অধ্যায় সতেরো
সময়: ১৫৯৬ খ্রিস্টাব্দ
জল-জঙ্গলের ভেতরে মোঘলদের দখলকৃত এলাকার এক প্রান্তে
.
হায় রে, কপাল এমনও দিন আইব কে জানত!’ ছোটো গোল দেখতে চারা গাছটার গা থেকে ছুরি দিয়ে ছোটো ছোটো শাখা ডালপাতা ছাঁটতে ছাঁটতে কথাটা বলে উঠল ধোবল। সে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে নুক্কুনের দিকে। নুক্কুন নিজেও লাঠি বানানোর জন্যে আরেকটা চারা গাছ বাছতে ব্যস্ত। ধোবল তার দিকে তাকাতেই দাড়ি-গোঁফের জঙ্গলের ভেতর থেকে তাকিয়ে সে একটা সরল হাসি দিলো। ‘পাগলটারে আমি কী বলি, আর এই ব্যাটা দেখি খালি হাসে!’ লাঠিটা বানানো শেষ করে সে ওটাকে শূন্যে দুইবার পাক খাওয়ালো। ‘মনে অইতাছ তো কাম অইব, কী মনে অয়?’ এবার সে প্রশ্নটা উচ্চারণ করেছে বরখাকে উদ্দেশ্য করে।
বরখা নিজেও একই ধরনের আরেকটা লাঠি পরীক্ষা করতে ব্যস্ত। ‘শোন, কাজ চললেই অইব। একবার মোঘলগোর ওইখানে হানা দিতে পারলে আর চিন্তা নাই, ওইখান থেইকা জরুরি সব জিনিস চুরি করতে পারবো আমরা।’
‘একদম ঠিক কথা বলছোস,’ লাঠিটা পরীক্ষা করা শেষ করে ওটাকে মাটিতে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে সে বরখার দিকে তাকিয়ে বলে উঠল। ‘কারণ, হয় জরুরি জিনিস পাইয়া যাব আর যদি ধরা পইড়া যাই তয় জীবনে আর কোনো জিনিসের দরকারই পড়ব না,’ বলে সে বরখার উদ্দেশ্যে মুখ ভেঙচে দিয়ে চরের বালির ওপরে বসে থাকা মাসুমের দিকে দেখাল। ‘হেয় কী করে?’
ধোবলের ইশরা পেয়ে সেদিকে মুখ তুলে তাকিয়ে বরখা কথা বলে উঠল ‘কিছু একটা বোঝার চেষ্টা করতাছে মনে অয়, মাসুম বালিতে কাঠি দিয়ে কিছু একটা এঁকেছে একটু আগে। তারপর সেটা নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ কথা বলেছে নুক্কুনের সাথে, তারপর নুক্কুনকে লাঠি তৈরি করতে বলে সে আবারও লেগে গেছে নিজের বোঝাপড়া নিয়ে। ‘আমরা আমগো কাম করি। ওরে মতন থাকতে দেই,’ বলে বরখা নিজের লাঠিটা পরীক্ষা শেষ করে নুক্কুনের দিকে তাকাল। ‘কিরে তোর অইছে?’ নুক্কুন কাজ চলার মতো একটা লাঠি বানিয়ে নিয়েছে ছোটো একটা গাছের কাণ্ড দিয়ে। লাঠির কাজ শেষ হতেই বরখা চোখ তুলে তাকাল আকাশের দিকে । ‘বৃষ্টি আইব নাকি?’ একে তো সন্ধের অন্ধকার নেমে এসেছে তার ওপরে আকাশে জমতে থাকা কালো মেঘ দিনকে আরও অন্ধকার করে তুলেছে। ‘মনে অইতাছে ওস্তাদ আইজ রাতে ঝড়ও অইতে পারে।’
ওরা এই মুহূর্তে অবস্থান করছে ছোটো একটা দীপের মতো জায়গার এক প্রান্তে। ওরা দুপুরের পর দিকে মাসুমের মুখে যখন শুনতে পায় মাসুম মোঘলদের আস্তানায় হানা দেওয়ার কথা চিন্তা করছে, প্রথমে সবাই খুব হয়রান হয়ে ওঠে তারপর মাসুম বিয়ষটা বুঝিয়ে বলে ওদেরকে। প্রথমত, ওদের রসদ প্রয়োজন; দ্বিতীয়ত, ওদের তথ্য প্রয়াজন; তৃতীয়ত, ওদের প্রয়োজন নির্দেশনা। কাজেই এই তিনটে জিনিস একসাথে পেতে হলে মোঘলদের আস্তানাই সেরা জায়গা এবং ওরা এখন যে-অবস্থায় আছে সেটাতে সফল হতে হলে ওদেরকে ঝুঁকি নিতেই হবে। এছাড়া আর কোনো উপায় নেই। এরপরের সবচেয়ে বড়ো প্রশ্ন যেটা আসে সেটা হলো ওরা কোনো জায়গায় এবং কীভাবে হানা দিবে।।
মাসুম ওর সাথে নিয়ে আসা কাপড়ের মানচিত্রটা নিয়ে বসে নুক্কুনের সাথে বিস্তারিত আলাপ করে। যে মানচিত্রটা সে রসুল খাঁর ছেলে বাসিমের কাছ থেকে নিয়ে এসেছে সেটার একটা আলাদা বিশেষত্ব হলো: মানচিত্রটাতে জঙ্গলমহালের আগের দখলদার আসলাম শেঠের বাহিনীর অবস্থান পরিষ্কার করে নির্দেশ করা আছে। জোরদার সম্ভাবনা হলো মোঘলরা জঙ্গলমহাল দখল করার পর প্রথম এইসব ঘাঁটিগুলোর দখল নিয়েছে, কাজেই চেষ্টা করলে এগুলোর একটার অবস্থান বের করে সেখানে হানা দেওয়া সম্ভব।
‘প্রশ্ন অইল কোনোডাতে আমরা হানা দিব?’ বরখা ভ্রু নাচিয়ে জানতে চায়। মাসুম মনোযোগের সাথে মানচিত্রটা দেখতে দেখতে একটা জায়গায় আঙুল রাখে, তারপর চোখ তুলে নুক্কুনের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, ‘চেন?
নুক্কুন মানচিত্রটার দিকে তাকিয়ে থেকে বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে পর্যবেক্ষণ করে তারপর নিজের আঙুল কামরাতে কামরাতে জবাব দেয়, ‘হুজুর, এইটাই সবচেয়ে ভালো অইব, কারণ এইটা জঙ্গলমহাল থেইকা অনেক দূরে।’
‘তারচেয়ে বড়ো কথা এইটা ঠিক একটা আস্তানা না,’ বলে সে বাকিদের দিকে তাকিয়ে একবার ভ্রু নাচিয়ে যোগ করল। ‘জায়গাটা এইখান থেইকা কতদূরে, আর কেমন?’।
‘হুজুর, জায়গা একেবারে কাছে না আবার খুব বেশি দূরেও না। এই নাওটা ভালোই আছে। আমরা যদি তিনজনে টানা বৈঠা চালাই আধাবেলার ভিতরে পৌঁছানি সম্ভব।’
‘মানে এখন দুপুর অইলে সইন্ধ্যার ভিতরে পৌঁছানো সম্ভব। ভালো, আজ জায়গাটা কেমন কও দেখি।’
‘হুজুর,’ বলে সে মানচিত্রের ওই জায়গাতে আবারও হাত রাখল। ‘আপনের যেই জায়গাটা ঠিক করছেন ওইটা জঙ্গলমহাল থেইকা রওনা দিয়ে বাউয়া বিল হয়া বমার নদীতে পড়ব। বমার থেইকা মাইল আষ্টেক গেলে পরে বিরাট একটা ফসলি হাওড় আর বমার নদীর মাঝামাঝি একটা গেরামের মতন, ওইখানে সারা বছর কেউই থাকে না। বিশেষ কইরা এই সময়ে কেউই থাকে না। বছরে দুইবার কইরা বাহির গাও থেকে চাষীরা আহে, হাওড় শুকায়া গেলে সেইহানে ধান চাষ করে। আর বাকি সময় খালিই পইড়া থাকে। আপনে যেহেতু জাহাজের কথা কইলেন জোর সম্ভাবনা ওইটা একটা ঘাটের মতন। ওইখানে জাহাজ ভিড়ানি আছে। আগে আসলাম শেঠের লোকেরা ওই এলাকা নিয়ন্ত্রণ করত ওইখান থেইকা। এই জায়গাটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ এর পরেই বমার নদী শুরু অই গেছে আর ওইখান থেইকা। মেঘালয়ের একটা যাতায়াতের জায়গা সরাসরি যুক্ত। কিন্তু ওই এলাকাতে অনেক ডাকাইতের উৎপাত আছে। বিশেষ কইরা বিশা নামে এক ডাকাইতের দল ওই এলাকা নিয়ন্ত্রণ করত এক সময়। আসলাম শেঠের লগে হেগো বহুবার গন্ডগোল লাগছিল। এহন কি অবস্থা জানি না।’
‘বুঝতে পারছি,’ মাসুম দাড়িতে হাত বুলাতে বুলাতে বড়ো করে দম নিলো একবার। কিন্তু ওইখানে হানা দেওয়ার আগে আমগো বেশ কিছু কাম করতে অইব। প্রথমত, আমগো খাবারের ব্যবস্থা করতে অইব, কারণ পুরা দিনই পইরা আছে। কিন্তু কোনো খাওন নাই।’
‘হুজুর, এইটার ব্যবস্থা আমি করতে পারবো। আশপাশে অনেক মাছুয়াগো গেরাম আছে।’
‘মোটেই না, কোনো জায়গায় আমরা চেহারা দেখাইতে পারবো না,’ মাসুম জোর গলায় মানা করে উঠল। ‘জঙ্গল থেইকা ফলটল পাইলে খাইয়া কাম চালাইতে অইব চেহারা দেখাইলেই বিপদ। একদিকে মোঘলরা, অন্যদিকে গেড়ুয়ার লোকেরা কোনো জায়গায় আছে আমরা জানি না। কাজেই কোনো ঝুঁকিতে যাওন যাইব না। এরপরে লগে হালকা পাতলা কিছু অস্ত্র, আমগো খালি তিনটা,’ বলে সে নিজেকে শুধরে নিলো। দুইটা ছুরি আছে। আর কিছু না অইলে অন্তত কিছু লাঠি বানায়া নিতে অইব। আর দ্রুত যাইতে হবে, চল কামে লাগি।’
মাসুমের নির্দেশনা অনুযায়ী ওরা সবাই কাছের জঙ্গলে ছড়িয়ে পড়ে যে যা পারে টুকটাক কিছু ফলমূল নিয়ে আসে। নুক্কুন পাখির বাসা থেকে কিছু ডিমও নিয়ে আসে। সেগুলোই খেতে হয়েছে। মাছ ধরার চেষ্টা করেনি, কারণ একে তো ধরার মতো কিছু নাই, তার ওপরে ধরলেও কাঁচা খেতে হবে, কাজেই সেই চেষ্টা না করে ওরা দ্রুত রওনা দিয়ে দিয়েছে খাওয়া শেষ করে। নুক্কুনের অনুমান ভুল প্রমাণিত করে ওদের প্রায় ছয় ঘণ্টার মতো লেগেছে সেই দ্বীপের মতো গ্রাম, যেখানে মোঘলদের পাহারা আছে বলে ধারণা করছে সেটার অন্য প্রান্তে পৌঁছাতে। আগের জঙ্গলে দেরি হয়ে যাবে বলে সেখানে লাঠি বানানোর জন্যো আলাদা কোনো সময় নেয়নি ওরা। আর তাই এখানে এসে নামার পর ওরা কয়েকটা লাঠি বানিয়ে নিয়েছে।
ঝড় হইলে হবে, কিন্তু আমগো থামার উপায় নাই, জলদি করো,’ মাসুমের তাগাদা শুনে ওরা জলদি রওনা দিলো দ্বীপের অপর প্রান্তের দিকে
‘নুক্কুন, তুমি আগে যাও,’ বলে নুক্কুনকে আগে যেতে দিয়ে ওরা তিনজন ওকে অনুসরণ করতে শুরু করল। আকাশে মেঘের ডাক আরও বেড়েছে, যেকোনো সময় বৃষ্টি নামতে পারে বলে মনে হচ্ছে ওদের কাছে।
‘সামনেই গেরামডা,’ আধ মাইলের মতো এগোতেই নুক্কুন অনেকটা ঘোষণার মতো করে বলে উঠল। ‘বছরের এই সময় খালিই থাহুনের কতা।’
‘সবাই সাবধান, খালি না লোক আছে আমরা জানি না,’ মাসুম মৃদুস্বরে সাবধান করে দিলো সবাইকে। আর তাছাড়া মোঘলরাও এই ঝড় বৃষ্টির রাতে আস্তানা নিতে গ্রামের কোনো বাড়িতে।’
মনে অয় না, ওস্তাদ। কারণ এইগুলা ওগো থাকার মতন ভালো কোনো বাড়িঘর না,’ ওরা আরেকটু এগোতেই সারি সারি ঝুপড়ি দেখতে পেল। দেখলেই বোঝা যায় নির্দিষ্ট প্রয়োজনের সময় বাদে এগুলোতে সারা বছর কেউই থাকে না। এমনকি এগুলো আসলে সেভাবে থাকার মতোও নয়।
ওরা সারি সারি ঝুপড়িগুলো পার হতে হতে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়তে শুরু করল। এমনিতে শোঁ শোঁ বাতাস বৃষ্টি আর অন্ধকারের ভেতরে পথচলাকে করে তুলল আরও কঠিন। ‘ওই যে, ওস্তাদ, নুক্কুন না বললেও চলত। কারণ এই অন্ধকারের ভেতরে সারি সারি ঝুপড়িগুলো পার হতেই দ্বীপের একমাত্র আলো আছে এমন জায়গাটা খুব ভালোভাবেই চোখে পড়ে। সেই স্বল্প আলোতে ওরা দেখতে পেল, দ্বীপের অন্যপাশে একটা ঘাটের মতো। কাঠের বানানো ঘাটটা চলে গেছে বেশ গভীর পানি পর্যন্ত, আর সেখানে বড়ো একটা বিশ-পঁচিশ হাতি জালিয়া নৌকা বাঁধা। ঘাটের আশপাশে ছোটো ছোটো কয়টা ছাউনির মতো আছে। সেগুলোর ভেতরেই বাতি জ্বলছে কিন্তু কোনো মানুষ দেখা গেল না।
‘মাসুম, আমরা কি জাহাজে উঠব?’
মাসুম বৃষ্টির ভেতরে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ঘাটের দিকে। ‘প্রথমে আমরা ছাউনিগুলা দেখব। মনে রাখবা দুইটা উদ্দেশ্য, অস্ত্র আর খাবার আর পারলে খবর,’ বলে সে হাসল।
‘তাইলে তো—’
মাসুম মুখের সামনে আঙুল তুলে ধোবলকে থামিয়ে দিলো। ‘শশ, ছাউনিতে কিছু নাই। জাহাজেই যাইতে অইব, উপায় নাই। চল।’
ওরা সন্তর্পণে এগিয়ে ছাউনির কাছাকাছি চলে এলো। ওগুলোর কাছাকাছি গিয়ে দুইজন বাইরে পাহারায় রইল আর বাকিরা ওগুলোর ভেতরটা পরীক্ষা করল। কিন্তু শুধু দুচারটে বাতি বাদে আর কিছুই পেল না।
মাসুম ফিরে তাকাল জাহাজের দিকে। যারাই আছে জাহাজেই আছে, এইখানে ঠিক যেমনে দুইজন দুইজন কইরা গেছিলাম ওইখানেও তাই করব। আমি ধোবল আর নুক্কুন জাহাজে উঠব। বরখা তুই বাইরে পাহারায় থাকবি।’
ওরা খুব সাবধানে পায়ে পায়ে এগোল জালিয়াটার দিকে। ওটার কাছাকাছি পৌঁছে ঘাট থেকে পানিতে নেমে পড়ল। শুধু ঘাটের নিচে রয়ে গেল বরখা। কারণ কেউ পাহারায় থাকলে ওদিকেই দেখতে পাবে। ওরা পানিতে নেমে সাঁতরে চলে এলো জালিয়াটার অন্যপাশে সেখান থেকে নোঙরের দড়ি বেয়ে তিনজনে একে একে উঠে এলো জাহাজের ওপরে। বৃষ্টির বেগ বাড়তে শুরু করেছে। জালিয়াটার পাটাতনের ওপরে কেউই নেই শুধু একটা বাতি জ্বলছে। সেটার আলোতে চারপাশে কাউকে দেখতে পেলনা ওরা। এমনকি ভেতর থেকেও কোনো শুব্দ ভেসে আসছে না।
‘ঘটনা কী?’ ধোবল খুব অবাক হয়ে বলে উঠল।
মনে অয় বৃষ্টির কারণে সবাই ভিতরে। খুব সাবধানে,’ মাসুম এগিয়ে গেল। ওরা দুজন পাহারায় রইল। এক হাতে ছুরি চেপে ধরে আরেক হাতে লাঠি নিয়ে জালিয়ার খোলের ভেতরে ঢুকে চট করে একপাশে সরে গেল ও। ভেতরটা খালি। এখানেও একটা বাতি জ্বলছে, মাসুম ওদেরকে ভেতরে ঢোকার জন্যে ইশারা করল। পুরো জাহাজ খালি, চারপাশে উঁকি দিয়ে খাবার দাবার পড়ে থাকতে দেখল, ‘ঘটনা কি, ওস্তাদ? জাহাজে তো কেউই নাই—’
খট করে উড়ে এসে কিছু একটা লাগল কাঠের দেওয়ালে। মাসুম তাকিয়ে দেখল একটা তির
‘সাবধান,’ বলেই ও মাথা নিচু করে দৌড় দিলো দরজার দিকে। মাসুম ও দরজার কাছে পৌঁছে গেছে এক শক্তিশালী ধাক্কায় খুলে গেল ওটা। আর দরজার ধাক্কায় ভেতরে ছিটকে পড়ল ও। একেবারে ধোবল আর নুক্কুনের গায়ের ওপরে, হাত থেকে ছুটে গেল লাঠি। কিন্তু পড়ে গিয়েই উঠে দাঁড়াল ও। হাতে বেরিয়ে এসেছে ছুরি, ওর দুপাশে উঠে দাঁড়াল নুক্কুন আর ধোবল। বিশেষ করে ধোবল একেবারে অবস্থানে চলে গেছে। কারণ ও জানে এখন কীভাবে আক্রমণ ঠেকাতে হবে।
কিন্তু খোলা দরজা দিয়ে যে ভেতরে ঢুকল তাকে দেখে থেমে গেল ওরা দুজন। দুই কাঁধ ঝুলে পড়েছে, মুখে বোকা ভাব নিয়ে ভেতরে ঢুকল বরখা। ‘দুঃখিত, মাসুম, আমি কিছু টের পাবার আগেই ওরা–’
সে কথা শেষ করার অগেই দুইপাশে দুই জন করে চারজন মোঘল সৈনিক ভেতরে ঢুকল। তাদের ঠিক পেছনেই দলের সেনাপতি। মুখে লাল দাড়িওয়ালা মধ্যবয়স্ক সেনাপতি ভেতরে ঢুকেই ওদের দিকে তাকিয়ে টিটকিরির হাসি দিলো, সে তার সৈনিকদের দেখিয়ে বলে উঠল, ‘দেহো অবস্থা, এই মরার লাডি নিয়া ওরা আমগোরে আক্রমণ করতে আসছে,’ কথাটা করতেই তার সৈনিকেরাও হেসে উঠল।
ধোবল আর নুক্কুন পরস্পরের দিকে তাকিয়ে অসহায় একটা ভাব করল। ওরা হানা দেয়নি মোঘলদের জালিয়াতে, মোঘলরাই ফাঁদ পেতে রেখেছিল আর তাতে বোকার মতো এসে ধরা পড়েছে ওরা।
***
যজ্ঞের আগুনের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সে। খুব কাছ থেকে আগুনের দিকে তাকিয়ে থাকাটা খুব সুখকর কোনো কাজ না। কিন্তু এই কাজটা করে সে বেশ সুখ পায়, শুধু সুখ পায় বললে ভুল হবে এটা বাদেও আরও বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কাজে সে নিজেকে পীড়নের মধ্যে দিয়ে নিয়ে যেতে পারলে কেন জানি অদ্ভুত আর বিচিত্র এক আনন্দ লাভ করে। মানুষটা এমনিতে সে খুব একটা গরম মাথার নয়, আসলে উলটোটা। মানুষটা খুবই ঠান্ডা মাথার, বলতে গেলে পাথরের মতো শীতল ধরনের। এমন ধরনের শীতল একজন মানুষ যে বলতে গেলে কোনো কিছুতেই উত্তেজনা বোধ করে না, শুধুমাত্র দুটো বিষয় বাদে। এক, নিজেকে পীড়নের মধ্যে সে কেন জানি অদ্ভুত বিচিত্র আর বিকৃত আনন্দ লাভ করে, সেই সাথে তীব্র উত্তেজনা ও।
দুই, দেবীর আরাধনা। তার পৃথিবীর বলতে গেলে প্রায় পুরোটাই বরাদ্দ তার নিজের গোত্রের মানুষ আর তার দেবীর জন্যে। এই কারণে সচেতন হবার পর থেকে যখনই সে তাদের একজন হয়েছে দেবীর আরাধনা করতে শিখেছে, মানুষ শিকার করতে শিখেছে তখন থেকেই সে নিজেকে এই দুটো বিষয়ের এক অদ্ভুত সমন্বয়ে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছে প্রতিটা মুহূৰ্ত।
কথায় বলে মানুষের জীবনে নাকি দুটো মুহূর্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যেই মুহূর্তে সে জন্ম নেয়, আর যেই মুহূর্তে সে অনুধাবন করতে পারে তার জন্ম নেওয়ার উদ্দেশ্য। আর গেড়ুয়ার জন্যে সেই মুহূর্তটা ছিল যেদিন সে অনুধাবন করতে পারে বাকি জীবন সে দেবীর আরাধনা আর নিজের গোত্রের মানুষের কল্যাণের জন্যে কাজ করে যেতে চায়। সেদিনই সে নিয়ত করেছিল এই দুটোর জন্যে সে প্রয়োজনে যেকোনো কিছু করতে রাজি, এমনকি এই দুটো লক্ষ্যের সামনে তার নিজের জীবনও কিছুই না। সেদিন থেকে সে নিজের ভেতরের দুটো সত্তাকে এক করার জন্যে কঠোর পরিশ্রম করে গেছে একনাগাড়ে। দুটো সত্তার প্রথমটা হলো নিজেকে পীড়নের মাধ্যমে উত্তেজিত হওয়া, আর দ্বিতীয়টা হলো দেবীর জন্যে আরাধনা। দুটো একসাথে করে সে সবসময় দেবীর আরাধনা করার জন্যে নিজেকে পীড়নের মধ্যে দিয়ে সর্বোচ্চ সন্তুষ্টি লাভ করে।
একে তো পাঙ্গুরা নিজেরাই বিচিত্র এক জাতি, তার ওপরে গেড়ুয়া যে-দলের প্রধান সেই দলটা আবার পাঙ্গুদের ভেতরেও সবচেয়ে পুরনো আর গোড়া মতাদর্শ অনুসরণ করে এমন দলগুলোর ভেতরে একটা। তার এতটাই রক্ষণশীল যে তাদের রক্ষণশীলতার কারণে এমনকি তাদের অনেক জ্ঞাতি ভাই তুসুমবাজ, ভাগিনারাও তাদেরকে ভয় পায়, এড়িয়ে চলে। কিন্তু তাতে গেড়ুয়ার কিছু আসে যায় না, নিজের দল আর নিজের আরাধনাকে সে অন্য এক উচ্চতায় নিয়ে যেতে চায় এবং সে পারবে বলে বিশ্বাস করে।
পাঙ্গুদের নির্দিষ্ট কোনো স্থায়ী ঠিকানা নেই, তারা কখনও বিয়ে করে না। তাদের সমাজে এমনকি যৌনসঙ্গম করাটাও অনেকটা নিষিদ্ধের মতোই। তবে হ্যাঁ তাদেরও বিয়ে করে স্থায়ী হবার সুযোগ আছে, তবে সেটা সবক্ষেত্রে নয়, সবার জন্যেও নয়। পাঙ্গুদের জীবনের বেশিরভাগ সময় কাটে পানির ওপরে। তাদের সবারই নিজেদের দল আছে, কখনও দলগতভাবে আবার কখনও নিজেদের মতো করে তারা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ছদ্মবেশ নিয়ে ঘুরে বেড়ায়, বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন মানুষের সাথে মিশে যায়। কখনও যাত্রীর ছদ্মবেশে, কখনও মাঝিমাল্লার ছদ্মবেশে, কখনও জেলে, কখনও খালাসি। তারা সারা বছর ভ্রমণের ওপরে। তবে সবসময় শিকার করে না। তাদের শিকারের খুবই শক্ত নিয়মকানুন আছে, আর সেগুলো পুরোপুরি পালন না হলে দেবীর পরিষ্কার ইশারা না পেলে তারা শিকারে নামবে না কখনোই।
তারা সবাই জলদেবীর পূজা করে। পূজার জন্যেও রয়েছে নির্দিষ্ট স্থান এবং নির্দিষ্ট উপায়। রয়েছে দেবী নির্মাণের উপায় থেকে শুরু করে বিসর্জন পর্যন্ত সবক্ষেত্রেই বিশেষ পন্থা। পাঙ্গুরা দলগতভাবে পথ চলে। তারা যখন ডাঙা থেকে পানিতে নামে, তখন তারা তাদের সম্ভাব্য অঞ্চলগুলোতে আগে নিজেরা চষে বেড়িয়ে পুরোপুরিভাবে খুব ভালো ধারণা করে নেয়। ধরে নেওয়া যাক তারা আগামী কয়েকমাস কুশিয়ারা নদীর এক এলাকা থেকে আরেক এলাকাতে ভ্রমণ করবে, এরজন্যে তারা আগে নিজেরা দলগতভাবে প্রতিটা ঘাট, প্রতিটা অঞ্চল আগে নিজেরা চষে বেড়িয়ে খুব ভালোভাবে ধারণা করে নিবে এবং এসব পথে কারা চলাচল করে, কোনো দিনগুলোতে হাট বসে, কোনো ব্যবসায়ীর কাছে কেমন টাকা থাকবে—এসব খবর তারা আগেভাবেই বের করে ফেলবে। তারপর প্রতিটা সম্ভাব্য শিকারের জায়গা থেকে তারা দুটো জিনিস সংগ্রহ করবে, এক সেই পানিতে ডুব দিয়ে যদি সম্ভব হয় জলধারার তলদেশ থেকে এঁটেল মাটি আর সেটা সম্ভব না হলে অন্তত এর কাছাকাছি কোনো জায়গা থেকে তারা তুলে আনবে পলিমাটি। পলি বা এঁটেল ছাড়া কাজ হবে না। সেই সাথে সেই জলের বিশেষ এক ধরনের জলজ আগাছা। এগুলো সংগ্রহের পর প্রস্তুতি চলবে দুই ধাপে। একদিকে এঁটেল মাটি বিশেষ প্রক্রিয়ায় জলে ভিজিয়ে সেটাকে আর্দ্র করে রাখা হবে, অন্যদিকে আবার আগাছাগুলোকেও রোদে শুকিয়ে করে তোলা হবে খরখরে। এরপর দুটোকে একসাথে মিলিয়ে তারা নির্মাণ করবে নিজেদের প্রতীক দেবী-মূর্তি। বানানোর পর সেই মূর্তিকে মাদী শূকর অথবা পাঠার রক্ত দিয়ে রঙিন করে তাতে চড়ানো হবে পাট ও নলখাড়া দিয় তৈরি বিশেষ বস্ত্র। বস্ত্রধারণের পর পুরো দল মিলে পিতরাজের তেল দিয়ে বানানো বিশেষ প্রদীপ দেবীর পাদদেশে অর্পণ করবে। তিনদিন যাবৎ শুকনো শালুক ফুল, পীতরাজের তেলের প্রদীপ দিয়ে পূজা চলবে। এই তিনদিনে আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ চলবে। সেটা হলো একটা বৈঠা নির্মাণ। বিশেষ এক ধরনের কড়ই কাঠ দিয়ে বানানো হবে এই বৈঠা। বানানোর পর এই বৈধী দেবীর পায়ের কাছে অর্পণ করে তারা মাছ শিকারে নামবে। পানি আর শুকনো ফল ছাড়া আর কিছু খাওয়া বারণ এই কয়দিন। তিনদিনের পূজা সম্পন্ন হবার পর তৃতীয় দিনের শেষ প্রহরে সূর্য উদয়ের আগে তারা পানিতে নামবে মাছ মারতে। যদি সূর্যের আলো ছড়িয়ে পড়ার আগে অন্তত পাঁচ সের ওজনের একটা মাছ ধরা না পড়ে, তবে বুঝতে হবে দেবী সন্তুষ্ট হননি। তাহলে আবার চলবে পূজা আবার মাছ মারার প্রচেষ্টা। চলতেই থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত দেবীর ইশারা না পায় তারা। আর যদি পেয়ে যায় তবে সেই মাছ দেবীর পায়ের কাছে অর্পণ করার পর, দেবী মূর্তিতে আগুন ধরিয়ে পুড়িয়ে ছাই করে ফেলা হবে। সেই ছাই ভাসিয়ে দেওয়া হবে পানিতে। দেবী বিসর্জনের পর তাদের ভোজ চলবে মাছের ঝোল আর ভাত দিয়ে।
এরপর তারা দলগতভাবে সুবিধামতো ছদ্মবেশ নিয়ে শিকারে নামবে। শিকারের প্রক্রিয়া এবং প্রস্তুতি আগে থেকেই সম্পন্ন করা থাকে। তারা স্রেফ নিজেদের প্রয়োজনমতো ছদ্মবেশ নিয়ে সঠিক সময়ের অপেক্ষা করবে। দেখা গেল হয়তো তারা কোনো এক ঘাটে কোনো এক বুধবার, মানে ওই এলাকার হাটবারে কোনো এক ব্যবসায়ীকে উদ্দেশ্য করেছে শিকার হিসেবে বেছে নেওয়ার জন্যে। ওইদিন দেখা গেল ওই হাটবার শেষে ব্যবসায়ী তার সঙ্গী সাথীদের দিয়ে যাত্রীবাহী নৌকায় এসে উঠল, তাদের সাথে হয়তো ব্যাবসার টাকা আছে। নৌকা মাঝ নদীতে যেতে যেতে হঠাৎ দেখা গেল মাঝি নৌকার গতি কমিয়ে এনেছে, এমন সময় হয়তো নদীতে কোনো একটা মাছ ঘাই মারল, কিংবা মাছরাঙা একটা মাছ শিকার করল, এমন সময় হঠাৎ যাত্রীদের কেউ একজন বৈঠা তুলে ঠুক ঠুক ঠিক করে তিনবার ঠুকে দিলো নৌকার পাটাতনে, সাথেসাথে মাঝি নৌকা থামিয়ে ফেলবে। শিকার সতর্ক হবার আগেই অবিষ্কার করবে নৌকার নিরীহ যাত্রীরা হঠাৎ সবাই তাদেরকে ঘিরে আক্রমণ চালিয়েছে। কেউ বের করে এনেছে ফাঁস, নৌকার পাটাতন থেকে তুলে নিয়েছে লাঠি, আবার কেউবা চেপে ধরেছে তাদের হাত। আসলে শিকার বাদে নৌকার বাকি সব যাত্রীই ছদ্মবেশী পাঙ্গু।
মাঝ নদীতে কারও পালাবার উপায় নেই। তাদের শিকারকে কাবু করার পন্থা দুইটা। প্রথমে তারা হঠাৎ ঘিরে ফেলে শিকারকে। সাধারণত একটা শিকারের জন্যে তিনজন বরাদ্দ থাকে। একজন চেপে ধরে শিকারের হাত আরেকজন পিঠে বা বুকে পা তুলে দেয়। তৃতীয় জন ফাঁস বা দড়ি পরিয়ে দেয় গলায়। যদি পিঠে পা তুলে দিয়ে থাকে তবে ফাঁস টানা হয় সামনে থেকে। যদি বুকে পা তোলা হয় তবে ফাঁস টানা হয় পেছন থেকে। এভাবে শিকারকে হত্যার পর, একজন মৃতদেহটা চেপে ধরে নৌকার পাটাতনের ওপরে, অন্যজন গলার নিচে হাত ঢুকিয়ে বিশেষ কায়দায় ভেঙে দেয় শিকারের মেরুদণ্ড। মেরুদণ্ড এমনভাবে ভাঙা হয় যে এদেরকে পানিতে ফেললেও লাশ আর ভেসে উঠবে না। এরপর পানিতে ফেলে দেয় হয় শিকারকে। আর দেবীর উপহার স্বরূপ করায়ত্ত করা হয় তার সমস্ত মালামাল।
এই পুরো প্রক্রিয়াতে কিছু জিনিস মানা হয় খুব সতর্কতার সাথে। প্ৰথমত, যদি কোনো মাছরাঙা শিকার না করে, কিংবা পাঙ্গুরা শিকার নিয়ে রওনা দেওয়ার পর কেউই পানিতে কোনো মাছকে ঘাই মারতে না দেখে তারা কোনো অবস্থাতেই শিকার করবে না। এগুলো হলো দেবীর ইশারা, এটা ছাড়া শিকার অসম্ভব। দেখা গেল দীর্ঘদিন প্রস্তুতি নিয়ে কাউকে বাগে আনা হলো, কিন্তু স্রেফ ইশারা না পাওয়াতে ছেড়ে দিতে হচ্ছে শিকার, যে মানুষটা শিকার ছিল সে জানতেও পারল না মৃত্যুর কতটা কাছাকাছি চলে গেছিল। শিকার করার সময় কোনো অবস্থাতেই রক্তপাত ঘটানো যাবে না। রক্তপাত ঘটলে শিকারের সাথে যত মূল্যবান জিনিসই থাকনা কেন সেগুলো ফেলে দিতে হবে পানিতে। না হলে দেবী ক্রোধিত হবেন। আর যদি ভুলেও রক্তপাত ঘটে এবং সেটা সরাসরি নদী-খাল-বিল বা হাওড়ের পানিতে পড়ে তবেই সর্বনাশ! সেখানেই সমস্ত প্রক্রিয়া শেষ করে ফিরে যেতে হবে এবং বিশেষ পূজা করতে হবে। পাঙ্গুরা সবসময় শুধু মালামাল বা সম্পদের জন্যে শিকার করে না, কখনও কখনও তারা শিকার করে ছোটো বাচ্চাদের জন্যে। যেহেতু তারা পরিবার ধর্ম করে না, কাজেই তাদের ছোটো বাচ্চা সংগ্রহ করা হয় বিশেষ প্রক্রিয়ায় এবং বিশেষ উদ্দেশ্যে। এসব ক্ষেত্রে তারা শিকার হিসেবে বেছে নেয় এমন পরিবারকে যাদের অবুঝ ছেলে সন্তান আছে। ঠিক একই প্রক্রিয়ায় শিকারকে মেরে তাদের শিশু সন্তানকে রেখে দেওয়া হয় এবং তাদেরকে বড়ো করে তোলা হয় পাঙ্গু হিসেবে। ঠিক যেভাবে গেড়ুয়া বড়ো হয়েছে পাঙ্গুদের এমনই এক দলের মাঝে।
গেড়ুয়ার বাবা ছিল পাঙ্গুদের এই দলের নেতা। সে বড়ো হবার পর নিজের যোগ্যতা আর শক্তির প্রমাণ দিয়ে এই দলের নেতা হয়েছে। সে নেতা হবার পর দলকে অনেক শক্তিশালী আর সম্পদশালী করেছে কিন্তু এখন সে চাইছে আরও বড়ো কিছু করার। কারণ দেবীর কাছ থেকে স্বপ্নে সে বিশেষ ইশারা পেয়েছে। পাঙ্গু সমাজের কারও যদি স্বপ্নে দেবী দেখা দেয় তবে ধরে নেওয়া হয় দেবী তার জন্যে বড়ো কিছুই অপেক্ষা করিয়ে রেখেছেন। এটা অনেক বড়ো সৌভাগ্য, গেড়ুয়া সেই
সৌভাগ্যধারীদের একজন। যজ্ঞের দিকে তাকিয়ে সে মনে মনে বিড়বিড় করে দেবীকে একবার ধন্যবাদ জানাল তাকে বিশেষভাবে নিজের আরাধনার সুযোগ করে দেওয়ার জন্যে তারপর দলের বাকিদের দিকে ফিরে বলে উঠল, ‘জরুরি আলোচনা আছে।’
***
‘মোঘল সেনাপতি বরকত উল্লাহ?’ মাসুম হাতের লাঠিটা নেড়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠল। ‘একসময় তোমার দায়িত্ব ছিল সেনা ছাউনিতে সেনাপতি কাবুলির জন্যে খাবার নিয়া আসা, তার ছোটোখাটো কাজকর্ম কইরা দেওয়া। আর এহন তুমি পুরা একটা জাহাজের দায়িত্ব পাইয়া গেছ!
বরকত উল্লাহ মাসুমের দিকে এগিয়ে আসছে। তার পাশাপাশি তার সাথে সৈনিকেরাও। ওদের পেছনে অসহায়ের মতো বন্দি করে রাখা হয়েছে বরখাকে, আর মাসুমের সাথে একদিকে নুক্কুন আর অন্যদিকে ধোবল। যদিও তিনজনেই নিজেদের বিচিত্র লাঠি চেপে ধরে আছে এখনও কিন্তু পুরোদস্তুর অস্ত্রে সজ্জিত মোঘল বাহিনীর সামনে সেগুলো দেখাচ্ছে খেলনার মতো। আর যেহেতু বরখা ওদের কবজায় চাইলেও ওরা কিছু করতে পারবে কি না সন্দেহ। বরকত উল্লাহ একবার পেছনে বরখাকে দেখে নিয়ে মাসুমের দিকে ফিরে ইশারা করল। মাসুমের হাতের লাঠিটা আপনাতেই নিচের দিকে নেমে গেল। আক্রমণাত্মক অবস্থা থেকে সোজা হয়ে দাঁড়াল সে। বরকত উল্লাহ এগিয়ে এসে তার হাত থেকে লাঠিটা একটানে নিয়ে নিলো। তারপর সেটার দিকে তাকিয়ে হেসে বলে উঠল, ‘প্রাক্তন মোঘল সেনাবাহিনীর লোক,’ ইচ্ছে করেই সে প্রাক্তন শব্দটার ওপরে জোর দিলো। ‘মাসুম খাঁ কাবুলি, এখন বাঙাল মুলুকে বিদ্রোহী বারো ভূঁইয়াগো একজন,’ বলে সে মুখ দিয়ে চুক চুক করে শব্দ করতে লাগল। ‘বীরের এই অধঃপতন, গাছের ডালের লাঠি দিয়া যুদ্ধ করতে অইতাছে,’ বলে সে ঝটকা দিয়ে লাঠিটা ফেলে দিলো একপাশে, তারপর মাসুমের একটা হাত ধরে তাকে জোরের সাথে টেনে নিয়ে চেপে ধরল নিজের বিশাল বুকের সাথে। ‘হা হা হা, বন্ধু কতদিন পর।
ধোবল নিজের হাতের লাঠিটা নামিয়ে নিলো, তারপর অবাক হয়ে তাকাল নুক্কুনের দিকে, তারপর বরখার দিকে। আনমনেই একবার কাঁধ ঝাঁকিয়ে ইশারা করল, হচ্ছেটা কী!
***
যজ্ঞ শেষ হবার পর খাবার পরিবেশন করা হলো। আজকের যজ্ঞটা তাদের নিয়মিত কোনো যজ্ঞ না। এটা বিশেষ উদ্দেশ্যে করা হয়েছে বিশেষ কাজের জন্যে। যজ্ঞ শেষ হবার পর খাবার পরিবেশন করা হলেও গেড়ুয়া খেল না। আজকের যজ্ঞের উদ্যোক্তা ছিল সে নিজে। তাই দেবী মায়ের সন্তুষ্টির জন্যে আজ বিশেষ উপবাস রাখবে সে। সবাই যখন খেতে বসল সে নলীতে ভরে আরও কয়েক দফা সিদ্ধি টানল। সবার খাওয়া শেষ হতে প্রায় নিভু নিভু যজ্ঞের আগুনের চারপাশে তারা সবাই গোল হয়ে আলোচনায় বসল। পরিবেশন করা হলো পান আর ধোঁয়া ভরা বাঁশের নলী। গেড়ুয়া শুধু সিদ্ধি ছাড়া আর কিছুই খেল না।
সিদ্ধি মেশানো ধোঁয়া টানা হতেই তাদের আলোচনা জমে উঠল। দলের নেতার প্রধান একজন সহকারী থাকে। প্রথমেই সে পুরো পরিস্থিতি বয়ান করার পর চলবে প্রশ্নোত্তর পর্ব, এরপর সিদ্ধান্ত গ্রহণ।
গেড়ুয়া তার চাচার দিকে ইশারা করতেই সে পুরো পরিস্থিতি বয়ান করার পর, প্রশ্নোত্তর পর্ব শুরু হতেই আলোচনা খানিকটা উত্তপ্ত হয়ে উঠল। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে গেড়ুয়ার বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে দলের অনেক বয়স্ক সদস্যরা ঠিক খুশি নয়।
‘প্রথম কথা অইল আমরা আমগো নিয়মের অনেক বাইরে চইলা গেছি, এইটা কি ঠিক অইছে?’ লম্বা দাড়িওয়ালা এক পাঙ্গু মাথা নেড়ে বলে উঠল।
তার কথার জবাবে আরেকজন কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল কিন্তু গেড়ুয়া একটা হাত তুলে থামিয়ে দিলো। ‘দেবীর ইশারার বাইরে কি কিছু করা অইছে?’
বয়স্ক সদস্য মাথা নেড়ে আপত্তি জানাতে যাচ্ছিল কিন্তু তার আগেই আরেকজন বলে উঠল, ‘তোমার কথা ঠিক আছে গেড়ুয়া, কিন্তু এতহানি ঝুঁকি নেওয়া কি উচিত অইছে?’
গেড়ুয়া কিছু বলতে গিয়ে আবার চুপ হয়ে গেল। আরেকজন পাঙ্গু কথা বলে উঠল, ‘আজকের ঘটনায় আমগো ক্ষয়ক্ষতিও কিন্তু কম অয় নাই, আমগো দলের দুইজন আহতও অইছে? এই বিষয়ে তোমার কি কওয়ার আছে?’
দলের নেতা হলেও পাঙ্গুদের ভেতরে জবাবদিহিতার নিয়ম আছে। দলের যেকোনো সদস্য নিজের মতো প্রশ্ন করার ক্ষমতা রাখে দলের নেতাকে।
দলের সব সদস্যরা তাকিয়ে আছে গেড়ুয়ার দিকে। গেড়ুয়া চুপচাপ কিছুক্ষণ ধোঁয়া টানল তারপর বাকিদের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে শুরু করল। ‘শোনো, আমি প্রথমেই একটা কথা বইলা নেই, তোমরা আমার কাছে যা জানতে চাইতেছ, আমরা সবসময় যেমন কাম করি, আমি দলের নেতা হওনের পর থেইকা এর অনেক বাইরে চইলা আসছি। বিশেষ কইরা বিগত কিছুদিনের ব্যাপারগুলা তোমগো সবার উপরে চাপ ফালাইতাছে আমি বুঝতেছি। কিন্তু আমারে একটা কথা কও, আমি দলের নেতা অওয়ার পর থেইকা কি দলের ভিতরের নিয়ম আরও শক্ত অইছে কি না?’
প্রশ্নটা করে গেড়ুয়া কিছুক্ষণ চুপ থেকে দেখে নিলো দলের সবাইকে। আমি নেতা হওনের পর থেকেই গত কয়েক বছরে আমরা সবচেয়ে বেশি দেবীর আশীৰ্বাদ পাইছি কি না?’ গেড়ুয়া জানে এর কোনো জবাব নেই ওদের কাছে দেবীর আশীর্বাদ মানে লুট থেকে কামানো টাকা। দলের সবাই অনেক বেশি সম্পদ করেছে বিগত কয়েক বছরে। কাজেই এরও কোনো জবাব নেই তাদের কাছে। ‘আরেকটা কথা, আইজ থেইকা বছরখানেক আগে আমি যখন আমার বিশেষ পরিকল্পনার কথা বললাম সবাই খুশি অইছিলা কি না?’ দলের সবাই চুপ। ‘এরপর থেইকাই আমরা তক্কে তক্কে ছিলাম। কিছুদিন আগে মোঘল আর বাঙাল মুলুকের ভিতরে যখন যুদ্ধ লাগল তখনই আমি জানতাম এইটাই আমগো সুযোগ। আর এরপর আমগো হাতে আসল আরেকটা বিরাট সুযোগ। এই সুযোগ আমগো কাজে লাগাইতে অইতোই, ঝুঁকি নিতে অইতোই, গেড়ুয়া কখনোই তার গলা উঁচু করে কথা বলে না। এখনও একেবারে শান্ত স্বরেই কথা বলে চলেছে সে। কিন্তু তার বক্তব্য যত সামনে এগোচ্ছে তত বেশি গলা শক্ত হয়ে উঠছে ওর। ‘শোনো, আজকে ঘটনা নিয়ে শাই চিন্তিত অইয়া পড়তাছ ক্যান এইটা আমি বুঝলাম না। বড়ো কিছু করতে অইলে ঝুঁকি তো নিতেই অইব। আর তাই অইছে,’ বলে সে থেমে গেল। আরেকটা কথা অইল যেই উদ্দেশ্যে আজকের ঘটনা ঘটানো অইছে, সেইটা করা গেছে কি না?’
দলের সবাই চুপ, আরেক বয়স্ক সদস্য মুখের সামনে দুই হাত তুলে বলে উঠল, ‘গেড়ুয়া ঠিকই বলছে এবং ঠিকই করছে। আমি ওর লাগে আছি,’ তার সাথে আরও কয়েকজন সায় জানাল।
‘তুমরা আমার লগে থাক, যা আমরা চাই, দেবী মা চাইলে তাই করতে পারবোই,’ সে সাথে সাথে বাকিরাও গুঞ্জন তুলল। প্রত্যন্ত দ্বীপের ছাউনির বাইরের বৃষ্টির শব্দ ম্লান হয়ে গেল তাতে।
গেড়ুয়া বাইরে ফিরে তাকাল, আজকের নাটকটা যে-উদ্দেশ্যে সাজানো হয়েছিল সেটা শতভাগ সফল হয়েছে ভাবতেই তার মুখে মৃদু হাসি ফুটে উঠল। তিন যোদ্ধা তার আয়ত্বের ভিতরেই আছে। এখন খালি সঠিক সময়ের অপেক্ষা, আর আশা করি যাতে তারা তাগো কামডা ঠিকমতো করতে পারে। তাহলেই বাকিটা সে সামলাইতে পারবে। মনে মনে আরেকবার দেবী মাতার স্তুতি করে দেবীর আশীর্বাদ প্রর্থনা করল সে।
***
দস্তারখানের ওপরে সাজানো খাবারের ওপরে রীতিমতো ঝাঁপিয়ে পড়েছে ওরা। বলতে গেলে চব্বিশ ঘণ্টার ওপরে হয়েছে ওরা সেভাবে কিছু খেতে পারেনি, গাছের কিছু ফলমূল আর কিছু পাখির ডিম ছাড়া, তার ওপরে বিশ্রামহীন ভয়াবহ পরিশ্রান্ত এবং চিন্তিত সময় কেটেছে এলাকায় পা রাখার পর থেকেই। বাইরে রীতিমতো ঝড়-বৃষ্টি তাণ্ডব চলছে আর এর ভেতরেই জালিয়ার খাবার ঘরে বসে খেতে খেতে আলোচনা চলতে লাগল ওদের ভেতরে।
মোঘল সেনাপতি বরকত উল্লাহর সাথে ওদের মোলাকাত হবার পর বাকিরা যখন অনুভব করল আসলে মাসুম এবং এই সেনাপতি পুরনো বন্ধু, ব্যাপারটা ওদের জন্যে বেশ অবাক করার মতোই ছিল।
বরকতের সাথে দেখা হবার পরে মাসুম প্রথমে পরিস্থিতি এবং খবর নিয়ে আলোচনা করতে চাইলে বরকত উল্লাহ সাফ মানা করে আগে ওদের জন্যে পরিষ্কার কাপড় আর খাবারের ব্যবস্থা করতে বলে নিজের লোকদেরকে। ওরা পরিচ্ছন্ন হয়ে পোশাক পালটে যখন খাবারের জন্যে বসতে যাবে ধোবল প্রথমেই মাসুমকে ধরে বসে, ‘এইটা কি অইল? তুমি আগে থেইকা জাইনা বুইঝা আসছ আর আমগোরে অন্ধকারে রাখছ, কামডা কি ঠিক অইছে?’
মাসুম মৃদু হেসে নিজের অপরাধ কবুল করে পুরো বিষয়টা ওদেরকে খুলে বলে। ঈশা খাঁর সাথে যখন ওর কথা হয় সেদিন রাতে ঈশা খাঁ ওকে জানায়, ওকে এই এলাকায় পাঠানোর পেছনে যতগুলো কারণ আছে তার ভেতরে অন্যতম একটা কারণ হলো ও নিজে মোঘল বাহিনীর সেনাপতি ছিল এবং দীর্ঘদিন ওর সাথে কাজ করেছে এবং ওর বন্ধুসম বরকত উল্লাহ বাহরাম খাঁর বাহিনীতে আছে এবং সেও ও জঙ্গলমহালের দখলদারদের একজন হিসেবেই এই এলাকাতে এসেছে। সত্যি কথা হলো বরকত উল্লাহ নিজেই ঈশা খাঁর সাথে যোগাযোগ করেছিল এবং ভেতরের অনেক তথ্যও তাকে জানিয়েছে। আর একারণেই ঈশা খাঁ ওইদিন ওদের সাথে আলোচনা করার পর এই গোপন মানচিত্রটা ওকে দিয়েছিল। ওরা জল-জঙ্গলে প্রবেশ করার পর বরকত উল্লাহর বাহিনী সম্ভাব্য কোনো কোনো জায়গায় থাকতে পারে সে-বিষয়ে নির্দেশনাও দিয়েছিল। কিন্তু মাসুম বিষয়টা গোপন রেখেছিল কয়েকটা কারণে। প্রথমত, ও আসলে নিজেই নিশ্চিত ছিল না ওদেরকে বের করতে পারবে কি না, তার ওপরে গেড়ুয়াদের সাথে গন্ডগোলটা লাগাতে ও খানিকটা হলেও ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিল, তার ওপরে নিশ্চিত ছিল না বরকত উল্লাহ পারবে কি না। তাই ও বৃথা কোনো আশা জাগাতে চায়নি বাকিদের মনে। আর বরকত উল্লাহকে না পেলে আসল মোঘলদের কাউকে ধরেই তথ্য বের করতে হতো। সবমিলিয়ে এখন পেয়ে যাওয়াতে অনেক সুবিধা হবে ওদের জন্যে।
‘এখন বলো পরিস্থিতি কী?’ বরকত উল্লাহ দস্তরখানের ওপাশে বসে ওদেরকে দেখছে। মাসুম, তুমি অনেক বদলাই গেছ।’
মাসুম কিছু না বলে মৃদু হাসল। ‘তুমি আগে বলো এইখানে আমরা কতখানি নিরাপদ, তারচেয়ে বড়ো কথা আমগোরে সাহায্য করতে গিয়া তুমি নিজের উপরে কতখানি বিপদ ডাইক্কা আনছ?’
বরকত উল্লাহ হেসে উঠল, ‘মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা খেলে যারা, হেগো আবার বিপদের ভয় কীসের, কথাডা কে কইতো, কও তো দেহি?’ মাসুম হেসে উঠল, সে নিজেই এক সময়ে এই কথাটা দিনে কয়েকবার করে বলত। ‘তুমি এখনও কথার রাজাই আছ, বরকত। যা জিগাইছি সেইটার কথা বলো, নিজের উপরে ঠিক কী ধরনের বিপদ ডাইক্কা আনছ সেইটা বলো।’
বরকত উল্লাহ মাছি তাড়ানোর মতো করে হাত নাড়ল। ‘শোনো,,, তুমি ফৌজে থাকতে এতবার এতভাবে আমারে বাঁচাইছ। তোমার জন্যে একবার না একের বেশি সময় মরতে পারি আমি, আর বিপদ তো কোনো ঘটনাই না,’ বলে সে নিজের লোকদেরকে ইশারা করে খাবার সরিয়ে তামাক দিতে বলল। ‘আর যদি বলি নিরাপত্তার কথা, আশা করি তোমরা আমার এইখানে শতভাগ নিরাপদে আছ। আমি ঈশা খাঁ সাহেবরে তিনটা জায়গার কথা জানাইছিলাম যেইখানে আমার থাকার সম্ভাবনা ছিল। এর মধ্যে এইটাই সবচেয়ে বেশি কইরা বলছিলাম, কারণ এইখানে কেউই আইতে চায় না, কারণ এইখানের পর থেইকা বিশা ডাকাইতের এলাকা শুরু। তবে, আমার দলের আরও একটা ভাগ আছে ওইখানে আরও এক সেনা দলের লগে যৌথভাবে আমার টহল দিতে অইতেছে। কিন্তু হেরে কৌশল কইরা সরায়া দিছি আইজ রাইতে। হেরাও এই ঝড়বৃষ্টির ভিতরে মূল ঘাঁটিতে ফিরা গিয়া খুশিই অইছে। আর এহন এইহানে যারা আছে হেরা একেবারেই আমার নিজের লোক, এগোরে নিয়া কোনো সমস্যা নাই।’
‘বুঝতে পারছি। ওগো সাথে তো পরিচয় আছেই, ধোবল আর বরখা আমার একেবারে ছোটোবেলার বন্ধু, আর ও অইল নুক্কুন,’ বলে নুক্কুনের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে পাঙ্গুদের সাথে যা-ঘটেছে সেটা বিস্তারিত বলল মাসুম।
একটু ভ্রু কুঁচকে আনমেনই মাথা নাড়ল বরকত উল্লাহ। ‘বড়ো বাঁচা বাইচা গেছ, এগো খপ্পরে পড়লে শেষ। মুশকিল অইল এই এলাকা এখন ডাকাইত, পাঙ্গু, তুসুমবাজ আর নানা বাহিনীর লোকে ভইরা গেছে। এর ভিতরে থেইকা যা করতে আসছ সেইটা করতে অইলে বহুত ঝামেলা পোহাইতে হবে।’
মাসুম একটা হাত তুলল। ‘আইচ্ছা, তোমার সাথে সব বিস্তারিত আলোচনা করব আগে আমারে একটা কথা বলো, জঙ্গলমহালে কী অইছিল, পতন ক্যামনে অইল?’
গড়গড়ায় তামাক টানতে টানতে বরকত উল্লাহ সব খুলে বলল ওইখানে কী ঘটেছিল এবং সবশেষে সে যখন জানাল সুবাদার আসলাম শেঠের স্ত্রী তার সাঙ্গপাঙ্গদের নিয়া আসলেই সরে পড়েছিল সেটা শুনে মাসুমের সমস্ত শরীরে একটা স্বস্তির পরশ বয়ে গেল। এই প্রথমবারের মতো কেউ বিষয়টা শতভাগ নিশ্চিত করল যে সুবাদারের স্ত্রী আসলেই মোঘলদের খপ্পর থেকে পালিয়েছে। তাহলে এখনও সম্ভাবনা অছে। ‘সে তাইলে আসলেই পলাইতে পারছে?’
বরকত উল্লাহ মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল, ‘সে তো গেছে কিন্তু তারপরে তো—’
‘শোনো, আমারে এখন বিস্তারিত জানাও জঙ্গলমহালের পতনের পর বিগত কয়েক দিনে কী কী অইছে এবং–’
‘সব বলতাছি,’ বলে সে নিজের এক সৈনিকের দিকে ইশারা করতেই সে গোল করে পাকানো এক টুকরো কাপড় এনে ওদের সামনে বিছিয়ে দিলো। ‘এইটা দেখ ভালো কইরা,’ বলে সে মানচিত্রটার দিকে নির্দেশ করল। ‘এই হইল পুরা জল- জঙ্গল এলাকা,’ মাসুম এইটার পাশাপাশি নিজের নিয়ে আসা মানচিত্রটাও বিছিয়ে নিলো কারণ ওটার ব্যাপারে ওর নিজের ধারণাটা তুলনামূলক পরিষ্কার। ‘আর এইটা হইল জঙ্গলমহাল। তোমরা আসছ রসুল খাঁর এলাকা মানে এদিক থেইকা, আর এখন আমরা আছি এইখানে। এইদিকে হইল বমার নদী, এইটা হাওড় এলাকা, এইদিকে মেঘালয় থেইকা একেবারে হিন্দুস্থান পর্যন্ত চলাচলের পথ, প্রার পুরাটাই এখন মোঘলরা নিয়ন্ত্রণ করতাছে।’
মাসুম মনোযোগের সাথে দেখে বোঝার চেষ্টা করছে এবং পুরো অবস্থানটা মানচিত্র এবং মাথার ভেতরে নিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। ‘আচ্ছা, এইবার বলো তোমরা জঙ্গলমহাল দখল করার পর সুবাদারের স্ত্রী এবং তার লোকেরা কোনোদিকে পলাইতে পারে এবং এখন পর্যন্ত তোমরা মানে মোঘল বাহিনী কোনো কোনো দিকে নরজদারি করতে পারছ।’
‘মন দিয়া দেখ,’ বলে সে নিজের আঙুল দিয়ে মানচিত্রের ভেতরে নির্দেশ করে দেখাতে লাগল সে। জঙ্গলমহালের সম্ভাব্য কোনোদিক দিয়ে ওরা বের হইছে এবং সেদিক থেকে বের হবার পর কোনো কোনো জায়গায় ওরা অভিযেন চালিয়েছে এবং কোনো কোনো জায়গা বাকি আছে পুরোটাই বুঝিয়ে দিলো সে মাসুমদেরকে। বুঝিয়ে দিয়ে সে মাসুমের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, ‘মাসুম এইবার মন দিয়া শোনো, ঝামেলাগুলা কোনোখানে। প্রথম কথা অইল পাঙ্গুগোর লগে তোমার মোলাকাত হইছে কাজেই বুঝতে পারছ এই এলাকা এহন উত্তপ্ত চুলার মতন, সবাই জানে সুবাদারের স্ত্রীর লগে কিছু-না-কিছু আছিল, বেশির ভাগই মনে করে অনেক সম্পদ নিয়া পলাইছে সে। তার লগে কী আছিল সেইটা নিয়া আমার কোনো আগ্রহ নাই। আমার আগ্রহ তোমারে সাহাইয্য করা নিয়া। কিন্তু সমস্যা অইল সুবাদারের স্ত্রী জল-জঙ্গলের একেবারে ভিতরে ঢুইকা গেছে সম্ভবত নিজেরে মোঘলগোর থেইকা বাঁচানোর লাইগা সে কোনো ঝুঁকি নিতে চায় নাই,’ বলে সে মানচিত্রে একটা জায়গা নির্দেশ করল। ‘জায়গাটা এইখান থেইকা চাইর ক্রোশ দূরে, সমস্যা এইটা না। সমস্যা অইল ওইটা বিশা ডাকাইতের এলাকা। সে এমনিতেই এমন ভয়ঙ্কর যে সুবাদার অসলাম শেঠ কিংবা সবাই তারে সইমঝা চলত। এমনকি মোঘলগোর লগেও তার টক্কর লাগছে বরাবরই। সমস্যা অইল জোরদার সম্ভাবনা সুবাদারের স্ত্রী তার এলাকাতেই আছে এহন। কপাল খারাপ অইলে সে ওগো হাতে ধরাও পইরা গিয়া থাকতে পারে। আর কপাল ভালো অইলে এহনো মুক্ত আছে, কিন্তু তুমগো ওগো লগে টক্কর লাগতে পারে এইটার সম্ভবনা শতকরা শতভাগ,’ বলে সে একটু থেমে নিজের পাহারাদার সৈনিকদের বাইরে যেতে বলল। ওরা বাইরে গিয়ে দরজা লাগিয়ে দিতেই সে মাসুমের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, ‘মানসিংহের বিষয়টা তো তোমরা জানোই। সে এখন এগারো সিন্ধুর দুর্গ দখল কইরা ফালাইছে। ধীরে ধীরে সে নিজের জাল ছোটো কইরা আনতাছে। যেহেতু সে এগারো সিন্ধু দখল কইরা ফালাইছে কাজেই এহন সে নজর দিব রসুল খাঁর এলাকার দিকে। আর সেইটা করতে গেলেই খাঁ সাহেবরা বাধা দিব। লাইগা যাইব যুদ্ধ। এরমানে অইল তুমরা যদি তাগোরে উদ্ধার করতেও চাও জলদি করতে অইব।’
‘করণীয় কী?’ মাসুম পুরো বিষয়টার অসম্ভাব্যতা যাচাই করার চেষ্টা করছে নিজের মাথার ভেতরে। পুরোপুরি একজন সৈনিকের মতো সে সম্ভাবনা ঝুঁকি এবং বিপদ সবকিছু হিসেব করে নিজের করণীয় ঠিক করার চেষ্টা করছে।
‘প্রথমেই অবস্থা বুইঝা ব্যবস্থা,’ বলে বরকত উল্লাহ হেসে উঠল। ‘মাসুম, তুমি আমার বন্ধু তোমারে আমি বৃথা আশ্বাস দিব না। তোমারে খুব বেশি সাহায্য আমি করতে পারবো না। বরং সেইটা করতে গেলে তোমারে আরও বড়ো বিপদে ফালানি অইবে।’
‘আমি সেইটা বুঝি তুমি আইজ রাইতে যে আমগোরে সাহায্য করতাছ এতেই কত বড়ো ঝুঁকি নিছ আমি জানি। কাজেই প্রয়োজন নাই আরও বেশি কিছু করার। তুমি এক কাম করো আমগোরে অস্ত্রসহ সব রসদ দিয়া এই এইখানে, বলে,’ সে মানচিত্রের যেখানে আসলামের শেঠের স্ত্রী অবস্থান করতে পারে বলে ধারণা করছ সেখানের একপ্রান্তে দেখাল। এইখানের একপ্রান্তে নামায়ে দাও, বাকিটা আমগোরেই করতে হবে।’
‘এইটা সম্ভব, তোমরা এখন বিশ্রাম লও, আমি যত ঝড় বৃষ্টি থাক রাইতের দ্বিপ্রহরের আগেই ওইখানে যাবার ব্যবস্থা করতাছি। ওইখানে গেলেই শুরু অইব তুমগো মূল অভিযান।’
মাসুম আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়ে তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল একবার। মাসুম মনে মনে জানে বরকত ঠিকই বলেছে। ওখানে গেলেই শুরু হবে ওদের মূল কাজ।
