পূর্বকথা
গল্পের শুরু
প্রথম অংশ: কল্পযাত্রা
দ্বিতীয় অংশ : সত্যাভিযান

রাজদ্রোহী – ৭

অধ্যায় সাত

সময়: ১৬৯৬ খ্রিস্টাব্দ
কিশোরগঞ্জ, জঙ্গলমহালের কাছাকাছি
রসুল খাঁর এলাকা

.

যে ধরনের ভবিতব্যে মাসুম বিশ্বাস রাখে তার সাথে এর কোনো মিল নেই।

মাসুম নিজে ঠিক যে-ধরনের জীবন-যাপন থেকে শুরু করে অতিথিপরায়ণতা আর কাজে অভ্যস্ত, তার ঠিক কোনোকিছুই মিলছে না যেখানে এসেছে সেই এলাকা এবং এর লোকজনের সাথে। দস্তরখানের ওপরে খাবারের আয়োজনের দিকে তাকিয়ে একবার অস্বস্তির সাথে সে খাবারগুলো দেখল, এরপরে চোখ তুলে তাকিয়ে সে ধোবল আর বরখার দিকে দেখে নিলো একবার। বরখার চেহারার অবস্থাও অনেকটা ওর মতোই, কিন্তু ধোবলের খুশি দেখার মতো। তার দুই ঠোঁটের কিনারা চওড়া হাসিতে এই কান থেকে অপর কান স্পর্শ করেছে। মাসুম ফিরে তাকাতেই তার হাসি আরও চওড়া হলো। আনমনেই একবার আফসোসের সাথে মাথা নাড়ল মাসুম।

আবারও তার দৃষ্টি ফিরে এলো সামনে বিছানো দস্তরখানের ওপরে। কী আয়োজন করেনি তাদের আয়োজক ঠিক বুঝতে পারছে না ও। কিসমিস আর পেস্তা দিয়ে রান্না করা চিকন চালের সুগন্ধি পোলাও, মুরগির কোরমা, খাসি আর মহিষের দুই ধরনের ঝাল মাংস। কোরমা আবার শুধু মুরগিরই নয়, খাসির মাংসের কোরমাও আছে, দুই ধরনের কাবাব, ঘি দিয়ে ভাজা বেগুন, কয়েক ধরনের সবজি, সুগন্ধি লেবু দিয়ে বানানো শরবত, কেওড়া জল, অন্তত ছয় সাত ধরনের ফল আর আট-দশ রকমের মিষ্টি আর দই। খাবার খাবে, নাকি এই পরিমাণ খাবার দেখে খুশি হবে, নাকি আফসোস করবে-ঠিক বুঝতে পারছে না মাসুম আর বরখা। খুব বেশি সময় আসলে খাবারের দিকে তাকিয়ে থাকাটা ঠিক শোভন নয়। খাবার থেকে চোখ তুলে চারপাশে দেখেতে লাগল মাসুম।

মাসুম নিজে পাগল প্রকৃতির মানুষ। জীবনের বেশিরভাগই তার কেটেছে হাটে-মাঠে-ঘাটে, সেনাবাহিনীর ব্যারাকে অথবা যুদ্ধের ময়দানে, আর না হয় পানির ওপরে। ফলে পারিবারিক বিষয় থেকে শুরু করে আতিথেয়তা ইত্যাদি সে আসলে খুব ভালো বুঝতে পারে না। তবে সে নিজেও খুবই বনেদি পরিবারের ছেলে। বাঙাল মুলুকের আতিথেয়তা সে নিজ চোখে দেখে এসেছে ছোটোবেলা থেকে। কিন্তু এমনকি তাদের পরিবারের অতিথি সেবার একটা মাত্রা থাকে, এরা যেন সেইসব মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। সুবাদার রসুল খাঁর নাম সে আগে শুনলেও এদের রাজ্যের ব্যাপারে আসলে খুব বেশি ধারণা ছিল না ওর নিজের। এসব এলাকাতে বহুবার এলেও সরাসরি কখনও রসুল খাঁর অতিথি হবার সুযোগ হয়নি ওর। সেদিন রাতে ঈশা খাঁ বিদেয় নেওয়ার পর বলরামের সাথে কথা বলে বলরামকে কিছু জিনিস বুঝিয়ে দিয়ে ওরা বড়ো পালের নৌকাটা নিয়ে রওনা দেয় রসুল খাঁর এলাকার দিকে। প্রায় সারারাত এবং পরের অর্ধদিবস নৌকা চালিয়ে ওরা রসুল খাঁর এলাকার কাছাকাছি আসতেই রসুল খাঁর পাঠানো তিনটে জালি নৌকা এগিয়ে এসে ওদেরকে নিয়ে যায়। আসার পর রসুল খাঁর জমিদারি এবং তার অন্দরমহল থেকে শুরু করে বৈঠকখানার সাজসজ্জা দেখে বেশ অবাক হয়েছে মাসুম। এমনকি ভূঁইয়াদের একজন হয়ে ওরা নিজেরা এতটা ধনী নয়। ওরা সবাই আসার পরেই এতটাই ক্লান্ত ছিল যে স্রেফ পরিচ্ছন্ন হয়ে বাহির বাড়ির কাচারি, মানে যেখানে ওদের থাকার আয়োজন করা হয়েছে সেখানে প্রথমেই একচোট ঘুম দিয়ে নেয়। বিশ্রাম নিয়ে ওঠার ঠিক পর দিয়েই ওদের আয়োজক একবার এসে দেখা করে যায় ওদের সাথে। এরপর বৈঠকখানাতেই ওদের খাবার আয়োজন করা হয়। এবার ওরা প্রস্তত হবার আগেই সমানে আসতে শুরু করে খাবার। একের-পর-এক আসতেই থাকে। ওরা অবশ্য বসে অপেক্ষা করছে ওদের অতিথির জন্যে। সে না এলে ওরা খাওয়া শুরু করতে চাইছে না। কিন্তু তাদের মূল আয়োজক, মানে রসুল খাঁর দেখা নেই এখনও। ওদেরকে সাহায্য করার জন্যে দরজার ঠিক পাশেই দুইজন খানসামা দাঁড়িয়ে আছে। মাসুম চারপাশে একবার দেখে নিয়ে নিজের একটা হাত ওঠাল দুই খানসামার একজনকে ডাকার জন্যে। কিন্তু তাকে ডাক দেওয়ার আগেই তাদের মূল আয়োজক রসুল খাঁ প্রবেশ করল দরজা দিয়ে। তার সাথে আরও দুজন ছোটোখাটো ফর্সা মতন দেখতে, রসুল খাঁ ভেতরে ঢুকেই হায় হায় করে উঠল, ‘কী সর্বনাশের কথা! আপনারা এখনও খাইতে শুরু করেন নাই?’ বলে সে রক্তচক্ষু করে দুই চাকরের দিকে তাকাল। ‘আমি কি নির্দেশ দিয়েছিলাম, তোরা বুঝিস নাই?’ বলেই সে চট করে ফিরে তাকাল মাসুমদের দিকে। ‘আমি অত্যন্ত দুঃখিত ওরা আপনাদেরকে অপেক্ষা করায়া রাখছে। আমি আরও দুঃখিত আমার আসতে দেরি হইল। আপনারা খাইতে শুরু করেন, শুরু করেন। এই খাবার পরিবেশন কর এখনি,’ ছোটোখাটো মানুষটা বৈঠকখানার ভেতরে ঢুকে ওদেরকে খেতে না দেখে উত্তেজনার চোটে যেন লাফাতে শুরু করল।

মাসুম একটা হাত তুলে তাকে শান্ত হতে বলল, ‘আপনি অস্থির হবেন না দয়া করে,’ মাসুম আবারও খানিকটা অস্বস্তির সাথে একবার বরখার দিকে তাকাল। বরখাও ওর দিকে খানিকটা অস্বস্তির সাথে তাকিয়ে আছে। কিন্তু ধোবলের এসব দিকে কোনো বিকার নেই। সে মহা সমারোহের সাথে উপভোগ করছে পুরো আয়োজন। ‘ওদের কোনো দোষ নাই। আমরাই বলছিলাম আপনার জন্যে অপেক্ষা করবো। আপনিও বসে যান আমাদের সাথে। আমরা ক্ষুধার্ত কিন্তু শুধু খাওয়াটাই মূল বিষয় নয়, আমাদের আসলে অনেক কিছুই আলোচনা করার রয়েছে,’ মাসুম একটু অস্বস্তি বোধ করছে। ওরা মূলত এসেছে একটা কাজে, সেই কাজের জন্যে এই লোকটার সাহায্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু মানুষটাকে দেখে মনেই হচ্ছে না ওরা কোনো যুদ্ধাবস্থার ভেতরে আছে। কাজ নিয়ে কোনো কথাই নেই, বরং সে ওদেরকে আদর আপ্যায়ন করতে বেশি ব্যস্ত। অস্বস্তির আরও কারণ হলো, ওদের আগমন নিয়ে এখানে এত বেশি হল্লা করা হচ্ছে আর ঢাকঢোল পেটানো হচ্ছে ব্যাপারটা মোটেই ভালো লাগছে না মাসুমের। ওরা এখানে এসেছে খুবই গোপনে কাজ সারার জন্যে আর সেখানে এমন হই-হল্লা আয়োজন ভালো লাগছে না ওর কাছে। কিন্তু একটা মানুষ যদি এত অয়োজন আর উৎসাহের সাথে কিছু একটা করে তাকে বাধা দেওয়া যায় না কোনোভাবেই।

‘আমার দুই ছেলের সাথে পরিচিত হোন,’ রসুল খাঁ ওদের সাথে দস্তরখানে বসতে বসতে বলে উঠল। ‘ও আমার বড়ো ছেলে বাসিম,’ মাসুম তাকিয়ে দেখল বাসিমের বয়স ওদের মতোই হবে। লম্বা-পাতলা, মুখে পাতলা দাড়িওয়ালা পাগড়ি পরা ছেলেটার সাথে তার বাপের প্রায় বলতে গেলে কোনো মিলই নেই। এমনকি তার হাবভাবও একেবারে শান্ত। বাসিমের নাম বলতেই সে মাসুমের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে মাথা নাড়ল। ছেলেটাকে ভালোই লাগল ওর কাছে। বাপের মতো বেশি কথা বলে না। ‘আর ও হলো আমার ছোটো ছেলে আবদুল্লাহ,’ রসুল খাঁর দ্বিতীয় ছেলের বয়েস বেশ কম, একেবারেই কৈশোরের গণ্ডি পার হয়নি এখনও সে। দেখতে একেবারে ভাইয়ের বিপরীত আর বাপের প্রতিচ্ছবি।

ওদেরকে খাবার পরিবেশন করতে করতে রসুল খাঁ সবিস্তারে এই এলাকা আর তাদের বাড়ির ইতিহাস বলতে শুরু করেছিল। কিন্তু তাকে থামিয়ে দিলো তার বড়ো ছেলেই। ‘বাবা, প্রথমত উনাদেরকে শান্তিমতো খেতে দিন। আর তাছাড়া আমি যদি ভুল না ভেবে থাকি তবে উনারা এই মুহূর্তে আমাদের পারিবারিক ইতিহাস জানার চাইতে জঙ্গলমহালে কী হয়েছে সেই বিষয়ে জানতে বেশি আগ্রহী হবেন,’ বাসিম শেষ কথাটুকু বলে আরেকবার মাসুমের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল। মনে মনে ভীষণ কৃতজ্ঞ বোধ করল মাসুম। সে নিজে কিছুতেই উচ্ছ্বসিত মানুষটাকে থামিয়ে দিয়ে কাজের কথা শুরু করতে পারছিল না। বাসিম সেই কাজটা করে দেওয়াতে খানিকটা হলেও শান্তি পেল ও। তবে সেই সাথে এটাও বুঝতে পারল বাসিম শুধুমাত্র তার বাপের বড়ো ছেলেই নয়, পরিবারের হর্তাকর্তাদের একজন হবে অবশ্যই। কারণ তা না হলে এভাবে বাপের কথার মাঝে তাকে থামিয়ে দিয়ে সে চাইলেই প্রসঙ্গ পরিবর্তন করতে পারত না।

‘জি, খাঁ সাহেব, শুধু জঙ্গলমহালই নয়, আমি পুরো এলাকার সার্বিক পরিস্থিতি নিয়েই জানতে চাই,’ সুযোগ পেয়েই মাসুম বলে উঠল। ‘জঙ্গলমহালে আসলে হয়েছিল কী, আর এভাবে সুবাদার আসলাম শেঠের মতো লোক বহিরাগত মোঘলদের কাছে পরাজিত হয়ে গেল, ব্যাপারটা ঠিক মেনে নেওয়া যাচ্ছে না। আমি তাকে যতটুক চিনতাম অত্যন্ত বুদ্ধিমান ও অভিজ্ঞ মানুষ ছিলো।’

মাসুমের কথা শেষ হতেই রসুল খাঁ একবার বৈঠকখানায় উপস্থিত দুই খানসামার দিকে ফিরে কিছু একটা বলে উঠল, দুজনেই বলতে গেলে প্রায় নিঃশব্দে বেরিয়ে গেল কামরা থেকে। যাবার সময় রসুল খাঁর ছোটো ছেলেকেও নিয়ে গেল আর বৈঠকখানার দরজাটাও বন্ধ করে দিয়ে গেল।

‘আসলে জানেন তো সাবধানে কথা বলতে হয়,’ মাসুম রসুল খাঁর গলার স্বর শুনে খানিকটা অবাক হয়ে গেল। এতক্ষণ মানুষটা যেভাবে কথা বলছিল তার গলার স্বর পুরো পালটে গেছে। ‘সত্যি কথা হইল পরিস্থিতি খুব বেশি সুবিধার না। প্রথমত, যেহেতু খাঁ-সাহেবের নির্দেশনায় আপনারা এইখানে আসছেন, কাজেই সার্বিক মুলুকের পরিস্থিতি তো জানেনই। এখন ঘটনা হইছে এই এলাকায় সবচেয়ে বড়ো দুই শক্তি আমরা আর সুবাদার আসলাম শেঠের পরিবার। আমগো দুই পরিবারের ভিতরে সম্পর্কও সবসময় খুবই ভালো। মল্লারের যুদ্ধের পরে সুবাদার আসলাম শেঠ একদিন আমার সাথে দেখা করতে আসে। সেই তখন আমারে কিছু বিষয়ে অবগত করে। এর মধ্যে একটা অইল মোঘল সেনাপতি মানসিংহ এই এলাকায় আসতাছে। তার মানে অনেক বড়ো কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। সে আমারে এইটাও বলে সে এই এলাকার ওপরে তার নজর থাকবই, তাই আমগোর সবার সতর্ক থাকা উচিত। আমি প্রথমে তার কথা বেশি গুরুত্ব দেই নাই। আমি আসলে ভাবতে পারি নাই তারা এত দ্রুত কিছু কইরা বসবে। সুবাদার আসলাম শেঠের লগে আলোচনার কয়েকদিন পরেই শুনি জঙ্গলমহালে আক্রমণ হইছে এবং এর নেতৃত্ব দিতাছে বাঙাল মুলুকে অবস্থানকারী সবচেয়ে ভয়ঙ্কর আর হিংস্র মোঘল সেনাপতি বাহরাম খাঁ। যুদ্ধের ময়দানে বাহরাম খাঁর অনেক বদনাম আছে।’

মাসুম মনে-মনে দাঁতে দাঁত পিষলো, বাহরাম আর সে একই বাহিনীর অন্তর্গত ছিল, বাহরামের সাথে তার ভালোই পরিচয় আছে। তাকেও বাহরাম খুব ভালোভাবেই চিনে। ‘এইখানে আমার একটা কথা আছে,’ খেতে খেতে হঠাৎ মাসুম জানতে চাইল। ‘এই এলাকাতে মোঘলগোর আনাগোনা তো আগে থেইকাই ছিল।

কারল জঙ্গলমহাল আর আপনাগো এলাকা দুইটাই ভূঁইয়াগো শক্তিশালী খুঁটি। কিন্তু মোঘলরা পুরোদস্তুর বাহিনী নিয়া আক্রমণ কইরা ফালাইলো আর আপনারা কেউই কিছু টের পাইলেন না, বিষয়টা কেমন জানি হয়া গেল না?’ যদিও প্রশ্নটা করতে খানিকটা অস্বস্তি বোধ করছিল মাসুম, কিন্তু অবশেষে আর থাকতে না পেরে বলেই ফেলল।

রসুল খাঁ জবাব দেবার আগে তার ছেলে বাসিম কথা বলে উঠল, ‘আপনার কথার সাথে আমি পুরেপুরি সহমত পোষণ করি, এইখানে আমাদেরও ব্যর্থতা আছে। শুধু আমরা না এমনকি সুবাদার আসলাম শেঠেরও ব্যর্থতা আছে। তাদের জাসুস বাহিনী আমাদের চেয়েও শক্ত, কিন্তু তারাও আগে থেইকা কিছু ঠাওর করতে পারে নাই। আরেকটা কথা বলি, আপনারা জানেন কি না, মানসিংহ কিন্তু এখন এইখান থেইকা বেশি দূরে নাই, সে এগারো সিন্ধুতে অবস্থান করতাছে এখন সে।’

বাসিমের শেষ কথাটা শুনে তার দিকে চোখ তুলে তাকাল মাসুম। আনমনেই মাথা নাড়ল সে। ‘একদিকে জঙ্গলমহাল আর অন্যদিকে এগারো সিন্ধু, মাঝখানে খালি আপনারা। আপানাদেরও তো সর্বোচ্চ সতর্ক থাকা উচিত,’ কথাটা মাসুমের মুখ দিয়ে আপনাতেই বেরিয়ে গেল।

‘আমরা আছি, যতটুকু সম্ভব, আপনার সাথেও এই বিষয় নিয়া আলোচনা আছে,’ বাসিম কথাটা বলে তার বাপের দিকে তাকাল সম্ভবত পূর্বের আলোচনায় ফেরার জন্যে। তারপর বলেন, আব্বা হুজুর।’

যাই হোক, আক্রমণের খবর যখন শুনলাম এমনকি মোঘলরা আক্রমণ করছে শুইনাই আমরা খুব বেশি বিচলিত বোধ করি নাই। কারণ আমরা জানতাম একদিকে জঙ্গলমহাল অত্যন্ত শক্তিশালী ঘাঁটি, তার ওপরে আসলাম শেঠ বহু যুদ্ধের দক্ষ সেনাপতি। তার ওপরে আমরা যেকোনো সময় ছিপ আর কোষায় কইরা তাগোরে সাহাইয্য পাঠাইতে পারবো।’

‘কিন্তু আদতে সেইটা হয় নাই,’ মাসুমের পাশ থেকে বরখা বলে উঠল। ‘কারণ কী?’ অনেকক্ষণ পরে কথা বলল সে। বরখার প্রশ্ন শুনে ধোবল একবার চোখ তুলে তাকাল কিন্তু খুব বেশি সময় মনোযোগ ধরে রাখতে পারল না, আবার সে খাবারে মনোনিবেশ করল।

রসুল খাঁ তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে কথার তুবড়ি ছোটাতে যাচ্ছিল কিন্তু তার আগেই তার ছেলে বাসিম কথা বলে উঠল। ‘এইখানে মোঘলদের চালাকি আছে, আমাদের গাফিলতিও আছে আর সুবাদার চাচার কিছু বোকামি আছে,’ শেষ কথাটা বলে সে সবার দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিলো। ‘দুঃখিত আমাকে ভুল বুঝবেন না, আমি উনাকে অত্যন্ত ভালোবাসতাম, এমনকি আমি মধ্যপ্রাচ্যে পড়ালেখা করতে গিয়েছিলাম তার যোগাযোগের মাধ্যম ধরেই। কাজেই তাকে ছোটো করার বা হেয় করার প্রশ্নই আসে না। আমি একটু একটু করে বলতাছি প্রথম মোঘলদের চালাকিটা হলো ওরা মল্লারের যুদ্ধের সময়ে যখন বুঝতে পারে আমাদের সাথে আসলে সেইভাবে পাইরা উঠবে না, তখন থেকেই নিজেগো আখের গুছায়ে চারপাশে নিজেগো শক্তি ছড়ায়া দিতে শুরু করে। মোদ্দাকথা হইল, ওরা নিজেগো শক্তি বৃদ্ধি করতে শুরু করেছিল এটা আমরা তো বটেই এমনকি খাঁ- সাহেবরাও পুরোপুরি অনুধাবন করতে পারে নাই। এরপরে যখন দক্ষিণে মানে আপনাদের ওদিকে ওরা ঝামেলা করা শুরু করল, বিশেষ করে শাহবাজ খাঁর বাহিনী তখনও আমরা আসলে বুঝতে পারিনাই ওরা এত দ্রুত একই সময়ে উত্তরেও হামলা চালাবে। এইখানেই আমাগো গাফিলতি, কিন্তু আমার কথা হইল সুবাদার চাচাই আমগো মাঝে সবার আগে এই বিষয়ে ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন কিন্তু তিনি নিজের জঙ্গলমহালের প্রতিরোধ ব্যবস্থা সেভাবে বৃদ্ধি করার খুব বেশ তাগিদ অনুভব করেন নাই। এইখানেই উনার বোকামি ছিল।’

‘এই বিষয়ে আপনারা নিশ্চিত?’ এবার মাসুম জানতে চাইল তার খাওয়া প্রায় শেষ দিকে। ‘এমনও তো হইতে পারে হয়তো মোঘলরা অনেক বেশি শক্তি নিয়ে আঘাত করেছিল তাদের ওপরে। কারণ আমি এর আগে জঙ্গলমহালে একবার গেছিলাম। যদিও সেইটা অনেক আগে, কিন্তু পরিষ্কার মনে আছে জঙ্গলমহাল অত্যন্ত সুরক্ষিত একটা কেল্লা।’

‘আসলে ওইখানে যে কী হইছিল কোনোটাই সঠিকভাবে জানা যায় নাই,’ এবার রসুল খাঁ বলে উঠল।

‘কারণ কী? আমি তো জানি আক্রমণের প্রায় সাথে সাথে জঙ্গলমহাল থেইকা বৃদ্ধ, শিশু আর মহিলাদের একটা দলকে আপনাদের এখানে সরিয়ে ফেলা হয়। তাহলে ওরা আসতে পারল কিন্তু আপনারা যাইতে পারলেন না,’ মাসুম মনে মনে আবারও অস্বস্তি বোধ করল। কে জানে তার কথাগুলো জেরার মতো শোনাচ্ছে কি না। কিন্তু তাকে পরিস্থিতি বুঝতে হবে।

‘ওরা নিতান্তই বৃদ্ধ-শিশু আর ভেতর বাড়ির লোকজন। ওরা তেমন কিছুই বলতে পারে নাই। যাকগে,’ রসুল খাঁ বলে চলল। ‘জঙ্গলমহালের পতন কীভাবে হইছে সেইটা জানা এখন জরুরি না। জরুরি যেইটা সেইটা হইল আক্রমণ শোনার পরে প্রথম লোকজন যখন চইলা আসল। আমরা প্রায় সাথে সাথেই দ্রুততম সময়ে আমগো লাঠিয়াল আর আর ছিপ নৌকার একটা বাহিনী পাঠাইছিলাম কিন্তু ওরা কিছুই করতে পারে নাই এর আগেই মোঘল সেনাপতি বাহরাম খাঁর বাহিনী পুরা এলাকার স্থল আর জলপথ দুইটারই দখল নিয়া নেয় এমনকি আমগো বাহিনীর লগে ওগোর কিছু খণ্ডযুদ্ধও হইছে। আমগো বাহিনী কিছুই করতে না পাইরা ফিরা আসছে। বাকিটা তো আপনারা জানেনই।’

‘আরেকটা বিষয়,’ মাসুম নিজের হাত মুছতে মুছতে বলে উঠল, ‘শোনা গেছে জঙ্গলমহালের পতনের ঠিক আগেই নাকি সুবাদারের স্ত্রী আর তার বিশ্বস্ত কয়েকজন লোক ভিতরের জঙ্গল আর জংলার দিকে সইরা পড়ছে, কথাটা কতখানি সত্যি?

‘এইটা আমি ভালো বলতে পারবো,’ বাসিম আবারও কথা বলে উঠল ‘আপনারা তো সেই উদ্দেশ্যেই আসছেন তাই না?’ মাসুম মাথা নেড়ে সায় জানাল। ‘সুবাদার আসলাম শেঠ অত্যন্ত অভিজ্ঞ আর বিচিত্র কাজকারবারের লোক ছিলেন। কথিত আছে উনার অনেক রহস্যময় ব্যাপারও নাকি ছিল। আপনারা কি জানেন উনার স্ত্রী পারস্যের বিশেষ গোত্রের মহিলা ছিলেন?’

মাসুম আর বরখা মাথা নেড়ে সায় জানাল। ‘ওইরকমই তো শুনছি, ‘ দুজনেই অনেকক্ষণ পর ধোবলের গলা শুনে বেশ অবাক হয়ে ফিরে তাকাল সেদিকে। খাওয়া শেষ করে তৃপ্তির ঢেকুর তুলে সে এখন ওদের আলোচনায় অংশগ্রহণ করার ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে উঠেছে।

‘হ্যাঁ, আপনারা ঠিকই শুনেছেন। আমরা ধারণা করতেছি সুবাদার আসলাম শেঠ যখন বুঝতে পারে জঙ্গলমহাল পতনের দ্বারপ্রান্তে, অর্থাৎ কেল্লার পতন স্রেফ সময়ের ব্যাপার তখন সে নিজে থেকেই নিজের বাহিনী নিয়ে সামনে সরে আসে সরাসরি যুদ্ধে। এই কাজটা সে করে সম্ভবত, শেষ শব্দটার গুরুত্ব বোঝানোর জন্যে দুবার উচ্চারণ করল সে। ‘তার স্ত্রী এবং তার সাথের লোকদেরকে পালানোর ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্যে।’

‘এইখানে আমার একটা কথা বলার আছে, মাসুম কথাটা শুরু করলেও তাকে থামিয়ে দিলো রসুল খাঁ।

‘একটু আপনাগো, মিষ্টি পান আর তামুক পরিবেশন করতে বলি,’

রসুল খাঁ ঠিক আগের মতোই তার অতিথি সৎকারের সুরে বলে উঠল। মাসুম একবার মানা করতে চাচ্ছিল কিন্তু তারও তামাকের তেষ্টা পেয়েছে, তাই আর মানা করল না। রসুল খাঁ দরজা খুলে তালি বাজিয়ে খানসামাদেরকে ডাকতেই কিছুক্ষণের ভেতরে ওদেরকে মিষ্টি পান আর সিলিম সাজিয়ে তামাক পরিবেশন করা হলো।

সাজানো বাটা থেকে পান তুলে নিয়ে মুখে পুরে গড়গড়ার নলটা টেনে নিয়ে তাতে দুটো টান দিলো মাসুম। এরকম চিন্তিত পরিস্থিতিতেও ওর মুখে হাসি ফুটে উঠেছে। জীবনে যেই অবস্থায় যেই পরিস্থিতিতেই থাকুক না কেন, ছোটো ছোটো জিনিসগুলো উপভোগ করার কোনো বিকল্প হয় না। এইটাই তো জীবন।

‘জি, রসুল খাঁ সাহেব, আমার একটা কথা জানবার আছে। আমি এখন পর্যন্ত যা বুঝতে পারছি তাতে আমার তিনটা প্রশ্ন আছে। প্রথমত, আপনাদের বক্তব্য অনুযায়ী জঙ্গলমহালকে বাহরাম খাঁর লোকেরা এমনভাবে ঘিরা ফেলছিল তাতে

ওগো পালাবার কোনো পথ ছিল না। যেইখানে আপনাদের শক্তিশালী বাহিনীই ঢুকতে পারে নাই, সেইখানে কয়েকজন নারী আর তার সাথের লোকজন জঙ্গলমহাল থকে পালালো কীভাবে?’

‘এর উত্তর আমি দিতে পারবো,’ বাসিম নিজেও পান চিবুতে চিবুতে বলে উঠল। ‘আমি আরবদেশ থেকে পড়ালেখা করে ফিরে আইসা গত কয়েক বছর ধইরা এই এলাকা আর রাজনীতি বোঝার চেষ্টা করতেছি। আর তাতে একটা তথ্য আমার কাছে আছে, জঙ্গলমহালের অনেক রহস্য অছে। আর অবশ্যই জঙ্গলমহালের গোপন পথ ছিল যেদিক দিয়ে তারা সম্ভব সুবাদার আসলাম তার স্ত্রী এবং ওদেরকে পলাইতে সাহায্য করছে। কাজেই তারা পলাইতে পারছে এটা শুধুমাত্র গুজব না যুক্তিনির্ভর অনুমানও বটে। আপনার দ্বিতীয় জিজ্ঞাসা?’ বাসিম সরাসরি তাকিয়ে আছে মাসুমের দিকে।

মাসুম আনমনেই মাথা নাড়ল। এই ছেলেটাকে তার ভালো লাগতে শুরু করেছে। এর বুদ্ধিমত্তা দারুণ। ‘আমার দ্বিতীয় কথা হইল, তারা যদি পলাইয়া থাকে, তবে মোঘলদের চষে বেড়ানোর পরও পুরা এলাকাতে তারা টিকা আছে ক্যামনে বিগত কয়েকদিন? এইটা কি প্রায় অসম্ভব না?’

‘আমি বলব?’ রসুল খাঁর দিকে তাকিয়ে অনুমতি প্রার্থনা করতেই বাসিমকে মাথা নেড়ে সায় জানাল রসুল খাঁ। ‘আপনার এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে এই এলাকার ভৌগোলিক কিছু বিষয় আপনাগো বুঝতে হবে এবং এখানকার পরিস্থিতি আর রাজনীতিরও খানিকটা অংশও।’

‘আমি জানতে আগ্রহী,’ মাসুম বেশ দৃঢ় প্রত্যয়ের সাথে বলে উঠতেই, তাকে সায় জানাল তামাক টানতে থাকা বরখা আর ধোবল।

‘আমরা যদি ওইখানে গিয়ে কিছু করতে চাই তাইলে আমাদের সব বুঝতে হবে।’

‘অবশ্যই, আমি বুঝতে পারছি। এই কারণেই আপনাদেরকে এত বিস্তারিত বলা সবকিছু এবং আরও কারণ আছে সেগুলোও বলবো এবং,’ বলে সে আবারও দরজার কাছে গিয়ে দরজাটা ভালোভাবে আটকে দিলো ভেতর থেকে। ‘প্রথমেই এই এলাকার ব্যাপারে খানিকটা বলে নেই। আমি শুনেছি আপনি এই এলাকাতে আগেও এসেছেন,’ এই কথাটা সে মাসুমের উদ্দেশ্যে বলে উঠল

‘হুম, শুধু আমি না, ধোবলেরাও,’ বলে সে তামাক চিবুতে থাকা ধোবলের দিকে দেখাল। ‘এই এলাকার সাথে পারিবারিক সম্পর্ক আছে। কাজেই আমরা দুজনেই এই এলাকার ব্যাপারে মোটামুটি ধারণা রাখি। একেবারেই ধানি এলাকা এইটা। পুরো এলাকাটা দুইভাগে বিভক্ত, উজান আর ভাটি। আপনাদের এইদিক

থেকে একেবারে এগারো সিন্ধু পর্যন্ত উজান আর জঙ্গলমহালের প্রায় পুরো এলাকাটাই ভাটি এলাকা। চারপাশে নদী, খাল, বিল আর হাওড়ে ছাওয়া পুরো এলাকা।’

‘পানির নানা ধারায় তো ছাওয়া আছেই তারচেয়ে বড়ো কথা হলো পানির ধারা সাথে সাথে জঙ্গলেও ছাওয়া আছে পুরা এলাকা,’ রসুল খাঁ কথা বলে উঠল। ‘এক কাম করি, আমার বাহিনীর প্রধান শেরুরে আসতে বলি।’

‘আর ওরে আমগো কাপড়ের মানচিত্রগুলাও আনতে বইলো,’ বাসিম বলে উঠল। তার বাপ বিদেয় নিতেই সে বলে যেতে লাগল। ‘হ্যাঁ, কী জানি বলতেছিলাম?’

‘আমি বলতেছিলাম আমি এই এলাকা সম্পর্কে সার্বিক ধারণা রাখি তবে সত্যি কথা হলো সার্বিক ধারণা রাখা এক জিনিস আর একেবারে নির্দিষ্টভাবে এলাকার সম্পর্কে জানা ভিন্ন কথা। এইটা বুঝতে পারছি যেহেতু ভাটিতে অবস্থিত জঙ্গলমহাল এলাকার পুরাটা জুইড়াই নানা ধরনের ছোটো-বড়ো পানির ধারা আর জঙ্গলে ছাওয়া পুরো এলাকা।

‘সেই সাথে ছোটো বড়ো ফসলি হাওড়ও আছে। আর এইসব হাওড়গুলারে আমরা বলি বিধায়ী, বিধায়ীর নানা জায়গায় ছোটো বড়ো নানা ধরনের দ্বীপও থাকে। দ্বীপ বলতে এখন যেহেতু বর্ষাকালের সায়াহ্নে কাজেই বেশিরভাগ হাওড়গুলা ডুবে গেছে পানিতে আর ছোটো ছোটো গ্রামগুলো হয়ে গেছে দ্বীপের মতন। এইসব দ্বীপগুলোর ভিতরে কিছু দ্বীপে মানুষের বসবাস আছে আবার কিছু দ্বীপ একেবারেই খালি।’

রসুল খাঁর সাথে বিশালদেহী পালোয়ানের মতো এক লোককে নিয়ে প্রবেশ করল বৈঠকখানার ভেতরে।

‘ও হইল শেরু, আমার স্থল বাহিনীর প্রধান,’ বলে সে শেরু নামের লোকটার চওড়া কাঁধে একটা চাপড় মারল। ‘শেরু হইল অত্র এলাকার সবচেয়ে বড়ো পালোয়ন এবং সেরা তলোয়ার আর লাঠির ওস্তাদ।’

‘সালাম হুজুর,’ লোকটার বিশাল আকৃতি আর ভয়ঙ্কর চেহারার তুলনায় তার গলার স্বর অনেকটাই পাতলা। শুনতে অস্বাভাবিক লাগে যা আনতে বলছি আনছ?’ বাসিম জানতে চাইল।

‘জি, হুজুর,’ বলে সে গোল করে পাকানো কাপড় খুলে ওদের সামনে মেলে ধরে বাসিমের হাতে একটা ছোটো কাঠির মতো ধরিয়ে দিলো। ওরা সবাই বিছানো কাপড়ের মানচিত্রটাকে ঘিরে দাঁড়াল।

‘মনোযোগ দিয়ে দেখেন, এইখানে বলতে গেলে প্রায় পুরা এলাকারই মানচিত্র আছে। একেবারে ছোটো নদী-নালাগুলান না থাকলেও বড়ো বড়ো পানির ধারা আর মূল জঙ্গলের বলতে গেলে প্রায় সবই আছে,’ বলে সে হাতে ধরা কাঠিটা দিয়ে একটা নির্দিষ্ট জায়গায় নির্দেশ করল। ‘এইটা হইল আমগো আবাসস্থল। মানে আমরা এখন এইখানে আছি। এইখান থেকে—’ সে কাঠিটাকে সরিয়ে নিতে নিতে দেখাতে লাগল। ‘—এইদিকে মাইল পনেরো আগাইলে জঙ্গলমহাল, বলে সে কাঠিটা গোল করে একটা এলাকা নির্দেশ করল। ‘এইটা পুরাটাই জঙ্গলমহাল। এখন পুরাটা মোঘলবাহিনীর হাতে, এই এলাকার দখলে আছে বাহরাম খাঁ,’ বাসিম নামটা উচ্চারণ করতেই আনমনেই মাসুম নিজের দাড়িতে একবার হাত বুলাল। চিবিয়ে চিবিয়ে উচ্চারণ করল, ‘বাহরাম খাঁ, তার কথা কেউ শুনতে পেল না। বাসিম বলে চলেছে।

‘আর এই এলাকার পুরাটাই বলতে গেল এখন মোঘল নজরদারিতে আছে,’ বলে সে জঙ্গলমহালের দিকে নির্দেশ করল। ‘এইটা হইল জঙ্গলমহালের সামনের ভাগ। এই এলাকা দিয়া মোঘলগোর নজর এড়ায়া একটা মাছিও ঢুকতে পারব না। এইটা হইল অন্যপাশ এদিকেও একই অবস্থা এদিকটা মোঘলগোর দখলে থাকলেও এদিক দিয়া কেউ সইরা পড়তে পারলে আমরা টের পাইতাম। তারমানে একটা দিকই বাকি থাকল যদি জঙ্গলমহাল থেইকা কেউ সইরা যাইতে পারে তবে অবশ্যই অবশ্যই এইদিকে গেছে। সে জঙ্গলমহালের পেছনের একটা নির্দিষ্ট দিকে নির্দেশ করল।

‘কী আছে ওইদিকে?’ মাসুম নিজের দাড়িতে হাত বুলাতে বুলাতে জানতে চাইল।

‘প্রথমে বলতে হয় ছোটো-বড়ো বেশ কিছু খাল-বিল, সেগুলা গিয়া মিশছে বমার নদীতে, বমার নদীর একটা অংশ আবার গিয়া মিশছে ছোটো ছোটো দুইটা হাওড়ে। আর পুরা এলাকা আবার ছাওয়া জল-জঙ্গল নামে একটা ছড়ানো-ছিটানো জঙ্গলে। যদি জঙ্গলমহাল থেইকা কেউ সইরা গিয়ে থাকে এইদিকেও যেকোনোখানে থাকতে পারে,’ বলে সে কাঠিটা দিয়ে একটা বৃত্তের মতো এঁকে দেখাল।

মাসুম চিন্তিত ভঙ্গিতে নিজের দাড়িতে হাত বুলাতে বুলাতে মানচিত্রে নজর বুলাচ্ছে। তারমানে আমরা যদি অনুসন্ধান চালাইতে চাই তবে এইখান থেকে মোঘলগোর রাজত্ব পার হইয়া, জঙ্গলমহাল যেইটা মোঘলগোর দখলে সেইটা পার হইয়া ওই এলাকায় ঢুইকা তাগরে খুঁইজা বাইর কইরা তারপর আবার সব পার হয়া ফিরা আসতে হইব, প্রতিটা শব্দ উচ্চারণের সাথে সাথে মাসুমের ভ্রু কুঁচকে উঠছে। ‘এইটা তো খড়ের গাদায় সুচ খোঁজার চেয়েও কঠিন।’

মাসুমের কথা শুনে ধোবল আর বরখা দুজনেরই চোখ কপালে উঠে গেছে। কিন্তু বাসিম হেসে উঠল। ‘আপনে স্রেফ অর্ধেক বলছেন, জনাব। আপনে খড়ের

গাদায় সুচ খোঁজার কথা বলছেন। এই সুচ আদৌ গাদাতে আছে কি না-আমরা কেউই জানি না। এই সুচ আবার বহুলোকে খুঁজতাছে। আর এইটা শুধু খুঁইজা পাইলেই হবে না। এইটারে আবার নিয়া ফিরা আসতে হবে।’

মাসুমের ভ্রু আবারও কুঁচকে উঠল। ‘একটা কথা বুঝলাম না, বহু লোকে খুঁজতেছে বলতে আপনে কি বুঝাইলেন, মোঘলরা?’

‘আপনারে আমি আলোচনার শুরুতে বলছিলাম এই এলাকা সম্পর্কে ধারণা দিবো, এরপরে এই এলাকার রাজনীতি সম্পর্কে বলব। এইবার সময় আসছে রাজনীতি সম্পর্কে ধারণা দেওয়ার। জঙ্গলমহালের যেই এলাকা আপনারা দেখলেন ওই এলাকার একটা বিশেষত্ব হইল ওইটা বমার নদীর মাধ্যমে ওপরে উত্তর, বাঁয়ে পশ্চিম আর ডাইনে পূর্বের সাথে একটা যোগাযোগ আছে। এইখানে আমগো একটা সুবিধা হইল আমগো এলাকা পুরাটাই আমগো দখলে, কারণ এইটা কারও সাথে সংযুক্ত না। এই কারণে আমগো এইদিকে যেমন পুরাটাই নিজেগো নিয়ন্ত্রণে, সাথে আবার অসুবিধা হইল আমগো আয়ও, কম প্রভাবও কম জঙ্গলমহালের তুলনায়। মোঘলরা ওইদিকে আগে আক্রমণ চালানির এইটাও একটা কারণ। একেবারে মেঘালয় থেইকা শুরু কইরা আসাম এমনকি ত্রিপুরার অনেক ব্যবসায়ী এই বাংলা হয়া বৃহত্তর হিন্দুস্থানের দিকে যাবার পথের সাথে সংযুক্ত ওই এলাকা দিয়া। এই কারণে সুবিধা-অসুবিধা দুইটাই আছে। জঙ্গলমহাল দখল করলেও মোঘলরা পুরা এলাকা নিশ্ছিদ্রভাবে আটকাইতে পারে নাই-এর কারণ হইল পুরা এলাকা অটাকায়া দিলে নিম্নবিত্ত থেইকা শুরু কইরা বহু মানুষের অনেক ক্ষতি হইবে। আবার আরেকটা অসুবিধা হইল লোকের সমাগমের কারণে যেই এলাকা দেখাইলাম সেই এলাকা ছোটো বড়ো ডাকাইত থেইকা শুরু কইরা বহু স্বাধীন রাজ রাজাদের বাহিনীর সমাগম ওই এলাকায়। আর ইতিমধ্যেই খবর ছড়াইয়া গেছে জঙ্গলমহালের পতনের পর ওই এলাকাতে সুবাদার আসলাম শেঠের স্ত্রী বহু সম্পদ নিয়া পলায়া গেছে। কাজেই এই সুচ এমন যার পিছনে এখন বহুত লোক লাগছে,’ বলে বাসিম নিজের মুখটা বাঁকায়া একটা বিশেষ ভঙ্গি করল।

‘খুব ভালো অবস্থা বুঝতে পারছি,’ বাসিমকে ভেংচে দিয়ে ধোবল বলে উঠল। ‘তাহলে এখন উপায় কী? আমার প্রশ্ন হইল ওই এলাকায় গিয়া উদ্ধার অভিযান তো পর, মোঘলগোর নজর এড়ায়া তো আমরা ঢুকতেই পারব না। এর আগেই শেষ। তাহলে উপায় কী এখন?’ নিজের প্রশ্নের শুরুতে আর শেষে একই কথার পুনরাবৃত্তি করল মাসুম।

‘উপায় একটা আছে,’ এবার কথা বলে উঠল রসুল খাঁর বাহিনীর প্রধান শেরু। ‘মানে আমরা ভাইবা বাইর করছি আরকি, কিন্তু মারাত্মক ঝুঁকি আছে এতে।’

তার কথা শুনে নিষ্ঠুর একটা হাসি ফুটে উঠল মাসুমের মুখে। নিজের দাড়িতে হাত বুলাতে বুলাতে সে একবার ধোবল আর বরখার দিকে দেখে নিয়ে বাটা থেকে এটা পান তুলে মুখে পুরে সরাসরি বাসিম আর শেরুকে একবার দেখে নিয়ে রসুল খাঁর দিকে দৃষ্টি স্থির করল। ‘আপনাগো কি মনে হয় আমরা এইখানে আসছি ক্যান? ঝুঁকি আছে বইলাই তো আমরা আসছি। আমরাও দেখব কতবড়ো ঝুঁকি আছে।’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *