পূর্বকথা
গল্পের শুরু
প্রথম অংশ: কল্পযাত্রা
দ্বিতীয় অংশ : সত্যাভিযান

রাজদ্রোহী – ৩০

অধ্যায় ত্রিশ

বর্তমান সময়

পানাম নগর, সোনারগাঁও, নারায়ণগঞ্জ

‘তুমি ঠিকই বলেছিলে-এই পয়েন্টগুলো আসলে কূপই, কিন্তু এই লাইনআপটা কীসের ঠিক বুঝতে পারছি না,’ বলে প্রফেসর হামিদ একবার বাকিদের দিকে দেখে নিয়ে ফিরে তাকাল সামনের দিকে। ওরা পানাম নগরের এক পুরনো ভবনের আঙিনাতে দাঁড়িয়ে আছে। এখানে বেশিরভাগ ভবনগুলোর আকৃতি প্রায় কাছাকাছি। অন্তত যেসব ভবন একই সময়ে কাজ করেছে সেগুলোর আকৃতিও মোটামুটি একই ধরনের। বেশিরভাগ বাড়িগুলোই বাহির বাড়ি সেটাকে ঘিরে ভেতরে আঙিনা, আর আঙিনার অন্যপাশে ভেতরের বাড়ি। এরকম একটা বাড়ির আঙিনাতে দাঁড়িয়ে ওটার কূপের সামনে প্রফেসর ম্যাপটা মেলে বোঝার চেষ্টা করছে কিছু একটা।

‘একটা বিষয় কি খেয়াল করেছেন—’

চৌধুরী কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল তার আগেই হঠাৎ প্রফেসর হামিদ প্রায় চিৎকার করে উঠল, ‘সর্বনাশ!’ সে এতটাই জোরে চিৎকার করেছে যে সবাই চমকে উঠেছে। ‘কী ব্যাপার, কোনো সমস্যা? কেউ একজন প্রশ্ন করল। ওরা নিজেদের মতো কাজ করছে বাশার বাড়ির বাইরের দিকে তাকিয়ে বলতে গেলে এক ধরনের পাহারায় রেখেছে বাকিদেরকে। সেও চমকে উঠেছে প্রফেসরের চিৎকার শুনে। ‘প্রফেসর, আপনি ঠিক আছেন?’ সে চেঁচিয়ে জানতে চাইল।

‘আমি ঠিক আছি, ওহহ সরি! আমি আসলে সবাইকে চমকে দিতে চাইনি, ‘ বলে সে সামান্য লজ্জার হাসি দিলো।

‘কী বুঝতে পেরেছেন আপনি বলেন তো?’ পৃথা জানতে চাইল।

‘সেটাই, বিয়ষটা এমনভাবে মাথায় এলো আমি আসলে নিজেকে সামলাতে পারিনি। এই পানাম নগরীকে ঘিরে একটা মিথ প্রচলিত আছে,’ বলে সে কাঁধ ঝাঁকাল। ‘আসলে শুধু এই পানামকে ঘিরে নয় বরং বলতে গেলে যে-তিনটে নগরের কথা বলেছিলাম সেগুলো নিয়ে একটা মিথ প্রচলিত আছে। কেন জানি ম্যাপটা দেখে মনে হলো সেই মিথটা সত্যি হলে হতেও পারে।

‘মিথটা কী সুড়ঙ্গ নিয়ে?’ চৌধুরী ভ্রু কুঁচকে জানতে চাইল।

‘এক্সাক্টলি,’ তালি দিয়ে উঠল প্রফেসর। ‘আগেই বলেছি এই নগরগুলো ছিল ব্যবসায়ীদের কেন্দ্র কিংবা রাজনৈতিক নেতাদের প্রধান বাণিজ্য অথবা ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু। আর আগের দিনে এসব জায়গাগুলাতে যা হতো প্রায়ই শত্রুর আক্রমণ হতো, ওদেরকে লুকিয়ে পালাতে হতো কিংবা এরকম আরও অনেক ব্যাপার ছিল প্রচলিত অছে এই তিনটে নগরের কাছাকাছি অবস্থানের পেছনে অন্যতম একটা কারণ হলো এই তিনটে নগরই নাকি মাটির নিচ দিয়ে কানেক্টেড।’

মানে এইখানে পাতালের সুড়ঙ্গ আছে?’ পৃথা প্রশ্ন করল।।

‘হুম, এই দেখ,’ বলে সে ম্যাপটা চোখের সামনে তুলে ধরল। ‘এই দেখ এই ডটগুলোকে যদি আমরা কূপ ধরে নেই এবং দেখ এই ডটগুলোকে কানেক্ট করেছে নিচে আউটলাইনটা,’ বলে সে আবারও জোরে একটা তালি মারল। এতদিন ধরে এই এলাকাতে আছি এই মিথটা স্রেফ শুনেই আসছি, কাজেই এটা দেখার সাথে সাথে আমার বোঝা উচিত ছিল। আচ্ছা যাকগে, এখন তো ধরতে পেরেছি। আমি প্রায় সেন্ট পারসেন্ট নিশ্চিত এগুলো পাতালেরই সুড়ঙ্গ। যদি তাই হয়—’ বলে সে ওদের দিকে তাকাল, ‘–এটা দারুণ একটা অবিষ্কার হবে। এখন পর্যন্ত এটা কেউ বের করতে পারেনি।’

‘আপনার কি ধারণা প্রফেসর ইফতেখার বা ইলা ম্যাডাম এটাকে বের করতে পেরেছিলেন?’

‘সে তো আমি জানি না, তবে কেউ একজন তো পেরেছিল সেই ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই, বলে সে কাঁধ ঝাঁকাল। কিন্তু প্রশ্ন হলো সুড়ঙ্গটা বের করব কীভাবে? এই নগরে শত শত কূপ আছে, কোনোটা ধরে কীভাবে কিছুই তো বোঝা যাচ্ছে না ম্যাপটা থেকে।’

‘দেখি,’ বলে ম্যাপটা নিজের হাতে নিয়ে নিলো চৌধুরী। ‘আমরা এখন কোন জায়গায় আছি?’

‘আমরা আছি কাশীনাথ বাড়ি মানে এই এলাকার সবচেয়ে বড়ো বাড়িগুলোর একটার কাছাকাছি।’

‘এখানে আছি আমরা,’ চৌধুরী মনোযোগ দিয়ে দেখে বোঝার চেষ্টা করছে।

‘আচ্ছা মিথটা কী নিয়ে বলেন তো?’

‘মানে এরকম প্রচলিত আছে যে এখানে যে সুড়ঙ্গ আছে সেটা দিয়ে তিনটা নগরীই একটা আরেকটার সাথে সংযুক্তে এবং–’

‘এখানে আমার একটা প্রশ্ন আছে, যদি পালানোই উদ্দেশ্য থাকে তবে দুটো ব্যাপারের সাথে সুড়ঙ্গের সংযোগ থাকবে। একটা হলো সম্পদ বা অর্থ, আরেকটা হলো পালানোর ব্যবস্থা। আর এটা যেহেতু পাতালের সুড়ঙ্গ, জোরদার সম্ভাবনা আছে এটা কোনো-না-কোনোভাবে ওয়াটার বডির সাথে কানেকটেড থাকবে আর এখানে তো বেশ কিছু ওয়াটার বডি আছে।

‘তোমার পয়েন্ট ঠিক আছে,’ প্রফেসর হামিদ বলে উঠল। ‘এমনও হতে পারে ওরা কোনোভাবে কাছের মেঘনার সাথে সংযুক্ত কিংবা খালগুলোর কোনো একটা সে-সময় হয়তো কানেক্টেড ছিল। কিন্তু ওতে আমাদের খুব একটা লাভ হবে না। আর কূপ ধরে বের করতে গেলে এই নগরে কতগুলো কূপ আছে কে জানে,’ সে হতাশ ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল।

‘আর পৃথার দ্বিতীয় পয়েন্টটা?’ চৌধুরী বলে উঠল। ‘এমনকি হতে পারে শহরের কেন্দ্র বা মূল কোনো গুদাম বা সব টাকা পয়সা বা সম্পদ রাখা থাকত এমন কোনো পয়েন্ট আছে, হয়তো সেটার সাথে কানেক্টেড থাকতে পারে।

প্রফেসর হামিদ চিন্তা করছে। ‘ঠিক সেরকম কিছুর কথা তো জানি না,’ বলে সে মুখ উজ্জ্বল করে ওদের দিকে তাকাল। ‘তবে একটা ব্যাপার আছে। এখানে একসময় একটা টাকশাল ছিল, মানে যেখানে টাকা বানানো হতো,’ বলে সে আবারও তালি দিলো উত্তেজনায়। ‘ওটা হবার একটা সম্ভাবনা আছে,’ বলে সে ম্যাপটা আবারও তুলে ধরল।

‘হিসেবও মিলে যায়, টাকা সম্পদ এবং’ বলে নিজের কাঁধ ঝাঁকাল পৃথা। ‘ওটা এখান থেকে কতদূরে?’

‘খুব বেশি দূরে না, চল দেখি,’ বলে প্রফেসর হামিদ বাকিদেরকে নিয়ে রাস্তায় চলে এলো। পৃথা, চৌধুরী আর প্রফেসর আলোচনা করতে করতে এগোচ্ছে, সোহেলকে শিস দিয়ে ওর দিকে ডাক দিলো বাশার, ‘শোনো,, ওরা ওদের কাজ করুক আমাদেরকে সাবধানে থাকতে হবে।’

সোহেল চোখ তুলে তাকাল বাশারের দিকে। বস, তুমি কী কোনো বিপদের আশঙ্কা করছ?’

‘অবশ্যই করছি, সাবধানে থাকিস। তুই সামনে চলে যা আমি পেছন থেকে নজরে রাখছি।’

‘ওকে, বস,’ বলে সোহেল এগিয়ে যেতেই বাশার একটা সিগারেট ধরিয়ে পেছনে হাঁটতে লাগল। বাকিরা অনেক দূরে এগিয়ে গেছে বাশার সিগারেট ধরিয়ে বেশ ধীর গতিতে হাঁটতে লাগল। সরাসরি সে কোনোদিকে তাকাচ্ছে না। আসলে তার নজর পুরোপুরি রাস্তার ওপরে। শুধুমাত্র চোখ দিয়ে দেখছেই না, সিগারেট টানতে টানতে বাশার কিছু ব্যাপার অনুধাবন করার চেষ্টা করছে। ঠোঁট থেকে সিগারেটটা নামিয়ে হাতে নিয়ে বাঁহাতে মোবাইলটা বের করে আনল, এখনও সে রাস্তায় এমনভাবে হাঁটছে যেন কোনো টুরিস্ট বেড়াতে এসে মুগ্ধ হয়ে চারপাশের পুরনো ভবনগুলো অবলোকন করছে। বাশার মোবাইলে একটা বিশেষ নম্বরে কল দিয়ে কথা বলতে শুরু করল। কথা বলার পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে সানগ্লাসের ভেতর থেকে নজর রাখছে সে চারপাশে, সেই সাথে এগিয়ে চলেছে ওরা যেদিকে গেছে সেদিকে। দুটো ভবন পরেই সামনে বাঁক নিয়েছে রাস্তাটা। বাশার খুবই স্বাভাবিক ভঙ্গিতে কথা বলতে বলতে সেদিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বাঁকটার কাছাকাছি পৌঁছে সে দাঁড়িয়ে গেল। মোবাইলে কথা বলতে বলতে খুব সাবধানে নজর বুলাচ্ছে চারপাশে। মোবাইলে কথা শেষ করে বাশার এমনভাবে হাত নাড়তে লাগল যেন মোড়ের ওপাশ থেকে কেউ তাকে ডাকছে এবং তার ডাকে সাড়া দিয়ে সে হাত নাড়ছে। বাশার চট করেই মোড়ের ওপাশে চলে গেল। কেউ তার ওপরে নজর রাখছে কি না সে জানে না, কিন্তু যদি নজর রাখতই কিংবা তাকে অনুসরণ করত তবে বাঁকের ওপাশে গেলে দেখতে পেত মানুষটা খুবই স্বাভাবিক ভঙ্গিতে চট করে ওপাশে গিয়েই যেন গায়েব হয়ে গেছে।

***

‘এইটা!’ সামনের ভবনটার দিকে তাকিয়ে পৃথা মোটামুটি হতাশার সুরে বলে উঠল। কারণ আগের যে-ভবনগুলো ওরা দেখেছে কিংবা কাশীনাথ ভবন নামে যে- বাড়িটার ভেতরটা ওরা পরখ করছিল সেটার অবস্থাই অনেক ভালো ছিল, বলতে গেলে মানুষ বসবাস করার মতোই প্রায় কিন্তু টাকশাল বলে প্রফেসর হামিদ ওদেরকে যেখানে নিয়ে এসেছে সেটার অবস্থা বেশ কাহিল। এটাতে মানুষ থাকার মতো অবস্থা তো নেই, বলতে গেলে প্রায় ভেঙেই পড়েছে, এমনকি দরজা জানালাও নেই। ‘এখানে কি আদৌ কিছু পাবার আশা করা যেতে পারে?’ পৃথা নিচের ঠোঁটটা টান দিয়ে ছেড়ে দিলো হতাশ ভঙ্গিতে।

‘আমি বুঝতে পারছি তোমরা এখানে এসে হতাশ বোধ করছ,’ প্রফেসর হামিদ খানিকটা কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলে উঠল। ‘কিন্তু এখানে একটা আশার ব্যাপারও আছে,’ বলে সে আবারও ম্যাপটা তুলে ধরল চোখের সামনে। ‘এখানে দেখো,’ বলে সে ম্যাপের একটা জায়গায় নির্দেশ করল। ‘এই যে খাল আর পুকুরগুলো দেখছ, ভালোভাবে খেয়াল করে দেখো। এগুলো অনেকটা আউটলাইনের মতো করে সাজানো এবং এগুলোর সাথে নিচের আউটলাইনের একটা সংযোগ আছে, যদি ডটগুলোকে মিডিয়াম ধরি তাহলে এটা শহরের যে-অংশের দিকে নির্দেশ করে, সেটা কিন্তু এদিকেই,’ বলে সে চৌধুরী আর পৃথার দিকে তাকিয়ে হেসে উঠল। ‘এই বাড়িটার ভগ্নদশা কিন্তু আরও একদিক থেকে আমাদের কাজের জন্যে পজিটিভ একটা ইঙ্গিত দেয়, সে তাকিয়ে আছে চৌধুরী আর পৃথার দিকে।

‘কী সেটা?’ প্রফেসর যত কথাই বলুক না কেন, পৃথাকে দেখে খুব বেশি আশাবাদী মনে হচ্ছে না বাড়িটার দিকে তাকিয়ে।

‘দেখো, এই বাড়িটার এই ভগ্নদশার কারণ কী হতে পারে?’ সে প্রশ্ন ছুড়ে দিলো দুজনার দিকে।

‘টেইক কেয়ার করা হয়নি ঠিকমতো, চৌধুরী বলে উঠল, সে প্রফেসরের পয়েন্ট ঠিক ধরতে পারছে না।

‘আর কী কারণ হতে পারে?’ প্রফেসর তার সন্তুষ্টিমূলক জবাব পায়নি

পৃথা মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে আছে বাড়িটার দিকে। সে প্রফেসরের পয়েন্ট বোঝার চেষ্টা করছে। ‘বাড়িটা অনেক বেশি পুরনো, অন্য বাড়িগুলোর তুলনায়, এটাও বাড়িটার ভগ্নদশার একটা কারণ।’

‘তুমি অনেকটাই কাছাকাছি যেতে পেরেছ আমার লজিকের,’ বলে প্রফেসর হামিদ তালি দিয়ে উঠল। উত্তেজিত হলেই বাচ্চাদের মতো তালি দিয়ে ওঠা লোকটার অভ্যাস মনে হয়। প্রফেসর তালি দিয়ে ম্যাপটায় একটা টোকা দিয়ে যোগ করল। ‘এই ম্যাপটায় যা যা নির্দেশ করা আছে সেগুলোও আসলে অনেক পুরনো নির্দেশনা এবং জোরদার সম্ভাবনা আছে ম্যাপটা এই নগরীর একেবারে পুরনো স্থাপনাগুলোর সাথে সংযুক্ত কোনোকিছুই নির্দেশ করছে। কাজেই—’ বলে সে আবারও কাঁধ ঝাঁকাল।

‘চলুন, খোঁজা শুরু করি, চৌধুরী বলে উঠল। ‘সারাদিন আলোচনা করেও কোনো লাভ হবে না যদি কাজে লাগানোর মতো কিছু পাওয়া না যায়।’

‘কী ব্যাপার, কী হচ্ছে?’ ওদের পেছন থেকে সোহেল বলে উঠল। সে বাশারের সাথে কথা বলতে গিয়ে আলোচনার আগের অংশ মিস করেছে।

‘আমরা খোঁজ শুরু করতে যাচ্ছি,’ পৃথা বলল। ‘আপনিও আমাদের সাথে হাত লাগানো।’

‘পারটিকুলারলি কী খুঁজতে হবে?’ সোহেল একে একে তিনজনের দিকে দেখল। তার প্রশ্ন শুনে পৃথা আর চৌধুরীও ফিরে তাকাল প্রফেসর হামিদের দিকে। একই প্রশ্ন ওদের মনেও।

প্রফেসর ভ্রু কুঁচকে জবাব দিলো। ‘প্রথমত যদি বাড়িতে কোনো কূপ থাকে, সেগুলোকে ভালোভাবে খুঁজে দেখবে। আর বাড়ির মূল অংশসহ আশপাশেও ভালোভাবে নজর রাখবে যাতে করে যদি নিচের দিকে কোনো সংযোগ থাকে তবে সেটা যেন খুঁজে বের করা যায়। বুঝেছো?’ বলে সে সবার দিকে তাকাল। ‘ও আচ্ছা, সবাই পরস্পরের দিকে নজর রাখবে এবং চলাচল করবে সাবধানে। এসব পুরনো জায়গায় অনেক অ্যাক্সিডেন্ট হয়। আর যদিও এখন শীতের সময়, সাপখোপের ভয় অবশ্য তেমন নেই, তবুও সবাই খুব সাবধান। চলো,’ বলে সে বাড়িটার দিকেই এগোতে বাকিরাও তার সাথে সাথে এগোল। সবাই মিলে ছড়িয়ে পড়ে খুঁজতে শুরু করল। প্রথমেই ওরা চলে এলো বাড়িটার ভেতরে ঢুকতেই প্রথম যে কূপটা চোখে পড়ল ওটার সামনে, ওরা কূপটাকে ঘিরে দাড়িয়ে নিচে তাকিয়ে বুঝতে পারল এটা হবার কোনো সম্ভাবনা নেই। কারণ পুরো কূপটাই মাটিতে ভরে আছে। ‘এইটাতে নাই, আর থাকলেও লাভ নাই,’ চৌধুরী বলে উঠল। কেউ জবাব দিলো না কারণ, যদি সুড়ঙ্গ থাকেও এবং এটার সাথে সেটার সংযোগ থাকে তবে তাতে কোনো লাভ নেই, এটা থেকে মাটি সরিয়ে সেটা বের করতে আর্মি লাগবে। ওরা বাড়িটার আঙিনায় ছড়িয়ে পড়ে খুঁজতে শুরু করল। এই বাড়িটা অন্য বাড়িগুলোর মতো নয়। দেখলেই মোটামুটি বোঝা যায় এটা বসতবাড়ি ছিল না। যদিও অনেককিছুই ভেঙে পড়েছে তাও বাড়িটার আকৃতি দেখলে বোঝা যায় বাড়িটা অনেকটা ব্যারাকের মতো ছিল। ‘এটা মূল কার্যক্রম কেন্দ্র, প্রফেসর সামনের মূল আকৃতিটা দেখাল। আর এগুলোতে মনে হয় শ্রমিকেরা থাকত, মানে যারা কাজ করত আরকি টাকশালে।’ আর বাসস্থানগুলোকে দুপাশে রেখে মাছে কূপটা। যখন সব চালু ছিল তখন এটা থেকে শ্রমিকেরা পানিপানসহ দৈনন্দিন কাজকর্ম করত। ওরা পুরো আঙিনাটা চষে কিছুই পেল না, সবাই মিলে এসে দাঁড়াল টাকশালের মূল কার্যকেন্দ্রের সামনে। ‘দেখা যাক এখানে কিছু পাওয়া যায় কি না,’ ওরা খানিকটা ক্লান্ত বোধ করলেও প্রফেসরের গলায় কেন ক্লান্তি নেই। তাকে ছোটো বাচ্চাদের মতো উৎফুল্ল মনে হচ্ছে, ছোটো লাফ দিয়ে সে ভাঙা সিঁড়ির ধাপগুলো পার হয়ে বারান্দার মতো জায়গাটায় উঠে চট করে ঢুকে পড়ল টাকশালের মূল ভবনটার ভেতরে। পৃথার দিকে তাকিয়ে চৌধুরী একবার কাঁধ ঝাঁকাল, তারপর সে নিজেও ঢুকে পড়ল ভেতরে। কিন্তু ভেতরের চিত্র মোটেই আশা জাগানোর মতো কিছু নয়। ভেতরে বলতে গেলে প্রায় কিছুই নেই, শুধুমাত্র ভেতরের বিরাট আকৃতিটা বাদে। দেখলেই বোঝা যায় একসময় এখানে বিরাট কর্মযজ্ঞ চলত। বিরাট বিরাট আকারের কামরা কিন্তু এখন বলতে গেলে কিছুই নেই। কামরার ভেতরে দেওয়াল থেকে খসে পড়া ইটের টুকরো আর ময়লা ছাড়া বলতে গেলে আর কিছু অবশিষ্ট নেই। আরেকটা জিনিস আছে, সেটা হলো মেঝেতে জায়গায় জায়গায় চারকোনা আকৃতি, সেগুলো খুব মনোযোগের সাথে দেখছিল চৌধুরী। পৃথা তার পাশে গিয়ে দাঁড়াতেই সে বলে উঠল, ‘এসব জায়গাগুলোতে মনে হয়—’

‘টাকশাল চালুর সময়ে টাকা বানানোর মেশিনপত্র ছিল,’ পৃথা আশপাশে দেখতে দেখতে চৌধুরীর বাক্যটা সমাপ্ত করে দিলো। ‘কিন্তু এখন তো এখানে কিছুই নেই, প্রফেসর-’ এবার সে তার কথা শেষ করতে পারল না, তার আগেই টাকশালের ভেতর থেকে প্রফেসরের উত্তেজিত চিৎকার শোনা গেল। চৌধুরী আর পৃথা দুজনেই সেদিকে দ্রুত এগোল। দুটো একইরকম দেখতে কামরা পার হয়ে ওরা চলে এলো ভেতরের কামরার দিকে। সেখানে প্রফেসর মেঝের কাছে দাঁড়িয়ে কিছু একটা দেখছে।

‘কী ব্যাপার কী হয়েছে? কিছু পেয়েছেন?’ চৌধুরী উত্তেজিত ভঙ্গিতে এগিয়ে গেল তার দিকে। সে তাকিয়ে আছে প্রফেসর যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেদিকে। মেঝেতে একটা ভাঙা চারকোনা আকৃতির পাশেই গোল গর্তের মতো কিছু একটা দেখা যাচ্ছে, সেটার দিকে বেশ উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে প্রফেসর। পৃথা এগিয়ে গেল সেটার দিকে।

‘আচ্ছা, বলো তো এটা কী?’ গোল গর্তের মতো জিনিসটার দিকে দেখিয়ে প্রফেসর হামিদ জানতে চাইল। পৃথা এবং চৌধুরী দুজনেই তাকিয়ে আছে ওটার দিকে কিন্তু দুজনার কেউই আসলে বুঝতে পারছে না জিনিসটা কী। পৃথা মুখ খুলতে যাবে তার আগেই পাশের কামরায় পদশব্দ শোনা গেল। দরজায় উঁকি দিলো সোহেল, ‘কী ব্যাপার, কিছু হয়েছে নাকি?’ বলে সে প্রফেসরের দিকে দেখল। চিৎকার শুনলাম বলে মনে হলো তাই দেখতে এলাম,’ সে ওদের থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে তাকাল সেই গর্তের মতো জিনিসটার দিকে। ‘কী ওটা?’ কৌতূহলের সাথে জানতে চাইল সে-ও।

‘তুমি আসার আগে ঠিক এই প্রশ্নটাই করেছিলাম আমি ওদেরকে, নাচিয়ে বলে উঠল প্রফেসর। ‘বলো দেখি কী ওটা?’

‘আমার কাছে তো একটা ভাঙা-চোরা গর্ত ছাড়া আর কিছু মনে হচ্ছে না,’ সোহেলের সরল স্বীকারোক্তি।

‘পুরনো কোনো কূপ হতে পারে,’ চৌধুরী বুকের ওপরে দুই হাত ভাঁজ করে বলে উঠল। সে বোঝা চেষ্টা করছে প্রফেসর আসলে কী বলতে চাইছে। কিন্তু ঘরের ভেতরে কূপ আসবে কোথা থেকে?’

‘এটা মূল সমস্যা না, বলে প্রফেসর হমিদ বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে মাটিতে বসে পড়ল হাঁটু গেড়ে, ‘একটা ব্যাপার খেয়াল করে দেখো। এই বাড়ি, মানে পুরনো টাকশালটার আমরা যত ভেতরের দিকে এসেছি এটা তত নিচের দিকে নেমে গেছে। মানে বাইরের কামরার তুলনায় এই ভেতরের কামরাটা অনেক বেশি নিচু।’

‘হ্যাঁ, ব্যাপারটা পুরোপুরি ধরতে না পারলেও, আমার কাছেও এমনটা মনে হচ্ছিল,’ পৃথা বলল।

‘এক্সাক্টলি,’ প্রফেসর তুড়ি বাজিয়ে বলে উঠল। ‘কেন এমনটা হবে? আমার জ্ঞান যা বলে তা হলো এসব টাকশালগুলো যখন চালু ছিল সেগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা খুব শক্ত ছিল এবং ভেতরের কামরাগুলোর সাথে অনেক সময় মাটির নিচের কামরা থাকত।

‘অনেকটা ব্যাংকের ভল্টের মতো?’ সোহেল জানতে চাইল।

‘একদম ঠিক, এই কামরাটাও অনেকটা সেরকমই ছিল, কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সব ক্ষয় হয়ে সেসব আকৃতির আর কিছুই নেই শুধুমাত্র নিচু ব্যাপারটা রয়ে গেছে। এখন আমার প্রথম প্রশ্নে ফিরে আসি,’ বলে সে চৌধুরীর দিকে ফিরে তাকাল। ‘তুমি বলেছিলে কামরার ভেতরে পানির কূপ কেন থাকবে, আমারও একই জিজ্ঞাসা। এরকম একটা জায়গায় পানির কূপ থাকার কোনো কারণই নেই। টাকশালে যদি পানির প্রয়োজনই হয়, বলে সে বাইরের দিকে দেখাল, এখানে খুবই কাছে পুকুর ছিল, ওটার সাথে টাকশালের সংযোগ করে ছোটো একটা নালা কেটে দিলেই পানির জোগান চলে আসবে। কূপ কেন লাগবে, তাও বাড়ির ভেতরে?’

‘তারমানে আপনি বলছেন এটা কূপ না?’ পৃথা চিন্তিত ভঙ্গিতে জানতে চাইল।

‘একদম ঠিক,’ বলে প্রফেসর হামিদ ওটার ভেতরের দিকে উঁকি দিলো, ‘আমার বিশ্বাস ম্যাপের লোকেশন অনুযায়ী যদি এখানে কিছু থেকেই থাকে তবে সেটার সাথে সংযোগের একটা পথ হতে বাধ্য এই কূপ।’

প্রফেসরের কথা শেষ হবার আগেই সোহেল গর্তটার দিকে এগিয়ে গেল। ওটার ভেতরে উঁকি দিয়ে বলে উঠল, ‘খুব বেশি গভীর তো মনে হচ্ছে না, নেমে দেখব নাকি?’ বলে সে কারও জবাবের অপেক্ষা না করে লাফ দিয়ে নেমে গেল গর্তটার ভেতরে। নেমে ওটার ওপরে ছোটো ছোটো দুটো লাফ দিয়ে বলে উঠল। ‘আজব তো, ওপর থেকে দেখে মনে হচ্ছিল গর্তটা ভরাট অথচ মাটি বেশ ঝুরঝুরে,’ বলে সে নিজের পোশাক কনুই পর্যন্ত গুটিয়ে নিয়ে, দুই হাতে মাটি জড় করে তুলতে শুরু করল। তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে গেল চৌধুরী। সোহেল মাটি তুলে তুলে দিতে লাগল, আর সেগুলোতে তুলে এনে ওপরে রাখতে সাহায্য করতে লাগল চৌধুরী। প্রায় আধা ঘণ্টা টানা কাজ করার পর প্রফেসর জানতে চাইল, ‘শুধু কি মাটিই উঠছে নাকি অন্য কিছু-’ সে কথা শেষ করার অগেই সোহেল চিৎকার করে উঠল, ‘নিচে ঢাকনার মতো কিছু একটা লাগছে,’ সোহেলের চিৎকার শুনে সবাই উঁকি দিয়ে দেখতে লাগল। কিন্তু জায়গাটা খুব বেশি চওড়া না, সোহেল কোনোমতে ওটার ওপরে দাঁড়িয়ে নিচু হয়ে কিছু একটা দেখছে গর্তের ভেতরে। ওরা চারপাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে দেখার চেষ্টা করতেই সে সোজা হয়ে দাঁড়াল। লালচে মাটি আর বালুতে তার হাত আর কাপড় মাখামাখি। ‘নিচে ছোটো একটা ঢাকনার মতো পেয়েছি, কিন্তু জিনিসটা খুব বেশি পুরনো বলে মনে হলো না আমার কাছে, ‘ সে তাকিয়ে আছে ওদের দিকে। ‘তাই নাকি?’ প্রফেসর উত্তেজিত ভঙ্গিতে নিচে দেখার চেষ্টা করছে। ‘কেমন ঢাকনা?’

‘আচ্ছা, অকারণে কথা বলে লাভ নেই, যা আছে তো আছেই, তুমি কি ওটা খুলতে পারবে?’ চৌধুরীও উত্তেজিত ভঙ্গিতে নিচের দিকে তাকিয়ে জানতে চাইছে।

‘পারবো,’ বলে সোহেল নিচের হাতাটাকে আরও ভালোভাবে গুটিয়ে নিয়ে পকেট থেকে মোবাইল বের করে চৌধুরীর হাতে ধরিয়ে দিয়ে ওটার চর্ট জ্বালাতে বলল, সেই সাথে সে পকেট থেকে একটা সুইস নাইফ বের করে আবারও নিচু হয়ে গেল। জায়গাটা এতটাই সরু, সোহেল কাজ করছে চৌধুরী খানিকটা ঝুঁকে চার্টটা ধরে আছে, প্রফেসর আর পৃথা দুজনেই উত্তেজিত হলেও পাশেই দাঁড়িয়ে রইল। কারণ সেভাবে চেষ্টা করে কোনো লাভ নেই, সেই সরু জায়গাতে কিছুই দেখতে পাবে না ওরা। সোহেল তো নিচে নেমেই গেছে, চৌধুরীও খানিকটা নেমে দুজনে মিলে নিচের থেকে কিছু একটা সরানোর চেষ্টা করছে, ওপর থেকে ওরা দেখতে না পেলেও স্ট্রাগলটা পরিষ্কার বুঝতে পারছে। একটু পরেই নিচ থেকে কড়াত মতো একটা শব্দ হলো এবং দুজনেই উল্লাসের সাথে চিৎকার করে উঠল। একটু পরেই চৌধুরী নিচ থেকে একটা গোল ঢাকনার মতো কিছু একটা তুলে আনল ওপরের দিকে। জিনিসটা অনেকটা ম্যানহোলের ঢাকনার চেয়ে আরেকটু বড়ো ভার্সন এবং আকৃততিতেও খানিকটা ভিন্ন যেন। চৌধুরী কাদা ও বালু মাখা হাতে ভারী জিনিসটা তুলে এনে মেঝেতে ফেলে দিলো ধাম করে। সাথে সাথে প্রফেসর হামিদ এগিয়ে গেল ওটার দিকে। জিনিসটার ওপর থেকে বালু মাটির মতো আস্তরণটা সরিয়ে সে জিনিসটাকে দেখতে লাগল, পৃথাও ঝুঁকে পড়ল ওটার ওপরে। জিনিসটা ওপর থেকে বালু কাদা সরানোর সাথে সাথে প্রফেসর বলে উঠল, ‘এটা তো ধাতব ঢাকনার মতো,’ প্রফেসরের পাশ থেকে পৃথা যোগ করল, ‘এটা অবশ্যই সে-সময়ের নয়, যে-ধরনের ধাতু এতে ব্যবহার করা হয়েছে সেই সময়ে এগুলো ব্যবহার করা হতো না, পৃথাও হাত লাগিয়ে ঢাকনাটার ওপর থেকে বালুময় কাদা পরিষ্কার করতে করতে বলে উঠল।

‘একদম ঠিক এবং-’ প্রফেসর কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল তাকে কথা শেষ করতে দিলো না পৃথা

‘এক মিনিট প্রফেসর, এটা কী?’ বলে সে ধাতব ঢাকনাটার ওপর থেকে ধুলো- বালু পরিষ্কার করতে করতে ওটার ওপরে খোদাই করা একটা সিম্বল দেখতে দেখতে অস্ফুটে বলে উঠল।

‘কী?’ প্রফেসর বোঝার চেষ্টা করছের পৃথা আসলে কি দেখে চমকে উঠল

‘এই সিম্বলটা—’ এবার পৃথা কথা শেষ করার আগেই কূপের ওদিক থেকে চিৎকার ভেসে এলো। প্রফেসর আর পৃথা দুজনেই ফিরে তাকাল সেদিকে।

‘আমাদের মনে হয় ওদিকে যাওয়া উচিত,’ প্রফেসর উঠে দাঁড়িয়ে সেদিকে এগোল। পৃথাও পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল। কূপের নিচের অংশ থেকে বালু, কাদা মাখা চৌধুরী মাথা বের করল। ‘জলদি আসুন আপনারা, দারুণ জিনিস আবিষ্কার হয়েছে।

***

রাস্তা থেকে চট করে সে ঢুকে পড়েছে পুরনো দিনের বাড়িটার ভেতরে। ভেতরে ঢুকে অন্ধকার এক কোনার দিকে সরে গেল বাশার, জায়গাটা ইচ্ছে করেই এমন এমনভাবে বেছে নিলো যাতে করে সে অন্ধকারের ভেতরেও থাকতে পারে আবার সহজে বাইরের রাস্তার দিকেও নজর রাখতে পারে। অন্ধকার কোনের দিকে সরে গিয়ে বাইরের দিকে নজর রেখে সে সাবধানে একটা সিগারেট ধরাল। আনমনেই একবার ঘড়ি দেখল সে। সোহেল এতক্ষণে পৃথা, চৌধুরী আর প্রফেসর হামিদের কাছে পৌঁছে যাবার কথা। তারমানে তারা যা করছে সেটা করার জন্যে যথেষ্ট সুযোগ ওরা পাবে এবং সাথে সোহেল থাকাতে ওরা নিরাপত্তাও পাবে। আর এর ভেতরে তাকে অন্য একটা বিষয় নিশ্চিত করতে হবে। আর এই বিষয়টার ওপরে ওদের পুরো অপারেশন এবং নিরাপত্তা দুটোই নির্ভর করছে।

সিগারেট টানতে টানতে বাশার বাড়িটার চারপাশে একবার দেখল। এরকম পুরনো বাড়িতে কিংবা জমিদার বাড়িতে এলে ওর খুব অদ্ভুত এক অনুভূতি হয়। এসব বাড়িতে আগে কত ভিন্ন ধরনের মানুষ বসবাস করত। সেই সময়য়ের জীবন- যাত্রা, সেই পুরনো জীবন-যাপন, ভিন্ন পোশাক, ভিন্ন খাবার, ভিন্ন আয়োজন ভিন্ন যাপিত জীবন। ওদের মতো তাদেরও জীবনে ছিল হাজারো সমস্যা, হাজারো সম্ভাবনা, হাজারো উচ্ছ্বাস, ভালোলাগা, মন্দলাগা। অথচ সময়ের ফেরে আজ সব হারিয়ে গেছে। কারও কোনো খোঁজ নেই। সবচেয়ে বেশি অবাক লাগে ভাবতে যে, একদিন ওর সাথেও এমনটাই হবে। এই যাপিত জীবন, হাজারো সমস্যা, সম্ভাবনা কিছুই আর রবে না। যত যাই অর্জন করুক জীবনে, কালের অতলে হারিয়ে যাবে একদিন সব। যদি কিছু টিকে থাকে তবে সেটা হবে একমাত্র সময়। সময় বদলায়, প্রযুক্তি বদলায়; কিন্তু হাজারো বছরের আগে আর পরে, যাপিত জীবনের টানাপোড়েনগুলো সব একই রয়ে যায়, আবেগ আর ভালোবাসাগুলোও এক রয়ে যায়, এটাই হয়তো সময়ের উপাখ্যান।

নিজের ভাবনার অতলে হারিয়ে গিয়ে খানিকটা উদাস হয়ে গেছিল বাশার। হঠাৎ সামনের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠল ও। যা ভেবেছিল সেটা নিয়ে খানিকটা সন্দেহ থাকলেও এখন মনে হচ্ছে নিজের মনের গহীনে থাকা ভয়ঙ্কর আর কুৎসিত সন্দেহগুলো সঠিক হতে যাচ্ছে।

***

আধো অন্ধকার গর্তটার ভেতরে উঁকি দিয়ে পৃথা খানিকটা ভয় পেল না সেটা বলা যাবে না। কিন্তু নিচ থেকে আবছা একটা আলো ভেসে আসছে একদিকে, অন্যদিকে আবার বুড়ো প্রফেসর হামিদ তরতরিয়ে নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে দেখে সে বেশ খানিকটা সাহস পেল। পায়ে পায়ে এগিয়ে যেতে যেতে সে আবার ফিরে তাকাল ঢাকনাটার দিকে। ওটার কাছে ফিরে এসে সেটার ওপরে থাকা সিম্বলটার ছবি তুলে নিলো টপাটপ বেশ কয়েকটা। তারপর ফিরে এসে কূপের ওপরের অংশ টপকে নেমে এলো ওটার নিচের দিকে এবং বেশ অবাক হয়ে লক্ষ করল কূপের অপরের অংশটা যতটা সরু, যত নিচের দিকে নেমে গেছে ওটা তত চওড়া হয়েছে। খানিকটা নেমেই আড়াআড়িভাবে গোল একটা মুখের মতো দেখা গেল। ওটার ওপাশ থেকে হালকা আলো আসছে। পৃথা অনুমান করল এই গর্তটার মুখেই ওই ধাতব ঢাকনাটা লাগানো ছিল। ও গর্তটার মুখের অন্যপাশে তাকাতেই দেখতে পেল ওটার ওপাশে ধাপের মতো কিছু একটা ধরে প্রফেসর হামিদ নেমে যাচ্ছে ধীরে ধীরে, আর তাকে সাহায্য করছে চৌধুরী। প্রফেসর নেমে যেতেই নিচ থেকে সোহেল চিৎকার করে ওকে এগিয়ে যেতে বলল।

গর্তের ভেতরেও নিজের শরীরটাকে কোনোমতে গলিয়ে দিয়ে নিচের দিকে পা বাড়াতেই ওর পা গিয়ে ঠেকল একটা ধাপের মতো কিছুতে।

‘আরেকটু নিচে নামলেই পা রাখতে পারবে,’ নিচ থেকে চৌধুরী বলে উঠল।

পৃথা নিজের পা’টাকে আরেকটু বাড়িয়ে দিতেই দেখল ওর পা’টা বেশ সুন্দরভাবেই খোপের মতো সেট হয়ে গেলে ধাপের ওপরে। চাপ দিয়ে দেখল বেশ শক্ত, খুব সহজেই ওর শরীরের ভার রাখতে পারবে। অবশ্য সন্দেহের কোনো কারণই ছিল না, একটু আগেই এই ধাপগুলো দিয়ে তিন তিনজন সমর্থ পুরুষ নেমে গেছে নিচের দিকে। পৃথা প্রথম পা’টাকে সাবধানে রেখে পরের পা’টাও বাড়িয়ে দিলো সেদিকে। খুব সহজেই দ্বিতীয় পা’টা ওখানে সেট হয়ে যেতেই শরীরের ভার পুরোটাই চাপিয়ে দিয়ে নিজের শরীরটাকে নামিয়ে দিলো নিচের দিকে। আরও তিন-চারটা ধাপ নিচে নামতেই নিচ থেকে চৌধুরীর বাড়িয়ে দেওয়া হাতটা ধরে ফেলল ও, চৌধুরীর হাতটা ধরেই নিচে লাফিয়ে নামল মেঝেতে। শরীরটাকে সোজা করে সামনে তাকাতেই খুব অবাক হয়ে দেখল ও সরু করিডোরের মতো একটা জায়গায় নেমে এসেছে ওরা। সবাই বেশ বিস্ময়ের সাথে দেখছে চারপাশ।

‘এটাই তবে—’ ওর কথাটা শেষ করতে দিলো না সোহেল।

‘সোনারগাঁও-পানাম নগরের হারানো পাতাল পথ,’ আনমনেই বলে উঠল সে।

‘এখনও অবশ্য সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। কারণ এটা স্রেফ বাড়ির নিচে একটা পাতাল কামরাও হতে পারে,’ প্রফেসর নিজের মোবাইলের টর্চ লাইট জ্বেলে চারপাশে দেখতে শুরু করেছে।

‘এটা বানানো হয়েছিল খুব সাবধানে এবং যত্নের সাথে। কারণ একে তো লোকচক্ষুর আড়ালে ছিলই, সেই সাথে এত পুরনো হবার পরও ওপরের চেয়ে নিচের অবস্থা এখনও অনেক বেটার।’

‘কিন্তু ওগুলো কী?’

সোহেলই ব্যাপারটা প্রথম খেয়াল করল। দেওয়ালের জায়গায় জায়গায় ছোটো তির-চিহ্নের মতো এঁকে রাখা হয়েছে। ‘এগুলো তো মনে হচ্ছে আমাদেরকে সামনে কোনোদিকে এগিয়ে যাবার জন্যে নির্দেশ করছে,’ সোহেলও নিজের মোবাইলের টর্চ জ্বেলে সামনে দেখার চেষ্টা করছে।

‘এ তো লুমিনাস পেইন্ট মনে হচ্ছে,’ পৃথা চিহ্নগুলোর দিকে আলো ফেলে দেখল, আলো পড়তেই ওগুলো চক চক করছে। ‘সেই সময়ের লোকে লুমিনাস পেইন্ট আবিষ্কার করেছিল বলে তো মনে হয় না,’ সাথে সাথে ওর মাথার ভেতরে খেলে গেল ধাতব ঢাকনাটার কথা এবং ওটার গায়ের ওপরে থাকা সেই সিম্বলটার কথাও। ‘এগুলো অবশ্যই পরে কেউ বসিয়েছে এবং,’ বলে সে ফিরে তাকাল দলের বাকি সবার দিকে। ‘আমার ধারণা ওপরের ওই ঢাকনাটাও তাদেরই বসানো। এগুলো এখানকার প্রাচীন বাসিন্দারা বসায়নি।’

যাই হোক আর যারাই যাই করে থাকুক না কেন,’ প্রফেসর হামিদ ছোটো ছোটো তির চিহ্নগুলো যেদিকে এগিয়ে গেছে সেদিকে দেখাতে দেখাতে বলে উঠল। ‘আমাদেরকে এখন এগোতে হবে, তবে সবাই খুব সাবধান।’

***

গাড়ির ভেতরে সে এমনভাবে বসেছিল যেন চোখ বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়েছে কিন্তু আসলে সে ঘুমায়নি। কিন্তু তার অধীনে কাজ করতে থাকা ছেলেটা সামনে এসে খানিকটা দ্বিধায় পড়ে গেল। চোখ বন্ধ করে থাকা মানুষটাকে ডাকবে কী ডাকবে না-ঠিক বুঝতে পারছে না।

‘বিষয়টা জরুরি, তাই না?’ নিজের ক্যালক্যাশিয়ান টানে কথাটা বলে ওঠাতে খানিকটা চমকে উঠল ছেলেটা। আরেকটু হলে তার হাত থেকে ল্যাপটপটা পড়েই যাচ্ছিল। ‘জি স্যার, মানে—’

তাকে কথাটা শেষ করতে দিলো না মানুষটা। চোখ বন্ধ অবস্থাতেই সে নিজের হাতটা বাড়িয়ে দিলো ছেলেটার দিকে। ছেলেটা ল্যাপটপটা নিজের হাতে রেখেই হেডফোনটা ধরিয়ে দিলো মানুষটার হাতে। অভ্যস্ত এবং দ্রুত হাতে সেটাকে পরে নিতেই ছেলেটা কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু নিজের ঠোঁটে আঙুল রেখে তাকে চুপ থাকতে বলল সে। মনোযোগের সাথে হেডফোনের ওপাশ থেকে ভেসে আসা কথাগুলো শুনতে শুনতে তার মুখে হাসি ফুটে উঠল। নিজের চোখে খুলে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে গেল সে। ‘কী ব্যাপার, কোনো সমস্যা?’ বিষয়টা সে ধরতে পারছে না। হেডফোনের ওপাশ থেকে যা শুনেছে তাতে তার খুশি হওয়া উচিত, সেই সাথে বাকিদেরও। কারণ এতদিন ধরে তারা যা খুঁজে আসছিল সেটার নাগালে পাবার একটা পথ আবিষ্কার হতে যাচ্ছে সম্ভবত, এমন অবস্থায় সবার খুশি হওয়া উচিত কিন্তু সবাই এমন মুখ গোমড়া করে আছে কেন ঠিক ধরতে পারছে না সে।

‘স্যার, অন্য একটা সমস্যা দেখা দিয়েছে,’ মুখ অন্ধকার করেই কালো কোটের গার্ডদের একজন বলে উঠল। কালো কোট এখনও তাকিয়ে আছে কিছু বলছে না। অপেক্ষায় আছে গার্ড লোকটা তাকে আরও কিছু জানাবে। কিন্তু গার্ড লোকটা অন্যপাশে দেখে নিয়ে আরও সময় চুপ করে রইল। এবার বিরক্ত হয়ে কালো কোট কথা বলতে যাবে, তার আগেই অন্য আরেক গার্ড মুখ খুলল, ‘স্যার, তৃতীয় পক্ষ দেখা দিয়েছে, কোনো-না-কোনোভাবে আমাদেরকে অনুসরণ করে ওরাও চলে এসেছে এখানে।

সাথে সাথে ভ্রু কুঁচকে উঠল কালো কোটের

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *