অধ্যায় দুই – বর্তমান সময় – পিবিআইএস হেড অফিস, ধানমন্ডি, ঢাকা
যে দুজন তার সাথে দেখা করতে এসেছে তাদের সামনে নিজের ইমেজটা তার জন্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
তার হাতে ধরা দামি কোহিভা সিগারের ডগা থেকে খানিকটা ছাই মেরুন রংয়ের কার্পেটের ওপরে খসে পড়তেই বেশ বিরক্তির সাথে ফিরে তাকাল সে সেদিকে। অত্যন্ত পরিপাটি এবং পরিচ্ছন্ন মানুষ সে। পোশাক-পরিচ্ছদ হোক, জীবন-যাপন কিংবা কর্মক্ষেত্র–সে হলো সেইসব মানুষদের একজন যারা নিজের কাপড়ের ভাঁজ নষ্ট হবার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ডিল বাতিল করাটা বেশি শ্রেয় বলে বলে মনে করে। একই কথা প্রযোজ্য তার কর্মক্ষেত্রেও। সে হলো এমন ধরনের মানুষ যারা বাক্সের ভেতরে প্রবেশ করে বাক্সের ভেতরটা কেমন সেটা আগে বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করে, তারপর সেই বাক্স থেকে কীভাবে বাইরে লাফিয়ে পড়বে সেই চিন্তা করতে থাকে। তবে পুরো ব্যাপারটাতে তার প্রাধান্য থাকে নিজের কর্তৃত্ব এবং নিজের মানুষদের নিরাপত্তা, আর এসবের চেয়েও বেশি গুরুত্ব বহন করে আরেকটা ব্যাপার, সেটা হলো পরিস্থিতিকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখা। আর তাই তার মতো মানুষের জন্যে কার্পেটে ছাই খসে পড়া হোক কিংবা নিজের প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট এমন ঘটনা হোক যেটা সে বুঝে উঠতে পারছে না কিংবা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছে না, দুটোই সমান বিরক্তিকর।
সিগারেটের চেয়ে সরু দেখতে গাঢ় খয়েরি রংয়ের সিগারটাতে বেশ জোরে একটা টান দিয়ে সে জানালার বাইরে দিয়ে দূর দিগন্তের দিকে তাকানোর চেষ্টা করল। ধানমন্ডি চার নম্বরে অবস্থিত নয়তলা অফিস ভবনের জানালা দিয়ে আসলে খুব বেশি দূরে দেখা সম্ভব নয়, আর যতই দূরে তাকানো হোক না কেন একঘেয়ে ভবনের মাথা ছাড়া আর কিছু দেখা যায় না। তাও ঢাকা শহরের এই এলাকাতেই জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে খানিকটা হলেও সবুজের দেখা মেলে। অন্যান্য এলাকাতে সেটারও উপায় নেই। সিগারে আলতো করে আরেকটা টান দিয়ে সে বাতাসে দুলতে থাকা সবুজ গাছের ডগার ওপর দিয়ে ঢাকা শহরের ভিন্ন প্রান্তের দিকে তাকানোর চেষ্টা করল সে। এই সবুজে ঘেরা প্রকৃতি ঢাকার প্রকৃত চেহারা নয়। এর অন্যপাশে রয়েছে ধূসর এক ঢাকা, সেই ঢাকাই হলো প্রকৃত ঢাকা। সেই ঢাকার রূপটা অনেক বেশি নগ্ন, অনেক বেশি কঠোর, অনেক বেশি নিষ্ঠুর। পরিপাটি স্যুট পরে ঠান্ডা এসিরুমে বসে সিগার টানতে থাকলেও সেই ঢাকাকে সে খুব ভালো করেই চেনে। কারণ ওখান থেকেই উঠে এসেছে সে।
তার জন্ম হয়েছিল খুবই নিম্ন মধ্যবিত্ত এক পরিবারে। আসলে বলা উচিত নিম্ন নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে। দিন আনে দিন খায়, কথাটা বেশিরভাগ মানুষ শুনলেও কয়জন জীবনে এই অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে সন্দেহ আছে। কিন্তু তার জন্ম হয়েছিল এমন এক পরিবারে যেটা সত্যিকার অর্থেই দিন আনে দিন খায় টাইপের পরিবার। তাদের পরিবার থাকত কাকরাইলের বস্তি সংলগ্ন এক বাড়িতে। সংলগ্ন বলার কারণ হলো, তাদের বাড়িটা ঠিক মূল বস্তির ভেতরে ছিল না বরং ছিল বস্তির সাথে লাগানো। আসলে তাদের পরিবারের সামর্থ্য ছিল না বস্তির বাইরে থাকার; কিন্তু তার বাপের সামর্থ্য না থাকলেও ইচ্ছে ছিল, আর সে কারণেই তার বাপ চেষ্টা করত পরিবারকে যতটা সম্ভব ভালো রাখার। আর তাই বস্তির অভ্যন্তরে না থেকে তার বাপ বাসা ভাড়া করেছিল বস্তির সংলগ্ন এলাকাতে। কারণ তার বাপ জানত-নিজের ছেলে এবং মেয়েকে ভালো রাখতে হলে বস্তির পরিবেশ থেকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো তার বাপ দিনরাত মেহনত করে যে পরিবেশ থেকে নিজের সন্তানদেরকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করত, শৈশব পেরোনোর আগেই ঠিক সেই পঙ্কিল জগতে নিমজ্জিত হয় সে ভাগ্যের ফেরে। কিংবা কে জানে হয়তো নিয়তিরও খেলা ছিল সেটা।
তার বাপ ছিল দিনমজুর। স্থানীয় একটা করাত কলে কাজ করত, আর মা ছিল স্থানীয় এক সুতা কারখানার শ্রমিক। তারা ছিল দুই ভাই বোন। আগেই বলা হয়েছে তাদের পরিবার আক্ষরিক অর্থেই দিন আনে দিন খায় টাইপের পরিবার ছিল। কিন্তু মজার বিষয় হলো তার বাবা আর মা মিলে যে-টাকা আয় করত তাতে তাদের পরিবার একেবারে দিন আনে দিন খায় টাইপের হবার কথা ছিল না। কিন্তু তাদের পরিবারটা এমন হবার পেছনে কারণ ছিল তার বাবা-মা দুজনেই নিজেদের আয়ের চেয়ে ভালো জীবন-যাপন করার চেষ্টা করত। তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী যে- ধরনের বাড়িতে থাকা উচিত সেটায় না থেকে থাকত আরেকটু ভালো বাড়িতে, তাদের সামসময়িক পরিবারগুলো যখন সন্তান খানিকটা বড়ো হওয়ামাত্রই কাজে লাগিয়ে দিত, সেখানে তার পরিবার তাদের দুই ভাই বোনকেই পড়ালেখার ব্যবস্থা করেছিল। শুধু তাই না যেখানে ওই ধরনের পরিবারগুলো ছেলেমেয়েদেরকে শুধুমাত্র ধর্মীয় শিক্ষা দিয়েই যথেষ্ঠ মনে করত সেখানে তার বাবা-মা তাদেরকে রীতিমতো ভালো স্কুলে পাঠাতো। শুধু তাই না, ছেলেমেয়েদেরকে দামি না হলেও সবসময় পরিচ্ছন্ন পোশাক-পরিচ্ছদ পরাত তারা। মাঝে-মধ্যেই ভালো ভালো খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করত। এমনকি মাঝে-মধ্যেই তাদেরকে নিয়ে ঘুরতে বের হতো। মোটকথা তাদের পরিবার অত্যন্ত গরিব হলেও গোছানো সুখী পরিবার ছিল। কিন্তু এই সুখ মনে হয় প্রকৃতির সহ্য হবার কথা ছিল না। তাই বিপর্যয় নামতে খুব বেশি সময় লাগেনি
যখনই সে নিজের ফেলে আসা শৈশবের দিকে ফিরে তাকায়, খুব দোদুল্যমান কিছু অনুভূতি হয় তার ভেতরে। সে এমন একজন মানুষ যে কি না বাস্তবিকের চেয়েও বেশি বাস্তবিক, সে মেধায় বিশ্বাস করে না, সে ভাগ্যে বিশ্বাস করে না, যদি সে কিছুতে বিশ্বাস করে তবে বিশ্বাস করে একমাত্র পরিশ্রম এবং স্ট্র্যাটেজিতে। সে মনে করে যদি কারও ভেতরে পরিশ্রম করার স্পৃহা থাকে এবং সে সেটা করতে পারে সঠিক কৌশলে, তবে যেকোনো অসাধ্য সাধন করা সম্ভব। কিন্তু যখনই সে নিজের শৈশবের দিকে ফিরে তাকায় তখনই নিজের এই নিরেট বিশ্বাসের কঠিন প্রস্তরের ওপরে অদ্ভুত এক দোদুল্যমানতা দেখতে পায়। সে সবসময়ই মনে করে আজকে সে যে অবস্থানে আছে এর পেছনে মূল চালিকাশক্তি তার শৈশব। জীবনের প্রতিটা স্তরে প্রতিটা ক্ষেত্রে সে যখনই কোনো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে যায় প্রতিবারই সে শৈশবের দিকে ফিরে তাকায়।
একদিকে সে চিন্তা করে তারা বাবা কিংবা মা যদি যে-বস্তিতে সে শৈশব কাটিয়েছে সেখানকার অন্যান্যদের মতোই হতো তবে কি সে এখন যে অবস্থানে রয়েছে সেখানে আসতে পারত? কিংবা তার চিন্তা-ভাবনা এমন হতো কি না? সোজা কথা সে কি তবে ভিন্ন কিছু হতে পারত? আবার সে এটাও চিন্তা করে যদি তারা বাবা-মা বাকিদের মতোই চিন্তা-ভাবনা করত তবে হয়তো তার বাবার মৃত্যুর পর তাদের পরিবার যে ধরনের সমস্যায় পড়েছিল কিংবা যেভাবে পুরো পরিবার বলতে গেলে প্রায় ধ্বংসের মুখে পতিত হয়েছিল, ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছিল তার এবং তার বোনের জীবন—সেটা আদৌ হতো কি না। কে জানে নাও হতে পারত।
তবে সেটা মূল পয়েন্ট নয়, মূল পয়েন্ট হলো মানুষের কি আসলে তার সাধ্যের বাইরে চিন্তা করা উচিত? আরও সহজ ভাষায় বলতে গেলে মানুষের জন্যে নিজের সাধ্যের বাইরে চিন্তা করাটা তার নিজের জন্যেই ক্ষতিকর কি না? যদি ধরে নেওয়া যায় মানুষের নিজের জন্যে নিজের সাধ্যের বাইরে চিন্তা করাটা ক্ষতিকর, সেক্ষেত্রেও একটা বড়ো প্রশ্ন রয়ে যায়—মানুষ যদি নিজে থেকে তার সাধ্যের বাইরে চিন্তা না করত তবে হয়তো আজকের এই সভ্যতার সৃষ্টিই হতো না। আজ মানুষ পুরো পৃথিবীকে জয় করতে পেরেছে হয়তো সে বার বার নিজেকে নিজের সাধ্যের বাইরে ঠেলে দিয়েছে বলেই।
তো তার বাবার মৃত্যু তো হলো এরপর–
‘পরিস্থিতি কী, বলো তো, হাবিব?’ পেছন থেকে ভারী গলার স্বর শুনে জানালার বাইরে থেকে দৃষ্টি সরিয়ে পিবিআই স্পেশাল উইংয়ের প্রধান হাবিব আনোয়ার পাশা ফিরে তাকাল কামরার ভেতরের দিকে।
আজ থেকে পাঁচ বছর আগে গাজীপুরের একটা অপারেশনের পর যখন সে গবেষণার জন্যে ছুটিতে যায়, এরপরে ফিরে এলে তাকে প্রমোশন দিয়ে পিবিআইয়ের স্পোশাল উইংয়ের ডিরেক্টর হিসেবে ধানমন্ডির এই শাখাতে ট্রান্সফার করা হলো, তখন থেকে এই সুন্দর কামরাটায় তার অফিস। কামরাটা খুব আহামরি না হলেও বেশ পরিপাটি করে সাজানো। এমাথা-ওমাথা কার্পেটে মোড়ানো কামরাটায় তার সবচেয়ে প্রিয় অংশ হলো এর বিরাট জানালাটা।
তার নিজের ভারী সেক্রেটারিয়েট টেবিলের ওপাশে দামি কার্পেটের ওপরে সাধারণ চেয়ারের ওপরে বসে থাকা মানুষটার হাতে একটা স্বচ্ছ কাচের কাপের ভেতরে সোনালি তরল। তাতে সে আরেকবার চুমুক দিয়ে দেশের অন্যতম ধনী ব্যাবসায়িক পরিবারের কর্ণধার মাহবুব তালুকদার চোখ তুলে তাকাল হাবিব আনোয়ার পাশার দিকে। কিন্তু পাশা এবারও কিছু না বলে সিগারে আরেকটা টান দিয়ে জিনিসটা খানিকটা উঁচু করে ধরল। মাহবুব, তুমি কি একটা ব্যাপার জানো? আমার এই পুরো অফিস ভবনে সিগারেট খাবার নিয়ম নেই এবং এই অফিসে কোনো নিয়ম ভাঙারও নিয়ম নেই,’ বলে সে সিগারে কষে আরেকটা টান দিলো, তার মুখে মৃদু একটা হাসি ফুটে উঠতে শুরু করেছে। সাধারণত তার মুখের হাসি বেশিরভাগ সময় চোখে না পৌঁছালেও এখন সেটা পৌঁছাতে শুরু করেছে। কারণ মাহবুব তালুকদার শুধু তার প্রতিষ্ঠানের ফিন্যানশিয়াল ইনভেস্টরই নয়, তার বন্ধুও বটে। আনোয়ার পাশা দেখতে পেল মাহবুব তালুকদারের মুখেও হাসির ছোঁয়া ফুটে উঠতে শুরু করেছে। কারণ সে যে তার সাথে দুষ্টামিটা করতে যাচ্ছে এটা সে বেশ ধরতে পেরেছে। ‘কিন্তু সেফ তোমার জন্যে এবং তোমার জন্যে এই নিয়মটা ভাঙা হয়,’ বলে সে অ্যাশট্রের একপাশে সিগারটা নামিয়ে রেখে মুখটা সামান্য এগিয়ে ধরল। ‘কেন যেন এই সিগার তুমি যতবার এনে দাও, কোনোবারই আমি নিজেকে ধরে রাখতে পারি না,’ বলে সে জোরে জোরে হেসে উঠল।
তার হাসির সাথে সাথে মাহবুব তালুকদারও হেসে উঠল। ‘পাশা, তুমি ঠিক আগের মতোই চালু রয়ে গেছ,’ বলে সে তার পাশের চেয়ারে বসে থাকা হালকা- পাতলা ম্যানেজার হামিদের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল। ‘পাশা, শুধু আজকে চালু না, ও সেই কলেজ জীবন থেকেই চালু,’ চুপচাপ মধ্যবয়স্ক ম্যানেজার হামিদ কিছু না বলে স্রেফ একবার মাথা ঝাঁকিয়ে তার জবাব দিলো। মাহবুব তালুকদার হাবিব আনোয়ার পাশার দিকে ফিরে বলে উঠল, ‘পাশা, কাজের প্রোগ্রেস বলো। তোমার নতুন উইংয়ের কী অবস্থা?’ এবার তার গলা সিরিয়াস হয়ে উঠেছে, গলায় ফুটে উঠেছে একজন প্রফেশনাল ব্যবসায়ীর সুর। ‘তুমি তো জানো, সেই প্রজেক্টের প্রধান ফাইন্যানশিয়ার হিসেবে আমার অধিকার আছে তোমাদের কাজের প্রোগ্রেস জানার।’
হাবিব আনোয়ার পাশা সরাসরি তাকিয়ে আছে মাহবুব তালুকদারের দিকে, ‘তালুকদার, তুমি তো জানোই আমি তোমার কাছে কিছুই লুকাব না কিংবা বলতে পারো একমাত্র তোমার কাছেই কিছুই লুকাব না,’ বলে সে টেবিলের একপাশে ইন্টারকমের বাট চেপে মৌসুমিকে কিছু ডকুমেন্টস নিয়ে রুমে আসতে বলল। ‘একজন ব্যবসায়ী হিসেবে তুমি যেমন জানো টাকা-পয়সা নিয়ে বিশ্বাস রাখা যায় এমন লোকের সংখ্যা যেমন বেশি হয় না, ঠিক তেমনি আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার লোক হিসেবে আমি তোমাকে বলতে পারি গোপন কথা শেয়ার করা যায় এমন লোকের সংখ্যাও আসলে খুব বেশি হয় না, শেষ কথাটা বলতে বলতে সে অ্যাশট্রের একপাশে ঠেস দিয়ে রাখা সিগারটা উঠিয়ে নিতে নিতে মাহবুব তালুকদারের ম্যানেজার হামিদের দিকে তাকাতেই হামিদ সামান্য মাথা নেড়ে সায় জানাল। দরজায় সামান্য নক করে বেশ কয়েকটা ফাইল হাতে কামরার ভেতরে ঢুকল আনোয়ার পাশার ব্যক্তিগত সেক্রেটারি মৌসুমি। ‘এসো, মৌসুমি, যা যা বলেছি এনেছ?’
‘জি, স্যার,’ বলে মৌসুমি হাতের ফাইলগুলোর দিকে ইশারা করল কিন্তু সেগুলো টেবিলেও রাখল না বা মাহবুব তালুকদার কিংবা তার ম্যানেজারের দিকে এগিয়েও দিলো না। টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে রইল। আনোয়ার পাশা তাকে ইশারা করতে, একটা চেয়ার টেনে বসে পড়ল সে। ‘সবগুলো ফাইলই এনেছি।’
আনোয়ার পাশা তার দিকে সামান্য মাথা নেড়ে মাহবুব তালুকদারের দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করল। ‘তোমাকে সত্যি কথা বলি। আজ থেকে চার বছর আগে আমি যখন থেকে ভাবতে শুরু করি বিশেষ ধরনের কাজ এবং মিশনের জন্যে পিবিআইয়ের সেরা কিছু অফিসারদের নিয়ে আমি একটা স্পোশাল উইং খুলব ব্যাপারটা তখন সবার আগে তোমার সাথে শেয়ার করেছিলাম, কারণ আমি জানতাম আমার একজন বড়ো মাপের ফাইন্যানশিয়ার লাগবে। তুমিও তাতে বেশ দ্রুত সাড়া দাও এবং বলতে গেলে বেশ পজিটিভলি সাড়া দাও।’
এখানে একটু কারেকশন আছে,’ মাহবুব তালুকদার চায়ের কাপটা নামিয়ে রেখে একটা আঙুল তুলে বলে উঠল। ‘আসলে তোমার প্রস্তাবটার ভেতরে আমি প্রথমে খুব বেশি পটেনশিয়াল দেখতে পাইনি। আমার ম্যানেজার হামিদই প্রথম এই বিষয়ে আমাকে হাইলাইট করে আমাকে কনভিন্স করে যে এতে অনেক পটেনশিয়াল আছে। সেজন্যে হামিদকে খানিকটা ধন্যবাদ। কারণ ও আমাকে কনভিন্স না করলে হয়তো আমি এই প্রজেক্টের সাথে ইনভলভড হতাম না’ বসে সে হামিদের দিকে তাকিয়ে সামান্য মাথা ঝাঁকালে, স্বল্পভাষী ম্যানেজার হামিদ এবারও তেমন কিছু না বলে স্রেফ মাথা ঝাঁকিয়ে জবাব দিলো।
‘যাই হোক, তুমি ভালো করেই জানো এসব বিষয় কতটা কঠিন। বিশেষ করে আমাদের মতো দেশে যেখানে প্রতি পদে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা প্রকট সেখানে এমন একটা উইং চালু করা কতটা ঝামেলার ব্যাপার। একেবারে সত্যি কথা বলতে গেলে আমার নিজেরও কনফিউশন ছিল অনেক। কিন্তু এই বিষয়ে একেবারে গোড়া থেকে আমি যেসব সিদ্ধান্ত নিয়ে এসেছি এখন এসে সবগুলো এখন সঠিক মনে হচ্ছে। প্রথমত, তানভীর এবং শারিয়ারকে এই উইংয়ের যোগ্য করে তোলার জন্যে ট্রেনিংয়ে পাঠানো এবং পরবর্তীতে ওদেরকে মাঠে নামানো প্রতিটি সিদ্ধান্তই সঠিক প্রমাণিত,’ বলে সে মৌসুমির দিকে ইশারা করতেই মৌসুমি তার সামনে রাখা ফাইল খুলে কয়েকটা কাগজ এগিয়ে দিলো মাহবুব তালুকদারের দিকে। আনোয়ার পাশা আবারও বলতে শুরু করল, ‘এক হিসেবে বলতে পারো হাতে এই মুহূর্তে দুর্দান্ত একটা টিম আছে যারা দেশের অভ্যন্তরের যেকোনো পরিস্থিতি সামলানোর ক্ষমতা রাখে। এই টিম পরীক্ষিত এবং প্রস্তুত,’ বলে সে মাহবুব তালুকদারের দিকে তাকাল, ‘তবে এটাই মূল সফলতা নয়। সবচেয়ে বড়ো সফলতা হলো আমি অফিসিয়ালি এখনও উইংয়ের ঘোষণা দেইনি, কিন্তু ইতিমধ্যেই আমার টিম এমন কিছু কাজ করেছে যা দেশের আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর ইতিহাসে বিরল একটা বিষয়,’ বলে সে সিগারটাকে ঠোঁটে লাগিয়ে নিজের বুকের ওপরে একটা হাত রাখল। ট্রাস্ট মি, আমি কথাটা বুঝে এবং জেনে বলছি, না জেনে নয়। আমার টিমের অপারেটররা কাজ শুরু করা মাত্র বাংলাদেশের মাটিতে দুই দুটো আন্তর্জাতিকভাবে কুখ্যাত সংস্থার অস্তিত্ব অবিষ্কার করেছে যারা এখানে অপারেট করছিল এবং দেশের আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর এই বিষয়ে কোনো ধারণাই ছিল না!’
আবারও মৌসুমি মাহবুব তালুকদারের দিকে কয়েকটা কাগজ এগিয়ে দিলো।
কাগজগুলোতে চোখ বুলাতে বুলাতে মাহবুব তালুকদার বলে উঠল, ‘রেলিক এবং নেক্রপলিস। এরা কারা?’ তার ভ্রু কুঁচকে উঠেছে।
‘ইন্টারপোল লিস্টেড আন্তর্জাতিক অ্যান্টিক চোরাচালানি সংস্থা,’ আমাদের আগে এদের নামও ঠিকমতো শোনেনি লোকে। আমরাই এদের অস্তিত্ব আবিষ্কার করেছি, মানে আমাদের দেশে ওদের অপারেট করার প্রমাণ পেয়েছি। যাই হোক, এমনকি এটাও আমাদের মূল সাফল্য নয়,’ বলে সে ইচ্ছে করেই একটু নাটকীয়ভাবে থেমে গেল।
মাহবুব তালুকদার, তার ম্যানেজার এবং সে পরষ্পরের দিকে তাকিয়ে রইল কয়েক সেকেন্ড। ‘মাস্টার ডি এবং মাস্টার ইউ নামে দুই দুইজন ভয়ঙ্কর আন্তর্জাতিক অপরাধী যারা এই দেশে অপারেট করছিল ছদ্মবেশে, আমাদের টিম স্রেফ এদের অস্তিত্বই আবিষ্কার করেনি, তানভীর সিলেট থেকে মাস্টার ডি এবং চট্টগ্রাম থেকে শারিয়ার আলট্রা মাস্টার অর্থাৎ মাস্টার ইউকে গ্রেপ্তারও করতে সমর্থ হয়েছে। আমি চোখ বন্ধ করে বলে দিতে পারি সাম্প্রতিক সময়ে কোনো আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা এতটা সফলতা দেখাতে পারেনি,’ বলে সে নিজেকে খানিকটা এগিয়ে নিয়ে গেল মাহবুব তালুকদারের দিকে। ‘আর পুরো টিমকে অ্যাকুমুলেট করে এখন পুরো উইং খোলা স্রেফ সময়ের ব্যাপার। কাজেই আমি মনে করি তোমার ফাইন্যানশিংয়ের সেরা সময় এখনই। বলো, তোমার মতামত কী?
মাহবুব তালুকদার মনোযোগ দিয়ে কাগজগুলো দেখে হামিদের দিকে এগিয়ে দিলো। চোখ থেকে নিজের দামি রিডিং গ্লাস খুলে সেটাকে নামিয়ে রাখল টেবিলের ওপরে। আমি বুঝতে পেরেছি তুমি দারুণ কাজ করছ।’
‘আমি না, আমার টিম,’ বলে আনোয়ার পাশা একটা হাত তুলল।
‘ওই,’ বলে সে মাথা নাড়ল সামান্য। যদিও আমি আমার কোম্পানির সিইও, তবুও তো তুমি জানো এরকম ডিলে অনেক ডিসিশন মেকিংয়ের ব্যাপার থাকে। কাজেই আমরা দ্রুতই আমাদের সিদ্ধান্ত জানাবো। তবে আমি তোমাকে আনঅফিসিয়ালি বলতে পারি, ব্যাপারটা ইয়েসই হবে। কী বলো, হামিদ?’ মাহবুব তালুকদারের ম্যানেজার হামিদ স্রেফ একবার মাথা নেড়ে সায় জানাল।
‘ওকে আমি তবে আজকের মতো উঠব। বলে মাহবুব তালুকদার উঠে দাঁড়িয়ে নিজের টান টান হয়ে থাকা থ্রি-পিস নেভি ব্লু স্যুট টেনে ঠিক করে নিলো। তার স্যুটের ভেতরে সাদা শার্টের সাথে গোল্ডেন মেরুন নিটেড টাই, কাফে গোল্ডের কাফ লিঙ্ক আর হাতে মিক্সড গোল্ডের রোলেক্স ঠিক করে নিয়ে সে সোজা হয়ে দাঁড়াতেই আনোয়ার পাশা এগিয়ে এসে তার স্যুটের কলারটা ঠিক করে দিলো। তারপার তার একটা হাত ধরে বলে উঠল, ‘ধন্যবাদ, বন্ধু।’
‘অ্যান্ড আ’ম প্রাউড অব ইউ,’ মাহবুব তালুকদার হাতটাকে ধরে জোরে ঝাঁকুনি দিয়ে হাতটা ছাড়িয়ে নিতে যাচ্ছিল আনোয়ার পাশা হাতটা ছাড়ল না। ‘শারিয়ার,’ নামটা উচ্চারণ করতেই মাহবুব তালুকদারের ভ্রু কুঁচকে উঠল।
‘কী করেছে আবার ও?’
আনোয়ার পাশা হেসে উঠল, ‘আচ্ছা তুমি, তোমার ভাতিজার ওপরে সবসময় এত খেপে থাক কেন বলো তো? এবার কিছু করেনি ও। বরং উলটো আমি বলতে চাচ্ছিলাম অসাধারণ কাজ দেখিয়েছে সে চট্টগ্রামে। তার কারণেই বলতে পারো আমরা পুরো রহস্যটা তো সলভ করতে পেরেছিই সেই সাথে কেসটা কোনোদিকে মোড় নিবে সেই লিডও বের করতে পেরেছি।’
‘গুড ফর হিম,’ প্রায় নিরাবেগী গলায় কথাটা বলে পিবিআইয়ের স্পেশাল উইংয়ের ফিল্ড এজেন্ট শারিয়ারের চাচা মাহবুব তালুকদার আনোয়ার পাশার কাঁধে চাপড় দিয়ে বেরিয়ে গেল। তার পেছন স্বল্পভাষী ম্যানেজার হামিদ একবার আনোয়ার পাশা আরেকবার মৌসুমির দিকে মাথা নেড়ে হাসিমুখে অনুসরণ করল তাকে।
মানুষ দুজন বেরিয়ে যেতেই ফুসস করে শব্দ করে নিশ্বাস ছাড়ল আনোয়ার পাশা, তারপর মৌসুমির দিকে তাকিয়ে একটা হাসি দিয়ে কোটের নিচে নিজের শার্টের কলার খুলে ঢিলে করে দিলো টাইটা। ‘বলো মৌসুমি, কী অবস্থা?’
বলে সে ধপ করে বসে পড়ল নিজের চেয়ারে। চশমা খুলে টেবিলের ওপরে রেখে মৌসুমির দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়তে নাড়তে বলে উঠল, ‘একটা কথা কি জানো, মৌসুমি, ব্যবসায়ীদের সাথে ডিল করা রাজনৈতিক নেতাদের সাথে ডিল করার চেয়েও কঠিন,’ বলে সে আনমনে একবার মাথা নেড়ে বলে উঠল, ‘বলো তো, পরিস্থিতি কী?’
মৌসুমিও হেসে উঠল তার কথা শুনে। ‘কোন পরিস্থিতি বলব, স্যার, আপনি যেটা মাহবুব স্যারকে বললেন ওটা? নাকি সত্যিকারের পরিস্থিতি যেটা সেটা?’ বলে সে মৃদু হেসে উঠল।
তার সাথে আনোয়ার পাশাও হেসে উঠল। ‘মৌসুমি, তুমিও মজা নিতে শিখে গেছ। সত্যিকারের পরিস্থিতি কী বলো?’
স্যার, পরিস্থিতি নিয়ে আমি কোনো কমেন্ট করব না, সেই এখতিয়ারও আমার নেই। আমি শুধু পরিস্থিতি বয়ান করতে পারবো এবং,’ বলে সে খানিকটা থেমে গেল। মৌসুমি কাজ করে অত্যন্ত প্রফেশনালভাবে এবং যেকোনো পরিস্থিতিতে সে নেগেটিভিটি অ্যাভয়েড করার চেষ্টা করে কিন্তু এখন পরিস্থিতি এতটাই ঘোলাটে যে চাইলেও সেটা করতে পারছে না। আনোয়ার পাশা কিছু না বলে একবার হাত নাড়ল। এর অর্থ মৌসুমি খুব ভালোভাবেই জানে। তাকে বয়ান করে যেতে বলছে আনোয়ার পাশা।
ভণিতা না করে সে টেবিলের সামনে থেকে দ্বিতীয় ফাইলটা তুলে নিলো। মৌসুমি খুব ভালোভাবেই জানে কেসের সমস্ত আপডেটেড রিপোর্টগুলোতে কী আছে। কারণ সে নিজেই এগুলো কম্পোজ এবং অ্যানালাইসিস করেছে। এটা আসলে তার দায়িত্বেরই একটা অংশ এবং সে এটা করার জন্যেও সবচেয়ে উপযুক্ত মানুষ। কারণ সে ডেস্কে কাজ করলেও তার ক্রিমিনোলজিতে বেশ উচ্চতর পড়ালেখা রয়েছে। যে কারণে যেকোনো সময় যেকোনো পরিস্থিতিতে হাবিব আনোয়ার পাশার যেকোনো মিটিং বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কেস ফাইল সাজিয়ে সিচুয়েশন অ্যানালাইসিস করে জায়গামতো নোট নিয়ে রাখে সে আগে থেকেই।
‘স্যার, আমি গোড়া থেকেই শুরু করি। আপনি তো দীর্ঘদিন যাবৎই নিজের ডিপার্টমেন্ট খোলার জন্যে ভেতরে ভেতরে পরিকল্পনা করে যাচ্ছেন। আর সে পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই ফিল্ডে কাজ করার জন্যে তানভীর আর শারিয়ারকে ইউরোপে পাঠানো হয়েছিল ট্রেনিংয়ের জন্যে। ওদের ট্রেনিং যখন প্রায় শেষ দিকে এমন সময় সিলেটে একটা বিশেষ পরিস্থিতি দেখা দেয়। আর সেটা প্রথমে পুলিশ হ্যান্ডেল করার চেষ্টা করলেও আপনার মনে হয়েছিল এই বিশেষ কাজের মাধ্যমেই আমাদের উচিত নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেওয়া আর সেটারই অংশ হিসেবে তানভীরকে ট্রেনিং থেকে দ্রুত ডেকে এনে মিশনে পাঠানো হয় সিলেটের উদ্দেশ্যে। সেখানে গিয়ে প্রথমে খুব হাবুডুবু খেলেও তানভীর তার মিশন সম্পন্ন করে খুব ভালোভাবেই এবং আমাদের প্রত্যাশাকে ছাড়িয়ে গিয়ে ওখানে দুটো গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার ঘটে। প্রথমত, বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো নেক্রপলিস এবং রেলিক নামে আন্তর্জাতিকভাবে কুখ্যাত দুটো অ্যান্টিক চোরাচালানি গোপন সংগঠনের অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায় এবং নেক্রপলিসের এশিয়া জোনের অন্যতম কর্ণধরার কুখ্যাত অপরাধী মাস্টার ডি, যে আসামে ব্ল্যাক বুদ্ধা নামে বিখ্যাত এক লেজেন্ডারি মূর্তি উদ্ধার করেছিল সেটা বের করা যায় এবং মাস্টার ডি-ও ধরা পড়ে, সেই সাথে আমরা ব্ল্যাক বুদ্ধাও করায়ত্ত করতে পারি। তানভীর সিলেটের পরিস্থিতি সামলানোর জন্যে এখনও সেখানেই আছে।’
হাবিব আনোয়ার পাশা অ্যাশট্রের এক পাশ থেকে সিগারটা তুলে নিয়ে তাতে টান দিয়ে সুগন্ধি নীলচে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বলে উঠল, ‘মৌসুমি, এসব তো আমি জানি আবার রিপিট করছ কেন?’
‘স্যার, পুরো পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে হলে ব্যাপারগুলো আবার আলোচনা করাটা জরুরি,’ মৌসুমির গলায় কোনো তাড়াহুড়ো নেই। যদিও সে মনে মনে জানে হাবিব আনোয়ার পাশা খানিকটা বিরক্ত হচ্ছে তার বয়ানে, কিন্তু সে বলে যাবেই ঘটনা তার মতো করে। কারণ এর শেষে তাকে অ্যানালাইসিস যোগ করতে হবে। স্যার, এই ঘটনার রেশ না কাটতেই চট্টগ্রামে আরেকটা ঘটনা ঘটে। ওখানকার পতেঙ্গা রোডে, অ্যাক্সিডেন্টে মারা পড়ে প্রফেসর আবদেল নামে এক ব্যক্তি। সে মারা যাবার সাথে সাথেই সক্রিয় হয়ে ওঠে একাধিক মহল এবং জানা যায় লোকটা আসলে একজন আর্কিয়োলজিস্ট এবং ওখানকার এক বাড়িতে দীর্ঘদিন যাবৎ লুকিয়ে থেকে সে কিছু একটা নিয়ে গবেষণা করছিল। ওখানেও কেসটা প্রথমে ডিবি এবং পিবিআইয়ের চট্টগ্রাম ব্যুরো হ্যান্ডেল করলেও খুব দ্রুতই সেখানে আমাদের অভিজ্ঞ ফিল্ড এজেন্ট শারিয়ারকে পাঠানো হয়। ওখানে অনেক জল ঘোলা হবার পর জানা যায় ওখানেও নেক্রপলিসের হাত ছিল, মূলত নেক্রপলিস এবং রেলিকের হাত থেকে বাঁচার জন্যে, যিনি রোড অ্যাক্সিডেন্টে মারা পড়েছেন উনি, মানে প্রফেসর আবদেল লুকিয়ে গবেষণা করছিলেন কিছু একটা নিয়ে এবং মিশনের শেষে শারিয়ার সেটা উদ্ধার করতেও সমর্থ হয় চট্টগ্রামের এক প্রত্যন্ত দ্বীপ থেকে।’
‘রাজদ্রোহী,’ হাবিব আনোয়ার পাশার মুখ থেকে নীলচে ধোঁয়ার সাথে সাথে শব্দটা বেরিয়ে এলো। ‘রাজদ্রোহী নামে এক অসমাপ্ত রহস্য।’
‘জি, স্যার, রাজদ্রোহী,’ বলে মৌসুমি মৃদু বিরতি দিয়ে আবারও বলতে শুরু করল। ‘রাজদ্রোহীর রহস্যে পরে আসছি। সত্যি কথা হলো, রাজদ্রোহীর রহস্যই আমাদের আজকের আলোচনার মূল বিষয়। কিন্তু সেই আলোচনায় যাবার আগে আমাকে প্রফেসর আবদেলের ব্যাপারে কিছু জিনিস বলতে হবে। উনি একজন আর্কিয়োলজিস্ট ছিলেন এবং বলা যায় উনার ফিল্ডে বিশ্ব সেরা আর্কিয়োলজিস্ট ছিলেন। বেশ কয়েক বছর আগে উনি উনার ফিল্ড অব স্টাডি বদলে ভারতবর্ষের বিভিন্ন পুরনো আনসলভড রহস্য নিয়ে গবেষণা শুরু করেন এবং উনার সাথে একটা সময় পরিচয় ঘটে আরেক পাগলাটে প্রফেসর ইফতেখার মাহমুদের। তারা দুজনে মিলে ভারতবর্ষের পুরনো এক রহস্য নিয়ে কাজ করতে শুরু করেন। একটা পর্যায়ে এই বিষয়ে তারা বাংলাদেশ সরকারের কাছে সাহায্য চাইলে তাদেরকে কেউই বিশ্বাস তো করেইনি, এমনকি প্রফেসরদের আর্কিয়োলজিস্ট হিসেবে লাইসেন্সও কেড়ে নেওয়া হয়। সম্ভবত এরপরই তারা রিসোর্সের জন্যে নেক্রপলিস বা রেলিকের কারও সাহায্য নেয় এবং সম্ভবত একটা পর্যায়ে তারা ওদেরকেও ধোঁকা দিয়ে স্রেফ গায়েব হয়ে যান। এটা আজ থেকে তিন বছর আগের ঘটনা। ওই সময় থেকে প্রফেসর আবদেল সেই চট্টগ্রামের সেই পুরনো বাড়িতে লুকিয়ে নিজে গবেষণার কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন এবং তিনি যা আবিষ্কার করেছেন সেটাকে একটা কোডের আকারে কনভার্ট করে একটা চিপের ভেতরে রেখেছিলেন যেটা শারিয়ার তার চট্টগ্রামের অপারেশনে আবিষ্কার করেছে। মজার বিষয় হলো শারিয়ার যে-চিপ আবিষ্কার করেছে সেটা একটা বিশেষ কোডেই স্রেফ খুলবে এবং এই কোডের কু হিসেবে বলা আছে স্রেফ রাজদ্রোহীর নাম। কিন্তু এটা কী বা কোথায় আছে বা বিষয়টা আদতে কি এ সম্পর্কে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। অন্যদিকে শারিয়ার যখন এই অপারেশন চালায় সেই সময় সে শুধু এই চিপটাই আবিষ্কার করেনি, বরং চট্টগ্রামে অ্যাকটিভ নেক্রপটলিসের বেশ বড়োসড়ো এক কর্মকর্তা মিস্টার ইউকেও সে বন্দি করতে সমর্থ হয়। এই বিষয়গুলো নিয়ে শারিয়ার এখনও চট্টগ্রামে অবস্থান করছে সেখানকার পরিস্থিতি আরও ভালোভাবে বুঝে পরবর্তী পদক্ষেপে আসলে সে কী করবে সেই ব্যাপারে আমাদের নির্দেশের জন্যে অপেক্ষা করছে সে। এই হলো সার্বিক পরিস্থিতি, কথা শেষ করে মৌসুমি ফাইলটা বন্ধ করল। সে কিছু বলল না। কারণ জানে হাবিব আনোয়ার পাশা শেয়ারড প্লাটফর্মে ইতিমধ্যেই ফাইলটাতে চোখ বুলিয়েছে।
মৌসুমি কথা শেষ করার পর হাবিব আনোয়ার পাশা কিছু বলল না। চুপচাপ কিছুক্ষণ সিগার টানল। মৌসুমিও কিছু বলল না, কারণ সে জানে আনোয়ার পাশা যখন সময় হবে তখনই কথা বলবে। শারিয়ার,’ বলে সে সে আবারও থেমে গেল। ‘ও ঠিকঠাক আছে তো?’ বলে সে সরাসরি তাকাল মৌসুমির দিকে। মৌসুমিও তাকিয়ে আছে আনোয়ার পাশার দিকে। মৌসুমি জানে আনোয়ার পাশা শারিয়ারের শরীরিক অবস্থার কথা জানতে চায়নি। আনোয়ার পাশা জানে মৌসুমির সাথে তানভীর বা শারিয়ারের সম্পর্ক ছোটো ভাই-বোনের মতো। কাজেই প্রতিটা এজেন্টের ব্যাপারে বিশদ সব খবর সে মৌসুমির মাধ্যমেই রাখে।
‘জি, স্যার। সে ভালো আছে,’ বলে সে মৃদু কাশি দিয়ে বলে উঠল। ‘স্যার, আপন রা কিন্তু এই কেসে ওর সাথে খুব ভালো আচরণ করেননি।’
‘সে কেসের প্রথমে যে পরিমাণ গুবলেট করেছিল তারপরও কিন্তু ভরসা করেছি ওর ওপরে,’ আনোয়ার পাশার গলায় কাঠিন্য, সে এখনও মৌসুমির দিকেই তাকিয়ে আছে। মৌসুমিও তার দিকে তাকিয়ে আছে। স্যার, ও কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভালো কাজ দেখিয়েছে।’
আনোয়ার পাশা কিছু না বলে সামান্য মাথা ঝাঁকাল। হঠাৎ সে সামান্য হেসে উঠল। ‘সূর্যের চেয়ে বালি গরম কথাটা শুনেছ, মৌসুমি?’ বলে সে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে আবারও সেই জানালার সামনে এসে দাঁড়াল। ‘আমার কাছে এই মুহূর্তে সেরকম মনে হচ্ছে। প্রথম যখন ডিপার্টমেন্ট শুরু করার পরিকল্পনা করি আমি ভেবেছিলাম আমরা কী ধরনের কেস নিয়ে কাজ করবো বা আদৌ কাজ পাবো কি না! এখন তো মনে হচ্ছে ডিপার্টমেন্ট শুরু করার আগেই নিজেদের সাধ্যের চেয়ে বড়ো বড়ো সব কাজ এসে হাজির হয়ে গেছে। ভয়ঙ্কর সব আন্তর্জাতিক ক্রিমিনাল, অদৃশ্য আন্তর্জাতিক কুখ্যাত সংগঠন, ইতিহাসের পুরনো রহস্য! হচ্ছেটা কী আসলে?’ বলে সে টেবিলের কাছে ফিরে এসে খানিকটা রাগের সাথেই সিগারটা অ্যাশট্রেতে চেপে নিভিয়ে দিলো। ‘হোয়াট দ্য হেল আর দিজ অর্গানাইজেশনস? নেক্রপলিস, রেলিক? এরা দেশের সব জায়গায় নিজেদের লোক নিয়োগ করে বসে আছে আমাদের নাকের ডগায়। আমারা এমনকি ওদের অস্তিত্বের কথাও জানি না! এ-কেমন কথা?’
স্যার, এখন আমাদের করণীয় কী? একদিকে তানভীর সিলেটে, অন্যদিকে শারিয়ার চট্টগ্রামে। একদিকে ওরা আমাদের নির্দেশের জন্যে অপেক্ষা করছে। আবার চট্টগ্রামে রাজদ্রোহীর যে রহস্য পেঁচিয়ে উঠেছে সেটার কিছুই আমরা বুঝতে পারছি না।’
‘তোমার অ্যানালাইসিস কী বলে?’ হাবিব আনোয়ার পাশা টেবিলের ওপর থেকে ট্যাব তুলে নিয়ে তাতে ফাইলটা ওপেন করে চোখ বুলাতে শুরু করেছে।
‘স্যার, আমার অ্যানালাইসিস বলে আমাদের এই মুহূর্তে খুব শক্তভাবে কাজে নামতে হবে দুটো কারণে। প্রথমত, আমরাদের ডিপার্টমেন্ট খোলার প্রস্তাব বিবেচনাধীন, এই মুহূর্তে আমাদের কোনোভাবেই ভুল করা যাবে না। বিশেষ করে তানভীর আর শারিয়ারের পরে যে ইমপ্রেশন আমাদের তৈরি হয়েছে সেটা কোনোভাবেই ব্রেক করা যাবে না। তার ওপরে, রাজদ্রোহীর রহস্য যাই হোক না কেন, আমরা কিছুই না জানলেও আমাদের শত্রুরা এর ব্যাপারে সবই জানে এবং একটা ব্যাপার কি জানেন, স্যার? সিলেটের ঘটনাটা ঠিক পরেই চট্টগ্রামের ঘটনা অ্যাকটিভেট হয়ে উঠল এবং চট্টগ্রামের ঘটনার পর অবশ্যই আমাদের শত্রুরা নিশ্চিত আরও আঁটসাঁট বেঁধে কাজে নেমে পড়েছে। আর আমরা পুরোপুরি অন্ধ অবস্থায় আছি। আমরা এখন শক্ত হয়ে না নামলে শত্রুরা আরও এগিয়ে যাবে এবং…’
‘আমাদেরকে কোনো জায়গা থেকে কাজ শুরু করতে হবে সেটা আমি ইতিমধ্যেই বের করে ফেলেছি। বলে সে নিজের হাতে ধরা ট্যাবের একটা জায়গাতে জুম করে সেটা এগিয়ে দিলো মৌসুমির দিকে।
‘প্রফেসর ইফতেখার মাহমুদ,’ নামটা দেখে নিয়ে মৌসুমি ভ্রু কুঁচকে চোখ তুলে তাকাল আনোয়ার পাশার দিকে। ‘প্রফেসর আবদেলের ফ্রেন্ড। যে কি না তিন বছর আগে প্রফেসর আবদেলের সময়েই হারিয়ে গেছিল!’
আনোয়ার পাশা মাথা নাড়ল। ঠিক, রাজদ্রোহীর রহস্য যাই হোক না কেন সে-ব্যাপারে যদি কেউ ধারণা রেখে থাকে তবে একমাত্র এই প্রফেসরই পারবে।’
‘এখানে আমার দুটো প্রশ্ন আছে, স্যার?’ মৌসুমিকে চিন্তিত দেখাচ্ছে। ‘তাকে কোথায় খুঁজব আমরা? এভাবে হারিয়ে যাওয়া একজন মানুষকে খুঁজে বের করা
‘তুমি ভুল প্রশ্ন করেছ, মৌসুমি,’ আনোয়ার পাশার ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি। ‘দেখি তোমার দ্বিতীয় প্রশ্ন ঠিক হয় কি না!’
মৌসুমিও মৃদু হেসে উঠল। ‘দ্বিতীয় প্রশ্ন, এই মুহূর্তে আমাদের নিজেদের তো অ্যাকটিভ এজেন্ট নেই। আমরা তবে কাজে লাগাব কাকে। আবারও কি আমরা পিবিআই থেকে কাউকে হায়ার করবো?’
‘এবার ঠিক প্রশ্ন করেছ তুমি,’ বলে সে চেয়ারটাকে খানিকটা পেছনে ঠেলে দিয়ে এক পায়ের ওপর থেকে ভর অন্য পায়ে সরাল। ‘এই ব্যাপারটা খানিকটা জটিল। আমি কাকে কাজে লাগাতে চাচ্ছি সেই ব্যাপারে একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছি, কিন্তু এবার ব্লাইন্ড খেলতে হবে আমাকে। আর তাছাড়া—’ বলে সে থেমে গেল। মৌসুমি কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে।
‘আমি যার কথা ভাবছি সাম্প্রতিক সময়ে সে বেশ ভালো কাজ দেখালেও তার অতীতের রেকর্ড খুব একটা সুবিধা না। যদিও আমার বন্ধু এসপি আমজাদ আনোয়ার তাকে রিকমেন্ড করেছে এবং পুরোপুরি ভরসা রাখতে বলেছে। কিন্তু তারপরও। আসলে
‘স্যার, আপনি কি ইন্সপেক্টর আহমেদ বাশারের কথা ভাবছেন?’ মৌসুমির ভ্রুজোড়াও কুঁচকে উঠেছে।
হাবিব আনোয়ার পাশা মাথা নেড়ে সায় জানালেও তার দৃষ্টিতেও দ্বিধা এবং সে বলেই ফেলল। ‘একেবারেই অচেনা ছেলেটার ওপরে কি ভরসা করাটা ঠিক হবে? বিশেষ করে তার অতীতে যেখানে খুবই বাজে একটা রেকর্ড আছে?’
‘নিজের বন্ধুকে খুন করার ব্যাপারটা বলছেন, স্যার?’ মৌসুমি হাবিব আনোয়ার পাশার দিকে তাকিয়ে বলে উঠল।
আনোয়ার পাশা কিছু না বলে আনমনেই মাথা নাড়ল।
