অধ্যায় পঁচিশ
সময়: ১৫৯৬ খ্রিস্টাব্দ
জল-জঙ্গল এলাকা
‘কি মনে হয়, কাজ হবে?’ রায়েলির করা প্রশ্নটা শুনে মাসুম ফিরে তাকাল তার দিকে। মেয়েটার বাংলা বলার ধরন এতটাই অদ্ভুত আর বিচিত্র যে মাসুমের কানে শুনতে খুবই অদ্ভুত শোনায়। আর তার আচার-আচরণ থেকে শুরু করে পোশাক- আশাক তো বটেই। এখন খালি দেখার বাকি আছে, যুদ্ধটা সে আসলে কেমন পারে।
মাসুম তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে উঠল। ‘দেখা যাক কী অয়, আমগো হারানোর কিছু নাই। যে-অবস্থায় আছি তা থেইকা চেষ্টা করলে যাই করা সম্ভব তাই করার চেষ্টা করতেছি আমরা। এরচেয়ে বেশি কিছু কি আর আদৌ সম্ভব? আর যদি তাও না হয়—’ বলে আনমনেই কাঁধ ঝাঁকাল মাসুম। ‘মরণ যদি এই চরেই লেখা থাহে তাইলে আর করনের কী আছে। মরণের চেয়ে খারাপ কিছু তো আর অইতে পারে না। খোদার স্মরণে চইলা গেলে তো বরং ভালোই।’
মরণের চেয়েও খারাপ অইতে পারে বাঙালি, ওরে দেখ,’ বলে রায়েলি মেয়েটা মাসুমের অন্যপাশে বইসা থাকা নুক্কুনকে দেখাল। ‘এখানে পরে শুনলাম ও এইখানে ক্যান আসছে। ও যদি নিজের পরিবাররে খুইজ্জা বাইর কইরা নিরাপদ করতে না পারে তাইলে ওর লাইগা এইডা মরণের চাইয়াও খারাপ অইব, তোমার কি সেইটা মনে অয় না? আমগোর কাছে যা আছে সেইটা যদি শত্রুর হাতে পড়ে তাইলে সেইটা আমগোর মরণের চায়া খারাপ অইব,’ মেয়েটার চোখের পলক পড়ছে না, মাসুম দেখল।
‘ওর পরিবারের কিছু অইব না,’ মাসুম কাঁধ ঝাঁকাল। ‘আর তোমগোর কাছেও যা আছে সেইটাও খাঁ সাহেবের কাছে পৌঁছাইবো,’ খুবই তরল গলায় বলে উঠল মাসুম। বলে সে একটা হাত রাখল নুক্কুনের কাঁধে। ‘ওর পরিবাররে আমি, খুঁইজা বাইর করব যদি ওরা এই এলাকায় থাকে,’ বলে সে রায়েলির দিকে তাকাল। ‘আমি মাসুম কাবুলি কথা দিলে কথা রাখি,’ বলে ও মৃদু হেসে উঠল। ‘আর তোমগোরেও নিরপাদে খাঁ সাহেবের কাছে পৌঁছায়া দিবো-এইটা আমি তারে কথা দিয়া আসছি। কাজেই—’ এইটুকু বলে ও আর বাক্যটা শেষ করল না। রায়েলি এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে, ওদের আরেকপাশ থেকে ধোবল বলে উঠল, ‘সবই ঠিক আছে খালি ক্যামনে করব ওইটা জানে না আরকি,’ বলে সে খুক খুক করে মৃদু হেসে উঠল। আরেক দিক থেকে বরখা আর সুলতানও হেসে উঠল। মাসুম নিজেও মৃদু হাসছিল শুধু দেখল ওদের ভেতরে দুজন মানুষের মুখে হাসি নেই। এক রায়েলি, সে কঠিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সামনের দিকে। আর অন্যজন নুকুন, সে এক দৃষ্টিতে ছল ছল চোখে তাকিয়ে আছে মাসুমের দিকে। মাসুম তাকে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল তখনই সামনে থেকে কুক্কার ডাক ভেসে এলো। কুক্কা হলো এক ধরনের নিশাচর পাখি যেটা রাতের বেলা চড়ে বেড়ায় এবং থেকে থেকে বিচিত্র স্বরে ডেকে ওঠে।
‘ওরা আসতাছে, বাঙালি, রায়েলি কঠিন স্বরে বলে উঠল
‘সবাই প্রস্তুত?’ বলে ও নিজের দুইপাশে তাকাল। ওর ডানের সবার শেষ প্রান্তে সুলতান সে মাথা ঝাঁকিয়ে ইশারা করল। বাঁয়ে সবার শেষে বরখা সেও মাথা ঝাঁকিয়ে ইশারা করল। মাসুম একবার আকাশের দিকে দেখল, রাতের শেষ প্রহর। ভোর হতে আর ঘণ্টাখানেক বাকি, বৃষ্টির বেগ একেবারেই কমে গেছে। ঝড়ো হাওয়া নেই বলতে গেলে। ‘আসতে দাও।’
মাসুমের পরিকল্পনা খুব সাধারণ কিন্তু স্বল্প লোক এবং স্বল্প জিনিস নিয়ে কাজে লাগানোর মতো। ওরা চারজন করে তিনটে দলে ভাগ হয়েছে। এখানে আছে মূল যোদ্ধাদের দুটো দল। আরেকজন মেহেরকে নিয়ে আশ্রয় নিয়েছে পেছনের জঙ্গলে। মাসুমের পরিকল্পনা হলো ওরা যদি চারটে কোষা নিয়ে অন্তত বিশ জনও আসে, তাও সংখ্যায় প্রায় দ্বিগুণ হবে। কাজেই ওদেরকে কাবু করতে হলে শক্তিতে সেটা কোনোভাবেই সম্ভব না, কাজটা করতে হবে কৌশলে। খুব স্বাভাবিকভাবেই ওরা যখন দ্বীপে আক্রমণ চালাবে ওদের প্রথম এবং প্রধান লক্ষ্য থাকবে ঝুপড়িগুলো। ওরা জানে মেহেররা এই দ্বীপেই আছে। আর এখানে এই ঝুপড়িগুলো বাদে আর কোনো আশ্রয় নেওয়ার জায়গা নেই। কাজেই ওরা এখানটাতেই আক্রমণ চালাবে। আর ওদের মূল যোদ্ধাদের দুটো দলও আশ্রয় নিয়েছে ঝুপড়িগুলোতেই। ওরা আক্রমণকারীদের সাথে সামান্য নাটক করবে। ওরা ঝুপড়িগুলোতে আক্রমণ চালালে ওরা প্রথমে প্রতিহত করবে যতটা পারে, তারপর এখান থেকে দুটো দলে ভাগ হয়ে দুদিকে চলে যাবে। একটা দল যাবে জঙ্গলের দিকে আর অন্য দলটা যাবে নৌকাটা যেদিকে আছে সেদিকে।
এটাও খুবই সহজাত একটা ব্যাপার। দ্বীপে যারাই আছে বা থাকবে সবাই পালাতে গেলে এই দুটো দিকেই পালাবে, কারণ এছাড়া আর কোনো উপায় নেই। কিন্তু মূল খেলাটা শুরু হবে এই দুই জায়গাতে যাবার পর।
মাসুম যেই মুহূর্তে ঘোষণা করল সবাই প্রস্তুত কি না, এটা বলার সাথে সাথে দুদিক থেকে আবারও দুজনে শব্দ করে উঠল। মাসুম সামনের দিকে ঝুপড়ির দরজার ফাঁক দিয়ে সামনে তাকিয়ে আছে। বিশার লোকেরা এলে ওদিক দিয়েই আসবে আর সেটা দেখা যাবে পরিষ্কার। মাসুম মনে মনে হিসেব করার চেষ্টা করছে কয়জন হতে পারে এবং কীভাবে ওরা আক্রমণ চালাতে পারে। সে নিজে হলেও নিজের লঠিয়াল আর যোদ্ধা বাহিনীকে পাঠাত, কারণ এতে শত্রুদের কাবু করা সম্ভব হবে এবং সেটা করা যাবে কাউকে আহত না করেই। কারণ তিরন্দাজদেরকে পাঠালে প্রতিপক্ষে মৃত্যুর সম্ভাবনা বেড়ে যাবে, মাসুমের ধারণা যদি ভুল না হয় তবে ওরা অবশ্যই চেষ্টা করবে অন্তত মেহের এবং নারী যোদ্ধাদের দলটাকে না মেরে বন্দি করতে। এর পেছনে কারণ আছে। আর একারণেই মাসুম আশা করছে ওরা তিরন্দাজ নয়, বরং যোদ্ধাদেরকে পাঠাবে।
‘ওই যে,’ মাসুম কিছু দেখার আগে ওর পাশ থেকে নুক্কুন কথা বলে উঠল মাসুম ভালোভাবে তাকিয়ে দেখল অন্ধকারের ভেতরে একটা মাথা দেখা যাচ্ছে। কালো কোটে মোড়ানো মানুষটার চেহারা পরিষ্কার না দেখা গেলেও ওর অনুমানকে সঠিক করে দিয়ে লোকটার হাতের চকচকে লাঠিটা চোখে পড়ল পরিষ্কার। মাসুম খুশি হয়ে উঠতে যাচ্ছিল কিন্তু তার আগেই মুখটা একটু বেজার হয়ে গেল। কারণ দেখতে পাচ্ছে একের-পর-এক আক্রমণকারীরা অন্ধকারের ভেতর থেকে প্রকট হয়েই যাচ্ছে। মাসুম মনে মনে আন্দাজ করল লোকসংখ্যা বিশের বেশি হবেই। কিছু করার নেই, বাঁচতে হলে লড়তে হবে। ড্যাগার আর বর্শার হাতলে ওর হাতের আঙুল শক্ত হয়ে উঠল। বাঁয়ে ফিরে তাকিয়ে দেখতে পেল সুলতান হাতে বিরাট একটা ধনুক নিয়ে তাতে তির জুড়ে দিয়েছে। কিন্তু সেটাকে এখনও ছোড়ার জন্যে টান টান করেনি। মাসুম জানতে চাইল, ‘আর কটুক আসলে আয়ত্তের মধ্যে আসব ওরা?’ সে জানতে চাইছে আর কতটুকু এগোলে শত্রুরা ওদের তিরের আয়ত্বের ভেতরে আসবে।
মাসুম দেখল সুলতান ভ্রু কুঁচকে কিছু একটা হিসেব করছে। ‘আর বিশ কদম।’
‘কোনোভাবেই যেন না ফসকায়,’ বলেই সে রায়েলি আর তার বাহিনীর বাকি তিনজনের দিকে ফিরে ইশারা করল। ওরা ধনুক নিয়ে প্রস্তুত সুলতানের প্রথম তিরটা ছোড়া হতেই ওরা আক্রমণ চালাবে। মাসুম জানে প্রথম দফায় চারটা তির ছুটে গেলেই ওরা সচেতন হয়ে উঠবে। পরে তির দিয়ে অন্তত আর ঘায়েল করা যাবে না। কাজেই এই প্রথম দফায় যতজন কমানো যাবে ততই সুবিধা হবে। নিজের বর্শার হাতলে শক্ত হয়ে উঠছে ওর আঙুলগুলো। মনে মনে ও শত্রুর পদক্ষেপ গুনতে শুরু করেছে।
আট দশ বারো . . . ‘ দেখল সুলতানের দৃষ্টি স্থির সামনের দিকে। তার চোখে পলকও পড়ছে না।
আঠারো—বিশ—বাইশ—
করছে কী ছেলেটা!
ফুসসস করে সাপের ফণা তোলার মতো শব্দ হলো। মাসুম শব্দটা শুনলেও সেদিকে তাকাল না, বরং আরও শক্ত করে চেপে ধরল বর্শার হাতল। মাসুম সামনের দিকে তাকিয়ে আছে, সুলতান ছেলেটার নিশানা দারুণ, সর্বাগ্রে থাকা মুখ বাঁধা এক ডাকাত, আসতে আসতে কোনো কারণে সে পেছন ফিরে তাকিয়েছিল, সুলতানের তিরটা উড়ে গিয়ে সোজা তার কণ্ঠার হাড়টাকে ছিন্নভিন্ন করে দিলো। লোকটা এমনকি চিৎকারও করতে পারল না, তার পর মাটিতে পড়ে খাবি খেতে শুরু করল। বিশার দলের লোকেরা জানত এমন কিছু হবে। কিন্তু হুট করে ঘটে যাওয়াতে তারা সেভাবে সাবধান হবার আগেই আরও তিনটা তির ছুটে গেল, সেই সাথে সুলতানও আবার তির জুড়ে দিয়েছে। মাসুম জানত এই অন্ধকারের ভেতরে একটা তির লেগেছে জায়গামতো, এটা দক্ষতা এবং ভাগ্য, বাকিসবগুলো এতটা কার্যকর হবে না।
আর হলোও তাই। তিন-চারটা তির ছুটে গেলেও, মারা পড়ল আর মাত্র একজন, বাকিরা ততক্ষণে সাবধান হয়ে গেছে। এগোনোর গতিও ধীর করে ফেলেছে; সেই সাথে আগে যেরকম খোলামেলা এগিয়ে আসছিল, সেটা বদলে গেল পুরোপুরি, এবার আড়াল নিয়ে সাবধানে এগিয়ে আসতে শুরু করেছে। সুলতান আর বাকিরা তির ছুড়েছে কিন্তু এখন তেমন আর কাজ হচ্ছে না। ওরা এগিয়ে আসতে আসতে দেউরির কাছাকাছি পৌঁছে গেছে, মাসুম সবাইকে সাবধান করে দিলো। সেই সাথে নিজের হাতে ধরা বর্শাটা সামনে নিয়ে এল, যেই মুহূর্তে প্রথম ডাকাত দেউরির ওপর পা রাখল, সাথে সাথে উঠে দাঁড়াল মাসুম, বর্শাটাকে চেপে ধরে ওটাকে কাঁধের পেছনে নিয়ে সর্বশক্তিতে ছুড়ে মারল সামনের দিকে। বর্শাটা তীব্র বেগে ছুটে গিয়ে ডাকাতটাকে শুধু আঘাতই করল না, লোকটা ছিটকে পড়ে গেল নিচে। বর্শাটার পেছন পেছন মাসুম লাফ দিয়েছে। লাফিয়ে দেউরিতে নামতেই পড়ে যাওয়া ডাকাতের লাঠিটা উঠিয়ে নিলো ও। সাথে সাথে লাঠিটাকে মাথার ওপরে দুই চক্কর দিয়ে আক্রমণ করে বসল আরেকজনকে। মাসুমের আক্রমণটাই ছিল বাকিদের জন্যে ইশারা। সুলতান আর বাকি তিন তিরন্দাজ বাদে বাকিরা চিৎকার করতে করতে আক্রমণ করে বসল ডাকাতদের প্রথম দলটার ওপরে। পুরো আঙিনা হইহই চিৎকার, লাঠির ঠোকাঠুকি আর তরবারির ঝনঝনানির শব্দে ভরে উঠল
***
দ্বীপের পেছন দিকে যারা জঙ্গলে আশ্রয় নিয়েছে তারা পরিষ্কার শুনতে পেল: ঝুপড়িগুলোর দিক থেকে চিৎকার আর লড়াইয়ের শব্দ ভেসে আসছে। ওরা বেশিরভাগই আশ্রয় নিয়েছে জঙ্গলের শেষ মাথায় ছোটোবড়ো গাছগুলোর ওপরে। তবে মেহেরের সেই লোহার সিন্দুকটাকে রাখা হয়েছে ভিন্ন জায়গাতে। ওটাকে রাখা হয়েছে মাটির নিচে এমনভাবে যাতে ওটা সহজে কারও চোখেও না পড়ে, আবার খুব চট করে ওটাকে স্থানান্তরিতও করা যায়।
‘কি মনে হয়, আমরা পারবো?’ অন্ধকারের ভেতরেই একজন বলে উঠল।
‘আমরা পারার কথা আর আসে না, তবে বাঙালি পারলেই হয়, তার উপরেই এখন সব নির্ভর,’ বলে মেহের বাকিদের দিকে ফিরে তাকাল। ‘তবে আমগো সময় কিন্তু আসবো, ওরা পিছায়া এইখানেই আসবো। কাজেই সবাই প্রস্তুত থাক,’ বলে সে প্রস্তুতিগুলো দেখে নিলো আরেকবার। জাল, ডালপাতা আর লগি-সবই প্রস্তুত আছে।
***
বিশা ডাকাত আতঙ্ক ছড়াতে পছন্দ করে, নিজের ডাকাত জীবনে সে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে নিজের একমাত্র অস্ত্রভয় দিয়ে। সে মানুষকে ভয় দেখাতে পছন্দ করে, অন্য মানুষের চোখে ভয় দেখতে পেলে তার ভেতরে তীব্র আনন্দ হয়। মানুষকে ভয় দেখালেও সে নিজে ভয় কী জিনিস জানে না, তার ভেতরে কোনো বিষয়ে কোনো দ্বিধা নেই। যেদিন থেকে জ্ঞান হয়েছে দুটো জিনিসের মাধ্যমে সে বেঁচে আছে, যতদিন বেঁচে থাকবে এই দুটো জিনিসকে আশ্রয় করেই সে বেঁচে থাকবে। একটা হলো ভয় আর অন্যটা হলো মৃত্যু। সারাজীবন সে ভয় আর মৃত্যুকে পুঁজি করেই টিকে থাকবে। যেদিন অন্যের মাঝে এই দুটো জিনিস আর ছড়িয়ে দিতে পারবে না, সেদিন তার মৃত্যু হবে। আর তাই সে এই দুটোকে আরও বেশি করে আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করে প্রতিটা ক্ষণে।
কিন্তু আজ রাতে তার ভেতরে কেন জানি অদ্ভুত এক দ্বিধাবোধ কাজ করছে। এই দ্বিধার উৎস কি সে জানে না। আজ রাত তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাত হতে পারে। আর এই দ্বিধার কারণটাও সে বুঝতে পারছে না। একদল নারী আর পুঁচকে পোলাপান আটকে আছে ওই চরের মতো দ্বীপে। তার দলের সবচেয়ে দুর্বলতম লোকটাও ওদের যে-কারও চেয়ে বেশি সবল। তাদের পথ বন্ধ, তার হিসেবে নৌকাও চোট পেয়েছে। এদেরকে কাবু করা তার জন্যে কিছুই না। আর একারণেই সে প্রথমে নিজে না গিয়ে তার দলের সবচেয়ে সেরা বাহিনীটাকে পাঠিয়েছে। তাহলে দ্বিধাটা কীসের?
সে দ্বীপের মতো গ্রামটার দিকে চোখ তুলে তাকাল। ওখানে কী হচ্ছে কে জানে। বিশা সওদাগর কপালের পাশে বহু পুরনো একটা ক্ষত চেপে ধরল, ঝামেলার সময় ওটা ডলতে থাকা তার অভ্যাস। কী হচ্ছে ওখানে জানতে হলে অপেক্ষা ছাড়া উপায় নেই।
***
প্রথম দফা ঝটিকা আক্রমণে খুব একটা ক্ষতি করতে না পারলেও, ডাকাত দলটাকে ওরা এগোতে দেয়নি খুব বেশি। তবে মাসুম জানে এটা বেশিক্ষণ টিকবে না। কাজেই এই ঝটিকা আক্রমণকে ঝটিকার মতোই রাখতে হবে। প্রথম দফা আক্রমণ হতেই মাসুম শিস বাজিয়ে উঠল, সাথে সাথে পেছন থেকে ভেসে এলো শিসের শব্দ যে যার যার জায়গায় মাটিতে শুয়ে পড়ল। আর পেছন থেকে তিরন্দাজ বাহিনী আরেক দফা তির বর্ষণ করল। তিরের আঘাতে দুজন পড়ে গেলেও বাকিরা নিজেদেরকে সামলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়তেই আরও দুদফা তির বর্ষণ করতে লাগল সুলতানের বাহিনী। বাকিরা মাটিতে হামাগুড়ি দিয়ে সরে পড়তে শুরু করল। দেউরিতে উঠতেই মাসুম চিৎকার করে পালাতে বলল সবাইকে। সাথে সাথে দুই দলে ভাগ হয়ে দৌড়াতে শুরু করল ওরা। একদল রওনা দিলো পেছনের জঙ্গলের দিকে, আরেকদল রওনা দিলো নৌকাটার দিকে। সবাই প্রাণপণে দৌড়াচ্ছে। মাসুমের দলে আছে মাসুম, নুক্কুন, ধোবল আর নারী যোদ্ধাদের একজন। আর অন্য দলটাতে আছে রায়েলি, সুলতান, বরখা। মাসুম দৌড়াতে দৌড়াতে দেখতে পেল ওদের একজন মারা পড়েছে। মনে মনে আফসোসের সাথে মাথা নাড়ল ও। রায়েলিদের দলে লোক কমে গেছে, ওরা নৌকার আক্রমণ সামলাতে পারবে কি না, কে জানে। কিছু করার নেই, এখন ওকে এদিকটা সামলাতে হবে। কারণ ও জানে, মূল আক্রমণটা হবে এদিকেই। প্রাণপণে দৌড়াতে দৌড়াতে একবার সামনে দেখে নিলো, তারপর ফিরে তাকাল পেছন দিকে। এখনও ডাকাতদের কাউকে দেখা যাচ্ছে না কিন্তু মাসুম জানে ওদের ঝটিকা আক্রমণে খানিকটা এলোমেলো হয়ে গেলেও দ্রুতই ওরা পিছু নিতে শুরু করবে। কথাটা ভেবেও সারতে পারল না, তার আগেই দেখতে পেল কালো কোটধারীদের কয়েকজনকে। মাথা ঘুরিয়ে দৌড়ের গতি বাড়িয়ে দিলো ও, সেই সাথে চিৎকার করে সাবধান করে দিতে লাগল বাকিদের।
এবার শুরু হবে আসল খেলা।
