অধ্যায় আঠারো
বর্তমান সময়
ধানমন্ডি এলাকা, ঢাকা
.
‘আপনাকে না ভুয়া পরিচয়ধারী আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার লোকজন তুলে নিয়ে গেছে?’ বাশার এখনও ওর পিস্তলের ওপরে নিজের হাত সতর্কভাবে রেখে দিয়েছে যাতে প্রয়োজন হলেই সেটা বের করে আনতে পারে।
চৌধুরী তাকিয়ে আছে বাশারের দিকে, বাশারও তাকিয়ে আছে তার দিকে। চৌধুরী তার দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে একবার পৃথাকে দেখে নিলো তারপর আবারও বাশারের দিকে ফিরে বলে উঠল, ‘ইন্সপেক্টর, আমাকে আপনার থ্রেট মনে করার কোনো দরকার নেই। আমি যে আপনাদের বন্ধু, আশা করি সেটা প্রমাণ করতে পেরেছি,’ বলে চুপ হয়ে গেল।
বাশার এখনও তাকিয়ে আছে তার দিকে। আজ সকালে অফিসে লোকটার তিন বছর অগের ছবি দেখেছিল, সেই হিসেবে লোকটার বয়স এখন চল্লিশের আশপাশে হওয়া উচিত। কিন্তু তার সামনে যে-মানুষটা উপস্থিত তাকে দেখে মনে হচ্ছে তার বয়স পঞ্চাশ ছাড়িয়ে গেছে। নিশ্চিতভাবেই বলা যায় মানুষটার জেলজীবন খুব একটা ভালো কাটেনি। ভালো কাটার অবশ্য কোনো কারণও নেই, বাশার মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলো, একটা বাজি ধরেই দেখবে। সে নিজের পিস্তলের ওপর থেকে হাতটা সরিয়ে নিয়ে বড়ো করে একবার দম নিলো। তারপর সোহেলের দিকে ফিরে ইশারা করল তাকে রিল্যাক্স হবার জন্যে। ‘মিস্টার চৌধুরী, আমি আপনার কথা স্বীকার করে নিচ্ছি, আপনি আমাদেরকে সাহায্য করেছেন, কিন্তু আপনাকেও কিছু জিনিস বুঝতে হবে। আপানাকেও অনেক কিছু ব্যাখ্যা দিতে হবে। যদি সেগুলো সন্তুষ্টিজনক হয় তবেই আমরা পরস্পরের ভরসা অর্জন করতে পারবো,’ বাশার এখনও এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে চৌধুরীর দিকে। ‘আর যদি আমরা পরস্পরকে সাহায্য করতে চাই তবে বিশ্বাস অর্জন করাটা খুবই জরুরি।’
চৌধুরীও তাকিয়ে আছে ওর দিকে, অনেকটা যেন আনমনেই সম্মতিসুচক মাথা নাড়ল সে। ‘ফেয়ার এনাফ।
‘আপনি জেল থেকে কীভাবে পালালেন সেটা দিয়ে শুরু করুন।
আবারও কাঁধ ঝাঁকাল চৌধুরী। ‘আমার জেল থেকে পালানোর ব্যাপারটার সাথে অনেকগুলো বিষয় জড়িয়ে আছে। আপনারা যেটা শুনেছেন সেটাও পুরোপুরি মিথ্যে নয়। কিছু লোক আসলেও এসেছিল আমাকে জেল থেকে বের করে নেওয়ার জন্যে। কিন্তু সেটা হয়নি, কারণ আমি আগেই সরে পড়েছিলাম। প্রথমত, আমার সাজার মেয়াদ প্রায় শেষ দিকে চলে এসেছিল। আমার জেল হয়েছিল পাঁচ বছরের, জেলখানায় বছরের হিসাব দশ মাসে হয়। তার ওপরে আমার ভালো আচরণের জন্যে সেটা আরও কমে এসেছিল। তার ওপরে, আমি একসময় জেলারকে একটা বিষয়ে সাহায্য করেছিলাম, তার মেয়ে মৃত্যুশয্যায় ছিল আমি একটা কিডনি দান করেছিলাম তাকে। ফলে জেলের ভেতরেও আমি কিছু সুবিধা পেতাম, বাইরের কিছু খবরাখবর রাখার সুযোগ থাকত। আর তাই প্রফেসর আবদেলের খবরটা আমি জানতাম। আমি এটাও জানতাম তাকে যেহেতু লোকেট করা গেছে এবার আমার দিকে নজর পড়বেই। সেটা পুলিশের হোক আর অন্যদের হোক। তাই জেলারকে অনুরোধ করে আমার মুক্তির কিছুদিন আগেই আমি বের হয়েছিলাম, সেটা অবশ্য খুব যে লিগ্যাল পন্থায় তা না। যাই হোক, সব সম্ভবের দেশে এটাও সম্ভব। এরপরের দিনই আমাকে নিতে ভুয়া লোক আসে, জেলার বুঝতে পেরে তাদের ফিরিয়ে দিলেও উচ্চাবাচ্য করেনি, বরং এটাকে সে এক্সকিউজ হিসেবে দাঁড় করিয়েছে পরে।’
‘এরপরদিন পিবিআইয়ের লোক যায় আপনার খোঁজ করতে—’ সোহেল বলে উঠল।
‘জেল থেকে বের হবার পর কী করলেন?’
‘আপনারা যা করেছেন,’ বলে সে পৃথাকে দেখাল। ‘আমি সম্ভবত আমার জীবনে গত তিন বছর সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করেছি প্রফেসর ইফতেখারকে,’ বলে সে বয়ান করল তিন বছর আগে কী ঘটেছিল। ‘আমি জানতাম প্রফেসর আবদেল আবিষ্কার হবার পর এবং আমি পালানোর পর সবার নজর পড়বে প্রফেসর ইফতেখারের মেয়ের দিকে। কাজেই আমি তার ওপরে নজর রাখতে শুরু করি। আর বাকিটা—’ নিজের বাক্য সমাপ্ত না করে সে কাঁধ ঝাঁকাল।
‘আমাকে একটা কথা বলেন তো, বাশার আলোচনার ভঙ্গিতে বলে উঠল। ‘পুরো বিষয়টা আসলে কী নিয়ে? আমরা সবাই পুরো ব্যাপারটার খণ্ড খণ্ড চিত্র দেখতে পাচ্ছি, কখনও আগা কখনও মাথা। ময়মনসিংহ থেকে টুইন কালী, সিলেট থেকে বুদ্ধ মূর্তি, চট্টগ্রাম থেকে রাজদ্রোহী নামের অদ্ভুত এক অমীমাংসিত রহস্যের সন্ধান বের হয়েছে। এগুলো আসলে কী? প্রফেসর আবদেল আর প্রফেসর ইফতেখার আসলে কী নিয়ে গবেষণা করছিলেন, কীসের সন্ধান পেয়েছিলেন তারা?’
বাশারের প্রশ্নের জবাবে মৃদু হেসে উঠল চৌধুরী। ‘এগুলো তো আমিও জানতে চাই।’
মানে আপনি উনাদের অ্যাসিসটন্টে ছিলেন, আপনি কিছুই জানেন না এটা কেমন কথা?’ বাশার আনমনেই মাথা নাড়ল। ‘এটা তো বিশ্বাসযোগ্য হতে পারে না।’
‘ইন্সপেক্টর, আমি বুঝতে পারছি আমার কথা শুনতে অদ্ভুত শোনাচ্ছে, হয়তো বা অযৌক্তিকও, কিন্তু আমি পুরো বিষয়টা বললে আপনারা বুঝতে পারবেন। সেটা বলার আগে আরেকটা কথা বলে নেই,’ চৌধুরী পৃথার দিকে একবার তাকাল। ‘ম্যাডাম, আমি কোনো ক্রিমিনাল নই, কিংবা কে জানে গত তিন বছরে হয়তো হয়েই গেছি কি না। আমি জানি প্রফেসর ইফতেখার আপনার বাবা, এক সময় অনেক মহান চিন্তা করতাম। কিন্তু এই যে রহস্য ইত্যাদি, এগুলোর বিষয়ে আমার আর কোনো আগ্রহ নেই। আমার একমাত্র আগ্রহ প্রফেসর ইফতেখারকে খুঁজে বের করা। পাগলের মতো শ্রদ্ধা করতাম আমি, অথচ মানুষটা আমার জীবনটা শেষ করে দিলেন! জীবনে একবারের জন্যে হলেও তার সামনে দাঁড়াতে হবে আমাকে এবং একবারের জন্যে হলেও তার চোখে চোখ রেখে জিজ্ঞেস করতে হবে, কেন তিনি এমন করলেন?’
‘আমাকেও সেটাই করতে হবে—’ বাশারের পাশ থেকে পৃথা বিড়বিড় করে বলে উঠল। ‘আমিও তার চোখে চোখ রেখে জানতে চাই সে কেন আমার আর আমার মায়ের জীবনটা নষ্ট করল।’
যাক গে, সে অন্য কথা,’ বাশার দেখল একদিকে চৌধরীর চোখে অশ্রু, আবার তার চোখে অদ্ভুত এক আলোও বিদ্যমান। ‘প্রফেসর আর প্রফেসর ইফতেখারের সাথে আমি ইন্টিমেটলি কাজ করতে শুরু করি আজ থেকে তিন বছর আগে উনারা যখন হারিয়ে যান তার এক বছর আগে থেকে,’ বাশার দেখল চৌধুরী আঙুলের কড়ে হিসেব করতে করতে বলে উঠল। ‘এর আগে আমি প্রফেসর ইফতেখারের ডক্টরেট স্টুডেন্ট ছিলাম, ওই সময়টাতে উনারা বেশ কিছু প্রপোজাল নিয়ে কাজ করছিলেন। এগুলোর ফাইলিংয়ের কাজের জন্যেই মূলত প্রফেসর ইফতেখার আমাকে ফুল টাইম উনার সাথে কাজ করতে বলেন।
‘যখন আপনি উনাদের সাথে কাজ করতে শুরু করেন তখন উনারা কোনো স্টেজে ছিলেন, মানে অ্যাডভান্স স্টেজে নিশ্চয়ই, তা না হলে তো’
‘অনেকটা তাই,’ চৌধুরী জবাব দিলো। ‘এরপরেই উনাদের সাথে অথরিটির গন্ডগোল লাগে উনারা কিছু অর্গানাইজেশনের সাথে জড়িয়ে যান এবং এর এক বছর পরেই পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হয় যে তারা আন্ডার গ্রাউন্ডে চলে যেতে বাধ্য হন, আমিও ছিলাম তাদের সাথে,’ বলে সে একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ছাড়ল। ‘আসলে যাদেরকে সারাজীবন গুরু মেনে এসেছি তাদের বিপদের সময়ে মুখ ঘুরিয়ে চলে যেতে পারিনি বলেই স্রেফ নিজের ক্যারিয়ার বিসর্জন করে উনাদের হেল্প করেছিলাম। প্রফেসর বারবার বলতেন উনারা বিরাট কিছু একটা করতে যাচ্ছেন, আমিও একদিন এর অংশীদার হবো,’ বলে সে দুঃখের হাসি দিলো। ‘কেমন অংশীদারিত্ব পেয়েছি সে তো দেখতেই পাচ্ছেন।’
‘তাই বলে আপনি কিছুই জানেন না, এটা কি—’
চৌধুরী চোখ তুলে তাকাল বাশারের দিকে, ‘আমি কি একবারও বলেছি আমি কিছুই জানি না, আমি বলেছি আমি সবটা জানি না। আমি যা জানি সেটা অবশ্যই শেয়ার করব, কিন্তু তার আগে আমাকে জানতে হবে কেন? এটা করে আমার লাভ কী হবে? আমাকে আপনাদের প্রয়োজন, আপনাদেরকে আমার প্রয়োজন নেই।
‘আমি আপনাকে আপনার কোনো লাভের ব্যাপারে প্রমিজ করতে পারবো না,’ বাশার সরাসরি তাকিয়ে আছে, চৌধুরীর চোখের দিকে। ‘আমি নিজেই যে-ফোর্সের হয়ে কাজ করছি সেই অফিসে আমি জয়েন করেছি আজকে সকালে। এখানে আমি কী ধরনের নেগোসিয়েশন করব, বলেন। তার ওপরে আপনার ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে শুরু করে এমনকি জেল পালানোর বিষয়টা নিয়ে হাজারো সমস্যা,’ বলে বাশার দীর্ঘ নিশ্বাস ছাড়ল। ‘কিন্তু আমি এটাও অস্বীকার করব না যে, আপনার হেল্প আমাদের প্ৰয়োজন।’
বাশারের কথা শুনে চৌধুরী হেসে উঠল, মানে আমার মতো একজন ক্রিমিনালের হেল্প আপনার প্রয়োজন কিন্তু আমাকে হেল্প করার কোনো সুযোগ বা ইচ্ছা আপনার নেই।’
‘দেখুন, আমি অস্বীকার করছি না শুধু আপনি না আপনাদের দুজনেরই হেল্প আমাদের প্রয়োজন, সে পৃথা আর চৌধুরী দুজনকেই দেখাল। ‘আমি চাইলেই বলতে পারতাম, হ্যাঁ, আমাকে হেল্প করুন, বিনিময়ে সব মাফ করিয়ে দেব আমি বা ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু আমি সেটা করছি না,’ বাশার এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে চৌধুরীর দিকে। ‘আমি আপনাদেরকে শুধু সত্যিকারের পরিস্থিতিটা বলছি, মিথ্যে প্রমিজ আমি আপনাদেরকে করব না। কারণ আমি এটা বুঝতে পারছি আপনারা দুজনেই প্রচলিত সিস্টেমের চাপে হোক আর নিজের শ্রদ্ধেয়জন হোক বা আপনজন হোক সব মিলিয়ে যথেষ্ট সাফার করেছেন এবং এখনও করছেন। আর সিস্টেমের সাথে লড়াই করলে কেমন লাগে আমি এটা খুব ভালোভাবেই জানি।’
‘আমি একটু কথা বলি—’ সোহেল কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল তার আগেই পৃথা তাকে থামিয়ে দিলো।
‘এই পুরো ব্যাপারটাতে আমার ভূমিকাটা কি আমি বুঝতে পারছি না। আপনারা আমাকে ট্র্যাপ করে বিপদে ফেলেছেন। আমি চাইলেই আপনাদেরকে সু করতে পারি। আর আমি–’
‘শোনো, পৃথা, একটা ব্যাপার তোমাকে বুঝতে হবে, আমরা সবাই একদিকে যেমন সাফার করেছি আবার না চাইলেও এই বিষয়টার সাথে জড়িয়ে গেছি,’ চৌধুরীর গলা একেবারে শান্ত শোনাচ্ছে, সে মনে হয় ইচ্ছে করেই পৃথাকে তুমি ডাকল। ‘তুমি হয়তো বুঝতে পারছ না, হয়তো ভাবছ তোমাকে এখানে এক্সপ্লয়েট করা হচ্ছে,’ বলে সে মাথা ঝাঁকাল। ‘হ্যাঁ, তোমাকে আমাদের প্রয়োজন, কিন্তু তোমারও আমাদেরকে প্রয়োজন। তুমি তোমার বাপকে পছন্দ করো বা না করো একটা বিষয় তো বুঝতে পারছ একাধিক মহলের কাছে প্রফেসর ইফতেখারের মূল্য এখন অনেক। আর সেই একাধিক মহলে তার কাছে পৌঁছানোর মাধ্যম একমাত্র তুমি।’
‘অথবা আপনি-’ চৌধুরীকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠল সোহেল।
‘অস্বীকার করছি না,’ বলে চৌধুরী থামল। সে সোহেলের দিক থেকে নিজের দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে বাশারের দিকে তাকাল। ‘ধন্যবাদ ইন্সপেক্টর, মিথ্যে কোনো প্রমিজ না করার জন্যে। তবে একটা জিনিস পরিষ্কার আমরা এখানে যারাই আছি পরস্পরের কাছ থেকে কোনো সুবিধা পাই বা না-পাই, পরস্পরকে আমাদের প্রয়োজন। আপনাদের কেস সলভ করতে হলে প্রফেসর ইফতেখারকে প্রয়োজন, আর তাকে খুঁজে বের করতে হলে আমি এবং পৃথা দুজনেই সমান গুরুত্বপূর্ণ, পৃথার আমাদেরকে প্রয়োজন, কারণ প্রফেসর ইফতেখারকে না পাওয়া পর্যন্ত সে মোটেই সেফ না।’
তারচেয়েও বড়ো কথা তাকে আমার কিছু কথা জিজ্ঞেস করার আছে—’ চিবিয়ে চিবিয়ে কথাটা বলল পৃথা। বাশার এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে।
‘আমার তার কাছে কিছু জিজ্ঞাসা আছে, তার চোখে চোখ রেখে আমাকে কিছু কথা জানতে হবে। আর আমি এই রহস্যেরও সমাধান চাই, আর তাই প্রফেসরকে প্রয়োজন আমাদের।’
‘আমি আগেই বলেছি কোনো মিথ্যে প্রমিজ করব না,’ বাশার কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলে উঠল। ‘আপনার জন্যে আমি সর্বোচ্চ এটুকু করতে করতে পারি। যেহেতুে আমাদের পরস্পরকে প্রয়োজন কাজেই এই মুহূর্তেই আপনার বিষয়ে আমি অথরিটিকে জানাব না। তবে যদি আমরা প্রফেসরকে খুঁজে বের করতে পারি এবং এই কেস সলভ করতে পারি এবং–’ ইচ্ছে করেই ও নেক্রপলিস বা রেলিকের নামগুলো এড়িয়ে গেল। ‘সেইক্ষেত্রে হয়তো আমি আপনাকে সহায়তা করতেও পারি-’
‘ফেয়ার এনাফ,’ চৌধুরী স্টিয়ারিংয়ের দিকে ঘুরে গেল। ‘আমাদের পরস্পরকে প্রয়োজন আর বিশেষ প্রয়োজন প্রফেসর ইফতেখারকে। কারণ সমস্ত রহস্যের গোড়া জুড়ে আছে তার সাথে। কাজেই সবার আগে তাকেই খুঁজে বের করতে। তবে সেটা করতে হলে আগে আমাদেরকে জানতে হবে পুরনো কিছু বিষয় এবং’
আপনি এই সমস্ত রহস্যের বিষয়ে কী জানেন, এর শুরু কোথা থেকে, বিষয়টা আদৌ কি নিয়ে এবং রাজদ্রোহীর ব্যাপারটাই বা কি আমাদেরকে আগে বিস্তারিত বুঝতে হবে—’
‘লেটস স্টার্ট দ্য জার্নি— তার আগে এখান থেকে সরে পড়তে হবে। রাতে খোলা থাকে এমন কোনো রেস্টুরেন্টে বসে কথা বলতে পারি আমরা—’
‘লেটস গো—’
***
আজ রাতের অভিযান এতটা সফল হবে সে ভাবতে পারেনি। সাধারণত কোনো সাফল্যে খুব বেশি খুশি হয়ে ওঠার মতো মানুষ সে নয়, আবার ব্যর্থতায় একেবারে ভেঙে পড়ার মতো মানুষও সে নয়। জীবনের নানা ঘাতপ্রতিঘাত তাকে যে- কয়েকটা জিনিস মারাত্মকভাবে শিখিয়েছে তার ভেতরে অন্যতম একটা হলো স্থির থাকা। পরিস্থিতি যাই হোক না কেন কখনোই কোনো অবস্থাতেই সে অস্থির হয়ে ওঠে না। কারণ সে জানে বেলা শেষে যাই ঘটুক না কেন, সাফল্য আর ব্যর্থতা সবই স্রেফ সময়ের ব্যাপার। কোনোটাই স্থায়ী নয়। আর তাই যেকোনো অবস্থায় যেকোনো সময়ে অস্থির না হয়ে নিজেকে ঠিক রেখে যেকোনো মূল্যে লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। কিন্তু সে এটাও উপলব্ধি করতে পেরেছে বেশিরভাগ মানুষই এটা করতে পারে না। এ-ক্ষেত্রে বাঘ কিংবা সিংহের শিকার করার প্রক্রিয়াটাকে সে সবসময় নিজের আদর্শ বলে মনে করে। একটা বাঘ যখন হরিণের পালের ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে শিকার করার জন্যে তখন সে একটা নির্দিষ্ট হরিণকে টার্গেট করে ওটাকেই ধরার জন্যে আক্রমণ করে। ওটাকে আক্রমণ করতে গিয়ে বা ধরতে গিয়ে তার সামনে যদি আরও কোনোটা এসে পড়ে খুব সহজেই সে ওটাকে বাদ দিয়ে এটাকে ধরতে পারবে, বাঘ কখনোই সেটা করবে না। সে যেটাকে উদ্দেশ্য করবে সেটাকেই ধরার চেষ্টা করবে। সেটা যতই কঠিন কিংবা অসম্ভবই হোক না কেন এমনকি যদি ধরতে নাও পারে তাও কোনো সমস্যা নেই, কিন্তু সে তার উদ্দেশ্য থেকে সরবে না।
সে নিজেও এভাবেই চিন্তা করে, এভাবেই ভাবার চেষ্টা করে এবং এভাবেই নিজের কর্মপন্থা ঠিক করার চেষ্টা করে। কিন্তু সে এটাও জানে বেশিরভাগ মানুষ আসলে এটা পারে না। প্রথমত, বেশিরভাগ মানুষ জানেই না যে তাদের জীবনের লক্ষ্য কি, তারপর সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে কী করতে হবে আবার সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর পথে হাজারটা বাধা আর ডিস্ট্র্যাকশন তাকে নানাভাবে বিমুখ করে চলে প্রতিনিয়ত। কিন্তু সে এমন নয়, সে একেকবারেই ভিন্ন পন্থায় চলে এবং ভিন্ন পন্থায় কাজ করে। বহু ভেবেচিন্তে সে কাজে নামে, বহু ভেবেচিন্তে সে নিজের লক্ষ্য স্থির করে, আর যখন সে একবার লক্ষ্য স্থির করে ফেলে তখন আর সেটা থেকে মুক্তি নেই। যেকোনোমূল্যে যেকোনোভাবে তাকে ওটার কাছাকাছি পৌঁছাতেই হবে।
নিজের ভাবনার জগৎ থেকে ফিরে এসে সে তার পাশে ল্যাপটপে কাজ করতে থাকা চুল ঝুঁটি করা ছেলেটার দিকে ফিরে তাকাল। টেকনোলজি জিনিসটা ঠিক তার ধাতে সয় না, কিন্তু সে বোকা নয়, সে জানে এই যুগে টেকনোলজি ছাড়া চলবে না। আর তাই একদিকে এইসব তথাকথিত ‘টেকগাই’দেরকে তার কেন জানি বিরক্ত লাগে, অন্যদিকে এরা কাজের মানুষ এটাও সে উপলব্ধি করতে পারে।
‘কি, কাজ হচ্ছে?’ গম্ভীর গলায় জানতে চাইল সে।
চুল ঝুঁটি করা ছেলেটা অতীব উৎসাহের সাথে মাথা নেড়ে নেড়ে তাকে অনেককিছু বোঝানোর জন্যে উঠে পড়ে লাগছিল কিন্তু সে একটা হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিলো। সহজ দুইটা প্রশ্ন করব, সহজে দুইটা উত্তর দিবা।’
ঝুঁটির চুল নেড়ে ছেলেটা সায় জানাল, কখনোই জোরে কথা বলে না, ধমক দেয় না লোকটা, কিন্তু তাকে সে ভয় পায়।
‘ওরা কই আছে আমরা জানি?’ বলে সে ভ্রু কুঁচকালো। ‘ওরা কী করতেছে সেইটা বোঝা যাইতেছে? এইবার বলো।’
ছেলেটা ধীরে ধীরে সব বুঝিয়ে দিলো তাকে যতটা সম্ভব সহজে সব বোঝা শেষ হবার পর সে মুখ তুলে হাসি দিলো একটা। এবার খেলা জমে উঠেছে পুরোপুরি।
