অধ্যায় চৌত্রিশ
অতীত
জঙ্গলবাড়ি দুর্গ
যদিও বন্দি এবং ওদেরকে আটকে রাখা হয়েছে দুর্গ প্রাঙ্গণের একপাশে, তবুও কোনো ধরনের অপমান করা হয়নি কিংবা তাদেরকে কোনো ধরনের আঘাত করা কিংবা যন্ত্রণা দেওয়া হয়নি। মাসুম রাগের সাথে শুধু নুক্কুনের দিকেই তাকাচ্ছে বারবার। গেড়ুয়া কিংবা তার বাহিনীর ওপরে ওর কোনো রাগ নেই। ওরা ওদের কাজ করেছে এবং গেড়ুয়ার মতো একটা ছেলে ওকে বুদ্ধির খেলায় হারিয়ে দিয়েছে এটা নিয়েও ওর কোনো রাগ নেই, কিন্তু ওর রাগ হচ্ছে নুক্কুনের ওপরে। বিগত কয়েকদিনের অভিজ্ঞতায় ও যাকে ভাই ভেবেছিল, যে-লোকটা একাধিকবার ওকে প্রাণে বাঁচিয়েছে। যার পরিবারের নিরাপত্তার কথা ও নিজের দলের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে ভেবেছিল, সেই লোকটা কি না ওকে এভাবে ধোঁকা দিলো!
ওদেরকে বন্দি করার সাথে সাথে যখন ওরা বুঝতে পারল যে পুরো ব্যাপারটাই নুক্কুন ইচ্ছে করে ঘটিয়েছে, ধোবল চিৎকার করে ওকে গালি দিয়েছে, সুলতান একবার ওকে মারার জন্যে তেড়ে গিয়েছিল কিন্তু পুরোপুরি শান্ত ছিল স্রেফ তিনজন মানুষ।
ওদের দলের সাথে থাকা সুবাদারের স্ত্রী মেহের। মেহের প্রথম থেকেই বেশি কথা বলেনি, এইবার আরও বলেনি। ধরা পড়ার আগে থেকেই বলতে গেলে চুপ, ধরা পড়ার থেকে বলতে গেলে আরও চুপ হয়ে গেছে সে। কিন্তু রায়েলি আর মাসুম একেবারেই কিছু বলেনি ধরা পড়ার পর থেকে। রায়েলি শুধু দুবার মাসুমের দিকে দেখেছে, সে এমনকি নুক্কুন কিংবা গেড়ুয়াদের দিকে দেখেওনি। কিন্তু মাসুম বারবার রাগের সাথে তাকাচ্ছে নুক্কুনের দিকে। কিন্তু যতবার সে মানুষটার দিকে তাকাচ্ছে ততবারই দ্বিধার একটা পর্দা বারবার ভারী হয়ে জড়িয়ে ধরছে ওকে। ওরা ধরা পড়ার পর থেকে নুক্কন দুর্গের প্রাঙ্গণের এক কোণে এমনভাবে জবুথুবু হয়ে মাথা নিচু করে বসেছে যে একবারের জন্যেও সে নিজের মাথা কিংবা মুখ ওপরে তোলেনি। মাসুম যতবার লোকটার দিকে তাকাচ্ছে একটাই প্রশ্ন ওর মনের ভেতর থেকে দানা বেঁধে উঠেছে, কেন লোকটা এরকম করল। ‘কেন, নুক্কুন?’ আর থাকতে না পেরে প্রশ্নটা মাসুমের মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল। কোনোরকমের রাগ নয়, ঘৃণা নয়, একেবারেই শান্ত সুরে জিজ্ঞেস করা নিখাদ কৌতূহলে জর্জরিত একটা প্রশ্ন। মাসুম কথাটা জিজ্ঞেস করার সাথে সাথে নুক্কুন এই প্রথমবারের মতো মুখ তুলে তাকাল ওর দিকে। মাসুম দেখল আধ পাগল শুকনো লোকটার লাল চোখ দুটো অশ্রুতে ভরে আছে। কোনো ধরনের প্রতিউত্তর নয়, কোনো ধরনের ব্যাখ্যা নয়, স্রেফ একটা চাহনি। মাসুম খুব অবাক হয়ে অনুভব করল নুক্কুনের চোখের দিকে তাকিয়ে ওর মনে কোনো রাগ বা ঘৃণাবোধ নয়, বরং এক ধরনের সহানুভূতি অনুভব করতে লাগল। কিন্তু ওকে জানতে হবে নুক্কুন কেন এমনটা করল।
‘কারণডা কী, নুক্কুন?’
‘হুজুর, আমি বলতাছি কারণডা কী,’ হঠাৎই আসরের মাঝখান থেকে উঠে দাঁড়াল গেড়ুয়া। ওদেরকে বন্দি করে রেখে ওরা গোল হয়ে বসেছে প্রাঙ্গণের ঠিক মাঝখানে। গোল বৃত্তটার মাঝে একজন পুরোহিত গোছের মানুষ মন্ত্র পড়ে কিছু একটার যজ্ঞ করছে, আর বাকিরা গোল হয়ে বসতেই হাতে হাতে ঘুরতে শুরু করেছে ধোঁয়া ভরা বাঁশি। বাঁশিতে কড়া একটা টান দিয়ে কথাগুলো বলতে বলতে উঠে দাঁড়াল গেড়ুয়া। মাসুম দেখতে পেল লোকটার চোখে মুখে খুশি যেন উপচে পড়ছে। ‘হুজুর, তুমি যোদ্ধা,’ বলে সে মাসুমদের সামনে এসে একেবারে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। ‘তোমার আবেগ, তোমার শক্তি চলে একটা নির্দিষ্ট রাস্তায়,’ মাসুম আগেও খেয়াল করেছে সাধারণ এক ডাকাত কিংবা পাঙ্গু হিসেবে গেড়ুয়ার কথাবার্তা অনেক চমৎকার এবং খুব শান্ত। ‘কিন্তু সবার তো সেইটা না, আমার কোনোদিনই সেরকম কোনো পরিবার ছিল না,’ বলে সে নিজের লোকদের দিকে দেখাল। ‘এইহানে যাগো দেখতাছ এরাই আমার পরিবার। আর আমার দেবীই হইল আমার পিতা-মাতা ঈশ্বর,’ বলে সে ভক্তিতে নিজের মাথা নিচু করে দুই হাত তুলল নিজের মুখের সামনে। তারপর নিজের টকটকে লাল দুই চোখ তুলে মাসুমের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, ‘আর এই কারণেই আমার মানুষগুলা বাদে আমার আর কোনো দুর্বলতা নাই। কিন্তু আমি দেখছি, মানুষ তার পরিবারের জন্যে কী করতে পারে। তুমি বিশ্বাস করতে পারবা না হুজুর, পরিবারের দোহাই দিয়া মানুষরে দিয়া কী করানি সম্ভব,’ বলে সে নিজের মতো হেসে উঠল।
আমার এই পাঙ্গু দলের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেইকা আমার একটাই নিয়ত ছিল আমার এই দল আর দেবীর জন্যে বড়ো কিছু করা। অনেক বিরাট কিছু। তারপর নিজের দলরে থিতু কইরা আরও বড়ো আরও বিরাট এক পাঙ্গু দল গইড়া তোলা। আর আমি জানতাম এইটা ছোটো ছোটো ব্যবসায়ী আর সাধারণ মানুষ মাইরা সম্ভব না। আর এই কারণেই এই বাঙাল মুলুকে পা রাখছিলাম আমি। আর যেই সুযোগটা খুঁজতেছিলাম সেইটা আমার হাতের নাগালে চইলা আসল যখন জানতে পারলাম মোঘলগোর লগে যুদ্ধে এই এলাকার সবচেয়ে বড়ো সুবাদারের স্ত্রী অনেক ধনসম্পদ নিয়া পলাইছে। আমি জানতাম আমি যা করতে চাইতেছি এইটা এহনি করতে হবে। কিন্তু আমার মতো ছোটো একটা মানুষ কিছু করার আগেই সব গুলায়া গেল। মোঘল, বিশা ডাকাইত থেইকা শুরু কইরা সবাই হেগো পিছে লাগল, যেইখানে আমার মতো মানুষের কোনো পাত্তাই ছিল না। আমি যখন দিশাহারা, ঠিক তখনই আমার সামনে সেই উত্তরটা চইলা আসল, জানতে পারলাম মসনদে আলা ঈশা খাঁ নিজের খাস লোক পাঠাইতাছে সুবাদারের স্ত্রীরে খুঁইজা বাইর করার লাইগা, আমি, জানতাম যেইটা আমি করতে পারবো না, এইটা তোমার মতো লোকেই করতে পারবো। কিন্তু তোমার সাথে-’
‘আমার সাথে তোমার নিজের ভিড়া সম্ভব ছিল না, কারণ আমি বুইঝা ফালাইতাম, আর এই কারণেই ছোটো একটা নাটক কইরা তুমি নুক্কুনরে ভিড়ায়া দিলো। ও কি তুমগো দলের লোক?’
হা-হা করে জোরে জোরে হেসে উঠল গেড়ুয়া। ‘হাসাইলা হুজুর, ও সাধারণ এক পাগল, যে-পাগলের মতো বন্দর বাজারে নিজের পরিবাররে খুঁইজা বেড়াইতেছিল। আমি খোঁজ নিয়া জানতে পারি হের পরিবার যুদ্ধ এলাকায় হারায়া গেছে বহু আগে। আর হেয় তাগোরে খুঁইজা বেড়াইতাছে। যে-মানুষটারে কেউই মানুষ মনে করে না। তারে কাছে ডাকলাম, তার পরিবারের দোহাই দিলাম এবং বললাম তার পরিবারের খোঁজ আমার কাছে আছে।’
‘–এবং তার পরিবারের দোহাই দিয়া তুমি তারে,’ মাসুম ফিরে তাকাল নুক্কুনের দিকে। লোকটা অবিশ্বাসের সাথে তাকিয়ে আছে গেড়ুয়ার দিকে। ‘তুমি নুক্কুনের মতো একটা মানুষের সাথে ধোঁকাবাজি করলা?’ মাসুম নিখাদ অবিশ্বাসের সাথে বলে উঠল।
‘হুজুর, আমি, তার সাথে ধোকাবাজি করি নাই, আমি তার দুর্বলতারে পুঁজি করছি স্রেফ,’ গেড়ুয়া খুব গম্ভীর ভঙ্গিতে বলে উঠল। ‘আমি তার সব হারানো জীবনটারে একটা গতি দিছি, আশা দিছি। হ এইটা স্বীকার করতে দ্বিধা নাই যে তারে আমি ব্যবহার করছি। কিন্তু প্রতিদিন যেখানেই তোমার মতো মানুষেরা আমগোর মতো মানুষগো নিত্যপ্রয়োজনে পশুর মতো ব্যবহার করো, সেইহানে আমি স্রেফ পথ হারা একটা মানুষরে পথের দিশা দেখায়া ব্যবহার করছি তাও দেবীর জন্যে।’
মাসুম নুক্কুনের দিকে দেখছে। গেড়ুয়ার কথা শুনতে শুনতে মানুষটা উন্মাদের মতো ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়িয়ে অবিশ্বাসের সাথে মাথা নাড়ছে, তার দুই চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রু।
‘আর এখন, এই মানুষটা যখন নিজের শেষ আশাটুকুও হারাইল এখন তুমি কী করবা?’ মাসুম গম্ভীর ভঙ্গিতে বলে উঠল। ও আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু তার আগেই নুক্কুন চিৎকার করে দৌড়ে আসতে শুরু করল গেড়ুয়ার দিকে। ‘আমার পরিবার, আমার বাচ্চারা-’
গেড়ুয়া নিজের দেহটা নিয়ে অস্বাভাবিক দ্রুততার সাথে উঠে দাঁড়াল। আগুয়ান নুক্কুনের গলা চেপে ধরে তার হালকা-পাতলা দেহটা স্রেফ পাটখড়ির মতো শূন্যে তুলে ফেলল। ‘তোর পরিবার বহুত আগেই শেষ হয়া গেছে। এইটা তোর পাগল মাথার ভিতরে ঢুকায় নে, তোর কপাল যে তোর মতো একটা মানুষ দেবীর কামে সহায়তা করছস,’ ক্ষণিকের জন্যে মাসুমের মনে হলো গেড়ুয়া হাত দিয়ে চেপে নুক্কুনকে মেরেই ফেলবে। কিন্তু তার আগেই রাগের সাথে ধমকে উঠল মাসুম। ‘ছাড় ওরে, ছাড় বলতাছি।’
গেড়ুয়া তাও ছাড়ল না নুক্কুনকে,’ তার টকটকে লাল চোখ দেখে মনে হচ্ছে আগুনের হলকা বেরোচ্ছে। আর নুক্কুনের চোখ দুটো মনে হচ্ছে টপ টপ করে খসে পড়বে গলার তীব্র চাপে। তাও সে নিজের পাটকাঠির মতো হাত দুটো দিয়ে গেডু য়াকে আঘাত করার চেষ্টা করছে। ‘ছাড় ওরে, আবারও সাবধান করতাছি।’
গেড়ুয়া নুক্কুনের গলার চাপ কমিয়ে তাকে ছেড়ে দিতেই মাটিতে পড়ে গেল নুক্কুন। গড়িয়ে দেওয়ালের একপাশে সরে গিয়ে জুবুথুবু হয়ে পড়ে রইল মাটিতে। কান্নার দমকের সাথে সাথে ফুলে ফুলে উঠতে লাগল তার পিঠ।
যথেষ্ট নাটক হইছে। এইবার বলো, আমগোরে বন্দি কইরা রাখছ কেন?’ অনেকক্ষণ পর ঝাঁঝাল রাগের সাথে বলে উঠল রায়েলি। ‘কী চাও তুমি?’
নিজেকে সামলে নিয়ে পোশাক টেনেটুনে ঠিক করে নিলো গেড়ুয়া, দুঃখিত হুজুর, বেগম সাহেবা,’ বলে সে রায়েলি আর সুবাদারের স্ত্রীর দিকে ফিরে সামান্য মাথা ঝাঁকাল। ‘হঠাৎ রাইগা গেছিলাম, দুঃখিত আমি।’
‘গেড়ুয়া, নাটক বাদ দিয়া কথা বলো—’ মাসুমও শান্ত সুরে বলে উঠল।
‘আমি সরাসরিই কথা কই, প্রথমে আমি ওইটা খুলব,’ বলে সেই বড়ো সিন্দুকটা দেখাল। ‘বহুত কষ্ট আর ঝামেলার পর এইটা আমগোর লাইগা দেবীর আশীর্বাদ,’ বলে সে আবারও নিজের দুই হাত জড় করল। ‘দেবী যেহেতু আমগো পরিশ্রমরে স্বীকার কইরা নিছে, কাজেই তুমগো জিনিস আমগো ভেট আর তুমরা দেবীর ভোগে যাবা। এতগুলা মানুষ, তাও যোদ্ধা, এতগুলা ভেট দেবীর সন্তুষ্টির জন্যে যথেষ্ট,’ বলে সে শোরগোল শোরগোল তুলতেই তার দলের লোকেরাও শোরগোল তুলল।
‘তার মানে তুমি সবাইরে হত্যা করবা?’ মাসুম বলে উঠল।
‘তোমার কোনো ধারণাই নাই তুমি কত বড়ো ভুল করতে যাইতেছ,’ রায়েলি আবারও শান্ত স্বরে বলে উঠল। ‘আসলে করতে যাইতেছ না, কইরা ফালাইছ,’ রায়েলির শান্ত স্বর শুনে সবাই তাকিয়ে আছে তার দিকে।
‘মেয়েমানুষের আব্রুর ভিতরে থাকা উচিত, অমি সম্মান করি তাই বইলা—’
‘তুমি আমগোরে ধইরা নিজের আর দলের বাকি সবার মৃত্যু ডাইকা আনছ, যেই মুহূর্তে তুমি ওই সিন্দুক খুলবা, তুমি শেষ।’
গেড়ুয়া আগেরবার রাগের সাথে ওদের দিকে তাকিয়েছিল, কিন্তু এবার যেন খানিকটা দ্বিধার সাথে ওদের দিকে দেখল। একবার সে মুখ খুলে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল; তার আগেই তার দলের একজন যে প্রাঙ্গণের ওপর প্রান্তে পাহারা দিচ্ছিল চিৎকার করে উঠল। তার চিৎকার শুনে সেদিকে ফিরে তাকাল সবাই। দৌড়ে সেদিকে এগিয়ে গেল গেড়ুয়া। তার দলের লোকেরাও শোরগোল করতে শুরু করেছে।
মাসুম চিৎকার করে জানতে চাইল হচ্ছেটা কী। গেড়ুয়ার দলেরই একজন উত্তেজনা আর ভয়ের সাথে বলে উঠল, ‘মোঘল আর ডাকাইতেরা পুরা খণ্ডর ঘিরা ফালাইছে।’
মাসুম কিছু বলার আগেই ওর পাশ থেকে ফিক করে হেসে উঠল রায়েলি। ‘বলছিলাম না, ওরা আমগোরে ধইরা নিজেগোর ধ্বংস ডাইকা আনছে,’ বলে সে ফিরে তাকাল মাসুমের দিকে। ‘সেই সাথে আমগোরও।’
.
বর্তমান
করিমগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ
প্রথম গাড়িটা নরসুন্দা নদীর ব্রিজ পার হয়ে ছোটো একটা বাজারের মতো এলাকায় প্রবেশ করতেই পাশের সিটে বসা লম্বা চুলের ছেলেটা ড্রাইভারের কাছে জানতে চাইল, ‘আমাদের কি একবার কাউকে জিজ্ঞেস করা উচিত ঠিক পথে যাচ্ছি কি না?’
ড্রাইভার লোকটা গাড়ির গতি কমালেও পুরোপুরি থামিয়ে দিলো না। বরং সে ছেলেটার দিকে একবার তাকিয়ে জানতে চাইল, ‘আপনের কম্পিউটার কি কয়, ঠিক পথে আছি নাকি?’ প্রশ্নটার ভেতরে এমন একটা সহজাত টিটকারির ভঙ্গি ছিল পেছনের সিটে বাশারের পাশে বসা কালো পোশাক ফিক করে হেসে ফেলল।
না, মানে ইয়ে,’ ছেলেটা আমতা আমতা করছে দেখে ড্রাইভার লোকটা বলে উঠল, ‘জিগানির দরকার নাই, আমরা ঠিক রাস্তাতেই আছি।’
বাশার বাইরের দিকে তাকাল। বিকেলের লালিমা পার হয়ে সন্ধের অন্ধকার নেমে আসছে। সকাল বেলা লঞ্চে করে রওনা দেওয়ার পর ওদেরকে আলাদা কেবিন দেওয়া হয়, সেই সাথে পরিচ্ছন্ন হয়ে পোশাক বদলাবার ব্যবস্থা এমনকি ভালো খাবার এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়ার ব্যবস্থাও করা হয়। কিন্তু সেই সাথে প্রহরা ছিল সেরকম টাইট। তবে বাশার ওই সময়টা বিশ্রাম নেওয়ার পাশাপাশি চিন্তা- ভাবনার সময় পেয়েছে এবং সেই সময়টাতে সে বেশ কিছু ব্যাপার অনুধাবনও করতে পেরেছে। তবে শুরু থেকে সে চুপ করেই ছিল। ওদের লঞ্চ নদী পথে এগিয়েছে যতটা সম্ভব। এরপরে কিশোরগঞ্জে এসে ওরা একটা নাম না জানা খুবই ছোটো এবং নির্জন ঘাটে নামে দুপুরের পর দিয়ে। সেখানে দুটো গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল ওদের জন্যে। দুটো গাড়িতে করে ওরা সোজা কিশোরগঞ্জ শহর থেকে পুরাতন থানা মোড় হয়ে হয়ে চলে আসে করিমগঞ্জের পথে। সেখান থেকে হাইওয়ে ধরে পাঁচ কিলো মতো এসে রাস্তা মোড় নেয় ডানে। ওখানে জঙ্গলবাড়ি দুর্গের সাইনবোর্ড লাগানো ছিল। ওরা দুটো গাড়িতে করে এসেছে। কিন্তু ওই মোড় পার হবার পরই রাস্তার পাশে নির্জন হাইওয়েতে আরও নির্জনতম স্থান দেখে গাড়ি দুটো অপেক্ষা করতে থাকে। বাশার কালো কোটকে জিজ্ঞেস করেও তেমন কোনো সদুত্তর পায়নি। তবে সে ঠিকই অনুধাবন করতে পেরেছে কেন ওরা অপেক্ষায় ছিল। ওরা আসলে সন্ধে নামার জন্যে অপেক্ষা করছিল।
ঠিকই দিনের আলো বিকেল পার হতেই গাড়ি উঠে পড়ে নরসুন্দা নদীর ব্রিজের ওপরে। ওটা পার হতেই ছোটো একটা বাজারে আছে এখন ওরা।
বাশার গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখতে পেল গ্রামের বাজারে সন্ধের আলো জ্বলে উঠতে শুরু করেছে। লোকজন গঞ্জের চায়ের দোকানে বসে অলস আড্ডা দিচ্ছে। কিন্তু বেশিক্ষণ দেখার সুযোগ হলো না। বাজারটা পার হতেই কয়েক মিনিটের ভেতরেই ওরা একটা সাইনবোর্ড দেখতে পেল, চালানোর ধরন দেখে বাশার পরিষ্কার অনুধাবন করতে পারল এই লোক এখানে আগেও এসেছে বহুবার। সাইনবোর্ডটাকে দেখেই বাঁয়ে মোড় নিতেই ওরা দেখতে পেল সামনে একটা বিরাট দিঘি, দিঘিটার বিপরীতে একটা মসজিদ। আর মসজিদের পরেই শুরু হয়েছে পুরনো একটা আকৃতি। আধো অন্ধকারের ভেতরেও দেখলে বোঝা যায় আকৃতিটার আসলে খুব বেশি অবশিষ্ট নেই।
প্রথম গাড়িটা গিয়ে বিরাট দিঘি আর মসজিদের মাঝামাঝি জায়গায় দাঁড়িয়ে গেল। ওটার ঠিক পেছনেই ওদের সাথে আসা দ্বিতীয় মাইক্রোটাও এসে দাঁড়িয়ে গেল।
‘মিস্টার বাশার, ওর দিকে তাকিয়ে মৃদু ইশারা করল কালো কোট। ‘ইটস টাইম টু দ্য গ্লোরি।’
‘আপনি কি নিশ্চিত যা খুঁজছেন তা এখানে পাবেনই। শতভাগ নিশ্চিত?’ বাশার ওর পাশে বসা গার্ড লোকটাকে একবার দেখে নিয়ে আবার কালো কোটের দিকে ফিরে তাকাল।
‘মিস্টার বাশার আপনাকে একটা কথা বলি,’ বলে সে মৃদু হেসে উঠল। ট্রাস্ট মি, এখানে কী ঘটছে আপনি এখনও তার কিছুই জানেন না। আপনি কল্পনাও করতে পারছেন না আসলে কীসের ভেতরে আছেন, বিষয়টা কতটা গভীর।’
‘তাই নাকি, খানিকটা আলোকিত করেন প্লিজ, বাশারও কালো কোটের মতোই একই ভঙ্গিতে হেসে বলে উঠল।
‘এখন কাজের সময় মিস্টার বাশার, আর যদি আপনি লাকি হোন তবে শুধু বোঝা নয়, একেবারে দেখেই আলোকিত হতে পারবেন। চলুন।’
ওরা গাড়ি থেকে নেমে দেখতে পেল পেছনের মাইক্রোটা থেকে বাকিরা সবাই নেমে এসেছে।
কালো কোট নিজের পোশাক টেনে ঠিক করে সবার দিকে ফিরে বলে উঠল, ‘আমরা এখানে থাকা প্রতিটা স্ট্রাকচার পরীক্ষা করব। আমার গার্ডরা প্রস্তুত থাকবে। কাজেই কোনো ধরনের চালাকি বা কিছু করার চেষ্টা করে লাভ হবে না। আমার ধারণা এখানে অথরিটি বা এরকম কেউই নেই। কিন্তু যদি থাকেও বা স্থানীয়রা কেউ কোনো প্রশ্ন করে তবে আমরা যথাযথ আইডি দেখাব। কাজেই সবাই আমাদেরকেই ট্রাস্ট করবে, কাজেই উলটাপালটা কিছু না করে বরং সহায়তা করুন। প্রাণে বাঁচবেন এবং সবকিছু দ্রুত শেষ হবে। লেটস গো।’
ওরা সবাই ফিরে তাকাল ঐতিহাসিক জঙ্গলবাড়ি দুর্গের প্রায় ধ্বংস হওয়া আকৃতির দিকে।
***
অতীত
জঙ্গলবাড়ি দুর্গ
দুর্গের প্রাঙ্গণের বিরাট আকৃতিটার সীমানার প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে ওরা সবাই। সেই সাথে দুর্গের সামনের প্রাঙ্গণে পরিখার ওপাশে বিরাট বাহিনী দাঁড়িয়ে আছে। পোশাক দেখলেই বোঝা যায়, মোঘল বাহিনী, তবে ওরা অবাক হয়ে দেখল শুধু মোঘল বাহিনীই নয়, তাদের সাথে কালো কোট আর লাল পাগড়ি পরিহিত আরেকদলও অছে, এই পোশাকও অপরিচিত নয়।
‘সর্বনাশ! এইটা তো পুরা বাহিনী চইলা আসছে,’ গেড়ুয়া আনমনেই বলে উঠল। এই প্রথমবারের মতো মাসুম তার গলায় দ্বিধা এবং যেন খানিকটা ভয়েরও ছাপ টের পেল।
‘এইবার কী মনে হয়?’ মাসুম কিছু বলার আগে ওদের পাশ থেকে রায়েলি বলে উঠল। ‘তোমারে বলছিলাম না, আমগোরে ধইরা কত বড়ো ভুল করছ,
টেরও পাও নাই। এইবার টের পাইতাছ?’ গেড়ুয়া কিছু বলল না। সে শুধুই সামনে তাকিয়ে আছে, আর যেন খানিকটা বিহ্বলও বটে। মোঘল বাহিনী দুর্গটা ঘিরে ফেলার সাথে সাথে পাঙ্গুদের দলটা এমনভাবে চমকে গেছে যে ওদেরকে আর পাহারা রাখারও প্রয়োজন বোধ করছে না। সবাই এসে দাঁড়িয়ে প্রাঙ্গণের কিনারার দিকে, সেই সাথে মাসুমেরাও।
‘কিন্তু ওরা টের পাইল ক্যামনে আমরা এইহানে আসছি?’ গেড়ুয়ার দলের অন্য একজন বলে উঠল।
‘ওই যে,’ মাসুম পুরো বাহিনীর সম্মুখভাগের একপাশে দেখাল যেখানে কালো পোশাক আর লাল পাগড়িদের দলের একাংশ দাঁড়িয়ে আছে। ‘ওইটা বিশা ডাকাইতের বাহিনী,’ মাসুমের কথা শুনে গেড়ুয়া থেকে শুরু করে সবাই চমকে উঠল এবং সাথে সাথে এটাও অনুধাবন করতে পারল মোঘল বাহিনী এখানে কীভাবে পৌঁছেছে।
‘আমরা ওগোরে চরের ওইখানে ধাক্কা দেওয়ার পরে বিশা ডাকাইত বুঝতে পারে আমরা দলে যত ছোটোই হই আমগোরে চট কইরা ওরা কাবু করতে পারবো না। কাজেই সে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়া মোঘলগোর লগে যোগাযোগ করে। মোঘলগোর লগে ওর কী চুক্তি অইছে জানি না। তবে এইটা বুঝতে পারছি যে বিশা এই এলাকার সব জায়গায় থাকা তার নিজের লোক ব্যবহার করছে আমগোরে খুঁইজা বাইর করতে, আর এরপরে সে মোঘলগোর লগে আইসা উপস্থিত হইছে। আর মোঘলগোর বাহিনীর আকৃতি দেইখা আমি অভিজ্ঞতা থেইকা কইতে পারি, এইটার নেতৃত্বে আছে বড়ো কোনো নেতা,’ বলে সে ফিরে তাকাল গেড়ুয়ার দিকে। খালি তুমি মর নাই, গেড়ুয়া, তোমার দলের সব লোক, তোমার দেবী আর আমরাসহ মরছি।’
সবাই নিশ্চুপ ভঙ্গিতে তাকিয়ে মাসুমের দিকে। উপস্থিত প্রতিটা লোক বুঝতে পারছে। মাসুম যা বলেছে তার প্রতিটা অক্ষর সত্যি।
‘এখন তাইলে করণীয় কী?’ কেউ একজন বলে উঠল।
মাসুম সামনের দিকেই তাকিয়ে ছিল সে হঠাৎই সামনে দেখিয়ে বলে উঠল, ‘করণীয় কী সেইটা নির্ভর করতাছে ওইখান থেইকা যা আসতাছে সেইটার ওপরে।’
সবাই তাকিয়ে দেখতে পেল, মোঘলদের বিরাট বাহিনীর সামনে থেকে একটা ঘোড়া এগিয়ে আসছে ওদের পরিখার দিকে। তাতে সাদা পতাকা হাতে বসে আছে একজন লোক। ঘোড়াটা পরিখার সামনে এসে থেমে গেল।
‘ফরমান আসছে,’ যাও গিয়া দেখ কী বলে ওরা।
গেড়ুয়া তার নিজের তিন সঙ্গীকে নিয়ে নেমে গেল সিঁড়ি বেয়ে। ওরা অপেক্ষা করতে লাগল প্রাঙ্গণে। খুব বেশি সময় নিলো না। ওরা দেখতে পেল ঘোড়াটা ফিরে যাচ্ছে আর গেড়ুয়ারাও উঠে আসছে।
মাসুম, ওকে দেখে মৃদু হেসে উঠল, ‘বাহরাম খাঁ আর বিশা ডাকাইত, দলে আছে তাই না? ওরা আমগোরে ওগো হাতে তুইলা দিতে কইছে, ওই জিনিসটাসহ। বিনা শর্তে, কোনো ঝামেলা ছাড়াই, তাই না?’
মাসুম কথাগুলো বলতে বলতে অনুভব করল ওর ঠোঁট কাঁপছে। জীবনে সম্ভবত প্রথমবারের মতো একই কথা বলার সময়ে তিনবার সে তাই না শব্দটা উচ্চারণ করল।
গেড়ুয়ার মাথা নাড়ানো দেখেই বুঝতে পারল ও ভুল বলেনি
‘তোমার লাইগা একটা উপহারও পাঠাইছে মোঘলগোর সেনাপতি,’ বলে সে ভেজা থলের মতো কিছু একটা এগিয়ে দিলো মাসুমের দিকে। জিনিসটা দেখেই বুকটা ধক করে উঠল মাসুমের। থলেটা খুলতেই ওটার ভেতর থেকে গড়িয়ে পড়ে গেল মোঘল বাহিনীতে ওর বন্ধু বরকতের খণ্ডিত মস্তক।
আনমনেই মাথা নাড়ল ও। কোথায় সে নিজের বীর মসনদে আলার জন্যে একটা কাজ উদ্ধার করতে আসছিল, আর এখন কি না সেই জিনিস তুলে দিতে যাচ্ছে শত্রুর হাতে। ওর কারণেই মৃত্যু হলো ওর বন্ধুর। ঈশা খাঁর বাহিনীর কী অবস্থা কে জানে। যে-সহায়তা পাবার কথা ছিল তার, তা তো পাইলোই না উলটো এখন ওরাও সব হারাইব।
***
অতীত
ব্রহ্মপুত্র আর শীতলক্ষ্যার সঙ্গমস্থল
জঙ্গলবাড়ির দুর্গে মাসুম যখন সময়ের অপেক্ষা করছে ঠিক সেই সময়ে মসনদে আলা ঈশা খাঁ হতবিহ্বল ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে তার সামনের মাটিতে পড়ে থাকা শত্রুর রক্তাক্ত মৃত শরীরের দিকে। ক্ষণিক আগেও যেখানে বিজয় আর স্বস্তির আনন্দ তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবাহিত হয়ে চলছিল, পলকের জন্যে তার মনে হয়েছিল যে- কাঙ্ক্ষিত বিজয়ের জন্যে সে দীর্ঘদিন অপেক্ষায় ছিল সেই বিজয় অবশেষে ধরা দিয়েছে, যে-বিজয়ের জন্যে পুরো বাঙাল মুলুক, পুরো বারো ভূঁইয়া সমাজ অপেক্ষায় ছিল সেই বিজয় অবশেষে অধরা হতে হতেও ধরা দিয়েছে। ঈশা খাঁ যতটা হতবিহ্বল ভঙ্গিতে ছিল তারচেয়ে বেশি হতবাক নিজের রক্তাক্ত তরবারি খাপে ঢুকিয়ে মাথা থেকে শিরস্ত্রাণটা খুলে আনল। যা ঘটেছে সেটা বিপর্যয় না কমিয়ে বরং আরও বেড়ে গিয়েছে। কারণ ভুল বোঝাবুঝি হয়ে গেছে একটা ভয়াবহ।
এগারো সিন্ধুর যুদ্ধে প্রথম কয়েকদিন যুদ্ধের ময়দানে ঈশা খাঁর অনুপস্থিতির পর যখন ছড়িয়ে পড়ল যে ঈশা খাঁ মানসিংহের ভয়ে ময়দানে আসছে না ঠিক সেই সময়ে ঈশা খাঁ নিজেদের শক্তি সামর্থ্য এবং সম্মান সবকিছু বিবেচনা করে এক চাল চালে। সে মানসিংহকে পত্র পাঠিয়ে দ্বৈতযুদ্ধের জন্যে আহ্বান করে। তার পত্রে সে জানায়: অযথা রক্তপাত না করে বরং পুরনো কায়দায় এর সমাধান করতে চায় সে। দুই দলের নেতার ভেতরে যুদ্ধ হোক, যে শক্তিশালী সেই টিকে থাকবে। যে হেরে যাবে সে সার্বিকভাবে পরাজিত ঘোষিত হবে। মানসিংহের তরফ থেকে প্রথমে কোনো জবাব আসছিল না। তারপর সরাসরি যুদ্ধের ময়দানে সমরসাজে সজ্জিত হয়ে উপস্থিত হয় সে। ঈশা খাঁও কোনোরকম দ্বিধা না করেই ঝাঁপিয়ে পড়ে তার ওপরে। প্রথমভাগে কিছুক্ষণ সমানে সমানে লড়াই হলেও কিছুক্ষণের ভেতরেই অপরপক্ষ ধীরে ধীরে দুর্বল প্রমাণিত হতে থাকে এবং কিছুক্ষণের ভেতরেই ঈশা খাঁর প্রবল আক্রমণের মুখে টিকতে না পেরে প্রতিপক্ষ বধ হতে শুরু করে এবং সুযোগ বুঝে ঈশা খাঁর তরবারির তীব্র আঘাতে লুটিয়ে পড়ে সে।
শত্রুকে পরাজিত করার আনন্দে পুরোপুরি উদ্বেলিত হবার আগেই মাটিতে লুটিয়ে পড়া মৃত শত্রুর চেহারা উন্মোচিত হতেই সবাই চমকে ওঠে।
এত মানসিংহ নয়।
সত্যি কথা হলো ঈশা খাঁর পত্র পেয়ে মানসিংহ সত্যিকার অর্থে ভাবতেই পারেনি কোনো বাঙালি তার সাথে যুদ্ধের যোগ্য এবং সে ঈশা খাঁর শক্তি-সামর্থ্য পরীক্ষা করার জন্যে তার জামাতা দুর্জন সিংকে লড়াই করার জন্যে পাঠায়। সে ভেবেছিল কোনো বাঙালির শরীরে এত শক্তি থাকতে পারে কিংবা কোনো বাঙালির এতটা সাহস থাকতে পারে যে, তার সাথে লড়াই করবে। তাই সে দুর্জন সিংকেই লড়াই করতে পাঠায়। কিন্তু এভাবে যুদ্ধ এমনকি পুরোপুরি শুরু হবার অগেই ঈশা খাঁর আঘাতে দুর্জন সিং মৃত্যু বরণ করবে ভাবতেও পারেনি কেউই।
যে মুহূর্তে দুর্জন সিংহের কর্তিত মস্তক মাটিতে লুটিয়ে পড়ল, মানসিংহ ক্রোধে চিৎকার করে উঠল। তার সেই চিৎকার প্রতিধ্বনিত হতে শুরু করল যুদ্ধের প্রান্তরে। হতবিহ্বল ঈশা খাঁর কর্ণকুহরেও সেই চিৎকার প্রবেশ করতে বেশি সময় লাগল না।
ময়দানের অপরপ্রান্ত থেকে ছুটে আসা ঘোড়সওয়ারিকে দেখে ঈশা খাঁ দ্রুত নিজের শিরস্ত্রাণটা পরে নিয়ে মনে মনে বলে উঠল, আসল যুদ্ধ এবার শুরু হবে।
.
বর্তমান
করিমগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ
ঈশা খাঁর জঙ্গল বাড়ি দুর্গের কথা আগে শুনলেও বাশার কখনও এখানে আসেনি ওরা সবাই মিলে দুর্গের সামনের প্রাঙ্গণে এসে দাঁড়াতে বাশার অনুভব করল শুধু ও না বলতে গেলে প্রায় সবাই বেশ হতাশ। কালো কোটের লোকজন শক্তিশালী সার্চ লাইটের মতো দুটো লাইট জ্বালাতেই প্রাঙ্গণের অন্ধকার বলতে গেলে দূর হয়ে গেল। এখন বাশার বুঝতে পারল কেন ওরা রাত হলেও ভয় পাচ্ছিল না। কারণ রাত হলে ওদের কাজ করার মতো যথেষ্ট রিসোর্স আছে। ওরা এসে পৌঁছাতেই স্থানীয় কিছু লোকজন জানতে চেয়েছিল ওরা কারা, কী দরকারে এখানে এসেছে? কালো কোটের লোকেরা কী আইডি দেখিয়ে ওদেরকে দূরে থাকতে বলেছে? এমনিতেও খুব বেশি মানুষ এখানে নেই। তার ওপরে ওরা কড়াকড়ি করতেই বাকি যারা ছিল তারাও চলে গেছে। অতি উৎসাহী কিছু ছোটো বাচ্চাকাচা ছাড়া আর কেউই নেই।
তবে বাশার এসব কিছু নিয়েই ভাবছে না। ও স্রেফ ভাবছে এখানে দুর্গের যে অবস্থা তাতে এখানে কী খুঁজে পাবে সেটাই বুঝে উঠতে পারছে না। কেউ একজন ওর মনের কথা বলেই ফেলল। ‘এখানে অবস্থা যে কাহিল তাতে আর কিছু আছে বলে তো মনে হয় না।
‘প্রফেসর, লি আর আপনি, মিস পৃথা আপনারা আগে বাড়ুন, আপনাদেরই এখন খেল দেখানোর সুযোগ।
শুধু ওরা না, জন লিও বেশ অবাক হয়েছে দুর্গের অবস্থা দেখে। দুর্গটাকে কোনোভাবেই আর দুর্গ বলার উপায় নেই। কিছু ভাঙা চোরা বাড়ির আকৃতি আর সেগুলোর ভেতরে মোটা মোটা থামের অস্তিত্ব আর বাড়ির মাঝখানের পিলার দেখলে বোঝা যায় একসময় এখানে দারুণ এক দুর্গ ছিল কিন্তু এখন বলতে গেলে প্রায় আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।
‘খুব বেশি কিছু অবশিষ্ট না থাকলেও, যা আছে সেগুলো আমাদেরকে খুব ভালোভাবে পরীক্ষা করে দেখতে হবে, আমি সবাইকে টিমে ভাগ করে দিচ্ছি এবং কীভাবে কী করতে হবে সেটাও বলে দিচ্ছি। তিনটা টিম থাকবে। প্রথমটায় আমি আর মিস পৃথা, অন্যটাতে আমাদের লোক আর প্রফেসর হামিদ। সম্ভাব্য কী কী ধরনের জিনিস খুঁজে দেখতে হবে সেটাও বলে দিচ্ছি,’ বলে সে সবাইকে গোল করে দাঁড় করিয়ে কাজ বুঝিয়ে দিলো। বাশার বুঝতে পারল লি কেন টিমটা এভাবে ভাগ করছে। কারণ যাতে ওরা কিছু পেলেও লুকাতে না পারে বা ইচ্ছে করেই খুঁজে দেখতে না পারে।
কিছুক্ষণের ভেতরেই ওরা ছড়িয়ে চারপাশে দেখতে শুরু করল। প্রথমেই একটা মূল দালানের মতো, ওটার বাইরে প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তর জায়গাটা কীসের এবং এটার গুরুত্ব কী-সেই বিষয়ক একটা সাইনবোর্ড লাগিয়েই দায় সেরেছে। দালানটার ভেতরে ঢুকে ওরা দেখতে পেল ভেতরের অবস্থা বেশ জরাজীর্ণ। বাশার, কালো কোট তার আর গার্ডরা দাঁড়িয়ে রইল। লি, পৃথা আর প্রফেসর কাজ শুরু করল। ওদেরকে হেল্প করল লম্বা চুলের সেই ছেলেটা। ওরা নিজেদের ভেতরে কথা বলতে বলতে প্রথম পুরো দালানটা পরখ করে চলল। বাশার সার্চ লাইটের আলোতে দেখতে পেল ভেতরের দেওয়ালগুলোতে টেরাকোটার কাজ আর পিলারগুলোতে সুন্দর লাল রঙ বাদে জায়গাটার অতীত জৌলুসের বলতে গেলে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। তবে অবশিষ্ট অংশগুলোর হারিয়ে যাওয়া জৌলুসের জেল্লার ছাপ দেখলে অনুধাবন করা যায় অতীতের ঝলমলে রূপটা।
‘আমি জানি আপনি কী ভাবছেন?’ হঠাৎই বাশারের পাশ থেকে কালো কোট কথা বলে উঠল। বাশার তার দিকে ফিরে তাকাতেই সে আবারও বলতে লাগল। ‘আপনি হয়তো জায়গাটার এরকম ধ্বংসস্তূপ দেখে ভাবছেন এরকম দুর্গ নিয়ে এত গাল-গল্প এত কাহিনি। কিন্তু সত্যি কথা হলো যা দেখছেন এটা সত্যিকরের দুর্গের মৃহদেহের ছায়া মাত্র। যখন এই জায়গা তার সত্যিকারের রূপে ছিল তখন এর জৌলুস ছিল একেবারেই ভিন্ন। ওই দেখ,’ বলে সে ভেতরের দিকে দেখাল। পৃথারা নিজেদের মতো কাজ করছে দেখে বাশারকে নিয়ে কালো কোট চলে এলো ভেতরের কামরায়, ‘দেখুন লেখা ‘ঈশা খাঁ স্মৃতি জাদুঘর ও পাঠশালা’ অথচ কিছুই নেই এখানে,’ বলে সে মাটিতে পড়ে থাকা একটা পাথরের টুকরোতে লাথি মারল। ‘আমরা জাতিগত ভাবে আজও নিজেদের ইতিহাস আর ঐতিহ্যকে গুরুত্ব দিতে শিখলাম না,’ বলে সে আফসোসের সাথে মাথা নাড়ল।
‘এই দুর্গ ঈশা খাঁর জঙ্গলবাড়ি দুর্গ নামে পরিচিত হলেও দুর্গটা কিন্তু ঈশা খাঁ নির্মাণ করেননি। তারও আগে আরেকজন অধিপতি ছিল এই দুর্গের। আবার সেই ব্যক্তির আগেও এই দুর্গ আরেকজনের দখলে ছিল। তবে ঈশা খাঁ ব্যাপক সংস্কার করেছিলেন এর।’
‘কিছু মনে না করলে একটা জিজ্ঞেস করি,’ বাশার বলে উঠল কালো কোটের দিকে তাকিয়ে। ‘আপনি এতকিছু জানেন কীভাবে? আপনি কি—’
‘না না, আপনি ভুল ভাবছেন, মিস্টার বাশার, কালো কোট হেসে উঠল। ‘আমি আর্কিয়োলজিস্ট বা অ্যাকাডেমিক জগতের কেউ না। আমি পিয়োর ক্রিমিনাল, কালো কোট সরাসরি তাকিয়ে আছে বাশারের চোখের দিকে। ‘আমার ধ্যানজ্ঞান এবং নেশা সবই অপরাধের জগৎকে ঘিরে।’
বাশারও সরাসরি তাকিয়ে আছে তার চোখে। ‘আর আমার নেশা পুলিশি জীবনকে ঘিরে।’
দুজনেই দুজনার দিকে তাকিয়ে আছে। কারও চোখের পলক পড়ছে না। দুই শক্তিশালী পুরুষের এই দৃষ্টির লড়াই কতক্ষণ চলত, কে জানে কিন্তু হঠাৎই গার্ডদের একজন দরজার বাইরে থেকে বলে উঠল। ওরা কাজ সেরে বেরিয়ে এসেছে। কথাটা শুনে নিজের লোকের দিকে ফিরে হাত নাড়ল কালো কোট। যাও আসছি,’ আবার বাশারের দিকে ফিরে সে গম্ভীর ভঙ্গিতে বলে উঠল, ‘চলুন, দেখি কী পেল ওরা।’
বাশার খেয়াল করল, এই প্রথমবারের মতো লোকটা তার বিখ্যাত ঠান্ডা হাসিটা হাসেনি
.
অতীত
জঙ্গলবাড়ি দুর্গ
মাসুম সামনের দৃশ্য এবং পরিস্থিতির চাপে যতটা না অবাক হচ্ছে তার চেয়ে বেশি অবাক হচ্ছে গেড়ুয়ার অস্থিরতা দেখে। শান্ত এবং শক্তিশালী পুরুষ মানুষ যখন ভেঙে পড়ে ব্যাপারটা তখন খুব একটা সুখকর হয় না। এই মুহূর্তে মাসুমের ঠিক সেই একই অনুভূতি হচ্ছে গেড়ুয়াকে দেখে। এরকম শান্তশিষ্ট পর্বতের মতো স্থির মানুষটা হটাই কেমন জানি অস্থির হয়ে উঠেছে। বারবার এদিক-সেদিক দেখছে নিজের পোশাক টানাটানি করছে কী থেকে কী করবে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। তার অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে তার দলের লোকজনের ভেতরেও, এমনকি রায়েলির দলের ভেতরেও অস্থিরতা কাজ করছে। কিন্তু অদ্ভুত বিষয় হলো যাদের ঝুঁকি এবং বিপদ সবচেয়ে বেশি তারাই একেবারে শান্ত রয়েছে। মাসুম, ওর সঙ্গীরা, রায়েলি আর মেহের। অথচ বিপদের খাড়া ওদের ওপরেই ঝুলছে সবচেয়ে বেশি প্রকট হয়ে। ‘আমি একটা জিনিস বুঝলাম না, তুমি এত অস্থির হইতাছ ক্যান? মাসুম শান্ত স্বরে বলে উঠল। যদিও সে কথাটা বলেছে গেড়ুয়ার দিকে তাকিয়ে কিন্তু একবার রায়েলির দিকেও ফিরে তাকাল ও। যদিও মেয়েটার চোখদুটো জ্বল জ্বল করছে কিন্তু সেও একেবারেই শান্ত আছে। ঘটনার প্রেক্ষিতে প্রতিটা মানুষের প্রতিক্রিয়া দেখে মাসুম আরেকবার নিশ্চিত হলো আসলে অভিজ্ঞতা মানুষকে অনেক কিছুই মূল্যায়ন করতে শেখায়। মাসুম নিজে এবং ওর দুই সঙ্গী জীবনে এতবার বিচিত্র আর ভয়ঙ্কর সব অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে যে ওরা সবচেয়ে মারাত্মক অবস্থাতেও শান্ত থাকতে পারে। অন্যদিকে বিচিত্র আর ঝুঁকিপূর্ণ জীবন কাটালেও এ-ধরনের যুদ্ধাবস্থার মুখোমুখি কখনও হয়নি গেড়ুয়া। তার প্রতিক্রিয়া অন্তত তাই বলে।
একটু আগে দুর্গটাকে ঘিরে ফেলার পর বাহরাম খাঁ আর বিশার বাহিনী যখন দূত পাঠায় সেখানে একটাই বার্তা ছিল, সুবাদারের স্ত্রী এবং তার সঙ্গীদেরকে বিনা শর্তে তাদের হাতে তুলে দিতে হবে। সেই সাথে দুর্গে যারাই আছে সবাইকে আত্মসমর্পণ করতে হবে। আর সেটা করার জন্যে ওরা সময় বেঁধে দিয়েছে স্রেফ ঘণ্টাখানেক। এর ভেতরে বিনা শর্তে আত্মসমর্পণ না করলে ওরা দুর্গ আক্রমণ করবে এবং সেক্ষেত্রে একজনকেও জীবিত ছাড়া হবে না। আর যদি ওরা যথা সময়ে এবং বিনা বাধায় আত্মসমর্পণ করে তবে ওদের জন্যে কিছু সুবিধা থাকবে। কী সুবিধা থাকবে এবং ওরা কী করবে সেই ব্যাপারে কিছুই বলা হয়নি। ওরা জানতে চেয়েও কোনো কাজ হয়নি। ওরা নেতৃস্থানীয় কারও সাথে কথা বলার কথা বলা হলে পাঠানো দূত সরাসরি মানা করে দিয়েছে। মোট কথা ওদের কোনো কথাই শোনা হবে না। দূত চলে যাবার পরই গেড়ুয়া নিজের দলের লোকদের সাথে কথা বলেছে তারপরও ওরা একসাথে হয়ে আলোচনা করছে এখন।
‘কী হইল, গেড়ুয়া, কথা বলো না ক্যান? মূল বিপদ তো আমগো তুমি এত অস্থির হইতাছ ক্যান?’ মাসুম প্রশ্ন করলেও সবাই তাকিয়ে আছে গেড়ুয়ার দিকে। আর গেড়ুয়া তাকিয়ে আছে মাসুমের দিকে। ‘হুজুর, তুমি বুঝবা না। যা ঘটতাছে এইটা পরিষ্কার দেবী মাতার ক্রোধের নিদর্শন, তা না হইলে সব ঠিক আছিল। দেবীর সব নির্দেশ আমি ঠিক ঠাক পালন করছিলাম, সব ঠিক আছিল। খালি খালি,’ বলে সে একবার নিজের লোকদের দিকে দেখে নিলো। তারপর মাসুমের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল। ‘তারচেয়ে বড়ো বিপদ কী জানো? একবার দেবীর উদ্দেশ্যে ভোগের নিয়ত করলে সেইটা করতে না পারলে এইকাল পরকাল কোনোটাতেই মুক্তি নাই,’ বলে সে এমন এক কাজ করে বসল মাসুম কল্পনাও করতে পারেনি গেড়ুয়ার মতো লোক করে বসবে।
সে চট করে এগিয়ে এসে মাসুমের হাত জোর করে ধরে বলে ফেলল, হুজুর, তুমিই এখানে সবচেয়ে শক্তিশালী যোদ্ধা, একমাত্র তুমিই পারবা কিছু করতে।’
মাসুম অনেকক্ষণ পর রাগের সাথে তাকাল গেড়ুয়ার দিকে। ‘তুমি আমার কাছে সাহায্য চাইতেছ?’ বলে সে নিজের লোকদেরকে দেখাল। ‘তোমার মানুষেরা তোমার জন্যে ঠিক যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তোমার দেবী তোমার জন্যে যতটা গুরুত্বপূর্ণ, আমার মানুষেরা আমার জন্যে অতটাই, তোমার দেবী যদি তোমার সব হয় আমার মসনদে আলা আর তার নির্দেশ আমার জন্যে সব। আর তুমি এইসব ধ্বংস করতে যাইতেছিলা, একটু আগে। সবাইরে ধোঁকা দিয়া, তুমি বন্দি করছিলা, দেবীর ভোগের জন্যে উৎসর্গ করতেছিলা আরেকটু হইলে। আর সেই তুমি আমার কাছে সাহায্য চাও?’ বলে মাসুম নিজের মুখটাকে গেড়ুয়ার দিকে বাড়িয়ে দিলো। ‘তুমি আমগোরে মোঘলগোর হাতে উঠায়া দাও, তোমার লাইগা আমার কাছে কোনো সমাধান নাই,’ মাসুমের কথা শেষ হতেই গেড়ুয়া যেন ডুকরে উঠল সে রায়েলির দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, ‘তুমগো তো জীবনের ভয় আছে, হুজুররে বলো কিছু একটা করতে।’ রায়েলি রাগের সাথে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল তার আগেই পেছন থেকে কেউ একজন যেন প্রায় গর্জন করে উঠল।
‘তুমরা কেউই এই বিপদ থেইকা উত্তানির সমাধান করতে পারবা না। সমাধান আমার কাছে আছে,’ সবাই হঠাৎ ভারী গলা শুনে সেদিকে ফিরে তাকাল এবং খুবই অবাক হয়ে দেখল দুর্গের প্রাঙ্গণের মাঝামাঝি কোমরে দুই হাত রেখে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে নুক্কুন। একটু আগের ভঙ্গুর মানুষটা যেন হঠাৎই বদলে গেছে, তার সমস্ত অবয়ব থেকে ঠিকরে বেরোচ্ছে শক্তি আর মনোবল।
‘সমাধান একটা আমার কাছে আছে, কিন্তু তার জন্যে কিছু মানুষরে মরতে হবে,’ বলে সে মাসুম গেড়ুয়া আর রায়েলির দিকে তাকিয়ে নিজের ভ্রু নাচালো। ‘কে কে মরতে রাজি আছ?’
.
অতীত
ব্রহ্মপুত্র আর শীতলক্ষ্যার সঙ্গমস্থল
মৃত্যুভয় ঈশা খাঁ করে না। যে মানুষটা ছোটোবেলাতেই নিজের বাবার মৃত্যু দেখেছে, দেখেছে পরিবারের ধ্বংস, বিক্রি হয়ে গেছে ক্রীতদাস হয়ে, সেই যে- মানুষটা কোনোদিন ভাবেনি যে সে নিজ ভূমিতে পা রাখতে পারবে, সেই মানুষটা আজ পুরো বাংলার প্রতিনিধি। পুরো বাঙাল মুলুকের অবিসংবাদিত নেতা, যার কাছে নিজের প্রাণের চেয়ে নিজের মাতৃভূমির মুক্তি এবং স্বাধীনতা অনেক বেশি মূল্যবান। যে-মানুষটার কাছে তার নিজের বাহিনী কিংবা সাম্রাজ্যের চাইতে তার নিজের মানুষদের কল্যাণ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে সেই মানুষটা যে মৃত্যুভয় করবে না সেটাই স্বাভাবিক। আর সেই কারণেই সে জানে যে মোঘলদের সাথে মুখোমুখি যুদ্ধে তার বাহিনীর কোনো সুযোগই নেই। ঠিক তাই সে চেষ্টা করেছিল ভিন্ন এক শক্তির আশ্রয় নেওয়ার। আর সেটা যখন হলো না, তখন একমাত্র পথ এবং উপায় ছিল দ্বৈত যুদ্ধের আহ্বান। প্রথমত, সে ভাবেনি মানসিংহ এতে সাড়া দিবে। এরপর যখন দিলো এবং যুদ্ধের প্রথম ধাপেই তাকে হারিয়ে দিয়ে সে খুশি হয়ে উঠতে গিয়েও আবিষ্কার করল এ তো মানসিংহ নয়, বরং তার জামাতা দুর্জন সিং। আর দুর্জন সিংয়ের মৃত্যুর পরই মানসিংহ সরাসরি অবতীর্ণ হয়েছে তার সামনে বিগত আধাঘণ্টা ধরে সমানে সমানে চলছে লড়াই।
পুরো যুদ্ধের ময়দানে এমন একটা প্রাণিও নেই যে কি না দম বন্ধ না-করে দেখছে দুই মহারথীর এই লড়াই।
বাঙালিদের বীর ঈশা খাঁ আর মোঘলদের সেরা সেনাপতির লড়াই যে এতটা ভয়ঙ্কর আর সমানে সমান হবে কেউই ভাবতে পারেনি। মোঘলরা তো ভেবেই বসেছিল যে বাঙালির দেহ মনে এতটা শক্তি থাকতেই পারে না যে, সে মোঘল সেনাপতির সাথে লড়াই করতে সক্ষম হবে। কিন্তু দুই যোদ্ধা যখন ময়দানে মুখোমুখি হলো তখই সবাই অনুধাবন করতে পারল দুজনেই সমানে সমান।
টানা লম্বা লড়াইয়ের পর দুই যোদ্ধাই কাউকে বিন্দুমাত্র পিছু হঠাতে না পেরে নিজেরাই পরস্পর থেকে দূরে সরে গেল দম নেওয়ার জন্যে। নিজের ঘোড়ার ওপরে আসীন ঈশা খাঁ দম নিতে নিতে দেখতে পেল খানিকটা দম ফিরে পেতেই আবারও নিজের ঘোড়া নিয়ে তার দিকে ছুটে আসছে মানসিংহ। সাথে সাথে নিজের ঘোড়াটাকে আগে বাড়াল সে-ও। দুই কুলের দুই যোদ্ধা আবারও পরস্পরের ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল বীর বিক্রমে।
***
বর্তমান সময়
করিমগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ
‘এর মানে কি কিছুই পাওয়া যায়নি?’ এই প্রথমবারের মতো কালো কোটকে খানিকটা উত্তেজিত মনে হলো বাশারের কাছে, গলার স্বরও উঁচু হয়ে গেছে, যেটা একেবারেই তার স্বভাববিরুদ্ধ। একে একে সে দেখে নিলো পৃথা আর প্রফেসর হামিদকে। কিন্তু তার নজর এসে থামল জন লির ওপরে। ‘আর ইউ শিয়োর?’
লিকেও খানিকটা নার্ভাস দেখাচ্ছে। সে তার স্বভাবসুলভ বিচিত্র টানের ইংরেজিতে বলে উঠল, ‘স্যার, এখানে যা আছে প্রতিটা স্ট্রাকচার পরীক্ষা করে দেখা হয়েছে, এখানে বলতে গেলে তেমন কিছুই নেই।’
‘পেছনের ওই বাড়িগুলোতে, ওগুলো দেখে মনে হলো ওখানে মানুষ থাকে,’ মূল দুর্গ ভবনের পেছনের মোটামুটি বসবাসের আকৃতিগুলোর দিকে নির্দেশ করল সে।
‘ওগুলোতে ঈশা খাঁর বংশধরেরা থাকে,’ পৃথা বলে উঠল এবার। ‘ওগুলোতেও আসলে খুব বেশি কিছু দেখার ছিল না, তাও আমরা স্কিপ করিনি, উনাদেরকে আপনার লোকেদের আইডি দেখিয়ে প্রতিটা বাড়ি চেক করা হয়েছে,’ বলে সে কালো কোটের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, ‘তাও কিছু পাওয়া যায়নি।’
‘এক মিনিট,’ কালো কোটের গলার স্বর উঁচু হয়ে গেছিল সে নিজেকে কন্ট্রোল করল। ‘এখানে যদি আমরা কিছু না পাই তাহলে এর পরিণতি কী হবে জানেন তো আপনারা, বিশেষ করে তুমি। তোমাকে আনাই হয়েছে এই জন্যে, কালো কোটের গলার স্বর নিচে নামছে কিন্তু সেই সাথে তাতে একটা হিংস্রভাব ফুটে উঠছে। হঠাৎই সে থেমে গেল। ‘আচ্ছা আমি যতটা জানি এই দুর্গের একটা বড়ো অংশ এখানে মাটির নিচে দেবে গেছে। সেগুলোতে কি কিছু খুঁজে দেখা সম্ভব? আমাদের সাথে তো স্ক্যানার আছে মাটির নিচে স্ক্যান করে দেখার মতো।’
‘স্যার,’ লির গলা কেঁপে উঠছে। ‘ওগুলোও স্ক্যান করা হয়েছে। কিন্তু চেক করে দেখার মতো কিছুই পাওয়া যায়নি। একমাত্র উপায় যদি ওগুলো খুঁড়ে দেখা হয়। কিন্তু সেটা তো—’
‘সেটা করতে হলে রীতিমতো আর্মি নামাতে হবে সেটা সম্ভব না। আর সেটা যুক্তিযুক্তও না। কারণ এখানে যাই থাকুক না কেন সেটা এতটাও গভীরে থাকা সম্ভব নয়।’
‘তাহলে—’
‘তাহলে আমি কী জানি?’ রীতিমতো গর্জন করে উঠল। কালো কোট মাটি থেকে একটা ঢেলা তুলি নিয়ে সামনের পুকুরে ছুড়ে মারল।
‘এক মিনিট। আমরা সব পরীক্ষা করেছি কিন্তু একটা জায়গা বাকি আছে,’ কথাটা বলেই পৃথা ফিরে তাকাল বাকিদের দিকে। সবাই কৌতূহলের সাথে তাকিয়ে আছে তার দিকে। মেয়েটা কী বলছে কেউই বুঝতে পারছে না।
‘মিস’
‘এই পুকুর, মানে দিঘিটা, এটা নিশ্চয়ই পরীক্ষা করে দেখা হয়নি—’
‘কিন্তু এটা কীভাবে পরীক্ষা করা সম্ভব?’ প্রফেসর হামিদ বলে উঠল।
তার দিকে তাকিয়ে হেসে উঠল কালো কোট। ‘প্রফেসর, এটা করার মতো প্রযুক্তি আমাদের কাছে আছে,’ বলেই সে লম্বা চুলের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, যাও, অ্যাকুয়া স্ক্যানারটা নিয়ে আসো।’
***
অতীত
জঙ্গলবাড়ি দুর্গ
মানুষের ভেতরে নাকি বিশেষ অবস্থায় বিশেষ শক্তির জাগরণ ঘটে। মানুষ তার নিজের শক্তি-সামর্থ্য আর চিন্তার সীমাকে অতিক্রম করে যেতে পারলে নাকি এমন সব কাজ করে বসে যা তার দ্বারা কোনো অবস্থাতেই সম্ভব হতো না। নুক্কুনকে দেখে এই মুহূতে তাই মনে হচ্ছে মাসুমের কাছে। তার চেহারা আগের মতোই এলোমেলো। চোখজোড়া টকটকে লাল আর হ্যাংলা-পাতলা পাটকাঠির মতো শরীর। কিন্তু তার চোখ মুখ শরীর থেকে যেন একটা দ্যুতি ঠিকরে বেরোচ্ছে। সে এইমাত্র তার নিজের পরিকল্পনা পরিষ্কার করে খুলে বলেছে ওদেরকে। তার পরিকল্পনা খুব পরিষ্কার এবং সহজ।
এই দুর্গের সম্মুখভাগ থেকে শুরু করে পেছনের জলাধার এবং প্রায় চতুর্দিক দিয়েই এই দুর্গটাকে ঘিরে ফেলেছে মোঘল বাহিনী। কিন্তু এই দুর্গের একপাশ দিয়ে একটা গোপন পথ আছে যেটার সন্ধান সে জানে। কিন্তু সেখান দিয়ে খুব বেশি মানুষ পালানো সম্ভব নয়। খুব কম মানুষই সেখান দিয়ে যেতে পারবে এবং ওখান দিয়ে পালাতে হলে কিছুটা সময়ও লাগবে। যেহেতু মোঘলরা ওদেরকে সময় বেঁধে দিয়েছে কাজেই ওই পথে পালাতে হলে একটাই উপায় আছে ওরা যারা এখানে আছে তাদের একটা অংশ মোঘলদেরকে আটকে রাখতে হবে বেশ লম্বা একটা। আর বাকি যারা পালাতে চায় তারা ওই সময়ের ভেতরে পালাতে পারবে সেই পথ দিয়ে। এই ক্ষেত্রেও ওদেরকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে কারা সামনে রয়ে যাবে এবং কারা পালাবে। যদি ওদের দলের একটা অংশ নিজেদের প্রাণ বিসর্জন দিতে রাজি থাকে তবেই এই পন্থা অবলম্বন করা সম্ভব। ওরা সেটা পারবে কি না।
সে নিজের প্রস্তাবনা শেষ করে কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে উঠল, ‘আমি ওই গোপন পথ দেখাইতে পারি তয় গেড়ুয়ার মরতে হবে, আমার লগে যেই ধোঁকা সে করছে তার শাস্তি পাইতে হবে ওর,’ সে অগ্নিচোখে তাকিয়ে আছে গেড়ুয়ার দিকে।
তার দৃষ্টি অনুসরণ করে মাসুমও ফিরে তাকাল গেড়ুয়ার দিকে। সে ভেবেছিল গেড়ুয়া রেগে যাবে কিংবা রাজি হবে না। কিন্তু খুবই অবাক হয়ে দেখল গেড়ুয়া নুক্কুনের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎই তার মুখে ফুটে উঠল এক অদ্ভুত হাসি।
শাস্তি না, এইটা হবে আমার জীবনের লাইগা পরম পাওয়া,’ বলে সে ভক্তি ভরে নিজের দুই হাত জড় করল মুখের সামনে। ‘এইটাই এইটাই দেবীর ইশারা। আমি নিজেরে দেবীর লাইগা উৎসর্গ করব। নিজের মানুষগো লাইগা উৎসর্গ করব। তয় আমার শর্ত আছে। আমার দলটাকে বাঁচাইতে অইব। সবাইরে না পারলে অন্তত কয়েকজনরে। তবেই আমি নিজেরে উৎসর্গ করব।’
মাসুম একটা হাত তুলল। নুক্কুন যা বলছে সেইটাই সই, এইখানে হিসাব খুব পরিষ্কার। ‘গেড়ুয়া, তুমি কাগোরে পাঠাইবা নির্দিষ্ট করো। আমার লাইগা হিসাব পরিষ্কার। আমি তোমার লগে থাকব সামনে। আমার দুই বন্ধু আর বেগম সাহেবা–’
‘কোনোদিনই না,’ মাসুম কথা ভলার আগেই প্রায় ধমকে উঠল ধোবল। ‘তুই আমগো লাইগা নিজের দায়িত্বের লাইগা জীবন দিবি এইটা হইতেই পারে না। আমরাও তোর লগে থাকবো। এইটা নিয়া কোনো কথাই অইব না।’
মাসুম অসহায়ভাবে ফিরে তাকাচ্ছিল বরখার দিকে, বরখাও মাথা নেড়ে সাফ জানিয়ে দিলো এটা নিয়ে আর কোনো কথাই চলবে না।
‘ঠিক আছে আর বেগম সাহেবা মেহের–’
‘আমি সামনে রয়া যাবো, আমি ধারণা করতাছি তোমরা একটা ফাঁদ পাততে যাইতেছ, তাতে টোপ অইব আমি,’ নিজের বিচিত্র টানে বাংলায় কথা বলে উঠল সুবাদারের স্ত্রী মেহের। নিজের ঘোমটার আড়ালও ফেলে দিয়েছে সে।
সবাই অবাক হয়ে ফিরে তাকিয়েছে তার দিকে। ‘কিন্তু’ কেউ একজন বলে উঠতে যাচ্ছিল কিন্তু তাকে থামিয়ে দিয়ে রায়েলি বলে উঠল, ‘তা হয় না, মেহের। তুমি জানো এই ক্ষেত্রে সমাধানটা কী?’ রায়েলি এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মেহেরের দিকে। ‘তুমি তো আমার কর্ত্রীই না, আমার বান্ধবীও, আমার বোনও, তোমার ওপরে অনেক বড়ো দায়িত্ব, তুমি বাকিগো নিয়া পালাও, আমি রয়া যাবো।’ রায়েলির চোখের দিকে তাকিয়ে মেহের কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল রায়েলি তাকে থামিয়ে দিয়ে মাসুমের দিকে ফিরে জানতে চাইল। ‘বাঙালি, বলো তোমার পরিকল্পনা কী?’
মাসুম সবার দিকে তাকিয়ে একে একে মাথা ঝাঁকাল। তারপর বলে উঠল, নুক্কন, কয়জন যাইতে পারবো আর বাকিরা কই কই থাকবো, এইটা হিসাব কইরা সব ঠিক কইরা ফেলতে অইবে। আমার একটা পরিকল্পনা আছে। তবে সবার আগে মোঘলগরে ফরমান পাঠাও আমরা আত্মসমর্পণ করতে রাজি অইছি।’
***
বর্তমান সময়
করিমগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ
এরকম কোনো কিছু এর আগে বাশার কখনও দেখেনি। ছোটো একটা যন্ত্র দিয়ে এত বড়ো একটা কাজ সমাধা করা সম্ভব এটা সে নিজ চোখে না দেখলে কিছুতেই বিশ্বাস করত না। মূলত পুরো কাজটা করছে সেই লম্বা চুলের ছেলেটা এবং জন লি, আর ওদেরকে হেল্প করছে পৃথা এবং প্রফেসর হামিদ। ইন্টারেস্টিং ব্যাপার যে পৃথা কিংবা প্রফেসর হামিদ নিজেরাও আর্কিয়োলজিস্ট হলেও এর আগে তারা এমন কিছু করেনি বা এরকম কোনো স্ক্যানার দেখেনি।
‘এটা কাজ করবে তো ঠিক ঠাক নাকি?’ প্রফেসর হামিদ ওদের পেছন থেকে জানতে চাইল।
‘অব্যশ্যই প্রফেসর, হান্ড্রেড পারসেন্ট। এটা একধরনের ওয়েভ সিগন্যাল প্রেরণ করবে পানির নিচে, সেটা পানির নিচের প্রতিটা সলিড জিনিসকে তরঙ্গের আকারে স্ট্রাকচার ঠিক করে আমাদেরকে দেখাবে। আমরা যা আশা করছি সেটা তো বটেই এমনকি ছোটো ছোটো মাছ পর্যন্ত আমরা টের পাব পানির নিচে।’
‘এটার একটা ছোটো ভার্সন আমি দেখেছি বিদেশে বন্ধুরা লেকে মাছ ধরতে গেলে ব্যবহার করে,’ অনেকক্ষণ পর সোহেল কথা বলে উঠল।
ওরা ওদের কাজ করছে, চারপাশে বলতে গেলে একরকম গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে কালো কোটের গার্ডরা। আর অন্যদিকে, দুজন গার্ড ভিন্ন এক প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। এই সুযোগে সোহেলের হাতে মৃদু চিমটি দিলো বাশার। সোহেল ওর দিকে ফিরতেই সামান্য মাথা নেড়ে ইশারা বিনিময় করল ওরা দুজনে। বাশার হয়তো ওকে আরও কিছু বোঝানোর চেষ্টা করত কিন্তু এমন সময়ে সামনে থেকে উত্তেজনাময় চিৎকার শুনে সবাই সেদিকে ফিরে তাকাল। এমনকি বাশার আর সোহেলও এগিয়ে গেল সেদিকে
‘কী ব্যাপার, কিছু পাওয়া গেছে নাকি? বাশার নিজের অজান্তেই আগ্রহের সাথে জানতে চাইল।
‘এখনও পুরোপরি নিশ্চিত না, কিন্তু দিঘিটার মাঝামাঝি এক জায়গায় একটা অদ্ভুত আকৃতি চোখে পড়ছে। ওখানে একটা গাছের নিচে সম্ভাব্য স্কয়ার আকৃতির কিছু একটা আছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।’
‘আসলে কাদার কারণে সম্ভবত আকৃতিটা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না,’ এই শীতের রাতে ঠান্ডার ভেতরেও লির কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে আছে। ‘আসলে আমরা—’
‘আমি নিশ্চিত,’ এই দেখুন,’ বলে ওদের দিকে স্ক্যানারটা এগিয়ে দেখাল। ‘দেখুন এই স্পটে যে স্ট্রাকচারটা আমরা দেখতে পাচ্ছি ওটার ভেতরেও স্ক্যান করে একটা চারকোনা আকৃতি পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি এবং ওটার ভেতরে মেটালের অস্তিত্বও পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে। এই দেখুন, ওরা সবাই স্ক্যানারটাতে চোখ বুলাতেই দেখতে পেল আকৃতিটা তো দেখা যাচ্ছেই সেই সাথে ওটার একপাশে সম্ভাব্য ম্যাটেরিয়ালের একটা আকৃতি থ্রিডি প্রিন্টের আকারে ভেসে উঠছে।
কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো এই রাতের বেলা দিঘির ভেতর থেকে এই জিনিস তুলে আনবেন কীভাবে? আমাদেরকে কি সকাল পর্যন্ত—’
বাশারকে ওর কথা শেষ করতে দিলো না কালো কোট। মৃদু হেসে সে বলে উঠল, ‘মিস্টার বাশার, আপনার কোনো ধারণাই নেই আমাদের রিসোর্সের বিষয়ে, বলে সে হাতের ইশারা করতেই ওরা দেখতে পেল একপাশে দুজন গার্ড কীসের প্রিপারেশন নিচ্ছিল এখন দেখতে পেল। দুজনেই পুরোপুরি স্কুবা ডাইভিংয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কালো কোট ইশারা করতেই নিজেদের মাস্ক পরে নিয়ে কাপালের ওপরে ডাইভিং টর্চ লাগিয়ে ধীরে ধীরে পুকুরে নেমে গেল। ‘এই ঘটনার সমাধান হবে আজ রাতেই।’
‘অব্যশ্যই অবশ্যই,’ তার সাথে সাথে বিড়বিড় করে বলে উঠল বাশার। ‘তা তো হতেই হবে।’
***
অতীত
জঙ্গলবাড়ি দুর্গ
শেষবারের মতো সমস্ত প্রস্তুতি দেখে নিলো মাসুম। হাতে একেবারে নির্দিষ্ট সময় ঠিক কতখানি আছে সে জানে না। তবে সেটা শেষ দিকেই হবে কারণ ওরা নিজেদের সমর্পণের ফরমান পাঠানোর পরও দুর্গ ঘিরে থাকা বাহিনী আক্রমণের পূর্ণ প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে।
প্রস্তুতি নিতে নিতে একবার প্রাঙ্গণের কিনারায় এসে সামনের বাহিনীর প্রস্তুতি দেখে নিয়ে সবার দিকে ফিরে মাসুম বলে উঠল, ‘সময় নেই, সময় নেই একেবারে। সবাই জলদি করো,’ ও কথা শেষ করে নিজের কাজ সেরে সামনের দিকে তাকাতেই দেখতে পেল আর্দ্র চোখে নুরুন তাকিয়ে আছে ওর দিকে।
‘হুজুর, আমার বেঈমানির ক্ষমা কি আমি পাইমু কোনোদিন?’ নুক্কুনের ভেজা চোখের দিকে তাকিয়ে আবারও কেমন জানি অদ্ভুত এক মায়া অনুভব করল মাসুম। সে নুক্কুনের এক কাঁধে একটা হাত রাখলো। ‘ক্ষমার প্রশ্নই আসে না। তুমি যা করছ তোমার পরিবারের লাইগা করছ। আর এখন যা করতছ সেইটার ঋণ আমি কীভাবে শোধ করবো। যদি তোমার পরিবাররে কোনো সাহায্য করতে পারতাম!’
‘হুজুর, আমি আমার নিজের ভবনার জগৎ থেইকা যে-বাইর হইয়া আসছি। আমার পরিবার অনেক আগেই মারা পড়ছে এইটা আমি এখন অনুধাবন করতে পারছি। হেগোরে আমি বাঁচাইতে পারি নাই। কিন্তু অন্য কারও পরিবারের ক্ষতি যাতে না হয় সেইটা আমি দেখব এহন থেইকা,’ বলে সে মাসুমের হাত শক্ত করে ধরে ফেলল। যদি কোনো উপায় থাকত তয় আমি আপনেরে
‘তুম ওগো লগে থাক, ওগোরে নিরাপদে রসুল খাঁর এলাকায় পৌঁছানির দায়িত্ব এহন তোমার। যদি এইটা করতে পারো, এইটাই আমার জন্যে অইব সবচেয়ে বড়ো পাওয়া,’ বলে সে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল নুক্কুনকে।
‘হুজুর, আমরা প্রস্তুত,’ গেড়ুয়া বলে উঠল ওর পাশ থেকে। ‘আপনে যা যা বলছেন যেইভাবে বলছেন সব সেইভাবেই করা অইছে।’
মাসুম তার দিকে ফিরে মাথা নেড়ে ফিরে তাকাল রায়েলি আর তার পাশে থাকা সুবাদারের স্ত্রীর দিকে। ‘বেগম সাহেবা, আপনেরা নিরপদে পৌঁছায়া যান, আর একবার মসনদে আলার কাছে পৌঁছাইতে পারলে আর কোনো ঝামেলা নাই। আর তার কাছে পৌঁছাইলে আমার একটা বার্তা দিবেন তারে,’ বলে মাসুম তাকে জানিয়ে দিলো ঈশা খাঁকে কী বলতে হবে। সব শেষ করে ওদের বিদায় জানিয়ে মাসুম ফিরে তাকাল নিজের দুই বন্ধু ধোবল আর বরখার দিকে। ওদের দুজনকে একসাথে চেপে ধরল বুকের সাথে।
‘আরে ছাড় ছাড় কী করতাছোস?’ ধোবল স্বভাবসুলভ খুশির ভঙ্গিতে বলে উঠল।
‘তোগো দুইজনের কী করতে হবে মনে আছে তো, এইটার উপরে কিন্তু অনেক কিছু নির্ভর করতাছে,’ বলে মাসুম ফিরে তাকাল দুজনার দিকে। দুজনেই মাথা নেড়ে সায় জানাল।
‘চলো,’ বলে রায়েলি আর গেড়ুয়ার দিকে দেখল। দুজনেই প্রস্তুত। ওরা এগোতেই ধীরে ধীরে পরিখার ওপরের সেতুটা নামতে শুরু করল। ওটা নেমে পরিখার ওপরে স্থির হতেই সিঁড়ি বেয়ে নামতে শুরু করল মাসুম, গেড়ুয়া আর রায়েলি। গেড়ুয়া আর মাসুম শক্ত হাতে ধরে আছে বিরাট সিন্দুকটা।
যদিও সরাসরি মৃত্যুর দিকে এগিয়ে চলেছে তাও মাসুমের মনে একটাই ভাবনা, মসনদে আলা কি করছে এখন, ওরা কি তার কাছে সময়মতো পৌঁছাতে পারবে। আদৌ কি তার যুদ্ধে কোনো সাহায্য হবে?
.
অতীত
ব্রহ্মপুত্র আর শীতলক্ষ্যার সঙ্গমস্থল
মাসুমরা যখন বাহরাম খাঁ আর বিশা ডাকাতের বাহিনীর দিকে এগিয়ে চলেছে ঠিক সেই সময়ে টাঙ্গা গ্রামের যুদ্ধের ময়দানে মনসদে আলা ঈশা খাঁ আর মোঘল সেনাপতি মানসিংহের ভেতরে যুদ্ধ চরমে উঠেছে। মানসিংহ প্রথমে ঈশা খাঁকে তার নিজের যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবতেই পারেনি। আর সেই বোকামির ফসল গুনতে হয়েছে তার জামাতা দুর্জন সিংয়ের মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে। দুর্জনের মৃত্যুর পরই ক্রোধে অন্ধ মানসিংহ ঈশা খাঁ কে ছিন্নভিন্ন করে দেওয়ার প্রতিজ্ঞা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। কিন্তু আক্রমণ আর প্রতি আক্রমণের ধাক্কা পালটা ধাক্কা কয়েক দফা কেটে যেতেই সে অনুধাবন করতে পারে এই বাঙালিকে চট করে হারিয়ে দেওয়ার সম্ভাবনা স্রেফ বাতুলতা। কিন্তু তাই বলে আক্রমণ প্রতিআক্রমণে কোনো বিরতি না দিয়েই পরস্পরকে ঘায়েল করার জন্যে একের পর আঘাত চলতেই থাকে। প্রথম দফা কেউই কাউকে বিরতি না দিয়ে টানা আক্রমণের পর পরস্পর থেকে খানিকটা দূরে সরে যায় তারা দম নেওয়ার জন্যে। এরপরে মানসিংহই আবারও আক্রমণ চালায় ঈশা খাঁর ওপরে এখনও সেই আক্রমণের ধারাই অব্যাহত রয়েছে।
দুই দুইজন বলশালী পুরুষ, সেরা প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত যোদ্ধা একের পর আঘাত প্রতিঘাত আর প্রতিহত করে খুঁজে বের করার চেষ্টা চালাচ্ছে পরস্পরের দুর্বলতা, আবার কখনও কখনও চেষ্টা করছে পরস্পরের জন্যে ফাঁদ সৃষ্টি করে তাতে প্রতিপক্ষকে ফাঁদে ফেলতে। ঈশা খাঁ একেবারেই শান্তভাবে লড়াই করে চলেছে, বলতে গেলে প্রায় বিনা উত্তেজনায় দারুণ কৌশলের সাথে। কিন্তু যতই সময় প্রবাহিত হচ্ছে ততই বেশি উত্তেজিত হয়ে উঠছে মানসিংহ। প্রতিটা আঘাত এবং প্রতিঘাত যেন তার শরীরের কিংবা তরবারিতে নয় বরং তার ব্যক্তিত্বে গিয়ে আঘাত হানছে। যে-বাঙালিদেরকে সে চিরদিন দুর্বল ভীরু আর কাপুরুষ ভেবে এসেছে সেই বাঙালিদের একজন তার মতো মোঘল বাহিনীর সেরা সেনাপতির সাথে সমানে সমানে লড়াই করে চলেছে এই বিষয়টা সে কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না। মানসিংহ যতই উত্তেজিত হয়ে উঠছে ঈশা খাঁ যেন ঠিক ততটাই শান্ত ভঙ্গিতে লড়ে চলেছে। আর এটা আরও বেশি আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে মানসিংহের মাথার ভেতরে।
লড়াই চালাতে চালাতে মানসিংহ সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল এভাবে আর নয়। এই লড়াই এখন আর দুই যোদ্ধার লড়াই নয়, বাঙালি বনাম মোঘলদের লড়াই নয় এই লড়াই এখন সম্মান বনাম প্রতিপত্তির লড়াই হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানসিংহ চট করেই নিজের কৌশল পরিবর্তন করে সরাসরি আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল। ঈশা খাঁ দেখতে পেল তার প্রতিপক্ষ নিজের প্রতিরক্ষা ভেঙে তার প্রতিরক্ষা ভেদ করে চূড়ান্ত আক্রমণ চালানোর জন্যে ধেয়ে এগোতে শুরু করেছে তার দিকে।
.
বর্তমান
জঙ্গলবাড়ি দূর্গ, কিশোরগঞ্জ
পুকুর পাড়ের প্রতিটা প্রাণি একবার পানির দিকে দেখছে আবার স্ক্যানারের দিকে তাকাচ্ছে। ডুবুরিরা পানিতে নেমেছে আধা ঘণ্টার ওপরে হয়ে গেছে। আর অন্যদিকে ওদের প্রায় প্রতিটা মুভমেন্ট দেখা যাচ্ছে স্ক্যানারে। বাশার আনমনেই একবার স্ক্যানারের দিকে তাকিয়ে দেখল, ডুবুরি দুজন ভারী চারকোনা বক্সের মতো কিছু একটা উঠিয়ে নিয়ে আসছে। কিছুক্ষণ পরেই দুই ডুবুরির একজন পানি থেকে ওপরে মাথা তুলল। তার ঠিক পর দিয়েই আরেকজন মাথা তুলল। প্রথম জন ওপরে মাথা তুলে হাতের ইশারা করতেই পাড়ে দাঁড়ানো দুই গার্ড কিছু একটা ধরে উঠিয়ে আনতে শুরু করল। বাশার মনে মনে এদের কাজের ধরনের প্রশংসা না করে পারল না, এরা প্রায় প্রতিটা কাজ এত প্রফেশনালি করছে যে তা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে দেখার মতোই। সবকিছু এরা আগে থেকে ভেবে রেখেছে এবং সম্ভাব্য সব ধরনের পরিস্থিতির জন্যে প্রস্তুতি নিয়ে তো রেখেছেই সবচেয়ে বড়ো কথা যেকোনো কাজের জন্যে এদের আগে থেকেই রিসোর্স এবং প্রয়োজনীয় সব ধরনের উপাদান ঠিক করে রাখাই আছে।
পাড়ের গার্ড দুজন চারকোনা জিনিসটার সাথে আটকানো কর্ডটা ধরে টানতে শুরু করতেই ডুবুরিরা সেটা ছেড়ে দিয়ে ওরা উঠে এলো পাড়ে। আর গার্ডেরা জিনিসটাকে টেনে আনতে আনতেই বাশার আরেকবার ফিরে তাকাল সোহেলের দিকে এবং অবাক হয়ে লক্ষ করল কালো কোট মোটেই জিনিসটা ওঠানোর উত্তেজনায় পাহারা ভুলে যায়নি বা সে উত্তেজনার চোটে সব গুলিয়ে বসে থাকেনি। বরং ওরা জিনিসটাকে উঠিয়ে আনতে আনতেই কালো কোট তার বাকি গার্ডদেরকে দুইপাশে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে যাতে প্রতিটা লোক নজরের ভেতরে তো থাকেই সেই সাথে বাইরের উটকো কেউ যেন এখানে কোনো ঝামেলাও সৃষ্টি করতে না পারে।
জিনিসটা উঠিয়ে আনতেই বাশার প্রথমবারের মতো ওটার দিকে তাকিয়ে নিজের ভেতরে এক ধরনের গুজবাম্পস টের পেল এবং অবাক হয়ে খেয়াল করল পুরো জিনিসটা এক ধরনের স্বচ্ছ প্লাস্টিকের মতো কিছু দিয়ে মোড়ানো। ওটা কাদার নিচে থাকলেও জিনিসটাকে টেনে পানি থেকে আনতে আনতে ওপরের কাদা পরিষ্কার হয়ে তো গেছেই সেই সাথে, ওটার ওপরের আবরণও বের হয়ে গেছে ওটাকে টেনে পাড়ে উঠিয়ে আনতেই পরিষ্কার দেখা গেল জিনিসটাকে যে বা যারাই ওখানে রেখে থাকুক ওটা একেবারে ইনটেক আছে এমনভাবে মোড়ানো।
‘একেবারে এয়ারটাইট করে মোড়ানো হয়েছে,’ প্রফেসর হামিদ জিনিসটার দিকে ঝুঁকে ওটাকে পরখ করতে করতে বলে উঠল।
‘এটা সেই পনেরো শতকের জিনিস নয়, কেউ এটাকে পরে ট্রান্সপ্লান্ট করেছে। সেই সময়ে নিশ্চিই এই প্লাস্টিক ছিল না,’ অন্য কেউ একজন মতামত দিলো।
কুইক কুইক, হোয়াটএভার এটাকে সোজা গাড়িতে তোল, কালো কোটের গলায় উত্তেজনা। সে নিরাবেগ গলায় ওটাকে গাড়িতে তুলে ফেলার নির্দেশ দিলো।
‘এক মিনিট,’ তার গার্ডরা এগিয়ে যাচ্ছিল ওটার দিকে হঠাৎ বাশার চিৎকার করে উঠল, ‘ওটা কোথাও যাচ্ছে না। ওটাকে আগে খোলা হবে তারপর অন্য আলাপ হবে,’ বাশারের বজ্রকণ্ঠ শুনে সবাই থেমে গেল এবং সবাই অবাক হয়ে দেখল। বাশারের হাতে একটা কালো পিস্তল সার্চ লাইটের আলোয় চকচক করছে, আর সেটা সোজা তাক করা কালো কোটের দিকে।
‘ওটা ভেতরে যাই আছে আগে খোলা হোক, তারপর অন্য আলাপ, আমি দেখতে চাই ওটার ভেতরে কী আছে।’
***
অতীত
জঙ্গলবাড়ি দুর্গের সম্মুখভাগ
গেড়ুয়া আর রায়েলিকে নিয়ে মাসুম নিচে নেমে আসতেই মোঘল সৈনিকেরা ওদেরকে ঘিরে ফেলল এবং বলতে গেলে জন্তু জানয়ারের মতোই টেনে নিয়ে চলল ওদেরকে। ওদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হলো বড়, ভারী সিন্দুকটা।
মাসুমকে পিছমোড়া করে বেঁধে চড় চাপড় মারতে মারতে বাহিনীর সামনে নিয়ে হাঁটু গেড়ে বসিয়ে দেওয়া হলো। মাসুম সামনের দিকে তাকিয়ে দেখল ঘোড়ার ওপর থেকে নেমে আসছে একেবারে পুরোদস্তুর মোঘল পোশাকে সজ্জিত একজন মানুষ। মানুষটা কে হতে পারে সেটা খুব ভালোভাবেই আন্দাজ করতে পারলেও সে একেবারে পরিষ্কার দেখতে পেল আরেকটু কাছে আসার পর। তার এক সময়ের সতীর্থ মোঘল সেনাপতি, বাহরাম খাঁ। বাহরাম খাঁ ওর দিকে এগিয়ে এসে, প্রথমে মাটিতে থুতু ফেলল তারপর ভাঙা বাংলা আর নিজের ভাষা মিলিয়ে বলে উঠল, ‘মাসুম খাঁ কাবুলি, শালা ভিতু বাঙালি, তোকে জিন্দা পেয়ে খুব খুশি লাগছে। তবে আমার চেয়ে খুশি হবে আরেকজন,’ বলে সে ইশারা করতেই মাসুম চোখ তুলে দেখতে পেল ওদের ঠিক পাশেই এসে দাঁড়িয়েছে পাহাড়ের মতো বিরাটাকায় একজন মানুষ। গায়ে কালো পোশাক আর মাথায় লাল পাগড়ি। ‘বিশা সওদাগর, ওরফে ডাকাইত,’ মুখ থেকে রক্তাক্ত থুতু ফেলে বলে উঠল সে। ‘তোমার সাথে মোলাকাত হয়ে ভালোই লাগল। যদিও আগের মোলাকাতটাই বেশি ভালো আছিল,’ বলে মাসুম খিক খিক করে হেসে উঠল। সাথে সাথে বিশা ডাকাত তার বিরাট বপু নিয়ে ওর সামনে এসে সর্বশক্তিতে ওর বুকে লাথি মারল। মাসুম মাটিতে পড়ে যেতেই সে নিজের একটা পা তুলে দিলো মাসুমের বুকের ওপরে। মাসুমের মনে হতে লাগল ওর দম বন্ধ হয়ে আসছে। কিন্তু কেউ একজন বিশাকে টেনে সরিয়ে নিলো ওর বুকের ওপর থেকে। আবছাভাবে মাসুম শুনতে পেল বিশাকে মানা করা হচ্ছে ওকে এখনি মেরে না ফেলার জন্যে।
মাসুম কোনোমতে উঠে বসতে বসতে অনুভব করল ওর নাক মুখ ভেসে যাচ্ছে রক্তের ধারায়। কোনোমতে ও গেড়ুয়া আর রায়েলির দিকে তাকাল। ওদের দুজনার অবস্থাও খারাপ কিন্তু ওর মতো এতটা মারধর করা হয়নি। ওদের দিকে তাকিয়ে একবার মৃদু হাসি দিয়ে মাসুম একবার দুর্গের দিকে তাকাল, তারপর ফিরে তাকাল বাহরাম খাঁ আর বিশার দিকে। ওদের নিয়ে আসা সিন্দুকটাকে বাহিনীর একেবারে সম্মুখভাগে এনে রাখা হয়েছে। ওটাকে খোলার জন্যে আয়োজন চলছে। মাসুম মনে মনে খুশি হয়ে উঠল, ঠিক এমনটাই তো ও চেয়েছিল। আবারও একবার রায়েলি আর গেড়ুয়ার দিকে তাকাল তারপর দুর্গের দিকে তাকিয়ে ফিরে তাকাল সামনে। মঞ্চ প্রস্তুত, এবার নাটক শুরু হবে।
মোঘলদের একজন সিন্দুকটার আটকানো কবজার ওপরে তলোয়ার দিয়ে আঘাত করতেই ওটা দু-টুকরো হয়ে গেল। সবাই ঝুঁকে আছে সিন্দুকটার দিকে মোঘল বাহিনীর সৈনিক সিন্দুকটার ডালা মেলে ধরল ওপরের দিকে।
***
.
বর্তমান সময়
জঙ্গলবাড়ি দূর্গ, কিশোরগঞ্জ
কালো কোট বেশ তীব্র চাহনির সাথে তাকিয়ে আছে বাশারের দিকে। ‘মিস্টার বাশার, আপনার করিৎকর্মতা দেখে আমি আপনার প্রশংসা না করে পারছি না। কখন আপনি গার্ডদের কারও থেকে পিস্তল চুরি করে নিজের কাছে রেখে দিয়েছেন এত লম্বা সময় ধরে, ব্রিলিয়ান্ট। কিন্তু আপনাকে দেখে তো আমার বোকা মনে হয় না, তাহলে বোকামি করছেন কেন?’ বলে সে বাকিদের দিকে দেখল। গার্ডরা এতক্ষণ নিজেদের অস্ত্র লুকিয়ে রাখলেও এবার তারা প্রকাশ্যে বের করে এনেছে সব। আর সেগুলা তাক করা সোহেল, পৃথা, চৌধুরী আর প্রফেসর হামিদের দিকে। ‘আপনার কি মনে হয় আপনি একা একটা পিস্তল দিয়ে কী করতে পারবেন? আপনি এমনকি ট্রিগার টেপার আগেই আপনার নিরীহ সাথীরা তো মরবেই সেই সাথে আপনারও—’
‘আমি সত্যিই হতাশ হলাম আপনার ওপরে,’ বাশার আফসোসের সাথে মাথা নাড়তে নাড়তে বলে উঠল। ‘আপনার কি আমাকে এতটাই বোকা মনে হয় যে, আমি এই একটা পিস্তলের ওপরে ভরসা করে আপনাকে জিম্মি করব?’
কালো কোটকে বেশ বিহ্বল দেখাচ্ছে। ‘তাহলে?’
বাশার মৃদু হেসে উঠল তার কথা শুনে। ‘সেরের ওপরে সোয়া সের কথাটা শুনেছেন? আপনার ওপরেও যে আরেক পার্টি আমাদের পিছু নিয়েছিল সেটা কি ভুলে গেছেন? নাকি—’ বাশার কথা শেষ করার আগেই সোহেলের দিকে তাকিয়ে ইশারা করতেই সোহেল কোনোরকম জানান না দিয়েই লাফ দিলো পৃথার দিকে সে ঠিক পৃথার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল। পৃথাকে নিয়ে গড়িয়ে পড়ে গেল। আর বাশার নিজের হাতের পিস্তলটা ছুড়ে দিলো হতভম্ভ কালো কোটের দিকে। কালো কোট ওটা ধরার আগেই ও প্রফেসর হামিদকে নিয়ে গড়িয়ে পড়ে গেল। আর চৌধুরী আগেই শুয়ে পড়েছে। ওরা লাফ দিতেই একসাথে গর্জে উঠল একাধিক অস্ত্র। আর কালো কোটের গার্ডদের প্রায় সবাই গড়িয়ে পড়ে গেল মাটিতে। শুধু মাঝখানে পিস্তল হাতে দাঁড়িয়ে রইল কালো কোট।
লি আর লম্বা চুলের ছেলেটাও দাঁড়িয়ে আছে হতভম্বের মতো। ওদের চারপাশ থেকে হঠাৎই উদয় হলো একদল অস্ত্রধারী। সংখ্যায় প্রায় হাফ ডজন এবং প্রত্যেকের কাছে আধুনিক অস্ত্র তো বটেই মুখেও মুখোশ।
কালো কোট এখনও নিজের বিহ্বল অবস্থা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। সে শুধু বলে উঠল, ‘ইমপসিবল।’
‘এরা কারা?’ পৃথা কাঁপতে কাঁপতে জানতে চাইল
বাশার মৃদু হেসে এগিয়ে গেল পানির নিচ থেকে উঠিয়ে নিয়ে আসা জিনিসটার দিকে। ওটার ওপরের আবরণটা সরাতেই কাঠের একটা আকৃতি দেখা গেল ওটার ওপরে সেই প্রতীক চিহ্নটা আঁকা যেটা ওরা পৃথার মায়ের কবরের ওপরে দেখেছিল। প্রতীক চিহ্নটার দিকে দেখিয়ে বাশার বলে উঠল, ‘এরা হলো একটা কাল্টের প্রতিনিধি। আর এটা হলো এদের প্রতীক।’ পৃথার দিকে ফিরে বলে উঠল, ‘তোমার মাও এই কাল্টের একজন ছিল। কি, ঠিক বলেছি?’ মুখোশধারীদের দিকে তাকিয়ে জানতে চাইল বাশার।
মুখোশধারীদের একজন পায়ে পায়ে এগিয়ে এলো বাশারের দিকে। ‘ঠিকই বলেছেন ইন্সপেক্টর কিন্তু সবই বুঝতে পেরেছেন একটু সময় নিয়ে ফেললেন আরকি,’ বলে সে নিজের লোকদের দিকে ফিরে বলে উঠল, ‘এদেরকে একপাশে করো। এরপর সিন্দুকটা খোলো। আমাদেরকে চেক করে দেখতে হবে সব ঠিক আছে কি না,’ বলে সে ওদের দিকে ফিরে বলে উঠল, ‘ইতিহাসের একটা টুকরো দেখতে পাবেন,’ বলে সিন্দুকটার দিকে ইশারা করতেই ওদের একজন ওপরের আবরণ সরিয়ে ওটার ডালাটা মেলে ধরল।
***
জঙ্গলবাড়ি দুর্গের সম্মুখভাগ
একের-পর-এক আঘাতের চোটে অবস্থা কাহিল হলেও সামনের দিকে তাকিয়ে মাসুমের তাদের গ্রামদেশে প্রচলিত একটা পুরনো প্রবাদ মনে পড়ে গেল। নেতা থেকে খেতা সবারই কাঁদতে হয়। কথাটার মর্মার্থ হলো মানুষ সমাজ কিংবা অথনৈতিক আবরণের যে যে-স্তরেই বাস করুক না কেন, একটা পর্যায়ে সবাই সমান। সামনের দিকে তাকিয়ে মাসুমের এই কথাটা মনে হবার একমাত্র কারণ হলো চাকর-মনিব সবাই এক কাতারে দাঁড়িয়ে গেছে ওদের নিয়ে আসা সিন্দুকটা দেখার জন্যে। কৌতূহলের সামনে সবাই সমান, মনে মনে ভাবল মাসুম।
মাসুম, গেড়ুয়া, রায়েলিকে বন্দি অবস্থাতেই একপাশে সরিয়ে রাখা হয়েছে। আর পুরো বাহিনীর সম্মুখভাগে নিয়ে যাওয়া হয়েছে সিন্দুকটা খোলার জন্যে। আর ওটার ভেতরে কী আছে দেখার জন্যে ভিড় করেছে মোঘল বাহিনীর প্রতিটা প্রাণী। মাসুম মনে মনে ভাবল ক্ষমতার দম্ভ শক্তি-সম্পদের লোভ মানুষকে অন্ধ করে ফেলে। আর বাহরাম খাঁর ক্ষেত্রেও সেটাই হয়েছে। আর তাকে অন্ধভাবে অনুসরণ করেছে বিশা ডাকাত। দুজনেই নিজেদের শক্তি, ক্ষমতা আর লোভের মোহে এতটাই অন্ধ হয়ে গেছে যে একদিকে ওদের কাউকে বাঁধার প্রয়োজন বোধ করেনি, অন্যদিকে নিজেরা নিজেদেরই বাহিনীরই প্রতিরক্ষার দিকে নজর না রেখে সোজা সিন্দুক নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। বাহরাম খাঁ আর বিশা তো বটেই তার বাহিনীর সম্মুখভাবে থাকা লোকরাও সবাই ঘিরে ধরেছে সিন্দুকটাকে, এমনকি ওদের পাহারায় যারা আছে ওদেরও নজর ওদিকেই। নিজের হাতটাকে শক্ত করে ধরে শেষবারের মতো গেড়ুয়া আর রায়েলির দিকে দেখে নিলো মাসুম, সেই মুহূর্তেই বাহরাম খাঁর বাহিনী প্রধানের কোপে সিন্দুকের ডালাটা খুলে গেল, আর একসাথে ঘটে গেল বেশ কয়েকটা ঘটনা।
***
বর্তমান
জঙ্গলবাড়ি দূর্গ, কিশোরগঞ্জ
মুখোশধারীদের একজন ডালাটা মেলে ধরার চেষ্টা করল প্রথম ধাপে সে সফল হলো না। ডালাটার নিচে সেভাবে কোনো তালা না থাকলেও বারবার ওটাতে চাপ দিয়ে কিংবা ধাক্কা দিয়েও কেউই খুলতে পারল না। মুখোশধারীদের একজন প্রথম নিজের কোমর থেকে পিস্তল বের করতেই সবার সামনে থাকা মুখোশধারী ধমকে উঠল তারপর সে কিছু একটা বলতেই লোকটা পিস্তলটা কোমরে ঢুকিয়ে কিছু একটা আনতে গেল।
ব্যাপার কী? এখানে হচ্ছেটা কী?’ প্রফেসর হামিদ অনেকক্ষণ পর চেঁচিয়ে উঠল। ‘কেউ কি আমাকে বলবে আসলে এখানে হচ্ছেটা কী?’
‘সব জানতে পারবেন, প্রফেসর। আর খানিক সময় অপেক্ষা করুন,’ বাশার বেশ খুশি খুশি স্বরে বলে উঠল
আমরা শুরু থেকে সবকিছু করে এখন সব হারাতে বসেছি আর আপনি কি না হাসছেন?’ পৃথা বলে উঠল। বাশার তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে উঠল। ‘আসলেই কী?’ সে আরও কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, তার আগেই মুখোশধারীদের একজন ধমকে উঠল। চৌধুরী এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে বাশারের দিকে। বাশারও মৃদু হাসিমুখে তাকিয়ে রইল তার দিকে।
কিন্তু অল্প সময় পরেই দৃষ্টি ফিরিয়ে চোখ তুলে তাকাল সামনের দিকে। কারণ সেই মুখোশধারী লোকটা আবার ফিরে এসেছে এবার তার হাতে ক্রোবারের মতো একটা জিনিস। সেটাকে সিন্দুকের পাল্লার সাথে ঠেকিয়ে জোরে চাড় দিতেই ফুসসস করে শব্দ হয়ে খুলে গেল। বাশার অনুমান করল, কোনো-না-কোনোভাবে ওটাকে এয়ারটাইট করে রাখা হয়েছিল, যে কারণে এই শব্দ হয়েছে।
ডালাটা খুলে গেলেও ভেতরে সরাসরি কিছুই দেখা গেল না। কারণ ভেতরে আরেকটা স্টিলের পাতের মতো কিছু দিয়ে আটকানো। সেটাকে খুলতে খুব বেশি সময় নিলো না। আর ওটাকে উঠিয়ে আনতেই সবার চোখ গোল হয়ে গেল বিস্ময়ে।
সত্যিকার অর্থেই ভেতরে দামি জিনিসে ভরপুর। রাশি রাশি সোনার মোহর, ভারী গহনা, বিভিন্ন রকম মুর্তি আর দামি পাথরে ভরা। বাশার অবশ্য খুব বেশি অবাক হলো না। ও এরকম কিছুই আশা করেছিল। ও বরং মনোযোগের সাথে আশপাশে দেখতে দেখতে খানিক অবাক হয়ে আবিষ্কার করল ওর মতো ঠিক পৃথাও মোটেই অবাক হয়নি।
বাশার সামনের দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে দেখল, সেই প্রথম মুখোশধারী সামনে এগিয়ে গিয়ে অন্য লোকটা যে-ডালাটা খুলেছে তাকে কিছু একটা নির্দেশ দিলো। সেই লোকটা এবং তার সাথের আরেকজন মিলে সিন্দুকের ভেতর থেকে দামি দামি জিনিসপত্র সরিয়ে বাইরে একরকম বলতে গেলে অবহেলার সাথে ফেলে দিয়ে আরও ভেতরে দেখতে লাগল।
‘এরা করছেটা কী?’ বাশার অনুভব করল ওর পাশ থেকে সোহেল বলে উঠল। এবারও নিজের সামনের দিকে না দেখে বাশার মনোযোগের সাথে আশপাশে দেখতে লাগল এবং পরিষ্কার দেখতে পেল বন্দি থাকার পরও অত্যন্ত আগ্রহের সাথে কালো কোট সামনের দিকে দেখছে। সাথে সাথে সামনের দিকে তাকিয়ে বাশার আবিষ্কার করল, ওরা যা খুঁজছে সেটা সম্ভবত পেয়ে গেছে।
সেই প্রথম মুখোশধারী সিন্দুকের ভেতর থেকে দুই হাতে ধরে খুবই বিচিত্র দেখতে জ্বলজ্বলে পাথর খণ্ডের মতো কিছু একটা বের করে আনল। জিনিসটা বের করে আনতেই মুখোশধারীরা আনন্দে চিৎকার করে উঠল
বাশার অনুভব করল ওর পাশ থেকে পৃথা কিছু একটা বলে উঠল কিন্তু সেটা না শুনে বাশার ওদেরকে বন্দি করে রাখা পাহারাদারদেরকে উপক্ষো করে সবাইকে ঠেলে ধাক্কা দিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে লাগল। ওরা কেউ বাধা দেবার আগেই বাশার পৌঁছে গেল সিন্দুক আর সেই প্রথম মুখোশধারীর সামনে। ওকে দেখার সাথে সাথে একজন এগিয়ে এসে বন্দুক চেপে ধরল ওর মাথার পাশে।
কিন্তু বাশার হাসিমুখে জানতে চাইল, ‘যা খুঁজছিলে তা তো পেলে, তবে এখন কী?’
সেই প্রথম মুখোশধারী কিছু একটা জবাব দিতে যাচ্ছিল তার আগেই বাশার হাসিমুখে বলে উঠল, ‘তোমাদের জন্যে অনেকগুলো কঠিন সিদ্ধান্ত আমি একটু সাহায্য করছি কী করতে হবে,’ বলে সে নিজের একটা হাত তুলে ইশারা করল অদৃশ্য কারও উদ্দেশ্যে। সাথে সাথে ধুপ করে একটা গুলির শব্দের সাথে সাথে ওর মাথার পাশে পিস্তল চেপে ধরে রাখা গার্ডটার খুলি উড়ে গেল।
বাশার এক কদম প্রথম মুখোশধারীর দিকে এগিয়ে গিয়ে বলে উঠল, ‘তোমরা প্রফেশনালি কাজ করো, কাজেই আমি যা বলছি সেটা তোমরা খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারবে। যদি এক বিন্দু নড়ো কেউ তবে প্রত্যেককে মরতে হবে। এই মুহূর্তে চারপাশ থেকে তোমাদেরকে অন্তত আধা ডজন স্নাইপার ঘিরে রেখেছে। বলে সে মুখোশধারীর বুকের দিকে দেখাল। ওখানে স্নাইপিং রাইফেলের একাধিক লেজার পয়েন্টার লাফালাফি করছে।
‘অসম্ভব,’ শব্দটা দুজন মানুষের মুখ থেকে একসাথে বেরিয়ে এলো। এখন সেই মুখোশধারী আর অন্যজন সেই কালো কোট।
‘অসম্ভব কি না এখনই দেখতে পাবে,’ বাশার কথা শেষ করার কিছুক্ষণের ভেতরেই ওদের মাথার ওপরে চক্কর মারতে শুরু করল অন্তত তিন তিনটা হেলিকপ্টার।
‘এটা কীভাবে সম্ভব? আমি নিজে তোমাকে নিরস্ত্র করে চেক করেছিলাম, ‘ কালো কোট অবাক ভঙ্গিতে বলে উঠল। ‘এতবার এত ভাবে চেক করা হয়েছে, তবুও!’
বাশার মুখোশধারীর থেকে পেছন ফিরে তার দিকে এগিয়ে গেল খানিকটা তারপর মৃদু হেসে বলে উঠল, ‘দেওয়ার আর মোর থিংস বিটুইন হ্যাভেন অ্যান্ড আর্থ। তুমি বুঝবে না, মাস্টার জেড,’ বলে সে চোখ তুলে তাকাল কালো কোটের দিকে। ‘ওটাই তো তোমার কোড নেম, তাই না?’
লোকটা এখনও চোখ গোল গোল করে তাকিয়ে আছে বাশারের দিকে।
***
বর্তমান
পিবিআই, ধানমন্ডি
যত সন্ধে নেমে আসছে পিবিআই স্পেশাল ব্রাঞ্চ অফিসের ব্যস্ততা যেন ততই বেড়ে চলেছে। অন্যান্য দিন যখন এই সময়ে সবাই সারাদিন অফিস করে অলস ভঙ্গিতে চা-কফি খেতে খেতে আড্ডা মারে, আজ সেখানে অফিস আওয়ার পার হয়ে গেলেও সময়ের সাথে সাথে ব্যস্ততা যেন বেড়েই চলেছে। কারণ একসাথে একাধিক জায়গায় একাধিক অপারেশন চলছে।
হাবিব আনোয়ার পাশাকে দেখে মনে হচ্ছে যেন কারও সাথে ঝগড়া করতে যাচ্ছে। তার টাইয়ের নট খোলা, দুই শার্টের হাতা গোটানো। মোবাইলে কথা বলতে বলতে সে অপারেশন রুমে ঢুকল। ওখানে আগে থেকেই পাটোয়ারি, লম্বা চুলের সেই ডেস্ক অফিসার ছেলেটা, মৌসুমি এবং একজন অপারেটর অপেক্ষায় ছিল। তাকে দেখে সবাই উঠে দাঁড়াতেই খানিক বিরক্তির সাথে সে বলে উঠল, ‘তোমাদেরকে না মানা করেছি, আমাকে দেখে এভাবে সবসময় ওঠা-বসা করার প্রয়োজন নেই। এখন কাজের অগ্রগতি কী, বলো।’
‘স্যার, ভালোমন্দ দুটো খবরই আছে,’ মৌসুমি বলে উঠল।
আগে ভালোটা বলো,’ আনোয়ার পাশা তাকিয়ে আছে ওদের দিকে। সে অনুমতি দিতেই মৌসুমি অপারেটরের দিকে ফিরে ইশারা করল।
‘একাধিক ভালো খবর আছে, স্যার। ওইদিন যে-রিসোর্সের জন্যে আমরা মিটিং করেছিলাম সেগুলো তো পেয়েছিই এবং সেই স্পেশাল সাপোর্ট এবং রিসোর্স টিমের বদৌলতে ইন্সপেক্টর বাশার কেস অনেকটাই সলভ করে ফেলেছে। এইমাত্র কথা হয়েছে তার সাথে।’
‘সলভ মানে,’ আনোয়ার পাশার গলার স্বর শুনলে যে কেউ ভাববে সে ধমকে উঠেছে। আসলে কাজের সময়ে সে এভাবেই কথা বলে। ‘সে প্রফেসর ইফতেখারকে খুঁজে পেয়েছে?’
‘না, স্যার,’ আনোয়ার পাশার ভ্রু কুঁচকে উঠছে দেখে সে জলদি যোগ করল। ‘তা সে পায়নি কিন্তু বলতে গেলে সে বিরাট এক গুপ্তধন আবিষ্কার করে বসেছে কিশোরগঞ্জে। পাশাপাশি নেক্রপলিসের বিরাট এক মহারথী, যে মাস্টার জেড নামে পরিচিত তাকে এবং আরেকটা কি এক কাল্টের মেম্বাররাও ধরা পড়েছে।’
‘এই মাস্টার জেড কি সিলেটে ধরা পড়া মাস্টার ডি আর চট্টগ্রামের মাস্টার ইউ এর সাথে কোনোভাবে সংশ্লিষ্ট নাকি?’
‘অবশ্যই স্যার, আমরা ধারণা করছি এ আসলে ওদের চেয়েও বড়ো। এ আসলে ওদের বস হতে পারে।’
‘আচ্ছা, আর অন্য কাল্টটা?’
‘ওদের ব্যাপারে এখনও বিশদ জানা যায়নি তবে, ইন্সপেক্টর বাশার আরও দুটো কথা বলেছে, সে রাজদ্রোহীর ব্লু খুঁজে পেয়েছে এবং প্রফেসর ইফতেখারের বিষয়েও কিছু নির্দেশনা দিয়েছে আমাদেরকে।
ফলো করো, সে যাই বলেছে সেই কাজ করো, এর আগেও সে যা বলেছে সেটা করাতেই ফল পাওয়া গেছে,’ বলে সে ভ্রু নাচিয়ে জানতে চাইল, ‘এবার
খারাপ খবর বলো।’
‘স্যার, সিলেট আর চট্টগ্রাম অপারেশন নিয়ে কিছু জটিলতা দেখা দিয়েছে,’ এবার মৌসুমি মুখ ভার করে বলে উঠল।
***
অতীত
জঙ্গলবাড়ি দূর্গের সম্মুখভাগ
শেষবারের মতো মাসুম যেই মুহূর্তে অনুভব করল তাদের সময় সন্নিকটে, একবার সে গেড়ুয়া আরেকবার রায়েলির দিকে ফিরে তাকাল। দুজনেই সায় জানালো, সেই সাথে সিন্দুক খোলার শব্দ ভেসে এলো।
মোঘল আর বিশার বাহিনীর প্রতিটা লোক এগিয়ে এলো সিন্দুকের ভেতরে কী আছে দেখার জন্যে। বিশেষ করে বাহরাম খাঁ আর বিশা, সাথে যে লোকটা ডালাটা খুলেছে সে। তিনজনেই বলতে গেলে একেবারে ঝুঁকে পড়েছে ডালাটার ওপরে। যেই মুহূর্তে ওটা খুলে গেল ওরা কে কী আশা করেছিল মাসুম জানে না, কিন্তু ভেতর থেকে সটান সোজা হয়ে বসল দুটো মনুষ্য মূর্তি। ধোবল আর বরখা তাদের দুজনারই হাতে ধরা একটা করে লম্বা ছুরি। ওরা সোজা হয়ে বসেই হাতে ধরা ছুরি দুটো ঢুকিয়ে দিলো দুই মোঘল সৈনিকের পেটে। সেই সাথে লাফিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে দুজনেই হাতে ধরা গোল মতো একটা জিনিস মাথার ওপরে তুলে ধরল যতটা সম্ভব উঁচু করে। আর অন্যদিকে সেটা দেখামাত্রই মাটিতে শুয়ে পড়ল মাসুম গেড়ুয়া আর রায়েলি
মোঘল বাহিনী প্রথমত এমন কিছ আশাই করেনি। তাই সৈনিক লোকটা পেটে আঘাত পেয়ে গড়িয়ে পড়ে গেলেও ওরা এমন ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেল, মুহূর্তের জন্যে বুঝতেই পারল না আসলে কে কী করবে, নিজেদের করণীয় ঠিক করার আগেই ধোবল আর বরখার উঁচু করে ধরা জিনিস দুটোর দিকে উড়ে এলো একাধিক জ্বলন্ত তির। তিরগুলো এসে খট করে গেঁথে গিয়ে মূহূর্তের জন্যে জ্বলতে থাকল, তারপর আগুন ধরে গেল দুর্গে পাওয়া জ্বালানি দিয়ে বানানো বিস্ফোরকের পোঁটলাটাতে, এরপর তীব্র শব্দে গোলার মতো বিস্ফোরিত হলো। তীব্র বিস্ফোরণের ধাক্কায় সাথে সাথে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল ওটা ধরে থাকা ধোবল বরখা আর আশপাশের কয়েকজন। বিস্ফোরণের ধাক্কায় অস্ত্রসস্ত্র, জিনিসপত্র আর ঘোড়াসহ এদিক-সেদিক ছিটকে পড়ল মোঘল বাহিনীর পুরো সম্মুখভাগ।
বিস্ফোরণের ধাক্কায় ছিটকে পড়লেও সবাই যখন হতচকিত হয়ে গেছে সাথে সাথে মাটি থেকে উঠে দাঁড়াল মাসুম। হাতের কাছে থাকা এক সৈনিকের বর্শাটা একটানে তুলে নিয়ে ওটা সোজা বসিয়ে দিলো তার গলাতেই। অর্ধমৃত সৈনিকের কোমর থেকে টান দিয়ে বের করে নিলো তলোয়ারটা। ওটা হাতে নিয়েই দেখল উঠে দাঁড়িয়েছে রায়েলি আর গেড়ুয়া। তলোয়ারটা গেড়ুয়ার দিকে ছুড়ে দিয়ে বর্শাটা ছুঁড়ে দিলো রায়েলির দিকে। নিজে মাটি থেকে তুলে নিলো একটা ঢাল আর কুঠার।
খানিক এগিয়েই দেখতে পেল মাটিতে ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে পড়ে আছে বাহরাম খাঁ, লোকটা মারা গেছে দেখে আফসোসের সাথে মাথা নাড়ল মাসুম। সেই সাথে অল্প দূরেই দেখতে পেল মাটি থেকে উঠে দাঁড়াচ্ছে বিশা ডাকাত। কুঠারটা মাথার ওপরে তুলে এক চিৎকারের সাথে বিশার মুণ্ডুটা ধড় থেকে আলাদা করে মাসুম ফিরে তাকাল রায়েলি আর গেড়ুয়ার দিকে।
আহত বিধ্বস্ত মোঘল বাহিনীর সম্মুখভাবে দেওয়ালের মতো দাঁড়িয়ে গেল তিনজনে
মুহূর্তের জন্যে দুর্গের দিকে তাকিয়ে দেখতে পেল ওটার সামনের অংশ দাউ দাউ করে জ্বলতে শুরু করেছে। মনে মনে আশা করল আগুন ধরিয়ে দিয়ে ওরা হয়তো পালাতে পেরেছে।
গেড়ুয়া নিজের রক্ত দিয়ে কপালে তিলক এঁকে মুহূর্তের জন্যে দুই হাত জড় করে রাখল ভক্তি ভরে, তারপর চোখ তুলে তাকাল মাসুমের দিকে। রায়েলি আগে থেকেই তাকিয়ে ছিল ওর দিকে। তিনজনেই তিনজনের দিকে তাকিয়ে হাসল, তারপর ফিরে তাকাল সামনের শত শত সৈনিকের দিকে। বিধ্বস্ত অবস্থা থেকে উঠে দাঁড়াতে শুরু করেছে ওরা।
‘মাতৃভূমির জন্যে,’ বিড়বিড় করে বলে উঠল মাসুম। ‘মানবতার জন্যে, ‘ রায়েলি ওর পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। ‘দেবীর লাইগা,’ গেড়ুয়ার মুখ দিয়ে শব্দগুলো বেরিয়ে আসতেই তিনজনে ঝাঁপিয়ে পড়ল হাজারো সৈনিকের বাহিনীর ওপরে।
***
মাসুমের পরিকল্পনা ঠিক করে গেড়ুয়ার বাহিনীর লোকদেরকে আর সুবাদারের স্ত্রী আর তার সাথের মানুষদেরকে তার আর সুলতানের নেতৃত্বে বুঝিয়ে দিতেই সিন্দুকের ভেতরে যা ছিল সেগুলো দুর্গে থাকা একটা কাঠের পিপাতে ভরে ওরা রওনা দেয় দুর্গের নিচের পাতাল পথ ধরে। প্রথমে সেটা দিয়ে এগিয়ে এসে ওরা বের হয় দুর্গের পেছনের জঙ্গলে। তারপর সেখান থেকে পায়ে হেঁটে মাইলখানেক এগিয়ে পৌঁছায় একটা খালের কিনারায়। সেখানে বেশ কয়েকটা নৌকা আগে থেকেই ছিল। সেগুলোর একটাতে চড়ে ওরা বেশ কিছুক্ষণ পর যখন মূল নদীতে পড়ল। সেখান থেকে জঙ্গলবাড়ির দিকে তাকিয়ে দেখতে পেল পুরো দুর্গ দাউ দাউ করে জ্বলছে। জলন্ত দুর্গের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে নুক্কুন একবার মাসুমের নাম নিলো, তারপর সে হাতে ধরা ছোটো একটা জিনিস চেপে ধরল। এই জিনিসটা মাসুমের দেওয়া শেষ বার্তা তার মসনদে আলার কাছে। যেভাবেই হোক এটা আর ওই জিনিসগুলো পৌঁছাতে হবে তার কাছে।
নুক্কুন মনে মনে ভাবল, মসনদে আলা কি যুদ্ধে জিততে পারল?
***
অতীত
ব্রহ্মপুত্র আর শীতলক্ষ্যার সঙ্গমস্থল
মানুষ ভাবে এক আর হয় আরেক। মানুষ নিজ থেকে যত চেষ্টাই করুক, ভবিতব্য কখনও কখনও মানুষের নিয়তি নিজ থেকেই নির্ধারণ করে দেয়। মানসিংহ ঈশা খাঁকে কাবু করতে না পেরে একের-পর-এক আক্রমণে বিপর্যস্ত করে তুলতে চেয়েছিল। কিন্তু সেইদিকেও বেশি সুবিধা না হওয়াতে উলটো বরং সে নিজের ক্রোধে অস্থির হয়ে উঠতে শুরু করে। ক্রোধের কারণ যতটা না যুদ্ধ কৌশল ছিল তারচেয়ে অনেক বেশি ছিল নিজের মোঘল অহমিকা, যে কি না কোনো অবস্থাতেই এক বাঙালিকে কাবু করতে না পেরে আরও অস্থির হয়ে উঠছিল।
ঈশা খাঁ দেখল মানসিংহকে কাবু করতে হলে এটাই সুযোগ, কারণ ক্রোধে অস্থির হয়ে সে নিজের প্রতিরক্ষা ভেঙে বসে আছে। ঈশা খাঁ কৌশলে একের-পর- এক আঘাত ঠেকিয়ে ধীরে ধীরে নিজ থেকে আক্রমণে যাবার জন্যে উলটো আঘাতের পরিমাণ বাড়াতে শুরু করার কৌশলে আশ্রয় নিতে শুরু করল। কিন্তু সে যা করতে চেয়েছিল তা করার আগেই ঘটে গেল আরও বিচিত্র আর অদ্ভুত এক ঘটনা।
ক্রোধের বশে মানসিংহের করা তীব্র আক্রমণ প্রতিরোধ করে ঈশা খাঁ নিজ থেকে পূর্ণ শক্তিতে আঘাত করতেই হঠাৎ দু-টুকরো হয়ে গেল মানসিংহের তলোয়ার। মানসিংহ তো বটেই এমনকি ঈশা খাঁও তাজ্জব হয়ে প্রত্যক্ষ করল তার প্রতিপক্ষের তরবারি দু-টুকরো হয়ে পড়ে গেল মাটিতে। শুধু দুই যোদ্ধাই নয় এই ঘটনায় নাভিঃশ্বাস উঠে গেছে দুইপাড়ের দুই বাহিনীর হাজারো সৈনিক আর সেনাপতির ভেতরে। কী হয় কী হয় উত্তেজনায় উদগ্রীব হয়ে উঠেছে সবাই।
ক্ষণিকের জন্যে মানসিংহ ফিরে তাকাল ঈশা খাঁর দিকে। চোখের সামনে সে তার পুরো জীবন দেখতে পাচ্ছে। হতবিহ্বল হয়ে অনুধাবন করার চেষ্টা করল তার প্রতিপক্ষ ঠিক কীভাবে আঘাত করতে পারে তাকে। ঠিক কতটা সময়ের ভেতরে হত্যা করবে তাকে, নিজের জীবনের পরোয়া মানসিংহও করে না; কিন্তু নিজের আত্মসম্মান হারানোর ভয়ে চোখে পানি চলে এলো তার। আপনাতেই নিচু হয়ে এলো নিজের মাথাটা। অপেক্ষা করতে লাগল গ্লানিময় পরাজিত মৃত্যুর
কিন্তু খানিক সময় ব্যয় হবার পরও যখন কিছু হলো না, সে অবাক হয়ে দেখল তার থেকে খানিক দূরেই তরবারি হাতে দাঁড়িয়ে আছে তার প্রতিপক্ষ, সে চোখ তুলে তাকাতেই তাকে তলোয়ারের পরিবর্তে শরীরিক শক্তিতে জয়-পরাজয় নির্ধারণ করার মল্লযুদ্ধের জন্যে আহ্বান করতে লাগল সে। কিন্তু একজন মোঘল হিসেবে এটাও তার জন্যে অপমানের। আবারও নিজের মাথা নিচু করে ফেলল মানসিংহ।
মাথা নিচু করে রইলেও পরিষ্কার অনুভব করতে পারল তার শক্তিশালী প্রতিপক্ষ এগিয়ে আসছে তার দিকে। মানুষটার প্রতিটা পদক্ষেপ সে পরিষ্কার শুনতে পাচ্ছে, সেই সাথে সে শুনতে পাচ্ছে নিজের আসন্ন মৃত্যুধ্বনি। পরিষ্কার অনুভব করতে পারছে দিল্লির দরবারে তার গ্লানিময় পরাজয়ের গুঞ্জন। মানসিংহ অনুভব করতে পারল তার প্রতিপক্ষ তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। এবার নিশ্চিত তাকে আঘাত করবে সে। শেষ মুহূর্তে সব ভয়, সব শঙ্কা আর অসহায়ত্ব বিসর্জন দিয়ে মাথা সোজা করে দাঁড়াল সে নিজের প্রতিপক্ষের দিকে। যদি মরতেই হয়, তবে মাথা উঁচু করে বীরের মতো মরবে সে।
মাথা সোজা করে সামনে তাকাতেই সে দেখতে পেল সামনে সিনা টান করে দাঁড়িয়ে আছে যুদ্ধ সাজে সজ্জিত মানুষটা। হাতে ধরা ভারী একটা তরবারি। এবার সেটা নিশ্চয়ই নেমে আসবে তার মস্তক বরাবর। মৃত্যুকে সে ভয় করে না, আর সেটা এই বাঙালিকে বুঝিয়ে দিতে হবে তার। শেষ মুহূর্তে সে মাথা উঁচু করে মুখ খুলে কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু অবাক হয়ে দেখলো তার দিকে নিজের তরবারিটা এগিয়ে দিয়েছে তার প্রতিপক্ষ, আর সেটাকে তার দিকে এগিয়ে দিয়ে ঈশা খাঁ বলে উঠল, ‘আপনি আমার তরবারি নিন। আমি আরেকটা তরবারি আনানোর নির্দেশনা দিচ্ছি।’
পলকের জন্যে মানসিংহের পৃথিবী যেন টলে উঠল, চোখের সামনে তার আবারও ভেসে উঠল পুরো জীবন আর টুকরো টুকরো স্মৃতি। পলকের ভেতরে তার মোঘল অহমিকা থেকে শুরু করে পাহাড় সমান আত্মসম্মানবোধ সমুদ্রের তীব্র স্রোতের মতো ভেসে গেল এক বাঙালি বীরের প্রস্তাবে। নিজের সামনে থাকা তরবারিটাকে এক হাতে সরিয়ে দিয়ে সে বন্ধুত্বের বন্ধনে জড়িয়ে ধরল ঈশা খাঁকে।
***
‘অস্থির হবার কোনো কারণ নেই,’ বাশার হাতে ধরা সিগারেটটা সামান্য উঁচু করে বাকিদের দিকে সামান্য ইশারা করে বলে উঠল। ‘সবকিছুই আমাদের নিয়ন্ত্রণে আছে। এখানে এবং ঢাকাতেও,’ পুরো কথাটা সে সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললেও শেষ কথাটা সে বলেছে একবার চৌধুরী আরেকবার পৃথার দিকে তাকিয়ে। বলেই সে স্পেশাল ফোর্সের প্রস্তুতির দিকে একবার দেখে নিলো। ‘ওদের আরেকটু সময় লাগবে সব গোছাতে। বিশেষ করে এতগুলো লোককে অ্যারেস্ট করে, যা উদ্ধার করা হয়েছে সেগুলো গুছিয়ে পুরো এলাকা সিল করে পাহারা বসিয়ে সব কাজ সারা তো মুখের কথা না।
‘আমি অনেকটাই জানি, কিন্তু তুমি এমনকি পুরোটা আমাকেও বলোনি,’ সোহেল কথাটা খানিকটা অভিমানের সুরেই বলল।
‘বলোনি কারণ, আমি জানতাম আমার গ্রুপের ভেতরে প্রবলেম আছে। আর তোকে না বলার পেছনে বড়ো কারণ ছিল, মিশন শুরু করার পর একটা বড়ো সময় আমি ভেবেছিলাম বেঈমান আসলে তুই,’ বাশারের কথা শুনে সোহেলের চোখ কপালে উঠল। কিন্তু সে কিছু বলার আগে মাথা নাড়ল বাশার। ‘তোর কি মনে হয় না যে এটাই স্বাভাবিক? তোর সাথে অল্প সময়ে আমি যতই ক্লোজ হই না কেন, তোর সাথে আমার পরিচয় গতকাল সকালে এটা তো অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।
‘আমি পুরো বিষয়টা খুলে বলছি,’ সে সবার দিকে এক পলক দেখে নিলো ওরা সেই পুকুরের ঘাটে বসে আছে। ‘প্রথমে যখন আমাকে মিশনটা দেওয়া হলো। তখন আমি আসলে এর গভীরতা বুঝতে পারিনি। কিন্তু মিশনটা পাবার সাথে সাথেই যখন জানতে পারলাম জেল থেকে চৌধুরী মিসিং হয়েছে, তখন একটা ধাক্কা খেয়েছিলাম বটে। কিন্তু তখনও আমি পুরো বিষয়টা বুঝতে পারিনি। প্রথম আমি বিষয়টা খানিকটা অনুধাবন করতে পারলাম যখন দিনের বেলা পৃথার জন্যে অপেক্ষা করতে করতে বারবার কেস ফাইলটা পড়ছিলাম। একটা বিষয় পরিষ্কার যে এই কেসটাকে ওপর থেকে সাধারণ একজন মিসিং পারসনের কেস বলে মনে হলেও আসলে বিষয়টা তা নয়। কারণ একে তো প্রফেসর ইফতেখারের সাথে প্রফেসর আবদেলের একটা সম্পর্ক আছে। তার ওপরে তাদের আবার বিস্তারিত ব্যাকগ্রাউন্ড আছে, আবার সেই ব্যাকগ্রাউন্ডের সাথে অতীতের যোগাযোগ আছে, এসবের সাথে আবার জড়িয়ে আছে অন্তর্জাতিকভাবে কুখ্যাত একাধিক মহল। কাজেই এই কেসে এমন সব বিষয় আছে যা আমার পক্ষে পুরোপুরি অনুধাবন করাই সম্ভব নয়। আর তাই আমি সেই চেষ্টাও করিনি। বরং আমি যেটা করেছি সেটা হলো অনেকটা স্রোতের সাথে গা ভাসিয়ে দেওয়া আর একটু একটু করে ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে পুরো বিষয়টা ধীরে ধীরে বুঝে ওঠার চেষ্টা করা। তবে এক্ষেত্রে আমাকে আগে স্রোতটা সৃষ্টি করতে হয়েছে।’
‘তাহলে মোহাম্মদপুরের সেই ঘটনাটা’ পৃথা প্রশ্ন করতে যাচ্ছিল কিন্তু তাকে থামিয়ে দিলো বাশার। ‘সেই ফাঁদটা? ওটাই ছিল আসলে স্রোতে গা ভাসিয়ে দেওয়ার আগে স্রোতটা সৃষ্টি করা। অমি জানতাম এই পুরো জটিলতার একেবারে কেন্দ্রে যে মানুষটা অবস্থান করছে, সে হলে তুমি। সবার নজর তোমার ওপরে। কাজেই তুমি ছিলে টোপ। টোপটা আসলে যেভাবে দেখানো হয়েছে সেরকম নয়। টোপটা ছিল আসলে আমার নিজেকে অন্যদের কাছে টোপ হিসেবে তুলে দেওয়া। আর সেটা কাজে লেগেছে।’
‘মাস্টার জেড, মানে কালো কোট যেমন পৃথার হুডির পকেটে মাইক্রোফোন বসিয়েছিল,’ সোহেল বলে উঠল
‘হ্যাঁ, আমি ফাঁদটা পাতার পর অনেকেই এর সাথে জড়িয়ে যায়। এর মধ্যে অন্যতম ছিল কালো কোট মানে নেক্রপলিসের এজেন্ট। সে এমন একটা ভাব দেখিয়েছিল যাতে আমরা মনে করি সে পৃথাকে অপহরণ করার চেষ্টা করছিল। কিন্তু আসলে সে ওটার মাধ্যমে তার গায়ে ডিভাইসটা প্ল্যান্ট করতে চেয়েছিল। কারণ সে আসলে ওদেরকে দিয়ে কাজটা উদ্ধার করতে চেয়েছিল। কিন্তু তার পরিকল্পনা ভেস্তে যায় দুটো কারণে প্রথমত, সে যেভাবে করতে চেয়েছিল বিষয়টা সেটা সে করতে পারেনি কারণ হঠাৎ সেখানে চৌধুরী চলে আসে। সে বলেছে, সে চৌধুরীকে পৃথাকে অনুসরণ করতে দেখেছে, এটা আমি বিশ্বাস করিনি। এর পাশাপাশি আবার
অন্য আরেকটা গ্রুপ আমাদের পিছু নেয়। আর এইজন্যেই নার্ভাস হয়ে কবরস্থানের বাইরে আমাদের আক্রমণ করে বসে। আর ওখান থেকে যে-গাড়িটা আমাদের অনুসরণ করতে শুরু করে ওটা ছিল এই দ্বিতীয় গ্রুপ, যারা এখানে কালো মুখোশ পরে এসেছিল।’
‘আমার এখানে একটা প্রশ্ন আছে,’ সোহেল জানতে চাইল। ‘বুঝলাম কালো কোটেরা আমাদেরকে কীভাবে অনুসরণ করছিল। কিন্তু এরা প্রতি পদে পদে আমাদেরকে কীভাবে অনুসরণ করছিল? আর এরা কারা?’
‘এর জবাব সবচেয়ে ভালো দিতে পারবে চৌধুরী, বাশারের কথাটা শুনেই সবাই চমকে উঠল। চৌধুরী খুবই অবাক হয়েছে এমনভাবে রিঅ্যাক্ট করে উঠল। কিন্তু বাশার ইশারা করতেই একজন স্পেশাল ফোর্সের কমান্ডো এসে তাকে ধরে ফেলল। মানে কী এসবের?’
‘মানে হলো তুমি একটা কীট। অবশ্য আমি তোমার ইমোশনটা বুঝি। নিজের ক্যারিয়ার-পরিবার সব নষ্ট হয়ে গেছে। আর যে-মানুষটা নষ্ট করেছেন তাকে বের করে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্যে তুমি অস্থির হয়ে উঠেছিলে। আর তাই জেলখানায় ওরা তোমার কাছে একটা দারুণ প্রপোজাল নিয়ে আসে। যদি তুমি ওদেরকে হেল্প করো তবে, প্রতিশোধ তো পাবেই সেই সাথে শতাব্দির সেরা আর্কিয়োলজিক্যাল আবিষ্কারের ভাগিদারও হবে।’
‘কিন্তু এরা কারা?’ পৃথা বেশ জোরের সাথে জানতে চাইল।
‘বলছি,’ তার আগে চৌধুরীর বিষয়টা বলে নেই। চৌধুরীকে জেল থেকে বের করে এই বিশেষ গ্রুপটা। চৌধুরী জেল থেকে ছাড়া পাবার যে গল্পটা বলেছিল, সেটা ভেরিফাই করানোর পরেই তার ওপরে প্রথম সন্দেহ জাগে আমার। যে গ্রুপের সাথে সে কাজ করছিল ওরা তাকে রেখছিল নিজেদের রিসোর্স হিসেবে ব্যবহার করার জন্যে। আর পৃথার মাধ্যমে আমি যখন ফাঁদটা পাতলাম তখন এই গ্রুপটা সুযোগ পেয়ে গেল নিজেদের রিসোর্সটাকে কাজে লাগানোর জন্যে। ঠিক যেভাবে, কালো কোট পৃথার সাথে নিজেদের ডিভাইস আটকে দেয়, ঠিক তেমনি ওরা চৌধুরীকে আমাদের সাথে অ্যাটাচ করে দেয়,’ বলে সে খানিকটা থেমে আবারও বলতে লাগল। ‘চৌধুরী প্রতি পদে পদে তাদেরকে আপডটে জানিয়েছে কোনো-না- কোনোভাবে কীভাবে করেছে এখনও আমি জানি না কিন্তু করেছে।’
‘তাহলে কবরস্থান থেকে বেরোতেই ওরা আবার পিছু নিয়ে আক্রমণ চালাল কেন?’
ঠিক যে-কারণে কালো কোটেরা আক্রমণ চালিয়েছিল। ওরা আসলে ভয় পেয়ে গেছিল যে আমরা হাতছাড়া হয়ে যাবো কিংবা কালো কোটেরা ওদের আগে আমাদের নাগাল পেয়ে যাবে। পানামে পাতালে আক্রমণের বিষয়টাও তাই হতে
পারে, আবার এমনও হতে পারে ওরা আসলে চৌধুরীর ওপরে ভরসা রাখতে পারছিল না,’ বলে বাশার কাঁধ ঝাঁকাল। ‘ওরাও ধরা পড়েছে এবং চৌধুরীও আমাদের নাগালে, এটা বের করা খুব কষ্ট হবে না, বলে সে কমান্ডোদেরকে ইশারা করল চৌধুরীকে নিয়ে যাবার জন্যে। ‘দুঃখিত চৌধুরী, প্রফেসর ইফতেখারকে জেরা করার স্বপ্ন আর পূরণ হচ্ছে না বরং এবার তুমি আরও বাজেভাবে ফেঁসেছ।’
চৌধুরী চিৎকার করে কিছু একটা বলতে চাচ্ছিল কিন্তু তাকে কমান্ডোরা নিয়ে গেল।
‘তাহলে প্রশ্ন জাগে, তুমি তাহলে কীভাবে কী করলে?’ আবারও সোহেল প্রশ্ন করল। ‘আর অফিসের সাথে যোগাযোগ ছিন্ন করার নাটকটাই বা করলে কেন?’
‘আচ্ছা, আমি যখন বুঝতে পারলাম এখানে অনেক কিছুই ঘটছে যা আমার সাধ্যের বাইরে, তখন আমি পরোক্ষ স্ট্র্যাটেজিতে চলে যাই। আর আমাকে এই সাজেশনটা দেয় পিবিআইয়ের মৌসুমি আপা। নারায়ণগঞ্জে ঢোকার আগে, সবাই যখন রেস্টে আমি তখন তার সাথে দীর্ঘ সময় আলাপ করি। উনি যদিও এখন ডেস্কে কাজ করেন কিন্তু ক্রিমিনোলজিতে তার ব্যাকগ্রাউন্ড আছে। উনিই পুরো সিচুয়েশন অ্যানালাইসিস করে আমাকে সাজেস্ট করেন, যেহেতু আমি পরিস্থিতি এবং লোকজন ফ্যাদম করতে পারছি না, কাজেই আমি যাতে তোদের সবাইকে বোঝাই যে অফিসের ওপরে আমি ট্রাস্ট করতে পারছি না, তাই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছি। এতে করে আমি ভালনারেবল হয়ে যাব এবং শত্রুরা নিজেদের চেহারা প্রকাশ করবে। আর হয়েছেও তাই। কালো কোটেরা আমাদেরকে ধরে সব ধরনের কমিউনিকেশন ডিভাইস নিয়ে নিলেও আমার আর সোহেলের ব্ল্যাড স্ট্রিমে প্রবেশ করানো স্মার্ট ব্লাড টেকনোলজির মাধ্যমে অফিস আমাদেরকে ঠিকই ট্র্যাক করছিল। আর যোগাযোগ হারানোর আগেই আমি মৌসুমিকে বলেছিলাম আমাদেরকে যাতে সব ধরনের ব্যাকআপ দেয়, কাজেই যেখানেই আমরা গেছি, পানির ওপর লঞ্চ জার্নিটা বাদ দিলে, বাকি পুরোটা সময় আমরা রোড ও এয়ারের মাধ্যমে ব্যাক আপ টিমের নজরদারিতেই ছিলাম। ওরা অপেক্ষা করছিল আমার সিগনালের। কিন্তু আমি চাইছিলাম আগে কাজটা উদ্ধার হোক। আর সত্যি কথা কালো কোটের দলের হেল্প না হলে জিনিসটা উদ্ধার হতো না।’
‘তারমানে ওরা ভাবছিল ওরা আমাদেরকে দিয়ে কাজ উদ্ধার করাচ্ছে। আসলে তুমিই ওদেরকে দিয়ে কাজ উদ্ধার করাচ্ছিলে। কিন্তু এখনও দুটো প্রশ্ন রয়ে যায়,’ পৃথা বাশারের দিকে তাকিয়ে আছে। ‘এক, মুখোশধারীরা কারা? দুই পুরো ব্যাপারটা আসলে কী নিয়ে। এই বাক্সের ভেতরে এত এত সম্পদ এলো কোথা থেকে?’
‘আগে মুখোশধারীদের বিষয়টা বলি,’ বাশার বলে উঠল। ‘প্রথমত, আমি ওদের ব্যাপারে শতভাগ নিশ্চিত নই। কিন্তু আমি যতটুকু বুঝতে পেরেছি এরা একটা কাল্ট এবং কোনো-না-কোনোভাবে এই পুরো বিষয়টার সাথে এদের গভীর যোগাযোগ আছে এদের এবং এই যোগাযোগটা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তোমার মায়ের মাধ্যমে। এই কেসের দুটো বিষয় এখনও আমার কাছে পরিষ্কার নয়। একটা হলো, যে ট্রেজারটা আবিষ্কার হলো সেটা অনেক মূল্যবান হতে পারে। কিন্তু সেটাই এখানে সব নয়, এখানে আরও অনেক অনেক বড়ো কিছু আছে, যা আমি অন্তত বুঝতে পারিনি। মুখোশধারীদের নেতা এবং কালো কোট দুজনের একজনও এই ট্রেজারগুলো নিয়ে এক্সাইটেড ছিল না। ওরা দুজনেই আগ্রহের সাথে সিন্দুকের নিচের ওই বিশেষ পাথরটাকে পরখ করা নিয়ে বেশি ব্যস্ত ছিল। আমার বিশ্বাস রাজদ্রোহীর রহস্য যাই হোক না কেন সেটা ওটার সাথেই জড়িত। এই সিন্দুক ওখানে কীভাবে এলো, পানামের নিচে ওই পিতলের ডিভাইসটা কে প্ল্যান্ট করেছিল এবং পুরো বিষয়টা নিয়ে আসলে কী হচ্ছে এবং হতে যাচ্ছে এগুলো আমি এখনও পুরোপুরি জানি না।’
‘তাহলে—’
সোহেলের কথাটাকে সম্পন্ন করতে দিলো না বাশার। ‘এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে স্রেফ একজন মাত্র মানুষ। যে এই পুরো খেলাটার কেন্দ্রে ছিল এবং এখনও আছে-পুরো রচনার রচয়িতা যে,’ বাশার এখন আবারও তাকিয়ে আছে পৃথার দিকে। ‘তোমরা বলছিলে না যে ওরা আসলে আমাকে না, আমি ওদেরকে ব্যবহার করছিলাম? ভুল,’ বলে বাশার মৃদু হেসে উঠল। ‘আসলে এই পুরো খেলাটা নিয়ন্ত্রণ করছিল আরেকজন মানুষ।’
‘সেটা কে—’ অনেকক্ষণ পর প্রফেসর হামিদ জানতে চাইল। ‘প্রফেসর ডক্টর ইফতেখার মাহমুদ,’ বাশার শান্ত সুরে বলে উঠল।
‘মানে, উনাকে তো আমরা খুঁজেই বের করেত পারিনি তবে উনি কীভাবে—’
‘হ্যাঁ, আমরা তাকে খুঁজে বের করতে পারিনি এখন পর্যন্ত ঠিকই, কিন্তু তাই বলে পারবো না, সেটা তো হতে পারে না,’ বলে সে নিজের মুখটাকে সামান্য ওপরে তুলল। কি, আমি ঠিক বলেছি, পৃথা?’
.
