অধ্যায় বাইশ
বর্তমান সময়
ভিক্টোরিয়া পার্কের সামনে, ঢাকা
গাড়ির ভেতরে থাকা সবাই খুব অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে লকেটটার দিকে। চৌধুরী সেটাকে হাতে নিয়ে উলটেপালটে দেখতে লাগল, তারপর বাশারের কাছ থেকে মোবাইলটা নিয়ে সেটাকে মোবাইলের ছবির সাথে মিলিয়ে দেখল। তারপর পৃথার দিকে ফিরে তাকিয়ে বলে উঠল, ‘আচ্ছা, এটা তুমি কোথায় পেয়েছ? তোমার মা দিয়েছিল?’
‘জিনিসটা মারই ছিল, মা সবসময় এটা পরে থাকত কিন্তু মার মৃত্যুর পর এটা ছিল বাবার কাছে। আমার একেবারে সঠিক মনে নেই, তবে যতটুকু মনে পড়ে এটা কয়েক বছর আগে কুরিয়ারে এসেছিল। মায়ের অনেক জিনিস ইংল্যান্ড থেকে মাঝে মধ্যে আমাকে পাঠানো হয় সেই কারণে এটা যখন পাঠানো হয় আমি ভেবেছিলাম এটা হয়তো ওভাবেই ওখান থেকে পাঠানো। আমি আসলে অত ভালোভাবে খেয়াল করিনি। জিনিসটা পেয়ে এত খুশি হয়েছিলাম বলার বাইরে। তাই সেভাবে আর কিছু ভাবার কথা মাথাতেই আসেনি,’ বলে সে মাথা নাড়ল, ‘কিন্তু এখন মনে হচ্ছে এটা বাবাও পাঠিয়ে থাকতে পারে, কারণ বাবার অন্তর্ধানের সময় আর এটা পাঠানোর সময় দুটোই প্রায় কাছাকাছি সময়ে ঘটেছে।’
‘তারমানে এটার ভেতরে অবশ্যই কোনো-না-কোনো ব্লু আছে,’ বাশারের গলায় স্বস্তি। সে তাকিয়ে আছে চৌধুরীর দিকে। ‘আমাদের মনে হয় দ্রুত এটা পরীক্ষা করে দেখা উচিত আমাদের।’
কিন্তু চৌধুরীর ভেতরে কোনো তাড়াহুড়ো দেখা গেল না, সে এমনকি জিনিসটার দিকে তাকিয়েও নেই। সে তাকিয়ে আছে বাশারের দিকে। ‘একটা প্রশ্ন করতে পারি?’ বাশার মাথা নেড়ে সায় জানাল। ‘আপনি বুঝলেন কীভাবে যে এই ফলকের ওপরের চিহ্ন আর ওর লকেটের ওপরেও একই চিহ্ন। শুধুই অবজারভেশন নাকি আরও কোনো কারণ আছে?’
‘আপনি বুদ্ধিমান মানুষ,’ বাশার বলে উঠল। ‘সত্যি কথা হলো আমার কাছে ব্লু ছিল। আমি সেভাবে হয়তো চট করে ধরতে পারতাম না কিন্তু কিছুদিন আগে প্রফেসর আবদেলের কেসের সময়ে প্রায় কাছাকাছি ধরনের একটা ঘটে ফিল্ড এজেন্ট শারিয়ারের সাথে। আমি রিপোর্টে বিস্তারিত পড়েছি, কাজেই সেটা ব্যাক অব দ্য মাইন্ড কাজ করেছে।’
চৌধরী কিছু না বলে আনমনে মাথা নাড়ল, তারপর বাশারের মোবাইল দিয়ে লকেটের ওপরে থাকা প্রতীক চিহ্নটার একটা ছবি তুলে লকেট আর মোবাইল দুটোই ফেরত দিলো বাশারের কাছে। বাশার খানিকটা স্বস্তি বোধ করল জিনিসটা নিজের হাতের মুঠোতে নিয়ে। ‘আমাদের এটা পরীক্ষা করে দেখা উচিত,’ বাশার আবারও একই কথা বলে উঠল।
‘তা তো অবশ্যই উচিত কিন্তু, তার আগে একটা কাজ কি করা সম্ভব?’ চৌধুরী বাশার আর সোহেলকে দেখল একবার। ‘এই প্রতীকটার ছবি দিয়ে কি একটা সার্চ দেওয়া সম্ভব? কারণ আমি মনে হয় জিনিসটা নিয়ে কিছু একটা অনুমান করতে পারছি, তবে যদি সার্চ দেওয়া যায় সেটাতে আরও নিশ্চিত হওয়া যাবে।’
‘অবশ্যই সম্ভব। বস, তোমার মোবাইলটা দাও দেখি, সামনের সিট থেকে সোহেল বলে উঠল। বাশার মোবাইলটা ওর দিকে দিতে সে ব্যস্ত হয়ে উঠল।
‘এই ফলকের ওপরে এই সিম্বলটা এলো কীভাবে, মানে এটা কি শুরু থেকেই ছিল নাকি–’
‘আই হ্যাভ নো ব্লু,’ সামান্য কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলে উঠল পৃথা। ‘আমার আসলেই কোনো ধারণা নেই। তবে এটা ঠিক এর সাথে অবশ্যই পুরো ব্যাপারটার কোনো- না-কোনো সংযোগ তো অবশ্যই আছে। কারণ লকেটটা অনেক পুরনো এবং এটা মাম্মির কাছে সবসময়ই ছিল।’
বাশার লকেটটা চোখের সামনে তুলে ধরল সাধারণ একটা লকেট। পাতলা একটা রূপোর চেইনের সাথে আটকানো। লকেটটাও রূপালি রংয়েরই, গোল, পাঁচ টাকার কয়েনের চেয়ে সামান্য মোটা হবে। জিনিসটাকে উলটাতেই দেখল পেছনে একেবারে পালিশ করা, বাশার সাবধানে কয়েনটা চারপাশে নখ দিয়ে খুঁটতে লাগল। একেবারে সমান করে বসানো। কোনো দিকে কোনো ফাটল বা সূক্ষ্মতম কোনো দাগ পর্যন্ত নেই। আবার উলটে দেখতে পাবে সামনে থেকে। সোহেল বলে উঠল, ‘গট ইট, বস।’
সবাই ফিরে তাকাল তার দিকে। ইট ওয়াজ সো অভিয়াস, প্রথম হিটেই চলে এসেছে সার্চে।
তার হাত থেকে মোবাইলটা নিতে নিতে বাশার পেজের টাইটেলটা দেখতে পেল। ‘বারো ভূঁইয়া।’
‘এক্সাক্টলি, এটা বারো ভূঁইয়াদের সাথে সংশ্লিষ্ট একটা প্রতীক। পনেরো শতকের,’ বাশার মোবাইলটা তুলে দেখাল সবাইকে। ‘কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো শুধু কি এটাই? নাকি আরও কিছু আছে?’ বলে সে মোবাইলটা পৃথার হাতে দিয়ে আবারও লকেটটা তুলে ধরল চোখের সামনে। রূপালি রংয়ের লকেটটার সামনের অংশে সুন্দর করে খোদাই করে বসানো প্রতীকটা। মাঝখানে একটা কারুকাজ করা ঢাল, তার নিচে দুটো বর্শা। ‘কাজটা যদি হাতে করা হয়ে থাকে তবে বলতেই হবে খুবই দারুণ এবং দক্ষ হাতের কাজ,’ ঢালের ওপরের অংশে ছোটো একটা ঢিবির মতো। জিনিসটা নখ দিয়ে খুঁটে দেখল ও। ছোটো অংশটা নখ দিয়ে চাপ দিতে যেন একটু বসে গেল। কিন্তু কিছু হলো না, বাশার আবারও চাপ দিতে যাবে তার আগেই চৌধুরী হাত বাড়াল ওর দিকে, ‘দেখি আমি—’
কিন্তু সে কথা শেষ করার অগেই আবারও চাপ দিয়ে ফেলেছে বাশার। এবার খানিকটা জোরে, মৃদু কট করে যেন শব্দ হলো, দুপাশে যেন সামান্য বাতাসের মতো বেরিয়ে গেল, আর সেই সাথে ওটার গোড়া যেখানে চেইনটা আটকানো সেটাকে কেন্দ্র করে দুই ভাগ হয়ে গেল লকেটটা।
‘শিট,’ আনমনেই বলে উঠল পৃথা। সবাই হাঁ করে তাকিয়ে আছে লকেটটার দিকে। জিনিসটা মেলে ধরে খুব সাবধানে ভেতর থেকে মসলিনের মতো পাতলা একটা ভাঁজ করা কাপড় চোখের সামনে তুলে ধরল। ‘জিনিসটা একটা ম্যাপ।’
‘এবং জোরদার সম্ভাবনা ম্যাপটা এই জায়গার,’ সবাই ফিরে তাকাল চৌধুরীর দিকে। সে বাশারের মোবাইলেই একটা জায়গার ছবি দেখাচ্ছে। সেখানে বড়ো করে এই প্রতীকটা আঁকা।
‘সর্বনাশ, এটা তো এই প্রতীকটাই, কোন জায়গা এটা?’ আনমনেই জানতে চাইল বাশার।
‘এটা সোনার গাঁ, ঈশা খাঁর রাজধানী, মানে একভাবে বলতে গেলে সোনারগাঁওয়ের রাজধানী।’
‘এর মানে পুরোটা সময় আমি এই জিনিস গলায় নিয়ে ঘুরেছি,’ পৃথার মুখ লিটারেলি হাঁ হয়ে গেছে। বাশার ম্যাপটা দেখছে একবার, আরেকবার সে ফিরে তাকাল মোবাইলের দিকে। কিন্তু ও কিছু বলার আগে চৌধুরীই বলে উঠল ‘নিঃসন্দেহে এটা পুরো ব্যাপারটাকে জোড়। লাগালে খুব ভালোভাবে মিলে যায়। প্ৰথমত—’
মাম্মি এবং আব্বু দীর্ঘদিন কাজ করেছে সোনারগাঁওতে,’ পৃথা মুখ তুলে বলে উঠল। ‘এটা আপনারা জানেন কি না, আমি জানি না।’
‘আমি জানি,’ চৌধুরী বলে উঠল। ‘এটাই বলতে চাচ্ছিলাম আমরা। প্রথম কথা প্রফেসর আবদেল এবং প্রফেসর ইলা দুজনেই এই জায়গাতে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন,’ বলে সে মোবাইলের দিকে ইশারা করল। ‘দ্বিতীয়ত, এই লোগো বা প্রতীক বা সিম্বল—যাই বলি না কেন, এটা লকেট এবং প্রফেসর ইলার কবরের ফলকের ওপরে আঁকা ছিল। এই দুটোকে জোড়া লাগালে নিঃসন্দেহে বলা যায় এই বিষয়টা সোনারগাঁওয়ের দিকে নির্দেশ করে।’
‘এবং রাজদ্রোহীর রহস্যের সাথে বারো ভূঁইয়াদের সংযোগ আছে। কাজেই—’ বাশার কথা শেষ করার আগেই ধপ করে একটা আলো এসে বাড়ি মারল ওদের সবাইকে। নিজেদের আলোচনায় ওরা এতটাই মগ্ন হয়ে গেছিল যে খেয়ালই করেনি দুটো গাড়ি এসে থেমেছে ওদের গাড়িটা থেকে বেশ খানিকটা দূরত্বে বজায় রেখে। হঠাৎই ওদের সামনের গাড়িটার হেডলাইট এসে বাড়ি মারল ওদেরকে।
‘পাগল নাকি?’ পৃথা ব্যাপারটা ধরতে পারেনি, বাশার চট করে তার একটা হাত ধরে ফেলেলো। সাথে সাথে পেছনে আরেকটা গাড়ির হেডলাইট জ্বলে উঠল সেই আলোতে ওরা পরিষ্কার দেখতে পেল সামনেসেই কালো গাড়িটা আর ওটার ভেতরে বসে থাকা ড্রাইভার আর কালো কোটকেও পরিষ্কার দেখা গেল, কালো কোটের মুখে লেগে থাকা হাসিটাও পরিষ্কার দেখতে পেল ওরা।
‘সর্বনাশ,’ বাশার চট করে আশপাশে দেখতে শুরু করেছে। ও এবং সোহেল দুজনেই বের করে এনেছে নিজেদের পিস্তল। ওরা যে জায়গাতে আছে এটা সদরঘাট থেকে খুব বেশি দূরে না। ফলে লোকজনের যাতায়াত রাতে হলেও একেবারে নেই তা নয়, কিন্তু ওরা নীরবে আলোচনা করার জন্যে গাড়িটাকে নিয়ে এসেছিল একটা নির্জন গলির ভেতরে। ফলে এখানটা একেবারে নীরব। একটা মানুষ তো দূরে একটা কুত্তাও নেই। গলির একদিকে দাঁড়িয়ে আছে সেই কালো গাড়িটা অন্যদিকে পেছনে আরেকটা।
‘ওরা এভাবে একেবারে সময়মতো—’
‘আমরা আটকে গেছি,’ বাশার ঘোষণার সুরে বলে উঠল। ‘তবে-’ সে কিছু বলার আগেই চৌধুরী চট করে গাড়িটাকে স্টার্ট দিয়ে ফুল গিয়ারে সামনে ঠেলে দিলো। ওরা কেউ তো বটেই এমনকি সামনের গাড়ির মানুষেরাও অনুধাবন করতে পারেনি ওদের গাড়িটা এত দ্রুত এভাবে রিঅ্যাক্ট করে উঠবে, ওরা কেউ নিজেদেরকে সামলানোর আগেই কিংবা সামনের গাড়িটা কিছু করার আগেই ওদের গাড়ি গিয়ে তীব্র স্পিডে বাড়ি মারল সামনের গাড়িটাকে। প্রায় বোমা বিস্ফোরোণের মতো শব্দ হলো। ওরা সবাই গড়িয়ে পড়ল একে-অপরের ওপরে।
‘হ্যাং অন—’ বলে চৌধুরী গাড়িটাকে আবারও পিছিয়ে নিলো।
‘আরে আপনি করছেন কী—’
ওদের গাড়িটা আবারও গিয়ে বাড়ি মারল সামনের গাড়িটাকে। এবার এতটাই জোরে যে সামনের গাড়টা প্রায় চল্লিশ ডিগ্রির মতো ঘুরে গেল। বাশার তাকিয়ে দেখল ওর পেছনের গাড়িটা এগিয়ে এসে আটকে দিতে চাইছে ওদেরকে। চৌধুরী আবারও পেছাতে শুরু করেছে, সবাই মাথা নিচু করো—বলে বাশার সাইড মিরর দিয়ে নিজের পিস্তল ধরা হাতটা বের করে পেছনের দিকে দুটো ফাঁকা ফায়ার করল। পেছনের গাড়িটা কী করছে দেখার আগেই আবারও ওদের গাড়ি এগিয়ে বাড়ি মারল সামনের গাড়িটাকে। বাশার দেখল সামনের তো বটেই ওদের গাড়ির দুটো কাচ ভেঙে গেল, তীব্র ধাক্কার চোটে। গাড়ির ভেতরে পৃথা চিৎকার করতে শুরু করেছে। বাশার দেখল চৌধুরীর পাগলামিতে কিংবা ওর গুলিতে পেছনের গাড়িটাও থেমে গেছে। চৌধুরী আবারও পিছিয়ে গিয়ে ফুল স্পিডে বাড়ি মারতে যাবে সামনের গাড়িটাকে এবার চট করে ওটা পিছিয়ে গেল খানিকাটা আর ওদের গাড়িটা বোতলের ছিপির মতো ছিটকে বেরিয়ে এলো বড়ো রাস্তায়।
‘আপনি পাগল নাকি?’ নিজের তালগোল পাকানো শরীরটাকে কোনোমতে সামলে নিয়ে ঝাঁঝের সাথে বলে উঠল। কিন্তু সে পুরোপুরি ঠিক হবার আগেই আবারও তীব্র ঝাঁকির সাথে গাড়িটা ঘুরে গেল একপাশে। ‘অল অব ইউ আর ওয়েলকাম,’ বলেই গাড়ির স্পিড আরও বাড়িয়ে দিলো চৌধুরী।
‘সবাইকে মারার তাল করছেন নাকি আপনি?’ আবারও পৃথা বলে উঠল। বাশার বোঝার চেষ্টা করছে আসলে হচ্ছেটা কি আর চৌধুরীই বা কি করছে।
‘মারার তাল করছি না, বাঁচানোর চেষ্টা করছি,’ চৌধুরী গাড়িটাকে বনবন করে ঘুরিয়ে বাঁয়ের একটা রাস্তায় ঢুকিয়ে দিলো। ডানে গেলে সদরঘাট কিন্তু সেদিকে না গিয়ে এদিকে কেন এলো বুঝতে পারছে না বাশার। তবে খালি রাস্তায় গাড়ি মোটামুটি বেশ ভালো গতিতেই এগোতে শুরু করেছে।
‘ব্যাপার কী?’ বাশার এখনও পেছনেই তাকিয়ে আছে, তারপর চট করে বুঝে ফেলল সে, কথাটা বলার জন্যে মুখ খুলল কিন্তু তার আগেই চৌধুরীই বলে উঠল, ‘গলি থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছি আমরা ঠিকই, কিন্তু ওরা পিছু নিয়েছে।
চট করে প্রায় সবাই পেছনে ফিরে দেখার চেষ্টা করল। প্রথমে প্রায় কেউই দেখতে পেল না কিন্তু ভালোভাবে তাকাতেই দেখল একটা গাড়ি ওদের পেছনে পেছনে আসতে শুরু করেছে।
