অধ্যায় চৌদ্দ
বর্তমান সময়
মোহাম্মদপুর, ঢাকা
পৃথা হাসানের অ্যাপার্টমেন্ট
.
‘বস, এত সাড়ে সর্বনাশ হয়ে গেল মনে হচ্ছে,’ বলে আফসোসের সাথে পিস্তল নামিয়ে কোমর থেকে ওয়াকিটকিটা তুলে নিয়ে তাতে রিপোর্ট করতে যাচ্ছিল সোহেল, হঠাৎ বাশার একেবারে রুক্ষভাবে ধমকে উঠল তাকে।
‘চুপ, চুপ,’ বাশার এখনও এক হাতে নিজের পিস্তল ধরে আছে কিন্তু সেই সাথে সে মনোযোগ দিয়ে কিছু একটা শোনারও চেষ্টা করছে।
‘কী ব্যাপার, বস?’ সোহেল কিছু একটা জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিল বাশার আবারও তাকে থামিয়ে দিলো। ওরা এই মুহূর্তে অবস্থান করছে প্রফেসর ইফতেখারের মেয়ে পৃথা হাসানের শূন্য অ্যাপার্টমেন্টের লিভিং রুমে। প্রফেসর ইফতেখারের অ্যাসিসট্যান্ট চৌধুরী জেল থেকে ফেরার হয়ে যাবার পর জরুরি ভিত্তিতে প্রফেসর ইফতেখারের মেয়ে পৃথার সাথে দেখা করতে এসে দেখে সে-ও নেই তার অ্যাপার্টমেন্টে। খালি অ্যাপার্টমন্টে পড়ে আছে, এমনকি তার মোবাইলও রয়েছে, কিন্তু অ্যপার্টমেন্টে কেউই নেই। তখন সোহেল রিপোর্ট করতে যেতেই তাকে থামিয়ে দিয়েছে বাশার।
‘সোহেল, মনোযোগ দিয়ে শোনো,’ বাশার তাকে বলতেই সোহেল কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে গিয়ে আবার বলে উঠল, ‘কই তেমন কিছু তো এক মিনিট কারও কথা বলার হালকা আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। এটা কি আ্যপার্টমেন্টের ভেতরে–’
‘উহু,’ বাশার অ্যাপার্টমেন্টের খোলা দরজা দিয়ে বাইরের দিকে ইশারা করল। ‘শব্দ বাইরে থেকে আসছে,’ বলে সে আবারও পিস্তলটাকে হাতে ধরে দরজার দিকে এগোতে এগোতে বলে উঠল, ‘এবার তুমি আমাকে কভার করো।’
দুজনেই দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এলো। বাশার সামনে আর পেছনে সোহেল। বাইরে বের হতেই কথার শব্দ আরও পরিষ্কার শোনা গেল এবং অদ্ভুত ব্যাপার হলো শব্দটা আসছে ওপর থেকে, বাশার ছাদের দিকে ইশারা করল। যেহেতু এটা অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের টপ ফ্লোর কাজেই ওরা ওপরের দিকে তাকিয়ে দেখল দুটো সিঁড়ি পার হলেই ছাদের দরজা দেখা যাচ্ছে এবং সেখান থেকে কারও খুব উঁচু গলায় কথা বলার শব্দ ভেসে আসছে। হয় আগে কেউ কথা বলছিল না, অথবা ওরা প্রথমে ঢোকার সময়ে উত্তেজনার চোটে কথা শুনতে পায়নি
ওরা সিঁড়ি বিয়ে যত ওপরে উঠতে লাগল কথার শব্দ তত পরিষ্কার হয়ে ধরা পড়তে লাগল। ‘বিষয় কী বস, মনে হচ্ছে-’
‘কেউ ঝগড়া করছে,’ সোহেলের অসমাপ্ত বাক্য বাশার পূরণ করে দিলো হাতে পিস্তল থাকলেও সেটাকে সামান্য নামিয়ে ধরে রেখেছে এখন বাশার। ওরা সিঁড়ি দিয়ে ওঠে সিঁড়িঘরে পা রাখতেই পরিষ্কার শুনতে পেল একজন নারী এবং পুরুষ তুমুল ঝগড়া করছে। সোহেলের দিকে তাকিয়ে আনমনেই একবার কাঁধ ঝাঁকিয়ে বাশার সিঁড়ি ঘরের দরজা পার হয়ে পা রাখল ছাদে।
আর সব অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের মতোই সুন্দর একটা ছাদ। চারপাশে দেওয়ালে স্টিলের রেলিং দেওয়া, কালারফুল টাইলস লাগানো ফ্লোর, একপাশে কমিউনিটি হল আর ছোটো একটা কামরা, দেখে মনে হয় একজনের থাকার জায়গা, আর অন্য পাশটা খালি। বাশার তাকিয়ে দেখল কমিউনিটি হলের লাগোয়া কামরাটার সামনে আধবুড়ো গোছের এক লোক দাঁড়িয়ে আছে, বাশার অনুমান করল লোকটা দারোয়ান বা কেয়ারটেকার গোছের কিছু একটা হবে। আর ঠিক তার সামনে কোমরে হাত রেখে ওদের দিকে পেছন ফিরে গলা উঁচিয়ে চিৎকার করে হাত নেড়ে নেড়ে কথা বলছে এক মহিলা।
হঠাৎ করেই ওদের দুজনকে দেখে আধ বুড়ো গোছের লোকটা থেমে গেল, কামরাটার পর্দার আড়াল থেকে উঁকি দিয়ে কেউ একজন কিছু দেখছিল এবং সম্ভবত দুজনের ঝগড়ায় অংশগ্রহণও করছিল কিন্তু ওদরকে দেখেই চট করে সরে গেল ছায়াটা। বাশার অনুমান করল কেয়ারটেকারের বউ হতে পারে। কামরাটার সামনে নানা ধরনের জিনিসপত্র ছড়িয়ে আছে। তার ভেতরে বাগান করার গাছ লাগানোর জিনিসপত্র থেকে শুরু করে বিরাট আকারের একটা অ্যাশট্রেও দেখতে পেল সে।
বুড়ো লোকটা থেমে গেলেও মহিলা তখনও চিৎকার করে কথা বলছিল, তাকে থেমে যেতে দেখেও সে থামেনি, হাত নেড়ে নেড়ে সিঁড়ি পরিষ্কার বিষয়ে কিছু একটা বলছিল সে, বুড়োকে থেমে যেতে দেখে সে আওয়াজ কমালেও চেঁচামেচি করতে করতেই ফিরে তাকাল পেছন দিকে এবং হঠাৎ জলজ্যান্ত দুজন মানুষ দেখে চমকে উঠল খানিকটা।
মহিলা চমকে উঠলেও বাশার আর সোহেল দুজনেই স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল, মহিলা পৃথা হাসানই, প্রফেসর ইফতেখারের মেয়ে। ‘এক্সকিউজ মি, আপনি পৃথা হাসান?’ বাশার দুই কদম এগিয়ে গেল মহিলার দিকে। পিস্তলটা শরীরের পেছনে রেখেছে ও।
‘জি, আমিই পৃথা,’ মহিলা এতটাই তেজের সাথে আগের ঝগড়ার সুরেই বলে উঠল যে বাশার প্রায় চমকে উঠল। ‘আপনারা কারা? এভাবে কারও বাসায় ঢুকে পড়ে কেউ?’ মহিলা সন্দেহের চোখে দুজনকে দেখছ। তার পেছন থেকে আধ বুড়ো লোকটাও তাকিয়ে আছে কৌতূহলী দৃষ্টিতে।
‘সরি, আমি আহমেদ বাশার, ইন্সপেক্টর আহমেদ বাশার, এই মুহূর্তে পিবিআই স্পেশাল ব্রাঞ্চে কাজ করছি। একটা বিশেষ কেসের কাজে এসেছি,’ বলে সে নিজের আইডি বের করে দেখাল। তারপর সোহেলের দিকে ফিরে বলে উঠল, ‘ও আমার অ্যাসিসট্যান্ট সোহেল, একটা বিশেষ প্রয়োজনে আপনার সাথে দেখা করার জন্যে আসতে হয়েছে।’
মহিলা আইডি কার্ডটা বেশ ভালোভাবে পরখ করে দেখে নিলো। তারপর ওটা ওর দিকে ফিরিয়ে দিয়ে বড়ো করে একবার দম নিলো। সে এখনও তার আগের ঝগড়ার মুড থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না। বাশার আর সোহেলের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, ‘ঠিক আছে, আপনারা আমার সাথে আসুন,’ বলে সে পেছন ফিরে বুড়ো কেয়ারটেকারের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, ‘তুমি ভেব না মাফ পেয়ে গেছ, তোমাকে আমি পরে ধরব, কাজে ফাঁকিবাজি করার মজা হাড়ে হাড়ে বুঝাব তোমাকে,’ কথাগুলো বলে একটা আঙুল তুলে তাকে শাসাতে শাসাতে বাশারদের এগোতে বলে সে অগে আগে হাঁটতে লাগল আর বিড়বিড় করে বলতে লাগল, ‘ফাজিলের ফাজিল, কেয়ারটেকার! আমার অ্যাপার্টমেন্ট, আমার সোসাইটি, আমার কাছ থেকে বেতন পাও, আবার প্রতিটা কাজের জন্য তোমাকে আলাদা টাকা দিতে হবে, সেই কাজও আবার ঠিকঠাক করবে না। ফাইজলামির একটা সীমা থাকা উচিত,’ বলতে বলতে সে সিঁড়ি বেয়ে নামতে লাগল। বাশার ফিরে তাকাল একবার সোহেলের দিকে। সোহেল কাঁধ ঝাঁকিয়ে এমন একটা ভাব করল-তোমার সামলাতে হবে, আমি পারবো না, বস।
‘আপনারা বসুন,’ অ্যাপার্টমেন্টের ভেতরে ঢুকে, ওদেরকে লিভিং রুমে বসতে বলে মহিলা ভেতরে চলে গেল।
‘বস, মাল তো কড়া,’ বলে সে মুচকি হাসি দিলো। ‘সামলাবে ক্যামনে?’
‘চেহারার কথা বললা, নাকি মেজাজের?’ বাশারও দুষ্টামির সুরে বলে উঠল। ‘মানে দুটোরই কথা বললাম, কোনোটাই কম না,’ বলে সে আরেকটা হাসি দিয়ে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, তার আগেই মহিলা ভেতরে প্রবেশ করল, খুব অল্প সময়ের ভেতরেই সে পোশাক পালটে একটা ব্যাগ হাতে নিয়ে লিভিং রুমে প্রবেশ করল।
‘ব্যাপার কী বলুন তো? হঠাৎ আপনারা কি বিষয়ে এখানে এলেন, ঠিক বুঝতে পারলাম না,’ মহিলা ওদের সামনে একটা সিঙ্গেল সোফায় পা তুলে বসে ওদেরকে বেশ কড়া সুরেই জানতে চাইল।
‘সরি, এভাবে হুট করে কোনোরকম জানান না দিয়ে চলে আসার জন্যে, মহিলা যে-সুরেই কথা বলুক না কেন বাশার একেবারে শান্ত রয়েছে। তার গলার সুরে শতভাগ প্রফেশনালিজম। ‘দেখুন, মিস পৃথা, খুব সিরিয়াস একটা ঘটনা ঘটতে শুরু করেছে এবং এই বিষয়টার সাথে আপনার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।’
‘নিশ্চয়ই বিষয়টা বাবাকে নিয়ে কিছু একটা,’ পৃথা কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলে উঠল।
‘আপনি কীভাবে বুঝলেন?’ বাশার কিছু বলার আগেই সোহেল বেশ অবাক সুরে বলে উঠল।
মহিলা এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সরাসরি বাশারের চোখের দিকে। ‘দেখুন ইন্সপেক্টর,’ তার গলা বরফের চেয়েও শীতল, অনেকটা যেন ওদেরকে দেখিয়েই ঘড়ি দেখল সে। ‘প্রথমত, আমার সময় আসলে খুবই কম, আমার ক্লাশ আছে, আমি একজন প্রফেশনাল মানুষ কাজেই ঘরে বসে থাকলে আমার চলবে না। দ্বিতীয়ত, আমার বাবার বিষয়ে আমার কিছু বলার নেই,’ বলে সে সোহেলের দিকে তাকাল। ‘আপনারা আমার বাবার বিষয়ে আলোচনা করতে এসেছেন, সেটা বোঝা খুব কষ্টকর না। কারণ আমি স্টুপিড না,’ তার চোখ সরু হয়ে এসেছে। ‘আজ থেকে তিন বছর আগে যখন বাবা গায়েব হয়ে যায়, তখন পুলিশ থেকে শুরু করে বাকি সবাইকে নিয়ে আমাকেই সবচেয়ে বেশি ঝামেলা পোহাতে হয়েছে। বারবার মানা করার-বোঝানোর পরও সবাই আমাকেই জ্বালাতন করেছে সবচেয়ে বেশি। তারপর একটা সময় সব ঠান্ডা হয়েছে, ভেবেছিলাম এই যন্ত্রণা আমার লাইফ থেকে বিদেয় হয়েছে, কিন্তু কয়দিন আগে যখন আবদেল আঙ্কেলের মৃত্যু সংবাদ দেখলাম পেপারে তখনই অনুধাবন করেছিলাম আবার শুরু হবে এই যন্ত্রণা এবং তাই হয়েছে,’ বলে সে হাত তুলে দেখাল। ‘আপনারা দুজন এসে হাজির হয়েছেন।’
‘দেখুন মিস,’ বাশার মনে করার চেষ্টা করল, ফাইলে দেখেছিল মহিলা সিঙ্গেল এখনও। ‘পৃথা, আপনি –’
‘ইন্সপেক্টর আপনার পাশে যে দেওয়ালটা আছে ওদিকে একটু তাকান,’ বলে সে পাশের দেওয়ালের দিকে দেখাল। ‘কী দেখছেন ওখানে, আমাকে একটু বলুন তো?’
বাশার আর সোহেল দুজনেই দেওয়ালের দিকে তাকাল। পুরো দেওয়াল জুড়েই নানা ধরনের ছবি, সবই পারিবারিক এবং ব্যক্তিগত ছবি। পৃথার ছোটোবেলা থেকে শুরু করে গ্র্যাজুয়েশন পর্যন্ত নানা ধরনের ছবির বাহার।
‘ছবি, তাই না?’ মহিলার গলাই এমন নাকি ইচ্ছে করেই এতটা ঝাঁঝাল সুরে কথা বলছে বাশার ঠিক বুঝতে পারল না। ‘বলেন তো এই ছবিগুলোতে একটা জিনিস মিসিং, কী সেটা?’
বাশার মনোযোগ দিয়ে দেখতে লাগল। পৃথার ছোটোবেলার ছবি, বন্ধুদের সাথে ছবি, একা ছবি, মায়ের সাথে ছবি, চট করেই সে ধরতে পারল এবং বলতে যাবে তার আগেই সোহেল বলে উঠল, ‘এখানে আপনার বাবার সাথে কোনো ছবি নেই।’
মহিলা টিটকিরির ভঙ্গিতে তালি দিয়ে উঠল, ‘সাবাশ, পুলিশ হলেও দেখি বুদ্ধি আছে,’ মৃদু হাসি দিয়েই সে চোখের দৃষ্টি শক্ত করে ফেলল। ‘ঠিক ধরেছেন, এখানে আমার বাবার কোনো ছবি নেই। কারণ শুধু ছবির দেওয়াল নয় তাকে বহু বহু আগে আমি এবং আমার মা আমাদের জীবন থেকে পুরোপুরি শিফট ডিলিট করে দিয়েছি, দুঃখের বিষয় হলো আমাদের সাথে থাকতে লোকটা কোনোদিন আমাদেরকে শান্তিতে থাকতে দেয়নি। এখন দূরে সরে গিয়ে আরও বড়ো অশান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমি আমার নাম থেকে এই লোকটার টাইটেল বাদ দিয়েছি, আফসোস জীবন থেকে নিজের বাপ এবং তার পরিচয়কে পুরোপুরি বাদ দেবার কোনো উপায় নেই।’
‘দেখুন মিস, আপনাদের পারিবারিক—’
‘দেখুন ইন্সপেক্টর, আমি আমার বাবার কোনো বিষয়ে এমনকি শুনতে পর্যন্ত আগ্রহী নই। সে কী করেছিল, সে কত মহান ছিল, সে কত বড়ো মাল ছিল, আমার জানার কোনোই আগ্রহ নেই,’ মহিলার গলা চড়েই যাচ্ছে। ‘আমি অনেক সময় নষ্ট করেছি জীবনে। সরি, আপনাদের সাথে আমি অকারণেই গরম হচ্ছি। কিন্তু সত্যি কথা হলো এসব নিয়ে আমি, আর একটা সেকেন্ডও ব্যয় করতে আগ্রহী নই। আপনারা দয়া করে আসুন প্লিজ।’
বাশার চট করে উঠে দাঁড়াল, ‘ঠিক আছে আমরা আপনাকে বিরক্ত করব না। কিন্তু একটা বিষয় অন্তত আপনার জানা উচিত, সেটা কি আমি বলতে পারি?’ বাশার তাকিয়ে আছে মহিলার দিকে। সোহেল আপনাতেই একবার দেখে নিলো তাকে। বাশার এখনও নিজের মেজাজ ঠান্ডা রেখেছে কীভাবে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না সে।
মহিলা উঠে দাঁড়িয়েছিল বাশারের সাথে সাথে কিন্তু বাশারের শান্ত গলা শুনে সে খানিকটা স্থির হলো, ‘ঠিক আছে ইন্সপেক্টর, বলুন।’
‘দেখুন আমি বুঝতে পারছি আপনার বাবার সাথে আপনার সম্পর্ক ভালো ছিল না—’
বাশার এটুকু বলতেই মহিলা আবারও চেঁচিয়ে উঠল রীতিমতো, ভালো ছিল না! শুধু ভালো ছিল না বলছেন আপনি, এতক্ষণ কী শুনলেন তবে?
‘ওকে ওকে, চিৎকার করার প্রয়োজন নেই,’ বাশার এক হাত তুলে তাকে শান্ত হতে বলল। আমি বুঝতে পেরেছি তার কারণে আপনাদেরকে অনেক সাফারার হতে হয়েছে। কিন্তু সত্য কথা হলো বেলা শেষে তিনি আপনার বাবা-’
‘হ্যাঁ, সেটাই তো আমার জীবনের সেরা আফসোস,’ মহিলা বিড়বিড় করে বলে উঠল। ‘সরি, আমি অকারণেই আপনাদের সাথে গরম হচ্ছি, হয়তো অনেক বেশি নেগেটিভিটিও দেখাচ্ছি। বলুন-’
‘উনি যাই ছিলেন যেমনই ছিলেন, উনি আপনার বাবা, এটা আপনার অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। সম্প্রতি অনেক কিছু ঘটে গেছে। কী ঘটেছে তার কিছুই আপনাকে আমি বলব না, শুধু এটুকু বলব আপনার বাবাকে একদল লোক হন্যে হয়ে খুঁজছে।’
‘সত্যি কথা বলছেন না কেন, অফিসার?’ মহিলা ভ্রু নাচিয়ে বলে উঠল ‘আপনারাও তাকে খুঁজছেন এবং সেই ব্যাপারে আমার হেল্প লাগবে। কিন্তু দুঃখিত, হেল্প তো দূরে থাক আমি একটা সুতো দিয়েও আপনাদের হেল্প করতে পারবো না আর পারলেও করতাম না।’
‘দেখুন—’
‘এই বিষয়ে আর কোনো কথাই হবে না। জাস্ট ফুল স্টপ হিয়ার—’
‘ঠিক আছে,’ মহিলা যতটাই রুড, বাশার ততই মরিয়া। ‘অন্তত এটা বোঝার চেষ্টা করুন—শুধু পুলিশ না, আরও অনেকেই আপনার বাবাকে খুঁজছে এবং তাদের জন্যে আপনিই এখন তার কাছ পর্যন্ত পৌঁছানোর একমাত্র মাধ্যম। কাজেই আপনার সিকিউরিটি-’
বাশার ভেবেছিল মহিলা খেপে উঠবে কিন্তু সে হেসে উঠল। ‘শুনুন, এরকম যদি কেউ ভেবে থাকে আমাকে থ্রেট দিয়ে বা আমার ক্ষতি করার কথা ভেবে বাবার খবর বের করতে চাইবে বা তার কাছ পর্যন্ত পৌঁছাতে চাইবে, তাহলে বলে রাখি-বাবার কাছে আমার চেয়ে তার কাজ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কেউ যদি এরকম করে, কিছুই হবে না। আর রইল সিকিউরিটির কথা। নিজের নিরাপত্তা রক্ষা করার ক্ষমতা আমার আছে। আর যদি না থাকে তবে মরে গেলেও আমার কোনো আপত্তি নেই। বুঝেছেন? কাজেই প্লিজ আপনারা আসুন, আমি আপনাদের কোনো সাহায্য করতে পারছি না,’ বলে মহিলা এমনভাবে একটা হাসি দিলো বাশারের মনে হলো একে আর কিছু বলার চেয়ে মরে যাওয়াই বেটার। দুজনেই মুখ গোমড়া করে বেরিয়ে এলো অ্যাপার্টমেন্ট থেকে।
বস, বেটি তো পাত্তাই দিলো না,’ গাড়িতে উঠতে উঠতে সোহেল বলে উঠল।
‘হুম,’ গাড়িতে উঠে বাশার একটা সিগারেট ধরিয়ে টানতে লাগল। ‘এমনটা হবে আমার আগে থেকেই ধারণা ছিল, তবে এতটা খারাপ অবস্থা হবে ভাবিনি। অন্তত ভেবেছিলাম মহিলার সাথে কথা বলতে পারবো,’ বলে সে আফসোসের সাথে মাথা নাড়ল। যাক গে দায়িত্ব তো দায়িত্বই, অফিসে কথা বলে মহিলার ওপরে নজর রাখা দরকার, এ বিপদে পড়লে আমাদেরও বিপদ।’
‘এখন করবেটা কী?’ সোহেলের প্রশ্নের জবাবে বাশার কিছু না বলে চুপ করে রইল।
‘বস, করবেটা কী?’ সোহেল একই প্রশ্ন করল আবার।
‘ভাবতেছি, ঝরনা যদি নদীর কাছে না যায় নদীকেই ঝরনার কাছে আসতে হয়–’
‘কী বলতােছ বস, বিড়বিড় করে,’ সোহেলে টকিতে কথা বলার ফাঁকে বলে উঠল।
‘শোনো, সোহেল, মহিলার কাছে থেকা কোনো হেল্প পেলাম না, একটাই উপায়, সে হেল্প না করলেও তাকে টোপ বানিয়ে একটা ফাঁদ পাতা যায় কি না ভাবতেছি।’
সোহেলের দিকে তাকিয়ে আছে বাশার। ‘বস, তোমার বলার টোন আমার ভালো লাগতেছে না। খুলে বলো তো।’
‘কেস শুরু হবার আগেই এটার যে অবস্থা ঝুঁকি না নিয়ে উপায় নেই। হয় এসপার না হয় ওসপার। মন দিয়ে শোন কী বলি। অমি নিশ্চিত পৃথার ওপরে কেউ-না-কেউ নজর রাখতেছে কাজেই’ সে তার পরিকল্পনা খুলে বলতে লাগল আর সোহেল ঘন ঘন মাথা নেড়ে আপত্তি জানাতে লাগল।
***
তার কাজ এই মুহূর্তে একজন মানুষের ওপরে নজর রাখা। আর মানুষের ওপরে নজর রাখাটা সে কোনোভাবেই উপভোগ করতে পারছে না। কিন্তু সে জানে এই বয়সটার গুরুত্ব অপরিসীম এবং এটার ওপরে এখন অনেক কিছু নির্ভর করতেছে। কাজেই না চাইলেও তাকে এই কাজ করতেই হবে এবং করতে হবেই। বাইনোকুলারে চোখ রাখতে রাখতে চোখ ব্যথা হয়ে গেছে। কিন্তু উপায় নেই। হঠাৎ তার মুখে হাসি ফুটে উঠল। যার ওপরে নজর রাখছে সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছে দেখে সামান্য মাথা নাড়ল সে। এখন দ্রুত ঘটনা ঘটতে শুরু করলেই হয়।
