অধ্যায় চব্বিশ
বর্তমান সময়
বুড়িগঙ্গার পাড়, ঢাকা
‘আমরা কি নিশ্চিত ওরা আসলে আমাদেরকেই ধাওয়া করছে?’ পৃথার চোখ দুটো ভয়ে বড়ো বড়ো হয়ে গেছে। বারবার সে পেছনে ফিরে বোঝার চেষ্টা করছে? কী হচ্ছে আসলে ওখানে। তবে শুধু পৃথাকে দোষ দিয়ে লাভ কী? আসলে সবাই ঘাবড়ে গেছে বেশ ভালোভাবেই। স্বাভাবিক, সন্ধে থেকে একের-পর-এক যেভাবে ঘটনা ঘটেই চলেছে তাতে মাথা খারাপের জোগাড় হবারই কথা। প্ৰথমে মোহাম্মদপুরে পৃথাকে অপহরণের চেষ্টা, তারপর পুরনো ঢাকায় কবরস্থান থেকে ব্লু আবিষ্কার এবং আবিষ্কার সাথে সাথে ওদের ওপরে আক্রমণ, আর সেখান থেকে কোনোমতে পালানোতে সফল হবার পরও অনুসরণ করতে শুরু করেছে একাধিক গাড়ি।
‘আপনার কি মনে হয় পেছনে যে গাড়িটা আসছে সেটা অকারণেই আমাদের পেছনে পেছনে আসছে?’ কথাটা চৌধুরী বলে উঠল। তার নজর সামনের রাস্তাতে। রাতের ঢাকা হবার কারণে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি গতিতে গাড়ি ছুটছে কিন্তু পেছনের গাড়িটা ওদের চেয়ে বেশি দ্রুত গতিতে এগিয়ে আসছে। দেখলেই বোঝা যাচ্ছে কোনোকিছুরই পরোয়া করছে না ওরা। ‘অবশ্যই ওরা আমাদেরকে অনুসরণ করছে। কিন্তু আমি বুঝতে পারছি না চার্চের ওখানে যে-গাড়ি দুটো আমাদের পথ রোধ করেছিল ও দুটোকে যেভাবে আঘাত করা হয়েছে তাতে ও দুটোর এভাবে এত দ্রুত আমাদের পিছু নিতে পারার কথা না।
যারাই আমাদের ওপরে আক্রমণ করছে ওদের দুটো গাড়িই থাকবে এমন তো কোনো কথা নেই, ওদের আরেকটা গাড়িও হতে পারে,’ সোহেল বলে উঠল। বাশার দেখল তার চেহারা সাদা হয়ে গেছে; নিশ্চিত সে আইনপ্রয়গকারী সংস্থার লোক হলেও এরকম অভিজ্ঞতা তার এবারই প্রথম। ‘বস, আমরা ফোর্সে কেন খবর দিচ্ছি না?’
‘কিংবা কোনো পুলিশ চৌকিতে গিয়ে পৌঁছালেই তো হয়,’ পৃথার গলার আওয়াজ বাড়তে বাড়তে সেটা প্রায় চিৎকারের পর্যায়ে যেতে শুরু করেছে। বাশার দেখল চৌধুরী ওদের গাড়ির গতি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ওদের বাঁয়ে বুড়িগঙ্গা নদী, সেটার পাশ দিয়ে লম্বা রাস্তাটা ধরে গড়ি প্রায় ঝড়ের বেগে এগোতে শুরু করেছে। বাশার ঠিক মনে করতে পারল না এই এলাকাতে সে আগে এসেছে কি না এবং ওরা আসলে আদৌ কোনোদিকে যাচ্ছে।
‘আমরা এদিকে এলামই বা কেন? আমাদের তো উচিত ছিল কোনো একটা পাবলিক প্লেসে চলে যাওয়া কিংবা কোনো পুলিশ পোস্ট বা এরকম কোথাও যাওয়া,’ সোহেলই আবারও বলে উঠল। চৌধুরী জিপের গতি বাড়িয়ে দেওয়াতে সে এখন ড্রাইভারের পাশের সিটে রীতিমতো চেপে বসে আছে।
‘সেটা আরও বড়ো ভুল হতো, যারা আমাদেরকে আক্রমণ করেছে, তারা যদি প্রায় পাবলিক প্লেসের কাছাকাছি জায়গাতে আমাদেরকে আক্রমণ করতে পারে তবে আপনাদের কীভাবে মনে হয় যে পাবলিক প্লেসে গেলেই আমরা নিরাপদ হয়ে যেতাম? আপনাদের ভালোর জন্যে আরেকটা কথা বলি, এমনকি পুলিশ পোস্টে গেলেও লাভ হবে না, এরা যা মন চায় করবেই,’ বলে সে একবার পেছনে ওদের দিকে দেখে নিলো। ট্রাস্ট মি, এদের সাথে আমার মোলাকাত এবারই প্রথম নয়।’
‘আপনি প্লিজ সামনে দেখুন,’ বাশার কথাটা শেষ করার আগেই ওদের গাড়ির পেছনের কাচ ঝুর ঝুর করে ভেঙে পড়ল সেই সাথে ঠন করে শব্দ হলো কোথাও।
‘শিট! ওরা গুলি করছে,’ বাশার সিটের নিচে নিচু হতে হতে আপনাতেই বলে উঠল। ‘সবাই সাবধান।’
‘বলেছিলাম না,’ চৌধুরীর গলা শুনে মনে হচ্ছে ওরা গুলি করাতে সে একরকম খুশি হয়েছে। ‘সবাই সাবধান, সে কথাটা বলে শেষ করার আগেই জোরে জোরে গাড়ির স্টিয়ারিং ঘোরালো এবং সাথে সাথে ওরা বলতে গেলে গাড়ির একদিক থেকে গড়িয়ে সরে গেল আরেক দিকে। বাশারের হাত থেকে ছুটে গেল পিস্তলটা, ও গিয়ে গড়িয়ে পড়েছে পৃথার ওপরে।
‘এই লোকটা আসলেই পাগল,’ নিজেকে কোনোমতে মেয়েটার ওপর থেকে সরিয়ে আনতে আনতে বাশার শুনতে পেল বিড়বিড় করে গাল বকে উঠল পৃথা। সিটের নিচে হাতড়ে নিজের পিস্তলটা খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে বাশার, সামনে থেকে আবারও বলতে গেলে প্রায় আঁতকে উঠল সোহেল। ‘বস, কিছু একটা করো।’
বাশার পিস্তলটা হাতের নাগালে পেয়ে চেপে ধরার আগেই আবারও গাড়ি ঘোরালো চৌধুরী এবং পিস্তলটা আবারও ওর হাত থেকে ছুটে গেল। সেই সাথে সে অনুভব করতে পারল ঠুনঠুন করে আবারও শব্দ হলো। মানে আবারও গুলি করেছে পেছনের গাড়ি থেকে
‘এরা তো দেখি যুদ্ধ শুরু করে দিলো,’ সামনে থেকে সোহেল চিৎকার করে উঠল। বাশার সিটের নিচ হাতড়ে পিস্তলটা পেয়ে এবার চট করে ধরে ফেলল ওটা। ‘ডেসপারেট টাইম ডেসপারেট মেজার,’ বলেই সে কোনোমতে সোজা হয়ে পিস্তল তুলল গাড়ির পেছনের জানালার ভাঙা কাচের এপাশ থেকে, কিন্তু গুলি করতে যাবে তার আগেই দেখতে পেল পেছনের গাড়িটা একেবারে ওদের গায়ের ওপরে উঠে পড়েছে। বাশারও পিস্তল তুলল পেছনের গাড়িটা সর্বশক্তি দিয়ে এসে বাড়ি মারল ওদের গাড়ির বাম্পারে। গুলি করার আগেই ব্যালেন্স হারিয়ে বাশার সরে গেল একপাশে। ওর পিস্তল থেকে গুলি বের হতে হতেও কোনোমতে নিজেকে সামলে নিলো বাশার, তা না হলে ওর পিস্তলের গুলি গাড়ির ভেতরে কারও গায়ে লাগার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু গুলি সামলাতে গিয়ে নিজেকে সে সামলাতে পারল না, তার আগেই তীব্র ধাক্কার চোটে পেছনের সিট থেকে গিয়ে বাড়ি খেল সামনের সিটে। নিজেকে সামলে নিয়ে সোজা হতেই যা দেখল তাকে আতঙ্কের চোটে বাশারের মুখ হাঁ হয়ে গেল। সেই সাথে অনুভব করতে পারল গাড়িটা পুরোপুরি ব্যালেন্স হারিয়ে রাস্তার একপাশের খাদের দিকে ছুটে চলেছে।
চট করে সামনের দিকে তাকিয়ে দেখতে পেল-চৌধুরী নিজেকে সামলে প্রাণপণে চেষ্টা করছে হুইল সামলানোর। কিন্তু গাড়িটার নাক সোজা হবার বদলে ক্রমাগত পিছলেই চলেছে সামনের রাস্তার একপাশের দিকে
‘চৌধুরী, সাবধান,’ বাশার চিৎকার করে উঠল। কারণ পেছনের গাড়িটা আবারও ছুটে আসছে। এবার ধাক্কা দিলে আর দেখতে হবে না পুরোপুরিই ওটা ছিটকে পড়বে রাস্তার পাশের খাদে, আর পেছনের গাড়িটারও সেটাই উদ্দেশ্য। বাশার আবারও পিস্তল তুলল, পেছনের গাড়িটা চলে এসেছে বলতে গেলে প্রায় নাগালের ভেতরে, একসাথে ঘটে গেল বেশ কয়েকটা ঘটনা।
বাশার পিস্তল তুলল। ও গুলি করার আগেই পেছনের গাড়িটা এসে বাড়ি মারতে উদ্যত হলো পেছনের বাম্পারে কিন্তু, ওটা পুরোপুরি আঘাত করার আগেই চৌধুরী হুইলের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতেই ওটাকে রাস্তার বাঁদিক থেকে ঘুরিয়ে ফেলল ডানে। ফলে গাড়িটা ওদের গাড়িকে আঘাত করতে গিয়েও অল্পের জন্যে মিস করল। কিন্তু আবারও ওরা নিজেদের শরীরের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গড়িয়ে গেল একদিকে। এবার বাঁ থেকে ডানে।
দাঁতে দাঁত চেপে নিজেকে পিস্তলটা কোমরে আটকে সিটের কোনা চেপে নিজেকে সোজা করল বাশার। বারবার এভাবে ফসকাতে ফসকাতে নিজের ওপরে জিদ চেপে বসেছে ওর। এভাবে খোলা থাকলে আবারও শরীরের ভারসাম্য হারাবে কাজেই একহাতে সিটের কোনা চেপে ধরল, তারপর নিজের আরেকটা পা ঠেকাল পেছনের দিকে, সামনের সিটের গোড়াতে, সেই সাথে ডান হাতে কোমর থেকে বের করে আনল পিস্তলটা। এবার সামনের গাড়িটা ওদের জন্যে সুবিধা করে দিলো। আবারও ওদের গাড়িকে আঘাত করার জন্যে এগিয়ে এসেছিল ওটা। বাশার সোজা গুলি করল গাড়িটা লক্ষ্য করে। তিন রাউন্ড গুলি করেই নিচু হয়ে গেল ও। কারণ এরকম খোলা জানালা দিয়ে ওর শরীরের পুরোটাই দেখতে পাবার কথা পেছনের গাড়িটা থেকে।
এক দুই তিন, গুনেই আবারও সোজা হলো ও। সাথে সাথে বেশ কয়েকটা জিনিস ধরা পড়ল ওর চোখে। গাড়ির একপাশের জানালার কাচ ভেঙে গেছে, একটা সাইড মিরর ভেঙেছে, কিন্তু গাড়িটার কোনো ভাইটাল পয়েন্টে গুলি লাগাতে পারেনি ও। আবারও গুলি করতে যাবে তার আগেই টানা প্রায় ব্রাশ ফায়ারের মতো গুলি এসে লাগল ওদের গাড়ির এখানে ওখানে। সাথে সাথে মাথা নিচু করে ফেলল বাশার।
কিন্তু বাশার খুব ভালোভাবেই অনুধাবন করতে পারছে, এই ধাওয়াটা এখন ভয়াবহ ঝুঁকির দিকে যাচ্ছে। যেকোনো সময়ে যেকারও গায়ে গুলি লাগতে পারে, যেকোনো সময় পেছনের গাড়ির ধাক্কায় ওদের গাড়িটাও ছিটকে পড়তে পারে মূল রাস্তা থেকে পাশের খাদে।
আবার দুই রাউন্ড গুলি হলো। সামনের সিট থেকে সোহেল আর চৌধুরী দুজনেই চিৎকার করতে শুরু করেছে। ‘বস, কিছু একটা করো,’ পরিষ্কার শুনতে পেল বাশার। ওর পাশের সিট থেকে চিৎকার করছে পৃথা। মুহূর্তের জন্যে বাশারের মনে হলো ওর মাথা শূন্য হয়ে গেল, তারপর ও বুঝতে পারল আসলেই এই মুহূর্তে কিছু করতে না পারলে আর করার সুযোগই পাবে না। চট করে মাথা তুলে খোলা জানালা দিয়ে পেছনের গাড়িটার দিকে নিজের পিস্তলের অবশিষ্ট প্রায় সবকটা রাউন্ড সে খালি করে দিলো। সাথে সাথেই আবারও নিচু হয়ে গেল ও চট করে। বাশার ভালো করেই জানে আসেলে ওদের চেয়ে পেছনের গাড়ির পাওয়ার এবং ওদের অস্ত্র আরও শক্তিশালী, কাজেই ওদেরকে ঠেকাতে হলে একটাই উপায় আছে। নিজের পকেটে হাত দিয়ে জিনিসটা চেপে ধরল ও। ওরা যা নেওয়ার জন্যে এসেছে সেটা দিয়ে দিতে হবে বাঁচতে হলে। ‘সোহেল, তুই কি পেছনে গুলি করতে পারবি, আমাকে কভার করার জন্যে?’
‘জি, বস। চেষ্টা করবো,’ সামনে থেকে সোহেল বলে উঠল।
‘আমি দশ গুনলেই তোর পাশের জানালা দিয়ে কভার ফায়ার করবি। এক, দুই তিন,’ বাশার গুনতে গুনতেই পকেট থেকে জিনিসটা বের করে আনল। মুহূর্তের জন্যে পৃথার দিকে চোখ পড়ল ওর। যে-মুহূর্তে পৃথা অনুধাবন করতে পারল বাশার আসলে কী করতে যাচ্ছে, মাথা নাড়তে নাড়তে জোরে চিৎকার করে উঠল ও, ‘নো,’ কিন্তু ততক্ষণে বাশারের দশ গোনা শেষ। সোহেল নিজের একটা হাত বের করে কভার ফায়ার করতে শুরু করেছে। বাশার সোজা হয়ে নিজের শরীরটাকে অনেকখানি বের করে আনল খোলা জানালা দিয়ে। ভয়াবহ একটা ঝুঁকি নিতে যাচ্ছে ও। কারণ যেকোনো সময় গুলি ছুটে আসতে পারে।
শরীরটাকে বের করে এনেই হাতে ধরে ঘোরাতে শুরু করল চেইনটা। বাশার জানে পেছনের গাড়ি থেকে ঠিকই দেখতে পাচ্ছে। যেকোনো সময়ে গুলি করতে পারে কিন্তু যেই মুহূর্তে সে চেইনটা ঘোরাতে শুরু করেছে সে সম্ভাবনা কমে গেল। বাশার চেইনটাকে দুই তিন পাক খাইয়ে ঘুরিয়ে ছুড়ে মারল রাস্তার পাশের দিকে। সাথে সাথে অনুভব করতে পারল সোহেলের গুলি থেমে গেছে। গাড়ির পেছনের সিটটা ধরে নিজেকে নিয়ে এলো ভেতরে। বড়ো বড়ো করে কয়েকবার নিশ্বাস নিতে লাগল ও। তারপর চট করে মুখ তুলে দেখল পেছনের গাড়িটা থেমে গেছে রাস্তার পাশে। চৌধুরী গাড়ির গতি বাড়িয়ে দিতেই দ্রুত ছোটো হয়ে আসতে লাগল পেছনের গাড়িটা।
স্বস্তির নিশ্বাসের সাথে সিটে হেলান দিলে বাশার, আর সাথে সাথে ওর ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল পৃথা।
