অধ্যায় তেরো
সময়: ১৫৯৬ খ্রিস্টাব্দ
কালীঘাট, জল-জঙ্গল এলাকায় প্রবেশের পথ
‘হুজুর, ডর লাগতাছেনি?’ মাসুমের ঠিক পেছন থেকে কানের কাছে ফিসফিস করে বলে উঠল একটা কণ্ঠ। পলকের জন্যে ফিরে তাকিয়ে দেখল গেড়ুয়া মৃদু হাসিমুখে তাকিয়ে আছে তার দিকে। কালরাতের বেলায় তাকে যেমন দেখাচ্ছিল তার থেকে এখন বেশ ব্যতিক্রম লাগছে। কপালের তিলক, মাথার বন্ধনী আর চোখের চারপাশে লাগানো কালো কাজলের মতো বস্তুগুলো তাকে কেমন যেন ভিন্ন করে তুলেছে। তবে এই ভিন্নতার মূল কারণ তার পোশাক নয় বরং তার চেহারার অভিব্যক্তি। আর এই ভিন্ন অভিব্যক্তির কারণ তার হাতে ধরা ছোটো নলের মতো একটা জিনিস। ওটা থেকে ধোঁয়া বেরোচ্ছে। গন্ধটা মাসুমের কাছে অপরিচিত নয়, আবার পুরোপুরি পরিচিতও নয়। এটা একধরনের সিদ্ধি, কিন্তু গন্ধটা সিদ্ধির মতো হলেও পরিচিতি কোনো সিদ্ধির মতো নয়। মাসুম জানে এসব অঞ্চলের কাঠুরিয়া বা এ-ধরনের বুনো পেশার সাথে সংশ্লিষ্ট লোকজন নানা ধরনের উদ্ভট নেশা করে। কিন্তু এরকম একটা পরিস্থিতিতে গেড়ুয়ার মতো একটা ছেলে সিদ্ধি টানছে ব্যাপারটা ঠিক ভালো লাগল না ওর কাছে।
‘হুজুর, একটা টান দিবেন নাকি?’ দেবী মাতার বিশেষ আশীর্বাদের জিনিস,’ মাসুম কিছু বলছে না দেখে সে আবারও বলে উঠল। সম্ভবত মাসুমের বিরক্তি সে টের পায়নি। ‘একবার টান দিলে দেখবেন—’
‘গেড়ুয়া, এইরকম একটা সময়ে তোমার এখন সিদ্ধি টানা লাগতেছে!’ মাসুম ফিরে তাকিয়ে দেখল শুধু গেড়ুয়াই নয় বরং ওদের সাথে আরও অনেকের হাতেই একইরকম ধোঁয়া ভরা নল, সেগুলো শুধু একজনে টানছে না। একজনের টানা হতেই আবার সেগুলো একের থেকে অপরের সাথে হাতবদল হচ্ছে। ‘আমি তোমার কাছ থেকে এইটা আশা করি নাই।’
মাসুম ভেবেছিল ওর কথার জবাবে ছেলেটা আত্মসমর্পণমূলক কিছু বলবে কিন্তু সেটা না বলে সে বরং মৃদু হেসে উঠল। যদিও যখন সে কথা বলল বেশ বিনয়ী শোনাল। ‘গোস্তাকি নিয়েন না, হুজুর। পানিতে নৌকা ভাসানির আগে দেবীর খুশির জন্যে আমরা অনেক আয়োজন করি, সবশেষে সিদ্ধি টানি কিন্তু আইজ আপনেগো সম্মানে কিছু করা অয় নাই। তাই খালি সিদ্ধি টানতেছি। কিছু মনে নিয়েন না,’ বলে সে মাথা ঝাঁকিয়ে নিজের লোকদের উদ্দেশ্যে মাথা নেড়ে বিচিত্র ভাষায় কিছু একটা বলে উঠল। মাসুম এই ভাষা কখনও শোনেনি। ছেলেটার কথার জবাবে নৌকার ওপরে মৃদু গুঞ্জন বয়ে গেল। ‘কাররা’
‘কাররা’ বলে মৃদু একটা রব উঠে শান্ত হয়ে গেল নৌকার ওপরটা। মাসুম দেখল সবাই যার যার নল নামিয়ে নিলো মুখের সামনে থেকে। আনমনেই সে একবার বরখা আর ধোবলের দিকে দেখে নিলো।
হুজুর, আমরা প্রায় চইলা আসছি, সাবধান, আপনেরা কিন্তু কথা কইয়েন না।’
মাসুম আবারও বিরক্ত হলো ছেলেটার ওপরে, সে নিজেও কি আসলে চিন্তিত হয়ে পড়েছে। ‘গেড়ুয়া, আমি বাচ্চা পোলাপান না, আমরা কেউই না, তুমি বরং নিজের লোকগোরে সাবধান করো, মাসুমের কথা শেষ হতেই সে তার উদ্দেশ্যে একবার হাত নেড়ে মাথা ঝাঁকিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে মৃদু কুঁজো হয়ে চলে গেল নৌকার সামনের দিকে। মাসুম মাথা তুলে দেখল সারি সারি নৌকা এগিয়ে চলেছে ঘাটের দিকে। এই ঘাটে সে বহুবছর আগে একবার এসেছিল কাজেই এখানকার বিষয়াদি সম্পর্কে সে খুব ভালোই অবগত আছে। কিন্তু কালীঘাট বলতে যে ঘাটের কথা তার মনে পড়ে এই ঘাট তার থেকে অনেক ব্যতিক্রম। সেই ছোটো ঘাট কালের বিবর্তনে বিরাট আকারের ব্যাবসায়িক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। তবে এই মুহূর্তে ওটাকে ব্যাবসায়িক কেন্দ্রের চেয়ে সামরিক কিংবা নৌ ঘাঁটি বলে মনে হচ্ছে বেশি। সেদিকে তাকিয়ে মাসুম দেখল সারি সারি ছোটোবড়ো নৌকাঘাটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আর মোঘল সেনারা প্রতিটা নৌকা পরীক্ষা করে তবে ঘাটের ভেতর দিয়ে প্রবেশ করার জন্যে অনুমতি দিচ্ছে। ঘাটের বড়ো নৌকা চলাচলের জায়গাটাকে শক্ত লোহার জাল দিয়ে বন্ধ করে রাখা হয়েছে। তার পরিবর্তে সরু একটা জায়গা দিয়ে ধীর গতিতে এক এক করে নৌকাগুলো প্রবেশ করছে। অন্যদিকে বজরা কিংবা বড়ো জালিয়া নৌকাগুলোর প্রবেশ পথ আলাদা। সেগুলো গিয়ে একটা খোপঘরের মতো জায়গায় প্রবেশ করানো হচ্ছে। মাসুম অনুমান করল: সেখানে বড়ো নৌকাগুলোকে বেশি নিরীক্ষার ভেতর দিয়ে যেতে হচ্ছে। চারপাশের প্রহরা দেখে সে আরেকবার অনুধাবন করতে পারল বাসিমেরা কেন ওদেরকে এত কষ্ট করে এভাবে পাঠানোর আয়োজন করেছে। সত্যি কথা হলো, এছাড়া এখান দিয়ে প্রবেশের আর কোনো উপায় নেই। মাসুম ভেতরে খানিকটা উদ্বিগ্নতা বোধ করছেই তবে সেই সাথে আরেকটা সিদ্ধান্তও নিয়ে ফেলল। যে কাজে যাচ্ছে সেটা উদ্ধার করতে পারলে এখান দিয়ে নয় বরং বাসিমের কথামতো ওদেরকে অন্য পথে ফিরে আসতে হবে।
‘হেই,’ জোরে একটা চিৎকার ভেসে এলো সামনে থেকে। মাসুম দেখল সামনের আর ঠিক দুটো নৌকার পরেই ওদের নৌকা ঘাটের পরীক্ষার জায়গায় প্রবেশ করবে। আনমনেই একবার ধোবল আর বরখার দিকে দেখে নিয়ে সে মাথায় প্যাঁচানো কাপড়টা দিয়ে মুখ মাথা আর ঘাড় আরও ভালোভাবে ঢেকে এমনভাবে বসল যেন মনে হয় ঠান্ডার ভেতরে গুটিসুটি মেরে একেবারে সেধিয়ে গেছে নৌকার ভেতরে।
‘হেই,’ বলে ঘাটের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা এক মোঘল সৈনিক ওদের নৌকাটাকে সামনে নিয়ে যাবার জন্যে ইশারা করল। মাসুম দেখল সামনের নৌকাটা পার হয়ে যেতেই ওদের নৌকাটা ঘাটের সাথে গিয়ে লাগল। আনমনেই ওর নজর চলে গেল ঘাটে অন্তত আট-দশজন সুসজ্জিত সৈনিক নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সৈনিকদের দলটার ওপরে। প্রত্যেকর পরনে পুরোদস্তুর সামরিক পোশাক, প্রত্যেকের এক হাতে বর্শা, অন্য হাতে মোঘলদের প্রতীকচিহ্ন আঁকা গোল ঢাল আর কোমরে ঝোলানো বাঁকা তরবারি। প্রত্যেককেই দেখে মনে হচ্ছে যেন একেবারে যুদ্ধের ময়দানে প্রস্তুত হয়ে আছে যুদ্ধের জন্যে। সৈনিকদের সবার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সেনার দিকে চোখ পড়তেই তার পোশাকের ধরনটা দেখে মাসুম বুঝতে পারল এই লোকটাই ওদের দলের প্রধান। ওদের নৌকাটাকে এগিয়ে যেতে দেখেই সামনের এক সৈনিক ওদেরকে ডাক দিয়ে ওদের পরিচয় জানতে চাইল সে, কোথা থেকে আসছে, আর কোথায় যাচ্ছে সেটাও জানতে চাইল। মাসুম শুনতে পেল গেড়ুয়া উঠে দাঁড়িয়ে সামনে এগিয়ে গেল মোঘল সৈনিকদের সাথে কথা বলার জন্যে। গেড়ুয়া ওদের সাথে কথা বলছে হঠাৎ মাসুমের খানকিটা আবেগপ্রবণ অনুভূতি হলো। ওর মনে পড়ে গেল পুরনো দিনগুলোর কথা, একসময় সে নিজেও ওদের একজন ছিল, এরকম কত জায়গায় কত যুদ্ধে কত টহলে সে নিজে এরকম দলের নেতৃত্ব দিয়েছে, শত্রু আছে কি না পরখ করে দেখার জন্যে। আর আজ সে নিজেই কি না চোরের মতো ওদের নজরদারি থেকে বাঁচার জন্যে পালিয়ে এখানে একজন কর্মজীবী মানুষের ছদ্মবেশে বসে আছে। ব্যাপারটা ভাবতেই ওর মস্তিষ্ক ওকে বুঝিয়ে দিলো কাজটা সে করছে নিজের মানুষ, নিজের নেতা আর নিজের মাতৃভূমির জন্যে, কিন্তু মস্তিষ্ক যত ব্যাখ্যাই দিক না কেন, মন তো মানতে চায় না।
‘এই সর একদিকে,’ মুহূর্তের জন্যে ধমক খেয়ে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল মাসুম। ক্ষণিকের জন্যে সে নিজের ভাবনার জগতে হারিয়ে গেছিল, এই সময়ে ওদের নৌকা পরীক্ষার জন্যে মোঘল সৈনিকেরা নৌকায় উঠে এসেছে ব্যাপারটা সে খেয়ালই করেনি। মোঘল সৈনিকেরা নৌকায় উঠে পুরো নৌকা পরীক্ষার জন্যে ওদেরকে নেমে দাঁড়াতে বলছে, ওরা একে একে নৌকা থেকে নেমে ঘাটের পাটাতনের ওপরে দাঁড়াল। মোঘলদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আর সতর্কতা দেখে ও বেশ অবাকই হলো। মোঘল সেনাপতি বাহরাম খাঁর নেতৃত্বে যদি এটা ঘটে থাকে তবে বলতেই হবে অয়োজনে আর দায়িত্বে কোনো ত্রুটি রাখছে না ওরা। মনে মনে আরও একবার মাথা নাড়া দিয়ে উঠল মনের ভেতরে, এদেরকে ছাড়িয়ে যা করতে যাচ্ছে সেটা করাটা অনেক কঠিন একটা ব্যাপার হতে যাচ্ছে।
মোঘল সৈনিকেরা নৌকার ওপরে উঠে খুঁজে খুঁজে একপাশে নৌকার গলুইয়ের নিচে স্তূপ করে রাখা কুঠার লাঠি আর ছুরিগুলো দেখে ব্যাখা চাইল, গেড়ুয়া ওদেরকে বোঝানোর চেষ্টা করছে: ওরা যেহেতু কাঠুরিয়া কাজেই কুঠার এগুলো তো থাকবেই, তবুও ওকে আবারও জানতে চাইল লাঠি আর ছুরিগুলো রাখার কারণ কি, গেড়ুয়া ব্যাখ্যা করছে এমন সময় একাধিক সৈনিক এসে ওদেরকে পরীক্ষা করতে লাগল।
যদিও মোঘলরা এখন শত্রু তবু ওদের কাজের প্রশংসাই করল মনে মনে মাসুম। লোকগুলা কোনো সম্ভাবনা বাতিল করে দিচ্ছে না। আর মনে মনে এটাও স্বীকার করতে বাধ্য হলো গেড়ুয়ার কথামতো যদি একেবারে হুবহু ওদের মতো পোশাক পরিচ্ছদ আর ছদ্মবেশ ধারণ না করত তবে পার হবার কোনো সম্ভাবনাই ছিল না।
নৌকার লোকটা সব পরীক্ষা করে ঠিক আছে জানাতেই ডাঙার এরাও জানাল সব ঠিক আছে। গেড়ুয়াকে ডেকে ওরা কোথায় যাচ্ছে ওদিকে ফিরবে কি না জিজ্ঞেস করতে যাবে হঠাৎ চারপাশে সবাই সতর্ক হয়ে উঠল
সৈনিকদের কেউ একজন চিৎকার করে জানাল সেনাপ্রধান আসছে। মাসুমরা নৌকায় ওঠার জন্যে প্রস্তুতি নিচ্ছিল তার আগেই ওদেরকে নৌকায় উঠতে বাধা দিয়ে ঘাটের একপাশে সারি করে দাঁড় করিয়ে দিলো। মাসুম আনমনেই ধোবল আর বরখার দিকে তাকাল। ওরাও খানিটকটা চমকে গেছে, মাসুম দেখল গেড়ুয়ারও ভ্রু কুঁচকে উঠেছে।
‘এই সবাই সাবধান, সেনাপতি আসতাছে, কোনো উলটাপালটা কিছু করলে শাস্তি হবে,’ বলে একজন সৈনিক ধমকে উঠল। লোকটা না বললেও চলত, একদল সৈনিকের পায়ের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। সৈনিকদের দলটা ঘাটের কাছে এসে দুই সারিতে দাড়িয়ে মাঝখানে জায়গা করে দিলো। সেখান দিয়ে নিজের সঙ্গীদেরকে নিয়ে মাসুমদের দিকে এগিয়ে আসতে শুরু করল সেনাপতি।
সেনাপাতিকে দেখেই বুকের ভেতরে ধরাস করে ওর হৃৎপিন্ডটা একটা লাফ দিলো। সেনাপতি বাহরাম খাঁ, ওরা একসময় একইসাথে একই বাহিনীতে কাজ করত। লোকটা ওকে খুব ভালোভাবেই চেনে মাসুমকে। কথাটা বাকিদের বলতেই এমনকি গেড়ুয়ারাও চমকে উঠল। অন্যদিকে বাহরাম খাঁ বীরদর্পে এগিয়ে আসছে ওদের দিকে।
***
চাইলে নাকি সবই পাওয়া সম্ভব, কথাটা সে ঠিক বিশ্বাস করতে পারে না আর। সারা জীবন একের-পর-এক সব হারিয়ে যাওয়া মানুষকে এই কথা বললে অবশ্য বিশ্বাস করতে পারার কথাও না। তবে সারা জীবন ধরে হারালেও আজকের রাত আর দিনটা তার জন্যে একেবারে খারাপ না। সন্ধ্যার দিকে একবার ব্যর্থ হলেও সকাল হবার আগেই যা করতে চাচ্ছিল সে সেটা করার একটা সুযোগ পেয়ে গেছে। যদিও সে জানে এই সুযোগ কাজে লাগানোর মতন অবস্থায় সে এখনও আসতে পারেনি। এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে তার আরও ভাগ্যের সহায়তা লাগবে, সেই সাথে লাগবে কিছু মানুষের সাহায্য। আর তার মতো একটা লোকে সেই সাহায্য এত সহজে পাবে না এটা সে খুব ভালো করেই জানে। কাজেই তাকে নিজের পরিশ্রম আর ঝুঁকি নিয়ে কাজটা আদায় করে নিতে হবে, সেটা করতে হলে তাকে তাদের ভরসা অর্জন করতে হবে। আর সেটা করা যে সহজ হবে না, এটাও সে খুব ভালো করেই বুঝতে পারছে, আর মনে মনে প্রার্থনা করছে যেন আজ রাতের প্রথম প্রহরে ভাগ্য তাকে যেভাবে সহায়তা করেছে এইভাবে যেন এই ভাগ্য বজায় থাকে। অবশ্যই উপায় সে বের করবেই, করতে তাকে হবেই কারণ এটা তার পরিবারের বিষয় আর পরিবারের জন্যে সে সবই করতে পারে, আগেও করেছে, প্রয়োজনে আবারও করবে।
‘আহয়,’ বলে কেউ একজন চিৎকর করে উঠতেই নৌকা ঘাটে লাগল, সে দেখতে পেল ওদের নৌকার প্রায় কাছাকাছি চলে এসেছে। এমন সময় ঘাটে অনেক লোকের আগমনের শব্দ আর হই-হট্টগোল শুনতে পেয়ে খানিকটা চমকে উঠল। হচ্ছেটা কি ওইখানে, কোনো ঝামেলা না তো?
***
ঝামেলা তো নাই, উলটা সবকিছু অনেক বেশি শান্ত হয়ে গেছে সেনাপতি বাহরাম খাঁর আগমনে। সাধারণ লোকজন তো বটেই এমনকি মোঘল সৈনিকেরও তটস্থ হয়ে গেছে সেনাপতি বাহরাম খাঁর সামনে। আর সেই তটস্থ ভাবের জোরেই সবাই একরকম বলতে গেলে স্থির হয়ে গেছে যার যার জায়গাতে। মাসুম খুব সাবধানে যতটা সম্ভব কম নড়াচড়া করে মাথার পাগড়িটাকে আরেকটু কপালের ওপরে নামিয়ে আনল। সেই সাথে গলায় প্যাঁচানো পাগড়ির অংশটা খুব কৌশল করে পেঁচিয়ে দিলো মুখের ওপরে যতটা সম্ভব। বেশি প্যাঁচালে অবশ্য আরও বেশি চোখে পড়ে যাবার সম্ভাবনা তাই খুব বেশি প্যাঁচালো না সে। তবে আরেকটা কাজ করল, ধোবল ওর পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল। ইচ্ছে করেই খুব সতর্কতার সাথে সে খানিকটা সরে এলো ধোবলের একপাশে, যাতে ওর চেহারাটা সরাসরি দেখা না যায়। মাসুম সরে আসছে, মোঘল পাহারাদার ধমকে উঠল, ‘এই নড়িস না।’ মাসুম জায়গায় স্থির হয়ে গেল।
বাহরাম খাঁ ততক্ষণে চলে এসেছে ঘাটের একেবারে কাছাকাছি। এসেই সে প্রহরারত সৈনিকদের প্রধানের কাছে জানতে চাইল ওদের কাজ কেমন চলছে? সৈনিক প্রধান সতর্কতার সাথে বয়ান করতে লাগল সকাল থেকে কী কী ঘটেছে এবং এখন কাদেরকে নিরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। মাসুম মনোযোগ দিয়ে বাহরাম খাঁকে দেখছে। বাহরাম খাঁ বয়সে তার থেকে বেশ বড়ো হলেও তারা একই দলে কাজ করত একসময় একসাথে এবং সেইসূত্রে মাসুমের সাথে তার বেশ খারাপ সম্পর্ক ছিল। কারণ বাহরাম খাঁ সবসময় বাঙালিদেরকে দুর্বল আর অসহায় মনে করত, শারীরিকভাবে কম শক্তিশালীও। তাই সে মনে করত মাসুমের মতো চরিত্ররা মোঘল সেনাবাহিনীকে দুর্বল করে তুলছে। কিন্তু নিজে কাজের ক্ষেত্রে সবসময় বয়সে কম মাসুমের কাছে সবদিক থেকে পিছিয়ে থাকত, তাই তাদের ভেতরে একটা দুর্যোগের ঘনঘটা লেগেই থাকত সবসময়। মাসুম দেখল বিগত সময়ে বাহরাম খাঁ শরীরিকভাবে আগের চেয়ে ভারী হয়েছে দূর থেকে হলেও তার মুখে দুয়েকটা পাকা দাড়িও চোখে পড়ল মাসুমের। কিন্তু নির্দ্বিধায় তার শারীরিক ভাষা থেকে শুরু করে সবকিছুই আগের চেয়ে আরও উদ্ধত আর অহংকারী হয়েছে। মাসুম মনোযোগ দিয়ে বাহরাম খাঁকে দেখছিল হঠাৎ বাহরাম খাঁ একেবারে সরাসরি ওর দিকে ফিরে তাকাল, মুহূর্তের জন্যে মাসুম এতটাই চমকে উঠল আরেকটু হলে নড়ে উঠেছিল সে, কিন্তু বহুকষ্টে নিজেকে স্থির রাখল। আরও অবাক হয়ে দেখল বাহরাম খাঁ শুধু এদিকে তাকিয়েই নেই, সে নিজের একটা হাত তুলে এদিকেই ইশারা করছে। মাসুমের কলজেটা মুহূর্তের জন্যে একটা লাফ দিলো। পলকের জন্যে ওর হাত চলে গেল নিজের কোমরে লুকিয়ে রাখা ড্যাগারটাতে, কিন্তু স্বস্তির সাথে অনুভব করল ওরা আসলে ওদের দিকে তাকিয়ে নেই। ঘাটের পিছনে একটা বড়ো নৌকা আসছে মাল ভরতি করে। বাহরাম খাঁ তার সৈনিকদের নির্দেশ দিয়েছে ওটাকে ঘাটের এপাশে ভেড়ানোর জন্য। ওদেরকে আটকে রাখা সৈনিকেরা তাড়া দিলো ওদেরকে নৌকায় ওঠার জন্যে। স্বস্তির সাথে দ্রুত নৌকায় উঠতেই দাড় পড়ল পানিতে। কালীঘাটের মূল অংশ পার হয়ে এলো ওরা দ্রুততম সময়ে।
বাজার এলাকা পার হতেই মাথা থেকে পেঁচিয়ে রাখা কাপড়টা সরিয়ে বুক ভরে দম নিলো মাসুম।
‘উফফ জানে বাঁচছি, আরেকটু অইলে,’ মাসুম পেছন ফিরে দেখল ধোবল কথা বলছে। ও হেসে বলে উঠল, ‘যখন বাহরাম খাঁ আমগো দিকে ইশারা করল মুহূর্তের লাইগা মনে অইছিল আইজ গেছি।’
‘জি, হুজুর। ক্ষণিকের লাইগা আমিও ডরাই গেছিলাম,’ ভারী গলা শুনে সেদিকে ফিরে তাকিয়ে মাসুম দেখল মাঝির পাশ থেকে উঠে দাঁড়িয়ে ওদের দিকে এগিয়ে আসছে গেড়ুয়া। ‘হুজুর, কিছু মনে কইরেন না, আপনেরে একটা কথা জিগাই?’
মাসুম তার দিকে তাকিয়ে দেখল গেড়ুয়া তার লোকদেরকে ইশারা করতেই তারা বলতে গেলে ওদেরকে ঘিরে গোল হয়ে বসেছে। ‘আপনেরা আজকে অনেক সাহস দেখাইছেন,’ কথাটা বলতেই তার লোকেরা তালি দিয়ে উঠল মাসুম বরখা আর ধোবল খানিকটা অবাক হলেও যে মুহূর্তে বুঝতে পারল আসলে ওদেরকে সম্মান জানিয়ে তালি দিয়েছে সবাই খুশি হয়ে উঠল ওরা।
তালি দিয়ে একটা বাঁশের ধোঁয়া ভরতি নল এগিয়ে দিলো ওদের দিকে। ‘হুজুর, আজকে আপনেগো সম্মানে,’ মুহূর্তের জন্যে মাসুম ভাবল ফিরিয়ে দিবে, কিন্তু কী মনে করে নলটা হাতে নিয়ে ওটাতে দুটা টান দিলো সে, তারপর ওটা বাড়িয়ে দিলো বরখার দিকে। কালীঘাট পার হয়ে এসে পুরো নৌকার পরিবেশ বদলে গেছে। সবার ভেতরে একটা খুশি খুশি ভাব।
‘তোমারে এবং তুমগো সবাইরে ধন্যবাদ,’ মাসুম কথাটা আন্তরিকভাবেই বলে উঠল। ‘তুমি কিছু একটা জানতে চাইতেছিলা?’
‘হুজুর,’ গেড়ুয়া মাসুমের দিকে তাকিয়ে তার সুরমা লাগানো কালো চোখের মণিজোড়া স্থির করে বলে উঠল। ‘ওইখানে দেখলাম আপনে মোঘল সেনাপতির দিকে কঠিন নজরে তাকায়া ছিলেন, আপনেগো কি পুরানা শত্রুতা আছে?’
মাসুম আনমনে মাথা নাড়ল। ছেলেটাকে সে যা ভেবেছিল সে তারচেয়ে বেশি চালাক। ‘মোঘল বাহিনীতে আমরা একই দলে ছিলাম সেই সময় থেইকাই আমগো ভিতরে-’ বাক্যটা শেষ না করে সে মাথা নাড়ল। ‘আচ্ছা, এখন আমরা কোনো জায়গায় যাব?’ মাসুম শেষ অংশটুকে গেড়ুয়াকে উদ্দেশ্য করে জিজ্ঞেস করেছে।
কিন্তু সেই কথার কোনো জবাব না দিয়ে গেড়ুয়া খুশি খুশি ভাবে তালি দিয়ে বলে উঠল, ‘হুজুর, আপনে মোঘল বাহিনীতে ছিলেন? আমি জানতাম আপনে যোদ্ধা, মোঘল বাহিনীতে ছিলেন জানতাম না,’ বলে সে নিজের লোকদের দিকে ফিরে বলে উঠল, ‘হুজুর, মোঘল বাহিনীর যোদ্ধা আছিল।’ নৌকার প্রায় সবাই মিলে ‘কাররা’
‘কাররা’ বলে উঠল। মাসুম ঠিক বুঝতে পারল না এটা কি সম্মানসুচক করল কি না ওরা।
হুজুর, আপনেরা মহান,’ বলে সে সামান্য মাথা নেড়ে ধোবল আর বরখাকে দেখিয়ে বলে উঠল, ‘আর আপনের বন্ধুরা হেরাও কী যোদ্ধা?’
‘হুম,’ আলোচনাটা কোনোদিকে যাচ্ছে মাসুম ঠিক বুঝতে পারছে না। ‘আচ্ছা আমরা এখন কোনোদিকে যাব তুমি ঠিক কইরা কওনাই সেইটা।’
গেড়ুয়া ঢুলু ঢুলু চোখে ওর দিকে তাকিয়ে কী জানি বলছিল বিড়বিড় করে, মাসুম আবারও একই প্রশ্ন করল। হঠাৎ সে একেবারে স্বাভাবিকভাবে কথা বলে উঠল। ‘দুঃখিত হুজুর, দেবীর মন্ত্র পড়তেছিলাম। কাজে যাওনের আগে আমরা সবসময় পড়ি। বলে সে যোগ করল, হুজুর, আমরা কালীঘাট থেইকা কয়েক মাইল সইরা আসছি। আর আধ মাইলের মতো আগাইলে জল-জঙ্গলের শুরু, সেইখানে জঙ্গল আর জলপথের শুরুর মুহে অপনেগো নামায়া দেওয়ার নির্দেশ আছে। ওইখানেই রসুল খাঁর লোক থাহার কথা। সেই আপনেগো সব দিব। আমগো উপরে নির্দেশ আছে হের লগে আপনেগো দেখা করায়া বিদায় নেওয়ার, খাড়ান মাঝিরে বলি,’ বলে সে মাসুমের পাশ থেকে উঠে যাচ্ছিল, মাসুম বরখার দিকে ফিরে কিছু একটা বলতে যাবে, হঠাৎ সেই পুরনো তেলের গন্ধটা আবারও প্রকট হয়ে লাগল ওর নাকে। কীসের গন্ধ চিনতে না পেরে পুরনো অস্বস্তিটা আবারও ফিরে এলো ওর ভেতরে। নাক কুঁচকে গন্ধটা নিতে গিয়ে আবারও বরখাকে কিছু একটা বলবে, হঠাৎ নৌকার পাটাতনে শক্ত কিছু দিয়ে কেউ একজন আঘাত করল, একবার, দুবার, তিনবার।
ব্যাপার কী? বেশ অবাক হয়ে সেদিকে ফিরে তাকিয়ে কিছু দেখতে পেল না মাসুম। সে গেড়ুয়ার দিকে তাকিয়ে তাকেও সেখানে দেখতে পেল না। ঠিক একটু আগেও সেখানে ছিল লোকটা।
চট করে ওর মাথার ভেতরে একটা সতর্কবার্তা বেজে উঠল, ‘বরখা,’ নামটা উচ্চারণ করেই সে ওর দিকে ফেরার সাথে সাথে দেখল বিচিত্র কায়দায় বরখা আর ধোবল দুজনের গলায় পরিয়ে দেওয়া হয়েছে একটা ফাঁস, শুধু ফাঁস পরানোই হয়নি, যে ফাঁস পরিয়ে সে ওদের বুকের ওপরে একটা পা তুলে দিয়ে ফাঁসটা দিয়ে সামনে টানছে আর ওদের ঘাড়ের পেছনে আটকে দেওয়া হয়েছে একটা কুঠারের ফলা। দুটোর বিপরীতমুখী টানে দুজনেরই প্রায় জিভ বেরিয়ে আসার দশা। ক্ষণিকের জন্যে মাসুমের মাথা কাজ না করেলো না। কিন্তু পরমুহূর্তে একজন যোদ্ধা হিসেবে সে বুঝতে পারল কী ঘটতে চলেছে! নিজের হাতটাকে ড্যাগারের দিকে এগোবে শক্তিশালী একটা হাত চট করে ওর হাতটা ধরে ফেলল, সেটাকে ছাড়িয়ে নেওয়ার আগেই খুব আলতো করে যেন ওর গলায় পরিয়ে দিলো কিছু একটা। মাথা ঝাঁকিয়ে সেটা সরাতে যাবে, তার আগেই ওর হাতে টান পড়ল সেইসঙ্গে শক্ত কিছু একটা ঠেলা দিলো মেরুদণ্ডের ওপরে, আর কানের কাছে সেই পুরনো গলা ফিসফিস করে বলে উঠল, ‘হুজুর, আপনেরে আমার ভালো লাইগা গেছে কিন্তু লইড়েন না, লড়লেই আপনের পিঠের হাড্ডিটা দুই টুকরা কইরা দিব,’ মাসুম আড়চোখে দেখল গেড়ুয়ার চাচা পরিচয়ধারী লোকটা ওর ঠিক মেরুদণ্ডের সংযোগ স্থলে কুঠারটা ঠেকিয়ে রেখেছে, আর ওর গলায় ফাঁস পরিয়ে দিয়েছে আরেকজন।
‘হুজুর, আপনেগো লাইগা আমার মনে অনেক সম্মান,’ যেন খুব দুঃখ পাচ্ছে এমন সুরে বলে উঠল গেড়ুয়া। কিন্তু কী করব বলেন, আমরা হইলাম জাতে পাঙ্গু, দেবীর লাইগা ভেট না দিলে চলবে ক্যামনে। আর দেবী মাতার পিপাসা বুজানোর লাইগা যোদ্ধা রক্তের চেয়ে মজার আর কিছু হইতে পারে, বলেন,’ সে কথা শেষ করতেই নৌকায় উপস্থিত তার সব সঙ্গীরা ‘কাররা’
‘কাররা’ করে রব তুলল। এই অসহায় অবস্থায়ও মাসুম গলার ফাঁসের টানে ব্যথার চোটে চোখে পানি নিয়ে ধোবল আর বরখার দিকে তাকিয়ে দেখল ওদেরও একই অবস্থা।
মানুষ উত্তপ্ত কড়াই থেকে জ্বলন্ত চুলায় পড়ে, ওরা পড়ে গেছে একেবারে গলন্ত লাভার ভেতরে।
