পূর্বকথা
গল্পের শুরু
প্রথম অংশ: কল্পযাত্রা
দ্বিতীয় অংশ : সত্যাভিযান

রাজদ্রোহী – ১১

অধ্যায় এগারো

সময়: ১৫৯৬ খ্রিস্টাব্দ

রসুল খাঁর জমিদার বাড়ির বৈঠকখানা

.

মানুষটার পরনের পোশাকটাকে ঠিক শতচ্ছিন্ন বলা যাবে না, আবার সেগুলোকে পুরোপুরি পোশাকের পর্যায়ে ফেলাটাও ঠিক হবে না। মুখে কতদিনের অপরিচ্ছন্ন দাড়ি কে জানে, একই অবস্থা তার চুলেরও। পাটকাঠির মতো সরু শরীরটা দেখলে মনে হয় বেতগাছের গায়ে খোলস ছেড়েছে কোনো লম্বা সরু সাপ। মাসুম অনুমান করল দীর্ঘদিন গোসল না করার ফলে এই অবস্থা হয়েছে। মোঘল বাহিনীতে কাজ করার সময়ে মাসুম হিন্দুস্থানের নানা জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছে। তখন সে দেখেছে জটাধারী সন্নাসীদের অনেকের এমন হয়। তবে লোকটার দিকে তাকিয়ে একটা ব্যাপার কিছুতেই অস্বীকার করতে পারছে না মাসুম। লোকটার পুরো অবয়বের সাথে তার একটা জিনিসের কোনো মিল নেই, সেটা হলো তার অসম্ভব উজ্জ্বল আর প্রাণচঞ্চল চোখজোড়া। শরীর চেহারা এবং পরিধেয়র সাথে একেবারেই বেমানান চোখজোড়া একদিকে যেমন অসম্ভব উজ্জ্বল, একইসাথে সে-দুটো বিচিত্ররকমের প্রাণচঞ্চলও বটে। মুহূর্তের জন্যেও যেন চোখজোড়া স্থির হচ্ছে না। এদিক থেকে সেদিকে নড়েচড়ে তো বেড়াচ্ছেই, চোখের দৃষ্টির ভাবভঙ্গিও পরিবর্তন হচ্ছে যেন ক্ষণে ক্ষণে। মনে হয় চোখজোড়া যেন সামনে বসে থাকা মানুষটার নয়, বরং কোনো দুষ্টু বাচ্চার, যার মাথার ভেতরে ক্ষণে ক্ষণে নানা দুষ্টামির ভাবনা চিন্তা খেলে যাচ্ছে।

‘হুজুর, আমি কইতাছি আপনাগো আমারে নিতেই অইবে—’ লোকটা আবারও কথা বলে উঠতেই মাসুম দেখল তার মুখের সামনের দিকে ওপরের সারিতে দুটো দাঁত নেই। যে-কারণে কথা বললে অনেক উচ্চারণ বিকৃত হয়ে যায়। বিশেষ করে ‘ছ’ বর্গীয় শব্দ যেগুলো উচ্চারণ করতে জিহ্বা আর তালুর সংযোগে বাতাস ওপরের সারির সামনের দিকে বাড়ি খায়, সেগুলো উচ্চারণ একেবারেই বিকৃত শোনায়। লোকটা কথা বলতে বলতে উত্তেজিত ভঙ্গিতে মাটি থেকে উঠে যাচ্ছিল কিন্তু শেরু তাকে নিজের হাতের লাঠি দেখিয়ে শক্ত ধমক দিলো। ‘নুকুন,’ শেরু ধমক দিয়ে উঠতেই মাসুম অনুমান করল এটাই লোকটার নাম সম্ভবত। ‘বইসা কথা বল, তুই এই পর্যন্ত আসতে পারছস এইটা তোর কপাল, হুজুরগোরে সম্মান দিয় কথা কইবি না অইলে মাতা ফাডায়া ঘিলু বাইর কইরা ফালাব কই দিলাম,’ মাসুম অবাক হয়ে দেখল হ্যাংলা-পাতলা পাগলাটে লোকটা কোথায় শেরুর মতো দানবের ধমক খেয়ে চুপ হয়ে গুটিয়ে যাবার কথা সেখানে লোকটা উলটো বাচ্চাওয়ালা মুরগির মতো ফুঁসে উঠল।

‘এই মাতারির পোলা, চুপ কর,’ তার গলার স্বর শরীরের তুলনায় অসম্ভব ভারী আর গম্ভীর, ‘আমারে কথা কইতে দে,’ বলেই সে একবার রসুল খাঁ আর বাসিমের দিকে দেখে নিয়ে মাসুমের দিকে ফিরে আবারও কথা বলে উঠল, ‘হুজুর, আপনের দুই পায়ে পড়তাছি, আমারে আপনেগো লগে নিতেই অইব,’ বলে লোকটা আরেকটু হলে মাসুমের পায়েই ধরে ফেলত যদি শেরু তাকে না আটকাত। মাসুম আড়চোখে একবার বাসিমকে দেখে নিয়ে গেড়ুয়ার দিকে তাকাল। বাসিম আর তার বাপ দাঁড়িয়ে আছে একপাশে। ওদের থেকে খানিক তফাতে মাটিতে বসে আছে গেড়ুয়া। মাসুম তাদের দিকে তাকাতে দুজনেই মাথা নেড়ে মানা করল লোকটার ব্যাপারে, যাতে ও কোনো ধরনের সিদ্ধান্ত না জানিয়ে ফেলে।

আজ সন্ধ্যায়, মাসুম, বরখা আর ধোবলেরা মিলে বাসিম রসুল খাঁ আর শেরুর উপস্থিতিতে ওদের ভোরের অভিযান নিয়ে গেড়ুয়া আর ওর চাচার সাথে পরিকল্পনার প্রায় শেষ দিকে, ঠিক কখন নিচ থেকে হই-হট্টগোল শুনে ওরা সবাই বেশ অবাক হয় এবং এক সিপাহি দৌড়ে এসে জানায় একটা সমস্যা হয়েছে, বাড়ির প্রধন ফটকে পাগল এক লোক এসে বাড়ির কর্তাদের সাথে দেখা করতে চাইছে। তাকে মানা করার পরও কোনো কথা শুনছে না বারবার অনুরোধ করছে দেখা করার জন্যে সেই সাথে পাগলামিও করছে। সাথে সাথে শেরু আফসোসের সাথে মাথা নেড়ে বলে উঠল এই পাগলের সাথে তার আগেও দেখা হয়েছে। সে তাকেও অনুরোধ করে বলেছে সে নাকি ওইপাড়ের সব জানে এবং চেনে সে মাসুমদের সাথে ওপাড়ে যেতে চায়। কারণ তার নাকি কী প্রয়োজন, কিন্তু লোকটাকে বেশি সুবিধার মনে না হওয়াতে সে তাকে ফিরিয়ে দিয়েছিল। এখন কীভাবে কীভাবে যেন বসতবাড়ি পর্যন্ত চলে এসেছে। শেরু তার লোক নিয়ে ফটকের কাছে যাবার পরও লোকটা কোনো কথা শোনেনি, সে মাসুমদের সাথে যাবার জন্যে অস্থির হয়ে রয়েছে এখনও, তার এই অতি আগ্রহ দেখে বাসিম তাকে ডেকে পাঠায়। ভেতরে আসার পর থেকে বারবার অসংলগ্ন কথাবার্তা বলাতে ধমক দিয়ে তাকে চুপ করিয়ে রাখা হয়েছে।

মাসুম একটা হাত তুলে শেরুকে থামিয়ে দিয়ে লোকটার দিকে সরাসরি তাকিয়ে কথা বলে উঠল, ‘তোমার নাম নুক্কুন?’ মাসুম যথাসম্ভব শান্তভাবে লোকটার সাথে কথা বলার চেষ্টা করছে।

‘নুক্কুন। আমি এই এলাকারই মানুষ, আমার-’

‘নুক্কুন শোনো, আমি যা জানতে চাইব আগে ঠিকঠাক তার উত্তর দিবা, পরে অন্য আলাপ করবো। আর আমি কিছু জিজ্ঞাসা না করলে সেইটা নিয়া কথা বলবা না, বুঝতে পারছ? আর আমার কথার উত্তর দিবা সোজাসুজি, অনেক কথা আমি শুনতে চাই না,’ মাসুমের কথা, জবাবে সে কিছুই না বলে স্রেফ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। ‘কি হইল, তোমারে যা জিগাইলাম বুঝছো?’

এইবার সে সামান্য মাথা নেড়ে বুঝিয়ে দিলো মাসুম যা বলেছে সে তা বুঝতে পেরেছে। ‘আমারে আগে বলো আমরা জল-জঙ্গলের দিকে যাইতেছি এইটা তুমি জানলা কই?’ মাসুম প্রশ্নটা করতেই সে শেরুর দিকে তাকাল।

তার দৃষ্টি অনুসরণ করে মাসুম শেরুকে দেখে নিয়ে আধপাগলা নুক্কুনের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, ‘আমি বুঝতে পারছি, শেরুর লোকেরা যখন ওইপাড়ে যাবার মতন লোক খুঁজতেছিল, তখন তুমি জানতে পারছ?’ মাসুম একবার বাসিম আর গেড়ুয়ার দিকে দেখে নিলো সবাই মনোযোগ দিয়ে ওদের দুজনের দিকে তাকিয়ে আছে। ‘আচ্ছা, তুমি কি জানো আমরা কী কাজে ওইখানে যাইতেছি?’ এই প্রশ্নটার উত্তর জানা খুব জরুরি।

নুক্কুন এবার চোখ তুলে তাকাল সরাসরি মাসুমের দিকে। ‘আমি জানি, হুজুর আপনেরা মোঘলগোর লগে মারামারি করতে যাইতাছেন, কারণ হেরা আসলাম শেঠরে মারছে।’

লোকটার জবাব শুনে মাসুম হেসে উঠল। ‘আমরা মারামারি করতে যাইতেছি না,’ লোকটা ওদের উদ্দেশ্য নিয়ে বিস্তারিত জানে না এটা অনেকটা স্বস্তির। ‘যাই হোক—’

‘হুজুর, আপনেরা মানুষ আনতে যাইতেছেন, সেইটার লাইগা লাগলে মারামারিও করবেন, আমি ঠিক কইছি না?’ আধপাগলা নুক্কুনের কাছ থেকে এরকম জবাব একেবারেই আশা করেনি মাসুম। সে চট করে বরখার দিকে দেখে নিয়ে বাকিদের দিকে ফিরে তাকাল। সবাই খানিকটা চমকে উঠেছে লোকটার কথা শুনে।

‘আচ্ছা নুক্কুন, তুমি তো জানো ওই এলাকা এখন নরকের সমান। তাইলে তুমি ক্যান ওইখানে যাইতে চাও?’ মাসুম আসলেই লোকটার উদ্দেশ্য এবং বিধেয় দুটোই বোঝার চেষ্টা করছে। কারণ এরকম আন্দাজি একটা লোক যদি ওদের ব্যাপারে এতটা জানে তবে এলাকাতে ওদের খবর কতটা ছড়িয়েছে সেটা ওর জানা এবং বোঝা দরকার।

‘হুজুর,’ বলে সে নিজের দুই হাত তুলল। ‘হুজুর, আমি এই এলাকারই মানুষ, বিশ্বাস না অইল সায়েবগোরে জিগাই দেখেন,’ বলে সে শেরু, বাসিম রসুল খাঁ ওদের দিকে নির্দেশ করল। ‘আমারে সবচাইতে পাগল করা ডাকে কিন্তু সত্যি কথা অইল আমি আসলেই পাগল কিন্তু আমি পাগল অইলেও,’ মাসুম দেখল লোকটার চোখে অশ্রু গড়াতে শুরু করেছে। ‘আমি বুঝতাছি আপনেরা আমারে ক্যান এতকিছু জিগাইতাছেন। কারণ আপনেরা ভাবতাছেন আমারে দিয়া আপনেগো কোনো বিপদ অইব নাকি। হুজুর, আপনেগো কথা কেউই জানে না নিশ্চিত থাকতে পারেন। আমি জানছি কারণ আমি পাগল অইলেও কিছু জিনিস বুঝি। আমি আপনেগো লগে ওইপাড়ে যাইতে চাইতেছি কারণ আমার পরিবার। আমার বউ পোলাপান ওই পাড়ে আটকা পড়ছে। মোঘলগোর লগে যুদ্ধে ওরা বাইচা আছে না মইরা গেছে আমি জানি না। আমি পাগল, কিন্তু আমি আমার পরিবাররে বাঁচাইতে চাই হুজুর, আপনেরা না নিলে আমি যাইতে পারবো না। আমারে একটা সুযোগ দেন,’ বলে সে চট করে দাঁড়িয়ে গেল। ‘হুজুর, আমি পাগল অইতে পারি কিন্তু জল-জঙ্গল এলাকায় সব আমার চিনা, আমি ওই এলাকার এক একটা মাছ, পক্ষীও আমার চিনা। ওইপাড়ে আমারে যদি একবার নিয়া যান আমি আপনেগো সব সাহাইয্য করতে পারবো,’ বলেই সে আবারও মাটিতে একেবারে মাসুমের সামনে গড়িয়ে বসে পড়ল। ‘হুজুর, আমারে নিয়া যান, আমি কোনোভাবেই যাইতে পারতাছি না, আমারে সুযোগ দেন,’ বলে সে আবারও বলে উঠল। ‘হুজুর, আমারে সুযোগ দেন, ‘ বলে লোকটা রীতিমতো হাউমাউ করতে লাগল।

লোকটার অবস্থা দেখে মাসুমের মন আক্ষরিক অর্থেই নরম হয়ে উঠল, সে শেরুর দিকে তাকিয়ে ইশারা করল, ‘এক কাজ করো, ওরে নিয়া যাও, কিছু খাইতে দাও। আমি পরে ওর সাথে আবার কথা বলতাছি।’

শেরু তার সৈনিকদের ইশারা করল লোকটাকে নিয়ে যাবার জন্যে। মাসুম শুনতে পেল যাবার সময়ে লোকটা কারও নাম ধরে ডাকছে। লোকটা চলে যেতেই মাসুম ফিরে তাকাল শেরুর দিকে, ‘আমার একটা কথা জানবার আছে?’ তুমি যে আমাদের সাথে যাইবা খবর ছড়াইছ সেটা কত জনে জানে?’

‘হুজুর, আমি-’

শেরু কিছু বলতে শুরু করেছিল তার আগেই গেড়ুয়া মাথা নিচু করে কথা বলে উঠল, ‘হুজুর, গোস্তাকি মাফ নিবেন। আমি একটু কথা বলি। পাগল নুকুন আপনেগো ব্যাপারে জানে বইলা হয়তো আপনের মনে অইতাছে হয়তো অনেকেই আপনেগো ব্যাপারে জাইনা গেছে। কিন্তু আসলে বিষয়টা তা না। শেরু ওস্তাদে আমগো আগে যাগো লগে যাইতে চাইছিল, এই পাগল নুক্কুন হেগো এলাকায় ঘোরাঘুরি করে, মনে অয় তাগো কাছেই শুনছে। হুজুর, আপনে নিশ্চিত থাকেন বেশি লোকে জানে নাই। আর পাগল নুক্কুন পাগল অইতে পারে কিন্তু ক্ষতিকর না।’

‘এই লোকটা আসলে কে, আর তার পরিবারের বিষয়ে যা কইল সেইটা কি ঠিক?’

বাসিম আর রসুল খাঁ দুজনেই ফিরে তাকাল শেরুর দিকে। শেরু কাঁধ ঝাঁকাল, ‘হুজুর, নুক্কুন একটা কথা ঠিকই কইছে ও এই এলাকারই লোক, ভবঘুরে পাগল টাইপ। টুকটাক কাজকাম করে, লোকের ফুটফরমাইশ কইরা দেয়, বিনিময়ে খায়-চলে আরকি। বাড়িঘর নাই। মাঝেমধ্যে গায়েব অইয়া যায়, আবার আইসা হাজির অয়। গেড়ুয়া ঠিকই বলছে, ও ক্ষতিকর না। তবে হুজুর, সত্যি কথা কইতে হের যে পরিবার আছে এইটা আমি এই প্রথম শুনলাম। হেয় কই থেকে আইছে কেউই জানে না।’

বাসিম কথা বলে উঠল হঠাৎ, ‘এমন হইতে পারে ওর পরিবার হয়তো জল- জঙ্গলে থাকে কিন্তু ও পাগল বইলা ওকে পরিবার থেকে বিতারিত করা হইছে। কিন্তু যুদ্ধের কথা শুইনা ও হয়তো অস্থির হয়ে পড়ছে পরিবারের কাছে ফিরা যাবার জন্যে।’

‘আমার কথা সেইটা না, তার পরিবার আছে কি নাই, এইটা পরের প্রশ্ন, ‘ মাসুমের পাশ থেকে বরখা বলে উঠল। ‘তাকে কি আমরা সাথে নিব না কি?

শেরু কিছু না বলে গেড়ুয়ার দিকে তাকাল। সবাই বুঝতে পারছে জল-জঙ্গল এলাকায় প্রবেশ করার যে পরিকল্পনা ওদের, ওটাতে গেড়ুয়াই প্রধান। ‘হুজুর, গোস্তাকি মাফ নিবেন। ওইখানে ঢুকতে এমনেই অনেক ঝুঁকি, আমগো খুবই সাবধানে হুজুরগোরে লুকায়া কাঠুরিয়া সাজায়া নিয়া ঢুকতে অইব। আমার মনে অয় এই পাগলরে ওইটাতে সামিল না করাই ভালো, কারণ সবশেষে সে পাগল, যদি একটা উলটাপালটা কিছু করে তাইলেই অইছে, সব শেষ। হুজুর, গোস্তাকি নিয়েন না, এইটাই আমার মতামত, বাকি আপনেগো মর্জি,’ কথা শেষ করে মাথা নাড়ল সে।  

মাসুম ফিরে তাকাল বাসিমের দিকে। ‘আমি শেরুর লগে একমত, কারণ এই ঝুঁকি নিতে গেলে সবার জীবন তো খাতরায় পড়তে পারে তার ওপরে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজে যাইতাছেন আপনারা।’

মাসুম তাকিয়েছিল বাসিমের দিকে, তার কথা শেষ হতেই সে ফিরে তাকাল বরখা আর ধোবলের দিকে। বরখা সোজা মাথা নেড়ে মানা করল, ধোবল চুপচাপ। মাসুম আনমনে মাথা নাড়ল লোকটাকে দেখে ওর খারাপই লেগেছে কিন্তু বাসিম ঠিকই বলেছে। ওরা যাচ্ছে এমন এক কাজে, যেটা স্রেফ গুরুত্বপূর্ণই না পুরো বাঙাল মুলুকের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এর ওপরে, কাজেই একজন মানুষ আর তার পরিবারের জন্যে পুরো বিষয়টাকে সে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে না। মাসুম দ্বিধা করছে দেখে বাসিম বলে উঠল, ‘জনাব, কিছু মনে না করলে একটা কথা বলি, এই পাগল লোকটা কি আদৌ ঠিক বলতাছে কি না তার পরিবারের বিষয়ে সেইটাও কিন্তু আমরা জানি না। কাজেই—’

‘আচ্ছা ঠিক আছে, ওরে নেওয়া যাবে না,’ বলে সে নিজে নিজেই মাথা নাড়ল। ‘কিন্তু ওর সাথে তুমরা খারাপ ব্যবহার কইরো না, পারলে ওরে খাওয়া দাওয়া দিয়া এইখানেই রাখ,’ কথাটা সে শেরুকে উদ্দেশ্য করে বলেছে। ‘এখন করণীয় বলো?’

‘হুজুর, আপনেরা এখন রাইতের খাওয়া সাইরা জলদি বাইর হইতে অইব। বেলা এখন বিকাল পার হয়া রাতের দিক, প্রথমে আপনেরা এইখান থেইকা, তেলীগাতির জঙ্গলে যাবেন, ওইখানেই গেড়ুয়াগোর বাকি সাথীরা আছে। সেইখানে গিয়া আপনেরা পোশাক পালটায়া ওগো লগে মিশা যাবেন। ওইখানে আপনেগো আরও কিছু প্রস্তুতি আছে। সেইগুলা সব সাইরা রাইতের শেষ প্রহরে অন্ধকার থাকতেই নাওয়ে চড়বেন বাকিগো লগে। এরপরে ওইখান থেইকা রওনা দিবেন কালীঘাটের উদ্দেশ্যে,’ বলে সে একবার গেড়ুয়াকে দেখল।

‘আজ্ঞে, হুজুর, যেইভাবে বলছেন সেইভাবেই সব অইব,’ বলে সে চোখ তুলে তাকাল। ‘দুয়েকটা অনুরোধ করতে পারি, আপনেগো ভালোর লাইগাই। গোস্তাকি না নিলে—’

মাসুম একটু বিরক্ত হলো ছেলেটার ওপরে। এই ছেলে অতিভক্তি দেখায়, মাঝে মাঝে যেটা বিরক্তিকর। ‘বলো বলো, এত ভণিতার দরকার নাই।’

‘হুজুর, প্রথম কথা, তেলীগাতি গেলে অপনেগো আমগো কাপড় পরতে অইবে, আমগো মতন তিলক লাগায়া সাজতে অইব, ধম্ম নিয়ে কিছু মনে নিয়েন না,’ মাসুম ছেলেটার কথা শুনে আনমনে মাথা নাড়ল, যুক্তির কথা বলেছে সে। এটা বলাটা ওর জন্যেও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ধর্মের ব্যাপারটা খুবই স্পর্শকাতর। ঠিক আছে,’ বলে উঠল ও।

‘হুজুর, কোনো অস্ত্র নিয়েন না, আর কোনো কথা কইয়েন না,’ ছেলেটার এবারের কথাটা শুনে খানিক বিরক্ত হলেও মাসুম বেশি কিছু বলল না। ‘ঠিক আছে।’

অস্ত্রের বিষয়ে আমার খানিকটা কথা আছে,’ বাসিম বলে উঠল। ‘তেলীগাতি পর্যন্ত আপনাগো লগে কয়েকজন লোক যাবে আপনেগো প্রস্তুতিতে সাহাইয্য করার লাইগা। আর যদিও ওরা বারবার বইলা দিছে যে অস্ত্র নেওয়া যাবে না, কিন্তু আমরা তিনটা তরবারি আর বর্শা নৌকার নিচে বাইন্ধা দিব, যাতে ওইপাড়ে যাবার পর আপনাগো কাজে লাগে।’

বাসিমের কথা শুনে গেড়ুয়া প্রবল আপত্তির সাথে মাথা নেড়ে মানা করতে যাচ্ছিল কিন্তু তার আগেই শেরু ধমকে উঠল, ‘তোর অনেক কথা শুনছি, এইটা নিতেই হবে, সাথে সাথে গেড়ুয়া মাথা নিচু করে ফেলল। ‘হুকুম হুজুর।’

তবে মাসুম তার দিকে তাকিয়ে অনুধাবন করতে পারল ছেলেটার একদমই ভালো লাগছে না এই অস্ত্র নেওয়ার ব্যাপারটা। মাসুম হয়তো শেরুকে মানা করে দিত কিন্তু বাসিম ঠিকই বলেছে অস্ত্রগুলো ওপারে ওদের অনেক কাজে দিবে, কাজেই এটা সে মানা করতে পারে না। ঠিক আছে, সবাই প্রস্তুত হওয়া শুরু করো অনেক সময় নষ্ট হইছে এইবার কাজে নামাটা বেশি জরুরি।’

তাও যতই জলদি বলুক সব গুছিয়ে রাতের খাওয়া আর কাজ সেরে ওদের বের হতে হতে আরও প্রায় এক ঘণ্টার ওপরে লেগে গেল। অবশেষে শেরু তার সাথে চারজন সৈনিক, মাসুম, ধোবল, বরখা আর গেড়ুয়ারা তিনজন রসুল খাঁ আর বাসিমের কাছ থেকে বিদেয় নিয়ে তেলীগাতির উদ্দেশ্যে হাঁটতে শুরু করল।

পুরো দুই ঘণ্টা লাগল ওদের হেঁটে জায়গামতো পৌঁছাতে। প্রথমে রসুল খাঁদের এলাকা থেকে বের হয়ে ওরা একরকম বলতে গেলে অন্ধকারের ভেতরেই আট- দশজন মানুষ নিঃশব্দে হেঁটে পুরো জনবসতি এলাকা পার হয়ে আসে, যাতে সেভাবে কারও চোখে না পড়ে। তারপর বেশ কয়েকটা ফসলের মাঠ পার হবার পর শুরু হয় জঙ্গুলে এলাকা। মাসুম, ধোবল আর বরখারা অনেকটা অন্ধের মতোই পুরো জঙ্গুলে এলাকায় ঠোকর খেতে খেতে হাঁটতে থাকে। তাও জঙ্গুলে এলাকা পার হবার পর শুরু হয় পানিবাহিত এলাকা। সাঁকো লাগানো কিছু খালবিল পার হয় বলতে গেলে বেশ ঝামেলা করেই। কারণ আকাশে কোনো চাঁদ নেই, রাত গহীন কালো। তাও ভালো বৃষ্টি আসেনি, কাকে যেন একবার বলতে শুনেছিল আগামীকাল তুমুল বৃষ্টি হতে পারে। যাই হোক অবশেষে সব পথ পাড়ি দিয়ে ওরা পৌঁছায় একটা জঙ্গলমতো এলাকায়। সেখানে প্রবেশ করতেই মাসুম বুঝতে পারে সামনে পানি আছে। পানি আছে মনে হয় বড়ো কোনো জলধারা আছে, আর সেটা নদী হবার সম্ভাবনাই বেশি। এই ব্যাপারটা মাসুমকে সবসময় অবাক করে, সারাজীবন জলের ওপরে থাকতে থাকতে বড়ো কোনো জলধারার কাছাকাছি আসতেই সে যেন পানির গন্ধ টের পায়।

‘সামনে নদী, তাই না?’ বলতে গেলে পথচলায় বেশ খানিকটা ক্লান্ত মাসুম অনেকক্ষণ পর কথা বলে উঠল। এই ক্লান্তিটা আসলে পথ চলার ক্লান্তি নয় বরং অচেনা পথ চলার ক্লান্তি। চেনা পথে চলার চেয়ে অচেনা পথ চলার ক্লান্তি সবসময়ই বেশি, কিন্তু জীবনের প্রয়োজনে চলতে হয়।

‘জি, হুজুর, সামনেই কালসা নদীর একটা শাখা,’ গেড়ুয়া তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বলে উঠল। ‘জানি না হুজুরে কেমনে টের পাইলেন, তয় অনুমান ঠিক আছে,’ বলে সে যেন মৃদু হেসে উঠল বলে মনে হলো মাসুমের কাছে। জঙ্গলের ভেতরে আরেকটু এগোতেই গেড়ুয়া মৃদু স্বরে শিস বাজাল। প্রতিউত্তরে অনতিদূর থেকে শিসের শব্দ ভেসে এলো। ‘হুজুর, প্রায় চইলা আসছি। আরেকটু সামনে গেলেই ঘাট। আমগো লোকেরা ওইখানেই আছে।’

‘তারা এইখান থেইকা নাওয়ে চড়ছে?’ শেরুর গলা শুনে মাসুমের কাছে মনে হলো এই এলাকা সে-ও খুব ভালোভাবে চেনে না। ‘ভাদুরিয়ারা তো অন্যখান থেইকা নৌকায় উঠে জানতাম।’

‘হুজুর,’ গেড়ুয়া ঘুরে দাঁড়িয়ে মৃদু হেসে বলে উঠল। মাসুম অন্ধকারের ভেতরেও তার চোখের চকচকে ভাব আর সাদা দাঁত দেখতে পেল স্রেফ। ‘আপনেরা বড়ো বড়ো মানুষ, আপনেগো হিসাব আলদাই হয়, ভাদুরিয়া হেরাও অনেক বড়ো। আমরা হইলাম নিচুর নিচু জাত। বড়ো মাপের মানুষগো থেইকা আমগো সবসময় দূরে দূরে থাকতে অয়,’ বলে সে আবারও হেসে উঠল। মাসুম ঠিক বুঝতে পারল না এতে হাসির কী আছে। সে আড়চোখে একবার শেরুর দিকে, দেখল। যদিও অন্ধকারের কারণে পরিষ্কার দেখতে পেল না কিন্তু এটা পরিষ্কার বুঝতে পারল ছেলেটার কথা শেরুরও খুব ভালো লাগেনি। তবে ব্যাপারটা মাসুমের জন্যে একেবারে অননুমেয় নয়। মোঘলদের তো বটেই, এমনকি নিজের এলাকাতেও সে বহু ধরনের বহু জাতের মানুষের সাথে কাজ করেছে এবং এই কারণে সে ভালোই জানে বৃহত্তর এই ভূমিতে জাতের সমস্যা কতটা প্রকট। এই কারণেই সে নিজের ধর্মকে ভালোবাসে। এইখানে জাতের কোনো বিষয় নেই। তবে সমাজে শ্রেণিবিভাগ তো অবশ্যই আছে। সেই সাথে শ্রেণিবৈষম্যও সমান পরিমাণেই আছে। আর নিজের অভিজ্ঞতা থেকে সে এটাও জানে সমাজের নিচু শ্রেণীর নিষ্পেষিত মানুষেরা সুযোগ পেলে মৌখিকভাবে হোক কিংবা অন্য উপায়ে, এরা কোনো অবস্থাতেই সমাজের উঁচু শ্রেণির মানুষদের ওপরে প্রতিশোধ নিতে কোনো ছাড় দেয় না। কখনও সেটা মৌখিক, আবার কখনও সেটা বাহ্যিক। শেরু আর গেড়ুয়ার ভেতরে ঠিক এই ব্যাপারটাই ঘটল মাত্র।

ওরা আরেকটু এগোতেই সামনে আলো দেখতে পেল। মাসুম ভালোভাবে তাকিয়ে দেখল নদীর পাড়ে কাঠ-কয়লা দিয়ে একটা ধুনির মতো জ্বলছে আর সেটাকে ঘিরে বসে আছে ছয়-সাতজন মানুষ। ওরা এগিয়ে যেতেই গেড়ুয়ার মতোই ছিপছিপে লম্বা আরেক যুবক এগিয়ে এলো। তার পোশাক কথাবার্তাও অনেকটা গেড়ুয়ার মতোই। গেড়ুয়া ওদের সবাইকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে নৌকা প্রস্তুত করতে বলল।

গোল করে পাকানো একটা বান্ডিলের মতো কিছু একটা মাসুমের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে উঠল, ‘হুজুর, আপনেগো কাপড়। খুব বেশি সুবিধার না, তবে পরিষ্কার আছে। কষ্ট অইলেও পরতে পারবেন,’ মাসুম কিছু না বলে কাপড়ের বান্ডিলটা নিয়ে শেরুর দিকে ফিরে বলে উঠল, ‘তুমি গিয়ে নৌকার প্রস্তুতিটা ভালোভাবে দেখ আর অস্ত্রও যা আনছ সেইগুলা অইখানে ঠিক কইরা দিয়া আস।

মাসুম কাপড়ের বান্ডিলটা নিয়ে ধোবল আর বরখাকে একপাশে ডেকে নিলো।

দ্রুত কাপড় পালটায়া ঠিকঠাক হয়া ল,’ বলে সে নিজেও কাপড় পালটাতে লাগল। গেড়ুয়া ভুল বলেনি, কাপড় খুবই মলিন কিন্তু পরিষ্কার। তবে কাপড়ে কীসের যেন একটা তেলতেলে গন্ধ। গন্ধটা কীসের ঠিক বুঝেও বুঝতে পারল না ও।

‘এহ হে, গন্ধ কীসের?’ ঠিক ওর মনের কথাটাই বলে উঠল ধোবল।

‘শোন, গন্ধের আলাপ বাদ দে, এইগুলা রাখ,’ বলে ধোবল আর বরখার দিকে দুটো ছুরি এগিয়ে দিলো মাসুম। ‘এইগুলার কথা অগোরে বলার দরকার নাই বুঝছোস?’ তিনজনেই কাপড় পালটে এসে দেখল গেড়ুয়া তার সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে প্রস্তুত হয়ে আছে। শেরুর দিকে ইশারা করতেই সে বলে উঠল, ‘হুজুর, তিনটা তরবারি, দুইটা বর্শা, তিনটা ছুরি আর দুইটা কুড়াল নৌকার পাটাতনের নিচে রাখা আছে। মাঝি ওইটার উপরেই বইসা হালে থাকব। আশা করি সমস্যা অইব না।’

মাসুম তাকে ধন্যবাদ এবং বিদায় জানিয়ে গেড়ুয়ার সঙ্গে এসে নৌকায় উঠল। পানিতে জোয়ার নামতে শুরু করেছে। নৌকা চলতে শুরু করতেই মাসুম খেয়াল করে দেখল যদিও রাত, তাও পূর্ব দিগন্তে হালকা একটা লালিমা ছড়িয়ে পড়তে শরু করেছে। এর ভেতরেই নৌকা ভাসাল গেড়ুয়ারা। প্রত্যেকর হাতেই একটা করে কুঠার আর কয়েকজনের হাতে লাঠিসোটা।

‘এইগুলা যে?’ নৌকা চলতে শুরু করতেই মাসুম জানতে চাইল গেড়ুয়ার কাছে।

ওর প্রশ্ন শুনে গেড়ুয়া হেসে উঠল, ‘হুজুরে যে কী কইলাইন, আমরা কাঠুরিয়া আমগো কাছে কুড়াল থাকব না তো কাগো কাছে থাকব? লাডি আর বর্শা থাকলেও সমস্যা নাই। জিগাইলে বলব জঙ্গলের প্রাণী তাড়ানির লাইহা, হুজুর, শক্ত অইয়া বসেন, পানির স্রোত বাড়ব, নৌকা মূল নদীতে পড়তাছে।’

তার কথা প্রমাণ করেই একটু পরেই দুলুনি শুরু হয়ে গেল। এর ভেতরেই একদল কাঠুরিয়াদের মাঝে জবুথুবু হয়ে বসে রইল মাসুম। সময় অতিবাহিত হবার সাথে সাথে দিনের আলো ফুটে উঠতে শুরু করল ধীরে ধীরে। কয় ঘণ্টা গেল কে জানে হঠাৎ নৌকার সামনের অংশ থেকে মাঝি চেঁচিয়ে বলে উঠল, ‘কালীঘাট।’

‘হুজুর, কালীঘাট চইলা আসছি, খুব সাবধান,’ মাসুমের কানের কাছে অনেকটা যেন ফিস ফিস করে বলে উঠল গেড়ুয়া।

একবার ক্ষণিকের জন্যে চোখ তুলে মাসুম দেখতে পেল আধ মাইল সামনে নৌকার লাইন আর তার ঠিক ওপারেই মোঘলদের বাহিনী সজ্জিত ঘাট দেখা যাচ্ছে। আনমনেই সে একবার দোয়া-দরুদ পড়ে নিলো।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *