অধ্যায় উনিশ
সময়: ১৫৯৬ খ্রিস্টাব্দ
জল-জঙ্গল এলাকা
.
তীব্র ঝড়-বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে তার মনে পড়ে গেল নিজের মায়ের মুখে শোনা গল্প। ঠিক এরকমই এক ঝড়ের রাতে নাকি তার জন্ম হয়েছিল। তার মায়ের বেশ বয়সকালের সন্তান ছিল সে। চার ভাইয়ের পর জন্ম হয়েছিল তার। তার বাবার খুব শখ ছিল একটা মেয়ের আর তাই তার জন্মের পর পুরো এলাকাতে খুশির বন্যা বয়ে গেছিল। নিজের মায়ের মুখে শুনেছে সে। কিন্তু তার জন্মের আগে নাকি অনেক ঝামেলা হয়েছিল, বিশেষ করে তাদের পারিবারিক বৈদ্য অনেক চেষ্টা করেও তার মায়ের সমস্যা দূর করতে পারেনি। এত ঝামেলার পরও তার জন্ম হয় ভালোভাবেই। খুশির বন্যা বয়ে যায় পুরো এলাকাতে। কারণ রাজকুমারীর জন্ম বলে কথা।
শেষ কথাটা মাথায় আসতেই নিজের মুখেই খানিকটা টিটকারির একটা হাসি ফুটে উঠল তার। রাজকুমারী! এই পোড়ো জঙ্গল আর পানির এলাকার এক ছোটো ঝুপড়ি ঘরে বসে নিজের জীবনের সবচেয়ে বাজে সময়ের মুখোমুখি হয়ে ঝড় দেখতে দেখতে সে কি না নিজেকে যাই হোক, যেমনই হোক নিজের পরিচয় তো আর ফেলে দেওয়া যায় না। জন্ম তো হয়েছিল তার রাজকুমারী হিসেবেই। বাঙাল মুলুক থেকে হাজারো ক্রোশ দূরের এক দেশে রাজপরিবারেই জন্ম হয়েছিল তার। পাহার আর সমতলভূমির সঙ্গমস্থলে বিচিত্র আর শক্তিশালী রাজ্যের রাজপরিবারে, যারা এক সময় পাহাড় জঙ্গল আর সমভূমির পুরোটাই শাসন করত সুখ-শান্তির সাথে।
কিন্তু দুঃখের বিষয় হাজার বছরের পুরনো রাজ্যের সুখ-শান্তি কি না তার জীবদ্দশাতেই এসে শেষ হয়ে গেল। এটাকে সে কী বলবে নিজের দুর্ভাগ্য, রাজ্যের দুর্ভাগ্য, নাকি সময়ের দাবি? এক সময় বিষয়টা নিয়ে খুব ভাবত সে কিন্তু এখন আর সেটা নিয়ে খুব একটা ভাবে না। কী হবে সেই অতীত নিয়ে ভেবে যে অতীত অতীতের গর্ভেই হারিয়ে গেছে? যাই হোক, তার জন্মের পর সে আর দিনটা রাজকুমারীর মতোই বড়ো হয়ে উঠছিল। কিন্তু তাদের রাজ্যের কিছু কঠিন নিয়ম ছিল। এর ভেতরে অন্যতম একটা হলো, রাজপরিবার হোক আর সাধারণ পরিবার হোক কারও, জন্ম হলে তাকে কোনো একটা বিশেষ গোত্র কিংবা পেশার সাথে জড়িয়ে থাকতে হবে এবং ছোটোবেলা থেকে সে রাজপরিবারের সাথে থাকলেও তার জীবন ধারা পরিচালিত হবে সেই বিশেষ গোত্রের মতো করেই। তাদের রাজ্যে তিনটে মূল ভাগ ছিল। আর এই তিনটে মূল ভাগের মধ্যে একটা ছিল যারা জঙ্গলে বাস করত এবং জঙ্গলের পথ নিয়ন্ত্রণ করত; আরেকটা ছিল পাহাড়ি ভাগ, যেটা ছিল তাদের মায়েদের গোত্র; আরেকটা ছিল মূল রাজপরিবার যারা দুর্গে বাস করত। আর রাজ্যের পুরুষদের সাথে সাথে নারী যোদ্ধাদেরও একটা শ্রেণী ছিল, সে তার নিজের লোকদের মুখে শুনেছে এই নারী যোদ্ধাদের জন্ম হয়েছিল বহু বছর আগে এক যুদ্ধের সময়ে যখন পুরুষদের সাথে নারীরাও রাজ্য রক্ষার জন্যে যুদ্ধে মেতেছিল শক্তিশালী শত্রুর বিরুদ্ধে। সেই যুদ্ধের পর থেকে রাজ্যে নারী যোদ্ধাদেরও একটা গোত্র পরিচালিত হতে শুরু করে।
ছোটোবেলাতেই সিদ্ধান্ত হয় রাজকুমারী এই নারী যোদ্ধা গোত্রের সাথেই বড়ো হয়ে উঠবে। কাজেই রাজমহলে বড়ো হলেও একেবারে ছোটোবেলা থেকেই কঠিন প্রশিক্ষণ আর পরিশ্রমের মধ্যে দিয়ে বড়ো হয়ে উঠতে থাকে। সেই জীবনটা কঠিন হলেও কেন জানি আজো সেই জীবনটাকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে সে। এভাবেই একদিকে গোত্র প্রশিক্ষণ আর অন্যদিকে রাজপরিবারের শিক্ষায় বড়ো হয়ে উঠতে থাকে সে। কিন্তু গোলটা বাধে সে বড়ো হয়ে ওঠার পর। ছোটোবেলা থেকেই সে দেখে এসেছে তাদের রাজ্য সবদিক থেকে অত্যন্ত শক্তিশালী, সমন্বিত এবং পরিপূর্ণ। একদিকে রাজ্যের অবস্থানগত কারণে পথযাত্রীদের টোল আদায়ের মাধ্যমে প্রচুর অর্থ আয় হতো, সেই সাথে পাহাড়ি গোত্র ছিল চাষে পরিপূর্ণ, অন্যদিকে জঙ্গলের পথ নিয়ন্ত্রণকারী ছিল সবদিক থেকেই সামরিক শক্তিতে পরিপূর্ণ। কাজেই তাদের রাজ্যে কোনো সমস্যা ছিল না কখনোই। এছাড়াও তাদের রাজ্যে ছিল বিরাট এক দুর্গ যা সুরক্ষিত ছিল সবদিক থেকেই। সে পরিবারের সবার মুখে শুনেছে-হাজার দুই বছর আগে একবার তাদের রাজ্যে বাহির শত্রুর আক্রমণ ছাড়া আর কখনোই কিছু হয়নি।
কিন্তু একটা রাজ্য তো আর শুধু শক্তি আর অর্থনীতি দিয়ে টিকে থাকে না। টিকে থাকে মানুষ নিয়ে। সে কিংবা তার পরিবার জানত না-বহিঃস্থ শত্রু নয়, বরং তাদের রাজ্য ফাঁপা হয়ে উঠেছে ভেতরের দুর্জনদের কারণে। সে যখন কৈশোরে পদার্পণ করল তখন জানতে পারল: প্রকৃতপক্ষে কেন তাকে তার পরিবার নারী যোদ্ধা গোত্রের একজন সৈনিক হিসেবে গড়ে তুলেছে আর সব রাজ্যের রাজারা ছেলের জন্যে উতলা হয়ে থাকলেও, কেন তার বাপ নিজের চার ছেলে সন্তান থাকার পরও একটা মেয়ের জন্যে এতটা অস্থির হয়ে উঠেছিল! তাদের রাজ্যের এক গোপন রহস্য ছিল, যেটা তারা বহু বহু বছর ধরে অত্যন্ত সংগোপনে লালন করে এসেছে। শুধুমাত্র রাজ্যের খুবই গুটিকয় কর্তাব্যক্তি আর এই বিশেষ নারী যোদ্ধা গোত্রের একটা অংশ বাদে এই রহস্যের ব্যাপারে খুব বেশি মানুষ জানে না। যে- কারণে মূলত এই রহস্যকে আগলে রাখাই এই নারী গোত্রের মূল কাজ। আর এদের একজন হিসেবে নিজের পারিবারিক রহস্যকে লালন করে যাবার জন্যেই এই গোত্রের অংশ হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে তাকে। এই বিষয়টা এমনকি তার রাজ্যের ভেতরের মানুষও জানে না। কৈশোরে পদার্পণ করার পর বিষয়টা তাকে জানানো হয় এবং এই বিষয়ে তাকে সুশিক্ষিত করে তোলা হয় ধীরে ধীরে। কিন্তু এই বিষয়ে পুরোপুরি শিক্ষিত হয়ে ওঠার আগেই ঘটে যায় চূড়ান্ত বিপর্যয়। ভেঙে পড়ে তাদের রাজ্য, শাসন ব্যবস্থা এবং পুরো পরিবার।
একটা রাজ্য যে-কয়টা সম্ভাব্য পন্থায় ভেঙে পড়তে পারে কিংবা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে তার মধ্যে অন্যতম এবং ভয়ঙ্করতম হলো অন্তর্কোন্দল। আর তাদের রাজ্যের এই একই সমস্যা দেখা দিয়েছিল। তার বাবা সুশাসক হলেও ঠিক সেই অর্থে শক্ত মানুষ ছিল না। বলতে গেলে সে অনেকটা সুন্দরের চর্চা করা আমুদে ভালো মানুষ ছিল। আর নিজের ছেলেদেরকেও অনেকটা সেভাবেই গড়ে তুলছিল সে। একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল সে নিজে, এটাও ঘটেছিল মূলত তার মায়ের এবং নারী গোত্রের যোদ্ধাদের কারণে। যাই হোক, তার বাবা শাসক হিসেবে ভালো হলেও তার মধ্যে একদিকে দূরদর্শিতার অভাব তো ছিলই, সেই সাথে ছিল মানুষের প্রতি অন্ধ বিশ্বাস। আর এর সুযোগ নিয়েই তার পরিবারের ভেতরেই জন্ম নিচ্ছিল এক দানবের। তার নিজেরই চাচা।
আগেই বলা হয়েছে: তাদের রাজ্যে রাজা একজন থাকলেও মূল তিনটা ভাগ আছে এবং রাজপরিবার পুরো রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করলেও এই তিনটা ভাগ অনেকটা স্বতন্ত্রভাবেই নিজেদের কাজ পরিচালনা করে। কিন্তু প্রত্যেকভাগেই রাজপরিবার থেকে একজন প্রতিনিধি তো থাকে, এমনকি প্রতিভাগের সাথে অন্যভাগের পারিবারিক বন্ধনও তৈরি করা হয় তাদের ভেতরে বিয়ে দিয়ে। এতে করে রাজ্য শাসন চলে সুন্দরভাবে এবং বলতে গেলে সবার সাথে সুসম্পর্কও বজায় থাকে। অন্তত বিবাহের কারণে সবাই পরস্পরের সাথে আত্মীয়তার সম্বন্ধে আবদ্ধ হবার কারণে। এমনটাই চলে এসেছে তাদের রাজ্যের হাজার বছরের ইতিহাসে।
কিন্তু এই সাম্য ভেঙে যায় তার বাবার আমলে এসে। এর পেছনে কারণ ছিল তার চাচা। তার চাচা তার বাপের চেয়ে মাত্র এক বছরের ছোটো ছিল, সত্য কথা হলো—তার বাবা সবদিক থেকে মানুষ হিসেবে ভালো হলেও, তার চাচা ছিল ছোটোবেলা থেকেই অনেক বেশি যোগ্য শক্তিশালী এবং শক্ত প্রকৃতির। এই কারণেই তার চাচাকে জঙ্গলপথের গোত্রের সাথে জুড়ে দেওয়া হয় ছোটোবেলা থেকে। কারণ সামরিক দিকেই তার আগ্রহ ছিল। তার বাবার আমলে রাজ্য ভালোভাবেই শাসন হলেও, তার চাচা দিন দিন শক্তি বৃদ্ধি করে নিজের ভাইকে সরিয়ে দেয়ার পরিকল্পনা করছিল। ভেতরে ভেতরে নিজের ভাইকে সরিয়ে পুরো রাজ্য দখল করে রাজা হয়ে যাবার বাসনা দিন দিন বৃদ্ধি পেতেই থাকে তার। আর ছোটো এই বীজ একসময় মহীরুহে পরিণত হয়। একসময় সরাসরি সে তার ভাইয়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে বসে সে, দখল করে নেয় পুরো দুর্গ। একে তো সে যে গোত্রের সাথে বড়ো হয়ে উঠে সেটা সামরিক গোত্রই, অন্যদিকে তার শাসন ব্যবস্থায় সমস্ত সৈনিকেরা পরিচালিত হয়। তার ওপরে রাজ্যের একটা বড়ো অংশের প্রহরাও পরিচালিত হয় তার অধীনেই, তাই যখন সে সুযোগ বুঝে বিদ্রোহ ঘোষণা করে বসল, তার বাবার আসলে তেমন কিছু করার ছিল না সামান্য প্রতিরোধ করা ছাড়া। তবে তার বাপ নিজের ছোটো বাহিনী নিয়ে তাদের হাজার বছর ধরে লালন করে আসা রহস্য রক্ষা করতে বদ্ধপরিকর ছিল। আর তাই সেই আরাধ্য রহস্য সে তার কাছে গচ্ছিত রেখে রাজ্য প্রতিরোধ করে নারী বাহিনীর অল্পকিছু সদস্যসহ তাদেরকে দুর্গের গোপন পথ দিয়ে বের করে পালিয়ে যাবার সুযোগ করে দেয় কাছাকাছি বন্দরে। সেখানে আগে থেকেই একটা জাহাজ ছিল, সেটা দিয়ে মধ্য জলধারা পার হয়ে তারা চলে আসে উপমহাদেশের অন্যপ্রান্তে।
কিন্তু এলে কী হবে? বিপদ তাদের পিছু ছাড়ছিল না। এর পেছনে কারণও ছিল। তারা যখন মধ্য জলধারা পার হচ্ছে এমন সময় তার চাচা পুরো রাজ্য দখল করে নেয় এবং চারপাশে তাদের নামে হুলিয়া জারি করে অনেক স্বর্ণমুদ্রা পুরস্কারও ঘোষণা করে। কাজেই মধ্য জলধারা পার হলেও তারা অন্য যে বন্দরে পৌঁছায় সেখানে পৌঁছে ঠিক নিরাপদ বোধ করছিলা না। এমন সময় সেই বন্দরে তার সাথে পরিচয় হয় এক ভিনদেশির-সুবাদার অসলাম শেঠ। ঠিক তাদের মতো রাজপরিবার না হলেও বাঙাল মুলুকের বেশ সুশিক্ষিত এবং সমৃদ্ধ পরিবারের ছেলে। একদিকে যোদ্ধা, আরেকদিকে খানিকটা পাগল, আবার হৃদয়বান। কচিৎ এক ঘটনার মাধ্যমে তার পরিচয় হবার পর সে তাকে সব খুলেই বলে। শুধু সেই রহস্যের বিয়ষটা বাদে। সব শুনে আসলাম শেঠ তাকে সহায়তা করার আশ্বাস দেয়।
অনেক ঘাতপ্রতিঘাত পার হয়ে পারস্য দেশের সেই প্রান্ত থেকে তারা পৌঁছায় তুর্কির আরেক অঞ্চলে। সেখানেও বহু ঘটনার আর অঘটনার পর অবশেষে সবচেয়ে বুদ্ধিমানের মতো যা করার উপায় ছিল সেটাই করার চেষ্টা করে আসলাম শেঠ, তাকে নিয়ে রওনা দেয় নিজের দেশ বাঙাল মুলুকের উদ্দেশ্যে। তখন তাকে নিরাপদে রাখতে হলে ওটাই ছিল সর্বোত্তম পন্থা। সে কখনোই ভাবেনি এরকম ভিনদেশি এক পুরুষের সাথে তাকে সমুদ্রপথ পাড়ি দিয়ে ভিনদেশের পথে রওনা দিতে হবে নিজের জীবন বাঁচানোর জন্যে। কিন্তু তাই করতে হয়, প্রথম বিষয়টা তাকে ভেতরে ভেতরে একেবারে কুড়েকুড়ে খেত, কিন্তু সেই সমুদ্র যাত্রায় সেই বাঙাল মুলুকের হৃদয়বান মানুষটার প্রেমে পড়ে যায় সে। ভারতবর্ষের প্রথম বন্দরে পা রাখতেই বিয়ে করে তারা দুজনে, তারপরও আরও দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে তারা অবশেষে পৌঁছায় বাঙাল মুলুকে। পরিবারের একমাত্র ছেলেকে পেয়ে আসলাম শেঠের বাবা-মা যারপর নাই খুশি হয়েছিল, তার ওপরে ভিনদেশি বউ পেয়ে তাদের খুশি যেন বাধ মানছিল না। সে প্রথমে ভেবেছিল ভিনদেশ, ভিন্ন মানুষ হয়তো মতের মিল হবে না কিন্তু আসলাম শেঠের পরিবারের সাথে এতটাই ভালোভাবে মিশে যায় কখনও মনেই হতো না সে ভিন্ন দেশ ভিন্ন পরিবার থেকে এসেছ। ভিন্ন দেশে এসে আবারও নিজের আরেক নতুন পরিবার খুঁজে পায় সে। ধীরে ধীরে আসলাম শেঠ পরিবারের কর্তা হয়ে ওঠে, একে-একে মারা যায় তার বাবা মা। নিজের শাসন অঞ্চল আর রাজ্যের দিকে মনোযোগ দেয় সে। কিন্তু শান্তি যেন তার কপালে নেই। এবার বাঙাল মুলুকে দেখা দেয় দুর্যোগের ঘনঘটা।
বাঙাল মুলুকের ওপরে নজর পড়ে মোঘলদের। এই অঞ্চলে এমনিতেই কিছুটা স্বাধীনচেতা শাসকেরা বাস করত, সুবাদার আসলাম শেঠও তাদেরই একজন ছিল আর তাই মোঘলদের নজরে পড়ার পরও তারা নিজেদের সম্মান বজায় রেখে স্বাধীনতাই ঘোষণা করে বসে এবং নিজেদের নামে খুতবা চালু করে। আর এটার প্রভাব গিয়ে ঠেকে দিল্লিতে। লেগে যায় যুদ্ধ, যুদ্ধের পর পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়ে ওঠে একসময় তাদের ওপরেও নজর পড়ে শত্রুদের। এমন সময় নিজের পরিবারের প্রথা ভেঙে সে তার স্বামীকে জানিয়ে দেয় তার রহস্যের কথা, সেটা শুনে খুব উত্তেজিত হয়ে ওঠে সুবাদার। সে শলাপরামর্শ করে বাঙাল মুলুকের বারো ভূঁইয়াদের প্রধান ঈশা খাঁর সাথে। তার ঠিক পর দিকেই আক্রমণ হয় জঙ্গলমহালে। সুবাদার আসলাম শেঠ আসলে ঠিক বুঝতে পারেনি যে এত দ্রুত আক্রমণ হবে তাদের ওপরে। তারপর একসময় যখন সে বুঝতে পারে জঙ্গলমহাল পতনের দারপ্রান্তে, তখন নিজের সবচেয়ে বিশ্বস্ত বাহিনী প্রধানের সাথে তাদের নারী যোদ্ধাদের দলটাকে জঙ্গলমহাল থেকে পালিয়ে যাবার ব্যবস্থা করে দেয়। এরপর-বাকিটা ভাবতেই তার চোখ অশ্রুতে ভরে উঠল। নিজের মাতৃভুমি থেকে হাজারো ক্রোশ দূরে যে ভূমিতে নিজের আশ্রয় এবং ভালোবাসা খুঁজে পেয়েছিল সেটাও ধরে রাখতে পারল না সে। আগলে রাখতে পারল না নিজের ভালোবাসার মানুষটাকে। তবে নিজের দায়িত্ব এখন পর্যন্ত সে রাখতে পেরেছে, আগলে রেখেছে হাজার বছরের পুরনো সেই–’
‘বেগম সাহেবা মেহের, গোস্তাকি না নিলে ভিতরে আসব-’
মানুষটার কথা শুনে অশ্রু চোখেই হেসে ফেলল সে। রাজ্য চলে গেছে অথচ রাজকীয় আদব যায়নি। মানুষটা বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে ভিজছে কিন্তু তার অনুমতি না নিয়ে ঝুপড়ির ভেতরে আসতে চাচ্ছে না।
‘আসো, সুলতান। জলদি ভেতরো আসো,’ বলা মাত্রই ভেতরে প্রবেশ করল। সে এবং তার প্রধান রক্ষী রায়েলির দিকে একবার দেখে নিয়ে তার দিকে ফিরে একবার মাথা ঝাঁকিয়ে সম্মান প্রদর্শন করল। ‘বলো সুলতান, পরিস্থিতি কী?’ সুলতান ছিল আসলাম শেঠের সেনাবাহিনীর কনিষ্ঠতম সেনাপতিদের একজন। বলিষ্ঠ, সাহসী এবং তারুণ্যে ভরপুর ছেলেটার নেতৃত্বেই আসলাম শেঠ তাদেরকে পালিয়ে যাবার জন্যে ব্যবস্থা করেছিল আর এখন পর্যন্ত সুলতান সেই ভরসা খুব ভালোভাবেই রেখেছে। আর হ্যাঁ, অবশ্যই তার প্রধানরক্ষী এবং নারী যোদ্ধাদের প্রধান রায়েলিও আছে।
সুলতান ভেতরে প্রবেশ করতেই মেহের দেখতে পেল ছেলেটা একেবারে ভিজে চুপচুপে হয়ে আছে। তারমানে ওরা যেখানে আশ্রয় নিয়েছে সেই জায়গার অবস্থা ওদের এই ঝুপড়ির চেয়ে অনেক খারাপ। ব্যাপারটা মেহের আরও ভালোভাবে ধরতে পারল ছেলেটার লাল দুই চোখ দেখে। যদি সে শুধুমাত্র এখানে আসার সময়ে ভিজত তবে তার চোখদুটো লাল হতো না, এটা হয়েছে দীর্ঘক্ষণ ধরে ভেজার কারণে। জঙ্গলমহাল থেকে ওরা যারা পালাতে পেরেছিল তাদের সবার অবস্থাই যে একেবারে শেষ পর্যায়ে সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। জঙ্গলমহাল থেকে ওরা পালাতে পেরেছিল মোট নয়জন। এর ভেতরে ছিল সুবাদার অসলাম শেঠের স্ত্রী মেহের, তার সবচেয়ে কাছের মানুষ এবং তার নারী দলের প্রধান রায়েলি, আর রায়েলির সাথে আরও তিনজন নারী যোদ্ধা, যারা তার সাথে সেই পারস্য থেকে ভ্রমণ করে বাংলায় এসেছিল। আর সুলতান এবং তার সাথে আরও তিনজন। এই নয়জন মোট মানুষ, খুবই স্বল্প কিছু জিনিসপত্র এবং মেহেরের নিজের বড়ো একটা লোহার বাক্স। এই নয়জন থাকার পেছনে মূল কারণ ছিল, ওরা জঙ্গলমহালের গোপন পথে বের হয়ে যে সরু ছিপ নৌকাটায় করে পলিয়েছিল সেটাতে এরচেয়ে বেশি মানুষ ধরার কোনো উপায় ছিল না। এছাড়াও যত বেশি মানুষ হতো ধরা পড়ার সম্ভাবনাও বেড়ে যেত। ওরা জঙ্গলমহাল থেকে পালিয়েছে রাতের শেষ প্রহরে, জঙ্গলমহাল থেকে নৌকাটায় করে পালানোর সময়ে ভোরের আলোয় দেখতে পেয়েছে দাউ দাউ করে জ্বলছে জঙ্গলমহাল। কিন্তু খুব বেশি সময় আসলে আবেগি হবার সময় ছিল না। ওরা যেখান থেকে পালিয়েছে সেখান থেকে বড়ো নৌকায় করে পালাবার কোনো উপায় ছিল না। আর এই ছোটো নৌকায় করে উপায় ছিল না খুব বেশি দূরে যাবার, কাজেই ওরা যতটা দ্রুত পেরেছে সবাই হাত লাগিয়ে বৈঠা চালিয়েছে কারণ এটাই ছিল নৌকাটা নিয়ে দ্রুততম সময় সরে পড়ার একমাত্র উপায়। তবে সুবাদার আসলাম শেঠ বুদ্ধিমান মানুষ ছিল, কাজেই এরকম কিছু হতে পারে সে আগে থেকেই জানত এবং মেহেরদেরকে নির্দেশনাও দিয়েছিল সেই মতো। ওরা নৌকাটা নিয়ে জানপ্রাণে পালিয়ে যখন বুঝতে পেরেছে আপাতত বাহরাম খাঁর আয়ত্ত থেকে বেরোতে পেরেছে সাথে সাথে ওরা সুবাদার আসলামের পরিকল্পনা অনুসরণ করতে শুরু করে। ওখান থেকে তার প্রথমে পৌঁছায় একটা জেলেদের গ্রামে। ওখানে আগে থেকেই একটা মধ্যম আকারের নৌকা রাখা ছিল, যেটা মোটামুটি দূরত্ব পাড়ি দিতে সক্ষম। ওটাতে খাবার, প্রয়োজনীয় অস্ত্রসস্ত্রসহ আরও বিভিন্ন ধরনের প্রয়োজনীয় রসদও রাখা ছিল। সুবাদার আসলামের নির্দেশনা অনুযায়ী ওদের পরিকল্পনা ছিল দুটো। এক, ওরা ওখান থেকে বেরিয়ে হয় বমার নদী হয়ে হাওড়ে গিয়ে পড়বে এবং সেখান থেকে পূর্ব দিকে সরতে সরতে মোঘলদের চোখ ফাঁকি দিয়ে রসুল খাঁর এলাকায় যাবার চেষ্টা করবে। তবে সুবাদার আসলাম এটাও বলে দিয়েছিল যে এটা বাস্তবায়ন হবার সম্ভাবনা কম, কারণ মোঘলরাও জানে ওরা পালাতে চাইলে এটাই সহজ পথ, কাজেই ওদের নজর এদিকেই থাকবে সবচেয়ে বেশি। আর হয়ও সেটাই, ওদিক দিয়ে পালাতে গিয়ে ওরা গিয়ে পড়ে মোঘলদের টহলরত এক বাহিনীর সামনে, যদিও বেশ দূর থেকে ধাওয়া করাতে তারা ওদেরকে ধরতে পারেনি, কিন্তু ওটা থেকে পালাতে গিয়ে ওরা ঢুকে পড়ে জল-জঙ্গল এলাকার একেবারে গভীরে। এখানে এসে এক দ্বীপে আশ্রয় নিয়ে একদিন কাটানোর পরদিন যখন ওরা পূর্বে কাজ না হাওয়াতে পশ্চিমে রওনা হয়, কিন্তু কিছুদূরে এগানোর সাথে সাথে বুঝতে পারে ওদের পেছনে লেগেছে অন্তত তিনটে বড়ো বড়ো জালিয়া ও সুবেদারি। দূর থেকে জালিয়াগুলোর নিশানা দেখেই সুলতান ওদেরকে নিশ্চিত করে এগুলো বিশা ডাকাতের জালিয়া। ছোটো খালবিলে ওদেরকে ধাওয়া করে বেশি একটা সুবিধা করতে পারছে না ওরা। কিন্তু একবার খোলা পানিতে গিয়ে পড়লেই আর দেখতে হবে না, মুহূর্তের ভেতরে ধরে ফেলবে ওদেরকে। প্রায় দেড় দিনের মতো বিশা ডাকাতের বাহিনীর সাথে লুকোচুরি খেলে ওরা উলটো পথে আবারও ঢুকে পড়ে জল-জঙ্গলের আরও গভীরে তারপর পেরিয়ে গেছে একদিন। এখানেই মাঝিদের কয়েকটা ঝুপড়িতে আশ্রয় নিয়েছে ওরা। আজ রাতের শেষ প্রহরে জোয়ার আসামাত্র নৌকা ভাসানোর কথা ছিল কিন্তু তার আগেই শুরু হয় ঝড় বৃষ্টি।
মেহের অনুমতি দেওয়া মাত্রই পরিস্থিতি বয়ান করা শুরু করল, ‘বেগম সাহেবা, বৃষ্টির বেগ তো বাড়তেই আছে।’
‘তোমরা যে ঝুপড়িগুলাতে আশ্রয় নিছ, সেইগুলা তো খুব সুবিধার মনে অইতেছে না। তোমরা কি খাইতে পারছ?’
মেহেরের প্রশ্নের কোনো জবাব দিলো না সুলতান, সাথে সাথে বিয়ষটা বুকের ভেতরে খচ করে লাগল মেহেরের। এরমানে খাবার যা ছিল সাথে সেগুলো শেষ। তার মানে দুপুরের পর ওদের দলের কেউ ঠিকমতো খেতেও পারেনি। ‘সুলতান, আমার কাছে কিছু শুকনা খাবার আছে সেইগুলা তোমরা নিয়া যাইয়ো। নৌকা আর শত্রুর খবর কও দেখি,’ মেহেরের বাংলায় এখনও পারস্যের টান প্রকট।
‘বেগম সাহেবা,’ সুলতান তার দিকে চোখ তুলে তাকিয়ে আবার নামিয়ে নিলো। ‘নৌকার অবস্থা এখনও বেশি ভালো না, কাম শেষ করনের আগেই বেলা পইড়া গেল। তারপর তো বৃষ্টি আইয়া পড়ল,’ বিশা ডাকাতের তাড়া খেয়ে পালানোর সময়ে নৌকাটা আঘাত পেয়েছিল, সেটা মেরামত করাটাও এখানে থামার অন্যতম একটা কারণ।
‘নাও কি পানিতে নামানি যাইব?’ রায়েলি জানতে চাইল।
‘পানিতে হয়তো নামানি যাইব কিন্তু—’
যাই আছে সেইটা লইয়াই প্রস্তুত থাকতে কও সবাইরে,’ বলে সে বড়ো করে একবার দম নিলো সবচেয়ে বাজে খবরটা এখন জানতে হবে।
‘এইবার বলো মোঘলরা কিংবা বিশা ডাতাইতের বাহিনীর কোনো খোঁজ আছে কি না?’ মেহের দেখল সুলতান দ্বিধা করছে। তারমানে খবর ভালো না, তাই না?’
‘জি বেগম সাহেবা, শেষ বার যখন হেরা আমগোর পিছে লাগছিল এইখানে ঢুকুনের আগে আমি ভাবছিলাম হেগোরে খসানি গেছে, কিন্তু আদতে সেইটা হয় নাই। আসলে ওরা ঠিকই টের পাইছিল, অন্তত ধারণা করতে পারছিল আমরা কুনদিকে যাইতে পারি। অন্তত দুইটা বড়ো নাওরে আমরা দেখছি এই এলাকার অশেপাশে চক্কর কাটতে।’
‘বুঝতে পারছি ওরা ঝড়ের কারণে নাও ভিড়াইতে পারতাছে না,’ খুব শান্ত স্বরে কথা বলে উঠল। ‘শোনো, রায়েলির কাছ থেইকা খাবারগুলা নিয়া যাও। গিয়া সবাই ভাগ কইরা খাও, তারপর সব গুছায়া বিশ্রাম করার চেষ্টা করো, তবে,’ বলে সে একটা আঙুল তুলল প্রস্তুত অবস্থায়। যাতে যেকোনো সময় যেকোনো পরিস্থিতি সামলানি যায়। আর অন্তত দুইজন বাইরে পাহারায় রাখ। দেখি কী করা যায়।’
মেহের বুঝতে পারছে না ঝড়টা তাদের জন্যে আশীর্বাদ হিসেবে উপস্থিত হয়েছে নাকি অভিশাপ হিসেবে! কারণ এই ঝড়ের কারণে একদিকে ওরা আটকে গেছে, কষ্ট পাচ্ছে। আবার এটার কারণেই শত্রুরা ওদের ওপরে আক্রমণ করতে পারছে না। আবার অন্যদিকে এই ঝড় না থামলে ওরাও পালাতে পারবে না, আবার ঝড় থামলেই শত্রুরা আক্রমণ চালাবে। ও কি এটা থামার জন্যে প্রার্থনা করবে, নাকি চলতে থাকার জন্যে-ঠিক বুঝতে পারছে না। হঠাৎ করেই তার একটা কথা মনে পড়ল, তার স্বামী বিদায়ের ঠিক আগমুহূর্তে তাকে বলেছিল ঈশা খাঁ জানলে অবশ্যই সাহায্যের জন্যে লোক পাঠাবে। মনে মনে ভাবতে লাগল, কী করছেন খাঁ সাহেব?
***
মাসুমদের রসুল খাঁর এলাকায় পাঠানোর পরেই ঈশা খাঁ বারো ভূঁইয়াদের কয়েকজন এবং নিজের পরিষদদের নিয়ে জরুরি আলোচনা সভায় বসেছে। নিজের সভাসদ সরফরাজ, প্রধান উপদেষ্টা লতিফ খাঁ থেকে শুরু করে ভূঁইয়াদের ভেতরেও অনেকে উপস্থিত তার এই অস্থায়ী আস্তানাতে।
‘পরিস্থিতি বয়ান করো, নিজের দাড়িতে একবার হাত বুলিয়ে নিয়ে সে নিজের একান্ত সচিবকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠল ঈশা খাঁ।
হুজুর, কত্রাবো থেকে মোঘলেরা পিছু হটে গেছে, অন্যান্য এলাকাও ওরা ধইরা রাখতে পারবো না,’ সচিব কথা বলার সাথে সাথে সবাই ঈশা খাঁর দিকে তাকাল। স্বাভাবিকভাবেই এটা সুখবর, কিন্তু খাঁ সাহেবের মুখে কোনো হাসি ফুটে উঠল না, সে বরং চিন্তিত ভঙ্গিতে নিজের দাড়িতে হাত বুলাতে বুলাতে বলে উঠল, ‘এটা তো হওয়ারই ছিল। এই কারণেই তো ওই এলাকাগুলাতে বেশি একটা জোর লাগাই নাই আমরা। বরং বুঝতে চেষ্টা করতেছিলাম যে ওরা কতখানি শক্তি যোগাইতেছে,’ বলে সে চোখ তুলে তাকাল তার সভাসদদের দিকে। ‘এত তাড়াতাড়ি ওরা ছাইড়া দিবে আমি ভাবি নাই। আমি ভাবছিলাম ওরা অরো কিছুদিন বলদের মতন ধইরা রাখবে। কিন্তু সেইটা তো হইল না। অন্যান্য এলাকার কী অবস্থা বয়ান করো এবং মানসিংহের বাহিনীর কী অবস্থা সেইটাও জানতে অইব।’
‘হুজুর, ওইদিকে খারাপ খবর আছে একটা,’ খাঁ সাহেবের সচিব কিছু বলার আগেই আরেক সভাসদ বলে উঠল, ‘মানসিংহ এগারো সিন্ধু দখল কইরা নিছে আর সেই সাথে—’
‘বাকি মোঘল ফৌজগো লগে সে ওই এলাকায় জড়ো হওয়া শুরু করছে তাই না?’ ঈশা খাঁ চিন্তিত ভঙ্গিতে দাড়িতে হাত বুলাতে লাগল। তাকে এতটা চিন্তিত এর আগে কেউই দেখেনি কখনও। ‘এইটা পরিষ্কার যুদ্ধের এলান। আমগোরেও প্রস্তুত অইতে হবে,’ বলে সে নিজের সভাসদদের দিকে ফিরে বলে উঠল, ‘আমগো সব শেঠ, সুবাদার আর বারো ভূঁইয়াগো খবর পাঠায়ে দাও, সবাইরে ফৌজ প্ৰস্তুত করতে বলো। আর আমার নিজেরও অভিযানের প্রস্তুতি নিতে শুরু করো। যেকোনো সময় বাইর হওয়া লাগতে পারে।’
নিজের সভাসদদের সাথে জরুরি আলোচনা শেষ করে সমস্ত নির্দেশনা শেষ করে সে যখন মুক্ত হলো ততক্ষণে রাত অনেক গভীর, নিজের শোবার কামরায় যেতে যতে তার শুধু মনে হতে লাগল, একরকম বলতে গেলে যুদ্ধের ঘোষণা হয়ে গেছে। যেকোনো সময় সেইটা হয় দাপ্তরিক রূপ পাবে আর হয় শুরু হয়ে যাবে। সবাইকে নিজেদের ফৌজ প্রস্তুত করতে বললেও সে জানে মোঘল বাহিনী কিংবা মানসিংহের সাথে লড়াই করার জন্যে তার ফৌজ মোটেই যথেষ্ট নয়। এই শক্তি মোঘলগোর সামনে স্রেফ হাওয়ায় উড়ে যাবে। এরজন্যে তার অতিরিক্ত শক্তির দরকার। বা প্রয়োজন কোনো একটা দৈবক্রম। মাসুম, তুমি আছ কোথায়? মনে মনে বিড়বিড় করে বলে উঠল সে।
***
মেহেরের লোকেরা যখন বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে শুকনো খাবার চিবুচ্ছে মাসুম, বরখা, ধোবল আর নুক্কুন তখন নিজেদের পোশাক পরিচ্ছদ সব ভালোভাবে শরীরের সাথে পেঁচিয়ে নিয়ে, অস্ত্রগুলো শরীরের সাথে বেঁধে নিয়ে উথাল-পাথাল কালো পানির দিকে তাকিয়ে আছে।
মাসুম পানিরই মানুষ এবং জল-কাদা খাল বিল নদীর সাথে তার আত্মার সম্পর্ক কিন্তু তারপরও এই ভয়ঙ্কর ঝড়ের ভেতরে অন্ধকার কালো পানির দিকে তাকিয়ে তারও বুক ভয়ে কেঁপে উঠছে। সে বরকত আর তার লোকদের দিকে ফিরে তাকাতেই বরকত আনমনেই মাথা নেড়ে মানা করল।
মাসুমও মাথা নেড়ে সায় জানাল। সে জানে কেন বরকত তাকে মানা করছে। একে তো গভীর রাতের সময়, তার ওপরে তুমুল ঝড় হচ্ছে সেই সাথে পানিতে জোয়ার আসার প্রস্তুতি সবমিলিয়ে সবচেয়ে সেরা সাঁতারুর জন্যেও এই পানি খুব এটা উপযুক্ত না, তবে এইগুলার কোনোটাই বড়ো ধরনের ঝুঁকি না, সবচেয়ে বড়ো ঝুঁকি হলো পানিতে বিভিন্ন ধরনের গাছের কাণ্ড, টুকরো টুকরো অংশ ভেসে যাচ্ছে ক্রমাগত। একবার এগুলোর কোনোটার সাথে লাগলে আর দেখতে হবে না। তার ওপরে আছে অন্ধকারে দিক হারিয়ে ফেলার ভয়। কিন্তু মাসুম বুঝতে পারছে এমনিতে ওরা পিছিয়ে আছে। যদি কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে চায় তবে, পিছিয়ে থাকার সময় নেই, তার ওপরে আরেকটা ঝুঁকি আছে। সেটা হলো ওদেরকে নামিয়ে দিয়ে বরকতকে ফিরে যেতে হবে সময়মতো, তা না হলে ওরা বরকতকেও ঝুঁকিতে ফেলে দিবে আরও বেশি, ইতিমধ্যেই সে যথেষ্ট ঝুঁকি নিয়েছে। মাসুম পানির দিকে তাকিয়ে আনমনেই একবার ঢোক গিলে ধোবল আর বরখাকে দেখল, ওরাও ভয় পাচ্ছে কিন্তু মাসুম অবাক হচ্ছে নুক্কুনকে দেখে। নিজের নোংরা দাঁত বের করে পানির দিকে তাকিয়ে সে এমনভাবে হাসছে যেন কোনো শিকারি নিজের শিকারকে দেখছে। মাসুম তার দিকে তাকাতেই সে কথা বলে উঠল। ‘হুজুর, বুঝতাছি আপনেরা ডরাইতাছেন, কিন্তু আমার ডরানি সাজে না, আমার পরিবার এই এলাকাতে কোনোহানে বিপদে আছে, তাগো জন্যে আমার বিপদ কিছুই না, বলে মাসুমের দিকে একবার তাকিয়ে পিচ্ছিল পাটাতনের ওপর দিয়ে সে রীতিমতো দৌড় দিলো, তারপর নৌকার কিনারায় পৌঁছায়ে লাফিয়ে হারিয়ে গেল কালো পানির ভেতরে।
মাসুম ধোবল আর বরখার দিকে তাকিয়ে, একবার মাথা নেড়ে বিড়বিড় করে বলে উঠল, ‘আর ডরায়া লাভ নাই,’ বলে সে দৌড় দিলো। কয়েক ধাপ গিয়েই সাঁতারুর মতো দুই হাত তুলে, থুতনিটাকে বুকের সাথে ঠেকিয়ে সোজা ঝাঁপ দিলো পানিতে, মনে মনে একটাই প্রার্থনা: ভাসমান কোনো গাছের গুঁড়ি কিংবা ডালের সাথে বাড়ি না খেলেই হয়।
