অধ্যায় বারো
বর্তমান সময়
রাইফেল স্কয়ার, ঢাকা
.
দোয়া-দরুদ যতই পড়ুক, ঢাকার বিখ্যাত জ্যাম থেকে কারও রেহাই নেই। রাইফেল স্কয়ারের জ্যামে বসে জিপের ভেতরে আটকানো অফিস ফাইলটাতে চোখ বুলাচ্ছিল বাশার। কিন্তু তার মন যতটা না ফাইলে তার চেয়ে অনেক বেশি জ্যাম কখন ছুটবে সেদিকে। আর মোহাম্মদপুরে কী হতে যাচ্ছে সেদিকে। সোহেল ছেলেটা আপনাতেই একবার জিপের হর্ন বাজিয়ে দিতে বাশার তার দিকে ফিরে তাকাল।
‘সোহেল, অস্থির হয়ে কোনো ফায়দা আছে?’ বলে সে ফাইলে নজর ফিরিয়ে আনল। যদিও সে নিজেই ছেলেটার চেয়ে অনেক বেশি অস্থির হয়ে আছে ভেতরে ভেতরে কিন্তু বাইরে সেটা প্রকাশ পেতে দিচ্ছে না।
তবে বাশার নিজেও জানে পরিস্থিতি বেশি একটা সুবিধার না। কারণ একটু আগে পিবিআই অফিসের স্পেশাল ব্রাঞ্চে পাটোয়ারির ব্রিফিং শেষ হবার সাথে সাথে ওরা স্রেফ প্রস্ততি নেওয়া শেষ করতেই জানতে পারে প্রফেসর ইফতেখার মাহমুদের সেক্রেটারি চৌধুরী হাসান শেখ নাকি জেল থেকে গায়েব হয়ে গেছে। ব্যাপারটা একদিকে অত্যন্ত ভয়ঙ্কর এবং অন্যদিকে অ্যালার্মিংও বটে। ওরা বিষয়টা জানতে পারার পর হাবিব আনোয়ার পাশার অফিসে গিয়ে জানতে পারে পিবিআই স্পেশাল ব্রাঞ্চের লোকজন যখন জেলে যায়, ওখানে গিয়ে জানতে পারে-আগের দিন নাকি বিশেষ ব্রাঞ্চের পরিচয়ে দুজন লোক এসে চৌধুরীকে নিয়ে গেছে। তাদের কাগজপত্র থেকে শুরু করে সবকিছুই ওকে ছিল। পরবর্তীতে খুব ভালো করে চেক করে পওয়া যায় সব নকল কাগজ ছিল, কিন্তু ততক্ষণে ক্ষতি যা হবার হয়ে গেছে। চৌধুরীকে নিয়ে সরে পড়েছে তারা। এই ঘটনা বেশ কয়েকটা কারণে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একদিকে এই ঘটনা প্রমাণ করে প্রফেসর আবদেলের কেস সামনে আসার পর এই মুহূর্তে প্রফেসর আবদেল এবং প্রফেসর ইফতেখারের সাথে সংশ্লিষ্ট প্রতিটা মানুষ এবং তথ্য গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে ঠিক যেভাবে ওরা ইফতেখার মাহমুদের সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো খতিয়ে দেখছে এবং তাকে খুঁজে বের করার জন্যে উঠেপড়ে লেগেছে। ঠিক একইভাবে এই ঘটনায় আরও একটা বা একাধিক মহল সেই চেষ্টাই করছে। তবে তারচেয়ে অ্যালার্মিং বিষয় হলো যদি প্রফেসরের সেক্রেটারিকে এভাবে সরিয়ে ফেলা হয়ে থাকে তবে ওদের জন্যে এখন একমাত্র বাকি রাস্তা থাকে প্রফেসর ইফতেখারের মেয়ে পৃথা হাসান। কাজেই তার সাথে দেখা করাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, প্রফেসরের হদিস বের করতে সেই এখন ওদের একমাত্র পথ। আর দ্বিতীয়ত, যে বা যারাই চৌধুরীকে গায়েব করে থাকুক না কেন, তারা যদি চৌধুরীকে সুরক্ষিত জায়গার ভেতর থেকে উদ্ধার করতে পারে, তবে অবশ্যই তারা পৃথা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারবে। ইতিমধ্যেই পৌঁছে গেছে কি না, কে জানে। তাই হাবিব আনোয়ার পাশা সাথে সাথে ওদেরকে বের হয়ে মোহাম্মদপুরে যেতে বলে, সেই সাথে বাশার তাকে অনুরোধ করে যেহেতু মেয়েটা মোহাম্মদপুর থানা থেকে খুব বেশি দূরে থাকে না, তবে যদি সম্ভব হয় অন্তত একটা পুলিশের ভ্যান মেয়েটার অ্যাপার্টমেন্টের সামনে হলেও পাহারায় রাখতে।
‘বস, কী মনে হয়, আমরা পৌঁছে কী মেয়েটার দেখা পাবো?’
‘হুম?’ বাশার ফাইল থেকে চোখ তুলে সোহেলের দিকে ফিরে তাকাল। ‘দেখা যাক, আগে থেকে অস্থির হয়ে লাভ কী?’ বলে সে বাইরে দেখল। রাইফেল স্কয়ারের সামনে জ্যাম একটু একটু করে ছাড়তে শুরু করেছে। ‘গাড়ি আগে বাড়ান, সোহেল,’ বলে সে একবার ঘড়ি দেখে নিলো, খুব বেশি সময় পার হয়নি ওরা অফিস থেকে বের হবার চার নম্বর থেকে ভেতর দিয়ে জিপ নিয়ে এগোতেই রাইফেল স্কয়ারের জ্যামে এসে পড়েছে। এটা ছেড়ে দিলে আরও অন্তত দুটো পয়েন্টে জ্যাম বা সিগন্যাল পড়বে হিসেব করে নিলো মনে মনে বাশার। ওর হিসেবে আরও অন্তত ত্রিশ থেকে চল্লিশ মিনিটের মতো লাগবে ওদের পৃথা হাসানের ঠিকানায় পৌঁছাতে। এত সময়ের ভেতরে যদি কিছু না হয়ে থাকে, তবে এই ত্রিশ-চল্লিশ মিনিটে খুব বেশি পার্থক্য হবার কথা নয়। তবে কপাল খারাপ হলে অনেক কিছুই হতে পারে। সেকেন্ডের ব্যবধানে জীবন পালটে যেতে পারে কপাল বেশি খারাপ হলে, কথাটা মনে হতেই মুখের কোণে দুঃখের একটা হাসি ফুটে উঠল বাশারের। অন্তত ওর নিজের অভিজ্ঞতা সেরকমই বলে।
‘কী ব্যাপার, বস, হাসলেন যে? ভুল কিছু জিজ্ঞেস করলাম নাকি?’ বাশার সোহেলের প্রশ্নের জবাব না দিয়ে নিজের ভাবনায় হারিয়ে গেছিল।
‘অহহ সরি, আমি আপনার কথায় হাসিনি,’ বাশার বলে উঠল। ‘অন্য একটা কারণে হাসছিলাম।’
‘বস, কিছু মনে না করলে একটা কথা বলি, আমরা তো এখন একই টিমে। আপনি আমাকে তুমি করে বললে ভালো হয়, বস; তুই করেও বলতে পারেন, সমস্যা নাই,’ বলে সে বাশারের দিকে তাকিয়ে হেসে উঠল।
বাশার কিছু না বলে মাথা নাড়ল সম্মতির ভঙ্গিতে।
‘বস, বলছিলাম, হঠাৎ যেভাবে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠল মেয়েটাকে কি আমরা পাবো, নাকি ইতিমধ্যেই—’ বাশারের মনে হলো ইচ্ছে করেই ছেলেটা কথা শেষ করল না।
আনমনে মাথা নাড়ল বাশার। ‘ভুল প্রশ্ন, সোহেল। মেয়েটাকে পাবো কিংবা পাবো না সেটা তো পরে। তাকে যদি পাই সে কি আদৌ আমাদের কোনো কাজে লাগবে কি না, সেটা হলো সবচেয়ে বড়ো প্রশ্ন। কেসটা শুরু হবার আগেই কেমন জানি ঘেঁটে গেল। ভাবছিলাম চৌধুরীকে দিয়ে প্রফেসর ইফতেখারের খোঁজ শুরু করব। কারণ চৌধুরী তার সাথে কাজ করেছে এবং কেস ফাইলে লেখা প্রফেসর ইফতেখার এবং আবদেল পালানোর সময়ে প্রফেসর ইফতেখারের কারণেই নাকি চৌধুরী ধরা পড়েছিল। কাজেই ইফতেখারের প্রতি তার একটা রাগ আছে, কাজেই সে হয়তো সাহায্য করতেই পারবে। সে ভালো একটা হেল্প হতে পারত কিন্তু সেটা তো হলো না।’
‘তারচেয়ে বড়ো কথা যারাই আমাদের শত্রু পক্ষ হোক না কেন, চৌধুরীকে হাতে পেয়ে তারা তো অমাদের থেকে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল,’ সেহেলের কথায় খুশি হয়ে উঠল বাশার। ছেলেটার অ্যানালাইসিস করার ক্ষমতা খারাপ না।
‘হুম, সেটাও একটা সমস্যা। এমনিতেই আমরা অন্ধকারে আছি। এখানে আরও একটা ব্যাপার আছে,’ বাশার ফাইলটা রেখে হাতের আংটিটা মোচড়াতে শুরু করেছে। ‘প্রফেসর ইফতেখারের মেয়ে আদৌ কিছু জানে কি না—সেটাও একটা প্রশ্ন, হেল্প তো পরে।’
‘বস, সে যদি হেল্প করতে রাজি হয় অন্তত প্রফেসরের ব্যাপারে কথা তো বলা যাবে, কারণ ফাইল দেখে যা বুঝেছি প্রফেসর লোকটার ব্যাপরে আসলে খুব কমই লেখা আছে। খুবই চতুর ধরনের লোক মনে হয়েছে তাকে আমার কাছে। কিন্তু এই মেয়েকেও যদি ধরে নিয়ে যায় বা গায়েব করে দিয়ে থাকে, কিংবা সে যদি হেল্প করতে রাজি না হয়, তখন কী করবেন?’
বাশার হেসে উঠল, ‘এত দূর এখনও ভাবিনি। তবে ব্যবস্থা একটা না একটা হয়েই যাবে, আর সেটা হবে এখান থেকে,’ বলে সে ড্যাশবোর্ডের ওপরে রাখা ফাইলটা দেখাল। ‘অভিজ্ঞতা বলে এসব ফাইল অনেক কিছুই মিরাকল করার ক্ষমতা রাখে, ওই শালা আবার জ্যাম।’
‘কী আর করা, বস,’’ বলে সোহেল জিপ ব্রেক করে বাশারের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বস, কিছু মনে না করলে একটা কথা জিজ্ঞেস করি?’ বাশার মাথা নাড়তেই সে বলে উঠল, ‘আপনি এই ব্রাঞ্চে কীভাবে এলেন?’
বাশার সানগ্লাসের আড়াল থেকে তার দিকে তাকাল, ‘সে অনেক লম্বা কাহিনি। আমার আলাপ বাদ দাও, ডার্ক নাইটের জোকারের ভাষায় বলতে গেলে আমি হলাম অনেকটা পাগলা কুত্তার গাড়ির পেছনে দৌড়ানোর মতো, দৌড়াতেই আছি দৌড়াতেই আছি, গাড়ির নাগাল পেয়ে গেলে কী যে করব নিজেই জানি না, হা-হা-হা,’ বলে জোরে জোরে হেসে উঠল বাশার।
‘আপনি ফানি, বস,’ সিগন্যাল ছাড়তেই সে আবারও গাড়ি আগে বাড়াল।
‘তোমার কথা বলো, তুমি কীভাবে এখানে এলে?’
‘বস, আমার হিসাবটা উলটা, আপনি অনেক মহৎ মানুষ একেবারে সরাসরি সত্যি কথা বলেছেন নিজের ব্যাপারে। আমি অবশ্য অতো ভালো না। আমি হলাম ক্যারিয়ারিস্ট,’ বলে সে ঠোঁট কুঁচকালো। ‘আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়েই ঠিক করেছি সরকারি চাকরি করবো। এই দেশে যত যাই বলেন ভাই, সরকারি চাকরির উপরে কোনো হিসাব নাই।’
বাশার হেসে উঠল দেখে সোহেলও হাসল। যাই বলেন, কথা কিন্তু সত্যি আমি অনার্স শেষ করে আর মাস্টার্স-ফাস্টার্স এইসবের ধার দিয়াও যাই নাই। সোজা কোচিং কইরা একটার পর একটা পরীক্ষা দিয়া গেছি। ডিবিতে চাকরি হইতেই ঢুইকা গেছি। আর এই স্পেশাল ব্রাঞ্চের ব্যাপারটাও অনেকটা এরকমই, আমি জানি এ-ধরনের ব্রাঞ্চগুলোতে চ্যালেঞ্জ অনেক বেশি, কিন্তু সুযোগও অনেক। আর স্কিল বাড়ানো মানেই উপরে ওঠার সুযোগ। এই কারণেই এইখানে আসা।’
যাক তোমার অন্তত তো স্পেসিফিক মোটিভেশন তো আছে, আমি যে কী করতেছি আর কই আছি নিজেই ঠিকঠাক জানি না। আমরা মনে হয় কাছাকাছি চইলা আসছি।’
মোহাম্মদপুর থানা রোডের সামনে আসতেই সোহেল গাড়ি ডানে ঘুরিয়ে মেইন রোড থেকে সাইড রোডে ঢুকে গেল, আর বাশার মোবাইল বের করল নির্দিষ্ট ঠিকানাটা দেখার জন্যে। মোবাইলের জিপিএসটা ওপেন করে অফিস থেকে দেওয়া ঠিকানাটা ম্যাপে বসিয়ে জিপিএসে ট্র্যাক চেক করে নির্দেশনা দিতে লাগল সোহেলকে। আরও দশ মিনিট পর ওরা একটা অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ের সামনে এসে থামল। ‘এটাই মনে হয়।’
দুজনেই জিপ থেকে বেরিয়ে এসে বাশার একবার আশপাশে দেখে নিলো ‘দেখছ, পুলিশের ভ্যান আসার কথা ছিল, কোনো খবরই নাই। অবশ্য আমি আশাও করি নাই। তবে সোহেল থানায় ইনফর্ম করো ব্যাকআপের জন্যে,’ বলে সে বাড়ির গেটের দিকে এগিয়ে মোবাইলে পৃথা হাসানের ছবি দেখিয়ে দারোয়ানের কাছ থেকে কনফার্ম করে দুজনে মিলে লিফটের দিকে এগোল।
‘বাহ, এইসব অ্যাপার্টমেন্টে বিল্ডিংগুলো সেই বানিয়েছে তাই না?’ সোহেল মন্তব্য করার মতো করে বলে উঠল। দুজনে লিফটে উঠতেই বাশার বলে উঠল একেবারে টপ ফ্লোর।’
লিফটে ওপরে উঠতে শুরু করতেই বাশার বলে উঠল, ‘অস্ত্র চেক করে প্রস্তুত রাখো, বের করার দরকার নেই।’ লিফট থামতেই দুজনে সাবধানে বাইরে বেরিয়ে এলো। এই ফ্লোরটাতে চারটা অ্যাপার্টমেন্ট হবার কথা কিন্তু শুধুমাত্র একটা অ্যাপার্টমেন্টের দরজা দেখতে পেল ওরা। বাকিগুলো খালি স্পেস। এগুলোতে এখনও মনে হয় ফ্ল্যাট বিক্রি হয়নি।
‘এইটাই, তাই না?’ সোহেল প্রশ্ন করতেই নম্বর মিলিয়ে বাশার কনফার্ম করল। সোহেলকে এগোতে ইশারা করে সে আড়াআড়ি দাঁড়িয়ে তাকে কভার করল সোহেল কলিংবেল চাপলো। একবার, দুবার, তিনবার চতুর্থবারও কোনো রেসপন্স না পেয়ে কাঁধ ঝাঁকাল সোহেল। বাশার আলগোছে নিজের পিস্তলটা বের করে আনল।
‘বস, এক কাজ করেন, কল দেন একটা, নম্বর আছে না?’
বাশার কথা না বলে পিস্তলটাকে সামলে মোবাইল বের করে ডায়াল করল। ওপাশে রিং হচ্ছে কিন্তু কেউ উঠাচ্ছে না।
‘বস, ভেতরে রিং বাজতেছে,’ বলে সে দরজায় হাত দিতেই সেটা হাঁ হয়ে খুলে গেল। বাশার চট করে পিস্তল বের করে আনল, সোহেলও নিজের পিস্তল বের করে এনেছে।
‘আমি কভার করছি,’ বলে উঠতেই সোহেল ভেতরে ঢুকে পড়ল প্রথমে। তার পেছনে বাশার আ্যপার্টমেন্টটা খুব বেশি বড়ো না, তবে বেশ সুন্দর করে সাজানো গোছানো। রুমগুলো দেখে নিয়ে কিচেন ও ওয়াশরুম চেক করে নিলো ওরা। কেউই নেই ভেতরে। মোবাইলটা লিভিং রুমের টি-টেবিলের ওপরে রাখা। অ্যাপার্টমেন্টে কেউই নেই, এমনকি কোনো ধরনের জবরদস্তির চিহ্নও নেই।
‘বস, কেউই তো নাই,’ পিস্তল সামলে সোহেল মন্তব্য করার মতো বলে উঠল ‘কিন্তু কোনো জবরদস্তির চিহ্নও তো নাই,’ বাশার বলেই আবারও চারপাশে নজর বুলিয়ে টেবিল থেকে মোবাইলটা তুলে নিলো, সেটাতে একবার পলক বুলিয়ে নিয়ে সোহেলের দিকে তাকিয়ে চূড়ান্ত হতাশ গলায় বলে উঠল, ‘সোহেল, মনে হয় আমরা দেরি করে ফেলেছি। দুজনের মনে একই ভাবনা।
মেয়েটাকে কি কেউ অপহরণ করে নিলো!
