অধ্যায় একত্রিশ
সময়: ১৫৯৬ খ্রিস্টাব্দ
এগারো সিন্ধু এলাকা, কিশোরগঞ্জ
ঈশা খাঁ বেশ চিন্তিত ভঙ্গিতে নিজের যৌথ বাহিনীর প্রধানদের দিকে ফিরে তাকাল। সাধারণত এতটা চিন্তিত ভঙ্গি তার স্বভাব-বিরুদ্ধ, কিন্তু পরিস্থিতি এমনকি সে নিজেও ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। নিজের এলাকা থেকে রওনা দিয়ে সে এগারো সিন্ধু পৌঁছেছে খুব বেশি সময় হয়নি। এগারো সিন্ধুতে তার বাহিনী এবং মানসিংহের বাহিনীর ভেতরে রীতিমতো তীব্র যুদ্ধ চলছে বিগত বেশ কয়েকদিন একাধিকবার মানসিংহ তার বাহিনী নিয়ে দুর্গ দখল করেছে কিন্তু আবার তাদের যৌথ বাহিনীর চাপে পিছিয়ে যেতেও বাধ্য হয়েছে। একদিকে ঈশা খাঁ যেমন সমগ্ৰ বাংলা থেকে সমস্ত শক্তি এনে এক করেছে এখানে, ঠিক তেমনি সমগ্র বাংলায় ছড়িয়ে থাকা সেনানায়কদেরকে এক করে এই জায়গায় নিয়ে এসেছে মানসিংহ। ঈশা খাঁ এবং মানসিংহ দুজনেই জানে—এতদিন ধরে বাঙাল মুলুকে তাদের দুজনার ভেতরে যা চলছিল সেটা ছিল স্রেফ ইঁদুর-বিড়াল খেলার মতো। প্রকৃত মোকাবেলা হবে এখন। এই যুদ্ধই প্রমাণ করে দিবে বাঙাল মুলুকে কার কিংবা কাদের আধিপত্য বজায় থাকবে।
যদিও সে সবই জানে, তবুও নিজের বাহিনীর প্রধানের দিকে সে পরিস্থিতি বয়ান করার ঘোষণা দিলো। যুদ্ধ পরিস্থিতি বিস্তারিত বয়ান করা শেষ করে সে ফিরে তাকাল নিজের সভাসদদের দিকে। আর ঈশা খাঁ ফিরে তাকাল নিজের সভার সবচেয়ে বুদ্ধিমান মানুষ লতিফ শেঠের দিকে।
‘হুজুর, পরিস্থিতির বয়ানে আমরা তো বুঝতেই পারতেছি, এগারো সিন্ধুতে যা চলছে দুই বাহিনী মুখোমুখি হওয়া এখন স্রেফ সময়ের বিষয়,’ লতিফ শেঠ এইটুকু বলেই সে ফিরে তাকাল সেনাপ্রধানের দিকে। সেনাপ্রধান দুই বাহিনীর সমগ্র শক্তি এবং সামর্থ্যের একটা চিত্র বিবরণ করল।
তার বয়ান শেষ হতেই লতিফ খাঁ ফিরে তাকাল ঈশা খাঁর দিকে। ‘বুঝতেই পারছেন, হুজুর, আমরা কোনোদিক থেকেই তাদের সমকক্ষ নই।’
‘তারমানে সরাসরি যুদ্ধ যদি লাগে তবে পরিস্থিতি কোনোভাবেই আমাদের অনুকূলে থাকার কোনো সম্ভাবনাই নাই,’ ঈশা খাঁ যেন অনেকটা বিড়বিড় করেই বলে উঠল।
‘হুজুর, বেয়াদবি না নিলে আরও একটা বিষয় আপনার আজ্ঞাবহ করার প্রয়োজন অনুভব করছি,’ লতিফ শেঠের পাশ থেকে সরফরাজ বলে উঠল। ‘বিগত কয়েকদিনের যুদ্ধে আপনার অনুপস্থিতি নিয়ে মোঘলার কুৎসা রটাতে শুরু করছে, এইটুকু বলে সে খানিকটা যেন দ্বিধার সাথেই তাকিয়ে রইল ঈশা খাঁর দিকে। কিন্তু ঈশা খাঁর কুঁচকানো ভ্রুতে আরও দুয়েকটা ভাঁজ যোগ হওয়া ছাড়া আর কিছু হলো না দেখে সে আবারও বলতে লাগল, ‘হুজুর, খোদ মোঘল দরবারে নাকি এরকম কথা উঠেছে, আপনি মানসিংহের ভয়ে যুদ্ধের ময়দানে যাবার সাহস করছেন না। এরকম একটা কথা তারা সবখানে ছড়িয় দেওয়ার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে,’ এইটুকু বলে সরফরাজ খানিকটা ভয় এবং দ্বিধার সাথেই চুপ হয়ে গেল।
দরবারের পরিস্থিতি হঠাৎই যেন শুনশান হয়ে গেছে। সবাই চুপ। কিন্তু সবাই যা ভেবেছিল হলো তার উলটোটা, সবাই চুপচাপ ঈশা খাঁর দিকে তাকিয়েছিল ভাবছিল সে রেগে উঠবে, ধমকে উঠবে, বা অন্য কিছু করবে, কিন্তু তার বদলে ধীরে ধীরে তার মুখে মৃদু একটা হাসি ফুটে উঠল।
সবাই উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করছে হঠাৎই ঈশা খাঁ বলে উঠল, ‘ওরা যা বলেছে সেটা থেকেই আমরা সমাধান বের করবো,’ বলে সে ফিরে তাকাল লতিফ শেঠের দিকে। ‘আমরা বারবার বলছিলাম না, ভিন্ন শক্তি দরকার আমাদের, সেটা ছাড়াই পরিস্থিতি উত্তানোর উপায় বের করেছি,’ বলে তার মৃদু হাসি আরও চওড়া হলো। ‘একজন পত্রকারকে ডাকো, আমি মোঘল সেনাপতি মানসিংহকে একটা পত্ৰ পাঠাতে চাই।’
***
বৃহত্তর জল-জঙ্গল এলাকা
ভোরের আলো একেবারে তীর্যকভাবে পানিতে পড়ে সেটা প্রতিপলিত হয়ে এসে লাগছে তার নির্ঘুম লাল চোখে। রণক্লান্ত রাত জাগার পর চোখের ওপরে পানির প্রতিফলন লাগাতে রীতিমতো জ্বালা ধরিয়ে দিচ্ছে তাকে। কিন্তু মনের গহীন কোনে অপরিসীম প্রশান্তি তার। নৌকার পাটাতনের ওপরে দাঁড়িয়ে তামাক চিবুতে চিবুতে আনমনেই নিজের দাড়িতে হাত বুলাতে বুলাতে ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠল মাসুমের।
‘কী, বাঙালি, অনেক খুশি মনে অইতাছে?’ বিচিত্র উচ্চারণে বাংলা শুনেই মাসুম বুঝতে পেরেছিল মানুষটা কে হতে পারে, তাও সে সামান্য হাসি মুখে ফিরে তাকাল রায়েলির দিকে।
‘তা কইতে পারো,’ মাসুম দাড়িতে হাত বুলাতে বুলাতে এই প্রথমবারের মতো মেয়েটাকে ভালোভাবে খেয়াল করল। কাল রাত থেকে এতকিছু ঘটে গেছে অথচ মানুষটার দিকে একবারও খুব ভালোভাবে তাকানোর সুযোগ পর্যন্ত পায়নি সে। মেয়েটার দিকে তাকালেই সবার প্রথম চোখে পড়ে কঠিন চোয়াল আর রোদে পোড়া বাদামি চামড়া। মাসুম অনুমান করল মেয়েটা একসময় অনেক বেশি দুধে আলতা চামড়ার অধিকারী ছিল; কিন্তু বঙ্গদেশের রোদে তার চামড়া পুড়ে বেশ একটা বাদামি ভাব নিয়ে এসেছে, কঠিন চোয়াল, শক্তিশালী হাড়ের গড়ন আর অনেকটা পুরুষদের মতো পোশাক মেয়েটার অবয়বে মেয়েলি ভাবের চেয়ে পুরুষালি একটা ভাব নিয়ে এসেছে। কিন্তু তার ভেতরে কোথাও যেন অদ্ভুত এক কমনীয়তা আর রহস্যের ঘেরাটোপের বন্দিদশা অনুভব হয় চোখের দিকে তাকালে। ক্ষণিকের জন্যে সেই রহস্যের ঘেরাটোপে ধরা পড়ে গেলেও সাথে সাথে নিজেকে সামলে মেয়েটার চোখ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে পানির দিকে ফিরে তাকাল মাসুম। ‘তুমরা বিশ্রাম নিতাছ না?’
রায়েলি ওর পাশে এসে পাটাতনের ওপরে রাখা পিপের ওপরে বসে পড়ল। ‘বিশ্রাম নেওয়ার আসলে উপায় নাই,’ মেয়েটার কথা মাসুম বেশ ভালোভাবেই অনুভব করতে পারছে। ‘তা ঠিক,’ বলে সে আবার ফিরে তাকাল মেয়েটার দিকে। ‘তুমি কইতাছিলা না, আমি খুশি কি না,’ বলে সে কাঁধ ঝাঁকাল। ‘আমি আসলে খুশি। কারণ খাঁ সাহেব আমার জন্যে বিরাট কিছু। তার বলা কথা আমার লাইগা সবচেয়ে বড়ো নির্দেশ; কিন্তু প্রত্যেকবার আমার লাইগা তার অনেক ঝামেলায় পড়তে হইছে। আর তাই এইবার যখন সে তুমগোরে এইখান থেইকা উদ্ধার করতে কইল, আমি আসলে সত্যি ভাবতে পারি নাই শত্রু দিয়া ঘিরা এই ভয়ঙ্কর জল- জঙ্গল থেইকা তুমগোরে সত্যি সত্যি উদ্ধার করতে পারবো,’ আবারও কাঁধ ঝাঁকাল মাসুম। ‘কিন্তু এখন মনে অইতাছে বিষয়টা সম্ভব অইলে অইতেও পারে।’
‘বাঙালি, একটা কথা কই,’ বলে রায়েলি চোখ তুলে তাকাল মাসুমের দিকে । ‘আমি জানি না তুমি কতখানি জানো আমগোর বিষয়ে, কিন্তু আমরা অন্য হিসাবে চলা মানুষ। মাইয়া হইয়া জন্ম নিলেও আমরা পুরষগোর লগেই লড়াই কইরা টিক্কা আছি, কিন্তু কাইল রাইতে তুমি যা খেল দেহাইছ—’ রায়েলি বাক্য শেষ না করে মাসুমের দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে পানির দিকে তাকাল। ‘আমি আসলেই ভাবি নাই, ওই দ্বীপ থেইকা বাইর হইতে পারবো আমরা। কিন্তু সেইটা সম্ভব হইছে, এখন আমার মনে অইতাছে হয়তো এই ধাক্কা টিক্কা যাওয়া সম্ভব।’
‘একটা কথা জিগাই,’ মাসুম মনে মনে খানিকটা দ্বিধা করছে প্রশ্নটা করবে কি না ভেবে। ‘তুমগো লগে কী এমন আছে যে সবাই—’
‘বাঙালি, আমি তোমার ওপরে কৃতজ্ঞ কিন্তু এই প্রশ্নের জবাব এমনকি আমিও দিতে পারবো না,’ রায়েলি তাকিয়ে আছে মাসুমের দিকে, মাসুমও চোখ সরু করে তাকিয়ে আছে তার দিকে। ‘কিছু জিনিস না জানাই ভালো—’ বলে সে মৃদু হেসে উঠল। ‘এইখান থেইকা আমরা আসলে যাইতাছি কোনোদিকে?’
মাসুম এখনও রায়েলির দিকেই তাকিয়ে ছিল। ‘আমি এহনো পুরাপুরি জানি না। আমগোর প্রথম উদ্দেশ্য ছিল ওগো কাছ থেইকা দূরে সরা। গত কয়েক ঘণ্টায় আশা করি যথেষ্ট দূরে সরা অইছে,’ বলে মাসুম আবারও পানির দিকে ফিরে তাকাল। ‘আমার সাথে ওই যে পাতলা-পুতলা কইরা লোকটারে দেখছ না, ওর নাম নুক্কুন, ও এই এলাকা খুব ভালো চিনে। ও সারেংয়ের সাথে আছে, সেই নির্দেশনা দিবে কোনোদিক দিয়া যাইতে হবে, একটা নির্দিষ্ট জায়গা পর্যন্ত পৌঁছাইতে পারলে আমরা তারপর নিরাপদ,’ এইটুকু বলে মাসুম থেমে গেল।
রায়েলি, তাকিয়ে আছে। ‘এরপরে?’
‘হিসাব অনুযায়ী একবার রসুল খাঁর পাহারাদারির এলাকার ভিতরে যাইতে পারলে আর চিন্তা নাই, পরে ওরাই আমগোরে নিরাপদে নিয়া যাবো,’ বলে মাসুম হঠাৎই একেবারে চট করে প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে জানতে চাইল, ‘তোমগো দলের বাকিরা কেমন আছে, বিশেষ কইরা বেগম সাহেবা মেহের, হের উপরে দিয়া তো সবচেয়ে বেশি ধকল গেছে,’ মাসুম চোখ সরু করে রায়েলির প্রতিক্রিয়া লক্ষ করছে। ‘বিশেষ কইরা প্রথমে জঙ্গলমহালে আক্রমণ, তারপরে সুবাদার আসলামের মৃত্যু। এরপরে—’
মাসুম দেখল রায়েলির চোখ দুটো অন্ধকার হয়ে গেছে। ‘বাদ দাও, বাঙালি, যা গেছে তো গেছেই সবারই নতুন কইরা বাঁচার অধিকার আছে। তবে তার চায়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ অইল-’
হঠাৎ করেই পাটাতনের ওপরে শব্দ হতেই দেখতে পেল ওদের সাথের ছেলেটা এসেছে। ‘আপনেরে ডাকতেছে বেগম সাহেবা,’ মাসুম খুব ভালো করে দুজনের প্রতিক্রিয়া লক্ষ করতে করতে উঠে দাঁড়াল। ‘চলো, আমারও নুক্কুনের লগে কথা বলা দরকার।’ ওরা সবাই মিলে মূল অংশের দিকে এগোল। নিজের লোকদের একজনকে মাসুম বলে উঠল, ‘জাহাজের পাহারাদারদের বাদে বাকি সবাইকে সারেংয়ের ঘরে আসতে বলো,’ কথাটা বলেই সে দৃঢ় পায়ে এগিয়ে গেল সারেংয়ের ঘরের দিকে। ভেতরে প্রবেশ করে দেখল বরখা আর ধোবল দাঁড়িয়ে আছে দুপাশে। আর নুক্কুন কথা বলছে সারেংয়ের সাথে। সারেং লোকটাকে এখন অনেকটাই স্বাভাবিক মনে হচ্ছে, যদিও তার মুখে ভয়ের ছাপ পুরোপুরিই বিদ্যমান।
‘কাম আগাইল?’ মাসুম ভেতরে প্রবেশ করেই জানতে চাইল
‘এরা দুইজনে খালি ফুসুরফাসুরই করতাছে,’ ধোবল দুজনের দিকে ইশারা করে বলে উঠল।
মাসুম ওদের দুজনার দিকে ইশারা করে এগিয়ে গেল সারেংয়ের দিকে। ওকে দেখেই লোকটা কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল তার আগেই মাসুম তাকে থামিয়ে দিলো। ‘অপেক্ষা করবো, ওরা আসলে সবাই একলগে আলোচনা করবো। এর আগে আমারে বুঝাও আমরা কই আছি আর এইখান থেইকা কোনোদিকে যাইতে হবে? আর মোঘল পাহারা এড়াবো কেমনে?’
‘আমরা বেশি দূরে নাই,’ নুক্কুন তড়বড়িয়ে বলে উঠল। ‘আর খুব বেশি সময় লাগবো না।’
মাসুম তাকে থামিয়ে দিয়ে পুরনো তেল চিটচিটে একটা মানচিত্র দেখিয়ে ওকে সব বোঝানোর জন্যে ইশারা করল। ওরা আলোচনা করতে করতেই রায়েলি সুলতান আর ওদের দলের আরেকজনসহ ভেতরে প্রবেশ করল।
‘বলো, তুমগো পরিকল্পনা কী?’
বলো, নুক্কুন, মাসুম ফিরে তাকাল নুক্কুনের দিকে। তাকে দেখে একদিকে ভীষণ উত্তেজিতও মনে হচ্ছে আবার সবাই তার দিকে ফিরে তাকাতেই ভীষণ সংকুচিতও হয়ে উঠল যেন সে। সবাই তাকিয়ে আছে, সে দুবার কথা বলতে গিয়েও থেমে গেল। ‘নুক্কুন, এইহানে আমরা সবাই নিজের মানুষ, বলো। কোনো সমস্যা নাই।’
‘ইয়ে, হুজুর, আমরা এহন রসুল খাঁর এলাকা থেইকা বিশ ক্রোশ দূরে আছি, হেগো পাহারা এলাকার ভিতরে পৌঁছাতেই অইলে, বলে সে একে একে ব্যাখ্যা করে গেল কীভাবে কোনো জায়গায় মোঘলদের পাহারা থাকতে পারে এবং কোনোদিক দিয়ে ওখানে যেতে হবে।
‘আমরা কি সরাসরি যাইতে পারবো?’ মাসুম পুরো যাত্রাপথটা বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করছে। ‘মোঘলগোর পাহারা, আর তাছাড়া বলে সে রায়েলির দিকে ফিরে তাকাল। ‘বিশার বাহিনীর লগে মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা কী আছে?’ শেষ প্রশ্নটা মাসুম করেছে সারেংয়ের দিকে তাকিয়ে। লোকটা ওর প্রশ্ন শুনে আরও ভয়ে কাবু হয়ে গেল।
‘হুজুর, আমি জানি না, আমি বড়োজোর কইতে পারি কই কই হের ডেরা আছে, আর হেইগুলা বাদ দিয়া আপনেগো ক্যামনে রসুল খাঁর এলাকা পর্যন্ত লইয়া যাইতে পারবো। তয়—’
তাকে কথা শেষ করতে দিলো না নুরুন, তার আগেই সে মাসুমের দিকে ফিরে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল কিন্তু মাসুম তার আগেই কথা বলে উঠল। ‘সবাই মন দিয়া শোনো, আমগোর এখন তিনটা উদ্দেশ্য। যতটুকু বুঝছি এই নাও নিয়া আমরা রসুল খাঁর এলাকা পর্যন্ত যাইতে পারবো, মানে এইটার অবস্থা যাবার মতনই আছে। কিন্তু তার আগে কয়েকটা জিনিস মাথায় রাখতে অইব। কথাগুলা কইতাছি কারণ আমি, বরখা কিংবা ধোবল, আমরা এই এলাকা সেইভাবে চিনি না। কাজেই তুমি,’ সে সারেংকে দেখাল। ‘নুক্কুন আর সুলতান, তুমরা তিনজনে মিলা এমন একটা ব্যবস্থা বাইর করো যাতে, আমরা মোঘলগোর পাহারা এড়ায়া, বিশার বাহিনীর সামনে না পইড়া যেমনেই হোক রসুল খাঁর এলাকায় পৌঁছাইতে পারি।’
বলে সে নির্দিষ্টভাবে নুক্কুনের দিকে ফিরে তাকাল। ‘তবে আমগোর নিরাপদে পৌঁছানির আগে আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে, যা আমগোর নিরাপদে পৌঁছানির চাইয়াও বেশি গুরুত্বপূর্ণ,’ বলে সে থেমে গেল। সবাই তাকিয়ে আছে মাসুমের দিকে, আর মাসুম তাকিয়ে আছে নুক্কুনের দিকে। ‘আমার হিসাবে এই যাত্রার পথেই পড়ার কথা এমন এক জায়গা যেইখানে আটকা পইড়া আছে নুক্কুনের পরিবার। যেকোনো মূল্যে আমগোর ওর পরিবাররে উদ্ধার করতে হবে। ওয়াদা ওয়াদাই, আমগোর শত বিপদ অইলেও, এমনকি মরতে অইলেও নুক্কুনের পরিবাররে উদ্ধার না কইরা আমরা এই এলাকা ছাড়ব না,’ মাসুম এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে নুক্কুনের দিকে। এই কথাটা ওকে বলতেই হতো, কারণ ও জানে নুক্কুনের মতো পাগল নিজে থেকে জীবনেও সরাসরি কিছু বলবে না।
সুলতান কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল কিন্তু মেহের তাকে একটা হাত তুলে থামিয়ে দিলো। ‘বাঙালি ঠিকই বলছে।’
মাসুম মেহেরের দিকে তাকিয়ে একটা ধন্যবাদসুলভ হাসি দিয়ে ফিরে তাকাল ওদের তিনজনের দিকে। ‘কাজে নামো, আমি জলদি ফল চাই,’ বলে সে ইশারায় ধোবল আর বরখাকে ডাক দিলো। ওদের সাথে জরুরি কিছু আলোচনা সারতে হবে। একবার ভাবল রায়েলিকেও ওদের সাথে যোগ দিতে বলবে কি না কিন্তু পরে সেটা বাদ দিয়ে ওরা তিনজনে আলোচনা চালিয়ে গেল। খাবার থেকে শুরু করে অস্ত্র ইত্যাদি বিষয়ে নিজেদের পরিকল্পনা প্রায় শেষ করে এসেছে এমন সময় নুকুন ওদের কাছে এসে ডাক দিলো ওকে।
‘হুজুর,’ সে সরাসরি তাকাচ্ছে না মাসুমের চোখের দিকে। ‘হুজুর,’ আবারও খানিকটা দ্বিধার সাথে বলে উঠল সে।
‘বলো নুক্কুন, এত দ্বিধার কিছু নাই,’ মাসুম বুঝতে পারছে লোকটা কেন দ্বিধা বোধ করছে। ‘আমি যে দায়িত্ব নিয়া এইখানে আসছি সেইটা পূরণ করা যেমন আমার জন্যে গুরুত্বপূর্ণ, ঠিক তেমনি তোমার পরিবাররে উদ্ধার করাও গুরুত্বপূর্ণ। কাজেই ওইটা নিয়া কিছু বলার প্রয়োজন নাই।’
‘হুজুর,’ আবারও একই শব্দ উচ্চারণ করে সে এবার চোখ তুলে তাকাল মাসুমের দিকে। ‘হুজুর,’ বলে সে এবার মাসুমের হাত ধরে ফেলল। ‘আমার যদি কোনো ভুল হয়া থাকে—’
‘নুক্কুন,’ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্যে মাসুম তাকে মৃদু স্বরে ধমকে উঠল। ‘তোমার ভুল হইছে,’ মাসুম এই কথাটা বলতেই লোকটা চোখ তুলে তাকাল ওর দিকে, মাসুম দেখল, মানুষটার চোখে পানি। ভুলটা হইল এখন তুমি কাজের কথা বলবা, সেইটা না বইলা আজাইরা ভেজাল করতাছ। কাজের কী অইল সেইটা বয়ান করো।’
মাসুমের ঝাড়ি খেয়ে মৃদু হেসে উঠল নুক্কুন, নিজের লম্বা এলোমেলো চুল নেড়ে সে বলে উঠল, ‘হুজুর, মোটামুটি বাইর করন গেছে একটা রাস্তা। আমরা এহন যেখানে আছি এর চাইরপাশেই মোঘল পাহারা আর বিশার চরেরা আর তার বাহিনী ছড়ায় ছিটায় আছে,’ বলে সে থেমে গেল। মাসুম তাকিয়ে আছে তার দিকে। ‘তাইলে উপায়?’ ওর সাথের বাকিদের চোখেও কৌতূহল।
‘উপায় আছে, হুজুর,’ বলে নুক্কুন আবারও তকালো সরাসরি মাসুমের চোখের দিকে। ‘এইখান থেইকা আমরা জঙ্গলবাড়ি যাবো। একদিকে জঙ্গলমহালের পতনের পরে আবার অন্যদিকে রসুল খাঁর এলাকার মাঝামাঝি হওয়াতে আবার অন্যদিকে মানসিংহের বাহিনী এগারো সিন্দুর অবস্থানের পরে এখন জঙ্গলবাড়ি খালিই পইড়া থাকার কথা। এইখান থেইকা জঙ্গলবাড়ি পৌঁছানোই সবদিক থেইকা উত্তম অইব। আর জায়গাটা এইখান থেইকা কাছেও আবার এইখান থেইকা হাওড়-খাল-বিলের ভিতর দিয়া ওইখানে পৌঁছানিও সম্ভব আধাবেলার ভিতরে।’
‘আর তারপর?’ মাসুম সরাসরি তাকিয়ে আছে নুক্কুনের চোখের দিকে। লোকটার চোখের এত দ্বিধার কারণটা ও ঠিক ধরতে পারছে না।
‘হুজুর, ওইখান থেইকা আমরা রসুল খাঁর এলাকাতে খবর পাঠাইতেও পারবো, যাতে হেরা আইসা আমগোরে উদ্ধার করতে পারে, কিংবা সুযোগ বুইঝা আমারার সইরা পড়তে পারি। কারণ আমরা এখন যেইখানে আছি এইখান থেইকা সরার আর কোনো উপায় নাই, অন্তত মোঘলগোর চোখে ধুলা দিয়া,’ বলে লোকটা থেমে গেল। আবারও তার চোখে মুখে পৃথিবীর সব দ্বিধা এসে যেন ভর করেছে।
নুক্কুন, আর কোনো কারণ আছে কী জঙ্গল-বাড়ি পৌঁছানোর?’
‘হুজুর, ওইখানেই আমার পরিবারের থাকার কথা। চাইরপাশে সব ভাইঙা পড়ার পর খালি হেরা না আরও বেশ কিছু পরিবার ওইখানে আশ্রয় নেওয়ার কথা, যদি’
নুক্কুনকে কথা শেষ করতে দিলো না মাসুম। ‘পাল খাটাও, নাওয়ের মুখ ঠিক করো, আমরা জঙ্গলবাড়ি যাইতেছি। আগে ওইখানে যাই, এরপরে যা হইবার হবে, সেইটা দেখা যাবে-’
