অধ্যায় নয়
সময়: ১৫৯৬ খ্রিস্টাব্দ
রসুল খাঁর জমিদার বাড়ির বৈঠকখানার বাইরে
.
‘এইভাবে ওরা সব হারাইল কেমনে?’ একটু থেমে সে আবারও বলতে লাগল।
‘আচ্ছা, আমারে একটা বিষয় বুঝায়া বলেন তো,’ পান চিবুতে চিবুতে আনমনেই কথাটা বেরিয়ে গেল মাসুমের মুখ দিয়ে। ‘এইটা আপনাগো এলাকা, এইখানে আপনারাই হর্তা-কর্তা। এইখানে আপনাগো সবকিছু আছে, লোকলস্কর ও থেইকা শুরু কইরা বলতে গেলে সবকিছু। কিন্তু সুবাদার আসলাম শেঠের ওপরে যখন জঙ্গলমহালের আক্রমণ হইল তখন আপনারা কিছুই করতে পারেন নাই। এখন যখন আমরা ধারণা করতাছি জঙ্গলমহাল থেইকা একটা দল পলাইয়া উত্তর পশ্চিমের এলাকায় ছড়ায় পড়ছে এমন সময় আমরাই ক্যান?’ বলে সে বাসিমের দিকে দেখে নিয়ে রসুল খাঁর দিকে তাকাল সরাসরি। ‘আপনাগোর এলাকায় আপনারাই যদি কিছু করতে না পারেন আমরা বাইরে থেইকা আইসা কী করতে পারবো?’
মাসুম, ধোবল, বরখা ওরা সবাই মিলে বসে আছে বৈঠকখানার ছাদে। সময়টা বিকেল বেলা পার হয়ে সন্ধের দিকে রওনা দিয়েছে। খাওয়াদাওয়ার পর বিশদ আলোচনা সেরে ওরা বেশ কিছু পরিকল্পনা করে আর সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই রসুল খাঁর বাহিনীর প্রধান গেছে ওদের জন্যে বিশেষ কিছু ব্যাপারে আয়োজন করতে আর সেই ফাঁকে ওরা বৈঠকখানার দোচালায় বসে গড়গড়া টানছে আর চলছে আলোচনা।
‘এইটার উত্তর আব্বাজানের চেয়ে মনে হয় আমি ভালো দিতে পারবো,’ কথাটা বাসিম বলে উঠল। বাসিম যেভাবে নড়াচড়া করছে তাতে মাসুমের মনে হলো ওদেরকে তামাক টানতে দেখে তারও তামাকের নেশা পেয়েছে কিন্তু বাপের সামনে সে মনে হয় তামাক টানে না। যেই কারণে বারবার পাত্র থেকে সুপুরি তুলে মুখে পুরছে আর অস্বস্তির সাথে নড়াচড়া করছে। ‘প্রথম কারণটা হইল এইটা আমগো এলাকা এইকারণে আমগো যেমন কিছু সুবিধা আছে তেমন কিছু অসুবিধাও আছে। অসুবিধা অইল আমগোরে সবাই চিনে। বিশেষ কইরা আমগো এইখানে চাচাত মামাতো ভাই বেরাদার তো বটেই, এমনকি আমগো যত শক্তিশালী যোদ্ধা আছে সবাই পরিচিত।’
বাসিমের কথা শুনে তার দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে মাসুম। এইটা অসুবিধা কীভাবে ব্যাপারটা এখনও ঠিক পরিষ্কার হচ্ছে না তার কাছে। তাকে কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখে সম্ভবত বাসিম বুঝতে পারল মাসুম ওর কথা পুরোপুরি ধরতে পারেনি। ‘আপনে হয়তো ভাবতাছেন এইটা অসুবিধা ক্যামনে? আমি বুঝায়া বলতাছি। এই মুহূর্তে যে পরিস্থিতি তাতে মোঘলগোর লগে সরাসরি দ্বন্দ্বে যাবার মতো অবস্থায় আমরা কেউই নাই—এইটা তো আপনে ভালোই জানেন। এইক্ষেত্রে জঙ্গলমহাল থেকে যারাই পলায়া উত্তরে সইরা পড়তে পারছে তাগোরে উদ্ধার কইরা আনার একটাই উপায়, ওইখানে লুকায়া যাইতে হবে এবং তাগোরে খুইজ্জা বাইর কইরা উদ্ধার কইরা নিয়া আসতে হবে। ব্যাপারটা খুবই কঠিন এবং দুর্ধর্ষ বিষয়। আমি বলব না যে এইটা করার মতন যোদ্ধা আমগো নাই, বা আমগো পক্ষে করা সম্ভব না কিন্তু আমরা স্থানীয়রা কেউ ওই এলাকাতে ঢুকতেই পারবো না। ক্যান পারবো না, বলতাছি-তাহলেই আপনি বুঝতে পারবেন আমরা কিংবা ঈশা খাঁ সাহেব ক্যান আপনেগো এইখানে পাঠাইছে।’
এই পর্যন্ত বলে সে একবার বাইরে উঁকি দিয়ে দেখে নিলো। মাসুম আসার সময়েও দেখেছে এখন আরও ভালোভাবে খেয়াল করে দেখল, পুরো কেল্লা এবং বসতবাড়ির চারপাশে প্রচুর সৈনিকের প্রহরা এবং সে এটাও অনুধাবন করতে পারছে-সৈনিক থেকে শুরু করে সাধারণ প্রহরীরাও অত্যন্ত সজাগ। এটাই স্বাভাবিক হবার কথা, কারণ চারপাশে একটা যুদ্ধাবস্থা বিরাজমান, এর ভেতরে এমন প্রহরা এবং সতর্কতা থাকবে এইটাই হওয়া উচিত রসুল খাঁ কিংবা বাসিমের জায়গায় সে নিজে থাকলেও একই কাজ করত।
‘যা বলতেছিলাম, মোঘলরা জঙ্গলমহাল দখল কইরা নিলেও তারা পুরো জল- জঙ্গলের এলাকা বন্ধ কইরা দেয় নাই। প্রথমে জঙ্গলমহাল দখলের পরে দুই দিন বন্ধ রাখছিল জঙ্গলমহাল দখলের মানে যুদ্ধের সময়েও সতর্কতার কারণে কিছুদিন বন্ধ ছিল, কিন্তু ওরা কেল্লাটা দখলের পর খুব সাধারণ মানবিক এবং কৌশলগত কারণে জল-জঙ্গলের পথগুলা খুলে দিছে।’
‘কারণটা কী?’ মাসুমের পাশে তাকিয়ায় হেলান দিয়ে বসা ধোবল জানতে চাইল। মাসুম মনে মনে খানিকটা স্বস্তি বোধ করল। যদিও সে জানে সে নিজে যেমন বাঙাল মুলুকের মানুষ, নিজের পরিবার ধর্ম আর খাঁ সাহেবের জন্যে জীবন দিতে পারবে হাসতে হাসতে ঠিক তেমনি তার বন্ধু ধোবল আর বরখা কোনোরকম দ্বিধা ছাড়াই হাসতে হাসতে মৃত্যুবরণ করে নিবে ওর নির্দেশে কিংবা ওকে সাহায্য করার জন্যে। কিন্তু একজন যোদ্ধা এবং নেতা হিসেবে সে এটাও জানে যুদ্ধে জিততে হলে কিংবা দলগত কাজে সাফল্য আনতে হলে দলের প্রতিটা সদস্যের শুধুমাত্র শারীরিক সম্পৃক্ততা নয় বরং ঘটনার সাথে তাদের মানসিক সংযুক্তিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা ব্যাপার। প্রথমে তো নিজেই পুরো ব্যাপারটা বুঝতে পারছিল না। এরপর নিজে যখন বুঝতে শুরু করেছে তখন সে খানিকটা চিন্তিত ছিল তার দুই বন্ধু আসলে পুরো ব্যাপারটার সাথে সম্পৃক্ত হতে পারছে কি না-সেটা নিয়ে। বরখার ব্যাপরটা আলাদা, প্রচলিত ব্যবস্থার আর্থসামজিক অবস্থানের একেবারে নিচ স্তর থেকে উঠে আসা বরখা সবসময়ই খুব শান্ত এবং ঠান্ডা মাথার মানুষ। কিন্তু ধোবল অত্যন্ত শক্তিশালী আর দক্ষ যোদ্ধা হলেও তার মনোযোগ কম এবং অস্থিরতা বেশি, কিন্তু বাসিমের প্রশ্নে সেও যখন আগ্রহ বোধ করতে শুরু করেছে এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন নির্দ্বিধায়
‘কারণ হলো, ধোবলের প্রশ্নের জবাবে বাসিম বলে উঠল। ‘একদিকে এই এলাকা অনেক মানুষের আবাসস্থলও, তাদের অনেকেই নিজেদের জীবিকার জন্যে জল-জঙ্গলের ওপরে নির্ভর করে, কাঠকাটা থেকে শুরু করে মাছ ধরা, শিকার, এমনকি জ্বালানি সংগ্রহ থেইকা শুরু কইরা তাগো নিত্যনৈমিত্তিক প্রায় সবকিছুই জল-জঙ্গলের ওপরে নির্ভরশীল। কাজেই জল-জঙ্গলের পথ বন্ধ করে দিলে এইসব মানুষেরা না খেয়ে থাকবে। মোঘলরা নিষ্ঠুর হইতে পারে কিন্তু মানুষের রিজিক বন্ধ করার মতো নয়। দ্বিতীয়ত, আরেকটা বিষয় হইল, জল-জঙ্গলের ভৌগোলিক অবস্থান। আগেই বলছি সুদূর মেঘালয় থেকে শুরু করে দূর আসাম এমনকি ত্রিপুরার অনেক ব্যাবসায়িক জিনিস আদানপ্রদানের অন্যতম একটা যোগাযোগ পথ এই জায়গা, বিশেষ কইরা বমার নদীটা বেশ বড়ো কয়েকটা হাওড় আর অন্য নদীর সাথে সংযুক্ত। কাজেই এটা বন্ধ কইরা দিয়ে মোঘলরা সবাইরে খেপাইতে চাইব না—এটাও স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। তবে এখানেও ব্যাপার আছে। ওরা পথ খুইলা দিছে ঠিকই, কিন্তু ওগো নজরদারি ছাড়া একটা মাছও এই জলপথ বা স্থলপথ অতিক্রম করতে পারবো না। ওই জায়গাতে ঢোকার প্রতিটা পথ ওগো নজরদারিতে রাখা এবং ওরা প্রতিটা লোকরে পরীক্ষা কইরা অস্ত্র জমা রাইখা ঢুকতে দিতাছে ওইদিকে।’
টানা কথা বলে সে সামান্য থেকে মৃদু কাশি দিয়ে গলা পরিষ্কার করে নিয়ে আবারও বলতে লাগল। ‘কাজেই ওইখানে ঢুকতে হইলে হয় ওগো হাতে পরীক্ষা হইয়া ঢুকতে অইব আর না হয় সরাসরি যুদ্ধ কইরা ঢুকতে হবো,’ মাসুম একটা ব্যাপার জানতে চাইত কিন্তু তার আগে বাসিমই সেটার জবাব দিয়ে দিলো। ‘আমরা ওগো লগে যুদ্ধ করতে পারবো না, তারমানে ওইখানে ঢুকতে অইলে লুকায়া ঢুকতে অইব। আর আমরা সেইটা পারবো না, কারণ মোঘল স্থানীয় ডাকাইত থেইকা শুরু কইরা বিপুল পরিমাণ লোক নিয়োগ দিয়া রাখছে। এমনকি শোনা যাইতাছে জঙ্গলমহাল থেইকা যারাই পলাইছে তাগো ধরার জন্যেও বিপুল অর্থ ঘোষণা করা অইছে। কাজেই আমগো কারও পক্ষেই ওইখানে ঢোকা সম্ভব না। এই কারণেই খাঁ সাহেব আপনাগো পাঠাইছে। আপনারা এই এলাকার লোক না, কাজেই কেউ চিনব না। এই ধরনের পানিবাহিত জঙ্গল এলাকায় আপনাগো যাতায়াত ও যুদ্ধের অভিজ্ঞতা আছে। সেই সাথে আপনারা নৌকা চালানিতে দক্ষ এবং আপনাগো কাজের দক্ষতা অনেক। খুব সহজেই ছদ্মবেশে আপনারা আরও ভিতরে ঢুইকা যাইতে পারবেন।’
‘সে তো বুঝলাম কিন্তু ভিতরে ঢুকলে পরে? আর আমরা কীসের ছদ্মবেশে ঢুকব ভিতরে?’ বরখা জানতে চাইল, গড়গড়ায় টান দিয়ে চিন্তিত ভঙ্গিতে ধোঁয়া ছাড়ছে সে।
বরখার প্রশ্ন শুনে বাসিম হেসে উঠল। ‘এইটাও আমরা ভাইবা রাখছি, ‘ ছেলেটার কথা শুনে মনে মনে বেশ অনেকটাই কৃতজ্ঞ বোধ করল মাসুম। ছেলেটার বুদ্ধি আছে, তারচেয়ে বড়ো কথা সত্যি সত্যি ওদেরকে সাহায্য করার ইচ্ছা আছে। এই ছেলে একদিন সত্যি সত্যি বাপের রাজত্বের হাল তো ধরতে পারবেই, এ বাঙাল মুলুকের বড়ো নেতা হয়ে ওঠার সম্ভাবনা আছে। ‘বুদ্ধিটা অবশ্য আমার না। আমি প্রথমে ছদ্মবেশের কথাই ভাবছিলাম। কিন্তু পরে আমগো বাহিনীর প্রধান শেরু আরও ভালো একটা বুদ্ধি দিছে। এতে আপনাগো দুইটা সমস্যারই সমাধান অইব,’ সে এইটুক বলতেই তার বাপ রসুল খাঁ মাথা নেড়ে সায় জানাল। ‘ঠিক।’
‘বুদ্ধিটা অইল আপনাগো খালি একলা না, এইখানে নিয়মিত যাতায়ত করে এরকম একটা দলের লগে আপনেগো ভিড়ায়া দিব। শেরু বলছে এইখানে কাঠুরিয়াগো একটা দল আছে যারা নিয়মিত ওইখানে যাতায়াত করে এইরকম একটা দলের লগে আপনাগো ভিড়ায়া দিলে আপনেরা সহজেই অগো লগে মিলা কাঠুরিয়ার ছদ্মবেশে জল-জঙ্গলে ঢুইকা যাইতে পারবেন। এতে আরেকটা সুবিধা অইব। ওরা আপনাগো জল-জঙ্গলে ঢোকার পরে পথ দেখান থেইকা শুরু কইরা অন্যান্য কাজের সাহায্য করতে পারবো। এতে আপনাগো ওইখানে যাবার পরেও খুব বেশি চিন্তা করতে অইবে না।’
‘বুদ্ধিটা ভালো নিঃসন্দেহে, মাসুম খুশি হয়ে উঠল, ছেলেটা আসলেই সব ভেবে রেখেছে। ‘আর একবার যদি তাগোরে উদ্ধার করতে পারি তাহলে?’
‘সেই উপায়ও ভাইবা রাখা হইছে,’ বলে বাসিম ওদেরকে দেখিয়ে দিলো সম্ভাব্য যে জায়গাগুলোতে তাদেরকে পাওয়া যেতে পারে এবং সেসব জায়গাগুলোতে একবার তাদেরকে পেলে কোনো কোনো পথে ওরা আবার রসুল খাঁর এলাকায় ফেরত আসতে পারবে। নিদেনপক্ষে ওদের পরিচিত কোনো মেছো পল্লী বা গ্রামেও যদি পৌঁছাতে পেরে একবার ওদেরকে খবর পাঠাতে পারে তাহলেই হবে। পথগুলো বুঝে নিতে নিতে মাসুম বলে উঠল, ‘বুঝতে পারছি। কিন্তু শেরু গেল কই, আর আমগো কিছু খবরের দরকার আছিল। ওইগুলাও জানা প্রয়োজন ছিল আবার সইন্ধ্যা নাইমা আসতাছে,’ মাসুম একবার অন্ধকার আকাশের দিকে দেখে নিলো। সন্ধে বেশ গভীর হয়েই নেমে এসেছে।
‘শেরু আপনাগো কাজেই গেছে,’ রসুল খাঁ বলে উঠল। ‘আইজ সকালে আপনেরা যখন এইখানে আইসা পৌঁছায়া বিশ্রাম নিতেছিলেন সেইসময়ে এলাকায় লোক লাগানো অইছিল খবরের জন্যে এবং সাম্প্রতিক সময়ের ভেতরে ওইদিকে যাইব এরকম একটা দল খুইজা বাইর করা অইছে, অবশ্যই খুব গোপনে। আপনারা খাবার সময়ে খবর আসে, ওইরকমই একটা দল নিজে থেইকাই আগ্রহ দেখাইছে আপনেগো ভিতরে নিয়া যাওয়ার জন্যে, অবশ্যই অর্থের বিনিময়ে।’
‘অর্থ বা মুদ্রা কোনো সমস্যা না। আমার প্রশ্ন অন্য জায়গায়,’ মাসুম চিন্তিত ভঙ্গিতে একবার বাসিম আর ধোবলের দিকে দেখে নিলো। ‘আচ্ছা, এই লোকগুলারে আবার আমরা বিপদে ফালায়া দিব না তো? আরেকটা বিষয় হইল, এরা কি আদৌ বিশ্বাসযোগ্য, এরা আবার আমাদের নিয়া ওপারে গিয়া মোঘলদের লগে টাকার বিনিময়ে সওদা করে দিব না তো?’
রসুল খাঁ হেসে উঠল। ‘আপনার প্রথম প্রশ্নের উত্তর অইল এরা কাজটা করতাছে টাকার বিনিময়ে, কাজেই ঝুঁকি এরা জানে। আর এরা ভয়ঙ্কর সাহসী লোক, এই সবরে এরা ডরায় না। আর দ্বিতীয় প্রশ্নের জবাব অইল ওগোরও তো ফিরা আসতে হবে এইখানেই তাই না, ওরা বেঈমানি করলে যাইব কই?’ বলে সে বাইরের লোক সমাগমের দিকে তাকাল। মনে অয়, শেরু চইলা আসছে। দেখি খবর কী?’
রসুল খাঁর সাম্রাজ্যের প্রধান ভিত্তিদের একজন শেরু তার সাথে ঠিক তার মতোই পোশাক পরিহিত আরও দুজন সৈনিককে নিয়ে বৈঠকখানার ওপরে উঠে আসল। ‘সালাম, হুজুর,’ কথাটা সে রসুল খাঁকে উদ্দেশ্য করে বললেও বাকিদের দিকে ফিরেও সামান্য মাথা ঝাঁকাল।
‘খবর বলো, শেরু? যা যা করতে পাঠানো অইছিল করতে পারছ? আর চাইরপাশে এলাকার খবর কী?’
‘হুজুর, খবর আগের মতোই, মোঘল পাহারা আগের মতোই শক্ত দড়ির গিটের মতনই আছে। বরং আরও শক্ত অইছে,’ বলে সে একবার মাসুমদের দিকে দেখে নিলো। ‘আইজ সকালে কালীঘাটে একদল মেছুয়াগোরে ঢুকতে তো দেয় নাই সন্দেহ হওয়াতে আটকাইয়া রাখছে অনেক সময়, তারপর ফেরত পাঠাইছে।’
‘কোনো কারণ ছিল ওগোরে আটকায়া রাখার?’ মাসুম ভ্রু কুঁচকে জানতে চাইল। কোনো সমস্যা করছিল ওরা?’
‘না, হুজুর,’ লোকটা বিশালাকায় এক ডাকাতের মতো দেখতে হলেও তার আচার-আচরণ অত্যন্ত মার্জিত এবং আদবকায়দাও খুব ভালো। যতবার মাসুমের দিকে ফিরে ততবারই সামান্য ঝুঁকে সম্মান জানিয়ে কথা বলে। ‘কোনো কারণই আছিল না। কালীঘাট অইল যেইহান দিয়া আমগো এইখান থেইকা জল-জঙ্গলের পথে ঢোকা যায়।
‘আচ্ছা বুঝছি, তুমি কাজের অগ্রগতি বলো, এইগুলা হিসাব কইরা লাভ নাই, ঝামেলা ছিল, আছে, থাকবই। আর উনারা যেহেতু যাইবই, কাজেই এইসব চিন্তা কইরা কিংবা আলাপ কইরা লাভ নাই। তুমি যাগো সন্ধান করতে গেছিলা হেগোরে পাইছ কি না, সেইটা বলো?’
‘না, হুজুর, বিলা আর হের সাথের কাউরেই পাইনাই। জঙ্গলমহালের যুদ্ধের পর থেইকা হেরা কই আছে কেউই জানে না। তবে অন্য একটা দল পাইছি, ওরা নিজ থেইকাই আসছে আগ্রহ নিয়া, এরাও কাঠুরিয়া। হেগোরে নিয়া আসছি যাতে হুজুরের লগে সরাসরি কথা বইলা সিদ্ধান্ত নিতে পারে।’
‘ও কার কথা বলতাছে?’ মাসুম বাসিমের দিকে তাকিয়ে জানতে চাইল।
‘আমি বিস্তারিত বলতাছি,’ কথাটা মাসুমকে বলে সে শেরুর দিকে ফিরে বলে উঠল, ‘তুমি যাও ওগোরে এইখানে নিয়া আস,’ বাসিমের কথা শেষ হতেই শেরু একবার মাথা ঝাঁকিয়ে চলে গেল।
‘মাসুম কাবুলি, আমি একটা পরিকল্পনা করছি তা তো আগেই বলছি, এখন বাকিটা বলি। আপনেগো জল-জঙ্গলের পথে ঢুকাইতে হইলে এই একটাই উপায় আছে,’ বলে সে রসুল খাঁর দিকে একবার দেখে নিলো। রসুল খাঁ মাথা নেড়ে সম্মতি জানাতেই সে আবারও মাসুমদের দিকে ফিরে কথা বলতে লাগল। ‘আপনাদেরকে শেরু একদল কাঠুরিয়ার সাথে পরিচয় করায়া দিবে, ও যাগোরে খুঁজতেছিল তাগোরে না পাইলেও যাগোরে পাইছে এগোরে দিয়াও কাজ চলব আমার বিশ্বাস। আপনেরা হেগোর সাথে কথা বইলা, হেগোর কাছ থেইকা সব বুইঝা প্রস্তুতি নিয়া রাখবেন। ওরা যখন জল-জঙ্গলের পথে প্রবেশ করে, আপনেরা তিনজন ওগোর দলের লগে মিশা ভিতরে ঢুইকা যাবেন। ভিতরে ঢুকার পরে বাকিটা আপনেগো ওপরে নির্ভর করতাছে।’
‘না, এইখানেও আমি খানিকটা সাহায্য করতে পারবো,’ রসুল খাঁ মনোযোগের সাথে ওদের কথা শুনছিল। সে এতক্ষণ খুব বেশি কথা বলেনি। কিন্তু এইবার বলে উঠল। ‘ভিতরে ঢোকার পরে কী করতে হবে সেই ব্যাপারেও খানিকটা সাহায্য করতে পারবো আমার বিশ্বাস। কিন্তু তার আগে ভিতরে ঢোকাডা বেশি জরুরি। ওই যে ওরা আসছে।’
মাসুম বৈঠকখানার ছাদের প্রান্তের দিকে তাকিয়ে দেখল: ওপরে ওঠার চালান বেয়ে শেরুর সাথে তিনজন উঠে আসছে। সবার প্রথমে ওর নজরে পড়ল শেরুর সমানই লম্বা কালো ধুতি আর খয়েরি ফতুয়া পরা শক্তিশালী এক যুবকের দিকে। তার সাথে একজন বয়স্ক আরেকজন তুলনামূলক কিশোর বয়সী ছেলে। ফতুয়া পরা লম্বা পাকানো দড়ির মতো শক্তিশালী যুবক এগিয়ে এসে প্রথমে রসুল খাঁকে সালাম জানাল, তারপর বাকিদের দিকে ঝুঁকে সম্মান জানাল। মাসুম মনোযোগের সাথে ছেলেটাকে দেখেই অনুমান করল এই ছেলেই এদের দলের অবিসংবাদিত নেতা। পরনে কালো ধুতি আর খয়েরি ফতুয়া ঠেলে বেরিয়ে আছে শক্তিশালী পেশিবহুল শরীর। গলায় একটা মোটা পাটের চাদরের মতো প্যাঁচানো, কপালে বাঁধা লাল নিশান আর সেটা ছাপিয়ে ওপরে উঠে আছে লাল তিলক। তার ঠোঁটের কিনারা থেকে বাঁ-কানের গোড়া পর্যন্ত একটা লম্বা কাটা দাগ, আরও একটা বিষয় অবাক করল। ছেলেটাকে দেখেই বোঝা যায় কঠিন পরিশ্রমী কোনো পেশার সাথে সংযুক্ত সে, কিন্তু সেই হিসেবে তার চোখের দৃষ্টি অত্যন্ত শান্ত এবং অভিজাত, শিক্ষিত কিংবা অভিজাত মানুষের মতোই। ‘হুজুর, সালাম জানাই,’ মাসুমের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল সে।
ব্যাপারটা অনুভব করে মাসুম বেশ মজা পেল। সে যেমন বুঝতে পেরেছে এই ছেলেটাই এই দলের নেতা, ঠিক একইভাবে ছেলেটাও পরিষ্কার বুঝতে পেরেছে এই দলের নেতা হলো মাসুম।
‘এই, তুমি কে? তোমারে তো আগে কখনও দেখছি বইলা মনে পড়ে না, তোমরা করো কী?’ রসুল খাঁ অনেকটা ধমকের সুরে বলে উঠল।
ছেলেটা রসুল খাঁর দিকে ফিরল কিন্তু সে মাথা ওঠাল না। মাথা নিচু করেই শান্তস্বরে বলে উঠল, ‘হুজুর, আমরা নিচু জাতের মানুষ, আমগোরে চিনা কি আপনেগো শোভা পায়?’ মাসুমের মনে হলো ছেলেটার কথা শুনে রসুল খাঁ বেশ খুশি হয়ে উঠল। বিষয়টা খানিক অবাক করার মতোই, ছেলেটাকে দেখে যেমন মনে হয় তার কথা বলার ভঙ্গি একেবারেই অন্যরকম। অত্যন্ত বিনয়ী এবং কেতাসম্পন্ন।
মাসুম বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে ছেলেটার সামনে চলে এলো। ‘তুমি তোমার নাম বলো নাই,’ সে ছেলেটার একেবারে সামনে এসে দাঁড়াল। উচ্চতা গড়ন এবং বয়সে ছেলেটা প্রায় ওর সমানই হবে। কিন্তু আদব দেখানোর জন্যে সে খানিকটা মাথা নিচু করে রেখেছে। ‘হুজুর, আমার নাম, গেড়ুয়া, ও হইল আমার ছোটো ভাই, পটু, আর হেয় আমার চাচা। আমরা কাঠ কাটি হুজুর। ওস্তাদ শেরুর কাছে শুনলাম বিশেষ কাজে লাগতে অইব, অর্থকড়িও পাওয়া যাব তাই চইলা আসছি।’
‘গেড়ুয়া, তুমি কি জানো, তোমগোরে ঠিক কী কামে এইখানে ডাকা অইছে?’ কোনো অদ্ভুত কারণে দরিদ্র কিন্তু আচার-আচরণে কেতাসম্পন্ন অভিজাত ছেলেটাকে ওর ভালো লেগে গেছে প্রথম দর্শনেই; এর সাথে কোনো ধরনের ছলচাতুরি তো করবেই না বরং একে সব জানিয়ে তারপর এর সাথে কাজ করবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে মাসুম। যদি এরা ওদেরকে সাহায্য করতে না চায়, প্রয়োজনে এদেরকে বাদ দিবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে মাসুম। ‘এতে কী ধরনের ঝুঁকি আছে, সেইটা জানো?’
‘জি, হুজুর, ওস্তাদ শেরু কিছুই লুকায় নাই বা জোর করে নাই। আমগোরে সব জানায়াই এইখানে আনছে। আপনেগোরে সাহাইয্য করতে পারলে আমরা খুশি হবো,’ বলে সে মাথা নিচু করেই আড়চোখে নিজের চাচাকে একবার দেখে নিলো।
তার চাচাও সায় জানাল তার কথাতে।
‘ঠিক আছে,’ বলে মাসুম ফিরে তাকাল বাসিমের দিকে। ‘তাহলে আর দেরি না করে পুরো পরিকল্পনাটা আমি একবার বুইঝা নিতে চাই।’
মাসুম কথাটা বলামাত্রই বাসিম শেরুর দিকে তাকাল; শেরু তার এক সাগরেদের দিকে ইশারা করতেই সে আবারও মেঝেতে রাখা পার্টির ওপরে আগের মানচিত্রটা বিছিয়ে দিলো। হুজুর, ভালো কইরা দেখেন। এই তুমরাও দেখ,’ এই কথাটা সে গেড়ুয়া আর তার সঙ্গীদের দিকে ফিরে বলে উঠল। ওরাও কাছে এসে বসে পড়ল। ‘এইখান থেইকা কাল কাকভোরে এই জায়গায় যাবো আমরা। সেই সাথে ওগো বাকি দলের সাথে আপনারা কাঠুরিয়ার ছদ্মবেশে এইখান থেইকাই নৌকায় উঠবেন। ওরা আপনেগো নিয়া ওইখান থেইকা দূরে এই জায়গায় কালীঘাটে যাইব।’
‘এইখানেই সবাইরে পরীক্ষা কইরা একটা একটা কইরা নৌকা ছাড়া অয়,’ গেড়ুয়া বলে উঠল। ‘এই জায়গা পার হওনই সবচায়া কঠিন। হুজুর, গোস্তাকি না নিলে আমি এট্টু কই,’ গেড়ুয়া মাথা নিচু করেই অনুমতির জন্যে রসুল খাঁর দিকে দেখে নিলো। সে মাথা নেড়ে সায় জানাতে বলে উঠল। হুজুর, আপনেগো আমগো কাপড় পড়তে অইব, আমগো জিনিসপত্র নিয়া লগে থাকতে অইব কুনো অস্ত্রপাতি নেওয়া যাইব না, আর ভুলেও আপনেরা কথা কইয়েন না। বোঝা গেছে?’
অস্ত্র নেওয়া যাবে না শুনে মাসুম বরখা আর ধোবল তিনজনেই একসাথে আপত্তি জানাতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই বাসিম হাত নেড়ে বলে উঠল।
‘ও নিয়া আপনারা চিন্তা কইরেন না। অস্ত্র নৌকার তলে অন্য উপায়ে দেওয়া হবে। একবার ওইপার যাইতে পারলে আর চিন্তা নাই। বাকি কথাগুলো ও ঠিকই বলছে। শেরু, তারপর বলো, যদি ওরা পার অইতে পারে তবে কী করবে?
‘হুজুর, ওরা আপনেগো নিয়া নৌকা ভিতরে আরও পনেরো মাইল যাইয়া এইখানে নামায় দিব। এইখানে,’ বলে সে মানচিত্রের একটা নিদিষ্ট জায়গা দেখাল। ‘এইখানেই অগো দায়িত্ব শেষ হইবে।’
‘ওইখানে আমার লোক থাকব। বাকিটা ওর কাছ থেকে বুঝে নিতে পারবেন, ‘ রসুল খাঁ বলে উঠল।
‘ঠিক আছে, আলোচনা অনেক হইছে এইবার কাজে নামতে হবে, মাসুম জোর গলায় বলে উঠল তবে আরও কয়েকটা জিজ্ঞাসা আছে আমার। বলে সে আরও কিছু জানতে চাচ্ছিল কিন্তু তার আগেই বাইরে অনেক হই-হট্টগোল শোনা গেল।
‘কি ব্যাপার, অইছে কী?’ রসুল খাঁ উদ্বিগ্ন স্বরে বলে উঠল।
ওরা দেখল ওদের পাহারাদারদের একজন দৌড়ে আসছে এদিকে। লোকটা এগিয়ে এসে হাঁপাতে হাপাতে বলে উঠল, ‘হুজুর, একটা ঝামেলা অইছে।’
