অধ্যায় ছয়
বর্তমান সময়
পিবিআই অফিস, ধানমন্ডি, ঢাকা
.
দায়িত্বের জন্যে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার মতো মানুষ বাশার।
আর তাই যখন ধানমন্ডি পিবিআইয়ের অফিসের সামনে গিয়ে সিএনজি থেকে নামল তখন ওর হাতের ঘড়ির কাঁটা সকাল আটটার কোঠা ছোঁয়নি। মনে মনে সে একবার ভাবল, বেশি জলদি চলে এলো কী? কিন্তু গতকাল শেষবার যখন তাকে কল করা হয়েছিল তখন বলা হয়েছিল সকাল সকাল যেতে, যতটা সম্ভব দ্রুত পিবিআইয়ের স্পেশাল ব্রাঞ্চের সেকশনে রিপোর্ট করার জন্যে।
ভবনটার ভেতরের দিকে যেতে যেতে বাশারের মনে হতে লাগল বহু বছর আগে একবার সে এখানে এসেছিল কী একটা কাজে, এরপরে আর এদিকে আসার সুযোগ হয়নি ওর। এতবছর পর এভাবে এই অফিসে স্পেশাল ব্রাঞ্চে যোগ দেবার জন্যে ফিরে আসবে সে কখনও ভাবেনি, কথাটা ভাবতে ভাবতেই তার মুখে একটা মৃদু হাসি ফুটে উঠল। গতকাল রাতে সে শুয়ে পড়ার পরেও খুব একটা ভালো ঘুম হয়নি, রাতের একটা সময়ের পর আর ঘুম না আসাতে জলদি উঠে কিছুক্ষণ গেস্টহাউজের জিমে গিয়ে এক্সারসাইজ করেছে তারপর রেডি হয়ে বেরিয়ে গেছে জলদি জলদি। আর্লি বের হবার পেছনে কারণ ছিল দুটো। প্রথমত, তাকে জলদিই যেতে বলা হয়েছে, তার ওপরে সে যেকোনো ভাবেই হোক ঢাকার জ্যাম অ্যাভয়েড করতে চাইছিল। সিএনজি থেকে নেমে ভবনের ভেতরের দিকে যেতে যেতে সে বহু আগে দেখে যাওয়া ভবনের নকশাটা মনে করার চেষ্টা করল। কিন্তু নিজের পুরনো স্মৃতির সাথে খুব বেশি মেলাতে পারল না। ভেতরে ঢুকে রিসিপশনে নিজের পরিচয় দেওয়ার পর কিছু ফর্মালিটি সারল সে। কিছু পেপার ওয়ার্ক করে, কিছু ডকুমেন্ট ওর সই রেখে সোজা চলে যেতে বলল ছয় তলায় স্পেশাল ব্রাঞ্চে। লিফটে করে ছয়তলায় এসে, সে একটা ভারী দরজার সামনে চলে এলো। সেটার সামনে স্বচ্ছ কাচের ওপরে লেখা স্পেশাল ব্রাঞ্চ। কিন্তু যে-সেকশনের নাম তার চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছিল, সেটার নাম-নিশানাও দেখতে পেল না কোথাও। একবার নক করে দরজাটা মেলে ধরল সে।
ভেতরে তেমন কেউই নেই, দরজাটা মেলে ধরে সে ভেতরে ঢুকে দেখল ছোটো হলরুমের মতো একটা অফিস, সেটার বিভিন্ন দিকে কয়েকটা ডেস্ক বসানো। তিনটে ডেস্কের ভেতরে দুটোতেই কেউ নেই। তৃতীয় ডেস্কে বসে আছে লম্বা চুলের একটা ছেলে। একমনে সে কাজ করছে কম্পিউটারে। ওকে দেখে সে এক গাল হেসে উঠল। ‘হাই, আপনি নিশ্চয়ই, ইন্সপেক্টর আহমেদ বাশার?’ ছেলেটার কথাবার্তা সরকারি অফিসের কোনো কর্মকর্তার মতো নয় বরং চৌকস কোনো কর্পোরেট অফিসারের মতে। তার পোশাক-আশাক আর চালচলনও অনেকটা সেরকম।
‘জি, আমিই আহমেদ বাশার, ছেলেটার হাত মৃদু ঝাঁকির সাথে নাড়িয়ে দিয়ে সে জবাব দিলো। ‘আমি–’
‘ওহ, ইয়েস স্যার। আপনার জন্যে স্পেশাল ব্রাঞ্চের ডেস্ক অফিসার এবং স্পেশাল উইংয়ের প্রধান হাবিব আনোয়ার পাশা স্যারের পারসোনাল অ্যাসিসট্যান্ট মৌসুমি আক্তার অপেক্ষা করছেন। এই দিকে গিয়ে ডানে মোড় নিলেই উনার ডেস্ক পেয়ে যাবেন, থ্যাঙ্ক ইউ।’
বাশার কিছু বলার আগেই, এমনকি থ্যাঙ্কস জানানোর আগেই সে চলে গেল। একবার আনমনেই কাঁধ ঝাঁকিয়ে বাশার ছেলেটার দেখান করিডোর ধরে সামনে এগিয়েই একপাশে কাঠের প্যানেলিং দিয়ে আড়াল করা সুন্দর একটা অফিস দেখতে পেল। ওটার ওপাশে বিরাট একটা টেবিলের ওপাশে বসা সাদা সালোয়ার কামিজ পরা একজন মহিলা বসে ফাইল সাজাচ্ছিল ডেস্কের ওপরে। বাশার এগিয়ে যেতেই উঠে দাঁড়িয়ে মৃদু হেসে অভিবাদন জানাল ওকে। ‘হ্যালো, আমি মৌসুমি, আপনি নিশ্চয়ই ইন্সপেক্টর বাশার?’
‘জি, ম্যাম, আমিই আহমেদ বাশার, বাশারও মৃদু হেসে অভিবাদন জানাল। আপনার সাথেই বোধহয় আমার ফোনে কথা হয়েছিল একাধিকবার, তাই না?’
‘জি, আপনি বসুন না, মহিলা নিজেও চেয়ারে বসে বাশারকে বসতে ইশারা করল। ‘আপনার জন্যে চা-কফি বা অন্যকিছু বলব? এখন তো বেশ সকাল। আপনি কি ব্রেকফাস্ট করার সুযোগ পেয়েছেন?’
‘জি, ম্যাম। আমি ফুল ব্রেকফাস্ট করেই এসেছি, আপনাকে থ্যাঙ্কস, বাশারের কাছে মহিলাকে প্রথম দেখাতেই বেশ ভালো লেগে গেছে আন্তরিক ব্যবহারের কারণে। বেশ একটা বড়ো বোনসুলভ ভাব আছে তার ভেতরে। কিন্তু বেশ কয়েকটা বিষয়ে সে বেশ অস্বস্তিও বোধ করছে। এর ভেতরে অন্যতম একটা হলো নিজের দীর্ঘদিনের সরকারি চাকরির অভিজ্ঞতায় ও ঠিক যেরকম আচরণ কিংবা আতিথেয়তায় এবং ডেকোরামে অভ্যস্ত, এখানকার কাজ-কর্ম পরিবেশে ঠিক সেরকম লাগছে না ওর কাছে।
মহিলা এক মুহূর্তের জন্যে ভাবল, ‘আচ্ছা, এক কাজ করব, আপনি পাশা স্যারের রুমে গেলে তখন একসাথে দুজনকেই কফি দিব। সেটাই বেটার হবে,’ বলে মহিলা টেবিলের ওপরে ফাইলগুলোকে একপাশে সরিয়ে একটা অ্যাপলের ট্যাব ওপেন করল। ‘আপনি যেহেতু আমাদের সাথে কাজ করতে এসেছেন তাই আপনাকে প্রাথমিক ব্রিফিংটা আমাকেই করতে হবে। আপনাকে একটা কথা বলি, প্রথমত, আপনি হয়তো ইতিমধ্যেই টের পেয়েছেন যে আর দশটা সরকারি অফিসের ডেকোরাম আমাদের এখানে নেই। আমরা এমনকি পিবিআইয়ের ভেতরেও অনেকটা ছোটো দ্বীপের মতো বলতে পারেন। আমাদের এই স্পেশাল উইংয়ে আমরা বলতে গেলে অনেকটাই আমাদের মতো চলি। আমাদের কাজের কারণেও এই স্বাধীনতাটুকু আমরা পেয়ে থাকি। আরেকটা কথা, আমাকে ম্যাম- ম্যাডাম ডাকার প্রয়োজন নেই। যেহেতু আমি বয়সে আপনার থেকে বড়ো আপু বলে ডাকতে পারেন। আপনাকে যিনি চিঠি পাঠিয়েছিলেন অপারেশন ব্ল্যাক বুদ্ধার কমান্ডার তানভীর মালিক, ও, সেই সাথে এখানকার আরেক অফিসার শারহান শারিয়ার, ওরাও আপনার বয়সী হবে, ওরা সবাই আমাকে মৌসুমি আপা বলেই ডাকে। কাজেই আপনিও তাই ডাকতে পারেন।’
‘সেক্ষেত্রে আমার একটা শর্ত আছে,’ বাশার মৃদু হেসে বলে উঠল। ‘আমাকে ও আপনি বলে ডাকার দরকার নেই। তুমি বলেই ডাকতে পারেন, মৌসুমি আপা।’
মৌসুমি এক মুহূর্তের জন্যে বাশারের দিকে তাকিয়ে রইল তারপর বলতে গেলে জোরেই হেসে উঠল। ‘হা-হা, ঠিক আছে, বাশার। আমি বুঝতে পারছি এখানকার কাজ নিয়ে তুমি প্রায় অন্ধকারে আছ, তোমার কোনো প্রশ্ন থাকলে করতে পারো। আমি একবারে গুছিয়ে তোমার জবাব দেওয়ার চেষ্টা করব। বাই দ্য ওয়ে, সবকিছু জানার জন্যে বিস্তারিত একটা ইমেইল তোমাকে করা হবে, সেই রিপোর্টের হার্ড কপিও আমি তোমাকে দিয়ে দিব, কিন্তু এই মুহূর্তে আমরা একটা ইমার্জেন্সি সিচুয়েশনে আছি। কাজেই এমনও হতে পারে এখান থেকে সরাসরি তোমাকে কাজে নামতে হতে পারে। কাজেই আপাতত ফাংশন করার মতো তথ্য চাইলে আমি মৌখিকভাবে তোমাকে জানাতে পারি।’
‘অবশ্যই, অনেক ধন্যবাদ আপু, আমি বুঝতে পেরেছি। কিছু বিষয়ে আমার জানাটা খুব জরুরি, প্রথমেই যেটা আমি জানতে চাই এই স্পেশাল উইংয়ের ব্যাপারে আমি বলতে গেলে কিছুই জানি না, এই বিষয়ে খানিকটা জানতে চাচ্ছিলাম, এর পাশাপাশি আলফা এম নামে যে স্পেশাল টিমের কথা বলা হয়েছে সেটা নিয়েও আমি জানতে চাই, আর এইক্ষেত্রে আমার ভূমিকাটা কী হবে বা আমার দায়িত্ব কেমন হবে—সেই বিষয়গুলো জানাটাও জরুরি। আরেকটা বিষয় হলো, আমি কি আদৌ এই কাজের জন্যে উপযুক্ত ট্রেনিংপ্রাপ্ত কি না সেটাও জানতে হবে। মানে সোজা কথায় বলতে গেলে আমার সেই যোগ্যতা আছে কি না? তারচেয়েও বড়ো কথা হলো আমাকেই কেন সিলেক্ট করা হলো এই কাজের জন্যে?’
মৌসুমি হেসে উঠল বাশারের একগাদা প্রশ্ন শুনে। ‘শোনো, তোমার শেষ প্রশ্নটা দিয়ে তোমার প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়া শুরু করছি। প্রথম কথা হলো, তুমি এই কাজের জন্যে যদি যোগ্য না হতে তোমাকে ডেকে পাঠানো হতো না। তবে এর সাথে দুটো কারণ আছে। একটা আমি এখন বলব কিন্তু অপরটা পাশা স্যার ব্রিফিংয়ের সময়ে তোমাকে বলবেন। কারণ হলো সাম্প্রতিককালে তোমার সমাধান করা টুইন কালীর কেসটা নিয়ে আমাদের এই স্পেশাল উইংয়ের প্রধান পাশা স্যারকে তোমার বস, এসপি আমজাদ আনোয়ার তোমার নাম সাজেস্ট করেছিলেন। পুরো কেস ফাইল পড়ে পাশা স্যার বেশ মুগ্ধ, তোমাকে ডেকে আনার এটা একটা কারণ। বাই দ্য ওয়ে আমজাদ আনোয়ার স্যার কিন্তু আমারদের এই স্পেশাল উইংয়ের অ্যাডভাইজারদের একজন। উনার কথাকে এখানে খুবই মূল্যায়ন করা হয়।’
মৌসুমি একটু থেমে একটা কল রিসিভ করে কিছুক্ষণ কথা বলে আবার বাশারের দিকে ফিরে তাকাল। ‘সরি, এবার আসি আমাদের এই স্পেশাল উইংয়ের বিষয়ে। প্রথমত, এই স্পেশাল উইং আমাদের প্রধান হাবিব আনোয়ার পাশা স্যারের বেইন চাইল্ড। উনি বেশ কয়েক বছর আগে গাজীপুরে একটা স্পেশাল অপারেশন চালানোর পর সরকারের কাছে বিশেষ অনুরোধ করে সরাসরি পুলিশের কাজ থেকে সরে দাঁড়ানো গবেষণার জন্যে। প্রায় এক বছর নিজে রিসার্চ করার পর উনি সিদ্ধান্তে আসেন বিশেষ ধরনের ক্রাইম অ্যানালাইসিস এবং এর সমাধান করার জন্যে উনি একটা স্পেশাল উইং খুলবেন। এই স্পেশাল উইং আপাতত পিবিআইয়ের অধীনে কাজ করবে, ভবিষ্যতে আমাদের নিজের পুরো ইনফ্রাস্ট্রাকচার দাঁড়িয়ে গেলে এটাকে সরাসরি আলাদা একটা ডিপার্টমেন্ট হিসেবে ঘোষণা করা হবে।’
আমার একটা প্রশ্ন আছে?’ বাশার ছোটো বাচ্চাদের মতো হাত তুলে প্রশ্ন করতেই মৌসুমি মাথা নেড়ে কথা চালিয়ে যেতে বলল। ‘আমি ময়মনসিংহে দেখেছি ওখানে একটা স্পেশাল ল্যাব বানানো হচ্ছে ফরেনসিক থেকে শুরু করে নানা ধরনের ক্রাইম রিলেটেড ইস্যু সলভ করার জন্যে। আমি শুনেছি সিলেটেও নাকি এরকম একটা ল্যাবের কাজ চলছে। এটাও কি এই স্পেশাল উইংয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট?’
‘শুধু সিলেট না, দেশের বড়ো বড়ো প্রায় সব বিভাগীয় শহরেই এই ল্যাব বসানো হবে ফরেনসিক থেকে শুরু করে সবধরনের ক্রাইম অ্যানালাইসিস করার জন্যে। হ্যাঁ, বলতে পারো এটা এই উইংয়ের সাথে কানেকটেড কারণ ডক্টর মণিকা নামে একজন স্পেশালিস্ট আমাদের পাটোয়ারি স্যারের অধীনে কাজ করছে এই ল্যাবগুলো নিয়ে। তুমি তো টমিকে চেন, টমিও এই টিমেরই অংশ। এই ল্যাবগুলো বানানো হচ্ছে বিশেষ ধরনের কাজের জন্যে। এগুলোতে প্রায় সব আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার লোকেদের অ্যাক্সেস থাকবে, তবে কাজ শেষ হবার পর। ততদিনে যদি স্পেশাল উইং চালু হয়ে যায় তবে, ল্যাবগুলো স্পেশাল উইংয়ের অধীনেই পরিচালিত হবে।’
‘বুঝতে পেরেছি, আর প্রজেক্ট আলফা এম?’ বাশার জানতে চাইল।
‘প্রজেক্ট আলফা এমের গল্পটা বলতে হলে আগে আরও দুজন মানুষের কথা বলতে হবে। পাশা স্যার যখন স্পেশাল উইংয়ের পরিকল্পনা নিয়ে ছুটি থেকে ফিরে পিবিআইতে জয়েন করলেন অনেকটা বলতে গেলে স্পেশাল উইংয়ের কথা মাথায় রেখে একজন ডেস্ক অ্যানালিস্ট তানভীর এবং একজন ফিল্ড এজেন্ট শারিয়ারকে ইউরোপে পাঠান ট্রেনিংয়ের জন্যে। ওরা যখন প্রায় ট্রেনিংয়ের শেষ দিকে তখন সিলেটে একটা ঘটনা ঘটে এবং পাশা স্যার স্কটল্যান্ড থেকে তানভীরকে ডেকে সেই মিশনে পাঠান। তানভীর সিলেটে গিয়ে বেশ বড়ো একটা ষড়যন্ত্র আবিষ্কার করে। ওটাই ছিল অপারেশন ব্ল্যাক বুদ্ধা। ওইখান থেকে আমরা জানতে পারি আমাদের দেশে দুটো অত্যন্ত শক্তিশালী আন্তর্জাতিক ক্রাইম অর্গানাইজেশন রেলিক এবং নেক্রপলিস অ্যাক্টিভ আছে এবং ওইখানে তানভীর নেক্রপলিসের সাউথ এশিয়া জোনের অন্যতম প্রধানকে গ্রেপ্তারও করতে সক্ষম হয়, তানভীর এখনও সিলেটে আছে ওই কাজেই। এরপরে চট্টগামে অ্যাক্সিডেন্টে মারা পড়ে এক ব্যক্তি এবং সেই ব্যক্তির মৃত্যুকে ঘিরে বেশ কিছু রহস্যময় ঘটনা ঘটতে থাকলে সেখানে পাঠানো হয় আমাদের আরেক ফিল্ড এজেন্ট শারিয়ারকে। সেখানে অনেক ঘাত-প্রতিঘাত পার হয়ে সে আরও বড়ো এক রহস্যে উদঘাটন করতে সমর্থ হয়। সেখানেও মিস্টার ইউ নামে ইন্টারপোলের লিস্টেড আরেক কুখ্যাত অপরাধী ধরা পড়ে।
‘এখানেও কি সেই আগেরগুলোই নাকি নতুন কোনো সংগঠনই?’ বাশার প্রশ্ন করল।
‘আগেরগুলোই,’ মৌসুমি ত্বরিত জবাব শুনে বাশার খানিকটা নড়ে-চড়ে বসল।
‘তাহলে তো বলতে হবে বেশ বড়ো আকারের একটা ষড়যন্ত্র চলছে। কিন্তু অবাক বিষয় হলো এরকম বড়ো বড়ো সংগঠন এবং তাদের এত বড়ো মাপের অপারেটররা আমাদের দেশে অপারেট করছে অথচ আমরা এতদিন ধরে জানিই না! ব্যাপারটা খুব অদ্ভুত হয়ে গেল না?’
‘শুধু অদ্ভুতই না সেই সাথে দুঃখজনকও বটে,’ প্রথমবারের মতো মৌসুমির ভ্রু কুঁচকে উঠতে দেখল বাশার। ‘কিন্তু তারচেয়ে বড়ো কথা ওরা বাংলাদেশে শুধু অপারেটই করছে না, আমরা ধারণা করছি তারা অনেক বড়ো কিছু একটার পেছনে লেগেছে। সেটা আসলে যে কি এখনও আমরা জানি না। কিন্তু কিছু একটা অবশ্যই আছে। আমাদের অ্যানালিস্টদের মতে সেটা এমনকি আমাদের কল্পনার চেয়েও বড়ো কিছু হতে পারে, কারণ এখন পর্যন্ত আমরা যা টের পেয়েছি এবং বুঝতে পেরেছি এটা আমাদের অ্যানালিস্টদের মতে এমনকি এর উপরিভাগও নয়। এখানে অনেক বড়ো কিছু আছে,’ বলে মৌসুমি বড়ো করে নিশ্বাস নিলো। ‘যা ঘটছে এই ঘটনাটাকে আমরা দুইভাবে দেখছি। একদিকে এই ঘটনা প্রমাণ করে আমাদের স্পোশাল উইংয়ের প্রয়োজনীয়তা আছে। এখন পর্যন্ত আমরা যেসব কেসের দায়িত্ব নিয়েছি সেগুলোর সবাই শতভাগ সফলতার সাথে উদঘাটনই করিনি আমরা, বরং সামনে ঘটতে পারে এমনকিছুরও ইঙ্গিত বের করতে পেরেছি। আবার সেই সাথে বড়ো বড়ো অন্তত দুটো রাঘববোয়ালকেও ধরতে সক্ষম হয়েছে আমাদের এজেন্টরা। কিন্তু এখনে এমন অনেক কিছু আছে যা আমরা ধরতে পারছি না। স্পেশাল উইংয়ের ভেতরে এই স্পেশাল কেসটাকে নাম দেওয়া হয়ে প্রজেক্ট আলফা এম। এর মূল দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তানভীর মালিকের ওপরে। সেই তোমাকে চিঠি পাঠিয়েছিল।’
‘বুঝতে পেরেছি, তবে এখানে আমার ভূমিকা কোনো জায়গায়, মানে—’ বাশার চিন্তিত ভঙ্গিতে নিজের হাতের আঙুলে পরে থাকা আংটিটা মোচড়াতে মোচড়াতে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল কিন্তু সে বাক্য শেষ করার অগেই ইন্টারকম বেজে উঠল। মৌসুমি ফোন তুলে কথা বলে ওর দিকে ফিরে একটা হাসি দিলো ‘ভালো টাইমে ভালো প্রশ্ন করেছ, ওপরওয়ালার ডাক এসেছে,’ বলে সে জোরে হেসে উঠল। ‘ওই ওপরওয়ালা নয়,’ বলে সে ওপরের দিকে নির্দেশ করল। ‘ইনি আমাদের ওপরওয়ালা, মানে পাশা স্যার। চল, তোমার সব প্রশ্নের উত্তর থেকে শুরু করে তোমার দায়িত্বের ব্রিফিংসহ সবই ওখানে গিয়ে হবে,’ বলে মৌসুমি আই প্যাড আর ফাইলগুলো নিয়ে উঠে দাঁড়াল।
মৃদু কাঁধ ঝাঁকিয়ে বাশার পিছু নিলো তার। দেখা যাক ভবিতব্য কী রেখেছে ওর জন্যে।
