পূর্বকথা
গল্পের শুরু
প্রথম অংশ: কল্পযাত্রা
দ্বিতীয় অংশ : সত্যাভিযান

রাজদ্রোহী – ৮

অধ্যায় আট

বর্তমান সময়

পিবিআই অফিস, ধানমন্ডি

.

সাহস করেই কামরাটায় ঢুকে বাশারের নাকটা কুঁচকে উঠল।

পিবিআইয়ের স্পেশাল উইংয়ের প্রধানের কামরার ভেতরে প্রবেশ করতেই দুই ধরনের গন্ধ এসে নাকে বাড়ি মারল বাশারের। সাথে সাথে ভ্রু কুঁচকে উঠল ওর। কারণ দুটো গন্ধই বেশ অদ্ভুত এবং এর ভেতরে একটা গন্ধ সে ভালোভাবেই চিনতে পেরেছে। কড়া জর্দার গন্ধ, বিশেষভাবে বলতে গেলে হাকিমপুরি মিক্সার জর্দার গন্ধ। আজব অবস্থা! এমন সফিসটিকেটেড অফিসে পান খায় কে? কথাটা মনে মনে উচ্চারণ করেই সে সামনে ফিরে তাকাল।

প্রথমেই চোখে পড়ল কামরার বিরাট জানালাটা। ঠিক কোনদিকে অবস্থিত সেটা ঠাওর করতে না পারলেও বাশার অনুমান করে নিলো জানালাটা দক্ষিণ দিকেই হবে। জানালার সামনে একটা চেয়ারে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মধ্যম উচ্চতার হ্যাংলা-পাতলা সুদর্শন একজন মানুষ। মাথায় ধূসর চুল, মুখে পালিশ করা কাঁচা-পাকা দাড়ি, পরনে ফরম্যাল ব্রাউন ট্রাউজারের ওপরে সাদা সিল্কের শার্ট আর তার ওপরে ভেস্ট। সাদা শার্টের সাথে কনট্রাস্ট ম্যাচিং করা ব্রাউন টাই। মানুষটা সামান্য বাঁকা হয়ে চেয়ারে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে কারও সাথে কথা বলছিল, হাতে সিগারেটের চেয়ে সরু খয়েরি রংয়ের একটা সিগার, সেটা থেকে নীলচে ধোঁয়া উঠছে। বাশার এবার ধরতে পারল দ্বিতীয় গন্ধের উৎস তাহলে এই সিগার। এই গন্ধটা নির্দ্বিধায় জর্দার গন্ধের চেয়ে অনেক ভালো।

স্যার, ইন্সপেক্টর আহমেদ বাশার,’ মৌসুমি ডেস্কের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলে উঠল। ‘বাশার, হাবিব আনোয়ার পাশা স্যার।’

বাশার ডেস্কের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে হাবিব আনোয়ার পাশা হেলান দেওয়া থেকে সোজা হয়ে স্মার্ট ভঙ্গিতে ডান হাতে ধরা সিগারটা বাঁহাতে চালান করে দিয়ে ডান হাতটা ওর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে উঠল, ‘ওয়েলকাম মাই বয়, আমি আমজাদের কাছে তোমার কথা অনেক শুনেছি।’

বাশার শুকনো শক্তিশালী হাতটা ধরতেই জোরে একটা ঝঁকি দিলো হাবিব আনোয়ার পাশা। মানুষটার বয়স হবে ষাটের আশপাশে অনুমান করল বাশার কিন্তু সেই হিসেবে তার হাতের জোর বেশ অবাক করার মতোই। ও নিজেও মৃদু ঝাঁকি দিয়ে সামান্য হেসে বলে উঠল, ‘থ্যাংক ইউ, স্যার, আসলে আমিও আপনার কথা এতবার শুনেছি,’ সে নিজে যে হাবিব আনোয়ার পাশার একজন ফ্যান সেটা বলতে গিয়েও বেশ দ্বিধা বোধ করাতে কথাটা আর বলল না। ‘স্যার, অনেক ধন্যবাদ যে আপনি স্পেশাল টিমের একজন হিসেবে আমার কথা ভেবেছেন স্যার। আমি সত্যি অনারড।’  

হাবিব আনোয়ার পাশা নিজের রিভলভিং চেয়ারটাকে টেনে নিয়ে সেটাতে বসতে বসতে সিগারে দুটো টান দিয়ে সেটা অ্যাশট্রের ওপরে রেখে দিলো ‘আসলে এইক্ষেত্রে আমার চেয়ে তোমার বস এসপি আমজাদ আনোয়ার আর আমার স্পেশাল এজেন্ট তানভীর মালিকের ভূমিকা বেশি। সিলেটে হাসপাতালে বসে তোমার ফাইল পড়ে ও-ই তোমাকে রিকমেন্ড করেছে। বিশেষ করে টুইন কালীর কেসটাতে তুমি বেশ ভালো কাজ দেখিয়েছ, বলতেই হবে। এরকম একটা কেস সলভ করা মুখের কথা না। তাও তোমার ক্যারিয়ারের যে পর্যায়ে তুমি ওই ধরনের ঝুঁকি নিয়েছ সেটা বেশ প্রশংসার দাবি রাখে,’ বলে সে নিজের মুখটাকে বাশারের দিকে খানিকটা এগিয়ে বলে উঠল। ‘শোনো, বাশার, যেটা প্রশংসা করার মতো বিষয় সেটার প্রশংসা করতে আমার কোনো দ্বিধা নেই, তবে ব্যর্থতার ক্ষেত্রে উলটোটও ঠিক,’ মুহূর্তের জন্যে মানুষটার চোখের ভাষা যেন একেবারে বদলে গেল, সাথে সাথে বাশার অনুভব করতে পারল কেন মানুষটাকে বাংলাদেশের আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার ভেতরে লিজেন্ড বলে ভাবা হয়। মানুষটার হাসিখুশি প্রফুল্ল ব্যক্তিত্বের ভেতরে যে অত্যন্ত শক্তিশালী আর কঠোর একজন মানুষ আছে, সেটা বলতে কোনো দ্বিধা নেই।

‘জি স্যার,’ বাশার শুধু এটুকু বলল।

‘মৌসুমি আমাদেরকে কফি দাও, তোমার ওই স্পেশাল কফি, বাশার নতুন এসেছে; ওর জন্যে স্পেশাল কফিই দরকার আজকে,’ বলে সে টেবিলের অন্যপাশের দিকে তাকাল। ‘পাটোয়ারি, তুমি কফি খাবে?’ হাবিব আনোয়ার পাশা কথাটা যাকে উদ্দেশ্য করে বলেছে, তাকে এই প্রথমবারের মতো খেয়াল করল বাশার। টেবিলের অন্যপাশের বিরাট কুশনের চেয়ারটাতে মানুষটা এমনভাবে বসে আছে তাকে খেয়ালই করেনি ও। দেখার পর ভালোভাবে খেয়াল করে খানিকটা অবাক হলো ও সেই সাথে স্বস্তিও পেল। অবাক হবার কারণ ঢিলা শার্ট আর পুরনো গোল টুপিপরা ছাগুলে দাড়িওয়ালা মানুষটাকে কোনো এক অদ্ভুত কারণে কেন জানি বেশ বেমানান লাগছে এখানে, আর স্বস্তির কারণ হলো মানুষটাকে জাবর কাটার মতো মুখ নাড়তে দেখে রুমে প্রবেশকরা মাত্রই পাওয়া জর্দার গন্ধের রহস্যের সমাধান করতে পারল ও। এই মানুষটাই পান খাচ্ছে এবং জর্দার গন্ধটাও তার কাছ থেকেই আসছে।

‘নাহ, তুমগো ওই কফি-টফি আমার পুষায় না, আমি আরেকটা পান খামু, মানুষটা মুখ খোলামাত্রই তার চল ভাষায় শোনা কথাগুলো আরও অবাক হয়ে গেল বাশার। কিন্তু মানুষটার অন্য কোনোদিকে খেয়াল নেই, সে তার সামনে ডেস্কের ওপরে রাখা স্টিলের পানের কেস থেকে একটা খিলিপান বের করে আয়েশ করে সেটাকে মুখে পুরে দিয়ে সরাসরি ফিরে তাকাল বাশারের দিকে। বাশার তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসি দিতে যাচ্ছিল লোকটার করা প্রশ্ন শুনে সে বেশ থতমত খেয়ে গেল।

‘ওই পোলা তোমার হাতে মাইয়াগো আংটি ক্যান?’ প্রশ্নটা এমনভাবে উচ্চারণ করল আর এমনভাবে সে সরাসরি তাকিয়ে আছে বাশারের দিকে, মুহূর্তের জন্যে ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেল সে। আমতা আমতা করে জবাব দিতে যাচ্ছিল কিন্তু সে মুখ খোলার আগেই আবারও মানুষটা বলে উঠল। ‘আংটিটা তোমার মায়ের, তাই না?’ এবার তার গলার স্বর যেন অনেকটাই বদলে গেছে। একেবারে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সে বাশারের দিকে। ‘মৃত মায়ের স্মৃতি তাই না?’

বাশার আর যাই হোক এমন কিছু আন্দাজ করতে পারেনি। সে অবাক তো হলোই কেমন জানি বোকা বোকা অনুভব হতে লাগল ওর। ক্ষণিকের জন্যে সে কেন জানি দিশেহারা বোধ করল। ‘ইয়ে জি, এক্সকিউজ মি,’ বলে সে হাবিব আনোয়ার পাশার দিকে ফিরে তাকাল। ‘স্যার-’ কিন্তু সে কথা শেষ করার আগে হাবিব আনোয়ার পাশাই কথা বলে উঠল, সে একেবারে ভিন্ন প্রসঙ্গে কথা বলে উঠল। ‘আমি এক্সট্রিমলি সরি, পাটোয়ারির সাথে তোমাকে পরিচয় করাতে ভুলে গেছি। ও হলো আলীম পাটোয়ারি, ডক্টর আলীম পাটোয়ারি। ও হলো আমাদের স্পেশাল উইংয়ের রিসোর্স ও রিসার্চ সেকশনের হেড। ওর দায়িত্বেই সবগুলো ফরেনসিক ল্যাব বানানো হচ্ছে তুমি হয়তো ডক্টর মনিকার নাম শুনেছ। ডক্টর মনিকা পাটোয়ারির আন্ডারেই কাজ করছে।’

হাবিব আনোয়ার পাশার শেষ কথাটা শুনে বাশার বেশ অবাক হলো। স্ট্যানফোর্ড গ্র্যাজুয়েট ডক্টর মনিকা এই লোকের অধীনে কাজ করে, ব্যাপারটাকে ঠিক মেলাতে পারল না ও। তবে লোকটা যেভাবে কথা বলেছে এবং যে প্ৰসঙ্গে কথাটা বলেছে তাতে বাশার এটা বুঝতে পেরেছে লোকটাকে দেখে তার ব্যাপারে আন্দাজ করে নিলে ভুল হবে। যেমন এই মুহর্তে পান মুখে দিয়ে চেয়ারে হেলান দিয়ে সে চোখ বন্ধ করে আরাম করে পান চিবুচ্ছে। ‘পাটোয়ারি, তুমি তো বাশারকে চেনোই।’

হাবিব আনোয়ার পাশা পাটোয়ারির সাথে কথা বলিয়ে দেওয়াতে বাশার কিছু বলবে কি না ঠিক সেটা ভেবে বের করার আগে পাটোয়ারিই হাত নেড়ে বলে উঠল। ‘হাবিব, কাজের কথা শুরু করো।’

‘ওহ, ইয়েস,’ বলে সে ডেস্কের পেছন দিকে দেখাল। ‘ওই যে কফি চলে এসেছে,’ মৌসুমি একটা কাপ প্রথমে হাবিব আনোয়ার পাশার সামনে রাখল, তারপর বাশারকে একটা কাপ ধরিয়ে দিয়ে নিজেও তৃতীয় কাপটা নিয়ে বসে গেল একটা চেয়ার টেনে। এই ব্যাপারটা বাশারের কাছে বেশ ভালো লাগল। এতটা ক্যাজুয়াল কিন্তু এক্সেপ্টেড পরিবেশ সে এর আগে কোনো সরকারি অফিসে পায়নি।

যাক ভালো করেছ, আমি বলতে চাচ্ছিলাম তোমার জন্যে কফি নিয়ে আসতে, এনে ভালো করছ কারণ এখন বেশিরভাগ কাজ তোমার আর পাটোয়ারিরই। আমি জাস্ট ইনপুট দিব। তুমি বাশারকে কতটা বলেছ?’

‘স্যার, আমি আমাদের স্পেশাল উইংয়ের শুরু এবং তানভীর আর বাশারের অপারেশনের ব্যাপারে বলেছি। সেই সাথে প্রজেক্ট আলফা এমের ব্যাপারটাও ইনট্রোডিউস করেছি।’

‘তার মানে বর্তমান পরিস্থিতি এবং কারেন্ট কেসের ব্যাপারটা—’

‘না, স্যার। আমরা ওই পর্যন্ত আলোচনা করতে পারিনি, আমি কি আবার ওখান থেকে শুরু করবো?’ বলে সে আনোয়ার পাশার অনুমতি প্রার্থনা করল। আনোয়ার পাশা কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে সিগারে আরও দুবার টান দিয়ে বলে উঠল, ‘নাহ, তুমি কফি এনজয় করো, যখন বলার প্রয়োজন হবে আমি জানাবো তোমাকে। আপাতত আমিই ব্রিফ করছি বাশারকে,’ বলে সে বাশারের দিকে ফিরে তাকাল। ‘শোনো, বাশার, তুমি তো স্পেশাল উইংয়ের ব্যাপারটা শুনেছই, আসলে দীর্ঘদিন যাবৎই আমি স্বপ্ন দেখছিলাম স্পেশাল কেস নিয়ে কাজ করতে সক্ষম একেবারে স্বাধীন আর দক্ষ একটা স্পেশাল উইং গড়ে তোলার, যারা অনেকটা এলিট ফোর্সের মতো ইনভেস্টিগেটর হিসেবে কাজ করবে শুধুমাত্র স্পেশাল কেস নিয়ে। এই স্বপ্ন দেখছি আমি আজ বহু বছর ধরে। একটা সময় ছিল যখন আমার নিজেকে প্রমাণ করতে হতো। বেশ কয়েক বছর আগে গাজীপুরের একটা কেসে সেটা করতে পারার পর, আমি বিশেষ পারমিশন নিয়ে এই স্পেশাল উইংয়ের কাজ শুরু করি। এর অংশ হিসেবেই সারা দেশে স্পেশাল ফরেনসিক ল্যাবের কাজ চলছে। পাটোয়ারিকেও আমি আমার টিমে নিয়েছি। এই স্পেশাল উইংয়ের একটা বড়ো চ্যালেঞ্জ ছিল এর জন্যে এজেন্ট খুঁজে বের করা। আর এর জন্যে আমি যখন শারিয়ার আর তানভীরকে বেছে নিলাম সবাই হেসেছিল কিন্তু ওরা নিজেদেরকে দারুণভাবে প্রমাণ করতে পেরেছে এবং এমন সব কেসের কাজ করেছে বলতে গেলে প্র্যাকটিক্যালি অসম্ভব ছিল। আমার একটাই প্রাথমিক ভিশন ছিল স্পেশাল উইং স্পেশাল কাজে পারদর্শী সেটা প্রমাণ করা। সেটা প্রমাণ তো হয়েছেই-আমরা এমন ধরনের আর এমন সব কাজ পেয়েছি, যা বলতে গেলে আমাদের রিসোর্স এবং আয়ত্তের চেয়ে বড়ো হয়ে গেছে এবং পরিস্থিতি হয়ে গেছে অনেক ঘোলাটে।’

‘হাবিব, তোমার বয়স হয়া যাচ্ছে, এইটা বুঝতে পারতাছ?’ টেবিলের আরেকপাশ থেকে পাটোয়ারি ধীরে ধীরে মৃদু স্বরে কথাগুলো বলে উঠল। বাশার তাকিয়ে দেখল তার দুই চোখ এখনও বন্ধ, এখনও সে হেলান দিয়ে পান চিবুচ্ছে। ‘নেতাগো মতো সমানে কথা বলতাছো, কাজের কথা বাদে।’

পাটোয়ারির কথা শুনে বাশারের মুখে প্রায় হাসি চলে এসেছিল কোনোমতে নিজেকে সামলে নিলো সে। মৌসুমির দিকে তাকিয়ে দেখল তারও একই অবস্থা। সে মনোযোগ দিয়ে কফি পান করার ভাব দেখাচ্ছে। কিন্তু বাশার অবাক হয়ে গেল হাবিব আনোয়ার পাশাকে দেখে। মানুষটা মোটেও বিব্রত বোধ করছে না, বরং মৃদু হেসে বলে উঠল, ‘হুম, আমারও ইদানীং তাই মনে হয়; শুধু কথাই বেশি বলি না, মাঝে মাঝে ভাবিও বেশি। যাই হোক, আমি বর্তমান পরিস্থিতি আর কেসের ব্যাপারে বলি। তানভীর আর শারিয়ারের কেসের ব্যাপার তো তুমি জেনেছি, সেই সাথে রেলিক এবং নেক্রপলিসের ব্যাপারেও। একটা অদ্ভুত ব্যাপার হলো—এই অর্গানাইজেশনগুলো আমাদের এখানে এভাবে এতদিন ধরে অপারেট করছে এটা তো আমরা জানতামই না, সবচেয়ে বড়ো কথা, এদের বড়ো বড়ো সব এজেন্টদের অ্যাক্টিভিটি। আমরা ওদের ব্যাপারে কিছুই জানি না-অথচ ওরা আমাদের ব্যাপারে প্রায় সব জানে। আমাদের কাছে আমাদের শত্রুরা অদৃশ্য কিন্তু আমরা ওদের কাছে খোলা বইয়ের মতো।’

‘আর অন্যটা, স্যার?’ বাশার জানতে চাইল।

‘দ্বিতীয় কথা হলো ওদের সার্বিক উপস্থিতি এবং অ্যাক্টিভিটি খুব বড়ো কিছুর আভাস দিচ্ছে?’ বাশারের মনে হলো হাবিব আনোয়ার পাশা যেন চিন্তিত ভঙ্গিতে বলে উঠল কথাটা।

‘স্যার, আমি ঠিক বুঝলাম না,’ বলে বাশার এক মুহূর্তের জন্যে মৌসুমিকে দেখে নিলো। সে-ও কফি শেষ করে মনোযোগের সাথে হাবিব আনোয়ার পাশার কথা শুনছে।

বুঝিয়ে বলছি, প্রথমে সিলেটে ওদের পুরনো বুদ্ধ মূর্তি নিয়ে এত বড়ো একটা ঝামেলা, এরপরে ময়মনসিংহের ঘটনা,’ হাবিব আনোয়ার পাশার এই কথা শুনে বাশার ভ্রু কুঁচকে তাকাল কিন্তু কোনো প্রশ্ন করল না। ‘এরপরে চট্টগ্রামে একজন বিখ্যাত প্রফেসরের সাথে এদের সংযোগ খুব বড়ো কিছুই আভাস দেয়।’

‘স্যার, ময়মনসিংহের ব্যাপার মানে?’ বাশার জানতে চাইল।

‘তুমি বলোনি ওকে?’ আনোয়ার পাশা মৌসুমির দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করতেই সে মাথা নেড়ে জানাল সে কিছু বলেনি। ‘ময়মনসিংহে কালী মূর্তির ব্যাপারটাতেও রেলিক এবং নেক্রপলিসের সংযোগ আছে বলে ধারণা করছি আমরা। এখনও একদম সলিড প্রমাণ না পেলেও যাকে তুমি গ্রেপ্তার করেছ ময়মনসিংহে তার সাথে অবশ্যই এদের কারও সংযোগ থাকার সম্ভাবনা আছে। তোমাকে স্পেশাল উইংয়ে ডেকে পাঠানোর পেছনে এটাও একটা কারণ।’

আচ্ছা, এই তাহলে ঘটনা মনে মনে বলে উঠল বাশার। ‘স্যার, আপনি বড়ো কিছু বলতে আসলে কী বুঝাচ্ছেন?’ বাশার চেয়ারে নড়েচড়ে বসল। এতক্ষণে সে নিজেকে কেসের সাথে কানেক্ট করতে সক্ষম হচ্ছে।

‘রেলিক এবং নেক্রপলিসের ব্যাপারে কি তুমি কিছু জানো?’ আনোয়ার পাশা জানতে চাইতেই মাথা নেড়ে জবাব দিলো বাশার। ‘না, স্যার, খুব আবছাভাবে জানি এরা অ্যান্টিক চোরাচালানি বা এরকম কোনো সংগঠন।’

‘অ্যান্টিক আসলে ওদের একটা অংশমাত্র। রেলিক আর নেক্রপলিস হলো ইন্টারপোলের লিস্টেড সবচেয়ে কুখ্যাত অ্যান্টিক চোরাচালানি, বিক্রি এবং ম্যানুপুলেটিভ দুটো সংগঠন। অনেকে বলে এরা আসলে একই সংগঠনের দুটো রূপ। মানে সিস্টার অর্গানাইজেশন। আবার অনেকে বলে এরা আলাদা। আমরা এখন পর্যন্ত যা জেনেছি এবং টের পেয়েছি তাতে মনে হয়েছে এরা আসলে সিস্টার কনসার্নই। আসলে শুধু অ্যান্টিক বললে কম বলা হয়, পুরো পৃথিবীতে অ্যান্টিকের ব্যাবসা বিলিয়ন ডলারের ব্যাবসা। এর ভেতরে এরা একটা বড়ো চাঁই নিয়ে বসে আছে। এরা এতটাই শক্তিশালী যে এরা অ্যান্টিক নিয়ে এদিক-সেদিক করতে গিয়ে একটা দেশের সরকার নামিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।’

আনোয়ার পাশার শেষ কথাটা শুনে ভ্রু কুঁচকে উঠল বাশারের। তাই নাকি, স্যার? কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো চায়না, নেপাল, থাইল্যান্ড এমনকি ইন্ডিয়াও বুঝলাম; ওদের দেশের পুরনো স্থাপনা অ্যান্টিক ইতাদিতে এরা অনেক রিচ। বাংলাদেশে তো না অ্যান্টিকের তেমন কোনো কারবারই নেই,’ বলে সে কাঁধ ঝাঁকাল। ‘আমি বেশি কিছু জানি না অবশ্য।’

‘আমারও কনসার্ন এখানেই। আমাদের দেশে এরা এত অ্যাকটিভ কেন হলো এবং একটা ব্যাপার খেয়াল করো, এরা কিছুদিন যাবৎ অ্যাক্টিভ হবার পরেই একদিকে অমূল্য টুইন কালী, অন্যদিকে অমূল্য ব্ল্যাক বুদ্ধা আবিষ্কার করে বসে আছে। আর চট্টগ্রামে যা ঘটেছে তাতে মনে হচ্ছে ওখানে ওরা যেটার পেছনে লেগেছিল সেটার খোঁজ পেলে এগুলো স্রেফ রাস্তার পাশের সস্তা খেলনা মনে হবে।’

‘মানে, স্যার?’ বাশার দারুণ আগ্রহ বোধ করতে শুরু করেছে।

হাবিব আনোয়ার পাশা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে সিগারটা হাতে নিয়ে নিলো। জানালার পাশে গিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে সিগারে দুটো টান দিয়ে সে অনেকটা যেন আনমনেই বলে উঠল কথাগুলো। ‘আমরা এখনও সরাসরি কিছুই জানি না। কিন্তু চট্টগ্রামে শারিয়ার যে কেসটা সলভ করেছে সেটা থেকে এটা বেশ পরিষ্কার বোঝা গেছে প্রফেসর আবদেল এবং তার সাথের আরও বেশ কয়েকজন মিলে ইতিহাসের বেশ বড়ো কোনো একটা রহস্যের সমাধান করতে পেরেছিলেন কিংবা বলা যায় রহস্যটা সমাধান করার একেবারে দ্বারপ্রান্তে ছিলেন। কিন্তু কোনো একটা কারণে একটা পর্যায়ে অথরিটির সাথে তার বা তাদের কোনো একটা ঝামেলা হয় এবং হয় তারা রেলিক কিংবা নেক্রপলিসের সাথে যোগদান করেন কিংবা তারা তাদের পেছনে লাগে এবং তারা একবাক্যে বলতে গেলে লোকচক্ষুর অন্তরালে সরে পড়ে। প্রফেসর আবদেল পালিয়ে চট্টগ্রামে চলে যান, সেখানে তিনি একটা বাড়ির বেইজমেন্টে লুকিয়ে নিজের গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। এরপর একটা পর্যায়ে বাইরে বেরিয়ে অ্যাক্সিডেন্টে মারা পড়েন এবং সেখান থেকে রেলিক আর নেক্রপলিসের সাথে আমাদের ধাওয়া-পালটা ধাওয়া চলতে চলতে এক পর্যায়ে শারিয়ার তার মৃত্যু রহস্য উদঘাটন করতে সমর্থ হয় এবং মিস্টার ইউ নামে নেক্রপলিসের বড়ো মাপের একজন হর্তকর্তা ধরা পড়ে এবং প্রফেসর আবদেলের কাছের একজনও ধরা পড়ে। তারচেয়ে বড়ো কথা শারিয়ার আর টিম মিলে রহস্য সমাধানের খুব কাছাকাছি গেলেও পুরো ব্যাপারটা ধরতে পারেনি।’

‘বিষয়টা কী?’ বাশার জানতে চাইল।

‘স্যার, আমি বলব?’ প্রশ্নটা করে আনোয়ার পাশার কাছে অনুমতি চাইতে সে মাথা নেড়ে সায় জানাতে মৌসুমি বলতে শুরু করল।

‘ওরা চট্টগ্রামের পুরনো ইতিহাসের সাথে সংযুক্ত এক অদ্ভুত রহস্যের খোঁজ পায় যেটা নিয়ে প্রফেসর আবদেল গবেষণা করছিলেন। ওরা প্রফেসর আবদেলের রেখে যাওয়া ব্লু ধরে ধরে বিষয়টার শেষ পর্যন্ত গিয়ে জানতে পারে: প্রফেসর আবদেল যে-ব্লুগুলো রেখে গেছিলেন সেগুলো পুরোটাই ছিল সাজানো। সম্ভবত ভুল লোকের হাতে যেন না পড়ে কিংবা সম্ভাব্য অনুসরণকারীদের বিপথে পরিচালিত করার জন্যেই এই আয়োজন করেছিলেন তিনি। কিন্তু মূল জিনিসের ব্লু তিনি রেখে গেছিলেন একটা মাইক্রোচিপের ভেতরে। সেটা আমাদের হাতে পড়েছে।’

‘কিন্তু পুরো জিনিসটাই বিচিত্র ধাঁধা আর রহস্যের জাল আর কোডে সাজানো, আমরা এরকম একটা ব্যাপার আন্দাজ করছি এই ঘটনার সাথে মোঘলদের রেখে যাওয়া পুরনো কোনো বিষয়ের সংযোগ আছে। সম্ভবত মোঘল রাজপুত্র এবং সুবাদার শাহসুজা আরাকানে পালিয়ে যাবার সময়ে সে কিছু একটা রেখে গেছে বাংলার বুকে। যেটাই তারা খুঁজে বের করার চেষ্টা করছিল।’

‘সর্বনাশ!’ আনমনেই কথাটা বেরিয়ে গেল। ‘হারিয়ে যাওয়া মোঘল গুপ্তধন, ‘ এই জন্যেই আনোয়ার পাশা বাকিগুলোর চেয়ে এটা অনেক বেশি মূল্যবান এই কথাটা বলেছিল। রেলিক এবং নেক্রপলিস কেন এত হন্যে হয়ে লেগেছে এর পেছনে সেটাও খানিকটা আন্দাজ করতে পারছে সে। কিন্তু এরপরের যে-কথাটা শুনলো সেটাতে খানিকটা চুপসে গেল সে।

‘গুপ্তধন,’ বলে আনমনেই একবার কাঁধ ঝাঁকাল আনোয়ার পাশা। ‘কে জানে হতে পারে, নাও পারে। আমরা আসলে কিছুই বুঝতে পারছি না। শুধু এটা বুঝতে পারছি গুপ্তধন কিংবা অন্যকিছু, তবে যেটাই হোক সেটা অনেক বড়ো কিছু। আর সেটার এমন এক জায়গায় আমরা আটকে গেছি যার কিছুই বুঝতে পারছি না আমরা।’

আর এইসব সমাধার করনের লাইগ্যা একটাই উপায় আছে, যেই কারণে তুমারে এইহানে ডাকা অইছে,’ অনেকক্ষণ পরে আলীম পাটোয়ারি কথা বলে উঠল। ‘যেইখানে যাই ঘটতাছে আর যাই করা অইতাছে তার পুরা জট খোলনের লাইগ্যা একটাই উপায় সেইটা হইল রাজদ্রোহীর রহস্য সমাধান করা। আর সেইটা আমগো পক্ষে কোনোভাবেই করা সম্ভব অইতাছে না,’ বলে সে নাটকীয়ভাবে থামল। একদৃষ্টিতে সে তাকিয়ে আছে বাশারের দিকে। বাশারের মনে হলো মানুষটা আসলে মনোযোগ দিয়ে পরখ করছে ওর প্রতিক্রিয়া। ‘যদি না আমরা একটা কাজ করতে পারি।’

‘কী সেটা?’ বাশার উত্তেজিত ভঙ্গিতে নিজের হাতের আঙুলে পরা আংটিটা ধরে মোচড়াতে মোচড়াতে জানতে চাইল।

‘প্রফেসর আবদেলের একজর পার্টনার ছিল প্রফেসর ইফতেখার মাহমুদ। আমগোর হেরে খুইজ্জা বাইর করতে অইব,’ আলীম পাটোয়ারি আবারও চেয়ারে হেলান দিতে দিতে বলে উঠল। ‘সমস্যা অইল প্রফেসর আবদেলের মতন প্রফেসর ইফতেখার মাহমুদও তিন বছর আগে গায়েব হয়া গেছিল। যেকোনো উপায়েই হোক তারে খুইজ্জা বাইর করতে পারলেই একমাত্র রাজদ্রোহীর রহস্য সমাধান করা সম্ভব অইব।’

বাশার আনমনেই মাথা নাড়ল, এতক্ষণে পুরো বিষয়টাতে নিজের ভূমিকাটা ধীরে ধীরে ধরতে পারছে সে। তাকে একজন হারিয়ে যাওয়া মানুষকে খুঁজে বের করতে হবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *