পূর্বকথা
গল্পের শুরু
প্রথম অংশ: কল্পযাত্রা
দ্বিতীয় অংশ : সত্যাভিযান

রাজদ্রোহী – ৫

অধ্যায় পাঁচ

সময়: ১৬৯৬ খ্রিস্টাব্দ

ভাওয়াল ও মহেশ্বরদী পরগনার মধ্যবর্তী এলাকা

ব্রহ্মপুত্র ও শীতলক্ষ্যার মোহনা

.

অপেক্ষার প্রহরটা রীতিমতো দীর্ঘ মনে হচ্ছে।

‘তুই নাকি পানিতে একেবারে পাগলের মতো লাফ দিছিলি?’ ছোটো একটা চামড়ার বটুয়া থেকে হাতের আঙুলের ডগায় গুঁড়ো তামাক তুলে নিতে নিতে বলে উঠল ধোবল। ‘কথা কি সত্যি নাকি চাপা মারতাছে সবাই?’ আস্তে করে তামাকের একটা বল বানিয়ে সেটাকে জিভের নিচে ঠেলে দিতে দিতে বলে উঠল সে। এমন ভাব করছে যেন প্রশ্নটা করে মাসুমকে ভীষণভাবে পরখ করার চেষ্টা চালাচ্ছে সে।

সময়টা আসন্ন জোয়ারের সময় তাই তাদের নৌকার নিচে পানিতে দুলুনির পরিমাণ মারাত্মক বেশি। দুলুনির চোটে সবাই এমনভাবে নড়ছে যেন হাতির পিঠে সওয়ার হয়ে আছে। ভীষণ দুলুনির চোটে নড়তে থাকা নৌকার পাটাতনে নিজের শরীরের ভারসাম্য ঠিক করে বিশেষভাবে প্রক্রিয়াজাত করা শুকনো বক পাতা দিয়ে মোড়ানো ছইয়ের ওপরে হেলান দিলো মাসুম। এক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল সে ধোবলের দিকে। ধোবলের মুখের এক পাশে অন্তত কয়েকশো আঁচড়ের দাগের মতো দাগ, চোখ মুখ এমনভাবে ফুলে আছে যেন ভয়ঙ্কর মারামারি করে এসেছে ক্ষতগুলো অবশ্য মারামারিরই তবে সেটা মানুষের সাথে না, ঘড়িয়ালের সাথে। ধোবলের ক্ষতগুলো বাইরে থেকে দেখা যাচ্ছে, কিন্তু মাসুমের ক্ষত বাইরে থেকে দেখা না গেলেও তার অবস্থাও বেশি সুবিধার না।

ধোবলকে তামাক নিতে দেখে তার হাত থেকে চামড়ার বটুয়াটা ছিনিয়ে নিলো মাসুম। তারপর নিজেও খানিকটা তামাক মুখে পুরে তার দিকে ফিরে বলে উঠল। ‘তোকে কে কইল?’

মহা আনন্দের সাথে তামাক চিবুতে চিবুতে ধোবল আড়ষ্ট মুখে বলে উঠল, ‘ওই আরকি সবাই বলাবলি করতেছিল, আমি পানির তলে যাইতেই তুই নাকি পাগলের মতো ঝাঁপ দিছোস পানিতে,’ বলে সে পিক করে থুতু ফেলল পানিতে। ‘আমি অবশ্য পুরাটা বিশ্বাস করি নাই,’ তার চোখে মুখে একটা দুষ্টামির হাসি ফুটে উঠতে শুরু করেছে।

‘আহারে, তোরে বাঁচানোর লাইগা আমার ঠেকছে?’ বলে বটুয়াটা ধোবলের দিকে ছুড়ে দিতে দিতে মাসুমও মৃদু হেসে উঠল। ‘আমি তো লাফ দিছিলাম গারুদ মাছটা যাতে হারায়া না যায়। মাছটা গুরুত্বপূর্ণ, তুই কেডা?’ কথাটা বলে আধো অন্ধকারের ভেতরে তাকায়া দেখল ধোবলের মুখটা অন্ধকারের ভেতরে আরও একটু অন্ধকার হয়ে গেছে। কৃত্রিম একটা রাগের ভাব ছড়িয়ে পড়েছে তার মুখ জুড়ে। শালা, নিজে তামাক আনোস না, খালি আমারটা খাস। আর বড়ো বড়ো কথা কস। তোর কোনো দরকার ছিল ওমনে ঝাঁপায়া পড়ার?’ রাগের সাথে বটুয়াটা কোমরে রাখতে রাখতে সে বলে উঠল। ‘আমি তো গেছিলাম, তুইও গেছিলি আরেকটু হইলে, গাধা কোথাকার?’

‘আইচ্ছা আমি গাধা!’ এবার মাসুম খানিকটা এগিয়ে গেল ধোবলের দিকে। ‘আমি গাধা হইলে তুই কি, তুই তো একটা গোঁয়ারের একশেষ,’ বলে রাগের সাথে মুখ থেকে তামাক পানিতে ফেলে দিলো মাসুম। ‘পচা তামাক আনছস আবার বড়ো বড়ো কথা। আমি গাধা হইলে তুই একটা ছাগল। একরোখা একটা ছাগল।’

‘অ্যাই, তোরা জামাই বউয়ের মতন ঝগড়া বন্ধ করবি?’ নৌকার ছইয়ের ভেতর থেকে একটা গলা শাসনের সুরে ধমকে উঠল। ‘এমনেই আছি আমরা ঝামেলার মধ্যে তার ওপরে তোরা কুত্তা-বিলাইয়ের মতন ঝগড়া করতাছোস।’

‘খাড়া,’ মাসুম ওদের তৃতীয় সঙ্গী এবং বন্ধু বরখার দিকে ফিরে অস্বাভাবিক রাগের সাথে একটা আঙুল তুলল। দেখ, আমগো কথার ভিতরে কথা কবি না, আমরা সিদ্ধান্তে আইত পারতাছি না কেডা গাধা আর ছাগল; আর তুই এর মধ্যে কুত্তা-বিলাই টাইন্না আনলি ক্যান?’

ঠিকই আছে, চেহারা যা হইছে একেকজনের, কুত্তা-বিলাই-ছাগল এইগুলাই কইতে অইব? শালারা পাগলের দল মাঝরাইতে গেছিল পানির তলে মরতে। তগো মরাই দরকার আছিল।’

‘আর তুমি তো যাওই নাই আমগো লগে। শালা, খেতা মুড়ি দিয়া ঘুমাইতাছিলা। কাপুরুষ কোনোহানকার, এবার ধোবল রাগের সাথে বলে উঠল। সমর্থনের আশায় সে ফিরে তাকাল মাসুমের দিকে। মাসুমও তার দিকে ফিরে মাথা ঝাঁকাল। ‘একদম ঠিক, তুমি শালা আমগোরে কথা কও কোনো সাহসে, ভীতু, ঠিক?’ শেষ শব্দটা উচ্চারণ করল সে ধোবলের দিকে তাকিয়ে। তার প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে ধোবলও মাথা নাড়ল। ‘এক্করে ঠিক। তুই শালা একটা ভীতুর ডিম।’

‘খুব বাহাদুর তোমরা, শেষে যখন ঘড়িয়ালটা তোমার,’ মাসুমকে নির্দেশ করে সে বলে উঠল। ‘কল্লাটা চিবাইতে আসতাছিল আমি কোঁচ না মারলে তো গেছিলা,’ বলে সে ঝামটা দিয়ে আরও জোরের সাথে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল। তার আগেই ভারী একটা গলা নৌকার ছইয়ের অন্যপাশ থেকে ধমকে উঠল।

‘এই কী শুরু করছ তোমরা? এইসব পারিবারিক ঝগড়া বাদ দিয় চাইরপাশে খেয়াল রাখো,’ ভারী গলার ধমকে চুপ হয়ে গেল তিনজনই। যদিও তিনজনেরই মুখে চাপা হাসি। ‘আর পারলে শব্দ কম করো। চাইরপাশে শত্রু বিদ্যমান, এর ভিতরে এমন চিল্লাপাল্লা বাদ দিয়া নজরে রাখ কোনো আলো চোহে পড়ে কি না। খাঁ সাহেবের তো কোনো নিশানাই দেখি না।’

‘আমরা ঠিক জায়গায় আছি তো?’ খুনসুটি আর চাপা হাসি সামলে মাসুম নিজের গলার স্বর যতটা সম্ভব ভারী করে বলে উঠল

‘এইখানে আসো,’ ছইয়ের ওপাশ থেকে ভারী গলার ধমক শুনে একটু ঘাবড়েই গেল মাসুম। সে ধোবল আর বরখার দিকে ফিরে চোখে ইশারা করল, দুজনেই কাঁধ ঝাঁকিয়ে এমন ভাব করল, এইবার তুমি সামলাও।

‘কী অইল, আইতে কইলাম না?’ মাসুম নড়ছে না দেখে ছইয়ের ওপাশে থাকা মানুষটা চোখের সামনে ছোটো সলতের বাতিটা তুলে বলে উঠল, ‘আরে বিয়াক্কেল, ধমকাইতে ডাকতাছি না। আইতে কইতাছি কামে।’

‘আরে আমি তো আসতে আছিলাম,’ বলে ধোবল আর বরখার দিকে কপট বাহাদুরির ভঙ্গিতে হাত নেড়ে সে দুলুনি সামলে ছইয়ের অন্যপাশে যাবার জন্যে রওনা দিলো, আর নিজেদের দিকে চোখাচোখি করতে করতে নিঃশব্দ হাসিতে ফেটে পড়ল ধোবল আর বরখা।

মাসুম ছইয়ের নিচ দিয়ে অন্যপাশে আসতেই দেখতে পেল, হাতে ছোটো আলোর নিশানাটা নিয়ে সামনের অন্ধকারের ভেতরে মনোযোগ দিয়ে কিছু একটা দেখার চেষ্টা করছে গাজীদের লাঠিয়াল বাহিনীর প্রধান বলরাম। বিশালদেহী বলরামের পায়ে ধুতি গায়ে বুক খোলা ফতুয়া, গলা মুখে গামছা প্যাঁচানো। নিজের বলশালী এক হাতে সলতের বাতি ধরে অন্যটা মুখের কাছে নিয়ে রেখেছে সে। মাসুম কাছাকাছি গেলেও সে ফিরে তাকাল না, বরং আরও মনোযোগের সাথে সামনে দেখতে দেখতে নিজের খালি হাতটা তুলে ইশারা করল। ‘আমার এলাকা আর নদীপথ আমি হাতের তালুর চেয়ে ভালো চিনি। কিন্তু পরিচিত পানি ছাইড়া আসছি আমার বিশ্বাস আরও বিশ মাইল পিছনে,’ সে সামনে দেখতে দেখতেই কথাগুলো বলে চলেছে। ‘যদি আমার হিসাব ঠিক থাইকা থাকে, তবে আমরা এখন আছি ব্রহ্মপুত্র আর শীতলক্ষ্যার মাঝামাছি জায়গাতে এইখানে পশ্চিম থেইকা,’ বলে সে হাতের ইশারায় দেখাল একদিকে। মাসুম অনুমান করল ওটা পশ্চিম দিকই হবে, তবে অন্ধকারের ভেতরে ঠিক ঠাওর করতে পারল না। ‘খাঁ সাহেবগোর আসার কথা। কারণ তাগো এলাকা ওইদিকেই। আর এই সামনে আগায় যাইতে থাকলে মোহনা পার হইয়া কিশোরগঞ্জর আর জঙ্গলমহালের দিকে যাবার কথা।’

‘বুঝলেন কীভাবে, জায়গামতো আছি, নিশানা কী?’ বলে অন্ধকারের ভেতরে দেখে নিয়ে সে আকাশের দিকে তাকাল একবার। এসব এলাকায় নদীপথে চলার উপায় আছে তিনটে; প্রথমত, হয় চেনাজানা এলাকা হতে হবে। অন্তত দলে এমন একজন থাকতে হবে যে এলাকার চৌহদ্দি চিনে। তা না হলে আকাশের তারা, আর না হলে পাড়ের নিশানা। কিন্তু মাসুম এই অন্ধকারের ভেতরে কোনোটাই ঠিকমতো দেখতে পাচ্ছে না। এমনকি আকাশও মেঘে ঢেকে আছে, তারার কোনো লক্ষণ নেই। মনে মনে সে খানিকটা শঙ্কিতই বোধ করল। ওরা ঠিক জায়গায় আছে তো? আজকের এই সময়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ওদের জন্যে। শুধু ওদের জন্যে না, বাঙাল মুলুক এবং বারো ভূঁইয়া সমাজ সবার জন্যেই বিষয়টা গুরুত্বপূর্ণ। এর পেছনে বেশ কিছু কারণ আছে। পরিস্থিতি তো আগে থেকে টান টান হয়েই ছিল। এরপরে ওইদিন ওরা মাছ ধরে ফেরার সময়ে খবর পায় ওদের জন্যে ঈশা খাঁর রাজধানী থেকে সমন এসেছে খাঁ সাহের ওদের সাথে দেখা করতে চায়। সমনটা পেয়ে মাসুম খুশি হয়ে উঠেছিল কারণ ও মনে মনে ভেবেছিল: অবশেষে এই বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেতে যাচ্ছে কিন্তু ওরা আশা করছিল হয় ওদেরকে যেতে হবে তার সাথে দেখা করতে অথবা খাঁ সাহেব নিজে আসবে ভাওয়ালে; কিন্তু দুটোর কোনোটাই ঠিক হবার আগে খবর আসে খাঁ সাহেব ওদেরকে দেখা করতে বলেছে ভিন্ন এক জায়গায়। সে নিজেও ভাওয়ালে আসবে না, আবার ওদেরকেও ডেকে পাঠানো হয়নি। বরং তারা মাঝামাঝি এলাকায় দেখা করবে। ঈশা খাঁর পাঠানো বার্তায় এটাও লেখা ছিল মাসুম যেন সাথে করে অবশ্যই ওর বন্ধু এবং সহযোদ্ধা ধোবল আর বরখাকে নিয়ে আসে। সেই সাথে আরও উল্লেখ করা ছিল ওদের এই বিশেষ জায়গায় দেখা করার পেছনে নাকি আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ আছে। ওরা যেন দেরি না করে, পারলে সময়ের আগেই পৌঁছায় এবং ওদের যাত্রা যেন অবশ্যই বেশ সঙ্গোপণে সম্পন্ন হয়।

ঈশা খাঁর পাঠানো বার্তাটা মাসুম বারবার করে পড়েছে। বার্তার ভেতরে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা তো ছিল সেই সাথে এটাও তাকে বেশ অবাক করেছে যে খাঁ সাহেব, এমনকিছু কথা বলেছে যেগুলো সাধারণ সে বলে না এবং সেই কথাগুলো শুধু একবার না বারবার করে বলা হয়েছে। এসব বিষয়ে এত বেশি জোর দেওয়ার কারণ কি ঠিক ভেবে বের করতে পারেনি মাসুম।

সে একজন যোদ্ধা, একেবারে জন্মগত ভাবেই সে যোদ্ধা। মাসুম মনে করে তার রক্তের ভেতরেই যুদ্ধের বীজ নিয়ে জন্ম নিয়েছে, যুদ্ধ করতে করতেই একদিন মারা যাবে সে। আর যদি সেটা সে করতে পারে, তবে তার জন্যে এটাই হবে সর্বোত্তম জীবন। আর যদি খাঁ সাহেবের জন্যে সে মরতে পারে, নিজের মাতৃভূমির জন্যে মরতে পারে, বন্ধুত্বের জন্যে মরতে পারে তবে এরচেয়ে বড়ো পাওয়া তার জন্যে আর কিছু হতে পারে না। তবে একজন যোদ্ধা হিসেবে মাসুম জানে-যুদ্ধের সাথে রাজনীতি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। সে নিজে রাজনীতি খুব বেশি বোঝে না, খুব বেশি বোঝার চেষ্টাও কখনও সেভাবে করেনি। কিন্তু সে এটা বোঝে যে যুদ্ধের সাথে রাজনীতির একে-অপরের সাথে জড়িয়ে থাকে। একদিকে পুরো বাঙাল মুলুক উত্তপ্ত হয়ে ওঠা, তার ওপরে আবার ওর নিজের নির্বাসন, এখন আবার কত্রাবো আক্রমণের খবর-সব মিলিয়ে পুরো ব্যাপারটাকে সে ঠিক একটা নির্দিষ্ট চিত্রে দাঁড় করাতে পারছে না। আর তাই একটা পর্যায়ে সে ভাবনা ছেড়ে দিয়ে বরং নিজের কাজে মনোযোগ দেয়। নিজের পরিবার থেকে সে দূরে আছে বেশ কিছুদিন, আর নিজের সম্বল হিসেবে প্রিয় ড্যাগার, তরবারি আর নিজের বন্ধু আর নিজের দলটাকে বাদে আর কোনোকিছুরই প্রয়োজন নেই তার। যেহেতু বন্ধুদেরকে সাথে নিয়েই সে যাবে, কাজেই নিজের দলটাকে ওর মাতৃভূমিতে ফিরে যাবার নির্দেশনা দিয়ে সে নিজের পরিবারের জন্যে একটা বার্তা লিখে ওদেরকে বিদেয় দিয়ে ধোবল আর বরখাকে নিয়ে বলরামের সাথে নির্দিষ্ট সময়ে যাত্রা দিয়ে এসে পৌঁছেছে এই মোহনাতে। সে নিজে বাঙাল ভূমির দক্ষিণের এলাকা খুব ভালোভাবে চেনে। তার পরিবারের একটা অংশ উত্তরে হবার কারণে আর ছোটোবেলা থেকে ঘুরে বেড়ানোর কারণে ওসব এলাকাও বেশ ভালোভাবে চেনা। আর পানিরই মানুষই সে, কাজেই হাতে একটা বৈঠা থাকলে উত্তাল পানি বা ভয়ঙ্কর জলজ জীব বা পানির ডাকাত কাউকেই ভয় করে না সে। কিন্তু এই এলাকা তার সেভাবে চেনা নেই। এই কারণেই বলতে গেলে প্রায় পুরোপুরি নির্ভর করছে বলরামের উদ্দেশ্য। মাসুম নিজে খানিকটা উত্তপ্ত মস্তিষ্কের মানুষ, সেই সাথে সে প্রাণচঞ্চল, ওর বন্ধু ধোবল ওর চেয়ে আরেক কাঠি সরেস, কিন্তু বরখা সেই তুলনায় ঠান্ডা। কিন্তু বলরাম লোকটা যেন ভোরের শিশিরে ভেজা ঠান্ডা পাথরের টুকরোর মতো। তাই তাকে বেশি একটা পছন্দ করে না মাসুম, কিন্তু লোকটার ভেতরে এক ধরনের নেতাসুলভ ব্যাপার আছে যেটা বেশ আস্থা যোগায়। লোকটা গাজীদের সাম্রাজ্যের শক্তিশালী খুঁটিগুলোর একটি। আর তার কাজের দক্ষতার কোনো সীমা পরিসীমা নেই। তার প্রতি মাসুমের এক ধরনের ভক্তিও আছে।

‘ওই যে ওইদিকে দেহো,’ মাসুমের করা প্রশ্ন কীভাবে সে এই জায়গাটা নির্দিষ্ট করেছে সেটার জবাবে সে নিজের একটা হাত তুলে অন্ধকারের ভেতরে একদিকে নির্দেশ করল। মাসুম তার দেখান নির্দেশনায় চোখ কুঁচকে তাকাল। নিজের দৃষ্টিকে যতটা সম্ভব গভীর করেও সে কিছু দেখতে পেল না পরিষ্কার। কই, কিছু দেখতে পাচ্ছে না বলতে গিয়েও আবছাভাবে পানির ওপরে ঢিপির মতো উঠে থাকা কিছু একটার হালকা ছায়া দেখতে পেল যেন। ‘হুম।’

‘যেইটা দেখলা ওইটা হইল কামন্তির ঢিপি, কইতে পার নদীর মধ্যে উইঠা থাকা একটা দ্বীপের মতন। কওয়া হয় ওইখানেই মোহনা শুরু হইছে। ওইটা হইল একটা নিশানা,’ বলে সে আরেক দিকে দেখাল। ওইটার বিপরীতে আর যেইদিক থেইকা আসছি সেইটা হইল দক্ষিণ পশ্চিমের নদী, আর এই দিকে আরও মাইল দশেক গেলে আরেকটা গঞ্জ পড়ব। কাজেই হিসাব অনুযায়ী খাঁ সাহেবের লোকেরা ঠিক যেইখানে আমগো আসতে কইছে আমরা সেইখানেই আছি। ভুল হওনের সম্ভাবনা যে একেবারেই নাই তা না কিন্তু—’  

‘যদি—’ মাসুম আগ্রহের সাথে ওদের অবস্থানগত বিষয়ে আরও কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল তার আগেই ওদের থেকে গজ বিশেক দূরে থাকা দ্বিতীয় নৌকাটা থেকে কেউ একজন মৃদু একটা চিৎকার করে কিছু একটা বলে উঠল। জবাবে বলতে গেলে প্রায় সাথে সাথে ঘুরে গেল বলরাম, সে শিস বাজিয়ে উঠল। তার জবাবে টলটোদিক থেকে আবোরো শিসের শব্দ ভেসে এলো।

বলরাম, নৌকার মাঝিকে কিছু নির্দেশনা দিয়ে পাটাতন থেকে নিজের তেল চকচকে বাঁশের লাঠিটা উঠিয়ে নিলো। ‘দক্ষিণপুব দিক থেইকা একটা আলোর নিশানা দেখা দিছে।’

‘এইটা কি খাঁ সাহেবের–’

মাসুমকে কথা শেষ করতে দিলো না বলরাম। ‘শত্রু, না মিত্র, না অন্য কেউ তা এখনি বোঝার কোনো উপায় নাই। যে কেউই হইতে পারে, কাজেই সবাই প্রস্তুত, তার বাক্যের শেষ শব্দটা উচ্চারণ করেই সে বেশ জোরে আবারও শিস দিয়ে উঠল। মাসুম নিজে একবার ধোবল আর বরখার দিকে দেখে নিয়ে ওদেরকে প্রস্তুত হবার ইশারা করল। নিজে আনমনেই কোমরে হাত বুলিয়ে দেখে নিলো ড্যাগারটা ঠিক জায়গামতো আছে কি না। নৌকার ছইয়ের ভিতরেই তার তরবারিটা আছে। তবে এই নৌকার যুদ্ধে সেটার চেয়ে লাঠি অনেক বেশি কাজের, কাজেই সে-ও পাটাতনে রাখা বাঁশের লাঠিগুলো থেকে একটা উঠিয়ে নিলো। সে আর বলরাম নৌকার ঠিক সামনেই, বলরামের হাতে একটা বাতি। সেটা পাটের মোটা কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা। ওদের ঠিক পেছনে ছইয়ের ওপরে নৌকার হাল ধরে বসে আছে মাঝি। আর ছইয়ের অন্যপাশে প্রস্তুত আছে ধোবল আর বরখা। ওদের সাথে আরও বেশ বড়ো আরেকটা নৌকা। ওটায় প্রস্তুত আছে রীতিমতো একটা ছোটোখাটো লাঠিয়াল বাহিনী। ওদের নৌকাটা দ্বিতীয় নৌকাটাকে খানিকটা সামনে এগিয়ে গিয়ে স্থির হয়ে রইল। উত্তাল পানিতে যতটা সম্ভব স্থির থাকা যায় আরকি। আর ওদের সাথে থাকা নৌকাটা আরও বেশ খানিকটা পেছনে গিয়ে হারিয়ে গেল অন্ধকারের ভেতরে।

পানির যুদ্ধে অভিজ্ঞ যোদ্ধা মাসুম খুব ভালো করেই জানে কী হচ্ছে আসলে এখানে। ওরা এই নৌকাটা থেকে সামনে ইশারা করবে। আর পেছনে লাঠিয়াল ভরতি যুদ্ধ নৌকাটা অন্ধকারের ভেতরে শুধু সৈন্য না, সাথে আরও দুটো ছিপ নৌকা নিয়ে প্রস্তুত থাকবে। ওরা এই নৌকা থেকে আসন্ন নৌকায় আলোর ইশারা করবে। যদি বন্ধু হয় তবে কীভাবে সেটার জবাব দিতে হবে ওরা জানাবে, প্রতি উত্তরে ওরাও নির্দিষ্ট পন্থায় ইশারা করবে। আর যদি অচেনা কেউ হয় কিংবা শত্রু হয় তবে ওরা সেই নির্দিষ্ট ইশারা জানবে না। সেক্ষেত্রে ওদেরকে যেকোনো পরিস্থিতির জন্যে প্রস্তুত থাকতে হবে।

মাসুম মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে আছে বলরামের দিকে। লোকটা একহাতে শক্ত করে ধরে আছে লাঠি, অন্য হাতে পাটের মোটা কাপড় দিয়ে ঢাকা বাতিটা। মনোযোগের সাথে তাকিয়ে আছে সামনের দিকে। মাসুম একবার সামনে দেখে নিয়ে পেছনে চোখ বুলাল নৌকার মাঝি থেকে শুরু করে প্রতিটা লোক টান টান হয়ে আছে। মাসুম জানে দ্বিতীয় নৌকারও একই অবস্থা। কিন্তু সে অবাক হয়ে দেখল বলরামের চোখে মুখে যেন কোনো বিকার নেই। সে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সামনের দিকে। মাসুম মনে মনে লোকটার স্থিরতার প্রশংসা না করে পারল না। বলরাম জানে আজকের এই মোলাকাতের গুরুত্ব কতটুকু এবং সেই সাথে এ- ও জানে পুরো বিষয়টার দায়িত্বই তার ওপরে নিহিত, তবুও সে একেবারেই স্থির এবং শান্ত আছে। মাসুম নিজের কোমরের পেছনে রাখা ড্যাগারের হাতলটা শক্ত করে চেপে ধরে সামনে ফিরে তাকাল। আগুয়ান নৌকাটা এখন অনেকটাই দৃশ্যমান। আর পানির বুকে বিচরণরত মানুষ হিসেবে জানে যেহেতু ওরা নৌকাটাকে দেখতে পাচ্ছে এর মানে ওই নৌকা থেকেও তারা এখন দৃশ্যমান। আগামী কয়েক মুহূর্তের ভেতরেই সিদ্ধান্ত হয়ে যাবে। বলরাম আচমকাই নিজের লাঠিটা একবার তুলে ধরল মাথার ওপরে। এটা সবার জন্যে একটা সতর্কবার্তা। এবার সে লাঠির ডগা দিয়ে টান দিয়ে বাতির ওপর থেকে কাপড়টা ফেলে দিলো। পরিষ্কার নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে ওপাশে। এবার দেখার বিষয় ওরা কী করে। কয়েক মহূর্তের ভেতরে ওপাশেও সরু একটা আলোর রেখা দৃশ্যমান হলো। বলরাম সাথে সাথে লাঠির ডগাটা নৌকার পাটাতনের ওপরে চেপে ধরে শরীরটাকে স্থির করে বাতিটাকে নাড়তে শুরু করল বিশেষ ভঙ্গিতে। তার নাড়ানো শেষ হতেই সে উৎসুক নয়নে তাকিয়ে রইল সামনের দিকে। আগামী কয়েক মুহূর্তের ভেতরেই নির্ধারিত হয়ে যাবে অপরপক্ষ কি শত্রু না বন্ধু। ওপাশেও আলোটা নড়তে শুরু করল।

‘ঠিক আছে,’ চূড়ান্ত স্বস্তির সাথে শব্দগুলো উচ্চারণ করে বলরাম হাতের লাঠিটাকে পাটাতনের ওপরে ফেলে অলোটাকে মুখের সামনে তুলে ধরল। ‘ওটা খাঁ সাহেবেরই নৌকা।’

স্বস্তির নিশ্বাস বয়ে গেল মাসুমের শরীরেও। ইশারায় পেছনে নির্দেশ করল সে। সবাই যার যার অস্ত্র নামিয়ে নিলো, ছইয়ের ওপরে বসে থাকা মাঝি অনুচ্চ স্বরে শিস বাজাতেই পেছনের অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া নৌকাটা ওদের পাশে এসে স্থির হয়ে গেল। ধোবল আর বরখা ছই পার হয়ে মাসুমের পাশে এসে দাঁড়াল। ‘খাঁ সাহেব কি আসছেন?’

‘আবশ্যই আসছেন,’ মাসুম দৃঢ় গলায় কথাটা বলার চেষ্টা করলেও তার গলায় সামান্য দ্বিধা। অপর দিক থেকে এগিয়ে আসা নৌকাটা ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে স্থির হয়ে গেল ওদের সামনে। ‘হেই’ বলে অনুচ্চ স্বরে চিৎকার করে সম্ভাষণ জানাল বলরাম। অপর পাশ থেকেও কেউ একজন একই সম্ভাষণ জানাল তাকে। মাসুম উৎসুক নয়নে তাকিয়ে আছে সামনের নৌকার দিকে। কিন্তু তার না তাকালেও চলত। কারণ নৌকার একেবারে সর্বাগ্রে আলো হাতে দাঁড়িয়ে থাকা দীর্ঘদেহী সুঠাম মানুষটাই ঈশা খাঁ। যদিও তার শরীরে পরে থাকা ধূসর আলখাল্লা আর কালো পাগড়ির প্রান্ত দিয়ে মুখ আড়াল করা কিন্তু এই অবয়ব চিনতে না পারার কোনো কারণই নেই মাসুমের। নৌকাটা পাশে এসে ভিড়তেই এক গাল হাসি নিয়ে নৌকার প্রান্তে দাঁড়িয়ে নিজের একটা হাত বাড়িয়ে দিলো সে ঈশা খাঁর দিকে। তার হাতটা ধরে ছোটো কিন্তু দৃঢ় পদক্ষেপে ওদের নৌকায় চলে এলো ঈশা খাঁ এবং তার সাথের দুই সঙ্গী। মাসুম সালাম জানিয়ে তার পা ছুঁতে গেলেও ঈশা খাঁ তাকে সেটা করতে দিলো না। বরং শক্ত হাতে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরল তাকে। মাসুমও তাকে তীব্র আবেগের সাথে জড়িয়ে ধরে রইল কিছুক্ষণের জন্যে। দুইজন শক্তিশালী এবং দৃঢ়চেতা মানুষ পরস্পরের প্রতি তীব্র ভাইসুলভ আবেগে আক্রান্ত হয়ে রইল কিছুক্ষণের জন্যে। নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে মাসুমের চোখের দিকে তাকিয়ে তার দুই কাঁধ শক্ত করে ধরল ঈশা খাঁ। ‘তুমি ভালো আছ, মাসুম?’ বলেই ওর মুখের একপাশে হাত বুলাল সে। মৎস্য শিকার বেশ ভালোই চলেছে মনে হচ্ছে,’ বলে সে ধোবল আর বাকিদের দিকে এক পলক বুলিয়ে নিয়ে নিজের প্রধান সেনাপতির দিকে তাকিয়ে হেসে উঠল। ঈশা খাঁর বলা কথায় খানিকটা লজ্জা পেয়ে গেল মাসুম। ‘না না, আমি ভালো আছি, এগুলো তো

চলো, ছইয়ের ভেতরে বসে কথা হবে, অনেক জরুরি কথা বলার আছে তোমারে।’ মাসুম একবার চারপাশে দেখে নিয়ে সবাইকে ভেতরে যাবার জন্যে ইশারা করল। আপনাতেই সে ঈশা খাঁর দুই সঙ্গী সরফরাজ এবং লতিফ খাঁর দিকে ফিরে সম্বোধন সুচক মাথা নাড়ল।

‘আমি বাইরেই আছি, চাইরপাশে নজর রাখতে অইবে,’ বলে মাসুমের উদ্দেশ্যে একবার মাথা নাড়ল বলরাম।

পরবর্তী কিছুক্ষণের ভেতরেই নৌকার ছইয়ের ভেতরে আলোচনা জমে উঠল ‘খাঁ সাহেব, পরিস্থিতি কি আসলে? শুনলাম শত্রুরা নাকি—’

ঈশা খাঁ আপনাতেই খানিকটা ফিক করে হেসে উঠতেই মাসুম বেশ অবাক হয়ে তাকাল তার দিকে। সে ফিরে তাকিয়ে দেখল ধোবল আর বরখাও বেশ অবাক হয়েছে ওর প্রশ্নের জবাবে ঈশা খাঁর হাসি দেখে। কিন্তু ঈশা খাঁ তার দিকে তাকিয়ে নেই, সে বরং তাকিয়ে আছে তার দুই সঙ্গী লতিফ খাঁ আর সরফরাজের মুখের দিকে। ‘কি বলছিলাম না, কাজ হইছে?’ বলে সে ফিরে তাকাল মাসুমের দিকে। ‘আসলে সোনারগাঁওয়ের পতন হয় নাই শত্রুরা কত্রাবো দখল করে নিছে। আর সোনারগাঁও থেইকা আমরা সরে আসছি।’

মাসুম ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে ঈশা খাঁর দিকে। ‘আমি ঠিক বুঝলাম না, চাইরপাশে খবর ছড়াইছে সোনারগাঁও নাকি শত্রুরা দখল করছে। আপনি বললেন সোনারগাঁও না কত্রাবো; কিন্তু আমার প্রশ্ন হইলে,’ ঈশা খাঁ মনোযোগের সাথে তাকিয়ে আছে মাসুমের দিকে। অপেক্ষা করছে ওর প্রশ্নের জন্যে।

‘প্রথম কথা হইল, আপনি নিজেই বললেন আপনারা নিজে থেকেই সোনারগাঁও ছাইড়া পিছনে আসছেন। ঘটছে একটা, কথা ছড়াইছে ভিন্ন, এইটা কীভাবে হইল, আর যদি ওরা কত্রাবো দখল কইরাও থাকে সেইটাও কি বিপদের কথা না, তাইলে তো আপনাদের আরও শক্ত হাতে সোনারগাঁও প্রতিরোধ গইড়া তোলার দরকার আছিল।’

‘এইজন্যেই আমি তোমারে পছন্দ করি,’ ঈশা খাঁ একটা হাত তুলল মাসুমের দিকে। ‘তুমি সঠিক জায়গায়টা সবসময় ধরতে পারো সহজে,’ বলে সে পানপাত্র থেকে একটা সুপুরি তুলে মুখে পুরে দিলো। শতরঞ্জ খেলছো কখনও?’ মাসুম কিছু না বলে চুপ করে তাকিয়ে রইল ঈশা খাঁর দিকে। সে বোঝার চেষ্টা করছে খাঁ সাহেব আসলে কী বলতে চাইছে। ‘শতরঞ্জের বাজিতে কখনও কখনও শত্রুরে কাবু করতে হইলে খেলার ঘুঁটি যেমন আগে বাড়াইতে হয়, আবার কখনও কখনও পিছাইতেও হয়। কিন্তু পিছানোর মানে কিন্তু এই না যে ময়দান ছাইড়া দেওয়া হইছে। এইটা স্রেফ চালমাত্র,’ বলে সে আননেই মাথা নাড়ল। ‘শোনো, এইগুলা হইল চাল মাত্র। প্রথম কথা হইল, মোঘলরা গত কয়েক বছরে আমগোর লগে বারবার লাইগাও কিছুই করতে পারে নাই। এই কারণেই এইবার ওরা খুব শক্ত হইয়া লাগছে। মানসিংহের বাঙাল মুলুকে পাঠানো এইডাই প্রমাণ করে। তুমি কি জানো মানসিংহ বাঙাল মুলুকে আসার পর থেইকা এখন পর্যন্ত কী করছে?

মাসুম আনমনেই মাথা নাড়ল, কারণ সে আসলে জানে না মানসিংহ বাঙাল মুলুকে আসার পর থেকে কী করেছে। ‘আমার ধারণা তুমি জানো না সে কী করছে, ক্যান জানো না জানো? কারণ সে কিছুই করে নাই। মানসিংহের মতো এত বড়ো। মাপের একজন মোঘল সেনাপতি বাংলায় আসল, আসার পরে এতদিন ধইরা নিজের রাজধানী স্থানান্তর বাদে আর কিছুই করতাছে না, এইটা কি তোমাদের কাছে স্বাভাবিক মনে হয়?’ বলে সে ওদের তিনজনের দিকে দেখে নিলো একবার। ‘আবার সে আসার ঠিক পর দিয়াই মল্লারের যুদ্ধ লাগল আবার যুদ্ধের ঠিক পরেই তোমার সাথে ওগো যেমন গোল বাঁধলো, ঠিক তেমন গোল বাঁধতাছে সবখানে। তোমার কি মনে হয় না এইগুলা সব মোঘলগোর চালেরই অংশবিশেষ। মানসিংহ এখন কই আছে জানো? সে আছে এগারো সিন্ধুর কাছাকাছি। বলে সে নিজের একটা আঙুল রাখল পাটাতনের ওপরে।

‘ধর এইখানে,’ নিজের আঙুলটা দেখাল। ‘তোমার এলাকাটা এইখানে, এরপরে বিক্রমাদিত্য, এরপরে সোনারগাঁও বলে সে আঙুল দিয়ে একটা বৃত্ত রচনা করতে শুরু করল। ‘চাইরপাশে একের-পর-এক ঘটনা ঘটতাছে। আর সে ঠিক কেন্দ্রে বইসা আছে। কেন জানো? সে আসলে নিজের জাল বিছাইতাছে। আর ধীরে ধীরে খুব সাবধানে নিজের জালটারে গুটায়া আনতাছে। সে জানে আমার লোকেরা একের-পর-এক ঝামেলার সম্মুখীন হইলে আমার শক্তি কমতে থাকব। এরই অংশ হিসেবে সে কত্রাবো আক্রমণ চালাইছিল। তার ইচ্ছা ছিল স্রেফ ভয় দেখানো। কিন্তু আমরা এমনভাবে পিছে হটছি ওরা কত্রাবো দখলও কইরা ফালাইছে, আবার সোনারগাঁও থেইকা ইচ্ছা কইরা পিছানি হইছে যাতে ওইটাও ওরা দখল করতে পারে। কিন্তু আসলে ওইগুলা ওরা চাইলেই দখল এমনেও করতে পারত। বরং এখন যেমনে দখল করতাছে তাতে ওরা বেশিদিন এইগুলার একটাও ধইরা রাখতে পারবো না। এইটা আমগো চাল।’

‘কত্রাবো কি শাহবাজ খাঁ—’ মাসুম প্রশ্ন শেষ করার অগেই ঈশা খাঁ বলে উঠল, ‘নাহ, দুর্জন সিং দখল করছে।

মাসুম চট করে চোখ তুলে তাকাল তার দিকে। ‘মোঘল সেনাপতি দুর্জন সিং? মানসিংহের মেয়ের জামাই?’

ঈশা খাঁকে এই প্রথমবারের মতো খানিকটা চিন্তিত মনে হলো মাসুমের কাছে। ‘তাইলে শাহবাজ খাঁ কই?’ প্রশ্নটা যেন আপনাতেই বেরিয়ে গেল মাসুমের মুখ দিয়ে।

‘শাহবাজ খাঁ কই—তারচেয়েও বড়ো একটা সমস্যা দেখা দিছে,’ ঈশা খাঁ আরেকবার সুপুরি তুলে মুখে পুরে দিলো। ‘তুমি কি জানো জঙ্গলমহালের পতন হইছে?’

মাসুম আবারও খুব অবাক হয়ে ফিরে তাকাল ঈশা খাঁর দিকে। ‘জঙ্গলমহাল, সুবাদার আসলাম শেঠের জঙ্গলমহাল?’ মাসুম জানে সুবাদার আসলাম শেঠ নিজে সরাসরি বারো ভূঁইয়াদের একজন না হইলেও সে বাঙাল মুলুকে বারো ভূঁইয়াদের।

শক্ত খুঁটিগুলোর একটি এবং জঙ্গলমহাল সবচেয়ে শক্তিশালী দুর্গগুলোর একটি কিন্তু তবুও সে বেশ অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে ঈশা খাঁর দিকে। নিজের রাজধানীর পতনে যে মানুষটা মোটেও বিচলিত নয়, সেই মানুষটাই কি না স্রেফ একটা দুর্গের পতনে এতটা বিচলিত বোধ করছে, কারণ কী? কিন্তু সে জবাব দেবার আগে ঈশা খাঁ কথা বলে উঠল।

‘তুমি হয়তো ভাবছ, নিজের রাজধানীর পতনে আমি বিচলিত নই, তবে জঙ্গলমহালের পতনে এতটা অস্থির হয়া উঠতাছি কেন? তুমি সুবাদার আসলামরে কতটা চিনতা?’ ঈশা খাঁ গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মাসুমের দিকে।

‘তার সাথে একাধিকবার মোলাকাত হইছে কিন্তু অতোটা গভীরভাবে চেনার সুযোগ হয় নাই,’ মাসুমের মনে পড়ল শেষবার যখন সুবাদার আসলামের সাথে ওর দেখা হয়েছিল বিভিন্ন দেশে যুদ্ধের কৌশল নিয়ে লম্বা আলোচনা হয়েছিল দুজনার মাঝে। সে আগে থেকেই জানত মানুষটার গভীর জ্ঞানের কথা কিন্তু সেদিন টের পেয়েছিল: বহুদেশ ঘোরা মানুষটার অভিজ্ঞতা আর জ্ঞানের ঝুলি আসলে লোকমুখে যতটা প্রচলিত বাস্তবে তারচেয়েও অনেক বেশি।

‘আমার দেখা সবচেয়ে চতুর, শক্তিশালী এবং বুদ্ধিমান মানুষ ছিল সুবাদার আসলাম শেঠ। বহু দেশ-বিদেশ ঘুরলেও এই দেশ এই মাটির প্রতি তার ভালোবাসা ছিল অপরিসীম। তোমাকে একটা কথা বলি, মোঘলরা যেভাবে পুরো বঙ্গদেশ, বিশেষ করে বারো ভূঁইয়াদের পিছনে লাগছে, তাতে একটা বিষয় পরিষ্কার যে ওরা এর শেষ না দেইখা ছাড়বে না। আর একটা যুদ্ধ যে আসন্ন সেইটা ফিরানোর কোনো উপায় নাই। একদিকে ওরা ওগো সব জাল গুটায়া আনতাছে, অন্যদিকে, আমরা নানা কৌশল করতেছি জালটারে ছিদ্র কইরা বাইর হবার। কিন্তু একটা সময় গিয়া যুদ্ধে নামতেই হবে। আর সেইটা যখন হবে, অগোরে প্রতিহত করার মতন শক্তি কিন্তু আমগো নাই। এইখানেই দেখা দেয় জঙ্গলমহালের ভূমিকা,’ এই পর্যন্ত বলে ঈশা খাঁ খানিকটা বিরতি নিলো, একজনকে পানি দিতে বলে আবারও শুরু করল সে।

‘জীবনের বহু বছর সুবাদার আসলাম পারস্যতে কাটায়া ফিরা আসে গেল বছর। তার স্ত্রীও কিন্তু পারস্যের। আসার পর তার সাথে আমার দেখা করার কথা ছিল, নানা ঝামেলায় সেইটা হয়ে ওঠে নাই। আর এর ঠিক পরেই লাগল মল্লারের যুদ্ধ। কিছুদিন আগে সে আমার সাথে গোপনে দেখা করতে আসছিল, সে আমাকে জানাইছিল তার কাছে এমনকিছু একটা আছে যা মোঘলগোর লগে আমগো পুরা যুদ্ধের গতি পালটাইয়া দিতে পারে। কিন্তু সেইটার প্রস্তুতির জন্যে তার আরও কিছু সময় লাগব এইরকমও বলছিল সে। কিন্তু সে বাড়ি ফিরা যাবার কিছুদিন পরেই তার জঙ্গলমাহলে আচমকা আক্রমণ হয় এবং আক্রমণ করে মোঘলগোর সবচেয়ে হিংস্র সেনাপতি বাহরাম খাঁ। ওরা পুরা এলাকা অবরোধ কইরা আক্রমণ চালায়। কিন্তু জঙ্গলমহালের ব্যাপারে তো তুমি জানই। ওরা নিজেগোর অবস্থান ধইরা রাখে। একটা পর্যায়ে আর পারে নাই। জনমুখে অনেক কথাই প্রচলিত অইছে কিন্তু একটা মাধ্যম এরকম বলে যে শেষ দিকে নাকি আসলাম শেঠ নিজের লোকগোরে নিয়া নিজেই দুর্গের পতন ঘটাইছে।’

‘কিন্তু সে ওরকম করবে ক্যান?’ মাসুম বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করছে।

‘সেইটা আমরা কেউই সঠিকভাবে জানি না। কিন্তু ধারণা করতে পারি,’ ঈশা খাঁ চিন্তিত ভঙ্গিতে নিজের দাড়িতে হাত বুলাতে বুলাতে বলে উঠল। ‘তার কাছে যাই ছিল সেইটা যাতে শত্রুর হাতে না পড়ে সেইজন্যে সম্ভবত নিজের লোকদেরকে পালানোর সুযোগ করে দেওয়ার জন্যেই সে কাজটা করেছে। এইটা স্রেফ আমরা ধারণা করতে পারি, আর জনশ্রুতিও তাই বলে।’

‘তারমানে আপনি বলতাছেন, আসলাম শেঠের কাছে যাই ছিল না কেন, সেইটা শত্রুর হাতে পড়ে নাই এখনও,’ মাসুম বলে উঠল।

‘এইখানে আমার একটা কথা আছে,’ অনেকক্ষণ পর মাসুমের পাশ থেকে বরখা বলে উঠল। ‘আমার জানামতে ওই এলাকাতে রসুল খাঁর রাজ্য সবচেয়ে কাছে। সে ক্যান তাগোরে সাহায্য করল না?’

‘কারণ অনেকগুলা আছে,’ ঈশা খাঁ একটা আঙুল তুলল। ‘এরমধ্যে অন্যতম দুইটা কারণ হইল, মোঘলরা এমনভাবে জঙ্গলমহাল ঘিরা ধরছিল যে যেদিকে রসুল খাঁর রাজ্য সেদিকে যাবার কোনো উপায় ছিল না ওগো। তার ওপরে ওই এলাকার অবস্থানগত বিষয়টাও মাথায় রাখতে অইব। নদী আর খাল-বিল বিধৌত ওই এলাকা অত্যন্ত ভয়ঙ্কর জঙ্গুলে এলাকা। ওইখান থেইকা আবার মেঘালয়, আসামের সংযোগ আছে। ওইখানে একদিকে মোঘল বাহিনী, হাওড়ের ডাকাইত থেকে শুরু কইরা সব রকমের বিপজ্জনক লোকজনের আনাগোনা।’

‘আপনে ডরাইতেছেন আসলাম শেঠের জঙ্গলমহাল থেইকা যদি কেউ পলাইয়াও থাকে সে বেশিদিন টিকতে পারবো না।’

‘তারচেয়েও বড়ো কথা, আসলাম শেঠের ওইখানে যা আছিল সেইটা ভুল লোকের হাতে পড়লে ভয়াবহ বিপদ, পরিস্থিতি এমনিতেই এরপরে কী অইবে আমরা কেউই জানি না।’

মাসুম বড়ো করে একবার নিশ্বাস নিলো। ‘আমার জন্যে আপনার নির্দেশনা কী?’

‘আমি চাই তুমি ধোবল আর বরখারে নিয়া মহেশ্বরদী পরগনা পার হয়া ব্রহ্মপুত্র আর শীতলক্ষ্যা দিয়া নৌপথে জঙ্গলমহালের কাছাকাছি চইলা যাও। আমি প্রথমে ভাবছিলাম ফজল গাজীর চৌরা থেইকা বড়ো বাহিনীসহ তোমগোরে পাঠাবো। কিন্তু ওইখানে এখন বড়ো বাহিনী গেলেই সমস্যা হবে। তারচেয়ে তোমরা তিনজন যাও, একটা ভ্রু উঁচু হলো তার। ‘মাসুম, তুমি আমার ছোটো ভাইয়ের মতো, বলতে দ্বিধা নাই তুমি বাঙাল মুলুকের সেরা যোদ্ধাদের একজন। বিশেষ করে তুমি সেইসব গুটিকয় যোদ্ধাদের একজন যারা মোঘলদের কাছ থেকেই যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিয়ে যোদ্ধা হইছে। সেই সাথে বাংলার মাটির জল-কাদা সবচেয়ে ভালো বোঝে এবং চেনে। মিঠা পানির যুদ্ধে তোমার সমকক্ষও কেউ নাই। কাজেই একদিকে তুমিই সবচেয়ে ভালো বুঝতে পারবা মোঘলগোর পরবর্তী পদক্ষেপ, সেই সাথে তুমিই সবচেয়ে ভালো ধরতে পারবা ওইখানে আসলে কী হইতাছে। আর কী করতে হবে,’ বলে ঈশা খাঁ দীর্ঘ একটা নিশ্বাস ছাড়ল। ‘শুধু একটা অনুরোধ, পাগলামি কইর না, কোনো কিছু নিয়াই অস্থির হয়ো না।

ঈশা খাঁর প্রশ্নের সরাসরি কোনো জবাব না দিয়ে মাসুম ভিন্ন কথা বলে উঠল। ‘ওদিকের পানি আমি খুব ভালো বুঝি এই ব্যাপারে কোনো দ্বিধা নাই। কিন্তু ওইখানে আসলে হচ্ছেটা কী আমাকে বুঝতে হবে। আপনার কাছ থেইকা যা শুনলাম সেইটা অপ্রতুল, সেই সাথে-’

‘তোমার রসদ লাগব, তথ্য থেকে শুরু করে অস্ত্র এমনকি লোকবলও,’ ঈশা খাঁ আপনাতেই মাথা নাড়ল। ‘আমি জানি, আমি এই কারণেই গাজীকে বলেছিলাম দুটো নৌকায় করে তোমাদের পাঠাইতে, তোমরা এখান থেকে দুটো নৌকার একটা নিয়া যাবা, পালের যেটা সেইটা নিয়া যাবে। তাড়াতাড়ি যাওয়া যাবে। এরপরে এইখান থেইকা শীতলক্ষ্যা দিয়া ব্ৰহ্মপুত্ৰ দিয়া চইলা যাব সোজা রসুল খাঁর এলাকায়। ওইখানে যাবার পর আমার বিশ্বাস তুমি সব বুঝতে পারবা কীভাবে কই যাইতে হবে, কী করতে হবে, রসুল খাঁ নিজে আমারে বার্তা পাঠায়া সব বলে নাই। কারণ বার্তা অন্য লোকের হাতে পইরা যাবার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু আমার বিশ্বাস তুমি গেলে সে সব বিস্তারিত তো বলবেই সেই সাথে তোমার যা যা লাগে সব দিয়া সে তোমারে সাহায্য করবে।’

‘বুঝতে পারছি,’ আনমনেই মাথা নেড়ে মাসুম একবার ধোবল আর বরখার দিকে দেখে নিলো। ঈশা খাঁর সামনে দুজনেই খুব স্বাভাবিক মুখে ভদ্র ছেলের মতো বসে থাকলেও মাসুম জানে ওরা দুজনেও ওর মতোই ভেতরে ভেতরে উত্তেজনায় ফেটে পড়ছে। কারণ ঠিক ওর মতোই ওরাও অভিযানের গন্ধ পেয়েছে।

‘ঠিক আছে, আমরা এইখান থেইকাই রওনা দিব, আর বলরাম?’

‘ওরে বলো গাজীদের এলাকা চৌরায় ফিরা যাইতে। গাজীদের জন্যে আমার কিছু বিশেষ বার্তা আছে।’

‘আপনি এইখান থেইকা কই যাবেন?’ মাসুম জানে এই পরিস্থিতিতে এই প্রশ্ন করাটা ওর আসলে উচিত হচ্ছে না, কিন্তু প্রশ্নটা না করেও সে থাকতে পারল না।

ঈশা খাঁ সরাসরি কোনো উত্তর না দিয়ে দাড়িতে একবার হাত বুলিয়ে নিয়ে মুদু হেসে উঠল। ‘আমার এখন অনেক কাজ, আর দিল্লি থেকে বন্ধু আসছে, তার জন্যে তো আয়োজন করতে হবে,’ বলে সে বাকিদেরকে ছইয়ের বাইরে যাবার নির্দেশ দিলো। ‘মাসুম তোমার সাথে আমার আলাপ আছে। বসো।’

ওদের আলাপচারিতা শেষ হবার পর ছইয়ের ভেতরে কুঁজো হয়ে উঠে বাইরের দিকে রওনা দিলো ওরা। ছইয়ের বাইরে এসে ঈশা খাঁ বলে উঠল, ‘মাসুম, আমি বলরামের সাথে কথা বলব অন্য নৌকায় গিয়ে। তোমার কাছ থেকে এইখানেই বিদায় নিব। সরফরাজ আর লতিফ খাঁ তোমারে কিছু জিনিস বিস্তারিত বুঝায়া দিবে,’ বলে সে মাসুমের চোখে চোখ রেখে তার কাঁধে হাত রাখল। মুহূর্তের জন্যে কাঁধটাকে শক্তহাতে ঝাঁকি দিয়ে সে জড়িয়ে ধরল মাসুমকে।

‘মাসুম, তুমি তো বুঝতেই পারতাছ, তোমার এবং তোমাদের এই অভিযানের ওপরে অনেক কিছুই নির্ভর করতাছে। কাজেই তুমি তোমার সেরাটা দিয়া চেষ্টা করবা আমি জানি, কিন্তু আমি এইটাও জানি পরিস্থিতি খুব বেশি সুবিধার না। কাজেই—’ সে বাক্যটা শেষ না করে মাসুমের হাত ঝাঁকিয়ে দিয়ে পা রাখল অন্য নৌকায় মাসুম চোখ ফিরিয়ে একবার ধোবল আর বরখাকে দেখে নিয়ে ফিরে তাকাল অন্ধকার পানির দিকে।

ধীরে ধীরে মুখে ফুটে উঠল এক টুকরো ঠান্ডা হাসি। বহুদিন পর এমন একটা কাজ এসেছে যার জন্যে সে জীবন বিলিয়ে দিতেও প্রস্তুত, কিন্তু সেটা সঠিকভাবে সঠিক পথে বিলিয়ে দিতে পারবে তো?

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *