অধ্যায় তিন – সময়: ১৫৯৬ খ্রিস্টাব্দ – চৌরা, বৃহত্তর ভাওয়াল গড় এলাকা, ফজল গাজীর শাসন অঞ্চল
আনমনেই নিজের মাথাটাকে একপাশে কাত করে অন্ধকারের ভেতরে দেখার চেষ্টা করছে মাসুম। ‘তগো কি মনে অইতাছে আমরা ঠিক জায়গাতে আছি?’ নিজের লম্বা দাড়িতে আলতো করে একবার হাত বুলিয়ে নিয়ে মাসুম খাঁ কাবুলি অন্ধকারের ভেতরে আবারও তার পাশের মানুষটাকে দেখে নিলো। আর তার পাশের মানুষটা অত্যন্ত বিরক্তি নিয়ে ফিরে তাকাল তার দিকে। মানুষের অভিব্যক্তি এমন একটা ব্যাপার যেটা বোঝার জন্যে আলো আর আঁধারির প্রয়োজন হয় না। স্থান-কাল আর পাত্রের সংজ্ঞা পরিবর্তন হলেও এই জিনিস খুব ভালোভাবেই ধরা যায়, বিশেষ করে ঘটে যদি খানিকটা বুদ্ধি আর কাজের ক্ষেত্রে যদি খানিকটা বিদ্যা থাকে আরকি আর বারো ভূঁইয়াদের ভেতরে সবচেয়ে সাহসী এবং দক্ষ যোদ্ধা মাসুম খাঁ কাবুলির দুটোই বেশ ভালো অনুপাতে আছে। কাজেই তার পাশের মানুষটি যে তার গলার স্বর শুনে চূড়ান্ত বিরক্ত হয়েছে সেটা বুঝতে তার খুব বেশি বেগ পেতে হলো না।
সে কথা বলে উঠতেই ধোবল বিরক্তি নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে মুখের সামনে একটা আঙুল তুলে চুপ থাকতে নির্দেশ করল।
মাসুম খাঁ কাবুলি একটা হাত তুলে আত্মসমর্পণের ভঙ্গি করে খুব সাবধানে নিজের শরীরটাকে খানিকটা পিছিয়ে নিলো গাছের ডালের ওপরে, তারপর আরাম করে হেলান দিলো গাছের মোটা কাণ্ডের গায়ে। হিসেবে ঘুমে জড়িয়ে আসার কথা তার কিন্তু উত্তেজনায় বরং বুকের ভেতরটা ধুপ ধুপ করছে। মাসুমের মনে পড়ে গেল তার ছোটোবেলার কথা।
ইয়েমেনি বংশদ্ভুত পরিবারে জন্ম তার। পূর্বপুরুষেরা ইয়েমেনের পাহাড়ি মরু অঞ্চলের বাসিন্দা ছিল। সেখান থেকে ধর্মপ্রচারের জন্যে তারা প্রথমে পূর্ব আফগানিস্তানের কাবুল প্রদেশে যায় এবং সেখান থেকে পরবর্তীতে বাঙাল মুলুকে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে শুরু করে। সেখান থেকেই নামের সাথে কাবুলি উপাধিটা যোগ হয়েছে তাদের পরিবারে। তার পূর্বপুরুষদের জীবনযাত্রা ছিল অত্যন্ত কঠিন। একদিকে হাজার হাজার মাইলের ভ্রমণ আবার তার ওপরে নতুন অঞ্চল এবং নতুন বসতি শধুমাত্র তাদের ওপরেই প্রভাব সৃষ্টি করেনি, প্রভাব সৃষ্টি করেছিল তাদের বংশধরদের ওপরেও। বর্তমান সময়ে হলে আমরা হয়তো একে বলতাম জেনেটিক মোডিফিকেশন। যাই হোক, মাসুমের পর দাদারা প্রথম ইয়েমেন থেকে আফগানের পাহাড়ি এলাকায় বসতি স্থাপন করার পর তাদের পরিবারের একটা অংশ সেই পাহাড়ি গোত্রের সাথে মিশে যায়। মাসুমের পরদাদা নিজেদের বন্ধুত্ব বিস্তারের জন্যে সেই পাহাড়ি গোত্রের সর্দারের মেয়ের সাথে নিজের ছেলে অর্থাৎ মাসুমের দাদার বিয়ে দিয়েছিল। সেখানেই নিজের বিবাহিত স্ত্রীকে নিয়ে সংসার শুরু করলেও নিজের বাবার নির্দেশে একটা সময় পরে সে আবারও পরিবারের একটা অংশ নিয়ে পথ চলতে শুরু করে এবং বঙ্গভূমিতে এসে পৌঁছায়। সরাসরি ঠিক করা না হলেও বঙ্গভূমিতেই আসার নিয়ত ছিল তাদের। দীর্ঘযাত্রায় পথিমধ্যেই নিজের সন্তান জন্ম দেয় মাসুমের দাদি অর্থাৎ পথ চলার ভেতরেই জন্ম হয় মাসুমের বাবার। তাদের পথ চলতে চলতে আরও একটা মজার বিষয় ঘটে। পথ চলতে চলতেই তাদের সাথে মিশে যায় আরও দুটো যাযাবর গোত্র। নিজেদেরকে মুসলিম ধর্মে ধর্মান্তরিত করে তারা হয়ে ওঠে একই পরিবারের অংশ। আর ঠিক একারণেই বলতে গেলে একদিকে মাসুমের রক্তের ভেতরে রয়েছে ইয়েমেনি এবং আফগান পাঠানদের বীজ এবং অন্যদিক থেকে বাঙালি এবং যাযাবর গোত্রের ধারা। যে- কারণেই বলতে গেলে একদিকে সে ধর্মপ্রাণ, অন্যদিকে ভয়ঙ্কর এবং বেপরোয়া যোদ্ধা, সেই সাথে অত্যন্ত ছন্নছাড়া ধরনের একজন মানুষ।
মাসুমের দাদা বাঙাল মুলুকের দক্ষিণ পশ্চিম অঞ্চলে এসে বসতি স্থাপন করে এবং সেই সাথে যে উদ্দেশ্য নিয়ে তারা এসেছে অর্থাৎ ধর্মপ্রচার শুরু করে। মাসুম কাবুলির পরিবার বাঙাল মুলুকে এসে স্থায়ীভাবে আসন গেড়ে বসতে খুব বেশি অসুবিধা হয়নি কারণ বাঙাল মুলুকে সেই সময়ে ইয়েমেন থেকে আসা সম্প্রদায়ের বেশ প্রভাব, প্রতিপত্তি তো ছিলই সেই সাথে মাসুমের দাদা বেশ ভালো রকমের সম্পদ সাথে করে নিয়েই এসেছিল। আর তারা ছিল পাহাড়ি গোত্রের কঠিন পরিশ্রমী মানুষ এবং সেই সাথে সৎ। একদিকে পরিশ্রমের ফলে ধীরে ধীরে তাদের পরিবার উন্নতি করতে শুরু করে, অন্যদিকে সততা এবং ধর্মীয় অনুশাসনের কারণে অত্র এলাকায় তাদের নামডাক ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। মাসুমের দাদার পর তার বাবা পারিবারিক ব্যাবসাকে উন্নতির চরম শিখরে নিয়ে তো যায়ই সেই সাথে সে জড়িয়ে পড়ে রাজনীতিতে। রাজনৈতিক ক্ষেত্রের তাদের পরিবার দারুণ প্রভাবশালী হয়ে ওঠে মাসুমের জন্মের আগেই। তাদের পরিবার যখন উন্নতির চরম শিখরে বিচরণ করছে এমন সময়ে তিন ভাই-বোনের পর জন্ম হয় মাসুমের।
পরিবারের ছোটো সন্তান হিসেবে একদিকে বাবা-মায়ের প্রিয় তো ছিলই, সেই সাথে একেবারে ছোটোবেলা থেকেই নিজের চঞ্চলতা দিয়ে সবার মন জয় করে নিতে থাকে সে। কিন্তু মাসুমের পরিবার ছিল প্রচণ্ড রকমের ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলা রক্ষণশীল, তীব্র মূল্যবোধ সম্পন্ন এবং বেশ নিয়মানুবর্তিতা মেনে চলা পরিবার। প্রথম দুটো ব্যাপার নিয়ে সমস্যা না হলেও তৃতীয়টা নিয়ে মাসুমের নিজের পরিবারের সাথে মানিয়ে নিতে বেশ সমস্যা হতে শুরু করে সে কৈশোরের কোঠা পার হওয়া মাত্রই। কারণ অল্প বয়সেই শারীরিকভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে ওঠে সে এবং এর সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে তার দুরন্তপনা। নামাজ-কলমা ঠিকমতো করলেও পড়ালেখা তাকে দিয়ে খুব বেশি হয়ে ওঠেনি। অন্যদিকে সারাদিন সে মাঠে-ঘাটে ঘুরে বেড়াত আর নানা দুরন্তপনা করে বেড়াত। ছেলে যুবক হওয়া মাত্রই তাকে নিয়ে বেশ চিন্তায় পড়ে যায় তার বাবা। এমন সময় কেউ একজন তাকে পরামর্শ দেয় ছেলে যদি আক্ষরিক অর্থেই পারিবারির গণ্ডির ভেতরে থাকতে না চায় এবং দুরন্তপনাতেই তার যদি মন থাকে তবে তাকে সেই ব্যবস্থাই করে দেওয়া হোক। যে সময়ের কথা বলা হচ্ছে সেই সময়ে দুরন্ত ছেলেদেরকে পারিবারিক বাঁধনে বাঁধার জন্যে বাবা-মায়েরা যে অস্ত্র ব্যবহার করত সেটা ছিল তাদেরকে অল্প বয়সে বিয়ে দিয়ে দেওয়া। কিন্তু মাসুমের বাবা তাকে বেশ ভালোভাবেই চিনতে পেরেছিল। সে জানত এই ছেলেকে বিয়ে দিলে উলটো আরও ঝামেলা বাড়বে। তারচেয়ে যে পরামর্শ দিয়েছিল তার কথা শুনে ছেলেকে সে মোঘল সেনাবাহিনীতে ভর্তি করিয়ে দেয় এবং তার দূরদর্শিতা শতভাগ ঠিক ছিল।
মোঘল সেনাবাহিনীতে মাসুম আক্ষরিক অর্থেই তার নিজের জীবনের অর্থ খুঁজে পায়। তৎকালীন সময় মোঘল সেনাবাহিনী ছিল উপমহাদেশ কাম বিশ্বের সেরা সেনাবাহিনীগুলোর একটি। মোঘল সেনাবাহিনীতে একেবারে ছোটোবেলা থেকে সৈনিক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হতো যুবকদের এবং ধাপে ধাপে তাদেরকে শূন্য থেকে শিখরে পৌঁছে দেওয়া হতো। সৈনিক নিয়োগ দেওয়া হতো একেবারে ভারতবর্ষের সমস্ত এলাকা থেকে শুধুমাত্র বুদ্ধিমত্তা এবং শারীরিক সামর্থ্যের ভিত্তিতে। না ছিল কোনো জাত-ভেদের কাহিনি, না ছিল কোনো রেষারেষি। একটাই লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে ধাপে ধাপে তৈরি করা হতো তাদেরকে।
নিজের সৈনিক জীবনের একেবারে শুরু থেকে মাসুম নিজে সেরাদের সেরা হিসেবে প্রমাণ করে নিজের সেনাবাহিনীর জীবনের দশ বছরে সে সর্বনিম্ন পদ থেকে সর্বোচ্চ অবস্থানে চলে গেছিল। বলা হতো পুরো ভারতে তার মতো দক্ষ যোদ্ধা খুব কমই আছে। মাসুম নিজেও সর্বদা ভাবত সে একদিন মোঘল বাহিনীর প্রধান সেনাদের একজন হবে। কিন্তু বিধি তার জন্যে ভেবে রেখেছিল একেবারেই ভিন্ন কিছু। একেবারে ছোটোবেলা থেকেই মাসুম বড়ো হয়ে উঠেছিল তীব্র ধর্মীয় অনুশাসন এবং মূল্যবোধের ভেতরে। যে-কারণে যতই দুরন্তপনা করুক কিন্তু তার ভেতরে ধর্মীয় অনুভূতি ছিল প্রকট। যে কারণে বাদশা আকবর যখন দ্বীন-ই-ইলাহি ধর্মের প্রবর্তন করল ব্যাপারটা সে মন থেকে মেনে নিতে পারেনি। একরকম বলতে গেলে বিদ্রোহ করেই সে সেনাবাহিনী থেকে ইস্তফা দিয়ে ফিরে আসে নিজের বাড়িতে।
তার এই ফিরে আসার ব্যাপারটা মোঘল বাহিনী কোনোদিনই ভালোভাবে নেয়নি। কিন্তু সে বাড়ি ফিরে আসাতে খুব খুশি হয়েছিল তার বাবা। কারণ তার পরিবারে তখন তাকে প্রয়োজন ছিল। বিশেষ করে তার বাবার। একদিকে মোঘলদের সাম্রাজ্যে সম্রাট আকবরের দ্বীন-ই-ইলাহি প্রচারের ফলে মোঘল সাম্রাজ্যে যেমন উত্থান-পতন চলছিল ঠিক তেমনি বাঙাল মুলুকেও সেই সময়ে ঘটে চলেছিল নানা পরিবর্তন। মাসুমের পরিবার শুধুমাত্র ধর্মীয় দিক থেকে তাদের এলাকাতে শক্তিশালী ছিল না, বরং তারা রাজনৈতিক দিক থেকেও প্রভাবশালী ছিল। মাসুমের দাদা আর তার বাবার হাত ধরেই এই ধারাটা পরিবারে চলে আসছিল। যেই সময়ের কথা বলা হচ্ছে সেই সময়ে এমনিতেই বাংলাকে বলা হতো বিদ্রোহের মুল্লুক। কারণ বাঙাল প্রদেশে একদিকে যেমন ছিল সম্পদের পাহাড় অন্যদিকে ছিল বিদ্রোহী রাজা আর শাসকদের আস্তানা। একদিকে এমনিতে বাঙাল মুলুক ছিল বিদ্রোহী রাজাদের আস্তানা তার ওপরে দক্ষ নেতা এবং সাহসী বীর ঈশা খাঁর উত্থানের মাধ্যমে বারো ভূঁইয়ারা একত্রিত হতে শুরু করাতে বাঙাল মুল্লুক তখন স্বাধীনচেতাদের আস্তানা হয়ে উঠছিল। তার ওপরে সম্রাট আকবর দ্বীনই-ইলাহি প্রবর্তন করাতে ধর্মীয় অনুভূতি প্রবলভাবে বারো ভূঁইয়া এবং স্থানীয়দের মনে ব্যাপারটা এতটাই দাগ কাটে যে তারা প্রকাশ্যে নিজেদের স্বাধীন এবং মোঘল বিরোধী বলে ঘোষণা করতে শুরু করে। এমন সময় ঈশা খাঁ থেকে শুরু করে গাজীরা সবাই খুব করে চাইছিল মাসুমের পরিবারকেও নিজেদের সাথে সামিল করতে। কিন্তু মাসুমের বড়ো দুই ভাই উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হলেও তাদের কেউই সামরিক শিক্ষায় শিক্ষিত তো ছিলই না, সেই সাথে তারা রাজনীতির বিষয়েও ছিল একেবারে কাঁচা। অন্যদিকে মাসুমের বাবার বয়স হয়েছিল। কাজেই সে নিজে থেকে কিছু করবে এমনটাও সম্ভব ছিল না। ঠিক এমনই এক সময় মোঘলদের সাথে বিরোধিতা করে বাড়ি ফিরে আসে মাসুম। তার বাবার পরামর্শেই সে ঈশা খাঁর সাথে যোগদান করার জন্যে উদ্যত হয়। একে তো ছোটোবেলা থেকেই উদ্ধত এবং তার ওপরে দীর্ঘদিন মোঘল বাহিনীতে কাজ করার সুবাদে মাসুমের ভেতরে একটা লুক্কায়িত অহংকার ছিল এবং সে মনে মনে ভাবত তার সামনে কেউই টিকতে তো পারবেই না বরং তার সমকক্ষও কেউ হতে পারবে না। কিন্তু তার এই ধারণা ভেঙে যায় ঈশা খাঁর সাথে মোলাকাত হবার পর। মল্লারের যুদ্ধে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করতে গিয়ে সে অনুধাবন করতে পারে ঈশা খাঁ নামের এই মানুষটা তার চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী যোদ্ধা তো বটেই, সেই সাথে তার প্রজ্ঞা রাজনৈতিক দূরদর্শীতা মিলিয়ে এমন এক মানুষের সন্ধান পায় সে ঈশা খাঁর ভেতরে যাকে তার মতো উদ্ধত যুবকও নির্দ্বিধায় নেতা হিসেবে মেনে নেয়। মল্লারের যুদ্ধেই ঈশা খাঁর সাথে দারুণ সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। কিন্তু গোলযোগটা বাঁধে মল্লারের যুদ্ধ শেষ করে বাড়ি ফিরে আসার পর
মোঘলরা যে তার এভাবে বাঙাল মুলুকে ফিরে আসাটা পছন্দ করেনি সেটা সে পুরোপুরি অনুধাবন করতে পারেনি। মল্লারের যুদ্ধ থেকে বাড়ি ফিরে যাবার আগেই মাসুম জানতে পারে মোঘল সুবাদার শাহবাজ খাঁর থেকে সমন এসেছে— তাকে দিল্লির সম্রাটের নির্দেশে মোঘল বাহিনীর কাছে ফিরে গিয়ে কারণ দর্শাতে হবে : কেন সে সেনাবাহিনী ছেড়ে পালিয়েছিল? তা না হলে তাকে রাজদ্রোহী হিসেবে ঘোষণা করে ফরমান জারি করা হবে।
ঘটনাটা ঘটার সাথে সাথে নিজের স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে মাসুম প্রথমে খুব উত্তেজিত হয়ে উঠেছিল কিন্তু সে উলটাপালটা কিছু করার আগেই ঈশা খাঁ তাকে নিজের দরবারে ডেকে নেয়। ঈশা খাঁ বাদে দুনিয়ার আর কেউ যদি তাকে ডাকত সেই সময়ে জীবনেও সে সেই ডাকে সাড়া দিত না। কারণ মাসুমের বক্তব্য হলো: তাকে এই সমন জারি করার মাধ্যমে অপমান করা হয়েছে এবং এই অপমানের প্রতিশোধ নিতে হবে তাকে, প্রয়োজনে যদি শাহবাজ খাঁর সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করতে হয় সে সেটাও করতে রাজি আছে। কিন্তু মানুষটা ঈশা খাঁ, একমাত্র তার ডাকেই নিজেকে শান্ত রেখে পালমপুরে ঈশা খাঁর গোপন কাচারি বাড়ির দিকে রওনা দেয় সে।
সেখানে যাবার পর অত্যন্ত তাজ্জব হয়ে সে দেখতে পায় সেখানে শুধু সে নয়, বরং বারো ভূঁইয়াদের অনেকেই উপস্থিত। শ্রীপুর ও বিক্রমপুরের রায় পরিবারের ভূঁইয়ারা, ভাওয়াল এলাকার গাজী থেকে শুরু করে অনেকেই উপস্থিত সেখানে। সেখানে যাবার পর বিস্তারিত আলোচনার পর পুরো ব্যাপারটার গভীরতা অনুধাবন করতে পারে সে খুব ভালোভাবে। সেই আলোচনায় যে কয়েকটা বিষয় উঠে আসে, তার ভেতরে অন্যতম হলো মোঘল শাসকেরা বাঙাল মুলুকে ইতিপূর্বে বারবার বারো ভূঁইয়াদের শক্তির কাছে পরাস্ত হয়ে আসছে এবং সেই কারণেই সম্রাট আকবর মানসিংহকে প্রেরণ করেছে বাঙাল মুলুকে। কিন্তু মানসিংহ বাংলায় এলেও সে এখন পর্যন্ত তেমন কিছুই করেনি বলতে গেলে। এটা নিয়ে বারো ভূঁইয়ারা চিন্তিত হচ্ছিল এবং বোঝার চেষ্টা করছিল আসলে সে করছেটা কী? তার চুপ করে থাকবার কারণটাই বা কী? মল্লারের যুদ্ধটা ছিল প্রথম একটা ধাক্কা। এরপর ধীরে ধীরে ওরা নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেওয়ার পাশাপাশি প্রভাব বৃদ্ধি করতে শুরু করে। প্রথমে সমন পাঠানো হয়েছে মাসুমকে আত্মসমর্পণের জন্যে, এর ঠিক কাছাকাছি সময়ে আরও বেশ কিছু ঘটনা ঘটতে শুরু করেছে বাঙাল মুলুকের আরও বেশ কিছু জায়গায়। আর ঠিক একারণেই অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্যেই আজকের এই সমাবেশ। আর সেই সমাবেশেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়: পুরো বাংলা জুড়ে গোপনভাবে বারো ভূঁইয়াসহ সমস্ত স্বাধীন রাজ্য শাসকদেরকে সাবধান করে দেওয়া হবে। সেই সাথে আরও একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় সেই সমাবেশে, যা মাসুমের মোটেই পছন্দ হয় না। সেটা হলো তাকে আপাতত দৃশ্যপট থেকে সরে পড়তে হবে। বিষয়টাকে সে ভীষণভাবে প্রতিহত করতে যাচ্ছিল কিন্তু ঈশা খাঁ তাকে পুরো ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলার পর সে বুঝতে পারে এবং মন না মানলেও বাস্তবতার হিসেব করেই তাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় ঈশা খাঁর বন্ধুসম ফজল গাজীর ভাওয়াল এলাকা চৌরাতে। সেই থেকে সে এখানেই আছে নিজের সবচেয়ে কাছের দুই বন্ধু ধোবল আর বরখার সাথে। সেই সাথে এখানে আসার পর তার মতোই আরও বেশ কিছু দামাল ছেলেপেলের সাথে বন্ধুত্বও হয়ে গেছে তার। সবাই মিলে ঘুরে বেড়ায়, বনে শিকার করে, নদীতে হাওড়ে মাছ ধরে। দিনগুলো খুব বেশি উত্তেজনাপূর্ণ না হলেও খারাপ যাচ্ছে না। পার হয়ে গেছে প্রায় দুই সপ্তাহ। এমন সময় গত কয়েকদিন তারা গাজীদের যে বাহির মহলে থাকছে সেখানে স্থানীয় এক জেলে খবর নিয়ে আসে—মঙ্গল মোহনা নদী যেখানে পুবের হাওড়ের সাথে মিশেছে সেখানে কয়েকদিন যাবৎ নাকি অদ্ভুত এক প্রজাতির মাছ এসে ঘাই মারে রাতের শেষ প্রহর আর ভোরের মাঝামাঝি সময়ে। কথাটা শুনেই পাকা মাছ শিকারি, মাসুমের অন্যতম সহকারী ধোবলের মাথা গরম হয়ে ওঠে। এমনিতেই কয়েকদিন ধরে তারা কোনো কাজ না পেয়ে মাছি মারছে, তার ওপরে এমন সময়ে বিশেষ ধরনের মাছের খবর শুনে তার মতো মৎস্য-শিকারির মাথা তো গরম হবেই। প্রশ্ন হলো জেলেরা তো নিজেরাই মাছ মারতে পারে খুব ভালোভাবেই, তাহলে তারা নিজেরাই কেন ধরছে না বড়ো আকারের মাছগুলোকে?
এর পেছনে বেশ কয়েকটা কারণ আছে। প্রথমত, মাছগুলো কী ধরনের মাছ এটা তাদের জানা নেই, তার ওপরে তারা এত বড়ো মাছ ধরতে অভ্যস্ত নয়। সেই সাথে সবচেয়ে বড়ো সমস্যা হলো-যে-এলাকাতে মাছগুলো দেখা গেছে, সেই এলাকাতে নদীর কুখ্যাত ঘড়িয়ালের আনাগোনা আছে। ঘড়িয়াল হলো এক ধরনের মেছো কুমির, এটাকে ঘট কুমির নামেও ডাকে অনেকে। এরা মূলত মাছ খায় বলেই এদেরকে মেছো কুমির বলে, তবে মাছ খায় বলেই এরা নিরীহ নয়। মুখটা অস্বাভাবিক লম্বা এবং বেশ হিংস্র প্রজাতি বলে এদের কুখ্যাতি আছে। একারণেই জেলেরা সাহায্য চাইতে এসেছে ওদের কাছে। আর সেখান থেকেই আজ রাতের অভিযান তাদের।
ধোবলের ধমক খেয়ে চুপ হয়ে মাথা সরিয়ে আধো অন্ধকারের ভেতরে বাকিদের অবস্থান বোঝার চেষ্টা করতে লাগল। সবাইকে পরিষ্কার দেখা না গেলেও মাসুম মোটামুটি জানে, কে কোথায় আছে। ওরা অবস্থান করছে যে জায়গাটায় মাছেদের আগমন ঘটে বলে কথা ছড়িয়েছে, সেই জায়গাটার একেবারে কাছাকাছি একটা গাছের ডালের ওপরে। এখানে আছে সে আর ধোবল। ধোবলের কাছে আছে বিরাট আকারের একটা মাছ ধরার কোঁচ, সেটা গোড়ায় লম্বা দড়ি বাঁধা আর দড়ির এক মাথা আটকানো আছে গাছের ডালে। মাসুমের কোমরে আছে একটা বড়ো ড্যাগার, আর তার হাতে আছে একটা বড়ো চুক্কি, এটা মাছ মারার জন্যে ব্যবহৃত না হলেও নিজে সে এটা ভালো চালাতে পারে বিধায় এটা নিয়ে এসেছে সে। সে এটা আনার পেছনে আরেকটা বড়ো কারণ আছে। ওদের থেকে আরও খানিকটা দূরে আরেকটা গাছের ডালে আছে খণ্ডা নামে মাসুমের দলের আরেক যুবক। আর তাদের থেকে আরও বেশ খানিকটা তফাতে পানিতে দুটো ঝোপের আড়ালে জাল এবং কোঁচ নিয়ে প্রস্তুত আছে দুটো নৌকায় দুজন করে চারজন জেলে।
মাসুম দূর থেকে পরিষ্কার দেখতে না পেলেও এটা অনুভব করতে পারছে সবাই মনে হয় বিরক্তির চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। মাসুম একবার দিগন্তের দিকে তাকাল। এখনও রাতের আঁধার পুরোপুরি বিদ্যমান, কিন্তু ভোর হতে আর বেশি বাকি নেই। সে ধোবলকে আবারও কিছু বলার জন্যে ফিরে তাকাল। ওর পাগলামিকে যথেষ্ট সায় দেওয়া হয়েছে। আর না। ‘ধোবল—’
মাসুম মুখের কথা শেষ করতে পারল না। ধোবল ধমকে উঠে নিচের পানির দিকে ইশারা করল। মাসুম চট করে ফিরে তাকাল সেদিকে। আধো অন্ধকারের ভেতরে ঘোলা পানিতে প্রথমে সে কিছুই দেখতে পেল না। কিন্তু ভালোভাবে তাকাতেই দেখতে পেল পানিতে ভুরভুরি উঠতে শুরু করেছে। সারা জীবন পানিতে বেড়ে ওঠা মাসুমের এটা বুঝতে সমস্যা হলো না যে ভুরভুরিগুলোর আকৃতি এবং ঘনত্ব দেখেই বোঝা যায় বেশ কিছু মাছ এসেছে এবং সেগুলোর আকৃতি যে মোটেই সাধারণ নয়—এটা পরিষ্কার বোঝা যায়। আরেকটু মনোযোগের সাথে সামনের দিকে তাকাতেই সে আরও চমকে উঠল। জংলা পানির ভেতরে ওরা যেদিকে তাকিয়ে আছে তার থেকে খানিকটা দূরে আরেক জায়গায় ভুরভুরি দেখতে পেল সে। কিন্তু সেটা সমস্যা নয়, সমস্যা হলো ভুরভুরিগুলোর আকৃতি দেখে মাথা নষ্ট হবার জোগাড় হলো তার। বড়ো আকারের পাতিলের সমান এক একটা ভুরভুরি উঠছে পানি থেকে। ‘ধোবল, ওদিকে ‘ ফিসফিস করে সেদিকে ইশারা করতে গিয়ে দেখল ধোবল ইতিমধ্যেই সেদিকে তাকিয়ে আছে। উত্তেজনা আর খুশির চোটে তার দাঁতগুলো সব বেরিয়ে পড়েছে।
‘কী মাছ এইগুলা– এত বড়ো ভুরভুরি—’
মাসুম দেখল ধোবলের শরীরটা ডালের সরু পরিসরের ওপরেই টান টান হয়ে উঠেছে এবং তার ডান হাতটা ধীরে ধীরে উঠে যাচ্ছে পেছনের দিকে। শরীরটা টান টান হয়ে উঠছে। দক্ষ হাতের কবজি স্থির হয়ে গেছে একটা বিশেষ ভঙ্গিতে। মাসুম খুব ভালো করেই জানে এরপর কী ঘটবে, কারণ এই জীবনে এই দৃশ্য সে বহুবার দেখেছে। আর দুই এক মুহূর্ত পর সে হাতটাকে পেছনে নিতে নিতে স্থির হয়ে যাবে তারপর থেমে যাবে মুহূর্তের জন্যে। মুখে ফুটে উঠবে হালকা একটা হাসি এরপর সে কোচটাকে ছুড়ে মারবে শিকারকে উদ্দেশ্য করে। অন্ধকারের ভেতরেই আনমনে একবার মাথা নাড়ল মাসুম, ধোবল কোনোদিনই শুধরাবে না, প্রত্যেকবার শিকারের আগে এমনটা করে সে।
কিন্তু সে অবাক হয়ে দেখল প্রতিবার যেভাবে ব্যাপারটা ঘটে সেভাবে ঘটতে ঘটতেও ধোবলের মুখের হাসি পর্যন্ত এসে থেমে গেল বিষয়টা। তারপর হঠাৎই তার হাসি গায়েব হয়ে গেল মুখ থেকে। মাসুম তাকিয়ে ছিল ধোবলের দিকে, তার মুখের হাসি গায়েব হয়ে যেতেই সে ফিরে তাকাল পানির দিকে এবং সাথে সাথে সে নিজেও অবাক হয়ে গেল। পানিতে বেশ ভালো রকমের আলোড়ন চলছে এবং বিরাট মাছটা হঠাৎ বেশ জোরে ঘাই মারতেই ওটার মাথাসহ শরীরের ওপরের অংশ চোখে পড়ল এবং মাসুম অবাক হয়ে দেখল মাছটার আকৃতি এবং গায়ের রঙ পরিচিত কোনো মাছের মতোই নয়।
‘সর্বনাশ এইটা তো গারুদ মাছ,’ ধোবলের হাত এখনও ওপরে ওঠানো এবং সে কোচটাকে ধরে আছে। মাসুম এখনও পানির দিকেই তাকিয়ে আছে মাছটার নাম শুনতেই তার মাথার ভেতরে ঝিলিক দিয়ে উঠল, গারুদ মাছের সে স্রেফ নামই শুনছে, কখনও দেখার সৌভাগ্য হয়নি। গারুদ মাছ গজার মাছেরই এক ধরনের প্রজাতি কিন্তু আকারে অনেক বড়ো এবং কথিত আছে এই মাছ নাকি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। নদী-খাল-বিলে এটাকে আর দেখা যায় না। আর এই বিলুপ্ত প্রজাতির মাছটাকেই কি না ওরা আবিষ্কার করে ফেলেছে এই হাওড়ের জঙলার কিনারায় এসে! কিন্তু মাছটাকে দেখার সাথে সাথে যে ভাবনাটা মাসুমের মাথায় খেলে গেল সেটা খুব সুবিধার না। নিশ্চিত এইবার ধোবল কোনো একটা পাগলামি করবে এবং তার দিকে নজর ফিরিয়েই সে দেখতে পেল ধোবলের মুখে হাসি ফিরে এসেছে এবং সে কোচটাকে ধীরে ধীরে নামিয়ে আনছে। মাসুম তার দিকে ফিরে তাকাতেই সে একটা হাসি দিয়ে বলে উঠল, ‘এই মাছ তো মারা যাবে না..’
‘ধোবল, পাগলামি করিস না-’
মাসুম কথা শেষ করার আগেই ধোবল কোচটাকে গাছের গায়ে গেঁথে ফেলল, সেই সাথে জোরে শিস বাজিয়ে উঠল সে। এই শিস বাজানোর অর্থ হলো, দুইপাশে যারা ওঁৎ পেতে আছে তারা পানিতে শব্দ করে দুইদিক দিকে জাল পেতে নৌকা নিয়ে এগোতে থাকবে, যাতে দুইদিকে পানির ঝাপটা আর তাড়া খেয়ে মাছটা উলটোদিকে রওনা দেয় এবং এদিক থেকে ওরা শিকার করতে পারে। ধোবলের ইশারা পেয়ে নৌকা থেকে হল্লা করে উঠল মাঝিরা সেই সাথে ঝপাঝপ পানিতে দাঁড়ের শব্দের সাথে সাথে বৈঠা পড়তে শুরু করল। আর মাসুমের দিকে তাকিয়ে একটা হাসি দিয়ে ধোবল বলে উঠল, ‘এইটারে ধরতে হবে,’ বলেই সে মাছের ঝাপটানি লক্ষ্য করে খালি হাতে ঝাঁপ দিলো।
মুহূর্তের জন্যে ধোবলকে আটকানোর জন্যে হাত বাড়িয়ে দিয়েও তাকে ধরতে পারল না মাসুম। তার আগেই ধোবল পাকা সাঁতারুর মতো লাফ দিলো মাছের সৃষ্ট আন্দোলনরত জায়গাটা লক্ষ্য করে। মুহূর্তের ভেতরে আধো অন্ধকার শান্ত জায়গাটাতে প্রায় নরক গুলজার সৃষ্টি হলো। দুইদিক ধেকে জেলেরা হল্লা করতে করতে জাল নিয়ে এগিয়ে আসছে। অন্যদিকে গাছের ওপর থেকে উৎসুক দৃষ্টিতে পানির দিকে তাকিয়ে আছে ওরা। আর পানিতে চলছে হুটোপুটি। একহাতে চুক্কিটাকে ধরে ডালের ওপর থেকে উৎকণ্ঠার সাথে পানির দিকে তাকিয়ে আছে মাসুম। ধোবল লাফ দেওয়ার সাথে সাথে সেই যে হুটোপুটি শুরু হয়েছে সেটা থামার নাম নেই।
সে নিজে কী করবে সেটা পুরোপুরি ঠিক করার আগেই ভুস করে একটা মাথা ভেসে উঠল পানির ওপরে। তবে মাথা আর কোনোটাই স্থির নয়। কারণ মাথার মালিক দুই হাতে জাপটে ধরে আছে কিছু একটা। ‘ধইরা ফেলছি–ধইরা ফেলছি–’ খুশিতে চিৎকার করতে করতে ধোবল বলে উঠল। বলতে গেলে দুই হাতে বিরাটাকায় মাছটাকে জাপটে ধরে রাখাতে পানিতে ভেসে থাকতে যেমন কষ্ট হচ্ছে, তেমনি সমস্যা হচ্ছে নিজেকে স্থির রাখতে, কিন্তু তার গলায় খুশির আভাস। জেলেদের উদ্দেশ্যে চিৎকার করে দ্রুত এগোতে বলল সে।
মাসুম স্বস্তির সাথে গাছের গায়ে হেলান দিতে যাবে তার আগেই ব্যাপারটা চোখে পড়ল ওর। ওরা যেখানে অবস্থান করছে সেখান থেকে একটু সামনেই পানিতে মাছটাকে জাপটে ধরে হুটোপাটি করছে ধোবল, তার বাঁদিকে দুটো নৌকায় করে এগিয়ে আসছে জেলেরা। কিন্তু ওদের থেকে ডান দিকে জংলা ঝোপের মতো জায়গায় ফোলা ফোলা কিছু একটা চোখে পড়ল ওর, সাথে সাথে গায়ের রোম দাঁড়িয়ে গেল ওর। ‘ধোবল,’ ও চিৎকার করে সাবধান করে দেবার আগেই পানির ওপরে ফোলা ফোলা জিনিসটা গায়েব হয়ে গেল কিছু বুদ্বুদ রেখে। মাসুম দেখল ওপর দিকে জেলেরাও দেখতে পেয়েছে কিছু একটা; থেমে গেল ওদের চিৎকার-চেঁচামেচি, সেই সাথে নৌকার গতিও কমে আসতে শুরু করেছে। মাসুম কিছু বলে ওঠার আগেই ঝুপ করে মাছসহ ধোবলের মাথাটা ডুবে গেল পানির ভেতরে। গাছের ওপর থেকে বাকিরাও চিৎকার করে উঠল। ব্যাপারটা পরিষ্কার যে ঘড়িয়াল আক্রমণ করেছে ধোবলকে। ঝোপঝাড়ের মতো জায়গাটায় যে ফোলা ফোলা আকৃতি দেখা গেছিল সেটা ঘড়িয়াল ছাড়া আর কিছু নয়।
যেকোনো কুমির জাতীয় প্রাণি কখনও পানির উপরিভাগে আক্রমণ করো না বরং পানিতে ডুব দিয়ে টুপ করে নিচ থেকে টেনে পানিতে নামিয়ে ফেলে শিকারকে। আর হঠাৎ করে ধোবলের মাথাটা পানির নিচে নেমে যাওয়া প্রমাণ করে-নিশ্চিত তার পা কামড়ে ধরে পানিতে টেনে ধরেছে ঘড়িয়াল। মুহূর্তের জন্যে খানিকটা দিশেহারা বোধ করল মাসুম। কিন্তু পরমুহূর্তেই সে বুঝতে পারল কী করতে হবে। পানির নিচে চোখা জিনিসটা কোনো কাজে দিবে না। তাই সে ধোবলের মতো ওটাকে গেঁথে ফেলল গাছের সাথে, তারপর কোমর থেকে ড্যাগারটা বের করে ওটাকে দাঁতে কামড়ে ধরে লাফ দিলো পানিতে। ঠিক যেখানে ধোবলের মাথাটা ডুবে গেছিল পানির নিচে তার যতটা কাছাকাছি সম্ভব সেখানে।
মুহূর্তের জন্যে হাওড়ের ঠান্ডা কালো পানি গিলে নিলো তাকে। পানির নিচে কিছুই দেখতে পাবার প্রশ্নই আসে না। দিনের আলোতেই ঘোলা পানিতে কিছু দেখা যায় না আর রাতের শেষ প্রহরের অন্ধকরের ভেতরে তো প্রশ্নই আসে না। কিন্তু ছোটোবেলা থেকে জলকাদার ভেতরেই মানুষ হওয়া দক্ষ সাঁতারু মাসুম জানে কী করতে হবে তাকে। পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে ছোটো ছোটো নিশ্বাস ছাড়তে ছাড়তে সে প্রথমে তরতর করে ডুব সাঁতার দিয়ে নেমে গেল বেশ অনেকটা। ছয়- সাত হাত পানির নিচে নামতেই শরীটাকে সোজা করে ফেলল ও। এতক্ষণ ছোটো ছোটো নিশ্বাস নিতে নিতে নামছিল সে। এবার নিশ্বাস বন্ধ করে শরীরটাকে স্থির করে অনুভব করার চেষ্টা করল-আলোড়ন আসছে কি না কোনোদিক থেকে। কিন্তু অন্ধকার পানির ভেতরে কিছুই বুঝতে পারল না। চোখ বন্ধ করে, শরীরটাকে আরও স্থির করে ফেলল মাসুম। এসব কিছুই মাসুমের জন্যে নতুন নয়, পরিস্থিতি বুঝতে হলে প্রয়োজন শুধু মন আর মস্তিষ্কের সংযোজন। পানির গভীরে শব্দ কিংবা কম্পন কয়েকগুণ বেশি বেড়ে যায়, দরকার শুধু অনুভব করা। কয়েক মুহূর্ত স্থির থাকতেই তিনটে কম্পন টের পেল সে। দুটো আসছে ডান দিক থেকে আর সবচেয়ে ভারী কম্পনটা আসছে পেছন থেকে। চট করে ঘুরে ড্যাগারটাকে ডান হাতে নিয়ে শরীরটাকে একটা পাক খাইয়ে তিরের মতো লম্বা করে ফেলল সে, তারপর পা দুটোকে মাছের পাখনার মতো করে পানিতে শক্তিশালী দুটো ধাক্কা মারতেই অনেকটা সামনে এগিয়ে গেল মাসুম। সাথে সাথে টের পেল সামনে শক্তিশালী আলোড়ন পানিতে, আরেক দফা সামনে এগোতেই শক্তিশালী কিছু একটা ধাক্কা মারল মাসুমের চওড়া কাঁধে।
ধাক্কাটা এতটাই শক্তিশালী যে সাথে সাথে তার পরনের ফতুয়াটা ছিঁড়ে গভীর আঁচড় পড়ে গেল কাঁধের চামড়ায়। সাথে সাথে একপাশে সরে যাবার চেষ্টা করেও খুব একটা সফল হলো না মাসুম। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে জানে এমন শক্তিশালী ধাক্কা কোনো মানুষের পক্ষেই সম্ভব নয়। কাঁধের তীব্র আঘাত উপেক্ষা করে দলাপাকানো শরীরটাকে সোজা করে ডান হাতে ধরা ছুরিটাকে আরও শক্ত করে চেপে ধরল সে, কিন্তু জানে খুব একটা লাভ হবে না। সামনে যাই ঘটুক না কেন সেখানে তিনটে প্রাণি আছে-ঘড়িয়াল, গারুদ মাছটা আর ধোবল। ছুরি চালাতে গেলে জোরদার সম্ভাবনা আছে মাছ কিংবা ঘড়িয়ালটাকে আঘাত না করে ধোবলকে আঘাত করে বসতে পারে। কারণ কাকে আঘাত করছে সেটা নিশ্চিত না হয়ে ছুরি চালানো যাবে না, আর ততক্ষণ ছুরিটা একটা ঝামেলা ছাড়া আর কিছু না। কিন্তু একবার নিশ্চিত হয়ে গেলে ছুরিটাই হয়ে উঠবে সবচেয়ে মূল্যবান অস্ত্র, কাজেই ওটাকে ছাড়াও যাবে না।
শরীরটাকে সোজা করে আবারও সামনে ঠেলে দিলো সে। ডুব সাঁতারে দুর্দান্ত দক্ষ হলেও দম ফুরিয়ে আসতে শুরু করেছে ওর, আর যদি তাই হয়, তবে ধোবলের অবস্থা এতক্ষণে আরও খারাপ। দ্রুত কিছু না করলে সর্বনাশ। আর কিছু করতে হলে একটাই উপায়, আর তাই করল সে। শরীরটাকে সামনে ঠেলে দিতেই সামনে তীব্র ঘূর্ণনের ধাক্কা টের পেল, পরোয়া না করে পাকের ভেতরে ঢুকে যাবার চেষ্টা করল। সেই সাথে মুক্ত বাঁহাতে ধরার চেষ্টা করছে সামনে। যাই ধরা পড়বে সেটাই কাজে লাগবে। একটাই ঝুঁকি, ঘড়িয়ালটার মুখে হাত পড়ে গেলেই হয়েছে। বাঁহাত প্ৰথমে পিছলে কিছু একটা লাগল। খপ করে ধরার চেষ্টা করতেই ছুটে গেল ওটা, জিনিসটা কী—কিছুই বুঝতে পারল না। আবারও চেষ্টা করতেই পাতলা কিছু একটা হাতে লাগল। সাথ সাথে হাতটাকে সামনে এগিয়ে নিলো সে। মানুষের হাতের মতো কিছু একটা লাগতেই সমস্ত শক্তিতে চেপে ধরল ওটা। পিছলাতে গিয়েও হাতটা ধরে ফেলল ওকে। সাথে সাথে সমস্ত শক্তিতে টান দিয়ে ওপরের দিকে উঠতে শুরু করল মাসুম। নিচ থেকে টেনে নামিয়ে নিতে চাইছে হাতটা কিন্তু সর্বশক্তিতে ওটা চেপে ধরে ওপরের দিকে উঠতে উঠতে পানির ওপরে মাথা তুলল ও। হাতের মালিককে এখনও টেনে তুলতে পারেনি। মাথা তুলেই খাবি খাবার মতো দম নিলো কয়েক মুহূর্ত হাতটা এখনও ছাড়েনি। ফুসফুসে অক্সিজেন পৌঁছাতেই সমস্ত শক্তিতে টান দিয়ে তুলে ফেলল মানুষটাকে।
চারপাশ থেকে হইহল্লা ভেসে আসছে। কিন্তু সেদিকে খেয়াল নেই ওর। মুহূর্তের জন্যে ধোবলের মাথাটাকে পানির ওপরে ভেসে উঠতে দেখল ও। চিৎকার করে কিছু একটা বলতে গিয়েও আবারও টুপ করে ডুবে গেল ও। পানির ওপরেই ধোবলের মাথার অন্যপাশে খাঁজ কাটা একটা লেজ পানির ওপরে তীব্র শক্তিতে বাড়ি মেরেই লেজ আর মাথা দুটো মালিকই হারিয়ে গেল পানির নিচে। মাসুমের হাত থেকে ছুটে গেল ধোবলের হাত, মুহূর্তের জন্যে মাসুম বুক ভরে দম টেনে নিয়ে শরীরটা গুটিয়ে পা দুটো পানির ওপরে তুলে শরীরটাকে বাঁকিয়ে নিচের দিকে নিয়ে মাছের মতো বাউলি কেটে এগিয়ে গেল যেখানে লেজ আর মাথা দুটোকে হারিয়ে যেতে দেখেছে। মাছের লেজের মতো পানিতে বাড়ি মারতেই শরীরটা এগিয়ে গেল তীব্র আলোড়নের ভেতরে। অন্ধকার পানির গভীরে নড়তে থাকা দুটো শরীরের ঠিক মাঝামাঝি জায়গায় নিজের শক্তিশালী কাঁধ দিয়ে বাড়ি মারল মাসুম। মুহূর্তের জন্যে মনে হলো আহত কাঁধে আগুন ধরে গেল, পরোয়া করল না ও। বাঁহাত থেকে ডান হাতে নিয়ে আসা ড্যগারটার হাতলে শক্ত হলো নিজের আঙুল। বাঁহাতের নাগালে থাকা শরীরটাতে যেন আদর করে হাত বোলাচ্ছে এমনভাবে সেকেন্ডের ভগ্নাংশের জন্যে হাত বুলাতে খাঁজগুলো হাতে লাগতেই ডান হাতটা সাপের মতো ছোবল মারল এলোপাথাড়ি। ঘড়িয়ালের শক্তিশালী শরীরটা যেন মোচর খেয়ে উঠল, দুবার ছুরি চালাতেই শরীরটা ঘুরে গেল। মাসুম সতর্ক হয়ে উঠল, কিন্তু কাজ হলো না। আরেকবার ছুরি চালানোর আগেই ওটা ধরে থাকা শিকার ছেড়ে ওর দিকে ঘুরেই কামড় মারল ছুরি ধরা হাতে; মুহূর্তের ভগ্নাংশের জন্যে কামড়টা লাগল না ওর হাতে, কিন্তু নিজেকে সে সরাতেও পারল না। অন্ধকার পানির ভেতরও অনুভব করল ঘড়িয়ালটার মুখ আর ওর মুখ ফুটখানেক ব্যবধানে। ওটার মুখ হাঁ হয়ে গেল কামড় দেওয়ার জন্যে। কামড় এড়ানোর জন্যে একটাই উপায় আছে, আর তাই করল মাসুম; পিছিয়ে না গিয়ে বরং এগিয়ে গেল ওটার দিকে চট করে একহাতে জড়িয়ে ধরে অপর হাত আঘাত হানার জন্যে উদ্যত হলো কিন্তু ভয়ঙ্কর শক্তিশালী প্রাণিটার লেজের বাড়িতে বাঁকা হয়ে গেল ও। শরীরটা নেমে যেতে শুরু করল পানির গভীরে। কিন্তু ঘড়িয়ালটা এত সহজে শিকারকে ছেড়ে দেবার বান্দা নয়। সে ঠিকই বুঝতে পেরেছে শিকার কাবু হয়ে গেছে। মাসুম তীব্র আঘাত আর দমের অভাবে খাবি খেতে শুরু করেছে। কিন্তু এর ভেতরেও তীব্র বেগে ঘড়িয়ালটাকে এগিয়ে আসতে দেখল ওর দিকে। দুর্বল হাতে ছুরি তুলল কিন্তু ওটা তাকে আঘাত করার আগেই কিছু একটা আঘাত করল ওটাকে। আর একটা হাত টেনে ধরল ওকে। কিছু চিন্তা না করেই ওপরের দিকে রওনা দিলো সে। পানির ওপরে উঠে খাবি খেয়ে নিশ্বাস নিতে লাগল। ওর পাশেই ভেসে উঠল আরেকটা মাথা, ঘোলাটে চোখে দেখল ধোবলের মাথা, ধোবলের দিকে তাকিয়ে একটা হাসি দিতে যাবে তার আগেই ওদের থেকে খানিক তফাতে ভেসে উঠল ঘড়িয়ালটার মাথা।
অন্ধকারের ভেতরেও মাসুম পরিষ্কার দেখতে পেল ওটার কুতকুতে চোখে ভীষণ রাগ। ওরা ফিরে তাকাতেই ওটার লম্বাটে মাথাটা ডুবে গেল পানির নিচে। ধোবলকে এক ধাক্কায় সরিয়ে দিয়ে পানিতে ডুব দিলো মাসুম। কুমির জাতীয় প্রাণিরা কীভাবে আক্রমণ করে জানা আছে ওর ভালোই। ওগুলো পানির নিচে ডুব দিয়ে শিকারকে নিচ থেকে কামড়ে ধরে ডুব দেয়। পানিতে বাউলি কেটে ডুব দিতেই ঘড়িয়ালটার লম্বা মাথা এসে বাড়ি মারল ওর পেটে। এক ধাক্কায় সব বাতাস বেরিয়ে গেল। মাসুমের মনে হলো ওর মেরুদণ্ডটা ভেঙে গেছে। ও এগিয়ে আসাতে কামড় না লেগে বাড়ি লেগেছে। শরীরটাকে বাঁকিয়ে ছুরি চালাল, লাগাতে তো পারলই না উলটো আরেকটু হলেই ওটার হাঁ করা মুখের ভেতরে ঢুকে যেত ওর হাতটা। ওটার এতটাই কাছে এগিয়ে গেছে, আবারও ওটাকে জড়িয়ে ধরে ফেলল, তবে এবার ডান হাতের ছুরিটা চালাল পাগলের মতো। কয়বার আঘাত করল নিজেও জানে না। ওটার শরীরের তীব্র মোচড়ের ধাক্কায় একপাশে সরে যেতেই ওপরের দিকে রওনা দিলো। সে পানির ওপরে ভেসে উঠতেই আরেকটু দূরেই ঘড়িয়ালটারও মাথা ভেসে উঠল
চারপাশের পানি রক্তাক্ত হয়ে উঠেছে। কিন্তু এত আঘাতেও ওটার স্থিরতা নেই, পানির ওপরে ভেসে উঠতেই মাসুম দেখল নিজের স্বভাবসুলভ শিকারের নিয়ম ভুলে আহত ঘড়িয়ালটা পানির ওপর দিয়েই হাঁ করে ধেয়ে আসছে, ওর দিকে। আর বাধা দেওয়ার শক্তি নেই। ওটার হাঁ করা মুখটা ধেয়ে আসছে কিছু একটা উড়ে এসে গেঁথে গেল ঘড়িয়ালটার দুই চোখের মাঝখানে। রক্তাক্ত ভেজা পানি থেকে চোখ তুলতেই মাসুম দেখতে পেল পানির ওপরের নৌকা থেকে একটা কোঁচ এসে বিঁধেছে ওটার গায়ে। কোঁচটা লাগার সাথে সাথে পানির ওপরে মোচড়াতে শুরু করল ঘড়িয়ালটা, আরেকটা বর্শা এসে বিঁধতেই স্থির হয়ে এলো ওটা।
মাসুমের মনে হলো: পানির ওপরে আর ভেসে থাকতে পারছে না। মাথার কাছে কিছু একটা এসে থামল। শক্তিশালী একটা হাত নৌকার ওপরে টেনে তুলে ফেলল ওকে। নৌকার পাটাতনে শুয়ে চোখ বন্ধ করে স্রেফ দম নিতে লাগল মাসুম। শরীরে কোনো শক্তি নেই, মাথার ভেতরে কোনো বোধ নেই। মনের ভেতরে স্রেফ বেঁচে থাকার আনন্দ। যখন ঘড়িয়ালটাকে আক্রমণ করতে গেল ও ভাবেনি, আজ বেঁচে পানির ওপরে উঠতে পারবে। সব ওই শালা ধোবলের দোষ। চট করে চোখ খুলে উঠে বসার চেষ্টা করল ও। কেউ একজন ধরে শুইয়ে দিলো ওকে।
‘আরে আস্তে আস্তে, ওস্তাদ,’ মাসুম চোখ খুলে দেখল ওর দলের আরেক সদস্য বরখা।
‘ধোবল কই?’ মৃদু স্বরে জানতে চাইল মাসুম।
অন্য কেউ উত্তর দেওয়ার আগেই ওর পাশ থেকে ধোবল বলে উঠল। ‘আমি ঠিক আছি,’ মাসুম ফিরে তাকিয়ে দেখল আহত বিধ্বস্ত শরীর নিয়ে ওর পাশেই পাটাতনের ওপরে পড়ে আছে ধোবল। ও কিছু বলার আগেই আবারও ধোবল বলে উঠল, ‘আফসোস একটাই,’ সে উঠে বসল নৌকার ওপরে। কাটা-ছেঁড়া শরীর থেকে রক্ত গড়াচ্ছে। ‘শালার মাছটা ধরতে পারলাম না।’
মাসুম চট করে ধোবলের দিকে তাকাল। কড়া ভাষায় কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, তার আগেই ওদের আরেকদিকের জেলে নৌকা থেকে চিৎকার ভেসে এলো। ওরা পানিতে পেতে রাখা জালটা টেনে তুলছে, মাসুম দেখতে পেল ওটার জালের ভেতরে ছটফট করছে বিরাটাকায় মোটা অজগরের মতো গারুদ মাছটা। আশপাশের নৌকা থেকে সবাই হল্লা করে উঠল। মাসুম দেখতে পেল পানির ওপরে উলটো হয়ে ভেসে আছে মৃত ঘড়িয়ালটার দেহ। ওটাকে টেনে তোলা হবে আরেক নৌকায়।
মাছটাকে পাশের নৌকায় দেখে খুশিতে চিৎকার করতে লাগল ধোবল। মাসুম ওকে কড়া ভাষায় কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে গিয়ে আনমনে মাথা নাড়তে লাগল। এ কোনোদিনই ঠিক হবে না। আজ জানের ওপর দিয়ে বেঁচে গেছে।
মাসুম ওপরের দিকে চোখ তুলে তাকাল। আকাশে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। সবগুলো নৌকায় ফিরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিতে যাবে তার আগেই দেখতে পেল। দূর থেকে একটা বিছা নৌকা এগিয়ে আসছে ওদের দিকে।
‘এই সময় এইদিকে আসে কে?’ মাসুমের পাশ থেকে বরখা বলে উঠল
নৌকাটা আরেকটু এগিয়ে আসতেই ওরা দেখল ওটাতে বসে আছে গাজীদের প্রধান নায়েব। এই ভোরবেলা খোদ নায়েব চলে এসেছে হাওড়ে! তারমানে বিষয় গম্ভীর।
‘নায়েব মোক্তার, আপনি এই সময়ে এইদিকে?’ নৌকাটা আরেকটু এগিয়ে আসতেই মাসুম চিৎকার করে জানতে চাইল। ওদের একেকজনের বিধ্বস্ত চেহারা দেখে নায়েবের চোখ কপালে উঠে গেছে।
‘আইব না, সারারাত গাজী সাহেব বইসা রইছে তোমগো অপেক্ষায়, আর তুমরা,’ বলে সে তিন নৌকার সবাইকে দেখতে লাগল অবাক হয়ে।
‘বিষয় কী?’ মাসুম গম্ভীর মুখে জানতে চাইল। একহাতে আহত হাত চেপে ধরেছে। তীব্র ব্যথা সামলানোর চেষ্টা করছে।
‘তোমাদের নামে সমন আসছে, জলদি চলো, এখনি,’ বলে নায়েব নৌকা ঘোরানোর নির্দেশ দিলো। ‘খাঁ সাহেবের রাজধানীতে শত্রুরা আক্রমণ করছে।’
সমন এসেছে শুনে খুশি হয়ে গেছিল মাসুম, কিন্তু খবরটা শুনে স্তব্ধ হয়ে গেল সে।
