অধ্যায় বত্রিশ
বর্তমান সময়
পিবিআই হেডকোয়ার্টার, ধানমন্ডি ঢাকা
‘খবর বলো, মৌসুমি?’ হাবিব আনোয়ার পাশা মৌসুমির বাড়িয়ে দেওয়া কফির কাপটা নিতে নিতে মৌসুমির দিকে তাকিয়ে বলে উঠল। মৌসুমি দেখল সদা শান্ত মানুষটার ডান চোখের পাশের রগটা বেশ দপদপ করছে। তারমানে সে ওপরে ওপরে যত শান্তই থাকুক না কেন, ভেতরে ভেতরে তীব্র উত্তেজনা কাজ করছে তার। সেই সাথে তার দুই চোখের মণির পাশের সাদা অংশে খানিকটা লালচে ভাব প্রমাণ করে রাতে সে ঠিকমতো ঘুমায়ওনি। হাবিব আনোয়ার পাশার মতো লোক যখন রাত জাগে সেটা যে নেটফ্লিক্সে সময় কাটানোর জন্যে জেগে থাকেনি তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
‘স্যার, ইন্সপেক্টর বাশার আর সোহেলের সাথে কাল রাতের একটা পর্যায়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে,’ বলে মৌসুমি ডেস্কের সামনের চেয়ারে বসে পড়ল হাবিব আনোয়ার পাশা কফির কাপটা ঠোঁটে লাগাতে গিয়েও থেমে গেল মুহূর্তের জন্যে, চোখ তুলে সে বুঝতে পারল মৌসুমির আরও কিছু ব্যাপারে বলার আছে, তাই সে কিছু না বলে অপেক্ষা করতে লাগল। মৌসুমি একে একে বলে গেল গতকাল কী কী ঘটেছে এবং ওদের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবার আগ পর্যন্ত সে কী কী জানতে পেরেছে।
মৌসুমির কথা শেষ হবার পরও হাবিব আনোয়ার পাশা কিছু বলছে না দেখে মৌসুমি আবারও মুখ খুলতে যাচ্ছিল কিন্তু আনোয়ার পাশা কিছু একটা বলতে যাবে দেখে সে থেমে গেল।
তুমি কি জানো আমি গতকাল সন্ধ্যায় এবং রাতে কোথায় ছিলাম?’ হাবিব আনোয়ার পাশা জানতে চাইল।
‘স্যার, আপনি গতকাল গভীর রাত পর্যন্ত অফিস করেছেন,’ মৌসুমি নিরাবেগী গলায় বলে উঠল। তার জবাব শুনে ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠল আনোয়ার পাশার। এই প্রথমবার কফির কাপে চুমুক দিলো সে। ‘সিলেট এবং চট্টগ্রামে তানভীর এবং শারিয়ার যে উদ্দেশ্যে রয়ে গেছিল সেই কাজের শেষ ধাপে চলে এসেছে ওরা। তোমাকে বলতে দ্বিধা নেই, ওরা দুজনেই একটা গোপন মিশনের প্রস্তুতি নিচ্ছে, সেটার প্রস্তুতির জন্যেই আমার এই রাত অব্দি জাগরণ,’ বলে সে নিজের একটা আঙুল তুলল। ‘ওরা যে অপারেশনের প্রস্তুতি নিচ্ছে সেটার সাথে রেলিক এবং নেক্রপলিসের সরাসরি সংঘর্ষ হতে যাচ্ছে। আর ওদের অপারেশনের সাফল্যের একটা বড়ো অংশ নির্ভর করছে বাশারের প্রফেসর ইফতেখারকে খুঁজে বের করার ওপরে এবং নির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে রাজদ্রোহীর রহস্য সমাধান করার ওপরে। এমতাবস্থায় বাশারের পুরো টিম নিয়ে হারিয়ে যাওয়া–’
আনোয়ার পাশা কথা শেষ করতে পারল না, হঠাৎই কামরার টেলিফোনটা ঝন ঝন করে বেজে উঠল। দুজনেই আলোচনায় এতটাই মগ্ন হয়ে গেছিল যে হঠাৎ ফোন বেজে ওঠাতে চমকে গেছে দুজনেই। আনোয়ার পাশা কল রিসিভ করে কথা বলতে লাগল। কথা শেষ করে সে মৌসুমির দিকে তাকাল, চেহারা আগের চেয়ে গম্ভীর হয়ে গেছে। কফির কাপটা তুলে ঠোঁটে ঠেকাল
‘কী ব্যাপার, স্যার?’ মৌসুমি জানতে চাইল।।
আনোয়ার পাশা তার কথার কোনো জবাব দিলো না। চুপচাপ কিছুক্ষণ কফির কাপে চুমুক দিয়ে গেল সে। ‘ময়মনসিংহের টুইন কালীর মন্দিরে একটা ঘটনা ঘটেছে,’ বলে সে চোখ তুলে তাকাল মৌসুমির দিকে।
টুইন কালী মানে, সেই কেস না যেটাতে বাশার কাজ করছিল?’
হুম, আমার কেন জানি মনে হচ্ছে, বাশারের টুইন কালীর সেই কেস, তানভীরের সিলেট কেস আর শারিয়ারের কেস সব একসূত্রে গাঁথা,’ আনোয়ার পাশা কফির কাপে আর চুমুক দিচ্ছে না।
‘স্যার, এটা তো আমরা জানিই, একরকম বলতে গেলে—’
‘উহু, আমরা স্রেফ ধারণা করছিলাম এতদিন, এখন প্রমাণ মিলতে শুরু করেছে এবং,’ বলে সে উঠে দাঁড়াল, টেবিলের একপাশের কেস থেকে সিগার বের করে জানালার ধারে চলে গেল। ‘আমরা যা ধারণা করছি ঘটনা তারচেয়েও অনেক বড়ো এবং অনেক গভীর,’ জানালাটা সামান্য খুলে দিতে দিতে সে বলে উঠল। ‘আমার ইনটুইশন যদি ভুল না হয়, ময়মনসিংহের পর অবশ্যই অবশ্যই সিলেট এবং চট্টগ্রামেও কিছু-না-কিছু ঘটবেই,’ বলে সে মৌসুমির দিকে ফিরে তাকাল। ‘তানভীর এবং শারিয়ারকে অ্যালার্ট করে দাও,’ মৌসুমি মাথা নেড়ে চলে যেতেই আনোয়ার পাশা সিগার টানতে টানতে ভাবতে লাগল, চারপাশে একের-পর-এক ঘটনা ঘটতে শুরু করেছে। বাশারের সফল হওয়াটা এখন খুবই জরুরি।
***
পানাম নগরের পাতাল ঘর
পাতালের জায়গাটা সরু হলেও শুরুতে বেশ বড়োই মনে হচ্ছিল। কিন্তু আসলে জায়গাটা ঠিক ততটা বড়োও নয় তবে পাতালের জায়গা হিসেবে একেবারে ছোটোও নয়। আর এটা প্রমাণ করে যে এই জায়গাটা স্রেফ মাটির নিচের কোনো ঘর নয়। এটা পাতালের একটা সুড়ঙ্গের মতোই। ওদের দলের সবার সামনে সোহেল, তার ঠিক পেছনে চৌধুরী, দুজনারই হাতে টর্চ লাইট সোহেলের হাতে সত্যিকারের টর্চ আর চৌধুরীর হাতে মোবাইল টর্চ।
‘তোমরা কি এখনও নিশ্চিত যে আমি ফাউন্ডেশনের কাউকে ডাকবো না? এত বড়ো একটা বিষয়—’ প্রফেসর হামিদ আবারও বলতে যাচ্ছিল কিন্তু তাকে থামিয়ে দিলো চৌধুরী।
‘স্যার, আপনাকে তো বলেছি এখানে এমন অনেক বিষয় আছে যা পৃথিবীকে জানানো অনেক বিপজ্জনক। কাজেই এই মুহূর্তে এই বিষয়ে যত কম লোকে জানে ততই বেটার,’ বলে সে পেছন ফিরে দাঁড়াল। ‘এই পাতালের জায়গাটা নিয়ে কাজ করার সুযোগ তো আপনার রইলই। আমরা আমাদের কাজ শেষ করে চলে গেলে আপনি আপনার টিম নিয়ে কাজ শুরু করতে পারবেন। পত্র-পত্রিকা এমনকি ইলেকট্রনিক মিডিয়া ডেকে সংবাদ সম্মেলন করে ঘোষণা দিবেন যে পানাম নগরে একটা পাতাল সুড়ঙ্গ পাওয়া গেছে। আরও একটা বিষয় আছে স্যার, আমরা আসলে কী নিয়ে ডিল করছি সেটা এমনকি আমরা নিজেরাও জানি না, কাজেই এখন চুপ থাকাই বেটার,’ বলে সে প্রফেসরকে সামনে এগোনোর জন্যে ইশারা করল।
ওরা সবাই মিলে সাবধানে সেই পাতালের করিডর ধরে এগিয়ে চলেছে দেওয়ালে আঁকা লুমিনাস পেইন্টের নির্দেশনা ধরে। ‘একটা ব্যাপার খেয়াল করেছেন?’ এগোতে এগোতে দেওয়ালের দিকে সামান্য এগিয়ে হাত বুলিয়ে পৃথা বলে উঠল, ‘এদিককার দেওয়ালটা বেশ ঠান্ডা আর,’ বলে আবার অন্যদিকের দেওয়ালে হাত রাখল, ‘এদিককার দেওয়ালটা অনেকটাই শুষ্ক,’ বলে সে থামতেই প্রফেসর হামিদ কথা বলে উঠল।
‘সম্ভবত ওদিকটা পানির সাথে সংযুক্ত কিংবা ওয়াটার বডির কাছাকাছি, মেঘনা কিন্তু খুব দূরে নয়,’ বলে সে আরও কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল সামনে থেকে সোহেল চিৎকার করে উঠল।
‘প্রফেসর, সামনে দেখুন,’ সোহেলের চিৎকার শুনে সবাই সেদিকে ফিরে তাকাতেই দেখতে পেল সামনে পাতালের পথটা দুদিকে ভাগ হয়ে চলে গেছে, একটা দিক অনেকটা অন্ধকার পথের দিকে এগিয়ে গেছে। আর অন্যদিকটা এগিয়ে গেছে একটা কামরা আর গুহার মাঝামাঝি জায়গার দিকে। লুমিনাস পেইন্টের একটা তির ওটার দিকেই নির্দেশ করছে।
মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থেকে লাভ কী?’ প্রফেসর এগিয়ে গেল সামনের দিকে। ‘চলো, সবাই।’
প্রফেসর এগিয়ে যেতেই সোহেলও এগোল তার পাশাপাশি। বাকিরা অনুসরণ করতে লাগল ওদের দুজনকে। ওরা বাঁয়ে বাঁক নিতেই দেখতে পেল করিডরের শেষ প্রান্তে ছোটো একটা কামরার মতো। ঠিক কামরা বলা যাবে না আবার গুহাও বলা যাবে না। অনেকটা গোলমতো কমরাটার ভেতরে মাঝামাঝি একটা জায়গাতে ছোটো একটা পাথরের বেদি। আর সেটার একপাশে হেলে পড়ে অছে প্রায় ক্ষয়ে যাওয়া একটা মূর্তি।
‘এটা কোনো উপাসনার কামরা মনে হচ্ছে,’ পৃথা অস্ফুটে বলে উঠল টাকশালের নিচে গোপন উপাসনার কামরা কেন থাকবে?’ অনেকটা যেন আনমনেই বলে উঠল পৃথা।
প্রফেসর কোনো কথা না বলে এগিয়ে গেল বেদি আর ওটার একপাশে হেলে থাকা আধ ভাঙা মূর্তিটার দিকে। মূর্তিটাকে পরীক্ষা করতে করতে সে মন্তব্য করার মতো বলে উঠল, ‘মধ্যযুগীয় দেবী মূর্তি। আমি একেবারে সঠিকভাবে বলতে না পারলেও ধারণা করছি কোনো বিশেষ গোত্র এই ধরনের দেবীর উপাসনা করত,’ বলে সে পৃথার দিকে চোখ তুলে তাকাল। ‘লিলিথ, ওহ গড,’ বলে সে তালি দিয়ে উঠল। ‘হতে পারে এটা লিলিথ বা লিলিথের সমধর্মী কোনো দেবীর মূর্তি।’
‘কিন্তু টাকশালের নিচে কেন?’ পৃথাও মনোযোগের সাথে ভেঙে থাকা মূর্তিটার দিকে এগিয়ে গেল।
‘এর একটাই ব্যাখ্যা হতে পারে,’ প্রফেসর হাঁটু গেড়ে বসে পড়েছে। ‘আর যদি সেটা হয়, তবে এটা হবে সময়ের অন্যতম একটা প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার। ওরা টাকশালের বানানো অর্থের লট বাইরে নেওয়ার আগে এখানে টাকশালের গোপন কামরায় মানুষ বলি দিত, দেবীর উদ্দেশ্যে।
আনমনেই মাথা নাড়তে নাড়তে পৃথা বলে উঠল, ‘জোরদার সম্ভাবনা আছে এটা হবার। কারণ বাঙাল মুল্লুক থেকে শুরু করে পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গাতে এই কালচার নতুন কিছু নয়, বরং বহু প্রচলিত একটা মিথ। কিন্তু প্রশ্ন হলো,’ সে বেদির পাশের মূর্তিটা থেকে দৃষ্টি সরিয়ে বেদিটাকে পরখ করতে শুরু করল। ‘এই মূর্তি এবং এই জায়গা পুরোটাই পরিত্যক্ত এবং সম্ভবত একাধিকবার এটা লুট হয়েছে। যারাই এখানে এসেছিল তারা কিছুই রাখেনি। যাদের নির্দেশনাতেই আমরা এখানে এসেছি তারা এখানে আনল কেন আমাদেরকে?’ পৃথা তাকিয়ে আছে বাকিদের দিকে। সবাই চুপ।
প্রফেসরই তাড়া দিয় উঠল প্রথম, ‘তারমানে এখানে অবশ্যই কিছু না কিছু আছে। সবাই ছড়িয়ে পড়ো, খুঁজতে হবে, কামরার প্রতিটা ইঞ্চি পরীক্ষা করে দেখতে হবে। জলদি শুরু করো।’
ওরা সবাই ছড়িয়ে পড়ে কামরার প্রতিটা জায়গা দেখতে শুরু করল। কিন্তু খুব বেশি সময় লাগল না ছোটো কামরাটা পরীক্ষা করতে। দশ-পনের মিনিটের ভেতরেই সবাই হতোদ্যম হয়ে ফিরে এলো আবারও বেদিটার সামনে।
‘কিছুই তো নেই, সোহেল হাঁপাতে হাঁপাতে বলে উঠল। সবার ছোটো হওয়াতে তার ওপর দিয়েই সবচেয়ে বেশি ধকল গেছে। ঠান্ডার ভেতরেও কপালে ঘাম দেখা দিয়েছে তার। ‘এখন?’
‘একটা জায়গা বাকি আছে,’ পৃথা তাকিয়ে আছে মূর্তিটার দিকে।
‘এটার তো আর কিছুই অবশিষ্ট নেই,’ চৌধুরী অনেকক্ষণ পর বলে উঠল ‘এটার দিকে দেখে লাভ কী—’
‘ওটা না,’ পৃথা ভ্রু নাচিয়ে বলে উঠল। ‘বেদিটা? ওটাই একমাত্র পরীক্ষা করার বাকি আছে।’
‘কিন্তু–’
কথা নাই, কাজে লাগো,’ প্রফেসর কাপড়ের হাতা গুটিয়ে কাজে লেগে গেল। তার সাথে হাত লাগালো বাকিরা।।
বেদিটা পরীক্ষা করতে করতে পৃথা হঠাৎই প্রায় চিৎকার করে উঠল ব্যাপারটা সে আগেও খেয়াল করেছিল বেদির ওপরের অংশের একপাশে সামান্য ফাটলের মতো দেখা যাচ্ছে। ‘এই এদিকে আসুন তো দেখি এটা কী?’
‘কিন্তু—’ সোহেল এগিয়ে এসে বেদির ওপরের অংশের ফাটলটা দেখে মন্তব্য করার মতো কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল তার আগেই বাইরে একটা শব্দ শোনা গেল।
সবাই সচকিত হয়ে ফিরে তাকাল সেদিকে। কারও পায়ের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে, এদিকেই এগিয়ে আসার।
‘এখানে কে আসবে?’ বলতে বলতেই সোহেল নিজের হাতের টর্চটা পৃথার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বের করে আনল নিজের পিস্তল। সেটাকে তাক করতে করতেই দরজার মতো ফোকরের বাইরের অংশে পায়ের আওয়াজ আরও বেড়ে গেল। কেউ একজন দৌড়ে আসছে এদিকেই। সবাই বিস্ময় এবং খানিকটা শঙ্কার সাথে তাকিয়ে রইল, পায়ের আওয়াজ এগিয়েই আসছে।
***
লম্বা চুলের ছেলেটা অত্যন্ত মনোযোগের সাথে তাকিয়ে আছে কালো কোটের দিকে। মানুষটা যত্নের সাথে শোনার চেষ্টা করছে কিছু একটা এবং তার সাথে সাথে প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে তার চেহারার ভাব। লম্বা চুলের ছেলেটা কালো কোটের সাথে কাজ করছে খুব বেশিদিন হয়নি। কিন্তু লোকটার প্রতি তার কৌতূহলের কোনো শেষ নেই। বিশেষ করে এই শান্তশিষ্ট লোকটাকে কেন সে বা তার আশপাশের লোকজন এতটা ভয় পায় এই ব্যাপারটা সে আজ অব্দি আবিষ্কার করতে পারেনি। আরও একটা বিশেষ কারণে লোকটাকে সে মনোযোগের সাথে অবজার্ভ করে, কারণ সে লোকটাকে কখনও রেগে যেতে কিংবা অবাক হতে, কিংবা বিচলিত হতেও দেখেনি। কিন্তু এহেন লোকটা নিজের গার্ডদের কাছ থেকে রিপোর্ট শোনার পর থেকে এবং সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করার প্রেক্ষিতে তাকে এই মুহূর্তে যেন খানিকটা বিচলিতই মনে হচ্ছে।
‘স্যার, ভিন্ন পার্টি মাঠে ইতিমধ্যেই প্রবেশ করে ফেলেছে। হয়তো—’ কালো কোটের এক গার্ড বলতে গিয়েও নিজের কথা শেষ করল না,বরং সে অসমাপ্ত বাক্যটা ছুড়ে দিলো নিজের সঙ্গীদের দিকে
‘জি, স্যার, আমরা যে পদ্ধতিতে কাজ করছিলাম, সেটাতে আদৌ কতটা কাজ হবে এখন আমি ঠিক বুঝতে পারছি না,’ দ্বিতীয় গার্ড কথা শেষ করে তাকিয়ে রইল নিজের বসের দিকে
কালো কোট কিছুক্ষণ কিছুই বলল না। সে চোখ বন্ধ করে নিজের ভাবনার জগতে যেন হারিয়ে রইল বেশ অনেকটা সময়, তারপর চট করেই চোখ খুলে বলে উঠল, ‘আমাদেরকে সেটাপ পরিবর্তন করতে হবে,’ বলে সে নিজের সবাইকে সামনে আসতে বলল। ‘তুমি,’ বলে সে লম্বা চুলের দিকে ইশারা করতেই সে চমকে উঠে মাথা নেড়ে সায় জানাল। ‘তুমি, যা করছিলে তাই করো, একটা শব্দও যেন মিস না হয়। নরজদারি আরও কড়া করো, প্রয়োজনে আরেকজনকে সঙ্গে নাও,’ বলেই সে ফিরে তাকাল নিজের বাহিনীর লোকজনের দিকে। সবাই মন দিয়ে শোনো আমি কী বলি,’ নিজের বিচিত্র ক্যালক্যাশিয়ান টানে নির্দেশনা দিয়ে চলল সে।
***
পায়ের আওয়াজ আরেকটু এগিয়ে আসতেই সোহেল হাতের পিস্তলটাকে আরেকটু উপরে তুলল। আরেকটু হলেই গুলি করে দিতে যাচ্ছিল কিন্তু মানুষটা দরজার মতো ফোকরে উদয় হতেই চট করে নিজেকে সামলে নিলো সে। অপর দিকের মানুষটাও নিজের পিস্তল ধরা হাতটা নামিয়ে নিলো।
‘তোমরা এখানে!’ ওদের দিকে এগিয়ে আসতে বাশার বলে উঠল, রীতিমতো হাঁপাচ্ছে সে। ‘আর আমি খুঁজতে খুঁজতে হয়রান হয়ে গেছি। তোমরা এখানে কীভাবে এলে, পেয়েছ কিছু?’ কৌতূহলের সাথে সবাইকে দেখছে বাশার।
‘আপনি এখানে এলেন কীভাবে?’ পৃথা জানতে চাইল। ‘আর ছিলেনই বা কোথায়?’
‘আমি পেছনে রয়ে গেছিলাম,’ বাশার ওদের দিকে এগিয়ে এলো। ‘একটা ব্যাপার নিশ্চিত করতে চেয়েছিলাম,’ বলে সে একে একে সবাইকে দেখতে লাগল। ‘আমরা ভয়াবহ বিপদের ভেতরে আছি। আমাদের পেছনে আবারও লোক লেগেছে। আমি পানামের একটা পুরনো বাড়ির ভেতরে লুকিয়ে চোখ রাখছিলাম তখন দেখতে পাই এবং–’ বলে কাঁধ ঝাঁকাল একবার। ‘ওরা টের পেয়ে যায়। তারপর কোনোমতে আমি এখান পর্যন্ত এসেছি, ওরাও খুব বেশি দূরে নেই।’
‘এই লোকগুলো বারবার আমাদেরকে এভাবে অনুসরণ করে জায়গামতো পৌঁছে খাচ্ছে কীভাবে?’ বেশ অবাক এবং বেশ খানিকটা হতাশার সাথে বলে উঠল সোহেল।
‘হয় আমাদের ভেতরে কোনো বেঈমান আছে, আর না হয়—’
‘আমাদের সবার নিজেদেরকে চেক করা উচিত,’ চৌধুরী অনেকটা মন্তব্য করার মতো করে বলে উঠল। ‘এক্ষুণি, ওরা কোনো-না-কোনোভাবে আমাদেরকে ট্র্যাক করছে। সবাই।’
‘কিন্তু কীভাবে—’
‘এক্ষুণি,’ এবার বাশার ধমকে উঠল। ‘আমি চৌধুরীর সাথে সম্পূর্ণ একমত। আমাদের প্রত্যেকের উচিত নিজেদেরকে চেক করা এবং সম্ভব হলে একে-অপরের তল্লাশী নেওয়া এবং সেটা এক্ষুণি করতে হবে,’ বলে সে ওরা দ্রুত গতিতে একে- অপরের তল্লাশী নিতে শুরু করল। প্রফেসরকে চেক করার কোনো কারণ নেই, বাশার প্রথমে সোহেল তারপর চৌধুরীর তল্লাশী নিলো, তারপর সোহেল ওর সব পকেট থেকে শুরু করে সব চেক করল। ‘বস, আমাদের ভেতরে তো মনে হচ্ছে—’
‘মিস্টার বাশার,’ পৃথার আতঙ্কিত গলা শুনে সেদিকে ফিরে তাকিয়ে সবাই দেখল সে ডান হাতের তর্জনী আর বৃদ্ধার মাঝে চেপে ধরে অছে চ্যাপ্টা ঘড়ির ব্যাটারির মতো প্রায় কয়েন সাইজের কিছু একটা। ‘এটা কী? এটা আমার ট্রাউজারের পেছনের পকেটে ছিল।’
বাশার চট করে এগিয়ে জিনিসটা হাতে নিয়ে নিলো। এক পলক দেখেই সে বলে উঠল, ট্র্যাকিং ডিভাইস, সম্ভবত লিসেনিংও,’ বলেই সে চট করে সোহেলের দিকে তাকাল। ‘শিট, মোহাম্মদপুরে পৃথাকে অপহরণের চেষ্টাটা তাহলে অপহরণের চেষ্টা ছিল না। বরং ওর কাছে ডিভাইসটা প্ল্যান্ট করে ওকে দিয়ে—শিট শিট,’ জিনিসটাকে মাটিতে ফেলে নিজের জুতো দিয়ে চ্যাপ্টা করে দিলো বাশার। ‘আমার আরও আগেই বোঝা উচিত ছিল। জলদি পালাতে হবে এখন। এক্ষুণি। যেই মুহূর্তে শত্রুরা টের পাবে ওদের ডিভাইস—’
‘আমি এতদূরে এসে এখানে কী আছে না দেখে যাব না, পৃথা গোঁয়ারের মতো বলে উঠল।
‘আমিও অ্যাগ্রি করি,’ প্রফেসরও গলা মেলাল। কিন্তু বাশার বা সোহেল কিছু বলে ওঠার অগেই ওপাশ থেকে দুম দুম একটা শব্দ ভেসে আসতে লাগল।
‘ওরা টের পেয়ে গেছে,’ বাশার চট করে নিজের পিস্তলটা বের করে আনল। ‘এবং টের পেয়েই সরাসরি আক্রমণে চালাতে যাচ্ছে।’
‘শব্দ কীসের?’ সোহেল জানতে চাইল।
‘তোমরা যে ধাতব ঢাকনাটা পার হয়ে এসেছিলে আমি এখানে আসার সময় ওটা নিচ থেকে আটকে দিয়ে এসেছিলাম। ওরা নিশ্চিত ওটা ভেঙে নামার চেষ্টা করছে। আমাদেরকে পালাতে হবে জলদি-’
‘আগে দেখে নেই, ওখানে কী আছে,’ পৃথা এগিয়ে গেল বেদিটার দিকে। প্রফেসরও সাহায্য করতে লাগল ওকে।
‘ওরা ওদের কাজ করুক তুই আমার সাথে চল,’ বলে ও সোহেলকে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো। ‘আমাদেরকে পথ খুঁজে বের করতে হবে।’
‘স্যার, আমাদেরকে এটা সরাতে হবে,’ বেদির ওপরে রাখা চ্যাপ্টা পাথরের মতো অংশটা ফাটলের ভেতরে আঙুল ঢুকিয়ে ওপরে ওঠানোর চেষ্টা করতে লাগল।
‘দাঁড়াও, আমি হেল্প করছি,’ হাতের মোবাইলের টর্চটা বেদির একপাশে রেখে দুজনে মিলে পাথরটা টেনে ওঠানোর চেষ্টা করতে লাগল।
একাধিকবার চেষ্টা করেও খুব বেশি সুবিধা করতে না পেরে দুজনে মিলে হাঁপাতে লাগল। অন্যদিক থেকে দুম দুম আওয়াজ বেড়েই চলেছে।
‘স্যার, এখন কী করবো?’ পৃথা অস্থির হয়ে উঠেছে। ‘আমি কোনো অবস্থাতেই এখান থেকে যাবো না।’
প্রফেসর একবার বেদিটার দিকে তাকাচ্ছে আরেকবার বাইরের দিকে দেখছে। বাশার আর সোহেলেরও কোনো খবর নেই। বাইরের দিকে দুম দুম শব্দ বেড়েই চলেছে। ‘জলদি জলদি,’ বলে প্রফেসর আর পৃথা আবারও হাত লাগিয়ে ঠেলতে লাগল। ফাটলের কাছটা সামান্য নড়ে উঠল।
‘জোরে জোরে,’ এবার পৃথা চিৎকার করে উঠল। ‘কিন্তু জোরে ঠেলাতেও কোনো কাজ হলো না। ‘কী করছ তোমরা?’ আমাদেরকে পালাতে হবে,’ বাশার দরজা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করেই চিৎকার করে উঠল।
‘এখানে কী আছে না দেখে আমি যাবো না, পারলে আমাদেরকে সাহায্য করো,’ বলে পৃথা পাথরটা দেখাল।
বাশারকে এক মুহূর্তের জন্যে অস্থির দেখাল, যেন সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। ‘ঠিক আছে,’ বলেই সে সোহেল আর চৌধুরীকে হাত লাগাতে বলল। সবাই মিলে পাথরটা ঠেলতে ঠেলতেই পাথরটা আরেকটু সরাতেই বেদির একপাশে হেলে পড়ে থাকা মূর্তির অংশবিশেষটা ভেঙে পড়ল মেঝের ওপরে বিকট শব্দের সাথে। সেই সাথে তীব্র শব্দের সাথে বাইরে ধাতব কিছু একটা ভেঙে পড়ার শব্দ শোনা গেল।
‘ওরা ঢুকে পড়েছে, জলদি জলদি,’ বলে বাশার উঠে দাঁড়িয়ে নিজের পিস্তল বের করে আনল। ওর দেখাদেখি সোহেলও তাই করল।
পৃথা বেদির ভেতরের অংশে চোখ বুলিয়ে পিতলের চাকতির মতো কিছু একটা দেখতে পেল। ‘কী এটা?’ বলে চামড়ায় মোড়ানো জিনিসটা তুলে নিতেই চৌধুরী টান দিয়ে ওদেরকে এগোতে বলল।
‘কী এটা দেখার সময় নেই। জলদি জলদি,’ বাশার চিৎকার করে উঠল
পৃথা এগোতে এগোতেই দেখল পিতলের জিনিসটা আসলে পুরোটা চাকতির মতো নয়, বরং অনেকটা দিক নির্দেশক যন্ত্র আর কাটা কম্পাসের মাঝামাঝি কিছু একটা। জিনিসটাকে অবারও চামড়ায় মুড়িয়ে ওটাকে রেখে দিলো সে নিজের হুডির ভেতরের পকেটে, রেখেই সামনে তাকাতেই দেখতে পেল সবার সামনে দরজার বাইরে পিস্তল হাতে দাঁড়িয়ে বাশার, আর ওদেরকে এগিয়ে যেতে সহায়তা করছে সোহেল।
‘আমরা কোনদিকে—’
‘যেদিক দিয়ে ঢুকেছি ওদিকে শত্রু—’ ওরা কথা বলা শেষ করার আগেই ফোকরের মতো অংশটা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এসেছিল, ওখান দিয়ে বাইরে বেরোতেই গুলির শব্দ হলো। সাথে সাথে উলটোদিকে দৌড়াতে শুরু করল ওরা।
পেছনে গুলির শব্দ হচ্ছে, ওদেরকে নিয়ে সোহেল উলটোদিকের সুড়ঙ্গের পথ দিয়ে দৌড়াতে শুরু করেছে।
‘আপনারা আমার সাথে আসুন,’ বলে সে ওদেরকে পথ দেখাতে লাগল।
‘আমরা যাচ্ছি কোথায়?’ কে চিৎকার করে জানতে চাইল পৃথা।
‘আমরা কিছুদূরে এগোলেই একটা গুহমুখ নদীর পাড়ের দিক দিয়ে বেরোতে পারবো। আমি আর বাশার স্যার দেখে গেছি একটু আগে।
‘কিন্তু বাশার?’ পৃথা চিৎকার করে জানতে চাইল।
‘উনি এসে পড়বেন, এই সাবধান,’ সামনে একটা গর্তের মতো দেখে সবাইকে সাবধান করে দিলো সোহেল। ওরা আরেকটু এগোতেই দেখতে পেল সামনে অন্ধকার গুহা ও ভেতরে আলোর মতো দেখা যাচ্ছে। ‘জলদি জলদি এদিকে,’ সোহেলের দেখান পথে আলোর রেখা ধরে এগোতে লাগল ওরা। পেছনে ধুমধাম শব্দ হচ্ছে কিন্তু কারও সেদিকে নজর দেওয়ার উপায় নেই। সবাই অন্ধের মতো এগিয়ে চলেছে।
আরও আধ মাইলের মতো এগোতেই পরিষ্কার আলোর রেখা দেখা গেল, সেই সাথে পথটাও সরু হয়ে আর দাড়ানোর মতো রইল না। ওরা হামাগুড়ি দিয়ে এগোতে লাগল। ‘এইদিকে, পৃথা প্রফেসর হামিদ আর চৌধুরী তিনজনেই সোহেলকে অনুসরণ করে নদীর ভেজা বালির চরের অংশে ঝোপঝাড়ের ভেতর দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো।
বাইরে বেরিয়ে জোরে জোরে দম নিতে লাগল। কিন্তু ওরা স্থির হবার আগেই ঝোপঝাড়ের কাছে শব্দ শোনা গেল, ওরা সচেতন হবার আগেই ঝোপঝাড় ঠেলে বাইরে বেরিয়ে এলো পিস্তল হাতে বাশার।
বাইরে বেরিয়েই সে সোহেলকে উদ্দেশ্য করে চিৎকার করে উঠল। ‘সোহেল গুহামুখটা ঢাকতে হবে,’ বলেই সে কাছেই পড়ে থাকা বড়ো একটা পাথরের দিকে নির্দেশ করল। দুজনে মিলে ওটা বহন করে এনে ঢেকে দিলো গুহামুখটা।
দম নিতে নিতে সেদিকে তাকিয়ে বাশার বলে উঠল, ‘এটা দিয়ে বেশিক্ষণ আটকানো যাবে না, আমাদেরকে পালাতে হবে,’ বলে সে নদী তীরের দিকে দেখাল। সবাই মিলে দৌড়াতে শুরু করল নদীর তির ধরে। কিছুদূর এগোতেই দেখল সামনে রাস্তা বন্ধ হয়ে নদীর পানিতে মিলে গেছে। আর ওরা যেখানে আছে সেখান থেকে কিছুদূরেই লঞ্চের মতো জলযান ভেসে আছে।
বাশার একবার পেছনে দেখল, যেকোনো সময় ওই পলকা পাথরের বাধা পেরিয়ে পিছু নেওয়া লোকগুলো বেরিয়ে আসবে, আর সামনে রাস্তা বন্ধ, দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল ও।
‘সবাই পানিতে লাফিয়ে পড়ো, ওই ট্রলারে উঠতে হবে আমাদেরকে পালাতে হলে,’ কে সাঁতার জানে বা না-জানে, সেটা ভাবা কিংবা বোঝার সময় নেই, একে একে সবাইকে লাফিয়ে পানিতে নামতে দেখেই সবার শেষে লাফ দিলো ও। বরফ ঠান্ডা কাঁদাটে পানিতে নেমেই সাঁতরাতে লাগল ট্রলারটার দিকে। খানিক সাঁতরে ওটার কাছাকাছি যেতেই ওটা থেকে পানিতে ভেসে থাকার গোল টায়ার ছুড়ে দেওয়া হলো ওকে উদ্দেশ্য করে। সেগুলো ধরে কোনোমতে ট্রলারের কাছকাছি আসতেই একাধিক হাত টেনে নিলো ওদেরকে। ওটাতে উঠে পাটাতনে শুয়ে বড়ো বড়ো করে দম নিতে নিতে বাশার ভাবতে লাগল, এবারের যাত্রায় মনে হচ্ছে বেঁচে গেল। একটু দম ফিরে পেয়ে প্রথমেই বাশার দেখে নিলো সবাই উঠতে পেরেছে কি না। দেখে নিয়ে স্বস্তির সাথে সামনে তাকাল সে এবং সাথে সাথে মুখের হাসি বন্ধ হয়ে গেল।
কালো কোট নিজের সঙ্গীদের দিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে শান্ত ভঙ্গিতে হাসিমুখে বলে উঠল, ‘হ্যালো ইন্সপেক্টর, আবার দেখা হয়ে গেল।’
