অধ্যায় এক – সময়: ১৫৯৬ খ্রিস্টাব্দ – খিজিরপুর দুর্গ, সোনারগাঁ
খুব ধীরে ধীরে নিজের আসন থেকে উঠে দাঁড়িয়ে দুর্গের বিরাট জানালা দিয়ে বাইরের দিকে ফিরে তাকাল সে। নিজের শক্তিশালী অবয়ব নিয়ে চাইলেই চোখের পলক ফেলার আগেই নড়ে উঠতে পারে মানুষটা। কিন্তু শারীরিক শক্তি আর ক্ষিপ্রতার তুলনায় তার সার্বিক নড়াচড়া অত্যন্ত ধীরগতির। ধীর পদক্ষেপে এসে দুর্গের জানালা দিয়ে বাইরে ফিরে তাকাল সে। একে তো রাত, তার ওপরে তীব্র বর্ষণের কারণে বাইরে বলতে গেলে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। বর্ষণমুখর সন্ধ্যার ভেজা অন্ধকারের ভেতরে তাকিয়েও সে বলে দিতে পারে বাইরে ঠিক কোথায় কী আছে, কী হচ্ছে। কারণ এই সাম্রাজ্যের প্রতিটা ধূলিকণার সাথে তার আত্মার সম্পর্ক আর এই মুহূর্তে তার এই আত্মার ওপরেই শকুনের নজর পড়েছে। কিন্তু তার জন্যে এসব কিছু নতুন নয়।
তার জীবনটাকে শুধু বৈচিত্র্যময় বললে কম বলা হবে, এ-যেন এক মহাকাব্যিক উপাখ্যান। ষোড়শ শতক যখন ত্রিশ বছরের কোঠা পূরণের দ্বারপ্রান্তে ঠিক সেই সময়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে জন্মেছিল সে। তার মা ছিল একজন রাজকুমারী আর বাবা ছিল একজন দেশত্যাগী। কালীদাস গজদানী ভাগ্যান্বেষণে অযোধ্যা থেকে পাড়ি দিয়েছিল এই বাঙাল মুলুকে। যে ভাগ্যের অন্বেষণে সে এসেছিল সেই ভাগ্যবিধাতা তাকে হতাশ করেনি। সুলতান গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ শাহের দরবারে নিজের কর্মপন্থা, কঠিন পরিশ্রম আর বুদ্ধির বলে সে ঠিকই জায়গা করে নিতে সফল হয়েছিল। একেবারে শূন্য থেকে শুরু করে সুলতানের দরবারে সে রাজস্বমন্ত্রীর পদে আসীন হয়। পরবর্তীতে ধর্ম বদলে নাম ধারণ করে সুলাইমান খাঁ। মন্ত্রী হিসেবে কর্মদক্ষতা, ব্যক্তিত্ব এবং বুদ্ধিমত্তা মুগ্ধ করেছিল খোদ সুলতানকেও। আর তাই নিজের মেয়ের সাথে সে বিয়ে দেয় সুলাইমান খাঁর। শুধু বিয়েই নয়, বিয়ে দিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল পরগনা ও পূর্ব মোমেনশাহী অঞ্চলের জায়গীরদারির দায়িত্বও সঁপে দেয় সুলাইমান খাঁর ওপরে। ভাগ্য অন্বেষণে বাংলায় আসা সুলাইমান খাঁর জন্যে এ-যেন ছিল রাজ্য এবং রাজকন্যা দুটোই একসাথে প্রাপ্তি। এই সুলাইমান খাঁর ঔরসেই জন্ম হয়েছিল তার। বিরাট রাজ্য, স্নেহময় পিতা-মাতা একভাবে বলতে গেলে অর্থ, বিত্ত, ভালোবাসা আর সুখের সাগরের মাঝেই যেন জন্ম হয়েছিল তার।
কিন্তু সব গল্পের একটা অন্ধকার দিক থাকে। আর তার জীবনের অন্ধকার দিকটার শুরু হয়েছিল তার কৈশোরেই, যখন সে এমনকি জীবনের অন্ধকার দিক কী-সেটাই ঠিকমতো বুঝে ওঠার মতো যোগ্য হয়ে ওঠেনি। এমনই এক সময় ঘোরতম কালো মেঘে ছেয়ে যায় সে এবং তার পরিবারের আকাশ। ভারতবর্ষের ইতিহাসে কখনই চিরস্থায়ী শান্তি বিরাজমান ছিল না। সম্ভবত পৃথিবীর কোথাও এমনটা থাকে না, তবে ভারতবর্ষের ইতিহাসে যেন অস্থিরতার মাত্রা বরাবরই খানিকটা বেশি। সময়টা ষোড়শ শতকের মাঝামাঝি। মোঘলদের পায়ের নিচের মাটি তখন টালমাটাল। এমনই এক সময় শের শাহের পুত্র ইসলাম শাহ দিল্লির সিংহাসনে আরোহণ করে। এই আরোহণ যেন ভারতবর্ষের বুকে বিরাজমান অস্থিরতার ভেলায় আরেকটা স্রোতের ধাক্কার মতো।
আর সেই ধাক্কা বেশ জোরেসোরেই এসে লাগে তার পরিবারের ওপরে। শের শাহের পুত্র ইসলাম শাহ দিল্লির সিংহাসনে আরোহণ করার পর তার পিতা সুলাইমান খাঁ দিল্লির আনুগত্য স্বীকার করে নিতে অস্বীকৃতি জানায়। জীবনের একটা সময় পর্যন্ত সে নিজের পিতার এই সিদ্ধান্তকে মনে মনে অভিশাপ দিত। বিশেষ করে এই সিদ্ধান্তের জন্যে তার পরিবারকে যে ধরনের কষ্ট আর যাতনার ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে সেটার কারণেই সে নিজের পিতাকে মনে মনে ধিক্কার জানাত বোকার মতো দিল্লির এই বিরোধিতা করার জন্যে। কিন্তু একটা অদ্ভুত বিষয় হলো জীবনের ঠিক যে প্রান্তে এই মুহূর্তে সে অবস্থান করছে এখানে দাঁড়িয়ে ঠিকই অনুধাবন করতে পারে, কেন তার পিতা এমন একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। আরও অদ্ভুত ব্যাপার হলো ঠিক যে-কারণে একটা সময় সে নিজের পিতাকে অভিশাপ দিত, মনে মনে ঠিক সেই কারণেই সে মনের গভীর থেকে নিজের পিতাকে সম্মান করে জীবনের এই প্রান্তে দাঁড়িয়ে। কেন তার মানসিকতার এই গভীর পরিবর্তন, সেটা বুঝতে হলে তার জীবনের প্রায় মহাকাব্যিক উপাখ্যানটা জানা জরুরি।
যেই সময়ের কথা বলা হচ্ছে সেই সময়ে দিল্লির মসনদে একটা পিঁপড়েও যদি চড়ে বেড়াত তবে সেটার প্রভাব পড়ত পুরো ভারতবর্ষের ওপরে। আর দিল্লির সিংহাসনের মানুষটা বদলে যাবে আর তাতে পুরো ভারতবর্ষে অনেক কিছু উলটে- পালটে যাবে না, সেটা তো হতেই পারে না! দিল্লির সিংহাসনে শের শাহের ছেলে ইসলাম শাহ ক্ষমতায় আসীন হওয়ামাত্রই তার পিতা সুলাইমান খাঁ দিল্লির আনুগত্য অস্বীকার করে। সোজা কথায় বলতে গেলে নিজেকে এক ধরনের স্বাধীন ঘোষণা করে বসে সে। সেই সময়ে বাঙাল মুলুকে এটা বেশ সাধারণ একটা ব্যাপার ছিল। প্রায়ই স্থানীয় শাসকেরা সুযোগ পেলে কেন্দ্রীয় শাসন থেকে মুক্ত হয়ে নিজেদের স্বাধীন রাজা হিসেবে ঘোষণা করে বসত। আর একারণেই বাঙাল মুল্লুককে বলা হতো বিদ্রোহের দেশ। দিল্লির কেন্দ্রীয় শাসনে এমন কোনো শাসক নেই যাদের এই বিষয় নিয়ে ঝামেলা পোহাতে হয়নি। এমনকি পরাক্রমশালী সম্রাট বাবরও এর থেকে মুক্ত ছিল না। বাঙালি বিদ্রোহী রাজাদের নিয়ে তাকে এমন ঝামেলা পোহাতে হয়েছে যে এক পর্যায়ে সে রাগের চোটে বলেই বসেছিল ‘বাঙালিদেরকে সে দেখে নেবে’। অর্থাৎ দিল্লির সাথে স্থানীয় রাজাদের এই খোঁচাখুঁচি নতুন নয়। তবে এই বিষয়টা কখনও বাঙালিদের জন্যে ভালো ফল বয়ে আনে তো আবার কখনও চূড়ান্ত বিপর্যয়। তার পিতা সুলাইমান খাঁর জন্যে বিষয়টা হয়ে দাঁড়িয়েছিল দ্বিতীয়টা।
ইসলাম শাহের শাসন অস্বীকার করামাত্রই ইসলাম শাহের প্রধান সেনানায়ক তাঁজ খা কররানীর সাথে সুলাইমান খাঁর যুদ্ধ বেধে যায়। যুদ্ধে সুলাইমান খাঁ নিহত হয়। আবার এমনও জনশ্রুতি আছে তাকে নাকি কৌশলে হত্যা করা হয়। সুলাইমান খাঁর মৃত্যু কীভাবে হয়েছিল সেটা বড়ো কথা নয়, বড়ো কথা হলো সে মারা যাবার সাথে সাথে ছিন্নভিন্ন করে ফেলা হয় তাদের পুরো পরিবারকেই। তবে সবচেয়ে খারাপ বিষয়টা ঘটে সম্ভবত তার এবং তার ভাইয়ের ভাগ্যে। তাদের পিতাকে হত্যা করে তাদেরকে কৌশলে দাস হিসেবে বিক্রি করে দেওয়া হয় একদল তুরানি বণিকের কাছে। তুরানি বণিকদের দলটা ছিল অনেকটা যাযাবর ব্যবসায়ীদের মতো। এরা দেশে বিদেশে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াত আর ব্যাবসা করত। তারা ঘুরতে ঘুরতে এক জায়গার পণ্য আরেক জয়গায় নিয়ে যেত, এক জায়গা থেকে দাস কিনে আরেক জায়গায় বিক্রি করে দিত। জন্ম হয়েছিল রাজপুত্র হিসেবে কিন্তু শৈশবের গণ্ডি পেরিয়ে কৈশোরের দারপ্রান্তে পৌঁছানোর আগেই স্থান হয় তার তুরানি বণিকদের কাফেলা দলের দাস হিসেবে। কিন্তু এক অর্থে দাস হিসেবে বিক্রি হলেও যে দলটা তাকে আর তার ভাইকে খরিদ করে নেয় তাদের সাথে কোনো এক বিচিত্র উপায়ে এবং বলা যায় প্রায় অদ্ভুতভাবেই বেশ এক ধরনের সখ্যতা গড়ে ওঠে তাদের দুজনার। আর সে সুবাদেই যাযাবর দলটা যেখানে এক জায়গার দাস আরেক জায়গায় বিক্রি করে দেয়, তাকে আর তার ভাইকে নিয়ে যায় নিজেদের দেশে। কিন্তু বণিক দলের প্রধান আর্থিক প্রয়োজনে তাকে আর তার ভাইকে আবারও বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়। এবার তার আর তার ভাইয়ের স্থান হয় তুরানের এক ধনাঢ্য ব্যক্তির বাড়িতে। সময়টা কেমন ছিল তার জন্যে, কিংবা তার ভাইয়ের জন্যে? আসলে কি এর কোনো জবাব আছে, একজন দাসের জীবন আসলে কেমন হয়, কেমন ছিল তার সেইসব দিনগুলো-এই জবাব এমনকি তারাও জানা আছে। কিন্তু যখনই সেইসব দিনগুলোর কথা ভাবে সে, মনের ভেতরে কোথায় যেন একটা শক্তির উদগীরণ ঘটে। কে জানে জীবনের সবচেয়ে উচ্ছল আর আনন্দের দিনগুলোতে সবচেয়ে কঠিন সময়ে পার করাতেই হয়তো আজকে তার ভেতরে অদ্ভুত এক আগ্নেয়গিরি জমা হয়েছে। বণিক দলের কাছ থেকে বিক্রি হয়ে হয়তো তাদের জীবনের বাকি দিনগুলো তুরানের মরুতেই দাস হিসেবে কাটিয়ে দিতে হতো। কিন্তু তা হয়নি, কারণ তাকে নিয়ে ভবিতব্যের আরও বড়ো পরিকল্পনা ছিল।
সে আর তার ভাই যখন তুরানের মরুতে দাস হিসেবে বন্দি জীবন-যাপন করছিল, সেই সময়ে বাঙাল মুলুকে তাদেরই রাজ্যে ঘটে চলেছিল আরও অসংখ্য ঘটনার প্রবাহ। আর সেইসবের প্রবাহেই এক সময় আবারও তাদের সিংহাসনে ক্ষমতাসীন হয় তার চাচা কুতুব খাঁ। বহু পাথর ভেঙে মানুষটা ক্ষমতায় আসীন হলেও নিজের পরিবারের কথা সে ভুলে যায়নি। ভুলে যায়নি তার মৃত ভাইয়ের কথা এবং তার হারিয়ে যাওয়া দুই ছেলের কথা। কিন্তু তার পক্ষেও সেইসময়ে চাইলেই চট করে হাজার মাইলের পথ পাড়ি দিয়ে নিজের হারিয়ে যাওয়া দুই ভাইপোকে খুঁজে বের করে ফেলা সম্ভব ছিল না। কিন্তু ওই যে, কথায় বলে না নিয়তেই বরকত, কিংবা বলা যায় খুঁজলে নাকি খোদাকেও পাওয়া যায়, শুধু খোঁজনেওয়ালার নিয়তে যথেষ্ঠ বরকত থাকতে হয়। কুতুব খাঁর নিয়ত ছিল পাহাড়ের মতোই অটল। আর সেই অটল নিয়তের বরকতেই সে নিজের দুই ভাইপোকে ঠিকই দূরদেশের তুরানি বণিকের বাড়ি থেকে খুঁজে বের করে চড়া মূল্য দিয়ে কিনে বাঙাল মুলুকে ফিরিয়ে নিয়ে আসে। সেই সময়ে তার বয়স মাত্র সাতাশ বছর। এই বয়সেই সে জীবনের সুন্দর আর কুৎসিত দুটো দিকই ভালোভাবে দেখে ফেলেছে। বুঝতে শিখেছে নিজের ভেতরে শক্তি লালন করার উপায়, বুঝতে শিখেছে সম্পর্কের মূল্য, উপলব্ধি করতে শিখেছে ধৈর্যের ফলে কত অসম্ভবকে সম্ভব করা যেতে পারে, তবে সবচেয়ে বড়ো শিক্ষা যেটা পেয়েছে সেটা হলো স্রষ্টার ওপরে ভরসা রাখার শিক্ষা। ওই সাত আসমানের ওপরে যিনি আছেন, তিনি কত অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারেন, তার ঝলক সে ওই বয়সেই বেশ ভালোভাবেই বুঝতে শিখেছে। মারামারি কাটাকাটি, হিংস্রতা আর লালসায় ভরা এই পৃথিবীতে কুতুব খাঁ এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করে নিজের দুই ভ্রাতুষ্পুত্রকে দূর দেশ থেকে নিজভূমিতে ফিরিয়ে নিয়ে এসে। শুরু হয় তার জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায়।
সুলতান তাজ খাঁ কররানী ক্ষমতায় আসীন হয়ে তাকে তার পিতার জায়গীরদারি ফেরত দেবার ব্যবস্থা করে দেন। আর নিজেকে সে সুলতানদের শাসনের জন্যে বিলিয়ে দেয়। ভাস্কররা যেমন এক একটু করে পাথর কেটে কেটে মূর্তি নির্মাণ করে, ঠিক তেমনি একটু একটু করে নিজের ভবিতব্যকে নির্মাণ করতে শুরু করে সে। শৈশব কেটেছে একজন রাজপুত্র হিসেবে, কৈশোর কেটেছে একজন দাস হিসেবে। এবার সে নিজেকে ধীরে ধীরে একজন যোদ্ধা এবং শাসক হিসেবে গড়ে তুলতে শুরু করে। বাংলার শেষ স্বাধীন সুলতান দাউদ খাঁ কররানীর রাজত্বকালে সে বিশেষ প্রতিপত্তি লাভ করে তার অসাধারণ বীরত্বের জন্যে। কারণ সে তখন জানত সামনে অনেক বড়ো কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে আর নিজেকে সেভাবেই প্রস্তুত করতে শুরু করে সে। শুধু নিজেকে বললে ভুল হবে নিজেকে, নিজের রাজ্যকে এবং বলতে গেলে নিজের লোকদেরকেও।
ষোড়শ শতকের যখন চারভাগের তিনভাগ পার হয়েছে সেইসময়ে বাংলার সুবাদার মুনিম খাঁর মৃত্যু হলে আফগান নেতা দাউদ খাঁ কররানী স্বাধীনতা ঘোষণা করে নিজ নামে বাংলা ও বিহারে খুতবা পাঠ করাতে শুরু করে। তাদেরকে অনুসরণ করতে শুরু করে বাংলার বুকে শাসন করতে থাকা আরেকদল শাসক, ইতিহাস যাদেরকে বারো ভূঁইয়া নামে চেনে। দাউদ খাঁ কররানী নিজেকে স্বাধীন করামাত্রই স্বাধীন ভূঁইয়ারাও নিজেদের নামে খুতবা পাঠ শুরু করে। আর এই ব্যাপারটার পুরোভাগের উদ্যোক্তা ছিল সে নিজে। বিগত কয়েক বছর ধরেই সে আসলে এই ব্যাপারে প্রস্তুতি নিচ্ছিল। রাজা টোডরমল সমগ্র বাংলাকে উনিশটি সরকার ও ছয়শো বিরাশিটি পরগনায় ভাগ করেছিল। সরকার বাজুহা ও সরকার সোনারগাঁওয়ের দুটি সরকারের সৃষ্টি হয়েছিল, আর তাতে সরকার বাজুহা ছিল বত্রিশটি পরগনা ও সরকার সোনারগাঁওয়ে ছিল বায়টি পরগনা। এর ভেতরে তার সরকার সেনারগাওঁয়ে বাজুহার বাইশটি পরগনার এবং ছয়টি দুর্গের আধিপত্য গ্রহণ করেছিল। এগুলোর আয়তন একেবারে পূর্বে আসামের প্রান্তভাগ থেকে শুরু করে একদিকে পশ্চিমে আর অন্যদিকে বৃহত্তর মোমেনশাহীর ব্রহ্মপুত্র বিধৌত এলাকা ছাড়িয়ে একবারে পদ্মার দক্ষিণভাগে ত্রিপুরা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। বিশেষ করে উত্তরের ভাটি এলাকার একটা বড়ো অংশই তার নিয়ন্ত্রণে ছিল। নিজের এই বিস্তৃত রাজ্য পরিচালনার জন্যে সে প্রথমে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে নিজের পরিচালনা কেন্দ্র স্থাপন করে, তারপর সেইটাকে সরিয়ে নিয়ে আসে সুবর্ণগ্রামে, অর্থাৎ বর্তমানে যেখানে আছে সেখানে। অনেক আগে থেকেই এখানে সে গড়ে তুলেছে মোঘল আর শত্রুদের জন্যে সব ধরনের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। কিন্তু সে জানত এটা যথেষ্ট নয়। কারণ খুতবা পাঠ মাত্রই সব বদলে যেতে শুরু করবে, আর হয়ও তাই।
যেই মুহূর্তে ভূঁইয়ারা স্বাধীনতা ঘোষণা করে নিজেদের নামে খুতবা পাঠ শুরু করে, সাথে সাথে সমগ্র বাঙাল মুলুকে হই হই রব পড়ে যায়। আর সেই উচ্চনাদের ধাক্কা গিয়ে লাগে দিল্লিতে। প্রাথমিক ধাক্কা কাটিয়ে নিজেদের অবস্থান পোক্ত করতে সমর্থ হয় ভূঁইয়ারা। কিন্তু সে জানত এটা যথেষ্ট নয়, আরও শক্তিশালী আঘাত আসতে যাচ্ছে তাদের ওপরে। আর তাই সে প্রস্তুতিও নিচ্ছিল সেভাবেই। নিজের দীর্ঘ আর বিচিত্র জীবনের অভিজ্ঞতায় সে জানত শক্তি ব্যাপারটা সবসময় দ্বিমুখী হয়ে থাকে, একটা হলো সত্যিকারের শক্তি যেটা দিয়ে সামর্থ্যের প্রমাণ করা যায় কিংবা করতে হয়। কিন্তু এই শক্তির মূল নিহিত থাকে অন্য আরেকটা ব্যাপারে, সেটা হলো সম্পর্কে। আর তাই সে বহু আগে থেকেই নিজের সম্পর্কের ক্ষেত্র বিস্তৃত করছিল সামসময়িক ভূঁইয়াদের সাথে। যাদের ভেতরে ছিল ভাওয়াল এলাকার গাজীরা। তার পিতা সুলাইমান খাঁ এবং গাজীদের প্রধান ফজল গাজীর পিতার ভেতরে সবসময় সুম্পর্ক ছিল। সে ক্ষমতায় আরোহণ করেই পুরনো সেই সম্পর্ক ফিরিয়ে আনার জন্যে গাজীদের সাথে সুসম্পর্ক তৈরি করে। বলতে গেলে বন্ধু হয়ে ওঠে সে আর ফজল গাজী। দুজনেই ছিল মোঘল শাসন বিরোধী এবং স্বাধীনতাকামী মানুষ। উভয়েই মনে প্রাণে স্বাধীনতার উচ্চাশা পোষণ করত, উভয়েই নিজ এলাকা আর সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার কথা ভাবত। স্বাধীনতার চেতনা থেকে তারা বুঝতে পেরেছিল একক প্রতিরোধে বাইরের শত্রুদের ঠেকানো যাবে না। তাই তারা দুজনেই অনুভব করতে পারছিল টিকে থাকতে হলে নিজেদের স্বাধীনতা বজায় রাখতে হলে এবং জনগণের মঙ্গল করতে হলে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। তাই দুজনের বন্ধুত্ব খুব সহজেই গভীর থেকে গভীরতম রূপ লাভ করে। আর তাদের এই বন্ধুত্বের প্রভাব পড়ে শীতলক্ষ্যা পাড়ের জনগণ থেকে শুরু করে সমগ্র বাঙাল মুলুকের জনগণের ভেতরে। আর এরই বহিঃপ্রকাশ ঘটে বারো ভূঁইয়াদের উত্থানের ভেতর দিয়ে।
একদিকে ভাওয়াল এলাকা কালীগঞ্জের অন্তর্গত শীতলক্ষ্যা নদীর পশ্চিম তীরে চৌরা নামক গ্রামে ছিল গাজীদের আবাসস্থল। এই চৌরা গ্রাম থেকেই গাজীরা ভাওয়াল পরগনা শাসন করত। অন্যদিকে সে ব্রহ্মপুত্রের পাড় ধরে একেবারে উত্তর থেকে শুরু করে পদ্মার পাড় পর্যন্ত বিস্তৃত করেছিল নিজেদের শাসন এলাকা, যার ভেতরে বৃহত্তর ব্রহ্মপুত্র বিধৌত এলাকা তো ছিলই, সেখান থেকে দেশের মধ্যভাগে মহেশ্বরদী ও সোনারগাঁও পরগনা, ত্রিপুরা জেলার সরাইল ও বরদাখাত পরগনা মিলিয়ে এক বিস্তৃত রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ হয় সে। তার প্রতিষ্ঠিত রাজ্যের একটা বড়ো অংশের নাম ছিল মহেশ্বরদী পরগনা। ভাওয়াল ও মহেশ্বরদী পরগনার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত ছিল ব্রহ্মপুত্র ও শীতলক্ষ্যা নদী। অসংখ্য খাল-বিল আর নদী নালায় বিস্তৃত এই দুই পরগনা। যোগাযোগের সবচয়ে শক্তিশালী এবং দ্রুততম মাধ্যম জলপথ। আর সেই প্রয়োজনেই তারা গড়ে তুলেছে শক্তিশালী নৌবাহিনী। আর একারণেই একেবারে উত্তরাঞ্চল থেকে শুরু করে বাংলার মধ্যভাগ হয়ে দক্ষিণে দুইপাশে বিস্তৃত অঞ্চলের সবচেয়ে দাপুটে বাহিনীতে পরিণত হয়েছে তাদের নৌবাহিনী। বিশেষ করে নিজের সরাইল পরগনা, মহেশ্বরদী পরগনা, ভাওয়াল পরগনা এবং বৃহত্তর ব্রহ্মপুত্র এলাকায় বিস্তৃত জঙ্গলমহাল এলাকার যেকোনো জায়গায় যেকোনো সময়ে দ্রুততম সময়ে নিজের বাহিনী নিয়ে যাতায়াত করার মতো সামর্থ্য তাদের রয়েছে। আর রয়েছে তাদের এসব ক্ষিপ্রগতির ছিপ নৌকার সুনাম। দ্রুত গতির কারণে এসব ছিপ নৌকা নিয়ে একদিকে যেমন দ্রুত এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাতায়াত করা যেত ঠিক তেমনি, দ্রুততম সময়ে এক জায়গায় থেকে আরেক জায়গায় সরে পড়া সম্ভব হতো। এমনকি বর্ষার উত্তাল সময়েও এসব নৌকার উপকারিতার কোনো সীমা নেই। একদিকে তার এবং গাজীদের নৌবাহিনীর খ্যাতি তো ছড়িয়ে পড়েই, অন্যদিকে এর প্রভাব পড়তে থাকে বাঙাল মুলুকের অন্যান্য শাসকদের ওপরে। আগে থেকেই বাঙাল মুল্লুককে বলা হতো বিদ্রোহী রাজাদের এলাকা, তার রাজ্যের বিস্তৃতি, গাজীদের সাথে সুসম্পর্ক এবং শক্তিশালী নৌ এবং ডাঙার বাহিনীর কারণে তার স্বাধীনতার স্বপ্ন ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে সবার মাঝে। আর সেখান থেকেই ধীরে ধীরে গড়ে উঠতে শুরু করে বারো ভূঁইয়াদের শাসন ব্যবস্থা। এদের উত্থান ছিল দেশপ্রেম এবং ঐতিহ্যের, ভ্রাতৃত্ব এবং স্বাধীনতার। কিন্তু কেন্দ্রীয় শাসন তো এত সহজে সব মেনে নেওয়ার কথা ছিল না এবং হলোও তাই। শুরু হলো একের-পর-এক আক্রমণ।
ছোটো-বড়ো সব যুদ্ধের কথা বলতে গেলে সে এক আলাদা উপাখ্যান তৈরি হয়ে খাবে। ১৫৭৭ খ্রিস্টাব্দে মোঘল সেনাপতি খান-ই জাহান যখন এগারো সিন্ধুর কাছাকাছি এক জায়গায় তার সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়, সেই বিশেষ মুহূর্তে তার পাশে ছিল ফজল গাজীর পিতা তিলগাজী। তিলগাজীর মৃত্যুর পর তার সন্তান ফজল গাজী তার বন্ধুসম হয়ে ওঠার পর দুজনে মিলে বারবার মোঘলদের প্রতিহত করতে থাকে সফলতার সাথে। তাদের সাথে ধীরে ধীরে যোগ দিতে থাকে বারো ভূঁইয়াদের বাকিরা।
অন্যদিকে পরিবর্তন হতে থাকে দিল্লির শাসন ব্যবস্থা। সম্রাট আকবর দিল্লির সম্রাট হবার পর সবকিছু গুছিয়ে খানিকটা থিতু হবার পরই মনোযোগ দিতে শুরু করে ভারতবর্ষের চারপাশে তার মূল শাসন এলাকার পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোর দিকে। খুব স্বাভাবিকভাবেই তার নজর পড়ে বাঙাল মুলুকের দিকে। ১৫৮২ সনে শাহবাজ খাঁ, ১৫৮৫ সনে সাদিক খাঁ, ১৫৮৬ সনে উজির খাঁকে পাঠিয়ে একের- পর-এক আক্রমণ চালাতে থাকে বাংলার শাসনভার পুরোপুরি দিল্লির অধীনে করার জন্যে; কিন্তু কোনো কাজ হয় না। তার এবং বারো ভূঁইয়াদের শক্তিশালী বাহিনী প্রতিরোধ করে দিতে থাকে সমস্ত আক্রমণ। কিন্তু কোনো যুদ্ধেই তাকে পরাজিত করা সম্ভব হয়নি। সম্রাট আকবরের আনুগত্য স্বীকার না করেও সে বারবার নিজের ও নিজের লোকদের স্বাধীনতা বজায় রাখতে সমর্থ হয়েছে। তার দুঃসময়ে অসংখ্য নৌ-সেনা নিয়ে পাশে থেকেছে তার বন্ধু ফজল গাজী থেকে শুরু করে বারো ভূঁইয়ারাও। দিন দিন সাধারাণ মানুষের চোখে সে মানুষ থেকে নায়ক, নায়ক থেকে প্রতীকের আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছে। তার ও ফজল গাজীর যৌথ সামরিক বাহিনীর সামরিক শক্তির কাছে বারবার পরাজিত হয়েছে মহাপরাক্রমশালী মোঘল বাহিনী। মোঘলদের বিরুদ্ধে এই বীরত্ব-গাথা রচনার কারণে তাকে দেওয়া হয়েছে ‘মসনদ- ই-আলা’ উপাধি।
বিচ্ছিন্ন পাঠান শক্তি বিভিন্ন স্বাধীনতা প্রিয় ব্যক্তির সহযোগিতায় একত্রিত হয়ে বাংলায় পাঠান শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য এক হচ্ছে-এই সংবাদ দিল্লিতে পৌঁছানো মাত্র মোঘল রাজদরবারে দেখা দেয় চরম উৎকণ্ঠা। দিল্লির দরবারের এই অস্থিরতার খবর বাংলায় এসে পৌঁছাতে সময় লাগেনি। যেকোনো সময় আক্রমণ হতে পারে এই আশঙ্কায় ফজল গাজীসহ বাকিদেরকে একসাথে করে ফরমান পাঠায় সে। তারা নিজেরা নিজেরা যখন যেকোনো যুদ্ধ কিংবা আক্রমণের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে এমন সময় তাদের আশঙ্কাকে সত্যি প্রমাণ করে মোঘল সেনাপতি শাহবাজ খাঁ বাংলা আক্রমণ করে। আর তার সাথে গোলযোগ বাধতে সময় লাগেনি ভূঁইয়াদের। যদিও শাহবাজ খাঁর সাথে মূল গোলযোগটা বাধে তার নিজের শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা ও আরেক বারো ভূঁইয়ার; কিন্তু নিজের শ্রেষ্ঠ যোদ্ধাকে বাঁচাতে সে পিছপা হয়নি এক বিন্দু। কারণ সে জানত-এই ভয়ঙ্কর বিপদের সময় তার নিজের লোককে তারই রক্ষা করতে হবে। সেই ঝামেলা সামলে নেবার চেষ্টা করছে এমন সময় খবর এসে পৌঁছায় অবশেষে রাগে ক্রোধে বিরক্ত সম্রাট আকবর তার সেরা সেনাপতি মানসিংহকে বাংলায় পাঠাচ্ছ।
সাথে সাথে সমস্ত ভূঁইয়ারা থেকে শুরু করে সবাই সাবধান হয়ে ওঠে। সমস্ত জায়গায় সচেতন অবস্থা জারি করে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু সে জানত মানসিংহ আগের মোঘল সেনাপতিদের মতো নয়। তার সাথে টক্কর দেওয়ার মতো শক্তি তার নিজের তো নেই; এমনকি বারো ভূঁইয়াদের মিলিত শক্তিও মানসিংহের বাহিনীর কাছে অসহায়। তার সাথে যুদ্ধে জিততে হলে তার আরও অনেক বেশি কিছুর প্রয়োজন। এমন সময় তার সবচেয়ে বিশ্বস্ত সুবাদারদের একজন জঙ্গলমহালের অধিপতি তাকে বিশেষ এক প্রস্তাব পাঠায়। প্রথম বিষয়টা শুনে সে চমকে ওঠে, পরবর্তীতে এর সম্ভাবনা যাচাই করে সে খুশি হয়ে ওঠে। কিন্তু ভয়ঙ্কর বিষয় হলো সুবাদার নিজেকে সামলে নিয়ে তার কাছে পৌঁছানোর আগেই তাদের জঙ্গলমহালে আক্রমণ হয়। মোঘল বাহিনী এত দ্রুত এত ভিতরে গিয়ে জঙ্গলমহালে আক্রমণ করে বসবে-এটাও সে ভাবতে পারেনি
সে বাস্তববাদী মানুষ, লোকে তাকে যতই নায়ক কিংবা দেবতা ভাবুক না কেন, নিজে খুব ভালোই ধারণা রাখে সে নিজের শক্তি আর সামর্থ্যের। সেই সাথে নিজের জীবনের দীর্ঘ আর বিচিত্র অভিজ্ঞতায় সাহস আর বোকামির ভেতরে পার্থক্য করতেও সে শিখেছে বেশ ভালোভাবেই। কাজেই সে এটা জানে মানসিংহের
বাংলায় আগমন এবং নিজেদের চিরাচরিত নিয়ম ভেঙে মোঘলদের জঙ্গলমহালে আক্রমণ একেবারেই ভিন্ন কিছুই ইঙ্গিত দেয়। এসমস্ত কিছুর পেছনে একটাই কারণ থাকতে পারে। যা সে নিজে জানে মোঘলরাও সেটা জানে। আর যদি সেটা হয়ে থাকে তবে–
‘হুজুর, কিছু তো বলুন,’ হঠাৎ পেছন থেকে ভেসে আসা আওয়াজে নিজের সভাসদদের দিকে ফিরে তাকাল মসনদ-ই-আলা উপাধিপ্রাপ্ত বারো ভূঁইয়াদের অন্যতম প্রধান নেতা ঈশা খাঁ।
বাইরের ভেজা অন্ধকার থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিজের লোকগুলোর দিকে তাকালেও সে প্রথমে কিছু বলল না। সবাই তার দিকে তাকিয়ে আছে, তারও দৃষ্টি মানুষগুলোর ওপরে কিন্তু সে আসলে তাদেরকে দেখছে না, নিজের ক্ষুরধার মস্তিষ্কের ভেতরে তার ভাবনার ঝড় বয়ে যাচ্ছে।
‘হুজুর-’ সামনে পশমিনার দস্তরখানের ওপাশে বসা মানুষটা কিছু একটা বলতে যাচ্ছে কিন্তু নিজের একটা হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিলো ঈশা খাঁ, তারপর ধীর পায়ে সে গোল করে সাজিয়ে রাখা পশমিনার আবরণের ওপরে এসে বসে পড়ল হাঁটু মুড়ে। সামনে রাখা গড়গড়ার নলটা হাতে নিয়ে ফিরে তাকাল যে-মানুষটা কথা বলতে চাইছিল তার দিকে। ‘দুঃখিত, সরফরাজ, তোমাকে কথার মাঝে থামিয়ে দেওয়ার জন্যে।’ সরফরাজ তার ডান হাতদের একজন, তুখোড় সেনাপতি এবং দুর্দান্ত যোদ্ধা। ঈশা খাঁ মনে মনে ভাবল: সরফরাজকে সে নির্দ্বিধায় নিজের সেরা যোদ্ধা বলে ভাবত যদি না–’
‘হুজুর, আমি বলছিলাম যে আপনার নির্দেশনা অনুযায়ী পুরো পরিস্থিতি বয়ান করা হলো, এখন আপনার বিচক্ষণ নির্দেশ ছাড়া আমরা কিছু ভাবতেও পারছি না। তাই জানতে চাইছিলাম আপনার মতামত এবং নির্দেশনা কি এই অবস্থায়?’ সরফরাজ কথাগুলো ঈশা খাঁর উদ্দেশ্যে বলে সমর্থনের আশায় ফিরে তাকাল উপস্থিত বাকি মানুষগুলোর দিকে। এটা আসলে ঈশা খাঁর মূল দরবার নয়, বরং এখানে সন্ধের পর দরবারের নির্দিষ্ট কিছু মানুষ নিয়ে নিজের কাচারির বৈঠকখানায় বসেছে সে বিশেষ পরিস্থিতিতে বিশেষ আলোচনার জন্য। সরফরাজ কথা শেষ করতেই সবাই সমর্থন জানাল।
তাও ঈশা খাঁ চট করে কথা বলল না। সে আরাম করে গড়গড়া টানতে লাগল। গড়াগড়া টানা শেষ করে নলটাকে হুঁকোর সাথে আটকে দিয়ে ঈশা খাঁ বড়ো করে দম নিলো একবার, তার ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি। হাসিটা মুখে নিয়েই নিজের লোকদের দিকে তাকিয়ে সে দেখল, সবাই বেশ অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে। এরকম বিপজ্জনক অবস্থায় সে হাসছে কীভাবে! নিজের লোকদের দিকে তাকিয়ে গর্বে তার বুকটা ফুলে উঠল, এরা কেউই তার রক্তের আত্মীয় না হয়েও এরা সবাই তার ভাই, এরা সবাই এক একজন বীর সেনানি নিজের হাতের ওপরে ভরসা না করে সে এদের ওপরে ভরসা করতে পারে নির্দ্বিধায়। এদের কারণেই সে বাঙাল মুলুকের একজন সাধারণ রাজ্য শাসক হয়েও দিনের-পর-দিন টক্কর দিয়ে যেতে পারছে মোঘলদের সাথে এবং সাফল্যও পাচ্ছে একের-পর-এক। কিন্তু এবার খেলা অনেকটাই বদলে যাবে, কিংবা কে জানে হয়তো বদলে গেছে ইতিমধ্যেই জঙ্গলমহালের পতনের ভেতর দিয়ে।
‘তোমরা আমার কাছে যা বয়ান করলা সেসব মিলায়ে যদি বলি তবে মূল বিষয় হলো কয়েকটা,’ বলে সে নিজের একটা হাত তুলে দাড়িতে বুলাতে লাগল। তারপর অন্য হাতটা ওপরে তুলে নিজের বৃদ্ধাঙ্গুলিটা কনে আঙুলের কড়ে ঠেকাল। ‘প্রথম কথা হলো শাহবাজ খাঁর সাথে টক্করের ফলাফলটা খুবই বিপজ্জনক দিয়ে মোড় নিছে,’ বলেই সে সরফরাজের দিকে ফিরে তাকাল। ‘আমি জানি তোমরা কী ভাবছ বা মনে করছ। তোমরা হয়তো ভাবছ শাহবাজ খাঁর সাথে টক্করটা সরাসরি আমাদের সাথে ছিল না, ওটার ভেতরে ঢোকা আমার উচিত হয়নি ইত্যাদি। কিন্তু সত্যি কথা হলো আমি যা করেছি বুঝেই করেছি। কারণ শাহবাজ খাঁ যা শুরু করছিল তা থেকে আমার নিজের মানুষটাকে রক্ষা করা না হলে ওদের সাহস আরও বাড়তো এবং ধীরে ধীরে ওরা আমাদের দিকে নজর দিত। বাধা দেওয়ার পরও নজর দিচ্ছে, আর বাধা না দিলে তো যাই হোক দ্বিতীয় বিষয়, মানসিংহ বাংলায় পদার্পণ করছে এবং সে নিজের শক্তি বৃদ্ধি করছে। রাজধানী স্থাপন করছে। যেকোনো সময় আক্রমণ চালাবে, ঠিক?’ সবাই সায় জানাল। আর মানসিংহ আক্রমণ চালালে তাকে বাধা দেওয়ার মতো শক্তি আমাদের হবে কি না সেই ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত নই, এখানেই আসে তৃতীয় বিষয়, সুবাদার আসলাম শেঠ এবং জঙ্গলমহালের পতন। তোমরা তো আমার সবচেয়ে কাছের মানুষ, তোমরা তো জানই আজ থেকে কিছুদিন আগে আমরা যখন আশঙ্কা করছিলাম সম্রাট আকবর তার সেরা সেনাপতি মানসিংহকে বাংলায় পাঠাবে, তখন সুবাদার আসলাম আমাদের কাছে একটা প্রস্তাব নিয়া আসে।’
‘হুজুর, সম্মানের সাথে বলছি, সুবাদার আসলাম আপনার কাছে কী প্রস্তাব নিয়ে এসেছিল তা কিন্তু আপনি আমাদের খুলে বলেননি,’ ঈশা খাঁর সভাসদদের মধ্যে যুদ্ধ বিষয়ে সবচেয়ে অভিজ্ঞ সেনাদের একজন অনেকটা মন্তব্য করার মতো বলে উঠল।
‘সে যাই প্রস্তাব নিয়ে আসুক,’ ঈশা খাঁ এবার বিষয়টা খোলাসা করল না। ‘সেটা এমন কিছু ছিল যা খুব সহজেই মানসিংহের সাথে যুদ্ধের মোড় ঘুরায়ে দিতে পারত কিন্তু,’ বলে সে গড়গড়ার নলটা আবার হাতে নিয়ে ওটাকে তাদের দিকে তাক করে বলে উঠল, ‘ভয়ঙ্কর ব্যাপার হলো সুবাদার আসলাম আমার এখান থেকে ফিরে যাবার ঠিক পরপরই তার জঙ্গলমহালে মোঘলরা আক্রমণ করে। সেই আক্রমণের ভয়াবহতা কেমন ছিল সে খবর তো সবার জানা। একদিকে জঙ্গলমহালে আক্রমণ হলো, অন্যদিকে আমাদেরকে চেয়ে চেয়ে তা দেখতে হলো। না আমরা, না রসুল খাঁর বাহিনী কেউই তাকে কোনো মদদ দিতে পারলাম না কারণ বাহরাম খাঁর বাহিনী অবরোধ করে রইল পুরো জঙ্গলমহাল। প্রশ্ন হলো তারা এত পরিকল্পনা করে আমাদের ওপরে আক্রমণ না চালিয়ে জঙ্গলমহালে আক্রমণ কেন চালাল? এর একটাই অর্থ হইতে পারে,’ বলে সেন একুট থামল। ‘তারাও জানে সুবাদারের কাছে কী ছিল।’
‘এত বড়ো সর্বনাশের কথা,’ লতিফ খাঁ চিন্তিত ভঙ্গিতে বলে উঠল। ‘এর মানে সুবাদারের কাছে যা ছিল সেটা যদি আমাদের দিকে যুদ্ধের মোড় ঘুরায়ে দিতে পারে তবে সেটা অবশ্যই শত্রুপক্ষের হাতে পড়লে—’
তুমি ঠিকই ধরেছ লতিফ,’ ঈশা খাঁ আবারও উঠে দাঁড়াল। ‘প্রথমত, বাঙাল মুলুক বাঁচাতে হলে আমাদের নিজেদের শক্তিতে কুলাবে না। একটা দৈব শক্তি লাগবেই। দ্বিতীয়, হলো সুবাদারের শক্তির উৎস আমার চাই। কোনোভাবেই ওটা শত্রুর হাতে পড়া চলবে না।’
‘জনাব,’ এবার তৃতীয় সভাসদ চন্দ্ৰ ভূঁইয়া কথা বলে উঠল। সে সামরিক দিক থেকে খুব বিজ্ঞবান না হলেও, রাজ্যের অর্থনীতির মূল চালিকা মাধ্যম সেই। ‘আমরা কী করে নিশ্চিত হচ্ছি যে সুবাদারের শক্তির উৎস ইতিমধ্যেই শত্রুর হাতে পড়ে যায়নি?
‘কারণ,’ ঈশা খাঁ বলে উঠল। ‘সুবাদার আসলাম অনেকটা ইচ্ছে করেই জঙ্গলমহালের পতন ঘটিয়েছে।’
‘মানে?’ সবাই নিজেদের ভেতরে মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে।
‘মানে হলো গোপন সূত্রে আমাদের কাছে খবর এসেছে, মানে এরকম খবর ছড়িয়ে পড়েছে সুবাদার আসলাম যখন বুঝতে পেরেছে যে জঙ্গলমহালের পতন স্রেফ সময়ের ব্যাপার এবং সে বাইরে থেকে কোনো সাহায্যও আর পাবে না, তখন ইচ্ছে করেই সে প্রতিরোধ না করে আক্রমণে গেছে। এতে সে জানত তার জঙ্গলমহালের পতন দ্রুততর হবে কিন্তু এতে আরেকটা সুবিধা সে পাবে-’
তার কিছু লোককে সে পালাবার ব্যবস্থা করে দিতে পারবে—’
‘লোক নয়, তার স্ত্রী। জঙ্গলমহালের আক্রমণের সময় গোপন জলপথে তার স্ত্রীকে পালাবার ব্যবস্থা করার জন্যে সে এমন কায়দা করেছে যাতে শত্রুরা তার ওপরে আক্রমণ চালায় এই সুযোগে তার স্ত্রী নিজের গুটিকয় লোকদের নিয়ে পালিয়েছে এবং–’
আবারও বিজ্ঞবান লতিফ শেঠ কথা বলে উঠল। ‘সম্ভবত সুবাদারের কাছে যা- ই ছিল সেটা সহই সব পালিয়েছে তারা। ঠিক? কিন্তু তারা এখন আছে কোথায় ইতিমধ্যে ধরা পড়ে যায়নি তো?’
‘ঠিক বলেছ, লতিফ খাঁ,’ ঈশা খাঁকে এই প্রথম চিন্তিত দেখাল। ‘ধরা তারা এখনও পড়েনি। পড়লে সেই খবর আমি পেতাম। তারা জঙ্গলমহাল থেকে বেরিয়ে জলবিধৌত জল-জঙ্গল এলাকায় লুকিয়ে পড়েছে সম্ভবত। স্থানীয়দের জন্যেই সে এক বিচিত্র আর ভয়াবহ জায়গা। আর মোঘলদের জন্যে তো বটেই। কাজেই এত সহজে তারা তাদেরকে ধরতে পারছে না। অন্তত খুব দ্রুত নয়।’
‘আপনি কি ভাবছেন এখন, মশাই?’
‘সমাধান খুব সহজ,’ বলে ঈশা খাঁ আবারও ফিরে তাকাল তার সভাসদদের দিকে। ‘আমাদের কাউকে পাঠাতে হবে। কোনো বাহিনী নয়। বড়োজোর ছোটো একটা দল হতে পারে। অত্যন্ত বিচক্ষণ যোদ্ধাদের নিয়ে গঠিত এক দল, যার নেতৃত্বে থাকবে এমন একজন যে-শুধু সেরা যোদ্ধাই নয় অসাধারণ মাল্লা এবং পানিবিধৌত এসব জায়গা খুব ভালোভাবেই চেনে এবং বোঝে।’
সরফরাজ ছটফটিয়ে খুব আগ্রহের সাথে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল ঈশা খাঁ তাকে থামিয়ে দিলো। ‘তুমি নও, সরফরাজ,’ বলে সে থেমে যেতেই লতিফ খাঁ কথা বলে উঠল। ‘হুজুর, আপনি কি মাসুমের কথা ভাবছেন?’ সে খুব মৃদু স্বরে কথা বলে উঠল। কারণ জানে তার এই মৃদুস্বরে বলা বাক্যটাই প্রচণ্ড উত্তাপ নিয়ে বিস্ফোরিত হতে যাচ্ছে এবং হলোও তাই। ঈশা খাঁ মাথা নেড়ে সায় জানাতেই কামরার প্রায় সবাই অসন্তোষের সাথে মাথা নাড়ল।
‘অসম্ভব–’
‘এই ছেলেটা আগেও আমাদের বিপদে ফেলেছে—’
‘সে যোদ্ধা ভালো হতে পারে কিন্তু—’
ঈশা খাঁ একটা হাত তুলে থামিয়ে দিলো। ‘সে কেমন মানুষ আমি জানি। কিন্তু এই কাজের জন্যে সে এবং তার দল ছাড়া আমাদের আর উপায় নাই।’ আর কেউ কিছু বলার আগেই সরফরাজ কথা বলে উঠল, তাকে খানিকটা ম্লান দেখাচ্ছে। ‘হুজুর, সব বুঝলাম কিন্তু সে তো একজন রাজদ্রোহী-’
‘এই কাজের জন্যে রাজদ্রোহীই সই,’ বলে সে বিড়বিড় করে বলে উঠল, ‘এই কাজের জন্যে এমন কাউকে লাগবে যে সমস্ত বৃত্তের বাইরে চিন্তা করতে পারে। মাসুমরে খবর পাঠাও, আমি তার সাথে দেখা করবো—’
