অধ্যায় একুশ
সময়: ১৫৯৬ খ্রিস্টাব্দ
জল-জঙ্গল এলাকা
মাসুম পানিতে লাফটা দিয়েছিল একেবারে দক্ষ সাঁতারুর মতো, মনে মনে আশা করেছিল-কপাল ভালো হলে হয়তো ঠিকমতো পানিতে নামতে তো পারবে, যদি কোনো মোটা ডাল বা গাছের গুঁড়ির সাথে বাড়ি না খায়। কিন্তু যত দক্ষতার সাথেই সে লাফ দিক না কেন, ঝড়-বৃষ্টি আর বাতাসের বেগে শরীর এমনভাবে তালগোল পাকিয়ে গেল আর পানিতে শরীরটা এমনভাবে নেমে এলো যে পানির বাড়িতেই ওর মনে হলো বুকের ভেতরে আগুন লেগে গেছে। পানিতে নামতেই কয়েক ডুব দিয়ে মাথা তুলল পানির ওপরে। সাথে সাথে দেখতে পেল কালো কিছু একটা ধেয়ে আসছে ওর দিকে। মুহূর্তের জন্যে ওর কাছে মনে হলো কুমির। ঘড়িয়ালের সাথে লড়াইয়ের স্মৃতি এখনও একেবারে তাজা। কিন্তু পলকের জন্যে বুঝতে পারল ওটা আসলে একটা গাছের গুঁড়ি, তবে এটাও কম ভয়ঙ্কর নয়, লাগলে মাথা ছাতু হয়ে যাবে।
পলকের ব্যবধানে মাসুম অনুধাবন করতে পারল ডানে কিংবা বাঁয়ে সরার মতো সময় নেই। শরীরটাকে আবারও বাঁকিয়ে নিচের দিকে ডুব মারল। কিন্তু গুঁড়িটা পুরোপুরি এড়িয়ে যেতে পারল না। ডুব দিলেও কাঁধের কাছটায় ভীষণ বেগে বাড়ি মারল ওটা। ডুবন্ত অবস্থাতেও মুখ দিয়ে তীব্র চিৎকার বেরিয়ে গেল। পানির নিচে তো আর চিৎকার বের হলো না বরং বুদ্বুদের সাথে সাথে ফুসফুস থেকে সব বাতাস বেরিয়ে গেল। খাবি খেতে খেতে কোনোরকমে পানির ওপরে মাথা তুলে দম নিতে লাগল ও। সামনে এগোনো তো দূরে থাক স্রেফ ভেসে থাকতেই জান বের হয়ে যাচ্ছে, তবে সামনে এগোতে হবে। কারণ স্রোতের বেগ এত বেশি, সামনে এগোনোর চেষ্টা না করলে স্রোতে স্রেফ আরও দূরে সরিয়ে নিয়ে যাবে। যত বেশি দূরে সরবে তত বেশি জীবনের ঝুঁকি বাড়তে থাকবে। শরীরটাকে যতটা সম্ভব স্থির করে কিছুক্ষণ দম নিলো মাসুম। আশপাশে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করল বাকিদের কী অবস্থা। কিন্তু কাউকেই দেখতে পেল না ঠিকমতো। এখন অন্যদের চিন্তা করে লাভ নেই, কারণ কাউকে সাহায্য তো করতে পারবে না। মাসুম স্রোতের বেগ ঠেলে কিছুক্ষণ এগোনোর চেষ্টা করেও খুব বেশি এগোতে পারল না। এ-ক্ষেত্রে কী করতে হবে সেটাও সে ভালোভাবেই জানে। এরকম পরিস্থিতি ওর জন্যে নতুন না। সাঁতার বাদ দিয়ে পানির ওপরে মাথা তুলে দম নিলো বুক ভরে, তারপর ডুব দিলো পানিতে। সেই সাথে শরীর বাঁকিয়ে যতটা সম্ভব তিরের মতো করে ফেলল নিজের হাতদুটো তারপর ডুব সাঁতার দিয়ে এগোতে লাগল। এটা বহু পুরনো একটা টেকনিক। অতিরিক্ত স্রোতের ভেতরে শুধু সাঁতারের চেয়ে ডুব সাঁতার অনেকসময় বেশি কাজে লাগে। তবে এক্ষেত্রে অনেক দক্ষ সাঁতারু হতে হয়, আর মাসুমের সেই বিষয়ে কোনো সমস্যা নেই।
যদিও খুব ধীর গতিতে তাও একটু একটু করে ডুব সাঁতার দিয়ে সামান্য করে এগোতে এগোতে যখন মনে হতে লাগল এ-জীবনে আর বোধহয় তীরে পৌঁছাতে পারবে না অবশেষে পায়ের নিচে মাটি ঠেকল। কোনোমতে হাঁচড়ে-পাঁচড়ে জলকাদা ঠেলে তীরে এসে এলিয়ে পড়ল ও। মনে মনে আরেকবার ধন্যবাদ দিলো স্রষ্টাকে। আসলে বেঁচে থাকার চেয়ে বড়ো আনন্দ আর কিছুতে হতে পারে না। বড়ো বড়ো করে স্রেফ দম নিলো কিছুক্ষণ।
‘মাসুম?’ কণ্ঠস্বরটা পরিচিত ঠেকলেও ওটা যে ধোবলের গলা সেটা বুঝে উঠতে বেশ কিছুক্ষণ সময় লাগল ওর। কথা বলার চেষ্টা করেও কয়েকবার মুখ খুলে কথা বলতে পারল না মাসুম। হাত নেড়ে বুঝিয়ে দিলো, ও ঠিক আছে। আরেকটু দম পেয়ে জানতে চাইল, ‘তুই ঠিক আছিস, ধোবল? বাকিরা কই?’
‘আমি, ঠিক আছি, নুক্কুন আছে আমার সাথে। কিন্তু বরখা—’
মাসুম মুখ তুলে দেখল কোমর পানিতে একটা মূর্তি ওর মতোই হাঁচড়ে-পাঁচড়ে উঠে আসছে। ‘ওটা বরখা না হয়েই যায় না—’ স্বস্তির সাথে হাত নেড়ে আবারও দম নিতে লাগল ও এলিয়ে পড়ে।
ঝড়-বৃষ্টির কোনো কমতি নেই। বেগ যেন বেড়েই চলেছে। খানিকটা দম ফিরে পেতেই মাসুম বাকিদের উদ্দেশ্য করে বলে উঠল, ‘এইখান থেইকা সরতে অইব। এইভাবে বেশিক্ষণ থাকলে পাগল হইয়া যাইতে অইব,’ বলে মাসুম নিজে সোজা হয়ে উঠে দাঁড়াল। ধোবল আর নুক্কুনও সোজা হয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে, বরখা এখনও এলিয়ে আছে মাটিতেই। কাঁধ ডলতে ডলতে মাসুম নুক্কুনের কাছে জানতে চাইল, ‘নুক্কুন, তুই কি এই এই এলাকা চিনিস? ‘ কাঁধে ব্যথা পেলেও খুব বেশি খারাপ অবস্থা না এখনও, মাসুম কাঁধ পরীক্ষা করে এবার হিসেব করতে বসল, অস্ত্র আর অন্যান্য জিনিস যা যা নিয়ে এসেছিল সাথে করে সেগুলোর কয়টা রক্ষা পেয়েছে।
‘ওস্তাদ, এইখানে আমি আগে আসি নাই, তবে এইসব দ্বীপগুলার বেশিরভাগগুলাতেই মাঝামাঝি উঁচা জায়গায় বাড়িঘর থাকে। আর না অইলে মাঝি বা জেলেগো ঝুপড়ি থাকেই, সেইখানে আমরা আশ্রয় নিতে পারবো, আর যদি না পাই—’
মাসুম বরখার দিকে তাকিয়ে ধোবলকে ইশারা করল, ‘ওরে তোল,’ বলে সে নিজের অস্ত্র পরীক্ষা করতে গিয়ে আবিষ্কার করল ওর মানচিত্রটা আছে, ড্যাগারটাও আছে, সাথে আনা ধনুকটাও আছে। তিরও কয়েকটা আছে, বর্শা আর তলোয়ার দুটোই গেছে। আফসোসের সাথে মাথা নাড়ল। ধোবল বরখাকে টেনে নিয়ে এসেছে। মাসুম আকাশের দিকে তাকিয়ে ইশারা করল, ‘জলদি আশ্রয় খুঁজতে অইবে। তগো অস্ত্রসস্ত্রের কী অবস্থা-’
সে প্রশ্নটা শেষ করতে পারল না, তার আগেই ওদের পাশ থেকে নুক্কুনের আঁতকে ওঠার শব্দ পেল। হুজুর, আপনেরা কিছু শুনছেন?’
মাসুম একবার বরখা আরেকবার ধোবলের দিকে দেখে নিয়ে ফিরে তাকাল নুক্কুনের দিকে। ‘কীসের শব্দ? এই ঝড়ের ভিতরে তুই কীসের শব্দ শুনলি, গাছ টাছ পড়ছে মনে হয়।’
‘না, না। আমি পরিষ্কার শুনলাম-’ বলেই সে আবারও থেমে গেল।
মাসুম কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল তার আগেই আবারও সে ওকে ইশারায় চুপ থাকতে বলল।
মাসুম, এইবার আমিও কিছু একটা শুনলাম,’ বলেই চট করে নিজের তলোয়ারটা বের করে আনল বরখা। ওর দেখাদেখি সতর্ক হয়ে উঠেছে ধোবলও।
বরখা যেহেতু শুনেছে তবে একেবারে ফেলে দেওয়া যায় না। মাসুম আলতো করে কাঁধ থেকে ধনুকটা নামিয়ে আনল। ‘কিন্তু আমি তো—’
সে কথা শেষ করার আগেই পরিষ্কার শুনতে পেল খসখস শব্দ শুধু একদিকে না, ওদের চারপাশ থেকেও আসছে, অন্তত দুইদিকে তো বটেই। বাকিদের সাবধান করার আগেই অন্ধকারের ভেতর থেকে কিছু একটা উড়ে এসে খট করে লাগল ওর ধনুকে, সাথে সাথে হাত থেকে ছুটে গেল ওটা। ছুরিটা বের করার জন্যে হাত দিয়ে ওটার হাতল চেপে ধরেও থেমে গেল মাসুম একদল অস্ত্রধারী ঘিরে ধরেছে ওদেরকে চারপাশ থেকে।
‘এরা আইল কই থেকে?’ কথাটা নুরুন বলে উঠল। কিন্তু মাসুম আফসোসের সাথে মাথা নাড়ল, যেখান থেকেই আসুক না কেন জেনে আর লাভ কী? বন্দি তো হয়েই গেছে।
***
তীব্র ঝড়-বৃষ্টি যেন তার গায়ে লাগছেই না। নিজের বিরাট জাহাজের মতো সওদাগরি নাওয়ের পাটাতনের ওপরে দাঁড়িয়ে হাতের বিরাট লাঠিটা দিয়ে একটু পর পর পাটাতনে বাড়ি মারছে সে। আর অন্য হাতের মুঠোর ভেতরে বিশেষ কায়দায় ধরে থাকা আগুন দেওয়া প্যাঁচানো পাতার দড়ি মুখে লাগিয়ে টান মারছে সে। মাথার কালো পাগড়িটা ভিজে চুপচুপে হয়ে গেছে। কপালে লাল তিলকটাও গলে গড়িয়ে পড়ছে মুখের ওপরে। সেই সাথে ভিজে নিচের দিকে নেমে গেছে গোঁফের চোখা অংশ কিন্তু তার কোনো বিকার নেই, টকটকে লাল চোখে নেই কোনো শান্তির পরশ। ততক্ষণ পর্যন্ত হবেও না যতক্ষণ পর্যন্ত শিকারকে সে নিজের হাতের মুঠোয় আনতে পারছে।
ব্রহ্মপুত্র আর শীতলক্ষ্যা এলাকার সবচেয়ে ভয়ঙ্কর আর হিংস্র ডাকাত বিশা সওদাগরের থেকে খানিকটা পেছনে দাঁড়িয়ে আছে তার দুই সহযোগী। যেহেতু তাদের সর্দার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে কাজেই চাইলেও তারা নাওয়ের আচ্ছাদনের ভেতরে আরামে বসে থাকতে পারে না। সর্দারকে তাদের জরুরি কিছু কথা বলার প্রয়োজন কিন্তু সাহসের অভাবে সেটা বলতে পারছে না। তবে সর্দারের এই অস্থিরতা তারা খুব ভালোভাবেই অনুধাবন করতে পারছে। যে-লোকের হাত থেকে কখনোই কোনো শিকার হাতছাড়া হয়ে যেতে দেখেনি, সেই লোকের হাত থেকে যদি তার সবচেয়ে আরাধ্য শিকারটা বারবার হাতছাড়া হয়ে যায়-তবে তো ক্রোধে অস্থির হয়ে উঠবেই।
বিশা সওদাগরের প্রকৃত নাম আসলে বিশাও নয়, আর সওদাগর তো অবশ্যই নয়। এই দুটো নামই সে নিজে দিয়েছে ডাকাতি শুরু করার পর। নিজের প্রকৃত নাম সে জানতই না, আর জানলেও সেটা এত আগে নিজের জীবন থেকে দূর করে দিয়েছে সে যে ওটা আর তার মনে আছে কি না সন্দেহ আছে। অন্ধকার পল্লীতে জন্ম নেওয়া বিশার পারিবারিক কোনো পরিচয় কখনোই ছিল না, নেইও। জীবনের বহু ঘাতপ্রতিঘাত পেরিয়ে নিজের ভয়ঙ্কর সাহস, ভয়াবহ নিষ্ঠুরতা আর হিংস্রতা দিয়ে সে পুরো এলাকায় নিজের ত্রাসের রজত্ব কায়েম করেছে। তার ব্যাপারে বলা হয়ে থাকে তাকে নাকি পুরো এলাকার প্রতিটা মাছও ভয় পায়। আর পাবে নাই-বা কেন। সে হলো এমন এক ডাকাত যে জল এবং ডাঙা দুই জায়গাতেই সমানভাবে ডাকাতি করতে সক্ষম। তার উপর, তার রয়েছে সবচেয়ে শক্তিশালী লাঠিয়াল বাহিনী আর দক্ষ জল ডাকাতের দল। পুরো এলাকার যেকোনো জায়গায় যেকোনো সময় সে হানা দিতে পারে নিজের দ্রুতগতির জালিয়া নিয়ে। শুধু তাই না, বড়ো নাও নিয়ে তো বটেই ছোটো ছোটো কোষা আর ছিপ নৌকা চালানো এবং সেগুলো দিয়ে আক্রমণ করতেও সমান দক্ষ তার বাহিনী।
বিগত পাঁচ বছরে শুধুমাত্র আসলাম শেঠ বাদে কাউকেই সে পরোয়া করেনি, দিনের-পর-দিন একের-পর-এক সওদাগরি নাও থেকে শুরু করে মেঘালদের ব্যবসায়ী, কাউকেই ছাড়েনি তার লুটেরা দল। তার নিয়ম একটাই, কোনো নৌকার পিছনে সে একবার লাগলে সেটাকে লুট না করা পর্যন্ত তার কোনো স্বস্তি নেই। আর লুট করার পর প্রতিটি পুরুষকে হত্যা করা এবং প্রতিটা নারীকে ধর্ষণ করার পর দাসী হিসেবে বিক্রি করে দেওয়া তার সবচেয়ে নিষ্ঠুর কার্যক্রমগুলোর মধ্যে অন্যতম। তার ব্যাপারে আরও বলা হয়: অত্র এলাকার প্রায় সব জায়গাতে তার একাধিক ঘাঁটি আছে, রাজা থেকে শুরু করে প্রজা, সব জায়গাতে তার চর আছে। পুরো জল-জঙ্গল এলাকায় একটা মাছ লেজ নাড়ালেও সে জানতে পারে।
কাজেই এহেন বিশা সওদাগর যখন জানতে পারল জঙ্গলমহালের পতনের পর তার প্রধান এবং এক নম্বর শত্রু আসলাম শেঠের স্ত্রী কিছু লোক নিয়ে জল-জঙ্গলের ভেতরে পালিয়ে গেছে তখন তো সে প্রতিশোধ নিতে উদ্যোগী হবেই। সেই সাথে ব্যাপারটাতে আরও মাখন লেগেছে যখন সে জানতে পেরেছে ওদের সাথে আছে বিপুল পরিমাণ সম্পদ এবং মোঘলরা আবার তাদের মাথার ওপরে পুরস্কারও ঘোষণা করেছে। এমন অবস্থায় সে নিজের সর্বোচ্চ শক্তি নিয়োগ করে লেগেছে ওদের পেছনে। কিন্তু এদের পিছে লাগার পর থেকে কপাল যেন আর ফিরছেই না। প্রথমেই এদের পিছে লাগার সাথে সাথে মোঘলদের সাথে একবার টক্কর লেগেছে। তারপর বহু কাঠ খড় পুড়িয়ে যখন আবার বের করতে পারল তখন পিছু নিতে গিয়ে হারিয়ে ফেলল। এরপর থেকে একটা বড়ো জালিয়া আর দুটো সওদাগরি নিয়ে পুরো এলাকা চষে ফেলার পরে যখন ওদের সন্ধান বের করতে পারল শুরু হলো তুমুল ঝড়। একদিকে ঝড় থামার অপেক্ষা করতে হবে অন্যদিকে ঝড় থামার কোনো নাম গন্ধও নেই। তাই অস্থির হয়ে উঠেছে বিশা।
সর্দার,’ তার পেছন থেকে নিজের দলের দুই প্রধানের একজন বলে উঠল। ‘বিয়ানের আগে কিছু করণ যাইব বইলা মনে অয় না,’ কথাটা ভয়ে ভয়ে বললেও সে জানে এটা যুক্তির কথা আর সর্দার বিশা যতই খারাপ আর হিংস্র হোক না কেন, যুক্তি না মানার মতো লোক নয় সে।
আর তার ধারণাকে সত্যি প্রমাণ করে দিয়ে ডাকাত সর্দার বিশা দ্বীপের মতো গ্রামটার দিকে তাকিয়ে থেকেই সম্মতিসুচক মাথা নাড়ল। তবে সাথে এটা যোগ করতেও ভুলল না। ‘ছিপ আর কোষাগুলা সব প্রস্তুত রাখতে কও সবাইরে, লগে অস্ত্রসস্ত্র। বিয়ান অইতেই আমরা দ্বীপে হানা দিমু। আর হ্যাঁ, শকুনের নজর রাখতে কও দ্বীপের উপরে যাতে একটা পক্ষীও পলাইতে না পারে।’
তার দুই প্রধান সহযোগীই স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। সর্দারের আরও কোনো নির্দেশনা আছে কি না জিজ্ঞেস করতে যাবে তার আগেই পেছনে ধুপধাপ শব্দ শোনা যেতে তিনজনেই ফিরে তাকাল সেদিকে। ওদেরই এক সাগরেদ দৌড়ে আসছে।
‘সর্দার, সর্দার, নতুন খবর আছে, নতুন খবর আছে,’ লোকটা জোরে জারে বলে উঠল।
‘ওই মাতারির পো, খবরটা কী সেইটা বল,’ বিশালদেহী বিশা দুই পা এগিয়ে এসে পা দিয়ে জোরে ঠুকে দিতেই পুরনো নাওয়ের পাটাতন কেঁপে উঠল। তাকে দেখে সাথে সাথে মুখ-চোখের জল শুকিয়ে গেল তিনজনেরই। যে-দৌড়ে এসেছে সে কোনোমতে বলে উঠল। ‘হুজুর, এলাকাতে মোঘলগোর জাহাজ দেখা গেছে একটা।’
‘চক্কর দিতাছিল? এই ঝড়ের রাইতে!’ কথাটা শুনে বেশ অবাক হয়েছে বিশা সওদাগর।
‘না, হুজুর, স্রেফ একবার দেখছে আমগো একজন, ওইদিকে আগায়া গিয়া তারপর আবার ফিরা গেল,’ বলে সে দ্বীপের দিকে দেখাল।
‘খালি এই?’ চোখ সরু হয়ে গেছে বিশার। ‘এই সবাই মন দিয়া শোন আমি কী কই।’
***
‘এই তোমরা কারা?’ অস্ত্রধারী লোকগুলোর ভেতরে সর্বাগ্রে থাকা লোকটা জানতে চাইল। মাসুম দেখল সে হাঁটু গেঁড়ে বসে একটা তির তাক করে রেখেছে ওদের দিকে। লোকটার অবয়ব বেশ শক্তিশালী হলেও তার গলার স্বর শুনে খানিকটা অবাকই হলো মাসুম। কণ্ঠস্বরের মালিকের বয়স খুব বেশি না।
নিজের দুই হাত শরীরের দুপাশে তুলতে তুলতে মাসুম চারপাশে তাকিয়ে দেখল একবার, ওদেরকে ঘিরে ধরেছে অন্তত ছয়-সাতজনের একটা দল। এদের ভিতরে তিনজনের পোশাক এক রকম অন্য তিনজনের পোশাক আবার আলাদা। মনে মনে একবার হিসাব করে নিলো মাসুম। এরা কেউই এই দ্বীপের লোক না। এরা মোঘল অবশ্যই না। হয় এরা কোনো ডাকাত দলের আর না হয়
‘আস্তে, এমনে অস্ত্র ধইরো না, ঘড় বৃষ্টির ভিতরে একটা তির ছুইটা গেলে সবারই ক্ষতি,’ নিজের একেবারে মান্ত গলা শুনে সে নিজেই বেশ খানিকটা অবাক হয়ে গেছে। ‘তোমরা কারা?’
‘এই, কথা কানে গেল না, আগে নিজেগো পরিচয় দাও,’ ছেলেটা ধমকে উঠল, তাকে দেখে মোটেই স্বস্তি পাচ্ছে না মাসুম। দেখেই বোঝা যায় এরা বেশ ভয়ে আছে। আর ভয়ে থাকলে মানুষ সবচেয়ে বেশি অস্থির হয়ে ওঠে আর এমতাবস্থায় অস্ত্র ধরা থাকলে সমূহ বিপদ। কাজেই কোনো ঝুঁকি নেওয়া যাবে না। ‘আমার নাম মাসুম খাঁ কাবুলি। আমি ভূঁইয়া প্রধান ঈশা খাঁর লোক। এইখানে সুবাদার আসলাম শেঠের স্ত্রীর সন্ধানে আসছি,’ বাজিটা সঠিক ধরল কি না ঠিক বুঝতে পারছে না মাসুম। ভুল হয়ে গেলে বিপদ, অবশ্য এমনিতেও কম বিপদে নেই ওরা।
ছেলেটা কিছু বলার আগে তার পাশ থেকে অস্ত্র ধরে রাখা আরেকজন এগিয়ে এলো। ‘এই সবাই অস্ত্র নামাও,’ বলে সে পেছন ফিরে ইশারা করল। মাসুম অনুমান করল সে অস্ত্র নামাতে বললেও ওদেরকে সাবধান থাকার ইশারা করল পেছন ফিরে। ওরা পরিচয় দিয়েছে কিন্তু সেটা সঠিক কি না যাচাই করার উপায় নেই, সেজন্যেই এই সাবধানতা। তার জায়গায় মাসুম হলেও তাই করত। কথাটা মনে আসতেই খানিকটা স্বস্তি বোধ করল মাসুম কিন্তু সাথে সাথে কণ্ঠস্বরটা মনে পড়তেই বেশ চমকে উঠল সে।
মানুষটা এগিয়ে এসে ওর সামনে দাঁড়িয়ে আবারও বলে উঠল, ‘মাসুম কাবুলি? ঈশা খাঁর পাঠানো লোক? আপনে মিথ্যা বলতাছেন কি না বুঝব ক্যামনে?’
‘তুমি মেয়ে মানুষ?’ মাসুম ভ্রু কুঁচকে বলে উঠল। সে পাশে তাকিয়ে দেখল ধোবল বরখা আর নুক্কুনও অবাক হয়ে গেছে। এরকম ঝড়ের রাতে এরকম অন্ধকার দ্বীপে কি না নারী যোদ্ধাদের দলের মুখোমুখি হতে হয়েছে ওদের। তবে পরমুহূর্তে আসলাম শেঠের স্ত্রীর ইতিহাস এবং তার বিশেষ বাহিনীর কথা মনে পড়ে গেল মাসুমের। সাথে সাথে নিশ্চিত হলো সে জায়গামতো পৌঁছে গেছে।
যাক পাইলাম তুমগোরে, সুবাদার সাহেবের স্ত্রী কই?’ মাসুম খুশি খুশি গলায় জানতে চাইল।
‘কথার উত্তর দেও আগে, তোমরা ঈশা খাঁর লোক বুঝব ক্যামনে? তোমরা ডাকাইত না সেইটা বা নিশ্চিত করবো ক্যামনে?’ মেয়েটার গলায় অদ্ভুত এক টান। সেই টানে বাংলা কথা খুব অদ্ভুত শোনায়। মাসুম ভারতবর্ষের বহু জায়গাতে ভ্রমণ করেছে, বহু রকমের ভাষা-উপভাষা শুনেছে কিন্তু এরকম কখনও শোনেনি।
‘নিশ্চিত করার উপায় নাই,’ মাসুম নিজের অস্ত্র পুরোপুরি নামিয়ে নিয়ে সোজা হয়ে বলে উঠল। ‘কিন্তু আমরা তুমগোরে সাহায্য করতেই আসছি। আমগোরে জলদি সুবাদার পত্নীর কাছে নিয়া চলো।’
মেয়েটা এখনও তাকিয়ে আছে ওর দিকে, মাসুম দেখল বড়ো বড়ো একজোড়া চোখ, তাতে সন্দেহ আর অবিশ্বাস, তবে সবচেয়ে বড়ো কথা তাতে যেন খানিকটা অসহায়ত্বের ছায়া। সে একবার পেছন ফিরে সেই ছেলেটার দিকে তাকাল। ছেলেটা দুইপাশে মাথা নেড়ে মানা করছে। কিন্তু সে ওর দিকে ফিরে বলে উঠল, ‘তুমি কি সুবাদারকে চিনতা?’
‘খুব বেশি জানা পরিচয় ছিল না। কিন্তু তার সাথে দুই-একবার আলাপচারিতা হইছিল,’ মাসুমও সরাসরি তাকিয়ে আছে মেয়েটার চোখের দিকে। সে কথাটা বলতেই মেয়েটা বাকিদের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, ‘অস্ত্র নামাও সবাই। ঠিক আছে।’
‘কিন্তু–’
ছেলেটা কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল তার আগেই মেয়েটা থামিয়ে দিলো ওকে। ‘জলদি চলো, ভিজতে ভিজতে ত্যানা হয়ে যাইতেছি,’ বলে সে মাসুম আর বাকিদের দিকে একবার দেখে নিয়ে বলে উঠল, ‘জলদি চলো, সময় কম, তবে তোমরা এখনও পুরাপুরি বিশ্বাস করা অয় নাই, কাজেই সাবধান।’
মাসুম হেসে উঠল। মেয়েটা এত স্বচ্ছন্দে ওকে তুমি বলছে ব্যাপারটা খুব অদ্ভুত লাগল ওর কাছে। ‘সমস্যা নাই, আমরা মানুষ খাই না,’ বলে ও হেসে উঠল। ‘মেয়েমানুষ তো আরও না।’
মেয়েটা মনে হলো মৃদু হাসল কিন্তু অন্ধকারের ভেতরে ঠিক বুঝতে পারল না মাসুম। ‘আমি রায়েলি, বেগম সাহেবার নিজের লোক।’
তার নারী বাহিনীর প্রধান?’ মাসুম জানতে চাইল।
‘বলতে পারো যোদ্ধা। বাহিনীই নাই, তার আবার প্রধান। জলদি চলো।’
অন্ধকারের ভেতরেই ওরা দ্রুত এগোল। তারপরও আরও আধা ঘণ্টা হাঁটার পর সামনে কালো কালো অবয়বের মতো দেখতে পেল মাসুম। এগুলো নিশ্চয়ই জেলেদের ঝুপড়ি। আর তাতেই আশ্রয় নিয়েছে ওরা।
ওরা ঝুপড়িগুলোর কাছাকাছি আসতেই জোরে শিস বাজিয়ে উঠল মেয়েটা, সাথে সাথে ওপাশ থেকেও ভেসে এলো প্রায় একইরকম শিসের শব্দ। এই ঝড়ের ভেতরেও শিসের শব্দের জোর শুনে অবাক হয়ে গেল মাসুম। শখানেক গজ পার হয়ে ওদেরকে একটা ঝুপড়ির ভেতরে নিয়ে এলো ওরা। মাসুম দেখল ওটার ভেতরে কিছুই নেই বলতে গেলে। স্যাতস্যতে মেঝেতে একটা পুরনো পার্টি বিছানো। ওদেরকে অপেক্ষা করতে বলে চলে গেল সবাই।
‘এ কই আসলাম?’ গায়ের কাপড় থেকে পানি ঝড়াতে ঝাড়তে বলে উঠল ধোবল।
‘তারচেয়ে বড়ো কথা,’ ধোবলের দেখাদেখি মাসুম নিজেও অস্ত্রগুলো একে একে মেঝেতে রেখে নিজের গা থেকে পরিধেয়র পানি ঝরাতে লাগল। যাগোরে খুঁজতে আসছি তাগোরে পাওয়া গেছে। কিন্তু ঝামেলা অন্য জায়গাতে,’ পানি ঝরিয়ে আবার পোশাক পরে নিতে নিতে কথা বলছে মাসুম।
‘কোনো জায়গাতে?’ বরখা তাকিয়ে আছে ওর দিকে।
‘আমি পরিস্থিতি যা ভাবছিলাম তারচেয়ে বেশি খারাপ। প্রথমত, এরা এতটা খারাপ অবস্থায় না পড়লে এরকম একটা জায়গায় আশ্রয় নেওয়ার দরকার পড়ত না। এইখানে যেহেতু আশ্রয় নিছে কাজেই বুঝতে অইব খুবই বাজে অবস্থার ভিতরে আছে এরা। তার ওপরে মোঘলরা তো আছেই, সেই সাথে বিশা নামে এক ডাকাইত লাগছে এদের পিছে, এইটা আমারে বরকত বলছে। তুমি তো চেনই?’
বিশা নামটা উচ্চারণ করতেই নুক্কুনের মুখ অন্ধকার হয়ে গেল, ‘তারে আমি ভালো কইরাই চিনি। আমার পরিবারের লোকজনের তো হের কারণেই
‘আইচ্ছা, নুক্কুন, তুমি যে আমগো লগে আছ তোমার পরিবার—’
মাসুম কথা শেষ করতে পারল না, তার আগেই দরজায় দেখা দিলো একজন, তার হাতে কয়েকটা জিনিস, মাসুম দেখল হালকা কিছু খাবার আর গা মোছার জন্যে শুকনা কাপড়। সেই ছেলেটা নিয়ে এসেছে। মাসুম কাপড়টা তুলে নিতে নিতে জানতে চাইল, ‘তোমার নাম কী? বয়সে ছোটো হবা তাই তুমি বললাম। সুবাদার তোমার কী লাগত?
‘ঠিক আছে, ছেলেটা মাথা নেড়ে হাসিমুখে বলে উঠল। এই প্রথমবারের মতো বাতির আলোয় মাসুম ভালো করে দেখল ছেলেটাকে, সদ্য কৈশোরে পদার্পণ করেছে কিন্তু বেশ লম্বা আর বলিষ্ঠ শরীর। মাসুম মনে মনে অনুধাবন করল, ছেলেটাকে নিশ্চিত খুব ভালোবাসতো সুবাদার, তা না হলে একে এদের সাথে ভিড়িয়ে দিত না। ‘আমার নাম সুলতান, সুবাদার আসলাম আমার মামা ছিলেন।’
সুলতান, আমরা এখন কিছু খাবো না, তুমি বেগম সাহেবারে জলদি গিয়া বলো: তার সাথে দেখা করা খুব জরুরি, আমগো হাতে সময় নাই।’
‘অপেক্ষা করতে হইবে না, আপনেরা আমার সাথে চলেন,’ বলে ছেলেটা বাইরের দিকে যেতেই মাসুম দ্রুত তার পিছু নিলো। আবারও ভিজতে হবে উপায় নেই। কিন্তু বেশি ভিজতে হলো না, দুটো ঝুপড়ি পরেই ছেলেটার পিছু নিয়ে ঢুকে গেল ওরা। ভেতরে ঢুকে দেখল, এই ঝুপড়িটা আগেরটার তুলনায় বড়ো। এখানে দুইপাশে দাঁড়িয়ে সবাই। ঝুপড়ির মাঝখানে একটা পাটি বিছানো জলচৌকির ওপরে বসে আছে মুখে ঘোমটা দেওয়া এক মহিলা। মাসুম ভিতরে গিয়ে একটু অস্বস্তি বোধ করতে লাগল। সালাম দিবে না কী করবে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না।
ওর অস্বস্তি দূর করল রায়েলি, যে মেয়েটার সাথে ওদের প্রথম দেখা হয়েছিল। ‘বেগম সাহেবা, এই সেই যোদ্ধা যারে ঈশা খাঁ পাঠাইছেন।’
আমার নাম মাসুম খাঁ কাবুলি, আমি সুবাদারের খুব ঘনিষ্ট মিত্র ছিলাম না কিন্তু তার মৃত্যু বাঙাল মুলুকের জন্যে বিরাট ক্ষতি,’ এর বেশি আর কী বলবে ঠিক বুঝতে পারল না মাসুম। ওর প্রশ্নের জবাবে সুবাদারের স্ত্রী মেহের শুধু মাথা নাড়ল।
‘আপনারা স্রেফ তিনজন আসলেন?’ রায়েলি বলে উঠল। ‘আমরা আশা করছিলাম, ঈশা খাঁ তার মিত্রের জন্যে আরও বড়ো বাহিনী পাঠাবেন।’
মাসুম মাথা নেড়ে দুঃখ প্রকাশ করে বুঝিয়ে বলল কেন সে সেটা পারেনি। সেই সাথে যোগ করল, ‘আমরা একবার যেহেতু আসছি একটা না একটা উপায় বাইর কইরাই ফালাব। কিন্তু তার আগে আমগো কিছু বিষয়ে আলোচনা করাটা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ কইরা বিগত কিছুদিন যাবৎ কী হইল এবং-’ মাসুম ঈশা খাঁর নির্দেশ অনুযায়ী সেই বিশেষ আলোচনাটা করতে যাচ্ছিল কিন্তু তার আগেই বাইরে কারও পদশব্দ শোনা গেল। আসলে একাধিক এবং বেশ জোরে দৌড়ে আসছে তা না হলে এই ঝড়ের ভেতরে সব বোঝা যেত না।
সবাই সেদিকেই তাকিয়ে আছে ওদেরই মতো পোশাক পরা দুজন দৌড়ে এসে ভেতরে ঢুকল।
‘কী ব্যাপার, তোমরা পাহারা ছাইড়া আসছ কেন?’
‘বেগম সাহেবা, খারাপ খবর আছে,’ বলে দম নিতে লাগল। সবাই তাকিয়ে আছে ওদের দিকে দ্বিতীয় জন বলে উঠল। শত্রু, শত্রুরা আক্রমণ চালাইতে যাইতেছে।’
কথাটা শুনে চমকে উঠল মাসুম, আর যাই হোক এত দ্রুত আক্রমণ আশা করেনি ও।
