জে আর কিশোরগঞ্জে অভিযান চালিয়ে বেড়াচ্ছি তখন এই অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের ব্যাপারে খোঁজ নিতে বলি আমার কলিগ মৌসুমিকে, সে লোক লাগিয়ে জানতে পারে। পৃথা শুধু ওই অ্যাপার্টমেন্টটাই নয়, এই ছাদের একটা অংশ এবং এই কামরাটাও কিনে নিয়েছে হাউজিংয়ের কাছ থেকে—এটাও একটা ব্লু ছিল। যদিও তারা এই ভবন আনইউজুয়াল কিছু বের করতে পারেনি। নিঃসন্দেহে আপনারা খুবই সাবধান ছিলেন। আরও একটা ব্যাপার ছিল, পৃথার সাথে আপনি একটা লিসেনিং এবং ট্র্যাকিং ডিভাইস সেট করে দিয়েছিলেন সম্ভবত, ওটার ব্যাপারেও আমি আঁচ করতে পারছিলাম, কারণ পৃথা অনেক ক্ষেত্রেই তার সীমার চেয়ে বেশি গভীরে যেতে পারছিল আপনার কারণেই। উদাহরণ দিচ্ছি। পুরনো ঢাকায় চার্চে, পানামে সেই বেদি পরীক্ষার বিষয়টা, জঙ্গলবাড়িতে কিছু না পেয়ে যখন সবাই হতোদ্যম তখনও পৃথাই আলো দেখায়। আসলে আপনিই পৃথাকে গাইড করছিলেন? ঠিক কি না?’ বাশার প্রফেসরকে প্রশ্ন করল পৃথাকে এবার দেখে নিলো। পৃথাকে আগে থেকে এখন সচ্ছন্দ দেখাচ্ছে।
‘সবটা না হলেও কিছুটা আমি করছিলাম,’ প্রফেসর ইফতেখার মাথা ঝাঁকিয়ে বলে উঠলেন। ‘আসলে পৃথার সাথে দুটো ডিভাইস ছিলো, দুটোই মাইক্রো ডিভাইস, দুটোই বিশেষ কায়দায় লুকানো ছিলো। একটা ছিলো ওর একেবাওে কানের ভেতরে বসানো। ওটা দিয়ে আমি ওর সাথে যোগাযোগ রাখছিলাম। আর ব্যাকআপ হিসেবে ওর হুডির বাটনের ভেতরে আরেকটা মাইক্রো ডিভাইস বসানো ছিলো।’
‘এই কারণেই ওরা এতো সার্চ করেও কিছু পায়নি বা আমরাও কিছু টের পাইনি। কালো কোট মানে জেড বুদ্ধিমান হলেও কিছু ভুল করেছে সে। কোন স্ক্যানার দিয়ে চেক করেনি। কালো কোট অত্যন্ত বুদ্ধিমান লোক কিন্তু ওভার কনফিডেন্সে ভুগে কিছু ভুল করেছে সে। আমার বিলিভ চৌধুরীও পৃথার মতো কোন উপায়েই মুখোশধারীদের সাথে যোগাযোগ রাখছিল বা ওরা তাকে ট্র্যাক করছিল। যদিও আমি শিয়োর না এখনও,’ বাশার একটু থেমে আবার বলতে লাগলো। ‘আপনারা যখন কমলাপুরের বস্তি থেকে পালান তখনই আপনি এখানে এসে ওঠেন তাই না? একেবারে শুরু থেকেই আপনি এমন এক জায়গায় ছিলেন যেখানে কেউই আপনাকে খোঁজার কথা ভাবেনি। আর ইচ্ছে করেই পৃথার সাথে তার মায়ের সাথে সম্পর্ক খারাপ করে রেখেছিলেন যাতে ওটা কেউই ভাবতেও না পারে, ব্রিলিয়ান্ট,’ বাশার মাথা নাড়ল। ‘আমার খুব পছন্দের একটা মুভি প্রেসটিজের ডায়লগ মনে পড়ে যাচ্ছে: একটা ম্যাজিক ট্রিকের জন্যে পুরো জীবন সেক্রিফাইস আপনিও তাই করেছেন। বহু বছর আগে থেকেই আপনারা প্রয়োজনের সময়ে কাজে লাগানোর জন্যে মঞ্চ সাজাচ্ছিলেন। ও বাই দ্য ওয়ে, আপনার পুরনো জাদুকর হিসেবে কাজ করার ব্যাকগ্রাউন্ডটাও আমার জন্যে একটা ক্লু হিসেবে কাজে দিয়েছে,’ বাশার মাথা নাড়ল। ‘তবে আপনি চৌধুরীর সাথে খুব অন্যায় করেছেন। সে বেচারা বার বার শুধু ধরাই খেয়েছে।’
‘ওর জন্যে আমি কিছু একটা অবশ্যই করবো। যদি আমি নিজে দাঁড়াতে পারি ওর জন্যে সুন্দর একটা জীবনের ব্যবস্থা আমি অবশ্যই করবো।’
‘প্রফেসর আমি আপনার প্রশ্নের উত্তর দিয়েছি, এবার আমার পালা, বাশার এইটুকু বলতেই প্রফেসর মাথা ঝাঁকালেন। ‘প্রথম প্রশ্ন, কী কেন কীভাবে, একেবারে শুরু থেকে।’
‘অলরাইট, আমি আর কিছু লুকাব না,’ প্রফেসর মাথা ঝাঁকিয়ে বলে উঠলেন ‘একেবারে শুরু থেকে বলছি তাহলে বুঝতে সুবিধা হবে সবার। আজ যা ঘটছে, এই এতো আয়োজন, এত রহস্য, এত ঘটনার ঘনঘটা সবকিছুর শুরু পৃথার মা ইলার মাধ্যমে। ইলা ইংল্যান্ডে বড়ো হওয়া মেয়ে। ওর সাথে ওখানেই আমার পরিচয়, বিয়ে। আজ থেকে বেশ অনেক বছর আগে তখন আমরা হ্যাপিলি ম্যারিড, ইলা একটা প্রজেক্টের কাজে বাংলাদেশে আসে। এখানে এসে সে জানতে পারে নিজের জন্ম পরিচয় সে যা জেনে এসেছে তা নয়। তার পরিবার এক বহু পুরনো কাল্টের সাথে জড়িত। সে নিজেও আসলে ওই কাল্টেরই ধারকদের একজন। ছোটোবেলা থেকেই তার পড়া, তার জীবন-যাপন সবই ওরা নিয়ন্ত্রণ করে এসেছে, জাস্ট সে জানত না। এমনকি সে যাদেরকে ওর বাবা-মা হিসেবে জেনে এসেছে তারা ওর প্রকৃত বাবা-মাও নয়। ইলা ছোটোবেলা থেকে একেবারে কিছুই জানত না যে তা নয়। অন্তত অনুধাবন করতে পারত ওর জীবনটা আলাদা ছিল। দেশে এসে ওদের সাথে জড়িয়ে পড়ে সে। বাই দ্য ওয়ে ওই মুখোশ বাহিনী আসলে ওরাই। যাই হোক ইলা ওদের সাথে কাজ করতে করতে মজা পেয়ে যায় এবং আমাকেও এর সাথে ইনভলভড করে। আমিও তখন নিজের ক্ষেত্র পরিবর্তন করে এই ফিল্ডে চলে আসি এবং আমরা পুরো ব্যাপারটার এত গভীরে চলে যেতে থাকি যে আমাদের আরও স্কলার হেড প্রয়োজন হয়। আমি আবদেলকে ইনভলভ করি। এই কাল্টের অন্যতম একটা রহস্য হলো এরা পৃথিবীর সবচেয়ে পুরনো শক্তি এবং রহস্যগুলোর একটার ধারক। আপনারা যে- ট্রেজার আবিষ্কার করেছেন ওটা অনেক মুল্যবান কিন্তু ওটা আসলে কিছুই নয়। মূল বিষয় আরও অনেক গভীর এবং অনেক অনেক রহস্যময়। এমনকি পুরো ব্যাপারটা এতটাই শক্তিসম্পন্ন যে কাল্টের ওরাও গোটা ব্যাপারটা জানে না। আর তাই আমি আবদেল এবং ইলা মিলে যখন গবেষণা শুরু করি ওরা খুশিই হয়। কিন্তু গবেষণার এক পর্যায়ে আমরা ভয়াবহ কিছু বিষয় আবিষ্কার করে বসি। প্রথমত, এই বিষয়টার সাথে পৃথিবীর সবচেয়ে পুরনো কিছু রহস্যের সংযোগ আছে। দ্বিতীয়ত, এর সাথে অত্যন্ত বড়ো রকমের শক্তির ভারসাম্যের বিষয় জড়িয়ে আছে। শুধু ভারতবর্ষ বা বাংলাদেশ নয়, এর ক্ষেত্র আরও বড়ো। আর তাই আমরা গবেষণার এক পর্যায়ে গোটা ব্যাপারটার ব্যপ্তি অনুভব করে ঘাবড়ে যাই এবং একটা পর্যায়ে আমরা অনেক বিষয় কাল্টের কাছে লুকাতে থাকি। আমরা জানতাম ওরা একটা সময় এই বিষয়গুলো টের পাবেই। আর তাই ইলা, আমি আর আবদেল-আমরা তিনজনেই আগে থেকে ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে থাকি। সমাজের কাছে এমন একটা চিত্র দেখাই যে ইলার সাথে আমার সম্পর্ক খারাপ, পৃথার সাথে আমার সম্পর্ক খারাপ। আমরা আলাদা হয়ে যাই সবার নিরাপত্তাও এর পেছনে একটা কারণ ছিল। ওপরে ওপরে আলাদা হলেও আমরা ভেতরে যোগাযোগ রাখতাম এবং গবেষণা চালিয়ে যেতে থাকি। কিন্তু একটা পর্যায়ে আর হচ্ছিল না। এমন সময় হঠাৎ করে ইলা অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং ও’ প্রফেসর থেমে দীর্ঘ নিশ্বাস ছাড়লেন। ‘-ওর মৃত্যুর পর আমরা বুঝতে পারি যে আর হবে না। আমরা বাংলাদেশ সরকারের সহায়তা চাই। তারা উলটো আচরণ করে। এমন সময় নেক্রপলিসের বড়ো কর্মকর্তা অনেক বড়ো অফার নিয়ে আসে। আমাদের অবস্থা তখন এমন কাল্টের হাত থেকে বাঁচতে যা খুশি তাই করতে রাজি। কিন্তু এটা বুঝতে পারিনি যে, এরা আরও বড়ো দানব। অল্প সময়ের ভেতরে সেটা অনুধাবন করেই আমরা আড়াল নিয়ে ফেলি। কমলাপুরে যা ঘটে তো ঘটেই এরপর আবদেল পালিয়ে যায়, আমি চলে আসি পৃথার এখানে। আগে থেকেই আমি জানতাম এমন কিছু হতে পারে তাই সেভাবেই সব গোছানো ছিল। সবাই পৃথার ওপর নজরদারি করে কিন্তু আমি এতটা কাছাকাছি আছি কেউ ভাবতেও পারেনি খুবই সাবধানতা অবলম্বন করতাম আমরা। কিন্তু আবদেলের মৃত্যুর পর সব ভেঙে পড়ে। আমি জানতাম এবার আর রক্ষা হবে না। আর সেই সময়েই আপনি, ইন্সপেক্টর বাশার সেই ফাঁদের পরিকল্পনা করো আর আমি দেখতে পাই বিরাট একটা সুযোগ। ইলা আমার সাথে সেপারেট হবার পর নিজে বেশ কিছু জিনিস নিজের মতো করে লুকিয়ে রেখেছিল। ও নিজে খুব বড় ধরনের কিছু একটা আবিষ্কার করেছিলো ইনক্লুডিং সেই ট্রেজার, যেটা আপনারা উদ্ধার করেছেন। আমরা সেপারেট হবার পর ও সেই মসলিনের কাপড়ে ম্যাপ করে সেটাকে লকেটে ভরে পৃথাকে পাঠিয়ে যায়। কিন্তু আমাদেও কাছ পর্যন্ত পৌঁছাতে দেরি হয়ে যায়। আমরা যখন ওটা পাই ততোদিনে আমি এখানে লুকিয়ে পড়েছি। কাজেই ইলা আসলে কি আবিষ্কার করে কী লুকিয়ে রেখেছিলো সেগুলোর সন্ধান আমিও বের করতে পারিনি। পৃথার একার পক্ষে সেটা সম্ভব ছিলো না। তুমি ফাঁদটা পাতার পর আমি বেশ কয়েকটা সম্ভাবনা দেখতে পাই। এক, ইলা যা লুকিয়ে রেখেছে সেগুলো উদ্ধার করার। দুই নেত্রপলিসের রাঘব বোয়ালদেরও সামনে নিয়ে আসার এবং তিন, কাল্টের হোতাদের পাকড়াও করার। আর পুরো কাজটা অনেকটা কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার মতো করে সাজাই আমি।’
বাশার মাথা নাড়ল। ‘আপনি জানতেন ওরা কেউই এই সুযোগ ছাড়বে না। আপনি চান্স কাজে লাগান। কিন্তু ভয়াবহ ঝুঁকি ছিল—’
বাশারের কথা শুনে হেসে উঠলেন প্রফেসর। ‘কিন্তু কাজ তো হয়েছে।’
প্রফেসর ইফতেখার এখানে আসার আগে আমার বসের সাথে আমার কথা হয়েছে, আপনি আজ থেকে কত বছর আগে যে-সাহায্য সরকারের কাছে চেয়েছিলেন এবং বোকার মতো অথরিটি সেটা ডিক্লাইন করে আমার স্পেশাল ফোর্স থেকে সেটা দিব আপনাকে। বিনিময়ে আমাদেরকে এই রহস্যের গোড়ায় পৌঁছাতে হবে। এই কাল্ট, নেক্রপলিস, রেলিক-এদেরকে ধরতে হবে, কাজেই আপনি আমাদেরকে এই বিষয়ে সহায়তা করবেন। প্রয়োজনে প্রফেসর হামিদ আপনাকে সাহায্য করবেন। আমাদের হাতে বেশ কিছু অমীমাংসিত রহস্য রয়েছে আপনি সেগুলোর সমাধান করতে আমাদের সহায়তা করবেন। বিনিময়ে আপনার বিরুদ্ধে সব চার্জ তুলে নেওয়া হবে, আপনি এবং পৃথাকে সব ধরনের প্রটেকশন দেওয়া হবে। বলুন আপনার মতামত কী?’
প্রফেসর হেসে উঠলেন, ‘ডু আই হ্যাভ আ চয়েস?’ বলে তিনি একবার পৃথার দিকে দেখে নিয়ে মাথা নেড়ে বললেন, ‘আমি রাজি।’
‘প্রথম প্রশ্ন, রাজদ্রোহীর রহস্য আসলে কি, চট্টগ্রাম থেকে যে চিপ আমাদের এজেন্ট উদ্ধার করেছে সেটার কোড কী? আর কিশোরগঞ্জ থেকে আমরা যা পেয়েছি সেগুলো আসলে কী এবং কোথা থেকে এলো? সবচেয়ে বড়ো কথা, ওই ট্রেজার বক্সের ওই পাথর যেটার জন্যে কালো কোট মাস্টার জেড আর কাল্টের মুখোশধারীরা অস্থির হয়ে উঠেছিল এগুলো আসলে কী?’
‘একটা প্রশ্ন বলে অনেক কথা জিজ্ঞেস করে ফেললেন, ইন্সপেক্টর। প্রথম কথা সব জবাব এখানে দেওয়া যাবে না। আপনি নিজেও জানেন না কীসের ভেতরে এসে পড়েছেন। কাজেই সবার অগে আমি হাই প্রটেকশন চাই। আমি লিখিত অ্যাগ্রিমেন্ট করতে চাই অথরিটির সাথে এরপর আমি কথা বলবো।’
‘ঠিক আছে, আপনার কথায় যুক্তি আছে। কিন্তু আমরা কীভাবে বুঝবো, আপনি আসলে এসবের জবাব জানেন?
‘আপনাদের কাছে চট্টগ্রামের সেই চিপের ফরম্যাট আছে?’
‘জি, আমি জানতাম আপনি ওটা চাইবেন,’ বলে বাশার টমির দিকে ইশারা করল। ‘শুধু এটুক বলি আপাতত। রাজদ্রোহীর যে রহস্যের কথা বলেছেন, সেটা আজ থেকে কয়েকশো বছর আগে বারো ভূঁইয়াদের সাথে সংশ্লিষ্ট একটা ঘটনার পর ঈশা খাঁর পরবর্তী যুগে পারস্য থেকে আসা একদল যোদ্ধার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল একটা কাল্ট। ওরা আজ থেকে কয়েক হাজার বছর আগের এক রহস্যকে লালন করে রেখেছে। তবে এই রহস্য বা শক্তি শুধু ওদের নয়, এটা পুরো পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো রহস্যগুলোর একটা, মিস্টার বাশার,’ বলে সে টমির ল্যাপটপে সেই চিপের ফরম্যাটে কিছু টাইপ করল বাশার দেখল ল্যাপটপের স্ক্রিনে সেই চিপের ফাইলগুলো একটা একটা করে খুলতে শুরু করেছে।
‘আজকে আপনারা, সেই পুকুরের নিচ থেকে যা উদ্ধার করেছেন, তার ভেতরের সেই পাথরটা তারই একটা অংশমাত্র। আপনাদেও টুইন কালী, বুদ্ধ মূর্তি, শাহ সুজার হারানো সম্পদ, রাজদ্রোহী শুধু নয় ইতিহাসের আরও অনেক ঘটনার সাথে এর সংযোগ আছে। পুরো ব্যাপারটা বুঝতে হলে আপনাদেরকে শুধু রাজদ্রোহী নয়, এক সিপাহী এবং অশ্বারোহীর গল্পও বুঝতে হবে।’
‘এক মিনিট, আপনার কোড কাজ করছে এবং এটা প্রমাণিত যে আপনার কাছে অনেক মূল্যবান তথ্য আছে কিন্তু আপনি তো কাহিনি টেনেই চলেছেন। কীসব বলছেন, কালী, বুদ্ধ, সিপাহী, অশ্বারোহী—এসব কী?’ বাশার বিরক্ত হয়ে বলে উঠল
ওর কথা শুনে হেসে উঠল প্রফেসর। ‘মিস্টার বাশার, আমরা এমন এক রহস্য নিয়ে ডিল করছি ইতিহাসের পাতায় যাকে—’
প্রফেসর তা কথা শেষ করতে পারল না তার আগেই একজন গার্ড দৌড়ে এলো। ‘বাশার স্যার,’ বাশার চূড়ান্ত বিরক্তি নিয়ে ফিরে তাকাল তার দিকে। ‘কী বলো?’
স্যার নিচে আনোয়ার পাশা স্যার এসেছেন, উনি এক্ষুণি আপনাকে যেতে বলেছেন। ইমার্জেন্সি।
বাশার একবার তাকে দেখল তারপর প্রফেসরকে সোহেলের জিম্মায় রেখে চলে এলো ভবনের নিচে। সেখানে গাড়িতে বসে আছে পিবিআইয়ের স্পেশাল উইংয়ের প্রধান হাবিব আনোয়ার পাশা এবং সাথে মৌসুমি।
‘কংগ্রাচুলেসন্স, যদিও কথাটা আনন্দের কিন্তু আনোয়ার পাশা আর মৌসুমি দুজনেই মুখ ভার করে বসে আছে।
‘কী ব্যাপার স্যার, কিছু হয়েছে?’ বাশার চিন্তিত মুখে জানতে চাইল। আমি আসলে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা আলোচনা—’
‘বাশার, রিফাত মজুমদার তোমার কী হয়?’ আনোয়ার পাশার প্রশ্নটা শুনে ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেল বাশার।
‘ইয়ে মানে, ও আমার গার্লফ্রেন্ড–ফিয়ান্সেও বলতে পারেন স্যার–কেন মানে-’
‘বাশার, ব্যাড নিউজ আছে,’ আনোয়ার পাশা ভার মুখেই বলে উঠল। ‘তুমি মাস্টার জেডকে গ্রেপ্তার করার পরেই একাধিক মহলে খুব জোর আলোড়ন তৈরি হয়েছে। আজ সন্ধ্যায় তোমরা কিশোরগঞ্জ ছাড়ার পরেই ময়মনসিংহে একটা ঘটনা ঘটে।’
‘শুধু ময়মনসিংহেই নয়, সিলেট এবং চট্টগ্রামেও,’ এবার কথা বলে উঠল মৌসুমি।
বাশার বিস্তারিত কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই বাশারের মাথার ভেতরে ঘণ্টা বেজে উঠল, তারমানে প্রফেসর ইফতেখার বা অন্যরা যা বলেছে সেটাই সত্যি, ওরা যা ভাবছে গোটা ব্যাপারটা সম্ভবত তারচেয়েও অনেক বড়ো কিছু।
অনেক বেশি বড়ো কিছু।
***
