অধ্যায় বিশ
বর্তমান সময়,
চাঙ্খার পুল এলাকা, ঢাকা
.
‘আমাকে আগে একটা কথা বলেন, পুরো বিষয়টা কী নিয়ে?’ বাশার খেতে খেতে সালাদের প্লেট থেকে একটা কাঁচামরিচ তুলে নিয়ে সেটাকে চৌধুরীর দিকে পিস্তলের মতো তাক করে জানতে চাইল।
চৌধুরী খেতে খেতে আনমনেই মাথা নেড়ে জবাব দিলো। ‘তোমাদেরকে তো আগেই বলেছি পুরো ব্যাপারটা আসলে কী নিয়ে, সেটা এমনকি আমিও পরিষ্কার জানি না। তবে যেটুকু জানি সেটুকু বলছি,’ বলে সে মৃদু হেসে উঠল। ‘একটা অবাক করা তথ্য দিয়ে শুরু করি, এখনকার আলোচনায় বারবার শুধু প্রফেসর ইফতেখার আর প্রফেসর আবদেলের নাম এলেও গোটা ব্যাপারটা কিন্তু তারা শুরু করেননি। এর শুরুর ব্যক্তিটা ছিল একেবারেই ভিন্ন কেউ।’
‘কে?’ বাশার খাওয়া থামিয়ে জানতে চাইল।
সবাই তাকিয়ে আছে চৌধুরীর দিকে। ব্যাপারটা চৌধুরীও অনুধাবন করছে আর তাই সে নাটকীয়তার সুযোগটা ছাড়ল না। মদু হেসে সে ফিরে তাকাল পৃথার দিকে। ‘মানুষটা আর কেউ না…তোমার মা, গোটা ব্যাপারটা শুরু হয়েছিল তোমার মায়ের থেকে।’
‘হোয়াট!’ শব্দটা এতটাই জোরে উচ্চারণ করল পৃথা আশপাশের টেবিলে খেতে থাকা লোকজন ফিরে তাকাল তাদের দিকে। মুখ থেকে আরেকটু হলে পরোটা আর ডিম ভাজির টুকরো পড়ে যাচ্ছিল তার।
ওরা এই মুহূর্তে অবস্থান করছে পুরনো ঢাকার কাছাকাছি চাঙ্খার পুল এলাকার একটা রেস্টুরেন্টে। এই জায়গার হোটেল রেস্টুরেন্টগুলো বলতে গেলে সারারাতই খোলা থাকে, কারণ এখানে সবসময় লোকজনের সমাগম থাকেই বিশেষ করে বুয়েট, ঢাকা ইউনিভার্সিটিসহ আশপাশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছেলেপেলেরা প্রায়ই রাত বিরাতে খেতে আসে এখানে। আর তাছাড়া জায়গাটা বেশ জনবহুলও বটে। তাই বলতে গেলে ওদের জন্যে নিরাপদও।
এই রেস্টুরেন্টগুলোতে খেতে এসে বাশারেরও বেশ একটা নস্টালজিয়া ফিল হচ্ছে। ভার্সিটিতে পড়ার সময়ে সে একুশে হলে থাকত আর, সেখানে থাকা অবস্থায় এখানেই ছিল তার নিয়মিত যাতায়াত আর খাবারের আয়োজন। বিশেষ করে রাজুর সাথে এখানে কতবার এসেছে ইয়ত্তা নেই। একটা সময় ছিল বন্ধুরা মিলে কয়েকদিন পর পর চাঙ্খার পুলের কালা ভুনা না খেলে জীবন বৃথা মনে হতো। হায় রে, জীবন মানুষকে কোথা থেকে কোথায় নিয়ে যায়।
‘আপনার কথাটা আমি ঠিক বুঝতে পারিনি,’ পৃথা প্রথমে ভীষণ অবাক হয়ে গেলেও নিজেকে সামলে নিয়ে সে বলে উঠল, ‘আপনি কি আমার মায়ের কথা বলছেন?’
চৌধুরী তার দিকে তাকিয়ে হেসে উঠল, ‘জি, পৃথা। আমি তোমার মায়ের কথাই বলছি। প্রফেসর ইলা হাসান মাহমুদ।’
‘এক মিনিট, উনার নাম শুধু ইলা হাসান, আমি এবং আমার মা, আমরা দুজনেই আমাদের নাম থেকে মাহমুদ অংশটুক এফিডেভিট করে বাদ দিয়েছি, কাজেই ওটা আর বলার প্রয়োজন নেই,’ ঝাঁঝের সাথে বলে উঠল পৃথা। বাশার মনোযোগের সাথে দেখছে তাকে।
‘ওকে। ইলা হাসান, মানে তোমার মায়ের কথাই বলছি। পুরো ব্যাপারটাতে বারবার প্রফেসর ইফতেখার আর আবদেলের বিষয়টা এলেও শুরুটা তাদের হাত ধরে হয়নি। শুরুটা হয়েছিল প্রফেসর ইলার মাধ্যমে।’
‘আর ইউ শিয়োর?’ পৃথা আবারও প্রশ্ন করল। সে খাওয়া পুরোপুরি থামিয়ে চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে আছে।
‘আমি ব্যাখ্যা করছি, প্রফেসর ইলার জন্ম বাংলাদেশে হলেও খুব অল্প বয়সেই ঊনি লন্ডনে চলে যান। সেখানেই বড়ো হয়ে ওঠেন এবং প্রফেসর ইফতেখারের সাথে ওখানেই তার পরিচয় এবং বিয়ে হয়। প্রফেসর ইফতেখার তখন অন্য বিষয় নিয়ে স্টাডি করছিলেন। আর ডক্টর ইলার গবেষণার বিষয় ছিল মধ্যপ্রাচ্য এবং ভারতের মাইগ্রেটরি সিস্টেম নিয়ে। উনি আসলে পুরোপুরি আর্কিয়োলজিস্ট ছিলেন না। উনার পড়ালেখার বিষয় ছিল এনথ্রোপলজি এবং আর্কিয়োলজির মিক্সড। এখন যা ঘটছে এই সমস্ত ঘটনার বেশ অনেক বছর আগে উনি একটা বিশেষ কাজে বাংলাদেশে আসেন। বাংলাদেশ সরকারের সাথে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বেশ বড়ো একটা প্রজেক্টের কাজে এসেছিলেন উনি। তখন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরটা সেগুন বাগিচায় ছিল, ওটাকে তখন ধীরে ধীরে আগারগাঁও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে স্থানান্তর করা হচ্ছিল। সেইসময়ে উনি কিছু একটার সন্ধান পান, ব্যাপারটার সাথে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, দেশভাগ এবং সিপাহী বিদ্রোহেরও সংযোগ আছে এবং ওটার একটা বড়ো অংশ জড়িয়ে আছে ব্রিটিশ ভারত, শায়েস্তা খাঁ এমনকি বাংলার মোঘল সুবাদার শাহ সুজা এবং তার আগে বারো ভূঁইয়াদের সাথে,’ বলে সে কাঁধ ঝাঁকাল। ‘আমি তো আর বিস্তারিত বিষয়টা জানি না। কিন্তু উনি ইতিহাসের সাথে সংযুক্ত এমন কিছু একটার সংযোগ পেয়েছিলেন যেটা ওতোপ্রতোভাবে ভারতবর্ষের ইতিহাসের সাথে জড়িয়ে আছে। শুধু ভারতবর্ষ বললে ভুল হবে, বলতে গেলে প্রায় পুরো বিশ্ব ইতিহাসের সাথেই জড়িয়ে আছে। উনি এটা নিয়ে বেশ কিছুদিন কাজ করার পর ইংল্যান্ডে ফিরে গিয়ে সম্ভবত প্রফেসরের সঙ্গে বিশদভাবে বিষয়টা শেয়ার করেন। প্রফেসর ইফতেখার দীর্ঘদিন কাজ করতে করতে বিরক্ত হয়ে উনার ফিল্ড অব স্টাডি পরিবর্তন করতে চাইছিলেন এবং এটাই তার জন্যে বিরাট একটা সুযোগ হয়ে দেখা দেয়। উনি প্রফেসর ইলাকে নিয়ে বাংলাদেশে চলে আসেন। এরপরের ঘটনা আমার কাছে ঠিক পরিষ্কার না, প্রফেসর ইফতেখারও এই বিষয়ে কথা উঠলে পরিষ্কার কিছু বলতেন না। সম্ভবত এই সময়েই দুজনার ভেতরে সম্পর্ক খারাপ হতে শুরু করে এবং প্রফেসর ইলা আবারও ইংল্যান্ডে ফিরে যান। প্রফেসর ইফতেখারের তখন আরেকজন পার্টনার প্রয়োজন ছিল যে-তার মতোই স্কলার হবে এবং এই ফিল্ডে দক্ষতা থাকবে। এরপরে উনারা দুজনে কাজ শুরু করে।’
এবার সোহেল জানতে চাইল, ‘ইতিহাসের এতগুলো বিষয় এর সাথে জড়িত, ব্যাপারটা কী হতে পারে? কোনো ধরনের কন্সপিরেসি-’
‘ট্রেজার হতে পারে—’ পৃথা যোগ করল।
‘ট্রেজারের বিষয়ে আমাদের সেকশনের প্রধান হাবিব আনোয়ার পাশা স্যারও বলেছেন,’ বাশার বলে উঠল। ‘মোঘলদের হারানো কোনো ট্রেজারের সাথে নাকি রাজদ্রোহীর রহস্যের যোগসূত্র থাকতে পারে।’
চৌধুরী কাঁধ ঝাঁকাল। হতে পারে আবার নাও পারে, আবার ভিন্ন কিছুও হতে পারে। আমি তো বলেছি প্রফেসর আবদেল আর প্রফেসর ইফতেখার খুব সাবধানে এবং গোপনীয়তা বজায় রেখে কাজ করতেন। আর আমাকে এমনভাবে কাজগুলো দেখাতেন বা দিতেন যে কখনও হাতির ঠ্যাঙ, কখনও শুঁড়, আবার কখনও কান দেখতে পেতাম। কাজেই এগুলো সব একসাথে মিলিয়ে পুরো হাতিটা কেমন সেটা আমি বুঝতেই পারিনি। এবং এখন এটা পরিষ্কার অনুধাবন করতে পারি যে আসলে উনারাই আমাকে বুঝতে দেননি। তবে ট্রেজারের ব্যাপারটা মেলে, কারণ শাহ সুজার যে সময়টার কথা আমরা বলছি সেই সময়টা নিয়ে কাজ করার সময়ে কিছু জিনিস দেখার সুযোগ হয়েছিল আমার। সেটা একটা সম্ভাবনা হতে পারে।’
‘ট্রেজারের ব্যাপারটা আরও বেশি সম্ভাবনাময় কারণ এরকম কিছু একটার ইনভলভমেন্ট না থাকলে রেলিক বা নেক্রপলিসের মতো সংগঠনগুলো এসব ক্ষেত্রে এতটা আগ্রহ দেখাতো না,’ বাশার অনেকটা মন্তব্য করার মতো করে বলে উঠল অর্গানাইজেশন দুটোর কথাও সে এবারই প্রথম মেনশন করল। ‘কাজেই ট্রেজারের বিষয়টা যায়।’
‘কিন্তু এখানে একটা কথা আছে,’ চৌধুরী খাওয়া শেষে করে আশপাশে তাকিয়ে বলে উঠল। ‘চা পাওয়া যাবে?’ বাশার চা অর্ডার দিতেই সে আবারও বলতে শুরু করল। ‘ট্রেজার ব্যাপারটার ভেতরেও কিন্তু রকমফের আছে। যেমন তোমরা ময়মনসিংহে যে টুইন কালী উদ্ধার করেছ এটাও কিন্তু একধরনের ট্রেজার, আবার সিলেটে ব্ল্যাক বুদ্ধা পাওয়া গেছে এটাও এক ধরনের ট্রেজার।’
‘সেটাই,’ বলে মৃদু হেসে উঠল সোহেল। ‘আগের দিনের বাংলা কিংবা হিন্দি সিনেমায় যেভাবে দেখাত যে, শুধু মণি-মুক্তা, হীরে-জহরত আর মোহরই যে ট্রেজার হবে, তা কিন্তু না। ধরেন কেউ একজন কোনো জায়গায় অনেক পুরানো কোনো ফসিল খুঁজে পেল কিংবা অনেক মূল্যবান কোনো ধাতু খুঁজে পেল সেটাও কিন্তু ট্রেজার। ক্ষেত্রবিশেষে এগুলো আরও অনেক বেশি দামি ট্রেজার।’
‘তারমানে তোমরা বলতে চাইছ-প্রফেসর আবদেল বা ইফতেখার কিংবা পৃথার মা ম্যাডাম ইলা, তারা যেটার সাথেই সংশ্লিষ্ট ছিল সেটা যেকোনো কিছুই হতে পারে?’ দশার চিন্তিত ভঙ্গিতে বলে উঠল।
‘হ্যা, তবে সেটা যাই হোক না কেন এটা অনেক অনেক বড়ো কিছু, আর যদি প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী ট্রেজার হয়ও তবে সেটা পুরো ব্যাপারটার একটা অংশমাত্র হবে, গোটা ব্যাপারটা আরও অনেক অনেক বড়ো কিছু
‘তা না হলে ইতিহাসের এতগুলো অংশের সাথে এত মানুষ এভাবে জড়িয়ে যেত না,’ পৃথা ফোড়ন কাটল। ‘এতগুলো জীবনও এভাবে নষ্ট হতো না।’
‘মোদ্দা কথা, গোটা ব্যাপারটা যাই হোক না কেন, আর এই মুহূর্তে যে অবস্থানেই থাকুক না কেন, এটা বুঝতে হলে কিংবা এর ব্যাপারে জানতে হলে একমাত্র উপায় যেকোনোভাবে প্রফেসর ইফতেখারের কাছে পৌঁছানো।’
‘-এবং দ্রুত পৌঁছানো,’ বাশার মাথা ঝাঁকিয়ে বলে উঠল। ‘কোত্থেকে শুরু করব আমরা?’ প্রশ্নটা সে পৃথা এবং চৌধুরী দুজনের দিকে তাকিয়েই করেছে।
পৃথা কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলে উঠল। ‘আমার বিন্দুমাত্র ধারণা নেই।’
‘তোমার মায়ের থেকে,’ চৌধুরী ঘোষণার সুরে বলে উঠল। ‘অমি যতটুকু জানি তাতে গোটা ব্যাপারটা শুরু হয়েছিল তোমার মায়ের থেকে, কাজেই আমাদেরও ওখান থেকেই শুরু করতে হবে।’
‘তা তো বুঝলাম, কিন্তু বাবাকে খুঁজে বের করতে হলে মাকে দিয়ে শুরু করে লাভ হবে কি আদৌ?’
‘হবে,’ চৌধুরী চায়ের কাপটা নামিয়ে রেখে বলে উঠল। ‘কারণ যতদিন দুই প্রফেসরের সাথে কাজ করেছি ততদিনে পুরো ব্যাপারটা বুঝতে না পারলেও আমাদের ভেতরে কথোপকথন তো হতো। আমার পরিষ্কার মনে আছে প্রফেসর ইফতেখার মাঝে-মধ্যেই দুষ্টামি করে বলতেন: তার যদি কখনও কিছু হয় কিংবা তিনি যদি কখনও হারিয়ে যান, তাহলে ইলা মানে তার স্ত্রীর মাঝে তাকে খুঁজে পাওয়া যাবে,’ এটুকু বলে চৌধুরী মাথা নাড়ল। ‘বাই দ্য ওয়ে, প্রফেসর ইফতেখার আমার সাথে যা করেছেন তাতে তাকে একটা দানব ছাড়া আর কিছু বলার উপায় নেই। কিন্তু এটাও ঠিক তিনি তোমার মাকে ভীষণ ভালোবাসতেন।’
‘ভালোবাসা যদি বেঁচে থাকতেই মূল্য না পায় তবে—’
‘আচ্ছা, আমরা ম্যাডাম ইলাকে নিয়ে ঠিক কীভাবে শুরু করব?’ পৃথার কথার মাঝেই বাশার বলে উঠল, সে আরেক দফা ইমোশনাল আলোচনার ভেতরে যেতে চাচ্ছে না, তাই কাজের কথা বলে উঠল। ‘তার গবেষণা, তার পরিবার, ইতিহাস, পড়ালেখা নাকি—’
‘তার কবর,’ চৌধুরীর কথা শুনে পৃথা মাথা নিচু করে ফেলেছিল, হঠাৎই সে মাথা তুলে বলে উঠল। ‘আসলে আমি সেভাবে কখনও ভেবে দেখিনি। কিন্তু এখন আপনাদের কথা শোনার পর মনে হচ্ছে মাম্মির আসলে কিছু কিছু বিষয় খানিকটা অদ্ভুতই ছিল। যেমন সে জীবনের একটা বড়ো অংশই কাটিয়েছে ইংল্যান্ডে। এমনকি জীবনের শেষ সময়টাও কিন্তু সে বারবার করে বলে গেছে তার মৃত্যুর পর তার ডেডবডি যেন এদেশে নিয়ে আসা হয় এবং তার মৃত্যু এবং দাফন নিয়ে অনেক ঝামেলাও হয়েছিল।’
‘কী রকম?’ বাশার বেশ কৌতূহলের সাথে জানতে চাইল।
মাম্মি তার শরীরে বেশিরভাগ অংশই দান করে গেছিল মানুষের প্রয়োজনের জন্যে। মরেণোত্তর দান যেটাকে বলে। কিন্তু সেইসাথে সে উইল করে এটাও বলে গেছিল যে, তার দেহের অবশিষ্টাংশ দাফন করতে হবে একটা বিশেষ জায়গায়। বলে সে হঠাৎই সম্পূর্ণভাবে প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে বলে উঠল, ‘আচ্ছা, আমরা যখন মারা যাই তখন তো আমাদেরকে দাফন করা হয় বা মৃতদেহের সৎকার করা হয় আমাদের ধর্ম অনুযায়ী, তাই না? যেমন, মুসলমান হলে কবর দেওয়া হয় জানাযা পড়ে, হিন্দু হলে তাকে পোড়ানো হয় মুখাগ্নি করে, আবার খ্রিস্টান হলে–’
‘আপনি পয়েন্টটা কি মেক করতে চাইছেন?’ সোহেল একটু অস্থির হয়ে বলে উঠল।
‘সেটা বুঝতে হলে তো পুরোটা শুনতে হবে,’ পৃথা হেসে কথাটা বললেও সোহেল মনে হলো খানিকটা লজ্জা পেল। ‘ধরেন যদি কারও ধর্ম না থাকে, মানে কেউ যদি কোনো ধর্মেরই অনুসারী না হয়, সে অফিসিয়ালি নিজেকে ডিক্লেয়ার করে যে তার কোনো ধর্ম নেই, তবে তার সৎকার কীভাবে হবে?’
‘সাধারণত তো পরিবার করে–’
‘যদি পরিবারেরও এই বিষয়ে কোনো এখতিয়ার না থাকে?’
বাশার কাঁধ ঝাঁকাল, ‘জানি না। এভাবে তো কখনও ভেবে দেখিনি। ইউরোপ-আমেরিকাতে এটা নাকি প্রচলিত, আমাদের দেশে এরকম কেউ করে বলে তো জানি না।’
‘অনেক কিছুই আছে আমরা জানি না, পৃথা হেসে যোগ করল। ‘যেমন দুজন মানুষ যদি নিজেদের ধর্ম বজায় রেখে বিয়ে করতে চায়, মানে ইন্টার রিলিজিয়ন ম্যারেজ, সেই ব্যবস্থাও আছে আমাদের দেশে, যেমন পুরো দেশে তিনটা না চারটা এরকম জায়গা আছে যারা অফিসিয়ালি ইন্টার রিলিজিয়ন ম্যারেজ করায়। পুরনো ঢাকার ব্রাহ্ম উপাসনালয় এর ভেতরে একটা। ঠিক ওরকমই কেউ যদি নিজেকে অফিসিয়ালি কোনো ধর্মের অনুসারী ঘোষণা না করে তবে তাদের জন্যে ব্যবস্থা আছে। পুরনো ঢাকাতেই একটা চার্চ আছে যারা তাদের মৃতদেহের সৎকার করে।’
‘মানে কীভাবে করে?’ যেহেতু কোনো পন্থাই নেই।
‘সে আমি জানি না, তবে মাকে কবর দেওয়া হয়েছে এরকম একটা জায়গাতেই সৎকার করা হয়েছে পুরনো ঢাকার সেই চার্চে। আর তার সমস্ত জিনিসপত্র ইত্যাদিও ওখানেই রয়েছে।’
‘তাহলে তোমার পরামর্শ মতে ওখান থেকেই আমাদের শুরু করা উচিত?’ বাশার বলে উঠল।
‘আমার মায়ের থেকে শুরু করার আইডিয়া তো আমার ছিল না, উনার ছিল,’ বলে সে চৌধুরীকে দেখাল। ‘মার জীবনের কোনো অংশ বা কোনো জায়গা থেকে এটা করা যেতে পারে অমি সেটা বলেছি স্রেফ।’
‘ওকে লেটস গো,’ আমাদের কাজ শুরু করতে হবে।
ওরা সবাই মিলে বাইরে বেরিয়ে এসে গাড়িতে উঠতেই সেই চার্চের নাম আর ঠিকানাটা বলতেই বাশার গুগল ম্যাপ সেটার অ্যাড্রেস বসিয়ে চৌধুরীকে দেখাল। চৌধুরী ওদেরকে নিয়ে সেদিকে রওনা দিলো।
***
প্রতিটা কথা এবং আলোচনা সে পরিষ্কার শুনতে পাচ্ছে নিজের জায়গায় বসে। প্রযুক্তি আসলে এতটা এগিয়ে গেছে ব্যাপারটা ভাবতে সে খানিকটা অবাকওই হলো। এতটা ভালো পারফরমেন্স সে আশা করেনি। তারা যখন কাজ করত তখন প্রযুক্তির চেয়ে মানুষের ধ্যানধারণা ইত্যাদির ওপরে নির্ভর করা হতো অনেক বেশি। তাতে যেমন অনেক সুবিধা ছিল ভালো দিক ছিল, আবার খারাপটাও ছিল। তবে আজকের দিনে অনেকে হায় হায় করে প্রযুক্তি সব শেষ করে দিলো বলে, এটাও সে মনে করে না। খারাপ তখনও ছিল, এখনও আছে। কে কীভাবে কোনোটা ব্যবহার করছে তার ওপরে নির্ভর করে সবকিছু।
তবে এসব দার্শনিক কথা ভেবে লাভ নেই। সে বরং নিজের কাজে মনোযোগ দিলো। বেশ অনেকক্ষণ শোনার পর সে যখন বুঝতে পারল সবকিছু তার পরিকল্পনা মতোই এগোচ্ছে মনে মনে আরেরকবার প্রশান্তি অনুভব করল সে। দীর্ঘ এক প্রতীক্ষার অবসান হতে যাচ্ছে অবশেষে। সব যেভাবে এগোচ্ছে সেভাবেই চলতে থাকলে বিষয়টা ধারণা করা যেতেই পারে। তবে সে জীবনে এত বেশি অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে যে জানে সব এভাবে আগাবে না। ঝামেলা হবেই। তবে এখন পর্যন্ত তার পরিকল্পনা শতভাগ সফল। দেখা যাক সামনে কী ঘটে।
***
রাতের ঢাকায় তেমন কোনো জ্যাম থাকে না। এখনও নেই। আর তাই রাতের ঢাকাতে গাড়ি চালিয়ে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় গেলে সত্যিকার অর্থে বোঝা যায় যে আসলে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে কতটা সময় লাগে। যেমন চাঙ্খার পুল থেকে রওনা দিয়ে ওরা পনেরো মিনিটের ভেতরেই পুরনো ঢাকার ভিক্টোরিয়া পার্কের কাছাকাছি সেই চার্চে চলে এলো। চার্চের গেটের কাছে গাড়ি পার্ক করে ওরা গেটের কাছে চলে এল, গেটে তালা মারা এবং কাউকে দেখাও যাচ্ছে না।
‘ভেতরে যাব কীভাবে?’ চৌধুরী জানতে চাইল।
‘ভেতরে যাওয়া কোনো সমস্যা না,’ পুলিশের আইডি আছে না?’ বাশার বলে উঠল, ‘কিন্তু কাউকে তো দেখতেই পাচ্ছি না। মানুষ কাউকে না পেলে তো আইডি কার্ড দেখাবে কাকে। গেট ভেঙে তো আর ঢোকা যাবে না।’
‘ভেঙে না ঢোকা যাক, টপকে তো ঢোকা যেতেই পারে কী বলো, বস?’ মৃদু হেসে বলে উঠল সোহেল। বাশার কৃত্রিম রাগের ভঙ্গিতে ফিরে তাকাল তার দিকে
‘ওই যে তোমার সমস্যার সামাধান এগিয়ে আসছে, কথাটা শুনে বাশার সামনের দিকে তাকিয়ে দেখল একজন লোক এগিয়ে আসছে গেটের দিকে। চার্চটা বেশ বড়ো একটা জায়গার ওপরে। মূল গেট পার হয়ে একটা আঙিনার মতো, তার পাশে আবার ফুলের বাগান, আর সেটার পরে চার্চের মূল ভবন। বাশার দেখল চার্চের মূল ভবনের পাশেই ছোটো একটা কামরার মতো। সেটা থেকে একজন লোক বেরিয়ে আসছে। লোকটার পরনে ইউনিফর্ম এবং তাতে একটা সিকিউরিটি কম্পানির লোগো। বাশার অনুমান করল এরা চার্চের সিকিউরিটি এবং লোকটা হঠাৎ করে কীভাবে ওদের উপস্থিতি টের পেয়েছে সেটাও বুঝতে পারল। সম্ভবত চার্চের মূল ভবনের সাথে ওটা সিকিউরিটি রুম এবং বাশার নিশ্চিত ওই রুমে সিকিউরিটি ক্যামেরা আছে। সেটাতে ওদেরকে দেখেই লোকটা বেরিয়ে এসেছে।
সিকিউরিটির লোকটা এগিয়ে এসে গেটের ওপাশ থেকে ওদের পরিচয় জানতে চাইল। বাশার এগিয়ে গিয়ে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, তার আগেই পৃথা সামনের দিকে এগিয়ে গেল; সে জানাল-তার মায়ের দেহাবশেষ এখানে সৎকার করা হয়েছিল, সে বিদেশ থেকে এসেছে একবার দেখার জন্যে। কথাটা বলার সাথে সাথে লোকটার চেহারা পরিবর্তন হয়ে গেল। সে প্রায় বিনা প্রশ্নে গেটের তালা খুলে ওদেরকে ভেতরে ঢুকতে দিয়ে পৃথার মায়ের নাম জানতে চাইল এবং ওদেরকে ওখানেই অপেক্ষা করতে বলে সে ভেতরে চলে গেল।
‘বাহ, ভালো বলেছ তো,’ মেয়েটার উপস্থিত বুদ্ধিতে বাশার রীতিমতো খুশি।
‘আমি আগেও এখানে এসেছি বহুবার, কাজেই মোটামুটি জানি এখানে কীভাবে কাজ করে ওরা। আর রাতের বেলাতেও প্রায়ই গেস্ট আসে, বিশেষ করে বিদেশে যারা থাকে তারা বা বিদেশ চলে যাচ্ছে, কাজেই রাতের বেলাতেও তাদের গেস্ট অ্যাটেন্ড করার অপশন থাকার কথা,’ পৃথা জানাল ওদেরকে। ‘মানে গতবার যখন এসেছিলাম তখন ছিল, এখন কী অবস্থা জানি না। তবে এরা নাম ইত্যাদি চেক করে খুব ভালোভাবে।’
লোকটা ফিরে এলো তবে অনেক সময় নিয়ে। তবে সে ফিরে এলো হাসিমুখে। ‘দুঃখিত, আপনাদেরকে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করিয়ে রাখলাম। আসলে রাতে তো সবাই চলে গেছে, তাই ফোন করে ম্যাডামের নাম মিলিয়ে মৃতের লিস্ট থেকে বের করে উনার মেয়ে কি না ভেরিফাই করে তারপর নিশ্চিত করতে হলো। আপনারা আসুন প্লিজ,’ ওরা লোকটাকে অনুসরণ করে এই ইয়ার্ডের মতো জায়গাটা পার হয়ে চার্চের পেছন দিকে চলে এলো। সেখানে কবরস্থানের মতো একটা জায়গা দেখিয়ে লোকটা ওদেরকে নির্দেশনা দিতে যাচ্ছিল তার আগেই পৃথা ধন্যবাদ জানিয়ে বলে উঠল ও চেনে, কাজেই এখান থেকে সে যেতে পারবে। এবার ওরা সবাই মিলে পৃথাকে অনুসরণ করে সারি সারি কবর পার হয়ে নির্দিষ্ট কবরের সামনে চলে এলো। ওদের দিকে তাকিয়ে ইশারা করল, ‘দেখুন যদি কিছু চোখে পড়ে।’
বাশার দেখল সাধারণ একটা কবর, তবে গোরস্তানের মতো বেড়া দেওয়া না, ঢিবি করে রাখা। খুব যত্নের সাথে ঘাস ছেটে রাখা হয়েছে। আর মৃতের মাথার কাছে একটা ফলক পাথর, যেটাকে ইংরেজিতে টুম্বস্টোন বলা হয়। সেখানে মৃতের নাম জন্ম-মৃত্যুর সাল লেখা আর তার নিচে একটা সিম্বল। বাশার মোবাইল বের করে বেশ কয়েকটা ছবি তুলে নিলো। ওরা বেশ কিছুক্ষণ ভালোভাবে চেক করার পরও কিছুই পেল না।
‘এখানে বিশেষ কিছু আছে বলে তো মনে হচ্ছে না,’ বেশ হতাশার সুরে বলে উঠল সোহেল।
‘আসলে ভুলটা আমাদেরই, এখানে আদৌ কিছু আশা করাটাই উচিত হয়নি,’ চৌধুরী এখনও মনোযোগ দিয়ে দেখছে কিন্তু তার গলা শুনেই বোঝা যাচ্ছে সে বেশ হতাশ বোধ করছে।
‘সেক্ষেত্রে ডক্টর ইলার সাথে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সব জায়গা চেক করতে হবে, আপনি বলেছিলেন এখানে উনার বেশ কিছু ডকুমেন্ট আছে, সেগুলো কি—’ শেষ কথাটা সে বলেছে পৃথাকে উদ্দেশ্য করে।
হুম, তা আছে তবে সেগুলো এখন চেক করতে পারবেন বলে মনে হয় না, চলুন কথা বলে দেখি,’ ওরা সিকিউরিটির সেই লোকটার সাথে কথা বলে জানতে পারল ডকুমেন্টস চেক করতে হলে অফিস আওয়ারে যেতে হবে। ওরা সবাই বেশ ব্যর্থ মনোরথে গাড়িতে এসে উঠল।
‘এখন কোনোদিকে?’ এবার গাড়ির ড্রাইভিং সিটে বসেছে সোহেল।
‘কী?’ বাশার মোবাইলে কিছু একটা দেখছিল মনোযোগ দিয়ে তাই সোহেলের কথাটা ঠিক ধরতে পারেনি।
‘বলছিলাম এবার কোনোদিকে যাব?’
বাশারের কোনো জবাব নেই, সে মনোযোগ দিয়ে মোবাইলে দেখছে। ‘বস—’
‘এক মিনিট,’ বাশার মোবাইল দেখতে দেখতেই বলে উঠল। ‘এই ছবিটা দেখেন তো সবাই,’ বলে সে মোবাইলটা তার পাশে বসে থাকা পৃথার দিকে এগিয়ে দিলো।
‘বিশেষ করে তুমি।’
পৃথা মোবাইল হাতে নিয়ে দেখল তাতে একটু আগে দেখে আসা ওর মায়ের কবরের ছবি। ‘ছবিতে কী দেখব, একটু আগে তো বাস্তবেই দেখে এলাম।’
‘দেখার আছে, মনোযোগ দিয়ে দেখ, অস্বাভাবিক কিছু কি চোখে পড়ছে?
পৃথা কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলতে লাগল। ‘অস্বাভাবিক, কই– মাম্মির নাম, জন্ম ও মৃত্যুর তারিখ, নিচে একটা লোগো-’
‘এক্সাক্টলি, এখানে অস্বাভাবিক কিছু লাগছে না?’ ও এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে পৃথার দিকে।
‘কই, আমি তো—’
‘উনার কবরের ফলকে ওই লোগো বা সিম্বলটা কীসের?’
‘সিম্বল, হ্যাঁ! তাই তো –
‘দেখি,’ বলে তার হাত থেকে মোবাইলটা নিয়ে দেখতে লাগল চৌধুরী। ‘এই লোগো আমি এর আগেও দেখেছি।’
‘আপনি কোথায় দেখেছেন আমি জানি না, মিস্টার চৌধুরী। এই লোগো সম্প্রতি আমি খুব ভালোভাবে দেখেছি, ও তাকিয়ে আছে পৃথার দিকে।
‘কী?’ বাশারের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে অবাক হয়ে গেছে পৃথা। ‘ওহ শিট,’ বলে চট করে নিচের হুডির ভেতরে হাত ঢুকিয়ে দিলো ও। বের করে আনল গলায় চেইনের সাথে ঝুলতে থাকা লকেটটা। সেটার গায়ে খোদাই করে আঁকা একই লোগো। ‘শিট, মাই গড।’
‘আমিও ধরতে পারতাম না যদি ফিল্ড এজেন্ট শারিয়ারের চট্টগ্রাম কেসের ফাইলটা ডিটেইলে না পড়া থাকত,’ বলে সে হাত বাড়িয়ে লকেটটা ধরতেই, পৃথা ওটা চেইনসহ খুলে দিলো। ‘আমার যদি ভুল না হয় আমরা রাজদ্রোহীর অসমাপ্ত অংশের ক্লু পেয়ে গেছি, যদি তা নাও হয় অন্তত পরবর্তী ধাপে কী করতে হবে সেইটা অন্তত জানতে পেরেছি,’ বলে বাশার বাকিদের দিকে তাকিয়ে একটা হাসি দিলো।
