পূর্বকথা
গল্পের শুরু
প্রথম অংশ: কল্পযাত্রা
দ্বিতীয় অংশ : সত্যাভিযান

রাজদ্রোহী – ১০

অধ্যায় দশ

বর্তমান সময়

পিবিআই অফিস, ধানমন্ডি ঢাকা

.

‘প্রফেসর ইফতেখার মাহমুদ, পুরোদস্তুর একজন ঝামেলাবাজ লোক,’ বলে হাবিব অনোয়ার পাশা কামরার একপাশে থাকা স্ক্রিন প্রজেক্টরে একটা স্লাইড ওপেন করতেই তাতে একজন মানুষের ছবি ভেসে উঠল। মুখে কাঁচাপাকা দাড়ি, মাথায় পাতলা চুল, ঠিক টাক বলা যাবে না আবার ঠিক চুল আছে তেমনও বলা যাবে না। লম্বা ধারালো বিশেষ কোনো বৈশিষ্ট্যহীন একটা চেহারা, তবে একটা জিনিস বাদে। আর তা হলো লোকটার ধারালো চোখ দুটো। বাশার খেয়াল করে দেখল মানুষটার মুখে সামান্য হাসি আছে, কিন্তু সেটা তার চোখ স্পর্শ করেনি মোটেই। আসলে একজন মানুষকে প্রথম দৃষ্টিতে দেখে তার ব্যক্তিত্ব বা ইত্যাদি আন্দাজ করা না গেলেও ফার্স্ট ইমপ্রেশন বলে একটা কথা থাকে। প্রফেসর ইফতেখার মাহমুদের চেহারা দেখে প্রথম দর্শনেই বাশারের যেটা মনে হলো সেটা হলো: লোকটা অত্যন্ত বুদ্ধিমান এবং ঠান্ডা মাথার একজন মানুষ এবং সম্ভবত বেশ নিষ্ঠুর বা ভাবলেশহীন প্রকৃতিরও।

‘ইন্সপেক্টর আহমেদ বাশার, আবারও মৌসুমির গলা শুনে বাস্তবে ফিরে এলো বাশার। ‘তোমার বর্তমান মিশন আসলে এই মানুষটাকে খুঁজে বের করা।’

‘যদি সে বেঁচে থাকে,’ বাশার অনেকটা আনমনেই বলে উঠল

‘তা তো বটেই, তবে সে যদি মারা গিয়ে থাকে তবে সেটার একেবারে কংক্রিট প্রমাণ বের করতে হবে একেবারে ডিএনএ টেস্ট করিয়ে শিয়োর হয়ে। সেটা না হওয়া পর্যন্ত তার খোঁজ চলতেই থাকবে। এক কথায় বলতে গেলে জীবিত বা মৃত যাই হোক না কেন, প্রফেসর ইফতেখার মাহমুদকে তোমার খুঁজে বের করতে হবে,’ কথাগুলো হাবিব আনোয়ার পাশা আবারও মৌসুমিকে ইশারা করতে যাবে ইন্টারকম বেজে উঠল। হাবিব অনোয়ার পাশা ফোন রিসিভ করে ওপাশে কিছু একটা শুনে বলে উঠল, ভেতরে পাঠিয়ে দাও।

ফোন রেখে সে প্রথমে বাশারের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, ‘বাশার, তোমার এটা প্রথম কেস এবং যদি আমরা ভুল না করে থাকি তবে এই কেসে প্রায় সব ক্ষেত্রেই নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ আসবে। কাজেই এসব বিষয়ে হেল্প করার জন্যে তোমার একজন অ্যাসিসট্যান্ট কাম জুনিয়র পার্টনারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ছেলেটার নাম সোহেল ইসলাম, আগে ডিবিতে ছিল। বলতে গেলে অনেকটা তোমার মতোই ওকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ও গতকাল জয়েন করেছিল। এখন এসেছে, আমি এখানে আসতে বলেছি।’

হাবিব আনোয়ার পাশা কথা শেষ করতেই দরজায় নক হলো, ভেতরে আসার নির্দেশ দিতেই ফাইল হাতে ভেতরে প্রবেশ করল পরিপাটি পোশাক পরা হ্যাংলা- পাতলা সুদর্শন এক যুবক, ভেতরে ঢুকে সে নিজের পরিচয় দিয়ে সালাম দিলো।

‘ভেতরে আস, সোহেল। বাশারের সাথে পরিচিত হও, ও এই কেসে তোমার সুপিরিয়র হিসেবে আছে, আর আমরা ব্রিফিং শুরু করতে যাচ্ছিলাম। বাশারের কাছাকাছি এসে ওকে সালাম দিতেই ওর পাশের চেয়ার দেখাল বাশার, ধন্যবাদ জানিয়ে ওর পাশের চেয়ারে বসে পড়ল সোহেল ইসলাম নামের সুদর্শন ছেলেটা। বাশার খেয়াল করে দেখল আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার লোক হিসেবে একটু বেশিই ফর্সা আর সুদর্শন ছেলেটা। চোখে আবার চশমা, ফলে তাকে দেখে কোনো প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির ইয়াং ফ্যাকাল্টি মনে হয়, ডিবির অফিসার না। তবে সুদর্শন হওয়া তো আর কোনো অপরাধ না। বাশার ব্রিফিংয়ে মন দিলো।

‘প্রফেসর ইফতেখার মাহমুদ, বাড়ি যশোরে, পড়ালেখা প্রথমে আন্ডারগ্রাড জওহরলাল নেহেরু ইউনির্ভাসিটিতে, এরপরে মাস্টার্স কায়রো ইউনির্ভাসিটিতে, পিএইচডি লন্ডনের কিংস কলেজে ফুল স্কলারশিপে। পেশা ছিল ইউনির্ভাসিটির গেস্ট প্রফেসর, বলতে গেলে ফুল টাইম আর্কিয়োলজিস্ট, সেরাদের সেরা বলা হতো তাকে একসময়। গবেষণার বিষয়বস্তু ছিল মধ্যপ্রাচ্য। এরপরে অনেকটা প্রফেসর আবদেলের মতোই হঠাৎ কোনো কারণে বিষয় পালটে ভারতবর্ষ নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। যদিও নির্দিষ্ট কারণটা সেভাবে জানা যায়নি। কিন্তু ধারণা করা যায় যে বিষয়গুলো নিয়ে আমরা রহস্য আন্দাজ করছি সেই কারণেই তিনি সম্ভবত তার বিষয় পালটে ভিন্নখাতে চলে আসেন। বিগত চার পাঁচ বছর ধরে বাংলাদেশে থাকছিলেন। মাঝেমধ্যে জাহাঙ্গীরনগরে পড়াতেন, আর বাকি সময় ইনডিপেনডেন্ট গবেষণা করতেন। প্রফেসর আবদেলের সাথে তার প্রথম পরিচয় লন্ডনে, এরপরে একটা সময় পরে তারা একসাথে গবেষণা করতে শুরু করেন। এরপরে বলতে গেলে একই সময়ে একইসাথে তাদের বাংলাদেশের অথরিটির সাথে গন্ডগোল বাধে, প্রফেসর আবদেলের মতোই তারও আর্কিয়োলজির লাইসেন্স কেড়ে নেওয়া হয় এবং এরপরই আজ থেকে তিন বছর আগে প্রফেসর আবদেলের মতোই গায়েব হয়ে যান তিনি-ও,’ টানা বলে মৌসুমি থামল। এই হলো প্রফেসর ইফতেখারের লেটেস্ট আপডেট। তার ব্যাপারে বিস্তারিত ফাইল ছবিসহ হার্ড এবং সফট কপি তোমাদের দুজনকেই দেওয়া হবে।

বাশার একটা হাত তুলল। ‘তার পরিবার?’

‘হ্যাঁ, তার পরিবারের ব্যাপারে জানাটা জরুরি। কারণ আমাদের বিলিভ ওটা একটা সম্ভাব্য স্টার্টিং এরিয়া হতে পারে,’ শেষ কথাটা সে হাবিব আনোয়ার পাশার দিকে তাকিয়ে বলেছে।

‘আমাদের অ্যানালাইসিস্টরা দুটো স্টার্টিং পয়েন্ট বের করে রেখেছিল তোমাদের জন্যে; অবশ্যই তোমাদের চয়েজ, যেহেতু তোমরা ইনভেস্টিগেটর।

‘প্রফেসর ইফতেখার মাহমুদ এতিম ছিলেন। তার কোনো রক্তের সম্পর্কের পূর্ববর্তী রিলেটিভ পওয়া যায়নি কখনোই। লোকমুখে মানে তাদের পুরনো কলিগ ইত্যাদির কাছ থেকে জানা গেছে তিনি এতিমখানায় বড়ো হয়েছেন, কিন্তু সেখানে তিনি বেশিদিন থাকেননি আর আগের দিনে পথে পথে জাদু দেখিয়ে বেড়াত এরকম একটা যাযাবর বেদে সম্প্রদায়ের সাথে বড়ো হয়েছেন। যেই বেদে সম্প্রদায় থেকে শুরু করে ইউনির্ভার্সিটিতে প্রফেসর হওয়া পর্যন্ত লম্বা এবং বিচিত্র জীবন ছিল তার। সেসব তোমরা ফাইলে পাবে। সব বলতে গেলে দিন পার হয়ে যাবে। তবে এইসব বিষয়গুলো তার জরুরি কারণ তিনি একজন অ্যাকাডেমিশিয়ন হলেও তার বিভিন্ন দিকে দারুণ দক্ষতা ছিলেন, প্রায় অ্যাক্রোবেটদের মতোই ফিটনেস ছিল তার, সেই সাথে জাদু এবং হাতসাফাই দেখিয়ে তাক লাগিয়ে দিত পারতেন মানুষকে খুব সহজেই।

‘সুজা কথা কইতে গেলে ভার্সিটির প্রফেসরগুলা যেমন আবাল কিসিমের হয় তিনি কিন্তু মোটেই সেইরকম মানুষ না,’ কথাটা বলে আলীম পাটোয়ারি আবারও চেয়ারে হেলান দিয়ে ঝিমুতে লাগল।

‘পাটোয়ারি স্যার একদম ঠিক বলেছেন। অত্যন্ত ধূর্ত আর বুদ্ধিমান বলে খ্যাতি এবং কুখ্যাতি দুটোই ছিল তার। তো যাই হোক, লন্ডনে পড়ালেখার সময়েই প্রফেসর ইলা হাসান মাহমুদ নামে লন্ডনপ্রবাসী আরেক আর্কিয়োলজিস্টের সাথে পরিচয় প্রেম এবং বিয়ে হয়, তাদের ঘরে পরবর্তীতে একটা মেয়েও হয়। প্রফেসর ইফতেখার সংসার জীবনে মোটেই সুখী ছিলেন না, উনি নাকি অত্যন্ত বাজে রকমের জীবন-যাপন করতেন। তাদের মেয়ের বয়স যখন দশ বছর তখন ভদ্রমহিলার সাথে তার ডিভোর্স হয়ে যায়। মহিল আজ থেকে বছর পাঁচেক আগে মারা যান।’

‘আর তাদের মেয়ে?’ বাশার জানতে চাইল।

‘পৃথা হাসান মাহমুদ,’ বলে মৌসুমি স্লাইড বাটন চাপতেই বাশার দেখল ওর বয়সি একটা মেয়ের ছবি ফুঠে উঠল স্ক্রিনে। ‘বাবা-মায়ের বাজে সম্পর্কের সবচেয়ে বাজে প্রভাব সম্ভব তার ওপরেই পড়েছিল। সে কখনও বাবার সাথে থাকত আবার কখনও কখনও মায়ের সাথে। বাবার সাথে তার সম্পর্ক নাকি সবসময়ই শীতল

ছিল। মায়ের মৃত্যুর পর থেকে নাকি বাবার সাথে সম্পর্ক আরও খারাপ হতে থাকে। প্রফেসর গায়েব হয়ে যাবার অনেক আগে থেকেই দুজনার ভেতরে মুখ দেখাদেখি বন্ধ, এমনকি তার নামের মাহমুদ অংশটাও সে এফিডেভিট করে বাদ দেয় পরে। এখন তার নাম শুধু পৃথা হাসান।’

‘সে কি বাংলাদেশে থাকে?’ বাশারের পাশ থেকে সোহেল জানতে চাইল

‘হ্যাঁ, পেশায় সে-ও আর্কিয়োলজিস্ট; যদিও সে প্র্যাকটিসিং আর্কিয়োলজিস্ট নয়, সে মূলত গবেষণা করে। ঢাকায় মোহাম্মদপুরে থাকে, ইউল্যাব ইউনির্ভাসিটিতে পড়ানোর পাশাপাশি ওখানেই বাংলাদেশের পুরনো বিভিন্ন স্থাপনা নিয়ে গবেষণা করে।’

‘এমনকি কোনো সম্ভাবনা আছে মেয়ের সাথে প্রফেসরের যোগাযোগ আছে?’ বাশার জানতে চাইল।

জবাবে মৌসুমি বলে উঠল, ‘আগেই বলেছি এটা তোমাদের জন্যে একটা সম্ভাব্য স্টার্টিং পয়েন্ট হতে পারে, কিন্তু কানাগলি হবার সম্ভাবনাও একেবারে ফেলে দেওয়া যায় না। কারণ এই মেয়ের সাথে প্রফেসরের যে খারাপ সম্পর্ক ছিল তাতে তাদের যোগাযোগ থাকার সম্ভাবনা খুব কম।’

‘আরও একটা ব্যাপার আছে। প্রফেসর গায়েব হয়েছিল পুলিশ থেকে শুরু করে নেক্রপলিস বা রেলিকের মতো সংগঠনের চোখে ধুলো দেওয়ার জন্যে। খুব স্বাভাবিকভাবেই ওদের নজর থাকার কথা এই মেয়ের ওপরে কারণ প্রফেসরের একমাত্র জীবিত আত্মীয় হিসেবে তার সাথে তার যোগোযোগের সম্ভাবনা সবার মাথাতেই কাজ করবে। কাজেই একদিকে এই মেয়ে একটা আকর্ষণীয় সোর্স হয়ে উঠতে পারে।’

‘বুঝতে পেরেছি। বাশার ওর মোবাইলে কিছু নোট নিচ্ছে। ‘আচ্ছা, আরকেটা সম্ভাব্য লিডের কথা বলেছিলেন অপনারা সেটা–’

‘লিডটা কী বলছি,’ বলে মৌসুমি একটা স্লাইড চাপল। ‘মধ্যবয়স্ক এক লোকের ছবি ফুটে উঠল। গোলগাল চেহারা মাথায় এলোমেলো চুল, মুখ হাসিতে উদ্ভাসিত। ‘প্রফেসর ইফতেখার মাহমুদের অ্যাসিসট্যান্ট ছিল এই ছেলেটা। নাম চৌধুরী হাসান শেখ।

‘এ কেমন নাম!’ সোহেল মৃদ হেসে বলে উঠল। ‘তিনটাই উপাধি, মেইন নাম নয় কোনোটাই।’ তার কথা শুনে হেসে উঠল সবাই।

‘শোনো, সিরিয়াস হও, কারণ এরপর যা বলব তাতে এই কেসের গভীরতার ব্যাপার খানিকটা আঁচ করতে পরবে তোমরা। এখন হয়তো ভাবছ তিন বছর আগে হারিয়ে যাওয়া ভার্সিটির এক প্রফেসরকে খুঁজে বের করতে হবে, এ আর এমন কী! কিন্তু এখন বুঝতে পারবে ঝামেলাটা কোনো জায়গায়। আজ থেকে তিন বছর আগে যখন প্রফেসর আবদেল আর প্রফেসর ইফতেখার লোকচক্ষুর আড়ালে সরে পড়ে সেইসময়ে এই চৌধুরী তাদেরকে হেল্প করেছিল। দুই প্রফেসর পালাতে পারলেও এই চৌধুরী পালাতে পারেনি। পুলিশের কাছে ধরা পড়ার পর নানা কেসে তার পাঁচ বছরের জেল হয়।’

‘তারমানে এই লোক জেলেই আছে? তাকেও জেরা করতে হবে বিষয়টার ব্যাপারে বিশদ জানতে হলে?’ বাশার খুশি হয়ে উঠল। ‘প্রফেসরের মেয়ের চেয়ে

এই লোক বেটার লিড মনে হচ্ছে আমার কাছে।

‘হ্যাঁ, এটা আরেকটা স্টার্টিং পয়েন্ট হতে পারে। আসলে তার সাথে কথা বলার জন্যে স্পেশাল পারমিশনের জন্যে আবেদন করা হয়েছিল গতকালই সেটা আজ পেয়েছি আমরা। তাকে আনার জন্যে লোক পাঠানো হয়েছে। এদিক থেকে আমরা খানিকটা কাজ এগিয়ে রেখেছি বলতে পারো।’

‘গ্রেট, তাহলে বলা যেতে পারে, একদিকে চৌধুরীকে জেরা করা, অন্যদিকে প্রফেসরের মেয়ের সাথে কথা বলা—এই দুটো জায়গা থেকে আমরা শুরু করতে পারি

‘গ্রেট, মৌসুমি,’ স্লাইড বন্ধ করে হাবিব আনোয়ার পাশার দিকে তাকাতেই সে বলে উঠল, ‘এক কাজ করো, বিস্তারিত ফাইল তো পাবেই বাশার আর সোহেল তোমরা মৌসুমির সাথে কথা বলে বাকি সব ফাইনাল করে নিয়ো। তার আগে তোমরা পাটোয়ারির সাথে ওর ল্যাবে গিয়ে ওয়েপন থেকে শুরু করে সব টেকনো রিসোর্স আপডেট করে নাও,’ বলে মাথা সোজা করে দুজনার দিকে তাকাল। ‘আশা করি কেসটার গভীরতা তোমরা বুঝতে পারছ, কাজেই আই অ্যাম কাউন্টিং অন ইউ গাইজ। হোপ ইউ য়োন্ট ডিসস্যাটিসফাই মি। বেস্ট অব লাক।’

‘লও, আমার লগে লও,’ বলে পাটোয়ারি নিজের হাতে ধরা একটা পুরনো চামড়ার ব্যাগ বাশারের হাতে ধরিয়ে দিলো। দুজনেই তার পিছু পিছু রওনা দিতেই মৌসুমি বলে উঠল, ‘পাটোয়ারি স্যারর সাথে কাজ শেষ হতেই সোজা আমার এখানে চলে আসবে দুজনেই।’

দুজনেই মাথা নেড়ে সায় জানাল।

‘বস, আপনার সাথে তো সেভাবে কথাই হলো না,’ বাশারের পাশে যেতে যেতে সোহেল বলে উঠল।

‘সমস্যা নাই, শুধু কথা না আগামী কয়দিন কথা-খাওয়া ঘুম তো বটেই বাকিসবও একসাথেই করতে হবে মনে হচ্ছে,’ বলে ও হেসে উঠল। ওর সাথে সাথে সোহেলও হেসে উঠল।

ওরা দুজনেই পিছু নিয়ে পাটোয়ারির সাথে একটা দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকে দুজনেরই মুখ হাঁ হয়ে গেল। ভেতরে দারুণ আধুনিক একটা ল্যাব। দুজনের হাঁ হওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে পাটোয়ারি মৃদ হেসে উঠল। বাশারের হাত থেকে নিজের ব্যাগটা নিতে নিতে বলে উঠল, ‘কী মিয়ারা, কেমুন লাগল আমার ল্যাব? এইটা বাংলাদেশের সবচেয়ে সফিসটিকেটেড ফরেনসিক ল্যাব। এমন ল্যাব প্রত্যেকটা বিভাগীয় শহরে বানানি অইব। আহো আমার লগে।’

‘বস, বুড়ার কথা আর কামে তো কোনো মিল পাই না,’ সোহেলের কথা শুনে হেসে উঠল বাশার। ‘আমিও না,’ বাশার বলে উঠল।

পাটোয়ারি ওদেরকে নিয়ে চলে এলো ল্যাবের একপাশে। সেখানে ল্যাব কোট গায়ে কাজ করছিল একটা ছেলে, তাকে কিছু নির্দেশনা দিতে সে স্টিলের কেসের মতো দেখতে একটা কেস নিয়ে এলো।

দুইজনেই হাতা গুটাও দেখি, সে পিস্তলের মতো দেখতে একটা সিরিঞ্জ বের করে প্রথমে বাশারের হাতে অ্যান্টিসেপটিক ডলে সেটা থেকে কিছু একটা পুশ করল, তারপর সোহেলের। কাজটা সেরে মনিটরে দুজনের মুভমেন্ট দেখিয়ে বলে উঠল, ‘এইটারে বলে স্মার্ট ব্লাড, একরকমের ট্র্যাকার কইতে পার। জিনিসগুলা তোমাগো রক্তের লগে মিশা গেছে। তোমরা কই যাবা, কই আছ সব আমরা এইখান থেইকা ট্র্যাক করতে পারবো আগামী বায়াত্তর ঘণ্টা পর্যন্ত। এরপরে অব্যশ্য ডিজেবল হইয়া বাইর হইয়া যাইব।’ দুজনকে দুটো ব্যান্ড-এইড ধরিয়ে দিয়ে, আরেকটা ফাইল ওপেন করল সে। বাশার দেখল ওর প্রোফাইল রেকর্ড।

‘ভাতিজা, তোমার রেকর্ড তো ভালোই, এমন একটা ভুল করছিলা ক্যামনে?’ বলে সে বাশারের দিকে ফিরে তাকাল। বাশার বুঝতে পারল লোকটা ওর পুরো প্রোফাইল হিস্ট্রি জানে। একারণেই সে তখন ওর মায়ের ব্যাপারে প্রশ্ন করেছিল।

‘দেখি, হাত দেখি,’ বলে সে বাশারের ডান হাতটা টিপে দেখতে লাগল। ‘এখন তো সার্ভিস ইস্যু নাইন এম এম ব্যবহার করো তাই না?’ বাশার মাথা নেড়ে সায় জানাল। ‘দেখি, হাতের পাঞ্জাটা দেখি,’ বলে সে বাশারের হাতটা নিজের হাতে নিয়ে ওর হাতের তালুটা দেখল কীসের একটা যেন মাপ নিলো, তারপর ল্যাবের অন্য ছেলেটার দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, ‘এই, যাও। আমার আর্মস কেস নিয়া আসো,’ বলে সে ডেস্কের নিচের একটা ড্রয়ার খুলে দুটো প্যাকেট বের করে একবার দেখে নিলো। ‘এই দুইটা লও,’ বলে প্যাকেট দুটো এগিয়ে দিলো বাশারের দিকে একটা বাশার হাতে নিয়ে আরেকটা সোহেলের দিকে এগিয়ে দিলো।

‘কী এইগুলা?’ অনেকটা পোশাকের মতো দেখতে প্যাকেটটা হাতে নিয়ে উলটেপালটে দেখতে লাগল।

‘আরে পোলারা,’ পাটোয়ারি মনিটর থেকে চোখ সরিয়ে ওদের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, ‘ঈদের ডেরেস পাইছনি যে কেউ দেইখা ফালাইলে ঈদের খুশি যাব গা? প্যাকেট খুইল্লা দুইজনেই গায়ে দেও দেহি মাপ ঠিক আছে কি না।’ বাশার প্যাকেট খুলে দেখল ভেতরে সাদা খুবই পাতলা বলতে গেলে প্রায় হাফ সোয়েটারের মতো একটা ভেস্ট। বুলেট প্রুফ ভেস্ট? বাহ এত পাতলা?’

‘হু, বুলেট পুরুফ ভেস্ট, লাইটওয়েট কার্বনের, বর্তমান দুনিয়ায় এফবিআই থেইকা শুরু কইরা সবাই এখন এইটাই পরে, গায়ে দেও দেখি,’ দুজনেই নিজেদের শার্টের ওপরে ভেস্ট দুটো পরে দেখছে।

‘ঠিকই তো আছে মনে হচ্ছে,’ সোহেল বলে উঠল। ‘কিন্তু আমার কথা হলো, একজন প্রফেসরকে খুঁজে বের করার কেসে বুলেট পুরুফ ভেস্ট পরার আদৌ প্রয়োজন আছে কি?’

তার কথাটা শুনে পাটোয়ারি সরাসরি ফিরে তাকাল তার দিকে, বয়, ইউ হ্যাভ নো আইডিয়া হোয়াট ইউ আর গোয়িং ইনটু, কাজেই সব রহমের লাইগা প্রস্তুত থাকতে অইব। ওই লও তুমগো অস্ত্র চইলা আসছে। দুইজনেই আগের মালগুলা জমা দাও,’ পাটোয়ারি কেস খুলতে খুলতে বাশার আর সোহেল দুজনেই নিজেদের আগের স্ট্যান্ডার্ড ইস্যু পিস্তল দুটো টেবিলের ওপরে রাখল হোলস্টারসহ।

‘দারুণ,’ হাতে একটা ল্যুগার নিয়ে দক্ষ হাতে সেটার ক্লিপ চেক করতে করতে, প্রথমে সোহেলের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এই সুন্দরি পোলা, তুমি আগে আসো। দেখি হাত, আহ হা হাত তো পুরা মাইয়াগো মতো, অবশ্য শক্তি আছে খারাপ না। এইটা ধর দেখি, সোহেল পিস্তলটা হাতে নিতেই সে মুখ কুঁচকে ফেলল। ‘নাহ, এইটা অইব না এইটা লও দেখি,’ বলে সে সরু দেখতে একটা পিস্তল তুলে নিলো স্টিলের কেইসটা থেকে। ‘এইটা লও দেখি,’ সোহেল পিস্তলটা হাতে নিতেই সে হেসে উঠল। ‘পারফেক্ট, এইটা হইল স্প্রিংফিল্ড আর্মরি রোনেন টেন এমএম, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে এইটার ব্যবহার শুরু অইছিল, তোমারে যেইটা দিলাম একেবারে লেটেস্ট। তোমার হাইট, হাতের মাপ আর স্ট্রাকচারের লাইগা পারফেক্ট। বারো রাউন্ডের ক্লিপ, ল্যাবের ওই পোলার কাছ থেইকা হোলস্টার আর এক্সট্রা কিলিপ নিয়া নিবা। এইবার তুমি আসো দেখি,’ বলে বাশারের দিকে ফিরে তাকাল। তোমারটা অবশ্য ঠিক করাই আছে, বলে সে কেস থেকে আর্মি ফ্যাটিগ কালারের একটা কমব্যাট পিস্তল তুলে নিলো। ষোলো রাউন্ডের ম্যাগাজিন, বলে অভ্যস্ত হাতে পিস্তলটা লোড আনলড করল। ‘দারুণ, এক্কেরে লেটেস্ট মাল, হাতে লও দেখি,’ পিস্তলটা বাশার হাতে নিয়ে পরীক্ষা করতে লাগল। একেবারে চকচকে আধুনিক একটা জিনিস। এখনও ফ্যাক্টরি গ্রিজ লেগে আছে।

‘পাক্কা মাল, একদম ঠিকাছে তুমার লগে। এইটারে কয় নাইটহক, মানে রাইতের বাজপাখি, ব্যাপক না নামডা? হা হা, নাইটহক ভিআইপিএজেন্ট টু পিস্তল। মারাত্মক জিনিস,’ বলে সে ঘুরে গেল। ‘আইচ্ছা পিস্তল অইল। এইবার, এই দুইটা লও,’ বলে দুজনের দিকে দুটো সুইচ নাইফ এগিয়ে দিলো। ‘মাইক্রোটেক স্প্রিং ভি, দুনিয়ার সেটা ফাইটিং, থ্রোয়িং এবং কমব্যাট সুইচ নাইফ, জন উইক থেইকা শুরু কইরা ইথান হান্ট, জেমস বন্ড থেইকা জেসন বর্ন সবাই মাইক্রোটেকের ছুরি ইউজ করে,’ বলে সে মনিটরে একবার চেক করে নিলো।

‘ব্যাস, টেরেকার অইল, অস্ত্র অইল, চুরি অইল। এইবার এইগুলা সই কইরা ওই পোলার কাছ থেইকা বাকি সব মাল নিয়া আমার চোখের মনে থেইকা বিদায় অও। বহুত টাইম নষ্ট করছি তুমগো লগে,’ যেন প্রচণ্ড বিরক্ত সে এমন সুরে বলে উঠল। দুজনেই নিজেদের জিনিস বুঝে নিয়ে কাগজে সই করতেই পাটোয়ারি হঠাৎ নিজের স্বাভাবিক গলার চেয়ে একেবারে ভিন্ন গলায় বলে উঠল, ‘তোমরা দুইজনেই মনোযোগ দিয়ে শোনো। তোমরা দুইজনে অভিজ্ঞ পুলিশ এবং অফিসার, কিন্তু একটা কথা মনে রাখবা এখন তোমরা ভিন্ন জগতে পা রাখছ। এই জগৎ আলাদা জগত, এইটা সাধারণ পুলিশ প্রসিজারের ভিতরে পড়ে না,’ অত্যন্ত স্মার্ট ভঙ্গিতে নিজের কাঁধ নাড়িয়ে বলে চলেছে সে। ‘তোমরা হয়তো কেসটা দেইখা ভাবতাছ, এইটা আর এমন কী? মনে রাইখো এর আগে আমার সেরা দুই এজেন্ট এইরকমই সাধারণ কেস ঘাঁটতে গিয়া দুনিয়ার ঝামেলার জিনিস পাইছে। আমার ধারণা তোমাদের এই কেস এমনকি ওগুলার চায়াও জটিল হইতে পারে। একদিকে ঘোড়েল প্রফেসর, অন্যদিকেই শক্তিশালী অথরিটি। তার ওপরে ভয়ঙ্কর অদৃশ্য শত্রু, কাজেই সাবধান। প্রতিটা পা ফেলবা সাবধানে। একটা ভুল করবা না, আর কাউরে বিশ্বাস করবা না, এমনকি নিজেরেও না। যা বললাম ঘটে বুদ্ধি থাকলে ঠিকই বুঝবা। গুডবাই অ্যান্ড গুড লাক, ওইটাই এখনও তোমাদের দরকার,’ কথা শেষ করে ল্যাবের অন্য ছেলেটার দিকে ঘুরে গিয়ে সে বলে উঠল, ‘এই পোলা, তুমারে না বলছিলাম, পুরান ঢাকা থেইকা বুইড়া মোক্তারের পান আনাইতে, সেইটার আপডেট কী?’ বলেই সে আবারও ফিরে তাকাল ওদের দুজনার দিকে। ‘ঘটনা কী? খাড়ায়া আছ ক্যান, সিন্নি লাগছেনি! বিদায় অও।’

দুজনেই ধমক খেয়ে ত্বরিতবেগে নিজেদের জিনিস বুঝে নিয়ে ল্যাব থেকে বেরিয়ে এলো। দুজনেই ওয়াশরুমে ঘুরে নিজেদের পরিধেয় খুলে, ভেস্ট পরে, তাতে হোলস্টার সেট করতে করতে সোহেল বলে উঠল, ‘বস, বেশ একটা জেমস বন্ড জেমন বন্ড ভাব আসছে না। বন্ডের সিনেমাগুলাতে কিউ ব্রাঞ্চ থেকে সব রিসোর্স দেওয়া হয় ওইরকম।’

সোহেলের কথা শুনে হেসে উঠল বাশার। নিজের পোশাক ঠিকঠাক করে নিতে নিতে বলে উঠল, ‘হুম, সবই ঠিক আছে এখন দরকার শুধু বন্ডের মতো একটা ভিলেন তাহলেই বুঝবেন ঠেলা কাকে বলে,’ নিজের পোশাক ঠিক করে সোহেলের হোলস্টারটা ঠিক করতে তাকে হেল্প করতে করতে বাশার আরও কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, তার আগেই ওয়াশরুমে প্রবেশ করল রিসিপশনে থাকা পরিপাটি পোশাক পরা লম্বা চুলের ছেলেটা।

‘বস, আপনারা এখানে, আপনাদেরকে পুরো অফিস খুঁজছে, ছেলেটা একরকম হাঁপাতে হাঁপাতে বলে উঠল।

‘কেন, কী হয়েছে?’ বাশার জানতে চাইল। নিজের পোশাক পরা শেষ করে অস্ত্র ঠিক করে এখন অনেকটাই কনফিডেন্ট লাগছে নিজের কাছে।

‘বস, একটা দুঃসংবাদ আছে, আমি জানি কিন্তু আমার বলার অনুমতি নেই, আপনারা জলদি চলুন মৌসুমি আপার অফিসে।

‘ঘটনা কী, একটু আগে দেখলাম সব শান্ত হঠাৎ এমন কী হয়ে গেল?’ বাশারের পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে সোহেল প্রশ্ন করল।

‘খুব না জেমস বন্ড হবার শখ ছিল, খেলা শুরু হয়ে গেছে মনে হচ্ছে,’ ওরা দুজনে মিলে মৌসুমির অফিসের সামনে এসে দেখল সে সেখানে নেই, হাবিব আনোয়ার পাশার কামরার দরজা খোলা। দুজনেই সেদিকে এগিয়ে দেখল হাবিব আনোয়ার পাশা ডেস্কের সামনে দাঁড়ানো, মৌসুমি তার ফোনে কথা বলছে, আবার পাটোয়ারিও দাঁড়িয়ে আছে সেখানে।

‘ও তোমরা এসেছ,’ ওদের দিকে সিগার তাক করে এমনভাবে কথাটা বলে উঠল অনোয়ার পাশা যেন ওরা তার বাসায় দাওয়াতে এসেছে।

‘স্যার শুনলাম—’

‘হুম, ব্যাড নিউজ আছে।’ তার গলায় কোনো উত্তেজনা নেই।

‘কী ব্যাপার, হঠাৎ-’

‘চৌধুরী জেল থেকে পালিয়ে গেছে,’ মৌসুমি ফোনটা রেখে চট করে বলে উঠল ওদের দিকে তাকিয়ে।

এক মুহূর্তে, জন্যে তার কথাটা ঠিক প্রসেস করতে পারল না বাশারের মস্তিষ্ক। চৌধুরী কে সেটাও ধরতে পারলো না সে, তার পরমুহূর্তে সাথে সাথে বুঝতে পারল ব্যাপারটা কী এবং কেন সেটা সিরিয়াস। ‘চৌধুরী মানে প্রফেসর ইফতেখারের অ্যাসিসট্যান্ট, যে জেলে ছিল?’

‘হ্যাঁ, সে বিগত কয়েক বছর ধরে জেলে ছিল সে। আজ যখন অনুমতি পাবার পর আমাদের লোক গেছিল তাকে স্পেশাল কাস্টডিতে নিয়ে আসার জন্যে, গিয়ে দেখে তাকে যে বিশেষ সেলে বন্দি করে রাখা হয়েছিল সে সেখানে নেই, গম্ভীর এবং শান্ত সুরে বলে উঠল আনোয়ার পাশা। ‘এর মানে বুঝতে পারছ কেসটা শুরু করার আগেই কেসের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং ভাইটাল স্টার্টিং এরিয়াটা আমাদের হাতছাড়া হয়ে গেল।’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *