অধ্যায় সাতাশ
সময়: ১৫৯৬ খ্রিস্টাব্দ
জল-জঙ্গল এলাকা
প্রাণপণে দৌড়াতে দৌড়াতে যে মুহূর্তে পেছনে তাকিয়ে মাসুম দেখতে পেল কালো পোশাক পরা অবয়বগুলো দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে সে খুশি হয়ে উঠল, সেই সাথে সে বাড়িয়ে দিলো দৌড়ের গতি। চিৎকার করে বাকিদেরকেও দৌড়ের গতি বৃদ্ধি করতে বলল সে। ঠিক এই সময় এবং এই মুহূর্তটার জন্যেই অপেক্ষা করছিল সে এবং তার দলের বাকিরা। তাদের সমস্ত প্রস্তুতি এবং পরিকল্পনাও এই সময়টার জন্যেই, আর এর ওপরে নির্ভর করছে অনেক কিছু। মাসুম দৌড়ের গতি বাড়ানোর জন্যে হাতের বর্শাটা ফেলে দিলো। আপনাতেই সে একবার দেখে নিলো জঙ্গলের দিকে। ওখানে প্রস্তুত থাকার কথা মেহেরের সাথে থাকা বাহিনীটা। মাসুম দৌড়াতে দৌড়াতে একবার ওদের সাথে থাকা নারী যোদ্ধাটার দিকে দেখে নিলো ও। মেয়েটা বলতে গেলে প্রায় ওর সাথে সমান তালে দৌড়াচ্ছে। এর আগে ঝুপড়ির সামনে দেখেছে তার যুদ্ধের দক্ষতাও প্রায় পুরুষদের সমকক্ষ তো বটেই, বলতে গেলে ক্ষেত্রবিশেষে পুরুষদের থেকে খানিকটা বেশিই। মাসুম আরেকটু এগোতেই দেখল প্রায় জঙ্গলের কিনারায় চলে এসেছে, আপনাতেই ওর দৌড়ের গতি কমে এল, কারণ এখন খানিকটা ভুলচুক হলে আর দেখতে হবে না। ‘সবাই সাবধান।’
ওর দলের লোকেরা খুব ভালোভাবেই জানে মাসুম কীসের ব্যাপারে সাবধান হতে বলছে। জঙ্গলের থেকে শ’দুয়েক গজ দূরে থাকতে মাসুম বলতে গেলে নিজের দৌড়ের গতি প্রায় জোরে হাঁটার পর্যায়ে নিয়ে এলো। ‘সবাই আমার পিছে আসো, ঠিক আমার মতন,’ বলে সে চোখ সরু করে ওদের বানানো নির্দেশনাগুলো অনুসরণ করে এক এক পা করে লাফাতে লাফাতে এগোতে লাগল। শেষ নির্দেশনাটা পার হয়ে জঙ্গলের একেবারে কিনারায় এসে হাঁটুতে ভর দিয়ে ধপ করে বসে পড়ল, পার হয়ে আসতে পেরেছে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জায়গাটা। এখন দেখার অপক্ষো বাকিরা ঠিকঠাক পারে কি না।
মাসুম চোখ তুলে তাকাতেই দুটো জিনিস চোখে পড়ল। প্রথমত, ওর ঠিক পেছনেই ছিল সেই নারী যোদ্ধাটা। সে-ও ঠিক ওর মতোই লাফিয়ে লাফিয়ে নির্দেশনা ধরে পার হয়ে এলো জায়গাটা, তার ঠিক পেছনেই ধোবল আর ধোবলের পেছনে নুক্কুন। এবার ওরা দুজনে ঠিকভাবে পার হলেই আর ঝুঁকি নেই। সাথে সাথে মাসুমের দৃষ্টি চলে গেল ওদের দুজনকে ছাড়িয়ে পেছনের দিকে। কালো অবয়বগুলো আরও প্রকট হতে শুরু করেছে। তবে ওরা ওদের মতো এত দ্রুত এগোচ্ছে না, স্বাভাবিক ওরা খুব ভালোভাবেই জানে মাসুমদের আসলে পালাবার কোনো উপায় নেই। এই ছোটো জঙ্গলে ওরা কতক্ষণ লুকিয়ে থাকবে। অন্ধকারের ভেতরে পরিষ্কার দেখতে না পেলেও ও আন্দাজ করার চেষ্টা করতে লাগল, কতজন হতে পারে। ওর হিসেবে বিশজনের মতো নেমেছে দ্বীপে। এর ভেতরে অন্তত চার বা পাঁচজনকে ওরা কাবু করেছে ঝুপড়ির সামনে। এদের ভেতরে অর্ধেক যদি রায়েলিদের পিছু নিয়েও থাকে তবে অন্তত সাত-আটজন বা দশজনের মতো ওদের পিছু আসছে। আসুক, বর্শা ফেলে দিলেও নিজের প্রিয় ড্যাগারটা আছে, টান দিয়ে সেটাকে বের করে আনতেই ওর পাশে এসে দাঁড়াল জঙ্গলের ভেতরে থাকা আরেক যোদ্ধা, ওর দিকে একটা লাঠি ছুড়ে দিলো সে।
লাঠিটা খপ করে ধরে মাসুম দেখল লাঠিয়ালের পাশে আরও অন্তত দুজন তিরন্দাজ দাঁড়িয়ে গেছে। সামনে তাকিয়ে দেখল ধোবল প্রায় পার হয়ে গেছে জায়গাটা, এবার নুক্কন পার হলেই হয়। এরপর দেখবে ওরা কী করে। মাসুম মনে মনে ভাবতে লাগল ওরা তো এই পর্যন্ত পৌঁছাতে পেরেছে, রায়েলিদের কী অবস্থা কে জানে।
***
ঝুপড়িগুলো থেকে বের হতেই রায়েলি প্রাণপণে দৌড়াতে লাগল, তার সাথে পাল্লা দিয়ে দৌড়াচ্ছে সুলতান; কিন্তু ওদের সাথে তাল রাখতে গিয়ে বরখা হিমশিম খাচ্ছে। কারণ একে তো অন্ধকার, তার ওপরে আবার রায়েলি কিংবা সুলতান কিছুটা হলেও দ্বীপটা চেনে, কিন্তু সে একরকম বলতে গেলে প্রায় শূন্য ধারণা নিয়ে স্রেফ ওদের পায়ের দিকে তাকিয়ে দৌড়াচ্ছে।
‘আর কটুক?’ প্রশ্নটা রায়েলিদের উদ্দেশ্যে করলেও সে আপনাতেই ফিরে তাকাল একবার পেছন দিকে। বিশার কালো কোট বাহিনী পিছু নিতে শুরু করেছে, ওদের উদ্দেশ্য সফল হলেও দুটো সমস্যা হয়ে গেছে। একে তো ওদের একজন ঝুপড়িগুলোর ওখানে মারা পড়াতে ওদের দলের একজন কমে গেছে। তার ওপরে, ওরা ঝুপড়িতে যতজনকে কাবু করতে পারবে বলে ভেবেছিল সংখ্যাটা ততটা হয়নি, কারণ ডাকাতও সংখ্যায় এসেছে বেশি। তবে এতসব ভেবে লাভ নেই, বরখা দৌড়ানোতে মনোযোগ দিলো। পেছন ফিরে দেখতে গিয়ে সে খানিকটা পেছনে পড়ে গেছে, রায়েলি আর সুলতান এগিয়ে গেছে অনেকটাই। ও প্রাণপণে দৌড়াতে দৌড়াতেই পানির শব্দ পেল সামনে সেই সাথে দেখতে পেল সামনে নৌকাটার অবয়ব, নৌকাটাকে মেরামতির জন্যে বলতে গেলে প্রায় অনেকটাই বালির ওপরে তুলে নিয়ে আসা হয়েছে। পুরো নৌকাটাকে বেশ কয়েকটা কাঠের লগির ওপরে ভর দিয়ে উঁচু করে রাখা হয়েছে। একদিকে সামান্য হলেও হেলে আছে ওটা।
রায়েলি আর সুলতান পৌঁছে গেছে নৌকার কাছে। ওরা নৌকার কাছে পৌঁছেই বালির ওপরে বসে হাঁপাতে লাগল। বরখাও ওখানে পৌঁছে বসে পড়ল বালির ওপরে। বড়ো বড়ো করে দম নিয়ে সে জানতে চাইল। ‘আমগো তো মানুষ একজন কইমা গেছে, আর ওরা–’
রায়েলি এখনও দম নিচ্ছে তবে তার চেহারা পাথরের মতো কঠিন। বড়ো বড়ো করে দম নিতে নিতে সে বলে উঠল, ‘কিছু করার নাই। যা আছে তাই দিয়া কাম সারতে অইব। পিছে ফেরার উপায় নাই,’ বলে সে বালির ওপরে হাতড়াতে হাতড়াতে একটা ঝোপের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে নারকেল পাতা দিয়ে মোড়ানো একটা বস্তার মতো বের করে আনল। সেটা থেকে, দুটো ধনুক আর তিরের তূণী বের করে ছুড়ে দিলো ওদের দুজনার দিকে, সেই সাথে দুটো তরবারিও। তার কাঁধে ধনুক আগে থেকেই ছিল, সেটাকে সে ঠিকঠাক করে সোজা হয়েই বলে উঠল, ‘ওরা চইলা আসছে।’ বরখা মেয়েটার গলার শান্ত গলা শুনে খুবই অবাক হলো। এই মেয়ে ঠান্ডা পাথরের চেয়েও ঠান্ডা। মাসুম ঘাড় ফিরিয়ে দেখল অন্তত ছয়-সাতজন হবেই, সে-ও চট করে উঠে দাঁড়াল।
‘সুলতান, তুমি এইখানেই থাকো। ওরা আরেকটু আগাইলেই যা করার কথা ছিল সেইটা করবা। মনে আছে তো?’ সুলতান মাথা নাড়তেই সে বলে উঠল, ‘মনে রাখবা, ওরা যেন তোমারে ঠিকঠাক দেখতে পায়,’ বলে সে চট করে বরখার দিকে ফিরে বলে উঠল। ‘তুমি আমার সাথে আসো, ওরা দুজনে দৌড়ে চলে এলো নৌকার পেছন দিকে। তারপর ওকে নিয়ে একটা ঝোপের আড়ালে মেয়েটা চলে গেল তার নির্দিষ্ট জায়গায়, বরখা দেখল নৌকাটাকে ঠেস দিয়ে রাখা হয়েছে যে লগিটা দিয়ে, ওটার একটা প্রান্ত এসে ঢুকেছে ওরা যে ঝোপটায় অবস্থান নিয়েছে সেটার ভেতরে। ‘মনে আছে তো, বাঙালি, কী করতে অইব?’ কঠিন স্বরে কথাটা জিজ্ঞেস করেই সে চট করে বসে পড়ল আড়াল নিয়ে। এবার সময়ের অপেক্ষা।
***
মাসুম ওর হাতে ধরা লাঠিটাকে দুবার মাথার ওপরে পাক খাইয়ে ওটার একটা প্রান্ত জোরে ঠেলে ঢুকিয়ে দিলো সামনের ভেজা বালু মাটিতে। নরম মাটিতে ঢুকে গিয়ে লাঠিটা সোজা হয়ে রইল ওর সামনে। মাটি থেকে ভেজা বালু মাটি তুলে নিয়ে নিজের দুহাতের তালুতে ঘষে নিয়ে দুবার তালি মারল মাসুম, বিড়বিড় করে বলে উঠল, এইবার আসুক।
ওর পাশেই তরবারি নিয়ে প্রস্তুত আছে আরেকজন। আর ওদের দুপাশে দুজন তিরন্দাজ, সেই নারী যোদ্ধাও এসে দাঁড়িয়ে গেছে, এবার ধোবল আর নুকুনও ঠিক ঠাক এসে পৌঁছে গেলেই হয়, ধোবল শেষ নির্দেশনাটা লাফিয়ে পার হয়ে গেল, ওর ঠিক পেছনেই নুক্কুন। সে আর দুটো নির্দেশনা পার হতে পারলেই মুক্ত। মাসুম দেখল ডাকাতদের দলটাও প্রায় চলে এসেছে, আনমনেই সে একপাশে তাকাল, আপনাতেই একবার মাথা ঝাঁকাল সেদিকে তাকিয়ে। ও জানে কাউকে দেখতে না পেলেও অন্তত দুজন প্রস্তুত আছে ওখানে। মাসুম সামনে ফিরে তাকিয়েই দেখতে পেল ধোবল পার হয়ে গেছে জায়গাটা, নুক্কুন শেষ নির্দেশনা পার হচ্ছে মাসুম চিৎকার করে কিছু একটা বলতে যাবে, তার আগেই শেষ নির্দেশনাটা মিস করে গেল নুন, সাথে সাথে পা পিছলাল সে। মাসুমের মুখ দিয়ে আপনাতেই চিৎকার বেরিয়ে গেল, সে পরিষ্কার দেখতে পেল নুক্কুন পা পিছলে শরীরের ভারসাম্য হারিয়ে ধেয়ে চলেছে ওদের পাতা ফাঁদের দিকে, ধোবল কিছু একটা আন্দাজ করে পেছন ফিরে তাকিয়েছিল। নুক্কুনকে দেখতে পেল, সে-ও ধেয়ে চলেছে ফাঁদের দিকে। যদিও সে পার হয়ে গেছে, কিন্তু তাও চট করে আবারও পেছন ফিরে সে একটা হাত বাড়িয়ে ধরে ফেলল নুক্কুনকে, সাথে সাথে টান লাগল তার নিজের শরীরে। ক্ষণিকের জন্যে মাসুমের মনে হলো ওরা দুজনেই পড়ে যাবে ফাঁদের ভেতরে। আপনাতেই দুই কদম এগিয়ে গেল সেদিকে। কিন্তু বাজে কিছু ঘটার আগেই ধোবল ফিরে পেল তার শরীরের ভারসাম্য এবং চট করে নিজেও সোজা হয়ে গেল সেই সাথে সোজা করে ফেলল নুক্কুনকেও। কিন্তু দুজনেই চট করে পড়ে গেল বালির ওপরে।
মাসুম দেখল বিশার লোকেরাও প্রায় চলে এসেছে ফাঁদের কাছাকাছি। আর বড়োজোর বিশ কদমের মতো পার হলেই ওরা চলে আসবে, ফাঁদের ওপরে। ওদেরকে যদি আটকানো না যায় মাসুম চট করে এগিয়ে গেল ধোবল আর নুক্কুনের দিকে। দুজনেই ততক্ষণে উঠে বসেছে। দুজনকে টানতে টানতে খানকিটা সরিয়ে আনতেই দেখতে পেল লোকগুলো প্রায় চলে এসেছে। দম বন্ধ করে দেখল প্রায় আটজনের মতো হবে, প্রথম জন ফাঁদের কিনারায় পা রাখতেই ঝপাৎ করে পড়ে গেল পানিতে। তাকে অনুসরণ করল দ্বিতীয় আরেকজন। বাকিরা নিজেদের গতি কমিয়ে ফেললেও পড়ে গেল দুপাশের পানি ভরতি তিনটে গর্তের ওপরে। সাথে সাথে মাসুম ইশারা করতেই দুপাশ থেকে কড়কড় শব্দ তুলে দুটো লগি জালগুলোকে টেনে তুলে ফেলল শূন্যে। জালগুলোতে জড়িয়ে বন্দি হয়ে গেছে ওদের অর্ধেকের বেশি লোক। মাসুমের ফাঁদের পরিকল্পনাটা ছিল খুবই সাধারণ আর পুরনো। দ্বীপটা যেহেতু জেলেদের, কাজেই এখানে জেলেদের সামগ্রী আছেই। আর এর ভেতরে দুটো জিনিস খুবই প্রচলিত—একটা হলো মাছ জিইয়ে রাখার জন্যে পানির চৌবাচ্চা, আর অন্যটা হলো মাছ ধরার জন্যে লগি দিয়ে আটকানো জাল। ওরা এরকম দুটো জাল সরিয়ে এনে ওই দুটোকে পানি ভরতি মাছ ধরার চৌবাচ্চার ওপরে জালগুলো নামিয়ে সেগুলোকে নারকেল পাতা দিয়ে ঢেকে দিয়েছে। ওরা ঝুপড়ি থেকে পালিয়ে জঙ্গল পর্যন্ত আসার পেছনে অন্যতম কারণ ছিল ওদেরকে এই পর্যন্ত নিয়ে আসা। ওরা চৌবাচ্চাগুলোর ফাঁক দিয়ে নির্দেশনা দিয়ে রেখেছিল, ওরা সেগুলো এড়িয়ে জঙ্গলের কিনারা পর্যন্ত চলে এসেছে। কিন্তু অন্ধকারের ভেতরে পাতা দিয়ে ঢাকা চৌবাচ্চাগুলোর অবস্থান বোঝা ডাকাতদের জন্যে প্রায় অসম্ভব ছিল। আর তাই দৌড়ে এসে চৌবাচ্চাগুলোতে পড়ে যেতেই ওটাতে বিছানো জালে জড়িয়ে গেছে যারা পড়েছে, সাথে সাথে দুপাশে বসে থাকা দুজন লগুিগুলো ঠেলে জালগুলোকে টেনে ওপরে তুলে ফেলেছে, জালের সাথে জড়ানো ডাকাতেরাও উঠে গেছে ওপরে। ঠিক যেভাবে মাছ জালে জড়ানোর পরে টেনে তোলা হয়।
‘জীবনে প্রথম, মাটিতে মানুষ ধরলাম তাও মাছের জাল দিয়া, সাবধান,’ বলেই মাসুম মাটিতে শুয়ে পড়ল তিরন্দাজদেরকে জায়গা করে দেওয়ার জন্যে। দুই পা এগিয়ে ওরা যারা চৌবাচ্চার ওপাশে এখনও দাঁড়িয়ে ছিল তাদের দিকে তির ছুঁড়তে শুরু করল। এক দফা তির ছোড়া হতেই মাসুম, ওর পাশের যোদ্ধা নুক্কুন আর ধোবল উঠে দাঁড়িয়ে আক্রমণ চালাল অবশিষ্ট তিন চারজনের ওপরে। সবাই মিলে এদেরকে কাবু করতে কয়েক মিনিটের বেশি লাগল না। হাতের লাঠিটাকে মাথার ওপরে তুলে এক ডাকাতের খুলি ছাতু করে দিয়ে মুখের রক্ত মুছে বাকিদেরকে নির্দেশ দিলো জালে জড়ানো বন্দিদেরকে বেঁধে ফেলতে। কিছুক্ষণের ভেতরেই জঙ্গল থেকে বেরিয়ে মেহেরসহ সবাই জড় হলো ঝুপড়িগুলোর দিকে রওনা দেওয়ার জন্যে।
‘এদিকে তো সব সামলানি গেল, ওইদিকে কী অবস্থা কে জানে,’ মাসুম বিড়বিড় করে বলে উঠল। সবাই তাকিয়ে আছে যেদিকে নৌকাটা রাখা আছে সেদিকে
***
সুলতান নৌকাটার ঠিক সামনেই ওঁত পেতে বসে আছে। যেই ডাকাতগুলো কাছাকছি চলে এলো, সে লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল এবং সেই সাথে উঠতে শুরু করল লগি দিয়ে আটকে রাখা নৌকাটার পাটাতনের ওপরে। ওকে দেখে ডাকাতেরা হই হই করে তেড়ে এলো। সুলতান দেখল ডাকাতরা খুব বেশি সাবধানতার পরোয়া
করছে না, কারণ একে তো সংখ্যায় বেশি তার ওপরে ওদেরকে এমন একটা ভাব দেখান হয়েছে যে ওরা নৌকায় করে পালানোর চেষ্টা করবে, দূর থেকে অন্ধকারের ভেতরে চট করে বোঝাও সম্ভব না যে নৌকাটা পুরোপুরি পানি থেকে ওপরে তোলা। ওরা ভাবছে এরা আধা ঠিক করা নৌকাটাকে তো পানিতে ভাসানোর চেষ্টা করছে যেকোনো বোধ বুদ্ধি সম্পন্ন লোকের তাই ভাবার কথা। কিন্তু ওরা ফাঁদটা পেতেছে ভিন্নভাবে।
সুলতান নৌকায় উঠেই চলে এলো অন্যপাশে, তারপর নৌকাটা থেকে লাফিয়ে নেমে পড়ল ভেজা বালু মাটিতে। নেমেই সে মাটিতে হামাগুড়ি দিয়ে চলে এলো রায়েলি আর বরখা লুকিয়ে আছে যে ঝোপটার ভেতরে, সেখানে। ওরা দুজনেই প্রস্তুত হয়ে ছিল। সুলতান ভেতরে ঢুকেই হাঁপাতে লাগল। বাঁধের লগিতে হাত রেখে রায়েলি শান্ত সুরে জানতে চাইল, ‘কয়জন, গুনতে পারছস?’
‘সাজ্জন, কমপক্ষে,’ বলে সে নিজেদের দেখল, মোকাবেলাটা সহজ হবে না। যতই ফাঁদ পাতুক, তিনজনে সাতজনকে কাবু করা কঠিন।
‘আমরা কি—’
তাকে প্রশ্নটা শেষ করতে দিলো না রায়েলি, ‘দেহা যাক, শশশ,’ বলে সে সবাইকে চুপ থাকতে বলল, নৌকার এপাশের পাটাতনে কালো একটা অবয়ব দেখা যাচ্ছে। রায়েলি লগির ওপরে হাত শক্ত করল, বরখা আর সুলতানকেও চেপে ধরেছে ওটা। ‘এখন কী–’
‘শশশ, আমি তিন গুনলেই—’
ডাকাতেরা একে একে পাটাতনের এপাশে আসছে। সবার হাতেই হয় তরবারি আর না হয় চকচকে বাঁশের লাঠি। সবার পরনে কালো কোট, মাথায় মুখে কালো কাপড় বাঁধা। নৌকার পাটাতনের এপাশে এসে নিজেদের ভেতরে কথা বলাবলি করতে লাগল। ‘ওরা বুইঝা গেছে নৌকা পুরাটাই বালুর উপরে—’
‘এক,’ বলেই রায়েলি শক্ত করে দুই হাতে চেপে ধরল বাঁশের লগির মাথাটা। ‘দুই,’ ওরা দেখতে পাচ্ছে এক ডাকাত নৌকার পাটাতনের ওপর থেকে মাটিতে নেমে এলো লাফিয়ে, বোঝার চেষ্টা করছে সুলতান পালিয়ে কোনদিকে গেছে, বালুর ওপরে পায়ের ছাপ দেখে সে ফিরে তাকাল ওদের ঝোপটার দিকে, সাথে সাথে রায়েলি চিৎকার করে বলে উঠল, ‘তিন।’ বলেই তিনজনে প্রাণপণে ঠেলতে শুরু করল লগিটা। মুহূর্তের জন্যে মনে হলো এটা এক চুলও নড়ছে না জোরে জোরে ঠেলা দিতেই মটমট করে নড়তে শুরু করল। তারপর তীব্র ধাক্কার চোটে অনেকটা যেন পিছলে বেরিয়ে গেল ওদের হাতের ফাঁক দিয়ে, বরখা দেখল লগিটা নৌকার নিচ থেকে ছুটে যেতেই বিস্ফোরণের মতোই নৌকাটাকে ঠেস দিয়ে রাখা ছোটো ছোটো কাঠ আর বাঁশের টুকরোগুলো ছিটকে সরতে শুরু করল আর নৌকাটা কাত হয়ে গেল একদিকে। যে ডাকাতটা লাফিয়ে নেমে এসেছিল বালুর ওপরে নৌকাটা কাত হয়ে আছড়ে পড়ল তার ওপরে। নৌকার ভেতর থেকেও ভেসে এলো চিৎকার, চেঁচামেচি আর অর্তনাদ।
‘এই বার,’ বলেই লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল রায়েলি, ওর সাথে বাকি দুজনও। তিনজনেরই হাতে বেরিয়ে এসেছে অস্ত্ৰ।
কিছু ডাকাত নৌকার ওপরে আর কয়েকজন লাফিয়ে নেমে এলো বালুর ওপরে। ওরা সোজা গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল ওদের ওপরে। প্রথম দফায় কয়েকটা তির ছুঁড়তেই পড়ে গেল কয়েকজন। কিন্তু দ্বিতীয় দফা তির ছুঁড়তেই ডাকাতেরা এমনভাবে ওদের মুখোমুখি হয়ে গেল যে তির ছোড়ার মতো অবস্থা রইল না আর। লড়াই শুরু হয়ে গেল তরবারি আর লাঠি দিয়ে। রায়েলি নিজের ধনুক ফেলে দিয়ে তরবারি বের করে এনে ঝাঁপিয়ে পড়ল একজনের ওপরে। সুলতানও তাই, বরখা এমনকি ধনুক নামানোর সময়ও পেল না তার আগেই লড়াই বেঁধে গেল। সংখ্যায় ডাকাতেরা ওদের চেয়ে বেশি। কিন্তু লড়াই হলো সমানে সমান
প্রথম যার সাথে টক্কর লেগেছিল লোকটার হাতে ছিল চকচকে বাঁশের লাঠি। রায়েলি ভেবেছিল তরবারির কোপে ওটা দুই টুকরো হয়ে যাবে কিন্তু খুবই অবাক হয়ে সে দেখল লাঠিটা দিয়ে দক্ষ ডাকাত তার সাথে খুব ভালোভাবেই পাল্লা টানছে। কয়েক মিনিটের লড়াইয়ে যদিও একসময় তাকে কাবু করতে পারল রায়েলি, কিন্তু ততক্ষণে জান বেরিয়ে গেছে ওর। একাধিক আঘাতে রীতিমতো আহত। অন্যদিকে প্রাণপণে লড়ছে সুলতান আর বরখা। কিন্তু অসম লড়াইটা অনেকক্ষণ চালিয়ে গেলেও একসময় ওদের তিনজনকেই তিনপাশ থেকে ঘিরে ফেলল ডাকাতদের অবশিষ্ট কয়জন। বরখা নিজের অস্ত্র হারিয়ে ফেলেছে, সুলতানের লাঠি ভেঙে গেছে মাঝখান দিয়ে, একমাত্র রায়েলির হাতের তরবারি টিকে আছে কিন্তু সেটা চালানোর মতো অবস্থায় নেই সে।
‘আর মনে হয় না—’ হাঁপাতে হাঁপাতে বলে উঠল বরখা।
‘শেষ দম পর্যন্ত লড়বো,’ আবারও লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল রায়েলি, সাথে সুলতান এবং বরখাও। যদিও ঘিরে ফেলেছে ওদেরকে কিন্তু তিনজনেই আবারও আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে, ডাকাতেরা ওদের ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল শক্ত লাঠির বাড়িতে রায়েলির হাত থেকে ছুটে গেল ওর তরবারিটা। আবারও ধপ করে বালুতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল সে। এক ডাকাত মাথার ওপরে তুলে নিলো তার লাঠিটা ওটাকে নামিয়ে আনছে রায়েলির মাথা বরাবর, খট করে একটা শব্দের সাথে রায়েলি দেখল খুলিতে গেঁথে থাকা একটা তির নিয়ে মাটিতে পড়ে গেল লোকটা। মুখ থেকে খুলে গেছে ঢেকে রাখা কাপড়। চোখে অবিশ্বাস। অবাক রায়েলিও কম হয়নি, সে অন্যদিকে তাকিয়ে দেখল মাসুম ওর হাত থেকে ধনুকটা নামিয়ে নিচ্ছে। তার সাথের সঙ্গীরা হই হই করে ঝাঁপিয়ে পড়ল বাকি দুই ডাকাতের ওপরে। ওদেরকে কাবু করে বন্দি করতে খুব বেশি সময় লাগল না বাকিদের।
‘তুমি ঠিক আছ?’ বালুতে বসে হাঁপাতে থাকা রায়েলির কাছে জানতে চাইল মাসুম। সে বাকিদের দিকে দেখে নিয়ে নিজের কপাল থেকে ঘাম আর রক্ত মুছল এক হাতে তারপর ফিরে তাকাল খোলা পানির দিকে।
যা করার ছিল সেইটা করা গেছে, এইবার আক্রমণ চলবো পানিতে-’ ওর সাথের সবাই হই হই করে উঠল।
