পূর্বকথা
গল্পের শুরু
প্রথম অংশ: কল্পযাত্রা
দ্বিতীয় অংশ : সত্যাভিযান

রাজদ্রোহী – ২৯

অধ্যায় উনত্রিশ

সময় : ১৫৯৬ খ্রিস্টাব্দ

জল-জঙ্গল এলাকা

আগুয়ান নৌকাটার দিকে তাকিয়ে মাসুম একবার বড়ো করে দম নিলো। সেই সাথে সে আনমনেই একবার দেখে নিলো ওপরে আকাশের দিকে। রাত এখন শেষ প্রহরে, বলতে গেলে আর কিছুক্ষণের ভেতরেই দিনের আলো ফুটে উঠবে। আর ঘণ্টাখানেকও হয়তো লাগবে না। মাসুম জানে ওরা যা করতে যাচ্ছে, সেই অসম্ভবের স্রেফ অর্ধেকটা সম্ভব হয়েছে; বাকি অর্ধেক অসম্ভবকে এখনও বাস্তব রূপ দেওয়া বাকি। এই বাকি অর্ধেক অসম্ভবকে সম্ভব করতে হলে ওদের অন্ধকার প্রয়োজন। অন্ধকার ছাড়া এই অসম্ভবকে সম্ভব করা কোনোমতেই সম্ভব হবে না। আলোর পরিমাণ হিসেব করে আরেকবার নৌকাটাকে দেখে নিলো মাসুম। বেশ বড়ো একটা সওদাগরি নৌকা। তবে ওটার মাস্তুল থেকে শুরু করে আরও বেশ কিছু জায়গায় সওদাগরি সাধারণ নৌকার সাথে মেলে না। খুব স্বাভাবিকভাবেই একজন ডাকাতের সওদাগরি নৌকার প্রয়োজন হবার কথা নয়। সওদাগরি নৌকা বানানোই হয় আরাম-আয়েশের জন্যে আর মালামাল বহন করার জন্যে। কাজেই বিশা ডাকাত এই নৌকাটাকে যার কাছ থেকেই দখল করে থাকুক না কেন সে এটাকে দখল করার পর ব্যাপক পরিবর্তন করেছে। মাসুম আন্দাজ করতে পারে এটাকে পরিবর্তন করা হয়েছে এটার গতি বৃদ্ধি থেকে শুরু করে আরও কিছু বিষয়ে সুবিধা পাবার জন্যে।

‘এই নৌকাই তো?’ মাসুম খুব জোরে কথা বলছে না, আবার ধীরেও না। সে কথাটা মূলত জানতে চাইল ওর দলের যে ছেলেটা পাহারায় ছিল তার কাছে। যে- প্রথম ডাকাতদেরকে দ্বীপে আসতে দেখে কুক্কার ডাক ডেকে সবাইকে সাবধান করে দিয়েছিল তার কাছে। কারণ ওই প্রথম দেখতে পেয়েছিল গাছের ওপর থেকে কোন নৌকাটায় করে সবাই রওনা দিয়েছিল সেটা।

‘ওস্তাদ, এইটাই,’ ছেলেটা নিশ্চিত করতেই মাসুম মাথা নাড়ল। আরেকবার ফিরে তাকাল অন্য নৌকাটার দিকে। ওটা এখান থেকে কমপক্ষে আধা মাইল দূরে। নৌকাটাকে দেখে নিয়েই নিজের ড্যাগারের হাতলে ওর আঙুলগুলো শক্ত হয়ে উঠলে। মনে আছে তো, ওগোরে চমকায়া দিয়া কাম হাসিল করতে অইবে?’

নৌকটার সবাই সায় জানাল।

যে ডাকাতগুলো দ্বীপে আক্রমণ চালিয়েছিল ওদের একটা দলকে জঙ্গলের কাছে আর অন্য দলটাকে নৌকার কাছে কাবু করে কয়েকজনকে হত্যা করে আক্রমণের সময়ে; বাকিরা এখনও বন্দি আছে দ্বীপের ঝুপড়িগুলোতেই। বন্দিদের পোশাক পরিবর্তন করে ওদের পোশাক পরে সমস্ত অস্ত্র প্রস্তুত করে ওরা ডাকাতদের নিয়ে আসা নৌকাগুলোয় এসে ওঠে, মাসুমের পরিকল্পনা সহজ, এখান থেকে পালাতে হলে ওদেরই কোনো একটা বড়ো নৌকা দখল করতে হবে। মাসুম ধারণা করছে ওরা যে সওদাগরি নৌকাটা থেকে এসেছে, মূল পরিকল্পানাকারী বা নেতৃত্ব স্থানীয়রা ওখানে নেই। কারণ বিশা ডাকাতের ওটায় থাকার সম্ভাবনা কম সে সম্ভাবনা আছে পাশের জালিয়াটাকে। তাই ওর পরিকল্পনা আগে সওদাগরিটা দখল করা, তারপর অন্যটার ব্যবস্থা করে পালানো। অসম্ভব এক যাত্রা, কিন্তু এখান থেকে পালাতে হলে এছাড়া আর কোনো উপায় নেই আসলে। নৌকাটা ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে আর মাসুমের ভেতরে ভেতরে উদ্বিগ্নতা বাড়ছে। নৌকাটাকে দখল করতে হলে বেশ কিছু সমস্যা আছে, প্রথম সমস্যা হলো: ওরা গেছিল চারটা নৌকায় করে, ওরা ফিরে আসছে দুটো নৌকায় করে, ফলে এতে সন্দেহ বাড়তে পারে ওদের। আর ডাকাতেরা যে পোশাক পরে গেছিল ওরা সেই একই পোশাক পরে ফেরত এলেও অবশ্যই ওদের সাথে এদের আকৃতিগত পার্থক্য অনেক। কাজেই এটাও সন্দেহের একটা কারণ হতে পারে, কারণ ওরাও নিজেদের লোক চিনতে পারার কথা। এরপর সবচেয়ে বড়ো একটা সমস্যা হলো ওদেরকেই নৌকা আক্রমণ করতে দেখল বা টের পেল অন্যপাশের জালিয়া কী করবে। ওই নৌকাটাকে অবশ্যই বেশি লোকবলে এবং অস্ত্রে ভরা থাকার কথা। ওটা আক্রমণ করলে এই সওদাগরি দিয়ে ফেরানো যাবে না। কাজেই বেশ কিছু অনিশ্চয়তা আছে। নৌকার আরেকটু কাছে এগোতেই কেউ একজন সওদাগরি থেকে মশাল নাড়তে নাড়তে চিৎকার করে কিছু একটা বলল। সম্ভবত জানতে চাইছে কিছু একটা।

‘কিছু বলার দরকার নাই,’ বলে মাসুম পাটাতনের ওপর থেকে লাঠিটা তুলে হাতে নিয়ে নিলো। ‘সবাই প্রস্তুত হও,’ নৌকাটা আর বিশ-পঁচিশ গজ দূরে। মাসুম দেখতে পেল পাটাতনের ওপরে কয়েকজন এসে দাঁড়িয়েছে। চিৎকার করে একজন জানতে চাইল দ্বীপের কী অবস্থা? মাসুম ভারী স্বরে আগে দড়ি ফেলতে বলল। ওরা প্রায় কোনো সন্দেহ না করেই একটু পরে গিট দেওয়া একটা মোটা দড়ি এসে পড়ল ওদের নৌকার ওপরে। ‘এইবার,’ যদিও আসলে আক্রমণের ইঙ্গিত দিলো কিন্তু, সেটা জোরে না বলে মাসুম লাঠিটাকে ফেলে দিলো। আগে ওঠা দরকার। সে দড়িটা বেয়ে তরতর করে উঠে এলো। দেখতে পেল তিনজন আছে পাটাতনের ওপরে। ও পাটাতনের কাছাকাছি পৌঁছে একটা হাত বাড়িয়ে দিলো ধরার জন্যে। আর অন্যদিকের লোকটা জানতে চাইল ওরা এত কম কেন? মাসুম মুখের আড়াল থেকেই হাসি দিলো একটা। লোকটার হাত চেপে ধরেই ও লাফিয়ে নেমে এলো পাটাতনের ওপরে। একহাতে লোকটার হাত ধরে আছে, অন্য হাতটা দিয়ে টান দিয়েই বের করে আনল দুই দিকে ধারওয়ালা নিজের ড্যাগার।

ড্যাগারটা বের করে আনতে আনতেই সোজা চালিয়ে দিলো লোকটার গলা বরাবর। আরেকটু হলে ফিনকি দিয়ে বের হয়ে আসা রক্ত ওর চোখমুখ ভিজিয়ে দিত, কিন্তু মাসুম ততক্ষণে লাফ দিয়ে সরে গেছে দ্বিতীয় জনের দিকে। লোকটা প্রথমজনকে পড়ে যেতে দেখলেও বুঝতে পারেনি কী হচ্ছে! মাসুম তাকে দেখেই হাতের চুরিটা ছুড়ে মারল লোকটার কণ্ঠার হাড় বরাবর। চিৎকারটা গলা পর্যন্ত ঘড়ঘড় শব্দে রূপান্তরিত হলো। কিন্তু তৃতীয় জন ততক্ষণে সাবধান হয়ে গেছে। মাসুম ছুরিটা ছুড়ে সোজা হবার আগেই বিশালদেহী লোকটা রাগে গজ গজ করতে করতে ছুটে এসে ওকে ধাক্কা মারল কাঁধ দিয়ে। মাসুম উড়ে গিয়ে বাড়ি খেল নৌকার মাস্তুলের সাথে। পিঠে মাস্তুলের বাড়ি লেগে মেরুদণ্ড বাঁকা হয়ে গেছে, ও দম ফিরে পাবার আগেই লোকটা উঠে এলো ওর বুকের ওপরে, দুইহাতে চেপে ধরল ওর গলা। এমনিতেই দম হারিয়ে ফেলেছিল গলায় লোকটার চাপ খেয়ে ওর মনে হতে লাগল গলার হাড় ভেঙে বসে যাচ্ছে। সাথে আর কোনো অস্ত্র নেই। একহাতে লোকটার হাত চেপে ধরে বুঝতে পারল এই নাগপাশ ছোটোনোর মতো শক্তি ওর নেই।

***

মাসুমদের নৌকা দুটো যখন সওদাগরিটার কাছাকাছি পৌঁছালো, অন্য নৌকাটা থেকে তখন ওটার দিকেই তাকিয়ে আছে বিশা ডাকাত। তার সাথে সেই দুজনে মাত্র দুইটা আসল ক্যান নৌকা?’

হুজুর, অবশ্যই ওরা চরের উপরে তাগোরে ধরছে; তা না অইলে আইত না,’ বিশার প্রধান সহকারী বলে উঠল। বিশা ততক্ষণে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে নৌকাটার দিকে। যদিও অন্ধকারের কারণে সেভাবে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে না সে। তবে কথায় যুক্তি আছে। হয়তো ওরা দুটো নৌকা নিয়ে একদল ফিরে এসেছে আর বাকিরা দ্বীপের বন্দিদেরকে পাহারায় রেখেছে। এটাই স্বাভাবিক হবার কথা।

‘মনে অয়-’ সে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল হঠাৎ অন্য নৌকাটা থেকে চিৎকারের শব্দ ভেসে এলো।

তাদের নৌকায় একটা থেকে অপরটাতে নির্দেশ বিনিময়ের কারণেও চিৎকার করা হয় অনেক সময়, তবে বেশিরভাগ সময় এটা করা হয় আলোর মাধ্যমে। চিৎকারটা কেন ভেসে এলো ঠিক বুঝতে পারল না ওরা।

‘এই এক কাম কর, জিগা অগোরে কী অইছে?’

ভেতরে ভেতরে ভীষণ এক অস্থির তো বোধ করতে শুরু করেছে বিশা ডাকাত, নৌকাটা ফিরে আসাটা ভালো লক্ষণ কিন্তু তবুও কেন জানি তার ভেতরে ভেতরে অস্থিরতা কমছে না।

***

লোকটা ওকে গলা চেপে মেরেই ফেলবে, চোখদুটো মনে হয় ছিটকে বেরিয়ে আসবে, হঠাৎ লোকটার হাত কাদার মতো নরম হয়ে গেল, ধাম করে ওর ওপর থেকে পড়ে গেল লোকটা। মাসুম খাবি খেতে খেতে দম নিতে নিতে উঠে বসল। দেখল পাটাতনের ওপরে উঠে এসেছে ওর দলের আরও দুজন, বরখার হাতে একটা বৈঠা, ওটার কোনায় রক্ত লেগে আছে। ওই বাড়ি মেরেছে লোকটাকে। ‘আমি ঠিক আছি। জলদি জলদি,’ ওরা বাকিরাও তরতর করে উঠে এলো। সবার সামনে লাঠি হাতে এগোল মাসুম, বেশি এগোতে হলো, প্রথমেই চোখে পড়ে গেল লাঠি হাতে এগিয়ে আসতে থাকা এক ডাকাতের, ওদেরকে দেখেই তারস্বরে চেঁচিয়ে উঠল লোকটা। সেই সাথে দৌড়ে গেল ভেতরের দিকে।

জলদি চলো, ওরা ঠিক হবার আগে আমরাই আক্রমণ চালাবো; আর লুকায়ে লাভ নাই,’ ওরা দৌড় দিলো নৌকার মূল কাঠামোর দিকে। প্রথমেই মাসুমের সাথে মোলাকাত হলো ছুটে আসতে থাকা দুই ডাকাতের। দুজনেরই হাতে তলোয়ার, মাসুমের লাঠির সামনে দুটোই টিকতেই পারল না। দুজনের একজন আগে এগিয়ে আসতেই সে তলোয়ার বাগিয়ে ধরতেই মাসুম মাথার ওপরে লাঠি ঘুরিয়ে এত জোরে কনুইতে বাড়ি মারল যে লোকটার হাড় ভাঙার শব্দ শুনতে পেল পরিষ্কার। লোকটা নিজের হাত চেপে ধরার আগেই কপালের ওপরে লাঠির গোড়ার গুঁতো খেয়ে জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গেল পাটাতনের ওপরে। দ্বিতীয় জন তার মতো ভুল করল না। সে মাসুমের দিকে চোখ রেখে এগিয়ে এলো সাবধানে। সামনে বাগিয়ে ধরে আছে তলোয়ার, মাসুম ওর আশপাশে চিৎকার চেঁচামেচি আর মারামারি টের পাচ্ছে কিন্তু সে সম্পূর্ণ মনোযোগ ধরে রাখল প্রতিপক্ষের ওপরে, লোকটার তলোয়ার ধরার ভঙ্গি দেখেই বুঝতে পারছে সে দক্ষ যোদ্ধা। লোকটা একটা পা বাড়িয়েই আক্রমণ চালাল মাসুমের ওপরে। লাঠির মারামারিতে প্রধান একটা পন্থা হলো আগে আক্ৰমণ চালানো কিন্তু লোকটা আগে আক্রমণ করাতে মাসুম সেই সুবিধা পেল না। বরং আগে তার তলোয়ারের আঘাতটা ঠেকাতে হলো, সেটাকে ঠেকাতে গিয়েই সোজা দু-টুকরো হয়ে গেল হাতের লাঠিটা। মাসুম একটা টুকরো ফেলে দিয়ে পিছিয়ে গেল দুইপা, লোকটা এগিয়ে সেটা সে পাটাতনের ওপরে গড়ান দিয়ে লোকটার তলোয়ার ধরা হাতটা চেপে ধরে ভাঙা লাঠির চোখা অংশটা বসিয়ে দিলো লোকটার মুখের ওপরে। প্রণপণে চেঁচিয়ে উঠতেই তাকে ধরে সোজা পানিতে ফেলে দিলো মাসুম। ঘুরে দাঁড়িয়েই দেখল নৌকার পাটাতনের ওপরে রীতিমতো খণ্ড যুদ্ধ চলছে। মাসুম সেখান থেকে রওনা দিলো নৌকার ভেতরের দিকে। আগে নৌকার মূল অংশ দখল করতে হবে, ভেতরে দিকে যেতে যেতে দুবার দুজনের সাথে মোলাকাত হলে তাদেরকে শুইয়ে দিয়ে মাসুম পৌঁছে গেল মূল নিয়ন্ত্রণের ওখানে। মাঝি আর সাথে এক পাহারাদার হাতে মশাল নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। মাসুমকে দেখেই মশাল ছুড়ে মারল লোকটা। মাসুম সেটাকে তলোয়ারের ডগা দিয়ে সরিয়ে দিলো একপাশে। মশালটা টুপ করে পাটাতন টপকে পনিতে পড়ে গেল। মাসুম এগিয়ে গিয়ে লোকটাকে আক্রমণ চালাল।

লোকটা ছুরি হাতে তেড়ে এলো মাসুমের দিকে, তলোয়ার দিয়ে তার পেট ফাঁসিয়ে দিলো। লোকটা পাটাতনে পড়ে যেতেই মাঝি লোকটা হাউমাউ করে উঠল। তাকে নির্ভয়ে নৌকা চালাতে বলে সে ফিরে এলো পাটাতনের ওপরে বেশিরভাগ ডাকাতই হয় ধরা পড়েছে আর না হয় মারা পড়েছে। ওরা পুরা নৌকা চষে ফেলল। ওদের ঝটিকা আক্রমণ সফল হয়েছে, হঠাৎ আক্রমণ চালানোতে সওদাগরিটা দখল করতে বেশি বেগ পেতে হয়নি।

‘ওস্তাদ, সব বন্দি অইছে,’ সুলতান এসে বলল। ‘আমগো আরও একজন মারা পড়ছে।’ আছে আর সাত জন মাসুম মনে মনে হিসেব করল।

‘ঠিক আছে, সবাইরে ডাকো,’ বলে মাসুম। ‘আমগো দ্বিতীয় ধাপ হইছে কিন্তু আরও একটা কাম এহনো বাকি,’ বলে সে জালিয়াটা দেখাল। ‘আমরা যেই সরতে শুরু করব ওইটা পিছে লাগব, কাজেই পলানির আগে ওইটার কিছু করতে অইব।’

‘কিন্তু সেইটা ক্যামনে করবা, বাঙালি?’ রায়েলি জানতে চাইল। মাসুম দেখল এই প্রথম মেয়েটাকে ক্লান্ত দেখাচ্ছে। যতই শক্তিশালী আর শক্ত হোক সবাই ক্লান্তি আর উত্তেজনার শেষ পর্যায়ে চলে এসেছে।

‘উপায় আছে, আমি যা বলি মন দিয়া শোনো। প্রথমে মেহের আর তার জিনিসপত্র ভিতরে নিয়া যাও। তার সাথে একজন থাকবা। সেরা তিরন্দাজ আর বর্শা ছুঁড়তে পারে এমন দুইজনরে নিয়া সুলতান থাকবা নৌকার সামনে। আমার সাথে একজন আসো।’ এরপরে সে বুঝিয়ে দিলো কী করতে হবে। ‘ওরা এখনও নৌকা নিয়া আগায় নাই, তবে সন্দেহ অবশ্যই করছে। এখনও সুযোগ আছে আমগো। চলো জলদি।’

***

‘ঘটনা কী? আমরা ইশারা করলাম ওরা কোনো উত্তর দিলো না। তার উপরে আবার চিৎকারের শব্দ শুনলাম, হইতাছেডা কি অই নৌকায়?’ বিশা ডাকাত গোঁফে মোচড় দিতে দিতে একবার আকাশের দিকে দেখল। বেলা শুরু হতে আর দেরি নাই যেকোনো সময় আকাশ পরিষ্কার হতে শুর করবে।

‘হুজুর, আমরা কি ওইদিকে আগাবো?’

বিশা ডাকাত আসলে বুঝতে পারছে না ঠিক কী করা উচিত, কারণ তার পরিকল্পনা ছিল দ্বীপে যা হবে সেখান থেকে লোকেরা চলে এলে ওরা সোজা দ্বীপে যাবে; কিন্তু সেখানে প্রথমে লোক এলো কম, তার ওপরে এই নৌকা থেকে কোনো পরিষ্কার জবাব দিচ্ছে না। এখন আবার বিশা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল কী করতে হবে।

‘চল, আমরাই আগাব ওইদিকে—’

কিন্তু সে কথা শেষ করতে পারল না, আবছা ধূসর অলোতে দেখতে পেল ওই নৌকাটাই এগিয়ে আসছে ওদের দিকে

‘হুজুর, ওরাই আগাইয়া আসতেছে আমগো দিকে।’

কেউ একজন কথাটা বলার সাথে সাথে স্বস্তির একটা পরশ বয়ে গেল তার শরীরে। যাক অবশেষে ওরা আসছে।

***

‘সব প্রস্তুত?’ প্রশ্নটা করল মাসুম বরখাকে উদ্দেশ্য করে, বরখা সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করার পর সে নিজে এসেছে মাসুমের কাছে সব জানাতে। বরখা সব প্রস্তুতি জানানোর সাথে সাথে সে ইশারা করল মাঝির দিকে। সামনের নৌকাটাকে দেখাল, সমস্ত গতি দিয়া ওইটার দিকে আগাবা,’ বলে সে বরখার দিকে ইশারা করতেই বরখা তলোয়ার বের করে ঠেকাল মাঝির গলার কাছে, ‘একটু উলটাপালটা করলেই কল্লা নামায়া দেওয়া অইবে। কাজেই সাবধান। অন্যের কারণে নিজের জীবন হারাইয়ো না। কী করবা মনে আছে তো?’ লোকটা ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে মাথা নেড়ে জানাল সব পরিষ্কার মনে আছে তার।

‘সাবাস, এইবার গতি বাড়াও,’ মাসুমের পরিকল্পনা পরিষ্কার প্রথমে ধীরে এগোতে থাকবে তারপর গতি বাড়বে, সবশেষে, দেওয়া হবে সবচেয়ে বড়ো ধামাকা। মাসুম দেখল নৌকার গতি বাড়তে শুরু করেছে। ‘যারা বৈঠা চালাইতাছে তাগোরে জোরে চালাইতে কও।’

জালিয়াটা আর দুইশো গজ দূরে, মাসুম দেখল ওই নৌকার পাটাতনের ওপরে লোকজন ব্যস্তভাবে ছুটোছুটি করছে। ওরা টের পেয়ে গেল নাকি! কিছু করার নেই, ওদের নৌকার গতি বাড়তে শুরু করেছে। একশো, নব্বই, আশি, সত্তর…

‘এইবার,’ মাসুম চিৎকার করে উঠল

নৌকার পাটাতনে মাস্তুলের কাছে একটা কাঠের ভারে বিচিত্র শব্দ করে উঠল, ধুপধাপ মাস্তুল থেকে নেমে এলো মোটা কাপড়ের বান্ডিলের মতো। ওটা শূন্যে মেলে ধরতেই বেলুনের মতো ফুলে উঠল ওটার একটা পাশ, সাথে সাথে নৌকা জ্যা মুক্ত তিরের মতো ছুটতে শুরু করল। আর শ’খানেক গজ দূরত্ব। বিশার নৌকাটা চাইলেও আর ফেরাতে পারবে না। আঘাত লাগবেই।

বিশার জালিয়ার পাটাতনে থাকা লোকেরা দেখতে পেল সওদাগরিটা এগিয়ে আসছে ওদের দিকে। হঠাৎই গতি বাড়তে শুরু করল ওটার। তারপর হুট করেই গতি আরও বেড়ে গেল ওটার, বাড়তেই থাকল, কেউ একজন চেঁচিয়ে থামতে বলল ওটাকে। কিন্তু সওদাগরিটা থামল তো না-ই বরং হঠাৎ করেই খুলে গেল ওটার পাল, ঝড়ের বেগে এগিয়ে আসছে নৌকাটা, জালিয়ার মাঝি পাশ কাটানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করল ওটাকে একপাশে ঘুরিয়ে এড়িয়ে যাবার কিন্তু তাতে ফল হলো আরও উলটো। সওদাগরিটার সামনের চোখা গলুইটা এসে ওটার একপাশে তীব্র আঘাত করতেই মড়মড় শব্দ করে একপাশে কাত হয়ে গেল বিশা ডাকাতের জালিয়া।

মাসুম নিজের লোকদের চিৎকার করে নির্দেশ দিলো কাউকে দেখতে পেলেই আঘাত করতে। সাথে সাথে সুলতানের নেতৃত্বে থাকা তিনজন তির আর বর্শা ছুড়েই শুয়ে পড়ল পাটাতনের ওপরে।

আঘাত করে নৌকাটা একপাশে কাত হয়ে যেতেই উলটো দাঁড় বাইতে শুরু করল ওরা। খানিকটা পিছিয়ে এসে একপাশে এগিয়ে সোজা করে ফেলল ওরা সওদাগরিটাকে। মাসুমের নৌকাটাকে একপাশ দিয়ে এগিয়ে কাত হতে থাকা জালিয়াকে ছাড়িয়ে এলো ওরা বেশ অনেকটা। মাসুমের নৌকা থেকে প্রাণপণে চেঁচিয়ে উঠল সবাই, খুশির চিৎকার। অসম্ভকে সম্ভব করার চিৎকার।

আরও খানিক দূরে সরে আসার পর মাসুম নৌকার গলুইয়ের ওপরে এসে দাঁড়াল। নিজের দাড়িতে হাত বুলাতে বুলাতে দেখতে পেল জালিয়াটা ডুবে না গেলেও একপাশে আঘাত পেয়ে কাত হয়ে আছে, নৌকার পাটাতনের ওপরে দাঁড়িয়ে ফুঁসতে থাকা একজন লোককে সে দেখতে পেল না। লোকটাকে দেখতে পেলে সে হয়তো খানিকটা শঙ্কিত হতো। কিন্তু মনে মনে অল্প সময়ের জন্যে হলেও খুশি হয়ে উঠল মাসুম। একাধিক অসম্ভবকে সম্ভব করতে পেরেছে ওরা একরাতে। এবার পালাতে হবে।

কিন্তু সে জানে না, পালানো তার কপালে নেই।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *